গল্প:স্মৃতির অলিন্দ...
 
Notifications
Clear all

গল্প:স্মৃতির অলিন্দে মেঘ (লেখিকা :নাজনীন নেছা নাবিলা )


Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
“তোর লজ্জা করে না আমেরিকা যাওয়ার লোভে স্মৃতি হারানোর নাটক করে একজনের বউ সেজে বসে থাকতে?”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে আঙুল তুলে নিজেকেই প্রশ্নটি করল মিরহা।
 
তারপর কিছুক্ষণ নিরব থেকে নিজেই নিজেকে উত্তর দিল, 
    “লজ্জা করার কি আছে? আমেরিকার যেতে তো আমার অনেক পরিশ্রম করতে হবে আবার টাকাও লাগবে প্রচুর। তার থেকে ভালো মিথ্যে নাটক করে শর্টকাটে আমেরিকা চলে যাওয়া। সেফলি যেতেও পারবো তাও বিনা পয়সা এবং পরিশ্রমে।”
নিজের উত্তর শুনে কিছুক্ষণ হাসলো মিরহা। আবার নিজকে বলতে লাগলো,
   "আর তাছাড়া এমন না যে আমি কোনো নিষ্পাপ মানুষ কে ব্যবহার করছি। মি. বাদাম যে নেশা করে আই মিন নাসা তে কাজ করে। এত দায়িত্বশীল মানুষ হওয়ার পরেও যেই যায়গায় একজন অসহায় মেয়ের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে নিজের বিয়ে আটকাতে পারে। আমি সে ভন্ড বাদাম কে ব্যবহার করে আমেরিকা যাব এতে তো দোষের কিছুই দেখছি না। এভরেথিং ইজ ফেয়ার।" 
আয়নার নিজের সাথে কথা বলে মিরহা গান ধরল,
 
            “ বাদাম বাদাম দাদা কাঁচা বাদাম
                    আমার কাছে নাইকো বুবু ভাজা বাদাম
             বাদাম বাদাম দাদা কাঁচা বাদাম
                    আমার কাছে নাইকো বুবু ভাজা বাদাম"
 
 
 
 
নোট ( স্থান লন্ডনের পরিবর্তে আমেরিকা দেওয়া হবে এবং আগের গুলো ঠিক করা হবে)
Loading spinner

Reply
4 Replies
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
Part:01
 
 
হাসান বাড়ির বড় নাতি যার আজ বিয়ে হবার কথা ছিল তার ফুফাতো বোনের সাথে, সে এই বিয়ে না করে, বিয়ের দিনই অন্য মেয়েকে বিয়ে করে নিজের সাথে বাড়ি নিয়ে এলো। এই কথাটি পুরো মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের আরধিপাড়া গ্রামে ছড়িয়ে গেছে।
 
“লজ্জা করে না তোমার? আমার মেয়েটাকে এভাবে ধোঁকা দিলে? শেষমেষ একটা রাস্তার মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুললে? তাও আবার ঠিক আজকেই, যেদিন আমার মেয়ের সাথে তোমার বিয়ের আসরে বসার কথা ছিল? এখন কী হবে আমার মেয়ের? সমাজে মুখ দেখাবে কী করে?”
নিজের আপন ফুফুর মুখ থেকে এমন তীক্ষ্ণ আর অপমানজনক কথাগুলো শুনে মুহূর্তের মধ্যেই এজাজের রগচটা মেজাজটা চড়ে গেল। তপ্ত হয়ে উঠল তার মস্তিষ্ক। সে কখন ধোঁকা দিল? কাকে ধোঁকা দিল? গত কালকের কালরাত্রির ধকল এখনো সে সামলে উঠতে পারেনি। সারাটা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি বিন্দুমাত্র। চোখের সামনে একের পর এক অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটে গেছে। ঝড়ের বেগে ঘটে যাওয়া সেইসব দৃশ্যপটের কথা মনে পড়তেই এখনো তার মাথাটা তীব্রভাবে ঘুরে উঠছে। তার ওপর দীর্ঘ জার্নি শেষে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই দরজায় পা রাখা মাত্রই শুরু হয়ে গেল এই নতুন অশান্তি। ঠিক এই কারণেই সে কখনো এ দেশে পা রাখতে চায়নি। এতদিন মা, বাবা আর আদরের বোনটাকে নিয়ে লন্ডনের পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম জীবনে বেশ সুখেই কাটছিল তার দিনগুলো। আর আজ সেই সাজানো সুখের দুনিয়াটা যে এভাবে তছনছ হয়ে গেল। অবশ্য তার পেছনে অন্য কেউ দায়ী নয়, বরং দায়ী তার অত্যন্ত প্রিয় দাদা আর দাদি। তীব্র ক্লান্তি আর একরাশ বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘদেহী, সুপুরুষটির পুরো নাম #বারান_এজাজ। সুদূর লন্ডনের মাটিতেই কেটেছে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জীবনের বসন্ত পেরিয়ে বয়সটা এবার সবেমাত্র পা রেখেছে ত্রিশের কোঠায়।
 
বারান এজাজ সাধারণ কোনো যুবক নয়। সে পেশায় একজন মহাকাশ প্রকৌশলী বা অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার, যার কর্মক্ষেত্র বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা 'নাসা' (NASA)। রকেট, কৃত্রিম উপগ্রহ কিংবা পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান ও মহাকাশযানের জটিল নকশা তৈরি করাই তার কাজ। লন্ডনের হিমশীতল আবহাওয়া আর মিশ্র বংশগতির কারণে তার শারীরিক গঠন ও রূপ মাধুর্য রূপকথার রাজপুত্রের চেয়ে কম কিছু নয়। তার গায়ের রঙ একদম দুধে-আলতা ফর্সা যাতে লেগে আছে এক অনিন্দ্য, মসৃণ ও দীপ্তিময় অভিজাত আভা। যেকোনো ভিড়ের মাঝেও সে সহজেই সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তবে বারানের সবচেয়ে রহস্যময় আর আকর্ষণীয় অংশ হলো তার এক জোড়া চোখ। তার চোখের মণির রঙ অত্যন্ত দুর্লভ এক সবুজাভ-নীল, যাকে বলা চলে ‘হেজেল গ্রিন’। এই চোখের এক অদ্ভুত মায়াবী জাদুকরী ক্ষমতা আছে, আলোর সামান্য তারতম্যেই বদলে যায় এর রূপ। ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় যা শান্ত সমুদ্রের মতো হালকা নীল দেখায়, রোদের আলোয় তা-ই আবার রূপ নেয় পাইন বনের স্নিগ্ধ সবুজে। এই চঞ্চল চোখ দুটি তার চিরগম্ভীর ব্যক্তিত্বে এক অতল গভীরতা আর রহস্য যোগ করেছে। তার মাথার চুলগুলো ডার্ক ব্লন্ড বা সোনালী-বাদামী রঙের। সাধারণ আলোতে তা হালকা বাদামী মনে হলেও, সূর্যের আলো এসে পড়ামাত্রই চুলগুলো থেকে এক চমৎকার সোনালী আভা চকচক করে ওঠে। চুলের কাটিংয়েও রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। সে চুল কাটে ‘মডার্ন কার্টেন ব্যাংগস উইথ বাটি কাট’ স্টাইলে। সামনের সিল্কি চুলগুলো কপালে আলতো করে ঝুলে থেকে মাঝখান দিয়ে দুভাগে বিভক্ত হয়ে দুপাশে নেমে গেছে, যা তার তীক্ষ্ণ চোয়ালের গড়নকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। 
 
বারানের বাবা আমির হাসান খাঁটি বাঙালি হলেও, তার মা বাহার এলা একজন তুর্কি বংশোদ্ভূত রূপসী নারী। মায়ের সেই তুর্কি রক্তের ধারা আর আভিজাত্যই মিশে আছে বারানের নামে ও চেহারায়। তার বাবা-মা বহু বছর ধরে লন্ডনের স্থায়ী বাসিন্দা। তবে বারানের নাম তুর্কি ঘরানার হলেও, তার একমাত্র ছোট বোনটির নাম রাখা হয়েছে একেবারে খাঁটি বাঙালি ঢঙে তাহেরা আমির। তাহেরার বয়সটা সবেমাত্র আঠারোর কোঠায় পা রেখেছে। ভাইয়ের মতো দুধে-আলতা ফর্সা না হলেও, তাহেরার গায়ের রঙটা কিছুটা চাপা বা শ্যামলা বরণ, যা তাকে এক অদ্ভুত মায়াবী বাঙালি রূপ দিয়েছে।
 
ফুফুর সেই বিষাক্ত বাক্যবাণ বারানের গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারল না। সে তীব্র উত্তেজিত কিংবা ক্ষিপ্ত হলো না। বরং তার ভেতরে এক অদ্ভুত, হিমশীতল শান্ত ভাব নেমে এলো। নিজের সেই মায়াবী সবুজাভ-নীল চোখ দুটি ফুফুর মুখের ওপর স্থির রেখে অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর আর শান্ত কণ্ঠে সে বলল,
   “প্রথমত, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করার কোনো প্রতিশ্রুতি কখনো দিইনি, কিংবা তার সাথে তেমন কোনো সম্পর্কও তৈরি করিনি। আর যদি ধোঁকা দেওয়ার কথাই তুলতে চান, তবে সেই ধোঁকাটা আসলে আপনারা আমাকে দিয়েছেন। দাদাজানের মিথ্যে অসুস্থতার ভান করে, নাটক সাজিয়ে আমাকে লন্ডন থেকে এই দেশে উড়িয়ে এনেছেন শুধু আপনার মেয়ের সাথে বিয়ের আসরে বসানোর জন্য। তাই আর যাই হোক, অন্তত আপনাদের মুখে এই ধোঁকা দেওয়ার গল্প বড্ড বেমানান। এই মুখে ধোঁকা দেওয়ার কথা আর বলবেন না।”
সামান্য একটু থেমে বারান ফুফুর চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এবার ফুটে উঠল এক অনমনীয় দৃঢ়তা,
    “আর এমনিতেও বর্ষাকে আমি সবসময় নিজের ছোট বোন তাহেরার মতোই দেখে এসেছি। সেখানে তাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে কল্পনা করা তো দূরের কথা, আমি দুঃস্বপ্নেও তা ভাবতে পারি না। তাই দয়া করে নিজেদের স্বার্থপর মন-মানসিকতাটা এবার একটু পরিবর্তন করুন।”
কথাগুলো শেষ করে বারান থামল। তার শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠস্বরের রেশ যেন ঘরের বাতাসে কিছুক্ষণের জন্য থমকে রইল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরনো, বিশাল দোতলা বাড়িটার চারপাশজুড়ে এক নিরেট, পাথুরে নিঃশব্দতা নেমে এলো। পিনপতন নীরবতায় ঢাকা পড়ে গেল পুরো চত্বর। উপস্থিত সবার মুখের ভাষা যেন কেউ কেড়ে নিয়েছে। কেবল ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পুরনো সিলিং ফ্যানের একটানা ঘোরার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ সেখানে অবশিষ্ট রইল না। বারানের ফুফুর মুখটা রাগে আর অপমানে মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
 
চারপাশের এই তুমুল ঝড় আর বাকবিতণ্ডার মাঝে ড্রয়িংরুমের এক কোণে কাঠপুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে মিরহা। সে মাথা নিচু করে ভয়ে নিজের ভেতর যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। তার পুরো নাম 
#মিরহা_নূর_জামান। সবেমাত্র জীবনের একটা বড় ধাপ, এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে সে। বয়সটাই বা আর কত হবে? হয়তো আঠারোর কোঠায় সবে পা রেখেছে, কিংবা আঠারো ছুঁয়ে কিছুটা পথ সামনে এগিয়েছে। কিন্তু এই অল্প বয়সেই মিরহার শান্ত চোখের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত পরিপক্কতা চোখে পড়ে। এক আঠারো বছরের তরুণী হয়েও তার চিন্তা ও মনস্তত্ত্বে যেন ভর করেছে ছাব্বিশ-আটাশ বছরের এক পরিণত নারীর গম্ভীর জ্ঞান আর বুদ্ধিমত্তা। এই অকাল পরিপক্কতা সে শখ করে অর্জন করেনি, নির্মম পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে সময়ের আগেই বড় হয়ে উঠতে। নিজের চোখের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে, জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে থেকে রাতে পালিয়ে এসেছিল এই মেয়েটি। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! এক জ্বলন্ত কড়াই থেকে বাঁচতে গিয়ে সে যেন এখন এসে পড়ল এক ফুটন্ত পানির মাঝে। এক ঝামেলা এড়াতে গিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিল আরেক মহাসমুদ্রের ঝামেলার স্রোতে। মিরহার জানা নেই, এই অচেনা নতুন গোলকধাঁধায় আটকে থেকে সে আদৌ কোনোদিন নিজের লালিত স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারবে কি না। তবে সে এটুকু বোঝে অসহায় অবস্থায় মাঝরাতে রাজপথে নেকড়ে আর ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো মানুষের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হওয়ার চেয়ে, এই সম্পূর্ণ অজানা ঝামেলার মাঝে আশ্রয় নেওয়া হাজার গুণে উত্তম। তাই তো কোনো দ্বিধা না করে, নিজের ভাগ্যকে এই পরোপকারী গম্ভীর যুবকের হাতে সঁপে দিয়ে সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে এই নতুন সংকটে। এখন বাকি পথটুকু সে পুরোপুরি ওপরওয়ালার ওপর ছেড়ে দিল। যে মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে কালরাত্রির ওই নিশ্চিত বিপদ থেকে বাঁচিয়ে অলৌকিকভাবে এতদূর টেনে এনেছেন, তিনি নিশ্চয়ই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো না কোনো পথ দেখাবেন এই বিশ্বাস তার আছে। 
 
বাংলামুলুকের চিরচেনা অপরূপা নায়িকাদের মতো দুধে-আলতা বা কাঁচা সোনারঙা রূপ মিরহার নেই। সে গায়ের রঙে বেশ কৃষ্ণবর্ণ বা কৃষ্ণকলি। তবে তার এই মেঘবরণ কালো ত্বকের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক তীব্র, সম্মোহনী মায়াবী রূপ। তার ঘন কালো ত্বকের ওপর বড় বড় দুটো চোখ আর নিখুঁত ওষ্ঠাধর যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত তৈলচিত্র। এই ঘন কালো রঙের আড়ালে তার তীক্ষ্ণ নাক আর ডাগর চোখ দুটোতে এমন এক বিষাদগ্রস্ত আভিজাত্য ফুটে ওঠে, যা ফর্সা রঙের চেয়েও বেশি করে মানুষের দৃষ্টি টেনে ধরে। তার এই শ্যামল স্নিগ্ধ রূপের কারণেই হয়তো জীবনে অনেক ভালোবাসা থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে। 
 
