আগের পর্ব গুলোর লিঙ্ক উপরে দেওয়া আছে।
পর্ব-১১
মনে শতো শতো সংকোচ নিয়ে দরজা খুলে দিল রুমি।
এর পর যা দেখলো, তাতে কিছু টা অবাকের সাথে ভয় ও পেলো।
দরজার সামনের জায়গাটা জনমানব শূন্য। কেউ নেই এখানে।
এতো দ্রুত কেউ চলে যেতে পারে না।
তাহলে শব্দ যে শোনলো সে? তবে কি মনের ভুল।
নিজেকে এই মানিয়ে নিল। ভুল শোনেছে সে। মনকে বুঝিয়ে যেই না দরজা আটকে দিবে তখনই চোখ আটকে গেলো একটা চিরকুটে।
এটা কিসের কাগজ পরে আছে দরজার সামনে ?
তুলে নেওয়া টা কি ঠিক হবে?
দ্বিধা ভেঙে অবশেষে কাগজটা হাতে তুলে নিল,
~~~ কাজল চোখে তোমায় মায়াবতী ষোড়শী কন্যা লাগছিল আজ,'~~~"
ব্যাস আর কিছু লেখা নেই। এতোখাণি লেখাই যে রুমির এক রাতের ঘুম কেরে নিতে সক্ষম তা টের পেলো বেশ করে ।
তাছাড়া এমন চিরকুট কে পাঠাবে? তাকে কে ফলো করেছিল আজ?
নাকি অন্য কারো চিরকুট ভুলে এখানে এনে রেখেছে?
রুমি যখন ভাবনার জগতে ডুবে আছে তখনই দ্বিতীয় বারের মতো দরজায় শব্দ হলো।
এক মুহুর্ত দেরি না করে রুমি দরজা খুলতে ছুটেছে,
দরজা খুলে আরও এক ধাপ অবাক হলো,
" তু,,,তু,,, তুমি
________________
গাড়ির পিপ পিপ শব্দ শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে,
সাথে সকলের হৈ-হুল্লোড়।
বউ এসেছে বরণ করো, বরণ করো।
আমি আমার মায়ের বিয়ে দেখিনি। তবে বাবার বিয়ে দেখতেছি। দ্বিতীয় বিয়ে,
সেই তো দু দিন আগের রাতে ফুফু আর দাদি আমাকে কোলে বসিয়ে বুঝালো।
" সংসারে একজন মা প্রয়োজন। দাদির শরীর খারাপ, সে কি সংসারের সকল কাজ পারে? তাছাড়া আমার জন্য নাকি মা আনা দরকার। নয়তো আমার খেয়াল কে রাখবে।
আর আমাকে আদর করে এমন একজনকে আনতে চায় তারা।
লিবা ম্যাডামকে নাকি ঠিক করেছে।
কিন্তু বাবা নাকি রাজি নন।
তার চিন্তা অন্য মহিলা এসে আমাদের আদর করবে না। তাই আমি বললে তবে নাকি বাবা রাজি হবে।
আমি মানতে নারাজ।
তখন আরও বুঝালো,
আজ না হয় কাজ তোর বাবা তো বিয়ে করবেই। তখন নতুন মা কেমন করে কে জানে। কিন্তু তোর ম্যাডাম তো তোকে কতো আদর করে।
তাই উনাকেই আনলে ভালো হবে। তোকেও আদর করবে
সব শেষে আমি মেনে নিলাম।
