গল্প :অপেক্ষার প্রহ...
 
Notifications
Clear all

গল্প :অপেক্ষার প্রহর (writer -Fatima Tuj Nawshi)


Posts: 8
Topic starter
(@fatima-tuz-nawshi)
Joined: 5 months ago

গল্প :অপেক্ষার প্রহর

writer-Fatima Tuz Nawshi

 

এখন থেকে বাকি পর্ব গুলে এইখানে৷ পোস্ট করা হবে, 

যাদের আগের পর্ব গুলো পড়া বাকি আছে তাদের জন্য নিচে লিংক দেওয়া হয়েছে। 

 

গল্পের- link

Loading spinner

Reply
4 Replies
Posts: 8
Topic starter
(@fatima-tuz-nawshi)
Joined: 5 months ago
পর্ব :০৯
 

ধুমধাম আয়োজনে বিয়ে হয়ে গেল শিমাতের। শুরুতে কথা হয়েছিল বাগদান হবে। তবে আনিসুল বিষয়টা পরিবর্তন করে দিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করলেন। শিমাত বসে আছে। এই রুমটায় কখনো আসা হয় নি তার। বুকের ভেতর কেমন ধীম ধীম করছে। স্বামী নামক মানুষটি কেমন হবে সে জানে না। তার ভয় হচ্ছে। প্রচন্ড ভয়। খানিক বাদে দরজা খুলে গেল। শিমাত শাড়ি খামচে চোখ বন্ধ করল। পুরুষটি বোধহয় নিকটে আসছে। শিমাত চোখ খুলতে পারছে না। তার ভেতরে আন্দোলন নেমেছে।

"হাতটা বাড়াও।"

মেয়েটি হাত বাড়াল না। পুরুষটি পুনরায় বলল,"হাত বাড়াও।"

এবার শিমাত পড়ল বিপাকে। কোন হাত বাড়াবে? ডান নাকি বাম? পুরুষটি বোধহয় ধৈর্য ধরতে পারল না। তাই নিজ থেকেই বা হাত টেনে নিল। পরিয়ে দিল হিরে খচিত ব্লেসলেট। শিমাতের সর্বাঙ্গে কেমন হীম ধরেছে। সে কথা বলতে পারছে না।

"সম্ভবত একটু ঢিলে হয়েছে। আসলে মাপ টা বুঝতে পারি নি।"

শিমাত এবার ও চুপ। তার অন্তরের ঝড় থামছে না। অথচ তিন কবুল বলে মানুষটিকে স্বামী রূপে গ্রহণ করেছে সে। ইয়াজ কথা বলল না। ফ্রেশ হতে গেল। শিমাত এবার মুখ তুলে চাইল। পুরুষটিকে পেছন থেকে দেখেই ওর শরীর কেমন কাঁপছে। চোখে নেমে এল ব্যথা। মানুষটি তাকে নিশ্চয়ই দয়া করেছে।

চোখে মুখে পানি দিল ইয়াজ। আনিসুল সাহেব কে মানাতে গিয়ে বেশ বড়ো ত্যাগ করতে হলো তাকে। বোনের ভালোবাসা রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করতে হলো। যদিও শুরুর দিকে আনিসুল সাহেব রাজি ছিলেন না। ভাগ্নীর প্রতি স্নেহ যেন তার একটু বেশি। ওনার মতে রেহানের থেকে ছয় বছরের ছোট শিমাত। আর রেহানের থেকে ইয়াজ আরো পাঁচ বছরের বড়ো। সেই হিসেবে ইয়াজ আর শিমাতের সম্পর্কটা সম্ভব না। এগারো বছরের বড়ো পুরুষের সাথে শিমাতকে বিয়ে দিতে চান নি আনিসুল। এর জন্য ইয়াজকে কম কাঠখড় পোড়াতে হলো না। ভদ্রলোক ভাগ্নী কে নজর ছাড়া করবেন না। অন্য কারো সাথে বিয়েও দিবেন না। ইয়াজ চোখে মুখে পানি দিল। বিয়ের জন্য সে ও প্রস্তুত ছিল না। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল শিমাত একই ভাবে বসে। ইয়াজ একটু ধীর সুরে বলল,"ভারী জামাকাপড় বদলে আসো।"

শিমাত কোনো কথা ছাড়াই উঠে গেল। ইয়াজ পরিপাটি হয়ে উঠতেই দেখল শিমাত বাথরুমের কাছে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি ভয় পাচ্ছে।

"ওখানে দাঁড়িয়ে কেন?"

শিমাতের মাথা নত। সে পা দ্বারা মেঝেতে স্লাইড করছে।

"কিছু খাবে?"

দু দিকে মাথা নাড়াল শিমাত। সে খাবে না। ইয়াজ এগিয়ে এল। এক নজরে মেয়েটিকে দেখে নিল। স্ত্রী হিসেবে শিমাত নিশ্চয়ই সুন্দরী। তবে ওর সময়ের প্রয়োজন। শিমাতের ও তাই।

"বারান্দায় আসো।"

ইয়াজ এগিয়ে গেলেও শিমাত চলতে পারছে না। ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই মানুষটার সাথে শিমাত কখনোই ভালো মন্দ দুটো কথা বলে নি। 

আকাশে বিশাল চাঁদ। আজ নিশ্চয়ই পূর্ণিমা। শিমাত পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর উপস্থিতি বুঝেও কথা বলে নি ইয়াজ। মেয়েটির মনে সংশয়। ইয়াজ কি তাকে প্রত্যাখ্যানের কথা বলবে? এমনটা হলেও সে অবাক হবে না। হাজারটা ভয় সংকোচের দেয়াল ভে ঙে দিয়ে ইয়াজ বলল,"ভালোবাসা একদিনে হয় না। এমন কথাও নেই ভালোবেসেই বিয়ে করতে হবে। বিয়ের পর ও ভালোবাসা হতে পারে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করে অনেকেই সুখী হয়, হয়েছে। আমি তোমায় মন থেকে মেনে নিয়েছি তাই আন ইজি ফিল কোরো না। তুমি আমার স্ত্রী শিমাত।"

মেয়েটির সমস্ত শরীর জুড়ে যেন সুখ বয়ে গেল। হাত কাঁপতে শুরু করেছে। ইয়াজ পুনরায় বলল,"হয়ত সময় লাগবে। তবে সম্পর্কটা আগাবে। দ্বিধা ছাড়াই আগাবে।"

শিমাত এবার ও কথা বলতে পারল না। ইয়াজ নিজ থেকেই বলল,"হাতটা দাও।"

শিমাত এবার হাত বাড়াল। ইয়াজ তা দু হাতে তুলে নিয়ে সময় নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল। এই অনুভূতি, ভালো লাগা শিমাতের জন্য নতুন। খুবই নতুন। সুখে ওর কান্না আসতে চাইছে। সত্যিই কি মানুষটা তাকে ভালোবাসবে?

সকালের মিষ্টি রোদ চোখে মুখে লাগতেই ঘুম ছুটে গেল শিমাতের। অনেক গুলো দিন পর ভালো ঘুম হয়েছে তার। সে চোখ খুলে দেখল অন্য একটা রুম। সে ভীত হয়ে উঠে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেয়েছিল সে। তারপর মনে হলো ইয়াজের সাথে বিয়ে হয়েছে তার। মানুষটি তাকে এই বেডে শোয়ার অধিকার ও দিয়েছে। সবটা মনে করে একটুখানি হাসল সে। হয়ত ওদের সম্পর্কটা সত্যিই আগাবে। ইয়াজ পাশে নেই। অথার্ৎ জিম করতে বের হয়েছে। শরীরচর্চায় ভীষণ মনোযোগ তার। ও বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এখান থেকে পুরো বাসাটার দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। একটু চারপাশে নজর বুলাতেই ইয়াজ কে দেখা গেল। ছেলেটা পুশ আপ করছে। উন্মুক্ত পিঠ। বাহু গুলো দেখা যাচ্ছে। শিমাতের ভেতর থেকে অনুভূতি এসে গেল। সে নজর সরিয়ে নিল। পুনরায় ভাবল, মানুষটা তার স্বামী। তাই আবার চাইল। দেখতে লাগল মন ভরে। মাত্র কিছু ঘন্টা। এই কিছু ঘন্টাই ওর হৃদয়ে ভালোবাসা জাগ্রত করল। অথচ দুদিন পূর্বেও এমন কোনো অনুভূতি ছিল না।

দরজা খুলতেই চমকে তাকাল শিমাত। ইয়াজ তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছে নিচ্ছে।

"সরি,তোমায় না ডেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলে?"

"না। ঠিক আছি।"

"আচ্ছা। আমি শাওয়ারে যাচ্ছি। এর পর তুমিও শাওয়ার করে নিও।"

শিমাত মাথা নাড়ায়। যদিও তাদের মাঝে এমন কোনো সম্পর্ক হয় নি যাতে করে শাওয়ার ফরজ হয়। তবু শাওয়ার নেওয়াটা জরুরি। ইয়াজ গোসল শেষ করলে শিমাত গোসলে গেল। মেয়েটি শুনেছিল ইয়াজ নাকি কারো সাথে কোনো কিছুই শেয়ার করে না। এটা তার অপছন্দ। অথচ ভাগ্য দেখো, মানুষটা আজ নিজ থেকেই সমস্তটা শেয়ার করে চলেছে। এক পর্যায়ে বেনারসির দিকে চোখ যায় ওর। শাড়িটির রঙ লাল নয়। এটি নীল রঙের শাড়ি। ইয়াজের পছন্দ নাকি নীল। শিমাত একটু ভেবে দেখল, ইয়াজ আর সে বিপরীত। অথচ মানুষটা কেমন মানিয়ে নিয়েছে। এই ভেবে একটু মন খারাপ হলো। ও ভাবল, ইয়াজের পছন্দের মতো করে নিজেকে গড়ে তুলবে। মাত্র কিছু সময়েই শিমাত নিজেকে ইয়াজের মনের মতো করে তোলার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠল। এ জীবনে প্রেম শব্দটি আগে কখনো আসে নি। তাই শিমাত চায়, নিজের সবটুকু ইয়াজের নামে উৎসর্গ করে দিতে।

ইয়াজের সিদ্ধান্তটা প্রথম দিকে কেউ মেনে নিতে চায় নি। তবে এক রোখা স্বভাবের জন্য নিষেধটাও বহাল রয় নি। ইয়াজ আপন মনে নাস্তা করছে। শিমাত নত হয়ে দাঁড়িয়ে। ইয়াজের মা রাজিয়া বললেন,"শিমাত, বসে যাও।"

"পরে খাচ্ছি।"

"এখনই বসো। পার্লারের মেয়েরা আসবে।"

শিমাতকে বসতে হলো। বিকেলে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরির মতো বানানো হলো। ইয়াজ, নিজের ঘরে কিছু ফাইলের জন্য এসেছিল। এসেই দেখল শিমাত বসে আছে। মেয়েটিকে এক নজর দেখে বলল,"সুন্দর লাগছে।"

ঐটুকুতেই শিমাত গলে গেল। ওর হৃদয়ে কম্পন হলো। মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি এসে গেছে। সন্ধ্যার পার্টিতে ইয়াজের দায়িত্বশীল আচরণ শিমাতকে আরো বেশি মুগ্ধ করল। এতদিন মনে হয়েছে ইয়াজ বুঝি মুডি চুজি মানুষ। অথচ এখন মনে হচ্ছে এই মানুষটির মতো ভালো মানুষ আর কোথাও নেই। কোথাও না।

 

Loading spinner

Reply
Posts: 8
Topic starter
(@fatima-tuz-nawshi)
Joined: 5 months ago
 
 (১০)
 
 

সময়ের স্রোতে শিমাত আর ইয়াজের সম্পর্কটা সহজ হয়ে গিয়েছে। ইয়াজের কাপড় গুলো গুছিয়ে রাখছিল শিমাত। ওমন সময় ঘরে এল ইয়াজ।

"একটা আউটফিট রেডি করো তো। জরুরি মিটিং পড়েছে।"

শিমাত চট করে একটা আউটফিট নামিয়ে দিল। ইয়াজ তৈরি হলো। যাওয়ার পূর্বে বলল,"বিকেলে এসে, ঘুরতে নিয়ে যাব। রেডি হয়ে থেকো।"

শিমাত মাথা নাড়াল। মেয়েটি এত কম কথা কেন বলে? ইয়াজ কাছে এল। অধিক লম্বা হওয়ায় নিচু হতে হলো তাকে।

"এত কম কথা কেন বলো? একটু স্বাভাবিক হও, কেমন?"

তারপরই মুচকি হাসল ইয়াজ। মানুষটা আজকাল খুব হাসে। অথচ এর আগে এতটা খুশি নজরে আসে নি। যাওয়ার পূর্বে শিমাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ইয়াজ। শিমাত খোলা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। ইয়াজ ও তাই। দুজনের দৃষ্টি কেমন মিশে গেল। ইয়াজ আবার হাসল। অথচ শিমাত লজ্জায় মিইয়ে যাচ্ছে। কি অদ্ভুত অনুভূতি!

বিয়ের পর ইয়াজ যেন শিমাতকে আগলে রাখতে শুরু করেছে। ভালোবাসা কতটুকু জন্মেছে সেটা শিমাত জানে না। তবে এই টুকু জানে, বুঝে মানুষটা ওকে ছাড়বে না। শিমাত লাল রঙের একটি শাড়ি নামিয়ে নিল। এটা ইয়াজ ই এনে দিয়েছিল। ছেলেটার নাকি নীল রঙ পছন্দ। অথচ একদিন হুট করেই এই লাল শাড়িটা এনে দিল। এই রহস্য শিমাত এখনো বুঝতে পারল না। সে হাল্কা সাজে নিজেকে সাজিয়ে নিল। ইয়াজ বাড়ি ফিরে এসে দেখল শিমাত তৈরি হয়ে গিয়েছে। ওদের বিয়ের প্রায় মাস খানেক হতে চলল। অথচ হানিমুনটা হয়ে উঠে নি। ইয়াজের হাতে মোটামুটি লম্বা এক ছুটি। হাতের ঘড়িটা খুলে নিয়ে শিমাতের কাছে এল। শিমাত কিন্তু নজর রাখতে পারল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে। ইয়াজ তার লম্বা শক্তপোক্ত হাতের সাহায্যে শিমাতের বাহু চেপে ধরে,কিছুটা কাছে টেনে নিল। এতে অদ্ভুত ভাবে কম্পিত হলো মেয়েটি। অথচ এমন না, আজ ই ইয়াজ এতটা কাছাকাছি এসেছে। বিয়ের সপ্তাহ খানেক যেতেই ইয়াজ তার সর্বোচ্চ ভালোবাসায় সিক্ত করেছে ওকে। অথচ ওর লজ্জায় নত হওয়া মুখটা দেখলে উল্টোটাই মনে হবে।

"সিলেট যাচ্ছি। পাহাড় ভালো লাগে তো?"

"হুম।"

"এ ছাড়া অন্য কোনো পছন্দ আছে?"

"উহু।"

শিমাতের কথায় মৃদু হাসল ইয়াজ। সে জানে মেয়েটি পাহাড় বেশি পছন্দ করে। অথচ ইয়াজের পছন্দ সমুদ্র। ওদের দুজনের মাঝে মিলের চেয়ে অমিলটাই বেশি। অথচ দুজন ই মানিয়ে নিয়েছে। ভালো লাগা ভালোবাসা কে পাশ কাটিয়ে গুরুত্ব দিয়েছে সম্পর্কটা। নিচে নামতেই ইয়াজের মা রাজিয়া ছেলে ও ছেলের বউ কে দোয়া পড়ে দিলেন। ওদের বিদায় জানাতে এসেছে সকলে। রেহান ওদের একটু দাঁড়াতে বলে উপরে উঠে গেল। নেমে এল ক্যামেরা হাতে। শিমাতের অধর জুড়ে হাসি।

"পছন্দ হয়েছে সুন্দরী?"

"খুব।"

"আচ্ছা। অনেক অনেক ছবি তুলবে কেমন?"

"হুম। থ্যাংক ইউ।"

রেহান মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ইয়াজ গাড়ি পার্কিং থেকে নিয়ে এসে সকলের থেকে বিদায় নিল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। এক পর্যায়ে ইয়াজ বলল,"ফটোগ্রাফির শখ রয়েছে তোমার?"

কিছুটা চমকে গেল শিমাত। মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাল। ইয়াজ না তাকিয়েই বলল,"মন কে সর্বদা গুরুত্ব দিবে। তোমার ভালো লাগাটা আমার কাছে সবচেয়ে দামি। তাই কিছু প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে জানাতে ভুলবে না।"

শিমাত নত হয়ে রইল। ইয়াজ বুঝে না মেয়েটি কেন তার সাথে সহজ হতে পারে না। ড্রাইভ করে এসেছে ওরা। তবে ফিরবে ফ্লাইটে। ইয়াজ ক্লান্ত। মাঝে লাঞ্চ করেছিল। তবে এখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। শিমাত এক বার ঘুমিয়েছিল। উঠে দেখল হোটেল রুমে। ইয়াজ কোলে করে এনেছে? লোকজন দেখেছে নিশ্চয়ই। এসব ভেবেই মেয়েটা লজ্জায় লাজুক হয়ে রইল। ইয়াজ শাওয়ার নিয়ে এসে দেখল শিমাত উঠে গেছে। ছেলেটার উন্মুক্ত বুকে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে। শিমাত চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওর এই অবস্থা দেখে ইয়াজ হাসল। কাছে এল এবার। দু হাত মুঠোয় নিয়ে বলল,"এমন করছো যেন এভাবে আগে কখনো দেখো নি।"

ইয়াজের এক একটা শব্দ তোলপাড় তুলে দিল শিমাতের হৃদয়ে। ইয়াজ নিজেও ক্লান্তি ঠেকাতে বধূকে খুব করে চাইছিল। সেই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যাটা শিমাত আর ইয়াজের জন্য মধু হয়ে এল।

শিমাত ঘুমিয়ে আছে। শরীরে ইয়াজের শার্ট। যা ঠেকেছে হাঁটু অবধি। ইয়াজ মৃদু হেসে মেয়েটির শরীরে কম্বল জড়িয়ে দিল। তৈরি হয়ে নেমে এল কিছু ফর্মালিটিস আর ডিনার অর্ডার করতে। ফিরে এসে দেখল শিমাত উঠে গেছে। মেয়েটি ইয়াজকে দেখে নিজেকে আবৃত করার চেষ্টা করছে। ওর অস্বস্তি দেখে ইয়াজ বারান্দায় চলে এল। অথচ মেয়েটি একটু আগেও ইয়াজের বুকে শুয়ে ছিল। বেশ কিছু সময় যেতেই ইয়াজ ডাকল।

"হয়েছে?"

"জি।"

ঘরে প্রবেশ করল ইয়াজ। শিমাত চুলে চিরুনি করছিল। আয়নায় তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। শিমাত লজ্জায় নুইয়ে পড়ল। ও বুঝে না এত লজ্জা কেন ওর। নিজের স্বামীর কাছে এত লজ্জা কেন পেতে হবে? 

কলিং বেজে উঠল। খাবার এসেছে। রিসিভ করে নিল ইয়াজ। শিমাত ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল খাবার সাজিয়ে নিয়েছে ইয়াজ। আজ ও শিমাতের পছন্দের সব কিছু। অথচ সে জেনেছিল এসব ইয়াজের ভালো লাগে না। ছেলেটা যখন নিজের পছন্দ এড়িয়ে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিল তখন শিমাতের দু চোখ বেয়ে নেমে এল নোনা জল। যা লক্ষ্য করল ইয়াজ।

"কি? কাঁদছো কেন?"

মেয়েটি পারল না উত্তর দিতে। সে নিজেও ভেবে পায় না সৃষ্টিকর্তা এতটা ভালোবাসা লিখে রেখেছিল তার ভাগ্যে। সে রাতে জেগে ছিল শিমাত। পুরো রাত জেগে শুধু ইয়াজকে দেখেছে। ছেলেটা তাকে শক্ত আলিঙ্গনে ঘুমায়। এটা কেমন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেদিন ইয়াজ থাকে না সেদিন একা লাগে শিমাতের। মনে হয় পৃথিবীটা থমকে গিয়েছে। শুধু চলমান সে। ভয় হয় বড়ো। শিমাত তার উষ্ণ ঠোঁট দিয়ে ইয়াজের কপালে চুম্বন করে। ছেলেটা ঘুমিয়েছে বিধায় এই অসাধ্য সাধন করতে পারল মেয়েটি। নতুবা কখনোই পারত না।

সিলেটের সময়টা শিমাতের জন্য সেরা ছিল। অনেক কিছু শিখেছে সে। ফটোগ্রাফি কি করে করতে হয় সবটা ধরে ধরে শিখিয়েছে ইয়াজ। আজ ওদের ফেরার পালা। ফ্লাইটে ফিরেছে বিধায় তেমন ক্লান্ত নয়। তবু জার্নিতে ধকল কিছুটা থেকেই যায়। বাসায় এসে চমক পেল ওরা। দেখল, বিনি আর বিলকিস ড্রয়িং রুমে বসে আছে। শিমাতকে দেখেই ছুটে এল বিনি। এসে জড়িয়ে ধরল।

"কেমন আছিস তুই? কত দিন পর দেখলাম তোকে। রেগে আছিস খুব? মাফ করে দে শিমাত।"

বিলকিস কান্নায় ভে ঙে পড়লেন। শিমাত সারাটা জীবন এই দুটি মানুষের ভালোবাসা কামনা করেছে। তাই হয়ত আবেগ লুকাতে পারল না। ইয়াজ এসবে খুশি হতে পারছে না। এই মা মেয়েকে ওর একদমই ভালো লাগছে না। তবে বের করে দেওয়ার মতো মন মানসিকতা ও ওদের নেই। যেহেতু দুদিন বাদেই রেহান আর রুহির বিয়ের অনুষ্ঠান তাই ওনাদের থাকতে বলা হলো। শিমাত কে খুব খুশি দেখাচ্ছে। ইয়াজ একটু হতাশার শ্বাস ফেলল। যদিও মন নানান কথা বলছে তবু সে চাইল শিমাতের এই খুশি দীর্ঘ স্থায়ী হোক।‍

ইয়াজ শাওয়ার নিয়ে এসে চুল মুছছিল। ওমন সময় ঘরে এল বিনি। অনুমতি না নিয়েই ঘরে প্রবেশ করেছে। শিমাত তখন কাপড় গুলো কাবাডে রাখছিল। বিনি এসেই জড়িয়ে ধরল।

"কি রে। তুই দেখি পুরোদস্তুর গিন্নি হয়ে গেছিস।"

"তেমন না।"

"দেখছিই তো। বর সামলাচ্ছিস, ঘর ও সামলাচ্ছিস।"

কথা পাল্টাটে শিমাত বলল,"লাঞ্চ করবি না? বেলা হয়েছে তো।"

"হুম করব। তাই তোকে নিতে এসেছি।"

"আচ্ছা। আমি আসছি।"

বিনি পুরোটা সময় ইয়াজের দিকে তাকিয়ে ছিল। উন্মুক্ত পিঠ, পেশি গুলো ফুলে উঠেছে। সুঠাম ফর্সা শরীর মন কে জাগিয়ে তুলে। বিনি একটু হেসে বলল,"ঠিক আছে। আয়,আমি যাচ্ছি।"

বিনি চলে গেল। শিমাত নিজেও অস্বস্তি বোধ করছিল। ইয়াজ ওর দিকে ফিরে বলল,"শিমাত, একটা কথা মনে রাখবে। যে যতই আপন হোক না কেন তাকে শতভাগ বিশ্বাস করবে না। চারপাশে অনেক কিছু থাকবে, আছে যা তুমি জানবেও না। তাই সব সময় সচেতন থাকবে।"

এ কথা বলেই শিমাতের কপালে ঠোঁট ঠেকাল ইয়াজ। মেয়েটির যে কি হলো। আজ নিজ থেকেই জড়িয়ে ধরল। বুকে মাথা ঠেকিয়ে শুনতে লাগল প্রিয় স্বামীর হৃদস্পন্দন।
 

Loading spinner

Reply
Posts: 8
Topic starter
(@fatima-tuz-nawshi)
Joined: 5 months ago

 (১১) এলার্ট ⛔

 

হলুদের অনুষ্ঠান। মেয়েদের জন্য অনেক গুলো শাড়ি আনা হয়েছে। তবে ইয়াজ শিমাতের জন্য আলাদা করে এনেছে। এই শাড়িটা খুব স্পেশাল করে বানানো। শিমাত সেটা পরতেই নিচ্ছিল ওমন সময় এল বিনি। তার মন খারাপ।
"কী হয়েছে?"

"না,কিছু না।"

"বল।"

"শাড়ি গুলো আমার পছন্দ হয় নি। সবাই এক রকম পরবে।"

"তাতে কি? এটা তো ভালো।"

"কোথায় ভালো? ভালো হলে তুই কি আলাদা পরতি?"

শিমাত বুঝল না সে কি বলবে। বিনি মন খারাপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর দেখতে লাগল শিমাতের শাড়িটা।

"এটা তো খুব সুন্দর।"

আঁচল টেনে নিয়ে শরীরের উপর দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে বলল,"দেখ, কি মানিয়েছে আমায়।"

শিমাত পুরো সময় চুপ। সে কিছু বলতে চাইছে না। এবার বিনি বায়না ধরল।
"দে না তোর এই শাড়িটা।"

"বিনি, অন্য শাড়ি আনিয়ে দিচ্ছি।"

"অন্য শাড়ি কেন? এটা দিলে কি হবে?"

"এটা,ওনি দিয়েছেন।"

বিনি কোনো কথা ছাড়াই শাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। শিমাত ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল। ও কিছু বলবে যে তার ও উপায় নেই।

হলুদের অনুষ্ঠানে শিমাতের শরীরে অন্য শাড়ি দেখে যা বোঝার বুঝে নিল ইয়াজ। তবে সে চুপ রইল। ইয়াজ সুন্দর পাঞ্জাবি পরেছে। তাকে দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। বিনি এসে দেখল শিমাতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াজ। এই পুরুষটির প্রতি নজর লেগেছে ওর। কিছু তেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। ইয়াজ তখন শিমাতের বাহু জড়িয়ে ধরে কিছু বলছিল ওমন সময় বিনি ডেকে উঠল।

"এই শিমাত, একটু শোন তো।"

অসহায় নজরে তাকাল শিমাত। ইশারায় যেতে বলল ইয়াজ। তার ভালো লাগছে না। বিনি মেয়েটি সুবিধার নয়। শিমাত অনেকক্ষণ ধরে গিয়েছে। ইয়াজ অন্য কাজে ব্যস্ত হলো। হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। জনে জনে মানুষ উপস্থিত হয়েছে। রুহি আর রেহান কে হলুদ লাগানো হচ্ছে। ইয়াজ ভীড় পছন্দ করে না। তাই সে আড়ালে ছিল। ঠিক সে সময় একটি হাত ওর গালে স্পর্শ করল। পেছনে চেয়ে দেখল বিনি। খিলখিল করে হাসছে।

"বাহ, আপনাকে তো হলুদ লাগানোর পর অনেক সুন্দর লাগছে।"

ইয়াজ রাগান্বিত বোধ করলেও মুখে সেটা প্রকাশ করল না।

"আগে লাগত না। ইদানীং শিমাতের ছোঁয়া পেয়ে সুন্দর হয়ে যাচ্ছি।"

কালো মেঘ ভর করল বিনির হৃদয়ে তবে সে হেসে উড়িয়ে দিল। শিমাত একটু দূরে দাঁড়িয়ে। বিনির হাতে হলুদের বাটি। সেটা থেকে একটু হলুদ নিল ইয়াজ। বিনি খুশি হলো। এমনটাই চাচ্ছিল সে। সে ভেবেছিল ইয়াজ তাকে হলুদ লাগিয়ে দিবে। তবে তেমনটা হলো না। ছেলেটা এগিয়ে গেল শিমাতের দিকে। শিমাত শাড়ি ঠিক করছিল। হুট করেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল ইয়াজ। তারপর শক্ত হাতটা ঠেকিয়ে দিল রমণীর তুলতুলে পেটে। ইয়াজের ছোঁয়ায় পাগল হবার মতন অবস্থা হলো। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে,আরো কাছে নিয়ে নিল ইয়াজ। তার হাতে থাকা হলুদ লেপ্টে যাচ্ছে মেয়েটির উদরে। পুরো দৃশ্যটা ঘটল বিনির চোখের সামনে। রাগে দুঃখে তার চোখে পানি চলে এল। এর শাস্তি নিশ্চয়ই পেতে হবে শিমাতকে।

পরের দুটো দিন ভালোই যাচ্ছিল। বিনি ইয়াজের মুখোমুখি হয় নি কিংবা ইয়াজ সে সুযোগ দেয় নি। রিসিপশনের অনুষ্ঠান শেষে প্রায় সকলেই বাইরে আড্ডা দিচ্ছিল। ইয়াজের শরীর কিছুটা ক্লান্ত। সেই সাথে লোকজনের ভীড় তার পছন্দ নয়। সেই জন্যে নিজের ঘরে এসেছিল। মাথাটা হুট করেই কেমন ঘুরাচ্ছে। শাওয়ার নেওয়া প্রয়োজন। বাথরুমে প্রবেশ করে চোখে মুখে পানি দিতেই দরজার পাশ থেকে শব্দ হলো। সে পেছন দিকে তাকাল। দেখল বিনি দাঁড়িয়ে। ইয়াজ চোখ মুখ শক্ত করে ফেলল।

"তোমার সমস্যা কি? এখানে কেন এসেছ?"

বিনি কথা বলল না। সে কাছে এগিয়ে এল। ইয়াজের মাথা তখন ও ঘুরাচ্ছে। চোখ মুখ কেমন হয়ে আসছে।

"বিনি, আই ওয়ার্নিং ইউ। তুমি কিন্তু ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছ।"

বিনি এবার হাসল। তার হাসিতে রহস্য।
"তোমাকে পেলে আমি সব করতেও রাজি জান। জাস্ট একবার। একবার ভালোবাসো আমায়। আমি কথা দিচ্ছি, আমি কাউকে বলব না। ট্রাস্ট মি।"

শরীর ঠিক থাকলে এতক্ষণে বিনির গালে চ ড় পড়ত। তবে ইয়াজ নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না। তার মাথা ঘুরাচ্ছে। চোখ ঘোলাটে দেখাচ্ছে। বিনি ঝরণা ছেড়ে দিল। এতে ইয়াজ আর সে দুজনেই ভিজে গেল। পাতলা শাড়ি ভেদ করে ফুটে উঠল বিনির শরীর। ইয়াজ চোখ বন্ধ করে নিল। তবে বিনি থামার নয়। ইয়াজকে তার চাই। যে কোনো মূল্যে চাই। সেই জন্যেই তো খাবারে বিশেষ দু ধরনের মেডিসিন মিশিয়েছে। এতে করে ইয়াজ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। শারীরিক উত্তেজনা বাড়বে। বিনি চট করেই তার শাড়ি খুলে ফেলল। ইয়াজের মনে হচ্ছে মেয়েটিকে খু ন করে ফেলতে পারলে শান্তি মিলত। তবে এই মুহূর্তে ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছে না সে। বিনি আরো কাছে এগিয়ে এল। ইয়াজের হাত দুটো চেপে ধরল উদরে। ইয়াজ ঝটকা মে রে সরিয়ে নিল।
"জান, একবার ভালোবেসে দেখো। একবার ভালোবাসা দাও। আমি শিমাতের মতো গাঁধা নই। আমি অনেক ম্যাচিউর। ট্রাস্ট মি শিমাতকে ভুলে যাবে।"

ইয়াজ শান্ত হয়ে দাঁড়াল। এভাবে সে পারবে না। মেয়েটি তাকে কাবু করে ফেলেছে। ইয়াজ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। বার বার বিনিকে সরিয়ে দিচ্ছে। তবে বিনি থামছে না। সে ইয়াজ কে নিয়ে বাথটবে চলে এসেছে। ইয়াজের বুকের উপর শুয়ে পড়েছে। এবার ইয়াজ তাকে দু হাতে ধাক্কা দিল। মেয়েটি ছিটকে পড়ে আবার সামলে নিল। নিজেকে পুরোপুরি অনাবৃত করতে যাবে ওমন সময় দরজা খোলার শব্দ হলো। দরজায় দাঁড়িয়ে শিমাত। বিনি চট করে প্ল্যান সাজাল। উঠে এসে জড়িয়ে ধরল শিমাতকে। কান্নায় ভে ঙে পড়ল।

"শিমাত, বাঁচা আমায়। বাঁচা বোন। ওনি,ওনি আমার সর্বনাশ করতে যাচ্ছিল। বাঁচা বোন।"

শিমাত শান্ত স্থির। ইয়াজ নিজেকে কোনো মতে উঠিয়ে নিল। সে দু চোখে তেমন কিছুই দেখতে পারছে না। বিনি তোয়ালে নিয়ে নিজে আড়াল করল। এমন ভাব করছে যেন ইয়াজ তার এই হাল করেছে। শিমাতের দু চোখে রাগ  ঝরছে। সে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। নিজের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে বিনির গালে আ ঘা ত করল। বিনি ছিটকে পড়ল মেঝেতে।

"তুই আমায় মা রলি? আমায় মা রলি তুই। তোর বর আমার সাথে নষ্টামি করতে চাইল আর আমার মা রলি তুই।"

"বের হ,বের হ বিনি। আমাকে বাধ্য করিস না তোর জানটা বের করে নিতে।"

বিনি বুঝল শিমাতকে বলে লাভ নেই। সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। ইয়াজ কোনো মতে উঠে এসেছে। শিমাত তাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরল। ইয়াজ নিজের হয়ে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা চালাল না। কারণ ও জানে,শিমাত তাকে ভুল বুঝে নি। আর না কখনো বুঝবে।

শেষ রাতে ইয়াজের নেশাটা কেটে গেল। তার শরীরে শারীরিক উত্তেজনার ঔষধ পড়েছে বিধায় সে কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হলো। শিমাত ও নিজেকে মেলে ধরেছে। মানুষটাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়েছে। ঘুম ভে ঙে দেখল শিমাত চেয়ে আছে। ইয়াজ একটা শ্বাস ফেলে বলল,"আমাকে ভুল না বোঝার জন্য থ্যাংকস শিমাত।"

শিমাত একটু হেসে বলল,"আপনার কোনো দোষ নেই। দোষ আমার। আমি অপাত্রে কন্যা দান করেছি। ভুলে গিয়েছিলাম এত বছর ধরে যারা আমায় একটু ভালোবাসা দেয় নি। তারা কেন হুট করেই ভালোবাসা দিবে।"

ইয়াজ কিছু বলল না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল বধূকে। তারপর গলার কাছটায় মুখ  ঠেকিয়ে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিল। শিমাত ও জড়িয়ে ধরল ওভাবে। এই যে মানুষটা। যে তাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসায় আগলে রাখে, তাকে ভুল বোঝার সাধ্য শিমাতের কি আছে?
 

Loading spinner

Reply
Posts: 8
Topic starter
(@fatima-tuz-nawshi)
Joined: 5 months ago

(১২)

 

রিসিপশনের পরের দুদিন বাড়িতে মেহমান ছিল। আজ সবাই চলে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তার টেবিলে বসল সবাই। শিমাত ধীরে স্বস্তে খাবার বাড়ছে। ইয়াজ তাকে টেনে বসিয়ে দিল।
"খাও।"

"পরে।"

"না এখনি।"

ছেলেটার জোরাজুরিতে খেতে হলো শিমাতকে। টেবিলের এক পাশে বিলকিস আর বিনি। পরিবেশ শান্ত। কিছুটা ভয় কমেছে বিনির। ও ভেবেছিল, সম্মানের কথা চিন্তা করে ইয়াজ আর শিমাত বুঝি চুপ করে যাবে। তবে ওর ধারনা ভুল। সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিল ওরা। শিমাত খাবার খাওয়া শেষে উপরে উঠে গেল। সেদিকে তাকিয়ে রইল বিনি। তারপর আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিল। খানিক বাদে শিমাতকে দেখা গেল। হাতে লাগেজ। সকলের দৃষ্টিতে বিস্ময়। ইয়াজ নিজেও অবাক হয়েছে। সে শিমাতের কথা ভেবে চুপ করে গিয়েছিল। তবে শিমাত যে ছেড়ে দিবে না এটা বুঝতে পারছিল না।

"আম্মা,গাড়ি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের রেলস্টেশনে পৌছে দেওয়া হবে।"

বিলকিস কিছুটা অপমান বোধ করলেন। উঠে দাঁড়ালেন। সকলেও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে।

"তুই আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছিস শিমাত?"

"হ্যাঁ।"
 
সহজ সরল উত্তর। এবার বিনি জ্বলে উঠল।

"বড়োলোক বাড়ির বউ হয়ে আমাদের ভুলে গেলি শিমাত। আমার মা তোকে কম যত্ন করেছে?"

এবার শিমাতের হাসি পেল। এরা কখনো যত্ন করেছে ওর? তবে ও চুপ রইল। পাশ থেকে কেউ কিছু বলছে না। তারা ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে।

"তুই ঠিক করছিস না শিমাত। এত স্বার্থপর!"

"হুম স্বার্থপর। তবে তোর মতো নষ্ট না।"

"মুখ সামলে কথা বল শিমাত। তুই ভুলে যাস না আমি কে।"

"তুই, তুই কে? তুই কেউ না। তুই হলি সেই মেয়ে যার ইজ্জতের মূল্য নেই। সোজাসুজি বললে প তি তা।"

এবার বিলকিস চটে গেলেন। উঠে এসে শিমাতকে থা প্প ড় দিতে চড়াও হলেন। তবে পারলেন না। ইয়াজ আটকে দিল।

"আপনার সাহস কি করে হয়,আমার স্ত্রীর গায়ে আ ঘা ত করতে যাওয়ার?"

বিলকিস রক্তিম চোখে তাকালেন। শিমাত ইয়াজের হাত আগলে দাঁড়াল।
"এদের বের করে দিন। আমি মুখ দর্শন করতে চাই না। আর ঐ নষ্টা মেয়ে যেন আমার দু চোখের সীমানায় না আসে। নষ্টা কোথাকার। তুই কি ভেবেছিস, তোর ঐ নষ্ট শরীর দেখিয়ে আমার স্বামীকে কাবু করতে পারবি।"

বোম ফাঁটিয়ে দিল শিমাত। বিনি নিজের হয়ে কথা বলতে পারল না। অপমানে গা জ্বলে যাচ্ছে বিলকিসের। তিনি তৎক্ষণাৎ মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। শিমাত কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ল। ওকে আগলে নিল ইয়াজ। একদম বুকের সাথে মিলিয়ে বলল,"এভাবে ভে ঙে যেও না প্লিজ।"

"ওরা এমন কেন? এমন কেন ওরা? আমাকে কেন ভালোবাসল না।"

ইয়াজ লম্বা করে দম নিল। শিমাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,"ওরা ভালোবাসে নি তো কি হয়েছে। আমি ভালোবাসি তো। এই যে সবাই, সবাই তো ভালোবাসে তোমায়।"

শিমাত চুপ করে রইল। ইয়াজ ও তাই। মেয়েটিকে তার বাহুডোরে আগলে রইল। যেন ছোট্ট কোনো পাখির ছানা। 

২বছর পর
হাতে বেশ কিছু সময় পাওয়া গিয়েছে। রেহান, রুহি, শিমাত, ইয়াজ ঠিক করল কোথাও একটা ট্যুর দিবে। সেই অনুযায়ী সমস্তটা প্ল্যান ও করেছিল তবে মাঝে বাঁধা হলেন ইয়াজের বাবা ইলিয়াস মাহমুদ। তার মতে বহুদিন হলো গ্রামের বাড়ি যান না। ছেলে মেয়েরা এভাবে নিজ স্থানে না যাওয়া আসা করলে পরবর্তীতে নিজের শিকড় ই চিনবে না। তাই সকলে মিলে গ্রামে ঘুরতে যাবে। পরদিন ই ব্যাগ গুছিয়ে বের হলো সবাই। ইয়াজের পাশে বসে শিমাত। সে চারপাশের মুগ্ধতা অনুভব করছে। ইয়াজের দাদা বাড়ি রাজশাহীতে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পথ ঘাট বড়ো সুন্দর লাগছে। শিমাত চেয়েই রইল। ওরা যখন পৌছাল তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়েছে। জোনাক পোঁকা খেলা করছে। কি যে সুন্দর লাগছে। শিমাত ধরার চেষ্টা করল তবে পারল না। তাই মন খারাপ করে ফেলল। সেটা দেখে ইয়াজ তার বড়ো হাতটায় কিছু জোনাকি পোঁকা আটকে নিল। শিমাত আগ্রহ ভরে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে হাত খুলতেই জোনাকি পোঁকা বেরিয়ে এল। এ যে কি সুন্দর দৃশ্য। ওরা এমন মজা করতে করতে বেশ লেট হয়ে গেল। তখন প্রায় আটটা বাজতে চলেছে। শুনশান পরিবেশ। চারপাশ স্তব্ধ। ইয়াজ দু হাতে আগলে নিল নিজ বধূকে।

"ভয় লাগছে?"

ফিক করে হেসে ফেলল শিমাত। তারপর ইয়াজের বাহু আগলে ধরে বলল,"উহু। আপনি ভুলে গেলেন, আমি গ্রামের মেয়ে?"

ইয়াজ হাসল। বধূকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই চারপাশ থেকে মানুষের ভীড় লেগে গেল। মাহমুদ বাড়ির বড়ো ছেলে ইয়াজ। তাই তার যত্ন একটু বেশি। তার বউ এর ক্ষেত্রেও তেমনই। সকলে খাওয়া দাওয়া করে গল্প করতে শুরু করেছে। শিমাত ও তাদের একজন। এদিকে ইয়াজ ক্লান্ত। লং ড্রাইভ করায় শরীরে চাপ পড়েছে। তার রুম তৈরি। তবে সমস্যা সেটা না। সমস্যা হচ্ছে শিমাত। সে শিমাতকে ছাড়া ঘুমাতে যাবে না। এদিকে শিমাত এত মানুষের থেকে উঠতে পারছে না। তার নাকি লজ্জা লাগছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেই উপস্থিত হলো ইয়াজ। মেয়েলি আড্ডার মাঝ খানে দাঁড়াল পুরুষটি। কোনো ভালো মন্দ না বলেই বউ কে কোলে তুলে নিল। তারপর বলল,"আমার বউ কে আমি নিয়ে যাচ্ছি।"

এই নিয়ে একচোট হাসা হাসি শুরু হলো। শিমাত লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। রুমে এসে অভিযোগের শেষ নেই। সেসব তোয়াক্কা করল না ইয়াজ। বধূকে নিয়ে বসাল খাটে। সোজাসুজি জড়িয়ে ধরল। একদম মিশিয়ে নিল বাহুডোরে। শিমাত থেমে রইল। শুধু ইয়াজ ই নয়, শিমাত নিজেও এই মানুষটির আলিঙ্গন ছাড়া ঘুমাতে পারে না। মনে হয় কি যেন নেই। 

রুহি আর রেহান নদীর ধারে এসেছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা নদীতে নেমেছে। কি যে ভালো লাগছে। শিমাতের ঘুম থেকে উঠতে লেট হয়েছে। আসলে ইয়াজ ই উঠতে দেয় নি। ছেলেটা খুব বেশি সময় পায় না। তাই এ ধরনের ছুটিতে একটু বেশি ঘুমায়। শিমাত নদীর ধারে এসে লোভে পড়ল। তার গোসল করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তবে সে বউ মানুষ। এভাবে নামতে পারবে না। তাই উপর থেকেই দেখতে লাগল। খানিক বাদে ইয়াজ কে দেখা গেল। হাতে লাইফ জ্যাকেট। রুহির জন্য আনা হয়েছে। মেয়েটা সাঁতার পারে না। সবটা দ্রুত ঘটল। ওকে টেনে নামিয়ে নিল ইয়াজ। ঠান্ডা শীতল জলে পুরো শরীরে ভালো লাগা ছেয়ে গেল। ইয়াজ আর শিমাত সমান তালে সাঁতার কাটছে। মাঝ নদীতে এসে মেয়েটির কোমর জড়িয়ে ধরল ইয়াজ। শিমাত চিৎকার করে উঠল। সে ভয় পেয়েছিল।

"আরে,আপনি। ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।"

"আমি জানতাম তুমি ভীতু।"

"মোটেও না।"

"মোটেও হ্যাঁ।"

"না।"

"হ্যাঁ।"

শিমাত এবার হাতের মাঝে পানি নিয়ে ইয়াজের চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল। ইয়াজ ও দুষ্টুমিতে কম না। মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে একসাথে ডুব দিল। ডুব শেষে শিমাত হেসে ফেলল। ইয়াজ ও তাই। ওর ঘোর কাটতে না কাটতে ভেজা ঠোঁটে স্পর্শ করল ইয়াজ। শিমাত লজ্জায় শেষ। চারপাশে কত মানুষ জন। যদি কেউ দেখে নিত?

রাজশাহীতে ভীষণ ভালো সময় গিয়েছে শিমাতের। তবে বাড়ি ফিরতেই মনে হলো সে অসুস্থ। সেদিন সন্ধ্যায় অসুস্থতা আরো বেড়ে গেল। ইয়াজ অফিস থেকে ফিরে এসে দেখল শিমাত নেতিয়ে পড়েছে। সে ডাক্তার ডাকল। চেকাপ করা হলো। ইয়াজের ভয় হচ্ছিল খুব। তবে ওর ভয় কাটিয়ে ডাক্তার জানাল আহামরি কিছু নয়। শরীর কিছুটা দুর্বল। সম্ভবত জার্নির জন্যেই এমনটা হয়েছে। যত্ন নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। ইয়াজ যেন দম ফিরে পেল। শিমাত তার জীবনে আসার পূর্বে ঘর সংসার নিয়ে সে কখনো ভাবে নি। ব্যক্তিগত জীবনকে সাজানোর কথা মাথায় আসে নি। সারাক্ষণ বিজনেস নিয়ে পড়ে ছিল। অথচ এখন মনে হয় এই মেয়েটি ছাড়া সে একেবারেই শূন্য। সেদিন খুব রাত। শিমাতের বড়ো মুড সুয়িং হলো। ওর ইচ্ছে হলো বারান্দায় বসে চাঁদ দেখবে। ইয়াজ ক্লান্ত ছিল। তবে ওর মুখে কোনো বিরক্তি রইল না। ও শিমাতকে নিয়ে বারান্দায় এল। পাশাপাশি বসল। মেয়েটি মাথা ঠেকাল ওর বাহুতে। ও আগলে ধরল। তারপর দেখতে লাগল রূপালি রঙা বিশাল চাঁদটাকে। ইয়াজের ভেতরটা শীতল হলো। ও তাকাল বধূর পানে। এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল অধর জুড়ে। এই মেয়েটির জীবনে এক বিন্দু ভালোবাসা হয়ে ধরা দিয়েছে ইয়াজ। শেষ হয়েছে অপেক্ষার প্রতিটা প্রহর। এখন শুধু ভালোবাসার পালা।

                                     ~সমাপ্ত~
 

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner