গল্প: অমৃত তোকে চাই
লেখিকা: রাহি চৌধুরী তোহা
এখন থেকে এইখানে বাকি সব গুলো পর্ব পোস্ট করা হবে।
আর যারা আগের পর্ব গুলো পড়েননি তাদের জন্য সব গুলো পর্বের লিংক দেওয়া হলো।
গল্প: অমৃত তোকে চাই সব গুলো পর্ব পড়তে ক্লিক করুন Links
গল্প: অমৃত তোকে চাই
লেখিকা: রাহি চৌধুরী তোহা
এখন থেকে এইখানে বাকি সব গুলো পর্ব পোস্ট করা হবে।
আর যারা আগের পর্ব গুলো পড়েননি তাদের জন্য সব গুলো পর্বের লিংক দেওয়া হলো।
গল্প: অমৃত তোকে চাই সব গুলো পর্ব পড়তে ক্লিক করুন Links
বিকেলের রোদটা আজ যেন আলসেমি করে নামছে। চারপাশে গ্রীষ্মের ছোঁয়া। রোদের তাপে যেন শরীর আর এগোচ্ছে না। কাঁধের ব্যাগটাও আজ বেশ ভারী লাগছে। পা যেন আর চলছে না।
কলেজ শেষ হয়েছে সেই দুপুরে, আর রিক্তা বাড়ি ফিরছে বিকেলে। মূলত তারা কলেজ মাঠে বসে আড্ডা দিয়ে এইমাত্র যে যার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রিক্তা আজ উল্টো যাচ্ছে। উদ্দেশ্য রিতুর স্কুলের দিকে গিয়ে তাকে নিয়ে একেবারে বাড়ি ফেরা।
ব্যাগ থেকে ফোন বের করে রিতুর প্রিন্সিপালের কাছে ফোন করে। প্রথম রিং হতেই ফোন রিসিভ হয়। রিক্তা নমনীয় কণ্ঠে বলে „“আসসালামু আলাইকুম!”
" ওয়ালাইকুম সালাম। কে বলছেন? "
" স্যার, আমি রিতুর বোন "
" কোন রিতু? একটু খুলে বলুন তো "
" ১০ম শ্রেণির সাহারা আহমেদ রিতু "
" ওহ। রিতু মেয়েটা অত্যন্ত ভালো, যেমন পড়াশোনায় তেমন কাজে কর্মে "
" ধন্যবাদ স্যার। আচ্ছা রিতুদের ক্লাস কখন ছুটি হবে? "
" এই তো ১ ঘণ্টা পরে "
রিক্তার ইচ্ছে করছে প্রিন্সিপালের মাথা ফাটিয়ে দিতে। এই গরমে সে আরও ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে?
রিক্তা নিজেকে দমিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে „“আচ্ছা স্যার, আমি রিতুকে নিতে আসছি "
" আচ্ছা এসো "
" ধন্যবাদ স্যার "
এই বলে ফোন কেটে দেয়। ইচ্ছে করছে এখানে বসে এক ঘণ্টা কান্না করতে। কপালে হাত দিয়ে মাথা উঁচু করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে „“মানলাম সূর্যি মামির সাথে একটু ঝগড়া হয়েছে। তাই বলে কি সেই রাগ আমাদের উপর দেখাবেন মামা? একটু তো দয়ামায়া করেন আপনার অসহায় ভাগ্নির উপর।”
একটু থেমে আবার বিরক্ত হয়ে বলে „“দূর ছাতার মাথা, কারে কি বলি?”
এই বিরক্ত নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
চারপাশের পাতাগুলোও আজ খুব ক্লান্ত হয়ে ঝুলে আছে। গাছের ছায়ায় একটু শান্তি লাগছে। আগের থেকে এখন একটু গরম কম।
কিছু দূর হাঁটতেই রিক্তা একটা স্কুল দেখতে পায়। মুখে জয়ের হাসি নিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। স্কুলের সাইনবোর্ডে লেখা “Viqarunnisa Noon School and College
গেটের কাছে রিক্তাকে দেখে দারোয়ান উঠে তার সামনে আসে। ভালোভাবে দেখে বলে„“আপনি Adamjee Cantonment College এর স্টুডেন্ট?”
রিক্তা নিজের কাঁধের কাছে স্কুল ব্যাচের দিকে তাকিয়ে ভদ্রভাবে বলে „“জ্বি "
" তা আপনি এতো দূর থেকে এসে এখানে কেনো? "
" আমার ছোট বোনকে নিতে এসেছি "
" আপনার ছোট বোন এই স্কুলে পড়ে? "
" হুম "
" কিন্তু এখন তো ছুটি হবে না, আরও অনেক দেরি আছে "
" হুম, আমি জানি "
" আপনি এখন এই গরমে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন? "
রিক্তার ইচ্ছে করছে এই লোকটার মাথা ফাটিয়ে ফেলতে। এতো গরমে তার উপর আবার বকবক।
বিরক্ত হয়ে সে বলতে যায়„“শা…”
আর কিছু বলার আগে দাঁত দিয়ে জিহ্বা কামড়ে ধরে। মনে মনে বলে „“আল্লাহ, আমি তো নাহুর মতো হয়ে গেছি, মুখ দিয়ে অটোমেটিক গালি চলে আসে।”
লোকটি আবার প্রশ্ন করে „“কিছু বলছেন?”
রিক্তা ছোট করে বলে „“না "
লোকটি বকবক সেই যে শুরু করেছে এখনো থামার নাম নেই। রিক্তা বিরক্ত হয়ে ফোন দেখছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে হঠাৎ স্কুলের ঘণ্টা পড়ে।
রিক্তা ফোনের টাইম দেখে স্কুলের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হঠাৎই দারোয়ান গেট খুলতেই মেয়েরা হুড়মুড়িয়ে বের হয়।
এর মধ্যেই রিতুও বের হয়। বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে বলতে বের হচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই রিক্তা দেখে বান্ধবীদের থেকে বিদায় নিয়ে তার দিকে আসে।
কাছে এসে একগাল হেসে বলে „“আপুই, তুমি এখানে কেনো?”
" তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছে তাই ভাবলাম তোকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। কিন্তু তোর তো দেরি হতে আরও ৩৫ মিনিট বাকি ছিল, তাহলে ছুটি দিলো কেন? "
" জানি না আপু। প্রিন্সিপাল ক্লাসে এসে কিছু কথা বলতে শুরু করলো, হঠাৎ কে ফোন করলো। স্যার হুম… আচ্ছা স্যার বলে ফোন কেটে দেয় এবং আমাদের ছুটি দিয়ে দেয়। আমার মনে হয় ফোনের ওপাশের ব্যক্তি তাড়াতাড়ি ছুটি দিতে বলেছে। আর কথা বলার সময় স্যার যা ভয়েসে কাঁপছিল, খুব ভালো লেগেছিল তখন "
বলতে বলতে রিতু দাঁত বের করে হেসে দেয়।
রিক্তা রিতুর বিনুনি ধরে বলে „“স্যারের কষ্ট দেখে খুব হাসি লাগছে? এটাই স্যার শিখায়? হুম?”
রিতু দুই বিনুনি সামনে এনে হেসে বলে „“আপুই, চলো না আইসক্রিম খাই?”
রিক্তা বলে „“চল "
দুই বোন হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে ওপারের দোকানে যায়। দোকানদারকে বলে দুইটা ডিসকোন আইসক্রিম দিতে। দোকানদার আইসক্রিম দিলে রিক্তা টাকা পরিশোধ করে।
একটা আইসক্রিম রিতুকে দেয়, আরেকটা নিজে নিয়ে রাস্তার কাছে যায়। একটা রিকশা আসতেই সেটাকে দাঁড় করায়।
রিক্তা জিজ্ঞেস করে „“মামা যাবেন? শাহবাগের মোড়ে?”
" হুম যাবো আপা, কিন্তু ৫০ টাকা ভাড়া দিতে হবে "
" আচ্ছা দিবো, চলেন "
রিক্তা রিকশায় উঠে বসে। রিতু আইসক্রিম খেতে খেতে উঠে বসে। রিকশাওয়ালা রিকশা ছেড়ে দেয়।
রিকশাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে।
বিকেলের রোদটা এখন আর আগের মতো তেজী নেই, বরং একটু নরম সোনালি রঙে চারপাশ ঢেকে ফেলেছে। রাস্তার ধারের গাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে মাটিতে—যেন কেউ ইচ্ছা করে সোনালি ছিটা ছিটিয়ে দিয়েছে।
দূরে কোনো একটা গাছের ডালে পাখি বসে ডাকছে, আর বাতাসে ধুলো মিশে একটা ভ্যাপসা গরমের গন্ধ ভেসে আসছে। শহরের কোলাহল এখনো থেমে নেই, কিন্তু বিকেলের এই সময়টা তাতে একটা আলসেমি মিশিয়ে দিয়েছে।
রিকশার চাকার শব্দ আর বাতাসের হালকা ঝাপটা মিলে একটা অদ্ভুত শান্ত-অশান্ত মিশ্র পরিবেশ তৈরি করেছে।
রিক্তা এক হাতে আইসক্রিম ধরে বসে আছে।
আর সত্যি বলতে—সে বসে নেই, খাচ্ছে। এক কামড়, একটু চুপ, তারপর আবার কামড়। গরমে তার মুখভঙ্গি বারবার বদলে যাচ্ছে।
পাশে বসা রিতু যেন আজ পুরো একটা প্রশ্নমেশিন। আইসক্রিম চেটে চেটে খেতে খেতে পা দোলাচ্ছে আর চারপাশ দেখছে।
রিতু হঠাৎ বলে উঠে„“আপু, রিকশাওয়ালা মামা কি সারাদিন রিকশা চালায়?”
