গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 2 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৫
 
কেবিনের নরম ক্ষীন আলোয় শুয়ে আছে কায়রা। কয়েক ঘণ্টা আগেই জ্ঞান ফিরেছে তার। তবু শরীরটা ক্লান্ত, অবশ লাগছে। এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শরীরটা নুইয়ে পরেছে কেমন। স্বাভাবিক অবস্থান বুঝতে চোখ খুলে চারপাশ চিনতে তার সময় লাগে। শান্ত কেবিনটায় স্যালাইনের ফোঁটা ফোঁটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর বাতাসে ঔষুধের ঘ্রান মিশে আছে। 
 
এই সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে কাবির আর কায়রাভ। দু’জন একই সাথে ডক্টরের অনুমতি নিয়েই এসেছে। বোনকে একা সামলানোর সাহস কারও নেই।একজনের চোখে জল এলে অন্যজন ভেঙে পড়বে। তাই দু’জনেই পাশাপাশি এসে শক্ত হয়ে থাকার অভিনয়ে নেমেছে। বেডের কাছে এসে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে তাদের। জীর্ণ-শীর্ণ, নিস্তেজ মুখে শুয়ে আছে তাদের হাসিখুশি চঞ্চল বোনটা। তবু বুকের ভেতর নিজেদের সমস্ত কষ্ট সামলে এগিয়ে যায় তারা। কাবির বেডের কোণে বোনের মাথার কাছে বসে পড়ে। কায়রাভ চেয়ার টেনে নেয় বিছানার একদম কাছে। দু’জনেরই চোখ নিবদ্ধ কায়রার উপর। কথাগুলো গলায় এসে থেমে গেছে এই মুহুর্তে। 
 
কায়রা চোখ পিটপিট করে খুলে বুঝতে পারে তার ভাইরা এসেছে। জখমকৃত ঠোঁট নাড়াতে গিয়ে চাপা ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে সে। তবু নিভু নিভু গলায় ডাকে,
“ভাইজান…”
 
বোনের ডাক শুনে ব্যস্ত ভঙ্গিতে একইসাথে সাড়া দেয় দুইভাই।
“এই তো, ভাইজান আছি।”
 
রাস্তার উপর পড়ে যাওয়ায় ঠোঁটের কোণে ক্ষত হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে ঠোঁট নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে তার। আবার পিঠের জ্বালাপোড়া ব্যাথা অনুভব হতে কায়রা মুখ কুচকাচ্ছে। তবু ব্যাথা ভুলে চোখ খিঁচে ক্ষীণস্বরে বলল,
“ভাইজান, আমাকে তোলো একটু… শুয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। পিঠ'টা জ্বালাপোড়া করছে। তোলো আমায়!”
 
দু’ভাই খুব সাবধানে তাকে তুলে বসায়। তাদের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে বসে কায়রা। হেলান দেয় না, পাছে না পিঠে আবার জ্বালা করবে ভেবে। বসে থাকাই একটু শ্রেয়। 
 
কায়রাভ তাকিয়ে থাকে বোনটার মলিন মুখের দিকে। কায়রার চোখে তখনও ভাসছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। শরীরের ক্ষত যত না জ্বলছে, তার চেয়ে বেশি জ্বলছে মনে লাগা আঘাত। তবু ভাইদের সামনে দুর্বল হচ্ছে না। এই একগুঁয়ে দৃঢ়তা তার চেনা স্বভাব। শক্ত গোছের মেয়ে হওয়ায় হাউমাউ করে কাঁদলো না। শুধু চোখের কোণ বেয়ে ধীরে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো যন্ত্রনার প্রকাশ্য হিসেবে। কায়রাভ ধীরে জিজ্ঞেস করে,
“কারা ছিলো? মুখ দেখেছিস? চিনিস কাউকে?”
 
কায়রা মাথা নাড়ে দু'পাশে। 
“না… সব আবছা চোখে ভাসছে।”
 
হঠাৎই কায়রার মনে অন্য এক ভাবনার উদয় হয়। তার চেহারা ঠিক আছে তো? তার মুখ কি বিকৃত হয়েছে! এই ভয় গলা চেপে ধরে তাকে। সে কাবিরের হাত চেপে বিভ্রান্তচিত্তে বলে উঠে,
“আচ্ছা ভাইজান, আমার মুখ! আমার মুখ ঠিক আছে তো? নাকি… নাকি ঝলসে গেছে? একটা আয়না দাও দেখবো আমি!”
 
কাবির বোনের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
“উত্তেজিত হইস না। মুখে কিছু হয় নাই। সব পিঠের উপর দিয়া গেছে।”
 
তবু কায়রার মন শান্ত হয় না। নিজের রূপ বিকৃত হয়ে গেছে এই আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে উঠে। তাও নিশ্চিত হতে জেদ করে বলল,
"না ভাইজান, আয়না দাও আমায়। আমি দেখবো। নিয়ে আসো।"
 
কাবির শেষমেশ না পেরে ফোনের স্ক্রিন এগিয়ে দেয়। কায়রা ফোন হাতে নিয়ে নিজের গাল ছুঁয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিজেকে। মুখ অক্ষত, শুধু ঠোঁটের কোণে সামান্য ছুঁলে গেছে। নিজেকে ধীরে ধীরে বোঝায়, এ ঠিক হয়ে যাবে কিছুদিন পরে। তারপর কায়রাভের দিকে তাকিয়ে দুর্বল স্বরে বলল,
“আমার পিঠের কি অবস্থা বলেছে ডাক্তার? এটা কি ঠিক হবে না?”
 
কায়রাভ বোনের হাত শক্ত করে ধরে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“হবে। সব ঠিক হবে। তুই আগে শান্ত হ।”
 
কায়রা নিশ্চিন্ত হয়ে কাবিরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রাখে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠে,
“আমি বাসায় যাবো, ভাইজান। নিয়ে চলো আমাকে। আর কখনো কোথাও ঘুরতে যেতে চাইবো না… কখনো না।”
 
কায়রাভ উঠে দাঁড়িয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। গলাটা ভারী হয়ে আসে। তবু স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে,
“ডক্টরের সাথে কথা বলি। যদি আজ নেওয়া যায়, আজই নিয়ে যাবো। তোকে এখানে রেখে আমারও মন সায় দিচ্ছে না। বাদবাকি ট্রিটমেন্ট সব বাড়িতে হবে।”
 
কায়রা ধীরে মাথা নাড়ে। ও এখনো ওর পায়ের অবস্থা জানে না। ও শুধু জানে ওর পিঠটা ঝলসে গিয়েছে। তার অজান্তেই চাদরের নিচে লুকিয়ে আছে আরেকটি নির্মম সত্য। তার জীবনের নিষ্ঠুর সত্য। কাবিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে সেই চিন্তায়। যখন কায়রা সব জানবে, তখন? তার হাসিখুশি বোনটা কতটা ভেঙে পড়বে? কতটা যন্ত্রণা সইবে?
 
কায়রা মুখ তুলে মিনমিন করে বলে,
"ওয়াসরুম যাবো, ভাইজান।"
 
কাবির মাথা নেড়ে ছাড়লো কায়রাকে। কায়রা কোনোকিছু না ভেবে নিজেই চাদর সরাতে গেলে চোখে পরে হাঁটুর গোড়ার ব্যান্ডেজ যুক্ত পা। তার আরেকটা পা নেই! আচমকা এই দৃশ্য চোখে পড়তেই উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে কায়রা। কায়রার এই চিৎকার, বুকফাঁটা আর্তনাদ কানে আসে বাইরে বসে থাকা প্রীষানেরও। প্রীষান ভয় পেয়ে ছুটে আসতে গিয়ে জানালা দিয়ে দেখে দুই-ভাই সামলাচ্ছে তাকে। তাই দু-পা পিছিয়ে যায়। এখন কায়রা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে ভেবে আর এগোয় না। এদিকে হাউমাউ করে কাঁদছে কায়রা। এতক্ষনের জমে থাকা সব কষ্ট, যন্ত্রনা উগড়ে দিচ্ছে একসাথে। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। কি থেকে কি হলো! ও চিৎকার করে শুধু একটা বাক্যই আওড়াচ্ছে বার বার,
"আমার পা....আমার পা!"
 
কাবির ছটফটানো বোনকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। কায়রাভও ধরে রেখেছে। তারা ভেবে এসেছিলো নিজেরা জানাবে। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় বোঝানোর সময়ই পেলো না। এখন দুই-ভাই জাপটে ধরে আছে বোনকে। নড়তেও দিচ্ছে না। ক্রমাগত চিৎকারের ফলে গলা ভেঙে এখন শুধু ফোঁপাচ্ছে কায়রা। মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না। দুই ভাইয়ের স্পর্শে কায়রা একটু থিতু হয়। কিন্তু ভয় তার চোখে থেকে যায়। যেন হঠাৎ সবকিছু থেমে হয়ে গেছে। ও শেষ হয়ে গেছে। একেবারে শেষ হয়ে গেছে। কাবির নিজেও বোনের করুণ আর্তনাদে যোগ দিলো। আজ কাবিরও কাঁদলো নিরবে। শেষ এভাবে কেঁদেছিলো মায়ের মৃত্যুতে। আর আজ আজ বোনের জন্য। কায়রাভও আর সামলাতে পারলো না নিজেকে। এতো করুণ পরিস্থিতি নিরসনের উপায় পেলো না সে। তিন ভাই-বোন একসাথে কাঁদলো আজ, খুব করে। এই পরিস্থিতিতে কোনো সান্ত্বনা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। শুধু ব্যাথার বিশালতা মিলিত আর্তনাদে রচিত একটি ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তের সৃষ্টি হলো। 
 
কেবিনের সাদা দেয়াল নীরব সাক্ষী হয়ে থাকলো সে ক্ষনের। একটা সময় থামলো তারা। তিন ভাইবোন চুপ হলো। আর কেউ উচ্চস্বরে কাঁদলো না। নিরব থাকলো তারা। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। নীরবতার ভেতরেই জমে উঠলো অশ্রু আর এক অদৃশ্য অঙ্গীকার। যা-ই হোক, তারা একসাথে সামলাবে। যেমনটা এতোবছর করে এসেছে।
 
*****************************
 
প্রায় ঘন্টাখানেক বোনের কাছে ছিলো তারা দুজন। এতক্ষণ বোনকে সামলিয়েছে, বুঝিয়েছে। অত:পর কায়রা বুঝতে পেরেছে বাস্তবতা। ও নিজের জীবনের চরম সত্যকে নির্লিপ্তভাবে মেনে নিয়েছে। কান্না থামার পর কায়রা চুপ করে আছে সেই থেকে, কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না। চোখ দুটো অদ্ভুতরকম স্থির, নিশ্চল। 
 
কায়রাভ আর ঘাটলো না। এবার কায়রাভ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোনকে বাড়ি নিয়ে যাবে। বাদবাকি চিকিৎসা বাড়িতেই চলবে। হসপিটালের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কায়রাভ কেবিন থেকে বের হয়। ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। কেবিনের দরজার বাইরে এসেই সে দেখতে পায় প্রীষান চেয়ারে হেলান দিয়ে ক্লান্ত শরীরে চোখ বুজে বসে আছে। কায়রাভ ধীরে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আপনি এখনো আছেন?”
 
প্রীষান কারও গলা পেয়ে হঠাৎ চোখ খুলে সামনে কায়রাভকে দেখে সোজা হয়ে বসে। তারপর ধীর স্বরে উত্তরে বলল,
“মনের শান্তির জন্য এখানে ছিলাম। মাঝপথে ছেড়ে যেতে বলছেন?”
 
কায়রাভ বিনীত স্বরে উত্তর দিলো,
“না না, আমি সেটা মিন করিনি। আপনিই সঠিক সময়ে বোনটাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। এজন্য আমরা চির কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি।”
 
প্রীষান মলিন হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“এসব বলবেন না। কায়রা কেমন আছে এখন?”
 
“শারীরিক অবস্থা তো জানেনই। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে মেয়েটা, তবে এখন শান্ত আছে, ” কায়রাভ মৃদু স্বরে উত্তর দিলো।
 
প্রীষান একটু ইতস্তত করছিলো দেখা করতে চাওয়ায়। তবুও বলেই ফেলে,
“আপনারা অনুমতি দিলে কায়রার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
 
“জ্বি, অবশ্যই। অনুমতির প্রয়োজন নেই। যান, গিয়ে দেখা করে আসুন,” কায়রাভ শান্তভাবে বলল।
 
প্রীষান মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে কেবিনের দিকে এগোলো। ততক্ষণে কাবির বেরিয়ে এসেছে কেবিন থেকে। কাবির কায়রাভকে বলল,
“কায়রার জন্য কিছু খাবার আনতে হবো। খিদা লাগছে ওর। নিচে গিয়া আমি নিয়া আসি। তুমি এইজাগা থাকো।”
 
কায়রাভ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এরপর প্রীষান ধীর পায়ে কেবিনে প্রবেশ করলো। দেখলো কায়রা শুয়ে আছে। বসতে গেলেই ওর মাথা কেমন ঘুরছে। পায়ের দিকে তাকাতে পারছে না। প্রীষানের দিকে চোখ পড়তেই সে থমকে গেলো। ভাবলো, 'এখনো যান নি স্যার? কি প্রয়োজন ছিলো?' প্রীষান চেয়ার টেনে বসলো কায়রার পাশে। কায়রা এবার ওদিকে তাকাতে পারলো না, চোখ ঘুরিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকালো। এক ফোঁটা জল চোখের কার্নিশ বেয়ে নেমে এলো ধারার মতো। 
 
নিরবতা ভর করলো কেবিনে। প্রীষান নিজেও বুঝলো না কি বলবে। কিছুক্ষন এভাবেই নিরবে কাটলো। প্রথমে নিরবতা ভেঙে প্রীষানই বলল, 
“তুমি সত্যিই খুব স্ট্রং মেয়ে, কায়রা। এমন পরিস্থিতিতেও শান্ত আছো।”
 
হুট করে বলা কথায় নিজেই ভরকালো প্রীষান। একি বলল সে? আবার মনে করিয়ে দিলো! মনে হলো, এই কথার পুনরাবৃত্তি ওর হৃদয়কে আরও ভেঙে দিলো। 
কায়রা ধীরে উঠে বসতে চাইলো। প্রীষান বলল,
“শুয়ে থাকো, উঠছো কেন?”
 
কায়রা ঠান্ডা গলায় মলিন হেসে বলল,
“একদিন মজা করে আপনাকে বলেছিলাম না খুঁতের কথা! কি আশ্চর্য, আল্লাহ সত্যিই কবুল করে নিয়েছে।”
 
প্রীষান থমকে গেলো। কায়রার কথায় ওর বুক কাঁপলো। তবে সেটা প্রকাশ করলো না। আনমনেই বলে ফেলল,
"উহু'ম, ভালো করে মনে করে দেখো। সেদিন খুঁত বানানোর কথা আমিই বলেছিলাম, আর তুমি সেটাকে এমন নির্মম পরিণতিতে রূপ দিলে! আমাকে পাওয়ার চক্রান্তে তুমি আমাকেই নিজের অপরাধী বানিয়ে ফেললে। নিজের সাথে সাথে আমার অস্তিত্বেও গেঁথে দিলে অমোচনীয় দাগ। যার দায় আজীবন বহন করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় রইলো না।"
 
এই কথার মর্মার্থ কায়রার মস্তিষ্ক ধরতে পারলো না। তাই জিজ্ঞেস করলো,
“মানে?”
 
