গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 5 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৪০

 

কাবিরের কথা শুনে কায়রাভ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে সে ধীরে পাশে ফিরে ঘুরে তাকায়। এক্ষুনি এটা কি বলল কাবির? বউ ছেড়ে দিতো মানে কি? কায়রাভ কন্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট বিস্ময়। গলায় খাদ নামিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“আমি কখনোই ওকে ছাড়তা'ম না… প্রশ্ন'ই আসে না।”

কাবির হালকা হাসলো। এই উত্তরটাই সে আশা করেছিলো। কাবির হাতে থাকা ক্যানটায় ঠোঁটে ছুঁইয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল
“এক্সাক্ট'লি, এইটা'ই! বউ যখন ছাড়তা'ই না তখন তোমারে অতীত জানাইয়া, তোমার সদ্য সংসা'রে আগু'ন লাগাইয়া আমার কি লাভ হইতো? হু?”

কায়রাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কাবিরের কথায় যুক্তি আছে। চাইলেও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই ফিরোজের ফোন আসে, আর সে নীরবে বারান্দায় চলে যায় কথা বলার উদ্দেশ্যে। ঘরে তখন কেবল কাবির আর কায়রাভের ভারী নীরবতা। কায়রাভ নিশ্চল চোখে সামনে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“তোদের কতদিনের সম্পর্ক ছিলো?”

কাবির মাথা নেড়ে হালকা স্বরে বলল,
“প্রেমের সম্পর্কের কথা জিগাইলে একদিনেরও না। বন্ধুত্বের দুই বছর হইছিলো। তোমাদের বিয়ের আগের হিসাব করলে।”

কায়রাভ কপাল কুঁচকালো। সে বুঝলো না কিছু। কাবির কি মিথ্যে বলছে তাকে? কারণ কায়রাভ স্পষ্ট দেখেছে ভালোবাসার কথা লিখেছে কায়েশী। ওসবের মানে কি? কায়রাভ রেগে জিজ্ঞেস করে,
"এই ফাজলা'মি করবি না! প্রেমের সম্পর্ক না থাকলে মানুষ ডায়েরিতে কাব্যিক কথাবার্তা লিখবে কেন? তাছাড়া, তোর আর কায়েশীর ছবিও দেখেছি আমি!"

কাবির চূড়ান্ত বিরক্তিতে চোখ বুজলো। তারপর রুক্ষ কন্ঠে বলল,
“কাব্যিক কথাবার্তা তোমার বউ লেখছে! ওইটা আমার দোষ না। আর যেইসব ছবির কথা বলতাছো ওগুলা ছবিতে এবনরমাল কিছু পাইছো? আ'ম ড্যা'ম সিওর সবগুলাই নরমাল পাশাপাশি বসা বা দাঁড়ানো ছবি? কথা কি ঠিক কইছি?"

কায়রাভ চুপ হয়ে যায়। কায়রাভের স্মৃতিতে ভেসে উঠলো, সত্যি পাশাপাশি বসা ছবি ছিলো দুজনের। ঘনিষ্ঠ কিচ্ছু ছিলো না। সাধারণ ছবি তবুও মন সায় দেয় না। তাই জিজ্ঞেস করে, 
"আচ্ছা, ছবি ছাড়। কায়েশী তো স্পষ্ট লিখেছিলো তোকে ভালোবাসে। আবার তুই বলছিস প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না! আমি কিছু বুঝতে পারছি। সব কাহিনি খুলে বল!"

কাবির এবার বাম হাত তুলে দেখালো নিজের কব্জিতে থাকা ব্রেসলেট।
“এইযে দেখো, ফ্রেন্ডশিপ ব্রেসলেট। নিউমার্কেট থেকে কিনছিলাম দুইজন। ভাবীর হাতেও একটা আছে, দেইখো।”

কায়রাভের চোখে ভেসে উঠলো কায়েশীর হাতের সেই একই ব্রেসলেট। কায়েশীরও সেম এমনই ব্রেসলেট আছে হাতে। তবে ফ্রেন্ডশিপ ফরএভার লেখাটা চোখে পড়েনি। হয়তোবা খেয়াল করা হয়নি। কায়রাভ আস্তে করে বিরবির করে বলল, 
“ফ্রেন্ডশিপ?”

“হ্যাঁ।” 

কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিষণ্ণ কণ্ঠে কাবির সামনে তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে বলতে শুরু করে, 
"হ্যাঁ, ফ্রেন্ডশি'প। আমাদের সম্পর্ক এই ফ্রেন্ডশিপ অব্দিই সীমাবদ্ধ আছিলো। কোনো প্রেমঘটি'ত সম্পর্ক না। কায়েশী ফারিয়াহ নামক মেয়েটা খুব ভালো বন্ধু আছিলো আমার। কিন্তু তোমার সাথে বিয়ের পরে কথা বলা বন্ধ কইরা দেয়, ভাবী। আমিও তেমন কথা বলতাম না শুরুতে। দেখা হইলে মাঝেমধ্যে টুকটাক শয়তানি করতাম, ব্যস এই পর্যন্তই। মানে আগের মতো মনপ্রা'ণ খুইলা আমাদের কথা হয় নাই আর। তোমার ভাই হওয়ার কারণে সে অস্বস্তিবো'ধ করতো আমার সামনে, বুঝতাম আমি। তোমার বিয়ের পর কার কি ক্ষতি হইছে জানি না, কিন্তু আমাদের সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক নষ্ট হইছে ভালোভাবেই।"

কাবিরের কথায় আফসোস স্পষ্ট। কায়রাভ চুপ করে শুনছিলো সব কথাগুলো। সত্যি তো, কায়েশী বিয়ের পর থেকে কাবিরকে এড়িয়ে চলতো। হয়তো পুরোনো সম্পর্কের জের টেনে দিয়েছিলো। ধীরে ধীরে কাবিরের প্রত্যেকটা কথার সত্যতা টের পাচ্ছে কায়রাভ। সত্যিই কায়েশীর কাবিরকে এড়িয়ে চলা অনেকবার নজরে এসেছিলো কায়রাভের। তখন সেসব না বুঝলেও আজ সব বুঝলো সে। ধীর গলায় কায়রাভ জানতে চাইলো,
“তাহলে ওর অনুভূতি…” 

কায়রাভ জিজ্ঞেস করতেই কাবির সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
"একতরফা। এর বেশি কিচ্ছু না। আমার তরফ থেকে কোনো ফিলিং'স আছিলো না। সেও জানতো। তবে হ্যাঁ, মা'য়া কাজ করতো। বিয়ের আগে কায়েশী ফারিয়াহ নামক মেয়েটার তিনকু'লে কেউ আছিলো না। সে আমাকে বিশ্বাস করতো, ভরসা করতো। একটা ছেলের সাথে মিশতে মিশতে অনুভুতি জাগা কোনো ব্যাপার না। তার মধ্যে বয়স কম। সে আমার সাথে সংসার করার পরিকল্পনা পর্যন্ত করছিলো। কিন্তু আমার বিয়ে-সাদি নিয়া ইন্টারেস্ট ছিলো না, তুমি জানোই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হইতো, বিয়ের প্রসঙ্গ জীবনে আসলে করমুনি তারে বিয়ে। এত প্যা'রা নাই। দেখতে শুনতে ভালো আছে, সমস্যা কি? মানে ইম্পর্টেন্স দেই নাই কখনো তারে। তারে না পাইলে মইরা যামু এই টাইপের জোরও আছিলো না। কারণ, আমি তো আমিই! যেখানে ভালোবাসা নাই, সেখানে কিসের জোর থাকবো? আমি আরও কইতাম, ভালো চাকরিজীবী পোলা পাইলে তারে বিয়ে দিয়া দিমু!"

একটু থেমে কাবির প্রীতিষার মুখ মনে করে মুচকি হাসে। তারপর আবার বলল,
"আমার প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসা প্রীতি, নিঃসন্দেহে। ওই সেই মেয়ে যার প্রতি আমার জো'র আসছে। যারে দেখে মনে হইছে যে হ্যাঁ, এই মেয়েরেই লাগ'বো। এই মেয়েরে না পাইলে মইরা যামু। ওর আগে পরে কেউ আমার মনে জায়গা পায় নাই। এই বেখাপ্পা, ভবঘুরে কাবিররে প্রীতি চেঞ্জ করছে। সো… প্রীতি ইজ দ্য ওন'লি ওয়ান লেই'ডি, দ্যাট কাবির লাভ'স।"

কায়রাভ এবার মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করে, 
"খুব ভালোবাসিস মেয়েটাকে, তাইনা?"

কাবির মৃদু হেসে সুর টেনে জবাব দেয়,
"খুউউব!"

এসব শুনে কায়রাভের বুকের ভার ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছিলো। কায়রাভ এবার আনমনেই বলল,
"তোর দিক থেকে কিছুই ছিলো না, বুঝলাম। তাহলে এতবছরেও আমাকে মেনে নিতে পারলো না কেন কায়েশী?"

কথা শুনে কাবির ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। কাবির ঠান্ডা গলায় নির্মম সত্য বলেই ফেললো, 
“একটা মেয়ের অন্য ছেলের প্রতি ফিলিংস আছে জানা সত্ত্বেও জোর কইরা বিয়ে করছো। এখন তুমি আশা করতাছো সেই মেয়ে তোমারে ইজি'লি স্বামী স্বামী করবো! কথাটা জোক'স হইলো না? সবশেষে, ভাবীর কোনো দোষ নাই। সব দোষ তোমার।”

কায়রাভ এবার চুপ হয়ে যায়। কায়রাভ ধীরে মাথা নামিয়ে নেয়।
"হ্যাঁ জানি, সব দোষ আমার। আমি অসংখ্য বার ক্ষমাও চেয়েছি ওর কাছে। কিন্তু তারপরেও...."

কাবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
"ইয়াপ! ভাবী ক্ষমা করছে তাই সংসার করতেছে। নাহলে ওই থুথু দেওয়া পাবলিক এত সহজে মানতো না। এখন আদৌও তোমারে ভালোবাসতে পারছে নাকি সেইটা তো আমি জানি না।"

এই কথাটা কায়রাভকে একেবারে ভেঙে দিলো।
সে মাথা চেপে ধরলো দু'হাতে, 
“বুঝেছি…সব ভুল আমার। আমি আবার ভুল করেছি রে ভাই! আবার কষ্ট দিয়েছি ওকে!”