রিক্তা বিরক্ত চোখ বন্ধ করে বলে„“না, সে সারাদিন ঘুমায় আর রিকশা স্বপ্নে চালায়।”
রিতু চোখ বড় করে বলে„“সত্যি?”
„“হ্যাঁ, একদম সত্যি।”
রিতু কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবে আবার বলে„“তাহলে আমরা এখন স্বপ্নে যাচ্ছি?”
রিক্তা এবার চোখ খুলে তাকায়„“তুই আইসক্রিম খেয়ে খেয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছিস।”
রিতু দাঁত বের করে হেসে বলে„“আইসক্রিম তো মাথা ঠান্ডা করে, খারাপ করে না।”
রিক্তা ধীরে ধীরে আইসক্রিম খেতে খেতে বলে„“তোর ক্ষেত্রে উল্টো কাজ করে।”
বাতাসে তখন হালকা একটা ঠান্ডা ভাব আসতে শুরু করেছে। গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে নড়ে উঠছে, আর দূরের আকাশে সূর্যটা একটু একটু করে কমলা রঙে ঢেকে যাচ্ছে।
রিতু আবার বলে„“আপু, তুমি কলেজে সারাদিন কী করো?”
রিক্তা আইসক্রিমটা একটু চেটে নিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে„“পড়ি।”
„“আর?”
„“আড্ডা।”
„“আর?”
রিক্তা বিরক্ত হয়ে বলে„“আর কিছু না।”
রিতু চোখ বড় করে বলে„“এত কম?”
রিক্তা এবার একটু মাথা ঘুরিয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে „“তুই কি চাই, আমি সারাদিন ট্রেন চালাই?”
রিতু সাথে সাথে দাঁত বের করে হেসে বলে„“না, ট্রেন চালাইলে আমি পেছনে বসতাম!”
রিক্তা কপাল কুঁচকে রিতুর দকে তাকায়।
কিছুক্ষণ পর রিকশাটা ধীরে ধীরে একটা পরিচিত রাস্তায় ঢুকে পড়ে।
দুই পাশে এখন গাছ আরও বেশি ঘন, বাতাসও একটু ঠান্ডা লাগছে।
দূরে পরিচিত দেয়াল, গেট আর বড় গাছগুলো চোখে পড়তেই রিতু সাথে সাথে বলে উঠে„“আপু! এটা তো আমাদের রাস্তা!”
রিক্তা মাথা নাড়ে„“হুম।”
রিতু খুশিতে দাঁত বের করে বলে„“ইইই! বাসা এসে গেছে!”
রিক্তা শান্ত গলায় বলে„“এত খুশি হওয়ার কী আছে, আমরা তো সারাদিনই বাসায় থাকি।”
রিতু সাথে সাথে বলে„“হুম তা ঠিক কিন্তু বাসায় আমার ভালো লাগে”
রিকশাটা এখন একদম আহমেদ বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
রিক্তা নামতে নামতে বলে„“মামা, ভাড়া।”
রিকশাওয়ালা মাথা নাড়িয়ে রিক্তার থেকে টাকা নেয়।তারপর সে চলে যায়
রিতু লাফিয়ে নেমে গেটের দিকে দৌড় দেয়„“আমি আগে যাবো!”
রিক্তা ধীরে ধীরে নেমে আইসক্রিমের শেষ টুকু খেয়ে নেয়। এক মুহূর্ত গেটের দিকে তাকিয়ে থাকে
তারপর ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভেতরে পা রাখে।
গরমের সেই ক্লান্ত বিকেলটা শেষ হয় বাড়ির পরিচিত শান্ত ছায়ার ভেতরে ঢুকে।
চলবে......
আহমেদ বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই এক ধরনের শান্তি লাগে।
বাইরের গরম আর কোলাহলের তুলনায় বাড়িটা যেন অন্য এক জগৎ
রিতু গেট পেরিয়েই জুতা খুলে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে যায়।
দৌড়াতে দৌড়াতেই চিৎকার করে বলে„“আম্মু! আমি চলে এসেছি!”
ধীরে ধীরে রিক্তাও ভিতরে প্রবেশ করে।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই যেন একটু শান্তি লাগে।
ফ্যানের বাতাসে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে সে।
রিতু ইতিমধ্যেই সোফার উপর আধশোয়া হয়ে গেছে।
স্কুল ব্যাগ একদিকে, জুতা আরেকদিকে।
উপরের তলা থেকে সাথী বলে উঠে„“ওমা! দুই বোনের অবস্থা তো মনে হচ্ছে মরুভূমি পার হয়ে এসেছে!”
রিতু সাথে সাথে বলে„“আপা, আজকে রোদ আমাদের সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতা করেছে!”
রিক্তা ক্লান্ত কণ্ঠে বলে„“শত্রুতা না, হত্যা চেষ্টা।”
সাথী হাসতে হাসতে বলে„“ওহ এই জন্যই এই অবস্থা। আচ্ছা যান আগে হাত-মুখ ধুয়ে আসেন তারপর আমি নাস্তা এনে দেই।”
মনিরা আহমেদ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে রিতুর অবস্থা দেখে বলেন„“এই মেয়ে! বাসায় এসেই যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেললি?”
রিতু চোখ বন্ধ করেই বলে„“ছোট আম্মু, আমি খুব ক্লান্ত।”
সানজিদা আহমেদ রান্নাঘর থেকে দুই গ্লাস ঠান্ডা পানি টেবিলে রাখে বলেন„“ক্লান্ত? স্কুলে পড়তে যাও নাকি পাহাড় কাটতে যাও?”
রিতু চোখ খুলে গম্ভীর হয়ে বলে„“দুটাই।”
বলেই পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেতে শুরু করে
রিক্তা ব্যাগটা টেবিলের উপর রাখে। সাথে চশমা খুলে টেবিলে রেখে ধীরে বলে„“আম্মু, আজকে বাইরে অনেক গরম।”
সানজিদা আহমেদ সাথে সাথে বলে„“তাই বলে এই অবস্থা? মুখ শুকিয়ে গেছে পুরো।”
রিক্তা সোফায় বসে পানি খেয়ে গ্লাস টেবিলে রেখে সোফায় মাথা পেছনে ঠেকিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে বলে„“আরেকটু থাকলে আমি রাস্তায় গলে যেতাম।”
রিতু সাথে সাথে বলে উঠে„“হ্যাঁ বড় আম্মু! আপু তো রিকশায় বসে বারবার মরার মতো মুখ করছিল।”
রিক্তা চোখ খুলে বলে„“তুই চুপ কর।”
সানজিদা আহমেদ মেয়েদের নাজেহাল অবস্থা দেখে বলেন„“আচ্ছা তোরা গোসল করে নে। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।”
রিতু অলস কণ্ঠে বলে „“ও আম্মু ছোট বেলার মতো আমাকে কোলে করে নিয়ে একটু গোসল করিয়ে দাও, আমার উঠতে মন চাচ্ছে না।”
" হুম গোসল করাবো তোমাকে খুন্তি দিয়ে "
রিতু সোফা থেকে তড়িৎগতিতে উঠে স্কুল ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে যেতে বলে „“আররে খুন্তির কোনো দরকার নেই আমি যাচ্ছি তো।”
সানজিদা আহমেদ মাথা নাড়িয়ে বলে„“এই মেয়েটা দিন দিন আরও বেশি ফাঁকিবাজ হচ্ছে।”
রিতু উপরে উঠতে উঠতেই বলে„“ফাঁকিবাজ না আম্মু, আমি খুবই শান্তশিষ্ট মেয়ে!”
রিক্তা সাথে সাথে নিচ থেকে বলে উঠে„“হ্যাঁ, ভূমিকম্পও অনেক শান্ত।”
রিতু রেলিং ধরে নিচে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কাটে।
তারপর দ্রুত নিজের রুমের দিকে দৌড়ে চলে যায়।
ড্রয়িংরুমে হালকা হাসির রেশ থেকে যায়।
রিক্তা ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
গরমে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গালে লেগে আছে।
সাথী তার দিকে তাকিয়ে বলে„“রিক্তা আফা, আপনারে তো মনে হচ্ছে আর পাঁচ মিনিট বাইরে থাকলে সত্যি সত্যিই গলে যাইতেন।”
রিক্তা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলে„“আপা, আমার আত্মা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে।”
রিক্তা ব্যাগটা হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোয়।
কিন্তু দুই ধাপ উঠে থেমে যায়।
সাথী পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলে„“খালাম্মা, আফার জন্য একটু বেশি বরফ দিয়ে শরবত বানিয়ে দেই। আজকে উনার অবস্থা গুরুতর।”
রিক্তা নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলে„“হ্যাঁ আপা, আমি আর বাঁচবো না।”
ঠিক তখনই মূল দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে সোহেল আহমেদ আর সৈয়দ আহমেদ।
দুজনের মুখেই সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ।
সোহেল আহমেদ জুতা খুলতে খুলতে বলে„“আজকে বাইরে যা গরম! মনে হচ্ছিল সূর্য একদম মাথার উপর নেমে এসেছে।”
রিক্তা সাথে সাথে বলে উঠে„“দেখছেন? শুধু আমি না, সবাই বলছে!”
