গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 6 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
 
পর্বসংখ্যা:৪৫

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন আর আকাশে দিনের সেই উজ্জ্বল আলো নেই। দিনের উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে এসেছে ধীরে ধীরে। আকাশের রঙ এখন কোথাও ধূসর, কোথাও বা কালচে ছায়ামতো। দূরের গাছপালাগুলোও অস্পষ্ট হয়ে আসছে। শহরের প্রতিটি ঘরের জানালার ভেতর আলো জ্বলে উঠলেও বাইরের আলো হারিয়ে যাচ্ছে বরাবরের মতো। একটা শান্ত, একটু বিষণ্ণ সন্ধ্যার পর প্রকৃতি রাত নামানোর প্রস্তুতি করছে।

কাবিরের ঘরের ভেতর আধো আলো জ্বলছে।  বিছানায় উপুড় হয়ে ভরসন্ধ্যায় শুয়ে আছে কাবির। পরনে সাদামাটা টি-শার্ট আর আরামদায়ক লুঙ্গি। তার শরীরটা আজ ভারী ক্লান্ত সারাদিনের খাটাখাটুনিতে। তার ওপর গতরাতে ল্যাপটপের সামনে জেগে থাকা। চোখ দুটো বন্ধ, কিন্তু ঘুমটা গভীর নয়। আধো আধো। 
বিয়ের কিছুমাস পর থেকেই বদল এসেছে তার ভেতরে। নিজের পেশার পাশাপাশি এই কাজটাকেও গুরুত্ব দিয়ে ধরেছে সে। এবার বেশ সিরিয়াস হয়েছে কাবির। বুঝে গেছে, ভবঘুরে জীবনে আর যাইহোক সংসার চালানো যায় না। 

কাবির সবসময় মানতো, 'অর্থ অনর্থের মূল'। তবে এই কথাটা সত্য হলেও, ভালোভাবে বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে কাবির বা প্রীতিষার কারোরই চাওয়া-পাওয়া খুব বড় নয়। যতটা থাকলে একজীবন সুখে পার করা যায়, অতটুকুতেই তুষ্ট তারা। 

আধো ঘুমের মাঝেই ধীরে ধীরে শরীরটা ঘুরিয়ে ডান পাশে কাত হলো কাবির। আধখোলা চোখে দেখলো, প্রীতিষা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে। সেই দৃশ্যটা তার তন্দ্রা ভেঙে দিলো। এবার সে প্রায় জোর করেই চোখ মেলে তাকালো। দেখলো, প্রীতিষা চুল আচরাচ্ছে। সাদা রঙের কটন কামিজ, আর তার ওপর কাঁধের একপাশে রাখা রঙধনুর ন্যায় বিভিন্ন রঙের মিশেলে তৈরি রঙিন ওড়না। 

কাবির কনুইয়ে ভর দিয়ে কাত হয়ে রইলো। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, 
“কই যাবা? এত সাজগোজ ক্যান?”

প্রীতিষা চট করে পেছনে ফিরে তাকালো। ঠোঁটে একটুখানি হাসি মেখে বলল,
“ওহ, তুমি উঠেছো! আরে ভুলে গেছো নাকি? আজ প্রিহার জন্মদিন। ভাইয়ার বাসায় যাবো, তাই রেডি হচ্ছি।”

কথাটা শুনে কিছু একটা মনে পড়লো কাবিরের। সত্যিই তো, প্রীতিষা আগেই বলেছিলো তাকে এই ব্যাপারে। নিজের ভুলে যাওয়া নিয়ে সে মৃদু মাথা নেড়ে হাসলো। তারপর হঠাৎ কী ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কাবির। প্রীতিষা তখন আয়নাতে অল্পস্বল্প সাজগোজে ব্যস্ত। ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসে বলল,
“চুল বাইন্ধা নেও।”

“হ্যাঁ, বাঁধছি, ”

বলতে বলতেই চুলে রাবার পেঁচিয়ে নিলো প্রীতিষা।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হালকা গলায় প্রীতিষা বলল,
“কাবির, তুমিও চলো না? তুমি গেলে ভালো হতো।”

কাবির বড়সড় একটা হাই তুললো। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট,
“যাইতে চাইছিলাম। কিন্তু ঘুমটা পুরা হয় নাই আমার। এখন গেলে বড়জোর আধাঘন্টা পরেই চোখ লাগবো। তখন কি করমু?”

প্রীতিষা ঠোঁট উল্টে একটু তাকালো। অবশ্য বুঝলো, কাবির যথেষ্ট ক্লান্ত, তাই বিশেষ জোর করলো না। সব প্রস্তুতি শেষ হলে কাবির'ই বাইক বের করলো প্রীতিষাকে পৌঁছে দিতে যাবে বলে। প্রীতিষাকে লেডিস জুতো পরতে দেখে কাবির বলল,
"পায়ের গোড়ায় ছিলে গেছে না তোমার? ব্যাথা পাবা তো এই জুতা পরলে! শু পরো আজকের মতো।"

প্রীতিষা মাথা নেড়ে জুতোটা তুলে রেখে শু-ই বের করলো। তবে বিপত্তি ঘটে ফিতে বাঁধার সময়। পারে না প্রীতিষা লেস বাঁধতে। এসব কাবিরের অজানা নয়। তাই মেয়েটা বলার আগেই কাবির এক হাঁটু গেড়ে বসে শু-এর লেস দুটো বেঁধে দেয়। এই কেয়ারিং কাবিরকে দেখে আরেকবার টুস করে প্রে'মে পরে যায় প্রীতিষা। মনে মনে ঠা'স ঠা'স করে কাবিরকে শ-খানেক চু'মুও দিয়ে ফেলে সে।

--------------------------

রাতের বাতাসে হালকা শীতলতা। রাস্তা প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। শুধু দুটো সিএনজি শো করে ছুটে গেছে। এদিকে চলন্ত বাইকে বসেই প্রীতিষা বলল,
“আমি একাই যেতে পারতাম। তোমার কষ্ট হলো অযথা।”

কাবির রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই জোর গলায় বলল,
“বউয়ের সেফটি সবার আগে।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল প্রীতিষা,
“আচ্ছা, আমি ভাবছিলাম আজ ভাইয়ার বাসায় থেকে যাবো। কারণ, বার্থডে সেলিব্রেশন করতে করতে রাত একটা-দুটো বাজবে। অত রাতে আর তোমাকে আসতে হবে না। কাল সকালে তুমি নিতে এসো।”

কাবির এক মুহুর্ত চুপ থাকলো। মনে হলো কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। তারপর ফোস করে শ্বাস ফেললেও নরম গলায় বলল,
“বউ ছাড়া থাকতে পারুম না… স্যরি।”

প্রীতিষা এবার একটু জেদ করলো,
“প্লিজ কাবির, একটা রাতই তো। থাকি না?”

কাবিরের কণ্ঠ এবার একটু কঠোর হলো,
“তোমার সব আবদার মানি। কিন্তু এইটা না। তাই আজাইরা জেদ কইরো না, প্রীতি। যত রাতই হোক, আমারে ফোন দিবা। আমি আইসা নিয়া যামু।”

প্রীতিষা রীতিমতো ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,
“সবসময় এমন করো কেন? বিয়ের পর একদিনও থাকতে পারলাম না ও বাড়িতে! আমি কি মিস করি না ওদের!”

কাবির হালকা হাসলো। চোখ সামনে তার। একটু তাচ্ছিল্য হেসেই কাবির বলে,
“এতবছর একাই থাকলাম। তারপর তুমি আইসা অভ্যাস খারাপ করছো। এখন আবার সেই আমারে একা রাখার প্ল্যান করলে আমি সায় দিতাছি না দেইখা চেইতা যাইতাছো! বাহ!”

কথাগুলো শুনে প্রীতিষার মনটা একটু নরম হয়ে আসে। আর জেদ করে না সে। তবুও ভাই, ভাতিজাদের জন্য মনটা টানে খুব। শেষ পর্যন্ত আর কিছু বললো না সে। শুধু পেলব হাতদুটো দিয়ে কাবিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। অতি সন্তপর্ণে মাথা রাখলো প্রসস্ত পিঠটায়। এটাও সত্যি, সে নিজেও তো থাকতে পারবে না কাবিরকে ছাড়া। কাবির কি বুঝতে পারে না প্রীতিষাকে? এই মেয়েটাও ওর জন্য অতটাই পাগল, ঠিক যতটা কাবির। 

ডান হাতে বাইকের হ্যান্ডেল আঁকড়ে রেখেই কাবির আরেকহাতে পেছন থেকে আলতো টানে প্রীতিষার হাতটি ধরে সামনে আনে। এসবে প্রীতিষা আলতো হাসে শুধু। তারপর মেয়েটার হাতের তালুতে ঠোঁট ছোঁয়ায় কাবির। চুমুর উষ্ণতা কিছুক্ষণ বুকে আগলে রেখে আবার দু’হাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে ছুটে চলল কাবির।

--------------------------

প্রিমাকে কড়া গলায় কথা শুনিয়ে বাড়ি ছাড়তে বলেছিলেন নিজাম উদ্দীন। কারণ, তার নজরে পরে গিয়েছিলো কায়রার বিরুদ্ধে প্রিমার করা ষড়যন্ত্র। প্রীষানের জীবনে আর কোনো অশান্তি চায় না সে। তাই নিজাম উদ্দীন সেদিন ছিলো প্রচন্ডরকম কঠোর।  বাবার করা অপমানের কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে প্রিমা আর এক মুহূর্তও থাকেনি এ বাড়িতে। আর থাকবেই বা কিসের আশায়? প্রীষানকে ও কখনো পাবে না বুঝে গেছে। পাওয়ার সুযোগ নেই, একটুও নেই। প্রীষানকে ঘিরে তার না বলা স্বপ্নগুলো জন্মেছিলো বহু আগে থেকে। কিন্তু এখনো সে অধরা, নাগালের বাইরে। তাই ভারাক্রান্ত বুক আর অগোচর অশ্রু নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেছে প্রিমা। তারপর আজ ঠিক এক সপ্তাহ গড়িয়েছে। বাড়িটায় এখন শান্তি বিরাজমান। 

আজ প্রিহার শেষ পরীক্ষা ছিলো। টেস্ট পরীক্ষা নামক যন্ত্রনা আজ শেষ হলো তার। পরীক্ষার দরুন ক্লান্ত শরীর আর পরীক্ষা শেষ হওয়ার দরুন হালকা স্বস্তি নিয়ে বিকেলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই মেয়েটা ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। কেউ তাকে ডেকে তোলেনি, বিরক্তও করেনি। মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমাক একটু। এই কটা দিন বড্ড পরিশ্রম গেছে তার। 

এদিকে রাত সাড়ে ন-টার দিকে প্রীষান, কায়রা আর প্রীভান মিলে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে প্রিহার জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে। সাদা-কালো রঙিন বেলুন, ঝলমলে ফিতে বাঁধতে ব্যস্ত তারা। প্রীতিষাও পাশে দাঁড়িয়ে হাত লাগাচ্ছে সব কাজে। আজ প্রিহাকে প্রতিবারের মতো বিশেষ সারপ্রাইজ দেওয়া হবে। সেই আয়োজন সম্পুর্ন করতে ব্যস্ত সকলে। তবে সবার মাঝে অনুপস্থিত নিজাম উদ্দীন। তিনি রাত আটটার মাঝে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন। তার আবার প্রতিদিন ঘুমের ঔষধ নিতে হয়। 

কাজের মাঝে হঠাৎই প্রীষানের চোখ আটকে গেলো প্রীতিষার হাতের কব্জিতে। একটা মোটা শেকলের ন্যায় রুপোর ব্রেসলেট মেয়েটার হাতে এবং তা স্পষ্টত'ই ছেলেদের। ভ্রু কুঁচকে প্রীষান প্রশ্ন করলো, 
“ছেলেদের ব্রেসলেট পড়েছিস কেন তুই?”

প্রীতিষা তখন বেলুনে ফুঁ দিচ্ছিলো। ফোলানো শেষ করে হাতটা চোখের সামনে এনে মৃদু হাসলো। বলল, “এটা কাবিরের। ও-ই দিয়েছে আমাকে। দেখো না, নামও আছে ওর।”

এই বলে সে হাতটা একটু উঁচু করে সামনে ধরলো। বড় অক্ষরে ইংরেজিতে খোদাই করা—“KABIR”। প্রীষান এবার ভালো করে দেখলো। তখন নামটা চোখে পড়েনি। এদিকে কায়রা পাশ থেকে চুপচাপ সব শুনছে, তার ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি।

প্রীষান ছোট করে শ্বাস ফেলে আবার বলল, 
“তোর সাথে থেকে কাবির পাগল হয়েছে? নাকি কাবিরের সাথে থেকে তুই পাগল হয়েছিস?”

প্রীতিষা মুচকি হেসে উত্তর দিলো, 
“দুজনকেই ক্রেডিট দাও, ভাইয়া। আমরা কেউ কারো থেকে কম নই। ইয়্যু নো, মেইড ফর ইচ আদার!”

কায়রা এখন আর চুপ থাকতে পারলো না। ফিক করে হেসে সায় জানায়, 
“রাই'ট, আসলেই তোমরা দুজন একেবারে মেইড ফর ইচ আদার!”

প্রীতিষা লাজুকভাবে মাথা নামিয়ে হাসলো। এমন সময় হঠাৎই এক তরুণের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সবার দৃষ্টি একসঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেলো। বাকিরা স্বাভাবিকভাবে তাকালেও কায়রার ভ্রু কুঁচকালো।

“হাই, গাই'স! সো সরি ফর দ্য লেই'ট। একচুয়ালি মাম্মা একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো, তাই সবকিছু গুছিয়ে আসতে একটু সময় লেগে গেলো।”

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে দম নিলো সুহৃদ। সুদর্শন ছেলেটার উপস্থিতি ঘরটার আবহে আলাদা এক আভা এনে দিলো। সাদা শার্টের ওপর পরিপাটি করে পরা কালো ব্লেজার, চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা। সব মিলিয়ে একরকম সংযত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে ছেলেটার মধ্যে। হাতে ধরা ক্রাফট পেপারে মোড়ানো রিবন দিয়ে বাঁধা টকটকে তাজা গোলাপের বুকে।

প্রীষান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
“নো প্রবলেম, বেটা। কিন্তু মৃনালীর কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস?”

সুহৃদ হালকা মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে জবাব দিলো,
“না, আংকেল। মাম্মার একটু প্রেশার বেড়েছিলো জাস্ট। এখন অল ইজ ওকে।”

প্রীষান আশ্বস্ত হয়ে মাথা নাড়িয়ে সুহৃদকে ভেতরে গিয়ে বসতে বলে উপরের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। নিজেকে প্রস্তুত করার পালা এবার তার। শুধু পরনের শার্টটা পাল্টাবে সে। নাহলে প্রিহা নারাজ হবে। 

এদিকে সুহৃদ তখন কায়রার দিকে এগিয়ে এলো। স্বভাবসুলভ বিনয়ী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, 
"হাই, আন্টি। হাউ আর ইয়্যু?"

কায়রা এতক্ষণ যেন অবচেতনেই তাকিয়ে ছিলো ছেলেটির দিকে। হঠাৎ তার কণ্ঠ শুনে সামান্য চমকে উঠে বলল,
“ভালো… তুমি?”

“ফাইন। কিছু হেল্প লাগবে, আন্টি?”

ভদ্রতা মেশানো কণ্ঠে জানতে চাইলো সুহৃদ। কায়রা মৃদু হাসলো, মাথা নেড়ে বলল,
“না, সব রেডি। তুমি বসো।”

সুহৃদ মাথা দোলালো। এদিকে প্রীভান গিয়ে তার পাশে বসতেই ঘরের স্বাভাবিক ছন্দ আবার ফিরে এলো। কিন্তু কায়রার ভ্রু যেন অজান্তেই কুঁচকে রইলো, চোখদুটো অনুসন্ধিৎসু। এই ছেলেটি কে? প্রীষান তো বলেছিলো, আজকের আয়োজন একেবারে ঘরোয়া। তবে অকস্মাৎ এই অতিথির আগমন কেন? মনে মনে আন্দাজ করলো, হয়তো প্রিহার কোনো বন্ধু। বয়স তো সে রকমই, সতেরো-আঠারোর বেশি নয়। 

প্রীতিষার দিকে চোখ পড়তেই সুহৃদ হেসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, মণি।”

প্রীতিষাও মিষ্টি হেসে জবাব দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী অবস্থা তোমার?”

“এই তো, চলছে।”

“একটা কাজ করো তো, সুহৃদ। প্রিহাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আনো। একেবারে তৈরি হয়েই আসতে বলো।”

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো যেন সুহৃদ। চোখে হালকা উচ্ছ্বাস ঝিলিক দিয়ে উঠলো। দ্রুত বেগে বলল,
“ওকে!”

এই বলে সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো প্রিহার ঘরের উদ্দেশ্যে। কায়রা কাজ সেরে এসে প্রীভানের পাশে বসলো। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এই ছেলেটা কে? চিনলাম না তো! প্রিহার ফ্রেন্ড?”

প্রীভান মুচকি হেসে একটু দুষ্টুমি মেশানো ভঙ্গিতে বলল,
“শুধু ফ্রেন্ড না। জানেম'ন বলো, মম!”

কায়রার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো,
“কিহ! প্রিহা কি রিলেশন করে?”

প্রীভান তাড়াতাড়ি হেসে বলল,
“আরে নাহ! ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড—ছোটবেলা থেকে। তবে… সুহৃদ ভাইয়া আপুকে একটু বেশিই লাইক করে।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, ভালো করে দেখলেই বুঝতে পারবে।”

কায়রা তখন সরু চোখে তাকিয়ে রইলো সিঁড়ির দিকটায়, যেখানে একটু আগেই মিলিয়ে গেছে ছেলেটি। তার মনে অদ্ভুত এক ভাবনা খেলে গেলো। যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে! অনুভূতির ভাষা বুঝে নেয় সময়ের আগেই। দুনিয়া সত্যিই পাল্টাচ্ছে! 

---------------------

প্রিহার ঘরের দরজাটা অতি সন্তর্পণে খুলে ভেতরে পা রাখলো সুহৃদ। ঘরের ভেতরের আলোটা মৃদু নরম।
প্রিহা চিত হয়ে ঘুমাচ্ছিলো বাচ্চাদের মতো। সুহৃদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। প্রিহার ঘুমন্ত মুখটা ডিজনি প্রিন্সেস স্নো হোয়াইটের মতো লাগছে। প্রিহা অত্যাধিক ফর্সা আর চোখের ভিন্ন রঙের মণির জন্য এই নামটা ভীষণ সুট করে ওকে। আর হ্যাঁ, স্নো হোয়াইট'ই তো! সুহৃদের ব্যক্তিগত স্নো হোয়াইট প্রিহা। এসব ভেবে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো মৃদু হাসি এসে ভিড় করলো তার। স্নিগ্ধ, মুগ্ধতার ন্যায় সে হাসি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে প্রিহার মাথার কাছে বসলো। তারপর খুব নরম, প্রায় ফিসফিসিয়ে ডাকলো,
“প্রিহা… প্রিহা! ওঠ।”

প্রথমে কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলো ছেলেটা। 
“প্রিহা… ওঠ!”

দুই-তিনবার ডাকার পর ঘুমের পরতটা একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করলো। প্রিহার চোখের পাতায় কাঁপন, পলক ফেলে ফেলে ধীরে ধীরে সে তাকালো।
সুহৃদকে এত কাছে দেখে এক মুহূর্তে চমকে উঠে বসে পড়লো সে। স্বপ্ন ভেঙে বাস্তবটা হঠাৎ এসে ধাক্কা দিয়েছে তাকে। 

“তুই এখানে?”

প্রিহার কণ্ঠে বিস্ময় আর ঘুম-ভাঙা বিভ্রান্তি। সুহৃদ কিছু না বলে পেছন থেকে লুকানো ফুলের তোড়াটা সামনে এগিয়ে দিলো। আর উচ্ছসিত স্বরে বলল,
“হ্যাপি বার্থডে, মাই স্নো হোয়াইট!”

এক মুহূর্ত থমকে গেলো প্রিহা। তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়লো, আজ তো তার জন্মদিন। প্রিহা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় এগারোটার দিকে ছুঁই ছুঁই। বেশ রাত হয়েছে। তাই চুপচাপ সে ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে পাশে রেখে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। চোখে তখনো ঘুমের আভা লেগে। তবে সুহৃদকে পাত্তা না দিয়ে একটা হাই তুলে প্রিহা জিজ্ঞেস করলো,
“তুই কখন এলি?”

“মাত্রই, এখন রেডি হ তাড়াতাড়ি। মণি তোকে নিতে পাঠিয়েছে।”

"হুম, যাচ্ছি।"

এই বলে প্রিহা আলমারির পাল্লা খুলে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে অবশেষে বের করলো সাদা রঙের একটা প্রিন্সেস গাউন। নরম কাপড়ের গাউনটা বুকের সঙ্গে আলতো চেপে পাশের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ যেন কী মনে পড়লো তার। পদক্ষেপ থেমে গেলো মাঝপথেই। ধীর ভঙ্গিতে গাউনটা সোফার ওপর রেখে আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো সে। পরমুহূর্তেই ঝড়ের মতো এগিয়ে গিয়ে সুহৃদের শার্টের কলার মুঠো করে ধরলো। 

আচমকা আক্রমণে সুহৃদ খানিকটা চমকে উঠলো। হকচকিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাতেই প্রিহা চাপা রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
"সেদিন সিয়ামের সঙ্গে মারামারি করেছিলি কেন? আমি কারণ জিজ্ঞেস করতেই কিছু না বলে চলে গেলি! আমায় ইগনোর করার সাহস তোর হলো কীভাবে?"

রাগে ফুঁসতে থাকা মেয়েটার চোখদুটো তখন ঠিক বর্ষার আগের কালো মেঘের মতো। অথচ সুহৃদ একটুও বিচলিত হলো না। বরং ওর ঠোঁটের কোণে ধীর একটা হাসি ফুটে উঠলো। সে আলতো করে প্রিহার হাত দুটো কলারের ওপরই রেখে মৃদু স্বরে বলল,
"তোকে ইগনোর করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি না, স্নো হোয়াইট। একচুয়ালি, সেদিন ভীষণ রেগে ছিলাম। তাই কিছু বলিনি। মুখ ফসকে রেগে কিছু বললে তুই তো হার্ট হোতি!"

প্রিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর গভীর একটা শ্বাস ফেলে বলল,
"আমার আসল প্রশ্নের উত্তর এখনো দিসনি।"

সুহৃদের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো। মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠলো নিমেষেই। নিচু গলায় বলল,
"সিয়াম তোকে প্রপোজ করার জন্য রোজ নিয়ে আসছিলো। ওর বন্ধুদের চিয়ার আপের মধ্যে তোর নাম শুনলাম… তারপর মাথা ঠিক ছিলো না। তখন রাগে গিয়ে ওকে মেরেছি।"

কথাটা শুনে প্রিহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
"সেসব ঝামেলা আমি নিজেই সামলাতে পারতাম। তুই কেন মারামারি করতে গেলি?"