ঘরের গুমোট নীরবতা ভেঙে বারানের শান্ত কণ্ঠস্বর আবার গর্জে উঠল, তবে এবার তার কণ্ঠে মিশে রইল এক ইস্পাতকঠিন সতর্কতা। সবাইকে উদ্দেশ্য করে সে স্পষ্ট ভাষায় বলল,
    “এবং হ্যাঁ, আরেকটি কথা পরিষ্কার জানিয়ে রাখছি। নূর আমার বিবাহিতা স্ত্রী। তাকে এরপর থেকে ‘রাস্তার মেয়ে’ বলার মতো ধৃষ্টতা বা সাহস ভুলেও কেউ দেখাবেন না। দেখালে আমি বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না, সে যেই হোন না কেন। এই সমাজে, এই বাড়িতে আমি যতটা সম্মান পাওয়ার যোগ্য, আমার স্ত্রীও ঠিক ততটা সম্মানেরই সমঅধিকারী। তাই নূরকে পরিবারের ছোটরা উপযুক্ত সম্মান করবে এবং বড়রা স্নেহ-ভালোবাসায় আগলে রাখবে, এটাই আমি আশা করি। আর যদি আমার এই সিদ্ধান্ত কেউ মেনে নিতে না পারেন, তবে আমাকে সরাসরি বলুন আমি তাকে নিয়ে এখনই প্রথম ফ্লাইটে লন্ডনে ফিরে যাব।”
বারানের এই আকস্মিক ও বজ্রকঠিন ঘোষণা উপস্থিত সবাইকে স্তম্ভিত করে দিল। পুরো ড্রয়িংরুমে যেন এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্তব্ধতা নেমে এলো। কিন্তু সবার এই অবাক হওয়ার ভিড়ে, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মিরহার চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই অতি পরিচিত ‘নূর’ নামটা বারানের মুখে শুনে মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতর একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। এক অজানা, তীব্র যন্ত্রণায় তার দম আটকে আসতে চাইল, মনে হলো যেন সে শ্বাস নিতে পারছে না। এই ‘নূর’ নামে তাকে কেবল এই পৃথিবীর একজন মানুষই ডাকতেন যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত, ভালোবাসে এবং যে মানুষটি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসে আগলে রেখেছিলেন। কত কত বছর পার হয়ে গেছে, এই আদুরে ডাকটি সে আর শোনেনি। মিরহা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি, এই নাম ধরে ডাকার মতো মানুষ সে আবার তার জীবনে ফিরে পাবে। বিগত কয়েক বছর ধরে এই নামটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবাই যেন এই নামটিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু আজ, সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা এই গম্ভীর পুরুষটির মুখে নিজের সেই প্রাণপ্রিয়, মরিচিকা পড়ে যাওয়া নামটি শুনে মিরহার মনে হলো তার দীর্ঘদিনের অবহেলিত নামটি যেন আজ এক পরম পবিত্রতায় অভিশাপ থেকে মুক্তি পেল।
 
মিরহা নিজের নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরে চোখের অবাধ্য জল আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। গতকাল সকাল থেকে তার পেটে এক দানা অন্নও পড়েনি। তার ওপর গত রাতে ঘটে গেছে জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড় আর দুর্ঘটনা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কেবল কয়েক ব্যাগ স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল তাকে। মূলত সেই স্যালাইনের শক্তিতেই সে এতক্ষণ কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে। কিন্তু শরীর এবার পুরোপুরি জবাব দিচ্ছে। মনে হচ্ছে না আর এক মুহূর্তও তার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব। মাথার ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেই সাথে চারপাশটা কেমন যেন বনবন করে ঘুরছে।
 
বারান নিজের ভেতরের চরম রাগটুকু কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে যখন পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে তাকাল, তখন দেখল মিরহা দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে চোখ-মুখ কুঁচকে আছে। তার টালমাটাল শরীর দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে এখনই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। বারান আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মিরহাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। এরপর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
    “আমার স্ত্রী এখন ভীষণ অসুস্থ। আমার সাথে অন্য কারও বিয়ে ঠিক হয়েছিল বলে সে অভিমান করে নিজের চরম ক্ষতি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যিস আমি সঠিক সময়ে সেখানে পৌঁছে তাকে বাঁচিয়ে ফেলেছি। আজকে যদি আমার স্ত্রীর সামান্যতম কোনো ক্ষতি হয়ে যেত, তবে এই বাড়িতে উপস্থিত আপনাদের কাউকে আমি ছেড়ে কথা বলতাম না। এখনো যদি আমার স্ত্রীকে নিয়ে আপনাদের কারও কোনো আপত্তি বা সমস্যা থাকে, তবে সরাসরি বলতে পারেন। আমি তাকে নিয়ে এই মুহূর্তেই চলে যাব।”
 
বারানের মুখ থেকে এমন একের পর এক সাজানো বানোয়াট আর নিখুঁত মিথ্যে কথা শুনে মিরহা এবং দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বারানের প্রিয় বন্ধু আসফান্দ যারিশের চোখ চড়কগাছে ওঠার উপক্রম হলো। এই ভয়াবহ গম্ভীর পরিস্থিতির মাঝেও যারিশ নিজের ভেতরের উপচে পড়া হাসিটুকু চেপে রাখতে গিয়ে এক চরম যুদ্ধ শুরু করে দিল।
 
বারানের বাবা আমির হাসান এবং মা বাহার এলা উনাদের কেউই জানতেন না যে দাদাজান এভাবে মিথ্যে অসুস্থতার নাটক সাজিয়ে সবাইকে দেশে আনিয়েছেন। উনারা তো লন্ডনে বসে সত্যি সত্যিই বাবার কঠিন অসুখের খবর শুনে ব্যাকুল হয়ে এ দেশে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু আসার পরপরই যখন বাড়ির বয়োবৃদ্ধ বড় কর্তা আব্দুল হাসান অর্থাৎ বারানের দাদা নিজের শেষ ইচ্ছে প্রকাশ করে বললেন তিনি মরার আগে নিজের ছেলে আমির হাসানের ছেলের সাথে, নিজের মেয়ে রুমা হাসানের মেয়ের বিয়ে দেখে যেতে চান, তখন বারানের মা-বাবা মনে মনে না চাইতেও বুড়ো বাবার মুখের ওপর ‘না’ করতে পারেননি। বাধ্য হয়েই উনারা আব্দুল হাসানের সেই অন্যায্য আবদারে সম্মতি দিয়েছিলেন।
 
এদিকে বারানের ছোট বোন তাহেরার মাথায় তো কোনো কিছুই ঢুকছে না। গতকালই সে কত আশা নিয়ে দেশে এসেছিল দাদাকে দেখতে। কিন্তু পা রাখা মাত্রই জানতে পারল, কালই নাকি তার মেজাজী আর গম্ভীর ভাইয়ের বিয়ে! খবরটা শুনে সে মনে মনে বেশ খুশিই হয়েছিল। ভেবেছিল, তার এই রগচটা ভাইয়ের যখন বিয়ে হচ্ছেই, এই সুযোগে মনভরে আনন্দ-ফুর্তিও করা যাবে, আবার বাড়িতে যে নতুন ভাবি আসবে তাকে নিজের দলে টেনে দুজনে মিলে ভাইকে আচ্ছা করে শায়েস্তা করা যাবে।
ঠিক এই দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণেই গতকাল থেকে সে তার ফুফাতো বোন বর্ষার সাথে একটু বেশিই খাতির জমানো শুরু করেছিল, যাতে ভবিষ্যতে দুজনে মিলে বারানের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারে। অথচ এখন চোখের সামনে দেখছে, তার সেই অদ্ভুত ভাই কোথা থেকে যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে হাজির হয়েছে।
 
পুরো ব্যাপারটা তাহেরার কাছে এখন চরম বিরক্তিকর ঠেকছে, কোনো কিছুই আর তার ভালো লাগছে না। না পারল সে ভাইয়ের বিয়েতে একটু আনন্দ করতে, আর না পারল ভাইয়ের নতুন বউয়ের সাথে আগে থেকে কোনো বন্ধুত্ব জমাতে। উল্টো যার সাথে এত খাতির জমাল, সে তো এখন আর ভাইয়ের বউ-ই হলো না! এখন আবার নতুন করে এই অচেনা নতুন ভাবির সাথে খাতির জমানোর যুদ্ধ শুরু করতে হবে ভেবেই তাহেরা মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
 
বারানের এই চলে যাওয়ার হুমকি শুনে দাদা আব্দুল হাসান এবং দাদি রাবেয়া বেগম মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। হ্যাঁ, তারা দুজনেই বারান এবং তার নিজের পছন্দে বিয়ে করে আনা এই নতুন বউয়ের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। কারণ, তারা দুজনে মিলে অনেক বড় পরিকল্পনা করে বারানের সাথে বর্ষার বিয়েটা দিতে চেয়েছিলেন। যেহেতু সেই গুড়ে বালি পড়েছে, তাই তাদের রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারা এটাও কোনোভাবেই চান না যে, বারান এই মুহূর্তে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাক। কত বছর পর নিজের আদরের নাতিকে এত কাছে পেয়েছেন তারা। তাই এখনকার মতো পরিস্থিতি সামাল দিতে উনাদের নিজেদের রাগটা চেপে রাখতে হবে। যত যাই হোক না কেন, বিয়ে যখন হয়েই গিয়েছে, তখন তো আর এটাকে ফেলে দেওয়া বা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। 
 
রাবেয়া বেগম চট করে স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় এক বিশেষ ইশারা করলেন। আব্দুল হাসানও চতুর স্ত্রীর সেই চোখের ইশারা মুহূর্তেই ধরে ফেললেন। নিজের ক্ষোভ আড়াল করে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য তিনি এবার উনার চেনা গ্রামীণ টানে বলতে লাগলেন,
   “যা হোইবার তা হোইয়া গেছে। এত ভাইবা লাভ নাই। আমার ইচ্ছা তো আর পূর্ণ হোইল না। কি আর করার? তোমরা যার যার ঘরে যাও, এই সব ঝামেলা আর ভালা লাগতাছে না। আমাগোরে এখন একটু বিশ্রাম করার প্রয়োজন। আর বারান, তুই নিজের পতনিরে লোইয়া নিজের ঘরো যা।”
দাদার মুখ থেকে এই রায় শোনার পর সবার মাঝে এক অদ্ভুত শ্লথ ভাব নেমে এলো। কিন্তু সম্পূর্ণ একজন অপরিচিত পরপুরুষের সাথে এক বদ্ধ ঘরে গিয়ে রাত কাটাতে হবে এই কথাটা মাথায় আসবামাত্রই মিরহার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, ভয়ে তার গলা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো।
 
এমন সময় দাদি রাবেয়া বেগম স্বামীর কথায় বাধা দিয়ে তড়িৎ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
   “আমনের কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই? পোলা মাইয়া দুইটা কেমনে না কেমনে জানি বিয়ে কইরা আইছে। হেগোরে কেমনে একলা রুমে পাডাইয়া দেন? এই সব পরে দেহা যাইবো। আপাতত এই মাইয়া রে তারিহার রুমে যাইতে কন।”
রাবেয়া বেগমের এই মোক্ষম কথাটি শুনে মিরহার ধড়ফড় করতে থাকা নিভে আসা প্রাণে যেন আচমকা জোয়ার এলো। সে স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আড়চোখে বারানের দিকে একবার তাকাল। দেখল, বারান তখনো তার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি সহ্য করতে না পেরে মিরহা সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখের দৃষ্টি নিচু করে নিল।
 
 বারান আর কোনো বাকবিতণ্ডায় না গিয়ে নিজের মা এবং বোনের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত দায়িত্বশীল কণ্ঠে বলল,
   “নূর গতকাল সারারাত হসপিটালে ভর্তি ছিল। ওর মাথায় এবং শরীরে এখনো অনেক ব্যথা রয়েছে। তোমরা দুজন মিলে ওকে সুন্দর করে তাহেরার রুমে নিয়ে যাও। আর তাহেরা, তুই ওর খুব ভালোভাবে খেয়াল রাখবি।”
ভাইয়ের এমন নরম আর আদেশসূচক কথা শুনে তাহেরা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে নিজের নতুন ভাবির কাছে এগিয়ে এলো। সে খুব আলতো ও পরম মমতায় মিরহার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় পুরল। বাহার এলাও ছেলের কথামতো নিজের ছেলের বউয়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে উনার মনটা নরম হয়ে গেল। আসলেই তাকে ভীষণ ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। উনার নিজের ছেলের প্রতি কিংবা এই অনাকাঙ্ক্ষিত ছেলের বউয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র কোনো রাগ ছিল না। যেহেতু উনার গম্ভীর ও বুদ্ধিমান ছেলেটি নিজে পছন্দ করে একে ঘরে এনেছে, তার মানে মেয়েটি নিশ্চয়ই ভালো হবে এই বিশ্বাস উনার ছিল। উনি পরম স্নেহে মিরহার মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন,
   “চিন্তা করবে না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মায়ের বয়সী একজন নারীর মুখ থেকে এমন একরাশ ভালোবাসা আর সান্ত্বনা জড়ানো কথা শুনে মিরহার চোখ দুটো আবার নোনা জলে ভরে এলো। এত নরম আর মধুর সুরে কেউ তার সাথে কথা বলতে পারে, তা সে আজ বহু বছর ধরে ভুলেই গিয়েছিল। এমনকি তার নিজের গর্ভধারিণী মা-ও কখনো তাকে এভাবে বুকে টেনে নিয়ে কথা বলেনি। এক বুক আকুলতা আর কান্না দলা পাকিয়ে এলেও মিরহা অনেক কষ্টে নিজের চোখের জলটুকু চোখের কোণেই চেপে রাখল।
 
বারান ধীরপায়ে মিরহার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবার এক অদ্ভুত মায়াবী ও নরম রূপ নিল। সে মিরহার চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,
    “ভয় পেও না। তোমার পাশের রুমটাই আমার। যদি কিছু প্রয়োজন হয়, তবে নিঃসংকোচে তাহেরাকে বলবে। আর তাকে যদি বলতে না পারো, তবে ওকে বলবে ও যেন আমাকে ডেকে দেয়, আমি তখনই তোমার কাছে চলে আসব। আর হ্যাঁ, একদম নড়াচড়া করবে না। চুপচাপ গিয়ে বিছানায় বসবে। আমি তাহেরাকে বলে দিচ্ছি ও যেন ওর কোনো একটা জামাকাপড় তোমাকে আপাতত পরতে দেয়। এখন এগুলো পরেই ম্যানেজ করো। তারপর আমি গাড়ি থেকে তোমার লাগেজটা এনে তোমার রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
মিরহা কোনো কথা বলতে পারল না, কেবল এক জড় মানবযন্ত্রের মতো যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। বারান নিজেও ঠিক জানে না এই মুহূর্তে তার মনের ভেতর কী ওলটপালট হয়ে গেল, কিন্তু আচমকাই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তার ঠোঁটের ঠিক ওপরের অংশে থাকা নিখুঁত, কালো বড় তিলটা সেই হাসির ছোঁয়ায় যেন আরও বেশি সুন্দর আর জীবন্ত হয়ে উঠল। আর সে হাসতেই তার গালে হালকা একটা টোল পড়ল যা এই ঘোরলাগা পরিস্থিতির মাঝেও মিরহার নজর এড়াতে পারল না। 
 