সৈয়দ আহমেদ হালকা স্বরে বলেন„“আজ বাহিরে প্রচুর গরম পড়েছে।”
ঠিক তখনই উপরের তলা থেকে রিতুর চিৎকার ভেসে আসে„“আপু! আমার তোয়ালে পাই না!”
রিক্তা চোখ বন্ধ করে ধীরে বলে„“ইয়া আল্লাহ…”
সাথী রান্নাঘরের দিকে চলে যায় সবার জন্য শরবত তৈরি করতে।
রিক্তা বিরক্ত গলায় বলে„“ওই আলমারির সামনেই তো রেখেছি!”
উপরে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর আবার রিতুর গলা শোনা যায়„“ও আচ্ছা, পেয়ে গেছি!”
রিক্তা ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে যায়।
সোহেল আহমেদ সোফায় বসতে বসতে বলেন„“এই মেয়েকে নিয়ে একদিন পুরো বাড়ি পাগল হয়ে যাবে।”
সানজিদা আহমেদ বলেন „“ও তো আমাদের অনেক আগেই পাগল বানিয়ে ফেলেছে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।
জানালার ফাঁক দিয়ে কমলা রঙের আলো ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এসে পড়েছে।
ফ্যানের বাতাসে পর্দাগুলো ধীরে ধীরে দুলছে।
আর আহমেদ বাড়ি ভরে উঠছে পরিচিত হাসি, খুনসুটি আর দিনের শেষে ফেরা মানুষগুলোর শান্তিতে।
বিকেলের নাস্তা করার পর রিক্তা তৈরি হতে রুমে যায়। রিক্তা মেরুন রঙের থ্রি-পিস পরে তৈরি হয়ে নেয়। কলেজ ব্যাগের মধ্যে থাকা বইগুলো বের করে কোচিং বই নিয়ে নেয় সাথে ফোন। এই ফোন নেওয়া হয় সেফটির কথা ভেবে।
পুরো তৈরি হয়ে নাইমকে ফোন করে। দুইবার রিং হতেই নাইম ফোন ধরে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলে „“হ্যালো কে বে?”
রিক্তা হালকা রাগ নিয়ে বলে „“আমি বে আমি!”
রিক্তার কণ্ঠে পেতেই নাইম স্পষ্ট করে বলে „“আররে তুই হঠাৎ ফোন দিলি?”
" কেনো তোর কি মনে নেই বিকেলে কোচিং যেতে হবে? "
" আরে ইয়ার একদম মনে ছিল না। "
" মনে থাকবে কেনো? এটা পড়াশোনা যে "
" আচ্ছা আমি আসছি তোরাও আয় "
" তাড়াতাড়ি আসবি আজ স্যার পরীক্ষা নেবে "
" ওকে ওকে "
নাইম ফোন কাটতেই রিক্তা গ্রুপে মেসেজ দেয় „“কি রে তোরা কোথায়?”
ওপাশ থেকে নাহিদার মেসেজ আসে „“আমরা সবাই চলে আসছি, শুধু তুই আর নাইম আসিস নাই। তোরা কোথায়?”
রিক্তা তাড়াতাড়ি রিপ্লাই দেয় „“এই তো আসছি ৫ মিনিট।”
" আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসিস আর নাইম কোথায়?"
" ও আসবে "
" আচ্ছা। "
রিক্তা ফোন ব্যাগে নিয়ে ব্যাগ হাতে রুম থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। নিচে সৈয়দ আহমেদ এবং সোহেল আহমেদ ছিলেন। রিক্তাকে তাড়াহুড়া করতে দেখে সোহেল আহমেদ জিজ্ঞেস করেন „“কোথায় যাচ্ছো?”
রিক্তা নিচে নেমে বলে „“বড় আব্বু, কোচিং যাচ্ছি। আজ আসতে দেরি হবে কারণ পরীক্ষা আছে আজ।”
" ওহ, তা মন দিয়ে পরীক্ষা দিও কেমন "
" দোয়া করবেন "
" দোয়া করি। আর কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে ফোন দিবে "
" ঠিক আছে। "
" হুম "
" বড় আব্বু রিতু কোথায়?"
" রিতুর টিউটর আসছে "
" ওহ, এইজন্যই বাড়ি শান্ত "
রিক্তার কথায় সবাই হেসে দেয়। রিক্তা হাসিমুখে ‘আসি’ বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
বাড়ি থেকে বের হয়ে সড়কের পাশে এসে দাঁড়ায়। তখন একজন রিকশাওয়ালা ছিল। রিক্তাকে দেখে রিকশাওয়ালা তার কাছে এসে বলে„“কোথায় যাবেন?”
" এই তো অপজিট সাইটে "
" আচ্ছা, আসেন "
রিক্তা রিকশায় উঠে বসে। রিকশাওয়ালা রিকশা চালাতে থাকে।
রিকশাটা ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে।
সন্ধ্যা পুরোপুরি নামেনি এখনো। আকাশে কমলা আর হালকা বেগুনি রঙ মিশে একটা শান্ত আবহ তৈরি করেছে। পশ্চিম আকাশে ডুবে যাওয়া সূর্যের শেষ আলো শহরের উঁচু বিল্ডিংগুলোর গায়ে এসে পড়ছে।
রাস্তার দুই পাশে দোকানগুলোর লাইট একে একে জ্বলছে। কোথাও ফুচকার দোকানে ভিড়, কোথাও চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে। ভাজাপোড়ার গন্ধ বাতাসে মিশে পুরো পরিবেশটাকে আরও ব্যস্ত করে তুলেছে।
হালকা বাতাসে রিক্তার চুলের কিছু অংশ বারবার মুখে এসে লাগছে।
সে বিরক্ত হয়ে চুল সরিয়ে নেয়। সারাদিনের ক্লান্তিতে মাথাটাও একটু ধরে আছে।
রিকশাওয়ালা ধীরে ধীরে রিকশা চালাতে চালাতে বলে„“আপা, আইজকা রাস্তা তেমন জ্যাম নাই।”
রিক্তা ছোট করে বলে„“হুম।”
তার মাথায় এখন শুধু কোচিংয়ের টেস্ট ঘুরছে।
গত সপ্তাহেও ইংরেজিতে দুইটা প্রশ্ন ভুল হয়েছিল। আজ আবার ভুল হলে স্যার নিশ্চিত ঝাড়ি দিবে।
রিক্তা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে টাইম দেখে।
তারপর বিরক্ত হয়ে নিজেই নিজেকে বলে„“ইয়া আল্লাহ, আজকে যেন কিছুই ভুল না হয়।”
ঠিক তখনই ফোনে টুং করে মেসেজ আসে।
নাহিদা মেসেজ দিয়েছে„“তাড়াতাড়ি আয়। স্যার আজকে অনেক রেগে আছে।”
রিক্তা সাথে সাথে রিপ্লাই দেয়„“আমি রাস্তায়।”
ওপাশ থেকে আবার রিপ্লাই আসে„“নাইম আসছে?”
রিক্তা চোখ উল্টে টাইপ করে„“আসবে। যদি ঘুম থেকে উঠে।”
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোন ব্যাগে রেখে দেয়।
রিকশা এখন বড় রাস্তা পার হচ্ছে।
চারপাশে গাড়ির হর্ন, মানুষের আওয়াজ, দোকানিদের ডাক—সব মিলিয়ে ব্যস্ত শহরটা সন্ধ্যার আলোয় আরও জীবন্ত লাগছে।
একটা ছোট ছেলে ফুল বিক্রি করছে রাস্তার পাশে।
আরেক পাশে কয়েকজন কলেজ স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে।
রিক্তার হঠাৎ খেয়াল হয়, বিকেলের পর আর কিছু খাওয়া হয়নি।
কিন্তু এখন আর নামার ইচ্ছেও করছে না।
সে ক্লান্ত চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে।
মাঝে মাঝে বাতাস এসে মুখে লাগছে, তাতে একটু ভালো লাগছে।
কিছুক্ষণ পর রিকশাটা একটা পরিচিত বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামে।
বিল্ডিংয়ের সামনে কয়েকজন স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কেউ নোট দেখছে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে পড়া মুখস্থ করছে।
রিক্তা ভাড়া দিয়ে রিকশা থেকে নামে।
ব্যাগটা ঠিক করে কাঁধে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে যাবে—
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে„“এই যে! আজকে আবার লেট?”
রিক্তা ঘুরে দেখে নাইম হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসছে।
চুল এলোমেলো, শার্ট অর্ধেক বের হয়ে আছে, মুখে এখনো ঘুম ঘুম ভাব।
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে„“তুই কি দৌড় প্রতিযোগিতা করে আসছিস?”
নাইম হাঁপাতে হাঁপাতে বলে„“না… ঘুম থেকে… দেরি করে উঠছি…”
রিক্তা শান্ত গলায় বলে„“তোরে নিয়ে আমার জীবন শেষ।”
নাইম দাঁত বের করে হেসে বলে„“আরে ইয়ার, আমি তো আসছি!”