সুহৃদ এবার একপেশে হেলে হালকা হাসলো। সেই হাসির ভেতর ছিলো তীব্র অধিকার। 
"কেন? কেন গেছি সেটা সত্যিই বুঝিস নি? নাকি বারবার আমার মুখ থেকে শুনতে ভালো লাগে যে আমি তোকে ভালোবাসি?"

কথাটা শুনে কলারে ধরে রাখা প্রিহার আঙুল আলগা হয়ে এলো। ধীরে ধীরে ছেড়ে দিলো সুহৃদের কলার। তারপর নিজের বুকের কাছে দু’হাত ভাঁজ করে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
"ভালোবাসিস, সেটা তো জানি'ই। সাহস থাকলে পাপাকে বলে দেখা!"

সুহৃদ একটুও না থেমে জবাব দিলো,
"অফকোর্স, আই ওইল। কেন বলবো না? তবে এখনই না। আই জাস্ট ওয়ান্ট দ্য টাইমিং টু বি রাইট। আগে আমাদের দু’জনের একটা সুন্দর ক্যারিয়ার তৈরি হোক। তারপর সবার সামনে তোকে চাইবো, প্রাউড'লি।

প্রিহা অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ছেলেটার দিকে। মাঝে মাঝে সত্যিই সুহৃদের আত্মবিশ্বাস তাকে বিস্মিত করে। আবার ভালোও লাগে। শেষমেশ মাথা নেড়ে উদাস ভঙ্গিতে বলল,
"তোর সাহস দেখে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। যাই হোক, আমি এখন রেডি হতে যাচ্ছি। ব্যস, পাঁচ মিনিট ওয়েট কর।"

এরপর আর একটাও শব্দ করলো না সে। সোফা থেকে সাদা গাউনটা তুলে নিয়ে ধীর পায়ে পাশের রুমে চলে গেলো। আর সুহৃদ তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পথে। ঠিক যেমন কেউ নিজের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যটা চোখ ভরে দেখে নিতে চায়, তেমন।

----------------------------

আজ কায়রা পরেছে লাল রঙের লেসের একটা শাড়ি। পুরো কাপড়জুড়ে সূক্ষ্ম লেসের নকশা। পুরো কাপড়টা লেস ডিজাইনের হওয়ায় একটু ট্রান্সপারেন্ট লাগছে। ব্লাউজটাও ম্যাচিং লেসের তৈরি। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কায়রা শাড়ির কুচিগুলো ঠিক করছিলো। ঠিক তখনই সামনে চোখ পড়তেই থমকে গেলো সে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রীষান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাত দিয়ে চুল ব্যাক ব্রাশ করছে। পরনে শুধু ঘরোয়া একটা ট্রাউজার। শুধু শার্টটা বদলেছে। অথচ তাতেই লোকটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। কায়রা বহুবার ভেবেছে, একটা মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে! আজও উত্তর খুঁজে পেলো না। পাবেও না বোধহয়।

মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে প্রীষানের পাশে দাঁড়ালো সে। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে নরম গলায় বলল,
"আপনার কি মনে হয় না, একটু বুড়ো হওয়া উচিত আপনার, প্রিহার পাপা?"

প্রীষান ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে তাকালো। কথাটার মানে বুঝতে না পেরে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলো স্ত্রীর দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
"হঠাৎ আবার একথা কেন? আজ খুব হ্যান্ডসাম লাগছে নাকি আমাকে?"

কায়রা যেন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর মুখ করে বলল,
"খুব না… খুব বেশি। ভয়ংকর বেশি! আপনাকে নিয়ে এইজন্যই সবসময় ইনসিকিউরড থাকতে হয় আমাকে।"

কথাটা শুনে প্রীষান হেসে ফেললো। গভীর, মায়াভরা সেই হাসি। আর কায়রা আবারও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এভাবে প্রীষান প্রতিবার হাসলেই নতুন করে প্রেমে পড়ে যায় সে।

এতক্ষণে প্রীষানের চোখ গিয়ে থামে কায়রার দিকে। মেয়েটা আজ শাড়ি পরেছে। যদিও বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই কায়রা শাড়িতে মজেছে ভীষণ। আর শাড়ি পরলেই কায়রা বদলে যায়। অন্যরকম লাগে ওকে। নরম, স্নিগ্ধ, অদ্ভুত এক গৃহিণীসুলভ আভা এসে জড়িয়ে ধরে কায়রার স্বত্তাকে। প্রীষানের বুকের ভেতর তখন অকারণে একটা শান্ত অনুভূতি দোলা দেয়। এই মেয়েটাকে শাড়িতে দেখলে তার শুধু একটা কথাই মনে হয়, বউ বউ লাগে মেয়েটাকে…হুম, বউ'ই তো। প্রীষানের বউ। একদম তার নিজের, তার সংসারের, তার অস্তিত্বেরর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নারী। তার স্ত্রী। এই মনের কথাগুলি যদি প্রীষান বলতে পারতো, তাহলে হয়তো তার চরিত্রের সাথে কাঠখোট্টা পুরুষ স্বভাবের বদনাম ঘুচতো। প্রীষান কিছুক্ষণ চুপচাপ কায়রার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই প্রশ্ন করলো,
"ইদানীং তোমাকে বেশ শাড়ি পরতে দেখা যাচ্ছে। কারণ কী?"

কায়রা মৃদু হেসে আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
" সত্যি বলতে কী, বড় ভাবীকে দেখেই শাড়ি পরার শখটা হয়েছে। ভাবী এত সুন্দর করে শাড়ি ক্যারি করে দেখলেই মনে হয়, নারীর আসল সৌন্দর্য বুঝি এই পোশাকেই লুকিয়ে আছে। তাই ভাবলাম আমিও পরবো। আমি অবশ্য অতো গুছিয়ে পরতে পারি না…"

শেষ কথাটা বলে একটু থামে সে। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে তার। তবুও বলতে লাগে,
"তবে যেভাবেই পরি, খুব একটা খারাপও লাগে না মনে হয়। আর জানেন… শাড়ি না পরলে কেন যেন বিয়ের ফিলিংস'টাই ঠিক আসে না। এটাও একটা কারণ।"

কথাগুলো শুনে প্রীষানের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে আসে। শাড়ির আঁচলের চেয়েও বেশি মায়া তখন জড়িয়ে থাকে কায়রার সরল-সোজা স্বীকারোক্তিতে। এরপর প্রীষান হঠাৎই কায়রাকে কাছে টেনে তার গালে একহাত রাখলো। কিছুক্ষণ মেয়েটার সাজসজ্জা একদৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করে খুব সন্তপর্ণে একখানা চু'মু খেলো কায়রার গালে, সম্পুর্ন অনুভুতি ঢেলে। তবে আজ কায়রা মোটেও অবাক হলো না। বরং ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। প্রীষান কয়েক সেকেন্ড গড়ালে সরে আসলো। কায়রার দৃষ্টির গভীরে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল,
"এখনকার জেনারেশনের ছেলে-মেয়েদের রোমান্টিসিজম নিয়ে মেইবি বিভিন্ন ফ্যান্টা'সি থাকে। তারপর বিভিন্ন টিপিক্যাল এক্সপ্রেশন তো আছেই। কিন্তু আমি মানুষটা একটু আলাদা, কায়রা। কোনো বিষয়ে রাগ হলে মাথা গরম হওয়া বাদে বাকিসময়ে আমি খুবই ঠান্ডা গোছের লোক এবং একটু বেশিই সংয'ত। তাই প্রেমময় বাক্য আমার মুখ দিয়ে বেরোবে না।"

এসব কথায় কায়রা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে এখন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় প্রীষানের সব কথা শুনতে ব্যস্ত। কারণ, এই লোক খুব বেশি কথা বলে না। কিন্তু যখন বলে, তার কথাগুলো মন দিয়ে শোনার মতো গভীরতা রাখে। তাই কায়রা এখন ভীষন মনোযোগী। চুপটি করে সব শুনছে সে। প্রীষান একটু থেমে কায়রার কপালের সরে যাওয়া টিপ ঠিক করতে করতে স্নিগ্ধ হেসে বলল, 
"এইযে তুমি শাড়ি পরেছো, এটা দেখে মনে হলো একটা চু'মু তো দেওয়াই যায়। এক্ষেত্রে বলতে পারো, স্বত্তার বাইরে গিয়ে নিজের সংযম একটু খোয়ালাম। তাছাড়া, প্রীষান নামক লোকটি অতি ভদ্রলো'ক, তুমি ভালো করেই জানো!"

কায়রা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে অবলীলায় বলে দেয়, 
" হ্যাঁ, জানি তো। আর সেই অতি ভদ্রলোকিপ'না করা লোকটিকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।"

প্রীষান হালকা হেসে মাথা নেড়ে ধীর গলায় বলল,
"সবসময় এভাবে 'ভালোবাসি ভালোবাসি' বলতে নেই, কায়রা। কিছু শব্দ না হয় বিশেষ মুহূর্তের জন্য তুলে রাখো। বারবার বলা হলে এই শব্দটার ভ্যালু কমে যাবে।"

কায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে জোর গলায় বলল,
"কমবে না। আর কোনটা বিশেষ মুহূর্ত নয়, বলুন তো? আপনার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা দিন'ই তো আমার কাছে বিশেষ। প্রতিটা সকাল, প্রতিটা রাত, প্রতিটা মিনিট… সবকিছুই বিশেষ। তাহলে ভালোবাসিটা লুকিয়ে রাখবো ঠিক কোন মুহূর্তের জন্য? তাছাড়া 'ভালোবাসি' শব্দটা'ই বিশেষ। এই শব্দ যেই মুহুর্তে বলা হয়, সেই মুহুর্ত অটোমেটিক বিশেষ হয়ে যায়।"

প্রীষান আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। কিছু অনুভূতির সামনে যুক্তি বড় অসহায় হয়ে যায়। এমনিতেও, কায়রার কথাগুলোও ভুল নয়। প্রীষান কায়রার হাত মুঠোবন্দি করে বলল,
"মেয়েটা তৈরি হলো কি না দেখি, চলো।"

কায়রা মাথা নেড়ে সায় জানালো। আর প্রীষানকে অনুসরণ করে নিচে চলে গেলো। 

-------------------------

প্রিহা আর প্রীতিষা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল হয়ে বসেছিলো। অনেকদিন পর, প্রিহা তার মণিকে পেয়ে বড্ড খুশি। কিছুক্ষণ পর প্রীষানও গিয়ে যোগ দিলো তাদের আড্ডায়। কারণ, কেক আসতে একটু লেট হচ্ছিলো।

আর একটু দূরত্বে, ভিড়ের বাইরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সুহৃদ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো প্রিহার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিলো অপার কোমলতা, যেন মানুষটা চারপাশের সব ভুলে শুধু একজনকেই দেখছে। দৃশ্যটা চোখ এড়ালো না কায়রার। সে ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো সুহৃদের পাশে। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করলো,
"প্রিহাকে ভালো লাগে তোমার? নাকি…ভালোবাসো?"

হঠাৎ প্রশ্নে সুহৃদ খানিকটা চমকে তাকালো। তার মুখভঙ্গি দেখে কায়রা ঠোঁট টেনে হেসে বলল,
"আমি ঘুরিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই আশা করবো, তুমিও সরাসরি আর সত্যিটাই বলবে।

সুহৃদ কিছুক্ষণ প্রিহার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে স্বীকার করলো,
"ইয়েস আন্টি… আই লাভ হার।"

"সেইম এজ তোমরা?"

"না, আন্টি। আমি এক বছরের বড়ো ওর থেকে। বাট, সেইম ক্লাস।"

কথাটা শুনেই কায়রা এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
"যখন প্রিহাকে লাভ করো, তখন আমাকে আন্টি বলছো কেন? কল মি ম'ম!"

সুহৃদ এবার হেসে ফেললো সত্যি সত্যিই।
"ওকে, মম। আপনি কিন্তু ভীষণ সুইট, প্রিহা অবশ্য বলেছিলো। আর আজকেও আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে।"

কায়রা চোখ সরু করে সন্দেহভরা ভঙ্গিতে তাকালো,
"কী ব্যাপার? শাশুড়িকে পটানোর চেষ্টা করছো নাকি?"

সুহৃদের হাসি আরও চওড়া হলো। তখন কায়রা নরম স্বরে মুগ্ধ চোখে বলল,
"পটাতে হবে না। তোমার আচার-ব্যবহার, গুড লুকিং-এ আমি অলরেডি ইমপ্রেসড। তাছাড়া, মানুষের ভদ্রতা অনেক কিছু বলে দেয়।"

"থ্যাংক্স আ লট। যাক, আপনি অন্তত বুঝলেন আমাকে।"

কায়রা মুচকি হেসে বলেই ফেলে,
“ইয়্যু নো হোয়াট, সুহৃদ? তোমাকে আমার মেয়ে-জামাই হিসেবে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। প্রিহার পাপার ব্যাপারটা তো বলতে পারছি না। তবে তুমি নিশ্চিত থাকো, আমার দিক থেকে সবসময় ফুল সাপোর্ট পাবে।”

'মেয়ে-জামাই' শব্দদুটো কানে যেতেই সুহৃদ একটু লজ্জা পেয়ে যায়। সে সলজ্জ অপ্রস্তুত হাসি হেসে মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে নিলো স্বভাবসিদ্ধ ভাবে। মনে মনে ভাবলো, প্রিহার মমের পছন্দ হওয়া মানে ফিফটি পার্সেন্ট এগিয়ে থাকা। পরে শশুরকে নাহয় পটানো যাবে। ছেলেটার আকাশকুসুম ভাবনার মাঝে কায়রা হঠাৎ নিজের ফোনটা ছুঁড়ে দিলো তার দিকে। সুহৃদও নিখুঁত কায়দায় সেটি লুফে নিলো। অবাক হওয়ার আগেই দেখলো কায়রা জন্মদিন উপলক্ষে সাজানো জায়গাটার এক পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সুহৃদ সেদিকে তাকাতেই কায়রা বলল,
“এইবার ঝটপট তোমার প্রি'টি শাশুড়ির কয়েকটা ছবি তোলো দেখি। মেয়েটার বার্থডে উপলক্ষে এত সুন্দর করে সাজলাম, ছবি তুলবো না নাকি? নাও, তোলো তোলো! ছবি সুন্দর হওয়া চাই কিন্তু!”

সুহৃদ ক্যামেরা অন করতে করতে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বেশ গর্ব করে জবাব দিলো,
“অবভিয়াসলি, মম। ছবি তো সুন্দর হতেই হবে।আফটার অল, আই হ্যাভ দ্য মোস্ট গর্জিয়া'স, মোস্ট বিউটিফু'ল অ্যান্ড প্রিটিয়েস্ট মাদার-ইন-ল!”

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:৪৬

 

সেদিন রাতে প্রিহার জন্মদিনে বেশ ভালোই আনন্দ হয়েছে। কায়রা আর বাচ্চাদের হাসি, মজা, হৈ-হুল্লোড়ে প্রীষানের কোনো আপত্তি ছিলো না। বরং, সেও সায় জানিয়েছে সবার আনন্দে। প্রীষানের পরিবার আবার আগের মতো প্রাণ ফিরে পেয়ে উজ্জীবিত হয়েছিলো সেদিন। 

সেই রাতের পর কেটে গেছে প্রায় বারো-তেরোটা দিন।
আজ বৃহস্পতিবার। এখন রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি। আজকের দিনটা কায়রার জন্য ছিলো ভীষণ বিষন্ন! সে আজ কলেজে যায়নি। কায়রা সারাদিন বাড়িতেই ছিলো একা একা। তবে বাড়িতে থাকলেও খুব একটা সঙ্গ পায় নি কারোর। প্রিহা এখন এসএসসির চাপে বইয়ের ভেতর ডুবে আছে। আর প্রীভান তো ছেলেমানুষ! বাইরে বাইরেই থাকে বেশিরভাগ সময়। আর বাড়িতে ফিরলেও গেমে ব্যস্ত হয়ে পরে। বলতে গেলে নিজাম উদ্দীনের সঙ্গে যা একটু কথাবার্তা হয়েছে কায়রার। মানুষটা অমায়িক, কায়রাকে নিজের মেয়ের স্থান দিয়েছেন। আর ভালোবাসাও ততখানি। এটুকুই আজ কায়রার সারাদিনের স্বাভাবিকতা।

এদিকে কায়রা আজ যাকে সবথেকে বেশি মিস করেছে সেই মানুষটা হচ্ছে প্রীষান। অপ্রত্যাশিতভাবে, সেও ছিলো না আজ সারাদিন। প্রীষান কলেজ থেকে সোজা তার খালামনির বাসায় চলে গেছে। তার খালামনি অসুস্থ, তাকে দেখতে যেতেই হয়েছে। কায়রা বিকেলে মেসেজ করলে প্রীষান জানিয়েছে ফিরতে রাত হবে। কায়রা সেই মেসেজে একটা লাইক করে ফোন রেখে দেয়। এরপর আর কোনো রিপ্লাই করা হয় নি। 

এইসব ভাবতে ভাবতে কায়রা বারান্দার রেলিংয়ের পাশে বসে ছিলো চেয়ার নিয়ে। রাতের ঝড়ো হাওয়ায় চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে মুখে এসে পড়ছিলো, কিন্তু সেদিকে খেয়াল ছিলো না তার। চোখের দৃষ্টি দূরে কোথাও, অথচ মনটা যেন স্থির নেই। অতি চঞ্চল।
হঠাৎই, একটা পুরুষালি গলা ভেসে এলো সব নিস্তব্ধতা ভেঙে,
“হ্যালো, ওয়াইফি?”

কায়রা চমকে ঘুরে তাকায়। বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে প্রীষান। প্রীষানকে দেখামাত্র মেয়েটার খরার ন্যায় রুক্ষ মুখজুড়ে অজান্তেই একরাশ স্বস্তি ছুঁয়ে যায়। শুকনো ঠোঁটজোড়ায় এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
সে নরম গলায় জানতে চায়,
“ওহ, আপনি এসেছেন! খালামনি কেমন আছেন? তার কি অবস্থা এখন?”

প্রীষান শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
“এখন মোটামুটি স্টেবল।”

কায়রা মাথা নাড়ায় ধীরে। এইটুকু তথ্যেই তার ভেতরের চিন্তার একটা অংশ থেমে যায়। সে উঠতে যাচ্ছিলো, কিন্তু প্রীষান হাত তুলে থামিয়ে দেয়। বলে,
“উঠতে হবে না। বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে এখানেই আসছি।”

কায়রা আবার বসে পড়ে নিজের স্থানে, তবে একটু অবাক চোখে। বরাবরের মতো জানতে চায়, 
“রাতে খাবেন না আপনি?”

সোফার পাশ থেকে তোয়ালে হাতে নিয়ে প্রীষান বলে, “খেয়ে এসেছি। তোমায় মেসেজ করে জানিয়ে ছিলাম তো।”

যেতে গিয়েও একটু থেমে প্রীষান আবার জিজ্ঞেস করে,
“বাচ্চারা খেয়েছে রাতে?”

“হুম।”

“আর তুমি?”

কায়রা একপলক প্রীষানকে দেখে শান্তভাবে উত্তর দেয়, 
“আমি ওদের সাথেই খেয়েছি।”

এরপর প্রীষান আর কিছু না বলে ওয়াসরুমে চলে যায়। কায়রা পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকে প্রীষানের যাওয়ার পানে। দৃষ্টি স্থির তার। এই লোকটার সবকিছুই পুরুষালী আভিজাত্যপূর্ণ। হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি, চলন-বলন সবকিছুই। কায়রা এগুলোতেই বিমোহিত হয় বারবার। তাই দৃষ্টি আটকে থাকে মানুষটার পানে সবসময়। 

কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে প্রীষান ফিরে আসে বারান্দাতেই। পুরুষালী মুখটা এখনো ভেজা, তোয়ালে হাতে। প্রীষান এসে কায়রার ঠিক পাশেই বসে। বারান্দার বাতাস ছেড়েছে তখন। তোয়ালেটা চেয়ারের কোণে ঝুলিয়ে দিলো প্রীষান। এরপর সামনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“হাউ ওয়া'জ দ্য ডে?”

কায়রা একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে,
“বোরিং! আপনাকে মিস করেছি।”

কায়রা এভাবেই অবলীলায় নিজের মনের কথাগুলো বলে দেয়। কিন্তু প্রীষান কেন জানি পারে না। কি ভেবে যেন প্রীষান একটু এগিয়ে এসে কায়রার কপালের মধ্যিখানে ঠোঁট ছোঁয়ায়। পরপরই প্রীষানের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা যায়। সে পকেট থেকে একটা ডার্ক চকলেট বের করে কায়রার হাতে দেয়। কায়রা তা দেখে চমকে তাকায়। প্রীষান শুধু চোখের ইশারায় খেতে নির্দেশ করে। কায়রা ধীরে ধীরে খোসা ছাড়িয়ে চকলেট খেতে থাকে। তারপর নরম গলায় হাসিমুখে বলে,
“থ্যাংক্স।”

মেয়েটার খাওয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখে হঠাৎ প্রীষান হঠাৎ মজা করে বলে উঠে, 
“আমাকে একবার সাধলেও না? একাই খাচ্ছো? হুহ!”

এসব শুনে কায়রা মুহূর্তেই থমকে যায়। তারপর তড়িঘড়ি করে প্রীষানের সামনে চকলেট এগিয়ে ধরে,
“স্যরি স্যরি! আমিও না! আপনিও নিন, প্লিজ!”

প্রীষান হেসে ফেলে। ধীর গলায় বলে,
“আই ওয়াজ জাস্ট জোকিং। চকলেট খাই না আমি। তুমি'ই খাও।”

এই শুনে কায়রা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। প্রীষান স্যার মজা করছে তার সাথে! এও সম্ভব? কায়রা অবাক হয়ে বলেই ফেলে,
“আপনি আমার সাথে কবে থেকে এমন মজা করা শুরু করলেন? স্ট্রেইঞ্জ!”

প্রীষান হালকা হেসে বলে,
“যবে থেকে তোমার মতো ইডিয়েটকে বিয়ে করেছি।”

এই কথাটার পর কয়েক মিনিট কেটে যায়। তারপর কায়রার মুখে একটা চাপা হাসি ফোটে ওঠে। প্রীষান স্যার বদলেছেন, অনেকটাই। কায়রা নিজেও কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো। রাতটা তখন আগের মতো আর হালকা নেই। একটা অদ্ভুত ঘনত্ব জমে গেছে বারান্দার বাতাসে। হঠাৎ কায়রা একটু নিচু গলায় বলে উঠলো,
“আপনার মাঝে অনেক চেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি, প্রিহার পাপা। ব্যাপারগুলো অবিশ্বাস্য!”