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেল তাহেরা আর তার মা বাহার এলা। সবসময় মেঘের মতো মুখভার করে রাখা তাদের এই রগচটা গম্ভীর ভাই কিংবা ছেলেটি যে এভাবে হুট করে হাসতে পারে, তা যেন তাদের কল্পনারও অতীত ছিল। তারা দুজনেই চরম বিস্ময় নিয়ে বারানের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের এই আকস্মিক পরিবর্তন এবং কী কাণ্ড সে করে বসেছে, তা বুঝতে পেরে বারান পরক্ষণেই নিজেকে বেশ শক্তভাবে সংযত করে নিল। সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যারিশকে ইশারায় নিজের পেছনে আসতে বলে, আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে গম্ভীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। বারানের চলে যাওয়ার সেই চওড়া পিঠের দিকে ড্রয়িংরুমের এক কোণ থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মিরহা। তার এই ‘স্মৃতি হারানোর নাটক’ তাকে ভবিষ্যতের দিনগুলোতে কতটা সাহায্য করতে পারবে, তা এই মুহূর্তে তার একেবারেই জানা নেই। এই নিখুঁত মিথ্যা নাটকের অবসান ঘটিয়ে তার জীবনে শেষমেষ একটু সুখের আলো আসবে, নাকি তার মাথার ওপর আরও বড় কোনো মহাবিপদ ঘনিয়ে আসবে তাও সে জানে না। তার মনে হতে লাগল, যেন এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার নিরেট কালো মেঘ তার চোখের সামনে এসে জমে আছে। অথবা বলা যায়, তার চেনা-অচেনা স্মৃতির অলিন্দে মেঘ জমে আছে।
 
 
 
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
Part:02
 
 
 
তোর দাদা ভীষণ অসুস্থ। উনি আমাদের সবাইকে দেশে আসতে বলেছেন। তুই যেভাবেই হোক ছুটির ব্যবস্থা কর। আমরা যাওয়ার জন্য গোছগাছ করছি। আর হ্যাঁ, বেশ কিছুদিনের জন্য ছুটি নিবি। যেহেতু বার্ষিক ছুটি তুই একবারও নিসনি, তাই এখন চেষ্টা কর দুই থেকে দেড় মাসের ছুটি নিতে পারিস কিনা। না পারলে সর্বনিম্ন এক মাসের ছুটি নে। বাবা-মা আজ আছে, কাল নেই…”
বাবার শেষ কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল বারান। ওপাশ থেকে তার বাবা তাকে আরও নানাভাবে বুঝিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। বারান এখন ভাবছে, এতদিনের ছুটি সে কীভাবে নেবে? এমন নয় যে কর্তৃপক্ষ তাকে ছুটি দেবে না, কিংবা এখন কোনো জরুরি প্রজেক্টের চাপ আছে। গতকালই একটি বড় প্রজেক্ট শেষ করে সে সফল হয়েছে। আর সেই সাফল্যের আনন্দ উদযাপনের জন্যই আজ থেকে সাকসেস পার্টির প্রস্তুতি চলছে নাসার (NASA) সদর দপ্তরে। পুরো এক সপ্তাহ ধরে চলবে এই আয়োজন। সে চাইলে এখন অনায়াসে দেড় মাসের ছুটি পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু যে মানুষটি বছরের পর বছর নিজের বার্ষিক ছুটি পর্যন্ত নেয় না, নিজেকে সবসময় কাজের মাঝে ডুবিয়ে রাখতে ভালোবাসে, সেই মানুষটি হঠাৎ দেড় মাসের ছুটি নিয়ে কী করবে এটাই সে মাথায় খাটাতে পারছে না। 
 
তবে বাবার শেষ দিকের অসহায় কণ্ঠস্বর মনে পড়তেই বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। আর কোনো উপায় না পেয়ে সে কম্পিউটারের স্ক্রিনে ছুটির আবেদন ফর্মটি পূরণ করে ফেলল। দেড় মাসের ছুটির জন্যই আবেদন সাবমিট করল সে, তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল বাড়িতে গিয়ে বলবে এক মাসের ছুটি নিয়ে এসেছে। কারণ, তার বাবাকে দেড় মাসের ছুটির কথা বললে তিনি জোর করে সেটাকে তিন মাসে রূপান্তর করে ফেলবেন। তার চেয়ে ভালো এক মাসের কথা বলা, তাহলে টেনেটুনে বড়জোর দুই মাস কাটানো যাবে।
 
নিজের বুদ্ধির তারিফ না করে পারল না বারান। অবশ্য এই প্রখর বুদ্ধিটুকু না থাকলে কি আর নাসার (NASA) মতো জায়গায় এমন বড় পদে চাকরি করার সৌভাগ্য জুটত! আজ প্রায় চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সে এই মর্যাদাপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আর বাড়তি কোনো চিন্তাভাবনা না করে দ্রুত সব ফরমালিটি শেষ করে ছুটির আবেদনটি সাবমিট করে দিল সে। এরপর কেবিন থেকে বের হয়ে পা বাড়াল নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির কেবিনের দিকে। একা একা দেশে গিয়ে ফেঁসে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ফাঁসলে বন্ধুকে নিয়েই ফাঁসবে। আর সেই উদ্দেশ্যেই যারিশকে বিন্দুমাত্র না জানিয়ে, তার পক্ষ থেকেও ছুটির আবেদনটি করে ফেলেছে বারান। এখন শুধু যারিশকে গিয়ে খবরটা দেওয়ার পালা। তবে বারান খুব ভালো করেই জানে, যারিশ এতে একটুও রাগ করবে না, বরং ভীষণ খুশিই হবে।
 
_______
 
লন্ডনের অত্যন্ত অভিজাত এলাকা শ্যাড টেমসের সেই চমৎকার ভিক্টোরিয়ান পেন্টহাউজে যখন বারান ফিরল, তখন তার শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। বাবা লন্ডনের নামকরা ব্যবসায়ী হওয়ায় পারিবারিক আবাসন হিসেবে এই রিভার-ভিউ অ্যাপার্টমেন্টটিই বেছে নিয়েছেন তিনি। সেন্ট্রাল লন্ডনের টেমস নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজটি এখান থেকে একদম স্পষ্ট দেখা যায়, যা উত্তর তীরের টাওয়ার হ্যামলেটস এবং দক্ষিণ তীরের সাউথওয়ার্ক এলাকাকে চমৎকারভাবে সংযুক্ত করেছে।
 
নিজের ঘরে ঢুকেই গায়ের কোটটি খুলে চেয়ারের ওপর রাখল বারান। ঘরের বিশাল কাঁচের দেয়ালটি দিয়ে বাইরের পুরো পৃথিবীটা যেন এক নজরে চেনা যায়। দশ তলার ওপর অবস্থিত এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে রাতের আলোকোজ্জ্বল টাওয়ার ব্রিজের মায়াবী দৃশ্য দেখার আনন্দ কোনোভাবেই মিস করার সুযোগ নেই। ক্লান্ত চোখে সেই জানালার ধারেই গিয়ে দাঁড়াল বারান।
 
ছোটবেলা থেকেই বারান স্বভাবগতভাবে ভীষণ চুপচাপ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চারপাশের অনেক কিছু পাল্টালেও, তার এই মজ্জাগত স্বভাবটি আর বদলে যায়নি। পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই সে নাসায় (NASA) যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়। আসলে, এটাই ছিল তার আজন্ম লালিত স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সে সবসময় নিজেকে বইখাতা আর জটিল সব প্রজেক্টের গোলকধাঁধায় ডুবিয়ে রাখত। দিন-রাত এক করে করা সেই কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে সে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিঝুম রাতের আলো আঁধারিতে নিজের জীবনের এই ফেলে আসা দিনগুলোর হিসাব-নিকাশ করতে ব্যস্ত ছিল বারান। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দে তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। বারান একটু নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে ভেতরে আসার অনুমতি দিল।
 
দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর পা রাখল তাহেরা। ভাইয়ের একদম কাছাকাছি এসে মৃদু স্বরে বলল, 
    “ভাইয়া, আম্মু তোমাকে জলদি শাওয়ার নিয়ে গোছগাছ করে নিতে বলেছেন। আমাদের সবার প্যাকিং করা শেষ। তুমি দ্রুত তৈরি হয়ে নাও, খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হব।”
 
বারান মুখে কিছুই বলল না, কেবল কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নির্লিপ্ততা দেখে তাহেরা মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রোবটের মতো দিনরাত সব বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট বানাতে বানাতে তার ভাইটা নিজেই যেন আজ একটা প্রজেক্ট হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ কেমন এক গম্ভীর মুখোশ পরে থাকে। তাহেরারও তো আর দশটা বোনের মতো ইচ্ছে করে ভাইয়ের সাথে একটু খুনসুটি করতে, অনর্থক ঝগড়া বাঁধিয়ে ঘর মাথায় তুলতে। এমন নয় যে বারান তাকে ভালোবাসে না। আগলে রাখার ভালোবাসাটুকু ভাইয়ের চোখেমুখে সবসময়ই স্পষ্ট, কিন্তু মুখে সে কখনোই তা প্রকাশ করতে পারে না। কখনো কোনো ছুটির দিনে বোনকে একটু ঘুরতে নিয়ে যাওয়া কিংবা নিজে কোথাও ঘুরে বেড়ানো এসব বারানের অভিধানেই নেই। অবশ্য বারানের বেস্ট ফ্রেন্ড যারিশের স্বভাবটা একদম উল্টো। সে তাহেরাকে নিজের বোনের মতোই স্নেহ করে। তাই অবলীলায় যারিশের ওপরই তাহেরা সব রাগ, অভিমান আর আবদার উজাড় করে দেয়। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই বারানের ঘর থেকে বেরিয়ে এল তাহেরা। এবার নিজের ঘরে গিয়ে ঝটপট একটা শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে নিতে হবে, তারপর সোজা লাগেজপত্র নিয়ে নিচে চলে যাবে।
 
________________
 
দীর্ঘ আঠারো ঘণ্টার এক ক্লান্তিকর সফর শেষ করে, অবশেষে বিকেল নাগাদ বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল বারান এজাজ এবং তাদের পুরো পরিবার। গতকাল রাতে তারা লন্ডনের ফ্লাইট ধরেছিল। এখন আবার এই বিমানবন্দর থেকে মুন্সিগঞ্জ পৌঁছাতে পৌঁছাতে নিশ্চিতভাবেই সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে। এই দীর্ঘ পথযাত্রার কথা ভাবতেই বারানের শরীর যেন ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইল। তাদের অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দর চত্বরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বারানের ফুফা এবং দুই চাচা। পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রত্যেকেরই নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। বিদেশফেরত অতিথিদের যাতায়াতে যাতে বিন্দুমাত্র কষ্ট না হয়, সেজন্য তিনজনেই যার যার গাড়ি নিয়ে চলে এসেছেন। 
 
বারানের ফুফা হিমেল চৌধুরী, বড় চাচা আকাশ হোসেন এবং ছোট চাচা আসিম হোসেন হাসিমুখে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। বারান বিনম্র ভঙ্গিতে চাচা ও ফুফাকে সালাম জানিয়ে কুশল বিনিময় করল। এরপর বড়রা আমির হাসান ও তার স্ত্রীর সাথে কুশল বিনিময়ের আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সেই ফাঁকে বারান, তাহেরা এবং যারিশ ট্রলি ঠেলে বিমানবন্দর থেকে বের হতে লাগল। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাদের গাড়ি যখন মুন্সিগঞ্জের আড়ধিপাড়া গ্রামে এসে পৌঁছাল, তখন চারপাশের আকাশজুড়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে চারপাশের গ্রামীণ পরিবেশ দেখে বারান মনে মনে বেশ অবাক হলো। চার বছর আগে যখন শেষবার এসেছিল, তখনো এই জনপদ এতটা আধুনিক ছিল না। অথচ এখন রাতের অন্ধকার নামলেও চারদিকের বৈদ্যুতিক আলোয় পুরো পথঘাট ঝলমল করছে। হিমেল সাহেব সবাইকে সাথে নিয়ে পরম যত্নে নিজেদের চেনা অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন।
 
বাড়ির সদর দরজার সামনে বিশাল এক বাগান, আর সেই বাগানের বুক চিরে চলে গেছে একটি সরু মাটির পথ। বাগানের প্রবেশমুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কারুকার্যখচিত এক বিশাল প্রধান ফটক। গেটের ঠিক পাশেই পাহারায় বসে আছে দুজন চৌকিদার। সবাই মিলে সেই সরু পথ ধরে বাড়ির ভেতরের দিকে এগোতে লাগল। বাড়িটি বেশ পুরোনো হলেও তার প্রতিটি ইটে এখনো এক রাজকীয় আভিজাত্য লেপ্টে আছে। তিন তলা এই বিশাল অট্টালিকাটি মূলত পুরোনো দিনের যৌথ পরিবারের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে এই বাড়িতে বারানের দাদা-দাদি, দুই চাচা এবং তাঁদের পরিবার একসাথে থাকেন। চাচাদের পরিবারে রয়েছে বারানের দুই চাচী, তিন চাচাতো বোন এবং দুই চাচাতো ভাই, তাদের স্ত্রী এবং সন্তান। বারানের ফুফু স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকলেও, বাবার বাড়ির টানে প্রায়শই এখানে চলে আসেন। এই পরিবারের মূল চালিকাশক্তি বারানের দাদা-দাদি, যাঁরা এখনো পুরোনো দিনের রক্ষণশীল চিন্তাভাবনা ও ঐতিহ্য মনেপ্রাণে লালন করেন। 
 
সবাই মিলে যখন বাড়ির মূল ফটক গলে ভেতরে পা রাখল, তখন ভেতরের দৃশ্য দেখে অবাক না হয়ে পারল না। পুরো বাড়িজুড়ে উৎসবের আমেজে সাজসজ্জার ধুম পড়ে গেছে। যেখানে বাড়ির প্রধান কর্তার গুরুতর অসুস্থতার খবরে সবার মনমরা থাকার কথা, সেখানে পুরো বাড়ি গমগম করছে মানুষে, আর প্রত্যেকে ব্যস্ত ঘরদোর আলোকসজ্জায় রাঙিয়ে তুলতে। পরিস্থিতি দেখে যারিশ একটু এগিয়ে এসে বারানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 
   “কিরে, তোর দাদা কি টপকে গেছে?”
কথাটা শুনেই বারান রাগে চোখমুখ শক্ত করে এক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল যারিশের দিকে। বন্ধুর সেই চাউনি দেখেই যারিশ আর কথা না বাড়িয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাহেরা পুরো কাণ্ডটি দেখে আড়ালে মিটমিট করে হাসতে লাগল।
 
বারান তার পরিবার এবং যারিশকে সাথে নিয়ে সোজা দাদার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে ইতিমধ্যেই পরিবারের প্রায় সব বড় সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। আব্দুল হাসান বিছানায় শুয়ে অবিরত কাশছিলেন। বারান আলতো পায়ে হেঁটে গিয়ে দাদার পাশে বসল এবং তাঁর বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম সুরে শুধাল, 
   “কেমন আছো, দাদাজান?”
বারান বাইরে থেকে যতই গম্ভীর আর শক্ত স্বভাবের হোক না কেন, দাদু আর দাদিকে সে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভীষণ ভালোবাসে। আব্দুল হাসান ধীরেমিলিয়ে চোখ মেলতেই যখন তাঁর প্রাণপ্রিয় বড় নাতিকে দেখতে পেলেন, বৃদ্ধের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আজ কতগুলো বছর পর তিনি তাঁর কলিজার টুকরোকে চোখের সামনে দেখছেন! তিনি কাঁদতে কাঁদতে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন,
    “এই বুড়ার কথা মনে পড়ল তোর? আমি বাঁচলেই কী আর মরলেই কী! তুই তো লন্ডোনোই থাকবি, আমারে তো আর দেখবার আইবি না।”
 