আমার মানা না মানায় অবশ্য তাদের বিয়ে আটকে থাকতো না। তবুও ফর্মালিটি পূরনের জন্য হয়তো এতোখানি আদিক্ষেতা করেছিল সে দিন।
সে সুবাদে আজ বাবার বিয়ে,
মা আজ দুপুরে এখানে না আসলে আমিও যাইতাম বাবার সাথে তার বিয়েতে, মা আসায় আমার আর যাওয়া হয়নি। কেউ তেমন করে বলেওনি
নতুন মাকে বরণ করে ঘরে আনা হলো,
আমায় ডাকেনি কেউ।
কিছুক্ষণ পর আমি গিয়ে ম্যাডামকে ডাকতেই পাশ থেকে ফুফু দাঁত কিরকির করে বললো,
" নতুন মা এটা তোর। এসব ম্যাডাম ফেডাম ডাকবি না এখন থেকে আর।
ম্যাডাম বিনয়ী সুরে যখনই বললো,
" থাক না, আগে থেকে ম্যাডাম ডেকে অভ্যাস, তাই ডাকুক। পরে না হয় আস্তে আস্তে ঠিক করে নিবে।
কথাটা বলতেই ছোট ফুফু গরম চোখে তাকালো নতুন মায়ের দিকে,
দৃষ্টিতে যেন কথা আদান প্রধান করে নিল, কেমন রহস্যময় দৃষ্টি। । ফুফুর এমন চাহনি দেখে ধমে গেলো নতুন মা।
আর কিছু বললো, না।
আমিও ঘরে চলে আসলাম, ফুফুর আচরণ ভালো লাগে না আমার কেন জানি। কেমন রহস্যময় লাগে শুধু .
নাদিম ভাই ঘরে আসলো কিছুক্ষণ পর, ঐ রাতে আমাকে মা*রার পর থেকে আর আমার সাথে তেমন কথা হয়নি তার। প্রয়োজন ছাড়া কিছু বলে না। এমন কি ধমক ও দেয়না হুটহাট।
আজ হঠাৎ এসেই প্রশ্ন করলো,
" আমি তোকে মামির কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম সে কথা তুই সে কথা তোর ম্যাডামকে বলেছিলি তাইনা?
প্রশ্নের মাঝেই যেন উত্তর লুকিয়ে আছে। নাদিম ভাইয়ার দৃষ্টি এমন যেন সে উত্তর টা জেনেই প্রশ্ন করেছে আমায়।
আমি মৌন রইলাম,,
নাদিম ভাই নীরবতার থেকে উত্তর কুড়িয়ে নিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো,
" ঐ মহিলার থেকে দূরে থাকবি।
" কেন?
আমি ডেব ডেব করে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম। কিছু উত্তরের আশায়। কিন্তু অপেক্ষা বৃথা।
" আমার মনে হলো তাই বলেছি। বাকিটা তোর ইচ্ছে।
নাদিম ভাই কথা বললো না আর আমার সাথে।
পর দিন সকালে নতুন মা রান্না করলো,
খেয়ে স্কুল চলে গেলাম।।
স্কুল থেকে ফিরতেই অবাক হলাম, যা দেখে
চলবে ইনশাআল্লাহ
" ভাইয়া, তুমি? তোমাদের তো কাল আসার কথা ছিল,। তাহলে আজ এলে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?