ডিপ্রেশন কমাতে পকেট থেকে সিগারেট বের করলো কায়রাভ। সিগারেট জ্বালিয়ে দুটো টান দিয়ে ধোয়া উড়ালো। তারপর কাবিরকে সাধলে কাবির দাঁত কেলিয়ে হেসে মানা করে বলল,
"বাদ দিছি এইডি খাওয়া। বউ পছন্দ করে না। সিগারেটের ধোয়ায় সমস্যা হয় ওর।"

কায়রাভ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে। 
"বাহ, এত উন্নতি! অবশ্য উপযুক্ত বউ মানুষ ঘরে আসলে অনেক উন্নতি হয় স্বামীদের। তোর বউও তার প্রমাণ দিলো।"

কাবির স্বাভাবিকভাবে উঠে দাঁড়ালো। কায়রাভকেও হাত বাড়িয়ে টেনে তুললো। ব্যস্ত স্বরে কাবিরে বলে,
“বাইকে বসো যাইয়া। ওই দিক দিয়াই যামু।”

"লাগবে না। তুই তারাতাড়ি বাসায় চলে যা। তোর বউ তো একা বাসায় রয়েছে।"

কাবির জেদ করে বলল,
"কথা বাড়াইয়ো না, ভাইজান। বাইকে যাইয়া বসো।আসতাছি।"

কায়রাভ আর আপত্তি করলো না। সিগারেট পা দিয়ে পিষে চলে গেলো। এবার কাবির বারান্দায় উঁকি দিয়ে শয়তানি হেসে বলল,
"কি ফিরোজ ভাই? প্রেম চলে নাকি!"

ফিরোজ আঁতকে উঠে কল কেটে দিলো। কাবিরকে বিশ্বাস নেই, কখন কি বেফাঁস কথা বলে ফেলে। পরে না আবার ওর ব্রেকআপ হয়ে যায়। ফিরোজ উঠে এসে প্রসঙ্গ বদলে বলল,
"প্রবলেম সলভ?"

"একবারে আগা থেকে সলভ। আশা করি আর গেঞ্জাম করবো না এই লাইলি মজনু।"

কাবির আর ফিরোজ হাঁটতে হাঁটতে ঘর ছেড়ে বেরিয়েই আসছিলো। হঠাৎই কাবির তিনশ ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গিয়ে ফিরোজের দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
"ফিরোজ ভাই, একটা জিনিস খেয়াল কইরা দেখছেন?”

ফিরোজের চোখে কৌতূহল খেলে গেলো,
“কি?”

কাবির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টানে। সে খুব গভীর কোনো রহস্য আবিষ্কার করেছে এমন ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ভাইজান আর ভাবীর মধ্যে ঝড়-তুফান, ঝামেলা ডেইলি রুটিন। এত কিছুর পরেও চার বছরে দুইবার সুখবর আপডে'ট দিছে! মানে বাইরে ঝগড়া যতই হোক, ভিতরের টিমওয়ার্ক কিন্তু একদম সলি'ড! এইবার একটু ক্যালকুলেশন করেন। যদি এদের মধ্যে ঝগড়া না থাকতো, সব কিছু যদি মাখন মাখন হইতো, তাইলে তো প্রতিবছর সুখবর দিতো। সোজা কথা, এদের ঝগড়া শুধু বাইরের শো। দিনশেষে জামাই-বউ মিলে ঠিকই ফ্যামিলি প্ল্যানিং করে। ধুর শা'লা! পিছায়া গেলাম জীবনে!”

ফিরোজ হতবুদ্ধি হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে,
"কিহ! ভাবী প্রেগন্যান্ট নাকি? তুমি জানলে কি করে?"

এদিকে কায়রাভ বাইরে থেকে কাবিরকে অনবরত ডাকছে তারাতাড়ি আসতে। কায়রাভ যত দ্রুত সম্ভব কায়েশীর কাছে যেতে চায় এখন। কাবির ভাইয়ের ডাক শুনে তারাহুরো করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেলো,
"কাবির সব জানে। অবস্থা দেখছেন, একটু আগে বউয়ের সাথে হাঙ্গা'মা কইরা আইসা এখন বউয়ের কাছে যাওয়ার জন্য অস্থি'র হইতাছে! শেইমলে'স ব্রাদা'র!"

ফিরোজ প্রতিউত্তরে কিছু না বলে পেট চেপে হাসলো। এই কাবির সত্যি একটা চিজ! লা'খে এমন একটা ভাই মেলে। এদিক থেকে কায়রাভ সত্যিই ভাগ্যবান।

----------------------

মুষলধারের বৃষ্টি থেমেছিলো ঠিকই। তবে আকাশের বুক থেকে মেঘের কালচে ভার নামেনি এখনো। আবার যেকোনো সময় ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি নামবে ভাব। এই মেঘলা ভেজা বাতাস চিরে কাবিরের বাইক ছুটে চলেছে খান বাড়ির দিকে। পেছনে বসে কায়রাভ। 
সে খানিকটা চুপচাপ'ই রয়েছে। হঠাৎই কাবির গতি সামান্য কমিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, 
“ভাইজান, ভাবীরে আবার উল্টাপাল্টা কথা শুনাও নাই তো?”

কায়রাভের নিচু গলায় উত্তর দেয়, 
“অনেক কিছুই শুনিয়েছি রে… এখন আমাকে সামনে পেলে তোর ভাবী নিশ্চিত আবার থুথু দিবে। না হলে একটা থাপ্পড় মেরে বসবে।”

কাবির হো হো করে হেসে ওঠে। আর কায়রাভ হালকা করে নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর অশান্তি নিয়ে বসে থাকে। কায়েশীর মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মেয়েটা কাঁদছিলো আসার সময়, কিন্তু কায়রাভ ফিরেও দেখেনি। পাষাণ হয়ে গিয়েছিলো রাগে। এখন খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য। 

এদিকে কায়রাভ এখনো জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর খবরটা ঠিক তার জন্যই অপেক্ষা করে আছে। ফিরোজ বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু কাবির থামিয়ে দিয়েছিলো তাকে। কারণ কাবির জানে, কিছু সত্যি উপযুক্ত সময়ে প্রকাশ পেলেই তার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি হয়। হয়তো এই খবরটা দুটোকে মিলিয়ে দিতে পারবে। 

অবশেষে খান বাড়ির সামনে এসে বাইক থামে।
ঠিক তখনই যেন অপেক্ষা করছিলো বৃষ্টি। আবার ঝপঝপ করে বৃষ্টি নামে। হালকা টুপটাপ শব্দে ভিজে ওঠে চারপাশ। বাইক থেকে নেমে দু’জনই এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। চোখ চলে যায় সামনের উঠোনে। 

একটু সামনেই খোলা আকাশে নীচে ঘাসের উপর বসে আছে কায়েশী। পুরো ভিজে গেছে সে। চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। আঁচলটা একপাশে সরে গেছে, চুলগুলো ভিজে কপাল বেয়ে গাল ছুঁয়ে নামছে। কাপড় জবজবে হয়ে গায়ে লেপ্টে আছে। তার গায়ের হালকা রঙের শাড়িটা বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় হয়ে উঠেছে। অথচ সে নড়ছে না। চুপচাপ বসে আছে দূরে কোথাও নিশ্চল, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মেয়েটার ঠোঁটদুটো সামান্য কাঁপছে। আজ ইচ্ছে করেই ভিজছে কায়েশী। এত যন্ত্রণা, এত অশান্তির মাঝে একটু মানসিক শান্তি পেতে ঠাঁই নিয়েছে খোলা আকাশের নীচে। 

দু'জন পুরুষ এই দৃশ্যের মর্মার্থ বুঝতে পারলো না। তবে কাবির বুঝলো, এই মুহূর্তটা শুধু তাদের দু’জনেরই হওয়া উচিত। কাবির সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিয়ে বাইকে বসে চাবি ঘুরিয়ে আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। কাবির তার যথাসাধ্য দায়িত্ব পালন করেছে। দুটোকে মিলিয়ে দিয়েছে। এবার এরা ঝগড়া করুক, মাথা ঠোকাঠুকি করুক, কাবিরের কি? অগত্যা কাবির ধীরে ধীরে বৃষ্টি ভেদ করে মিলিয়ে যায়।

আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে কায়রাভ অবাক, স্তব্ধ ভঙ্গিতে। আপাতত হুসে নেই সে। জ্ঞান ফিরতেই আর এক মুহূর্তও নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না কায়রাভ। ছুটে গেলো কায়েশীর দিকে বৃষ্টিভেজা ঘাস পেরিয়ে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তাড়না নিয়ে।
কায়েশীর কাছে পৌঁছে তার শরীরে হাত রাখতেই কায়রাভ চমকে উঠলো। শরীরটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা।

কায়রাভ এক ঝটকায় কায়েশীকে তুলে দাঁড় করালো। কণ্ঠে জমে থাকা রাগ আর দুশ্চিন্তা মিশিয়ে বলল,
“এসব কি ধরনের পাগলামি, কায়েশী? বাইরে ভিজছো কেন?”

কায়েশী ধীরে মুখ তুললো। তার চোখদুটো লাল, ভেজা চুল গাল বেয়ে নেমে এসেছে। কিন্তু দৃষ্টিটা কঠিন। অভিমানে জমাট বাঁধা। 

“এবার বলবেন আপনার ভুল হয়ে গেছে, তাইনা? আমাকে ধরাসায়ী করে, আমাকে ভেঙেচুড়ে দিয়ে আপনি বারবার ভুল করেন। আর প্রতিবার সেই ভুলগুলোর ফল ভোগ করতে হয় আমাকে!”

ভীষন কঠিন স্বরে বলে উঠলো কায়েশী। কায়রাভ থেমে গেলো এক মুহূর্ত। তারপর নিঃশব্দে কায়েশীর হাতটা টেনে ধরে বলল,
“হুম… এবারও ভুল করেছি আমি। এখন ভেতরে চলো, এভাবে থাকলে অসুস্থ হয়ে পরবে। এরপর যা শাস্তি দিতে চাও, দিও।”

কথাটা শেষ হতেই ঠা'স করে শব্দ হলো। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝে তীক্ষ্ণ শব্দে কায়রাভের গালে এসে পড়লো এক দাবাং চ'ড়। আর সর্বশক্তি দিয়ে চড়টা কায়েশী'ই মেরেছে। তবে কায়রাভ একটুও চমকালো না। সে জানতো, এইটা তার প্রাপ্য। তার সমস্ত ভুলের খেসারত। কায়েশী কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“এবার আমাকে এটার জন্য শাস্তি দিন… আর কি শাস্তি বাকি আছে? দিন, সব দিন!”

কায়রাভ আর কোনো উত্তর দিলো না। শুধু কয়েক পল তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটাকে। কায়েশী ছটফট করতে লাগলো বাহুবন্ধনীতে। কিন্তু লাভ হলো না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ নিয়ে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা,
“আপনার মতো খারাপ মানুষ আমি কখনো দেখি নি! আমি আপনাকে জীবনেও ছাড়'বো না!”

কায়রাভ তার কাঁধে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“প্লিই'জ… ছেড়ো না, কায়েশী। আমিও চাই না তুমি আমাকে ছাড়ো…”

কথাগুলো কায়েশীর বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করলো। সে ফুঁপিয়ে উঠলো শরীর কাঁপিয়ে, গলা ভেঙে গেলো কান্নায়,
“এখন কেন ফিরে এসেছেন? চলে গেছিলেন তো!”

কায়রাভ একটু দূরে সরে তাকালো তার দিকে। তার চোখে ক্লান্তি, অনুতাপ। কায়রাভ ধীর গলায় বলল,
“এই কথাগুলো আগে বললেই হতো… তাছাড়া, হুট করে এসব জেনে আমার রিয়েক্ট করা কি অস্বাভাবিক ছিলো? তারমধ্যে কত পেঁচানো ব্যাপার!”

