পর্বসংখ্যা:৪৫
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন আর আকাশে দিনের সেই উজ্জ্বল আলো নেই। দিনের উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে এসেছে ধীরে ধীরে। আকাশের রঙ এখন কোথাও ধূসর, কোথাও বা কালচে ছায়ামতো। দূরের গাছপালাগুলোও অস্পষ্ট হয়ে আসছে। শহরের প্রতিটি ঘরের জানালার ভেতর আলো জ্বলে উঠলেও বাইরের আলো হারিয়ে যাচ্ছে বরাবরের মতো। একটা শান্ত, একটু বিষণ্ণ সন্ধ্যার পর প্রকৃতি রাত নামানোর প্রস্তুতি করছে।
কাবিরের ঘরের ভেতর আধো আলো জ্বলছে। বিছানায় উপুড় হয়ে ভরসন্ধ্যায় শুয়ে আছে কাবির। পরনে সাদামাটা টি-শার্ট আর আরামদায়ক লুঙ্গি। তার শরীরটা আজ ভারী ক্লান্ত সারাদিনের খাটাখাটুনিতে। তার ওপর গতরাতে ল্যাপটপের সামনে জেগে থাকা। চোখ দুটো বন্ধ, কিন্তু ঘুমটা গভীর নয়। আধো আধো।
বিয়ের কিছুমাস পর থেকেই বদল এসেছে তার ভেতরে। নিজের পেশার পাশাপাশি এই কাজটাকেও গুরুত্ব দিয়ে ধরেছে সে। এবার বেশ সিরিয়াস হয়েছে কাবির। বুঝে গেছে, ভবঘুরে জীবনে আর যাইহোক সংসার চালানো যায় না।
কাবির সবসময় মানতো, 'অর্থ অনর্থের মূল'। তবে এই কথাটা সত্য হলেও, ভালোভাবে বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে কাবির বা প্রীতিষার কারোরই চাওয়া-পাওয়া খুব বড় নয়। যতটা থাকলে একজীবন সুখে পার করা যায়, অতটুকুতেই তুষ্ট তারা।
আধো ঘুমের মাঝেই ধীরে ধীরে শরীরটা ঘুরিয়ে ডান পাশে কাত হলো কাবির। আধখোলা চোখে দেখলো, প্রীতিষা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে। সেই দৃশ্যটা তার তন্দ্রা ভেঙে দিলো। এবার সে প্রায় জোর করেই চোখ মেলে তাকালো। দেখলো, প্রীতিষা চুল আচরাচ্ছে। সাদা রঙের কটন কামিজ, আর তার ওপর কাঁধের একপাশে রাখা রঙধনুর ন্যায় বিভিন্ন রঙের মিশেলে তৈরি রঙিন ওড়না।
কাবির কনুইয়ে ভর দিয়ে কাত হয়ে রইলো। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কই যাবা? এত সাজগোজ ক্যান?”
প্রীতিষা চট করে পেছনে ফিরে তাকালো। ঠোঁটে একটুখানি হাসি মেখে বলল,
“ওহ, তুমি উঠেছো! আরে ভুলে গেছো নাকি? আজ প্রিহার জন্মদিন। ভাইয়ার বাসায় যাবো, তাই রেডি হচ্ছি।”
কথাটা শুনে কিছু একটা মনে পড়লো কাবিরের। সত্যিই তো, প্রীতিষা আগেই বলেছিলো তাকে এই ব্যাপারে। নিজের ভুলে যাওয়া নিয়ে সে মৃদু মাথা নেড়ে হাসলো। তারপর হঠাৎ কী ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কাবির। প্রীতিষা তখন আয়নাতে অল্পস্বল্প সাজগোজে ব্যস্ত। ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসে বলল,
“চুল বাইন্ধা নেও।”
“হ্যাঁ, বাঁধছি, ”
বলতে বলতেই চুলে রাবার পেঁচিয়ে নিলো প্রীতিষা।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হালকা গলায় প্রীতিষা বলল,
“কাবির, তুমিও চলো না? তুমি গেলে ভালো হতো।”
কাবির বড়সড় একটা হাই তুললো। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট,
“যাইতে চাইছিলাম। কিন্তু ঘুমটা পুরা হয় নাই আমার। এখন গেলে বড়জোর আধাঘন্টা পরেই চোখ লাগবো। তখন কি করমু?”