আব্দুল হাসানের এমন আকুলতা আর অভিমানী কথা শুনে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সবার চোখেই জল চলে এল। বারান পরম মমতায় দাদার হাতের পিঠে একটি আলতো চুমু খেল। তারপর সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, 
   “এই তো চলে এসেছি তোমার টানে। এখন আর কোথাও যাচ্ছি না আমি। তোমার সাথে অনেক দিন থেকে এই গ্রামে রাজ করব, কেমন?”
আব্দুল হাসান অশ্রুসজল চোখেই একটু মুচকি হাসলেন। তারপর আদুরে গলায় বললেন, 
   “হয়েছে, এই বুড়ারে আর পাম দিতে হইব না। যা, তুই বোনরে লইয়া রুমে যা। একটু জিরাইয়া ল। তোর বন্ধুরেও লইয়া যা।”
বারান ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দাদার কপালে ভালোবাসার একটি চুমু এঁকে দিল। এরপর পাশে থাকা দাদির কাছে গিয়ে পরম শ্রদ্ধায় কুশল বিনিময় করল। তাহেরা এবং যারিশও একই রকমভাবে মুরুব্বিদের সালাম জানিয়ে আশীর্বাদ নিল। এরপর বারানের বড় চাচি এসে তিনজনকে যার যার নির্দিষ্ট ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন।
 
বারান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বৃদ্ধ আব্দুল হাসান বিছানায় আধশোয়া হয়ে নিজের বড় ছেলে আমির হাসানের দিকে তাকালেন। অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে বললেন,   
     “বাবা, তুই কি আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখবি?”
আমির হাসান দ্রুত বাবার বিছানার পাশে এসে বসলেন। আকুল হয়ে বললেন, 
   “এভাবে কেন বলছ বাবা? তুমি শুধু বলো, তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব।”
আব্দুল হাসান এবার তাঁর বড় পুত্রবধু বাহার এলার দিকে তাকালেন এবং বললেন,
    “মা, তুই-ই একমাত্র আমার এই ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারবি।”
শ্বশুরের এমন কাতর কণ্ঠ শুনে বাহার এলা এগিয়ে এলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, 
   “এভাবে বলবেন না বাবা। আপনি শুধু আদেশ দিন, আমি যেভাবে হোক তা পূরণ করব।”
ঠিক তখনই আব্দুল হাসান আসল কথাটা পাড়লেন, 
   “তোর ছেলের সাথে আমি বর্ষার বিয়ে দিতে চাই।”
কথাটি শোনামাত্রই আমির হাসান এবং বাহার এলা যেন বজ্রাহত হলেন। দুজনেই স্তব্ধ হয়ে থমকে গেলেন। এমন একটা প্রস্তাব তাঁরা এই মুহূর্তে শুনবেন, তা কল্পনারও অতীত ছিল। এমন নয় যে বর্ষাকে তাঁরা অপছন্দ করেন। মেয়ে হিসেবে বর্ষা ভীষণ শান্ত আর লক্ষ্মী। কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত কি এত তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সম্ভব? কোনো বাবা-মায়ের পক্ষেই তা সহজে সম্ভব নয়, তাও আবার এমন একটা হুটহাট পরিস্থিতিতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আব্দুল হাসান আবার প্রচণ্ড জোরে কাশতে লাগলেন। বৃদ্ধ বাবার এমন আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে বারানের বাবা-মা দুজনেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। 
 
আব্দুল হাসান কাশির দমক সামলে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 
   “আমি জোর করমু না তোগোরে। এখন তোরা ভাব, আমার এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করবি, নাকি করবি না।”
 
বাবার এই অবস্থা দেখে আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারলেন না বাহার এলা। তিনি ভাঙা গলায় বলে উঠলেন, 
   “ঠিক আছে বাবা, আপনি যা বলবেন তা-ই হবে। আমি বারানকে রাজি করাব বর্ষাকে বিয়ে করার জন্য।”
 
বাহার এলার মুখ থেকে এই সম্মতিটুকু শোনামাত্রই ঘরের থমথমে পরিবেশটা কেটে গেল এবং উপস্থিত সবার ঠোঁটেই স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। রাবেয়া বেগম পরম মমতায় বড় পুত্রবধুর কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 
   “আমি জানতাম মা, তুই আমার কথা ফেলবি না। বর্ষা মেয়েটা অনেক ভালো। দেখিস, সে এলে এই সংসারের সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে।”
শ্বাশুড়ির কথায় বাহার এলা কেবল একটু মলিন ও দ্বিধামিশ্রিত মুচকি হাসলেন। মনে মনে তিনি ভাবছেন, নিজের এই গম্ভীর আর ক্যারিয়ার-পাগল ছেলেকে তিনি কীভাবে এই আকস্মিক বিয়ের জন্য রাজি করাবেন!
 
অতীতের সেই খণ্ডচিত্রের কথাগুলোই বাহার এলা একে একে মিরহাকে বলছিলেন, আর মিরহা পাথরের মতো চুপচাপ বসে তা শুনে যাচ্ছিল। এই তো মাত্র কিছুক্ষণ আগের কথা, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে তাহেরা এবং বারানের মায়ের সাহায্যে এই অচেনা ঘরটির ভেতর প্রবেশ করেছিল মিরহা। যন্ত্রণায় চোখ দুটো তখনো তার ঝাপসা হয়ে আসছিল, পেটের ভেতর তীব্র ক্ষিধের তাড়না। কিন্তু এই থমথমে পরিস্থিতিতে কাকে সে নিজের কষ্টের কথা বলবে, আর কী-ই বা করবে তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। বারানের মা-ই পরম মমতায় তাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং গোসল করতে সাধ্যমতো সাহায্য করেছিলেন। প্রতিটি কাজ করার সময় তিনি এতটাই সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন, যেন সামান্য একটু জোরে ছুঁলেই মিরহা আবার নতুন করে ব্যথা পাবে। একজন পরনারীর কাছ থেকে এমন অভাবনীয় ও স্নেহপূর্ণ ব্যবহার পেয়ে মিরহার চোখ বারবার কান্নায় ভরে উঠছিল। তার নিজের জন্মদাত্রী মা যেখানে তাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করতে দ্বিধা করেননি, সেখানে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মহিলা তার এতখানি খেয়াল রাখছেন।
 
গোসল শেষে মিরহা তাহেরার দেওয়া একটি সাদা রঙের, ফুলের ছাপে ঘেরা স্কার্ট এবং পার্পল কালারের টপস পরে নিয়েছে,পোশাকটি তার কোমর ছুঁয়ে লেপ্টে আছে। ব্যান্ডেজ ভিজে যাওয়ার ভয়ে গোসলের সময় সে মাথা ভেজায়নি। এরপর বাহার এলা তাকে এনে বিছানার ওপর বসালেন এবং পেছনের সব সত্য ঘটনা একে একে খুলে বললেন। কারণ, তাঁর স্পষ্ট মনে আছে কিছুক্ষণ আগেই বারান সবাইকে বলেছিল, এই মেয়েটি নাকি বারানের বিয়ের কথা শুনে নিজের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। সেই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার জন্যই বাহার এলা নিজে থেকে সব পরিষ্কার করে দিলেন। মায়ের পাশে বিছানার এক কোণে বসে তাহেরাও গভীর মনোযোগ দিয়ে মিরহার মুখের দিকে তাকিয়ে সব শুনছিল।
 
মিরহা অপরাধীর মতো চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনের ভেতরের এই জড়তা ও ভয় বুঝতে পেরে বাহার এলা পরম মমতায় তার হাত দুটো ছুঁয়ে বললেন, 
   “একদম ভয় পেও না, মা। তোমাকে নিয়ে এই বাড়ির কারোর মনে কোনো ক্ষোভ বা সমস্যা নেই। আর দয়া করে আমার ছেলেটাকে ভুল বুঝো না। সে নিজের ইচ্ছায় এই বিয়েটা করতে চায়নি, সব দোষ আসলে আমার। সে তো গত রাতেই,,,,
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই দরজার পর্দা ঠেলে বারান ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। তার হাতে একটি ট্রে, যাতে ধোঁয়া ওঠা গরম সুপের বাটি। পরনে তার নীল রঙের জিন্স আর নেভি ব্লু ফুল হাতা গেঞ্জি, যার ভেতর থেকে সাদা শার্টের কলারটা স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। বারানকে দেখেই তার মা কথা থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, 
   “তুই তোর বউকে খাইয়ে দে। আমি ওর জন্য একটু গরম পানি নিয়ে আসছি, পায়ে সেঁক দিলে ব্যথাটা অন্তত একটু কমবে।”
 
বারান মায়ের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে বরাবরের মতোই চুপচাপ ট্রে-টা নিয়ে খাটের পাশে থাকা ছোট টেবিলটার ওপর রাখল। ভাইয়ের এই ভাবলেশহীন গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে তাহেরা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে মিটিমিটি হেসে মিরহার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, 
   “অল দ্য বেস্ট, ভাবি!”
বলেই সে মায়ের পেছন পেছন দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিরহা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, তাহেরার এই শুভকামনার অন্তর্নিহিত অর্থ সে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না।
 
বারান তার বাম কানে থাকা ব্লুটুথ ডিভাইসটি ঠিক করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, কারণ ওপাশে কলে যুক্ত আছে যারিশ। বারানের মতো একজন ঘোর বাস্তববাদী ও গম্ভীর মানুষের পক্ষে ভালোবাসার এমন আবেগঘন মিথ্যা নাটক করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে নাটক করা ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথও খোলা নেই। তাই ওপাশ থেকে যারিশ তাকে যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছে, সেও ঠিক তোতাপাখির মতো সেটাই আউড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। যারিশ ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, 
   “দোস্ত, এইবার মিরহার দিকে তাকা।”
 
বারান ধীর চোখে নূরের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি যেন পলকের জন্য থমকে গেল। পার্পল কালারটি নূরের শ্যামলা গায়ের রঙের সাথে ভারী চমৎকার মানিয়েছে। নিজের ত্রিশ বছরের জীবনে বারান কখনো কোনো মেয়ের দিকে এভাবে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকেনি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে মিরহার সামনে এসে বসল, তবে দুজনের মাঝে বজায় রাখল কিছুটা দূরত্ব। মিরহা তখনও অপরাধীর মতো মাথা নিচু করেই বসে আছে। যারিশ আবারও কানে ফিসফিসাল, 
   “শোন, এবার বল—মিরহা, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? মাথা ব্যথা করছে? আমার কথা কি তোমার একবারও মনে পড়ছে না?”
 
বারান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়াবী সুরে ডেকে উঠল, 
   “নূর?”
 
মিরহা ধীরে চোখের পলক ফেলে বারানের দিকে তাকাল। আবারও সেই একই চেনা, আদুরে ডাক। বারান সরাসরি নূরের চোখের দিকে তাকিয়ে যারিশের শেখানো সংলাপগুলো আউড়ে গেল, 
   “মাথা ব্যথা করছে কি তোমার? খুব কষ্ট হচ্ছে? আর... আমার কথা কি তোমার একটুও মনে পড়ছে না?”
 
বারানের এই অতি নাটকীয় কেয়ার দেখে মিরহা অনেক কষ্টে নিজের হাসি চেপে রাখল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে এই সবকিছুই এক সাজানো নাটক। ওদিকে ব্লুটুথ কলের ওপাশে যারিশ তো হাসতে হাসতে বিছানায় কুপোকাত।
 
 মিরহা নিজের গলার স্বর যথাসম্ভব দুর্বল ও ধীর করে বলল, 
   “মাথাটা কেমন হালকা ব্যথা করছে... আর আমি পেছনের কোনো কিছুই মনে করতে পারছি না।”
 বলেই সে অভিনয়ের খাতিরে দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরল।
 
 মিরহাকে এভাবে অস্থির হয়ে উঠতে দেখে বারান তাকে শান্ত করার জন্য ব্যাকুল গলায় বলল, 
   “নূর, প্লিজ থামো। নিজের মাথায় একদম চাপ দিও না। ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক মনে পড়ে যাবে।”
 
বারানের এই সংলাপ শুনে ওপাশ থেকে যারিশ হাহা করে হেসে বলল, 
   “শালা, ওর পেছনের কথা মনে না পড়লেই তো আমাদের লাভ!”
 
আর ওদিকে মিরহা মনে মনে হাসল। সে মনে মনে বারানকে উদ্দেশ্য করে বলল, 
   “মিস্টার বাদাম!! আপনি যেমন নিখুঁত অভিনয় করতে পারেন, জেনে রাখুন আমিও কিন্তু কম যাই না।”
 
বারান আবারও অত্যন্ত মৃদু আর গভীর কণ্ঠে মিরহাকে ডেকে উঠল, 
   “নূর!’
 
ব্যাস, এই একটিমাত্র ডাকই যেন নূরের ভেতরের পুরো পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দিল। কেমন এক তীব্র অবশতায় সে এক নিমেষে বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ল। বারান তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 
   “তোমার কি কিছু বলার আছে, নূর?”
 
মিরহা নিজেও জানে না তার হুট করে কী হলো। সে সমস্ত জড়তা ভুলে সরাসরি বারানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, 
   “জানেন? আমার না ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে।”
 
বারান নিজেও বুঝতে পারল না তার মনের ভেতর এই মুহূর্তে কী চলছে। তবে মিরহার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মেয়েটি কতখানি না অসহায়। তার জীবনজুড়ে যেন কত শত না-বলা অপূর্ণতা জমে আছে। এই যে মেয়েটি কত সহজ সরল বিশ্বাসে তার কাছে ক্ষুধার কথা বলল, আর বারানও যে তার এই ক্ষুধা মেটাতে পারবে। ঠিক তেমনই বারানের অবচেতন মনে হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম নিল। তার মনে হতে লাগল, এই মেয়েটার জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা বোধহয় সে-ই একদিন এভাবে পূর্ণ করে দিতে পারবে। 
 
বারান আর এক মুহূর্তও বসে রইল না। টেবিলের ওপর থেকে সুপের বাটিটি হাতে তুলে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্ন সহকারে চামচ দিয়ে সুপে ফুঁ দিতে দিতে, তাপমাত্রা কুসুম গরম করে তা মিরহার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে ধরল। বারানের এমন রূপ দেখে মিরহা তো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনের কোণে হুড়মুড় করে ভেসে উঠল পুরোনো কিছু ধূসর স্মৃতি। অতীতে মিরহার খুব প্রিয় একজন মানুষ ছিল, যে তাকে ঠিক এভাবেই অসম্ভব ভালোবেসে, আগলে রেখে যত্ন করে খাইয়ে দিত। আজ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। তবে তফাত শুধু একটাই আগের মানুষটি অন্তরের গভীর ভালোবাসা থেকে তার যত্ন করত, আর সামনের এই মানুষটি করছে স্রেফ এক মিথ্যে অভিনয়ের খাতিরে। কিন্তু এই নিয়ে মিরহার মনে বিন্দুমাত্র কোনো আফসোস বা আক্ষেপ নেই। কারণ বিগত কয়েকটা বছর ধরে তো তার কপালে এই মিথ্যে সহানুভূতিটুকু পর্যন্ত জোটেনি! আজ যখন নিয়তি তাকে এই যত্নটুকু এনে দিয়েছে, তখন সে কেন তা ফিরিয়ে দেবে? সে তো দিনশেষে একজন রক্তমাংসের মানুষ, আর একজন মানুষ হিসেবে তার বুকেও তো ভালোবাসা, স্নেহ আর একটুখানি যত্ন পাওয়ার তীব্র লোভ লুকিয়ে আছে। বারান আবারও তার স্বভাবসুলভ নরম কণ্ঠে বলল, 
   “নূর, খেয়ে নাও।”
এই মায়াবী ডাকটি মিরহা আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারল না। সে এক শান্ত, লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাধ্য হয়ে বারানের হাতে সুপ খেতে শুরু করল।
 