রিক্তা চোখ ছোট করে বলে„“স্যার যদি আজ তোকে বোকা দেয়, আমি কিন্তু বাঁচাতে যাবো না।”
নাইম সাথে সাথে বলে„“বন্ধু হয়ে এত নিষ্ঠুর কথা বলতে পারলি?”
রিক্তা উত্তর দেওয়ার আগেই উপরের তলা থেকে নাহিদার চিৎকার শোনা যায়„“তোরা দুইজন নিচে সংসার শুরু করছিস নাকি? ক্লাসে আয় তাড়াতাড়ি!”
নাহিদার কথা শুনে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন হেসে দেয়।
রিক্তা বিরক্ত হয়ে বলে„“এই মেয়েটা কোনোদিন মানুষ হবে না।”
নাইম হাসতে হাসতে বলে„“ও জন্মগত সমস্যা।”
দুজন একসাথে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে।
উপরে উঠতেই দেখা যায় আরশি, নাহিদা, রাফি, কবিতা, রাজ আর আরও কয়েকজন বেঞ্চে বসে আছে।
নাহিদা রিক্তাকে দেখেই বলে„“অবশেষে রাজকন্যার আগমন ঘটেছে!”
রিক্তা ব্যাগ নামিয়ে বলে„“চুপ কর, গরমে আমার মেজাজ খারাপ।”
আরশি হেসে বলে„“তোর চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।”
নাইম চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে„“আমার জন্য কেউ পানি আন।”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“তুই আগে মানুষ হ।”
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজার সামনে স্যারের ছায়া দেখা যায়।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ক্লাস চুপ হয়ে যায়।
সবাই তাড়াতাড়ি নিজের জায়গায় বসে পড়ে।
রিক্তাও ব্যাগ থেকে বই বের করে শান্ত হয়ে বসে যায়।
বাইরে তখন সন্ধ্যা পুরোপুরি নামেনি।
জানালার কাঁচে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।
আর কোচিং সেন্টারের ছোট্ট ক্লাসরুমটা ভরে উঠছে পড়ার চাপা উত্তেজনায়।
স্যার ধীর পায়ে ক্লাসরুমের ভিতরে প্রবেশ করেন।
হাতে কয়েকটা কাগজ আর একটা ফাইল। মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝা যাচ্ছে আজ তার মুড খুব একটা ভালো না।
ক্লাসের সবাই চুপচাপ হয়ে বসে আছে।
রাফি নিচু স্বরে রিক্তাকে বলে„“আজকে মনে হয় কেউ না কেউ মরবে।”
রিক্তা বই খুলতে খুলতে বলে„“সব সময় তুই এসব অশুভ কথা বলিস কেন?”
নাহিদা পাশ থেকে ফিসফিস করে বলে„“কারণ ও নিজেই আজ মরবে।”
রাফি মুখ বাঁকিয়ে বলে„“বন্ধুদের কাছ থেকে আমি কখনো সম্মান পাই না।”
ঠিক তখনই স্যার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে„“এত ফিসফাস কিসের?”
মুহূর্তেই সবাই সোজা হয়ে বসে পড়ে।
স্যার টেবিলের উপর ফাইলটা রেখে বলেন„“আজকে আমি ছোট একটা টেস্ট নিবো। দেখি কারা গত ক্লাসের পড়া শিখেছো।”
এই কথা শুনেই পুরো ক্লাসে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়।
নাইম ধীরে বলে„“আমার তো আজ জীবন শেষ।”
কবিতা মাথায় হাত দিয়ে বলে„“আমি কিছুই পড়ি নাই।”
নাহিদা বিরক্ত হয়ে বলে„“তোরা সবসময় এমন ভাব করিস যেন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।”
রিক্তা শান্তভাবে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারও টেনশন হচ্ছে।
স্যার এক এক করে সবার বেঞ্চে প্রশ্নপত্র দিতে শুরু করেন।
জানালার বাইরে তখন রাত নেমে গেছে পুরোপুরি। দূরের বিল্ডিংগুলোর আলো কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে।
রিক্তার হাতে প্রশ্নপত্র আসতেই সে গভীর শ্বাস নেয়।
চোখ বুলিয়ে দেখে প্রথম দুইটা প্রশ্ন কমন।
তার মুখে ছোট্ট স্বস্তির হাসি ফুটে উঠে।
রাফি পাশ থেকে কাগজের দিকে তাকিয়ে অসহায় মুখে বলে„“ইয়া আল্লাহ… আমি তো কিছুই পারতেছি না।”
রিক্তা না তাকিয়েই বলে„“চুপচাপ লিখ।”
„“বন্ধু হয়ে একটু সাহায্য কর।”
„“মর।”
নাহিদা নিচু স্বরে হাসে।
স্যার হঠাৎ ক্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে উঠে„“কেউ কোনো কথা বলবে না। আর যদি কাউকে দেখি এদিক-ওদিক তাকাতে, সাথে সাথে খাতা নিয়ে নিবো।”
রাফি সাথে সাথে সোজা হয়ে বসে যায়।
সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে।
ক্লাসরুমে শুধু কলমের খসখস শব্দ আর ফ্যানের ঘূর্ণনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
রিক্তা মনোযোগ দিয়ে লিখছে।
মাঝে মাঝে চুল মুখের সামনে চলে আসছে, সে বিরক্ত হয়ে সরিয়ে আবার লিখতে শুরু করছে।
প্রায় ১ ঘণ্টা পর স্যার বলেন„“টাইম ওভার।”
সাথে সাথে পুরো ক্লাসে হতাশ আওয়াজ পড়ে যায়।
রাফি খাতা দিতে দিতে বলে„“স্যার, আর পাঁচ মিনিট দিলে আমি পাস করতাম।”
স্যার চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বলেন„“তুমি পাঁচ ঘণ্টা পেলেও একই অবস্থা হতো।”
পুরো ক্লাস হেসে উঠে।
রাফি বুক চেপে বলে„“স্যার, এভাবে অপমান করা মানবাধিকারের লঙ্ঘন।”
নাহিদা টেবিলে মাথা রেখে হাসতে থাকে।
স্যারও এবার হালকা হাসেন।
তারপর বলেন„“আচ্ছা, আজকের ক্লাস এখানেই শেষ। আগামীকাল সবাই পুরো চ্যাপ্টার পড়ে আসবে।”
সবাই একসাথে বলে উঠে„“জ্বি স্যার।”
স্যার বের হয়ে যেতেই ক্লাসরুম আবার শব্দে ভরে যায়।
চলবে...
স্যার ক্লাস থেকে বের হয়ে যেতেই পুরো ক্লাসরুমে আবার শব্দ শুরু হয়ে যায়।
কেউ টেস্ট নিয়ে আফসোস করছে, কেউ নিজের উত্তর মিলাচ্ছে, আবার কেউ টেনশন ছাড়ার জন্য অকারণে হাসাহাসি করছে।
স্যার সাথে সাথে অন্য স্টুডেন্টরাও চলে গেছে, শুধু রয়ে গেছে রিক্তাদের দল।
রাফি খাতা বন্ধ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে„“আজকের টেস্টের পর আমার আত্মা শরীর ছেড়ে চলে গেছে।”
কবিতা সাথে সাথে বলে„“তোর আত্মা থাকলে তো যাবে।”
নাইম চেয়ার ছেড়ে উঠে হাত-পা টানতে টানতে বলে„“আমি খুব টায়ার্ড।”
রাজ নাইমের পিঠে চাপড় দিয়ে বলে„“ওরে আমার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, একটু দেখালে কি হতো?”
নাইম বিরক্ত হয়ে বলে„“সর তো। তোকে দেখাতে গেলে আমার খাতাটা যে স্যার নিয়ে যেতো।”
„“খাতাই তো নিতো, তোকে তো নিতো না। আর তোকে নিয়েই বা কি করতো স্যার?”
রাফি হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে„“চল সবাই স্বপ্ন নীল নীড় মলে যাই!”
রাজ ভ্রু তুলে বলে„“হঠাৎ?”
„“কারণ আমার মন বলতেছে কিছু একটা খেতে হবে।”
নাহিদা এক সেকেন্ডও দেরি না করে বলে উঠে„“আমি রাজি!”
রাফি বুকের কাছে হাত এনে আবেগী কণ্ঠে বলে„“এই জন্যই তুই আমার সত্যিকারের বন্ধু।”
নাহিদা চোখ উল্টে বলে„“না, আমি শুধু খাবারের সত্যিকারের বন্ধু।”
নাইমও সাথে সাথে বলে„“আমিও যাবো।”
কবিতা হেসে বলে„“খাবারের নাম শুনে আমার চোখে আলাদা আলো চলে আসে।”
রাফি গম্ভীর হয়ে বলে„“খাবার হচ্ছে আবেগ।”
আরশি হাসতে হাসতে বলে„“তোদের দেখলে মনে হয় তোরা না খেয়ে বড় হয়েছিস। কত জনম ধরে যেন কিছু খাস না। খাদকের দল।”
নাহিদা চেঁচিয়ে বলে„“দেখ দোস্ত, খাবার নিয়ে কিছু বলিস তাহলে মাইন্ডে লাগে।”
আরশি নাহিদাকে মুখ বাঁকায়।
এইসবের মাঝেই শিখা ধীরে বলে„“তোরা যা। আমি আজ যাবো না।”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“কেন?”