কায়েশী তীব্র অভিমানে বলে উঠলো,
“আপনি আমার কথা শুনেছেন কবে? আমি বার বার বলতে চেয়েছি আপনাকে।”

এখানেও ভুল করেছে কায়রাভ। সত্যিই কায়েশীর কোনো কথাই শোনেনি সে। কায়রাভ এবার কায়েশীর গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো, 
"কাবিরের পক্ষ থেকে সব শুনেছি। এবার তুমি বলো, কাবিরের প্রতি এখনো কোনো অনুভূতি বেঁচে আছে তোমার?  

কায়েশী ক্রমাগত মাথা নেড়ে বলল,
"নেই...কোনো অনুভূতি নেই। বিশ্বাস করুন, আপনাকে কবুল বলার পরই সব অনুভুতি বিসর্জন দিয়েছিলাম। আমি কোনো চরিত্রহীনা মেয়ে নই যে স্বামী থাকতে অন্য কারো জন্য মনে অনুভূতি রাখবো। বিয়েটা যেভাবেই হোক, কিন্তু আমি ওই মানিয়ে নেওয়া নারীদের পর্যায়েই পরি।"

কায়রাভ মাথা নেড়ে বলল,
"আমি জানি তুমি কেমন? তোমাকে বিশ্বাস করি আমি। আজকে স্বীকারক্তিটুকু নিলাম শুধু।"

এদিকে বৃষ্টি থেমে গেছে আবার। চারপাশে শুধু ভেজা। এবার দুজনেই ভিজে জবজবে। কায়রাভ ভারী গলায় কায়েশীর হাত ধরে বলল,
“কাবিরের সাথে বন্ধুত্বটা নষ্ট করো না… ওর মতো বন্ধু দ্বিতীয়জন পাবে না। তাছাড়া, এখন নিশ্চয়ই অস্বস্তির কারণ নেই।”

কায়েশী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি বন্ধুত্ব নষ্ট করিনি। তবে হ্যাঁ, আগের মতো কিছু নেই। সময়, পরিস্থিতি আমাদের বদলেছে। আচ্ছা এসব ছাড়ুন, আপনি একটা কথা বলুন তো। আপনি সবাইকে বোঝেন, জানেন… শুধু আমাকে ছাড়া!”

কায়রাভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”

কায়েশী হঠাৎ যেন ভেঙে পড়লো,
“এখনো বুঝতে পারছেন না আমি আপনাকে ভালোবাসি? আজ নির্লজ্জের মতো বলতে হচ্ছে এই কথা। আপনার মতো একটা উন্মাদ, মানসিক বিকারগ্রস্ত লোককে ভালোবাসলাম কি করে জানি না, কিন্তু বেসেছি। যার জন্য আমি এত আয়োজন করলাম… আর সেই আপনি সব গুছিয়ে নষ্ট করে দিলেন!”

কায়রাভ থমকালো, চমকালো। ও কি ঠিক শুনছে এসব? কায়েশী তাকে এইমাত্র ভালোবাসার কথা বলেছে! কায়রাভের প্রতিক্রিয়ার আগেই কায়েশীর কণ্ঠ ভেঙে এলো,
“এবারেও আমাদের সুন্দর মুহুর্তটা নষ্ট করে দিলেন। আপনার বাচ্চার কথাটাও জানাতে দিলেন না…”

কায়রাভ থমকে গেলো। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। বিচলিত হলো নিজের ছেলের জন্য।কায়েশীর দুই বাহু চেপে ধরে ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো, 
“মানে? আমার কায়ানের কি হয়েছে? ঠিক আছে তো ও?”

কায়েশী চোখ মুছে ধীরে মাথা নাড়লো,
“কায়ান নয়। আপনি… আপনি আবারও বাবা হবেন…”

এই কথায় কায়রাভের চোখ বিস্ফারিত। 
“কিহ?”

কায়েশী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ… আপনি বাবা হবেন। এবার প্লিই'জ আমার প্রতি একটু সদয় হোন। আমি এইসব মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না। আমাকে একটা স্বাভাবিক সংসার দিন।”

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই কায়রাভ তাকে টেনে নিলো নিজের বুকে। আগের চেয়েও আরও শক্ত করে। যেন এইবার আর ছাড়বে না কোনোদিন। কায়রাভের কণ্ঠ মৃদু, কিন্তু অটলভাবে বলল,
“সংসার হবে… একটা খুব সুন্দর সংসার হবে আমাদের।”

কায়েশী পুরুষালী ভেজা বুকে মুখ লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“আমি এবার আমার মাতৃত্ব'টা উপভোগ করতে চাই। কায়ানের সময়ের মতো হঠকারিতা করবো না, প্রমিস! আপনি-ও কথা দিন… আর কষ্ট দেবেন না আমাকে?”

কায়রাভ চোখ বন্ধ করে কায়েশীর মাথায় চু'মু দিয়ে বলল,
“আমার পক্ষ থেকে আর কোনো ভুল হবে না, প্রমিস! কোনো কষ্ট দেবো না তোমায়। অনেক অনেক ভালোবাসবো। তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো… হ্যাঁ?”

কায়েশী ধীরে মাথা নাড়লো। সে তো সবসময়ই তার ছিলো। কিন্তু কায়রাভ বোঝে নি, বোঝেনি ধীরে ধীরে জন্মানো কায়েশীর সুপ্ত অনুভূতি। মুখে না বললে আজও বুঝতো না। হম্বিতম্বি করা লোকের ঘটে এক ফোটাও বুদ্ধি নেই। শুধু মুখেই গম্ভীর ভাব নিয়ে চলে। কায়েশী বুঝে গেছে। এসব ভেবে নাক টানলো কায়েশী। এতক্ষন বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লেগে গেছে তার। তবে আজ এই বৃষ্টির মাঝেই দুজনের মধ্যেকার সব ঝামেলার অবসান হলো। 

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

 
পর্বসংখ্যা:৪১

 

কাবিরের বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। যদিও তারাতাড়ি'ই ফিরতো কিন্তু মাঝপথে আচমকা বাজ পড়ায় বাধ্য হয়ে বাইক থামাতে হয়েছিলো একটু। অল্পসময়ের জন্য কাবির আশ্রয় নিয়েছিলো রাস্তার যাত্রী ছাউনিতে। কারণ, এই বাজ মাথায় পড়লে নিশ্চিত বেঘো'রে মারা পরবে সে। নিজের জীবনের রিস্ক তো আর নেওয়া যায় না। আজকে সন্ধ্যা থেকে আকাশের এমন বেগতি'ক অবস্থা। এই মুষলধারে বৃষ্টি নামছে, তো এই থামছে। থামলেও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছেই। তবে আকাশের গুড়গুড় ধ্বনি বন্ধ হয় নি। প্রকৃতি যেন ভয় দেখাতে আয়োজন করেছে আজ। 

আকাশের মোটামোটি অবস্থা বুঝে কাবির একটানে বাইক স্টার্ট করে সোজা বাড়িতে পৌছায়। বর্তমানে কাবির ভিজে একাকার অবস্থা। গায়ের শার্ট লেপ্টে আছে পেশিবহুল শরীরে। সাদা শার্ট হওয়ায় উজ্জ্বলবর্নের শরীরটা দৃশ্যমান হয়েছে। ভেজা শরীরের প্রতি বিরক্ত হয়ে শার্ট খুলে কাঁধে ঝুলিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে কাবির। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এক ঠেলাতেই দরজা খুলে যায়। সে ভেবেছিলো দরজা আটকানো থাকবে। কারণ, প্রীতিষা সে যাওয়ার সময় দরজা লাগিয়ে দিয়েছিলো স্পষ্ট মনে আছে। তাই এখন খোলা দরজা দেখে খানিকটা অবাক'ই হলো কাবির।

দরজা খুলে ভেতরে গিয়েই দেখে চারপাশ ঘুটঘু'টে অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। অকস্মাৎ, প্রীতিষার কথা ভেবে আঁতকে উঠে কাবির। মেয়েটা তবে এতক্ষণ এভাবে একা একা ছিলো! তাই তারাহুরো করে পকেট থেকে ছোট টর্চ লাইট জ্বালিয়ে কাবির ডাকতে লাগলো প্রীতিষাকে, 
"প্রীতি! প্রীতি! কই তুমি?"

প্রীতিষা কাবিরের ডাক শুনতে পেয়ে ভেতরের ঘর থেকে দ্রুত সম্ভব উত্তর দেয়, 
"আমি...এইঘরে। এদিকে!"

প্রীতিষার গলা পেয়ে কাবির ত্রস্ত পায়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখে প্রীতিষা বড় টেবিলটার নিচে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। নাজুক শরীরটা কাঁপছে বলে মনে হলো তার। ঘরে টর্চের আলোয় কাবিরকে দেখে দ্রুতবেগে টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো প্রীতিষা। প্রীতিষা বেরিয়ে আসতেই কাবির দেখলো মেয়েটার চোখমুখ অস্থির লাগছে। ঠোঁট দুটোও তিরতির করে কাঁপছে। চোখের পল্লব পিটপিট করছে নার্ভাসনেসে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখাও মিলেছে। কিন্তু কেন? কাবির ভয় পেলো মেয়েটাকে এমন অবস্থায় দেখতে পেয়ে। সে এগিয়ে এসে প্রীতিষার গালে হাত রেখে বিচলিত হয়ে বলল,
"এই'ই! কি হইছে? টেবিলের নিচে কি করতাছিলা তুমি?"

প্রীতিষা শুকনো ঢোক গিললো। অত্যন্ত ধিমি গলায় থেমে থেমে উত্তর দিলো, 
"আসলে আমি বিদ্যুৎ চমকানোতে ভয় পাই অনেক। তাই ওখানে লুকিয়ে চোখ বন্ধ করে, কান চেপে ধরে বসে ছিলাম। তুমি যাওয়ার পরপর'ই ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে সম্পুর্ন ঘর অন্ধকার হয়ে গেছিলো।"

"তাইলে আলো জ্বালাও নাই ক্যান?"

"আলো কোথায় পাবো? ঘরে তো আর কোনো লাইট নেই। তাছাড়া, কিছুই দেখতে পাইনি অন্ধকারে।"
 
কাবির থমকে গিয়ে মেয়েটাকে আগলে নিলো নিজের সাথে। প্রীতিষাও আপ্লুত হয়ে কাবিরের কাছে চলে যায়। সে মুঠো করে খামচে ধরে কাবিরের বুকের কাছের গেঞ্জিখানা। কাবির বুঝলো, ভুলটা তার নিজেরই। এই ভেবে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেললো কাবির। এরপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো, 
"ফোন কই আছিলো তোমার?"