 
            চলবে......
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
Part:03
 
 
বিশেষ নোট 📍 
( গল্পের স্থান পরিবর্তন করে লন্ডন এর জায়গায় আমেরিকা দেওয়া হয়েছে। কারণ আমেরিকা তে নাসা আছে। এবং আমি গুগল থেকে যখন জেনেছিলাম তখন গুগল বলেছিল লন্ডনেও আছে কিছু সেগুলো কেবল নাসা কে সহযোগিতা করে। মেইন কেন্দ্র আমেরিকাতে। একজন পাঠক ভুল ধরিয়ে দিয়েছে তাকে ধন্যবাদ। আমি আগের দুই পর্বে সব ঠিক করে দিব। আপাতত এইচএসসি পরীক্ষার জন্য সময় পাচ্ছি না।)
 
শাওয়ার শেষ করে বারান যখন ঘর থেকে বের হলো, তখন দেখল তার মা বাহার এলা বিছানার ওপর চুপচাপ বসে আছেন। মায়ের মুখাবয়ব জুড়ে গভীর চিন্তার রেখা। বারান তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বলল, 
    “দাদাজানের কথা ভাবছ, মা? একদম চিন্তা কোরো না। বয়স হয়েছে তো, তাই শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ উনাকে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দেবেন।”
 
বাহার এলা ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো টলমল করছে। অপরাধী কণ্ঠে তিনি বলতে লাগলেন,   
    “আমি জানি বারান, তোর জীবনের বড়-ছোট যেকোনো সিদ্ধান্তই নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার নেই। কিন্তু তোকে না জানিয়েই আজ তোর জীবনের মস্ত বড় একটা সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলেছি, বাবা।”
 
মায়ের কথার কোনো আগামাথা বুঝতে পারল না বারান। সে কিছুটা অবাক হয়ে মায়ের একদম সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। মায়ের হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, 
    “কী হয়েছে মা? আমায় খুলে বলো।”
 
বাহার এলা আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,   
     “তোর দাদার শরীরের অবস্থা তো নিজের চোখেই দেখলি, একদম ভালো না। আর তুই তো এটাও জানিস, আমার নিজের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তোর দাদাই আমার কাছে বাবার মতো। উনাকে আমি কতটা শ্রদ্ধা করি, কতটা ভালোবাসি, তা তো তোর অজানা নয়। আজ উনি আমার কাছে উনার জীবনের শেষ ইচ্ছাটার কথা বলেছেন। আমি কীভাবে সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দিই, বল?”
 
এতটুকু বলে তিনি একটু থামলেন, যেন পরের কথাটা বলার জন্য ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করছেন। তারপর বুকভরা সাহস নিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন, 
    “তোর দাদা আমাদের বাড়ির বর্ষার সাথে তোর বিয়ে দিতে চান... আর আমি উনাকে কথা দিয়ে এসেছি যে তুই এই বিয়েতে রাজি।”
 
কথাটি শোনামাত্রই বারানের মাথায় যেন এক আকাশ বজ্রপাত হলো। সে স্তব্ধ হয়ে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো, "ব... বর্ষা?" 
পরক্ষণেই তীব্র এক ক্ষোভ ও রাগ তার মাথায় চড়ে বসল। সে মায়ের সামনে থেকে ঝটকা দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে বলতে লাগল, 
    “তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে মা? প্রথমত তুমি খুব ভালো করেই জানো যে আমি এখন কোনো বিয়ের ঝামেলায় জড়াতে চাই না। আর সবচেয়ে বড় কথা, বর্ষাকে আমি ছোটবেলা থেকে একদম তাহেরার মতো দেখে এসেছি। তাকে আমি কীভাবে বিয়ে করব? ছিঃ মা!”
 
বাহার এলা খাটের ওপর থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের ক্ষোভ শান্ত করার চেষ্টা করে নরম গলায় বললেন, 
    “দেখ বাবা, সে তো আর তোর নিজের রক্তের বোন নয়। আর বর্ষা সত্যি অনেক লক্ষ্মী একটা মেয়ে। দেখিস, বিয়ের পর সবকিছু নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।”
 
বারান এবার নিজের ভেতরের রাগ আর চেপে রাখতে পারল না। কিছুটা চড়া সুরে সে বলল, 
    “ওহ প্লিজ মা! আমি খুব ভালো করেই জানি বর্ষা যথেষ্ট ভালো মেয়ে। কিন্তু তাকে বিয়ে করার মতো এমন একটা জঘন্য চিন্তা আমি মরে গেলেও মাথায় আনতে পারব না। শি ইজ জাস্ট লাইক আ সিস্টার টু মি।‌ ইম্পসিবল! আমি... আমি নিজেই দাদাজানের সাথে গিয়ে কথা বলছি। উনি নিশ্চয়ই আমার মনের অবস্থাটা বুঝবেন।”
বলেই বারান ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার মা পেছন থেকে তাকে ডাকার এবং আটকানোর চেষ্টা করলেও বারান সেদিকে বিন্দুমাত্র কান দিল না। বাহার এলার চোখ বেয়ে আবার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি যেন আজ বৃদ্ধ শ্বশুর আর নিজের ছেলের মাঝখানে পড়ে নির্মমভাবে ফেঁসে গিয়েছেন। তিনি চান না শ্বশুরের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ছেলে সারাজীবন কষ্ট পাক, আবার ছেলের এই জেদের কারণে বৃদ্ধ বাবা ওপারে যাওয়ার আগে কোনো কষ্ট নিয়ে যান। কী করবেন, তার কিছুই মাথায় আসছে না। ঠিক তখনই আমির হাসান ঘরে ঢুকে স্ত্রীর এই চরম অসহায়ত্ব টের পেলেন। আসলে তিনিও ছেলের সাথে এই বিয়ের বিষয়েই কথা বলতে আসছিলেন। কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়ানো অবস্থায় ভেতরের সব কথা শুনে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে কান্নাভেজা স্ত্রীকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললেন, 
    “একদম চিন্তা করো না বাহার। দেখবে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এখানে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো দোষ নেই, তাই দয়া করে নিজেকে আর দোষী ভাবা বন্ধ করো।”
স্বামীর এই আশ্বাসের চাদরে মুখ লুকিয়ে বাহার এলা যেন ভেতরের জমে থাকা ঝড়টা কিছুটা হলেও শান্ত করতে পারলেন।
 
     “এভাবে নাতিডারে ফাসাইয়া বিয়া দেওয়া ঠিক হইতাছে?” 
স্বামীরে প্রশ্নটা করলেন রাবেয়া বেগম। আব্দুল হাসান স্ত্রীর কথায় কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন,     
      “পোলাডার তো বয়স কম হইল না। দেখ না, সারাক্ষণ খালি কাম আর কাম করে। আর বর্ষারও বিয়ার বয়স হইছে। বারানের লগে বিয়াডা দিলে দেখবা সুন্দর মানাইয়া লইব। তাই তো এই অসুখের নাটক কইরা সবাইরে দেশি আনাইলাম। এখন বিয়াডা শান্তিমতো হইলেই আমি খুশি।”
বারান এতক্ষণ দাদার সাথেই কথা বলার উদ্দেশ্যে এই ঘরের দিকে আসছিল। কিন্তু যেই না দরজায় নক করতে যাবে, অমনি ভেতর থেকে দাদির এমন কথা শুনে তার হাত শূন্যে থমকে গেল। বারান দুনিয়ার সবকিছু সহ্য করতে পারলেও, বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা প্রতারণা মেনে নিতে পারে না। আর আজ তার নিজের দাদাই তার সরলতার সুযোগ নিয়ে এমন এক জঘন্য প্রতারণা করল, যা সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। বারান খুব ভালো করেই জানে, তার ভেতরের রাগটা কতটা ভয়ঙ্কর। এই মুহূর্তে এই বাড়িতে থাকা মানেই এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাওয়া। তাই নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে নিজের রুমে ফিরে এসে টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিল। গাড়িটি অবশ্য তার নিজের নয়, মেজো চাচার। বিকেলে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় সে-ই মেজো চাচার কাছ থেকে চাবিটা চেয়ে নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি এসেছিল, আর চাবিটা এতক্ষণ তার পকেটেই রয়ে গিয়েছিল।
 
বারান চাবিটা হাতে নিয়ে ধপধপ পা ফেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। যেখানে গাড়িটি পার্ক করা ছিল, সেখান থেকে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে তীব্র গতিতে ছুটে চলল। রাতের অন্ধকার আর একদম ফাঁকা রাস্তায় ফুল স্পিডে গাড়ি চালানোর পরেও বারানের ভেতরের জ্বলন্ত রাগটা কিছুতেই কমছিল না। তার ইচ্ছে করছিল অবরুদ্ধ আক্রোশে চিৎকার করতে কিংবা চারপাশের সবকিছু ভাঙচুর করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিজেকে সামলে রাখল। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে সে শুধু স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে রইল। সে নিজেও জানে না, এই ক্ষ্যাপাটে গতি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে যখন মেইন রোডে উঠল, তখনও তার গাড়ির স্পিড বিন্দুমাত্র কমল না। সে ঠিক এই উন্মাতাল গতিতেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় আচমকা সামনের এক অন্ধকার গলি থেকে কেউ একজন তীব্র বেগে এসে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। আকস্মিক এই বিপদে বারান নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে গাড়ির ব্রেক কষল এবং চাকার টায়ার পুড়িয়ে বিকট শব্দে গাড়িটি থেমে গেল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। গাড়ির সামনের অংশের সজোর ধাক্কা লেগে সেই অজ্ঞাত আগন্তুকটি কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ল।
 
ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে গেল যে বারান প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর কেটে যেতেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল এবং একছুটে সেই আগন্তুকের দিকে গেল। সেখানে গিয়ে দৃশ্যটি দেখামাত্রই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাস্তার ওপর লাল টকটকে বিয়ের পোশাক পরা এক তরুণী রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে। তার ঠিক পাশেই অবহেলায় পড়ে আছে একটি বড় ট্রাভেল ব্যাগ, আর হাতব্যাগটি ছিটকে গেছে কিছুটা দূরে। মেয়েটির কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে। খালি পায়ে জুতো না থাকার কারণে পায়ের তলা ছিলে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, আর শরীরের বিভিন্ন অংশে কালচে-বেগুনী আঘাতের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বারান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মেয়েটিকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল এবং দ্রুত নিজের গাড়ির দিকে পা বাড়াল। খুব সাবধানতার সাথে মেয়েটিকে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিল সে। গাড়িতে একটি ছোট কুশন বালিশ ছিল, সেটি এনে পরম যত্নে মেয়েটির মাথার নিচে গুঁজে দিল। এরপর তাড়াহুড়ো করে সামনের ড্যাশবোর্ড থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটি বের করে আনল। সেখান থেকে ব্যান্ডেজ ও গজ নিয়ে মেয়েটির কপালে শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে সাময়িকভাবে রক্তপাতটা বন্ধ হয়।
 
ঠিক যখন দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল, তখন আরেকটি গাড়িও সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে এমন এক্সিডেন্ট দেখে সেই গাড়িটিও দাঁড়িয়ে পড়ে এবং ভেতর থেকে একজন ভদ্রলোক নেমে আসেন। তিনি যখন দেখলেন যে গাড়ির মালিক নিজেই পরম দায়িত্বে মেয়েটিকে উদ্ধার করে গাড়িতে তুলছেন, তখন তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা মেয়েটির ব্যাগ দুটো কুড়িয়ে নিলেন। ধীরপায়ে বারানের গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি ব্যাগগুলো বাড়িয়ে দিলেন। বারান তখন ড্রাইভিং সিটে বসে গুগলে ম্যাপ দেখে আশেপাশের কোনো হাসপাতালের অবস্থান খুঁজতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ জানালার পাশে একজন অপরিচিত লোককে দেখে এবং তাঁর হাতে মেয়েটির ব্যাগ জোড়া লক্ষ্য করে সে গাড়ির গ্লাসটা নামাল। লোকটির হাত থেকে ব্যাগ দুটো লুফে নিয়ে সে কৃতজ্ঞতার সাথে কাছাকাছি কোনো ভালো হাসপাতালের খোঁজ জানতে চাইল। ভদ্রলোক দ্রুত হাসপাতালের রাস্তাটি বুঝিয়ে দিলেন। বারান তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদ্যুতবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে হাসপাতালে পৌঁছে গেল এবং মেয়েটিকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়ে দ্রুত ভর্তি করিয়ে দিল।
 
যখন সে মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করাচ্ছিল, তখন জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, 
    “রোগীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এমন গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি হারানোর (Amnesia) একটা বড় আশঙ্কা থাকে।”
কথাটি শোনামাত্রই বারানের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে পুরোপুরি থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একে তো সে নিজের জীবনের চরম এক ব্যক্তিগত ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর এখন তার গাড়ির ধাক্কায় আরেকটি প্রাণ ঘোর বিপদের মুখে। সে মনে মনে ভেবেছিল, মেয়েটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে নিজের দায়িত্বে তার বাড়ি বা গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে দায়মুক্ত হবে। কিন্তু মেয়েটি যদি সত্যিই তার অতীত ভুলে যায়, তবে তো সে এক মহাসমুদ্রে গিয়ে পড়বে। হতাশাজনক সব চিন্তা মাথায় নিয়ে বারান অলস পায়ে আবার নিজের গাড়ির দিকে ফিরে এলো এবং ড্রাইভিং সিটে ধপ করে বসে পড়ল। কী করা উচিত, কিংবা এই মুহূর্তে তার করণীয় কী তার কিছুই সে মাথায় খাটাতে পারছে না। অতিরিক্ত ভাবনায় তার মাথাটা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। সেই ফ্লাইটে শেষবার কিছু মুখে দিয়েছিল, তারপর থেকে এখন অবধি পেটে এক দানা খাবারও পড়েনি। আর এখন চারপাশের পরিস্থিতি যা, তাতে কোনো খাবার গলা দিয়ে নামার প্রশ্নই ওঠে না। বারান যখন চরম দুশ্চিন্তায় গাড়ির ভেতরেই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল পাশে পড়ে থাকা মেয়েটির হাতব্যাগটির ওপর। আর কোনো কিছু না ভেবেই সে ব্যাগটি হাতে তুলে নিল। তবে চেইনটা টানার ঠিক আগের মুহূর্তে সে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। একজন অপরিচিত মেয়ের ব্যক্তিগত ব্যাগ তার অনুমতি ছাড়া এভাবে হাতড়ানো কি আদেও নৈতিক? কিন্তু পরক্ষণেই তার প্রখর মস্তিষ্ক তাকে সায় দিল, এই ব্যাগটির ভেতরেই হয়তো মেয়েটির পরিচয় বা তার পরিবারের কোনো ঠিকানা লুকিয়ে আছে। সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে বারান ধীরহাতে ব্যাগের জিপারটি খুলল। ভেতরে হাত বাড়াতেই প্রথমেই তার আঙুলে ঠেকল ভাঁজ করা কয়েকটি কাগজ। বারান একে একে সব কটি কাগজ বের করে আনল। কাগজের ভাজগুলো খুলতেই সেখান থেকে একটি পরিচয়পত্র নিচে খসে পড়ল।
 