শিখা ব্যাগ গুছাতে গুছাতে বলে„“এমনি… বাসায় যেতে হবে।”
রাফি সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলে„“মিথ্যা কথা।”
শিখা ভ্রু কুঁচকে বলে„“মানে?”
নাহিদা মুখে চাপা হাসি এনে বলে„“ভাইয়ার ভয়?”
শিখা সাথে সাথে বলে উঠে„“না!”
কিন্তু তার গলার জড়তা দেখেই সবাই বুঝে যায়।
কবিতা হেসে বলে„“ওরে বাবা! এত ভয়?”
শিখা বিরক্ত হয়ে বলে„“ভয় না রে কবি, এটাকে ভয় বলে না। একপ্রকার বলা যায় নির্যাতন। এই ভাইয়া আসার পর থেকেই আমার বন্দি জীবন।”
নাহিদা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে„“আহারে আমাদের বন্দিনী রাজকন্যা!”
শিখা মুখ ফুলিয়ে তাকায়।
এইসবের মাঝে রিক্তা চুপচাপ বসে আছে।
স্বপ্ন নীল নীড় মলের নাম শুনতেই তার মাথায় সেদিনের ঘটনাগুলো ভেসে উঠে।
সেই ভিড়, সেই বিশৃঙ্খলা, আর…
রিক্তা দ্রুত মাথা ঝাঁকায়।
আরশি রিক্তার দিকে তাকিয়ে বলে„“তুই কি যাবি?”
রিক্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে„“জানি না…”
রাফি সাথে সাথে বলে„“না বলার কোনো অপশন নাই।”
নাইম বলে„“হ্যাঁ, সবাই যাবো।”
নাহিদা রিক্তার কাঁধে মাথা রেখে বলে„“চল না প্লিজ। অনেক মজা হবে।”
রিক্তা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে।
আসলে তারও যেতে ইচ্ছে করছে।
শুধু অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করছে ভিতরে।
শেষমেশ সে ধীরে বলে„“আচ্ছা চল।”
সাথে সাথে সবাই খুশি হয়ে যায়।
নাহিদা শিখার হাত ধরে বলে„“এখন তুইও না করতে পারবি না।”
শিখা বিরক্ত মুখে বলে„“তোরা জোর করিস কেন?”
রাফি দাঁত বের করে বলে„“কারণ আমরা ভালো বন্ধু।”
রাজ ধীরে বলে„“এবং খাদক।”
পুরো ক্লাস আবার হেসে উঠে।
সবাই একসাথে কোচিং থেকে বের হয়ে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করে।
বাইরে তখন রাত পুরোপুরি নেমে এসেছে।
রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে।
চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, দোকানগুলোর আলো—সব মিলিয়ে শহরটা ঝলমল করছে।
হালকা বাতাসে দিনের গরম অনেকটাই কমে গেছে।
নাহিদা হাঁটতে হাঁটতে বলে„“আজকে আমি ঠান্ডা কিছু খাবো।”
রাফি সাথে সাথে বলে„“আমি সব খাবো।”
কবিতা বলে„“তোর পেটটা আলাদা একটা পৃথিবী।”
কিছুক্ষণ পর সবাই স্বপ্ন নীল নীড় মলের সামনে এসে দাঁড়ায়।
বড় বড় আলোয় পুরো মলটা ঝকঝক করছে।
গ্লাসের দেয়ালে চারপাশের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।
শিখা আস্তে করে চারপাশে তাকায়। মনে হচ্ছে এখনো একটু অস্বস্তিতে আছে।
রিক্তা সেটা খেয়াল করলেও কিছু বলে না।
সবাই একসাথে ভিতরে ঢুকে পড়ে।
রাজ ভিতরে আগে ঢুকে পিছনে সবার দিকে তাকিয়ে বলে„“ওয়েলকাম খাদক স্বর্গে।”
নাহিদা ভিতরে ঢুকে দুই হাত ছড়িয়ে বলে„“আহ কি শান্তি!”
মলের ভিতরে ঠান্ডা বাতাস লাগতেই যেন ক্লান্তি কিছুটা কমে যায়।
উপরে উঠতেই দেখা যায় রেস্টুরেন্ট ফ্লোরে প্রচুর মানুষ।
কোথাও পরিবার, কোথাও বন্ধুদের আড্ডা, কোথাও আবার বাচ্চাদের হৈচৈ।
রাফি সামনে এগিয়ে বলে„“আজকে যা খেতে মন চাইবে তাই খাবো।”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“পরে বিল দেখে কান্না করিস না।”
সবাই হাসতে হাসতে একটা বড় টেবিলে গিয়ে বসে পড়ে।
টেবিলে বসতেই সবাই যেন একসাথে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
কোচিংয়ের টেস্ট, গরম, ক্লান্তি—সব মিলিয়ে এখন তাদের মাথায় একটাই চিন্তা… খাবার।
মলের ভিতরের ঠান্ডা বাতাসে শরীরটা একটু আরাম পেতেই নাহিদা নাটকীয় ভঙ্গিতে চেয়ার পেছনে ঠেলে বলে„“আহ… এখন মনে হচ্ছে আমি আবার বেঁচে উঠছি।”
রাজ পাশে বসে বলে„“পাঁচ মিনিট আগে তোকে দেখে মনে হচ্ছিল শেষ নিঃশ্বাস চলছে।”
„“খালি পেটে মানুষের অবস্থা এমনই হয়।”
রাফি সাথে সাথে বলে„“এই জন্যই আমি কখনো পেট খালি রাখি না।”
কবিতা মুখ বাঁকিয়ে বলে„“তোর পেট তো জাতীয় সম্পদ।”
চারপাশে মানুষের ভিড়।
কেউ পরিবার নিয়ে খাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সাথে গল্প করছে।
উপরে সাদা আলো আর কাঁচের দেয়াল দিয়ে আসা সন্ধ্যার ঘ্রাণ মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাকে সুন্দর লাগছে।
বাইরে আকাশে সন্ধ্যার আভা তৈরি হচ্ছে।
ওয়েটার মেনু এনে দিতেই রাফি সেটা এমনভাবে হাতে নেয় যেন বহুদিনের হারানো সম্পদ ফিরে পেয়েছে।
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“মেনু দেখে লাভ নাই। শেষে আবার বলবি—‘যেটা সস্তা ওইটাই দেন।’”
রাফি বুক চেপে বলে„“বন্ধু হয়ে এত অপমান?”
রাজ শান্ত গলায় বলে„“এটা অপমান না, বাস্তবতা।”
নাইম পাশ থেকে বলে„“আজকে কিন্তু আমি ঠান্ডা কফি খাবো।”
কবিতা তাকিয়ে বলে„“তুই তো প্রতিদিনই এটা বলিস, পরে অন্যেরটা খাস।”
নাইম নিরীহ মুখে বলে„“শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং।”
শিখা তখনও চুপচাপ বসে চারপাশ দেখছে।
রিক্তা সেটা খেয়াল করে বলে„“কি হয়েছে? এখনো ভয় লাগছে?”
শিখা ঠোঁট ফুলিয়ে বলে„“হুম বেবি, সাথে অস্তিত্ব।”
রাফি সাথে সাথে বলে„“এত সুন্দর জায়গায় এসে কারো অস্বস্তি লাগে?”
শিখা তাকিয়ে বলে„“তোর সাথে থাকলে লাগে।”
পুরো টেবিলে আবার হাসির শব্দ উঠে।
ঠিক তখনই নাহিদা হঠাৎ চোখ ছোট করে পিছনের দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে বলে„“ঐটা কি মিলি আপু না?”
সবাই একসাথে পিছনে তাকায়।
পিছনের টেবিলে সত্যিই মিলি বসে আছে। তার সামনে একটা ছেলে। দুজন বেশ হাসতে হাসতে কথা বলছে।
কবিতা চোখ বড় বড় করে বলে„“ওমা… সিনিয়র আপু যে!”
রাজ মুখ চেপে হাসে।
রাফি ফিসফিস করে বলে„“মামলা তো গুরুতর। এটা যে সিনিয়র আপুর…”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“চুপ! এত জোরে বলিস না।”
রিক্তা একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
মিলি তাদের কলেজের পরিচিত সিনিয়র মেয়ে।
তাকে কোনো ছেলের সাথে এভাবে বসে থাকতে কেউ খুব একটা দেখেনি।
নাইম সামনে ঝুঁকে বলে„“ওই ছেলেটা কে মামা?”
শিখা আস্তে বলে„“দেখতে তো খারাপ না… যাই হোক বাদ দে। পরে আমার সমস্যা হবে।”
রাফি নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলে„“আহারে। জুনিয়রদের সামনে সিনিয়র আপু ছেলের সাথে হেসে কথা বলছে।”
নাইম ফোন বের করে একটা পিক তুলে নেয়, যাতে পরে কাজে লাগাতে পারে। কারণ এই সিনিয়র আপু থুক্কু মিলি তাদের অনেক নাকানিচুবানি খাইয়ে জ্ঞান দিতো, অথচ সে নিজেই বাজে আড্ডা দিতো।
নাহিদা হেসে বলে„“আমার মনে হয় এটা গোপন মিটিং।”
কবিতা চোখ টিপে বলে„“না হলে সিনিয়র আপু এত হাসতেছে কেন?”