"ফোনের ব্যাটারি ডাউন।"

আচমকাই প্রীতিষা হুট করে কেঁদে ফেললো। আসলে ভয়ের চোটে কেঁদেছে। কারণ এমন ভয়ানক দিন কখনো পার করেনি সে। অন্ধকারে যে তার মারাত্মক ভয়। ফোবিয়া আছে তার। প্রীতিষা সহজে ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়, কিন্তু মেয়েটার অন্ধকারে প্রচুর ভয়।

প্রীতিষার কান্নায় কাবির চমকালো, বিমুঢ় হলো সে। কাবির অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছে। তার উচিত ছিলো আরও আগে বাড়িতে ফেরা। প্রীতিষা এবার মাথা তুলে কান্নাভেজা চোখে তাকিয়ে বলেই ফেলে,
"তুমি প্লিজ রাতে ফিরতে দেরি করো না। আমি একা বাসায় কখনো থাকি নি। দিন হলে কিছুনা, কিন্তু রাতে ভয় করে। তারমধ্যে ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ায় আলো নেই, চারিদিকে অন্ধকার। মাঝে মাঝে জোরে জোরে বাজ পড়ছিলো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিলো! আম.. আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম।"

কাবির চোখ বন্ধ করে নিজের উপর বিরক্ত হলো। প্রীতিষার অন্ধকারে ফোবিয়া আছে বেমালুম ভুলে গেছিলো কাবির। কি করে ভুললো এত বড় কথাটা। তাছাড়া, কারেন্ট গেলে তো ঘরে আলো থাকেবেই না।
এটা আগে ভাবা উচিত ছিলো ওর। আগে তো কাবির একা বাসায় মোবাইল ফোনের আলোয় কাজ চালিয়ে নিতো। পারলে অন্ধকারে থাকতো। তার অগোছালো জীবনযাপনে অসুবিধা নামক শব্দই ছিলো না। কিন্তু এখন ঘরে বউ আছে, তাও ভাবতে হবে। তার সুবিধা অসুবিধা দেখা কাবিরের দায়িত্ব। নিজের অপারগতায় নিজেই নিজেকে দু'চারটে গা/লি ছুড়লো কাবির। যাতে দ্বিতীয়বার এই ভুল না হয়। 

ভাবনা সরিয়ে কাবির প্রীতিষাকে আগলে বিছানায় বসালো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ড্রয়ার থেকে চারটে বড় মোম জ্বালালো ঘর আলোকিত করতে। টিমটিমে হলুদ আলোয় ঘরটা আলোকিত হলো। তারপর আবার প্রীতিষার কাছে এসে তার পাশে বসে কাবির শান্ত কন্ঠে বলল,
"কালকেই চার্জার লাই'ট কিনমু। মাথায়ই আছিলো না কথাটা! আগেই কেনা উচিত আছিলো।"

প্রীতিষা সেসব শুনলো না। হঠাৎ বলল, 
"কাবির, আজকেও শাড়ি'টা পরতে পারলাম না। তুমি তো পরতে বলে গিয়েছিলে!"

কাবির তেতে উঠে বলল,
"ভা'র ম্যে যাক, শাড়ি! তোমারে নিয়ে ভয় পাইয়া গেছি আমি! যাইহোক, কাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে বাড়িতে আসমু, প্রমিস। যদিও আজ কাজেই বেরোইছিলাম। সব তো জানো।"

প্রীতিষা আস্তে-ধীরে মাথা নাড়লো। কাবির হঠাৎ প্রীতিষার হাত ধরে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 
"তোমার কোনোকিছু নিয়া কমপ্রোমাইস করার দরকার নাই, প্রীতি। আমার সাথে ভালো থাকার উদ্দেশ্যে আসছো এখানে। কষ্ট পাওয়ার জন্য না। যখন যা মন চাইবো করবা, যা লাগবো বলবা। কোনোকিছুর কমতি হইলে অভিযোগও করবা। তোমার হক এগুলা।" 

প্রীতিষা অপলক তাকিয়ে থাকে কাবিরের দিকে। 
মৃদু হেসে কাবিরের হাতে চু'মু খেয়ে বলল 
"তোমার উপর কিসের অভিযোগ করবো আমি? করেছো নাকি এমন কিছু?"

শেষ কথাটা দুষ্টু স্বরে মজা করেই বলল প্রীতিষা। কিন্তু কাবির এখন মোটেও রসিকতার মুডে নেই। সে বড্ড সিরিয়াস এখন। অনুতপ্ত কন্ঠে কাবির বলল,
"আমি তোমার খেয়াল রাখতে পারতাছি না ভালোভাবে। এইযে, আজকে তুমি ভয় পাইছো, আমার জন্যই তো!"

প্রীতিষা সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে বলল,
"কিসব বলছো, কাবির! তুমি ছাড়া আমার খেয়াল রাখেই বা কে? আমি তো আগে থেকেই অন্ধকার ভয় পাই। পরিস্থিতির জন্য আজকেও পেয়েছি। তোমার কোনো দোষ নেই এতে।"

কাবির এবার বিছানায় হাত-পা তুলে বসলো। মনের ভেতর ঝড় বইছে। প্রীতিষার বাড়িটা এই বাড়ি থেকে অনেক ভালো ছিলো, অন্তত সেখানে মেয়েটাকে কষ্ট করতে হয় নি। কিন্তু কাবির কি দিতে পারছে? আর যাইহোক, এই পরিবেশ প্রীতিষার উপযোগী নয়। তার ছন্নছাড়া জীবনে কিছু গোছানো হয় নি। কিন্তু না, এখন থেকে গোছাতে হবে, অন্তত এই মেয়েটার জন্য। এইসব ভাবনায় এখন কাবিরকে কেমন যেন ভেতরে ভেতরে অস্থির করে দিচ্ছে। কিন্তু শুন্য দৃষ্টি তার। একদিকে তাকিয়ে সে আনমনেই বলল,
"তোমার জন্য একটা বড় বাড়ি বানামু আমি।"

কাবিরের গলায় স্পষ্ট আফসোস টের পেলো। তবে প্রীতিষা ঠোঁট প্রসস্ত করে আলতো হাসলো এই ভেবে যে- ভবঘুরে, ছন্নছাড়া কাবিরের জীবনে তার বউয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পাচ্ছে আস্তে আস্তে। প্রীতিষা একটু এগিয়ে কাবিরের পাশাপাশি উল্টোদিকে ঘুরে বসে। এরপর তার বাহুতে কপাল ঠেকিয়ে বলল, 
"কেন এই ঘরে কি সমস্যা? আমার তো অসুবিধা হচ্ছে না। তাছাড়া কত কষ্ট করে আমরা দুজন মিলে একটু একটু করে গোছাচ্ছি সব। ইনশাআল্লাহ একদিন একটা পরিপূর্ণ বাড়ি হবে আমাদের। আর তাছাড়া.."

কাবির পাশ ফিরে তাকিয়ে জানতে চায়, 
"তাছাড়া কি?"

প্রীতিষা বড্ড আবেগ জড়ানো গলায় কাবিরের চোখে তাকিয়ে বলল,
"তাছাড়া বাড়ি ওটাকেই বলে যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা থাকে, খুশি থাকে। দুজন মিলে ছোট ছোট খামতি সেখানে অনায়াসে পূরণ করা যায়। জীবনে অনেক দম্পতির গল্প শুনেছি, জানো? যাদের মধ্যে ভালোবাসাই নেই, বিশ্বাস-ভরসা নেই। সম্পর্কে কত জটিলতা তাদের! কিন্তু আমাদের দেখো, আল্লাহ কিন্তু আমাদের মাঝে ভালোবাসার অভাব দেয় নি। তিনি সত্যিকারের ভালোবাসা মিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের। 
এই সৌভা'গ্য কয়জনের হয়?"

কাবির মাথা নাড়ে সম্মতিতে। প্রীতিষা এবার আচমকাই আবেগের ভোল পাল্টে মজার সুরে বলল,
"আর এমনিতেও কিসের অভাব আমাদের? আমরা কি না খেয়ে আছি? কালকেও না দুজন চিকে'ন খেলাম! মানুষের আর কি অভাব থাকতে পারে বলো? মাথার উপর ছাদ নেই? পরার মতো জামাকাপড় নেই? কি নেই, কাবির বলো? আজ'ব!"

কাবির একপেশে হেসে প্রীতিষাকে কাছে টেনে ওর কপালে সবেগে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এরপর মৃদু হেসে বলল,
"হইছে হইছে, বুঝছি। যেই সংসারে কাবির-প্রীতিষার মতো জামাই-বউ আছে, সেই সংসারে কিছুর অভাব হইতে'ই পারে না। নেভা'র!"

প্রীতিষা মুচকি হেসে এবার কাবিরের দিকে তাকিয়ে থাকে, অপলক। কাবিরও তাকিয়ে থাকে তার বউয়ের দিকে, অনিমেষ। কিছুক্ষণ সময় এভাবে কাটতে'ই হঠাৎ প্রীতিষা দু-হাত তুলে বাচ্চাদের মতো করে মেকি সুরে আবদার করলো,
"এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো? জড়িয়ে ধরো আমায়! জড়িয়ে ধরো না, কাবির!"

কাবির আলতো হেসে আর একটাও কথা না বলে প্রীতিষাকে বুকে এনে জড়িয়ে ধরলো। জোর'সে, একদম শ'ক্ত করে বাহুবন্ধনীর ভেতর আবদ্ধ করলো মেয়েটাকে। যেন একটু ফাক-ফোক'ড় দিয়েও বেরিয়ে যেতে না পারে। কারণ, কাবিরের কাছে প্রীতিষা নিতান্তই বাচ্চাসম। তাই, সুযোগ বুঝে জড়িয়ে ধরে গোটা-দশেক চু'মুও খেলো মেয়েটার গালে। এরপর প্রীতিষাকে লজ্জা দিতে কাবির বলল,
"এই প্রীতি! তুমি না দেখা যায় আমার থেকেও বেশি জড়াজ'ড়ি করতে এক্সপা'র্ট!"

"চু'প করো! তুমি'ই আমাকে এমন বানিয়ে দিয়েছো। নাহলে আমি নিতান্ত'ই ভদ্র মেয়ে, হুহ!"

------------------------------

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। তবে কালকের মতো মেঘলা দিন নয় আজ। দুপুরে কড়া রোদ ছিলো। বিকেলটা হতেই রোদ কমে আসছে আস্তে আস্তে। 
এই পুরো বিকেল ধরে নিজাম উদ্দীন ও কায়রা গল্প জুড়ে বসেছে। কায়রা নিজাম উদ্দীনের সত্যি সত্যি নিজের মেয়ে হয়ে গেছে। কায়রাও শুধু মুখে বাবা ডাকে না, মন থেকেও বাবা মেনেছে। যার দরুন আজ তাদের এত কথা। 

সোফায় বালিশে মাথা দিয়ে আধশোয়া হয়ে গল্প করছিলো কায়রা। স্ট্রবেরি জুসের পাইপ ঠোঁটে গুজে বেশ মনোযোগ দিয়ে নিজাম উদ্দীনের কথা শুনছে সে। এতটা মনোযোগ তো কায়রা নিজের পড়াশোনাতেও দেয় নি। অবশ্য আজকের টপিক'টা এমনিতেই মনোযোগ দেওয়ার মতো। নিজাম উদ্দীনের কাছে কায়রা পৃথার বিষয়ে সব শুনছিলো। প্রীষানের প্রেমকাহিনী, বিয়ে পরবর্তী জীবন সব শুনছিলো সে। শুধু একটা কথাতেই ভীষন অবাক হয়েছে কায়রা। যে প্রীষানের মতো মানুষ প্রেম করলো কিভাবে? আর কিছু না, তার মতো কাঠখোট্টা মানুষ লাভ ম্যারেজ করেছিলো! যাইহোক, এবার কায়রা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
"আচ্ছা বাবা, প্রিহার পাপা কত বছর বয়সে বিয়ে করেছিলো পৃথা আপাকে? কারণ প্রিহার পাপার বয়স অতটাও বেশি নয়। আপনি দেখবেন, অনেক ছেলের প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ে করতে করতে ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর লেগে যায়। সেখানে ওনার বয়স এখন উনচল্লিশ বছর। খুব বেশি নয় তো!"

নিজাম উদ্দীন মৃদু হেসে বললেন,
"ঠিক বলেছো। আসলে প্রীষান আর পৃথা সেম এইজ ছিলো। ওরা ভার্সিটিতে পড়াকালীন অবস্থায় আমাদের সম্মতি নিয়েই বিয়ে করে ফেলে। আর এক বছরের মধ্যে প্রিহাও চলে আসে। তাই প্রীষানের বয়স ধরতে গেলে কম'ই। বেশ কম বয়সেই বাবা হয়েছিলো প্রীষান।"

কায়রা বিজ্ঞদের মতো মাথা নেড়ে বলল,
"বুঝলাম। আচ্ছা, পৃথা আপার বোন এখন কোথায়?"

নিজাম উদ্দীন একটু থমকালেন। তবুও বললেন, 
"প্রিমা এবরোডে সেটেল হয়ে গেছে। যদিও ওর ডিভোর্স হয়েছে অনেকবছর। এখন মন থেকে কতটা বদলেছে বা আদৌও শুধরেছে কিনা জানি না।"

কায়রা নখ কামড়ে প্রশ্ন করলো, 
"উনি কেন ভিলেনগিরি করেছিলো প্রীষান স্যার আর পৃথা আপার মাঝে? এইটা কিন্তু ক্লিয়ার করলেন না, বাবা!"

নিজাম উদ্দীন ধীর গলায় উত্তর দেয়, 
"প্রিমা পছন্দ করতো প্রীষানকে। তাই ও চায় নি প্রীষানের সাথে পৃথার বিয়েটা হোক। আমার বড় মেয়েটাকে হিংসা করতো প্রিমা। অনেকবার দুজনের মধ্যে ঝামেলা লাগানোর চেষ্টা করলেও প্রীষানের বুদ্ধিমত্তার কাছে বারবার হেরেছে।"

কায়রা'র রাগ লাগলো প্রিমা নামক মহিলার উপর। মানুষের সংসার নষ্ট করতে চেয়ে কি আনন্দ পায় এরা! নিজাম উদ্দীন আফসোস করে বললেন,
"এসব অনেক আগের কথা। আমি ওর বাবা, কেমন আছি না আছি সে খোজ-খবর কোনোদিন রাখেনি ও। দুজনেই আমার জমজ সন্তান, অথচ দুজন কতটা আলাদা ছিলো! ছোট'টাকে মানুষ করতে পারিনি। কি অভা'গা বাবা আমি!"

কায়রা থমকে যায়। সে উঠে গিয়ে নিজাম উদ্দীনের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে। তারপর আলতো গলায় বলে, 
"আপনি না আমায় 'আম্মু' বলেন? আমিও তো 'বাবা' বলে ডাকি। এগুলো কি নিছক'ই ডাক? মন থেকে মানেননি?"

নিজাম উদ্দীন দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
"না আম্মু! আমি তোমাকে নিছক 'আম্মু' নামে ডাকি না। তোমার মাঝে পৃথার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই আমি৷ 
পৃথার পর আমি তোমাকেই একমাত্র আম্মু ডেকেছি। আমার মনে হয়, এইতো আমার আম্মুটা চোখের সামনে ঘুরছে!"

কায়রা ম্লান হাসলো। বলল,
"পৃথা আপার মতো আমি কখনোই হতে পারবো না। কারণ এত পারফেক্ট মেয়ে আমি নই। দেখেন না, কত ঝামেলা করি, ঠিকঠাক গোছাতে পারি না কিছু। উল্টো সব ভেস্তে দেই। এজন্যই প্রিহার পাপা আমাকে পছন্দ করে না।"

নিজাম উদ্দীন কায়রার কথাকে ভুল প্রমাণিত করে কায়রার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলল,
"উহু! ভুল জানো তুমি। পৃথা মারা যাওয়ার পর প্রিমা বহু চেষ্টা করেছে প্রীষানকে বিয়ে করতে। কিন্তু সফল হয় নি। আর সেই প্রীষান তোমাকে নিজে বিয়ে করেছে। এবার বলো, তুমি সাধারণ?"

কায়রা অবাক হলো। এর উত্তর জানা নেই কায়রার। কিজানি কোনটা সঠিক! কায়রা বুঝতে পারে না। তবে নিজাম উদ্দীন ভুল কিছু বলেননি। বিয়ের জোর প্রীষানের'ই ছিলো। নাহলে এই লোক'কে বিয়ে করা কায়রার স্বপ্নাতীত। 

----------------------------
 
সন্ধ্যার আগেই প্রীষান গটগট পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। ড্রয়িং রুমে বসে থাকা নিজাম উদ্দীনকে হাসিমুখে সালাম জানায়। তারপর প্রীষান নিজাম উদ্দীনের পাশে বসে টুকটাক সারাদিনের আলাপচারিতা সাড়ে। তখন কায়রা বাচ্চাদের রুমে ছিলো। হুট করেই প্রীষান কায়রার চিৎকার শুনতে পায়। নিজাম উদ্দীনও ভয় পেয়ে যায়। প্রীষান আর এক মুহুর্ত দেরি না করে ছুটে যায় প্রিহার রুমের দিকে। গিয়ে দেখে ঘরে কেউ নেই। বারান্দায় প্রিহাকে দেখতে পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখে কায়রা নিচে বসে আছে। ভ্রু কুঁচকে যায় তার। তারপরই চোখে পরে বারান্দায় ঝোলানো ফুলের টব'সগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এভাবে পড়ে থাকতে দেখে হতবাক হয়ে যায় প্রীষান, কপাল কোচকায় তার। প্রীষান যে তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তখনও কেউ খেয়াল করেনি। প্রীভান মাথা চাপড়ে কায়রাকে বলল,
"উফ'ফ! আন্টি, একটু দেখে কাজ করবে তো?"

কায়রা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 
"আমি কি করে জানবো ওখানে বিড়াল লাফ দেবে? আচমকা আসায় ভয় পেয়েছিলাম আমি। উফ'ফ! আমার পা!"

প্রিহা এবার ভয় জড়ানো গলায় বলে, 
"পায়ে আবার কি হলো? মচকে গেছে নাকি, আন্টি?"
 
কায়রা কাঁধ ঝাকিয়ে ধরা গলায় বলল, 
"জানি না। কিন্তু ব্যাথা লাগছে। এক পা তো খুইয়েছি, এবার আরেকটা ভেঙে লু'লা হয়ে বসে থাকতে হবে দেখা যায়!"

পেছন থেকে প্রীষান কাটকাট গলায় ধমকে বলল,
"হোয়াট দ্য হে'ল! লুলা হওয়ার সব বন্দোবস্তো নিজেই করছো। এখন আফসোস করে লাভ কি! মানুষ কবে হবে তুমি, ইডিয়েট?"

প্রীষানের গলা পেয়ে তিনজন একসাথে ঘুরে তাকায়। 
কায়রা মাথা নিচু করে নেয় তার বেপরোয়া আচরণের জন্য। এবার প্রীষান ধীর, স্থির ভঙ্গিতে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসে। তা দেখে কায়রা মনে মনে ভাবে, 'মারবে নাকি এবার?' এমন ভাবনার মাঝে
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই প্রীষান কায়রাকে এক ঝটকায় পাজোঁকোলে তুলে নেয়। আচমকা এমন ঘটনায় কায়রার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। নিজের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু'হাতে প্রীষানের গলা জড়িয়ে ধরে। তার দৃষ্টি আটকে থাকে প্রীষানের মুখে। চোখ বড় বড় করে প্রীষানের পানে তাকায় সে। 

বাচ্চারাও তখন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই দৃশ্যে। আর প্রিহা তো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলা করে তার।

প্রীষান কোনো কথা না বলেই কায়রাকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। তারপর প্রীষান কায়রাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে সোজা বিছানায় বসিয়ে দেয়। কায়রার পায়ের কাছে নীরবে বসে প্রীষান। কোনো দ্বিধা না করে সে হাত বাড়ায় কায়রার পায়ের দিকে। মচকানো পা ঠিক করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই কায়রা আঁতকে উঠে পা সরিয়ে নেয় তড়িঘড়ি করে। বিস্ময় আর অস্বস্তির মিশেলে কাঁপা গলায় বলে উঠে,
“কি করছেন?”

প্রীষানের কপালে ভাঁজ পড়ে সামান্য। বিরক্তি আসে তার। তবে কোনো উত্তর না দিয়ে সে এবার খানিকটা জেদ করেই কায়রার পা আবার নিজের দিকে টেনে নেয়। ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে আচমকা একপাশে বাঁকিয়ে দেয়। হঠাৎ সেই টানে কায়রার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে এক চাপা আর্তনাদ,
 “আহ্…!”

কিন্তু পরের মুহূর্তেই কায়রা থেমে যায়। চোখের পাতা কেঁপে উঠে। দৃষ্টি স্থির হয়ে আসে নিজের পায়ের ওপর। আশ্চর্য, ব্যথা… নেই। কোথায় গেলো? কায়রা গোলগোল দৃষ্টিতে তাকালে প্রীষান উঠে দাঁড়িয়ে কায়রার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলে,
"ঠিক হয়েছে পা। এবার হাঁটতে পারবে।"

এই বলে তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় প্রীষান। বাইরে থেকে আসার পর ফ্রেশ হওয়া হয় নি। প্রীষান চলে গেলে কায়রা উঠে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যি হাঁটার চেষ্টা করে। আশ্চর্যভাবে, হাঁটতেও পারছে। অথচ একটু আগেও না ব্যাথা করছিলো! প্রীষান স্যার কি ম্যাজিক জানে নাকি? ভেবেই মুচকি হাসলো কায়রা। 

পরমুহূর্তেই নিচতলা থেকে হঠাৎ করেই ভেসে আসে দরজায় একটানা ঠকঠক শব্দ। যেন খুব অধৈর্য আর অস্থির হয়ে শব্দ করছে কেউ। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছে না দেখে শেষমেশ কায়রাই উঠে দাঁড়ায়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। ততক্ষণে আওয়াজটা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত স্বরে বলে উঠে সে,
“আসছি, আসছি! দরজা ভেঙে ফেলবেন নাকি!”

দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই কায়রা মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে উঠে। দৃষ্টি আটকে যায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ওপর। মেয়েটা অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে যাচ্ছে তার। পরনে ক্যাজুয়াল ফরেইন ড্রেস। এই মুখ চিনতে একটুও অসুবিধা হয় নি কায়রার। কিন্তু এখানে মেয়েটাকে দেখে অবাক হয়েছে। একটু এগিয়ে এসে মেয়েটা নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় কায়রার দিকে। হাসিটা আরও স্পষ্ট করে বলে,
“হাই! আমি প্রিমা। তুমি নিশ্চয়ই প্রীষানের ওয়াইফ… রাইট?”

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
 
পর্বসংখ্যা:৪২

 

হঠাৎ দরজার সামনে প্রিমাকে দেখে কায়রা খানিকটা থমকে গিয়েছিলো। বিস্ময়ের সেই মুহূর্তটা খুব দ্রুতই সে গুছিয়ে নেয় নিজের স্বভাবসুলভ সংযমে। ঠোঁটে হালকা সৌজন্যমিশ্রিত হাসি এনে কায়রা বলল,
“জ্বি, আমি'ই সে… ভেতরে আসুন।”

প্রিমা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে নতুন পরিচয়ের ভদ্রতায়। কিন্তু কায়রার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নেয় সে। তার চোখে একচিলতে বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠে কায়রার দেখানো দেমাগে। কায়রার এই অহমিকাটুকু যেন তাকে খানিকটা বিদ্ধ করলো মৌন অপমানে। পরক্ষণেই ভাবনা ঝেড়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে সুটকেস টেনে ভেতরে ঢুকে পড়ে প্রিমা। 

ড্রয়িংরুমে তখন নিজাম উদ্দীন সোফায় বসে ছিলেন। আচমকা মেয়েকে সামনে দেখে তিনি কিছুটা চমকে উঠলেন। ভ্রু কুঁচকে, কণ্ঠে অস্বস্তি মিশিয়ে বললেন,
“তুমি দেশে কবে ফিরেছো? আর এখানে?”

প্রিমা যেন প্রশ্নটাকে একেবারেই আমল দিলো না। বরং শিশুসুলভ আহ্লাদী ভাব নিয়ে এগিয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল,
“আশ্চর্য কথা বলছো, বাবা! তুমি এখানে, আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা এখানে। আর আমি আসবো না? এইতো গতকাল ফিরেছি। তাছাড়া, এতদিন পর মেয়েকে দেখে একবারও জানতে চাইলে না আমি কেমন আছি?”

নিজাম উদ্দীন ধীর, কিন্তু কেমন যেন কটাক্ষভরা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি কতটা ভালো আছো। আর তাছাড়া… তুমি একজন ইনডিপেনডে'ন্ট ওম্যা'ন। খারাপ থাকার তো কথা না!”

কথাগুলো শুনে প্রিমার মুখের হাসিটা এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেলো। মুখটা চুপসে মাথা নিচু করে নিলো সে। তার ইনডিপেনডেন্ট নামক উচ্ছৃঙ্খল, অবাধ্য জীবনযাপনের জন্য এই নিয়ে তিনটে সংসার ভেঙেছে ডিভোর্স হয়ে। এসব কথা মনে পড়ে যায় তার বাবার ইঙ্গিতপূর্ন কথায়। যার কারণে, বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে উঠলো বিষাদপূর্ণ তিক্ত অতীতে। প্রিমা ফুঁসে উঠলো ভেতর ভেতর। কিন্তু প্রতিউত্তর না করে নিজেকে সামলে চলে গেলো বাচ্চাদের ঘরে দেখা করতে। 

কায়রা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলো। কিন্তু নিজাম উদ্দীনের কথার অন্তর্নিহিত তীক্ষ্ণতা তার বোধগম্য হলো না। তাই খুব বেশি না ভেবে কায়রা ধীরে ধীরে নিজাম উদ্দীনের দিকে ফিরে বলল,
“বাবা, আটটা বাজতে চললো। আপনাকে খেতে দেবো এখন? একটু পরে হয়তো আমাকে রেডি হতে হবে… উনি কোথাও নিয়ে যাবেন বলেছেন।”

নিজাম উদ্দীন কোমল গলায় বললেন,
“তুমি খাবার বেড়ে ঢেকে রেখে দাও, আম্মু। আমি সময়মতো নিয়ে খেয়ে নেবো। তুমি এবার দ্রুত যাও, রেডি হও গিয়ে।”

কায়রা আলতো হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলো। এরপর সব গুছিয়ে নিজের রুমে ফিরে গেলো। রুমে ঢুকতেই দেখে প্রীষান ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে বসে ফোন স্ক্রল করছে। কায়রা আলমারি খুলে শাড়ি বের করতে করতে হালকা স্বরে বলল,
“আপনার শালী এসেছে।”

প্রীষান ভ্রু তুলে বলল,
“আমার জানামতে তো তোমার কোনো বোন নেই!”

“পৃথা আপার বোন,” 

শান্ত গলায় জবাব দিলো কায়রা। এক মুহূর্তের জন্য প্রীষান থমকে গেলো। তারপর প্রীষানের কণ্ঠে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠে, 
“হোয়াট? প্রিমা দেশে কবে আসলো?”

কথা শেষ না করেই সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। গটগট পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে। পেছনে কায়রা রয়ে গেলো  নিজের অলীক জগতের ভাবনায়। পরমুহূর্তেই আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি-কাপড় গুছিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। এবার সে একেবারে তৈরি হয়েই বাইরে যাবে। 

---------------------------

প্রিহার ঘরে এসে প্রীষান প্রথমে দাঁড়িয়ে যায় এক মুহূর্তের জন্য। দরজার বাইরে থেকে স্থির দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখছিলো সে। পড়ার টেবিলের সামনে বসে মনোযোগে বইয়ের পাতায় ডুবে আছে প্রিহা। এসএসসি সামনে, তারওপর মডেল টেস্ট আছে। চারপাশের শব্দ এখন তার কাছে কোনো অস্তিত্বই রাখে না, ফিকে হয়ে আছে পড়ার মনোযোগে। প্রীষান ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে নরম গলায় ডাকলো,
“এখনো তৈরি হও নি কেন, প্রিন্সেস?”

বাবার গলা পেয়ে বই থেকে চোখ তুলে প্রিহা শান্ত স্বরে বলল,
“কাল থেকে আমার মডেল টেস্ট শুরু, পাপা। যেতে পারবো না। অনেক পড়া বাকি… প্রীভান যাবে। ও তো তৈরি হচ্ছে।”

মেয়ের কথায় প্রীষানের চোখে একরাশ মমতা জমে উঠলো। সে এগিয়ে এসে প্রিহার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিলো এবং বলল,
“ওহ, সেদিন বলেছিলে তুমি টেস্টের কথা। আচ্ছা, মন দিয়ে পড়ো। এন্ড টেক কেয়ার। আমরা খুব দেরি করবো না, যত দ্রুত সম্ভব ফিরবো। ওকে!”

প্রিহা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর আবার বইয়ের পাতায় ডুবে গেলো সে। ঘর ছেড়ে প্রীষান যখন ড্রয়িংরুমে এলো, তখন সেখানে একাই বসে ছিলো প্রিমা। তার ঠোঁটে ঝুলে থাকা হাসিটা ছিলো একটু বেশি ধারালো, একটু বেশি ইচ্ছাকৃত। সে প্রীষানকে দেখেই মৃদু কটাক্ষে বলল,
“কি অবস্থা, প্রীষান? ‘সেকেন্ড ম্যারেজ’-এর ফিলিংস কেমন?”

‘সেকেন্ড ম্যারেজ’ শব্দটা সে ইচ্ছে করেই একটু জোর দিয়ে বলল। তবে, এতে প্রীষান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। কারণ, প্রীষান ভালো করেই জানে প্রিমার উন্মত্ত স্বভাব-চরিত্র। সে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
“ফিলিংস? গু'ড। একচুয়ালি কি বলতো, সেকেন্ড বিয়ে হলেও বিয়েটা আমার কাছে সম্মানে'র। আমার স্ত্রী পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার অনেক বছর পর আমি আবার বিয়ে করেছি। আমি তোমার মতো ইচ্ছে হলেই একের পর এক সংসার ভেঙে তিন-চার'টে বিয়ে করা পাবলিক নই!”

প্রিমা এই অপমানসূচক কথাটা গায়ে মাখলোই না। বরং চোখ সরু করে বলল,
“তাহলে এত ভালোবাসা-ভালোবাসা নাটক কেন? পৃথাকে যদি এত'ই ভালোবাসতে, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে করলে কেন? একা থাকতে পারোনি বলে, না?”

প্রীষান এবার হালকা হেসে হেয় চোখে তাকালো তার দিকে। ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে ভীষণ জোর গলায় বলল,
“বিয়ের জন্য যদি সত্যিই তড়পাতা'ম, তাহলে পৃথা চলে যাওয়ার পরপর'ই বিয়ে করতাম। এগা'রো বছর এভাবে একা থাকতাম না। আর বিয়ের জন্য আমার মেয়ের অভাব হতো না, ইয়্যু নো ভেরি ওয়েল!সবাইকে নিজের মতো ভেবে নিও না, প্রিমা।”

কথাগুলো ধীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ ধারালো। এবার প্রিমা এগিয়ে গিয়ে কণ্ঠে একটু কাঁপন এনে বলল,
“তুমি আমাকে কখনো বুঝলে না, প্রীষান… সেই বিয়েটা যখন করলেই, তখন আমাকে কেন নয়?”

প্রীষানের হাসিটা এবার একটু ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। দৃষ্টিতে নামল অবজ্ঞার ছায়া। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তোমাকে বুঝেছি বলেই বিয়ে করিনি। কারণ, তুমি নিজেই নিজেকে বার বার প্রমাণ করে দাও, এজ এ পার্ভা'র্ট! তোমাকে ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, প্রিমা। বাড়িতে এসেছো, থাকবে, খাওয়া-দাওয়া করবে, ইনজয় করবে এবং ভদ্রতার সাথে চলে যাবে। আমার পরিবারের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না। শুধুমাত্র, বাবা আর বাচ্চাদের কথা ভেবে বাড়িতে এলাও করলাম তোমাকে। নাহলে তুমিও জানো আমি খারাপ হলে ঠিক কত'টা খারাপ হতে পারি!"

প্রীষানের কথাটা শেষ হতেই প্রিমার মুখ শক্ত হয়ে গেলো। সে আর কিছু বলল না, কিন্তু চোখে জমে থাকা অপমানটার প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নামছিলো কায়রা। আজ তাকে আলাদা করে সুন্দর এবং বেশ গুোছানো লাগছে শাড়িতে। প্রীষান কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলো। কায়রা নিচে নেমে হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“এই শাড়িটায় ঠিকঠাক লাগছে? আসলে নিজে নিজে প্রথমবার পরলাম..”

প্রীষান চোখ নামালো না। বরং সরাসরি মৃদু হেসে বলল,
“ইয়াহ…পারফেক্ট। এন্ড গর্জিয়া'স!”