বারান জলদি গাড়ির ভেতরের রিডিং লাইটটি জ্বালিয়ে দিল। সবার আগে সে ছোট প্লাস্টিকের কার্ডটি হাতে তুলে নিল এবং আলোয় ঘুরিয়ে দেখতে পেল সেটি একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (ভোটার আইডি কার্ড)। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে
নাম: মিরহা নূর জামান
পিতা: মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম্ম
মাতা: জামিলা খাতুন
ঠিকানা: ঢাকা, ফরিদাবাদ
অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার মাঝে অবশেষে মেয়েটির আসল নাম জানতে পারল বারান। সে নিজের অজান্তেই বেশ কয়েকবার নামটি আওড়াল,
 "নূর... নূর!"
এরপর সে বাকি কাগজগুলো একটা একটা করে মেলে দেখতে লাগল। সেখানে সযত্নে রাখা ছিল মেয়েটির এসএসসির সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও অ্যাডমিট কার্ড। সেই সাথে রয়েছে এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন কার্ড এবং অ্যাডমিট কার্ডও। বারান অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি নথিপত্র দেখছিল, ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। ফোন স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল তার বন্ধু যারিশ কল করেছে। সে কলটি রিসিভ করে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে যারিশ মারমুখী গলায় একনাগাড়ে আউড়ে যেতে লাগল, 
    “শালা! তুই এই কারণেই এতদিনের ছুটি নিয়েছিলি? আমিও ভাবি, যে ছেলে নিজের বার্ষিক ছুটি পর্যন্ত কোনোদিন ছোঁয় না, সে কিনা মাসের শুরুতে এক ঝটকায় দুই মাসের জন্য ছুটি চেয়ে বসল। আমাকে বললি তোর দাদা অসুস্থ, তাই তোকে জলদি দেশে আসতে হবে। অথচ এখানে এসে দেখি তুই তলে তলে বিয়ের আসরে বসার আয়োজন করছিস। আচ্ছা, সব মানলাম, তা এখন তুই বউ রেখে কোন চিপায় লুকিয়ে বসে আছিস? বাড়ির সবাই মিলে তোর বিয়ের ধুমধাম কাজে মেতে উঠেছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।”
 
যারিশের প্রথম কথাগুলো শুনে বারানের মেজাজ চট করে গরম হয়ে গেলেও, পরের অংশটুকু শুনে সে পুরো থ বনে গেল। সে তো এখনো এই বিয়ের ব্যাপারে নিজের কোনো মতামত বা সম্মতি জানায়নি, অথচ এর মধ্যেই পুরো বাড়িসুদ্ধ মানুষ বিয়ের ধুমধাম আয়োজনে মেতে উঠেছে? সে যথাসম্ভব নিজের ভেতরের অস্থিরতা আড়াল করে শান্ত গলায় শুধাল, 
     “সবাই বিয়ের কাজে মেতে গিয়েছে মানে? কী বলছিস এসব?”
 
যারিশ ওপাশ থেকে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, 
     “খোকা যেন কিছুই জানেন না। আরে, কালকেই তো তোর বিয়ে। অবশ্য কালকে বললে ভুল হবে, ঘড়িতে এমনিতেও রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। সেই হিসাবে দেখতে গেলে আজকেই তোর বিয়ে, তোর ফুফাতো বোনের সাথে। পুরো বাড়ি আলো দিয়ে সাজানো হচ্ছে। তুই এতক্ষণ ধরে বাড়িতে নেই দেখে তোর মা প্রচণ্ড টেনশন করছেন। উনিই আমাকে বললেন তোকে ফোন দিয়ে জলদি ফিরতে বলতে। এখন বল, কোথায় আছিস তুই? আর কখন আসবি?”
 
সবটা শুনে বারানের বুকের ভেতর তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে যদি সে বাড়ি ফেরে, তবে যেভাবেই হোক তার মা এবং দাদাজান মিলে তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করবেন। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক রাজি করিয়ে বিয়েটা দিয়েই ছাড়বেন। কিন্তু যাকে সে আজীবন নিজের ছোট বোন হিসেবে দেখে এসেছে, তাকে সে কোন যুক্তিতে বিয়ে করবে? মেয়েটা এখনো বড্ড ছোট, তার পুরো জীবনটা সামনে পড়ে আছে। তাছাড়া যে পরিবারে তার নিজের ব্যক্তিগত মতামতের বিন্দুমাত্র কোনো মূল্য নেই, সেখানে সে কেন নিজের জীবনটা বিসর্জন দেবে? বারান আর অতশত ভাবার সময় পেল না। সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল, 
     “যারিশ, আমি তোকে একটা লোকেশন টেক্সট করছি। তুই সেখানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়। আর হ্যাঁ, সাথে করে ভুলেও কাউকে আনবি না। বাসায় কোনো একটা বাহানা দিয়ে ম্যানেজ করে জলদি বের হ।”
যারিশ বারানের গলার স্বর শুনেই বুঝতে পারল, কোথাও মস্ত বড় কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে। তাই সে আর উল্টো কোনো প্রশ্ন না করে ফোনটা কেটে দিল এবং চটজলদি বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ল।
 
বারান গাড়ির সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিথর হয়ে শুয়ে রইল। কী করবে, কোন দিকে যাবে তার কিছুই সে ভেবে পাচ্ছিল না। একদিকে তার পারিবারিক জটিলতা, যেখানে বাড়ি ফিরলেই নিজের অমতে মা আর দাদা মিলে তাকে বিয়ের আসরে বসতে বাধ্য করবেন। অন্যদিকে তার গাড়ির ধাক্কায় মারাত্মক আহত হওয়া এক অচেনা মেয়ের জীবন, যে এখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। বারান গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মেয়েটির সমস্ত নথিপত্র গুছিয়ে ব্যাগের ভেতর রেখে দিল। কিছুক্ষণ এভাবে একা বসে থাকার পর তার মনে হলো, এখন আর বাইরে বসে না থেকে হাসপাতালের ভেতরে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সে গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা লক করল এবং ধীরপায়ে হাসপাতালের করিডোর ধরে এগিয়ে গেল। সরাসরি কর্তব্যরত চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে রোগীর সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইল বারান।
 
ডাক্তার সাহেব ফাইলের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, 
      “রোগী মাথায় যেমন গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, তেমনি তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশেও পুরোনো ও নতুন অনেক আঘাতের দাগ রয়েছে। তা ছাড়া মারাত্মক কোনো কারণে তাঁর ব্রেইনে প্রচুর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। মেয়েটি মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত ও অসুস্থ। এত অল্প বয়সে এই ধরনের তীব্র ট্রমা বা মানসিক চাপ যেকোনো মানুষের জন্যই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর বিষয়। তাই বলতে পারেন, রোগীর মানসিক অবস্থা তাঁর শারীরিক অবস্থার চেয়েও ঢের বেশি আশঙ্কাজনক। আমরা আপাতত কপালে একটি ছোট অপারেশন সম্পন্ন করেছি এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আশা করি তাঁর জ্ঞান ফিরবে। তবে জ্ঞান ফেরার পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে তিনি তাঁর স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন কি না। আপনি চাইলে এখন রোগীকে একবার দেখে আসতে পারেন।”
কথাগুলো বলেই ডাক্তার সাহেব অন্য এক রোগীর দিকে চলে গেলেন। বারান হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোরে কিছুক্ষণ নিথর, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় তার চিকিৎসকের বলা প্রতিটি শব্দ অনবরত হাতুড়ি পেটার মতো বাজতে লাগল। ডাক্তার কী বললেন এসব? এতটুকু বয়স মেয়েটির, আর সে কিনা এমন ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে! কতটুকুই বা জীবনের রঙ রূপ উপভোগ করতে পেরেছে সে? মাত্র তো পথচলা শুরু হলো, এর মধ্যেই জীবনের প্রতি এমন হাঁপিয়ে ওঠা?এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান মনে মনে ভাবল,
      “অথচ আমি কতই না সুখে আছি। কেবল বাসা থেকে একটা বিয়ের চাপ দিচ্ছে, যা আমি চাইলে নিজের শক্ত অবস্থানে থেকে সহজেই হ্যান্ডেল করতে পারব। তাও আমার কত কত অভিযোগ এই সময়টা নিয়ে। আর সেই জায়গায় এই মেয়েটির জীবনের গল্প বা পরিস্থিতি তো আমি বিন্দুমাত্র জানিও না। কতটা অসহায় হলে, কতটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে একটা মেয়ে এই মাঝরাতে বিয়ের আসর থেকে এমন লাল বেনারসি পরে পালিয়ে আসতে পারে? আর নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, পালাতে না পালাতেই তাকে আবার মৃত্যুর মতো এক নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে হলো।”
বারান নিজের কপালটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরল। তার প্রখর বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কও এখন কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। মেয়েটার জ্ঞান ফেরার পর যদি সত্যিই তার কোনো স্মৃতি না থাকে, তবে সে এই সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েটিকে কোথায় নিয়ে যাবে? কার দায়িত্বে রাখবে?
 
বারান মনে মনে কথাগুলো বলেই এক বুকভারি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, ঠিক তখনই কেউ একজন পরম ভরসায় তার পিঠে হাত রাখল। বারান ঝটপট পেছনে তাকাতেই দেখল যারিশ দাঁড়িয়ে আছে। এই গভীর রাতে বন্ধুকে চোখের সামনে দেখে বারান যেন মনে মনে মস্ত বড় এক ভরসা খুঁজে পেল। যারিশ মুখ ফুটে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বারান তাকে থামিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, 
      “আমার সাথে আয়, আমি তোকে সব খুলে বলছি।”
বলেই বারান সামনের একটি কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল এবং যারিশও কোনো প্রশ্ন না করে বারানের পেছন পেছন ঘরের ভেতর পা বাড়াল। কিন্তু কেবিনে ঢুকেই বেডের ওপর এক অপরিচিত তরুণীকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে যারিশ পুরোপুরি অবাক হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে বারানের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 
     “বারান, এসব কী? এই মেয়েটি কে?”
বারান তখন গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে যারিশের কাছে সব ঘটনা একে একে খুলে বলতে লাগল। বাড়ি থেকে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বের হওয়া, মেইন রোডে আকস্মিক সেই দুর্ঘটনা, মেয়েটির ব্যাগ থেকে পাওয়া পরিচয়পত্র এবং একটু আগে কর্তব্যরত চিকিৎসক মেয়েটির মানসিক ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা যা বলেছেন সবকিছু সে একনাগাড়ে বলে গেল। যারিশ পরম নীরবতায় বন্ধুর প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনল। পুরো বিষয়টি শোনার পর সে এতটাই স্তব্ধ হয়ে গেল যে কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই সরল না। তবুও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে বারানের কাঁধে হাত রেখে বলল, 
     “ভাগ্যিস যে শেষ পর্যন্ত তোর কিছু হয়নি। এত স্পিডে কেউ মেইন রোডে গাড়ি চালায়, বারান? তোর মাথা কি পুরোপুরি ঠিক ছিল? তুই তো আর দশটা ছেলের মতো এমন অবিবেচক নোস।”
 
বারান এক বুকভারি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 
      “কী করব বল? হুট করে মা এসে বলল বর্ষার সাথে আমার বিয়ে। যাকে ছোটবেলা থেকে নিজের আপন বোন ভেবে বড় হয়েছি, তাকে বিয়ে করার কথা শুনলে কে নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে, বল? তবুও আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম নিজেকে শান্ত রাখার। দাদাজানের রুমে গিয়েছিলাম উনার সাথে সরাসরি কথা বলতে। কিন্তু উনার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জানতে পারলাম, উনি নাকি অসুস্থতার মিথ্যা নাটক করে আমাকে দেশি আনিয়েছেন। কেবল এই বিয়েটা দেওয়ার জন্য। ব্যাস, আমার মাথাটা পুরো গরম হয়ে গেল। নিজের ভেতরের চরম রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই তখনই চাবিটা নিয়ে রাস্তায় গাড়ি ড্রাইভ করতে বেরিয়ে পড়ি। কারণ আমি যদি তখন ওই বাসায় থাকতাম, তবে সত্যি একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেত।”
এতটুকু বলে বারান একটু থামল। কপালে জমে থাকা ঘামটুকু হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে আবার বলতে লাগল, 
     “একেই তো পরিবারের এই মস্ত বড় সমস্যা, তার ওপর এই অচেনা মেয়েটির এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার দ্বারা‌ এমনিতেই প্রচণ্ড চিন্তিত ছিলাম, এখন ডাক্তার যা বলল, মেয়েটি যদি সত্যি সত্যি তার অতীত স্মৃতি হারিয়ে ফেলে, তবে কার দায়িত্বে মেয়েটিকে ফেলে রেখে যাব? দিনশেষে একটা দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্ববোধ বলেও তো কিছু আছে, নাকি?”
পরিস্থিতির ওপর নিজের তীব্র ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে বারান বেডের সামনে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়ল। যারিশ কিছুক্ষণ গভীর নীরবতায় পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ করল, তারপর হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল, 
     “এই মেয়ের স্মৃতি যদি এখন সত্যি না ফেরে, তবে আমাদেরই লাভ! বিশেষ করে তোর তো মস্ত বড় লাভ।”
 
যারিশের এমন অদ্ভুত কথা শুনে বারান চরম বিস্ময় নিয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকাল। যারিশ ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বারানের ঠিক মুখোমুখি আরেকটি চেয়ার টেনে বসল। তারপর বারানের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর সুরে বলল, 
     “আমি এখন তোকে যা বলব, তা খুব মনোযোগ সহকারে শুনবি এবং বোঝার চেষ্টা করবি। আর হ্যাঁ, আমার সম্পূর্ণ কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং এর পেছনের যুক্তি না বুঝে ভুলেও কিন্তু রাগ করবি না, ঠিক আছে?”
বারান নিরুপায় হয়ে হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বন্ধুকে রাজি হতে দেখে যারিশ মনে মনে খুশি হয়ে নিজের পরিকল্পনাটা সাজিয়ে বলতে লাগল, 
     “দেখ, তোর বাড়ির এখন যা পরিস্থিতি, তুই এই মুহূর্তে ওখানে পা দেওয়া মানেই ফেঁসে যাওয়া। তুই গেলে উনারা তোকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে হোক, কিংবা তোর দাদা নতুন কোনো অসুস্থতার নাটক ফেঁদেই হোক তোকে এই বিয়েটা করতে বাধ্য করবেন। আর তুইও দিনশেষে পরিবারের বাধ্য ছেলে হয়ে একপর্যায়ে হয়তো অনীহা নিয়েই বিয়েটা করে ফেলবি। এতে করে শেষমেশ কী হবে? বিয়ের পর তুই নিজেকে আড়াল করতে নাসার (NASA) কাজের মাঝে আগের চেয়েও বেশি ডুবিয়ে দিবি। নিজের বিয়ে করা বউয়ের কাছ থেকে দূরে থাকতে তুই পুরো পরিবার থেকেই একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবি। ফলস্বরূপ, এই বিয়েতে তুই, বর্ষা কিংবা তোর পরিবার কেউই কোনোদিন সুখে থাকবে না। আর তুই যদি এখন কোনোভাবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে পরিবারের বিরুদ্ধে যাস এবং বিয়ে করতে সরাসরি বারণ করে দিস, তবে তোর বাবার সাথে তোর দাদার পুরো পরিবারের সম্পর্ক চিরদিনের মতো তেতো হয়ে যাবে। এমনকি তোর নিজের মা-বাবার সাথেও তোর মস্ত বড় একটা মনোমালিন্য তৈরি হবে। ঘুরেফিরে দেখ, পৃথিবীটা গোল। তুই যে পথেই হাঁটতে চাস না কেন, দিনশেষে সব দিক থেকেই তুই মারাত্মকভাবে ফেঁসে যাবি।”
 
