প্রীষান কায়রা
সারপ্রাইজ পার্ট✨
দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে এলো। জানালার কাঁচে শেষ বিকেলের রোদ লেগে ঘরের ভেতর একধরনের নরম সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। কায়রা এখন বহুব্যস্ত মেয়ে। সে একাধারে প্রীষানের ওয়াইফি, প্রীষানের ছানাপোনাদের মা। কত কাজ, কত দায়িত্ব তার! তাকে দেখলে এখন আর আগের সেই রোগাপটকা, ছটফটে মেয়েটার কথা মনে পড়ে না। সময় তাকে বদলেছে, পরিস্থিতি তাকে তৈরি করেছে সম্পুর্ন অন্য একটি কায়রা হিসেবে। মাতৃত্ব তাকে আরও পূর্ণ করেছে। পাতলা গড়নের জায়গায় এসেছে মৃদু স্থূলতা, মুখের রেখাগুলোতে জমেছে পরিণত বয়সের কোমল সৌন্দর্য। বয়স একত্রিশ ছুঁয়েছে বটে, কিন্তু কায়রাকে এখন আগের চেয়েও বেশি সুন্দর লাগে। রোগাপটকা স্লিম ভাবটি আর নেই যে।
এইমাত্র বাচ্চাদের বিকেলের নাস্তা খাইয়ে এসেছে সে। আবার একেকজনের একেক আবদার। প্রিহার জন্য নুডুলস, প্রীভানের জন্য পাস্তা, আর প্রকৃতি ও প্রবীরের জন্য মিল্কশেকের সঙ্গে কোকো। মেয়েজামাই সুহৃদ আসে নি, তাই ঘরে যা ছিলো, তা দিয়েই সব সামলেছে কায়রা। এসব ঝক্কিঝামেলা তার কাছে কষ্ট নয়, বরং একরাশ তৃপ্তির। কায়রা সাদরে গ্রহন করেছে এসব। সংসারের এই ছোট ছোট ব্যস্ততাগুলোই তার দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ। বাচ্চারা বড় হলেও কায়রার কাছে ওরা এখনো আদর আদরই রয়ে গেছে।
কায়রা নিজেও একটু আগে দু'পিস চকলেট কাপকেক খেয়েছে। আজ সারাদিন ধরে চকলেট কেক খাওয়ার অদ্ভুত ইচ্ছে হচ্ছিলো। পেটের ভেতরের ছোট্ট মানুষটার আবদার বলে কথা। তাই খেলো কায়রা। প্রীষান হোমমেইড কেক নিয়ে এসেছিলো গতকাল কায়রার জন্য। এই লোক আবার খাওয়া দাওয়া নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে। হেলদি ফুড ছাড়া বর্তমানে বাড়িতে কিচ্ছুটি এলাও নয়।
যাগগে, সব কাজ শেষ করে একমগ কফি হাতে নিলো কায়রা। তখনই মনে পড়লো, অনেকক্ষণ আগেই প্রীষান কফি চেয়েছিলো। ব্যস্ততার ভিড়ে সেটা পুরোপুরি ভুলে বসেছিলো কায়রা। এবার নিশ্চয়ই প্রিহার পাপা ওকে আচ্ছা করে বকে দেবে। মনে মনে বিপদের আভাস পেয়ে কফির মগ হাতে সাবধানে প্রীষানের রুমের দিকে এগোলো সে। দরজা খুলেই ভয়ার্তভাবে ভেতরে ঢুকলো কায়রা। বকা খাওয়ার ভয়ে। কিন্তু কায়রার কি দোষ! ও তো আগের মতোই রয়ে গেছে। ছেলেমানুষী যায় নি। কিন্তু প্রীষানের আর আগের মতো ধৈর্য নেই। ওটা কমছে বয়সের সাথে সাথে। কয়েকটা চুল পেকে বয়সও তা জানান দিচ্ছে বোধহয়। যেমন হুটহাট রেগে যায়, খিঁটমিটে মেজাজে থাকে। তবে তা বাচ্চাদের সামনে দেখায় না, সব কায়রার সাথেই। আর প্রীষানের রাগে কায়রাও ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়। যতক্ষন না প্রীষান গলে গিয়ে কায়রাকে আদর করে ততক্ষন কান্না থামায় না কায়রা। আজও এমনই এক ঘটনা ঘটে, ভাগ্যক্রমে। প্রীষানের বকা খাওয়ার একটা সুন্দর কারণ পেয়ে গেলো সে।