প্রীষান কায়রার দিকে ঘুরে তাকায়, ভ্রু একটু কুঁচকে।
“কেমন চেঞ্জ?”

কায়রা নিজের দু'হাতের আঙুল জড়িয়ে ধরে। তারপর ধীরে ধীরে বলে,
 “এই যে… আপনি আমাকে বকাঝকা করেন না এখন। আগের মতো ট্রিট করেন না। এগুলোই।”

এক মুহূর্ত থেমে যায় প্রীষান। তারপর খুব স্বাভাবিক কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে,
“আমি আমার বউকে যেভাবে ট্রিট করবো, সেভাবে বাকিদের কেন করবো? এটা কি অদ্ভুত কথা বললে! তবে হ্যাঁ, তুমি আবার উল্টোপাল্টা কাজ করলে আমি অবশ্যই বকবো। এখানে ছাড় নেই।”

'বউ' শব্দটা শুনে কায়রার ভেতরে হালকা একটা ঝাঁকুনি লাগে। এই 'বউ' শব্দটাতেই কায়রা গলে গেলো, পুলকিত হলো। বাকিকথা কানে গেলো না ওর। কায়রা অল্প হাসে। ঠোঁট নড়ে শুধু,
“তাও ঠিক।”

তারপর আবার দু’জনেই চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর কথা বাড়াতে কায়রা হঠাৎ বলে ওঠে,
“একটা সিক্রেট বলি আপনাকে?”

প্রীষান এবার একটু আগ্রহ নিয়ে তাকায়।
“হু।”

কায়রা অল্প শ্বাস নেয়। তারপর খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,
“আমি আপনাকে অনেক বছর আগে থেকেই চিনি আসলে..”

কথাটা শুনে প্রীষান একটু অবাক হয়। সামান্য কপাল কুঁচকে যায় তার। প্রীষানের প্রশ্নবোধক চাহনি দেখে কায়রা বলতে শুরু করে,
“ভার্সিটিতে আপনাকে বাস্তবে প্রথম দেখেছি ঠিকই… কিন্তু একচুয়ালি আমি আপনাকে চিনি যখন আমি ক্লাস নাইনে ছিলাম।”

প্রীষান এবার ভ্রু তুলে তাকায়।
“কিভাবে?”

কায়রা একটু লজ্জা মিশ্রিত হাসি দেয়। চোখ নামিয়ে নেয়। স্মৃতিচারণ করে বলে, 
“আপনার ইউটিউব চ্যানেল ছিলো না একটা? কি যেন নাম ছিলো? ওহ হ্যাঁ, ইজি ম্যাথ বাই প্রীষান। ওই ম্যাথ ক্লাসগুলোর ভিডিও দেখতাম আমি। ওগুলো অবশ্য আপনার পুরোনো ক্লাস ছিলো… মেইবি আপনি স্টুডেন্ট থাকাকালীন। বেশ কয়েক বছর আগের।”

এইবার প্রীষান সত্যিই চুপ হয়ে যায়। তার চোখে অবাক হওয়ার ছায়া স্পষ্ট। প্রীষান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
“হুম, তখন স্টুডেন্ট ছিলাম। তো ক্লাসগুলো করে কি উপকৃত হয়েছিলে?”

কায়রা এক মুহূর্তও দেরি না করে কৃতজ্ঞতাভরে বলে,
“ভীষণ! এসএসসিতে আমার ম্যাথে প্লাস পাওয়ার সম্পুর্ন ক্রেডিট আপনার।”

প্রীষান উঠে দাঁড়িয়ে হালকা হেসে বলে,
"হু, এবার আমার ক্লাস করানো সার্থক মনে হচ্ছে। যাইহোক, অনেক কথা হলো। এবার চলো, ঘুমাবো। বড্ড টায়ার্ড লাগছে।"

কায়রা ঝটপট উঠে দাঁড়ায়। ঘরে গিয়ে কায়রা বিছানা গুছিয়ে একপাশে শুতে শুতেই প্রীষান লাইট অফ করে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বিছানায় আসে। আজ আর ড্রিম লাইট জ্বালায় না। তবে ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। জানালা খোলা থাকায় বাইরের মৃদু আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। তাই আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে ঘরের অবয়ব। 

প্রীষান চোখ দুটো বন্ধ করে কায়রার দিকে ফিরে শোয়। তবে কায়রার চোখে ঘুম নেই, চোখদুটো খোলা তার। অন্ধকার ঘরের আবছা আলোতেও প্রীষানকে ফ্যালফ্যাল করে দেখে চলেছে সে। একপর্যায়ে আনমনেই প্রীষানকে জড়িয়ে ধরার উদ্দেশ্যে হাত এগিয়ে প্রীষানের বাহুতে রাখে আলতো করে। তবে সেই ঘনিষ্টতার স্থায়িত্ব হয় না খুব বেশি সময়। মিনিটখানিক পরেই অবচেতন মনে আবার কি ভেবে যেন হাতটা সরিয়ে নেয় কায়রা, পাছে না আবার প্রীষান বিরক্ত হয়। কিন্তু মুহুর্তেই কায়রাকে অবাক করে প্রীষান মেয়েলি কোমরখানা ধরে একটানে নিজের দিকে টেনে নিলো। নিমেষেই ইঞ্চিসম দূরত্বও কমে যায় দুজনার মাঝে। যেটুকু ফাঁকা ছিলো, সেটুকুও আর রইলো না। কায়রার চোখ বড় বড় হয়ে যায়, অপরদিকে হাতটা আনমনেই প্রীষানকে জড়িয়ে ধরে। প্রীষান এবার চোখ খোলে। কায়রার গালে হাত রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
"তুমি আমাকে দ্বিধা ছাড়াই জড়িয়ে ধরবে, কারণ আমি তোমার স্বামী। আমি তোমাকে দ্বিধা ছাড়াই কাছে টানবো, কারণ তুমি আমার বউ। ইজ ইট ক্লিয়ার?"

কায়রা মাথা নেড়ে বলে,
"ক্লিয়ার।"

এবার কায়রা সাহস পেয়ে মাথা উঁচু করে টুস করে একখানা চু'মু খেলো প্রীষানের খসখসে গালে। প্রীষানও কিছু বলল না। বলবেই বা কেন? প্রীষান নিজেও তো ব্যস্ত হচ্ছে কায়রাতে। দখল করে নিচ্ছে কায়রার সমস্ত সত্ত্বাকে। এই ভালোবাসা-বাসিতে  আছে নিগুঢ় অব্যক্ত অনুভূতি। প্রীষানের সঙ্গে থাকতে থাকতে কায়রা একটা অদ্ভুত সুন্দর বিষয় আবিষ্কার করেছে। সেটা হলো, এই মানুষটার ভালোবাসা প্রকাশের ধরন, আদর করার ভঙ্গিমা ভীষণ সহজ, ভীষণ স্বাভাবিক। কোনো নাটকীয়তা নেই, বাড়াবাড়ি রোমান্টিকতার ছাপ নেই। তার স্পর্শে, যত্নে, ছোট ছোট আচরণে এমন এক আপন অভ্যস্ততা মিশে থাকে, যেন তারা আজকের নয়, বহু বছরের একসাথে পথচলা কোনো পুরোনো দম্পতি। 

এইযে, এখন কায়রাকে কাছে টানার সময়ও প্রীষানের চোখেমুখে লেশমাত্র দ্বিধা নেই। প্রীষানের এই দ্বিধা শুধু ঘনিষ্ট হওয়ার প্রথম দিনই ছিলো। সেদিন অবশ্য কায়রা'ই এগিয়ে গিয়েছিলো। অথচ আজ প্রীষান কায়রাকে সানন্দে গ্রহন করছে, অনুভূতির সাথে।

এখন প্রীষানের সমগ্র অবয়ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক স্থির, পুরুষালী গাম্ভীর্য। অনুভূতির গভীরতাকে সে নীরব সৌন্দর্যে ধারণ করে রাখতে জানে। কায়রা নিশ্চুপ হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো মুগ্ধ, আনমনা হয়ে। একপর্যায়ে প্রীষানের ঠোঁট কায়রার গলার ভাজ ছুঁতেই মেয়েটা হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। এরপর কায়রা ধীরে ধীরে দু’হাত তুলে আঁকড়ে ধরলো প্রীষানের গলা। প্রীষানের বার বার মানা করা সত্ত্বেও কায়রা আবারও বেহায়ার মতো মনের কথা বলে ফেললো,
"এইযে শুনেন, আই লাভ ইয়্যু।"

-----------------------------

পরদিন একটা মনোমুগ্ধকর বিকেল। আকাশে হালকা সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা ঘাসের গন্ধ। সময় কাটাতে কায়েশী খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বাড়ির সামনের বাগানে হাঁটাহাঁটি করছিলো। সাত মাসের গর্ভে তার শরীর এখন ভারী। শরীরটা বেশ গোলুমোলু হয়েছে কায়েশীর। তবু মুখজুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এবার মাতৃত্ব উপভোগ করছে সে, যেটা আগের বার অবহেলা করেছিলো।

কায়েশীর পেছনে ছিলো কায়ান। কায়ান ফুল গাছে কিছু ফড়িং উড়ে-বেড়াতে দেখতে পায়। তা দেখে আগ্রহী হয়ে সেখান থেকে একটা ফড়িং-এর ডানা দুই আঙুলে চেপে ধরে। ধরতে পেরে মুহূর্তেই তার মুখে উচ্ছ্বাসের ঝিলিক ফোটে। তারপর উচ্ছ্বসিত হয়ে তা দেখাতে কায়েশীর কাছে এসে বলে,
"মা মা! দেখো! ফড়িং ধরেছি।"

কায়েশী পিছু ফিরে তাকায়। ইদানীং কায়ান স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে, উচ্চারণে শিশুসুলভ মাধুর্য আসছে। সামনের বছর কায়েশী ভেবেছে ছেলেটাকে স্কুলে দেবে। এদিকে কায়ানের হাতে ফড়িং দেখে কায়েশী নরম গলায় বলে,
"ফড়িং ধরতে হয় না, বাবা। ছেড়ে দাও।"

কায়ান রাজি হয় না। সে মুখ ফুলিয়ে একটু জেদ ধরে বলে,
"না, ছাড়বো না। একটু রাখি না!"

কায়েশী এবার শান্তভাবে বোঝায় ছেলেকে,
"যদি তোমাকে কেউ এভাবে ধরে রাখতো তাহলে তোমার কেমন লাগতো, কায়ান? কষ্ট পেতে না তুমি? ওরও তো কষ্ট হচ্ছে। ছেড়ে দাও।"

কায়ান মায়ের কথা বুঝলো এবার। তাই সত্যি ছেড়ে দিলো ফড়িংটাকে। ফড়িংটা এক ঝটকায় ছাড়া পেয়ে আকাশে হারিয়ে গেলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেটার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। তাই মন খারাপ করে মাথা নিচু করে রইলো। কায়েশী তা বুঝে ছেলের গায়ে হাত রেখে বলল,
"এ কি কান্ড? মন খারাপ হলো বুঝি?"

কায়ান ধরা গলায় বলল,
"তুমি আমাকে কারো সাথেই খেলতে দাও না। সেদিন চড়ুই পাখিটাকেও ছেড়ে দিলে। আজকে ফড়িংকে তাড়িয়ে দিলে। এখন আমি কার সাথে খেলবো?"

কায়েশী ভাবলো, আসলেই ছেলেটার খেলার মানুষ নেই। আশেপাশে থাকা কায়ানের সমবয়সী কেউ নেই বিধায় কায়ানের কোনো বন্ধু নেই। কায়ানের দুনিয়া তার বাবা-মা, ফুফু-চাচ্চুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কায়েশী এবার কায়ানের সামনে সাবধানে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, 
"তোমার সাথে খেলার জন্য একজন আসছে। আর কিছুদিন পর থেকেই তার সাথে খেলতে পারবে তুমি।"

কায়ান কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, 
"কে আসছে?"

কায়েশী আলতো হেসে বলে, 
"তোমার ভাই অথবা বোন।"

কায়ান আবারও আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করে, 
"কবে আসবে আমার ভাই?"

কায়ানের মুখে হুট করে 'ভাই' শুনে একটু অবাক হলো কায়েশী। কায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে গালে চুমু দিয়ে কায়েশী বলল,
"শিগ্রই!"

কায়ান আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ যায় বাড়ির গেইটের দিকে। কায়রাভকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে কায়ান 'বাবা' বলে দৌড়ে যায়। কায়রাভ হেসে ছেলেকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নেয়।কায়েশী সেদিকে তাকিয়ে রয়। কায়রাভ কায়েশীকে বাগানে দেখে সেখানে এগিয়ে যায়। এরপর জিজ্ঞেস করে, 
"এখানে কি করছো? খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?"

"জ্বি, খেয়েছি। একটু হাঁটছিলাম।"

কায়রাভ কায়েশীকে দোলনায় বসতে ইশারা করলে কায়েশী সেখানে গিয়ে বসে। ততক্ষণে কায়ান তার বাবার কোল থেকে নেমে আবার ফড়িং খুঁজতে বেরিয়েছে। কায়রাভ একবার কায়েশীর কপালে চুমু দিয়ে এরপর উঁচু হওয়া পেটেও চুমু খেলো। কায়েশী এবার আনমনেই জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা, আপনি বাচ্চার নাম ঠিক করেছেন?"

"হুম।"

"কি নাম ভেবেছেন?"

"কৌশিক। ভালো হয়েছে না?"

কায়েশী একটু বিরক্ত হলো যেন। বলল,
"আপনারা ধরেই নিয়েছেন ছেলে হবে! এত নিশ্চিত কিভাবে? আজ কায়ানও বলল, ভাই কবে আসবে? সেদিন কাবিরও বলে গেছে ছোট আব্বা আসছে। মানে আশ্চর্য সব!"

কায়রাভ মৃদু হেসে বলল,
"শোনো, মেয়ে হলে আমার থেকে বেশি খুশি কেউ হবে না। কিন্তু....."

কায়রাভ পুরো কথা সম্পুর্ন করার আগেই কায়েশী  পেট চেপে ধরে আচমকাই আর্তনাদ করে বসে। মেয়েটা চোখ-মুখ খিচে আছে। এমতাবস্থায়, কায়রাভ ভড়কে যায়, আঁতকে উঠে। হুরমুর করে কায়েশীকে আগলে ধরে জিজ্ঞেস করে, 
"কায়েশী! কি হলো? ব্যাথা করছে?"

কিছুক্ষণ পর কায়েশী নিঃশ্বাস সামলে নেয়। চোখে জল জমে থাকলেও মুখে অদ্ভুত হাসি ফোঁটে। আবার একটু রাগও হয়। কায়েশী এবার একটু ধাতস্থ হয়ে বলে, 
"লাথি দিচ্ছে বজ্জাত'টা! এত জোরে জোরে মাঝে মাঝেই লাথি দেয়!"

কায়রাভের আতঙ্কিত মুখ এবার স্থির হলো। স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে। মৃদু হেসে বলল,
"এইজন্যই বলি এটা ছেলে। কারণ, আমার মেয়ে কখনোই এত দস্যি হবে না। ছোট ছেলেটা ভীষণ দস্যি হবে, বুঝতে পারছি।"

কায়েশী ছলছল চোখে বলে,
"কায়ান এত দস্যি ছিলো না। এই ছেলে তো ভালো করে কিছু খেতেও দেয় না আমাকে। কায়ানের বেলায় অন্তত আমি খেতে পারতাম।"

কায়রাভ সব অভিযোগ শুনলো। এরপর স্ত্রীর উঁচু হওয়া পেটে হাত বুলিয়ে বলল,
"এই যে, ছোট আব্বা! মা-কে আর কষ্ট দিয়েন না, ঠিক আছে? মা কষ্ট পেলে বাবারও যে কষ্ট হয়। একটু শান্ত হোন আপনি, ধীর-স্থির হোন। বাবা ভালোবাসে আপনাকে।"

--------------------------

পরদিন দুপুর প্রায় দেড়টার দিকে প্রীতিষাকে ভার্সিটি থেকে আনতে গিয়েছিলো কাবির। ক্যাম্পাসের গেইটের ঠিক পাশেই বাইকটা স্ট্যান্ড করে সে অপেক্ষা করছিলো। আজ প্রীতিষার সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট বেরিয়েছে। সকাল থেকেই মেয়েটার উৎকণ্ঠে ভারী দুশ্চিন্তা লেগে ছিলো। তাও কাবির বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়েছে। যে সব ভালোই হবে, চিন্তা না করতে। 

কাবির বাইকে বসে কখনো মোবাইল স্ক্রল করছিলো, কখনো অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে গেইটের দিকে তাকাচ্ছিলো। হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান থেকে প্রীতিষাকে বেরিয়ে আসতে দেখে কাবির বাইক ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বড্ড অবাক হতে হয় তাকে। প্রীতিষা প্রায় দৌড়ে এসে কাবিরকে জড়িয়ে ধরলো। এভাবে হুট করে জড়িয়ে ধরায় কাবির দু-পা পিছিয়ে খানিকটা টাল সামলে মেয়েটাকে আগলে নিলো। ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
"আরে আস্তে, ভাই! এখন কও, কি অবস্থা? রেজাল্ট ভালো হইছে তো?"

প্রীতিষা এবার তাকে ছেড়ে দিলো। কাবির দেখলো, চোখমুখ উচ্ছ্বাসে ঝলমল করছে মেয়েটার। নিঃশ্বাস সামলে প্রায় চিৎকার করেই প্রীতিষা বলল,
"ভালো কি বলছো! আমি তো টপ করে ফেলেছি, কাবির! মেরিট লিস্টে নিজের নাম প্রথমে দেখে আমার তো মাথাই ঘুরে যাচ্ছিলো! একটুর জন্য জ্ঞান হারাই নি!"

"বাহ! বউ তো আমার নাম উজ্জ্বল কইরা দিলো।"

বউয়ের আনন্দ দেখে কাবিরের মুখেও অনায়াসে হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসিতে ছিলো গর্ব, স্বস্তি আর একরাশ তৃপ্তি। ঠিক তখনই পাশে থাকা দুটো ছেলে হাঁটতে হাঁটতে ফ্যালফ্যাল করে প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে ছিলো। বিষয়টা চোখ এড়ালো না কাবিরের। সে সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় ছেলেদুটোর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
"সামনে তাকায় হাঁট! ভটকা ভটকা চোখ কইরা কি দেখতাছোস? চোখ নামা, ফাউ'ল!"

প্রীতিষা কাবিরের হাত ধরে থামিয়ে দেয়। এদিকে এলাকায় মেসে থাকার সুবাদে ছেলেদুটো কাবিরকে চিনতো ভালো করেই। তাই ধমক খেয়ে মুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। আসলে তাদের বিস্ময়ের কারণ ছিলো অন্য। শান্ত, ভদ্র, পড়ুয়া মেয়েটা এমন দাপুটে-গুন্ডা ছেলের স্ত্রী! ব্যাপারটা এখনও অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে। তাদেরই বা কি করার! অগত্যা চলে যায় তারা।

এদিকে কাবির আবার ভ্রু কুঁচকে বউয়ের দিকে তাকালো। তারপর মৃদু সন্দেহের সুরে বলল,
"পরীক্ষার সময় তো কইলা কিছুই পারো না, এই সাবজেক্ট খারাপ, ওইটা খারাপ, হ্যানত্যান! আর এখন কইতাছো টপ করছো? ভালো ছাত্রীরা আসলেই অনেক ভাব মা'রে! বুজলাম।"

প্রীতিষা হেসে ফেললো। সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র অহংকার নেই, বরং শিশুসুলভ আনন্দ। বলল,
"না গো, সত্যি বলছি। আমি নিজেও ভাবিনি। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে আনএক্সপেক্টেড লাগছে এখনও।"

কাবির আর কিছু না বলে তার হাতটা ধরে আলতো টানে বাইকের পেছনে বসিয়ে দিলো। তারপর নিজেও উঠে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
"আজকে বাসায় কোনো রান্নাবান্না নাই। বাইরে খামু। এখন কও, কি ট্রিট দিবা?"

প্রীতিষা এক সেকেন্ডও না ভেবে ঝটপট বলে উঠলো,
"কাচ্চিতে চলো, বিরিয়ানি খাওয়াবো!"

কাবির হেসে মাথা নাড়লো। তারপর বাইকের চাবি ঘুরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার ভাইরে জানাইছো রেজাল্টের কথা?"

"হুম। ভাইয়া তো কলেজেই ছিলো। দেখা হয়েছে, তখনই বলেছি। ভাইয়াও অনেক খুশি হয়েছে।"

কাবির ধীরেসুস্থে হাসলো। খুব গভীর, মানসিক প্রশান্তির এক হাসি। প্রীতিষার এই সাফল্য শুধু মেয়েটার একার নয়, তারও। কারণ, প্রীষান একবার বলেছিলো বিয়ের পর তার বোনের পড়াশোনায় ঘাটতি আসবে। কিন্তু কাবির বড়মুখ করে বলেছিলো সেদিন, কিছুই পরিবর্তন হবে না, শুধু প্রীতিষার নামটা বিবাহিত নারীর তালিকায় উঠবে। কাবির তার কথা রেখেছে, এই বিয়ে প্রীতিষার পড়াশোনায় কখনোই বাঁধা হয়নি। হবেও না। 

--------------------------------

দেখতে দেখতে আরও একটি মাস গড়িয়ে গেলো। সময় যেন সংসারের উঠোন পেরিয়ে নীরব পায়ে হেঁটে চলে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। শুক্রবারের সকালটা তাই আজ একটু অলস, একটু ধীর। বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে ছুটির দিনের নরম আভা।

আজ সবার আগে ঘুম ভাঙে কায়রার। প্রীষানের ছুটির দিন বলে তাকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে হলো না। নিঃশব্দে উঠে গোসল সেরে রান্নাঘরে চলে যায় সে। চায়ের কেটলি চড়ায় গ্যাসে, পাশে কফি মেকারেও কফি ঢেলে দেয় যত্ন করে। সকালের নরম আলো এসে পড়েছে রান্নাঘরের জানালায়। বাতাসে ভাসছে চা-পাতার মিষ্টি গন্ধ।

ড্রয়িংরুমে তখন নিজাম উদ্দীন চশমা নাকের ডগায় বসিয়ে বই পড়ছিলেন। কায়রা ট্রেতে করে বিস্কুটসহ এক কাপ চা এগিয়ে দিলে তিনি মৃদু হেসে তাকালেন। দু’একটা টুকটাক কথাবার্তা সেরে কায়রা হাতে কফির মগ নিয়ে চলে যায় প্রিহার ঘরের দিকে।

প্রতিদিনের মতো আজও সকাল সকাল পড়তে বসেছে মেয়েটা। তবে বিছানার একপাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে প্রীভান। এক পলক তাকিয়ে ছেলেটার ঘুমন্ত মুখ দেখে নেয় কায়রা। তারপর তৃপ্তিতে, স্বস্তিতে হাসে। এই-কমাসে প্রীষান স্যারের ছানাপোনাদের প্রতি অদ্ভুত মায়া জন্মে গেছে তার। হয়তো বয়সে কায়রা খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু সম্পর্কের খাতিরে বাচ্চাদের আগলে আগলে রাখতে শিখেছে সে। ভালোবাসতে শিখেছে ওদের। কায়রার ভালোবাসায় বাচ্চারাও ওকে আপন করে নিয়েছে। 

ভাবতে ভাবতে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে প্রিহার সামনে কফির মগটা বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কখন উঠেছো? সেই থেকে দেখছি পড়ছো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তোমাদের রুমে আমি একবার উঁকি দিয়েছিলাম।"

প্রিহা কফিটা হাতে নিয়ে হালকা হাসলো,
"খুব ভোরে উঠি নি আজ। এইতো, সাড়ে ছ-টার দিকে উঠেছি। তারপরই, ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসেছি।"

কায়রা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বলল,
"এখন তো ন-টা বাজে! টানা এতক্ষণ পড়ছো? একটু ব্রেক নাও, তারপর আবার পড়ো। মাইন্ডকে রিলাক্স দাও একটু।"

প্রিহা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লো। বই বন্ধ করে চেয়ারটা ঘুরিয়ে কায়রার দিকে মুখ করলো। এরপর বিনয়ীভাবে বলল,
"মম, তুমিও বসো।"

কায়রা বিছানার কোণায় গিয়ে বসলো পা তুলে। কফিতে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল,
"সেদিনের বার্গার'টা কোথা থেকে এনেছিলে? মনে হয় ভালো ছিলো না। ওটা খেয়ে আমার ফুড পয়জনিং হয়ে গেছিলো। বমি করেছি দু-বার।"

প্রিহা ভ্রু কুঁচকে বলে, 
"কই? আমি আর প্রীভানও তো খেলাম। ভালোই তো লাগলো খেতে।"

"কি জানি? হয়তো খাবারটা সয় নি আমার পেটে। এমনিতে আমি এসব ফাস্টফুড আইটেম প্রচুর খাই। আচ্ছা যাইহোক, তোমাদের এক্সাম শুরু কবে থেকে?"