প্রীতিষা ঠোঁট উল্টে একটু তাকালো। অবশ্য বুঝলো, কাবির যথেষ্ট ক্লান্ত, তাই বিশেষ জোর করলো না। সব প্রস্তুতি শেষ হলে কাবির'ই বাইক বের করলো প্রীতিষাকে পৌঁছে দিতে যাবে বলে। প্রীতিষাকে লেডিস জুতো পরতে দেখে কাবির বলল,
"পায়ের গোড়ায় ছিলে গেছে না তোমার? ব্যাথা পাবা তো এই জুতা পরলে! শু পরো আজকের মতো।"
প্রীতিষা মাথা নেড়ে জুতোটা তুলে রেখে শু-ই বের করলো। তবে বিপত্তি ঘটে ফিতে বাঁধার সময়। পারে না প্রীতিষা লেস বাঁধতে। এসব কাবিরের অজানা নয়। তাই মেয়েটা বলার আগেই কাবির এক হাঁটু গেড়ে বসে শু-এর লেস দুটো বেঁধে দেয়। এই কেয়ারিং কাবিরকে দেখে আরেকবার টুস করে প্রে'মে পরে যায় প্রীতিষা। মনে মনে ঠা'স ঠা'স করে কাবিরকে শ-খানেক চু'মুও দিয়ে ফেলে সে।
--------------------------
রাতের বাতাসে হালকা শীতলতা। রাস্তা প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। শুধু দুটো সিএনজি শো করে ছুটে গেছে। এদিকে চলন্ত বাইকে বসেই প্রীতিষা বলল,
“আমি একাই যেতে পারতাম। তোমার কষ্ট হলো অযথা।”
কাবির রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই জোর গলায় বলল,
“বউয়ের সেফটি সবার আগে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল প্রীতিষা,
“আচ্ছা, আমি ভাবছিলাম আজ ভাইয়ার বাসায় থেকে যাবো। কারণ, বার্থডে সেলিব্রেশন করতে করতে রাত একটা-দুটো বাজবে। অত রাতে আর তোমাকে আসতে হবে না। কাল সকালে তুমি নিতে এসো।”
কাবির এক মুহুর্ত চুপ থাকলো। মনে হলো কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। তারপর ফোস করে শ্বাস ফেললেও নরম গলায় বলল,
“বউ ছাড়া থাকতে পারুম না… স্যরি।”
প্রীতিষা এবার একটু জেদ করলো,
“প্লিজ কাবির, একটা রাতই তো। থাকি না?”
কাবিরের কণ্ঠ এবার একটু কঠোর হলো,
“তোমার সব আবদার মানি। কিন্তু এইটা না। তাই আজাইরা জেদ কইরো না, প্রীতি। যত রাতই হোক, আমারে ফোন দিবা। আমি আইসা নিয়া যামু।”
প্রীতিষা রীতিমতো ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,
“সবসময় এমন করো কেন? বিয়ের পর একদিনও থাকতে পারলাম না ও বাড়িতে! আমি কি মিস করি না ওদের!”
কাবির হালকা হাসলো। চোখ সামনে তার। একটু তাচ্ছিল্য হেসেই কাবির বলে,
“এতবছর একাই থাকলাম। তারপর তুমি আইসা অভ্যাস খারাপ করছো। এখন আবার সেই আমারে একা রাখার প্ল্যান করলে আমি সায় দিতাছি না দেইখা চেইতা যাইতাছো! বাহ!”
কথাগুলো শুনে প্রীতিষার মনটা একটু নরম হয়ে আসে। আর জেদ করে না সে। তবুও ভাই, ভাতিজাদের জন্য মনটা টানে খুব। শেষ পর্যন্ত আর কিছু বললো না সে। শুধু পেলব হাতদুটো দিয়ে কাবিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। অতি সন্তপর্ণে মাথা রাখলো প্রসস্ত পিঠটায়। এটাও সত্যি, সে নিজেও তো থাকতে পারবে না কাবিরকে ছাড়া। কাবির কি বুঝতে পারে না প্রীতিষাকে? এই মেয়েটাও ওর জন্য অতটাই পাগল, ঠিক যতটা কাবির।
ডান হাতে বাইকের হ্যান্ডেল আঁকড়ে রেখেই কাবির আরেকহাতে পেছন থেকে আলতো টানে প্রীতিষার হাতটি ধরে সামনে আনে। এসবে প্রীতিষা আলতো হাসে শুধু। তারপর মেয়েটার হাতের তালুতে ঠোঁট ছোঁয়ায় কাবির। চুমুর উষ্ণতা কিছুক্ষণ বুকে আগলে রেখে আবার দু’হাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে ছুটে চলল কাবির।
--------------------------
প্রিমাকে কড়া গলায় কথা শুনিয়ে বাড়ি ছাড়তে বলেছিলেন নিজাম উদ্দীন। কারণ, তার নজরে পরে গিয়েছিলো কায়রার বিরুদ্ধে প্রিমার করা ষড়যন্ত্র। প্রীষানের জীবনে আর কোনো অশান্তি চায় না সে। তাই নিজাম উদ্দীন সেদিন ছিলো প্রচন্ডরকম কঠোর। বাবার করা অপমানের কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে প্রিমা আর এক মুহূর্তও থাকেনি এ বাড়িতে। আর থাকবেই বা কিসের আশায়? প্রীষানকে ও কখনো পাবে না বুঝে গেছে। পাওয়ার সুযোগ নেই, একটুও নেই। প্রীষানকে ঘিরে তার না বলা স্বপ্নগুলো জন্মেছিলো বহু আগে থেকে। কিন্তু এখনো সে অধরা, নাগালের বাইরে। তাই ভারাক্রান্ত বুক আর অগোচর অশ্রু নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেছে প্রিমা। তারপর আজ ঠিক এক সপ্তাহ গড়িয়েছে। বাড়িটায় এখন শান্তি বিরাজমান।