প্রীষান অল্প হেসে বলল,
“বাদ দাও। একটা কথা বলো, তোমার কি মনে হচ্ছে না এসব কিছুর জন্য আমি দায়ী!"
 
কায়রা আতঁকে উঠে বলল,
"এসব কি বলছেন, স্যার? আপনি কেন দায়ী হবেন? এগুলো আমার দুর্ভাগ্য!"
 
প্রীষান তাচ্ছিল্য হাসি হেসে বলল,
"যদি খুব ভুল না হই পরোক্ষভাবে আমি'ই দায়ী, কায়রা। ওই ঘটনার সময় তুমি লক্ষ্য করোনি। অবশ্য সেই পরিস্থিতিতেও ছিলে না, স্বাভাবিক। কিন্তু আমি বাইকের ছেলেদুটোকে দেখেছিলাম। ওদের একজনকে আমি জিসানের সাথে দেখেছি, কলেজে। আই সাসপেক্ট হি ওয়াজ বিহাইন্ড দিস। সেদিন জনসম্মুখে আমার দেওয়া মার ও সহ্য করতে পারে নি। ওর চোখে ভয়ানক ক্ষোভ ছিলো। অ্যান্ড অ্যালসো, হি হ্যাড বা'ডি আইস অন ইয়্যু। জানি না কতটা সঠিক আমার ধারণা। তবে এসব কিছু তোমার ভাইয়েরা ফিরলে আমি জানাবো।"
 
কায়রা বিস্মিত হয়ে তাকালো। মলিন গলায় অস্ফুটে ঠোঁট নেড়ে বলল,
"জিসান! ও এমন নয়। করতেই পারে না। আমি চিনি ওকে! ওই সামান্য ঘটনার জন্য আমার এতো বড় ক্ষতি করতে চাইবে?"
 
প্রীষান তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“মানুষ চেনার ক্ষমতা কি তোমার কখনোই হবে না? রাগ খুব খারাপ জিনিস! আর এখনকার ছেলেপেলেদের কথা তো বাদ'ই। আমি বলেছিলাম তোমাকে, ও ভালো ছেলে নয়। হি ইজ অ্যাডিকটেড টু ড্রাগস। ওর কাছে এসব কাজ আহামরি কিছু না। আর না জানি কি কি অনৈতিক কাজে জড়িত।”
 
কায়রা আরেকদফা থমকালো। বিস্মিত হয়ে বলল,
“আপনি কীভাবে জানলেন যে ও ড্রাগ নেয়? আমরা ওর ব্যাপারে এমন কিছু শুনিনি কখনো।”
 
প্রীষান বলল,
“ভালো করে খেয়াল করো নি তাই। ওর হাতের কব্জিতে খেয়াল করলেই দেখতে পেতে। সূচ ফোটানোর চিহ্ন, মাঝে মাঝে টেপ লাগানো থাকতো। ক্লাসে বেশ কয়েকবার খেয়াল করেছিলাম আমি।"
 
এসব শুনে কায়রা অসহায়ের মতো মাথায় হাত রাখলো। ওর দমবন্ধ হয়ে আসছে। এলোমেলো শ্বাস ফেললো ও। কায়রা ভেবেছিলো ওই ঝগড়াঝাটির ঘটনার পর দেখা হলে জিসানের সাথে কথা বলে ঠিক করে নেবে সব। কিন্তু যদি প্রীষানের কথা সত্য প্রমানিত হয় তাহলে বন্ধুর মতো সম্পর্কটা নোংরা হয়ে যাবে। এরপর হয়তো আর কোনোদিন কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না সে। সম্ভবই নয়। 
 
--------------------------------------------
 
পরদিন সকাল। রাতটা কোনেরকমে পারি দিয়েছে সবাই। তবে নির্ঘুম। কাবির কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করলো খাবার নিয়ে। সঙ্গে আসলো কায়রাভও। কায়রা তখন বসে আছে বিছানায়। কাবির যাওয়ার আগে কায়রাকে স্বাভাবিক করতে অনেক কথাবার্তা বলেছে। তার যত্ন, কথাবার্তা, স্নেহ আর ধৈর্যের মিশ্রণে ধীরে ধীরে কায়রার হুস ফিরতে শুরু করলো। প্রথমে নিজেকে অসমর্থ, ফেলনা মনে করলেও এখন সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। কায়রার তো দোষ নেই এতে। তাহলে সে কেন গুমরে গুমরে কষ্ট পাবে! তাছাড়া ডাক্তারও বলেছে, কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে সে আবার হাঁটতে পারবে। আল্লাহর শুকরিয়ায় সে প্রানে বেঁচেছে এটাই কি বড় কথা নয়? এমনিতেও কাবির আশ্বাস দিয়েছে। এই ঘটনার আসামীদের খুঁজে বের করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হবে। কাউকে ছাড়বে না তারা। এবার হতাশা আগের চেয়ে অনেক কম হয়েছে। মোটামোটি সে স্বাভাবিক আচরন করছে এখন। তাও মানসিকভাবে সেড়ে উঠতে সময় তো লাগবেই।
 
কাবির হাতে একটি সেদ্ধ ডিম আর মিল্কশেক। বাকিরা রাতে কিছু খায়নি। কায়রা সেসব জানে না।
এইসময় প্রীষানসহ কায়রাভ, কাবির তিনজনই কেবিনে ছিলো।
 
“আপনার টিকিটও কেটেছি, একেবারে আমাদের সাথেই ফিরবেন।” কায়রাভ মৃদু কণ্ঠে বলল প্রীষানকে।
 
প্রীষান অবাক হয়ে বলল, 
“এর কোনো প্রয়োজন ছিলো না।”
 
কায়রাভ হাসিমুখে জবাব দিলো,
"আপনি আমাদের মাঝপথে ছেড়ে যাননি। এবার আমরা কি করে যাই?”
 
প্রীষান বিনয়ী ভঙ্গিতে আলতো হাসলো বিনিময়ে। এই সময় কাবির ডিম খাওয়াচ্ছে কায়রাকে জোর করে। কায়রা নাক কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলল,
“সামনে থেকে সরাও ভাইজান! ইয়া'ক! এই ডিম কে খায়, ভাই!”
 
কাবির চোখে হালকা রাগের আভাস। কিন্তু তাতে রয়েছে মমতার ছোঁয়া বেশি। সে ধমক দিলো,
“তুই অসুস্থ, তাই চুপ রইছি। এই ডিম ভদ্রমতো না খাইলে আমার শক্ত হাতের থাব'ড়া খাইতে হবো সিওর থাক। এখন চয়েস কর, কি খাবি? থাব'ড়া না ডিম?”
 
কায়রাভ নরম হলো বোনের প্রতি। তাই উল্টো কাবিরকে ধমকে বলল,
"বকিস না। ধীরে সুস্থে বুঝিয়ে খাওয়া ওকে!"
 
কায়রা মুখ কুঁচকেই বিরক্ত গলায় কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দাও দাও, ডিম'ই খাচ্ছি। তোমার থাব'ড়া খেলে আমার আর হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া হবে না।”
 
কায়রা ডিম খেয়ে নিলো কোচকানো মুখে। কাবির চোখে হাসি ফুটলো। কায়রাভ বোনকে প্রশ্ন করলো,
“আর কিছু খাবি? নিয়ে আসবো?”
 
কায়রা মাথা নাড়ালো। তার ভালো লাগছে আর কিছু। দুই ভাইয়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে সন্দেহজনক চোখে বলল,
“তোমরা খেয়েছো?”
 
এবার দুই ভাই চুপ। প্রীষান এসব দৃশ্য দেখছে। মনের ভেতর আলাদাই ভালোলাগা ঢেউ উঠলো এদের ভাইবোনেদের এত সুন্দর বন্ডিং দেখে! নিঃসন্দেহে কায়রা ভাগ্যবান, এমন ভাইদের পেয়ে। কায়রা রাগান্বিত গলায় বলে, 
“যাও, খেয়ে আসো। নাকি সবাই আমার সাথেই হসপিটালে এডমিট হওয়ার প্ল্যান করেছো! একদিনেই নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে মুখগুলো বানিয়েছে কি একেকজন! এই চেহারায় আমাকে সামলাবে কিভাবে!"
 
এরপর প্রীষানের দিকে ঘুরে তাকিয়ে সেই একইভাবে বলল,
"আপনিও নিশ্চয়ই খান নি, স্যার। যান তো, খেয়ে আসুন সবাই। খাওয়া শেষ হলে ধীরে সুস্থে বাড়িতে যেতে চাই, জাস্ট! এই হসপিটালে আর থাকা যাচ্ছে না। দমবন্ধ লাগছে আমার!"
 
কাবির, কায়রাভ আর প্রীষান উঠে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। কোনো কথা হলো না কায়রার মুখের উপর। যদিও গলা দিয়ে কারোরই কিছু নামবে না তবুও চলার শক্তি পেতে পেটে কিছু দানা-পানি পরা দরকার। 
 
চলমান.......
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৬
 
ফ্লাইট আকাশের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে নিজস্ব গন্তব্যের দিকে। জানালার বাইরে মেঘের দল তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। সামনের সিটে পাশাপাশি বসেছে কায়রাভ আর কায়রা। তাদের ঠিক পেছনের সারিতে প্রীষান আর কাবির। হঠাৎ কাবিরের ফোনটা কেঁপে উঠলো রিংটোনের আওয়াজে। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো দুটো লাভ ইমোজির মাঝে প্রীতির নাম। কাবির এসব অদ্ভুত কাজও করে আজকাল। প্রেমিকার নাম এভাবে সেভ করার মতো পাগলামি। ভাবনা ছুড়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এলো,
" আপুর কি অবস্থা এখন? কেমন আছে?"
 
কাবির জানালার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
" আছে মোটামুটি।"
 
ওপাশ থেকে প্রীতিষা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এরপর বলল, 
" আল্লাহ সুস্থ করে দিক, তারাতাড়ি। আমি নিউজে সব দেখেছি। কি থেকে কি হয়ে হলো!"
 
কাবির মাথা নেড়ে বলল,
" হুম… চিন্তা কইরো না। দোয়া করো বেশি বেশি।"
 
কথা বলতে বলতেই হঠাৎ কাবিরের মনে হলো প্রীতিষার গলাটা আজ কেমন যেন অন্যরকম শোনাচ্ছে। কণ্ঠ হালকা ভাঙা ভাঙা লাগছে। মাঝে মাঝে নাক টানার আওয়াজও পেয়েছে কাবির। তাই কাবির খানিকটা চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার গলা এমন লাগতাছে ক্যান? ঘ্যারঘ্যার করতাছে কেমুন জানি?"
 
ওপাশ থেকে আবার সু'রু'ৎ করে নাক টানার শব্দ এলো। এদিকে প্রীতিষা খুশি হলো কাবিরের ছোট ছোট কেয়ারে। এই ভেবে প্রীতিষা একটু লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
" ওই যে… কাল বেলা করে গোসল করেছিলাম। ঠান্ডা লেগে গেছে।"
 
কাবির ঠান্ডা গলায় বলল, 
"এত অযত্ন করো ক্যান শরীরের প্রতি?"
 
সামনের সিটে বসে কায়রাভ আর কায়রা দুজনেই ফিচ করে হেসে উঠলো। এমন সাদামাটা, আন্তরিক কথোপকথনে তাদের বেশ মজা লাগছিলো। শুধু প্রীষানই চুপচাপ ছিলো। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে একপ্রকার নিজের ভেতরেই ডুবে আছে। কায়রাভ মনে মনে ভাবলো যাক, অবশেষে তার ছোট ভাইটা সত্যিই প্রেমে পড়েছে। ভালো থাকুক দুটোতে। 
 
প্রায় আধঘণ্টা ধরে কথাবার্তার পর কাবির ফোনটা রেখে দিলো। ফোনটা পকেটে ঢোকাতেই পাশ থেকে প্রীষান গলা খাঁকারি দিয়ে কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল,
"কে ছিলো? গার্লফ্রেন্ড?"
 
কাবির মুচকি হাসলো। সম্মতি জানিয়ে বেশ জোর গলায় বলল,
" এখনকার জামানায় তো তাই কয়। যদিও আমার লক্ষ্য বিয়া পর্যন্ত!"
 
সামনের সিট থেকে কায়রাভ সাথে সাথে বলে উঠলো,
" লজ্জা রাখ একটু। তোর বড় ভাই আর ছোট বোন সামনেই আছে। এইভাবে ওপেনলি প্রেমের কথা বলিস কিভাবে! "
 
কায়রা তৎক্ষনাৎ ছোট ভাইকে সাপোর্ট করে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে ছোট ছোট চোখে বলল,
"একা ছোট ভাইজানকে দোষ দিচ্ছো কেন, ভাইজান? তোমারও কি শরম আছে নাকি? সেদিনও আমার সামনে ভাবিকে চু'মু খেয়েছো! দেখিনি ভেবেছো?"
 
কায়রাভ ভরকালো বোনের কথায়। প্রীষান নিজেও থমকেছে। আর কাবির হো হো করে হেসে উঠলো বোনের সরল উক্তিতে। তার হাসিটা ছিল নির্ভার আর অকপট। গর্ব করে কায়রাভকে বলল,
"যারা সাচ্চা প্রেম করে তারা লুকায় না, ভাইজান। ভালোবাসলে সারা পৃথিবীর সামনে চিৎকার কইরা বলার মতো সাহস থাকা উচিত। যে আই লাভ হার, ম্যাড'লি!"
 
কায়রাভ আলতো করে হেসে মাথা নেড়ে বলল,
"আ'ই অ্যাপ্রিসিয়েট।"
 
প্রীষান ভ্রু তুলে, ঠোঁট সামান্য বাঁকিয়ে তাকালো কাবিরের দিকে।
"বেশ ভালো মানের প্রেমিক আপনি দেখা যায়!"
 
প্রীষান আপনি করে বলায় কাবির হঠাৎ করেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
"আচ্ছা, আপনার বয়স কত স্যার?"
 
প্রীষান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
"থার্টি নাইন।"
 
কাবির চোখ বড় বড় করে বলল,
"আল্লাহ! আমার থেকে তো অনেক সিনিয়র আপনি। তবে আপনারে দেইখা বোঝাই যায় না। আমারে তুমি কইরা বইলেন। আপনি কইলে কেমন লাগে জানি!"
 
প্রীষান হালকা হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। 
সামনের সিটে বসে কায়রা সব কথা চুপচাপ শুনছে। তার কান পুরোপুরি খাড়া। মনে মনে ভাবছে, প্রীষান স্যার তার করা এতদিনের পাগলামির কথাগুলো বলল না কেন তার ভাইদের? কায়রা অসুস্থ বলেই কি? এমন হাজারো ভাবনা তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে তার।
এরই মধ্যে কাবির, কায়রাভের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছে। আলাপচারিতায় প্রীষানও কিছুটা যুক্ত হয়েছে। যদিও কাবিরের কথাবার্তা, আচার-আচরণে প্রীষানের একটু অদ্ভুতই লেগেছে। তবু একটা বিষয় সে পরিষ্কার বুঝেছে, ছেলেটা নিঃসন্দেহে ভালো মনের মানুষ। ভেতরে যেমন, বাইরেও তেমন দেখায়। কোনো ছলচাতুরী নেই তার মাঝে।
 
ফ্লাইটের ভেতরটা কিছুক্ষণের জন্য বেশ নিরিবিলি হলো। কাবির কিন্তু চুপচাপ বসে থাকার মানুষ না। ফোন রাখার পরও তার মুখে সেই চেনা হাসিটা লেগেই আছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে হঠাৎ প্রীষানের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করে বলল,
"একটা কথা জিগাই?"
 
প্রীষান ভ্রু সামান্য তুলে তাকালো। অনুমতি দিয়ে বলল,
" জিজ্ঞেস করো।"
 
কাবির মাথা নেড়ে বলল,
" আপনি তো অনেক ম্যাচিউর মানুষ। এই বয়সে এসে কি প্রেম-টেমে বিশ্বাস করেন নাকি এসব আপনার কাছে কেবল ফালতু জিনিস?"
 
কায়রাভ সামনের সিট থেকে হেসে বলল,
" আরে ভাই, জেরা করা শুরু করলি নাকি?"
 
কাবির হেসে মাথা চুলকালো। অকপটে বলল,
" জেরা না ভাইজান, রিসার্চ। প্রেমের ব্যাপারে সিনিয়রদের মতামত নেওয়া দরকার। তাছাড়া ভবিষ্যৎ বউয়ের ভাইরে পটাইতে হইবো তো। সেও এমন স্যারের বয়সী। বুদ্ধি নিতে ক্ষতি কি?"
 
প্রীষান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
"আমি অতটাও সিনিয়র নই যেভাবে বলছো। মনে হচ্ছে আদিম যুগের আমি! আমার বিয়েও লাভ ম্যারেজ ছিলো। আর এসব কেন জিজ্ঞেস করছো? নিজেরটা ঠিক করার আগে জরিপ চালাচ্ছো নাকি?"
 
কাবির চোখ টিপে বলল,
" নিজেরটা তো ঠিক কইরাই ফালাইছি প্রায়। এখন শুধু আল্লাহর রহমত আর ওর ভাই রাজি হলেই কাম হইয়া যাইবো।"
 
কায়রা আজ মজা নিচ্ছে। কারণ প্রীষান জানে না কাবিরের প্রেমিকা কে। আর কাবিরও জানে না প্রীষান প্রীতিষার ভাই। তাই নিজের ভাইকে হেসে বলল,
"তোমার আত্মবিশ্বাস তো সেই লেভেলের ভাইজান? একদম সঠিক মানুষের কাছ থেকে আইডিয়া নিচ্ছো। ভেরি গুড!"
 
প্রীষান আড়চোখে তাকালো কায়রার দিকে। কায়রা চোখে চোখ পড়তেই তড়িৎ বেগে চোখ নামিয়ে নেয়। সে মনে মনে ঠিক করেছে আর পাগলামি নয় প্রীষান স্যারকে নিয়ে। আর তার এই অবস্থার পর তো নয়ই। সে মনের সব অনুভূতি জলাঞ্জলি দিয়ে দিয়েছে ওই হসপিটালের বেডেই। কাবির গম্ভীর মুখ করে বলল,
"আত্মবিশ্বাস তো থাকতেই হইবো রে, বইন। প্রেম মানে একটা যুদ্ধের মতো। শেষ পর্যন্ত না জিতলে এর দুঃখ আজীবন বইতে হয়।"
 
প্রীষান এবার সত্যিই একটু মজা পেলো। বলল,
"আর যদি হেরে যাও?"
 
কাবির কয়েক সেকেন্ড ভেবে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
"যদিও পসিবিলিটি নাই হারার। তারপরেও হারলে প্ল্যান চেঞ্জড হবো। কিন্তু মাইয়া ছাড়ুম না!"
 
কায়রাভ প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বলল,
"কি প্ল্যান? "
 
কাবির শয়তানি হেসে বলল,
"সিক্রেট প্ল্যান! বলা যাবো না।"
 
কায়রা ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলল,
" মেইবি আমি বুঝেছি কি প্ল্যান? "
 
কাবির মাথা দোলালো। তারপর হাই তুলে বলল,
" বুঝলেও কি, চুপ থাক! "
 
কায়রা ঠোঁট চেপে হাসলো। প্রীষান হালকা হেসে বলল,
"তুমি যে বললে তোমার গার্লফ্রেন্ডের ভাই জানে না এসব। কিন্তু যখন হঠাৎ করে তার সামনে যাবে তাকে পটাতে, বাই চান্স পটলো না। তখন রিস্কি হয়ে যাবে না ব্যাপারটা!"
 
কাবির গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লো,
"প্রেমে একটু রিস্ক না থাকলে মজা নাই, স্যার। সবকিছু যদি হিসাব কইরা করা লাগে, তাইলে সেটা ব্যবসা হয়… ভালোবাসা না। ভালোবাসা জিনিসটা হুট কইরা হইয়া যায়, প্ল্যান কইরা না। আমারও হুট কইরাই হইছে। সত্যি বলতে আমার বিয়া সাদির প্ল্যান আছিলো না। কিন্তু ওর সাথে দেখা হওয়ার পর সব কেমুন জানি চেঞ্জ চেঞ্জ হইয়া গেলো। বুঝাই পারলাম না কখন কি হইলো? যেদিন ফিল করলাম ওই মেয়েটারে পাইলে আমি জীবনের সব খুশি পামু, সেইদিন বুঝছি আমি শেষ! ফাঁন্দে পইরা গেছি! অবশ্য আমাদের সম্পর্ক নিয়া ও অনেক বেশি ডেডিকেটেড আছিলো আগে থেকে। সি ফ'ল ইন লা'ভ উইথ মি ফার্স্ট, দেন আই ফ'ল ফর হার ইভে'ন মোর ডিপ'লি।"
 
কাবিরের কথাগুলো শুনে কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপ করে রইলো। কায়রাভ পেছনে ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসলো আর বলল,
"তোর কথা শুনে আমি সিওর, তুই মারাত্মকভাবে প্রেমে পড়েছিস। একসময়কার ত্যাড়া ভাবটাও কেটে যাচ্ছে। তোরে মানুষ করে ফেলেছে ওই মেয়ে!"
 
কাবির জানালার বাইরে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল,
" শুধু প্রেমে পড়ি নাই ভাইজান… ডুইবা গেছি। বাঁচার উপায় নাই।"
 
আজ কাবির সবার সামনেই স্বীকারক্তি দিলো। এতদিনকার অনুভুতি সবাইকে জানালো যা মনের কুঠুরিতে গোপন রেখেছিলো এতদিন। প্রীষান এবার আর কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ কাবিরের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো মনে মনে ভাবলো, ছেলেটা একটু অদ্ভুত ঠিকই… কিন্তু তার কথাগুলোতে সততা আছে। ওর ভালোবাসার ধরনটাও ভালো লাগলো। পাগলামিপূর্ন বলে। আর যাইহোক, কোনো মেয়েকে ঠকানোর মতো না। আনমনেই প্রীষান হাসলো এসব ভেবে। সেও কত পাগলামি করেছে কলেজ জীবনে পৃথার জন্য। কিন্তু এখন সেসব শুধুই স্মৃতি। ভাবনা শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। 
 
--------------------------------------
 
দুপুর গড়ানোর আগেই প্রীষান বাড়িতে পৌঁছালো। ক্লান্ত বিধস্ত শরীরটা ঠেলে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলো প্রীতিষা। দরজার আওয়াজ শুনতেই অপেক্ষার বাঁধ ভাঙলো প্রিহা আর প্রীভানের।তাদের বাবা ফিরতেই রুম থেকে ছুটে এলো দুজন একসাথে। দু’জনেই বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। প্রীষান আলতো হাতে তাদের আগলে নিলো। সেই দৃশ্যটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখছিলো প্রীতিষা। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠলো একটুখানি মৃদু হাসি। এমন দৃশ্য দেখলে যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে। প্রিহা মুখ তুলে বলল,
"পাপা, আমি তো নিউজটা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম! আন্টি এখন কেমন আছে? সেরে যাবে তো?"
 
প্রীষান শান্ত গলায় বলল,
"চিন্তা করো না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আন্টি এখন ইনজিউরড। তাহলে বুঝতেই পারছো, তার মনের অবস্থা কেমন। আমরা শুধু তার জন্য দোয়া করতে পারি।"
 
প্রিহা ধীরে মাথা নাড়লো। তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীভান হেসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
"এত কিছুর মাঝেও কিন্তু একটা ভালো খবর আছে, পাপা!"
 
প্রীষান ভ্রু তুলল,
" কি খবর?"
 
প্রীভান উজ্জ্বল মুখে বলল,
"আপুর পা একদম সেরে গেছে! এখন ক্রাচ ছাড়াই হাঁটতে পারে আপু।"
 
প্রিহা বিনিময়ে আলতো হাসলো। প্রীষান একটু দূরে সরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
"তাই তো! আমি তো খেয়ালই করিনি, আমার প্রিন্সেস হেঁটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।আলহামদুলিল্লাহ…!"
 
প্রিহা হেসে বলল,
" হ্যাঁ পাপা। পা সেরে গেছে। আর শোনো তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে আসো। আজ সকালে আমি একটা নিউ ডিশ রান্না করেছি। যদিও মণি দেখিয়ে দিয়েছে… কিন্তু সব কিন্তু আমিই করেছি!"
 
প্রীতিষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আমি আবার কোথায় ক্রেডিট নিচ্ছি! সবই তো তুই করেছিস। এভাবে ঘটা করে বলার কি আছে!"
 
প্রীষান হালকা হেসে বলল,
"ঠিক আছে, বুঝেছি। আমি একবারে গোসল সেরে আসছি। 
 
তখন প্রীভান ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,
"মণি, আমি তাহলে বেরোলাম। প্রাইভেট আছে আমার।"
 
প্রীতিষা মাথা নেড়ে বলল,
"হুম, সাবধানে যাস।"
 
প্রীভান তখন বেরিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে প্রীষান সোজা ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো। টেবিলে খাবার অন্য খাবার সাজাতে সাজাতে প্রীতিষা বলল,
"ভাইয়া, আজ বিকেলে নিজাম আংকেল আসছেন। কাল রাতে ফোন করেছিলেন আমায়। তোমায় পাচ্ছিলেন না তাই।"
 
প্রীষান জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা… আর কিছু বলেছে?"
 
প্রীতিষা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
"হ্যাঁ। অনেকক্ষণ কথা হলো। উদ্দেশ্যটা জানোই। এইবার এসে-থেকে একেবারে তোমার বিয়ে দিয়ে যাবে বলেছেন।"
 
প্রীষান ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
"আমার আসলে কি বলা উচিত বল তো? কাউকে বোঝাতেই পারছি না আমার জীবনে কোনো অভিযোগ নেই। তবু এই বিয়ে-বিয়ে কথাটা এখন খুব বিরক্ত লাগছে। সবাই একটু বেশি বাড়াবাড়িই করছে।যেখানে আমার ইচ্ছে নেই সেখানে কারো কথা কিভাবে থাকতে পারে?"
 
প্রীতিষা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
"সত্যি বলতে, আমিও চাই তুমি বিয়ে করো। আমায় ভুল বুঝো না ভাইয়া। এখন তো অনেকেই সেকেন্ড ম্যারেজ করছে। তুমি কেন এখনো অতীতটা আঁকড়ে পড়ে আছো? একটু এগিয়ে দেখো। এভাবে তো সারাজীবন থাকা যায় না। ভালো থাকার অধিকার তোমারও আছে।"
 
এরই মধ্যে প্রিহা প্লেটে খাবার তুলে নিয়ে এসে টেবিলে বসলো। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। তাই কোনো কথা বলতে কেউই দ্বিধা করে না। চেয়ারে বসে প্রিহা বলল,
"পাপা, একটা কথা আমিও বলি?"
 
প্রীষান হতাশ ভঙ্গিতে হেসে বলল,
"সবাই যখন বলছে, তুমি বাদ যাবে কেন, মা? বলো বলো শুনবো। আমার ধৈর্য্য আছে।"
 
প্রিহা একটু থেমে বলল,
"আগে যখন নানা তোমার বিয়ের কথা তুলতো, তখন আমার খুব রাগ হতো। মনে হতো, মাম্মা ছাড়া পাপাকে অন্য কারো সাথে দেখতে পারবো না। কিন্তু সেদিন নানা আমাকে কিছু কথা বলেছে। বলতে পারো বাস্তবটা বুঝিয়েছে। তখন হয়তো ঠিক বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি কথাগুলোর মর্মার্থ। তোমার বিয়ে না করার অন্যতম কারণ, আমরা। তাই না, পাপা?"
 
প্রীষান সায় জানিয়ে বলল,
"অবশ্যই তোমরা একটা কারণ। আমি আমার বাচ্চাদের ফিউচার নিয়ে চিন্তা করি। অথচ তোমরা নিজেরা সৎ মা চাইছো! বিষয়টা রিডিকিউলাস!"
 
প্রিহা নাকোচ করে বলল,
"তুমি আগেই নেগেটিভ ভাবছো কেন? সবাই খারাপ হয় না। আর তাছাড়া এমন তো নয় যে তোমার জীবনে কেউ আসলে আমাদের প্রতি তোমার ভালোবাসা কমে যাবে? এতটাও ঠুনকো নয়!"
 
প্রীষান চোখ পাকিয়ে বলল,
"বড্ড পাকা পাকা কথা বলছো তুমি! "
 
প্রিহা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
" পাকা পাকা কথা নয়। আমি বুঝদারের মতো কথা বলছি স্বীকার করো তুমি। যাইহোক, মোটকথা আমিও চাই… তোমার বিয়ে হোক। তুমি ভালো থাকো, পাপা। ইয়্যু ডিজার্ভ টু বি হ্যাপি লাইফ।"
 
প্রীষান আচমকাই নরম হয়ে গেলো। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল,
"আমি তো ভালোই আছি, প্রিন্সেস। তুমি তোমার ছোট মাথায় এত চাপ নিও না। আপাতত এসব ভাবনা ছাড়ো। বাবা আসুক বিকেলে, তখন কথা হবে।"
 
তারপর একটু হাসলো প্রীষান। হাসিমুখে মেয়েকে বলল,
"এখন আগে দেখি তো, আমার প্রিন্সেস কি রান্না করেছে! টেস্ট করবো তো! আর প্রীভান খেয়ে গেছে?"
 
প্রীতিষা বলল,
" হুম। ও আগেই খেয়েছে। আমরাই বাকি এখন।"
 
প্রিহা এবার আর কিছু বলল না। ব্যস্ত হয়ে পড়লো পাপাকে তার বানানো নতুন ডিশ খাওয়াতে। ওসব ভাবনা পরে হবে ক্ষন।
 
---------------------------------------------
 
রাত তখন ঠিক ন’টা পঁয়তাল্লিশ। খান বাড়ির ভেতর একদম নিরব। সবাই একই ঘরে বসে থেকেও আলাদা আলাদা চিন্তায় বন্দি। কায়রার ঘরে আজ সবাই জড়ো হয়েছে। বিছানার একপাশে পাশাপাশি বসে আছে কায়েশী আর কায়ান। কায়রা বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার পাশের টেবিলটায় ঔষধের ছড়াছড়ি। আর তাদের সামনে থাকা সোফাটায় বসে আছে কাবির আর কায়রাভ। দুপুরের পর থেকে কাবির এখানেই ছিলো বোনের জন্য। 
এখন হঠাৎই কাবির উঠে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো বোনের দিকে। কায়রার মাথায় আলতো করে চুমু খেয়ে নরম গলায় বলল,
" যাইগা থাক। খারাপ লাগলে কল দিস।"
 
কায়রার চোখদুটো তখনও ক্লান্ত আর বিষণ্ণ। সে মলিন স্বরে বলল,
"থেকে যাও না ভাইজান! একটা রাতও এই বাড়িতে কাটাও না। আমরা তো কখনোই একসাথে থাকলাম না।"
 
বোনের কথাটা শুনে কায়রাভ একটু থমকে গেলো।
কায়েশী নীরবে তাকিয়ে আছে এই ভাইবোনদের দিকে। আসলেই… কায়েশী এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এক রাতও কাবিরকে এখানে থাকতে দেখেনি। অথচ এদের ভাইবোনের সম্পর্ক এত গভীর দেখলেই বোঝা যায়। তবু কাবির কেন আলাদা থাকে, সেই প্রশ্নটা তার মনে বারবার ঘুরে ফিরে আসে। কাবির হালকা হেসে বোনের কপালে টোকা দিলো স্বভাবসুলভভাবে। 
"কই থাকি না একসাথে? একসাথে থাকা মানে এক ছাদের নিচে থাকা নাকি? পাগল মাইয়া!"
 
