পর্বসংখ্যা:২৩
কায়েশী আজ দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছিলো। কায়রা বাড়িতে নেই, কায়রাভও এখনো বাড়ি ফেরেনি। বাড়িটা পুরো ফাঁকা, শুধু মা-ছেলেই রয়েছে। তাই সকালটা একপ্রকার অলসতায় কেটেছে বলা যায়। তবে সংসারের নিত্যদিনের কাজের থেকে অবসর নেই। রান্নাবান্না করে কায়ানকে খাইয়ে দিয়ে খেলার জন্য বিছানায় বসিয়ে রেখে কায়েশী বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষন অলস ভঙ্গিতে পায়চারি করলো।
কায়রাভের অপেক্ষায় না সময় পার করতে,কে জানে? সময়টা ধীর গতিতে এগোচ্ছে নাকি কায়েশী বড্ড ছটফট করছে জানা নেই। অপ্রত্যাশিত মনোচলন থামিয়ে আবার ভাবতে শুরু করলো এবার কি করা যায়? দুপুরের রান্নাটাও শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। এখন, কি করবে সে? তখনি মনে হলো, বই পড়া যাক।
ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে যাওয়ার আগে কায়ানকে সে বলে গিয়েছিলো ফুপির ঘরে যাচ্ছে। তাকে যেন আবার এলোমেলো ভাবে না খোঁজে। এই বলে কায়েশী ধীর গতিতে কায়রার ঘরের দিকে এগোলো। কায়রার রুমে সাজানো-গোছানো একটি ছোট্ট লাইব্রেরি ছিলো। যেখানে হরেক রকম বইয়ের সমাহার। সেখান থেকে একটা ধুসর রঙা প্রচ্ছদের বই বাছাই করলো কায়েশী। চকচকে নতুন বইটাকে উল্টে-পাল্টে প্রচ্ছদ'টা দেখলো সে। অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় লাগছে। ঘোড়ার উপর বসা একজন রাজার হাতে তড়োয়াল, এমন কভার। বইটার নাম রাজসিংহ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। প্রচ্ছদ দেখার পর ক্রমেই পড়ার কৌতুহল বেশ তীব্র হচ্ছে তার।
বইটি নিয়ে সে ডিভানে আরাম করে বসলো। পাতাগুলো উল্টাতে-উল্টাতে ঘ্রান নিলো নতুন বইয়ের। নতুন বইয়ের ঘ্রান কায়েশীর বড্ড প্রিয়।ছোটবেলায় নতুন বই কিনলে আগে এভাবে ঘ্রান নিতো সে। এবার প্রথম পৃষ্ঠায় পড়া শুরু করে নিমগ্ন হয়ে গেলো কাহিনিতে। কিন্তু হঠাৎ, পরিচিত এক পুরুষালি কণ্ঠে ভেসে এলো ডাক,
“কায়েশী…”
কায়েশী বই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মাথা তুললো। দেখলো কায়রাভ এসেছে। তার মুখটা কেমন ম্লান লাগছে। ক্লান্তি লেগে চোখে মুখে। হয়তো দীর্ঘসময়ের যাত্রার ফলে। কায়েশী কিছু বলার আগেই কায়রাভ ধীরে, নিঃশব্দে কায়েশীর কাছে এগিয়ে এলো।অকস্মাৎভাবে তার বলিষ্ঠ বাহুদ্বারা কায়েশীর শীর্নকায় দেহকে বন্দী করলো এক নিমেষে। হুট করেই স্বামীর কাছে আপোষহীনভাবে আবৃত হলো কায়েশী। ঘটনা বুঝতে কায়েশী হকচকিয়ে তাকালো। তখন মাথা ঠেকেছে কায়রাভের বুকের সাথে লেপ্টে।
কিছুক্ষণ পর কায়েশী শক্ত বাহুবন্ধন হতে মুক্তি পেয়ে ধিমি গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? সব ঠিক আছে তো? হঠাৎ আমাকে...”