কায়রা পরিতৃপ্তিতে হালকা হাসলো। এরপর তাড়া দিয়ে বলল,
“আমি তো রেডি। বাচ্চাদের হলে চলুন।”

এই মুহূর্তে প্রিমার ভেতরটা যেন আরও বেশি জ্বলে উঠলো। আদিক্ষেতা দেখানো হচ্ছে! এর শোধ নিয়ে তবেই যাবে প্রিমা! বাইরের শান্ত মুখের আড়ালে তার ভেতরে অস্থিরতা জমতে থাকলো। ঠিক তখনই প্রীভান বেরিয়ে এলো। প্রিমার দিকে তাকিয়ে হাসলো,
“বাই, মিমি। এসে কথা হবে।”

প্রিমা বুকে কষ্ট চেপে কোনোভাবে জোরপূর্বক ঠোঁটে হাসি টেনে আনলো আর হাত নাড়িয়ে বাই জানালো।
এরপর প্রীষান, কায়রা আর প্রীভান বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে কায়রা হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“প্রিহা এলো না?”

প্রীভান ইয়ারফোন কানে গুঁজতে গুঁজতে বলল,
“আপুর এক্সাম।”

“ওহ,”

কায়রা শুধু এতটুকুই বলল। গাড়িতে বসার সময় সামনে প্রীষানের পাশে বসলো কায়রা। পেছনে প্রীভান, ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে ডুবে গেলো গেমের দুনিয়ায়। এরপর ইঞ্জিন স্টার্ট নিলো গাড়ির। গাড়ি এগিয়ে চললো শহরের আলো-ছায়া ভেদ করে।

-------------------------------

কাবির আজ সন্ধ্যায়'ই বাড়ি ফিরেছিলো। কিন্তু খুব বেশি বাড়িতে থাকার সুযোগ পেলো না সে। একটা জরুরি কাজ মনে পড়তেই আবারও তাকে বেরিয়ে যেতে হলো রাতের দিকে। তবে যাওয়ার আগে, প্রীতিষার কথা মনে করে কাবির তার পড়ার টেবিলের পাশে চার্জার লাইটটা রেখে গিয়েছিলো। তাছাড়া, প্রীতিষা টেবিলে বসে পড়ছিলো তখন। লাইট রাখার কারণ, যাতে মেয়েটা আবার সেদিনের মতো অন্ধকারে ভয় না পায়। এখন এই ছোট্ট বিষয়টা কাবিরের কাছে অস্বাভাবিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাবির বাইরে যতই কঠিন এবং খাপছাড়া হোক, কিন্তু প্রীতিষার সামনে সে সবসময় একটু নরম গোছের।

রাত সাড়ে আটটার দিকে কাবির আবার ফিরে এলো।  প্রীতিষা তখনও টেবিলে বসে পড়ছিলো আগের মতো। বইয়ের পাতায় তার চোখ স্থির, আর কলমের শব্দে ভর ছিলো খাতায়। কাবির ব্যাগটা এক পাশে রাখলে আওয়াজ পেয়ে পেছন ফিরে তাকায় প্রীতিষা। এরপর সে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করে,
“ব্যাগ বোঝাই করে কি কিনলে এতো?”

প্রীতিষা ভ্রু কুঁচকে ব্যাগের দিকে তাকালো। কাবির হালকা ভঙ্গিতে বলল,
“শাওয়ারের হাতল, ট্যাপ কল, পাইপ… এইসব কিনলাম।”

প্রীতিষা অবাক হয়ে যায়,
“কেন? আমাদের টিউবওয়েল তো ঠিকই আছে!”

কাবির হালকা হাসলো,
“তোমার তো কষ্ট হয় পানি তুলতে! গোসল থেকে শুরু কইরা সব কাজ তো ওই টিউবওয়েলে'ই করা লাগে। এখন আর লাগবো না, কালকেই ট্যাপ কল লাগামু। তারপর কল ঘুরাইলেই ঝরঝর কইরা পানি পড়বো!”

প্রীতিষা মাথা নেড়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
“এগুলো কিন্তু বাড়াবাড়ি, কাবির! আমাদের টিউবওয়েলে তো একদম ইজিলি পানি আসে। এসবের দরকার ছিলো না। শুধু শুধু এতগুলো টাকা নষ্ট!”

কাবির যেন আগে থেকেই জানতো ঠিক এই কথাটাই শুনতে হবে তাকে। তাই সে একটু চোখ ছোট করে বলল,
 “এই! তুমি তো দিন-দিন কিপ্টা হইয়া যাইতাছো।”

প্রীতিষা সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় স্বরে জবাব দিলো,
“এটাকে কিপ্টেমি বলে না, মিতব্যয়িতা বলে।”

কাবির হেসে হঠাৎ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিলো,
 “আচ্ছা, বাদ দেও। পড়া কতদূর?”

প্রীতিষা আবার টেবিলে বসতে বসতে বলল,
 “আরেকটা চ্যাপ্টার আছে।”

সে যখন আবার বইয়ে ডুবে গেলো, ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাট থেকে হঠাৎ উচ্চস্বরে গান বেজে উঠলো। আধঘন্টার জন্য থেমেছিলো এরা। তাছাড়া বিকেল থেকেই সেই উচ্চস্বরে আওয়াজ আসছিলো একটানা। যা প্রচন্ড অস্থির, বিরক্তিকর। উপায় না পেয়ে প্রীতিষা কানে হাত চেপে ধরলো, কিন্তু পড়া থামালো না।

তবে এবার কাবিরের মুখ শক্ত হয়ে গেলো। অলরেডি কাবির ক্ষেপেও গেছে। কাবির বিরক্তিকর কন্ঠে তেঁতে উঠে বলল,
“এই বা'লগুলা কি শুরু করছে রাতের বেলায়! এত জোরে বক্স বাজাইতাছে ক্যা!”

প্রীতিষা এবার পাশ ফিরে ঘাড় ঘুরিয়ে হতাশ গলায় বলল,
 “জানো, আজ সারাদিন ধরেই এমন চলছে! আমি বিকেল থেকে কানে হাত চেপে পড়ছি।”

কাবির এবার দ্রুত ভঙ্গিতে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে পাগলা ষাড়ে'র ন্যায় দেয়ালে খাড়া করা ব্যাট হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
"দাঁড়াও, অগো ফু'র্তি যদি না ছুটাই'ছি তাইলে আমার নামও কাবির না! কিসের এত কুড়কুড়া'নি উঠছে অগো দেইখা আসি?"

প্রীতিষা আঁতকে উঠে এবার। সে চায় না কাবির কোনো ঝামেলায় জড়াক। তাই সে ভয় পেয়ে দৌড়ে এসে পেছন থেকে কাবিরকে জড়িয়ে ধরলো। 
“এইইই'ই! না না… প্লিজ, যেও না। ঝামেলা চাই না আমি। কি দরকার...”

কাবির হাত সরিয়ে নিতে চাইলো,
“ছাড়ো, প্রীতি! এর আগেও ব্যা'টাদের নামে ওয়ার্নিং আইছিলো। কিন্তু যেই লাউ সেই ক'দু! অগো কিছু না কইলে থামবো না।”

কিন্তু প্রীতিষা শক্ত করে ধরে রইলো
“প্লিজ কাবির…”

বউয়ের অনুরোধে কাবিরের রাগ কমলেও পুরোপুরি ঠান্ডা হলো না সে। কাবির নীচে নেমে উঠোনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর মাথা উঁচু করে তিনতলার ব্যাচেলর ছেলেপুলেদের দিকে চিৎকার করে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,
 “ওই শু/য়োরে'রা! এক্ষু'নি গান বন্ধ কর! তগো বাম পাশের বাড়িতে হার্টের পেশেন্ট আছে। গান না বন্ধ হইলে আমি উপরে আইসা তগো গু-ভর্তি মাথা আর বালে'র বক্স দুইটাই এই ব্যাট দিয়া ভাঙ'মু! বন্ধ কর!"

কাবিরের হুংকারে সাথে সাথে ছেলের-দল গান বন্ধ করে দিলো। প্রীতিষা পেছন থেকে এসে কাবিরের হাত ধরলো। ধিমি গলায় বলল,
“আল্লাহ! কত রেগে যাও তুমি! হয়েছে, এখন শান্ত হও।”

কাবির কিছু বলল না। শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে প্রীতিষার হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে এলো। এসেই কাবির ধপ করে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে হালকা স্বরে বলল,
“মুডটা'ই নষ্ট হইয়া গেলো, প্রীতি।”

প্রীতিষাও ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ায়। আফসোসের পরক্ষনেই হঠাৎ কাবিরের চোখে আবার সেই বুদ্ধিদীপ্ত আলোটা ফিরে এলো। এইবার চমৎকার একটি আইডিয়া পেয়েছে সে। তাই শোয়া অবস্থাতেই মাথার পেছনে এক হাত রেখে প্রীতিষার দিকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“চলো, একটা এডভেঞ্চারে যাই।”

প্রীতিষা অবাক হয়ে তাকালো,
“এডভেঞ্চার! এখন?”

“হ্যাঁ, এখনি। যাও, দ্রুত চেঞ্জ কইরা আসো।”

প্রীতিষা ভ্রু তুলে বলল,
“কোথায় নিয়ে যাবে বলো আগে?”

কাবির ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হেসে বলল,
“তোমারে নিয়া বাই'ক ডে'টে যামু।”

----------------------------

বাইকের স্পিড ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এখন সর্বোচ্চ স্পিডে আছে বাইকের গতি। প্রীতিষা তো কাবিরকে জাপ'টে পেছন থেকে ধরে আছে ভয়ে। প্রীতিষার বাঁধা চুলগুলোও যেন ছাড়া পেয়ে উড়তে চাইছে। তার বেবিহেয়ারগুলো বেরিয়ে এসে উড়ছে। কাবির তো মনের খুশিতে বাইক চালানোতে ব্যস্ত। প্রীতিষা ভয়ার্ত গলায় কাবিরের কাঁধ চাপড়ে বলল,
"এই কাবির! আস্তে চালাও প্লিজ! এভাবে বেশিক্ষণ চালালে আমরা দুজনেই অকালে অ'ক্কা পাবো!"

কাবির দুষ্টু কন্ঠে বলল,
"আচ্ছা, স্পিড কমাইতাছি। তার আগে বলো, একটু পর যা করমু তাতে তুমি রাজি?"

প্রীতিষা তড়িঘড়ি করে বলল,
"হ্যাঁ-হ্যাঁ, সবকিছুতে রাজি আমি। আগে জান বাঁচানো ফরজ!"

কাবির বাঁকা হাসলো। এইতো সুযোগ পেয়েছে সে। এবার বাইকটার অস্বাভাবিক গতি কমিয়েছে কাবির। উন্মাদ'না আর একরাশ বেপরো'য়া ভালোবাসা নিয়ে সেই চলন্ত বাইকের মাঝেই হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে প্রীতিষার অধরজো'ড়া আঁকড়ে ধরলো কাবির। প্রীতিষা এক সেকেন্ডের জন্য অবাক হলেও সাড়া দিলো। একটা লাগামছা'ড়া, অসংয'ত দীর্ঘ ওষ্ঠচুম্বনে মত্ত হলো দুজন। দীন-দুনিয়া ভুলে মোহাবিষ্ট অবাধ্য আবে'গে আপ্লুত হলো তারা।

ঠিক তখনই রাস্তার অপর পাশে গাড়ি চালাতে চালাতে এমন দৃশ্যটা চোখে পড়ে প্রীষানের। গেট টুগেদারের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় রাস্তায় এই দৃশ্য নজর কাড়ে তার। অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে চোখ স্থির হয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড প্রীষানের। কিন্তু ততক্ষণে বাইক'টা হাওয়ার বেগে মিলিয়ে গেলো সামনে থেকে। প্রীষানের রাগ উঠলো। স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তোমার ভাই তো দেখছি কাবির খান থেকে কাবির সিং হয়ে গেছে! এতটা ওয়াই'ল্ড!”