কায়রা আর জোর করলো না। সে জানে তার ভাইজান নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সহজে সরে না। অটল সে। অগত্যা সে চুপ করেই রইলো। কাবির দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই পেছন পেছন বেরিয়ে এলো কায়রাভ। সদর দরজা অব্দি যাওয়ার আগেই হঠাৎ ডেকে উঠলো, 
" কাবির, শোন! "
 
কাবির পেছন ফিরে তাকালো প্রশ্নবিদ্ধ চোখে।কায়রাভ এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে এসে হঠাৎই ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। কাবির স্পষ্টতই চমকে গেলো। তবু কিছু বলল না। শুধু আলতো করে ভাইয়ের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
" কি হইছে, ভাইজান?"
 
কায়রাভ ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিলো। মুখে ফোটে অদ্ভুত এক অস্বস্তিরেখা। তবু বলল,
"হসপিটালে তোকে উল্টোপাল্টা কথা বলছিলাম। আমার উচিত হয় নি। আমি...."
 
কাবির কথাগুলো মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে হেসে উঠলো,
" সিরিয়াসলি ভাইজান? ওই কথা নিয়া এখনো পইড়া আছো! ধুর… ওইসব আমি ধরিই নাই!"
 
কায়রাভ মাথা নেড়ে বলল,
"না, কিন্তু পরে মনে হয়েছে ওভাবে বলা উচিত হয় নি তোকে। অযথা ব্লেইম করতে যাচ্ছিলাম। আসলে কায়রার অবস্থা দেখে মাথা ঠিক ছিল না তখন।"
 
কাবির একটু মৃদু হেসে একটা অদ্ভুত কথা বলল,
"কায়রার অবস্থা দেইখা কি খালি তোমার মাথা একা খারাপ হইছিলো? আমার হয় নাই?"
 
কায়রাভ সচকিত বেগে তাকায়। কাবির একটু থেমে আবার বলল,
"অবশ্য তুমি বলতে পারো, ও তো তোমার নিজের বইন…তাই চিন্তাও তোমার বেশি!"
 
কথাটা শেষ হতেই কায়রাভ স্থির হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। এই কথাটা বলতে পারলো কাবির! কায়রাভ অবাক হয়েই বলল,
"এইসব কি বলিস তুই? কায়রা আমার নিজের বোন মানে? তোর বোন না ও?"
 
কাবির ঠোঁটে একফোঁটা হাসি ফুটলো। তবে তা কষ্টের, হতাশার। ভারী গলায় বলল, 
"সত্যি তো এইডাই ভাইজান… আমি তো তোমাদের মায়ের পেটের কেউ না। অস্বীকার করবা?"
 
কায়রাভও এবার গম্ভীর হয়ে উঠলো,
" আমাদের রক্ত এক, কাবির। এইটা তুই অস্বীকার করবি?"
 
এইবার কাবিরের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো। চোখদুটো হঠাৎ করেই কেমন কঠিন হয়ে উঠলো।
কঠিন, ভারী গলায় বলল,
"দূষিত রক্ত, ভাইজান। পরিশুদ্ধ না। এই রক্তরে আমি ঘে'ন্না করি… জাস্ট। আই’ম ডান উইথ ক্যারিং দি'স অ্যাসহো*ল ফাদার’স ব্লাড।”
 
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর কাবির আর দাঁড়ালো না। মুখে শুধু বলল,
"দেরি হইতাছে। গেলাম।"
 
কথাটা বলেই হনহন করে হাঁটা দিলো কাবির। মাথাটা চড়ে গেছে নিজের বাপের কথা শুনে। খান বাড়ির গেট পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো কাবিরের ছায়ামুর্তি।
পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো কায়রাভ। স্থির, নির্বাক ভঙ্গিতে। তার'ই বা আর কি বলার। কাবিরের এই রাগ, ক্ষোভ কোনো কিছুই অযৌক্তিক নয়। 
 
চলমান.......
 
 
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৭
 
 
বিকেলের শেষ প্রহরে সূর্যের আলোটা কোমল সোনালি পরশ হয়ে নেমে আসছিলো ধরণীর বুকে। প্রীষানের ঘরের বড় বারান্দায় প্রীষান আর নিজাম উদ্দীন পাশাপাশি বসে আছে দুটো চেয়ারে। সামনের ছোট টেবিলে রাখা চায়ের গরম ধোঁয়া উঠছে। 
 
নিজাম উদ্দীনের পরনে সাদা ফতুয়া আর পাজামা। মাথাভর্তি ঘন পাকা চুলে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তবুও চেহারায় অদ্ভুত এক জ্যোতি রয়ে গেছে। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ হলেও মুখের মাধুর্য এমন যে তাকালেই বোঝা যায় যৌবনকালে মানুষটা নিশ্চয়ই বেশ সুদর্শন ছিলেন। এইমাত্র বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার আগেই তিনি পৌঁছেছেন প্রীষানের বাড়িতে। সুদূর চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন। নিজাম উদ্দীনের আগমনের উদ্দেশ্য জেনে প্রীষান খানিকটা বেকায়দায় পড়েছে বটে। কিন্তু তা প্রকাশ করার চেষ্টা করছে না। তবু তার শ্বশুরের অভিজ্ঞ চোখ এড়িয়ে যায় না কিছুই। তিনি তা ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন।
 
বর্তমানে জামাই-শ্বশুর দু’জনেই চা পানে ব্যস্ত। অনেকদিন পর এমন করে একসাথে বসা। স্বাভাবিক কথাবার্তার মাঝেই নিজাম উদ্দীন হঠাৎ গত দুদিনের আলোচিত খবরটার প্রসঙ্গ তুললেন। 
“পেপারে তোমার কলেজের সেই শিক্ষার্থীর এক্সিডেন্টের খবরটা পড়লাম। মেয়েটা এখন কেমন আছে?”
 
প্রীষান আলতো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। 
“যেমন থাকার কথা... শারীরিক আর মানসিক দুই দিক থেকেই বিদ্ধস্থ মেয়েটা। কিন্তু সবার সামনে হাসিমুখে বোঝাচ্ছে সি ইজ ফাই'ন!"
 
কথাটা বলেই প্রীষান হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো।
নিজাম উদ্দীন ধীর স্বরে বললেন, 
“আল্লাহ তাআলা দ্রুত সুস্থ করে দিক মেয়েটাকে।”
 
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। প্রীষান ভেতরে ভেতরে আরেকটা কথা বলার সাহস জোগাড় করছিলো। সে কথাটা বলতে ইতস্তত করছিলো। কারণ এর আগে এই সম্পর্কে কথা উঠলেও কোনো সাড়া পায়নি মানুষটার থেকে। কিন্তু না বললেও নয়। শেষ পর্যন্ত দ্বিধা সরিয়ে বলেই ফেলল,
“বাবা… একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম আপনাকে।”
 
নিজাম উদ্দীন মৃদু হেসে বললেন, 
“আমিও বলতে চাইছিলাম। তবে আগে তুমিই বলো। শুনি।”
 
প্রীষান একটু এগিয়ে এসে নিজাম উদ্দীনের হাতটা আলতো করে ধরলো। অনুরোধের সুরে বলল,
“ভণিতা না করে সরাসরি বলছি। মা মারা যাওয়ার পর হাজারবার বলেছি আপনাকে… কিন্তু আপনি শোনেননি। ওই বাড়িতে আপনার একা থাকার কোনো মানে হয় না। বাবা, প্লিজ… আপনি আমাদের সাথে থেকে যান। আমার বাবা হয়ে। মাথার উপর বাবার ছায়াটা থাকুক।”
 
নিজাম উদ্দীন কিছুক্ষণ ছেলেসম এই জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নতুন নয় এই কথা। তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর যতবারই এই বাড়িতে এসেছে ততবারই ছেলেটা বোঝায় তাকে থেকে যেতে। কিন্তু রাজি হয় নি সে এতদিনেও। ভাবনার মাঝে নিজাম উদ্দীন মৃদু হেসে প্রীষানের পিঠ চাপড়ে বললেন,
“তুমি ভুল করে আমার জামাই হয়ে গেছো, প্রীষান। আসলে তোমার আমার ছেলে হওয়ার কথা ছিলো।”
 
প্রীষান অবাক হলো না। কারণ, সে জানে তাকে ছেলের থেকে কোনো অংশে কম দেখেন না তিনি। নিজাম উদ্দীন আবার বললেন, 
“আমাদের অনেক মিল আছে। আর সবচেয়ে বড় মিল কি জানো? জেদ।”
 
প্রীষান বুঝে গেলো এই কথার মানে। তাই চোখ সরু করে বলল, 
“তার মানে আপনি এবারও জেদ করবেন?”
 
নিজাম উদ্দীন হেসে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, 
“তুমি কি জেদ করছো না?”
 
প্রীষান একটু থতমত খেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। খানিকটা অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
“কিসের সাথে কি টানছেন আপনি? আমার বিষয় আলাদা। আপনি আমাদের সাথে থাকবেন, এটাই ফাইনা'ল। দরকার হলে জোর করেই নিয়ে রাখবো আপনাকে। আর ছাড়াছাড়ি নেই, অনেক জেদ করে নিয়েছেন আপনি!”
 
নিজাম উদ্দীন কিছুক্ষণ ভেবে বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন,
 " নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে থাকতে মন চায় না। এটাই কারণ। তবে তোমার কথাটা ভাবলাম। একটা ডিলে আসা যায় কিন্তু।”
 
প্রীষান ভ্রু তুলে তাকালো। কৌতুহলে জিজ্ঞেস করে, 
“কী ডিল?”
 
নিজাম উদ্দীন এবার একটু দুষ্টু ভঙ্গিতে হাসলেন। ঠিক ঠিক উচিত সময়টা কাজে লাগালেন।
“তুমি আমার বাছাই করা পাত্রীদের মধ্যে থেকে একটা মেয়েকে সিলেক্ট করে বিয়ে করে নাও। তারপর আমি আর জেদ করবো না। প্রমিস, থেকে যাবো তোমার বাবা হয়ে।”
 
কথাটা শুনে প্রীষান হঠাৎ চমকে উঠলো। সাথে চোখে বিরক্তির ঝলক ফুটে উঠলো। এইবার প্রীষান সত্যি ক্লান্ত। হতাশ গলায় বলল,
“ভালো চাল চাললেন কিন্তু, বাবা! চেকমেট করে দিলেন!”
 
নিজাম উদ্দীন নিজের ভাব বজায় রেখে শান্ত গলায় বললেন, 
“ভেবে দেখো, প্রীষান। দ্বিতীয় সুযোগ কিন্তু দেবো না তোমাকে।”
 
প্রীষান আর কিছু বলল না। তার মুখে অজস্র হতাশা জমে উঠলো। সে প্রচুর অসহায়। তাকে কেউ বুঝতে চাইছে না। প্রীষান মাথা নিচু করে বসেছিলো। মনে অজস্র ব্যথা চাপা দেওয়া। নিজাম উদ্দীন আরেকটু এগিয়ে এলেন। শান্তনা দিয়ে বললেন,
“তোমার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়ে অসম্মতির কারণ আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু প্রীষান, অতীত নিয়ে পরে থাকা কি কোনো সমাধান? অতীতের ক্ষতগুলো নিয়ে কতোদিন থাকবে? পৃথার স্মৃতি নিয়ে সারাজীবন কষ্টে কাটানো তোমার কেমন সিদ্ধান্ত বোঝাও আমায়? সারাজীবন নিজেকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। মনে রেখো, পৃথা চলে যাওয়ার আগে তোমার দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে গেছে। তোমার সুখ, তোমার ভালো থাকার সব দায়িত্ব আমি নিয়েছি। অথচ, এখনো আমি কিছু করতে পারছি না!"
 
প্রীষান হঠাৎ মাথা তুললো। বুক ভরা কষ্ট ঝরলো বলা শব্দগুলোয়, 
“আপনার মেয়ে দায়িত্ব দিয়ে পালিয়ে গেছে, বাবা।
অথচ আমার কথা একবারও ভাবলো না। ও ছাড়া আমার কি হবে, আমাদের বাচ্চাদের কি হবে একবারও ভাবলো না। ওর কথাও রাখে নি! আর আপনি আপনার জায়গায় ঠিক, আমি তা মানি। কিন্তু আমি কিভাবে পৃথাকে ঠকাবো? সারাজীবন ওর হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতি কিভাবে ভাঙবো আমি?”
 
নিজাম উদ্দীন চুপ করে সব শোনেন। তিনি তো অবুঝ নন। কিন্তু প্রীষানও নিজের দিক থেকে অসহায়। মেয়েটাকে কম তো ভালোবাসে নি, কম পাগলামি তো করেনি। সবকিছুর স্বাক্ষী তিনি। কিন্তু এভাবে ছেলেটার গুমরে কষ্ট পাওয়ার অধিকার নেই। এই ভেবে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজাম উদ্দীন বললেন,
“তুমি এটা কেন ভাবছো পৃথাকে ঠকানো হবে? প্রীষান, পৃথা কি বলেছিলো ভুলে গেছো? যেখানে পৃথা চলে যাওয়ার আগে নিজে তোমাকে বলেছে নতুন করে শুরু করতে তাহলে! আর রইলো কথা প্রতিশ্রুতির? যে মানুষটাই নেই তাকে ঘিরে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেই বা কিভাবে? এখানে অন্যায় নেই।”
 
প্রীষান চোখ বুজে ফেললো। ও আসলেই বুঝতে পারছে না কি করা উচিত, আর কি নয়? সত্যিই কি উচিত দ্বিতীয় বার জীবনকে সুযোগ দেওয়া? এটা অন্যায় হবে না তো পৃথার প্রতি? এই চিন্তাই জাপটে ধরে প্রীষানকে। নিজাম উদ্দীন প্রীষানের মনোভাব বুঝে তার কাঁধে হাত রাখলেন,
 “একবার নিজেকে সুযোগ দাও, প্রীষান। আমি বিশ্বাস করি, তুমি ভালো থাকবে।”
 
প্রীষান কোনো উত্তর দিলো না। দু-হাতের কনুই হাঁটুতে ভর দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে রইলো হাতের শক্ত মুঠোয়। ঘন ঘন শ্বাস ফেললো অস্থির হয়ে। তবে তার মনে একটা শান্তি কাজ করলো ডেস্টিনি ভেবে। যদি সত্যিই উপরওয়ালা তার জন্য কাউকে ঠিক করে রাখে তবে তাকে প্রীষান পাবে। প্রীষানও এবার নিজেকে সুযোগ দিতে প্রস্তুত হলো, মনে মনে। 
 
***************
 
কায়রাভের পার্টি অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে এসেছে। ক্লান্ত ছিলো বিধায় একেবারে ফ্রেশ হয়ে সে সোজা বোনের রুমের দিকে চলে যায়। ঘরে ঢুকতেই চোখ পড়ে কায়রার উপর। মেয়েটা বিছানায় নিশ্চল হয়ে বসে আছে বরাবরের মতো। পাশেই কায়েশী এবং কায়ানও চুপচাপ বসে আছে। কায়রাভ দরজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলো, 
“ডাক্তার এসেছিলো? দেখে গেছে তোকে?”
 
কায়রা হালকা মাথা নেড়ে ড্রয়ারের ওপরে ছড়ানো ঔষধগুলো দেখিয়ে বলল, 
“হুম… এসেছিলো। আরও অনেকগুলো মেডিসিন দিয়ে গেছে। আগেই কি কম ছিলো নাকি! এবার এগুলোও গিলতে হবে!”
 
কায়রাভ হালকা হাসি দিয়ে বোনের পাশে বসলো। কায়ান চুপটি করে বাবার কোলে গিয়ে বসলো। কায়ান তার ফুপির সাথে কোনো দুষ্টুমি করেনি। কারণ, কায়েশী মানা করে দিয়েছে। বলেছে তার ফুপি অসুস্থ, সে যেন বিরক্ত না করে। কায়ানও বাধ্য ছেলের মতো মায়ের কথা শুনেছে। এদিকে কায়েশী কায়রার কাছেই রয়েছে আজ সারাদিন। কায়েশী বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“কায়রা, আমি নুডুলস বানিয়ে আনছি তোমার জন্য। এসে পিঠে অয়নমেন্ট লাগিয়ে দেবো তোমায়।”
 
কায়রা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। কায়েশী চলে গেলে কায়রা কায়রাভের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ছোট ভাইজান তো আসলো না আজ? সন্ধ্যার পর আসবে বলেছিলো তো!”
 
কায়রাভ নিচের হালকা ঠোঁট কামড়ে ধরে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, 
“আসার কথা যখন বলেছে আসতোই। আমিও ওকে ফোনে পাচ্ছি না। বিকেলে একবার কল করেছিলাম। তখন সুইচ অফ বলল। দাঁড়া, আরেকবার ফোন করে দেখি।”
 
কায়রাভের ফোন করার আগেই নিজে থেকেই ফোন বেজে উঠলো। নাম্বার দেখে কায়রাভের ভ্রু কুচকলো। কারণ, কাবিরের নাম্বার নয় এটা। রিসিভ করতেই অপরপক্ষের কথায় মুখ থমথমে হয়ে গেলো কায়রাভের। আলতো করে ফোনটা বিছানার একপাশে রেখে দিলো। কায়রা কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলো, 
“কি হয়েছে? কে ছিলো?”
 
কায়রাভ ভারী গলায় বলল,
“তোর জন্য সমন্ধ ঠিক করেছিলাম আমি আর কাবির মিলে। সব ঠিকঠাক, কথাও হয়েছিলো মোটামোটি। ছেলেটাও ভালো ছিলো, ডক্টর। আজ ফোন করে ওর মা ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝালো তারা বিয়ে দিতে ইচ্ছুক নয়। ছেলে নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসে।"
 
কায়রা আচমকাই জোরে হেসে উঠলো,
 “ফাউল কথাবার্তা! যদি ভালোই বাসতো, আগেই বলে দিতো। নিউজে সব দেখেছে, তাই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।
আর ভাইজান, তোমাদের উপর রাগ হচ্ছে! বিষয়টা আমাকে আগে জানাওনি কেন?”
 
কায়রাভ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো,
“সব ঠিক করে আমরা সিওর হয়ে তোকে জানাতে চেয়েছিলাম। বাদ দে! ওই ছেলের থেকে দশগুণ ভালো ছেলে এনে দেবো।”
 
কায়রা আবার হালকা হাসলো। কিন্তু অভ্যন্তরে কিছুটা অস্থিরতা। অন্য সময় হলে বিয়ের কথা শুনে চিৎকার করার কথা ছিলো তার। কিন্তু কায়রা তা করেনি। ও এখন নিজেকে সামলাতে শিখে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কাবির ভিডিও কল করলো। কায়রাভ রিসিভ করতেই কাবির বড় ভাইকে দেখে বলল,
“মুখের অবস্থা এমুন হইছে ক্যান? কি হইছে, ভাইজান?”
 
কায়রাভ থমথমে গলায় বলল,
“যে সমন্ধটা আমরা ঠিক করবো ভেবেছিলাম, ওটা ইনিয়ে বিনিয়ে না করে দিয়েছে ছেলের মা।”
 
কাবিরও এবার থমকে গেলো। হাসোজ্জ্ব্যল মুখটা ভার হয়ে গেলো নিমেষেই। কায়রা তা দেখে হেসে বলল,
“ঠিকই আছে, প্রতিবন্ধী মেয়ের সাথে কে বিয়ে দেবে!”
 
কাবির ফোনের ওপাশ থেকে রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
“থাপড়া'মু তোরে! মেজাজ খারাপ করিস না, কায়রা! এমনিতেই মাথামুথা ঠিক নাই!”
 
কায়রা চট করে নিজের হাতে ফোন নিয়ে বলল,
“কেন মেজাজ খারাপ হচ্ছে, ভাইজান? সত্যি মানতে শেখো। তোমাদের বোন প্রতিবন্ধী, তার একটা পা নেই। এবার বিয়ে কিভাবে দেবে তোমরা? বোঝা হয়ে গেলাম তো!"
 
কাবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কালকে বাড়িতে আইসা একচোট থাপড়া'য় যামু তোরে! অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করতাছস এখন!”
 
কায়রা আলতো শ্বাস ফেললো ভাইয়ের কথায়। এদিকে কায়রাভ হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে এই দুই ভাইবোনের দিকে। কিছু বলার ভাষা নেই তার। এবার কায়রার হঠাৎ চোখ পড়ে কাবিরের আশেপাশে। কাবির একটি গাড়িতে, কোথাও যাচ্ছে! স্ক্রিনে দেখা যায় পাশে ফিরোজ ভাইও আছে। কায়রা জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় যাচ্ছো ভাইজান? এত রাতে?”
 
কাবির বাঁকা হেসে বলল, 
“পিকনিক করবার গেছিলাম। নেক্সট টাইম তোরেও নিমুনি সাথে। কান্দি'স না!”
 
কায়রা মনে সন্দেহের আঁচ পেলো। কায়রার সন্দেহ হতে লাগে যে পিকনিক করতে যাবে না, এটা নিশ্চিত সে। এগুলো তার ভাইজানের হেয়ালি কথাবার্তা। তাই কায়রা কিছু বলতে যাবে তার আগেই কাবির বলে, 
“ভাইজানরে ফোন দে!”
 
কায়রা বিনা বাক্যে দিয়ে দিলো। কিন্তু মন খুতঁখুতঁ করছে। কাবির ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠলো,
“ভাইজান, কাম শেষ। কালকে ব্রেকিং নিউজের জন্য রেডি হও। অতিরিক্ত মদ্যপানে নিহত তিন যুবক।”
 
এই বলে উচ্চস্বরে শয়তানি হাসি হাসলো কাবির। সে হাসি খুব ভয়ানক। এবার মোটেও কাবির রসিকতা করছে না। কায়রাভও হাসলো সাথে। যেন সব জানা ছিলো। বলল, 
“আমি ভেবেছি তুই কাল যাবি। আজকে যাবি বলিস নি কেন?”
 
কাবির মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“কইলাম তো এখন! বাদ দেও।”
 
কায়রা সন্দেহ আরও গভীর হলো। ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, 
“কি করেছো তোমরা?”
 
"খুন করেছে তোমার ভাইয়েরা! তোমার হয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে!"
 
পেছন থেকে কায়েশীর ভারী, দৃঢ় গলা ভেসে এলো। কায়রাভ, কায়রা চমকে তাকালো পেছনে। দেখলো কায়েশী নুডুলসের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। কায়রা আঁতকে উঠে বলে,
"মানে কি ভাবী? আমাকে কেউ বলবে কি হচ্ছে!"
 
কাবির তখনো কলে আছে। কায়রাভ কায়রা এবং কায়েশী, দুজনকেই উদ্দেশ্য করে কঠিন গলায় বলল,
"বুঝিস নি কি হচ্ছে! শুনেছিস এবার! আর যা হয়েছে একদম ঠিক হয়েছে! প্রীষান স্যারের কাছ থেকে সব জেনে নিয়েছিলাম আমরা। আর প্রীষান স্যারের সন্দেহ'ই ঠিক। জিসান এই কাজ করিয়েছে ওই বাইকের ছেলে দুটোকে দিয়ে। ব্যস, এবার তিনজন উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে। এই নিয়ে আর একটাও কথা নয়। টপিক এখানেই ক্লোজ।"
 
কায়েশী ত্রস্ত বেগে কায়রাভকে বলল,
"তবুও আইন হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করছি না। পুলিশের কাছে সব বলতেন। তদন্ত হতো। আইন শাস্তি দিতো ওদের!"
 
কাবির সব শুনতে পায় ফোনের ওপাশ থেকে। তাই নিজেই বলে,
"আরে আমার প্রতিবাদী ভাবীজান!! আপনি কিসের ভিত্তিতে কইলেন খুন করছি! খুন করতে দেখছেন! না জাইনাই ঠা'স কইরা একটা ভুয়া কথা কইয়া দিলেন! আর কি কইলেন? আইন! এই দেশে ধর্ষন, খুনেরই শাস্তি হয় না আর আমার বইনের এসিড নিক্ষেপের শাস্তি দিবো! ও যে পা হারাইলো ওইডা ফিরা পাইবো জীবনে! আপনার আইন দিতো ফিরাইয়া!"
 
কায়েশী এবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বিষণ্ণ কন্ঠে বলল,
"আমাকে নতুন করে চেনাবে তোমাদের! আমি এখনো বলবো, এটা ঠিক হয় নি। তোমরা যাই করো না কেন পা তো কায়রা এমনিও ফিরে পাচ্ছে না! তাহলে এসব করার মানে কি? নিজের গায়ে কেন দাগ লাগালে, কাবির!"
 
কাবির হেসে বলল,
"আমার গায়ে এমনিতেও যেই পরিমাণ দাগ আছে তার কাছে এইটা কিছুই না। তাছাড়া, মনের শান্তি তো পাইলাম, তাইনা ভাবী?"
 
কায়েশী এবার চুপ হলো। কাবিরও ফোন কাটলো।কাবিরের কথা সত্য। কিন্তু ও মানতে পারছে না। এই প্রতিশোধ আর ন্যায়-অন্যায়ের জটিল মিশ্রণে নিজেকে শুধু শুধু জড়ালো। এই বাড়ির লোকেরা অভিশপ্ত জীবনেই থাকবে সারাজীবন। বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
 
---------------------------------------------
 
পরদিন দুপুর বারোটায় প্রিহা স্কুল থেকে ফিরে এলো। ফর্সা মুখের ওপর ঘামের বিন্দু বিন্দু জমেছে। আজ হাফ-ডে, তাই স্কুল ছুটি পেয়েছে তারাতাড়ি। ঘরে ঢুকতেই সে সঙ্গে সঙ্গে তার বান্ধবী লিজাকে ডেকে নেয়।
 
“তোর বাবা-মা কি একই কোম্পানিতে জব করে?” 
 
প্রিহা জিজ্ঞেস করলো আলতো হাতে সদর দরজা খুলে ভেতরে যেতে যেতে। লিজা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ রে। তাই তো ঝামেলায় পড়েছি। এক্সট্রা চাবি তো নেই।”
 
প্রিহা মৃদু হেসে বলল,
“সমস্যা নেই। আন্টি-আংকেল না আসা পর্যন্ত আমার বাসায় থাক। তারপর আন্টি-আংকেল এসে নিয়ে গেলে চলে যাস। এবার চল, আমার রুমে যাই।”
 
লিজা চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে পিছু পিছু এগোলো। যাওয়ার সময় লিজার চোখ পড়লো পাশের রুমে। সেখানে একজন লোক বসে টেবিলের উপর ঝুঁকে বই পড়ছে। মানুষটা বসাটা অত্যন্ত ম্যানলি ভঙ্গিতে স্থির। ফর্সা আঁটশাট শরীরের সাদা শার্টের হাতা ফোল্ড করা। আর সাধারণ কালো ট্রাউজার। লিজার চোখ সে মুহূর্তে ধ্রুবতারার মতো ঝলমল করলো। হঠাৎ প্রিহার ডাক শুনে লিজার মনোযোগ ফিরে এলো। ভ্রু কুঁচকে প্রিহা হেসে বলল,
“ওদিকে কী দেখছিস এভাবে?”
 
লিজা বিছানার এক কোণে বসে। অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“তোর পাশের রুমের ছেলেটা কে রে? ওই যে বই নিয়ে পড়ছে!”
 
প্রিহার ভ্রু আরও কুচকালো। তার ভাই তো বাড়িতে নেই, আছে শুধু পাপা আর নানা। ভাবনার মাঝে প্রিহা এক নজর উঁকি দিয়ে দেখলো তার পাপার রুমে। হ্যাঁ, পাপা'ই বই পড়ছে। তাই লিজার দিকে চোখ বড় বড় করে বলে,
“আরে পাগল! ছেলে কাকে বলছিস! ওটা আমার পাপা!”
 
লিজা বিস্ময়ে চেয়ে রইলো হতবম্ব হয়ে, 
“কিহ! তোর পাপা কিভাবে… মানে এত হ্যান্ডসাম!”
 
প্রিহা কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে হতাশ গলায় বলল,
"এই পাপাটা'কে নিয়ে যে কি করি! কোথাও যেতে পারি না! কেউ বিশ্বাস'ই করতে চায় না আমার পাপা! আল্লাহ!"
 
লিজা এখনও থমকে আছে। হালকা সন্দেহজনক কন্ঠে বলল,
“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। আসলেই কি তোর পাপা? নাকি ঢপ মারছিস?”
 
প্রিহা খানিকটা রেগে দেয়ালের ফ্যামিলি ফটোর দিকে ইশারা করে বলল,
“আরে গাধী, দেয়ালে দেখ! আমাদের ফ্যামিলি ফটো আছে। দেখ, ভালো করে। এই যে, আমার পাপা, মাম্মা, আর আমি। তখন ভাই হয় নি।”
 
ফটোটির সামনে লিজা এগিয়ে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগে। এবার বিশ্বাস হতে শুরু করলো। কিন্তু হঠাৎ কান্না পেলো তার। এই ভেবে যে, দুনিয়ার সব সুন্দর ছেলেরা কেন এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেয়! এইসব ভেবে কষ্ট বোধ করলো সে। লিজার মন বারবার ভেঙে যায়। প্রিহা শুধু পাশে দাঁড়িয়ে সরু চোখে লিজার সেই কষ্ট বোঝার চেষ্টা করলো।
 
এরই মধ্যে প্রীষান প্রিহার রুমে প্রবেশ করে। মুখে বরাবরের ন্যায় নরম হাসি। মুলত, স্কুল থেকে ফিরেছে বিধায় মেয়েকে খাবার খেতে ডেকেছিলো। প্রিহা তার বাবাকে দেখে উদ্দীপনার সাথে বলল,
“পাপা, দেখো কে এসেছে আজ! আমার ফ্রেন্ড, লিজা!”
 
প্রীষানের পাশে ফিরে সৌজন্যপূর্ণ হাসি দিলো। লিজা কিছুটা চমকে উঠে সামনা-সামনি প্রীষানকে দেখে। তারপর তড়িঘড়ি করে বেশ উৎসাহ নিয়ে সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”
 
প্রীষান ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি, আম্মু! আপনি কেমন আছেন?”
 
লিজার মনোমুগ্ধকর উত্তেজনা 'আম্মু' ডাক শুনে ফুস করে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। আর কি কোনো ডাক ছিলো না পৃথিবীতে! আম্মু! ভাঙা মন নিয়ে সে বলল,
“জ্বি...ভালো আছি।”
 
প্রীষান মৃদু হাসি দিয়ে প্রিহার দিকে মুখ ফেরালো, “আমি একটু বের হবো, প্রিন্সেস। তুমি আর তোমার ফ্রেন্ড একসাথে লাঞ্চ করে নিও। তোমার নানার কিছু লাগলে ওনাকে দিও। এন্ড টেক কেয়ার, বাচ্চা!"
 
প্রিহা স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল,
“ওকে, পাপা।”
 
চলমান.......
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৮
 
রাত তখন প্রায় দশটা। ঘরটায় নিস্তব্ধতা বিরাজমান। মেঝেতে ধীর পায়ে পায়চারি করছে কায়রাভ। হাতদুটো পেছনে ভাজ করা। মুখে খানিকটা চিন্তার ছায়া থাকলেও চোখে একরকম ভাবনার ঘূর্ণি পাক খাচ্ছে। সেটা রাজনৈতিক ভাবনা। হঠাৎ করিডোরে কারও পায়ের মৃদু শব্দ ভেসে এলো। কায়রাভ পায়চারি থামিয়ে ঘুরে তাকালো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কায়েশী। হাতের আঙুলে এখনও পানির ফোঁটা, হয়তো একটু আগেই হাত ধুয়ে এসেছে। আঁচলে আলতো করে হাত মুছতে মুছতে সে ঘরে ঢুকলো। কায়রাভ জিজ্ঞেস করলো,
"কায়রা খেয়েছে?"
 
কায়েশী শান্ত গলায় বলল,
" হ্যাঁ। ওকে আর কায়ান, দুজনকেই খাইয়ে এসেছি।"
 
কথাটা শুনে কায়রাভের ঠোঁটে একটুখানি কোমল হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখে খুঁজলো নিজের বাচ্চাটাকে। বাড়িতে আসার পর কাছে পায় নি বাচ্চাটাকে। চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কায়ান কই? আজ তো কাছেই পেলাম না ওকে।"
 
কায়েশী এসে বিছানার এক কোণে বসলো। ক্লান্ত শরীরটা একটু হেলিয়ে নিয়ে বলল,
"কায়ানকে রেখে দিলো কায়রা। আমি বলেছিলাম নিয়ে যাই, যদি বিরক্ত করে। কিন্তু সে তো শুনলোই না। বলল, একা শোবে না- কায়ানকে নিয়েই শোবে। পরে আর কিছু বলিনি।"
 
কায়রাভ ধীরস্বরে বলল,
" থাক। একা না শোয়াই ভালো। তাছাড়া আমার বাচ্চা কাউকে বিরক্ত করে না। যথেষ্ট শান্ত ও।"
 
কায়েশী একটু ভ্রু তুলে তাকালো।
"আপনি সারাদিন বাড়িতে থাকলে বুঝতেন। দিনশেষে এসে একটু আদর করলে কোন বাচ্চা তার দুষ্টুমি দেখাবে? ওর সব হম্বিতম্বি আমার সাথে!"
 
কায়রাভ হালকা হেসে কায়েশীর পাশে এসে বসলো। 
"তাই নাকি! কায়ান কি খুব বিরক্ত করে তোমায়?"
 
কায়েশী মুখ ঘুরিয়ে বলল,
" না। কায়ান না… আপনি বিরক্ত করেন আমায়।"
 
কায়রাভ এমন কথায় হঠাৎই চমকে উঠলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
" আমি? আমি আবার কী করলাম?"
 
কায়েশী দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সেই দীর্ঘশ্বাসে অনেকটা ক্লান্তি আর অপ্রকাশিত অভিমান মিশে। বলল,
"এই যে… যখনই আমি আপনার প্রতি একটু নরম হই, তখনই আপনি এমন কিছু করে বসেন যা আমাদের মধ্যকার সবকিছু আবার এলোমেলো করে দেয়।"
 
কায়রাভের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। কণ্ঠটা একটু কঠিন হলো। ভারী দৃঢ় গলায় বলল,
" বাইরের কোনো কাজের সঙ্গে ঘরের ভেতরের সম্পর্ক গুলিয়ে ফেললে আমাদের সম্পর্কের উন্নতি কখনোই হবে না, কায়েশী ফারিয়াহ!"
 
কায়েশীর অনিমেষ তাকিয়ে রইল কায়রাভের দিকে। নিচু গলায় বলল,
"একটু কি ভালো থাকা যায় না? আপনারা কেন এসবের মধ্যে জড়ান বলুন তো? সবকিছু এত জটিল কেন? এই যে আপনি রাজনীতি করেন… সেবার গুলিটাও তো এই কারণেই লেগেছিলো। আপনার প্রতিপক্ষই তো সবসময় আপনার ক্ষতি করতে ওৎ পেতে থাকে। এদিকে সেসব চিন্তায় জান বের হয় আমার। অথচ আমি… আমি শুধু একটা সাধারণ জীবন চেয়েছিলাম, কায়রাভ। একটা সাধারণ লোকের সংসার চেয়েছিলাম।"
 
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইলো কিছুক্ষণ। কায়রাভ ধীরে ধীরে তার দিকে একটু এগিয়ে বসলো। আলতো করে কায়েশীর মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিলো। কায়েশী আপত্তি করলো না। সেও শক্ত কাঁধে মাথা রেখে পড়ে রইলো। দিনশেষে সেও ক্লান্ত। মনের ভেতর জমে থাকা ভারটুকু নামাতে চায়। কায়েশী ধিমি গলায় বলল,
"আমি আপনাকে কবে ভালোবাসতে পারবো, কায়রাভ? কবে বলতে পারবো আমি আপনাকে ভালোবাসি?"
 
কায়রাভ সব শুনে মৃদু হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ছিলো না কোনো অভিযোগ। ছিলো শুধু একরোখা দৃঢ় স্বীকারক্তি তার স্ত্রীর প্রতি। বলল,
"তোমায় ভালোবাসতে কবে বলেছি? আমি একাই বেসে নেবো দুজনের'টা। প্রমিস, একটুও কম পড়বে না। তুমি শুধু… একজীবন আমার হয়ে থেকে যেও।"
 
কথাগুলো সরাসরি কায়েশীর হৃদয়ে গিয়ে লাগলো। কায়েশী ভালোমতোই জানে এই লোক তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। কিন্তু কায়েশী এগোতে পারেনি। কিছুদিন আগে যদিও এগিয়েছিলো, আবার সব কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে যায়। সেসব ভেবে কায়েশী কায়রাভের কাঁধ থেকে মাথা তুলে তার বুকে আশ্রয় নিলো। দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো চওড়া পুরুষালী পিঠ। এই উষ্ণ বুকটাতেই কায়েশীর ঠাঁই। না চাইতেও এই মানুষটিই তার সব ভয় আর নিরাপত্তার একমাত্র আশ্রয়। এটা অস্বীকার করার মতো না। এবার কায়রাভের কথা মেনে নিলো সে। সত্যি তাদের সম্পর্কটাকে বাইরের কাজ দিয়ে বিচার করলে এজীবনেও ভালো থাকা হবে না। একটু স্বার্থপর হোক না কায়েশী। ওর নিজের জন্য, ওর স্বামীর জন্য আর ওর সন্তানের জন্য। 
 
এদিকে স্ত্রীর কোমল স্পর্শ পেয়ে কায়রাভও তাকে জড়িয়ে ধরলো। খুব যত্নে, খুব স্নেহে, অতি সন্তপর্ণে। মেয়েলি সিঁথি বরাবর ঠোঁট ছোঁয়ালো বেশ কয়েকবার। কায়রাভ মনে মনে হাসলো এই ভেবে, যে এই মেয়েটা নাকি তাকে ভালোবাসে না! তাহলে এই স্পর্শগুলো অন্য কথা বলে কেন? কায়রাভ অনুভব করে কায়েশীর সবটুকু। শুধু মুখে বলার অপেক্ষা। 
 
বাইরে রাত ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। আর ভেতরে দু’টি ক্লান্ত হৃদয় কিছুক্ষণের জন্য হলেও খুঁজে পেলো একটুখানি শান্তি। এই শান্তির বড়ই অভাব তাদের সম্পর্কে। 
 
*************************
 
পরদিন সকালটা ছিলো নির্মল আর স্নিগ্ধ।৷ পাখিদের কিচিরমিচির আর শীতল বাতাসে ভেসে রয়েছে এক ধরনের প্রশান্তি। ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার কাছাকাছি। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে নিজাম উদ্দীন এগিয়ে গেলেন প্রীতিষার ঘরের দিকে। দরজার সামনে এসে দেখলেন ঘরের ভেতরে মেয়েটা পড়ার টেবিলে বসে মন দিয়ে কিছু লিখছে। তিনি আলতো করে দরজায় নক করলেন। নরম স্বরে বললেন,
" আম্মা, আসবো?"
 
পরিচিত কণ্ঠ শুনে প্রীতিষা তড়িৎ বেগে ঘুরে তাকালো। এই সময় নিজাম উদ্দীনকে আসতে দেখে তার মুখে বিস্ময়ের সঙ্গে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো। তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
" আরে আংকেল! অনুমতি নিচ্ছেন কেন? আসুন, ভেতরে আসুন।"
 
নিজাম উদ্দীন মৃদু হাসলেন। এরপর ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে একটি চেয়ারে বসলেন। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
" পরীক্ষা শেষ হয়নি এখনো তোমার?"
 
প্রীতিষা বিনয়ী ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,
"কালই শেষ হয়েছে। ব্যস, এখন একটু বসে কোয়েশ্চেন পেপারগুলো মিলিয়ে দেখছিলাম।"
 
নিজাম উদ্দীন মাথা নেড়ে বললেন,
" আচ্ছা।"
 
এই বলে তিনি টেবিলের ওপর কয়েকটি মেয়ের ছবি রেখে দিলেন। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
"এখান থেকে বলো তো, কোন মেয়েটাকে প্রীষানের সঙ্গে মানাবে? এদের সবার ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো। খোঁজ খবর নিয়েছি।"
 
প্রীতিষাও পাশে একটি চেয়ারে বসে পড়লো। কিন্তু ছবিগুলোর দিকে তার চোখ গেলো না। ভাইয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই তার মনে একটাই নাম ঘুরপাক খায়, কায়রার নাম। মেয়েটা তার ভাইকে এতদিন ধরে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছে। সেটা সে খুব কাছ থেকে দেখেছে। তাই প্রীতিষা মনে মনে ভাবলো, যদি ভাইয়ের বিয়ে করতেই হয় তবে এমন কাউকে কেন নয়, যে তাকে সত্যিই ভালোবাসবে, আগলে রাখবে।
এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে নিজাম উদ্দীনের দিকে তাকালো। একটু ইতস্তত করে বলল,
"আংকেল, একটা কথা বলার ছিলো।"
 
নিজাম উদ্দীন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। অভয় দিয়ে বললেন,
"অবশ্যই। বলো, কী বলতে চাও?"
 
প্রীতিষা একটু ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলল,
"ভাইয়ার সাথে কালকে কথা বলে বুঝলাম ভাইয়া নিমরাজি হয়েছে কালকে আপনার বোঝানোর পর। তাহলে দেখুন, বিয়ে যেহেতু করতেই হচ্ছে ভাইয়াকে তাহলে এমন কাউকে করুক যে ভাইয়াকে ভালোবাসবে। অপরিচিত কোনো মেয়ে বিয়ের পর কেমন হবে সেটা কিন্তু আমরা জানবো না। তার মধ্যে যেহেতু দ্বিতীয় বিয়ে হুট করেই এভাবে মেয়ে সিলেক্ট করা একটু রিস্কি। সেক্ষেত্রে কারও আগে থেকে পছন্দ করাটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না?"
 
নিজাম উদ্দীন খানিকটা অবাক হলেন। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
" প্রীষান কি কাউকে পছন্দ করে?"
 
প্রীতিষা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো। বলল,
"আরে না না! ভাইয়া কাউকে পছন্দ করবে এটা আপনার মনে হয়!"
 
নিজাম উদ্দীন না বুঝে বললেন, 
" তাহলে?"
 
প্রীতিষা এবার আর কথা না ঘুরিয়ে বলেই ফেললো,
"আমি একজনকে জানি, যে ভাইয়াকে ভালোবাসে অনেকদিন ধরে। দিন না ঠিক, বছর গড়িয়েছে। কিন্তু ভাইয়ার জন্য পাগলামি কমে নি। যদিও ভাইয়া কখনো সাড়া দেয় নি। বরাবরই এড়িয়ে গেছে আপুকে।"
 
নিজাম উদ্দীন এবার সত্যিই অবাক হলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
"আচ্ছা, মেয়েটাকে তুমি চেনো? কেমন সে? আর… দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হবে তো? যদি রাজি থাকে, তাহলে আমরা তার পরিবারে প্রস্তাব পাঠাতে পারি।"
 
প্রীতিষা শান্ত কণ্ঠে বলল,
"আপুকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। খুব লক্ষ্মী একটা মেয়ে। আমার ভাইয়ার জন্য একদম পারফেক্ট। তবে… একটা সমস্যা আছে।"
 
নিজাম উদ্দীন কৌতূহলী হয়ে বললেন,
" কী সমস্যা?"
 
প্রীতিষা মাথা নিচু করে ধীরস্বরে বলল,
"আপু আর কেউ নয়… কিছুদিন আগে যে কলেজ ট্যুরের দুর্ঘটনায় ভাইয়া একটা মেয়েকে বাঁচিয়েছিলো, মনে আছে তো? যাকে এসিড ছুড়ে মারা হয়েছিলো। সেই মেয়েটাই। সেই ঘটনায় তার একটা পা হারিয়েছে।"
 
কথাটা শুনে নিজাম উদ্দীন গভীরভাবে চুপ করে গেলেন। মেয়েটার কথা ভেবে তার মনটা ভারী হয়ে উঠলো। কিন্তু প্রীতিষার মুখে বাকিসব শুনে অগ্রাহ্য করলেন না। কিছুক্ষণ পর ধীর কণ্ঠে বললেন,
"আচ্ছা… আগে প্রীষানের সঙ্গে কথা বলে দেখি। ওর মতামতটাও জানা জরুরি।"
 
প্রীতিষাও এবার মাথা নাড়লো। বলল,
"ঠিক আছে। বিকেলে ভাইয়া এলে আপনি নিজেই কথাটা তুলবেন। কারণ আপনার কথার উপর ভাইয়া কথা বলে না। আমিও সাথে থাকবো তখন।"
 
নিজাম উদ্দীন নীরবে সম্মতি জানালেন। আর প্রীতিষাও তৈরি হলো ভাইয়ের সাথে কথা বলতে।
 
-----------------------------------
 
প্রীষান সেদিন বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে তাড়াতাড়ি ফিরেছিলো। বিকেলের আলো তখনও পুরোপুরি ম্লান হয়নি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জুতো খুলতে খুলতে তার চোখ হঠাৎ করিডোরের দিকে আটকে গেলো। সেখানে তার বোন প্রীতিষা আর শ্বশুর নিজাম উদ্দীন পাশাপাশি বসে টিভির সামনে রয়েছে। ঘরের ভেতর টিভির নীলচে ঝলকানি তাদের মুখে পড়ছে। প্রীষান ঘরে ঢুকতেই কানে ভেসে এলো নিউজ রিডারের গলা,
“অতিরিক্ত মদ্যপানে নিহত তিন যুবক…”
 
একটা অকারণ কাঁপুনি বয়ে গেলো তার বুকের ভেতর। অজান্তেই চোখ চলে গেলো টিভির পর্দায়। সেখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা কয়েকটি নিথর দেহ। ক্যামেরা একটু সরতেই একটি মুখ স্পষ্ট হলো।প্রীষানের বুকটা ধপ করে নেমে গেলো। সে মুহূর্তেই চিনে ফেললো একটা মুখকে। ঠোঁট কাঁপলো হালকা। শব্দ বের হলো খুব ধীরে, প্রায় বিরবির করে উচ্চারণ করলো, 
“জিসান…”
 
কথাটা এতটাই নিচু স্বরে বেরিয়েছিলো যে ঘরে থাকা আর কেউ শুনতে পেলো না। নিজাম উদ্দীন এসব নিউজ দেখে মুখ কুচকে বললেন,
"কিসব চ্যানেল দিয়ে রেখেছো, আম্মু! খুনখারাপি দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। আজকাল নিউজ খুললেই শুধু এসব। এর থেকে সিরিয়াল দাও, তাও মনটা একটু ভালো থাকবে।"
 
প্রীতিষা মৃদু হেসে রিমোট তুলে নিলো। চ্যানেল বদলাতে বদলাতে পেছনে তাকালো। প্রীষানকে দেখে বলল,
"ওহ ভাইয়া, এসে গেছো! বসো বসো। আমি তো চা করতেই যাচ্ছিলাম আংকেলের জন্য। ভালো সময়েই এসেছো।"
 
প্রীষান একটু দেরিতেই বাস্তবে ফিরলো। মাথা নেড়ে ধীর পায়ে এসে নিজাম উদ্দীনের পাশে বসে পড়লো। মাথায় ঘুরছে জিসানের মৃত্যুর খবরটা। অবশ্য ভালোই হয়েছে। এমন ছেলের বেঁচে থাকার অধিকার এমনিতেও নেই। নেশা করতে করতে মরেছে। এদের আইনের আওতায় আনলেও টাকা দিয়ে দিনশেষে ঠিক বেরিয়ে যেতো। কায়রার সঠিক বিচার হতো না কখনোই। এসব ভাবনার মাঝে নিজাম উদ্দীন বললেন,
" প্রীষান, আমি আর প্রীতিষা মিলে কিন্তু মেয়ে সিলেক্ট করে ফেলেছি। এবার শুধু তোমাকে দেখানো বাকি।"
 
প্রীষানের মুখ তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না। এসব স্বাভাবিক কথা। কাল প্রীষানের নিরব স্বীকারক্তি টের পেয়েছিলো নিজাম উদ্দীন। সুতরাং বিয়ের কথা উঠতোই। তাই প্রীষান নিরাসক্ত স্বরে বলল,
"আপনারা চয়েস করুন। আমি তো আগেই বলেছি… আ'ই হ্যাভ নো অবজেকশ'ন।"
 
নিজাম উদ্দীন একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বললেন,
"মেয়েটা কে, সেটা শুনবে না? নাম কায়রা। এই শহরের এমপির বোন। সে-ই।"
 
প্রীষান চমকে ঘুরে তাকালো। নিজাম উদ্দীনের শব্দগুলো হঠাৎ করে বাতাসকে থামিয়ে দিলো। প্রীষানের চোখে চমকের তীব্র ঝলক। অবাকের চরম প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে বলল,
" কীহ! "
 
নিজাম উদ্দীন হেসে ফেললেন।
" প্রীতিষার কাছ থেকে সব জেনেছি। চলো, আরেকটু অবাক করে দিই তোমাকে। চা খেয়ে আমরা মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হবো। দেরি করতে চাইছি না। সরাসরি কথা বলবো।"
 
প্রীষান হতবিহ্বল হয়ে তাকালো। পরক্ষণেই আঁতকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
" আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন, বাবা? আপনি কি বলছেন বুঝতে পারছেন?"
 
নিজাম উদ্দীন শান্ত স্বরে বললেন,
"জানি। সবই জানি। এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন? আগে কী হয়েছিলো, কী হয়নি সেসব ভুলে যাও। মেয়েটা তোমাকে ভালোবাসে। মানুষের ভালো থাকার জন্য এর চেয়ে বড় কারণ আর কী লাগে বলো? এটা সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট তোমার ভালো থাকার।"
 
প্রীষান থেমে গেলো। একটু ভেবে কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো গভীরভাবে। বলল,
"আপনার কথা বুঝলাম। কিন্তু… ওর পরিবার কেন দোজবরের সঙ্গে বিয়ে দেবে?"
 
নিজাম উদ্দীন যেন খুব সহজ একটা হিসাবের উত্তর দিলেন। মুখে তৈরি ছিলো উত্তর,
"কারণ তোমরা দুজনেই ত্রুটিযুক্ত। এটাও কিন্তু একটা প্লাস পয়েন্ট।"
 
প্রীষান হতাশ হলো। ঠিক তখনই প্রীতিষা ট্রেতে করে চা নিয়ে ঢুকলো ড্রয়িং রুমে। কথার শেষ অংশটা শুনে মৃদু হেসে বলল,
" হ্যাঁ ভাইয়া, বেরিয়ে পড়ো। আপুর ফ্যামিলির সাথে কথা বলে তো দেখো। তারপর যা হবে দেখা যাবে।"
 
প্রীষান এখনও অস্বস্তিতে কুঁকড়ে আছে। প্রীতিষাকে বলল,
" কিন্তু এত তাড়াহুরো? হুট করেই যেতে বলছিস?"
 
প্রীতিষা চায়ের কাপটা নিজাম উদ্দীনের হাতে দিয়ে প্রীষানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"সবকিছু প্ল্যান করে হয় না, ভাইয়া। হওয়ার থাকলে এমনিই হয়ে যায়। আগে চা খাও। আর ড্রেস চেঞ্জ করতে হবে না। এটা পরেই চলে যাও।"
 
প্রীষান স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই জীবনের গল্পের পাতা কেউ দ্রুত উল্টে দিচ্ছে। ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটছে যে সে ঠিক ধরতেই পারছে না কোনটা বাস্তব, কোনটা কল্পনা। শেষমেশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। শ্বশুরের এই অদম্য সিদ্ধান্তের সামনে হয়তো আজ তাকে যেতেই হবে। কিন্তু তার মাথার ভেতর তখনও একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
জীবনটা হঠাৎ এমন অদ্ভুত মোড় নিচ্ছে কেন?
কি কি যে হয়ে চলেছে তার সাথে…আল্লাহই ভালো জানেন।
 
চলমান.......
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:২৯
 
 
সন্ধ্যার আলো তখনও গাঢ় হয়নি। আকাশে নরম কমলা রঙের শেষ রেখাগুলো মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে সবে। সেই সময়েই প্রীষান আর নিজাম উদ্দীন এসে পৌঁছালেন খান ভিলার সামনে। গেট পেরোনোর আগে নিজাম উদ্দীন একবার প্রীষানের মুখের দিকে তাকালেন। হালকা মুচকি হেসে বললেন,
" কী প্রীষান, নার্ভাস?"
 
প্রীষান শ্বাস ফেলে বলল,
"আপনার কাছে প্রথমবার যেতে ততটা নার্ভাস হইনি, আজ যতটা বেশি লাগছে।"
 
নিজাম উদ্দীন চোখ টিপে হাসলেন।
"আরে চলো তো! আপকে পাস ইন্টেলিজেন্ট শ্বশুর হ্যায়, চিন্তা মাত কিজিয়ে!"
 
প্রীষান হেসে ফেলল।
" আপনি শোধরাবেন না কখনো, বাবা!"
 
নিজাম উদ্দীন গম্ভীর ভাব ধরলেন।
" কাভি নেহি।"
 
এভাবে তারা কথাবার্তা বলতে বলতে সদর দরজা পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই কায়রাভের চোখে পড়লো দুজনকে। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে অবাক স্বরে বলল,
"আরে প্রীষান স্যার! আপনি হঠাৎ? আসুন, ভেতরে আসুন।"
 
“স্যার” সম্বোধনটা শুনে প্রীষানের ভেতরটা হালকা অস্বস্তিতে ভরে উঠলো। সম্বোধনটা ভুল নয়, তবু আজকের পরিস্থিতিতে সেটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। কায়রাভ আজ আগেই ফিরেছে পার্টি অফিস থেকে। যাক ভালো সময়ই এসেছে। কায়রাভ দুজনকে সামনের সোফায় বসতে ইশারা করলো। তারা বসতেই সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আতিথেয়তার জন্য কায়েশীকে ডেকে উঠলো,
"কায়েশী! চা-মিষ্টি নিয়ে এসো, মেহমান এসেছে।"
 
নিজাম উদ্দীন হাত তুলে থামাতে চাইলেন। বললেন,
" এসবের দরকার নেই। আমরা একটু আগেই চা খেয়ে এসেছি।"
 
কিন্তু ততক্ষণে কায়েশী রান্নাঘরের দিকে চলে গেছে। কায়রাভ হেসে বলল,
" চা খেয়ে এসেছেন তো কি অন্য কিছু খাবেন! না খাইয়ে মেহমানদের ছাড়া যাবে নাকি!"
 
নিজাম উদ্দীন মাথা নেড়ে বললেন,
" সে ঠিক আছে। তাহলে সময় নষ্ট না করে সরাসরিই বলি। আমি সম্পর্কে প্রীষানের শ্বশুর। হঠাৎ এভাবে বলা অদ্ভুত লাগতে পারে, তবু বলছি আমরা কায়রার জন্য সম্বন্ধ নিয়ে এসেছি। প্রীষানের সাথে।"
 
কায়রাভ চমকায়। কথাটা শুনে কায়রাভ মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। সে একবার প্রীষানের দিকে, একবার নিজাম উদ্দীনের দিকে তাকালো। দুজনকে নতুন করে পরোখ করতে। এদিকে কায়েশী এসে টেবিলের উপর বিভিন্নরকম মিষ্টি আর আজকেই হাতে বানানো পায়েসের বাটি রেখে দিলো। কথাগুলো শুনে কায়েশীর চোখেও বিস্ময় স্পষ্ট। সে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবে। প্রীষান কায়রাভের সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুঝতে পেরে একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
" দেখুন, বিষয়টা ভুলভাবে নেবেন না প্লিজ। আমি জানি, হুট করে এভাবে বলা খুবই ওইয়ার্ড শোনায়। মোটকথা এটা একটা সাধারণ বিয়ের প্রস্তাব। আপনারা চাইলে না করেও দিতে পারেন। এর জন্য একশটা কারণ আছে আপনার কাছে। আমাদের এজ গ্যাপ, আমার সেকেন্ড ম্যারেজ… ইত্যাদি ইত্যাদি। এন্ড ইট'স টোটালি ওকে।"
 
কায়রাভ শান্ত স্বরে বলল,
" বিয়ের প্রস্তাবের ভুল মানে ধরিনি। শুধু আপনার কাছ থেকে পেয়ে একটু অবাক হয়েছি।"
 
নিজাম উদ্দীন এবার বললেন,
" অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক। সত্যি বলতে, প্রীষানকে আবার বিয়ে করানোর জোরটা আমারই ছিলো। এমনকি আজ এখানে প্রস্তাব নিয়ে আসাটাও আমার জোরেই। প্রীষানের দ্বিতীয় বিয়ে, তার ওপর বাচ্চাও আছে। আপত্তি থাকতেই পারে। আমরা শুধু আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটা দিলাম। রাজি হওয়া না হওয়া আপনাদের উপর।"
 
কায়রাভ মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো সে বিষয়টা উপলব্ধি করছে। এর মধ্যেই সে ফোনে কাবিরকে একটা ছোট্ট মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে এক্ষুনি চলে আসার জন্য। কায়রাভ ধীরে বলল,
"আমরা নিজেরাও কায়রার বিয়ে দিতে চাইছি। আরও দুটো সম্বন্ধ এসেছিলো। কিন্তু কায়রা রাজি হয়নি। কারণ, ওর পায়ের সমস্যার জন্য কেউ যৌতুক চাইছে, কেউ আবার দ্বিধায় আছে, ইতস্তত করছে। আমরাও বুঝি এসব। কায়রার একটাই কথা, যৌতুক দিয়ে সে বিয়ে করবে না।
 
কায়রাভ একটু থেমে আবার বলল,
" ও নিজেই বলে রেখেছে, দ্বিতীয় বিয়ে, ডিভোর্সি কেউ হলেও ওর আপত্তি নেই। কিন্তু টাকার জন্য বিয়ে করতে চাওয়া কোনো ভদ্র সুশীল ছেলেকে সে বিয়ে করবে না। যুক্তিটা ভুলও না। তবে আমাদের বোন অসহায় নয়।"
 
প্রীষান চুপ করে শুনছিলো। এমন সময় কাবির এসে ঢুকলো। পাত্র শব্দটা মেসেজে দেখেই এখানে এসে সে মোটামুটি বুঝে গেছে ব্যাপারটা। দুই ভাইয়ের চোখাচোখি হতেই কাবিরের ঠোঁটে স্বভাবসুলভ হালকা হাসি ফুটলো। হঠাৎ কায়েশী পাশ থেকে বলেই ফেললো,
"সুন্দর, সুশীল টাকাখো'র ছেলে নিয়ে সম্বন্ধের অভাব হবে না। কিন্তু এতে কায়রার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকবে। কারণ, তাদের কাছে বিয়ের চেয়ে টাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে তো আর খারাপ নয়… যদি আপনি প্রতিশ্রুতি দেন কায়রাকে সারাজীবন সম্মান দিয়ে আগলে রাখার, তাহলে এই সম্মন্ধে জটিলতার কিছু দেখছি না।"
 
কথাটা শুনে প্রীষান মাথা নাড়ে। কাবির আর কায়রাভ তাকিয়ে আছে কায়েশীর দিকে। কাবির এদিকে দুষ্টুমি করে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে দু-হাত মুঠো করে বুড়ো আঙ্গুল তুলে কায়েশীকে দেখালো, আড়ালে। মানে তার কথায় কাবির সম্মত। কিন্তু কায়েশী এসব নিছক মজা ভেবে ছোট ছোট চোখে তাকায় কাবিরের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে কাবির নিস্পাপ বাচ্চার মতো মুখ করে ঘুরে সামনে তাকায়। অন্যদিকে কায়রাভকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে কায়েশী একটু সংকোচে বলল,
"ব্যস, আমি শুধু আমার মতামতটা জানালাম। সিদ্ধান্ত আপনাদের দুই ভাইয়ের।"
 
কাবির এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
" আমি এত ঘুরাই প্যাঁচাই কথা কমু না। সোজা কথা জিগামু। দ্বিতীয় বিবাহ খারাপ আমরাও মনে করি না। বিষয়টা আমাগো বোনের সুখের। আপনার জীবনে আমার বোন দ্বিতীয়বার আসবো। দ্বিতীয়বার তার অনুভূতির মূল্য কতটা দিবেন? কখনো কি আপনার প্রথম স্ত্রীর জায়গায় আমার বোনরে অপশন মনে হইবো?"
 
একটু থেমে কাবির আবার বলল,
"আমাগো কিন্তু বিয়ে দেওয়ার কোনো তাড়া নাই।"
 
প্রীষান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর ধীরে বলল,
" খুব কঠিন প্রশ্ন করেছো। ভবিষ্যতে আমি কতটা কি পারবো জানি না। তবে এটুকু নিশ্চিত করতে পারি, যে আমার স্ত্রী কখনো অযত্নে থাকবে না। আমি নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তাকে আগলে রাখবো। যে আমার স্ত্রী হবে, কবুল বলার পর সে পুরোপুরি আমার স্ত্রী-ই হবে। সে তার পুর্ন অধিকার পাবে। এখানে অপশনের কিছুই নেই।"
 
প্রীষান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
" দ্বিতীয়বার নিজের জীবনকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। ভালো থাকার। একটু টাফ সব। বাট আ'ই ক্যান হ্যান্ডেল।"
 
উত্তর শুনে কাবিরের মুখে তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠলো। কাবির সন্তুষ্ট হলো এমন কথায়। আরাম করে সোফায় হ্যালান দিয়ে বসে সোজাসুজি বলল,
"আমার দিক থেকে সমস্যা নাই। পরিচয় হওয়ার পর বুঝছি আপনি নিঃসন্দেহে একজন জেন্টলম্যান। তাছাড়া টিচার মানুষ, নীতিবাক্য র'গে র'গে আছে আপনার। ওই নীতিবাক্য নিজের জীবনে কাজে লাগায়লেই হইবো। এবার ভাইজান কী বলো? "
 
কায়রাভ শান্ত গলায় বলল 
"আপত্তির কিছু আমিও পেলাম না। তবে কায়রার মতামতটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
 
প্রীষান স্বস্তির শ্বাস ফেলে। এরপর বলল,
"আচ্ছা, তাহলে কায়রাকে এখানে ডাকুন। কথা সবার সামনেই হোক। আপনাদের সামনেই আমি ওর সাথে আলাদা কিছু কথাও বলতে চাই।"
 
কায়রাভ ইশারা করতেই কায়েশী কায়রাকে আনতে যায়। কিছুক্ষণ পর কায়রা ড্রয়িংরুমে ঢুকলো। কৃত্তিম পা লাগালেও ক্রাচের সাহায্যে আসতে হয়েছে। কারণ, এখনো এভাবে হাঁটাচলা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেনি সে। তার পরনে মেরুন রঙের গোল জামা, গায়ে পেচানো সাদা ওড়না। শরীরটা এতদিনে ঠিক হয়েছে। রুগ্নভাবটাও কমেছে। প্রীষান একপলক দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। কায়রার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, কারণ কায়েশী ইতিমধ্যেই সব বলে দিয়েছে। সে এসে কাবিরের পাশে বসতেই ধীরে সামনে তাকিয়ে বলল,
" আমি কারও দয়া চাই না। বিয়ে জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, যে না করলে আমি মরে যাবো।"
 
প্রীষান অবাক হলো না। সে আগেই এমন কিছু আশা করেছিলো। তাই অল্প বিস্তার হাসলো সে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলো,
"আমার সাথে বিয়ের প্রসঙ্গে দয়ার ভাবনা ছাড়া অন্য কোনো আপত্তি আছে তোমার? যেহেতু তুমি আমার সম্পর্কে সবই জানো!"
 
কায়রা একটু থমকে গেলো। না বুঝে বলল,
"মানে?"
 
প্রীষান শান্ত গলায় বলল,
"আমার তোমাকেই বিয়ে করতে হবে এমন নয়। তোমার ক্ষেত্রেও একই কথা। আমার কথা বলতে গেলে, আমার বাবা প্রায় চার বছর ধরে আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেক ভেবেচিন্তে আমি রাজি হয়েছি নিজের জীবনকে নতুন করে গড়তে। তুমি না চাইলে অন্য কারও সাথে আমার বিয়ে হবে। তোমারও অন্য কোথাও হবে। জাস্ট এটাই।" 
 
কায়রা সরু চোখে তাকিয়ে বলল, 
"তাহলে আমার বাড়িতে প্রস্তাব আনার কারণ?"
 
প্রীষান মজা করে বলল,
"আমাকে কেউ মেয়ে দিতে চাইবে না তাই! আমারও তো একটা পাস্ট আছে।"
 
কায়রা ভ্রু কুঁচকে বলল,
" আমার সাথে মজা করছেন?"
 
" না, সত্যি বলছি। এবার তুমি বলো। তোমার পরিবার সামনেই আছে। তোমার আপত্তি থাকলে কথা এগোবে না। আমরাও চলে যাবো। আমাকে বিয়ে করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আর তুমি তো বললেই, বিয়ে জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু না! "
 
একটু থেমে প্রীষান চারপাশের সব ভুলে গভীর কন্ঠে বলল,
" আমি আমার পক্ষ থেকে লাস্ট একটা কথাই বলবো, কায়রা। ভেবে দেখো, তুমি আমি দুজনেই ত্রুটিপুর্ন, রাইট? এবার আমরা দুটো ইমপারফেক্ট মানুষ মিলে পারফেক্ট হতে পারি না? হওয়া যায় তো!"
 
কায়রা অনিমেষ মানুষটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো। কি সহজেই বলে দিলো! কায়রার আপত্তির প্রশ্নই রাখলো না। অথচ এই মুহূর্তটা অনেক আগে থেকেই চেয়েছিলো কায়রা। কত স্বপ্ন দেখেছে এই দিনের! কিন্তু এখন কেন যেন সম্মতি কথাটা মুখে আনতে পারছে না। লজ্জায় না অন্য কিছু কে জানে। কাবির সরু চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
" কী রে, শরমে চুপ আছস নাকি? বিয়াতে রাজি তুই?"
 
কায়রা রেগে তাকালো ভাইয়ের দিকে। কাবির হেসে আরেকটু কাছে গিয়ে আরও ফিসফিস করে বলল,
" রাজি থাকলে আমার কানে কানে ক। কেউ শুনবো না! পাত্রর চেহারা কিন্তু সেই… ভাইবা দেখ!"
 
কায়রা কাবিরের হাতে জোরসে চিমটি কেটে দিলো। কাবির আর্তনাদ করেও করলো না। এসব দেখে কায়রাভ তখন খোলা গলায় হাসছে। কায়রা আমতা-আমতা করে বলল,
"আ..আমি কী বলবো! ভাইজানেরা যা বলবে তাই।"
 
কায়রাভ বলল,
" ব্যস! তাহলে আর কী। সব যখন হয়ে গেছে, মিষ্টিমুখ হোক।"
 
নিজাম উদ্দীন হাসলেন,
"আমার তো ডায়াবেটিস! নাহলে আমিও খেতাম।"
 
কায়েশী পাশ থেকে মুচকি হেসে পায়েসের বাটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
"পায়েসটা খেতে পারেন, আংকেল। এতে চিনি নেই, মধু দিয়েছি। দু-এক চামচে কিছু হবে না।"
 
নিজাম উদ্দীন দু-চামচ খেয়ে প্রশংসাসূচক মাথা নেড়েই থামলেন। ওদিকে কাবির হঠাৎ টেবিল থেকে একটা রসগোল্লা তুলে জোর করে প্রীষানের মুখে পুরে দিলো। অকস্মাৎ ঘটনায় প্রীষান বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকালো। এদিকে কাবির তখন শয়তানি হাসি হাসছে। প্রীষান মিষ্টি চাবাতে চাবাতে মনে মনে বলল,
“থাক, এখন থাক… পরে দেখা নেবো তোমাকে।” 
 
----------------------------------------
 
প্রীষান ও নিজাম উদ্দীন বাড়ি ফিরলেন ঠিক রাত আটটার সময়। দরজার শব্দ কানে যেতেই প্রীতিষার অপেক্ষার বাঁধ ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চোখে-মুখে অস্থির কৌতূহল সব জানার। এতক্ষণ সে ঘরে বসে চিন্তা করছিলো। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ভাইয়া! কী কথা হলো? ওনারা রাজি হয়েছেন?”
 
প্রীষান কোনো কথা না বলে ধীর ভঙ্গিতে সোফায় গিয়ে বসলো। তারপর মাথাটা আস্তে করে নাড়লো সম্মতি দিয়ে। সেই সামান্য ইশারাতেই সব উত্তর মিলে গেলো প্রীতিষার। প্রীতিষা খুশিতে বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে উঠলো। আনন্দে তার মুখটা ঝলমল করে উঠছে। নিজাম উদ্দীন হালকা গলায় মজা করে বললেন,
 “আমাকে কিন্তু ক্রেডিট দিতে হবে, আম্মু। আমি না থাকলে কিছুই হতো না! তোমার ভাই কিন্তু ভিতু!”
 
প্রীষান মৃদু হাসলো। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই কোথা থেকে যেন এক টুকরো চিন্তা এসে ভর করলো তার মনে। মুহূর্তেই মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠলো বাচ্চাদের কথা ভেবে। প্রীষান থমথমে গলায় বলল,
“সব তো হলো… কিন্তু বাচ্চাদের কীভাবে ফেস করবো?”
 
নিজাম উদ্দীন প্রীষানের পাশে বসে স্বাভাবিক স্বরে বললেন,
 “প্রিহা এখন অনেকটাই বড় হয়েছে। তাছাড়া ও আগে থেকেই রাজি ছিলো, উল্টো আমাকে বলতো যে পাপাকে রাজি করাও। আর প্রীভান… ও তো ছোট মানুষ। একটু বুঝিয়ে বললেই মেনে নেবে।”
 
তবু প্রীষানের মনটা বারবার প্রীভানের দিকেই ফিরে যাচ্ছে। অজানা এক দুশ্চিন্তা তাকে নীরবে তাড়া করে ফিরছে। প্রীতিষা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো উচ্চস্বরে। 
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটা নাম, 'কাবির'। নামটা দেখেই প্রীতিষার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। এই ছেলেটাও আর ফোন করার সময় পেলো না। হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ের মতো ঘাবড়ে যায় সে। প্রীষান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল,
 “এত রাতে কে ফোন করেছে?”
 
প্রীতিষা একটু থতমত খেয়ে যায়। ভাইয়া তো তার সম্পর্ক নিয়ে জানেই না কিছু। তাই স্বাভাবিকভাবে ভয় কাজ করে ভেতরে ভেতরে। ঘাবড়ে গিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
 “বা...বান্ধবী, ভাইয়া… কথা বলে আসি।”
 
আর কোনো সুযোগ না দিয়ে প্রীতিষা দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। অত্যাধিক চিন্তায় ভুলভাল কাজ করে বসে সে। আজ প্রীষানের সন্দেহ জাগাতে সেই ভুলটাই করলো। এতে প্রীষানের ভ্রু জোড়া আরও কুঁচকে উঠলো। বোনের এমন অস্বাভাবিক আচরণ তার চোখ এড়িয়ে গেলো না। মনে একটুখানি খটকা লাগলো বটে, তবে এখনই কিছু বলল না। ভাবলো, পরে সময় করে জিজ্ঞেস করবে এ ব্যাপারে।
এই মুহূর্তে তার সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো নিচের দিকের শার্ট টেনে ঠিক করে। তারপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বাচ্চাদের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আজ তাদের সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে হবে। তাদের মানসিক দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রীষানের জন্য। 
 
-----------------------------------
 
প্রীতিষা ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো। তারপর পা টিপে টিপে চলে গেলো বারান্দায়। রাতের বাতাসে হালকা শীতলতা, চারপাশ নিস্তব্ধ। ফোনটা কানে তুলতেই সে হালকা রাগ মেশানো স্বরে ফিসফিস করে উঠলো,
“উফ্ কাবির! আরেকটু হলেই ভাইয়া ধরে ফেলতো!
এত রাতে ফোন কেন দিয়েছো?”
 
ওপাশ থেকে কাবিরের হালকা হাসির শব্দ ভেসে এলো। 
 “এত ভয় পাও ক্যান? একদিন তো তোমার ভাই জানবোই! ওইদিন তো ধুমতানানা ধুমতানানা হবো!”
 
প্রীতিষা বারান্দার কোণের একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো। আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে বলল,
 “তোমার তো মজা লাগছে! কিন্তু ব্যাপারটা ভাবলেই আমার খুব ভয় লাগে, কাবির… তখন কী হবে কে জানে!”
 
কাবিরের ভরসা জানিয়ে বলে,
“কিছুই হবো না। হুদাই প্যারা খাইয়ো না। আমি আছি না? প্যায়ার কিয়া তে ডারনা ক্যায়া!”
 
প্রীতিষা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তোমাকে নিয়েই তো বেশি চিন্তা!”
 
কাবির হেসে ফেললো। সেই হাসির মধ্যে একরকম দুষ্টু উচ্ছ্বাস ভঙ্গি। এবার বেশ রয়ে-সয়ে বলল,
 “আচ্ছা, একটা গুড নিউজ দিই শুনো। আমার বোনের বিয়ে ঠিক হইছে। দাওয়াত রইলো কিন্তু!”
 
কথাটা শুনে প্রীতিষার ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু শব্দ করলো না। মনে মনে ভাবলো, বোকা'টা জানেই না, তার বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে ঠিক কার সঙ্গে! ভেবেছে কাবিরকে বিয়ের দিন একেবারে সারপ্রাইজ দেবে! মনের ভেতর একপ্রকার দুষ্টু আনন্দ নিয়ে সে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
 “তাই নাকি! বাহ, বেশ তো!”
 
কাবির স্বাভাবিকভাবেই বলল,
 “হুম। আচ্ছা শুনো, কালকে দেখা করবা? আমি কিন্তু বিকালে ফ্রি আছি।”
 
প্রীতিষা কিছুক্ষণ ভেবে শান্ত গলায় বলল,
 “উম'ম, যাওয়া যায়। কতদিন বাইরে ঘুরতে যাই না!”
 
 “আচ্ছা, তাইলে রেডি হয়ে থাইকো। মোড়ে দাঁড়াইবা, আমি আইসা নিয়ে যামুনে।”
 
 “ওকে… জান।”
 
ওপাশে হঠাৎ কাবির থমকে গেলো। প্রশ্ন করে, 
 “কি বললা! জান?”
 
প্রীতিষা হালকা লাজুক হাসলো।
“হুম।”
 
কাবির ঠোঁট কামড়ে অদ্ভুতভাবে বলল,
“যদিও আমার এসব লুতুপুতু কথা আগে তেমন ভাল লাগতো না… কিন্তু তোমার মুখে ‘জান’ শব্দটা শুইনা খারাপও লাগলো না। উল্টা বেশ ভালোই লাগলো! কি জানি করছো তুমি আমারে! আমি কাবির পুরাই চেঞ্জ'ড!”
 
চলমান.......
 
 
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Page 2 / 7
Share:

Loading spinner