রুমি উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করতেই লিহাব মুচকি হেসে বলল,
" না রে, তেমন কিছু না। তুই বাড়িতে একা আছিস, তাই তোর ভাবি বলল আমি যেন চলে আসি। কখন কী আপদ-বিপদ হয় বলা যায় না। তুই আবার ছোট বাচ্চা নিয়ে আছিস। যদি কোনো প্রয়োজন পড়ে
তাই
দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দে।
এ কথা বলে সে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
রুমি থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। ভাবিকে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। যে ভাবি ইদানীং তাকে সহ্যই করতে পারে না, সেই কিনা তার কথা ভেবে ভাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল৷
আশ্চর্য।
মানুষের ভেতরটা বোঝা সত্যিই কঠিন।
রুমির মনে আরেকটি ভাবনাও দানা বাঁধল।
ভাবির এই রহস্যময় আচরণ। সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না সে। চিরকুটের কথা ভেবে ভেবে কাটল পুরো রাত।
আরও একটি সিদ্ধান্ত নিল রুমি।
ভাবির থেকে দূরে থাকবে না। ভাবি যতই খারাপ ব্যবহার করুক, সে আশেপাশেই থাকবে, কাজকর্মে সাহায্য করবে।
পরদিন ভাবি এলে রুমি এক গ্লাস শরবত এগিয়ে দিল। হাসনা কিছু না বলে শরবতটা খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় আড়চোখে একবার তাকাল তার দিকে।
বাড়ির সব কাজ সে একাই করে। সেদিন রাতের খাবারের জন্য বেগুন কাটছিল হাসনা। তনিমাকে ঘুম পাড়িয়ে রুমি এগিয়ে গেল।
—
"আমি কেটে দিচ্ছি, দাও আমাকে।
বলেই বটি হাতে নিতে গেলে হাসনা এক টানে বটি কেড়ে নিল।
"আমার কাজে হেল্পার লাগে না। আমি একাই পারি। এ বাড়ির বাঁধি তো আমি,
রুমি অনেকক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রুমির হাত সামান্য কেটে গেছে, সেখান থেকে র'ক্ত ঝরছে। খুব স্বাভাবিক সুরে রুমি বলল
"তুমি এমন করে কথা বলো কেন, ভাবি?
হাসনা বেগুনটা নামিয়ে রেখে মাথা তুলে তাকাল।
" ওমা, কেমন করে কথা বলি? আসলে কী জানো, সত্যি কথা একটু তিতা লাগে। আর আমি তো সত্যিই বলছি, তাই হজমে সমস্যা হচ্ছে তোমার।
সমস্যা নাই, আস্তে আস্তে হজম হয়ে যাবে। আমি এ বাড়ির সব কাজ করি। তা আমি বাঁধি না এ বাড়ির?
এটা শুনতে খারাপ লাগলে আমার কিছু করার নাই।
রুমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেল।
পরদিন তনিমাকে দোলনায় রেখে গোসল করতে গেল সে। অর্ধেক গোসল সেরে উঠতেই ঘর থেকে তনিমার হৃদয়বিদারক কা"ন্নার শব্দ ভেসে এল। ওয়া ওয়া করে কাঁদছে মেয়েটা। সে কী কা'ন্না
রুমি তাড়াহুড়ো করে কাপড় বদলে ঘরের দিকে ছুটল। এর মধ্যেই তনিমার কা*ন্না থেমে গেল। তবুও দ্রুত পায়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াতেই তার পা থেমে গেল।
__________
খাবার টেবিলে খাবার সাজানো। সবাই সামনে বসে আছে, কিন্তু কেউ মুখে তুলছে না।
আমি আর নাদিম ভাই বাড়ি ফিরতেই ফুফু কর্কশ গলায় ডাকলেন
খাবার খেতে আয়। দেখে যা খাবারের কী অবস্থা।
আমরা কোনো কথা না বলে ঘরে ঢুকে স্কুল ড্রেস বদলে টেবিলে বসলাম। দেখলাম, ফুফু ভীষণ রেগে আছেন।
বাবা শান্ত স্বরে বললেন,
"প্রথম দিন, খেয়ে নাও তো।
ফুফু চটে উঠলেন। নতুন মায়ের দিকে দাঁত কিঁচিয়ে বললেন
"শুধু রূপ থাকলেই হয়? রান্না পারো না, বলতে পারতে! ইউটিউব দেখে রান্না করতে কে বলেছিল?
বাবা আবার বললেন,
"খেয়ে নাও না। আম্মা, প্লেটে তরকারি দাও।
দাদি সবার প্লেটে তরকারি তুলে দিলেন। গোশ্ত আর আলু-টমেটোর ঝোল। আলুর টুকরোগুলো হাতের মুঠোর মতো বড় বড়, তাও এক সাইজের নয়। আর টমেটো? সেগুলো কাটা-ই হয়নি।
ফুফু আবার প্রশ্ন করলেন
"মানলাম রান্না পারো না। কিন্তু টমেটো যে কে'টে রান্না করতে হয়, তা জানো না?