রিক্তা এবার হেসে ফেলে।
কিছুক্ষণ আগেও তার মনটা একটু ভারী ছিল, কিন্তু এখন বন্ধুদের এসব কথা শুনে হাসি আটকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই মিলির চোখ হঠাৎ এদিকে পড়ে যায়।
এক সেকেন্ডের জন্য সে থমকে যায়। তারপর চোখ বড় বড় করে তাদের দিকে তাকায়।
রাফি সাথে সাথে হাত নেড়ে বলে উঠে„“হাই সিনিয়র আপু!”
মিলি এমন মুখ করে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদ দেখে ফেলেছে।
মিলি জোরপূর্বক হেসে হাত নাড়িয়ে হাই বলে।
নাহিদা টেবিলে মাথা রেখে হাসতে শুরু করে।
আরশি ফিসফিস করে বলে„“আজকে খুব স্পেশাল ডে মেবি।”
শিখা ছোট্ট হেসে বলে„“আমরা আজকে ভুল জায়গায় চলে এসেছি মনে হয়।”
ঠিক তখনই ওয়েটার খাবার এনে টেবিলে রাখে।
গরম গরম ফ্রাইয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই রাফি সব ভুলে গিয়ে বলে উঠে„“আচ্ছা পরে তদন্ত হবে। আগে খাওয়া শুরু করি।”
রাজ ধীরে বলে„“খাবারের সামনে এই ছেলে নিজের নামও ভুলে যায়।”
আর সেই কথাতেই আবার পুরো টেবিল হাসিতে ভরে উঠে।
মিলি বারবার তাদের টেবিলের দিকে তাকাচ্ছে আর চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।
তার মুখের অস্বস্তি দেখে নাহিদার হাসি যেন থামছেই না।
রাফি ধীরে ধীরে চেয়ার সামনে টেনে ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বলে„“আমার মনে হয় আমাদের সিনিয়র আপুকে একটু জ্বালানো উচিত।”
শিখা সাথে সাথে বলে„“না বাবা, আমি এসবের মধ্যে নাই।”
নাইম দাঁত বের করে বলে„“তুই চুপ থাক। ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে। বেশি পাকনামি করবি না, কাজিন দেখে।”
„“আরে সেরকম কিছু না। মিলি আপু একটু নাটকবাজ। যদি বাসায় উল্টাপাল্টা কিছু বলে তাহলে?”
রাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে„“কুল বেবি। তোমার পরিবারের সবাই আমাদের চিনে, তাহলে এত ডিপ্রেশন কেন?”
রিক্তা কোল্ড কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলে„“তোরা আবার কি করতে যাচ্ছিস?”
নাহিদা চোখ টিপে বলে„“মানসিক শান্তি।”
কবিতা হেসে বলে„“মানে সিনিয়র আপুর মানসিক অশান্তি।”
রাফি হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মিলিদের টেবিলের দিকে হাত নেড়ে চেঁচিয়ে বলে উঠে„“সিনিয়র আপুuuu!”
মুহূর্তেই আশেপাশের কয়েকজন ঘুরে তাকায়।
মিলি এমনভাবে চমকে উঠে যেন কেউ তাকে পরীক্ষার হলে নকল করতে ধরে ফেলেছে।
তার সামনে বসা ছেলেটাও অবাক হয়ে এদিকে তাকায়।
মিলি জোর করে হাসি দিয়ে বলে„“হা… হাই।”
রাফি নিষ্পাপ মুখ করে বলে„“আপু, আপনি এখানে?”
নাহিদা সাথে সাথে বলে উঠে„“ওমা রাফি! মানুষ কি মলে আসতে পারে না?”
রাজ মুখ নিচু করে হাসছে।
নাইম ধীরে ধীরে ফোন বের করে আবার ছবি তোলার ভান করে।
মিলি সেটা দেখে চোখ বড় বড় করে ফিসফিসিয়ে বলে„“নাইম! ফোন নামাও!”
নাইম নিরীহ মুখে বলে„“আমি তো কিছু করি নাই আপু।”
কবিতা হেসে ফেলে।
রাফি আবার বলে„“আপু, আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন না?”
মিলি এবার পুরোপুরি অস্বস্তিতে পড়ে যায়।
সামনের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আবার এদের দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় ছেলেটাকে কি যেন বলছে, কিন্তু ছেলেটা বেবলার মতো করে তাকিয়ে আছে।
নাইম এবার জোরে হেসে বলে„“সিনিয়র আপু, ছেলেটা ভোলাভালা তাই আপনার চোখের ইশারা বুঝছে না। তাই শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট করছেন কেন?”
শিখা পাশে বসে মুখ চেপে হাসছে।
রিক্তা এবার হেসে বলে„“আচ্ছা তোরা থাম। আপু সত্যি ভয় পেয়ে গেছে।”
মিলি এবার রিক্তার দিকে তাকিয়ে বলে„“আমি ভয় পাইনি। আর তুমি এমন করে নিজের ক্ষতি ডেকে আনছো?”
রিক্তা ছোটদের মতো ইনোসেন্ট মুখ করে বলে„“আমি কি করলাম আপু?”
রাফি নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলে„“সিনিয়র আপু আমাদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে…”
রাজ শান্ত গলায় বলে„“কারণ তোর উপর বিশ্বাস করার মতো কিছু নাই।”
পুরো টেবিল আবার হাসিতে ফেটে পড়ে।
মিলিও শেষে বিরক্ত হয়ে আঙুল তুলে বলে„“কলেজে গিয়ে তোদের সাথে হিসাব হবে।”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“আমরা নির্দোষ।”
মিলি আর কিছু না শুনে ছেলেটাকে নিয়ে গটগট পায়ে মল ত্যাগ করে।
মিলি যেতেই সবাই অট্টহাসিতে মেতে উঠে।
এইসব হাসাহাসির মাঝেই সময় কেটে যায়।
টেবিলের খাবারও প্রায় শেষ।
মলের কাঁচের বাইরে রাতের শহর ঝকঝক করছে।
রাস্তার লাইটগুলো রাস্তায় পড়ে চকচক করছে।
রিক্তা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে„“চল, এখন না বের হলে বাসায় যেতে দেরি হয়ে যাবে।”
শিখা সাথে সাথে বলে„“হ্যাঁ! আমি এখনই যাচ্ছি।”
রাফি হেসে বলে„“ভাইয়ার ভয় আবার জেগে উঠছে।”
শিখা ব্যাগ দিয়ে রাফির হাতে হালকা বাড়ি মারে।
সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
নাহিদা শেষ ফ্রাইটাও মুখে দিয়ে বলে„“আহ… জীবন।”
কবিতা বলে„“খাবারের সাথে তোর প্রেম একদিন ইতিহাস হবে।”
নাইম বিল দেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে„“এত টাকা কিভাবে উড়লো?”
রাজ শান্তভাবে বলে„“তোদের পেটে গেছে।”
আবারও হাসির রোল পড়ে যায়।
সবাই মিলে বিল পরিশোধ করতে গেলে কাউন্টারের ছেলেটা বলে„“আপনাদের টাকা পে করা আছে।”
রাফি ভ্রু কুঁচকে বলে„“কোন দয়াবান ব্যক্তি টাকা দিয়েছে শুনি?”
„“আমাদের স্যার বলেছে, আপনারা বা ম্যাম আসলে যেন টাকা না নেই।”
রাজ সন্দেহ কণ্ঠে বলে„“ম্যাম মানে?”
„“আপনাদের সাথে যিনি, তিনি আমাদের ম্যাম।”
সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। শিখা, নাহিদা, আরশি তিনজন রিক্তার দিকে তাকায়।
শিখা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে„“আচ্ছা বাদ দে। চল আমরা চলে যাই।”
নাইম বাধা দিয়ে বলে„“তুই কি পাগল? টাকা না দিয়ে আমরা চলে যাবো?”
নাইম একটা ক্রেডিট কার্ড কাউন্টারের ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলে„“এখান থেকে টাকা রাখুন। আমরা কারো টাকায় খাবো না।”
„“সরি স্যার, আমরা টাকা রাখতে পারবো না।”
„“আজব! কেন রাখবেন না?”
„“স্যারের নিষেধ।”
„“আপনার স্যারের টাকা তার কাছেই রাখতে। আমরা তার টাকায় খাবো না।”
নাহিদা নাইমকে থামাতে বলে„“দোস্ত থাম এবার। এটা নিয়ে বড় ইতিহাস আছে। আর ঘ্যানঘ্যান করিস না।”
„“মানে কি নাহু?”
রাজের কথায় আরশি বলে„“পরে সময় করে বলবো। এখন চল।”
রিক্তাও এবার বলে„“হুম, সময় করে সব বলবো তোদের।”
নাইম রিক্তার দিকে একপলক তাকিয়ে কাউন্টার থেকে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে পকেটে রেখে দেয়।
সবাই একসাথে মল থেকে বের হয়ে আসে।
বাইরে রাতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই ভালো লাগে।
রাস্তার পাশে গাড়ির আলো, মানুষের ভিড়, দোকানের ঝলমলে সাইনবোর্ড—সব মিলিয়ে শহরটা এখনো জেগে আছে।
রাফি হাঁটতে হাঁটতে বলে„“আজকের দিনটা ভালো ছিল।”
নাহিদা সাথে সাথে বলে„“হুম। বিশেষ করে সিনিয়র আপুর মুখের এক্সপ্রেশন।”
রাজ বলে„“আর ওই ছদ্মবেশী স্যারটার জন্য। কারণ তিনি সবার টাকা দিয়েছেন। তার মন খুব বড়।”
কবিতাও বলে„“হ্যাঁ, একদম ঠিক।”
আরশি হেসে বলে„“আজ সিনিয়র আপুকে বেশ জ্বালিয়েছি।”
শিখা মুখ বাঁকিয়ে বলে„“হুম জ্বালিয়েছিস ঠিকই, কিন্তু পরে আমার খবর করা হবে।”
রাজ বলে„“চিন্তা করছিস কেন ডার্লিং? আমরা আছি না। সমস্যা হলে সাথে সাথে ফোন করবি, আমরা গিয়ে হাজির হবো।”
তারপর সবাই নিজেদের রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করে।
হাসি, খুনসুটি আর আড্ডার শব্দ ধীরে ধীরে রাতের শহরের কোলাহলের মাঝে মিশে যায়।
চলবে......
( মি :- বানান ভুল হলে একটু কষ্ট করে মানিয়ে নেন। আজ গত তিন ঘন্টা ৫ টা উপন্যাস লিখেছি। কারেন্ট ছিল না।, প্রচুর বৃষ্টি সাথে বজ্রপাত। আজ একটানা উপন্যাস লিখতে গিয়ে চোখে রক্ত উঠে গেছে। চোখের ড্রপ শেষ তাই এমন টা হয়েছে। অবশ্য চশমা পড়া ছিলাম তাও চোখ ব্যথা করছিল। যাই হক উপন্যাস টা কেমন হয়েছে?)
খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস রুমের ভিতরে ঢুকছে। পর্দাগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে। দূরে
পাখিরা দল বেঁধে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। কোথাও চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, কোথাও আবার অফিসগামী মানুষের ছোটাছুটি। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে আছে।
সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় শুভর। ঘুম ঘুম চোখে হাতড়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে। ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে বলে„“আসসালামু আলাইকুম।”
মেয়ের কণ্ঠে শুভ ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। ‘পিচ্চি’ নামে সেভ করা নাম্বার দেখে অবচেতনেই মুখে হাসি ফুটে উঠে„“ওয়ালাইকুম সালাম।”
" চিনেছেন? "
" তোর প্রতিটি নিশ্বাস পর্যন্ত আমার জানা, আর সেখানে তোর কণ্ঠ... "
" বাহ, খুব ভালো। "
" তা হঠাৎ কী মনে করে ফোন করলি? "
" কেন? ফোন করা কি নিষেধ? "
" না না, তোর জন্য হয়তোবা না। "
" তাহলে ফোন রেখে দেই। "
" কেন? সাত সকালে এই অধমকে কেনো স্মরণ করেছেন ম্যাম? "
ওপাশ থেকে মিষ্টি হাসির শব্দ শোনা যায়। শুভর মুখেও হাসি ফুটে উঠে।
" আপনি কি বিজি? "
" তোর জন্য না। "
" একটা কথা বলতাম... ভয় করছে। "
" ভয়কে জয় করে বলে ফেল। "
" সত্যি বলবো? "
" হ্যাঁ। "
" কিছু বলবেন না তো? "
" এতো রুলস বাদ দিয়ে বলে ফেল। "
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতার পর বলে উঠে„”আমি আপনাকে ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব।”
এই বলেই ফোনের লাইন কেটে যায়। শুভ কী ভুল শুনলো, না সত্যি—এটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়।
" আমি কি স্বপ্ন দেখলাম? "
এই বলে হাতে একটা চিমটি কেটে দেয়। পরমুহূর্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠে। পাগলের মতো নেচে উঠে। বারংবার ফোনকে চুমু খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে ধাতস্থ করে আবার রিক্তার ফোনে কল করে। তিনবার ফোন করার পর চতুর্থবারে ফোন রিসিভ হয়।
শুভ গম্ভীর কণ্ঠে বলে„“তুই কী বললি? শুনতে পাইনি। তখন ঘুমাচ্ছিলাম, তাই আবার বল।”
রিক্তা নরম স্বরে বলে„“সত্যি শুনেন নাই?”
" হ্যাঁ। "
" আমি আপনাকে ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব। "
শুভ বলতে চাইলো—আমিও তোকে ভালোবাসি। কিন্তু পরমুহূর্তেই রাহাদের বলা কথাগুলো মনে পড়ে।
কাল রাতে রাহাদ ফোন করে বলেছিল—
" ভাইয়া, ছোট চাচ্চু বোনুকে ল’ইয়ার বানাতে চায়। আর এতে বোনুরও ইচ্ছে আছে। তাই কোনো পাগলামির কাজ করো না। "
কথাগুলো মনে করে শুভ আবার গম্ভীর কণ্ঠে শুধায়„“এইসব তোর আবেগ। তাই এসব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দে।”
" বিশ্বাস করুন, আপনার প্রতি ফিলিংস আমার রিয়েল। কোনো ফেইক না। আমি সত্যি আপনাকে ভালোবাসি। "
" কখন থেকে ভালোবাসিস? "
" সেই দুই বছর আগের থেকে। যখন আপনাকে ফুপির সাথে হেসে হেসে ভিডিও কলে কথা বলতে দেখেছিলাম তখন প্রথম ক্রাশ খাই। পরে সেটা ভালোবাসায় পরিণত হয়। আর সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। আমি আপনাকে কখনো বলিনি কারণ আমি আমার ফিলিংসকে যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন আর পারছি না। "
শুভ একটু মুচকি হাসলো। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে„“আচ্ছা, মানলাম তোর ফিলিংস রিয়েল। কিন্তু আমি তোকে ভালোবাসবো একটা শর্তে। যদি মানিস তাহলে ভেবে দেখবো। রাজি থাকলে বল।”
" হ্যাঁ, আমি রাজি। "
" তোর তো সামনে এক্সাম। তুই যদি এক্সামে পাশ করিস তাহলে ভেবে দেখবো। এখন তোর হাতে সব। "
" ওকে। চার মাস পর আপনার সামনে আমি আসবো। তখন তৈরি থাকবেন। "
" ওকে, ডান। "
রিক্তা আল্লাহ হাফেজ বলে ফোন কেটে দেয়।
শুভ ফোন বিছানায় রেখে ধপাস করে শুয়ে পড়ে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলে„“ওরে আমার বোকা পিচ্চি... তুই তো জানিস না আমি তোকে কতটা চাই। যতটা চাইলে তুই আমার হবি ঠিক ততটাই চাই। যতটা চাইলে রোজ ঘুম ভাঙার পর তোকে দেখবো, যতটা চাইলে রোজ ঘুম ভাঙার পর পাশে তোকে দেখে আমার দিন শুরু হবে, যতটা চাইলে তুই আমার বুকের মাঝে থাকবি—ঠিক ততটাই আমি চাই। অমৃত্যু তোকে চাই... যার কোনো শেষ না হয়।”
শুভ ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। তার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ যেন একসাথে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
রিক্তার বলা প্রতিটা শব্দ এখনো কানে বাজছে„“আমি আপনাকে ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব…”
শুভ চোখ বন্ধ করতেই ছোটবেলার একটা দৃশ্য ভেসে উঠে।
যখন রিক্তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর, তখন তার জন্মদিনে সবাই গিয়েছিল। জন্মদিনে শুভ নীল টি-শার্ট পরেছিল। তারা সবাই নিচে বসে ছিল। তখন উপর থেকে নীল গাউন পরা একটা ছোট্ট মেয়ে, যার হাতে ছিল একটা মাথার মুকুট, দৌড়ে এসে শুভর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল„“শুভ ভাইয়া, তুমি আমাকে এই মুকুটটা পরিয়ে তোমার রানী বানাও।”
উপস্থিত সবাই রিক্তার কাণ্ডে হেসে ফেলে। শুভ তখন ভড়কে গিয়েছিল। সে চুপ করে থাকে। তখন রিক্তা আবার বলেছিল„“কি হলো? বানাবে না?”
শুভ কোনো কথা বলে না। তখন আকলিমা খান শুভর পাশে বসে বলেছিলেন„“বাবা, পরিয়ে দে।”
শুভ মায়ের দিকে তাকায়। আকলিমা খান চোখের ইশারায় পরাতে বলেন। শুভ রিক্তার হাত থেকে মুকুট নেয়। রিক্তা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন শুভ মুকুটটা পরিয়ে দিয়েছিল। পিচ্চিটা খুশি হয়ে গোল গোল ঘুরছিল।
ছোটবেলার কথাগুলো কল্পনা করতেই ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠে। এই হাসিটা বহুদিনের অপেক্ষার। বহু রাতের না বলা অনুভূতির। বহু বছরের লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার।
শুভ ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সকালের বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। দূরে আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে।
সে নিচু স্বরে বলে„”শেষ পর্যন্ত তুমি বললে—ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব।”
তার গলায় তখন কাঁপন। যেন নিজের আবেগ সামলাতেই কষ্ট হচ্ছে।
শুভ মাথা নিচু করে হালকা হেসে বলে„“জানো? আমি কতবার কল্পনা করেছি এই মুহূর্তটা… কতবার ভেবেছি তুমি একদিন নিজে থেকে এসে বলবে—আমি আপনাকে ভালোবাসি…”
তার চোখ ভিজে উঠে। সে ধীরে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ে বলে„“কিন্তু যখন সত্যিই বললি… তখন কেন জানি বুকটা আরো বেশি ব্যথা করছে। কেন এমনটা হচ্ছে?...”
শুভ চাইলে এখনই বলতে পারতো—“আমিও তোকে ভালোবাসি।”
খুব সহজেই বলতে পারতো। কিন্তু পারেনি।
কারণ ভালোবাসার থেকেও বড় একটা জিনিস হচ্ছে তার কাছে রিক্তার ভবিষ্যৎ। রিক্তার স্বপ্ন।
সে চায় না তার জন্য মেয়েটার পড়াশোনা নষ্ট হোক।
সে চায় না কেউ আঙুল তুলে বলুক—“ভালোবাসার জন্য নিজের ভবিষ্যৎ শেষ করেছে।”
বরং সে চায়, একদিন সবাই গর্ব করে বলুক—
“এই মেয়েটা নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তার ভালোবাসাও পেয়েছে।”
শুভ ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে রিক্তার নাম্বারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব আস্তে করে বলে„“তুমি শুধু পাশ করো পিচ্চি… তারপর দেখবে, আমি পুরো পৃথিবীর সামনে তোমাকে আমার বলে পরিচয় দিবো…”
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে লুমিনা। হাতে ট্রে। ট্রের উপর কফির মগ।
লুমিনা ভিতরে ঢুকতেই শুভ দ্রুত ফোনটা পাশে রেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু লুমিনা এক নজর তাকিয়েই থেমে যায়। শুভর মুখে অদ্ভুত এক হাসি। যেটা সে আগে কখনো দেখেনি।
লুমিনা ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
ট্রে টেবিলে রেখে শুভর সামনে বসে পড়ে জিজ্ঞেস করে„“কি হয়েছে তোর?”
শুভ মাথা নাড়িয়ে বলে„“কিছু না।”
লুমিনা চোখ ছোট করে বলে„“তুই আর মিথ্যা? মিল যাচ্ছে না।”
" কেন? "
" বল না… কী হয়েছে? "
কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে শুভ। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নেয়।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলে„“পিচ্চি আজ আমাকে ভালোবাসি বলেছে…”
লুমিনা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকে।
তারপর হঠাৎ করেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
„“সত্যি???”
শুভ মাথা নিচু করে হেসে ফেলে। সেই হাসিতে লুকানো আছে হাজারটা অনুভূতি।
লুমিনা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলে„“ইয়া গড! অবশেষে!”
সে দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলে„“আমি জানতাম! আমি জানতাম একদিন না একদিন রিক্তা তোকে ভালোবাসি বলবেই!”
শুভ লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়ে বলে„“পাগলি একটা…”
লুমিনার চোখও ভিজে উঠে। সে ধীরে বলে„“জানিস? আমি সবসময় গডের কাছে দোয়া করতাম যেন রিক্তা তোর হয়। কারণ আমি জীবনে কাউকে তোর মতো এতটা ভালোবাসতে দেখিনি…”
শুভ চুপ করে শুনছে।
লুমিনা আবার বলে„“তুই বাইরে থেকে যতটা শক্ত… ভিতরে ঠিক ততটাই নরম। সবাই শুধু তোর রাগ দেখে, ক্ষমতা দেখে… কিন্তু আমি জানি তুই কেমন।”
— “তুই রিক্তার জন্য নিজের অনুভূতি পর্যন্ত লুকিয়ে রেখেছিস… শুধু যেন ওর ভবিষ্যৎ নষ্ট না হয়। এইরকম ভালোবাসা সবাই পারে না…”
শুভ ফিসফিস করে বলে„“আমি ওকে হারাতে চাই না লুমি…”
লুমিনা সাথে সাথে শুভর হাত শক্ত করে ধরে বলে„”হারাবি না। গড কখনো সত্যিকারের ভালোবাসাকে দূরে রাখেন না।”
তারপর দুষ্টুমি করে বলে„“তবে একটা কথা…”
শুভ ভ্রু কুঁচকে বলে„“কি?”
„“রিক্তা কিন্তু খুব কষ্টে ছিল এতদিন। তুই আর বেশি ভাব নিস না।”
শুভ হেসে ফেলে। অনেকদিন পর মন খুলে হাসে সে।
লুমিনা আবেগী কণ্ঠে বলে„“জানিস? আজকে তোকে খুব শান্ত লাগছে। অনেকদিন পর মনে হচ্ছে তুই সত্যি সত্যি সুখী…”
শুভ জানালার দিকে তাকায়। তার চোখে তখন নরম আলো। সে ধীরে বলে„“কারণ আজ আমার পৃথিবীটা আমাকে নিজের করে ডেকেছে…”
লুমিনা মুচকি হেসে বের হয়ে যায়।
রুমের ভেতর তখন এক অদ্ভুত শান্তি। বাইরে সকালের রোদ ধীরে ধীরে পুরো শহরটাকে আলোকিত করছে। আর সেই আলোয় একটা মানুষ চুপচাপ বসে আছে—নিজের ভালোবাসা পাওয়ার সুখে।
শুভ ভাবনার ছেদ ঘটে অ্যালার্মের শব্দে। ঘড়ি বলছে এখন ৯টা বাজে।
শুভ ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হয়। নীল শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে হসপিটালে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। ফোন পকেটে নিয়ে টেবিল থেকে হাতঘড়ি হাতে পরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকে।
নিচতলার ড্রয়িংরুমে তখন হালকা সকালের ব্যস্ততা। ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজানো। আকলিমা খান সোফায় বসে কারো সাথে ফোনে কথা বলছেন।
সুফিয়া ডাইনিং টেবিলে বসে জুস খেতে খেতে ফোনে কার্টুন দেখছে।
শুভকে নিচে নামতে দেখে সুফিয়া চোখ তুলে তাকায়। মুখে হাসি টেনে বলে„”কাকামুনি…”
শুভ এগিয়ে গিয়ে সুফিয়ার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে„“কি করছো আম্মু?”
" এই তো জুস খাচ্ছি। "
" গুড গার্ল। "
আমেনা খান রান্না করছেন। আকলিমা খান ফোনে কথা বলছেন, তাই সিনথিয়া শুভকে নাস্তা দেয়।
নাস্তা খেতে খেতে শুভ জিজ্ঞেস করে„“ভাবি, বাড়ির সবাই কোথায়?”
সিনথিয়া জবাব দেয়„“বড় আব্বু কোর্টে গিয়েছেন, ছোট আব্বু অফিসে, তোমার ভাই তিনিও অফিসে। আর মিলি, শিখা—এই কিছুক্ষণ হলো কলেজে গেছে। আর লুমিনা খেয়ে তোমার জন্য কফি নিয়ে উপরে গেছে।”
শুভ খাবার থামিয়ে বলে„“ওহ ভাবি, লুমির দেওয়া কফি টেবিলেই রেখে আসছি। পরে নিয়ে এসো।”
" আচ্ছা নিবো। কিন্তু ভাই শুভ? "
শুভ চোখ তুলে তাকিয়ে বলে„“হুম?”
" বিয়ে-শাদি কি করবে না? "
সিনথিয়ার কথায় শুভ বিষম খায়। সিনথিয়া পানি এগিয়ে দেয়। শুভ পানি খেয়ে নেয়।
সিনথিয়া ফের বলে„”আর কতদিন সিঙ্গেল থাকবে? একটা বিয়ে করো তাহলেই তো আমরা একটু শান্তি পাই।”
শুভ নাস্তা খেতে খেতে বলে„“চার মাস সময় দাও আমাকে।”
" তোমার আর চার মাস হবে না। বড় ভাইয়া কোথায় আছে, কেমন আছে—আমরা কিছু জানি না। তুমিও যদি এমন পাগলামি করো তাহলে বড় আম্মু খুব ভেঙে পড়বে। তাই আগে থেকেই বিয়ে করে ফেলো।”
বড় ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই মুখের খাবার থেমে যায়। শুভ খাবারের প্লেটে হাত ধুয়ে ফেলে।
তা দেখে সিনথিয়া বলে„“রাগ করেছো আমার উপর?”
" না ভাবি। এমনিতেই ভালো লাগছে না। "
সিনথিয়া প্লেট নিয়ে যেতে যেতে বলে„“বুঝি বুঝি, সবই বুঝি। বড় ভাইয়ের কথা মনে পড়েছে।”
শুভ সুফিয়ার কপালে চুমু দিয়ে বলে„“আসি আম্মু।”
সুফিয়াও হাত নেড়ে টাটা দেয়।
শুভ সোফার কাছে এগিয়ে যায়। শুভকে দেখে আকলিমা খান ফোন কেটে জিজ্ঞেস করে„“এত খেতে গেলি, এত তাড়াতাড়ি চলে আসলি?”
" খাওয়া শেষ। আমি এখন যাচ্ছি। "
" সাবধানে যাস। "
এরমধ্যেই লুমিনাও তৈরি হয়ে নিচে নামে। নিচে এসে দেখে শুভ দাঁড়িয়ে আছে। শুভ আকলিমা খানের থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে চলে যায়। সাথে লুমিনাও বিদায় নিয়ে বের হয়।
শুভ গাড়িতে এসে বসে পড়ে। লুমিনা পিছনের সিটে এসে বসে। লুমিনা আসতেই শুভ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
চলবে...