ঘরে আসার সময় কার্পেটের কিনারায় পা আটকে যেতেই শরীরটা হঠাৎ সামনের দিকে হেলে পড়লো কায়রার। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলেও হাতের কফির মগটা ছিটকে মেঝেতে আছড়ে পড়লো।
ঝনঝন শব্দে ভেঙে গেলো মগ। তখন ফোনে কথা বলছিলো প্রীষান। শব্দ পেয়ে মুহূর্তেই ফোন নামিয়ে ছুটে এলো সে। হন্তদন্ত হয়ে কায়রার দুই বাহু ধরে দাঁড় করালো প্রীষান,
"একি! এক্ষুনি তো পড়ে যেতে! দেখি... কোথাও লেগেছে? ব্যথা পেয়েছো?"
কায়রা আস্তে করে মাথা নাড়লো। স্বস্তি পাওয়ার বদলে প্রীষানের চোখে তখন রাগ জেগে উঠেছে। কায়রার দিকে তাকিয়ে হিসহিসে স্বরে বলল,
"সেন্স কবে হবে তোমার, হু? এক্ষুনি পড়ে গেলে কি হতো? তাছাড়া, এত তাড়াহুড়ো কিসের? ভুলে গেছো নাকি ইয়্যু আর প্রেগন্যান্ট উইথ মাই বেই'বি!"
ধমকটা শুনে কায়রার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
এই ক'মাসে তার মনটা কেমন যেন নরম মাটির মতো হয়ে গেছে। প্রেগ্ন্যাসির দরুন মুড সুইং হওয়ায় সামান্য কথাতেই চোখ ভিজে আসে। বিশেষ করে প্রীষানের ধমকে। ছলছল চোখে তাকিয়ে কায়রা বলল,
"আমি কি ইচ্ছে করে করেছি? ভুলে হয়ে গেছে। সরুন, আমি পরিষ্কার করছি।"
এই বলে নিচু হয়ে কাচ কুঁড়োতে যেতেই প্রীষান প্রায় ধমক দিয়েই থামিয়ে দিলো কায়রাকে। তারপর আবারও রেগে বলল,
"হ্যাঁ, এরপর হাতটাও কেটে ফেলো! ইডিয়েট একটা!"
কায়রা আর কিছু বলল না। শুধু হেঁটে চুপচাপ গিয়ে বিছানার এক কোণে বসে রইলো। মুখটা এমনভাবে গোমড়া হয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সব অভিমান এসে ওর বুকে জমা হয়েছে। এদিকে প্রীষান ভাঙা কাচগুলো সরিয়ে ফেলে ফিরে তাকাতেই কায়রার অভিমানী মুখটা দেখতে পেলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলো, প্রীষান আজ আবারও বেশি রাগ দেখিয়ে ফেলেছে। নিজের কান্ডে নিজেই বিরক্ত হলো প্রীষান। তাই গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো সে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটাও যেন অকারণে তেঁতে ওঠে। অথচ এই মেয়েটার চোখে একফোঁটা জল দেখলেই প্রীষানের সমস্ত রাগ কোথায় মিলিয়ে যায়! কাচ ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কায়রার পাশে বসলো সে। এরপর আচমকা কায়রার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরলো প্রীষান, প্রতিবারের মতো।
কায়রাও যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে গুটিসুটি মেরে বিড়ালছানার মতো স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললো সে। অভিমান, রাগারাগি যতই হোক, প্রীষান কাছে টানলে তাকে কায়রা অস্বীকার করে না কখনো। করতে পারবেই না। এরই মধ্যে প্রীষান তার আঙুলগুলো আলতো করে বুলিয়ে যাচ্ছে মেয়েটার চুলের ভাঁজে। গলা নামিয়ে প্রীষান ছোট করে বলে দেয়,
"স্যরি..."
কায়রার উত্তর না পেয়ে প্রীষান আবার বলে,
"আবার বকাঝকা করলাম তোমায়। খারাপ লেগেছে?"
কায়রা নাক টেনে বলল,
"এ আর নতুন কি? আপনি তো সবসময়ই বকেন। স্বভাব আপনার।"
প্রীষানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো।
"বয়স হচ্ছে তো।"
কায়রা জীবনেও স্বীকার করতে চায় না প্রীষানের বয়স হচ্ছে। তাই কায়রা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে প্রতিবাদ করলো,
"উহু! এসব মিথ্যে কথা। আপনি এভারগ্রিন ইয়াং ম্যান। মাই ম্যা'ন! এখনো তো হিরোদের মতো বডি-সডি আছে। হিরোরা বুড়ো হয় না কখনো।"
প্রীষান হেসে ফেললো কায়রার বাচ্চামো কথায়। তারপর ঝুঁকে কায়রার মাথায় একটা দীর্ঘ, স্নেহমাখা চুমু খেয়ে বলল,
"বাচ্চাদের খাইয়ে এসেছো?"
"হু।"
"আর পেটের'টার কি খবর? উনি খেয়েছে?"
"হু।"
প্রীষান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
"কি এই হু হু? আর কোনো শব্দ জানা নেই?"
কায়রা হাসলো।
"আর কি বলবো?"
প্রীষান এবার ওকে আরও কাছে টেনে নিয়ে মায়াময় মুখে চেয়ে থেকে বলল,
"বলো, ভালোবাসি। আজকাল তো ভালোবাসি ভালোবাসি বলে কান ঝালাপালা করো না। কি ব্যাপার? ভালোবাসা কমে-টমে গেলো নাকি?"
কথাটা শুনে কায়রা হেসে ফেললো। সেই হাসির মধ্যে ছিল বহু বছরের সংসার, হাজারো স্মৃতি আর অগণিত ভালোবাসার ছাপ। কায়রা মাথা তুলে পিটপিট চোখ করে মৃদু গলায় বলল,
"আপনার প্রতি ভালোবাসা কখনো কমবে? কত কাঠখড় পুড়িয়ে আপনাকে পেয়েছি। আর সেই আপনিই বলছেন ভালোবাসা কমে গেছে কি না?"
প্রীষানের বুকটা অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে উঠলো এমন উত্তরে। কায়রা এমনই। প্রীষানকে বারবার আপ্লুত করে। সে আবার কায়রাকে নিজের বাহুর ভেতর জড়িয়ে নিলো। বলল,
"তবুও বলো। শুনি।"
কায়রা এবার দু'হাত তুলে প্রীষানের গলা জড়িয়ে ধরলো। মুখটা গুঁজে দিলো পরিচিত সেই বুকের কাছে, যেখানে এত বছর পরও সে নিজের পৃথিবী খুঁজে পায়। শান্তি পায়, স্বস্তি পায়। তারপর কায়রা দীর্ঘ টানে বলেই গেলো,
"ভালোবাসিইইই... খুব, খুব, খুব ভালোবাসি। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। অনেক অনেক ভালোবাসি।"
প্রীষান চোখ বন্ধ করলো আলতো হেসে। মুহূর্তটা বুকভরে অনুভব করলো। তারপর কায়রার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আই লাভ ইয়্যু টু। ফলিং ফর ইয়্যু এগেইন অ্যান্ড এগেইন। ইয়্যু আর মাই পিস, মাই হ্যাপিনেস, মাই ওয়াইফি।"
|| সমাপ্তি ||
(📌মন্তব্য করবেন কিন্তু। পড়াশোনার ব্রেকের মাঝে টুকুস করে লিখলাম ছোট্ট অংশ।❤️)