যারিশ একটু থামল। এরপর যে কথাটি সে বলতে যাচ্ছে, তার জন্য মনে মনে নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে নিল। বারানের কাছেও এতক্ষণ যারিশের বলা প্রতিটি যুক্তি বেশ জুতসই মনে হয়েছে। তাই যারিশ এরপরে কী বলতে চায়, তা শোনার জন্য সে গভীর মনোযোগ দিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল।যারিশ এক বুক শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, 
     “দেখ বারান, যেহেতু তুই নিজেও একটা মস্ত বড় পারিবারিক বিপদে আছিস, আর ওদিকে এই মেয়েটিও চরম একটা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তার মানে দিনশেষে এই মুহূর্তে মেয়েটিরও একটা বড় আশ
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
Part:04
 
 
 
হাসান বাড়ির বৈঠকখানা আজ এক থমথমে গাম্ভীর্যে রূপ নিয়েছে। ঘরের ভেতরের ভারী বাতাস যেন প্রতিটি মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দকেও স্পষ্ট করে তুলছে। এক পাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন পরিবারের অভিভাবক আব্দুল হাসান, আর তার পাশেই চিন্তিত মুখে বসে আছেন তার সহধর্মিণী রাবেয়া খাতুন। তাদের তিন ছেলে আমির হাসান (বারানের বাবা), আকাশ হাসান এবং আসিম হাসান আজ সস্ত্রীক উপস্থিত। তবে সকলের উপস্থিতির মাঝেও এক অদ্ভুত শূন্যতা আর চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো ঘর জুড়ে। আকাশ হাসানের তিন ছেলে আবির, আবিদ আর আদিল তিনজনেই বিবাহিত। তাদের মধ্যে একজন স্ত্রীকে নিয়ে সুদূর কানাডায় প্রবাসী, স্বভাবতই আজ সে এই জরুরি বৈঠকে অনুপস্থিত। বাকি দুই ভাইয়ের একজন ডাক্তার, অন্যজন উকিল‌। তারা দুজনেই আজ নিজ নিজ স্ত্রীদের নিয়ে বড়দের মুখোমুখি বসে আছে। অন্যদিকে আসিম হাসানের দুই বিবাহিত মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকায় এই পারিবারিক ঝড়ের আঁচ থেকে দূরে আছে। তবে বারানের ফুফা ও ফুফু ঠিকই উপস্থিত হয়েছেন পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে। ঘরের এক কোণে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে বর্ষা। তার মনের ভেতর কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা তার অবনত মুখশ্রী দেখে বোঝার উপায় নেই। তার থেকে কিছুটা দূরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে বারান আর যারিশ। এই বিশাল জমায়েতে কেবল দুটি মুখ অনুপস্থিত মিরহা ও তাহেরা। অসুস্থ মিরহা নিজের ঘরে শয্যাশায়ী, আর তাকে দেখাশোনার জন্য তাহেরাও তার কক্ষেই রয়ে গেছে। হঠাৎ করেই বৈঠকখানার সেই পিনপতন নীরবতা ভাঙলেন আব্দুল হাসান। প্রবীণ এই মানুষটির কণ্ঠস্বর ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর আঞ্চলিক টানের মিশেলে তিনি বলতে শুরু করলেন
      "যাই হোইবার হোইয়া গেছে। আমার নাতির সিদ্ধান্তের লাইগা আমি আরেক বাড়ির মাইয়ারে কষ্ট দিবার পারুম না। তাই নাত বউডার লগে কেউ খারাপ ব্যবহার করবা না। নাতি যেহেতু বিয়া কোইরাই লাইছে তাইলে আর ঝগড়া ঝামেলা কোইরা লাভ নাইগা‌।”
 
বারানের ফুফুর কণ্ঠে ঝরে পড়া সেই আকুলতা বৈঠকখানার ভারী বাতাসকে আরও কিছুটা বিষণ্ণ করে তুলল। আব্দুল হাসানের দিকে তাকিয়ে তিনি অসহায়ভাবে বলে উঠলেন,
      "তাহলে বাবা, আমার বর্ষার কী হবে?"
আব্দুল হাসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে সেই সুযোগ না দিয়েই শক্ত গলায় কথা বলে উঠল বারান। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আর যুক্তি। সে সোজা ফুফুর দিকে তাকিয়ে বলল, 
     "বর্ষার কী হবে মানে? ফুফু, তোমার মেয়ে কোনো বানের জলে ভেসে আসেনি। সবে অনার্সে ভর্তি হয়েছে ও। ওর কি এখনই বিয়ের বয়স হয়েছে? ও তো এখনো নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি। নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করার সুযোগ তো দেবে তাকে, তারপর দেখবে তাকে নিয়ে আর কোনো চিন্তাই থাকবে না তোমাদের।"
বারানের এই অকাট্য আর প্রগতিশীল যুক্তিতে ঘরের গুমোট ভাবটা যেন এক পলকেই কেটে গেল। উপস্থিত চাচা-চাচি আর ভাইদের মুখে একপ্রকার সন্তুষ্টির আভাস দেখা দিল। ঠিক তখনই ঘরের এক প্রান্ত থেকে রাবেয়া খাতুন, যিনি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিলেন, তিনি এক মৃদু অথচ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, 
    "কিন্তু আমার একটা আর্জি আছে।"
 
পরিবারের কর্ত্রীর এমন আকস্মিক ঘোষণায় ঘরের সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল তার দিকে। কৌতুহলী আর উৎসুক মুখে সবাই প্রায় একসাথে বলে উঠল, 
    "বলুন, কী আর্জি?"
রাবেয়া বেগম তার চশমাটা ঠিক করে নিয়ে নিজের চিরচেনা আঞ্চলিক টানে বলতে শুরু করলেন,    
     "বারানের বিয়া দেহার লাইগাই উনি এত নাটক করল, কিন্তু বারান তো বিয়াই একা একাই কইরা আইল। তাই আমি চাই বারান ও ওই মাইয়ার বিয়া আবার হোইব, তাও আমাগোর চোখের সামনে। এমনিতেই বাড়িডা বিয়ার সাজে সাজানো হোইছে। তাই আমি চাই বারানের বিয়া অনেক ধুমধাম কইরা করবার।"
রাবেয়া বেগমের এই প্রস্তাবে বৈঠকখানায় যেন আনন্দের একটা মৃদু লহরী বয়ে গেল। বড়রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, আর ভাবিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। কিন্তু এই পুরো ঘরে দুজনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা হলো বারান আর যারিশ।
 
বারানের তো রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ। সে স্তব্ধ হয়ে নিজের দাদির দিকে তাকিয়ে রইল। আর যারিশের অবস্থা আরও করুণ। সে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে, যেন কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের ভেতরের প্রবল অস্বস্তি আর অস্থিরতাকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বারান আমতা আমতা করে বলতে লাগল,
     "কিন্তু আমরা তো বিবাহিত! তাহলে শুধু শুধু আবার কেন বিয়ে করার দরকার?”
 
বারানের আপত্তির পিঠে তার বাবা আমির হাসান এবার বেশ গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখানো কণ্ঠে বলে উঠলেন,
     "একজনকে দুইবার বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়, বারান? আর তাছাড়াও আমাদেরও তো ইচ্ছা নিজের ছেলের বিয়ে দেখার। আর কোনো কথা হবে না। তুই নিজ পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ি এনেছিস, আমরা কিছু জিজ্ঞেস করিনি। এমনকি মেয়েটির পরিবার সম্পর্কেও জানতে চাইনি। তোর উপরে আমাদের এতটা ভরসা। আমরা কেবল চাইছি মেয়েটির সাথে তোর বিয়েটা ধুমধাম করে দিব। তুই কি আমাদের জন্য এতটুকু করতে পারবি না?"
বাবার এই আবেগঘন আর যুক্তিপূর্ণ কথার প্রেক্ষিতে বারান আর বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। তার পায়ের তলার মাটি যেন আরও খানিকটা সরে গেল। আসলেই তো, সে হুট করে একটা অপরিচিত মেয়েকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো, অথচ পরিবারের কেউ তাকে একটা কঠিন প্রশ্ন পর্যন্ত করল না। উল্টো সবাই কত সহজে মেনে নিল। সে এবং যারিশ কেবল তারা দুজনেই জানে যে এই বিয়েটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, একটা সাজানো নাটক। কিন্তু বাড়ির বাকি সরল মনের মানুষগুলো তো তা জানে না। তার প্রতি সবার এই অটুট বিশ্বাস বারানের বুকে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। কিন্তু তার মানে এই না যে সে এখন আসলেই একটা সত্যি সত্যি বিয়ে করে ফেলবে! হ্যাঁ, সে মনে মনে স্বীকার করছে যে তখন বর্ষার সাথে বিয়ে থেকে বাঁচার জন্য সে স্মৃতি হারানো এক অসহায় মেয়ের সুযোগ নিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে একটা মেয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে চিরদিনের জন্য এভাবে একটা মিথ্যা বাঁধনে বেঁধে ফেলবে? এমন কাপুরুষ তো বারান নয়। অথচ সে চাইলেও এখন পরিবারের সামনে সত্যটা উগড়ে দিতে পারছে না। এখন যদি সে বলে যে যারিশ তার স্ত্রী নয়, তবে পরিবারের মানুষ ক্ষোভে-অপমানে এবার তাকে ধরে বেঁধে বর্ষার সাথেই ছাদনাতলায় বসিয়ে দেবে। 
 
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ক্ষণিকের জন্য বারান একা একা অনেক কিছু ভাবল। মাথার ভেতর চিন্তার হাজারটা চাকা ঘুরতে লাগল। অবশেষে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে, একটা যুৎসই অজুহাত পেয়ে সে আমতা আমতা করে বলল, 
     "কিন্তু বাবা... নূর তো এখন অসুস্থ। এই অবস্থায় তারে টানা কয়েকদিন বেড রেস্ট নিতে বলেছে ডাক্তার।"
 অসুস্থতার কথা তুলে বারান ভাবল এবার হয়তো সাময়িকভাবে হলেও এই বিয়ের আয়োজন এড়ানো যাবে।
 
বারানের মা এবার ছেলের মুখের ওপর থেকে সবটুকু আশার আলো কেড়ে নিয়ে বেশ উৎফুল্ল গলায় বলে উঠলেন, 
    "সমস্যা নেই তো! এমনিতেও বিয়ের নাম বললেই তো আর বিয়ে হয়ে যায় না। সবকিছু গোছগাছ করতেও বেশ সময় চলে যাবে। আমরা সবকিছুর প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। কেনাকাটা আছে, নিমন্ত্রণ বাকি আছে। সব করতে করতে এক সপ্তাহ চলেই যাবে। তারপর না হয় বিয়ে। আর ততদিনে মিরহা একদম সুস্থ হয়ে যাবে। আর এমনও না যে আমরা চলে যাচ্ছি। তুই তো মাস খানেক ছুটি নিয়েছিস, তাই কোনো অসুবিধা হবে না।"
মায়ের এই নিখুঁত পরিকল্পনার পর বারান এবার সত্যিই ভাষা হারিয়ে ফেলল। তার শেষ অজুহাতটুকুও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাবেয়া বেগম খুশিতে গদগদ হয়ে বলে উঠলেন, 
     "যাকগে, আলহামদুলিল্লাহ! অহন নাতিডার বিয়া দেইখা মরতে পারাম। মরনের আগে চোখ জুরাইবো আমার।"
রাবেয়া বেগমের মুখ থেকে এমন মরণ-বাঁচনের কথা শুনে পুরো বাড়ির মানুষ এক লহমায় উতলা হয়ে উঠল। সবাই তড়িঘড়ি করে উনার কাছে ছুটে গেল এবং এই আনন্দের দিনে এমন অমঙ্গলের কথা বলতে বারণ করতে লাগল। বৈঠকখানা জুড়ে তখন এক আবেগঘন হুলস্থুল পরিবেশ। কিন্তু সেই আনন্দের জোয়ারের মাঝেও বারান পাথরের মতো চুপচাপ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভেতর তখন যেন সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে। যারিশ এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে বারানের ভেতরের এই তুমুল ঝড় আর অসহায়ত্ব খুব কাছ থেকে দেখছিল। সে বারানের মানসিক অবস্থাটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারল। পরিবারের সবার অলক্ষ্যে সে আলতো করে বারানের কাঁধে হাত রাখল। পরম ভরসা আর সান্ত্বনা দিয়ে মৃদু স্বরে বলতে লাগল, 
      "চিন্তা করিস না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। উনার পরিকল্পনা সবসময় উত্তম হয়।"
যারিশের হাতের ছোঁয়ায় আর আশ্বস্ত করা কথায় বারান কেবল একবার তার দিকে তাকাল, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না। এক বুক অনিশ্চয়তা আর চাপা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে আগের মতোই নিথর, নীরব হয়ে রইল।
 
পুরো হাসান বাড়ি জুড়ে তখন আনন্দের সানাই বাজার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। অলিন্দে শুধু বিয়ের কেনাকাটা, নিমন্ত্রণ আর ধুমধামের গুঞ্জন। কিন্তু এই উৎসবমুখর কোলাহল থেকে দূরে, এক শান্ত স্নিগ্ধ ঘরে বসে গল্প করছিল মিরহা আর তাহেরা। আজ কত বছর পর মিরহা এভাবে মন খুলে, কোনো দ্বিধা ছাড়া নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারছে। তাহেরার মিষ্টি স্বভাবের সাথে তার বন্ধুত্বটা বেশ ভালোই জমে উঠেছে। দুজনে মিলে কী একটা মজার কথা নিয়ে খিলখিল করে হাসাহাসি করছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল বারান। বারানকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মিরহার ঠোঁটের কোণের চঞ্চল হাসিটা ঝপ করে থেমে গেল। সে একটু আড়ষ্ট হয়ে পাশে বসা তাহেরার দিকে তাকাল এবং কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 
     "তোমার বাদাম ভাই চলে এসেছে।"
মিরহার সেই অতি গোপন ফিসফিসানি তাহেরার কান এড়ালো না। কথাটি শুনেই তাহেরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, ফিক করে হেসে উঠল সে। এরপর নিজের গম্ভীর ভাইয়াটার দিকে তাকিয়ে কৌতুকভরা গলায় বলে উঠল, 
     "বাহ্ ভাইয়া! ভাবি তো তোমার অনেক সুন্দর নাম রেখেছে বাদাম!"
 বলেই সে আবার হাসিতে ভেঙে পড়ল। তাহেরার এই আকস্মিক বোম ফাটানো কথায় মিরহা আর বারান দুজনেরই চোখ জোড়া চড়কগাছ হয়ে গেল! বারান চরম অবাক হলো, কারণ সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে স্মৃতি হারানো এই শান্ত-শিষ্ট মেয়েটি তাকে নিয়ে আড়ালে এমন কোনো মজার নাম দিতে পারে। আর মিরহার আকাশ থেকে পড়ার কারণ হলো, সে ভাবতেও পারেনি তাহেরা এতখানি বাচাল যে মনের ভুলে পেটের কথা সরাসরি তার রাশভারী ভাইয়ের সামনেই ফাঁস করে দেবে। 
 
বারান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমির আভাস ফুটিয়ে ধীরে ধীরে মিরহার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। মিরহার ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়ে এক ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, 
    "আমাকে তোমার বাদাম মনে হয়?"
 