নতুন মা বিনয়ী স্বরে বললেন
" জি, জানি। ইউটিউবে দেখেছি। কিন্তু আলু সেদ্ধ হয়ে ঝোল শুকিয়ে যাচ্ছিল। টমেটো কা'টতে গেলে তরকারি পুড়ে যেত। তাই না কে'টেই দিয়েছি। তা ছাড়া টমেটো তো অল্পতেই সেদ্ধ হয়ে গলে যায়। সেখানে কা'টাকা'টি করে সময় নষ্ট করার কী প্রয়োজন?
নতুন মায়ের কথায় আমার হাসি পেয়ে গেল। পাশে নাদিম ভাইও মুচকি হাসল।
এর মাঝেই ঝুমুর বলে উঠল
" আচ্ছা মামি, টমেটো ধুয়ে নিয়েছিলে তো?
নতুন মা বিস্মিত চোখে তাকাতেই ঝুমুর বলল
" না হলে সময়ের কারণে না ধুয়েই দিয়ে দাওনি তো?
ফুফু ধমক দিলেন
" চুপচাপ খা!
সবাই খাওয়ায় মন দিল। তবে মন দিয়ে খাওয়ার মতো খাবার নয় '
একেবারে অখাদ্য। ফুফু নাক-মুখ কুঁচকে খাচ্ছেন, এ দেখে নতুন মায়ের মুখে এক অদ্ভুত হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। সেই হাসির কারণ বুঝতে পারলাম না।
খাওয়া শেষে ড্রয়িংরুমে বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। পরে যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, দেখলাম ফুফু আর নতুন মা গভীর আলোচনায় মগ্ন। দু’জনের মুখই গম্ভীর
মনে হলো খুব জরুরি কিছু নিয়ে কথা বলছে।
আমি এগিয়ে যেতেই নতুন মা বলছিলেন
" আস্থা রাখতে পারেন। তবে আমার কথাও আপনাকে রাখতে হবে। তা নয়তো,,,,,,
আমার পায়ের শব্দে দু’জনেই চুপ হয়ে গেলেন।
বাকি কথা আর শোনা গেলো মা।আমি আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে গেলাম।
হাসনা বেগম তনিমাকে কোলে নিয়ে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আছেন। ছোট্ট মেয়েটাও কী সুন্দর করে তাঁর বুকে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে আরামছে।
অথচ এই তো কিছুক্ষণ আগেও কী প্রচণ্ড চিৎকারই না করছিল।
হাসনা কখনোই শখ করে রুমির কোল থেকে তনিমাকে নিয়ে আদর করেননি। কিন্তু আজ, যখন রুমি ঘরে ছিল না, তখন তিনি নিজেই তনিমাকে বুকে আগলে রেখেছিলেন। বিষয়টি রুমির কাছে ভীষণ অদ্ভুত মনে হলো।
রুমিকে আসতে দেখে হাসনা তনিমাকে দোলনায় শুইয়ে রেখে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ভাবির প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করল রুমি। এরপর থেকে ভাবির আরও কিছু আচরণ তাকে ভাবিয়ে তুলল। হাসনা প্রায়ই রুমির সঙ্গে খোঁচা দিয়ে কথা বলতেন, কটু মন্তব্য করতেন। কিন্তু তনিমার খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
এসবের ব্যাপারে তিনি নিজেই লিহাবকে বারবার মনে করিয়ে দিতেন।
সবকিছু বুঝে নেওয়ার পর রুমি ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখল। ভাবির কটুকথা যেন তার প্রতিদিনের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল।
________
নতুন মায়ের আচরণেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। এখন তিনি আগের মতো স্নেহ দেখান না, আবার খারাপ ব্যবহারও করেন না। কেমন যেন চুপচাপ থাকেন, আমাদের সঙ্গে তেমন মিশতেও চান না।
একদিন হঠাৎ দেখি, দুপুরে রান্না চড়িয়ে রেখে নতুন মা বাবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার ভেতরে প্রবল কৌতূহল জাগল। বাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম।
এরপর যা দেখলাম,
নতুন মা আলমারি থেকে কিছু কাগজপত্র বের করছেন। সেগুলো সামনে রেখে নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে কারও কাছে পাঠালেন। পরপরই কাউকে ফোন করে বললেন
"পাঠিয়ে দিয়েছি। আর হ্যাঁ, পরের বার এমন হঠাৎ কিছু চাইবেন না। আগে থেকে জানাবেন। আমি সুযোগ বুঝে যা প্রয়োজন, পরে পাঠিয়ে দেব।
কথা শেষ করে তিনি পেছনে ফিরতেই আমি দ্রুত জানালার আড়ালে সরে গেলাম। কিন্তু শুকনো ডালে পা পড়তেই মচমচ করে শব্দ হলো। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে এলাম।
মনের ভেতর তখন কেবলই খচখচ করতে লাগল।
কোন কাগজের ছবি পাঠালেন? কাকে পাঠালেন?
সারাদিন সেই ভাবনায় কাটল।
কথাটা আমি কাউকে বলিনি।
এমনকি নাদিম ভাইকেও না।
কয়েক দিন পর আবারও একই ঘটনা ঘটল। নতুন মা দরজা বন্ধ করতেই আমি আগের মতো জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু এবার আর তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। আমি পৌঁছানোর আগেই জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবুও কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলাম। আলমারি খোলার যে শব্দ হয়, সেটুকুই কেবল কানে এলো। আর কিছুই না।
মনের অস্বস্তি আর চেপে রাখতে পারলাম না। বিকেলে বাবাকে বলেই ফেললাম
বাবা, নতুন মা তোমার আলমারিতে কী যেন করেন।
আমার কথা শুনে বাবা ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন,
"এ কেমন কথা, ছামির? আলমারিতে তার কাপড় আছে, খুলতেই পারে।
আমি বললাম,
"না বাবা, বিষয়টা তা নয়। নতুন মা দরজা বন্ধ করে আলমারি খুলে কাগজপত্রের ছবি তুলে কারও কাছে পাঠান।
বাবা বিস্মিত স্বরে বললেন,
"কি? কবে?
."কয়েক দিন আগে। আজও।
"আজ আবার কী হয়েছে?
"আজও দরজা বন্ধ করে আলমারি খুলেছেন। কিন্তু জানালা বন্ধ থাকায় কিছু দেখতে পারিনি।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
"তুমি সত্যিই দেখেছ?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই তিনি চলে গেলেন।
ঘটনাটি ছিল বিকেলের।
রাতে হঠাৎ বাবা ঝড়ের মতো আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন। তাঁর পেছনে নতুন মা। বাবার মুখ দেখে বুঝলাম, তিনি ভীষণ রাগান্বিত।
আমার হাত চেপে ধরে বললেন,
"মায়ের মতো মিথ্যা শিখেছিস?
আমি কিছুই বুঝতে না পেরে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললাম,
"কি হয়েছে?
বাবা নতুন মাকে বললেন,
"দাঁড়িয়ে আছ কেন? দেখো তো, কোথায় রেখেছে।
বের করো।
নতুন মা দ্রুত আমার স্কুলব্যাগ খুলে বই-খাতা বের করতে লাগলেন। আমি হতবাক। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।
সব বের করার পর বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
"পেয়েছ?
নতুন মা মাথা নাড়িয়ে না বললেন। তারপর আমার কাপড় রাখার কাবার্ডের দিকে গেলেন। একে একে সব কাপড় মেঝেতে ফেলতে লাগলেন।
যেন কোনো অমূল্য সম্পদ খুঁজছেন।
হঠাৎ চিৎকার করে বললেন,
"পেয়েছি!
তিনি এক বান্ডিল টাকা বাবার হাতে দিলেন। বাবা টাকাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে আবার নতুন মায়ের হাতে দিয়ে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো আমার দিকে তেড়ে এলেন।
ঠাস করে দুটো চড় বসিয়ে বললেন,
'টাকা কেন চুরি করেছিস?
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
"আমি টাকা চুরি করিনি, বাবা।
"আবার মিথ্যা বলছিস? নিজের চোখে দেখলাম তোর ঘর থেকে টাকা পাওয়া গেল! এই টাকা কি উড়ে এসেছে?
আমি নির্বাক। শুধু কাঁদছি।
আমার নীরবতা যেন তাঁর রাগ আরও বাড়িয়ে দিল। লাঠি হাতে নিয়ে বললেন,
"বাকি টাকা কোথায় রেখেছিস? বল! না হলে আজ মেরেই ফেলব।
"আমি জানি না, বাবা। আমি টাকা নিইনি।
"তবে কার কাছে আছে? চুরি করে আবার নতুন মাকে ফাঁসাতে চেয়েছিলি? আমাকে সন্দেহ করাতে চেয়েছিলি?
বলেই তিনি বেদম মা'রতে লাগলেন।
এবার নতুন মা এগিয়ে এসে আমাকে ছাড়াতে চেষ্টা করলেন। বললেন,
"থাক, ছেড়ে দিন। ছোট মানুষ, বুঝতে পারেনি। এবারের মতো ছেড়ে দিন।
বাবা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন,
"ওকে বলতে বলো,
বাকি টাকা কোথায়!
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে নাদিম ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো। বলতে বলতে তিনি ঘরে ঢুকলেন
"আমি বলছি, বাকি টাকা কোথায়।
চলবে, ইনশাআল্লাহ
নাদিম ভাইয়ের আগমনে বাবা আমার হাত ছেড়ে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখ-মুখে তীব্র কঠোরতা।
—
"কী জানো তুমি? বাকি টাকা কোথায়?
নাদিম ভাই শান্ত ভঙ্গিতে একটি ব্যাগ এগিয়ে দিলেন। বাবা ব্যাগটি হাতে নিয়ে খুলে দেখলেন। ভেতরে চারটি টাকার বান্ডিল। প্রতিটি বান্ডিলে দশ হাজার টাকা করে আছে ।
মোট পঞ্চাশ হাজার। বাবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
" এই টাকাগুলো কোথায় পেলে?
নাদিম ভাই সংক্ষিপ্ত দায়সারা উত্তর দিলেন,
জুতার শেলফে।
বাবা কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠলেন।
"জুতার শেলফে মানে? সেখানে টাকা কে রাখবে?
" সেটা তো আপনারাই ভালো জানেন।
বাবার কণ্ঠ আবার রূঢ় হয়ে উঠল। আমারনদিকে অ'গ্নি চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো
" তুইই রেখেছিলি, তাই না?
নাদিম ভাই এবার মাঝখানেই কথা কে'টে বললেন,
" ছামির টাকা গুলো নিলে সব টাকা এক জায়গাতেই রাখত। আলাদা কোথাও রাখত না। বাকি টাকার সাথে এগুলো ও ই তার ঘরেই ।
নানুবাড়িতে নয়। এখন কে এমন কাজ করতে পারে, তা আমার জানা নেই। তবে ছামির করেনি এ বলতে পারি ।
নাদিম ভাইয়ের কথাগুলো বাবাকে গভীর ভাবনায় ফেলল। তিনি আড়চোখে নতুন মায়ের দিকে তাকালেন।
নতুন মা তৎক্ষণাৎ বললেন,
" এসব কী বলছে ও? মা বাড়িতে নেই, ছামিরও টাকা নেয়নি। তবে কি বলতে চায়, আমি করেছি এসব?
বাবা ধমকে উঠলেন,
"তা কখন বলেছে?
নতুন মা কেঁ'দে ফেললেন।
" সব কথা মুখে বলতে হয় নাকি? ওরা আমাকে ফাঁ'সাতে চায়। দেখেছে আমি টাকা পেয়েছি, সত্যিটা জেনে গেছি
তাই এসব সাজিয়েছে।
বাড়িতে তখন দাদি নেই। তিনি ফুফুদের বাড়িতে গেছেন। সামনে নির্বাচন, ফুফা নাকি প্রার্থী হবেন। বাবা খবর পাঠালেন, যেন ফুফু দ্রুত আসেন।
রাতে ফুফু এলেন। আমি তখনও না খেয়ে বসে আছি, যেন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি সবার সামনে।
ফুফু বসে বললেন,
"কী হয়েছে বলো তো? এমন জরুরি তলব কেন?
বাবা সব খুলে বললেন। নতুন মা কাঁ'দতে কাঁ'দতে বললেন,
" আপা, আমি এ বাড়িতে থাকব না। আপনার ভাইয়ের একটি টাকাতেও কি কখনও হাত দিয়েছি? জিজ্ঞেস করুন তাকে। যদি নিজে থেকে বলতেন, কিছু খরচ করতে,
তবুও নিতাম না। আর আজ আমাকেই চোর বানাতে চাইছে ওরা!
তিনি আবার বললেন,
"আমি যদি টাকা নিতাম, তবে কি জুতার শেলফে রাখতাম? আর ধরুন রাখলাম, তবে বাকি টাকা ওই ঘরের কাবার্ডে গেল কীভাবে? সবই সাজানো নাটক। হয়তো টের পেয়েছে আমি দেখে ফেলেছি টাকা নিয়ে ঘরে ঢুকতে, তাই আমাকে ফাঁসানোর ফন্দি আঁটছে।
বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
আমার চোখেও জল। নির্দোষ প্রমাণ করার আর কোনো উপায় যেন নেই আমার কাছে।
ফুফু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
" তোমার কী মনে হয় ভাই? কে করেছে এসব? আমার কিন্তু মনে হয় না লিভা এমন কাজ করেছে। দেখো কীভাবে কাঁদছে!
প্রশ্ন করলেও উত্তর যেন নিজেই দিয়ে দিলেন তিনি। তারপর হঠাৎ কণ্ঠ বদলে বললেন,
"ছামিরই করেছে এসব। আমাকে সন্দেহ না করতে মিথ্যাও বলেছে। ওকে আমি ছেড়ে কথা বলব না। এমন শিক্ষা দেব, জীবনে আর সাহস করবে না।
বাবা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। উঠতে যাচ্ছিলেন।
ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল। চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে নিলাম।
হঠাৎ ফুফুর কণ্ঠ শোনা গেল—
" আরে ভাই, থামো তো! ছোট মানুষ, এবারের মতো ছেড়ে দাও। মারধর করে শাসন ভালো হয় না। আমি বুঝিয়ে বলব। তুমি মাথা গরম করো না। আর ভাবিকে বলো, সবদিকে নজর রাখতে। এমন আর হবে না।
তার কণ্ঠে আজ এক অচেনা কোমলতা। অন্য সময় হলে আমাকে মা'রলে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। অথচ আজ তিনিই আমাকে বাঁচাচ্ছেন! বিষয়টি মোটেও স্বস্তিকর লাগল না।
এক এক করে সবাই ঘরে চলে গেলেন। ঝুমুরও চলে গেল। অন্য সময় হলে আমার পিছু ছাড়ত না সে; আজ মুখ ফিরিয়ে নিল।
কোনো অপরাধ না করেও আজ আমি সবার কাছে অপরাধী। বুকের ভেতরটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে যেতে। যদি পারতাম, দৌড়ে চলে যেতাম তার কাছে। মা নিশ্চয়ই এসব বিশ্বাস করতেন না।
সবাই রুমে চলে গেলে ফুফু আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকালেন। আমি সরে যেতে চাইলে তিনি ডাকলেন—
" এই, এদিকে আয়।