আজ প্রিহার শেষ পরীক্ষা ছিলো। টেস্ট পরীক্ষা নামক যন্ত্রনা আজ শেষ হলো তার। পরীক্ষার দরুন ক্লান্ত শরীর আর পরীক্ষা শেষ হওয়ার দরুন হালকা স্বস্তি নিয়ে বিকেলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই মেয়েটা ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। কেউ তাকে ডেকে তোলেনি, বিরক্তও করেনি। মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমাক একটু। এই কটা দিন বড্ড পরিশ্রম গেছে তার।
এদিকে রাত সাড়ে ন-টার দিকে প্রীষান, কায়রা আর প্রীভান মিলে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে প্রিহার জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে। সাদা-কালো রঙিন বেলুন, ঝলমলে ফিতে বাঁধতে ব্যস্ত তারা। প্রীতিষাও পাশে দাঁড়িয়ে হাত লাগাচ্ছে সব কাজে। আজ প্রিহাকে প্রতিবারের মতো বিশেষ সারপ্রাইজ দেওয়া হবে। সেই আয়োজন সম্পুর্ন করতে ব্যস্ত সকলে। তবে সবার মাঝে অনুপস্থিত নিজাম উদ্দীন। তিনি রাত আটটার মাঝে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন। তার আবার প্রতিদিন ঘুমের ঔষধ নিতে হয়।
কাজের মাঝে হঠাৎই প্রীষানের চোখ আটকে গেলো প্রীতিষার হাতের কব্জিতে। একটা মোটা শেকলের ন্যায় রুপোর ব্রেসলেট মেয়েটার হাতে এবং তা স্পষ্টত'ই ছেলেদের। ভ্রু কুঁচকে প্রীষান প্রশ্ন করলো,
“ছেলেদের ব্রেসলেট পড়েছিস কেন তুই?”
প্রীতিষা তখন বেলুনে ফুঁ দিচ্ছিলো। ফোলানো শেষ করে হাতটা চোখের সামনে এনে মৃদু হাসলো। বলল, “এটা কাবিরের। ও-ই দিয়েছে আমাকে। দেখো না, নামও আছে ওর।”
এই বলে সে হাতটা একটু উঁচু করে সামনে ধরলো। বড় অক্ষরে ইংরেজিতে খোদাই করা—“KABIR”। প্রীষান এবার ভালো করে দেখলো। তখন নামটা চোখে পড়েনি। এদিকে কায়রা পাশ থেকে চুপচাপ সব শুনছে, তার ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি।
প্রীষান ছোট করে শ্বাস ফেলে আবার বলল,
“তোর সাথে থেকে কাবির পাগল হয়েছে? নাকি কাবিরের সাথে থেকে তুই পাগল হয়েছিস?”
প্রীতিষা মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
“দুজনকেই ক্রেডিট দাও, ভাইয়া। আমরা কেউ কারো থেকে কম নই। ইয়্যু নো, মেইড ফর ইচ আদার!”
কায়রা এখন আর চুপ থাকতে পারলো না। ফিক করে হেসে সায় জানায়,
“রাই'ট, আসলেই তোমরা দুজন একেবারে মেইড ফর ইচ আদার!”
প্রীতিষা লাজুকভাবে মাথা নামিয়ে হাসলো। এমন সময় হঠাৎই এক তরুণের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সবার দৃষ্টি একসঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেলো। বাকিরা স্বাভাবিকভাবে তাকালেও কায়রার ভ্রু কুঁচকালো।
“হাই, গাই'স! সো সরি ফর দ্য লেই'ট। একচুয়ালি মাম্মা একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো, তাই সবকিছু গুছিয়ে আসতে একটু সময় লেগে গেলো।”
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে দম নিলো সুহৃদ। সুদর্শন ছেলেটার উপস্থিতি ঘরটার আবহে আলাদা এক আভা এনে দিলো। সাদা শার্টের ওপর পরিপাটি করে পরা কালো ব্লেজার, চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা। সব মিলিয়ে একরকম সংযত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে ছেলেটার মধ্যে। হাতে ধরা ক্রাফট পেপারে মোড়ানো রিবন দিয়ে বাঁধা টকটকে তাজা গোলাপের বুকে।
প্রীষান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
“নো প্রবলেম, বেটা। কিন্তু মৃনালীর কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস?”
সুহৃদ হালকা মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে জবাব দিলো,
“না, আংকেল। মাম্মার একটু প্রেশার বেড়েছিলো জাস্ট। এখন অল ইজ ওকে।”
প্রীষান আশ্বস্ত হয়ে মাথা নাড়িয়ে সুহৃদকে ভেতরে গিয়ে বসতে বলে উপরের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। নিজেকে প্রস্তুত করার পালা এবার তার। শুধু পরনের শার্টটা পাল্টাবে সে। নাহলে প্রিহা নারাজ হবে।
এদিকে সুহৃদ তখন কায়রার দিকে এগিয়ে এলো। স্বভাবসুলভ বিনয়ী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"হাই, আন্টি। হাউ আর ইয়্যু?"
কায়রা এতক্ষণ যেন অবচেতনেই তাকিয়ে ছিলো ছেলেটির দিকে। হঠাৎ তার কণ্ঠ শুনে সামান্য চমকে উঠে বলল,
“ভালো… তুমি?”
“ফাইন। কিছু হেল্প লাগবে, আন্টি?”
ভদ্রতা মেশানো কণ্ঠে জানতে চাইলো সুহৃদ। কায়রা মৃদু হাসলো, মাথা নেড়ে বলল,
“না, সব রেডি। তুমি বসো।”
সুহৃদ মাথা দোলালো। এদিকে প্রীভান গিয়ে তার পাশে বসতেই ঘরের স্বাভাবিক ছন্দ আবার ফিরে এলো। কিন্তু কায়রার ভ্রু যেন অজান্তেই কুঁচকে রইলো, চোখদুটো অনুসন্ধিৎসু। এই ছেলেটি কে? প্রীষান তো বলেছিলো, আজকের আয়োজন একেবারে ঘরোয়া। তবে অকস্মাৎ এই অতিথির আগমন কেন? মনে মনে আন্দাজ করলো, হয়তো প্রিহার কোনো বন্ধু। বয়স তো সে রকমই, সতেরো-আঠারোর বেশি নয়।
প্রীতিষার দিকে চোখ পড়তেই সুহৃদ হেসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, মণি।”
প্রীতিষাও মিষ্টি হেসে জবাব দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী অবস্থা তোমার?”
“এই তো, চলছে।”
“একটা কাজ করো তো, সুহৃদ। প্রিহাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আনো। একেবারে তৈরি হয়েই আসতে বলো।”
এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো যেন সুহৃদ। চোখে হালকা উচ্ছ্বাস ঝিলিক দিয়ে উঠলো। দ্রুত বেগে বলল,
“ওকে!”
এই বলে সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো প্রিহার ঘরের উদ্দেশ্যে। কায়রা কাজ সেরে এসে প্রীভানের পাশে বসলো। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এই ছেলেটা কে? চিনলাম না তো! প্রিহার ফ্রেন্ড?”
প্রীভান মুচকি হেসে একটু দুষ্টুমি মেশানো ভঙ্গিতে বলল,
“শুধু ফ্রেন্ড না। জানেম'ন বলো, মম!”
কায়রার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো,
“কিহ! প্রিহা কি রিলেশন করে?”
প্রীভান তাড়াতাড়ি হেসে বলল,
“আরে নাহ! ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড—ছোটবেলা থেকে। তবে… সুহৃদ ভাইয়া আপুকে একটু বেশিই লাইক করে।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ, ভালো করে দেখলেই বুঝতে পারবে।”
কায়রা তখন সরু চোখে তাকিয়ে রইলো সিঁড়ির দিকটায়, যেখানে একটু আগেই মিলিয়ে গেছে ছেলেটি। তার মনে অদ্ভুত এক ভাবনা খেলে গেলো। যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা কত দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে! অনুভূতির ভাষা বুঝে নেয় সময়ের আগেই। দুনিয়া সত্যিই পাল্টাচ্ছে!
---------------------
প্রিহার ঘরের দরজাটা অতি সন্তর্পণে খুলে ভেতরে পা রাখলো সুহৃদ। ঘরের ভেতরের আলোটা মৃদু নরম।
প্রিহা চিত হয়ে ঘুমাচ্ছিলো বাচ্চাদের মতো। সুহৃদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। প্রিহার ঘুমন্ত মুখটা ডিজনি প্রিন্সেস স্নো হোয়াইটের মতো লাগছে। প্রিহা অত্যাধিক ফর্সা আর চোখের ভিন্ন রঙের মণির জন্য এই নামটা ভীষণ সুট করে ওকে। আর হ্যাঁ, স্নো হোয়াইট'ই তো! সুহৃদের ব্যক্তিগত স্নো হোয়াইট প্রিহা। এসব ভেবে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো মৃদু হাসি এসে ভিড় করলো তার। স্নিগ্ধ, মুগ্ধতার ন্যায় সে হাসি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে প্রিহার মাথার কাছে বসলো। তারপর খুব নরম, প্রায় ফিসফিসিয়ে ডাকলো,
“প্রিহা… প্রিহা! ওঠ।”
প্রথমে কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলো ছেলেটা।
“প্রিহা… ওঠ!”