মিরহা তখন ভয়ে আর চুরির দায় ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় এতটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় যে, তার মাথা আর মুখের কথার কোনো মিল রইল না। সে অবচেতনভাবেই মাথা ওপর-নিচ করে 'হ্যাঁ' বোধক ইশারা করল, অথচ তার মুখ দিয়ে ভয়ে ভয়ে ছিটকে বের হলো
"না!"
মিরহার এই চরম হড়বড়ে কাণ্ড দেখে ঘরে আর গম্ভীর পরিবেশ ধরে রাখা গেল না। তাহেরা আর বারান দুজনেই একসাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসির দমকে ঘরের ভেতরের এতক্ষণের সবটুকু আড়ষ্টতা যেন এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
 
তাহেরা বেশ বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে এখানে তার থাকাটা একদমই অনুচিত। ভাই আর ভাবিকে কিছুটা একান্ত সময় দেওয়ার জন্য সে মনে মনে একটা চটজলদি বাহানা বানিয়ে ফেলল। বেশ চতুরতার সাথে বলে উঠল,
     "আমাকে মনে হয় মাম্মা ডাকছে, আমি একটু শুনে আসি।" 
কথাটি শেষ করেই সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। এখন এই নিঝুম ঘরের ভেতর কেবল দুজন মানুষ মিরহা আর বারান। তাহেরা চলে যেতেই ঘরের পরিবেশটা কেমন যেন অদ্ভুত রকম শান্ত হয়ে এলো। বারান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার কারো কাছে আসল। মিরহার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে, কণ্ঠস্বরে খানিকটা নাটকীয় গম্ভীরতা এনে বলল, 
    "তো তুমি বলতে চাইছো যে আমাকে বাদামের মতো লাগে, তাই তো?"
মিরহা তখন লজ্জায় আর সংকোচে রীতিমতো কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে আমতা আমতা করে, আমল ডলতে ডলতে বলল, 
    "না মানে... আপনার গায়ের রঙ ফর্সা, আবার হালকা বাদামি। চুলের রঙও অন্যান্যদের থেকে ভিন্ন। নামটাও অদ্ভুত... তাই সব মিলিয়ে বাদাম।"
মিরহার এমন সরল আর অদ্ভুত যুক্তি শুনে বারান আর নিজের ভেতরের হাসির বেগ চেপে রাখতে পারল না। সে মাথা পেছনে হেলিয়ে বেশ শব্দ করে, প্রাণ খুলে হেসে উঠল। বারানের এই রূপ দেখে মিরহা একেবারে অবাক হয়ে গেল। আজ দুটো দিন হলো সে এই বাড়িতে এসেছে, আর এই দুই দিনের মাঝে একটা বারের জন্যও সে এই রাশভারী লোকটিকে হাসতে দেখেনি। সবসময় কেমন যেন একটা গম্ভীর, চিন্তিত মুখ করে ঘোরে। আজ প্রথম দেখল তাকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে। হাসলে এই শক্তপোক্ত পুরুষটার গালে কত সুন্দর একটা টোল পড়ে! আর তার ঠোঁটের ঠিক ওপরের বড় কালো তিলটা যেন হাসির টানে আরও বেশি স্পষ্ট আর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। মিরহা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল। কিন্তু যখনই সে বুঝতে পারল যে সে বেশ অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে বারানের দিকে তাকিয়ে আছে, তখনই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে নিজেকে সংযত করল। 
 
বারান কিছুক্ষণ হাসার পর ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হলো। সে এবার বিছানায় মিরহার পাশে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসল। দুজনের মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপর অত্যন্ত শান্ত আর নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 
    "এখন তোমার শরীর কেমন আছে, নূর? কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?"
মিরহা আলতো করে আবার তাকাল বারানের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে এবার একটা আলগা, মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে মৃদু স্বরে বলল, 
    "না, আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর এখন আমি আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ আছি।"
মিরহার মুখে সুস্থতার কথা শুনে বারানের বুকের ওপর থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল। সে কিছুটা নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে বলল, 
     "কিছু বলার ছিল তোমাকে।"
মিরহা বারানের দিকে আগের মতোই উৎসুক চোখে তাকিয়ে থেকে কেবল মুখ দিয়ে বলল,
      "বলুন।”
 
   "তোমার আর আমার বিয়ে হবে আবার। বাড়ির সবাই মিলে ঠিক করেছে আমাদের বিয়ে বড় করে দিবে এবং ধুমধাম করে অনুষ্ঠান হবে।"
বারানের মুখ থেকে বের হওয়া এই একটিমাত্র বাক্য যেন নিমিষেই ঘরের শান্ত পরিবেশটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। মিরহার মাথায় তখন যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ভেঙে পড়ল! বিস্ময়ে আর আতঙ্কে তার চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। এক বিয়ের পিঁড়ি থেকে বাঁচতে সে নিজের পরিচয় লুকিয়ে, চোরের মতো পালিয়ে এসেছে সুদূর অচেনা এক জায়গায়। আর এখন কিনা তাকে আবার সেই বিয়ের মাঝেই গিয়ে পড়তে হবে? এমন অবিশ্বাস্য সমাপতন সে নিজের দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি! ভাগ্য কি তার সাথে কোনো নির্মম তামাশা করছে? তার সাথেই সবসময় এমন কেন হয়, সে নিজেও জানে না। ঠিক তখনই বারান আবার বলতে শুরু করল,
     "আমি জানি তুমি মনে মনে কী ভাবছো।" 
 
বারানের কথাটি শুনে মিরহার বুকের ভেতরটা একদম হিম হয়ে গেল, মুহূর্তে শুকিয়ে এলো গলার নালী। তার শরীর বেয়ে একটা সূক্ষ্ম ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। বারান কি তবে বুঝে ফেলেছে যে সে সব নাটক করছে? সে কি তার আসল পরিচয় জেনে গেছে? এক রাশ অজানা আতঙ্ক বুকে চেপে সে ধীরে ধীরে বারানের দিকে চোখ তুলে তাকাল। বারান তার মুখের ভয়ার্ত অভিব্যক্তি দেখে উল্টো শান্ত গলায় বলল, 
    "তুমি এটাই ভাবছো যে, আমরা একবার বিয়ে করেছি, তাহলে আবার কেন করব? তাই তো?"
বারানের এই ভুল অনুমান শুনে মিরহা যেন নতুন করে আবার প্রাণ ফিরে পেল। তার ভেতরের দম আটকে আসা ভয়টা এক পলকে কেটে গেল। সে একটা দীর্ঘ, নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে নিজেকে সামলে নিল, এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে বারানের কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল।বারান তখন মিরহাকে শান্ত করার জন্য এবং পরিস্থিতিটা বোঝানোর জন্য বেশ নরম গলায় বলতে লাগল,
     "দেখো নূর, তুমি আর আমি যখন বিয়ে করেছি, তখন সেখানে আমার বা তোমার পরিবারের কেউ ছিল না। তাই এখন আমার পরিবারের মানুষ চাইছে সবার সামনে যেন আমাদের বিয়েটা আবার নতুন করে হয়। তোমাকে এভাবে হুট করে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে আসার পর বাড়ির একটা মানুষও তোমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি। আমার ওপর তাদের এতটাই অটুট ভরসা। তাই এখন যেহেতু তারা মন থেকে চাইছে আমাদের বিয়েটা আবার ধুমধাম করে হোক, তাই আমি আর মুখ ফুটে 'না' বলতে পারছি না। আশা করি তুমি আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরেছো।"
বারানের কথায় এক ধরণের অসহায়ত্ব আর পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পাচ্ছিল। কিন্তু মিরহা তখন নিজের অজান্তেই এক জটিল মায়াজালে জড়িয়ে যাচ্ছে, যার থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ তার জানা নেই। মিরহার জানা নেই এখন সে কী করবে। তার মাথায় কোনো উপায় আসছে না। সে তো চাইলেও এখন নিজের আসল সত্যটা মুখ ফুটে বলতে পারবে না। যদি এই বাড়ির মানুষ জানতে পারে যে সে স্মৃতি হারানোর নাটক করছে এবং সে অন্য কারো ঘর থেকে পালিয়ে এসেছে, তবে এক মুহূর্তও তারা তাকে এই বাড়িতে আশ্রয় দেবে না। আর এই ভরসা জাগানো বাড়ি থেকে বের করে দিলে এই বিশাল পৃথিবীতে তার যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গাও তো অবশিষ্ট নেই। 
 
এসব দুশ্চিন্তার তীব্র ঝড়ে মিরহার মাথায় যেন দপধপ করে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। মনে হচ্ছে মাথাটা এখনই ছিঁড়ে দু-টুকরো হয়ে যাবে। তবে কি এখন পরিস্থিতির চাপে পড়ে বারানকে সত্যি সত্যি বিয়ে করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই? মিরহা যখন বিছানায় বসে একা একা এই ভাবনার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, আর বারান তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন বারানের দাদা আর দাদি।
 
 আব্দুল হাসান এবং রাবেয়া খাতুন হাসিমুখে ঘরে এসে মিরহার দিকে তাকালেন। রাবেয়া বেগম মায়াবী গলায় বলতে লাগলেন,
      "নাতবউ, এমনি আর কতদিন হুইয়া বইয়া থাকবি? চল আমাগোর গেরাম ঘুরাইয়া আনি তোরে। দেখবি মনডা ভালা হোইয়া যাইবো। সারাদিন ঘরে থাকবার কি আর ভালা লাগে? চল চল, আর সময় নষ্ট করিস না।"
মিরহা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একবার রাবেয়া বেগমের দিকে তাকাল, তো আরেকবার বারানের দিকে অসহায়ের মতো চোখ ফেরাল। বারান তাকে আশ্বস্ত করতে আলতো করে চোখের ইশারা করতেই মিরহা আর অমত করল না। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল এবং তার পরনের ওড়নাটা দিয়ে মাথায় সুন্দর করে একটা ঘোমটা টেনে নিল। নাতবউকে প্রস্তুত হতে দেখে আব্দুল হাসান বেশ খুশি হয়ে বলে উঠলেন,
     "দাদুভাই, তুইও আয় আমাগোর লগে। কত বছর ধইরা আহস না গেরামে। তোরে আর তোর বউরে একলগে গেরাম দেখাই।"
পরিবারের সবচেয়ে বড় অভিভাবকের এই স্নেহের আবদার বারান আর ফেলতে পারল না। সেও আর কোনো অজুহাত না দিয়ে দাদার কথায় চুপচাপ রাজি হয়ে গেল। এবং চারজন মিলে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাইরে হাঁটতে লাগল।
 
গ্রামের সুন্দর এবং সতেজ পরিবেশের বুক চিরে মেঠো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল দুই জোড়া যুগল। এক প্রান্তে দীর্ঘ জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া এক বৃদ্ধ আর এক বৃদ্ধা আব্দুল হাসান ও রাবেয়া খাতুন। আর ঠিক তাদের পাশাপাশি, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে এক আধুনিক সুদর্শন যুবক এবং এক অপরূপা রূপসী যুবতী। গ্রামীণ স্নিগ্ধ হাওয়া আর পাখির কলকাকলিতে চারপাশটা মুখরিত।
 
সবুজ ধানের ক্ষেত ভেদ করে যে সরু মেঠো পথটি চলে গেছে, তার চারপাশের পরিবেশটা ছিল অসম্ভব সুন্দর আর শান্ত। শান্ত বাতাসে কচি ধানের পাতাগুলো দুলছিল। সবার আগে আগে বেশ গল্প করতে করতে হাঁটছিলেন আব্দুল হাসান আর রাবেয়া বেগম। আর তাদের বেশ খানিকটা পেছনে, ধানের আইল ধরে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে ফেলে আসছিল বারান আর মিরহা। বারান গ্রামের এই সরু, কর্দমাক্ত আর পিচ্ছিল আইলে হাঁটতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল। সে বারবার নিজের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে আর আড়চোখে দেখছে মিরহাকে, যে কিনা গ্রামের মেয়ে না হয়েও বেশ অনায়াসে তার আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে। বারান মনে মনে ভাবল,
      "এতটুকু রাস্তায় ও যদি পারে, আমি কেন পারব না?" 
নিজের পুরুষত্ব আর অহংকার বজায় রাখতে বারান একটু বড় বড় পা ফেলে দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করল। আর ঠিক তখনই ঘটল সেই চরম অনর্থ। ধানের আইলের এক জায়গায় কাদা জমে বেশ পিচ্ছিল হয়েছিল। বারান সেখানে পা দেওয়া মাত্রই তার জুতো জোড়া বিশ্বাসঘাতকতা করল। মুহূর্তের মধ্যে পা পিছলে, শূন্যে দুই পা তুলে বারান একেবারে ব্যাঙের মতো উপুড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল কাঁচা কাদার ভেতর।
ধপাস করে একটা শব্দ হতেই বারানের দাদা-দাদি আর মিরহা ঝটপট পেছনে ফিরে তাকাল। বারান যখন কাদা থেকে কোনোমতে নিজের মাথাটা তুলল, তখন তার পুরো মুখাবয়বের অবস্থা দেখার মতো। ধবধবে ফর্সা মুখটার একপাশ কালো কাদায় লেপ্টে গেছে, আর নাকের ডগায় ও ঠোঁটের কোণে ধানের শুকনো খড় আর কাটা ঘাস এমনভাবে আটকে আছে যেন সে কোনো এক আজব কাদা-মানব। বারানের এই মহাকাব্যিক পতন আর তার মুখের সেই বিচিত্র রূপ দেখে মিরহা নিজের মুখের ওপর হাত চেপে ধরল। কিন্তু তার ভেতরের উপচে পড়া হাসি সে কিছুতেই আর চেপে রাখতে পারল না। হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরার জোগাড় হলো। একপর্যায়ে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ধানের আইলের ওপরই খিলখিল করে হেসে বসে পড়ল। তার মুক্তোঝরা হাসির শব্দে পুরো মাঠ গমগম করতে লাগল।
 
সামনে থেকে দাদি রাবেয়া বেগমও নাতির এই করুণ দশা দেখে চিবুকে হাত দিয়ে অবাক হয়ে বললেন, 
    "ওমা! দাদুভাইয়ের একি হাল হইলো গো!" 
আর আব্দুল হাসান পেছনে দাঁড়িয়ে নাতির এই জবুথবু অবস্থা দেখে গোঁফের আড়ালে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। বারান কাদার ভেতর থেকে এক চোখ বন্ধ করে মিরহার দিকে তাকাল। যে মেয়েটি গত দুটো দিন এক ফোঁটা হাসেনি, সবসময় ভয়ে গুটিয়ে থাকত, সে আজ তাকে কাদায় পড়তে দেখে মাটিতে বসে মন খুলে হাসছে। বারানের নিজের মুখের কাদা আর নাকের খড়ের জন্য চরম অস্বস্তি লাগলেও, মিরহার এই বাঁধভাঙা প্রাণবন্ত হাসি দেখে তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল। সে নিজের রাগ ভুলে গিয়ে মনে মনে ভাবল, যাক, অন্তত তার এই পতনের উসিলায় মেয়েটার মুখে আজ প্রথম এমন সুন্দর হাসি তো ফুটল!
     
               চলবে.......
Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner