গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 1 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই 

আজ থেকে এইখানে বাকি সব গুলো পর্ব পোস্ট করা হবে,

আগের সব গুলো পর্ব যাদের পড়া হয় নি তাদের জন্য এইখানে লিংক দেওয়া হয়ে পড়তে ক্লিক করুন।

 

গল্পের লিংক

 

Loading spinner

Reply
30 Replies
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
আগের পর্ব গুলো পড়তে বাকি থাকলে উপরে লিংক দেওয়া হয়েছে।
পর্বসংখ্যা:২১
 
 
কায়রাকে বিদায় জানিয়ে চাচা-ভাতিজা দু’জন হেলেদুলে হাঁটছিলো ক্যাপসুল মার্কেটের পাশ ঘেঁষে। রাত বাজে তখন সাড়ে আট'টা। দোকানের সাইনবোর্ডে রঙিন বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। মুলত রাত হলেই টাংগাইল শহরটাতে ঘুরে আলাদাই আমোদ পাওয়া যায়। কত মানুষজন বেরিয়েছে এই রাতে! কেও প্রয়োজনে, তো কেও অকারনে। ভিড়ের ভেতরে তারা দু’জন আলাদাই এক জগতে রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে কাবির খেয়াল করলো কায়ান হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে। বাচ্চাটার ছোট্ট দুটো চোখ পিটপিট করছে, পাপড়িতে ঘুমের ভার ভার ভাব। তা দেখে কাবির জিজ্ঞেস করলো,
"কিরে মুরগির বাচ্চা, ঝিম মাইরা গেলি ক্যান? নড়ন-চড়ন অফ কইরা দিলি যে!"
 
কায়ান কাবিরের গলা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা শক্তপোক্ত কাঁধে নামিয়ে আধো বোজা চোখে ধীর স্বরে বলল,
"ঘুমু আসচে, চাচু। মা...যাবো।"
 
কাবিরের ভ্রু কুঁচকে গেলো সামান্য। এই তো একটু আগে কী হাসিখুশি ছিলো! এত তারাতাড়ি মুড শেষ? তাই কাবির খ্যাটখ্যাটে গলায় বলল,
"চুপ কর! এখনি কিসের ঘুম! বাসায় যাইয়া তো সেই মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকবি। এখন বাইরে আইছস তাই আপাতত চাচ্চুর লগে ইঞ্জয় কর!"
 
কায়ান তার চাচ্চুর কথার মানে কতটা বুঝলো কে জানে, তবে ফোকলা দাঁতের এক চওড়া হাসি দিয়ে সব জবাব সেরে দিলো। কাবিরের খ্যাটখ্যাটে গলায় কায়ানের ঘুম এমনিতেই উধাও! এদিকে কাবির ভাবলো, কায়ানের মনটা অন্যদিকে নিতে হবে। মায়ের দিক থেকে ধ্যান ছুটিয়ে ভোলাতে হবে বাচ্চাটাকে। তাই একটু এগিয়ে একটা কনফেকশনারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
" কি নিবি? চিপস-টিপস কিনবি? কিনলে কিন!"
 
চিপস দেখতে পেয়ে কায়ানের চোখ মুহুর্তেই চকচক করে উঠলো। তড়াক বেগে কাবিরের কাঁধ থেকে মাথা তুলে দোকানের সব জিনিস দেখতে লাগলো সে। কিসের ঘুম, কিসের বাড়ি! এখন এনার্জি ফিরে এসেছে। ছোট ছোট দু'হাত বাড়িয়ে তাক থেকে একটা বড় সাইজের কুড়কুড়ে চিপসের প্যাকেট নামিয়ে ধরলো। যার দাম পঞ্চাশ টাকা। তা দেখে কাবির মুখ কুচকে বলল,
"ব্যাটাশা'লা! ধরলি তো ধরলি, পঞ্চাশ টাকার'টাই ধরলি? দশ টাকারগুলা চোখে পড়ে না?"
 
কায়ান মুখে হাত চেপে খিলখিলিয়ে হাসলো। যেন সে বুঝে শুনেই সবচেয়ে দামি চিপসটা বেছে নিয়েছে। তারপর বলল,
" জুসও কাবো! জুস কিনে ডাও। মেনগো জুস!"
 
কাবির ঠিক রসিকতা নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে কায়ানের হাতে চিমটি কাটলো, তা বোঝা গেলো না। খুব বেশি জোরেও না, আবার আস্তেও না। তবে কায়ান সেই চিমটির তোপে নিজের হাত চেপে ধরে সেই স্থান ডলতে ডলতে মৃদু আর্তনাদ করে বলল,
"উফ! মারচো কেন? ব্যাতা পাই!"
 
কাবির শয়তানি হাসি হাসলো এবার। চিমটি কেটে শান্তি পেয়েছে সে। এরপর যদিও হার মেনে জুস কিনে নিয়ে কায়ানের হাতে ধরিয়ে দেয়। তারপর বলল,
"কই মারলাম? এইডারে মারা কয়? চিমটাইছি ক! আমার বেশি টাকা খরচ করার পানিশমেন্ট দিলাম তরে।"
 
কায়ান এই শুনে গোলগোল চোখে তাকিয়ে রইলো। কি বুঝে যেন হঠাৎ করে কাবিরের কাঁধে বেশ শক্ত করেই কামড় দিলো। কাবির নিজেও এমন বিচি বিচি দাঁতের কামড়ে চেঁচিয়ে উঠে কায়ানকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
"ইয়া আল্লাহ! মাইরা লাইছে রে! আ'হ্!"
 
কাবির মৃদু চিৎকার করে উঠলো এভাবে। কাবিরকে এভাবে দেখে কায়ান খিলখিলানো হাসিতে ফেটে পড়লো। সেই হাসিতে শিশিরের মতো স্বচ্ছ দুষ্টুমি। কাবিরও রাগ ধরে রাখতে পারলো না। আঙুল দিয়ে তার সামনের দুই দাঁতে টোকা দিলো। কায়ান সেসবে পাত্তা না দিয়ে চিপসের প্যাকেট খুলতে চেষ্টা করছিলো। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে কাবিরের দিকে প্যাকেট'টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
" কুলে ডাও। পারচি না আমি। "
 
কাবির মুখ ঘুরিয়ে রইলো সেভাবে। কথা বলল না একটাও। ভান করেছে এমন যেন অভিমান হয়েছে। তা দেখে কায়ান ভাবলো কাবির রাগ করেছে বোধহয়। তাই শিশুসুলভ ভঙ্গিতে মাথাটা একটু চুলকিয়ে কাবিরের গালে চু'মু খেয়ে বলল,
"সলিইই… আল কামলাবো না। একন কুলে ডাও।"
 
এই সরল স্বীকারোক্তিতে আর চু'মু খেয়ে কাবিরের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠলো। তাই প্যাকেটও ছিঁড়ে দিলো। তবে নিজের ভাগ নিতে ভুললো না। এক খাবলায় বেশ কয়েকটা চিপস মুখে পুরে ফেললো কাবির। মুখ ভর্তি চিপস নিয়ে দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে একটা ফুটকার্টের পাশে চায়ের দোকানের সামনে এসে থামলো। কাঠের পাতা বেঞ্চে বসিয়ে দিলো কায়ানকে। পাশে বসলো কাবির নিজেও। কায়ান তো চিপস আর জুস খেতে ব্যস্ত। 
 
চায়ের দোকানের চারপাশে চায়ের কাপের ধোঁয়া উঠছে। পাউরুটিতে মালাই লাগিয়ে সেগুলো পোড়ানো হচ্ছে। উফ, কি সুন্দর সেই ঘ্রান! ম-ম করছে চারদিক সেই ঘ্রানে। সুগন্ধে মুখরিত চারপাশ। 
 
কাবির বসে থেকেই দু’হাত উঁচিয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। শরীর'টা টান টান করলো মোচড়ামুচড়ি করে। পাশে বসা কায়ান চিপস খেতে খেতে হেলান দিলো চাচার গায়ের সাথে লেপ্টে। চোখে এখন ঘুমের ছায়া নেই। বরং চোখমুখ উজ্জ্বল করছে প্রাপ্ত খুশিতে।
 
শহরের কোলাহলের মাঝেও সেই মুহূর্তে তারা ছিলো একটুখানি নিরিবিলি দ্বীপপুঞ্জের মতো। অকস্মাৎ, সামনের রাস্তার দিকে তাকাতেই কাবিরের সামনে এক পরিচিত নারী মূর্তি ভেসে উঠলো। প্রীতিষা যাচ্ছিলো কোথাও। কিন্তু তা না ভেবে সেভাবে বসে থেকেই কাবির ডাক দিলো ওকে,
“ওই....প্রীতি!”
 
প্রীতিষা পরিচিত পুরুষালী গলার স্বর শুনে চমকে পাশ ফিরে ঘুরে তাকালো। মুহূর্তেই তার মুখে এক হালকা ছলছল হাসি ফুটলো পুরোনো সব তারাহুরোর ভার কমে গিয়ে। আর দেরি না করে কাবিরের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“ওহ, তুমি! কেমন আছো?”
 
কাবির ধীর স্বরে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ। তোমার কি অবস্থা কও? কালকে তো ফোন দিলা না!”
 
প্রীতিষা নরম গলায় বলল,
"আমার তো সেমিস্টার চলছে, জানোই। ভেবেছিলাম রাতে পড়া শেষ করে কল করবো তোমায়। কিন্তু ওভাবেই পড়তে পড়তে চোখটা যে কখন লেগে গেলো বুঝতেই পারিনি। এমনকি বইটাও বন্ধ করিনি। তাই সকালে উঠে তোমাকে আগে মেসেজ করেছিলাম। দেখোনি?"
 
কাবির মাথা নাড়ায়। মনে পড়ে, আজ সকালে দেওয়া প্রীতিষার মেসেজের কথা। তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছিলো কাবির। ফোনে টুং করে শব্দ হওয়ায় যখন ফোন হাতে নিতে প্রীতিষার মেসেজ চোখে পরে, তখন অটোমেটিক কাবিরের সদ্য ঘুম থেকে উঠা কুচকানো মুখটা হাসোজ্জ্যল হয়ে যায়। এর মানে ও নিজেও সায় দিচ্ছে, নিজের এই ছোট ছোট অনুভুতিগুলোকে। ভাবনা ঝেড়ে কাবির সামনের বেঞ্চে বসতে ইশারা করলো প্রীতিষাকে। এরপর গম্ভীরভাবে বলল,
"দেখছি। আগে বসো এইজাগা। রাতে বের হইছো ক্যান? কইছি না সন্ধ্যার পর বের হবানা!"
 
প্রীতিষা বসলো কাবিরের সামনের বেঞ্চে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে হালকা হেসে বলল,
“আসলে দরকারেই বেরিয়েছিলাম। ভাইয়া নেই বাসায়, তাই রাতে রান্না করার ইচ্ছে হয়নি। ভাবলাম বাইরে থেকে পিজ্জা নিয়ে আসি। বাচ্চারাও তাই বলল। তাই আর কি…”
 
ততক্ষণে কাবিরের চা এসে গেছে। তাতে চুমুক দিয়ে কাবির বলল,
“বুজলাম। একটা কথা কও তো, এতো যে কৈফিয়ত দিতাছো আমারে বিরক্ত লাগতাছে না?”
 
প্রীতিষা হেসে উত্তর দিলো,
"উহু! বরং এটা ভেবে ভালো লাগছে, যে আমার কৈফিয়ত দেওয়ার মতো মানুষ জুটেছে।"
 
কাবির উত্তরটায় বিগলিত হলেও প্রকাশ করলো না। মিছে হাই তুলে বলল,
“নতুন নতুন ভালোই লাগে!"
 
প্রীতিষা সেসবে গুরুত্ব না দিয়ে বলল,
“ওসব ছাড়ো। এই কিউটু বাচ্চাটা কে?”
 
কাবির পাশে বসা কায়ানের চুল এলোমেলো করে বলল,
“আমার ভাইজানের পোলা… আই মিন ভাতিজা।”
 
প্রীতিষা ততক্ষণে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েছে। অবাক করার বিষয় আজ কায়ানও কোলে যেতে আপত্তি করেনি, গাইগুই করে নি। প্রীতিষা কি একটা যেন মনে করার চেষ্টা করছে। তারপর বলল,
"ওকে যেন কোথায় দেখেছি? উমম...ওহ হ্যাঁ। ওর সাথে আমার নিউমার্কেটে দেখা হয়েছিলো!"
 
কাবির ভ্রু বাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কবে?”
 
প্রীতিষা উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল,
“সে অনেকদিন আগে। ওর মাকেও চিনি আমি, মানে মুখ চিনি। এবার বুঝলাম, ওই মহিলা তোমার ভাবী।”
 
কাবির মাথা নাড়ালো, পরপর চা-য়ে চুমুক দিলো। প্রীতিষা আবার বলল,
“সেদিন কি হয়েছিলো জানো? তোমার ভাবীকে দেখে আমি দুই মিনিট স্তব্ধ হয়ে হয়েছিলাম।”
 
কাবির অতি সাধারণ কথায়ও আজকাল আগ্রহী হয়। অন্যদের কথা এতো ধৈর্য্য নিয়ে জীবনে শুনতো না কাবির। না সেসব শোনার মানুষ সে। সামনের মানুষটা যখন প্রীতিষা তখন কাবিরের নীতি-রীতি সব ভিন্ন। তাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে বলল,
“ক্যান ক্যান?”
 
প্রীতিষা বলে উঠলো,
"মানে এত সুন্দর দেখতে তিনি, মাশাল্লাহ। আমি মেয়ে হয়ে তাকিয়ে ছিলাম! সত্যি বলতে এতো সুন্দর নিখুঁত মেয়ে আমি আগে কখনো দেখিনি।"
 
কাবির এমন কথায় ফিচেল হাসলো। প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে গভীর দৃষ্টিতে বলল,
"সৌন্দর্য জিনিসটার একটা বিশেষত্ব আছে। সেইটা হইলো, এই জিনিসটা সবার দৃষ্টিতে এক হয় না। যেমন আমার দৃষ্টিতে একজন আছে যে আরও সুন্দর, আরও নিখুঁত। তার পাশে ঐশ্বরিয়া আইনা দিলেও আমার চোখে লাগতো না। কিছু জিনিস সাধারণ থাকলেও মানুষ বিশেষে সবচেয়ে সুন্দর।"
 
প্রীতিষা কৌতূহল ভরে বলল,
“সেটা কে?”
 
কাবির মৃদু হেসে বলল,
"অন্য আরেকদিন কমু নি। এখন জলদি কও কি খাবা? হাতে টাকা আছে আজ। তাছাড়া তোমার খাওয়ানোর ঋন সুদ করি নাই এখনো।"
 
প্রীতিষা হেসে বলল,
“তুমি না চা খাচ্ছো, আপাতত ওটাই খাওয়াও। আজ রাতের খাবার কিনে ফেলেছি অলরেডি। নাহলে তোমার টাকা খরচ করাতাম আমি!"
 
কাবির দোকানদারকে হাক দিয়ে বলল,
“চাচা, আরও দুই কাপ চা দেন। লগে দুইটা বন পাউরুটি মালাই দিয়া।”
 
প্রীতিষা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল,
“এখন পাউরুটি কে খাবে?”
 
কাবির চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে পরিস্কার করছিলো। প্রীতিষার উত্তরে বলল,
“আমরাই, চা দিয়া খামু।”
 
প্রীতিষা ভ্রু কুচকে খানিকটা হতবুদ্ধি হয়ে মুখ ফসকে বলল,
“চা দিয়েও পাউরুটি খাওয়া যায়?”
 
কাবির ত্রস্ত বেগে চাইলো প্রীতিষার দিকে। যেন ভুল জায়গায় ভুল কিছু বলে ফেলেছে সে। আসলেই বলেছে! চা দিয়ে পাউরুটির মতো স্পেশাল খাওয়া যে মিস দিয়েছে তাকে তো উগান্ডায় পাঠানো উচিত। অন্তত কাবির তাই করবে। তাই কাবির অবাক হয়ে বলল,
"জীবনে কোনোদিন চা-য়ে পাউরুটি চুবাইয়া খাও নাই? সিরিয়াসলি!"
 
এমন কথায় প্রীতিষা খানিকটা লজ্জায় মিইয়ে গেলো। ও আসলেই খায় নি কোনোদিন। চা জিনিসটাই খুব একটা খাওয়া হয় না। তাও তো এসব বাজারের চা! বাসায় কফি'ই খেতো বেশিরভাগ সময়। চা করতে হতো ওর ভাইয়ার জন্য আলাদা করে। কারণ, প্রীষান আবার কফি খায় না। ভাবনার মাঝেই কাবিরের কথার প্রতিউত্তরে প্রীতিষা মাথা নাড়ালো লাজুক ভঙ্গিতে। আর ঠোঁট উল্টো নিস্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কাবিরের দিকে। কাবির তা লক্ষ্য করে হতাশ ভাবে শ্বাস ফেললো। তারপর প্রীতিষাকে বাগে পেয়ে বিজ্ঞদের ন্যায় জ্ঞান ঝেড়ে বলল,
"বুঝছি। আদরের দুলালীরে হাতে ধইরা অনেক কিছু শিখানো লাগবো আমার। তা গরম চা যে ফু দিয়া খাইতে হয় তা জানো তো? এখন কও, এইডাও জানো না!"
 
প্রীতিষা ফিক করে হাসলো এমন কথায়। মাথা নাড়ালো কাবিরের প্রশ্নে, এর মানে সে জানে চা-য়ে ফু দিয়ে খেতে হয়। তখন টং দোকানের ধোঁয়া উঠছিলো ক্রমাগত। রাতের কুয়াশায় তা আর গাঢ় হচ্ছিলো। এমন সময় এক কিশোর ট্রেতে করে দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাড়ের চা এনে রেখে গেল তাদের সামনে। প্রীতিষা কোল থেকে কায়ানকে আস্তে করে নামিয়ে পাশে বসালো। তারপর ট্রে থেকে একটা কাপ তুলে নিলো। কাপের গা ছুঁয়ে থাকা উষ্ণতা আঙুল বেয়ে ভেতরেও ছড়িয়ে পড়লো। পাশে রাখা দুটো মালাই-লাগানো বন পাউরুটি নীরবে ডাক দিচ্ছিলো তাদের। কাবির নিজের চায়ের ভাড়টা হাতে নিয়ে পাউরুটির টুকরো চা-য়ে ডুবিয়ে বলল,
"এমনে চুবাও। তারপর মুখে দিয়া দেখো… জাস্ট! অমৃত, অমৃত!"
 
এই বলেই সে চোখ বন্ধ করলো। মুখের স্বাদের ভেতর ডুবে গিয়ে অন্য এক জগতে পৌঁছে গেছে সে। তার মুখের তৃপ্তি দেখে প্রীতিষার কৌতূহল বাড়লো। সে-ও কাবিরকে অনুকরণ করে সাবধানে পাউরুটি চায়ে ভিজিয়ে মুখে দিলো। নরম পাউরুটির ভেতর চায়ের উষ্ণতা আর মালাইয়ের মিষ্টি কোমলতা মিশে এক অদ্ভুত স্বাদ তৈরি করলো। স্বাদ পেতেই প্রীতিষার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো। সে হাস্যোজ্জ্বলভাবে বলল,
"ওয়াও! এটা তো দারুণ খেতে!"
 
কাবিরের ঠোঁটে ফুটে উঠলো আত্মতৃপ্ত গর্বের হাসি। আজ সে এক বিরল স্বাদের গুপ্তধন আবিষ্কার করে ভাগ করে দিলো আপন কারো সাথে। কাবির কায়ানকে খেতে সাধলে সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সে এখন জুসের স্বাদ নিতে মগ্ন, চা-পাউরুটির সরল সুখ তার কাছে তেমন আকর্ষণীয় নয় বর্তমানে। তবে সুযোগ পেলেই চাচা-ভাতিজা এই টং দোকানের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে বিকেলে এমন চা-পাউরুটির স্বাদ আস্বাদন করে। কায়ান মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় কাবির নিজেই টুকরোটা খেয়ে ভাবলেশহীন হয়ে বলল,
"না খাইলে নাই! ভালো জিনিস মিস করলি, ব্যাটা!"
 
প্রীতিষার খাওয়া শেষ হতেই কাবির বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালো। চোখের চশমাটা কপালে ঠেলে তুলে নিয়ে একবার চারপাশে তাকালো। হঠাৎ করেই দায়িত্বের ভারটা তার কাঁধে এসে বসেছে। সেটা কাবিরও অনুভব করে তবে প্রকাশ্যে নয়। তারপর দোকানের মালিকের কাছে গিয়ে বিল মিটিয়ে ফিরে এলো। কায়ানকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
" বাসায় যাবা না? চলো, দিয়া আসি।"
 
প্রীতিষা দু-হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বেঞ্চ থেকে খাবারের ব্যাগ তুলে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস বলল,
" আমার জন্য উল্টো রাস্তায় যাবে? "
 
কাবির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে জবাব দিলো,
"বেশিদুর যামু না। খালি বাড্ডার মোড় পার করায় দিয়া আসমু। তাইলেই হবো। বাকি রাস্তা সেফ।"
 
এ কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলো প্রীতিষা। রাতে বাড্ডার মোর একা পার করা নিরাপদ নয় একটা মেয়ের জন্য। বখাটেদের মেলা বসে সন্ধ্যার পর থেকেই। তাই দ্বিমত না করে কাবিরের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলো প্রীতিষা। তবে কাবির তাকে পেছনে ফেলে এগোয়নি। এক হাতে কায়ানকে বুকে জড়িয়ে রেখে, আরেক হাতে প্রীতিষার হাত শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে সে ব্যস্ত রাস্তা পার হচ্ছিলো। অতি সতর্ক ও সচেতন ভঙ্গিতে। এখন পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে দুজনকে নিরাপদ করে রাখাই যেন তার একমাত্র কাজ। কাবিরের চোখ ছিলো রাস্তায়। গাড়ির হেডলাইট, হর্নের শব্দ, মানুষের ভিড়ে তার চোখদুটো ব্যস্ত। অথচ প্রীতিষার চোখ আটকে ছিলো কাবিরের শক্ত হাতের মুঠোয় থাকা তার কোমল হাতে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ সরে এসে থেমে গেলো কাবিরের অচঞ্চল অবয়বে। একসময়কার সেই ছ্যাত-ছ্যাতানো, বুনো ষাঁড় গোছের ছেলেটার একটু একটু পরিবর্তন চোখে পড়ছে প্রীতিষার। বেশ সুচারুভাবে বদলে যাচ্ছে সে। তার ভেতরে ফুটে উঠছে অনভ্যস্ত স্থিরতা এবং অনুচ্চারিত দায়বদ্ধতা। যেটা অন্তর্লীন তবে ধীরে ধীরে প্রতীয়মান হচ্ছে। 
 
এই সামান্যতম দৃশ্যটুকুই প্রীতিষার চোখ জুড়িয়ে দিলো। প্রীতিষার ভেতরে কোথাও নিঃশব্দে একটা স্বপ্ন দানা বাঁধলো। একটা ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন, ওদের দুজনের। যেখানে এই অগোছালো কাবিরকে সে যত্নে, ভালোবাসায়, ধৈর্যে গুছিয়ে নেবে। তার ছন্নছাড়া দিনগুলোকে বাঁধবে এক ছাদের নিচে। তবে নিয়মের নয়, মায়ার বন্ধনে। কাবির মানুষটাকে ও পরিবর্তন করতে চায় না। কারণ, প্রীতিষা তো এই কাবিরকেই ভালোবেসেছে। হয়তো সরাসরি মুখ ফুটে বলেনি কিন্তু কাবির বুঝে নিয়েছে তার প্রীতিকে। প্রীতিষার নীরব ভালোবাসার আহবানে কাবির নিজেও মৌন স্বীকৃতি জানিয়েছে। যার ফলস্বরূপ কাবির অধিকারসমেদ প্রীতিষার হাত ধরতে পেরেছে। তাকে সুরক্ষিতভাবে বাড়ি পৌছে দেওয়ার মতো দায়িত্ববোধ জন্মেছে মনে। এই ছোট ছোট যত্ন, খেয়াল, মেহনতি উপলব্ধি করে প্রীতিষা। এখন তো নিয়ম করে ফোনে কথাও হয় প্রণয় যুগলের। 
 
ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে হেঁটে যাওয়া মানুষটা শুধু কাবির নয়। সে এক সম্ভাব্য ভালোবাসার স্বপ্ন যাকে পূর্ণতা দেওয়ার সাহস প্রীতিষা আনমনেই খুঁজে পেয়েছে নিজের ভেতরে। সেই স্বপ্ন পূর্নতা পাবে কবে প্রীতিষা জানে না, তবে কাবিরের সাথে কাটানো এই ছোট ছোট মুহুর্তগুলো অদ্ভুত সুন্দর। 
 
চলমান.......
 
(আজকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষে একটা মিষ্টি প্রেম প্রেম পর্ব দিয়েছি। সবার অনুভুতি জানতে চাই। 🤨🔪) 
 
[ কেমন লাগলো পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২২
 
 
ভোর ছয়টার কুয়াশাভেজা মৃদু আলোয় ভাসানীর বাস ঢুকলো সিলেট শহরে। সারারাতের পথচলায় ক্লান্ত চাকা থামতেই ঝেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সবাই। রাত বারোটা পর্যন্ত হৈ–হুল্লোড়ে মুখর ছিলো বাসের ভেতর হাসি-ঠাট্টা, গান-বাজনা, বন্ধুদের খুনসুটি, আর মেয়েদের ক্রমাগত সেলফির ঝলকে। তারপর রাত বাড়তেই শিক্ষার্থীদের উদ্যমতা, চাঞ্চল্যতার প্রদীপ নিভে যায়। একে একে নুয়ে পড়ে ভারী মাথাগুলো। ঘুম এসে ধরা দেয় ক্লান্ত চোখের পাতায়। জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে কেউ, আবার কেউ সিটে আধশোয়া
হয়ে আছে। ঘুমে কাত হয়ে কাটে তাদের রাতের বাকি পথ।
 
ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় বাস থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙে সবাই। শহর তখনো পুরো জেগে উঠেনি, কিন্তু ক্ষুধা বেশ জেগে আছে। একটি খাবারের হোটেলে ঢুকে পড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ভেতরে খাবারের ঘ্রানে ম-ম করছে চারপাশ। 
 
ডান পাশের একটা টেবিলে বসেছে কায়রা, জিহাদ, দিপ্তি আর দিপ্তির বয়ফ্রেন্ড প্রান্ত। একটা জায়গায় থিতু হয়ে বসতেই কায়রা ফোন বের করে দুই ভাইকে একটি মেসেজ পাঠিয়ে দেয়। কারণ, বড় মুখ করে বলে এসেছে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর দেবে। যদিও সত্যি সত্যি তা সম্ভব না, তবু রাতে বাসে ঘুমানোর আগে আর ভোরে পৌঁছে সে জানিয়েছে ঠিকই।দায়িত্ববোধটা তার ভাবনায় মিশে আছে। জানে তার দুই ভাই চিন্তা করবে তাকে নিয়ে। ভাইদের ছাড়া এভাবে শহরের বাইরে একা একা কোথাও যায় নি। এসেছে যখন তখন ভাইদের চিন্তায়ও রাখতে চায় না সে। তাই নিজের আপডেট দেওয়ায় কোনো গাফিলতি করবে না। 
 
দিপ্তি কায়রার ফোনের স্ক্রিন লক্ষ্য করে কায়রার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
"জানিস কায়রা, তোকে দেখে মাঝে মাঝে আমার খুব আফসোস হয়। এমন দুই ভাই কেন যে নেই আমার! "
 
কায়রা আলতো হেসে বলল,
"বাবা-মাকে তো জ্ঞান হওয়ার পর আর পাইনি। বাবা-মার দায়িত্ব ওরাই পালন করেছে। তাই ছোট থেকে আমার ভাইয়েরাই আমার সব। এ ভালোবাসার ভাগ হবে না। নট উইথ্ এনিওয়ান অ্যাট অল।"
 
কায়রার কণ্ঠে ছিলো কেবল ভাইবোনদের অভ্যস্ত এক ভালোবাসার দৃঢ়তা। জিহাদ পাশ থেকে বলল,
"সত্যি, কপাল করে দুটো ভাই পেয়েছিস।"
 
কায়রা মৃদু মাথা নাড়লো। তারপর জিহাদ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো সবার উদ্দেশ্যে, 
"তা তোরা খাবি কি?"
 
প্রান্ত হাত মুঠো করে টেবিলে ঠুকলো হালকা করে। তারপর বলল, 
"ডাল-পরোটাই নেওয়া যাক। সকাল সকাল ভাত খেতে ইচ্ছে করছে না।"
 
দিপ্তি সায় দিলো সে কথায়,
"আমিও অতো হেভি কিছু খাবো না সকালে। পরোটাই ঠিক আছে।"
 
কায়রা নিজেও তাল মিলিয়ে বলল,
"হুম, আমিও ওই পরোটার দলে। যাহ, তারাতাড়ি আন গিয়ে।"
 
জিহাদ উঠে গেলো সবার জন্য পরোটা আনতে। টেবিলে অপর পাশে দিপ্তি আর প্রান্ত ব্যস্ত হলো নিজেদের আলাপচারিতায়। সেই ফাঁকে কায়রার চোখ ঘুরে বেড়াতে লাগলো হোটেলের ভেতর। প্রীষানকে হন্যে হয়ে খুঁজছে কায়রার ব্যাকুল দুটি চোখ। পরক্ষনেই প্রীষানের অবস্থান টের পেলো কায়রা। সামনের দুই টেবিল আগে প্রীষানসহ আরও তিনজন শিক্ষক বসে আছেন। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে খাওয়া-দাওয়া করছেন তারা। 
 
কায়রা তো সেই থেকে তাকিয়ে ছিলো। দৃষ্টি সরায়নি।প্রায় হা করেই দেখছিলো প্রীষানকে সামনে খাবার রেখেও। কিন্তু আচমকাই চোখাচোখি হয়ে গেল কায়রা আর প্রীষানের। প্রীষানের খাওয়া হতে হাত থেমে গেলো মুহূর্তেই। কিছুক্ষণ অদ্ভুত, থমথমে ভাব। অবশ্য প্রীষানই আগে চোখ নামিয়ে নিলো। ওই দুটো চোখকে খুব অদ্ভুত লাগে প্রীষানের। এই মেয়ের চোখদুটো হুটহাট অস্বস্তিতে ফেলে দেয় ওকে। কী অসম্ভব দৃঢ় চাহনি! ভার্সিটিতে প্রায়ই অনুভব করে সে, ওই অদ্ভুত চোখদুটো সবসময় তাকে তাড়া করে। এমনকি ক্লাসেও। একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখদুটো কি ক্লান্তও হয় না? 
 
নাহ, অযথা চোখকে কেন দোষ দিচ্ছে প্রীষান? দোষটা কি শুধু চোখের? চোখের মালিকের ইচ্ছাতেই তো অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলার মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। মালিকটা একেবারে যাচ্ছে-তাই! মেয়েটা দূরে বসে তাই ধমকটাও দিতে পারছে না মনের শান্তির জন্য। উপায়ান্তর না দেখে নিজেই নিজের অযথা, অনাহূত ভাবনাকে ধমক দিয়ে আবার খাওয়ায় মন দিলো প্রীষান। বাইরে তখন সকাল একটু একটু করে উজ্জ্বল হচ্ছে। আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। সামনে আরও আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে জাফলং পৌছাবে তারা। অনেকটাই দীর্ঘ পথ। 
 
----------------------------------
 
খাওয়া দাওয়ার পর কিছু শিক্ষার্থীরা আবার যার যার মতো বাসে উঠছে। ঠিক আটটায় বাস ছাড়ার কথা, কিন্তু এখন ঘড়িতে দেখাচ্ছে সাতটা চল্লিশ। তাই সময় থাকায় খাওয়া দাওয়া শেষে কিছু শিক্ষার্থী হেঁটে বেড়াচ্ছে ফাঁকা রাস্তায়, কিছু শিক্ষার্থী আবার হেসে গল্প করছে নিজেদের মধ্যে। কায়রা ধীরে ধীরে বাসের পাশ দিয়ে এগোতে লাগলো। দেখলো প্রীষান স্যার ফোনে কল মাত্রই শেষ করে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। মনে হলো হয়তো বাড়ির কেউ ফোন করেছে। কায়রা পেছন থেকে যতটা সম্ভব সুমিষ্ট কণ্ঠে বলল,
“হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে, স্যার!”
 
প্রীষান চমকে পেছনে ঘুরে তাকালো। কায়রার দিকে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বললেন,
“আমাকে কেন বলছো? আশ্চর্য! আর এমনিতেও ভ্যালেন্টাইন্স ডে তো কাল ছিলো!”
 
কায়রা বোকা বোকা হেসে বলল,
“এমনিই বললাম, স্যার। আমি ডেকে ডেকে সবাইকেই ওইস করছি। বন্ধুদেরও, সবাইকেই।”
 
প্রীষান ছোট ছোট চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে কায়রাকে অবলোকন করলো। প্রীষান বেশ বুঝতে পারছে তাকে এসব বলার কারণ। তাই কায়রাকে জব্দ করতে পেছন দিকে ইশারা করে বলল,
“সবাইকে? আচ্ছা, তাহলে যাও, ওই যে টিচার্সরা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে, তাদেরকেও বলে এসো।”
 
কায়রা এবার থতমত খেয়ে গেলো। পেছনে তাকালো প্রীষানের ইশারা অনুযায়ী, যেখানে দুজন টিচার কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। আবার সামনে ফিরে প্রীষানের দিকে তাকিয়ে অসহায় চোখে বলল,
“না মানে… ওনাদেরকে কেন আবার?”
 
প্রীষান এবার খানিকটা জোর গলায় বলল,
“আমাকেই কেন, বুঝিনা ভেবেছো? স্টুপিড!”
 
কায়রা ধরা খেয়ে খানিকটা মিইয়ে যায়। মনে মনে ভাবলো, এই প্রীষান স্যারটা কঠিন চালাক! ঠিক কৌশলে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে ওকে! ঠোঁট নেড়ে কিছু বলার আগেই প্রীষান ধমক দিয়ে বলল,
“যাও! নিজের সিটে গিয়ে বসো!”
 
কায়রা খানিকটা কেঁপে উঠে চোখ খিঁচে ফেললো প্রীষানের ধমক শুনে। চোখ খুলে মৃদু কষ্ট নিয়ে বলল, 
“আপনি আমাকে কলেজে শাসন করেন, ঠিক আছে মানছি। কিন্তু ঘুরতে এসে কেন ধমকাচ্ছেন? দিস ইজ নট ফেয়ার!"
 
প্রীষান রাগী গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমার স্টুপিডির কাছে এভরিথিং ইজ ফেয়ার। আর একটাও কথা না, যাও!"
 
কায়রা আবার কিছু বলতে যাবে তখন প্রীষান চোখ গরম করে তাকায়। প্রীষানর অগ্নিদৃষ্টি দেখে কায়রা আর কিছু বলল না। অগত্যা ভাঙা মন নিয়ে বাসে উঠে নিজের সিটে বসে পড়লো। কিছু সময়ের মধ্যে ড্রাইভার সবাইকে হাক ছেড়ে ডাক দিয়ে বাসে উঠতে বললেন। একে একে সবাই বাসে উঠে বসলো। যাত্রা শুরু হলো জাফলংয়ের দিকে। দূরে পাহাড়ের ঘন সবুজ আর নদীর কলতান কায়রার মনকেও হালকা করে দিলো। ধীরে ধীরে ধমক আর গোঁফালো কথার স্মৃতি গায়ে চাপা দিয়ে মিশতে লাগলো নতুন দিনের রঙে। যদিও এমন ধমকে পাত্তা দেওয়ার মেয়ে কায়রা একেবারেই নয়। 
 
---------------------------
 
অবশেষে, আড়াই ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রার পর শিক্ষার্থীরা পৌঁছে গেলো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কোলে আশ্রিত জাফলং-এ। চারপাশে ছায়াময় পাহাড়, বিশাল নীল আকাশ, আর পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাঁকানো সেতু। নিচে শুধু পাথর আর পাথর। মসৃণ, কঠিন, ভিন্ন ভিন্ন সাদা রঙের পাথর। সবাই মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালো, চোখের সামনে বিস্তৃত এই দৃশ্যকে মন ভরে খুঁজে নিতে।
 
কায়রাও প্রথমবার এখানে এসেছে। আশেপাশের ছোট ছোট স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে তাকিয়ে দেখছিলো সে, চোখে বিস্ময় আর মুখে প্রশান্তির ছোঁয়া। এবার বন্ধুদের সঙ্গে সবাই নিজেদের মতো করে ঘোরার অনুমতি পেলো। শর্ত একটাই, বাসে ফেরার ঠিক সময় আসতে হবে সবাইকে। তবে প্রতিটি দলে একজন শিক্ষক রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য।  
শিক্ষক বাছাইয়ের সময় কায়রার চট করে বলল,
“আমাদের দলে প্রীষান স্যারকেই দেওয়া হোক!”
 
এমন উচ্চস্বরে বলায় প্রীষান সহ বাকিরা অদ্ভুত চোখে কায়রার দিকে তাকালো। কায়রা তখন দিপ্তির দিকে ইশারা করলো তার কথায় সায় দিতে। ইশারা বুঝে দিপ্তিও মেকি হাসি দিয়ে তাল মেলালো,
“ওহ, হ্যাঁ! হ্যাঁ...আমরা প্রীষান স্যারকেই চাই!”
 
দিপ্তি আবার জিহাদ ও প্রান্তকে ঠেলে বলালো। যার ফলে ওরাও বলল,
"হ্যাঁ, স্যার। আমাদের দলে জয়েন করুন, প্লিইজ..."
 
প্রীষান দীর্ঘশ্বাস ফেললো, মুখে হালকা হাসি দিয়ে বোঝালো সে রাজি। এগিয়ে গেলো জিহাদদের দিকে। 
প্রস্তুত হলো সে কায়রাদের দলকে গাইড করার জন্য।
কায়রা ভেতর ভেতর আনন্দে উদ্দীপ্ত! খুশিতে একেবারে গদগদ সে। এই ভেবে যে, এবার সে আরও কিছুটা সময় কাটাতে পারবে প্রীষান স্যারের সঙ্গে। বিজয়ী হাসি তার মুখে ফুটে উঠলো। 
 
এরপর সবাই হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে। পাথরের ওপর দিয়ে, ধীর গতিতে ঝরনা প্রবাহর দিকে এগোলো সবাই। পানির স্বচ্ছতায় প্রতিটি পাথর চকচক করছে। পানিগুলো এত স্বচ্ছ যে পানির নিচে পাথরও দেখা যাচ্ছে। প্রীষান হাঁটতে হাঁটাতেই চারপাশে নজর রাখছিলো। তার প্রত্যেকটি দৃষ্টি রেখা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কারণে নিবদ্ধ। কায়রা বুদ্ধি করে প্রীষানের পাশে হেঁটে যাচ্ছিলো। কায়রার পাশে দিপ্তি, আর তাদের পাশে অন্য দুজন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা কেও কেও বিভিন্ন স্টলে এসে থামছে। হঠাৎ কায়রা রাস্তার ধারের একটা স্টল থেকে পছন্দের স্ট্রবেরি জুস কিনে নিলো। প্রীষানের দিকে জুসটা বাড়িয়ে দিয়ে ইয়ার্কির সুরে বলল,
" খাবেন, স্যার?"
 
প্রীষান ভ্রু কুচকে কিছুটা বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কায়রার দিকে। তা দেখে কায়রা মেকি হেসে বলল,
" আচ্ছা, খেতে হবে না। মজা করছিলাম। ওভাবে তাকান কেন?"
 
প্রীষান ঠোঁট গোল করে একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে দিলো। তারপর হেঁটে একটা স্টলের সামনে দাঁড়ালো প্রীষান। সে মেয়ের জন্য হ্যাট, ছেলের জন্য চকলেট আর বোনের জন্য হাতে বানানো ব্যাগ নিলো। কারণ তারা আগেই বলে রেখেছিলো বার বার করে। সব ঠিক ঠিক মতো আনতে হবে প্রীষানের। কায়রা সেসব লক্ষ্য করে জুস খেতে খেতে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,
"বাচ্চাদের জন্য নিচ্ছেন এসব?"
 
প্রীষান শুধু ছোট করে বলল,
" হুম। "
 
কায়রাও তার মতো করে সেই স্টল থেকেই ভাবীর জন্য হ্যান্ডব্যাগ এবং বড় ভাইয়ের জন্য একটি শাল নিলো। কাবিরের জন্য ট্রাউজার প্যান্ট এবং সাবানের প্যাকেট কিনলো প্রায় বিশটার মতো। ব্যাগে সব ভরে রাখার সময় প্রীষান তা লক্ষ্য করে একটু অবাক স্বরে বলল,
"এতো সাবান কার জন্য নিচ্ছো? স্ট্রেইঞ্জ!"
 
কায়রা হেসে উত্তর দিলো,
"ছোট ভাইজানের জন্য। সে বলেছে উল্টোপাল্টা কিছু না কিনে, শুধু সাবান আনতে। "
 
প্রীষান মাথা দুপাশে হতাশ ভাবে নাড়িয়ে বলল,
"তোমার মতোই অদ্ভুত তোমার ভাইজান! তা সাবানই কেন?"
 
কায়রা আলতো হেসে বলল,
" দাম কম তাই। এগুলো তো আসল ইন্ডিয়ান সাবান। বাইরে থেকে নিলে কমপক্ষে একশ টাকার কমে মিলবে না। এখানে প্রতি পিছ দশ টাকা করে। এজন্য ভাইজান আমাকে আলাদা করে টাকা দিয়ে দিয়েছে।"
 
প্রীষান সাবানের প্যাকেট দেখতে দেখতে বলে,
" ওহ, ওকেহ। তাহলে এক কাজ করি, আমিও কিনি। কোয়ালিটি কেমন এগুলোর? "
 
এমনিতে প্রীষান তেমন একটা কথা বলে না কায়রার সাথে। আজ বলছে। তাই কায়রা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
" দামে কম, মানে ভালো। নিন নিন!"
 
প্রীষান স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করে, 
" তুমি ইউজ করেছো নাকি আগে?"
 
কায়রা তখন নিজের জন্য একটা পুতুল দেখছিলো। ছোট পুতুল। সেটা দেখতে দেখতে প্রীষানের প্রশ্নের উত্তরে বলে, 
" না তো! "
 
প্রীষান অবাক হলো। এই মেয়ে কি! না জেনেই কনফিডেন্স নিয়ে ভুলভাল বকছে! তাই কায়রার এরুপ বোকামিতে প্রীষান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"তাহলে কনফিডেন্সের সঙ্গে ভুলভাল কথা আগেই বলছো কি করে! আহাম্মক কোথাকার!"
 
বকা শুনে কায়রা মাথা চুলকে হালকা বোকা বোকা হাসি ছুড়ে দিলো। এই স্যারের সামনে এলেই মাঝে মাঝে বলদমার্কা কাজফা'জ করে বসে কায়রা। দিন যাচ্ছে আর এইসব বাড়ছে। মুলত কাছের মানুষের কাছে কায়রা বরাবরই আহ্লাদী। তার দুইভাইয়ের কাছে তো আরও বেশি। 
 
এদিকে প্রীষান নিজেও সাবান কিনলো, প্রায় দশটার মতো। ইউজ করে না হয় দেখবে কেমন। এমনিতেও দাম কম তাই দশটার মতো নিয়েছে। খুব একটা লস হবে না। 
 
----------------------
 
এরপর প্রীষান ছাত্রছাত্রীদের দিকে উদ্দেশ্য করে বলেছে ওইপাশে চলে আসতে। এরপর যার যার মতো সুবিধা অনুযায়ী কেনাকাটা করে, কিছু শিক্ষার্থীরা তার স্যারের পেছনে পেছনে এগোতে লাগলো। বাকিরা নিজেদের মতো ছিলো। সত্যি বলতে এরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। হাত ধরে ধরে তো আর নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। নিজেদের ভালো-মন্দ বোঝার বয়স প্রত্যেকেরই হয়েছে। তবুও প্রীষান একজন শিক্ষক হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে। 
 
আর কায়রা তো কায়রাই। সে প্রীষানের সাথে সাথেই আছে। একটুও এদিক সেদিন যায় নি। এমনকি বন্ধুদের কাছেও না। যদিও তারা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত। এরপর সবাই ধীরে ধীরে ঝর্ণার প্রবাহের দিকে এগোলো।
 
ঝর্ণার পাশে পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, অনেকে পানিতে নৌকা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেদিকে একপলক দেখে প্রীষান হাঁটু গেড়ে বসে জুতো খুলে ফেললো। তারপর প্যান্টের নিচটা দুভাজে ফোল্ড করে উন্মুক্ত পায়ে পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে শেষমেশ বড় একটি পাথরের উপর স্থির হয়ে বসলো। ধবধবে ফর্সা পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে রেখে। ঠান্ডা জলে পা রাখতেই শীতলতা অনুভব করলো প্রীষান। 
 
পেছনের শিক্ষার্থীরা ছবি তুলতে, হাসি-ঠাট্টায়, আনন্দ করতে ব্যস্ত। কায়রা তার কেনাকাটার ব্যাগ জিহাদের হাতে দিয়ে এসে এগোলো প্রীষানের দিকে। এভাবে প্রীষানকে বসে থাকতে দেখে দূর থেকে কায়রা মানুষটার অগোচরে কয়েকটা ছবি তুলে নেয়। কিন্তু প্রীষান তা খেয়ালও করল না, কারণ সে অন্য ধ্যানে ডুবে আছে। সে স্থির, নিশ্চল চোখে সামনে তাকিয়ে আছে, একভাবে। কিছুক্ষণ পর পাশ ফিরে কায়রাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“এদিক সেদিক না গিয়ে চুপ করে বসো কোথাও।”
 
কায়রা একটু সামনে এগিয়ে বসতেই যাচ্ছিলো কিন্তু হঠাৎ একটি পিছলে পাথরে পা লেগে পরে যেতে গেলে 
প্রীষানের বলিষ্ঠ হাত মুহূর্তেই তাকে ধরলো ওভাবে বসেই। সে একহাত দিয়েই কায়রার ভার সামলালো, ওকে থিতু করতে। কায়রা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পিছলে ঝুঁকে গিয়েছিলো। শক্ত হাত পেয়ে খামচে ধরে পরতে পরতেও নিজেকে সামলে নেয়। যার ফলে সামান্য খামচি লাগে প্রীষানের হাতে। বড় বড় নখ বসে যায় প্রীষানের বাহুতে। আরেকটু হলেই সোজা পানিতে গিয়ে পড়তো। পরক্ষণেই প্রীষান হাত ছেড়ে দিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে ধমকে বলল,
“আল্লাহ একটু যদি সেন্স দিতো তোমায়! আরেকটু হলে নিচে পড়ে গিয়ে পাথরে মাথা লাগলে মাথা ফেটে যেতো!"
 
আসলে কায়রা নিজেই ভয় পেয়ে গেছে এমন কান্ডে। ধমক খেয়ে কায়রা গুটিসুটি হয়ে ধিমি আওয়াজে বলল, 
“স্যরি… মানে, বুঝতে পারিনি কিভাবে কি…”
 
প্রীষান তাচ্ছিল্য হেসে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“বুঝতে পারোটা কি তুমি একচুয়ালি? শুধু প্রেম ভালোবাসা বোঝো!”
 
কায়রা মাথা নিচু করে নিলো। প্রীষানের কাছ থেকে একটু দূরে, অন্য একটি পাথরে বসলো বিপরীত পাশে মুখ ঘুরিয়ে। প্রীষান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আর হিমশীতল গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“বাড়িতে কে কে আছে তোমার?”
 
কায়রা মুখ তুলে প্রীষানের দিকে তাকালো। এতক্ষণ সে মাথা নিচু রেখেছিলো অপরাধবোধে। কারণ, প্রীষানের মেজাজ খারাপ করে দেওয়ার জন্য তো কায়রা'ই দায়ী হয় সবসময়। এইযে ধমক গুলো দেয়, এগুলো তো অকারণে বা অযথা নয়। কায়রার অবুঝপনা আর হঠকারিতার জন্যই, এটা কায়রা নিজেও জানে। তাই মন খারাপ করে ভারাক্রান্ত মুখে এসব ভাবছিলো সে। প্রীষান আবার একটু জোরেই বলল,
“কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি?”
 
কায়রা মাথা তুলে ধীরে ধীরে বলল,
“দুই ভাই, ভাবী আর আমি।”
 
প্রীষান পাশ ফিরে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“বাবা-মা নেই?”
 
কায়রা মাথা নাড়লো পাশাপাশি। ছটফটে ভাবটি হুট করেই হারিয়ে গেছে তার। প্রীষান মাথা নিচু করে একটা শ্বাস ফেলে আরও ধীরে বলল,
“আমারও নেই।”
 
চলমান.......
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৩
 
কায়েশী আজ দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছিলো। কায়রা বাড়িতে নেই, কায়রাভও এখনো বাড়ি ফেরেনি। বাড়িটা পুরো ফাঁকা, শুধু মা-ছেলেই রয়েছে। তাই সকালটা একপ্রকার অলসতায় কেটেছে বলা যায়। তবে সংসারের নিত্যদিনের কাজের থেকে অবসর নেই। রান্নাবান্না করে কায়ানকে খাইয়ে দিয়ে খেলার জন্য বিছানায় বসিয়ে রেখে কায়েশী বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষন অলস ভঙ্গিতে পায়চারি করলো। 
কায়রাভের অপেক্ষায় না সময় পার করতে,কে জানে? সময়টা ধীর গতিতে এগোচ্ছে নাকি কায়েশী বড্ড ছটফট করছে জানা নেই। অপ্রত্যাশিত মনোচলন থামিয়ে আবার ভাবতে শুরু করলো এবার কি করা যায়? দুপুরের রান্নাটাও শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। এখন, কি করবে সে? তখনি মনে হলো, বই পড়া যাক। 
 
ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে যাওয়ার আগে কায়ানকে সে বলে গিয়েছিলো ফুপির ঘরে যাচ্ছে। তাকে যেন আবার এলোমেলো ভাবে না খোঁজে। এই বলে কায়েশী ধীর গতিতে কায়রার ঘরের দিকে এগোলো। কায়রার রুমে সাজানো-গোছানো একটি ছোট্ট লাইব্রেরি ছিলো। যেখানে হরেক রকম বইয়ের সমাহার। সেখান থেকে একটা ধুসর রঙা প্রচ্ছদের বই বাছাই করলো কায়েশী। চকচকে নতুন বইটাকে উল্টে-পাল্টে প্রচ্ছদ'টা দেখলো সে। অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় লাগছে। ঘোড়ার উপর বসা একজন রাজার হাতে তড়োয়াল, এমন কভার। বইটার নাম রাজসিংহ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। প্রচ্ছদ দেখার পর ক্রমেই পড়ার কৌতুহল বেশ তীব্র হচ্ছে তার।
 
বইটি নিয়ে সে ডিভানে আরাম করে বসলো। পাতাগুলো উল্টাতে-উল্টাতে ঘ্রান নিলো নতুন বইয়ের। নতুন বইয়ের ঘ্রান কায়েশীর বড্ড প্রিয়।ছোটবেলায় নতুন বই কিনলে আগে এভাবে ঘ্রান নিতো সে। এবার প্রথম পৃষ্ঠায় পড়া শুরু করে নিমগ্ন হয়ে গেলো কাহিনিতে। কিন্তু হঠাৎ, পরিচিত এক পুরুষালি কণ্ঠে ভেসে এলো ডাক,
“কায়েশী…”
 
কায়েশী বই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মাথা তুললো। দেখলো কায়রাভ এসেছে। তার মুখটা কেমন ম্লান লাগছে। ক্লান্তি লেগে চোখে মুখে। হয়তো দীর্ঘসময়ের যাত্রার ফলে। কায়েশী কিছু বলার আগেই কায়রাভ ধীরে, নিঃশব্দে কায়েশীর কাছে এগিয়ে এলো।অকস্মাৎভাবে তার বলিষ্ঠ বাহুদ্বারা কায়েশীর শীর্নকায় দেহকে বন্দী করলো এক নিমেষে। হুট করেই স্বামীর কাছে আপোষহীনভাবে আবৃত হলো কায়েশী। ঘটনা বুঝতে কায়েশী হকচকিয়ে তাকালো। তখন মাথা ঠেকেছে কায়রাভের বুকের সাথে লেপ্টে।
কিছুক্ষণ পর কায়েশী শক্ত বাহুবন্ধন হতে মুক্তি পেয়ে ধিমি গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? সব ঠিক আছে তো? হঠাৎ আমাকে...”
 
মুখের বাক্য শেষ করতে না দিয়েই কায়রাভ মৃদু গলায় বলল,
“বউকে জড়িয়ে ধরতে কি কারণ লাগে? আর যদি কারণ চাও, তাহলেও বলতে পারি।”
 
কায়েশী অদ্ভুত চোখে তাকালো। কোনো ভাব ছাড়াই বলল,
“আপনি সচরাচর আমার সাথে এমন করেন না। তাই হঠাৎ এমন করায় আমি ভাবলাম...”
 
কায়রাভ তির্যক হেসে কায়েশীর গালে হাত রেখে মৃদু গলায় বলল,
“হ্যাঁ, বুঝেছি। তাহলে কারণ'টা শোনো, আঠারো ঘন্টা বউ থেকে দূরে ছিলাম, তাই এনার্জি ছিলো না। এইযে চার্জ করে নিলাম, এখন ভালো লাগছে।”
 
কায়েশী এবার বুঝলো লোকটার এমন কাজকারবারের কারণ। কুচকানো ভ্রু সোজা হয়ে এলো। তাই মেকি হেসে অবজ্ঞার সুরে বলল,
“ফ্লা'র্টি লাইন বলছেন? লাভ নেই। পটবো না এভাবে!”
 
"তো কিভাবে পটবে বলে যাও, কায়েশী ফারিয়াহ্! আ'ম ডায়িং টু হিয়ার দি'স!"
 
"আজগুবি কথাবার্তা বাদ দিয়ে খেতে আসুন!"
 
কায়েশীকে বিরক্ত করতে পেরে হো হো করে আবার সেই গা জ্বালানো হাসিটা ছুড়লো কায়রাভ। কায়েশী সেসব শুনে আর এক মুহুর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো। আর মনে মনে ভাবলো, এই লোক যদি চুপচাপ থাকতো, তাহলেই বরং সন্দেহ হতো তার। এখন আবার নিজের অতি অসভ্য সত্তায় ফিরে এসেছে ব'দ লোক! তাই সবকিছু এইবার স্বাভাবিক লাগছে। এইসব ভেবে তরকারিটা গরম করতে করতে কায়েশী ভারী নিশ্বাস ফেললো। 
 
----------------------
 
আগেভাগে রান্না করায় দুপুরের ভাত ঠান্ডা হয়ে এসেছিলো। কায়েশী ওভেন থেকে মাত্রই গরম করে আনলো কায়রাভের জন্য। টেবিলের একপাশে সদ্য গরম করা তরকারির তপ্ততা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কায়রাভ চেয়ারে বসে কায়ানকে কোলে নিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছে, মাঝে মাঝে ছোট ছোট লোকমা তুলে দিচ্ছে কায়ানের মুখে। কায়ান আজ তার বাবার কাছে খাবে। কায়ানের জন্য কম ঝাল দিয়ে রান্না করা শিং মাছটা নিজের প্লেটে নিয়ে মাছের কাঁটা বেছে অতি সাবধানে বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিচ্ছে কায়ারভ। কায়ান আজ বরাবরের মতো শান্ত বাচ্চা হয়ে রয়েছে বাবার কাছে। কায়ান তার বাবার কাছে দুরন্তপনা'টা ঠিক দেখায় না। একদম ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকে। ওর সব দুরন্তপনা ওর মা আর চাচ্চুর কাছে। 
 
টেবিলের পাশে আরেকটা চেয়ারে বসে কায়েশী নিঃশব্দে বাবা-ছেলের সুন্দর দৃশ্যটা দেখছে। তার চোখে একপ্রকার তৃপ্তি। এই সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তার জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে অনেক আগেই। ড্রয়িং রুমের বড় জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো টেবিলের ওপর পড়েছে। হঠাৎ কায়রাভ খাওয়া থামিয়ে কায়েশীর দিকে একপলক তাকালো। তার দৃষ্টিতে কি ছিলো বোঝা গেলো না। চোখ না সরিয়ে নরম কন্ঠেই জিজ্ঞেস করে, 
“কায়েশী, তুমি চাইলে তোমার বিজনেস'টা আবার শুরু করতে পারো।”
 
হঠাৎ এমন কথা বলায় কায়েশীর কথাটা ধরতে একটু দেরি হলো। তাই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, 
“কিসের বিজনেস?”
 
কায়রাভ কায়ানের মুখে শেষ লোকমাটা দিয়ে ধীরে বলল,
“বিয়ের আগে যে অনলাইন বিজনেস করতে তার কথা বলছি। ওইযে অর্নামেন্টস, ড্রেস… সেসব।”
 
কায়েশীর চোখে বিস্ময়রেখা দৃঢ় হলো। সে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে আছে। বলল,
“হঠাৎ এই কথা কেন বলেছেন?”
 
কায়রাভ গলায় শান্তভাব বজায় রেখে বলল,
“হঠাৎই মাথায় এলো। বাসায় বেশিরভাগ সময় একাই থাকো। কাজের মধ্যে থাকলে সময়'টা ভালো কাটবে, একাকিত্ব কমবে। আর তুমি তো আত্মনির্ভরশীল ছিলে সবসময়। নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া খারাপ না।”
 
কায়েশী কণ্ঠে মৃদু হতাশার সাথে বল,
“এখন আর ওসব করে কী হবে?”
 
কায়রাভ মুচকি হেসে তাকালো তার দিকে। তারপর হেসেই বলল,
“কেন? শুধু সংসার করতেই আগ্রহী তুমি? অবশ্য তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমার কথা ভেবেই বলেছি। এখন তুমি যা ভালো বোঝো। ”
 
কায়েশী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ভেবে আস্তে করে বলল,
“সংসার তো করছি'ই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় আসলেই কাটতে চায় না। রান্না ছাড়া আমি কোনো কাজই খুঁজে পাই না। বাকিসব তো চাচি আম্মাই করে দিয়ে যায়। সেই তো সারাদিন শুয়ে বসে থাকা….. ভালো লাগে না! আপনি ঠিকই বলেছেন, তাহলে আবার শুরু করবো না হয়?”
 
কায়ীরাভ মৃদু গলায় বলে,
“বললাম তো সবই তোমার ইচ্ছে, যদি তুমি চাও তো করবে।”
 
কায়েশীর চোখে তখন হালকা উজ্জ্বলতা দেখা দিলো। আসলেই কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়। সারাদিন এভাবে বসে থাকার মানেই হয় না। বিয়ের আগে কায়েশী কত কাজ করতো, ওর ভালো লাগতো সেভাবেই। কিন্তু এই বাড়িতে আসার পর সব পরিবর্তন হয়েছে। কায়েশীর জীবনধারাও। ভাবনা থেকে বেরিয়ে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে কায়েশী উচ্ছসিত হয়ে বলল,
“তাহলে শুরু করাই যাক। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে। আমার বাড়িতে দুটো লোহার টাঙ আছে। গহনা বানানোর অনেক সরঞ্জাম রাখা ছিলো ওটাতে। ওগুলো আনিয়ে দিলেই শুরু করতে পারবো।”
 
কায়রাভ সম্মতি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, লোক পাঠিয়ে আনিয়ে দেব।"
 
তারপর একটু থেমে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তবে একটা কথা।”
 
কায়েশী জিজ্ঞেস করে, 
“কি?”
 
কায়রাভ হাত ধুয়ে নেয়। তারপর শীতল দৃষ্টিতে কায়েশীর দিকে তাকিয়ে বলে,
“যা করবে, ঘরে বসেই করার চেষ্টা করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি না আমার বউ বাইরে কাজ-ফাজ করুক।”
 
কায়েশী থমকে গেলো এমন কথায়। চোখে বিস্ময় এলেও মুখে প্রতিবাদ করলো না। আসলে প্রতিবাদের মানেই পেলো না। অথচ সময়টা অন্যরকম থাকলে কায়েশী নিশ্চিত নারীবাদীদের ন্যায় মুখের উপর কথা শোনাতো। আরও দু'চারটে ভাষণ দিতো নারী স্বাধীনতা নিয়ে। মস্তিষ্ক তাকে ভাবালো, কোনো ভাবে কি কায়রাভ তাকে ঘরবন্দী করতে চাইছে কিংবা তার নারী স্বাধীনতা লঙ্ঘন করছে! এইসব অযাচিত ভাবনা যেনো কায়েশীর মুখেই প্রকাশ পাচ্ছিলো। সাড়ে চার বছরের সংসারে কায়েশীর নীরবতা দেখে কায়রাভ পড়ে ফেললো ওকে। এতক্ষনে কায়রাভের হুস এলো কি বলে ফেলেছে তা ভেবে। মাথায় আসা কথাটাই মুখে বলেছে কায়রাভ। চরম বোকামি! কায়রাভ নিজের ভুল বুঝতে পেরে আনমনে দু'চারটে গালিও দিলো নিজেকে। তারপর কায়রাভ ধীরে সুস্থে নিজেই বলল,
"হয়তো তুমি ভাবতে পারো যে এ কেমন ব্যাগডেটেড কথাবার্তা! আধুনিক যুগে নারীরা শুধু ঘরে থাকার জন্য না, তাদের স্বাধীনতা আছে, বাইরে কাজ করার অধিকার আছে, ব্লা ব্লা। আই নো, আমি জানি এসব। কিন্তু আমার কথা একটাই, যখন আমি আমার বউয়ের সব ধরনের চাহিদা পুরণ করতে সমর্থ, তখন তার বাইরে গিয়ে কাজ করাটাকে এপ্রেসিয়েট করতে পারছি না। এই বিষয়ে আ'ম এক্সট্রিমলি স্যরি, কায়েশী। আমায় ভুল বুঝো না তুমি।"
 
কায়েশী বুঝলো। কায়রাভের কথাটাও ভুল নয়। তাই ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“বুঝেছি। আমিও যে খুব আপডেট মেয়ে এমন না। আগে উপার্জন করতাম প্রয়োজন ছিলো বলে। আমাকে দেখার কেউ ছিলো না, নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হতো, স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু জানেন, আমার একটা ফ্যান্টা'সি ছিলো। যে বিয়ের পর আর এসব করবো না। আর পাঁচ'টা সাধারন নারীর মতো ঘর'টা আমি সামলাবো, বাইরে'টা আমার স্বামী। কারণ, আমার চাহিদা এতটাও বেশি নয় যে স্বামীর স্বল্প উপার্জনেও হবে না। আর সেদিক থেকে আপনার রোজগার মাশাল্লাহ অনেক ভালো। আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি এতে।"
 
কায়রাভ প্রসন্ন হলো কায়েশীর প্রতিটা কথায়। তার মুখে তখন তৃপ্তির ছায়া স্পষ্ট। কায়রাভ ভীষনভাবে সন্তুষ্ট হলো তার বউয়ের কথা শুনে। এদিকে কায়রাভ ভেবেছিলো তার কথায় ভুল না বুঝে বসে কায়েশী। তবুও সে নিশ্চিত হতে চাইলো,
“তোমার অনলাইন বিজনেসে বাইরে তো যেতে হবে না, তাই না?”
 
কায়েশী হালকা হেসে বলল,
“না। আমি এবার শুধু হ্যান্ড মেড জুয়েলারী নিয়ে শুরু করার কথা ভেবেছি। ড্রেসের কথা পরে ভাবা যাবে। তবে কিছু কাঁচামাল লাগবে, মালী চাচাকে লিস্ট দিলে তিনি'ই এনে দিতে পারবেন। আমি ঘরে বসেই বানাবো, পার্সেল রেডি করবো। ডেলিভারি ম্যান এসে নিয়ে যাবে। ব্যস, আমার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
 
কায়রাভ মাথা নেড়ে প্রসন্ন হেসে বলল,
“তাহলে ঠিক আছে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
 
কায়েশীর আলতো হাসলো। তার চোখে নতুন করে জেগে উঠলো পুরোনো দ্যুতি। তবে এবার তা সংসারের আঙিনার ভেতরেই। কায়রাভও বউয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু প্রশান্তি অনুভব করলো। সে ভেবেছিলো ভুল বোঝাবুঝি হবে, কিন্তু কায়েশী যেন দিন দিন আরও পরিণত হয়ে উঠছে। সংসারের মায়ায়, ভালোবাসার আবরণে, দুজন মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরকে বুঝতে শিখেছে। নিজ নিজ সীমা, স্বপ্ন আর সমঝোতার ভেতর দিয়ে। বিকেলের আলো ক্রমেই ফিকে হয়ে আসে। খাওয়া শেষে টেবিলের থালা-বাসন নিয়ে যায় কায়েশী। কায়রাভ ছেলেকে নিয়ে বউয়ের পিছু পিছু যায়। তাদের মাঝখানে যে সুন্দর বোঝাপড়া তৈরি হলো সেটা ভেবেই শান্তি শান্তি লাগছে কায়রাভের। মনটাই ভালো হয়ে গেলো কায়েশীর সুবিবেচক দিক থেকে। কায়েশী বেসিং এ বাসন ধুতে ধুতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করে বসলো, 
"আচ্ছা, আপনি কি খুব পসেসিভ ধরনের হাসব্যান্ড? মানে রেড ফ্ল্যাগ টাইপ আর কি?"
 
এমন প্রশ্নে কায়রাভ হকচকিয়ে যায়। বলল,
"এমন মনে হওয়ার কারণ?"
 
কায়েশী নিজের দু'কাঁধ ঝাকিয়ে বলল,
"এমনিই। আসলে আপনি চাইছেন না আপনার বউ বাইরে কাজ করুক। এমনটা তো এই টাইপের লোকেরা'ই বলে। আমার মনে হলো আর কি! "
 
কায়রাভ মৃদু গলায় বলল, 
"আমি পসেসিভ না রেড ফ্ল্যাগ, সেসবের কথা তো জানি না। তবে এটা ঠিক, আমি চাই না তুমি বাইরে কাজ করো। আর সেই ছুতোয় কেও তোমাকে দেখুক। কারণ, আমার স্ত্রীকে বাইরের কেও দেখবে তা আমার সহ্য হবে না, কায়েশী। একচুয়ালি আমার ভাবতেই রাগ লাগে। জানি, এটা হয়তো যুক্তির ভাষায় ঠিক শোনাবে না। তবুও, তোমাকে শুধু আমার চোখেদুটোই দেখবে। আমার ব্যক্তিগত মানুষটার সৌন্দর্যটুকু অন্য কারও দৃষ্টিতে ধরা দিবে সেটা আমি মেনে নিতে পারবো না। এতে আমি রেড ফ্ল্যাগ টাইপ পুরুষ হলে তাই সই।”
 
কায়রাভের কথায় কায়েশী চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো অদ্ভুত দৃষ্টিতে। কায়রাভের প্রতিটি কথাগুলো ভালোবাসা আর অধিকারবোধের সূক্ষ্ম দিক বোঝালো। সে বুঝতে পারলো, তার এই অনুভূতির ভেতরে যেমন গভীর টান আছে, তেমনি আছে এক অদৃশ্য খাঁচার ইঙ্গিতও। ভালোবাসা কারও ক্ষেত্রে মুক্ত আকাশ। আবার কারও দৃষ্টিতে সযত্নে রাখা সোনার খাঁচা। তবে হ্যাঁ, ভালো থাকাটাই আসল। সে সোনার খাঁচা হোক কিংবা মুক্ত আকাশ। 
 
*********************
 
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। সারা দিন রোদের নিচে দাঁড়িয়ে একটা বিল্ডিংয়ের দেয়াল তোলার কাজ করেছে কাবির। শরীরের হাড়গুলো আন্দোলন করে ক্লান্তির কথা বলছে। মালিক পক্ষ থেকে খাবারের অফার করলেও কাবিরের দলের কেও নেয় না, সেই খাবার খরচ মজুরিতে যোগ করা হয়। তাছাড়া কাবিরের দলের প্রায় সবার বিয়েসাদি হওয়ায় খাওয়া দাওয়া নিয়ে সমস্যা নেই। তাই মনে মনে কাবির ঠিক করেছিলো বাসায় ফিরে গা ধুয়ে একটু রান্না সেরে ভাত খেয়ে টানটান হয়ে একটা আরামের ঘুম দেবে।
 
যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া করে যেই না বিছানায় যাবে তার আগেই দরজার খটখট আওয়াজ কর্নগোচর হলো কাবিরের। শব্দটা কাবিরের টনক নড়ালো। তাই ত্রস্ত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতেই থমকে দাঁড়ালো কাবির। কারণ, এই সময়ে সামনের মানুষটি অপ্রত্যাশিত। দরজার সামনে প্রীতিষা দাঁড়িয়ে আছে। কাবির কস্মিনকালেও ভাবেনি এই মেয়ে, এই বিকেলে এভাবে তার বাসার সামনে এসে দাঁড়াবে। মেয়েটার পরনে হাঁটু পর্যন্ত ঢিলেঢালা গোলাপি টি-শার্ট, গলায় সাদা স্কার্ফ ঝোলানো। আসলেই বাচ্চা মেয়ে একটা! কিন্তু চেহারাটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে।কাবিরের স্থির তাকিয়ে থাকা দেখে প্রীতিষা ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“এখানে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি সারাদিন? ভেতরে তো আসতে বলো!”
 
কাবির হকচকিয়ে সরে দাঁড়ালো। বলল,
“ওহ…হুম..হুম, আসো। ভিতরে আসো।”
 
প্রীতিষা ভেতরে ঢুকে হাতের দুটো বই বিছানায় রাখলো ব্যস্ত ভঙ্গিতে। তারপর ধপ করেও নিজেও বসলো সেথায়। এরপর জোরে একটা নিশ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার ভার'টা একটু হালকা হলো বোধহয়। কাবির ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
“কাহিনি কী? হুট কইরা আমার বাসায় আইলা যে? কী হইছে?”
 
প্রীতিষা চোখ কুঁচকে খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলল,
“কেন? তোমার বাসায় এসেছি বলে অসুবিধা হচ্ছে নাকি? হলে বলো, চলে যাই!”
 
এমন কথায় কাবির হুরমুর করে বলে উঠলো, 
“আরে বে'ডি! ক্ষ্যাপো ক্যান? আমার বাসায় তোমার চরণধুলি পড়ছে এইডাই তো আমার কয় জন্মের সৌভাগ্য! আইছো, ধীরে সুস্থে বসো। আমার কোনো অসুবিধা নাই, উল্টা ভাল লাগতাছে!”
 
এই কথা বলে কাবির দুষ্টুমি করে হেহে-ধরনের হাসি হাসলো। তা দেখে প্রীতিষা সরু চোখে তাকালো। 
কাবির তখন অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকালো অবুঝ বালকের ন্যায়। প্রীতিষা এবার নিজে থেকেই বলতে শুরু করে, 
“হয়েছে কী জানো? বাড়িতে হুট করে আত্মীয়-স্বজন এসেছে সকালে। মানে কাজিনরা আর কি। আজ রাত অবধি আড্ডা চলবে। সারাদিন ফুসরতই পেলাম না পড়ার। বাচ্চারা এসেছে দৌড়াদৌড়ি করছে, হইচই করছে। মানে আজকে ভরা বাড়ি হয়ে গেছে, পড়ার মতো পরিবেশ নেই। কাউকে বলতেও পারছি না নিরব থাকতে। এক কাজিনকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি সে সামলাবে বাকিদের। ভাবছিলাম আমার বান্ধবী ইসরাতের বাসায় যাবো, কিন্তু ফোনে পাচ্ছি না ওকে। তারপর মনে হলো তোমার বাসা তো আরও কাছে, আর এখানে ডিস্টার্ব করারও কেউ নেই। তাই স্কুটি নিয়ে এক টানে চলে এলাম।”
 
কাবির ধীরে মাথা নাড়লো, 
“ভালো করছো।”
 
তারপর চোখ গেলো প্রীতিষার এলোমেলো চুলের দিকে। তাই প্রীতিষাকে হেসে বলল,
“আগে মাথা আঁচড়াও। পাগুল্লি পাগুল্লি লাগতাছে তোমারে!”
 
এই বলে ড্রয়ার খুলে একটা চিরুনি এগিয়ে দিলো প্রীতিষার দিকে। প্রীতিষা দ্বিমত না করে, আয়না না খুঁজে মোবাইলের কালো স্ক্রিনে নিজের ছায়া দেখে মাঝখানে সিঁথি করে চুল আঁচড়ালো। তাড়াহুড়োয় বাঁধা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে খোপা করলো।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, কোথায় পড়া যায় বলো তো? মানে বসবো কোথায়?”
 
কাবির ছোট্ট ঘরটার আশেপাশে তাকালো। দুই রুমের ঘর তার। কাবিরের রুমে একটা খাট, একপাশে ড্রয়ার, ওয়ারড্রব। প্রয়োজনীয় ফার্নিচার ছাড়া শৌখিন কোনো কিছু নেই। টিনের কোনায় পাটি গুটিয়ে রাখা। এক কথায় সাদামাটা একটা ঘর। তবে প্রীতিষার ভালো লাগলো। প্রীতিষা টেবিল জাতীয় কিছু না পেয়ে বিছানা দেখিয়ে বলল, 
"আচ্ছা কাবির, বিছানাতে'ই পড়ি তাহলে?"
 
কাবির ঠোঁট কামড়ে ভাবুক স্বরে বলল,
"সমস্যা না হইলে পড়ো! কিন্তু বেশিক্ষন পড়তে পারবা না বিছানায়। ঝুঁইকা পড়তে পড়তে ঘাড় ব্যাথা করবো!"
 
প্রীতিষা মাথা নাড়িয়ে বলল,
"তাও ঠিক।"
 
প্রীতিষা হতাশ হয়ে বিছানায় বসলো ওভাবেই। তারপর প্রিন্সিপাল অফ ম্যানেজমেন্ট বইটা হাতড়ে পড়াগুলো দেখে আরও হতাশ হলো সে।
 
"উ'ফ! কাবির! আমি এই সাবজেক্ট কিচ্ছু পারি না! কালকেও পরীক্ষা, অথচ প'ড়া হচ্ছেই না! কি যে হবে আমার! "
 
প্রীতিষা ভয়ার্ত গলায় ঠোঁট উল্টে বললো কথাগুলো। আতঙ্কিত হয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে কামড়ে তুলছে। তার বড্ড চিন্তা হচ্ছে কালকের পরীক্ষা'টা নিয়ে। ফেল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! সারাদিনে কিচ্ছুটি পড়া হয়নি। এখন বিকেল চারটে। তবে প্রীতিষা অন্তত আর যাইহোক ফেল করতে চায় না। শুধু নিজের জন্য নয়, তার ভাইয়ার সম্মানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এতে। ভাবতে ভাবতে সে অসহায় চোখে তাকালো কাবিরের দিকে।
 
কাবির বুঝলো সব। মেয়েটার এই অস্থিরতা, পড়াশোনার চাপ কিছুই তার চোখ এড়ালো না। তাই একটু ভেবে বলল,
"আচ্ছা, চিন্তা কইরো না। এক কাজ করো, তুমি আমার বারান্দায় পড়তে বসো। বাতাস আইতাছে দেখো। সুন্দর আবহাওয়া আছে আজকে। পড়ায় মন বসবো। আসো।"
 
প্রীতিষা তাই করলো। বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো কাবিরের পথ অনুসরণ করে। বারান্দাটা খোলা, গ্রিল নেই কোনো। সামান্য ধুলো পরে আছে মেঝেতে। মনে হলো অনেকদিন কেও এখানে আসে না। কাবির ঝাড়ু দিয়ে একপাশের ধুলো পরিস্কার করে একটা ম্যাট্রেস পেতে দিলো। আর পড়ার টেবিলের প্রক্সি হিসেবে দিলো একটি ছোট টেবিল। যেটাতে কাবির নিচে বসে খাবার খায়। একটা প্লেট আর গ্লাস রাখার মতো জায়গা রয়েছে এতে। সেখানে অনায়াসে প্রীতিষার একটা বই এঁটে যাবে। প্রীতিষা বই টেবিলে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বসে। কাবিরের কথায় স্বস্তি পেয়ে মনে হলো দুশ্চিন্তার গুমোট'টা একটু হলেও হালকা হয়েছে। তাই আত্মবিশ্বাসের সাথে বই খুলে পড়া শুরু করে সে। পড়তে পড়তে মাঝে সে বলল,
"শোনো কাবির, এগুলো তো রিটেন পড়া, শুধু মুখস্থ করবো। একটা করে অধ্যায় শেষ করে আমি নিজেই পড়া দেবো তোমায়। তুমি শুধু একটু শুনবে ভালো করে। ওকে?"
 
কাবিরের এমনিতেও বাড়িতে এখন কোনো কাজ নেই। তাই প্রীতিষাকে সময় দেওয়াই যায়। এই ভেবে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ালো কাবির। বাধ্য বাচ্চার ন্যায় বলল,
"আচ্ছা, পড়া দিও শেষ হইলে। আমি শুনবো নে।"
 
এরপর কাবির একটু দূরে ম্যাট্রেসের শেষ প্রান্তে আধশোয়া হয়ে বসে যায় দেয়াল ঘেঁষে। খানিকটা সময় পেরোলে একভাবে না থাকতে পেরে একটু কাত হয়। শোয়ার ভঙ্গিতে এক হাত ভাজ করে মাথাটা হাতের তালুতে রেখে প্রীতিষার পড়া দেখছিলো সে। প্রীতিষা পড়া শেষ হলে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে ক্রমাগত পড়া দিয়ে যাচ্ছিলো তাকে। কখনো ব্যাখ্যা, কখনো সংক্ষিপ্ত বাক্যে। প্রীতিষার সকল ধ্যান-জ্ঞান এখন শুধুমাত্র পড়াশোনায় নিবিষ্ট। এদিকে কাবির স্থির চোখে তাকিয়ে আছে গোলগাল মেয়েটার দিকে। তবে পড়া শুনছে নাকি প্রীতিষাকে দেখছে তা বোঝা গেলো না। কিন্তু ওকে দেখে খুবই মনোযোগী শ্রোতা লাগছে। যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ এটা, প্রীতিষার মুখনিঃসৃত বাক্যগুলো শোনা। হঠাৎ করেই অনুভব করলো বুকের বা পাশটায় চিনচিন করছে কেমন যেনো! কাবির চেষ্টা করলো না ব্যাথাটাকে প্রশমিত করার। হোক না এমন ব্যাথা! একটা সুখানুভূতির আবেশে চোখ দুটো মিনিট খানিকের মতো বুজে আবার তৈরি হলো প্রীতিষার দিকে মনোযোগ দিতে।
 
চলমান.......
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৪
 
 
সন্ধ্যা ঠিক সাতটা। আকাশের গায়ে ম্লান কমলা রঙের শেষ আঁচর। সারাদিনের হাসিমাখা মুখ থাকলেও ক্লান্তি নেমে এসেছে চারদিকে। ট্যুরের শেষ বিকেলটা কারও মনেই শেষ হতে চাইছিলো না। বন্ধুদের সঙ্গে হাসি, নির্ভার আড্ডা, ছোট ছোট দুষ্টুমি, সব মিলিয়ে দিনটা ছিলো রোদেলা স্মৃতির মতো উজ্জ্বল। কায়রার মনও ছিলো প্রশান্ত। প্রায় একঘন্টার মতো প্রীষান স্যারের সাথে কথা হয়েছে সেই পাথরে বসে। যদিও পরিবার-পরিজন নিয়েই কথা হয়েছে। তবে কায়রা অবাক ছিলো পুরোটা সময়। কিন্তু মনটা অচেনা ভালো লাগায় ভরে গেছিলো প্রীষানের এই স্বাভাবিকতায়।
এমন সময় প্রীষান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডাক দিলো ভারী কন্ঠে,
"ডিয়ার স্টুডেন্ট'স, আফটার ফিফটিন মিনিট'স উই’ল গেট অন দ্য বাস। সো এভরিওয়ান, প্যাক আপ ইয়্যুর ব্যাকপ্যাকস অ্যান্ড গ্যাদার ইয়্যুর আদার বিলংগিং'স।"
 
কথাগুলো শুনে দলবদ্ধ কোলাহল একটু শৃঙ্খলায় বাঁধা পড়লো। এবার সবাই ব্যস্ত হলো গোছগাছে। কেউ ব্যাগের চেইন টানছে গোছানো শেষে, কেউ পানির বোতল ভরছে। কেউবা শেষবারের মতো ছবি তুলছে প্রাকৃতিক দৃশ্যের। দুটো বাস মেইন রোডে দাঁড়িয়ে। হেডলাইটগুলো সন্ধ্যার অন্ধকারকে ঠেলে রাখার চেষ্টা করছে। কায়রা নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলো বাসের উদ্দেশ্য। হাঁটতে হাঁটতে তার গলার স্কার্ফটা বাতাসে একটু দুলে উঠছিলো। ঠিক তখনই জিহাদ ডেকে উঠলো,
“কায়রা, সব নিয়েছিস তো ঠিকভাবে? কিছু ফেলে যাস না আবার!”
 
দিপ্তিও নিজের ব্যাগ দেখতে দেখতে সায় দিলো,
“হ্যাঁ, ভালো করে চেক কর।”
 
কায়রা হেসে বলল,
“সব নিয়েছি। আর তোদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না আমার জন্য, তোরা এগোতে থাক। আমি একটা স্ট্রবেরি জুস নিয়েই আসছি, যেতে যেতে খাবো।”
 
জিহাদ হেসে হাত নেড়ে বলল,
“আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আয়।”
 
কায়রা নিজের ভাইদের নিজের আপডেট মেসেজ জানিয়ে দৌড়ে সামনের দোকান থেকে একটা স্ট্রবেরি জুস নিলো। ছোট্ট কাচের বোতলটা হাতে নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করলো বাসের দিকে। সে জানতো না, শকুনি দুই চোখ জোড়া তাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অনুসরণ করছে। দুটি ছেলে বাইক নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। কেয়ার পেছন পেছন ধীরে ধীরে বাইক নিয়ে এগোচ্ছিলো। তাদের গতিতে ছিলো হিসেবি স্থিরতা। এবার তাদের উদ্দেশ্য সাধনের উপযুক্ত সময় এসেছে। আশেপাশে লোকজন কম। পেছনে বসা ছেলেটি এক হাতে গ্লাভস পরে নিলো। অন্য হাতে ধরা একটি কাচের শিশি। ভেতরের তরল পদার্থ টগবগ করছে দাহনশক্তি বহন করে। হ্যাঁ, হাইড্রোক্লোরিক এসিড এটি। যা তারা পরিকল্পিতভাবেই এনেছে।
ছেলেটা চারপাশে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে চলন্ত বাইক থেকে সামান্য ঝুঁকে পড়লো। 
 
বাস আর কায়রার মাঝের দূরত্ব তখন খুব বেশি নয়। জিহাদ, দিপ্তিরা অনেকটাই সামনে। প্রীষানও এগিয়ে গিয়েছিলো। কায়রা ঝুঁকে পড়েছিলো নিজের শু-লেস ঠিক করবে বলে। ঠিক তখনই ছেলেটি শিশির ভেতরের তরলটি ছুড়ে দিলো কায়রার দিকে। তারপর সর্বোচ্চ বেগে বাইক নিয়ে ছুটে গেলো লোকচক্ষুর আড়ালে। কায়রা বাসে উঠেই পরতো কিন্তু তার আগেই ঘটলো এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি। 
 
সবকিছু ঘটলো এক নিমেষে, চোখের পলকে! 
 
যদিও কায়রার মুখ বরাবর লক্ষ্য ছিলো তাদের, কিন্তু সে ঝুঁকে যাওয়ায় তরলটি গিয়ে পড়লো তার পিঠে। তরলটা গায়ে পড়ার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। তারপর হঠাৎ একটা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া শব্দ ফেটে বেরোলো তার বুকের ভেতর থেকে। ওটা শুধু চিৎকার ছিলো না, ওটা ছিলো আতঙ্ক, যন্ত্রণা আর অবিশ্বাসের একত্র বিস্ফোরণ।
পরমুহূর্তেই তার কন্ঠ থেকে উঠে এলো অমানবিক চিৎকার। তার কণ্ঠ এক লহমায় ভেঙে গেলো। গলা ফেটে বেরোতে লাগল তীক্ষ্ণ, কর্কশ মেয়েলি আর্তনাদ। হাতের ব্যাগ ছিটকে পড়ে গেলো রাস্তায়। তার পিঠের চামড়া মুহূর্তেই জ্বলে উঠলো। জামা কুঁচকে গেলো। তীব্র দাহে শরীর কেঁপে উঠলো।
 
শব্দটা এত তীব্র ছিলো যে আশেপাশের কথাবার্তা, সড়কের গাড়ির হর্ন, মানুষের হাঁকডাক সব স্তব্ধ হয়ে গেলো। সময় নিজেই থমকে দাঁড়ালো সেই আওয়াজে। তার চিৎকারে ছিলো হঠাৎ করে গলা কেটে ফেলা মুরগির মতো ছটফটানি। প্রতিটা নিঃশ্বাসে যন্ত্রনা অনুভুত হচ্ছে, আর প্রতিটা শব্দ বেরোচ্ছে ছিন্ন গলার ভেতর দিয়ে। সে চিৎকার করছিলো শুধু ব্যথায় নয়। ভয়ে, অপমানে, অসহায়তায়। কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে কর্কশ হয়ে উঠছিলো, তবু থামছিলো না। মনে হচ্ছিলো, তার চিৎকার আকাশ ফুঁড়ে ওপরে উঠছে। শেষদিকে শব্দটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিলো। পূর্ণ আর্তনাদ আর বেরোচ্ছে না। শুধু কাঁপা, ছিন্ন শ্বাসের শব্দ ক্ষীন হচ্ছিলো ক্রমেই। তারপর একসময় সেই ভয়ংকর চিৎকার হঠাৎ থেমে যায়। আর সেই থেমে যাওয়া, চারপাশের নীরবতার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে যায়। 
    
অকস্মাৎ গগনবিদারী চিৎকারে ইলেকট্রিক তারে বসে থাকা পাখিরা হুড়মুড় করে উড়ে গেলো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে। বাসের ভেতর থেকে সবাই ছুটে বেরিয়ে এলো। জিহাদ আর দিপ্তি পেছনে তাকিয়ে জমে গেলো। কায়রার আর্তচিৎকারে প্রীষান ঘুরে তাকাতেই দেখলো কায়রা রাস্তায় লুটিয়ে ছটফট করছে। ঠিক তখনই নিয়তির নির্মমতা আরও একবার ঝাঁপিয়ে পড়লো। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে, গর্জন তুলে একটি চলন্ত ট্রাক ছুটে এলো অভিপ্রেতভাবে। আর চোখের পলকে কায়রার বাম পায়ের হাঁটুর উপর দিয়ে চলে গেলো উচ্চ বেগে। কায়রার পা থেকে রক্তের বর্ষন হলো। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো আতঙ্ক, আর আকাশের বুক চিরে ওঠা চিৎকার মিলিয়ে গেলো এক গভীর, স্তব্ধ শূন্যতায়। এইসব ঘটনাগুলো যেনো প্রাক্‌পরিকল্পিত ছিলো। 
 
প্রীষানের হাত থেকেও ব্যাগ পড়ে গেলো। পৃথিবীটা এক মুহূর্তে শব্দহীন হয়ে গেলো তার কাছে। প্রীষান স্তব্ধ হয়ে যায়, হুস-জ্ঞান লোপ পায় ওর। তারপর হুঁশ ফিরতেই সে দৌড়ে গেলো কায়রার কাছে। চারপাশে আতঙ্ক, কান্না, চিৎকার। কেউ মুখ চেপে ধরেছে, কেউ কাঁপছে, কেউ বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। ততক্ষনে জিহাদ দিপ্তিসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ভির করছে ঘটনাস্থলে।
 
কায়রার পিঠের কাপড় গলে কুঁচকে গেছে, পা থেকে গলগল করে পড়া লাল রক্ত আর দগ্ধ ত্বকের বিভীষিকা রাস্তার ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে। তার শরীর যন্ত্রণায় কাঁপছে। শ্বাস কেঁপে কেঁপে উঠছে। তারপর হঠাৎই সেই কণ্ঠরোধ করা আর্তনাদ থেমে গেলো। সে অচেতন হয়ে পড়লো প্রীষানের বুকেই। প্রীষান তাকে দু’হাতে আগলে ধরে। বার-কয়েক কায়রার গালে চাপড় দিয়ে ডাকলেও সাড়া আসে না। এরপর প্রীষান কাঁপা গলায় বিকারগ্রস্তের ন্যায় চিৎকার করে উঠলো,
“এম্বুলেন্সে কল করো, কুইক!”
 
সন্ধ্যার আকাশ তখন সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢেকে গেছে। দিনের সব হাসি, সব উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই ছাই হয়ে উড়ে গেলো বাতাসে। শুধু রাস্তায় পড়ে রইলো এক নিষ্ঠুর ঘটনার দগদগে দাগ। আর কয়েকজন তরুণ হৃদয়ের ভেঙে পড়া চেহারা। তারা স্বচক্ষে সাক্ষী হলো এই হৃদয় বিদারক ঘটনার। 
 
****************************
 
হাসপাতালের কেবিনের নীরবতা বিরাজমান। সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কায়রা ভর্তি। কেবিনের বাইরে প্রীষান আর আমিনুল স্যার বসে আছে। দিপ্তি আর জিহাদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মনোযোগ পুরোটা ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দরজায়, যেখানে কায়রা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রধান শিক্ষক নির্দেশ দিয়েছেন বাকি শিক্ষার্থীদের যথাসময়ে ফিরিয়ে আনার জন্য। কায়রার দুই ভাইকেও জানানো হয়েছে সম্পুর্ন ঘটনা। তারা ইতিমধ্যে ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে আসছে সিলেটের পথে।
 
ততক্ষণে সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়েছে ব্রেকিং নিউজের মর্যাদা পেয়ে। হেডলাইন পুরো শহরের আকাশ ঢেকে দিয়েছে।
"এমপি কায়রাভ তাজওয়ার খানের বোন এসিডে দগ্ধ।"
 
বড় বড় অক্ষরে লেখা এই শিরোনাম সবার নজরে পড়েছে। কিন্তু হেডলাইনের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং অযাচিত তত্ত্বের ঝড়। কায়রার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া গুজব মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমে। মানুষ একে অপরের কণ্ঠে, ছায়ায়, অনলাইন ফিডে একটুখানি সত্য আর অনেকে অন্ধ বিশ্বাস মিশিয়ে খবর ছড়াচ্ছে। কেউ বলছে, এটি প্রেম-সংক্রান্ত সম্পর্কের ফল, আবার কেউ আঙুল তুলছে রাজনৈতিক বা পারিবারিক যুক্তিতে। কিন্তু এই সব অনুমান, শুধুই কল্পনার খেলা। বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। শহরের মানুষ কেউ শিউরে উঠে খবর জেনে। কেউ কৌতূহলে চোখ বড় করে, কেউ আবার কেবল থমকে দাঁড়ায় খবর শুনে। যদিও এমন ঘটনা অহরহ ঘটে এদেশে। এমপির বোন হওয়ায় আজকের ঘটনার রেওয়াজটা একটু বেশি হচ্ছে। 
 
এদিকে কায়রার পাশে থাকা প্রিয় মানুষদের মনে হাহাকার। বাড়ির লোকেরা না জানি কি অবস্থায় আছে! তারা জানে, খবরের অন্ধ্রুগুলো কখনো সত্যের সঙ্গে যায় না। কিন্তু এর ভেতরে ঢুকে পড়া অযাচিত শব্দ, হাহাকার, এবং অপূর্ণ বোধ সব মিলিয়ে নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে তাদের জন্য। 
 
এদিকে দিপ্তি হু হু করে কাঁদছে। জিহাদ তার কাঁধে হাত রাখে সন্তপর্ণে। আর ধীরে ধীরে শান্ত করার চেষ্টা করে মেয়েটাকে। প্রীষান হাসপাতালের কেবিনের বাইরে চেয়ারে বসে আছে আমিনুল স্যারের পাশে।  
দু-হাত মুঠো করে চোখ বন্ধ করে সে ঝুঁকে আছে। চোখ বন্ধ হলেও চোখের ভেতর আগের ঘটনাটা ভেসে উঠছে। প্রীষানের শার্টে এখনো রক্ত লেগে। প্রীষানকে দেখলে বোঝা যাচ্ছে না, এখন ওর ভেতরের কি পরিমাণ ঝড় বইছে। এইতো কয়েক ঘণ্টা আগে স্বাভাবিক কথোপকথনের হলো দুজনার। নিয়তির নির্মমতা, সময়ের নিষ্ঠুরতা সবকিছু এক মুহূর্তে বিপর্যয় এনে দিলো। প্রীষান নিজেকে মনে মনে দোষারোপ করছে। যেহেতু সব শিক্ষার্থী তার তত্ত্বাবধানে ছিলো। কায়রাও তার তত্ত্বাবধানেই ছিলো, তাই এর দোষও তার। এর দায়ও তার। 'সবকিছু আমার দোষ।' মনের মধ্যে বারবার গর্জন করছে এই শব্দগুলো। হাসপাতালের ঘড়ির কাঁটা তিন ঘণ্টা অতিক্রম করেছে। 
 
এরই মধ্যে আগমন ঘটে কায়রাভ ও কাবিরের। দুই ভাই একসাথে হিংস্রভাবে পা ফেলে এসেছে। তাদের চোখ-মুখ লাল, রক্তে ভেজা। কায়রাভ জিহাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ,
“কোন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে কায়রাকে?”
 
জিহাদ হাত বাড়িয়ে সামনের ওয়ার্ডের দিকে ইশারা করলো। কায়রাভ ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজার হাত রাখলো এবং অবশেষে নিচে বসে পড়লো ধপ করে। কাবির মানসিকতার দিক থেকে কায়রাভের চেয়ে অনেকাংশে শক্তিশালী। ওর সহ্য ক্ষমতা হাজার গুন বেশি। তাই এই ঘটনায় কায়রাভ দুর্বল হলেও কাবির শান্ত রয়েছে। কিন্তু কষ্টের মাত্রা কেও কারও চেয়ে কম নয়। কায়রাভের কণ্ঠে ঝরলো এক মৃদু বিষণ্ণ আওয়াজ,
“আমার বোনটা বাঁচবে তো?”
 
প্রীষানের টনক নড়লো। সেও আতঁকে উঠে বাঁচা-মরার প্রশ্নে। কায়রাভের কথায় কাবির আতঙ্কিত হয়ে তার দিকে ঘুরে তাকালো,
“ভাইজান, চুপ করো! এসব কী কইতাছো?”
 
কায়রাভের ম্লান কণ্ঠে বলল,
“এজন্যই তো আমি বোনটাকে চোখের আড়াল হতে দিতাম না। ওর এই ট্যুরে আসাতেও রাজি ছিলাম না। তোর কথায় আমি রাজি হয়েছিলাম, কাবির!”
 
কাবির চমকে উঠে মলিন চোখে তাকায় বড় ভাইয়ের দিকে। মলিন স্বরে বলল,
“তুমি কি আমারে দোষারোপ করতাছো, ভাইজান?”
 
কায়রাভ হালকা তাচ্ছিল্য হাসি দিলো। সব কষ্টের মাঝেও সে কিছুটা নির্লিপ্ত। প্রীষান তখন দৃঢ় গলায় বলল,
“একে অপরকে অযথা দোষারোপ করা বন্ধ করুন। এই পরিস্থিতিতে ভেঙে না পরে সংযম ধরার চেষ্টা করুন। জানি কঠিন তবে, এছাড়া আর কিছু করার নেই। শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে দোয়া করা ছাড়া।"
 
কায়রাভ চোখ সরিয়ে প্রীষানের দিকে তাকালো। সুর্দশন পুরুষটির গায়ের শার্ট রক্তে ভেজা। কায়রাভ অনুমান করে নিলো কায়রার রক্ত হয়তো। তাই অবাক হয়ে বলল,
“আপনি?”
 
প্রীষান দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি প্রীষান শেখ। কায়রার শিক্ষক।”
 
কাবির তখন জিহাদ ও দিপ্তির দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। শীতল গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তোমরা কায়রার বন্ধু না? ওই ঘটনার সময় কোথায় আছিলা?”
 
দিপ্তি নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, বাসের কাছে সড়কে। কায়রা তখন জুস কিনতে গিয়েছিলো। জুস হাতে আমাদের দিকেই আসছিলো, তখনই এই দূঘটনা ঘটে।”
 
কাবির শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভারী গলায় বলল,
“যা যা দেখছো এখন একে একে সব খুইলা কও, উইথ ডিটেইলস!”
 
জিহাদ মুখ খুললো। দিপ্তিও যা দেখেছে তার মতো করে কথা শুরু করলো। প্রতিটি কথা এক এক করে এক রহস্যময় জট খুলছে। তবে অস্পষ্ট। তাদের চোখে মিশে যাচ্ছে ভয়ের সঙ্গে অশ্রু।
 
-----------------------------------
 
দীর্ঘ তিন ঘন্টা অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরলে কায়রা চোখ খোলে, ধীরে ধীরে। পৃথিবীর আলো দেখে চোখে ভরে। কিন্তু সে কথা বলতে পারছে না, এক ফোঁটা শব্দও নেই চঞ্চল ঠোঁটে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাতে ক্যানোলা। বাম পায়ে হাঁটুতে ব্যান্ডেজ। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছটফটে শরীরটা শীর্ন ও রুগ্ন লাগছে। যুদ্ধ করে রুহ তার শরীরে ফিরেছে। কিন্তু তার জীবনের চরম সত্য এখনো সে জানে না। জানানো হয় নি তাকে। কায়রার হাঁটুর নিচ থেকে পা কর্তন করা হয়েছে। ভাইদের সম্মতি নিয়েই। প্রথমে ডাক্তারের মুখে কায়রার পায়ের ব্যাপারে শুনে দুজনেই স্তব্ধ হয়ে ছিলো। ডাক্তার বলেছেন, পায়ের হাড় ও পেশী যতটুকু ধ্বংস হয়েছে তাতে সেটি আর পুনর্গঠনযোগ্য নয়। মাংসপেশী, লিগামেন্ট ও নাড়ি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পায়ের কার্যকারিতা ফেরানো সম্ভব নয়। পায়ে রক্ত চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং টিস্যু মরতে শুরু করেছে। এখন আবেগের উপর ভিত্তি করে পা রাখা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে পা না কেটে রাখলে কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে জীবন হুমকিতে পড়বে কায়রার।
 
এইসব শুনে তারা মনকে বুঝিয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলো। এছাড়া বোনকে বাঁচানো যেতো না। নাহলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো কায়রার। কাবির আর কায়রাভ দুই ভাই এখন নির্লিপ্ত, চোখের অশ্রু শুকিয়েছে। শুধু একটাই দোয়া, বোনটাকে বাঁচানো। চেয়ারে স্থির হয়ে বসেছিলো কায়রাভ। মাথা হালকা ব্যথায় দোল খাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, কিভাবে এই সত্যটা কায়রার কাছে পৌঁছাবে? ওর আর্তনাদ, ওর আতঙ্ক কীভাবে সহ্য করবে তারা? চোখে অজান্তে ভয় আর অসহনীয় যন্ত্রণা উঁকি দিচ্ছে এসব ভেবে। না জানি মেয়েটা সত্যিটা মানতে কত যন্ত্রণা হয়। ভাই হয়ে সেই যন্ত্রনার উপশম করতে পারবে না, সম্ভব না।
 
হাসপাতালের নীরবতা কেবল ঘড়ির টিকটক শব্দে ভেঙে যাচ্ছে। ডাক্তার অস্ত্রোপচার শেষে বাইরে এসে বলে গেলেন,
"পেসেন্ট আউট অফ ডেন্জার। একটু পর কেবিনে দেওয়া হবে। আধঘণ্টা পর থেকে দেখা করতে পারবেন। তবে একজন একজন প্লিজ।"
 
দুই ভাই একসাথে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। প্রীষান এখনও যায়নি কোথাও। জিহাদ আর দিপ্তিকে আমিনুল স্যারের সাথে পাঠানো হয়েছে। কায়রাভ নিঃশব্দে বসে থাকে সেখানেও। ভিতরে চিন্তা আর দুঃখের পাহাড় একটু কমলো। কায়রাকে সত্যটা মানানোর জন্য প্রস্তুতি, ধৈর্য্য আর নিঃশব্দ ভালোবাসা এই তিনটাই এখন তাদের অস্ত্র। হাসপাতালের স্থানটি নীরব। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অজানা আশা আর অদ্ভুত শান্তি। কাবির নিচে একপাশে বসে আছে। সে ভাবছে সামনে যে কষ্টের মুহূর্ত আসবে তা ধীরে ধীরে মোকাবেলা করতে হবে। বোনের চোখে আর্তনাদ সামলাতে হবে দুজনকে। এখন শুধু সময়ই পারে বলতে কায়রার হৃদয় কতটা শক্ত। আর কায়রাভ এবং কাবির কতটা ধৈর্য্যবান নিজেদের বোনকে সামলাতে। তাছাড়া বোনের জীবনের চেয়ে ভবিষ্যতের চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ নয় তাদের কাছে। ভবিষ্যতে যাইহোক না কেন, বোনকে সারাজীবন পালার সামর্থ্য তাদের দুই ভাইয়ের ঢের আছে। 
 
চলমান.......
 
 
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Page 1 / 7
Share:

Loading spinner