মুখের বাক্য শেষ করতে না দিয়েই কায়রাভ মৃদু গলায় বলল,
“বউকে জড়িয়ে ধরতে কি কারণ লাগে? আর যদি কারণ চাও, তাহলেও বলতে পারি।”
কায়েশী অদ্ভুত চোখে তাকালো। কোনো ভাব ছাড়াই বলল,
“আপনি সচরাচর আমার সাথে এমন করেন না। তাই হঠাৎ এমন করায় আমি ভাবলাম...”
কায়রাভ তির্যক হেসে কায়েশীর গালে হাত রেখে মৃদু গলায় বলল,
“হ্যাঁ, বুঝেছি। তাহলে কারণ'টা শোনো, আঠারো ঘন্টা বউ থেকে দূরে ছিলাম, তাই এনার্জি ছিলো না। এইযে চার্জ করে নিলাম, এখন ভালো লাগছে।”
কায়েশী এবার বুঝলো লোকটার এমন কাজকারবারের কারণ। কুচকানো ভ্রু সোজা হয়ে এলো। তাই মেকি হেসে অবজ্ঞার সুরে বলল,
“ফ্লা'র্টি লাইন বলছেন? লাভ নেই। পটবো না এভাবে!”
"তো কিভাবে পটবে বলে যাও, কায়েশী ফারিয়াহ্! আ'ম ডায়িং টু হিয়ার দি'স!"
"আজগুবি কথাবার্তা বাদ দিয়ে খেতে আসুন!"
কায়েশীকে বিরক্ত করতে পেরে হো হো করে আবার সেই গা জ্বালানো হাসিটা ছুড়লো কায়রাভ। কায়েশী সেসব শুনে আর এক মুহুর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো। আর মনে মনে ভাবলো, এই লোক যদি চুপচাপ থাকতো, তাহলেই বরং সন্দেহ হতো তার। এখন আবার নিজের অতি অসভ্য সত্তায় ফিরে এসেছে ব'দ লোক! তাই সবকিছু এইবার স্বাভাবিক লাগছে। এইসব ভেবে তরকারিটা গরম করতে করতে কায়েশী ভারী নিশ্বাস ফেললো।
----------------------
আগেভাগে রান্না করায় দুপুরের ভাত ঠান্ডা হয়ে এসেছিলো। কায়েশী ওভেন থেকে মাত্রই গরম করে আনলো কায়রাভের জন্য। টেবিলের একপাশে সদ্য গরম করা তরকারির তপ্ততা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কায়রাভ চেয়ারে বসে কায়ানকে কোলে নিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছে, মাঝে মাঝে ছোট ছোট লোকমা তুলে দিচ্ছে কায়ানের মুখে। কায়ান আজ তার বাবার কাছে খাবে। কায়ানের জন্য কম ঝাল দিয়ে রান্না করা শিং মাছটা নিজের প্লেটে নিয়ে মাছের কাঁটা বেছে অতি সাবধানে বাচ্চাটাকে খাইয়ে দিচ্ছে কায়ারভ। কায়ান আজ বরাবরের মতো শান্ত বাচ্চা হয়ে রয়েছে বাবার কাছে। কায়ান তার বাবার কাছে দুরন্তপনা'টা ঠিক দেখায় না। একদম ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকে। ওর সব দুরন্তপনা ওর মা আর চাচ্চুর কাছে।
টেবিলের পাশে আরেকটা চেয়ারে বসে কায়েশী নিঃশব্দে বাবা-ছেলের সুন্দর দৃশ্যটা দেখছে। তার চোখে একপ্রকার তৃপ্তি। এই সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তার জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে অনেক আগেই। ড্রয়িং রুমের বড় জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো টেবিলের ওপর পড়েছে। হঠাৎ কায়রাভ খাওয়া থামিয়ে কায়েশীর দিকে একপলক তাকালো। তার দৃষ্টিতে কি ছিলো বোঝা গেলো না। চোখ না সরিয়ে নরম কন্ঠেই জিজ্ঞেস করে,
“কায়েশী, তুমি চাইলে তোমার বিজনেস'টা আবার শুরু করতে পারো।”
হঠাৎ এমন কথা বলায় কায়েশীর কথাটা ধরতে একটু দেরি হলো। তাই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কিসের বিজনেস?”
কায়রাভ কায়ানের মুখে শেষ লোকমাটা দিয়ে ধীরে বলল,
“বিয়ের আগে যে অনলাইন বিজনেস করতে তার কথা বলছি। ওইযে অর্নামেন্টস, ড্রেস… সেসব।”
কায়েশীর চোখে বিস্ময়রেখা দৃঢ় হলো। সে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে আছে। বলল,
“হঠাৎ এই কথা কেন বলেছেন?”
কায়রাভ গলায় শান্তভাব বজায় রেখে বলল,
“হঠাৎই মাথায় এলো। বাসায় বেশিরভাগ সময় একাই থাকো। কাজের মধ্যে থাকলে সময়'টা ভালো কাটবে, একাকিত্ব কমবে। আর তুমি তো আত্মনির্ভরশীল ছিলে সবসময়। নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া খারাপ না।”
কায়েশী কণ্ঠে মৃদু হতাশার সাথে বল,
“এখন আর ওসব করে কী হবে?”
কায়রাভ মুচকি হেসে তাকালো তার দিকে। তারপর হেসেই বলল,
“কেন? শুধু সংসার করতেই আগ্রহী তুমি? অবশ্য তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমার কথা ভেবেই বলেছি। এখন তুমি যা ভালো বোঝো। ”
কায়েশী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ভেবে আস্তে করে বলল,
“সংসার তো করছি'ই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় আসলেই কাটতে চায় না। রান্না ছাড়া আমি কোনো কাজই খুঁজে পাই না। বাকিসব তো চাচি আম্মাই করে দিয়ে যায়। সেই তো সারাদিন শুয়ে বসে থাকা….. ভালো লাগে না! আপনি ঠিকই বলেছেন, তাহলে আবার শুরু করবো না হয়?”
কায়ীরাভ মৃদু গলায় বলে,
“বললাম তো সবই তোমার ইচ্ছে, যদি তুমি চাও তো করবে।”
কায়েশীর চোখে তখন হালকা উজ্জ্বলতা দেখা দিলো। আসলেই কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়। সারাদিন এভাবে বসে থাকার মানেই হয় না। বিয়ের আগে কায়েশী কত কাজ করতো, ওর ভালো লাগতো সেভাবেই। কিন্তু এই বাড়িতে আসার পর সব পরিবর্তন হয়েছে। কায়েশীর জীবনধারাও। ভাবনা থেকে বেরিয়ে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে কায়েশী উচ্ছসিত হয়ে বলল,
“তাহলে শুরু করাই যাক। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে। আমার বাড়িতে দুটো লোহার টাঙ আছে। গহনা বানানোর অনেক সরঞ্জাম রাখা ছিলো ওটাতে। ওগুলো আনিয়ে দিলেই শুরু করতে পারবো।”
কায়রাভ সম্মতি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, লোক পাঠিয়ে আনিয়ে দেব।"
তারপর একটু থেমে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তবে একটা কথা।”
কায়েশী জিজ্ঞেস করে,
“কি?”
কায়রাভ হাত ধুয়ে নেয়। তারপর শীতল দৃষ্টিতে কায়েশীর দিকে তাকিয়ে বলে,
“যা করবে, ঘরে বসেই করার চেষ্টা করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি না আমার বউ বাইরে কাজ-ফাজ করুক।”
কায়েশী থমকে গেলো এমন কথায়। চোখে বিস্ময় এলেও মুখে প্রতিবাদ করলো না। আসলে প্রতিবাদের মানেই পেলো না। অথচ সময়টা অন্যরকম থাকলে কায়েশী নিশ্চিত নারীবাদীদের ন্যায় মুখের উপর কথা শোনাতো। আরও দু'চারটে ভাষণ দিতো নারী স্বাধীনতা নিয়ে। মস্তিষ্ক তাকে ভাবালো, কোনো ভাবে কি কায়রাভ তাকে ঘরবন্দী করতে চাইছে কিংবা তার নারী স্বাধীনতা লঙ্ঘন করছে! এইসব অযাচিত ভাবনা যেনো কায়েশীর মুখেই প্রকাশ পাচ্ছিলো। সাড়ে চার বছরের সংসারে কায়েশীর নীরবতা দেখে কায়রাভ পড়ে ফেললো ওকে। এতক্ষনে কায়রাভের হুস এলো কি বলে ফেলেছে তা ভেবে। মাথায় আসা কথাটাই মুখে বলেছে কায়রাভ। চরম বোকামি! কায়রাভ নিজের ভুল বুঝতে পেরে আনমনে দু'চারটে গালিও দিলো নিজেকে। তারপর কায়রাভ ধীরে সুস্থে নিজেই বলল,
"হয়তো তুমি ভাবতে পারো যে এ কেমন ব্যাগডেটেড কথাবার্তা! আধুনিক যুগে নারীরা শুধু ঘরে থাকার জন্য না, তাদের স্বাধীনতা আছে, বাইরে কাজ করার অধিকার আছে, ব্লা ব্লা। আই নো, আমি জানি এসব। কিন্তু আমার কথা একটাই, যখন আমি আমার বউয়ের সব ধরনের চাহিদা পুরণ করতে সমর্থ, তখন তার বাইরে গিয়ে কাজ করাটাকে এপ্রেসিয়েট করতে পারছি না। এই বিষয়ে আ'ম এক্সট্রিমলি স্যরি, কায়েশী। আমায় ভুল বুঝো না তুমি।"
কায়েশী বুঝলো। কায়রাভের কথাটাও ভুল নয়। তাই ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“বুঝেছি। আমিও যে খুব আপডেট মেয়ে এমন না। আগে উপার্জন করতাম প্রয়োজন ছিলো বলে। আমাকে দেখার কেউ ছিলো না, নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হতো, স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু জানেন, আমার একটা ফ্যান্টা'সি ছিলো। যে বিয়ের পর আর এসব করবো না। আর পাঁচ'টা সাধারন নারীর মতো ঘর'টা আমি সামলাবো, বাইরে'টা আমার স্বামী। কারণ, আমার চাহিদা এতটাও বেশি নয় যে স্বামীর স্বল্প উপার্জনেও হবে না। আর সেদিক থেকে আপনার রোজগার মাশাল্লাহ অনেক ভালো। আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি এতে।"
কায়রাভ প্রসন্ন হলো কায়েশীর প্রতিটা কথায়। তার মুখে তখন তৃপ্তির ছায়া স্পষ্ট। কায়রাভ ভীষনভাবে সন্তুষ্ট হলো তার বউয়ের কথা শুনে। এদিকে কায়রাভ ভেবেছিলো তার কথায় ভুল না বুঝে বসে কায়েশী। তবুও সে নিশ্চিত হতে চাইলো,
“তোমার অনলাইন বিজনেসে বাইরে তো যেতে হবে না, তাই না?”
কায়েশী হালকা হেসে বলল,
“না। আমি এবার শুধু হ্যান্ড মেড জুয়েলারী নিয়ে শুরু করার কথা ভেবেছি। ড্রেসের কথা পরে ভাবা যাবে। তবে কিছু কাঁচামাল লাগবে, মালী চাচাকে লিস্ট দিলে তিনি'ই এনে দিতে পারবেন। আমি ঘরে বসেই বানাবো, পার্সেল রেডি করবো। ডেলিভারি ম্যান এসে নিয়ে যাবে। ব্যস, আমার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
কায়রাভ মাথা নেড়ে প্রসন্ন হেসে বলল,
“তাহলে ঠিক আছে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
কায়েশীর আলতো হাসলো। তার চোখে নতুন করে জেগে উঠলো পুরোনো দ্যুতি। তবে এবার তা সংসারের আঙিনার ভেতরেই। কায়রাভও বউয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু প্রশান্তি অনুভব করলো। সে ভেবেছিলো ভুল বোঝাবুঝি হবে, কিন্তু কায়েশী যেন দিন দিন আরও পরিণত হয়ে উঠছে। সংসারের মায়ায়, ভালোবাসার আবরণে, দুজন মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরকে বুঝতে শিখেছে। নিজ নিজ সীমা, স্বপ্ন আর সমঝোতার ভেতর দিয়ে। বিকেলের আলো ক্রমেই ফিকে হয়ে আসে। খাওয়া শেষে টেবিলের থালা-বাসন নিয়ে যায় কায়েশী। কায়রাভ ছেলেকে নিয়ে বউয়ের পিছু পিছু যায়। তাদের মাঝখানে যে সুন্দর বোঝাপড়া তৈরি হলো সেটা ভেবেই শান্তি শান্তি লাগছে কায়রাভের। মনটাই ভালো হয়ে গেলো কায়েশীর সুবিবেচক দিক থেকে। কায়েশী বেসিং এ বাসন ধুতে ধুতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করে বসলো,
"আচ্ছা, আপনি কি খুব পসেসিভ ধরনের হাসব্যান্ড? মানে রেড ফ্ল্যাগ টাইপ আর কি?"
এমন প্রশ্নে কায়রাভ হকচকিয়ে যায়। বলল,
"এমন মনে হওয়ার কারণ?"
কায়েশী নিজের দু'কাঁধ ঝাকিয়ে বলল,
"এমনিই। আসলে আপনি চাইছেন না আপনার বউ বাইরে কাজ করুক। এমনটা তো এই টাইপের লোকেরা'ই বলে। আমার মনে হলো আর কি! "
কায়রাভ মৃদু গলায় বলল,
"আমি পসেসিভ না রেড ফ্ল্যাগ, সেসবের কথা তো জানি না। তবে এটা ঠিক, আমি চাই না তুমি বাইরে কাজ করো। আর সেই ছুতোয় কেও তোমাকে দেখুক। কারণ, আমার স্ত্রীকে বাইরের কেও দেখবে তা আমার সহ্য হবে না, কায়েশী। একচুয়ালি আমার ভাবতেই রাগ লাগে। জানি, এটা হয়তো যুক্তির ভাষায় ঠিক শোনাবে না। তবুও, তোমাকে শুধু আমার চোখেদুটোই দেখবে। আমার ব্যক্তিগত মানুষটার সৌন্দর্যটুকু অন্য কারও দৃষ্টিতে ধরা দিবে সেটা আমি মেনে নিতে পারবো না। এতে আমি রেড ফ্ল্যাগ টাইপ পুরুষ হলে তাই সই।”
কায়রাভের কথায় কায়েশী চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো অদ্ভুত দৃষ্টিতে। কায়রাভের প্রতিটি কথাগুলো ভালোবাসা আর অধিকারবোধের সূক্ষ্ম দিক বোঝালো। সে বুঝতে পারলো, তার এই অনুভূতির ভেতরে যেমন গভীর টান আছে, তেমনি আছে এক অদৃশ্য খাঁচার ইঙ্গিতও। ভালোবাসা কারও ক্ষেত্রে মুক্ত আকাশ। আবার কারও দৃষ্টিতে সযত্নে রাখা সোনার খাঁচা। তবে হ্যাঁ, ভালো থাকাটাই আসল। সে সোনার খাঁচা হোক কিংবা মুক্ত আকাশ।
*********************
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। সারা দিন রোদের নিচে দাঁড়িয়ে একটা বিল্ডিংয়ের দেয়াল তোলার কাজ করেছে কাবির। শরীরের হাড়গুলো আন্দোলন করে ক্লান্তির কথা বলছে। মালিক পক্ষ থেকে খাবারের অফার করলেও কাবিরের দলের কেও নেয় না, সেই খাবার খরচ মজুরিতে যোগ করা হয়। তাছাড়া কাবিরের দলের প্রায় সবার বিয়েসাদি হওয়ায় খাওয়া দাওয়া নিয়ে সমস্যা নেই। তাই মনে মনে কাবির ঠিক করেছিলো বাসায় ফিরে গা ধুয়ে একটু রান্না সেরে ভাত খেয়ে টানটান হয়ে একটা আরামের ঘুম দেবে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া করে যেই না বিছানায় যাবে তার আগেই দরজার খটখট আওয়াজ কর্নগোচর হলো কাবিরের। শব্দটা কাবিরের টনক নড়ালো। তাই ত্রস্ত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতেই থমকে দাঁড়ালো কাবির। কারণ, এই সময়ে সামনের মানুষটি অপ্রত্যাশিত। দরজার সামনে প্রীতিষা দাঁড়িয়ে আছে। কাবির কস্মিনকালেও ভাবেনি এই মেয়ে, এই বিকেলে এভাবে তার বাসার সামনে এসে দাঁড়াবে। মেয়েটার পরনে হাঁটু পর্যন্ত ঢিলেঢালা গোলাপি টি-শার্ট, গলায় সাদা স্কার্ফ ঝোলানো। আসলেই বাচ্চা মেয়ে একটা! কিন্তু চেহারাটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে।কাবিরের স্থির তাকিয়ে থাকা দেখে প্রীতিষা ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“এখানে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি সারাদিন? ভেতরে তো আসতে বলো!”
কাবির হকচকিয়ে সরে দাঁড়ালো। বলল,
“ওহ…হুম..হুম, আসো। ভিতরে আসো।”
প্রীতিষা ভেতরে ঢুকে হাতের দুটো বই বিছানায় রাখলো ব্যস্ত ভঙ্গিতে। তারপর ধপ করেও নিজেও বসলো সেথায়। এরপর জোরে একটা নিশ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার ভার'টা একটু হালকা হলো বোধহয়। কাবির ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
“কাহিনি কী? হুট কইরা আমার বাসায় আইলা যে? কী হইছে?”
প্রীতিষা চোখ কুঁচকে খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলল,
“কেন? তোমার বাসায় এসেছি বলে অসুবিধা হচ্ছে নাকি? হলে বলো, চলে যাই!”
এমন কথায় কাবির হুরমুর করে বলে উঠলো,
“আরে বে'ডি! ক্ষ্যাপো ক্যান? আমার বাসায় তোমার চরণধুলি পড়ছে এইডাই তো আমার কয় জন্মের সৌভাগ্য! আইছো, ধীরে সুস্থে বসো। আমার কোনো অসুবিধা নাই, উল্টা ভাল লাগতাছে!”
এই কথা বলে কাবির দুষ্টুমি করে হেহে-ধরনের হাসি হাসলো। তা দেখে প্রীতিষা সরু চোখে তাকালো।
কাবির তখন অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকালো অবুঝ বালকের ন্যায়। প্রীতিষা এবার নিজে থেকেই বলতে শুরু করে,
“হয়েছে কী জানো? বাড়িতে হুট করে আত্মীয়-স্বজন এসেছে সকালে। মানে কাজিনরা আর কি। আজ রাত অবধি আড্ডা চলবে। সারাদিন ফুসরতই পেলাম না পড়ার। বাচ্চারা এসেছে দৌড়াদৌড়ি করছে, হইচই করছে। মানে আজকে ভরা বাড়ি হয়ে গেছে, পড়ার মতো পরিবেশ নেই। কাউকে বলতেও পারছি না নিরব থাকতে। এক কাজিনকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি সে সামলাবে বাকিদের। ভাবছিলাম আমার বান্ধবী ইসরাতের বাসায় যাবো, কিন্তু ফোনে পাচ্ছি না ওকে। তারপর মনে হলো তোমার বাসা তো আরও কাছে, আর এখানে ডিস্টার্ব করারও কেউ নেই। তাই স্কুটি নিয়ে এক টানে চলে এলাম।”
কাবির ধীরে মাথা নাড়লো,
“ভালো করছো।”
তারপর চোখ গেলো প্রীতিষার এলোমেলো চুলের দিকে। তাই প্রীতিষাকে হেসে বলল,
“আগে মাথা আঁচড়াও। পাগুল্লি পাগুল্লি লাগতাছে তোমারে!”
এই বলে ড্রয়ার খুলে একটা চিরুনি এগিয়ে দিলো প্রীতিষার দিকে। প্রীতিষা দ্বিমত না করে, আয়না না খুঁজে মোবাইলের কালো স্ক্রিনে নিজের ছায়া দেখে মাঝখানে সিঁথি করে চুল আঁচড়ালো। তাড়াহুড়োয় বাঁধা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে খোপা করলো।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, কোথায় পড়া যায় বলো তো? মানে বসবো কোথায়?”
কাবির ছোট্ট ঘরটার আশেপাশে তাকালো। দুই রুমের ঘর তার। কাবিরের রুমে একটা খাট, একপাশে ড্রয়ার, ওয়ারড্রব। প্রয়োজনীয় ফার্নিচার ছাড়া শৌখিন কোনো কিছু নেই। টিনের কোনায় পাটি গুটিয়ে রাখা। এক কথায় সাদামাটা একটা ঘর। তবে প্রীতিষার ভালো লাগলো। প্রীতিষা টেবিল জাতীয় কিছু না পেয়ে বিছানা দেখিয়ে বলল,
"আচ্ছা কাবির, বিছানাতে'ই পড়ি তাহলে?"
কাবির ঠোঁট কামড়ে ভাবুক স্বরে বলল,
"সমস্যা না হইলে পড়ো! কিন্তু বেশিক্ষন পড়তে পারবা না বিছানায়। ঝুঁইকা পড়তে পড়তে ঘাড় ব্যাথা করবো!"
প্রীতিষা মাথা নাড়িয়ে বলল,
"তাও ঠিক।"
প্রীতিষা হতাশ হয়ে বিছানায় বসলো ওভাবেই। তারপর প্রিন্সিপাল অফ ম্যানেজমেন্ট বইটা হাতড়ে পড়াগুলো দেখে আরও হতাশ হলো সে।
"উ'ফ! কাবির! আমি এই সাবজেক্ট কিচ্ছু পারি না! কালকেও পরীক্ষা, অথচ প'ড়া হচ্ছেই না! কি যে হবে আমার! "
প্রীতিষা ভয়ার্ত গলায় ঠোঁট উল্টে বললো কথাগুলো। আতঙ্কিত হয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে কামড়ে তুলছে। তার বড্ড চিন্তা হচ্ছে কালকের পরীক্ষা'টা নিয়ে। ফেল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! সারাদিনে কিচ্ছুটি পড়া হয়নি। এখন বিকেল চারটে। তবে প্রীতিষা অন্তত আর যাইহোক ফেল করতে চায় না। শুধু নিজের জন্য নয়, তার ভাইয়ার সম্মানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এতে। ভাবতে ভাবতে সে অসহায় চোখে তাকালো কাবিরের দিকে।
কাবির বুঝলো সব। মেয়েটার এই অস্থিরতা, পড়াশোনার চাপ কিছুই তার চোখ এড়ালো না। তাই একটু ভেবে বলল,
"আচ্ছা, চিন্তা কইরো না। এক কাজ করো, তুমি আমার বারান্দায় পড়তে বসো। বাতাস আইতাছে দেখো। সুন্দর আবহাওয়া আছে আজকে। পড়ায় মন বসবো। আসো।"
প্রীতিষা তাই করলো। বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো কাবিরের পথ অনুসরণ করে। বারান্দাটা খোলা, গ্রিল নেই কোনো। সামান্য ধুলো পরে আছে মেঝেতে। মনে হলো অনেকদিন কেও এখানে আসে না। কাবির ঝাড়ু দিয়ে একপাশের ধুলো পরিস্কার করে একটা ম্যাট্রেস পেতে দিলো। আর পড়ার টেবিলের প্রক্সি হিসেবে দিলো একটি ছোট টেবিল। যেটাতে কাবির নিচে বসে খাবার খায়। একটা প্লেট আর গ্লাস রাখার মতো জায়গা রয়েছে এতে। সেখানে অনায়াসে প্রীতিষার একটা বই এঁটে যাবে। প্রীতিষা বই টেবিলে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বসে। কাবিরের কথায় স্বস্তি পেয়ে মনে হলো দুশ্চিন্তার গুমোট'টা একটু হলেও হালকা হয়েছে। তাই আত্মবিশ্বাসের সাথে বই খুলে পড়া শুরু করে সে। পড়তে পড়তে মাঝে সে বলল,
"শোনো কাবির, এগুলো তো রিটেন পড়া, শুধু মুখস্থ করবো। একটা করে অধ্যায় শেষ করে আমি নিজেই পড়া দেবো তোমায়। তুমি শুধু একটু শুনবে ভালো করে। ওকে?"
কাবিরের এমনিতেও বাড়িতে এখন কোনো কাজ নেই। তাই প্রীতিষাকে সময় দেওয়াই যায়। এই ভেবে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ালো কাবির। বাধ্য বাচ্চার ন্যায় বলল,
"আচ্ছা, পড়া দিও শেষ হইলে। আমি শুনবো নে।"
এরপর কাবির একটু দূরে ম্যাট্রেসের শেষ প্রান্তে আধশোয়া হয়ে বসে যায় দেয়াল ঘেঁষে। খানিকটা সময় পেরোলে একভাবে না থাকতে পেরে একটু কাত হয়। শোয়ার ভঙ্গিতে এক হাত ভাজ করে মাথাটা হাতের তালুতে রেখে প্রীতিষার পড়া দেখছিলো সে। প্রীতিষা পড়া শেষ হলে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে ক্রমাগত পড়া দিয়ে যাচ্ছিলো তাকে। কখনো ব্যাখ্যা, কখনো সংক্ষিপ্ত বাক্যে। প্রীতিষার সকল ধ্যান-জ্ঞান এখন শুধুমাত্র পড়াশোনায় নিবিষ্ট। এদিকে কাবির স্থির চোখে তাকিয়ে আছে গোলগাল মেয়েটার দিকে। তবে পড়া শুনছে নাকি প্রীতিষাকে দেখছে তা বোঝা গেলো না। কিন্তু ওকে দেখে খুবই মনোযোগী শ্রোতা লাগছে। যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ এটা, প্রীতিষার মুখনিঃসৃত বাক্যগুলো শোনা। হঠাৎ করেই অনুভব করলো বুকের বা পাশটায় চিনচিন করছে কেমন যেনো! কাবির চেষ্টা করলো না ব্যাথাটাকে প্রশমিত করার। হোক না এমন ব্যাথা! একটা সুখানুভূতির আবেশে চোখ দুটো মিনিট খানিকের মতো বুজে আবার তৈরি হলো প্রীতিষার দিকে মনোযোগ দিতে।
চলমান.......
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]