" নেক্সট উইক।"

" ওহ! তাহলে তো খুব বেশিদিন নেই।"

" হুম।"

মেয়েটার গলায় চাপা দুশ্চিন্তার রেখা টের পেয়ে কায়রা নরম স্বরে বলল,
"বোর্ড এক্সাম বলে টেনশন হচ্ছে?"

প্রিহা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। কায়রা মৃদু হেসে বলল,
"তুমি এমনিতেই অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। সত্যি বলতে, এসএসসিতে এত পড়ার দরকার নেই। ঢাকা বোর্ডের প্রশ্ন একদম ইজি হয়। অযথা টেনশন করো না। আমার তো মনে হয় তুমি প্লাসের সাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পাবে, দেখে নিও।"

কথাগুলো শুনে প্রিহার মুখে একটু সাহসের আভা ফুটে উঠে। প্রিপারেশন যতই ভালো থাক, তবুও একটু ভয় পাচ্ছিলো সে। কিন্তু কায়রার কথাগুলো বড্ড ভরসা যোগালো ওকে। অনেকটাই মনোবল পেলো সে। প্রিহা কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল,
"আমি তো তাও অত পড়াশোনা করিই না। দিনে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ ঘণ্টা, রাতে দু-এক ঘন্টার মতো। তুমি জানো মম, সুহৃদ তো সারাদিনই পড়ে! এজন্যই ও ক্লাসের টপার।"

কায়রা দুষ্টুমি ভরা চোখে হেসে বলল,
"সেটা ওর গোল চশমা দেখেই আমি বুঝে গেছি। মেয়ে- জামাই আমার সেরা! আবার চশমা পরেও ছেলেটাকে এত্ত কিউট লাগে কীভাবে বলো তো?"

মুহূর্তেই লজ্জায় লাল-নীল হয়ে গেলো প্রিহা। চুপচাপ কানের পাশে চুল গুঁজতে লাগলো মৃদু লাজুকতায়। সেটা দেখে কায়রা আবারও হেসে উঠলো। বলল,
"আরে! লজ্জা পাচ্ছো নাকি?"

প্রিহা দ্রুত মাথা নাড়লো, যদিও তার কানদুটো তখনও টুকটুক করে লাল হচ্ছে। পরক্ষণেই সতর্ক গলায় বলল,
"শোনো মম, এসব আবার পাপাকে বলতে যেও না যেন!"

কায়রা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"ধুর! পাগল পেয়েছো আমায়? এসব আমাদের মা-মেয়ের সিক্রে'ট কথা। এখানে পাপা আসলো কোথা থেকে! হুহ?"

কথাটা শুনে অবশেষে নিশ্চিন্ত হলো প্রিহা। সুহৃদের কথা ভেবে ঠোঁটের কোণে অহেতুক লাজুক হাসি ফুটে উঠলো তার। আর সকালের জানালা বেয়ে আসা কোমল রোদে মা-মেয়ের সেই গোপন আলাপটুকু আরও আপন, আরও মায়াময় হয়ে রইলো। কেউ জানতেও পারলো না। 

মেয়ের সঙ্গে এভাবেই কিছুক্ষণ গল্পে মগ্ন ছিলো কায়রা। ঠিক তখনই হঠাৎ ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন তা ভেঙে দেয়। ফোন স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তার বড় ভাইজানের নাম। পরশুই তো দেখা করে এলো ভাই-ভাবীর সাথে। সব ঠিক আছে তো? বুকের ভেতর কেমন অজানা শঙ্কা নিয়ে তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করতেই ওপাশের কথাগুলো শুনে তার মুখের রঙ বদলে যায়। ফোনটা কেটে দিয়েই কায়রা হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। কণ্ঠে ব্যস্ততা আর উৎকণ্ঠা মিশিয়ে বলল,
"প্রিহা, আমাকে এখনই যেতে হবে। আমার ভাবির ডেলিভারি হবে। ভাইজান হসপিটালে একা আছে, সব সামলাতে পারবে না। রান্নাঘরের তাকে সব খাবার রাখা আছে, একটু কষ্ট করে তোমার পাপাকে বেড়ে দিও। আর বাবাও কিন্তু এখনো খায়নি।"

প্রিহা কায়রার অস্থিরতা বুঝতে পেরে শান্ত স্বরে তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
"কোনো সমস্যা নেই, মম। তুমি নিশ্চিন্তে যাও। এদিকটা আমি সামলে নেবো। আর সাবধানে যেও।"

মেয়ের পরিণত কথায় ক্ষণিকের জন্য নরম হয়ে আসে কায়রার মুখ। সে আদরে প্রিহার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। বেরোনোর পথে চোখে পড়ে প্রীষানকে। ওয়াশ বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছিলো সে। কায়রাকে এমন তাড়াহুড়োয় যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকে সে জিজ্ঞেস করলো,
"কোথায় যাচ্ছো?"

কায়রা থেমে সংক্ষেপে বলল,
"হসপিটালে। ভাবির ডেলিভারি হবে। ভাইজান একা আছে ওখানে।"

প্রীষান এক মুহূর্তও দেরি করলো না কথা বাড়িয়ে। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে গাড়ির চাবিটা বের করে কায়রার হাতে দিলো। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
"বাড়ির গাড়িটা নিয়ে যাও। আমি আসবো কি?"

কায়রা চাবিটা নিয়ে মাথা নাড়লো,
"না, আপনার আসতে হবে না। আপনি বাড়িতেই থাকুন।"

প্রীষান আর কিছু বলল না। শুধু স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পানে। আর কায়রা বুকভরা দুশ্চিন্তা নিয়ে দ্রুত পা বাড়ালো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।

-------------------

হসপিটালের করিডোরজুড়ে তীব্র ঔষধের গন্ধ। সাদা দেয়াল, ব্যস্ত নার্সদের ছোটাছুটি আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা রোগীদের স্বজনদের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ। যার ফলে, পুরো পরিবেশটাই কেমন ভারী হয়ে আছে। দ্রুত পায়ে হসপিটালের করিডোর পেরিয়ে যায় কায়রা। দূর থেকেই দেখতে পায় তার বড় ভাইজান অপারেশন থিয়েটারের সামনে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। কায়রাকে দেখেই যেন খানিকটা ভরসা ফিরে পেলো কায়রাভ। এগিয়ে এসে বলল,
"এসে গেছিস? ডাক্তার বলছে হয়তো আর একটু সময় লাগবে।"

কায়রা ধীর স্বরে বলল,
" ভাবি ঠিক আছে তো?"

" হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ। তবে খুব পেইন উঠেছে।"

ভাইজানের কণ্ঠে লুকানো ভয়টা স্পষ্ট বুঝতে পারলো কায়রা। সাধারণত মানুষটা বেশ দৃঢ়চেতা, কিন্তু আজ তার চোখেমুখে অসহায়তা জমে আছে। নিজের প্রিয় মানুষটাকে কষ্টে দেখলে শক্ত পুরুষেরাও কেমন ভেঙে পড়ে! কায়রা আজ তা বুঝলো। কায়রা নরম স্বরে বলল,
"চিন্তা করো না। আল্লাহ ভরসা, সব ঠিক হয়ে যাবে।"

এরপর কায়রাভ কাবিরকে ফোন করে বলে দেয় কায়ানকে তাদের বাসায় নিয়ে যেতে। বাচ্চাটা একা রয়েছে। যখন কায়রাভ কায়েশীকে হসপিটালে নিয়ে আসছিলো তখন ঘুমিয়ে ছিলো বাচ্চাটা। বাসায় এখন ফাতেমা খালা ছাড়া কেউ নেই। তাও নিশ্চিত কাঁদবে কায়ান। তাই কাবিরকে কায়ানের ব্যাপারে জানিয়ে দেয় কায়রাভ।

এরপর কায়রা আর কায়রাভ পাশাপাশি বসে পড়ে করিডোরের ধাতব বেঞ্চে। সময় আজ কেমন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছিলো। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার টিকটিক শব্দও কেমন অস্থির লাগছিল শুনতে। একসময় অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে একজন নার্স বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনই উঠে দাঁড়ালো। কায়রাভ ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"আমার বউ কেমন আছে?"

নার্সের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো বউ পাগল পুরুষ দেখে, তাও নাকি সে তাদের শহরের এমপি। এমন পুরুষ জীবনে কমই দেখেছে যারা বাচ্চা নয় আগে বাচ্চার মায়ের ব্যাপারে জানতে চায়। নার্স স্বভাবসুলভ ভাবে বলল,
"কনগ্র্যাচুলেশনস। আপনাদের ছেলে হয়েছে। মা আর বাচ্চা দু’জনই সুস্থ আছেন। একটু পর বাচ্চার মা-কে কেবিনে দেওয়া হবে।"

অন্য একজন নার্স এবার কোলে করে ছোট্ট শিশুটাকে নরম সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে বাইরে নিয়ে এলো। এতটুকুন একটা প্রাণ! গোলাপি মুখ, বন্ধ চোখ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঙুলগুলো কাঁপছে হালকা। পৃথিবীতে আসার পরও যেন এখনো মায়ের উষ্ণতা খুঁজে ফিরছে সে। নার্স মৃদু হেসে বলল,
"এইযে বেবি, নিন। ওজন একটু কম, যেহেতু প্রিম্যাচিউর বেবি। তাছাড়া কোনো জটিলতা নেই।"

কায়রাভ একমুহূর্তে থমকে যায়। এতক্ষণকার উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা সবকিছু মিলেমিশে তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আবেগের ছাপ ফুটে উঠলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো সে। কিন্তু শিশুটাকে কোলে নেওয়ার আগে হাত দুটো কেমন কেঁপে উঠলো তার। সেই প্রথমবারের মতো, কায়ানের সময়ও এমন অনুভুতি হচ্ছিলো। এখনো ভয় হচ্ছে, এতটুকুন কোমল প্রাণটাকে ঠিকভাবে ধরতে পারবে তো?

নার্স আলতো করে শিশুটাকে কায়রাভের বুকে তুলে দিতেই মানুষটা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেলো যেন।
ছোট্ট বাচ্চাটা বাবার বুকের কাছে আসতেই অল্প নড়েচড়ে উঠলো। আর সেই মুহুর্তেই কায়রাভের চোখ ভিজে এলো। পুরুষ মানুষ খুব সহজে কাঁদে না। কিন্তু জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেখানে ভাষা হার মেনে যায়। এটা তেমনই এক মুহূর্ত। সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো নিজের সন্তানের মুখের দিকে। ঠোঁট কাঁপছে সামান্য। তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বাচ্চার কানে আযান দিলো।

কায়রা একপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলো। তার বুকের ভেতরটাও কেমন হু হু করে উঠলো। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি বোধহয় এটাই। একজন পুরুষের বাবা হয়ে ওঠা। শিশুটার ক্ষুদ্র হাতটা অজান্তেই বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরলো। আর কায়রাভ সঙ্গে সঙ্গে শিশুটাকে বুকের সঙ্গে আলতো করে জড়িয়ে নিলো। বাচ্চাটাকে দু'হাতে বেশ সন্তপর্ণে কোলে নিয়েছে কায়রাভ। এবার কায়রাভের মুখজুড়ে প্রশান্তি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বুকের ওপর থেকে চিন্তার বিশাল পাথর নেমে গেছে। কায়রা পাশ থেকে মৃদু হেসে বলল,
"মাশাআল্লাহ… আবার আমি ফুফু হয়ে গেলাম তাহলে!"

কায়রাভ আবেগে হেসে ফেললো। বহুক্ষণ পর তার মুখে এমন স্বস্তির হাসি ফুটলো। এরপর কায়রাভ কায়রার কোলে বাচ্চাকে দিয়ে বলল,
"এই তুই কোলে নে তো! হাত কাঁপে আমার।"

কায়রা আলতো হেসে চট করেই কোলে তুলে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয় বাচ্চাকে। এরপর কোথা থেকে যেন কাবিরও এসে পড়েছে। কাবির এসেই বাচ্চাকে দেখে ভীষন খুশি হলো। কায়রাভ এবার জিজ্ঞেস করলো, 
"কায়ানকে কোথায় রেখে এলি?"

"প্রীতির কাছে আছে। প্রীতি খাবার খাওয়ায় দিছে ওরে। চিন্তা কইরো না।"

কায়রাভ নিশ্চিন্ত হলো। এবার সে ফোন বাজলে কল এটেন্ড করতে একটু সরে গেলো। তখনও কায়রার কোলেই ছিলো বাচ্চাটা। হঠাৎ করেই কায়রা শুন্য অনুভব করে। চোখে অন্ধকার দেখছে। তাই দ্রুত কাবিরকে বলে,
"ভাইজান, বেবিকে কোলে নাও তুমি। তারাতাড়ি!"

কাবির সামান্য বিস্মিত হলেও স্বাভাবিকভাবেই কোলে তুলে নেয় বাচ্চাকে। কায়রা পাশের ধাতব বেঞ্চে ধপ করে বসে পরে মাথায় হাত রেখে। এবার মাথাটা ঘুরছে তার। বেঞ্চে বসেও ধাতস্থ করতে পারছে না নিজেকে। কাবির চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, 
"এই কি হইছে তোর? শরীর খারাপ লাগতাছে?"

কায়রা আর প্রতিউত্তর করতে পারে না। যেন হঠাৎ করেই শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলো। আচমকাই সম্পুর্ন জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে যায় সে। সদ্যজাত শিশু কোলে থাকায় কাবিরও কিছু করতে পারে না। হাত বাড়িয়ে কায়রাকে ধরার সুযোগও পেলো না সে। তাই তৎক্ষনাৎ চিৎকার করে কায়রাভকে ডাকে কাবির। চিৎকার শুনে করিডোর হতে কায়রাভ ছুটে এসে বোনকে অচেতন হয়ে পড়ে থাকতে দেখে আঁতকে উঠে। এরপর বোনকে কোলে তুলে নার্সদের ডাকে। নার্সরা আসলে কায়রাকে স্ট্রেচারে তুলে নেওয়া হলো কেবিনের দিকে।

কাবির আর কায়রাভ দুজনেই স্তম্ভিত, বিস্মিত। পরপরই, কাবিরের কোল থেকে বাচ্চাকে নিয়ে যায় একজন নার্স। তারা বাচ্চাকে অবজারভেশনে রাখবে আপাতত। এরপর কায়রাভ কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
"কাবির, এক কাজ কর। প্রীষান ভাইয়াকে ফোন করে এখানে আসতে বল।"

কাবির তাই করলো। দ্রুত কল করলো প্রীষানের নম্বরে। প্রীষান রিসিভ করলে কাবির হন্তদন্ত হয়ে বলল,
"ভাইয়া, দ্রুত কুমুদিনী হাসপাতালে আসেন। বোন হঠাৎ কইরা অজ্ঞান হইয়া গেছে!"

--------------------------

হাসপাতালের করিডোরে তখন সময় থমকে গেছে। একদিকে কায়রা অচেতন, অন্যদিকে নার্সরা দ্রুততার সাথে তার শরীর পর্যবেক্ষণ করছে। মনিটরের বীপ শব্দগুলো নিয়মিত হলেও সবার বুকের ভেতর অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। কাবির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে এখনো কাঁপন। দু'ভাইয়ের মাথায় বারবার শুধু একটা চিন্তাই ঘুরছে,
“হঠাৎ এমন হলো কেন?”

কায়রাভ নার্সের দিকে তাকিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আমার বোনের কী হয়েছে? হঠাৎ এমন করে অজ্ঞান হয়ে গেলো কেন?”

নার্স একটু সময় নিয়ে চার্টে চোখ বুলিয়ে বলল, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে শারীরিক দুর্বলতা আর হঠাৎ ব্লাড প্রেশার ড্রপ করেছে। তবে আমরা কিছু টেস্ট দিয়েছি… রিপোর্ট এলে পরিষ্কার বোঝা যাবে।”

কিছুক্ষণ পর কেবিনে সাদা কোট পরা একজন মহিলা চিকিৎসক প্রবেশ করলেন। তিনি কায়রার ফাইলটা হাতে নিয়ে মনিটর দেখলেন। তারপর খানিকটা অবাক হয়ে বললেন, 
“আপনারা কি জানতেন না… রোগী প্রেগন্যান্ট? সি ইজ এবাউট টেন উইকস প্রেগন্যান্ট, এন্ড সি ইজ এক্সপেক্টিং টুইন্স।”

এক মুহূর্তের জন্য কেবিনে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
কাবিরের চোখে বিস্ময় আর হতবিহ্বল ভাব একসাথে ফুটে উঠলো। কাবির চরম বিস্মিত স্বরে বলল, 
“কিহ প্রেগন্যান্ট?”

কায়রাভ নিজেও হতবাক। 
“টুইন্স?”

কায়রাভ যেন এক ধাক্কায় পাথর হয়ে গেলো। সে কিছু বলার চেষ্টা করলো, কিন্তু শব্দ বের হলো না। দুই-ভাই খুশি হবে নাকি অবাক হবে বুঝতে পারছে না। তাদের ছোট্ট বোনটি কবে এত বড় হয়ে গেলো? কাবির হুট করেই নিশ্চিত হতে বলে ফেলে,
"ডাক্তার ম্যাডাম, আপনি সিওর তো?"

ডাক্তার পাশ থেকে শান্ত গলায় বললেন, 
“হ্যাঁ, প্রাথমিক পরীক্ষায় এটা নিশ্চিত হয়েছে। সম্ভবত শরীরের এই দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, এসব তার গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কিত। তবে এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাকে সম্পূর্ণ অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।”

এই বলে ডাক্তার চলে যায়। এই কথাগুলো কাবিরের কানে এসে বাজতে লাগলো। কিন্তু সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলো না। তার চোখ বারবার কেবিনের ভেতর যাচ্ছে। যেখানে কায়রা অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। কায়রাভ ধীরে ধীরে দেয়ালে হেলান দিলো। ভাবুক স্বরে বলল,
“এই খবর… আমাদের জানালো না কেন কায়রা?”

কাবির ধারণা করলো,
“আমি সিওর, ও নিজেই বুঝে নাই। আমাগো কি জানাবো! প্রেগন্যান্সির কথা জানলে একটু আগেও এমনে ফাল পারতো নাকি?"

"তাও ঠিক।"

এতক্ষণ থমকে যাওয়া কাবির আবার নিজের ফর্মে চলে এলো, 
"আই'লা জাদু! কি শুনলাম এইডা? এটলিস্ট, এই লোকরে আমি সোজাসাপ্টা মনে করছিলাম, ভাইজান! কিন্তু এ তো দেখি ডাবল প্যাকেজ সারপ্রাইজ নিয়া বইসা আছে! শালা'র, জীবনে কি করতাছি আমি?"

কায়রাভ সরবে হাসলো। মজা করে কাবিরের বাহু চাপড়ে ধরে বলল, 
"তুই তো পিছিয়ে গেলি, কাবির! তোর কাছ থেকে এটা আশা করি নি।"

কাবির মেকি মুখ কুচকে বলে, 
"খোঁচাইয়ো না, ভাইজান!"

কায়রাভ মুচকি হেসে বলে,
"একটা কথা ভেবে দেখ, এই টুইন্স তাও মেনে নিলাম। আরও দুটো বড় বড় ছেলেমেয়ে আগে থেকেই আছে। প্রীষান ভাইয়া বলতে গেলে কম বয়সেই চার বাচ্চার বাবা হয়ে গেলো। যদিও ওনাকে দেখে কেউ বলবে না এই লোকের এতগুলো ছানাপোনা। কিছু মানুষের আসলেও বয়স বাড়ে না। এদিকে আমার বত্রিশ বছরে এখনই চুল পেকে যাচ্ছে, ভাই!"

কাবির মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলল, 
"কথা সত্য। বান্দা বহু'ত সুন্দর! কিন্তু আমি এখন ভাবতাছি, কায়রার ওই ছোট্ট পেটে দুইডা বাবু কেমনে কি?"

কায়রাভ আরও কিছু বলতেই যাবে তার আগেই প্রীষান চলে আসে। হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে সে, মানুষটাকে অস্থির দেখাচ্ছে ভীষণ। আজ গোছালো-পরিপাটি মানুষটিকে বেশ অগোছালো লাগছে। কারণ, কাবিরের ফোন পেয়ে আর এক মুহুর্ত দেরি করেনি সে। কায়রার চিন্তায় প্রচন্ডরকম অস্থির লাগছিলো তার। এরপর কাবিরের পাশে এসে দাঁড়িয়ে প্রীষান উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে অবাক হয়ে জানতে চায়, 
"কার পেটে দুটো বেবি?"

একটু থেমে, দৃষ্টিতে চারপাশে খুঁজে ফেরে সে। তারপর দ্রুত জিজ্ঞেস করে,
“আর কায়রা? কায়রা কোথায়? ওর কী হয়েছে?”

চলমান.......

 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:৪৭

 

প্রীষানের ব্যাকুলতা, উৎকণ্ঠা ওর মুখেই প্রকাশ পাচ্ছে। কাবির নিজেও বুঝতে পারছে তার বোনকে নিয়ে প্রীষানের ভেতরে কী ভয়ানক অস্থিরতা জমে আছে। মানুষটার চোখ তখন উতলা হয়ে এমনভাবে কাঁপছিলো যেন এক মুহূর্ত দেরি হলেই ভয়ানক কিছু ঘটে যাবে। তাই আর অপেক্ষা করালো না কাবির। দ্রুত আঙুল দিয়ে পেছনের কেবিনের দিকে ইশারা করে বলল,
"তখন বোন জ্ঞান হারাইছিলো। তাই তাড়াহুড়া কইরাই ফোন দিছিলাম। এই যে, এই কেবিনে যান… কায়রা এখানেই আছে।"

প্রীষান আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চাইলো না। তড়িঘড়ি পা বাড়াতেই পাশ থেকে কায়রাভ হালকা হেসে বলে উঠলো,
"কনগ্র্যাচুলেশন। মামা হচ্ছি আমরা।"

কথাটা যেন বাতাস চিরে এসে সোজা প্রীষানের বুকের ভেতর লাগলো। তার পা থেমে গেলো আচমকা। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো সে। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। অস্ফুটে বলল শুধু, 
"হ্যাঁ…?"

কায়রাভ বিব্রত হেসে নিজের মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে বলল,
"আমরাও আসলে শক'ড। দশ সপ্তাহ চলছে, কিছুক্ষণ আগেই ডাক্তার ম্যাম বলে গেলো। আর আমার খামখেয়ালি বোনটা নিজেও টের পায়নি কিছু। যাইহোক, আগে দেখা করে আসুন ওর সাথে। আমি যাই… আমার বউকেও হয়তো কেবিনে শিফট করছে এতক্ষণে। পরে কথা হবে।"

কথা শেষ করেই কায়রাভ সরে গেলো। করিডোরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো আবার। শুধু কাবির দাঁড়িয়ে রইলো পাশে। আর প্রীষান… সে যেন কয়েক সেকেন্ড বাস্তবতা বুঝতেই পারলো না। শকের মধ্যে আছে সে।
মামা হচ্ছে তারা! শব্দটা মাথার ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে ফিরে বাজতে লাগলো। তারপর নিজেকে ধাতস্থ করে প্রীষান ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো কেবিনের দরজার দিকে। হাত তুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার দৃষ্টি থামলো। সাদা চাদরে মোড়া বেডের উপর কায়রা বসে আছে। নিস্তব্ধভাবে, জানালার ওপাশে কোথাও দৃষ্টি আটকে আছে তার। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব। না আনন্দ, না বিষাদ, বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে আছে মেয়েটা। প্রীষান গলা খাঁকারি দিতেই কায়রা ধীরে তাকালো তার দিকে। সেই চোখদুটোতে ক্লান্তি ছিলো। কিন্তু কোথাও খুব ক্ষীণ কোমল আলোও লুকিয়ে ছিলো৷ 

প্রীষান এগিয়ে এসে বেডে কায়রার পাশেই বসে পড়লো। দু’জনের মাঝখানে কিছুক্ষণ নীরবতা ঝুলে রইলো। কথা বলল না কেউই। হাসপাতালের মৃদু গন্ধ, মনিটরের ক্ষীণ শব্দ আর দ্রুত কাঁপতে থাকা দুটো হৃদস্পন্দন। সব মিলিয়ে মুহূর্তটা অবাস্তব-অদ্ভুত লাগছিলো। প্রীষান ধীরে ধীরে কায়রার দিকে তাকালো। তার চোখে বিস্ময়, ভয়, আনন্দ, সবরকম অনুভূতি একসাথে জড়িয়ে আছে। তার ঠোঁট কাঁপলো সামান্য। তারপর খুব নিচু স্বরে নিজেকে বিশ্বাস করাতে বলল,
"আ’ম গনা বি অ্যা ফাদা'র অ্যাগেইন!"

বাক্যটা শেষ হতেই মানুষটার কণ্ঠ ভেঙে গেলো খানিকটা। কায়রা জানতে চায়, 
"আপনি খুশি তো?"

প্রীষান কায়রাকে কাছে টেনে বলল,
"আমার খুশি ঠিক কিভাবে বোঝাবো তোমাকে, বলো তো কায়রা? এই গুড নিউজ শুনে তোমাকে জড়িয়ে ধরে পেটে চুমু খেয়ে দেখাবো ইয়াং এডাল্টদের মতো? এতে বুঝবে তুমি আমার খুশির মাত্রা?"

কায়রা কিছু বলে না, শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। আর প্রীষান অনুভব করলো, আবার সেই একই অনুভুতি হচ্ছে তার। বাবা হওয়ার বিশেষ অনুভূতি। এদিকে কায়রা ভাবছে প্রীষানের অনুভুতি কি? কেমন? হঠাৎই প্রীষান জিজ্ঞেস করে, 
"তুমি কি একবারও পিলগুলো নাওনি?"

কায়রা থমকে তাকালো। চোখে এখন কেমন যেন একটা অস্থির অস্থির ভাব। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো সে। মেডিসিনগুলো পরে নেবে নেবে করে আর নেওয়া হয় নি খামখেয়ালী স্বভাবের কায়রার। প্রীষান একটু সামনে ঝুঁকে এলো। কায়রার হাতটা আপোসে নিজের মুঠোয় ভরলো। কণ্ঠটা এবার আগের মতোই ভারী শান্ত, 
"দশ সপ্তাহ চলছে, কায়রা। ডিডন'ট ইয়্যু নোটিস এনিথিং আনইউজুয়াল অ্যাট অল, ইভেন ওয়ান্স?"

কায়রা চোখ বড় করে তাকালো। চরম বিভ্রান্ত, হতবাক সে দৃষ্টি। এতক্ষনে মুখ খুলল সে। কোনোমতে বলল,
"আমি… আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। সবকিছুই তো স্বাভাবিক লাগছিলো। বমি-টমি হয়নি, মাথাও ঘোরায়নি… আর কীভাবে বুঝবো, বলুন?"

প্রীষান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর আস্তে করে প্রশ্ন করলো,
"পিরিয়ডের লাস্ট ডেট কবে ছিলো?"

প্রশ্নটা শুনেই কায়রার মুখ এক মুহূর্তের জন্য রক্তশূন্য হয়ে এলো। সত্যিই তো, পিরিয়ড বন্ধ ছিলো তার। তার পিরিয়ড মাঝে মাঝে এমনিই অনিয়মিত হয়, তাই ভেবেছে এগুলো হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু এসব ভাবনা সপ্নেও ভাবে নি সে। ধিমি গলায় বলল,
"দু-দুই মাস আগে…"

প্রীষান আচমকাই হেসে উঠলো। নরম স্বরে হাসোজ্জ্যল গলায় বলল,
"কি করে ফেলেছো, কায়রা! যদিও আমি একটু নার্ভাস… কিন্তু খুশিও লাগছে। খুব বেশিই খুশি লাগছে!"

সে একটু থেমে আরও নরম গলায় বলল,
"বাচ্চারা শুনলে ওরাও নিশ্চয়ই খুশি হবে।"

কায়রা এখনো স্থির হয়ে রয়েছে। চোখে প্রশ্ন, ভেতরে ঝড়। কিছুই ঠিকমতো বোধগম্য হচ্ছে না। এসব কিছু কি তাহলে সত্যি? গা সমানে কাঁপছে তার। প্রীষান হাত এগিয়ে কায়রার গালে রাখলো। তার স্পর্শে কায়রার গা-কাঁপুনি একটু থামলেও মনের দোলাচল থামলো না। কিন্তু প্রীষান অনুভব করেছে কায়রার কাঁপুনি। তাই সামান্য ধমকে বলে,
"এই গাঁধা! স্বাভাবিক হও। কাঁপছো কেন তুমি? এই তাকাও আমার দিকে, সব ঠিক আছে। হু?"

কায়রা চুপ করে তাকিয়ে রইলো প্রীষানের চোখের দিকে। এই মানুষটা এত সহজ কেন? নিজের বাচ্চা বলেই হয়তো! এদিকে কায়রা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তার প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত। হুট করেই অনুভুতি শুন্য হয়ে গেছে সে। ধাতস্থ হতে সময় লাগছে মেয়েটার। এই নিয়ে দুইবার শুকনো ঢোক গিললো মেয়েটা। প্রীষান সেসব বুঝে কায়রার গাল চেপে ধরে চুমু খেলো। নাহ, এ যেমন তেমন চুমু নয়! একেবারে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খেয়েছে প্রীষান। ডিসেন্ট, অতি মাত্রার ভদ্রলোক প্রীষানের এই কাজে হা হয়ে গেলো কায়রা। ঠোঁটজোড়াও মৃদু খুলে গেলো তার। 

তবে এসবে কায়রা কিছু বলল না, শুধু স্বামীর আদরটুকু অনুভব করলো চোখ বুজে। প্রীষান সরে গেলে কায়রা চোখ খোলার পর শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রীষানের দিকে। মানুষটার কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা কাঁপনটা অনুভব করার চেষ্টা করছে। অনুভুতিগুলো বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে সে। এদিকে প্রীষান ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে কায়রার আঙুলগুলো ছুঁলো আবারও। জানতে চাইলো প্রীষান,
"তুমি একবারও বুঝতে পারো নি? কিছু সিমটম তো বোঝার কথা, কায়রা!"

খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো প্রীষান। কায়রা মৃদু মাথা নাড়লো। তারপর কিছু ভেবে ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত হাসি ফুটলো সামান্য। ধিমি গলায় বলল,
"উম'ম, ওহ হ্যাঁ, কয়েকদিন আগে আমি বমি করেছিলাম প্রিহাদের সাথে ফাস্টফুড খেয়ে। আমি ভেবেছি ফুড পয়জনিং ছিলো। গুরুত্ব দেইনি তখন।"

প্রীষান সরুচোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। এইনা বলল বমি-টমি হয় নি? পরক্ষণেই আবারও আচমকা হেসে ফেলল প্রীষান। প্রীষান এমন হাসি খুব কমই হেসেছে জীবনে। তবে স্বস্তি মিশে আছে এ হাসিতে। কায়রার চিন্তা দূর করে মেয়েটাকে থিতু করতে প্রীষান আশ্বস্ত করতে হেসে বলল,
“উই আর গোয়িং টু বি প্যারেন্টস, কায়রা। ঘাবড়াচ্ছো কেন তুমি? ক্যান্ট ইয়্যু ফিল আওয়ার বেবি?”

এইবার কথাটা বলার সময় তার চোখ চকচক করে উঠলো আনন্দে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব সুন্দর খবরটা সে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। কায়রা সেই থেকে তাকিয়েই আছে মানুষটার দিকে। তারপর ধীরে মেয়েটা বলে উঠলো,
"পারছি...পারছি। কিন্তু ভয় লাগছে আমার। আমি নিজেই ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না, আর ওরা দুজন!"

প্রীষানের হাসিটা থেমে গেলো। আরেকদফা অবাক হলো সে। দুজন মানে! সে মৃদু একটু ঝুঁকে এসে অবিশ্বাস্য গলায় জানতে চাইলো,
"দুজন মানে? টুইন্স!"

"হু।"

কথাটা বলে কায়রা চোখ নামিয়ে ফেললো। আঙুলগুলো চাদরের উপর শক্ত করে চেপে ধরলো সে। প্রীষান আর কত বিস্মিত হবে! সেই থেকে অবাক'ই হচ্ছে সে। আজকে কি তার অবাক হওয়ার দিন নাকি? এরই মধ্যে কায়রা বলে উঠে, 
"আমি যদি ভালো মা হতে না পারি? যদি কিছু ভুল করি?"

প্রীষান এক মুহূর্তও দেরি করলো না। আলতো করে কায়রার দুই হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল,
"কিচ্ছু ভুল হবে না। আমি আছি, সব সামলে নেবো।"

কায়রা এবারে চুপচাপ রইলো। প্রীষানের ওই 'আমি আছি' বলা কথাতেই হাজারগুন সাহস পেয়ে গেলো মেয়েটা। সত্যি বলতে, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেগ্ন্যাসিতে খুশির বদলে ভয়ের পরিমাণই বেশি ছিলো তার। কায়রার ধারণা ছিলো, ও কিছু সামলাতে পারবে না। তাই অযাচিত ভয়-দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছিলো তাকে। এখন আর চিন্তা নেই, প্রীষান আছে তার সাথে।

এরইমধ্যে প্রীষান ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
"লাভ ইয়্যু, ওয়াইফি!"

কথাটা কর্নগোচর হতেই বিস্ময়ে চাইলো কায়রা। ঠিক শুনেছে সে? প্রীষান কখনো এ-কথা বলেনি। আচমকাই কায়রার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠলো। এতদিনের শক্ত, জেদি মেয়েটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেলো। বাচ্চাদের মতো  ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে কায়রা বলল,
"আপনি বাচ্চাদের জন্য আমাকে ভালোবাসলেন?"

কায়রার বোকামোতে প্রীষান মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হেসে ফেললো। আর গভীর চোখে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
"উহু! বাচ্চাদের জন্য আমি বাচ্চার মাকে ভালোবাসি। আর আমার জন্য আমি এই কায়রাকে'ই ভালোবাসি।"

কায়রার বিশ্বাস হচ্ছে না কেন জানি! ওর ভ্রম লাগছে সব। তাই আবারও জানতে চাইলো সে, 
"সত্যি আমাকে ভালোবাসেন তো?"

প্রীষান এবার সামান্য ত্রস্ত চোখে চাইলো। খানিকটা গম্ভীর গলায় বলল,
"তোমাদের এই জেনারেশনের প্রবলেম'টা কি জানো?
অতিরঞ্জিত বিষয়গুলো পছন্দ করো তোমরা। এখন কি এই বয়সে রোজ নিয়ে হাঁটু-গেড়ে প্রপোজ করতে হবে তোমাকে? তবে বিশ্বাস করবে তুমি?"

কায়রা কান্নার মাঝেও হেসে ফেলল এবার। প্রীষানের পরনের শার্ট মুঠোয় চেপে ধরলো কায়রা। এরপর আলতো করে মানুষটার প্রশ্বস্ত বুকটায় মাথা রেখে বলল,
"না না, ওসব করতে হবে না। বিশ্বাস করেছি আমি। আমিও তো ভালোবাসি।"

কায়রাকে বুকে আগলে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রীষান বলল,
"হুম, জানি। দিনে দশবার ভালোবাসার কথা না বললে তোমার তো আবার ভাত হজম হয় না।"

এখন কায়রা হাসছে। ওর শান্তি লাগছে ভীষণ। এমন একটা দিনের বহু অপেক্ষা করেছে সে। প্রীষান এবার খুব সাবধানে হাত রাখলো কায়রার পেটের উপর। আলতো করে ছুঁয়ে দিলো উদরখানা। একটু ভয় পাচ্ছে সে, যেন একটু জোরে ছুঁলেই ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট অস্তিত্বেরা কষ্ট পাবে। তাই খুব সাবধানী প্রীষান। এই বাবা হওয়ার অনুভুতিগুলো খুব বিশেষ হয়। একমাত্র বাবারা'ই বোঝে এর আনন্দ। অন্য কেউ বুঝতে পারবে না।

-----------------------------

হাসপাতালে কায়েশীর কেবিনটায় নিস্তব্ধতা। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসছে নরম আলো। সেই জানালার দিকেই তাকিয়ে ছিলো কায়েশী। বাইরের সবুজাভ পরিবেশ দেখছিলো সে। কায়েশীর শারীরিক জটিলতা না থাকায় ভালোভাবেই নরমাল ডেলিভারিতে বেবি হয়েছে। কায়েশীর অবস্থা সন্তোষজনক থাকায় এখন নার্সদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। একজন নার্স অবশ্য মেয়েটাকে পর্যবেক্ষন করছে। স্যালাইনের টিউব হাতে লাগানো ছিলো। দীর্ঘসময় বেডে শুয়েছিলো সে। তখন কায়েশী একটু নড়েছিলো বলে ক্যানেলার টান লেগেছে হাতে, সাথে সাথেই চোখ-মুখ খিচে নিয়েছে মেয়েটা। 

বর্তমানে কায়েশী বেডে শুয়ে আছে, চুলগুলো কপালে লেগে আছে ঘামের কারণে। শরীর এখনো দুর্বল, কিন্তু মুখে এক শান্ত ক্লান্তি। একটা দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ হয়েছে, আর সে এখন শুধু ভারী ভারী নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তার পাশে স্যালাইন চলছে ধীরে ধীরে। শরীরের ভেতর থেকে এখনো হালকা কাঁপন অনুভব করছে সে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে ছেলের মুখ ভাসতেই মনে হচ্ছে সব কষ্ট একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। একজন নার্স তার ব্লাড প্রেসার চেক করলো। তারপর নার্সটি নরম গলায় বলল,
“সব ঠিক আছে, একটু বিশ্রাম নিন। অসুবিধা হলে জানাবেন।”

কায়েশী হালকা মাথা নাড়লো। কথা বলার মতো শক্তি এখনো পুরোটা ফিরে আসেনি। তার চোখ একটু খুঁজে ফিরলো কায়রাভকে। লোকটা আসছে না কেন এখনো? ক্রমেই অধৈর্য্য হচ্ছে কায়েশী। 

একটু পরই সে শুনলো দরজার পাশে কারোর পায়ের শব্দ। কেউ আসছে। কায়রাভ আসছে কি? হ্যাঁ, কায়রাভ এসেছে। সে ঢুকতেই নার্স বেরিয়ে গেলো। কেবিনের বাতাস এখন একটু বদলালো। কায়েশীর চোখে যে উদ্বেগ ছিলো তা পাল্টে সেই উদ্বেগের ভেতরেই স্বস্তি এসেছে।

কায়রাভ ভেতরে এসে এগিয়ে গেলো বেডের দিকে। দেখলো, কায়েশী শুয়ে আছে ক্লান্ত শরীরে। ক্ষনে ক্ষনে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলো সে। এদিকে বাচ্চাকে নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে রাখার পর অবস্থা স্থিতিশীল হলে মায়ের কাছে আনা হয়েছে। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি পাশের ছোট বেডে ঘুমিয়ে আছে, মাঝে মাঝে হালকা নড়াচড়া করছে। বাচ্চাটাকে আনার পর একটু থিতু হয়েছে কায়েশী। পাশে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর উপস্থিতি যেন পুরো ঘরটাকে আনন্দের জানান দিচ্ছে। 

কায়রাভ মাথা নিচু করে কায়েশীর কপালে আলতো করে চুমু দিলো। সেই চুমুতে ছিলো এতক্ষনের ভয়, ভালোবাসা আর তাকে আরো একবার বাবা হওয়ার সুখটুকু দেওয়ার জন্য অগাধ কৃতজ্ঞতা কায়েশীর প্রতি। একটু পর কায়রাভ সরে আসে। এরপর চেয়ারে বসে কায়েশীর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে শান্ত গলায় বলল,
"এখন কেমন লাগছে?"

কায়েশী চোখ আধখোলা করে ক্লান্ত হাসি দিলো,
“মোটামোটি… কিন্তু তখন মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি মরে গেলাম।”

কায়রাভ গম্ভীর স্বরে বলল, 
“আজেবাজে কথা বলবে না। আর ডাক্তার বলেছে বিশ্রাম দরকার। কথা কম বলবে।”

কায়েশী একটু ভ্রু কুঁচকে বলল, 
“আপনি সবসময় এমন আদেশ দেন কেন? আমি আপনার বাধ্যগত জনগণের কেউ নই। এখন আমি…” 

কায়রাভ প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি দিলে কায়েশী অল্প থেমে গিয়ে মৃদু হেসে বলে ফেললো,
“আমি এখন দুটো সন্তানের মা, হুহ!”

বিনিময়ে কায়রাভের মুখে নরম হাসি ফুটে উঠলো। সে ধীরে উঠে এসে বিছানার পাশে দাঁড়ালো। আর আস্তে করে বলল,
“হ্যাঁ, এখন তুমি অনেক বড় দায়িত্বে। দুজনকে সামলাতে হবে। সাথে আমাকেও।”

কায়েশী মৃদু হাসলো এবার। সে এক মুহূর্ত চুপ করে  তাকিয়ে রইলো স্বামী নামক মানুষটার দিকে। তারপর নরম গলায় জানতে চাইলো,
“আপনি তখন ভয় পেয়েছিলেন তাইনা? আপনার হুমকি-ধমকি শুনেছি আমি।”

কায়রাভ একটু থেমে গেলো। বলল,
"ভয়? হ্যাঁ, তা একটু পেয়েছিলাম। তারপর আল্লাহকে ডেকেছি। জানতাম তিনি আমাকে নিরাশ করবেন না।"

কায়েশী চোখ নামিয়ে নিলো। আবারও জানতে চাইলো,
“আপনি পুরোটা সময় ছিলেন তো বাইরে…? আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন থাকবেন!”

"ছিলাম। একটুও সরি নি কোথাও। তোমার অবস্থা প্রথমে শুনে তারপর কোলে নিয়েছি ছেলেকে।"

কায়েশী হাসলো। এরপর কায়ানের কথা মনে হতেই অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
"আচ্ছা, কায়ান কোথায়? সারাদিন দেখিনি ছেলেটাকে! কি খেয়েছে ও?"

কায়রাভ কায়েশীর হাত ধরে আশ্বস্ত করে বলে, 
"চিন্তা করো না। প্রীতিষার কাছে আছে ও। ছেলের খবর আমি নেই নি ভেবেছো?"

"বাসায় যাবো, কায়রাভ। এখানে থাকলে আরও অসুস্থ হবো আমি। বাসায় নিয়ে চলুন আমায়।"

"যাবো। কিন্তু, কাল সকালের আগে ডিসচার্জ করবে না। আজকের দিন এখানেই থাকতে হবে।"

এই কথার পর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। এরপর কায়রাভ ঝুঁকে এসে পরপর বেশ কয়েকবার চুমু খেলো কায়েশীর হাতে, কপালে, গালে। কায়েশী ঘাড় ঘুরিয়ে বাচ্চাকে দেখলো এক পলক। কিন্তু পরক্ষণেই কি যে হলো তার, কায়েশী হঠাৎ হু হু করে কেঁদে উঠলো। এতক্ষণ চেপে রাখা সব অভিমান এক লহমায় ভেঙে পড়লো। সে কায়রাভের কলার মুঠোয় চেপে শক্ত করে ধরে ফেললো। বলল,
“আপনি…!” 

কায়েশীর কণ্ঠ কাঁপছে। কায়রাভ ভড়কে গিয়ে বলল,
"আরেহ! কাঁদছো কেন আবার?"

কায়েশী কান্নারত গলায় ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আপনি আমার জীবনে আগে কেন আসলেন না? আগে এলে হয়তো… আমি এত কষ্ট পেতাম না। সবকিছু সুন্দর হতো। এরজন্যও আমি আপনাকে ক্ষমা করবো না।”

কায়রাভ এক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো সে। তারপর খুব ধীরে মুচকি হেসে শান্ত গলায় বলল,
“দুর্বল শরীরে তেজ দেখাচ্ছো, হু? সুস্থ হও আগে। তারপর ঝগড়া করবো দুজন, আপত্তি নেই। কিন্তু এখন আমার ঘোর আপত্তি!”

কায়েশী আরও জোরে কাঁদলো, কিন্তু তার চোখে রাগের চেয়ে বেশি ছিলো অভিমান। কায়রাভ এবার তার হাতটা আলতো করে ধরে ফেললো। আর বড্ড আবেগ নিয়ে বলল,
“শোনে, আগে আসি বা পরে, ওটা ফ্যাক্ট না। ফ্যাক্ট একটাই, তুমি সবসময় আমারই ছিলে, কায়েশী। আজও। কালও। আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।”

কায়েশীর কান্না একটু ধীর হলো। নাক টানলো সে। তার আঙুলের জোর কমে গেলো, কিন্তু হাত ছাড়লো না। ওভাবেই কায়েশী বলল,
"একটু জড়িয়ে ধরুন তো! ভালো লাগছে না।"

কায়রাভ হাসে। একটু এগিয়ে এসে খুবই আলতো করে জড়িয়ে ধরলো তার অত্যাধিক মাত্রার ত্যাড়া, বদরাগী বউকে। কায়রাভের নিজেরও স্বস্তি হলো। এতক্ষন ভেতরে ভেতরে প্রচুর তড়পাচ্ছিলো সে। এখন তনু-মন সব শীতল হয়েছে। আবার কায়েশীরও ভালো লাগছে। যত যাই করুক, যত হম্বিতম্বিই করুক না কেন? দিনশেষে এই কায়রাভ ছাড়া তার কেউ নেই এই দুনিয়ায়। এই সত্য অস্বীকার করতে পারবে না সে।

---------------------------------

কাবির মাত্রই বাড়িতে ফিরেছে। বিকেলের পর আর দেরি করেনি। কায়রাকে প্রীষান নিয়ে যাওয়ার পর একেবারে কায়েশীর সাথে দেখা করে কাবির ফিরে এসেছে। বেলাও হয়েছে অনেক। সেই সকালে খেয়ে বের হয়েছিলো সে। কাবির ঘরে ঢুকে প্রথমেই খেয়াল করলো, কায়ান বিছানায় ঘুমোচ্ছে। একেবারে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সে। কায়ানের হাতে ধরা এখনো স্পোর্টস কার খেলনাটা। যেটা কাবির কিনে দিয়েছিলো মাসখানেক আগে। তা দেখে চোখে একটু প্রশান্তি নিয়ে কাবির পরনের শার্ট খুলতে খুলতে চারপাশে তাকালো। খুঁজলো বউকে, কিন্তু প্রীতিষা কোথাও নেই। ভেবেছিলো সে হয়তো ঘরেই থাকবে, কিন্তু পাওয়া গেলো না। শার্ট খোলা শেষে স্যান্ডো গেঞ্জিখানাও টেনেটুনে খুলে ফেললো অত্যাধিক গরমের জন্য। এখন কাবিরের পরনে শুধুমাত্র জিন্স প্যান্ট। গায়ে কিচ্ছুটি নেই। 

ওভাবেই উদাম গায়ে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলো সে। কারণ, বউয়ের দেখা এখানে মিললেও মিলতে পারে। তাই হলো,  রান্নাঘরের দরজায় এসে থেমে দাঁড়ালো কাবির। ভেতর থেকে ভেসে আসছে প্রীতিষার হাতের রান্নার পরিচিত সুঘ্রাণ। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কাবির দেখলো, প্রীতিষা ব্যস্ত হাতে রান্নায় মন দিয়েছে। আর কোনো খেয়ালে নেই সে। চুলের গোছা কাঁধে এলোমেলো হয়ে পরে আছে, পিঠটা ঘেমে ভিজেছে। 

কাবির আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরে বাহুবন্ধনীতে আবদ্ধ করলো মেয়েটাকে। দু-হাতে জড়িয়ে ধরলো সরু মেয়েলি কোমরখানা। হঠাৎ কেউ জাপটে ধরায় কিঞ্চিৎ চমকে উঠলো প্রীতিষা। কিন্তু পরমুহূর্তেই বুঝে গেলো, হাতের মালিক কে আর এই স্পর্শ কার? তাই আর প্রতিরোধ করলো না, বরং আগের মতোই হাত চালিয়ে রান্নায় মন দিলো। কাবির নরম গলায় হাসলো,
“আজকে সারাদিন কী পরিমাণ মিস করছি তোমারে, বাপ রে বাপ! কী জানি করছো তুমি আমারে? জাদুটো'না?”

প্রীতিষা ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি টেনে বলল,
“খালি বাজে কথা, না! উল্টো তুমি বলো, তুমি আমাকে কী করেছো? আমিও সারাদিন তোমাকে মিস করেছি।”

কাবির একটু থেমে নরম স্বরে বলল,
“তাই নাকি?”

“হু,” 

প্রীতিষা হালকা মাথা নাড়লো। তারপর হঠাৎই জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা, এখন বলো, ভাবীর কী অবস্থা? মা আর বাচ্চা দুজনেই সুস্থ আছে তো?”

কাবির শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ। দুজনেই সুস্থ। ছেলে হইছে।”

“বাহ… ভালো তো,” 

প্রীতিষার চোখে স্বস্তির আলো ফুটে উঠলো। এদিকে
কাবির লক্ষ্য করলো, প্রীতিষার রান্না প্রায় শেষ। তাই কাবির আগ বাড়িয়ে গ্যাসের সুইচটা বন্ধ করে দিলো। এরপর প্রীতিষাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো।
এখন কাবিরের চোখে দুষ্টু হাসি,
“আরও একটা সুখবর আছে। শুনলে তো ফা'ল দিবা!”

প্রীতিষা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
“কি?”

কাবির একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তোমার ভাইয়ে… ওরফে 'গভীর জলের ফিস' তো আকা'ম কইরা ফালাইছে! বাবা হবো সে! আর সেটাও একটা না, দুইডা—টুইন্স!”

মুহূর্তেই প্রীতিষার চোখ বড় হয়ে গেলো। হা হয়ে গেলো প্রায়। বিস্ময়ে তার ঠোঁট আলতো করে কেঁপে উঠলো। জ্বলজ্বলে চোখে আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলো,
“কি বলছো, কাবির! সত্যি? ভাইয়া তো কিছুই জানালো না আমাকে!”

কাবির মাথা নাড়লো,
“সে নিজেও জানতো না। আজকেই জানছে। একটু পরেই ফোন দিবো নি তোমারে, দেইখো।”

কথাটা শেষ করেই কাবির আবারও প্রীতিষার দিকে ঝুঁকতে গেলো। কিন্তু এবার প্রীতিষা দ্রুত এক-পা পিছিয়ে সরে গিয়ে হেসে ফেললো। আর কড়া গলায় কাবিরের প্রস্তাব নাকোচ করে বলল,
“উহু! এখন না। সরো! বাইরে থেকে এসেছো, গোসল করো গিয়ে। তুমি গোসল করে আসলে, আমিও যাবো। এমনিতেই আজ বেলা হয়ে গেছে আমার।”

প্রীতিষার কথাটা শেষ হতেই কাবির একটু থমকে গেলো। তবে তার চোখে সেই চেনা দুষ্টু আলোটা আবার জ্বলে উঠলো। এবার সে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারলো না। তাই কাবির ধীরে ধীরে এক-পা করে এগিয়ে আসতে থাকে। প্রীতিষাও এক-পা করে পিছনে যেতে থাকে। কাবির দুষ্টু গলায় বাঁকা হেসে নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
“গোসল তো করতাম'ই? কিন্তু ভাবলাম, আজকে তোমার সাথে গোসল করমু। আরেকটা এডভেঞ্জার হবো কিন্তু। আসো, প্রীতি! মজা হবো!”

প্রীতিষা পেছনে যেতে যেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফেলে। কাবিরের মতলব বুঝতে আর বাকি নেই তার। লজ্জায় হাত গুটিয়ে ফেললো সে, তবে ঠোঁটে লাজুক চাপা হাসি দেখা যাচ্ছে। প্রীতিষা খানিকটা তুতলে বলল,
“না...যাও তুমি। এখন কোনো এডভেঞ্জার চাই না আমার। আগে ফ্রেশ হও গিয়ে।”

কাবির এক পা এগিয়ে এসে প্রীতিষার হাতখানা খপ করে ধরলো,
“আমি তো ফ্রেশ'ই থাকি অলটাইম। গোসলও করমু, প্রীতি। তার আগে কাছে আসো।"

প্রীতিষা এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। তারপর হালকা ধমকের সুরে হাত ছাড়িয়ে নিলো,
“কাবির, না। এখন না। তুমি সারাদিন বাইরে ছিলে, ক্লান্ত। আগে গোসল করে এসো।”

কাবির আবারও একটু কাছে ঝুঁকলো। হাস্কি গলায় বলল,
“তুমি কাছে আসলে ক্লান্তি আসবো না…”

এইবার প্রীতিষা সত্যিই একটু পিছু হটলো। কারণ দুজনার ঠোঁট ছুইছুই। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু গলার স্বর দৃঢ়,
“আমি বলেছি না। আগে গোসল। এরপর যা বলার, বলো।”

কাবির থেমে গেলো। তার মুখে এক মুহূর্তের জন্য হালকা মন খারাপের ভার নামলো। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টালো কাবির। তা দেখে প্রীতিষা অসহায় চোখে তাকালে পরপরই কাবির হেসে ফেললো। একটু ঝুঁকে প্রীতিষার অধরে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। যাও… তুমি জিতলা।”

প্রীতিষা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো,
“আমি জিতি নি। যেটা সঠিক, সেটাই বলেছি।”

কাবির বাথরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে তাকালো। চোখ টিপে বলল,
“প্রীতি, বুইঝো কিন্তু? এখন কাছে আসতে দিলা না। গোসল কইরা আমি আবার তোমার কাছে আসমু। তখন...”

প্রীতিষা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করে বিমুঢ় হয়ে তাকালো,
“কাবি'র!”

এইবার কাবির হাসতে হাসতে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। বাথরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসতেই প্রীতিষা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে অজান্তেই হাসলো। আর মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল,
“এই কাবির কখনো ভালো হবে না! চর'ম বদমাশ!”

---------------------------------

বিকেল তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা। সূর্যটা আকাশের কোণে হেলে পড়েছে। উঠানের একপাশে লম্বা ছায়া ফেলেছে বাড়ির গাছপালা। বাড়িটা আপাতত শান্ত।কারণ, প্রীভান আর প্রিহা দুজনেই যে যার প্রাইভেটে গেছে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে তাদের।

এদিকে বাড়িতে ফিরেই প্রীষান প্রথমেই নিজাম উদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে সুখবরটা জানিয়েছে। বৃদ্ধ মানুষটার চোখে আনন্দের ঝিলিক, মুখে সন্তুষ্টির হাসি দেখে প্রীষান নিজেও আপ্লুত। এরপর প্রীতিষাকে ফোন করেছিলো প্রীষান। কিন্তু রিং বাজলেও কেউ ধরেনি, হয়তো ব্যস্ত। তবে প্রীষানের খুব ভালো করেই জানা, কাবির ঠিক আগেই সব জানিয়ে দিয়েছে তার বোনকে। 

এরপরই সে কায়রাকে নিয়ে এসেছে বাইরের উঠানে। উঠানের এক কোণে ছোট্ট পুল। পানিটা স্থির, আকাশের আলোয় নীলচে রুপালি হয়ে উঠেছে। সেখানে দুটি চেয়ার পেতে বসিয়েছে কায়রাকে। তার হাতে গুঁজে দিয়েছে কাপড় আর তোয়ালে। প্রীষান আজ বলেছে, এখানে গোসল করবে সে। আর সত্যিই, কথামতোই সে নেমে পড়েছে পুলে।

কায়রা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখে সন্দেহ আর কৌতূহলের মিশ্র ছায়া। লোকটার হুটহাট এমন আচরণ সে এখনো পুরো বুঝে উঠতে পারছে না। তার মতিগতির পরিবর্তন বেশ অদ্ভুত লাগছে। শেষে কায়রা মনের কথা বলেই ফেললো,
“আপনি গোসল করবেন, ভালো কথা… কিন্তু আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছেন কেন?”

প্রীষান শুনতে পেয়ে পুল থেকেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। গলায় একরকম অবিচল দৃঢ়তা,
“হ্যাঁ, তোমাকে ঘরে একা রাখি, আর তারপর তুমি মাথা ঘুরে পড়ে যাও! পরে বলবে, তুমি বুঝতেই পারো নি কী থেকে কী হলো? আই ক্যান্ট টেক দ্য রিস্ক। আমি যতক্ষণ বাড়িতে থাকবো, তোমাকে কাছ ছাড়া করছি না।”

কায়রা হতভম্ব হয়ে গেলো। এসব কি বলল? সে কি ইচ্ছে করে মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলো নাকি? এতটা স্বাভাবিকভাবে কেউ এমন অপমানজনক কথা বলে! সে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। তারপর নীরবে তাকিয়ে রইলো পুলের দিকে প্রীষানের পানে।

প্রীষান তখন পুলে ডুব দিলো। কিছু মুহূর্ত পরে উঠে এলো। চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে তার। মাংসাশী মাসালগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে বারংবার। বুক-পিঠের শক্ত পেশিগুলো উঁকি দিচ্ছে কায়রাকে দেখাতে। প্রীষানের গা বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ ফোঁটা, সূর্যের শেষ আলোয় যেন মুক্তোর মতো ঝিকমিক করছে প্রতিটি পানির বিন্দু। প্রীষান একবার এপাশ-ওপাশ সাঁতরে নিলো, তারপর আবার ডুব দিয়ে উঠলো। 

কায়রা আনমনেই তাকিয়ে ছিলো সেদিকে। চোখ ফেরাতে পারছিলো না, আবার চাইলোও না। কিছুক্ষণ পর প্রীষান উঠে এলো পুল থেকে। ভেজা শরীর থেকে এখনো টপটপ করে পানি পড়ছে। প্রীষান এসে কায়রার কোল থেকে তোয়ালে তুলে নিলো, ধীরে ধীরে গা-পিঠ মুছতে লাগলো। 

তারপর একবার কায়রার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো। কায়রা ধরা পড়ে গেলো নিজের ভেতরের অস্থিরতায়। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলো। সামান্য কেশে কায়রা বিরবির করে বলল,
“ইচ্ছে করেই এসব করবে… আর দোষ পরে আমি তাকালে! হুহ!”

কথাটা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালো কায়রা। দেখলো, প্রীষান মাথা মোছেনি ভালো করে। তাই প্রীষানের দিকে তাকিয়ে বলল, 
“মাথা'টা মুছুন ভালো করে। এখনো পানি পড়ছে। ঠান্ডা লেগে যাবে।”

প্রীষান তোয়ালেটা তার দিকে এগিয়ে দিলো। বলল,
“নাও, তুমি মুছিয়ে দাও।”

কায়রা এবার অবাক হলো না। এটাইতো স্বাভাবিক। সে তোয়ালে হাতে নিয়ে প্রীষানের ভেজা চুল আলতো করে মুছতে লাগলো। কিন্তু সেই মুহূর্তে, কায়রার আঙুল তার ভেজা চুল মোছার পাশাপাশি কয়েকবার না চাইতেও প্রীষানের শরীরে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। লোকটার গা এখন প্রচন্ডরকম ঠান্ডা। তাই ছোঁয়া পেয়ে কায়রার শরীরটা হালকা কেঁপে উঠলো তার নিজেরই অজান্তে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ দৌড়ে গেলো। কায়রার গলা শুকিয়ে এলো মুহূর্তেই।

তবে প্রীষান কিন্তু নির্বিকার। স্থির, শান্ত সে। যেমনটা বরাবরই থাকে। হঠাৎ প্রীষান ঝুঁকে দূরত্ব ক্ষীণ করলো দুজনার। এরপর প্রীষান কায়রার মুখের খুব কাছে এসে বলল,
“ওয়ানা কি'স মি?”

কথাটা শুনতেই কায়রার বুক ধ'ক করে উঠলো। বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো তার চোখজোড়া। এক মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ থেমে গেছে যেন। বাতাস পর্যন্ত স্তব্ধ। ঠোঁট নড়লো তার, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। কারণ, কায়রা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে।

কায়রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রীষান আলতো করে দু’হাতে তার মুখটা আগলে নিলো। তারপর ধীরে, গভীর আকাঙ্ক্ষায় নিজের অধর ছুঁইয়ে দিলো কায়রার ঠোঁটে। একটা দীর্ঘ আবেশময় চুম্বনে হারিয়ে গেলো দুজন।

সময় যেন সত্যিই থেমে গিয়েছিলো তখন। বাইরে সন্ধ্যা নামছিলো ধীরে ধীরে। অথচ তাদের ভেতর অন্য ঝড় বয়ে যাচ্ছিলো। প্রীষান আজ খুব ধীরে, খুব যত্ন নিয়ে চুমু খাচ্ছিলো কায়রাকে। কায়রার আঙুল অজান্তেই মুঠো হয়ে চেপে ধরলো প্রীষানের কাঁধ। আবেশে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো তার। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়লো। ঠিক কতক্ষণ এভাবে কেটে গেলো, তা দুজনের কেউ'ই জানলো না। তখন তাদের মনে হচ্ছিলো, পৃথিবীতে এই মুহূর্ত ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। হতেই পারে না।

 
চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

অন্তীম পর্ব 

 

 

প্রীষান অবশেষে সুখবরটি জানিয়ে দিয়েছে প্রীভান আর প্রিহাকে। খবরটা শুনে প্রিহা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় খুশি হলেও, প্রীভান চুপ ছিলো। কেন জানি ওর ভয় হচ্ছিলো ভীষন। যদি তার বাবার ভালোবাসা বদলে যায়? যদি নতুন আসা ছোট্ট প্রাণগুলো তাদের জায়গা কেড়ে নেয়? এই প্রশ্নগুলোই নিঃশব্দে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো ওকে।

এদিকে ঘরের ভেতর এক শান্ত বিকেল। চেয়ার টেনে প্রীষান বসেছে ছেলেমেয়েদের সামনে, আর বিছানার ওপর বসে আছে প্রিহা আর প্রীভান।  প্রীষান কিছুক্ষণ ছেলেকে স্থির চোখে দেখলো। তারপর নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“প্রিন্স, তুমি কি খুশি হওনি?”

প্রশ্নটা শেষ হতেই প্রিহা রেগে গিয়ে বলে উঠলো,
“কিসের খুশি হবে না ও? মানে কী ও সিবলিংস চায় না? সে হিসেবে পাপা তো আমাকেও ভালোবাসে, তোর ভাগে কম পড়ছে নাকি?”

প্রীভান নিচু গলায় বলল,
“তুই আর ওরা এক না, আপু।”

"হোয়াট?"

রাগে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো প্রিহা, কিন্তু প্রীষানের একটুখানি দৃষ্টিতেই সে থেমে গেলো। প্রীষান ইশারায় মেয়েকে থামিয়ে দিয়েছে। ঘরটা আবার নীরব।

প্রীষান ছেলের দুই হাত নিজের মুঠোয় নিলো, তারপর আলতো করে সেখানে একটা চুমু রেখে বলল,
“তোমাকে কি আমি কখনো কায়রাকে মা ডাকতে বলেছি? বা কায়রা কি কখনো নিজেকে তোমাদের মা বলতে বলেছে? নিশ্চয়ই না, তাই না? তোমরা নিজেরাই ‘মম’ ডাকা শুরু করেছিলে, নিজেদের ইচ্ছেতে। আমি বাঁধা দিইনি, দিতেও পারতাম না। কারণ ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না।”

একটু থেমে প্রীষান আবার বলল,
“এটা সত্যি যে কায়রা তোমাদের মা নয়। তেমনি এটাও সত্যি ওই ছোট্ট প্রান দুটোও যে আমার। আমার কি ওদের ভালোবাসা উচিত নয়, প্রীভান?

প্রীভান ধীরে মাথা তুলে প্রশ্ন করলো,
“আমাদের থেকেও বেশি ভালোবাসবে, পাপা?”

প্রীষানের ঠোঁটে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি ফুটলো,
 “ভালোবাসা কি কোনো দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়, প্রিন্স? তুমি, প্রিহা, ওই দুটো বেবি সবাই আমার প্রাণ। না কম, না বেশি। তবে হ্যাঁ, প্রিহার ব্যাপারটা একটুখানি আলাদা। আমি নিজেও স্বীকার করবো এটা। জেনে রাখো, যদি আমি আমার কোনো সন্তানকে বাকিদের থেকে একটু বেশি ভালোবেসে থাকি, তাহলে সেই সন্তান নিসঃন্দেহে প্রিহা।”

প্রিহা চমকে উঠলো, আর প্রীভান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন? আপুকে বেশি কেন?”

প্রীষান দূরে কোথাও তাকিয়ে ধীরে বলল,
“কারণ প্রিহা আমার প্রথম সন্তান। প্রিহা আমাকে প্রথম সেই বাবা-বাবা অনুভুতি দিয়েছে। প্রথম ‘বাবা’ ডাকটা আমি ওর মুখ থেকেই শুনেছি। ওই অনুভুতি বোঝাতে পারবো না তোমাদের। তাই ভালোবাসার দাড়িপাল্লায় আমার সন্তান্দের মাপা হলে প্রিহার দিকের ওজনটা একটু বেশি হবে।”

প্রিহা প্রসন্ন হলো। প্রীষানের কথায় প্রীভানের নিজের ভেতরের অস্থিরতা থামলেও সে চুপ। হঠাৎ প্রিহা মজা করে বলল,
“নে, এবার আমাকে হিংসে কর। স্টুপিড!ব্রেইনলে'স!”

প্রীষান সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিলো মেয়েকে, তারপর প্রীভানের থেকে জানতে চায়,
 “আর কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ আছে আমাকে নিয়ে?”

প্রীভান ঠোঁট উল্টে বলল,
“আমি সবসময় ভুলভাল ভাবি কেন, পাপা? কই আপু তো আমার মতো ভুল করে না। আমি'ই কেন? আমি সত্যিই তোমার ভালো ছেলে না।”

এইবার কোনো উত্তর নয় শুধু প্রীষানের বুকভরা আলিঙ্গন পেলো প্রীভান। ছেলের পিঠে মৃদু হাত বুলিয়ে বলল,
“এসব বলে না। তুমি আমার ভালো ছেলে, বেস্ট ছেলে। শুধু একটু ওভারথিংকিং করে ফেলেছো। ব্যাপার না।”

প্রীভান সরে এসে ছেলের মাথা হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
"একটা কথা মনে রাখবে প্রীভান, তোমারা প্রত্যেকেই আমার কাছে সমান। তাই কোনো ভাইবোন নিয়ে মনে কখনো বিদ্বেষ রাখবে না। ভাইবোন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের নাম। বুঝেছো?"

প্রীভান ধীরে মাথা নাড়লো। অর্থাৎ সে বুঝেছে। এরপর প্রীষান প্রিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
"তাহলে প্রিন্সেস, তোমার কোনো অভিযোগ আছে কি পাপার প্রতি?"

প্রিহা ভ্রু কুচকে বলে,
"সিরিয়াসলি পাপা, আমাকে জিজ্ঞেস করছো এসব? আমি তোমার সেই ছোট্ট অবুঝ মেয়েটি নই। যথেষ্ট বোঝদার হয়েছি আমি। ভালো-মন্দ দুটোই বুঝি। আর তোমার প্রতি অভিযোগের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না আমি। আই জাস্ট লাভ ইয়্যু, পাপা। মোর দ্যান এনিথিং।"

প্রীষান হাসে। বলে,
"এত বড় কবে হয়ে গেলে?"

প্রিহা আলতো হাসলো। ঠিক তখনই ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ায় কায়রা। দরজায় দাঁড়িয়ে আলতো করে নক করলো সে। প্রীষান না তাকিয়েই বলল,
“অপরিচিতের মতো নক কেন, কায়রা? জাস্ট কাম।”

কায়রা ভেতরে এসে শান্ত গলায় বলল,
"উহু। ছেলেমেয়েদের তার বাবার সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা থাকতেই পারে। এভাবে হুটহাট আমার ঢোকা উচিত নয়।"

কায়রা গিয়ে প্রীভানের পাশে বসে পড়লো। এরপর প্রীভানের দিকে তাকিয়ে বলল,
 “তোমাকে আজও বুঝতে পারলাম না, প্রীভান। কখনো যত্ন করো, কখনো দূরে ঠেলে দাও, কখনো মম ডাকো, কখনো আন্টি… তুমি আসলে কেমন? বুঝি না আমি।”

প্রীভান সরল গলায় শান্তভাবে বলল,
"আমি কবে যত্ন করলাম তোমার?"

কায়রা হেসে উঠলো,
"কেন? করো নি? স্কুল থেকে ফেরার সময় টুকটাক আমার পছন্দের খাবার আনা, আমার উল্টোপাল্টা কাজ লুকানো, আমাকে তোমার পাপার বকার হাত থেকে বাঁচিয়ে নেওয়া এসব করতে না তুমি? এগুলোকে কি বলে?"

প্রীভান মাথা নাড়ে। কায়রা হেসে হঠাৎ প্রীষানকে বলে,
"আপনাকে আজ সত্যিটা বলেই দেই। কিছুদিন আগে ভাবীর বাসায় যাওয়ার সময় আপনার গাড়ি নিয়ে গেছিলাম। কিন্তু ফিরেছিলাম গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে। ওইদিন আপনি জিজ্ঞেস করলেন না গাড়ির কাচ ভেঙেছে কে? ওইদিন আসলে কাচ'টা আমিই ভেঙেছিলাম। কিন্তু প্রীভান দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে বলেছে, ওর বল লেগে কাচ ভেঙেছে। কথাটা ডাহা মিথ্যা। সেদিনের সব দোষ আমার ছিলো।"

প্রীষান চুপ করে রইলো, থমকে গেছে সে। তার চোখে বিস্ময়। প্রিহাও অবাক। প্রীষান বিস্মিত হয়ে তাকায় ছেলের দিকে। প্রীভান কিছু বলে না, চুপ মেরে থাকে। কায়রা আবার বলল,
“শুধু তাই নয়। দু’মাস আগে সকালে যে কুলকুচির পানি পড়েছিলো এক লোকের গায়ে, সেটাও আমি ফেলেছিলাম। প্রীভান না।”

প্রীষান কি বলবে বুঝতে পারে না। কায়রা এবার প্রিহা আর প্রীভানকে বলে,
"আমি কখনো তোমাদের দুজনের মা হতে পারবো না। পেটে ধরিনি যে, তাই সম্ভব না এটা, জানি। জীবন তো আর সিনেমা নয়, যে তোমরা আমাকে মেনে নেবে।  আর মা হওয়ায় মতো বোঝদার-পরিপক্কও নই আমি। তাছাড়াও অবাক করার বিষয় হলো, আমার পেটে যে দুটো রয়েছে ওদেরই ফিল করতে পারছি না। কিভাবে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না, তোমার পাপা জানে সব। তবে হ্যাঁ, তোমাদের পাপার পর তোমাদের জীবনে যাকে সব মুহুর্তে পাশে পাবে, সে মানুষটা আমিই হবো। প্রিহার বেস্ট ফ্রেন্ড তো হয়েই গেছি। এবার প্রীভানের বাকি। আর ভালোবাসার কথা যদি বলো, তাহলে বলবো আমি তোমাদের দুজনকেই ভালোবেসে ফেলেছি। আমি ওই রাগী-অবুঝ প্রীভানকেও ভালোবাসি আবার কেয়ারিং প্রীভানকেও ভালোবাসি। আমি আগাগোড়া মিষ্টি মিষ্টি প্রিহাকেও ভালোবাসি।"

প্রিহা এগিয়ে এসে কায়রার হাত ধরলো,
"খারাপ লাগলেও তোমার কথাগুলো সত্যি, মম। মাকে খুব বেশিদিন না পেলেও আমরা হয়তো আমাদের মায়ের মতো তোমাকে কখনো ভালোবাসতে পারবো না। কারণ, মা তো একজনই হয়। কিন্তু এখন পাপার পর তুমি,'ই আমাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তুমি আমার কম্ফোর্টজোন। আমি তোমাকেও ভালোবাসি।"

কায়রা আলতো হাসে। হঠাৎ প্রীভান
বলে গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
"আচ্ছা, ভাই নাকি বোন হবে?"

এবার সবাই একসাথে হেসে উঠে। প্রীভানের মুড চেঞ্জ হয়ে গেছে। কায়রা জিজ্ঞেস করে,
"কি চাও তুমি?"

"বোন। দুটো বোন আসুক। আপুটার সাথে প্রতিদিন ঝগড়াঝাটি হয় আমার।"

প্রিহা তৎক্ষনাৎ বলে,
"না না। দুটো ভাই আসুক। বোন চাইনা আমি।"

"নাহ। বোন আসবে দেখিস!"

"তুই বেশি জানিস?"

কায়রা হেসে ফেলে দুজনের বাচ্চামিতে। প্রীষান নিজেও হাসছে। সে এবার কায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
"খুশি এবার? বলেছিলাম না আমার ছেলেমেয়ে দুটো খুব বোঝদার। ওরা ভুল বুঝবে না। দেখেছো?"

কায়রা হেসে বলে,
"জ্বি, বুঝলাম।"

প্রীষান এবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
"এবার তুমিও বলে ফেলো, এই রাগী-গম্ভীর প্রীষানকে নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে?"

কায়রা আলতো হেসে প্রীষানের হাতদুটো আলতো করে ধরে বলে,
"উহু! আমার জীবনকে একটা সুন্দর পুর্নতা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। কোনো অভিযোগ নেই। যা আছে শুধুই এক আকাশ সমান ভালোবাসা।"

প্রীষানের কুঁচকানো কপাল সিথিল হয়। কায়রার হাতের পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
"সেইম টু ইয়্যু, ওয়াইফি। এন্ড আই লাভ ইয়্যু টু।"

------------------------

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামার মুখে। ঘরজুড়ে আধো অন্ধকার, জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাসে পর্দাগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। বিছানার একপাশে উপুড় হয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে কাবির। ক্লান্ত শরীরটা নিশ্চিন্তে এলিয়ে দিয়েছে নরম বালিশে। অথচ তার পাশেই বসে থাকা প্রীতিষার বুকের ভেতর ঝড় বইছে আজ। হতবম্ব হয়ে বসে আছে সে। দুই হাতে শক্ত করে ধরা দুটো প্রেগন্যান্সি কিট। সাদা সরু স্ট্রিপের ওপর জ্বলজ্বল করছে দুটো লাল দাগ।স্পষ্ট, নির্ভুল বার্তা দিচ্ছে। যে নতুন কেউ আসছে।

কিন্তু এই আসা তো এখনই হওয়ার কথা ছিলো না। তাদের স্বামী-স্ত্রী কারোরই পরিকল্পনা ছিলো না এখনই। প্রীতিষা চাইলেও কাবির নিজেই বলেছিলো, পড়াশোনা শেষ হোক আগে, তারপর বাচ্চা নিয়ে ভাববে। পরে প্রীতিষাও মেনে নিয়েছিলো কথাটা। সবে তো সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে সে। সামনে লম্বা পথ, নিজের স্বপ্ন, একটা জার্নি। এক হাতে সব সামলে এত কিছুর মাঝে একটা ছোট্ট প্রাণকে কিভাবে সামলাবে সে? তবুও জীবনে সবকিছু বোধহয় পরিকল্পনা মেনে আসে না। যে আসার, সে উপরওয়ালার ইচ্ছেতেই আসে। তাকে আটকানোর সাধ্যি কোনো মনুষ্যের নেই।

হঠাৎ কাবির ঘুমের ঘোরে সামান্য নড়েচড়ে উঠলো। প্রীতিষা কাঁপা হাতে তার পিঠে চাপড় দিলো, 
 “কাবির… এই কাবির… উঠো তো।”

কাবির চোখ না খুলেই ওপাশ ফিরে শুয়ে গুমরে বলল,
 “ডাইকো না সোনা… ঘুম পুরা হয় নাই আমার…”

 “উঠো না প্লিজ। কথা আছে।”

 “রাইতে শুনমু নে…”

প্রীতিষার বুকের ভেতরের ভয়, দুশ্চিন্তা, বিস্ময় সব একসাথে জমে হঠাৎ রাগ হয়ে বেরিয়ে এলো। প্রীতিষা কাবিরকে টলাতে না পেরে প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলো,
“আর কতবার ডাকলে উঠবে তুমি? তোমার বাচ্চা হবে আর তুমি আরামে ঘুমাও!”

এমন অতর্কিত চিৎকারে কাবির বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উঠলো। ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো সে। এলোমেলো চুল, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো প্রীতিষার দিকে। প্রীতিষা কি বলল একটু আগে? ভুল শুনলো না তো আবার। কাবির অবিশ্বাস্য গলায় বলে,
 “প্রীতি… কী বললা তুমি?”

প্রীতিষা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে কিট দুটো দেখালো। গলাটা কেমন কেঁপে উঠলো তার।
 “এই দেখো… একটু আগে টেস্ট করেছি। দুটোই পজিটিভ দেখাচ্ছে…”

কাবির তাড়াহুড়ো করে ছো মেরে কিট দুটো হাতে নিলো। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইলো লাল দাগগুলোর দিকে। ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। তারপর অবিশ্বাস মেশানো বিস্ময়ে বলল,
 “কেমনে হইলো এইটা?”

প্রীতিষা সঙ্গে সঙ্গে চোখ গোল করে তাকালো,
 “কিভাবে হলো মানে? ফাজলামি করছো আমার সাথে?”

পরমুহূর্তেই কাবির আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। হঠাৎ এগিয়ে এসে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো প্রীতিষাকে। আর তখনই মেয়েটা ভেঙে পড়লো। কাবিরের গায়ের শার্ট দুহাতে চেপে বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো সে,
 “আমি না বুঝতে পারি নি ও এসে যাবে...কিভাবে যে ঘটলো এসব? আমি কিছু জানি না, তোমার দোষ সব…”

কাবির হেসে ফেললো। সেই হাসিতে বিস্ময় আছে, সুখ আছে, অদ্ভুত এক কাঁপা কাঁপা আনন্দও আছে। সে প্রীতিষার মুখটা তুলে দুই গাল আলতো চেপে ধরে গুনগুন করে গান গেয়ে উঠলো কাবির,

“ঘটনা এমনি ঘটে না, ও বন্ধুরে…
এক হাতে তালি বাজে না…”

এমন গান শুনে কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেললো প্রীতিষা। নাক টেনে কাবিরের বুকে হালকা ঘুষি মারলো,
“ছিঃ! অসভ্য গান…এখন অন্তত মজা করো না কাবির। সিরিয়াস হও একটু।”

কাবির এবার সত্যিই শান্ত হয়ে গেলো। মজা সরিয়ে রেখে ধীরে ধীরে প্রীতিষার মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিলো। বড় একটা নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
 “আচ্ছা… আর মজা করমু না। একটু এইভাবেই থাকো তো। বুকে থাকো কিছুক্ষণ।”

প্রীতিষা নিঃশব্দে মাথা রেখে পড়ে রইলো কাবিরের প্রশস্ত বুকের ওপর। কাবিরের বুকের ধুকপুক শব্দটা আজ কেমন অন্যরকম লাগছে। কিছুক্ষণ পর কাবির খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“বাচ্চা, সংসার, আমি। সব একসাথে সামলাইতে পারবা তো?”

প্রীতিষা এক মুহূর্ত দেরি করলো না। কাবিরের হাত শক্ত করে চেপে ধরে মাথা নাড়লো,
 “পারবো। সব পারবো। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো সারাজীবন। আর কিছু চাই না।”

কাবির উত্তর দিলো না। শুধু মেয়েটার মাথায় গভীর মমতায় একটা চুমু এঁকে দিলো। জীবন একসময় তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিলো। তবু শেষমেশ জীবনই আবার ফিরিয়ে দিয়েছে ভালোবাসা, ঘর, শান্তি। আর এখন, তাদের দুজনের মাঝখানে বেড়ে ওঠা একটুকরো পূর্ণতা। অপূর্ণ মানুষ দুটো অবশেষে সম্পূর্ণ হলো। পুর্ণ হলো।

--------------------------

রাতটা ছিলো অদ্ভুত শান্ত। শহরের কোলাহল অনেক দূরে কোথাও থেমে গেছে। ছাদের একপাশে মাদুর পেতে বসেছে কায়রাভ, কায়েশী, কায়ান আর ছোট্ট কৌশিক। আকাশভরা তারা, হালকা বাতাস আর নরম চাঁদের আলো মিলেমিশে রাতটাকে করে তুলেছে কোমল।

কায়ান জেদ ধরেছিলো বলেই তাকে ছোট্ট একটা পাটি পেতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোলে কৌশিককে নিয়ে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভাইটার মুখের দিকে। সেই দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে, মায়া আছে, আর আছে অদ্ভুত এক দায়িত্ববোধ। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা এখন তার কোলে। কৌশিক অবশ্য কিছুই বোঝে না। ছোট্ট হাত-পা নাড়িয়ে কখনো হাওয়ায় আঁকিবুঁকি কাটছে, কখনো চোখ পিটপিট করছে। আর কায়ান মনে মনে হয়তো ভবিষ্যৎ সাজিয়ে ফেলছে। যে, ভাইটা একটু বড় হলেই ওরা একসাথে দৌড়াবে, খেলবে, ছাদজুড়ে হৈচৈ করবে। শিশুমন তাই খুব আগ্রহী। 

সেই দৃশ্য দেখেই কায়েশীর ঠোঁটে ধীর এক হাসি ফুটে উঠলো। মাতৃত্ব মানুষকে কেমন নরম করে দেয়! আগে যে মেয়ে সামান্য কথাতেই তেড়ে আসতো, রেগে যেত, আজ সে একই মানুষ হয়েও কত শান্ত।

বাচ্চাদের থেকে চোখ সরিয়ে পাশে বসা কায়রাভের দিকে তাকাতেই দেখলো, সেও তাকিয়ে আছে। চাঁদের আলোয় লোকটার চোখদুটো আজ অদ্ভুত কোমল লাগছে। কায়েশী একটু সরে এসে কায়রাভের এক হাত জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা রাখলো তার কাঁধে। তারপর খুব আস্তে বলল,
" ধন্যবাদ। "

কায়রাভ ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু গলায় বলল,
" কেন? তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করার জন্য?"

কায়েশী সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকালো। চোখদুটো কেমন গোল হয়ে গেছে। ত্রস্ত চোখে চেয়েছে কায়েশী। 
" আপনার কি আমার সাথে কখনো ভালোভাবে থাকতে ইচ্ছে করে না? সবসময় খালি ঝগড়া করতে মন চায়?"

কায়রাভ হেসে উঠলো। সেই হাসিতে পুরোনো দিনের ছেলেমানুষি লেগে আছে। বলল,
" তা না। আসলে আমার সেই পুরোনো রাগী, তেজি কায়েশীটাকে খুব পছন্দ ছিলো। ওই মেয়েটার মধ্যে অন্যরকম একটা ব্যাপার ছিলো। ইয়্যু নো? "

কায়েশী ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
" তার মানে এখন আমাকে ভালো লাগে না?"

কায়রাভ এবার সত্যি সত্যিই ভড়কে গেলো।
" আরে না! এসব কী কথা? কায়েশী যেমনই হোক, সে তো আমারই। ঝগড়ুটে কায়েশী যেমন প্রিয়, তেমনি এই শান্ত, বউ বউ হয়ে যাওয়া কায়েশীও আমার ভীষণ প্রিয়।"

কথাটা শুনে কায়েশীর চোখে চিকচিক করে উঠলো নরম তৃপ্তি। সে আবার মাথাটা এলিয়ে দিলো কায়রাভের কাঁধে। বাতাসে এবার কেমন এক ঘরভরা সুখের গন্ধ। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর কায়রাভ ধীরে বলল,
"আজ কাবির ফোন করেছিলো। আমরা চাচা-চাচি হচ্ছি।"

কায়েশী এক মুহূর্ত চুপ রইলো। তারপর ঠোঁটের কোণে খুব মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
" সুখে থাক ওরা।"

এই ছোট্ট কথাটার মাঝেই কত না প্রার্থনা লুকানো। কিছু সম্পর্ক দূরে গিয়েও মনের ভেতর নরম জায়গা দখল করে থাকে। সেখানে রাগ থাকে না, থাকে শুধু নিঃশব্দ শুভকামনা। 

উপরে আকাশে চাঁদ তখন ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে ঢুকছিলো। আর ছাদের সেই ছোট্ট পরিবারটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, সুখ আসলে খুব বড় কিছু না। প্রিয় মানুষগুলোর পাশে নির্ভার হয়ে বসতে পারার নাম'ই সুখ। যে সুখ ধরা দিয়েছে কায়রাভের পরিবারেও।
 
************************

আট বছর পর....

আটটি বছর সময় নদীর মতো বয়ে গেছে। একসময় যে ঘরটা গম্ভীর-ভারী ছিলো, আজ সেই ঘর ভর্তি কোলাহল। মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, পুরোনো মানুষগুলো একটু বড় হয়েছে, সম্পর্কগুলো আরও একটু গভীর হয়েছে।

ড্রয়িংরুমজুড়ে ছুটোছুটি করছে প্রবীর আর প্রকৃতি।
প্রীষান আর কায়রার সন্তান। এক ছেলে এবং এক মেয়ে হয়েছিলো ওদের। প্রীষান আর কায়রার সংসারে আল্লাহ একসাথে ছেলেমেয়ে দুটোই পাঠিয়েছেন। যেন প্রীভান আর প্রিহার অপূর্ণ ইচ্ছে দুটো পূর্ণ করতেই তাদের আগমন। প্রীভান পেয়েছে ছোট্ট এক আদুরে বোন, আর প্রিহা পেয়েছে আদুরে এক ভাই। দুজনের ইচ্ছেই পুরণ করেছে আল্লাহ। 

বর্তমানে, দৌড়াতে দৌড়াতে আচমকাই হোঁচট খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো প্রকৃতি। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরময় ভেসে উঠলো তার কান্নায়। পড়ে গিয়েই উচ্চস্বরে কাঁদা শুরু করে প্রীষানের আদুরে কন্যা। সেই কান্নার শব্দ প্রীভানের বুকের ভেতর গিয়ে লাগলো। শব্দ পেয়ে দরজার দিক থেকে দ্রুত ছুটে এলো প্রীভান।

এই প্রীভান আর সেই ছোট্ট, ভীতু ছেলেটা নেই। সময় তাকে লম্বা করেছে, পরিণত করেছে। সে এখন ভার্সিটিতে অধ্যয়নরত যুবক। শরীরে, বুদ্ধিতে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে সে। কাঁধে দায়িত্ব মানিয়েছে, সবাইকে এনে দিয়েছে আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। তাই এসেই সে বোনটাকে কোলে তুলে নিলো। বারবার গালে, কপালে চুমু খেতে খেতে নরম স্বরে বলল,
"ওওও… কাঁদে না বোনু। এই তো ভাইয়া এসেছি।ওওও…"

বড় ভাইয়ের বুক পেতেই প্রকৃতির কান্না ধীরে ধীরে থেমে গেলো। প্রীষানের পর প্রীভানকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে প্রকৃতি। ভাইয়ের আদর পেয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে ছোট্ট আঙুল তুলে নালিশ করলো,
"ওই প্রবীর আমাকে ধাক্কা দিয়েছে, ভাইয়া! ওকে এক্ষুনি মারো!"

প্রবীর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো,
" না, ভাইয়া! আমি ধাক্কা দেইনি। খেলতে গিয়েই পড়ে গেছে ও। কত বড় মিথ্যুক দেখো, সব দোষ আমার ঘাড়ে দিচ্ছে! মম'কে বলে দেব আমি!"

প্রীভান এবার চোখ সরু করে তাকালো প্রকৃতির দিকে। প্রকৃতি তখন কৌশলী মুখ করে ভাইকে গলাতে ভাইয়ের গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
"আমি সত্যিই বলছি ভাইয়া… ওই প্রবীর একটা পঁচা ছেলে!"

আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না প্রীভান। সে বোনের নাক টিপে দিয়ে বলল,
"ওরে! আমাকে পটানো হচ্ছে নাকি?"

তারপর প্রীভান প্রবীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"শোন, আপুর ঘরে গিয়ে দেখে আয় তো, আপু রেডি হয়েছে কিনা। লোকজন চলে আসবে একটু পর। আমি প্রকৃতিকে রেডি করিয়ে আনছি।"

"ওকে!"

এই বলেই ভো দৌড় দিলো প্রবীর। আর প্রকৃতি খিলখিল করে হাসতে হাসতে ভাইয়ের কোলেই গা এলিয়ে দিলো। এদিকে প্রবীর গিয়ে উঁকি দিলো প্রিহার ঘরে।
"আপুউউ! রেডি তুমি? ভাইয়া পাঠিয়েছে আমাকে!"

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করছিলো প্রিহা। সেই প্রিহা ষোড়শী বয়স পেরিয়ে এখন পূর্ণ যুবতী। মেডিকেলে একসাথে ইন্টার্ন করছে সে আর সুহৃদ। আজ সুহৃদ তার পরিবার নিয়ে আসছে তাদের সম্পর্কটাকে আনুষ্ঠানিক নাম দিতে। যেমনটি তারা ভেবে রেখেছিলো। এদিকে প্রিহা কুচি সামলাতে সামলাতে বলল,
" হ্যাঁ রে ভাই, রেডি। কিন্তু কুচিটা... একটু ধরে দিবি?"

প্রবীর বাধ্য ছেলের মতো এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে বসে এক এক করে শাড়ির কুচিগুলো গুছিয়ে ধরতে লাগলো। কাজ শেষে খুশি হয়ে প্রিহা ওর গাল টিপে বলল,
" থ্যাংক ইয়্যু, ভাই। আচ্ছা, পাপা বাড়িতে ফিরেছে?"

প্রবীর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
" কি জানি! শুধু ভাইয়াকে দেখলাম।"

প্রিহা আর কিছু বলল না। ওর হাত ধরে বেরিয়ে এলো বাইরে। এসেই দেখলো সোফার উপর রাজকন্যার মতো বসে আছে প্রকৃতি। লাল টকটকে ফ্রক পড়িয়ে দিয়েছে প্রীভান। তাই প্রকৃতি বসে বসে পা দোলাচ্ছে আর নিজের ফ্রকের ঝালর নিয়ে খেলছে। মেয়েটা অবিকল প্রীষানের মতো হয়েছে, চোখ দুটো পর্যন্ত।
আর প্রবীর পেয়েছে কায়রার শান্ত, মায়াময় চেহারা।
প্রিহা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
"বোনু, মম কোথায় রে?"

"রান্নাঘরে।"

উত্তর শুনে রান্নাঘরের দিকেই হাঁটলো সে। নিশ্চয়ই কায়রা একা হাতে সব সামলাচ্ছে। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো প্রীষান। দু’হাত ভর্তি মিষ্টির বাক্স আত্মীয়দের জন্য। 

"পাপায়ায়ায়া!"

প্রীষানকে দেখেই চিৎকার করে দৌড়ে এলো প্রকৃতি।
এত বছর পরেও প্রীষান এখনো সেই আগের মতোই আছে। সত্যিই প্রীষানের বয়স যেন আর বদলাতেই চাইছে না। সাতচল্লিশ বছর বয়স প্রীষানের, কেউ বলবেই না। মেয়েকে দৌড়ে আসতে দেখে প্রীষান তাড়াতাড়ি হাতে থাকা বাক্সগুলো সেখানেই নামিয়ে মেয়েকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো। ফোলা ফোলা গালে একগাদা চুমু খেয়ে বলল,
"মাম্মাহ! পড়ে যেতে তুমি! এভাবে দৌড়ে আসে না। পাপা তো তোমার কাছেই আসতাম।"

প্রকৃতি কিছু না বলে বাবার বুকেই মুখ গুঁজে রইলো।
মেয়েকে কোলে নিয়েই প্রীষান এগিয়ে গেলো প্রবীরের কাছে। ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"বাকিরা কই, বাবা?"

প্রবীর কিছু বলার আগেই সামনে এসে দাঁড়ালো প্রিহা।
কিন্তু এবারে প্রিহার মুখটা অন্য রকম, অদ্ভুত ভাব।
এদিকে শাড়ি পরা মেয়েটাকে দেখে প্রীষানের চোখে মুহূর্তেই ধাঁধিয়ে গেলো। মেয়েকে প্রশংসা করে বলল,
" প্রিন্সেস! শাড়িতে তোমাকে জাস্ট অপূর্ব লাগছে। কিন্তু গলা খালি কেন? একটা সিম্পল নেকলেস পরতে!"

প্রিহা মুচকি হেসে বলল,
" থ্যাংক ইয়্যু, পাপা। কিন্তু নেকলেস লাগবে না।"

তারপর একটু থেমে প্রীষান জিজ্ঞেস করলো,
" সুহৃদরা কখন আসবে? কিছু বলেছে তোমাকে?"

" হুম। বেরিয়েছে। রাস্তায় আছে।"

এরপরই প্রিহার মুখের ভঙ্গি হঠাৎ বদলে গেছে।  জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে প্রিহা ধীরে বলে উঠলো,
" বলছি পাপা… তুমি একটু মমের কাছে যাও তো। বোনকে দাও আমার কাছে।"

প্রীষানের বুকটা ধ'ক করে উঠলো আচমকা। মেয়ের মুখের এমন অদ্ভুত ভাব নজরে এসেছে তারও! প্রিহার পাল্টে যাওয়া মুখ দেখে ঘাবড়ে গেল প্রীষান। ততক্ষনে প্রকৃতিকে কোলে তুলে নিয়েছে প্রিহা। উদ্বিগ্ন স্বরে প্রীষান বলল,
" কী হয়েছে প্রিন্সেস? তোমার মুখটা এমন লাগছে কেন? এনিথিং রং?"

প্রিহা হেসে মাথা নেড়ে বললো,
"ধুর পাপা, সব ঠিক আছে। আসলে একটু শকড হয়েছি। তুমি যাও না, মমের কাছে। গুড নিউজ আছে। দ্রুত যাও।"

প্রীষানের মাথায় তৎক্ষনাৎ ধরলো না প্রিহার কথা। তাই আর কিছু না ভেবেই ঘরের দিকে দ্রুত পা চালালো প্রীষান। ঘরে ঢুকতেই দেখলো, কায়রা বিছানায় বসে আছে চুপচাপ। প্রীষান যাওয়ার আগে দেখেছিলো মেয়েটা রান্নাঘরে ব্যস্ত। কিন্তু সে এখন এমন নিশ্চুপ কেন? উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে গিয়ে কায়রার কপালে, গলায় হাত রাখলো প্রীষান। কিন্তু না, সব স্বাভাবিক। তাই জানতে চাইলো,
"শরীর খারাপ লাগছে?"

কায়রা মাথা নেড়ে বলল,
"না।"

প্রীষান অধৈর্য্য হয়ে বলে,
"তাহলে? এভাবে বসে আছো কেন? এভাবে বসে থাকার মেয়ে তো তুমি নও! কী হয়েছে বলো?"

কায়রা ধীরে ঢোক গিলে প্রীষানের হাতটা নিয়ে নিজের পেটের উপর রাখলো। তারপর মৃদু গলায় ভয়ে ভয়ে বলল,
"আপনার ডাক্তার মেয়ে এসে আমাকে দেখে গেলো। প্রিহা চেক করে বলেছে… আপনি আবারও বাবা হতে চলেছেন।"

প্রীষানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। ঠোঁট ফাঁক হয়ে রইলো বিস্ময়ে। কায়রা নিচু স্বরে বলল,
"এবার মানুষ কী বলবে? মেয়ে বিয়ে দেবো আমরা, আর এখন আবার..."

কায়রার কথা শেষ করতে দিলো না প্রীষান। হালকা ধমকের সুরে বলল,
"অন্য মানুষ আমার ছেলেমেয়েদের বড় করবে? খাওয়াবে? পড়াবে? তাহলে মানুষের কথা এত ভাবছো কেন? আশ্চর্য কথাবার্তা!"

তারপর প্রীষান কায়রার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে নরম গলায় বলল,
"আর মেয়ে বিয়ে দেবো তো কী হয়েছে? কোনো পাপ করে ফেলিনি আমরা। এটা ব্লেসিং আমাদের জন্য। তাছাড়া, প্রীষান অলওয়েজ প্রিপেয়ার্ড টু ওয়েলকাম হিজ চাইল্ড ইন্টু দ্য ওয়ার্ল্ড।"

কায়রার চোখ ভিজে উঠলো নিমেষেই। প্রীষানের এই সহজ কথাগুলো বার বার আপ্লুত করে কায়রাকে। 
সে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো প্রীষানকে। প্রীষানও বুকের ভেতর আগলে নিলো তার সমস্ত পৃথিবীটাকে।

এটাই ছিলো এ-যুগে তাদের রূপকথার গল্প। সেখানে তিনজন রাজা ছিলো, তিনজন রাণী ছিলো। আর ছিলো তাদের রাজপুত্ররা এবং রাজকন্যারা। সম্পর্ক ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমানের পর্ব পেরিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিলো। শেষমেশ সবাই নিজের মতো করে সুখ খুঁজে পেয়েছিলো। 

আর তারপর....
ভালোবাসার রাজ্যে আপন মানুষদের নিয়ে তারা সুখেই বসবাস করতে লাগলো।

   

--------------------------|| সমাপ্তি || --------------------------

📌 অবশেষে শেষ হলো তিন জুটির রূপকথার গল্পের দীর্ঘ জার্নি। কয়েকটা মাস ধরে চরিত্রগুলোর ভালোবাসা, অভিমান, অপেক্ষা আর মিশ্র অনুভূতির অসংখ্য মুহূর্ত নিয়ে লিখেছি। লিখতে লিখতে চরিত্রগুলোয় ডুবে ছিলাম। তাছাড়া, পাঠকদের ভালোবাসা, অপেক্ষা আর প্রতিটি প্রতিক্রিয়া আমাকে প্রতিদিন নতুন করে লিখতে শিখিয়েছে। ভুল-ত্রুটি নিশ্চয়ই ছিল, আছে- সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আশা করি, গল্পের কোনো না কোনো চরিত্র, কোনো সংলাপ কিংবা কোনো অনুভূতি আপনাদের হৃদয়ে একটু হলেও জায়গা করে নিতে পেরেছে। কখনো আপনারা চাইলে সারপ্রাইজ পর্ব দেবো ওদের নিয়ে। 🌸

হ্যাপি রিডিং....

 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

একটুকরো কাবির প্রীতিষা

সারপ্রাইজ পার্ট✨

পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা পথটা কোথাও গিয়ে আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে। চারপাশে শুধু গাঢ় সবুজের সমুদ্র। দূরে দূরে মেঘের দল পাহাড়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। পাহাড়ের ঢালে সাদা কুয়াশার চাদর বিছিয়ে আছে। দূরের চূড়াগুলোকে মনে হচ্ছে মেঘের ভেলায় ভাসমান কোনো স্বপ্নরাজ্য। সেই পথ ধরেই হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলেছে কাবির আর প্রীতিষা। পাহাড়ের প্রতি কাবিরের টানটা বরাবরই অদ্ভুত। তাই সুযোগ পেলেই সে শহরের কোলাহল ছেড়ে হারিয়ে যায় কোনো না কোনো পাহাড়ি জনপদে। তবে এবারের যাত্রাটা আলাদা। কারণ এবার তার সঙ্গী প্রীতিষা।

ভোর সকালে রওনা দিয়েছিলো দুটোয় মিলে। এতক্ষন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়কের রাস্তা পেড়িয়ে বাইকে পৌছিয়েছে দুজন। প্রীতিষার পরীক্ষা শেষে কাবিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী দু'দিনের জন্য শহর, ব্যস্ততা, নিয়ম—সবকিছু ফেলে রেখে তারা এসেছে পাহাড়ের কোলে। কাবিরের চোখে-মুখে চিরচেনা দুরন্তপনা, উচ্ছ্বাস। আর প্রীতিষা মুগ্ধ বিস্ময়ে চারপাশ দেখছে, নিজের স্বামীর সাথে আরও একটি এডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে পড়েছে সে। তবে প্রীতিষা অনুভব করছে, কাবিরের সাথে ভিন্ন ভিন্ন এডভেঞ্চারে পৃথিবীটাকে নতুন করে আবিষ্কার করছে সে। যা এতদিন তার কল্পনারও বাইরে ছিলো। 

প্রীতিষার পরনে আকাশি রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্ট। যদিও প্রীতিষা এসব পড়ে না, কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় সাফার করার জন্য কাবির নিজেই বুদ্ধি করে প্রীতিষাকে বলেছে টি-শার্ট পরতে। সকালের হিমেল বাতাসে মেয়েটার টি-শার্টের প্রান্ত হালকা দুলে দুলে উঠছে। মেয়েটার কাঁধ ছুঁয়ে থাকা ঘন চুলগুলো পনিটেল করে বাঁধা। মাঝে মাঝে বাতাস এসে কপালের সামনের বেবি হেয়ারগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। মেয়েটার মুখে একফোঁটা সাজ নেই, অথচ পাহাড়ি সকালের নির্মল আলোয় তাকে মনে হচ্ছে শিশিরভেজা কোনো বুনো ফুল। কাবির মনে মনে এই উপমাই দিয়েছে। অন্যদিকে কাবিরের চেহারায় চিরচেনা ভবঘুরে, ছন্নছাড়া ভাব। পরনে জলপাই রঙের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। শার্টটা খুলে কোমরে গিট বেঁধে রেখেছে, গা উদাম। এলোমেলো ঝাকড়া চুল আর চোখভরা দুষ্টুমি তাকে আরও বুনো করে তুলেছে। প্রীতিষার মতে, হ্যান্ডসাম বুনো ষাড়। 

প্রীতিষা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেখছিলো বেশ আগ্রহী হয়ে। সবকিছুর জন্য ভীষণ কৌতূহলী লাগছে ওকে। পাহাড়ের ঢালজুড়ে নাম না জানা বুনো ফুল ফুটে আছে। কোথাও লাল, কোথাও হলুদ, কোথাও আবার বেগুনি রঙের ছোট ছোট ফুল বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে। দূরে অরণ্যের ভেতর থেকে ভেসে আসছে অচেনা পাখির ডাক। এসবে কাবিরের সাথে সাথে প্রীতিষা নিজেও ভীষণ উদ্‌গ্রীব। হঠাৎ কাবির হাত তুলে সামনে দেখালো,
"ওই যে, দেখছো? নদী।"

প্রীতিষা সঙ্গে সঙ্গে তাকালো। দেখলো, পাহাড়ি নদীর অনবদ্য রুপ। সে নদীর জল স্বচ্ছ কাঁচের মতো লাগছে। নিচের ছোট ছোট নুড়িগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবু স্রোতের কলকল শব্দে একটু ভয় ভয় করছিলো প্রীতিষার।  কিন্তু কাবিরকে নদীতে নামার প্রস্তুতি দেখে প্রীতিষা দ্বিধাগ্রস্ত চোখে তাকালো নিজের স্বামীর দিকে। ইতিমধ্যে কাবির কোমরে বাঁধা শার্টখানা খুলে ফেলেছে। ধারে পৌঁছেই কাবির সু-জুতো খুলে ছুড়ে ফেলল একপাশে। এরপর কাবির প্রীতিষার দিকে তাকালো। প্রীতিষা একটু ইতস্তত করে বলল,
"কাবির, বলছি যে তুমি নামো। আমি যাবো না। আমার ভয় লাগে।"

ভয়কাতুরে প্রীতিষাকে দেখে কাবির বলল,
"আরে ভাই! পানিতে না নামলে মজাই পাবা না। তোমার ভাই তোমারে ঘরে বসায় রাইখা ডরপোক বানাইছে। এখন আমি আছি না, আসো!"

প্রীতিষা জলের গভীরতা বুঝে আঁতকে উঠলো। আবারও মানা করলো সে,
"আমি তো সাঁতার জানি না!"

কাবির হেসে উঠলো,
"না জানলা। আমি তো জানি। আমি থাকতে তোমার ডর কিসের, প্রীতি?"

এই বলে কাবির নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো। আর প্রীতিষার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল,
"বিশ্বাস করো না আমারে?"

প্রীতিষা কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো ভয় সরাতে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কাবিরের হাত চেপে ধরলো। আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না প্রীতিষা বলতে,
"তোমাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি।"

কাবিরের হাত শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করেছিলো প্রীতিষা। পরক্ষণেই কাবির প্রীতিষাকে নিজের কাছে টেনে জাপটে ধরে লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো নদীর ঠান্ডা জলে। মুহূর্তেই দু'জনের শরীর ছুঁয়ে গেলো নদীর শীতল জলরাশি। ঝপাৎ করে পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে অসংখ্য বুদবুদ ছড়িয়ে পড়লো। নদীর জল তাদের দু'জনকে টেনে নিলো কয়েক হাত নিচে। খুব বেশি গভীরে নয়—মোটামুটি আট-দশ ফুটের মতো নিচে নেমে গিয়েছিলো তারা। চারপাশে তখন শুধু সবুজাভ-নীল অন্ধকার আর ভেসে ওঠা রুপালি বুদবুদের সারি।

প্রীতিষার চুলগুলো জলের ভেতর শ্যাওলার মতো দুলে উঠছিল। কাবিরের হাত তখনও শক্ত করে ধরা তার হাতে। জলের নিচে কথা বলার উপায় নেই, তবু দু'জনের চোখে চোখ পড়তেই যেন হাজারটা কথা বিনিময় হয়ে গেলো।  কয়েক সেকেন্ড পর কাবির আলতো টান দিলো। দু'জন একসঙ্গে ওপরের দিকে ভেসে উঠতে শুরু করলো। মাথা পানির ওপর উঠতেই প্রীতিষা গভীর নিঃশ্বাস নিলো। ভেজা মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জলের ফোঁটা। কাবির প্রীতিষার কোমর আঁকড়ে ধরলো, যাতে ভয় না পায় মেয়েটা। আর প্রীতিষা ভারসাম্য রাখতে কাবিরের গলা জড়িয়ে রাখে। এরপর হেসে উঠে প্রীতিষা বলল,
"ইয়া আল্লাহ! কী ঠান্ডা!" 

এ কথায় কাবির চওড়া হাসলো। প্রথম ধাক্কায় ভয় পেলেও কিছুক্ষণ পর কাবিরের কাঁধ আঁকড়ে ধরে আবারও হাসতে লাগলো প্রীতিষা। নদীর বুকজুড়ে সেই হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো। তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না তা। মাঝে মাঝে কাবির ইচ্ছে করেই ডুব দিয়ে একটু গভীরে চলে যায় ওকে, আর প্রীতিষা আঁতকে উঠে বারবার তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তখন কাবির মজা করে বলে,
"এইডাই তো চাইছি রে, প্রীতি। ভয় পাইলে এমনে কইরা আমারে জড়াইয়া ধইরা থাকবা। ভাল লাগে খুব।"

প্রীতিষা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কাবিরের সুউচ্চ হাসি পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়। এই বেহায়া কাবিরের সাথে মেয়েটা কখনোই পেরে উঠবে না। কাবির এবার প্রীতিষাকে জিজ্ঞেস করে, 
"এবার সত্যি কইরা কও, ভাল লাগতাছে না? ইনজয় করতাছো? "

প্রীতিষা উচ্ছ্বসিত হয়ে উত্তর দেয়, 
"খুউউউব!"

এরপর কাবির প্রীতিষাকে পাড়ে আনে। সেখানেও বলতে গেলে জলের পরিমাণ অনেক। পাড়ে এনে একটা উঁচু ঢিবির উপরে প্রীতিষাকে বসিয়ে রেখে কাবির একটু ওপাশে গিয়ে তার আনা ব্যাগ খোলে। সেখান থেকে একগাদা আতশবাজি বের করে। অবশ্য সেসবের খেয়াল নেই প্রীতিষার। ও তো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আবেশে মগ্ন ছিলো। কাবির এবার আতশবাজিগুলো ধরিয়ে সরে আসে। এরপর প্রীতিষাকে আবার পানিতে নামিয়ে নিজের সাথে চেপে ধরে। প্রীতিষা অবাক হয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করে হঠাৎ দূরের আকাশে কয়েকটি আলো ছুটলো। শো শো করে। একটার পর একটা ছুটতে লাগলো। প্রীতিষা কাবিরের গলা জড়িয়ে রেখেই আকাশের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। মুহূর্তের মধ্যে স্বচ্ছ আকাশ রঙিন আতশবাজিতে ভরে উঠলো। লাল, নীল, সোনালি আলো ফুটে উঠছে একের পর এক। তারপর একসময় সব আলো যেন এক জায়গায় জড়ো হয়ে আকাশে লিখে ফেললো,
" I LOVE YOU "

প্রীতিষার মুখ হা হয়ে গেলো। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলো সে। প্রীতিষার চোখ দুটো আকাশের পানে আবিষ্ট থাকলেও কাবির এতক্ষণ প্রীতিষার সরল মুখটাই দেখছিলো। ওর সব খুশিই তো কাবিরের প্রাপ্তি। এবার কাবির বলল,
“এন্ড দিস ওয়ান ফর ইয়্যু, মাই লাভ...”

প্রীতিষার এবার অবাক চোখে তাকালো কাবিরের দিকে। আড়ষ্ট হাসলো ও। এসবের প্ল্যান তো জানায়নি কাবির। এই ছেলেটাকে আর কত ভালোবাসবে প্রীতিষা? সীমা তো সেই কবেই পেরিয়ে গেছে। কাবির বিমোহিত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার কপালের ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিলো। প্রীতিষা চোখ তুলে তাকালো তখন। দু'জনের মাঝখানের দূরত্বটুকু ক্রমশ কমে এলো। আজ ওই দূরত্বটুকু কমালো প্রীতিষা নিজেই, কাবিরের অধরজোড়া আঁকড়ে ধরে। প্রীতিষার ভেজা চুলের ভাঁজে কাবির আঙুল চালালো ধীরে ধীরে। এতে কাবির নিজেও অস্থির হলো একটু। তবে অশান্ত হলো না। নিজ স্বত্তাকে দমিয়ে আজ খুব শান্ত থাকলো কাবির। সে আজ উন্মত্ততা দেখালো না, বরং আপোসে মেয়েটার আদরটুকু গ্রহন করে গেলো কেবল।

পাহাড়ের মাথার ওপর তখনও হাজার আতশবাজি জ্বলছে। নিচে পাহাড়ি উপত্যকা। আর আকাশজোড়া রঙিন আলোর নিচে নদীতে ভেসে আছে দু'জন মানুষ। একজন ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, দুরন্ত, একটু উচ্ছৃঙ্খলও বটে। আর আরেকজন তার সমস্ত উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া শান্তির ঠিকানা, ভালোবাসা। সেদিন পাহাড় সাক্ষী ছিলো ওদের আনন্দের। ভালোবাসা মানে শুধু হাতে হাত রাখা নয়, কখনো কখনো একটা দুরন্ত মানুষের হাত শক্ত করে ধরে অজানার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার নামও ভালোবাসা হয়। 

 
|| সমাপ্তি ||

(🚫মূল গল্পের সাথে এ অংশের মিল নেই। যতই লিখি না কেন এদের, তবুও মন ভরে না। এদের নিয়ে আজ একটু লিখলাম শুধু, কাবির-প্রীতিষা ফ্যানদের জন্য। 
হ্যাপি রিডিং। মন্তব্য করবেন সবাই।💖)

Loading spinner

Reply
Page 6 / 7
Share:

Loading spinner