দুই-তিনবার ডাকার পর ঘুমের পরতটা একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করলো। প্রিহার চোখের পাতায় কাঁপন, পলক ফেলে ফেলে ধীরে ধীরে সে তাকালো।
সুহৃদকে এত কাছে দেখে এক মুহূর্তে চমকে উঠে বসে পড়লো সে। স্বপ্ন ভেঙে বাস্তবটা হঠাৎ এসে ধাক্কা দিয়েছে তাকে।
“তুই এখানে?”
প্রিহার কণ্ঠে বিস্ময় আর ঘুম-ভাঙা বিভ্রান্তি। সুহৃদ কিছু না বলে পেছন থেকে লুকানো ফুলের তোড়াটা সামনে এগিয়ে দিলো। আর উচ্ছসিত স্বরে বলল,
“হ্যাপি বার্থডে, মাই স্নো হোয়াইট!”
এক মুহূর্ত থমকে গেলো প্রিহা। তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়লো, আজ তো তার জন্মদিন। প্রিহা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় এগারোটার দিকে ছুঁই ছুঁই। বেশ রাত হয়েছে। তাই চুপচাপ সে ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে পাশে রেখে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। চোখে তখনো ঘুমের আভা লেগে। তবে সুহৃদকে পাত্তা না দিয়ে একটা হাই তুলে প্রিহা জিজ্ঞেস করলো,
“তুই কখন এলি?”
“মাত্রই, এখন রেডি হ তাড়াতাড়ি। মণি তোকে নিতে পাঠিয়েছে।”
"হুম, যাচ্ছি।"
এই বলে প্রিহা আলমারির পাল্লা খুলে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে অবশেষে বের করলো সাদা রঙের একটা প্রিন্সেস গাউন। নরম কাপড়ের গাউনটা বুকের সঙ্গে আলতো চেপে পাশের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ যেন কী মনে পড়লো তার। পদক্ষেপ থেমে গেলো মাঝপথেই। ধীর ভঙ্গিতে গাউনটা সোফার ওপর রেখে আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো সে। পরমুহূর্তেই ঝড়ের মতো এগিয়ে গিয়ে সুহৃদের শার্টের কলার মুঠো করে ধরলো।
আচমকা আক্রমণে সুহৃদ খানিকটা চমকে উঠলো। হকচকিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাতেই প্রিহা চাপা রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
"সেদিন সিয়ামের সঙ্গে মারামারি করেছিলি কেন? আমি কারণ জিজ্ঞেস করতেই কিছু না বলে চলে গেলি! আমায় ইগনোর করার সাহস তোর হলো কীভাবে?"
রাগে ফুঁসতে থাকা মেয়েটার চোখদুটো তখন ঠিক বর্ষার আগের কালো মেঘের মতো। অথচ সুহৃদ একটুও বিচলিত হলো না। বরং ওর ঠোঁটের কোণে ধীর একটা হাসি ফুটে উঠলো। সে আলতো করে প্রিহার হাত দুটো কলারের ওপরই রেখে মৃদু স্বরে বলল,
"তোকে ইগনোর করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি না, স্নো হোয়াইট। একচুয়ালি, সেদিন ভীষণ রেগে ছিলাম। তাই কিছু বলিনি। মুখ ফসকে রেগে কিছু বললে তুই তো হার্ট হোতি!"
প্রিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর গভীর একটা শ্বাস ফেলে বলল,
"আমার আসল প্রশ্নের উত্তর এখনো দিসনি।"
সুহৃদের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো। মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠলো নিমেষেই। নিচু গলায় বলল,
"সিয়াম তোকে প্রপোজ করার জন্য রোজ নিয়ে আসছিলো। ওর বন্ধুদের চিয়ার আপের মধ্যে তোর নাম শুনলাম… তারপর মাথা ঠিক ছিলো না। তখন রাগে গিয়ে ওকে মেরেছি।"
কথাটা শুনে প্রিহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
"সেসব ঝামেলা আমি নিজেই সামলাতে পারতাম। তুই কেন মারামারি করতে গেলি?"
সুহৃদ এবার একপেশে হেলে হালকা হাসলো। সেই হাসির ভেতর ছিলো তীব্র অধিকার।
"কেন? কেন গেছি সেটা সত্যিই বুঝিস নি? নাকি বারবার আমার মুখ থেকে শুনতে ভালো লাগে যে আমি তোকে ভালোবাসি?"
কথাটা শুনে কলারে ধরে রাখা প্রিহার আঙুল আলগা হয়ে এলো। ধীরে ধীরে ছেড়ে দিলো সুহৃদের কলার। তারপর নিজের বুকের কাছে দু’হাত ভাঁজ করে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল,
"ভালোবাসিস, সেটা তো জানি'ই। সাহস থাকলে পাপাকে বলে দেখা!"
সুহৃদ একটুও না থেমে জবাব দিলো,
"অফকোর্স, আই ওইল। কেন বলবো না? তবে এখনই না। আই জাস্ট ওয়ান্ট দ্য টাইমিং টু বি রাইট। আগে আমাদের দু’জনের একটা সুন্দর ক্যারিয়ার তৈরি হোক। তারপর সবার সামনে তোকে চাইবো, প্রাউড'লি।
প্রিহা অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ছেলেটার দিকে। মাঝে মাঝে সত্যিই সুহৃদের আত্মবিশ্বাস তাকে বিস্মিত করে। আবার ভালোও লাগে। শেষমেশ মাথা নেড়ে উদাস ভঙ্গিতে বলল,
"তোর সাহস দেখে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। যাই হোক, আমি এখন রেডি হতে যাচ্ছি। ব্যস, পাঁচ মিনিট ওয়েট কর।"
এরপর আর একটাও শব্দ করলো না সে। সোফা থেকে সাদা গাউনটা তুলে নিয়ে ধীর পায়ে পাশের রুমে চলে গেলো। আর সুহৃদ তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পথে। ঠিক যেমন কেউ নিজের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যটা চোখ ভরে দেখে নিতে চায়, তেমন।
----------------------------
আজ কায়রা পরেছে লাল রঙের লেসের একটা শাড়ি। পুরো কাপড়জুড়ে সূক্ষ্ম লেসের নকশা। পুরো কাপড়টা লেস ডিজাইনের হওয়ায় একটু ট্রান্সপারেন্ট লাগছে। ব্লাউজটাও ম্যাচিং লেসের তৈরি। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কায়রা শাড়ির কুচিগুলো ঠিক করছিলো। ঠিক তখনই সামনে চোখ পড়তেই থমকে গেলো সে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রীষান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাত দিয়ে চুল ব্যাক ব্রাশ করছে। পরনে শুধু ঘরোয়া একটা ট্রাউজার। শুধু শার্টটা বদলেছে। অথচ তাতেই লোকটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। কায়রা বহুবার ভেবেছে, একটা মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে! আজও উত্তর খুঁজে পেলো না। পাবেও না বোধহয়।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে প্রীষানের পাশে দাঁড়ালো সে। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে নরম গলায় বলল,
"আপনার কি মনে হয় না, একটু বুড়ো হওয়া উচিত আপনার, প্রিহার পাপা?"
প্রীষান ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে তাকালো। কথাটার মানে বুঝতে না পেরে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলো স্ত্রীর দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
"হঠাৎ আবার একথা কেন? আজ খুব হ্যান্ডসাম লাগছে নাকি আমাকে?"
কায়রা যেন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর মুখ করে বলল,
"খুব না… খুব বেশি। ভয়ংকর বেশি! আপনাকে নিয়ে এইজন্যই সবসময় ইনসিকিউরড থাকতে হয় আমাকে।"
কথাটা শুনে প্রীষান হেসে ফেললো। গভীর, মায়াভরা সেই হাসি। আর কায়রা আবারও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এভাবে প্রীষান প্রতিবার হাসলেই নতুন করে প্রেমে পড়ে যায় সে।
এতক্ষণে প্রীষানের চোখ গিয়ে থামে কায়রার দিকে। মেয়েটা আজ শাড়ি পরেছে। যদিও বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই কায়রা শাড়িতে মজেছে ভীষণ। আর শাড়ি পরলেই কায়রা বদলে যায়। অন্যরকম লাগে ওকে। নরম, স্নিগ্ধ, অদ্ভুত এক গৃহিণীসুলভ আভা এসে জড়িয়ে ধরে কায়রার স্বত্তাকে। প্রীষানের বুকের ভেতর তখন অকারণে একটা শান্ত অনুভূতি দোলা দেয়। এই মেয়েটাকে শাড়িতে দেখলে তার শুধু একটা কথাই মনে হয়, বউ বউ লাগে মেয়েটাকে…হুম, বউ'ই তো। প্রীষানের বউ। একদম তার নিজের, তার সংসারের, তার অস্তিত্বেরর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নারী। তার স্ত্রী। এই মনের কথাগুলি যদি প্রীষান বলতে পারতো, তাহলে হয়তো তার চরিত্রের সাথে কাঠখোট্টা পুরুষ স্বভাবের বদনাম ঘুচতো। প্রীষান কিছুক্ষণ চুপচাপ কায়রার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই প্রশ্ন করলো,
"ইদানীং তোমাকে বেশ শাড়ি পরতে দেখা যাচ্ছে। কারণ কী?"
কায়রা মৃদু হেসে আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
" সত্যি বলতে কী, বড় ভাবীকে দেখেই শাড়ি পরার শখটা হয়েছে। ভাবী এত সুন্দর করে শাড়ি ক্যারি করে দেখলেই মনে হয়, নারীর আসল সৌন্দর্য বুঝি এই পোশাকেই লুকিয়ে আছে। তাই ভাবলাম আমিও পরবো। আমি অবশ্য অতো গুছিয়ে পরতে পারি না…"
শেষ কথাটা বলে একটু থামে সে। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে তার। তবুও বলতে লাগে,
"তবে যেভাবেই পরি, খুব একটা খারাপও লাগে না মনে হয়। আর জানেন… শাড়ি না পরলে কেন যেন বিয়ের ফিলিংস'টাই ঠিক আসে না। এটাও একটা কারণ।"
কথাগুলো শুনে প্রীষানের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে আসে। শাড়ির আঁচলের চেয়েও বেশি মায়া তখন জড়িয়ে থাকে কায়রার সরল-সোজা স্বীকারোক্তিতে। এরপর প্রীষান হঠাৎই কায়রাকে কাছে টেনে তার গালে একহাত রাখলো। কিছুক্ষণ মেয়েটার সাজসজ্জা একদৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করে খুব সন্তপর্ণে একখানা চু'মু খেলো কায়রার গালে, সম্পুর্ন অনুভুতি ঢেলে। তবে আজ কায়রা মোটেও অবাক হলো না। বরং ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। প্রীষান কয়েক সেকেন্ড গড়ালে সরে আসলো। কায়রার দৃষ্টির গভীরে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল,
"এখনকার জেনারেশনের ছেলে-মেয়েদের রোমান্টিসিজম নিয়ে মেইবি বিভিন্ন ফ্যান্টা'সি থাকে। তারপর বিভিন্ন টিপিক্যাল এক্সপ্রেশন তো আছেই। কিন্তু আমি মানুষটা একটু আলাদা, কায়রা। কোনো বিষয়ে রাগ হলে মাথা গরম হওয়া বাদে বাকিসময়ে আমি খুবই ঠান্ডা গোছের লোক এবং একটু বেশিই সংয'ত। তাই প্রেমময় বাক্য আমার মুখ দিয়ে বেরোবে না।"
এসব কথায় কায়রা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে এখন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় প্রীষানের সব কথা শুনতে ব্যস্ত। কারণ, এই লোক খুব বেশি কথা বলে না। কিন্তু যখন বলে, তার কথাগুলো মন দিয়ে শোনার মতো গভীরতা রাখে। তাই কায়রা এখন ভীষন মনোযোগী। চুপটি করে সব শুনছে সে। প্রীষান একটু থেমে কায়রার কপালের সরে যাওয়া টিপ ঠিক করতে করতে স্নিগ্ধ হেসে বলল,
"এইযে তুমি শাড়ি পরেছো, এটা দেখে মনে হলো একটা চু'মু তো দেওয়াই যায়। এক্ষেত্রে বলতে পারো, স্বত্তার বাইরে গিয়ে নিজের সংযম একটু খোয়ালাম। তাছাড়া, প্রীষান নামক লোকটি অতি ভদ্রলো'ক, তুমি ভালো করেই জানো!"
কায়রা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে অবলীলায় বলে দেয়,
" হ্যাঁ, জানি তো। আর সেই অতি ভদ্রলোকিপ'না করা লোকটিকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।"
প্রীষান হালকা হেসে মাথা নেড়ে ধীর গলায় বলল,
"সবসময় এভাবে 'ভালোবাসি ভালোবাসি' বলতে নেই, কায়রা। কিছু শব্দ না হয় বিশেষ মুহূর্তের জন্য তুলে রাখো। বারবার বলা হলে এই শব্দটার ভ্যালু কমে যাবে।"
কায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে জোর গলায় বলল,
"কমবে না। আর কোনটা বিশেষ মুহূর্ত নয়, বলুন তো? আপনার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা দিন'ই তো আমার কাছে বিশেষ। প্রতিটা সকাল, প্রতিটা রাত, প্রতিটা মিনিট… সবকিছুই বিশেষ। তাহলে ভালোবাসিটা লুকিয়ে রাখবো ঠিক কোন মুহূর্তের জন্য? তাছাড়া 'ভালোবাসি' শব্দটা'ই বিশেষ। এই শব্দ যেই মুহুর্তে বলা হয়, সেই মুহুর্ত অটোমেটিক বিশেষ হয়ে যায়।"
প্রীষান আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। কিছু অনুভূতির সামনে যুক্তি বড় অসহায় হয়ে যায়। এমনিতেও, কায়রার কথাগুলোও ভুল নয়। প্রীষান কায়রার হাত মুঠোবন্দি করে বলল,
"মেয়েটা তৈরি হলো কি না দেখি, চলো।"
কায়রা মাথা নেড়ে সায় জানালো। আর প্রীষানকে অনুসরণ করে নিচে চলে গেলো।
-------------------------
প্রিহা আর প্রীতিষা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল হয়ে বসেছিলো। অনেকদিন পর, প্রিহা তার মণিকে পেয়ে বড্ড খুশি। কিছুক্ষণ পর প্রীষানও গিয়ে যোগ দিলো তাদের আড্ডায়। কারণ, কেক আসতে একটু লেট হচ্ছিলো।
আর একটু দূরত্বে, ভিড়ের বাইরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সুহৃদ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো প্রিহার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিলো অপার কোমলতা, যেন মানুষটা চারপাশের সব ভুলে শুধু একজনকেই দেখছে। দৃশ্যটা চোখ এড়ালো না কায়রার। সে ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো সুহৃদের পাশে। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করলো,
"প্রিহাকে ভালো লাগে তোমার? নাকি…ভালোবাসো?"
হঠাৎ প্রশ্নে সুহৃদ খানিকটা চমকে তাকালো। তার মুখভঙ্গি দেখে কায়রা ঠোঁট টেনে হেসে বলল,
"আমি ঘুরিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই আশা করবো, তুমিও সরাসরি আর সত্যিটাই বলবে।
সুহৃদ কিছুক্ষণ প্রিহার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে স্বীকার করলো,
"ইয়েস আন্টি… আই লাভ হার।"
"সেইম এজ তোমরা?"
"না, আন্টি। আমি এক বছরের বড়ো ওর থেকে। বাট, সেইম ক্লাস।"
কথাটা শুনেই কায়রা এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
"যখন প্রিহাকে লাভ করো, তখন আমাকে আন্টি বলছো কেন? কল মি ম'ম!"
সুহৃদ এবার হেসে ফেললো সত্যি সত্যিই।
"ওকে, মম। আপনি কিন্তু ভীষণ সুইট, প্রিহা অবশ্য বলেছিলো। আর আজকেও আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে।"
কায়রা চোখ সরু করে সন্দেহভরা ভঙ্গিতে তাকালো,
"কী ব্যাপার? শাশুড়িকে পটানোর চেষ্টা করছো নাকি?"
সুহৃদের হাসি আরও চওড়া হলো। তখন কায়রা নরম স্বরে মুগ্ধ চোখে বলল,
"পটাতে হবে না। তোমার আচার-ব্যবহার, গুড লুকিং-এ আমি অলরেডি ইমপ্রেসড। তাছাড়া, মানুষের ভদ্রতা অনেক কিছু বলে দেয়।"
"থ্যাংক্স আ লট। যাক, আপনি অন্তত বুঝলেন আমাকে।"
কায়রা মুচকি হেসে বলেই ফেলে,
“ইয়্যু নো হোয়াট, সুহৃদ? তোমাকে আমার মেয়ে-জামাই হিসেবে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। প্রিহার পাপার ব্যাপারটা তো বলতে পারছি না। তবে তুমি নিশ্চিত থাকো, আমার দিক থেকে সবসময় ফুল সাপোর্ট পাবে।”
'মেয়ে-জামাই' শব্দদুটো কানে যেতেই সুহৃদ একটু লজ্জা পেয়ে যায়। সে সলজ্জ অপ্রস্তুত হাসি হেসে মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে নিলো স্বভাবসিদ্ধ ভাবে। মনে মনে ভাবলো, প্রিহার মমের পছন্দ হওয়া মানে ফিফটি পার্সেন্ট এগিয়ে থাকা। পরে শশুরকে নাহয় পটানো যাবে। ছেলেটার আকাশকুসুম ভাবনার মাঝে কায়রা হঠাৎ নিজের ফোনটা ছুঁড়ে দিলো তার দিকে। সুহৃদও নিখুঁত কায়দায় সেটি লুফে নিলো। অবাক হওয়ার আগেই দেখলো কায়রা জন্মদিন উপলক্ষে সাজানো জায়গাটার এক পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সুহৃদ সেদিকে তাকাতেই কায়রা বলল,
“এইবার ঝটপট তোমার প্রি'টি শাশুড়ির কয়েকটা ছবি তোলো দেখি। মেয়েটার বার্থডে উপলক্ষে এত সুন্দর করে সাজলাম, ছবি তুলবো না নাকি? নাও, তোলো তোলো! ছবি সুন্দর হওয়া চাই কিন্তু!”
সুহৃদ ক্যামেরা অন করতে করতে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বেশ গর্ব করে জবাব দিলো,
“অবভিয়াসলি, মম। ছবি তো সুন্দর হতেই হবে।আফটার অল, আই হ্যাভ দ্য মোস্ট গর্জিয়া'স, মোস্ট বিউটিফু'ল অ্যান্ড প্রিটিয়েস্ট মাদার-ইন-ল!”
চলমান.......
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]