গাড়িতে পাশের সিটে বসে থাকা কায়রার নিজেরও দৃশ্যটা চোখে পড়েছিলো। কিন্তু প্রতিক্রিয়া করেনি সে। এসব দেখেই হালকা মুচকি হাসছিলো। কায়রা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,
“আপনি কি আশা করেছিলেন, বিয়ের পরেও ভাইজান সালমা'ন খান থাকবে? একটু তো চেঞ্জ আসবেই! হাউ রোম্যান্টি'ক দ্যে আর! তাছাড়া দেখলেন না, প্রীতিষাও কতটা ইনজয় করছিলো? এখন তারা স্বামী-স্ত্রী, যা ইচ্ছে করুক। আমাদের'ই বা কি বলার আছে?”

প্রীষান এবার কিছুটা বিমূঢ়, কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলল,
“আর ইয়্যু ম্যাড? এটাকে তুমি রোমান্টিসিজম বলছো? আমি কিন্তু ওদের লাইফ রিস্কের কথা ভাবছি! এভাবে বাইকে...”

কায়রা ধীরেসুস্থে মাথা নাড়লো। প্রীষানের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই কায়রা ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসী হাসি টেনে বলল,
“কিছুই হবে না ওদের। ভাইজান খুবই দ'ক্ষ, আই মিন বাই'ক চালাতে। হি ইজ অলসো আ ড্যাম'ন গুড রেসা'র, ইয়্যু নো!”

প্রীষান এবার পেছনে তাকায় প্রীভানের উদ্দেশ্যে। ছেলেটা গেম খেলতে ব্যস্ত। যাক, বাঁচা গেলো। এইসব দৃশ্য প্রীভান দেখলে লজ্জায় পড়তে হতো তাদের। মাথা নেড়ে পরক্ষণেই হঠাৎ ভ্রু কুচকে ফেলে প্রীষান। কি মনে করে যেন বলেই ফেলে, 
"আচ্ছা কায়রা, তুমি কি আমার কাছ থেকে রোমান্টিকতা এক্সপেক্ট করো?"

কায়রা পাশ ফিরে তাকালো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
"এক্সপেক্ট করার কি আছে? আপনি যথেষ্ট রোমান্টিক, প্রিহার পাপা!"

প্রীষান বিস্মিত হয়। জিজ্ঞেস করে, 
" কিভাবে আমি রোমান্টিক হলাম? আমি তো এমন কিছু করিই'নি তোমার সাথে!"

কায়রা এবার লজ্জালু ভাব ধারণ করে পুরোনো কিছু স্মৃতিচারণ করে। নিজের হাতের আঙুলে কানের পিঠে চুল গুজে দিয়ে বলে,
" করেছেন তো।"

প্রীষান হতবুদ্ধি হয়ে যায়। 
" মজা করলে খবর আছে তোমার, কায়রা! ঠিকঠাক বলো, কেন আমাকে রোমান্টিক মনে হলো?"

কায়রা বেশ জোর দিয়ে বলতে শুরু করে, 
"আশ্চর্য, মজা করবো কেন? আমাদের মধ্যে রোমান্টিক কিছু হয়নি কে বলেছে আপনাকে? ওইযে সেদিন আপনি আমার মাথায় তেল দিয়ে দিলেন, এটা রোমান্টিক ছিলো না? আবার মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, আজকে আমি পড়ে যাওয়ায় আমাকে কোলে তোলা, এসব রোমান্টিক ঘটনা নয়? আপনি তো দেখছি কিছুই জানেন না!"

প্রীষান ভড়কে গিয়ে বলে,
"এগুলো রোমান্টিক!"

কায়রা মাথা নেড়ে নির্লজ্জের মতো বলতে লাগে, 
"হ্যাঁ, এগুলোই তো। আমি তো আপনার করা সব কাজেই রোমান্টিকতা খুঁজে পাই, প্রিহার পাপা। আপনি যখন আমার আশেপাশে থাকেন তখন আপনার শরীর থেকে যে ম্যান'লি পারফিউমে'র ক'ড়া স্মে'ল আসে, এটাও একটা রোমান্টিক'তা। আপনি যখন আমাকে বকাঝকা করেন, সেটাও একটা রোমান্টিক'তা। আপনি যখন খালি গায়ে... "

প্রীষান এবার কায়রাকে থামিয়ে দিয়ে ধমকে উঠে,
"স্টপ...স্টপ! পাগ'ল করে দেবে তুমি আমাকে! রোমান্টিকতা কি সেটা আমি তোমাকে পরে বোঝাবো। এখন আর একটাও শব্দ করবে না। চুপ করে থাকো!"

কায়রা ফি'চ করে হেসে নিজের ঠোঁটে তর্জনী আঙুল দিলো প্রীষান চুপ করতে বলায়। এদিকে প্রীষান চমকেছে কায়রার এমন বেফাঁস কথাবার্তায়। এসব নাকি তার কাছে রোমান্টিক ঘটনা! চোখ রাস্তায় নিবদ্ধ রেখেই কায়রার উদ্দেশ্যে বিরবির করে বলল,
"স্টুপি'ড একটা!"

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
 
পর্বসংখ্যা:৪৩
 
 
 
যমুনা রিসোর্টটায় পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগেনি প্রীষানদের। গাড়ির চাকা থামতেই রিসোর্টের বাইরের চাকচিক্যময় আলো এসে পড়লো গাড়ির কাঁচে।  কায়রা আর প্রীভান গাড়ি থেকে নেমে যায় আগেই। তবে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসেই প্রীষান হালকা ঝুঁকে বলল,
"কায়রা, তুমি প্রীভানকে নিয়ে ভেতরে যাও। আমি গাড়িটা পার্ক করে আসছি।"

কায়রা মৃদু সম্মতিতে মাথা নেড়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরের পাশে টেনে নিলো। তারপর প্রীভানের হাতটা আলতো করে ধরে এগিয়ে গেলো রিসোর্টের ভেতরে।
প্রীভানের হাত আচমকা ধরায় অস্বস্তি হলো ওর। খানিকটা নিশপিশ করলো শরীর এই ভেবে যে, প্রীভান তো আর বাচ্চা নয়। সে এগারো বছরের। হাত ধরার কি আছে? 

এদিকে কায়রা রিসোর্টের ভেতরে ঢুকে আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে ব্যস্ত হলো সাজানো-গোছানো, নিখুঁত শৈল্পিকতায় ভরা জায়গাটাকে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ প্রীভান থেমে গেলো। নিচু স্বরে বলল,
"থ্যাংক ইয়্যু, আন্টি..."

কায়রা একটু থমকে তাকালো পাশ ফিরে। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
" কেন?"

প্রীভান ধীর গলায় বলল,
"পাপাকে ভুল বুঝেছিলাম। তুমি সেই ভুল'টা ভাঙিয়ে দিয়েছো।"

কায়রার ঠোঁটে নরম হাসি ফুটে উঠে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল প্রীভান,
" আপু আর আমি মিলে ঠিক করেছি তোমাকে আর আন্টি ডাকবো না। সবার সামনে বিষয়'টা ভীষণ অ'ড শোনায়।"

কায়রা এবার একটু অবাক হলো। অদ্ভুতভাবে চাইলো ছেলেটার দিকে। ছেলেটার এই পরিবর্তন ভাবাচ্ছে তাকে। যাক, বাচ্চাটার ভুল ভাঙাতে তো পারলো অবশেষে। কায়রা নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"তো কি ভাবলে তুমি আর তোমার আপু?"

প্রীভান একটু ইতস্তত করে বলল,
" 'মা' তো ডাকতে পারবো না। আমার বা আপু কারো পক্ষেই সম্ভব নয় 'মা' ডাকা। আসলে..."

কায়রা মাঝপথে থামিয়ে দিলো প্রীভানকে। এরপর শান্ত গলায় বলল,
" মা হওয়া এত সহজ না, প্রীভান। সন্তান কখনো ভাগ করা যায় না, তবে নতুন কিছু অনুভূতি তৈরি করা যায়। তাই দু'দিনের পরিচয়ে শুধু সম্পর্কের ভিত্তিতে তোমাদের আমাকে 'মা' ডাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তোমরা যেটাতে স্বস্তি পাও, সেটাই ডাকো। সম্পর্কটা জোর করে নয়, অনুভূতি দিয়ে তৈরি হওয়াই ভালো। মানুষ কি ভাবলো-না ভাবলো এই নিয়ে নিজেদের প্রেশারাইজ করার কোনো দরকার নেই, হুম?"

কথাগুলো শুনে প্রীভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখে নতুন করে কোনো অনুভূতি জন্ম নিলো বোধহয় কায়রার এমন ইতিবাচক কথায়। খানিকক্ষণ তাকিয়ে দেখে তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"তাহলে, 'মম' ডাকি তোমায়? আসলে আপু আর আমি মিলে এটাই ঠিক করেছি। তোমার পছন্দ না হলে পাল্টানো যেতে পারে।"

মুহূর্তের জন্য কায়রা স্থির হয়ে গেলো। এই ছোট্ট শব্দটা তার ভেতরের কোনো শূন্য জায়গা ছুঁয়ে দিলো।
তারপর হঠাৎ করেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো হাসিতে। চোখে আনন্দের ঝিলিক নিয়ে বলল,
"এটাই ডেকো তোমরা প্লিজ! আমিও ভেবেছিলাম আমার বাচ্চা-কাচ্চাদের 'মম' ডাক শেখাবো আমি। এটাই ফাইনাল, ওকে?"

 প্রীভান মাথা নেড়ে হেসে বলল,
" ওকে, ম'ম।"

'মম' ডাক শুনে কায়রার ভেতরে হঠাৎ যেন একরাশ দুষ্টু উন্মাদনা জেগে উঠে। চোখে চিকচিক করলো দুষ্টুমির ঝিলিক। উচ্ছ্বাস সামলাতে না পেরে সে একটু ঝুঁকে বলল,
" প্রীভান, আরেকবার ডাকো না… প্লিজ!"

প্রীভান কিছুটা বিস্মিত হয়ে তাকালো তার দিকে। ভ্রু কুঁচকে হালকা গম্ভীর সুরে বলল,
"এখন আবার কেন ডাকবো? এটা কেমন পাগলামি?"

কায়রা ঠোঁট উল্টালো। ভান করা অভিমানে বলল,
" উফ'ফ! তুমি ঠিক তোমার পাপার মতোই ভীষণ রু'ড, ব্যাডি!"

প্রীভানের ঠোঁটে তখন মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে। চোখে দুষ্টুমি খেলা করছে তারও। আচমকাই সেও কায়রার সাথে পাগলামিতে সায় দিলো। প্রীভান মাথা একটু কাত করে শান্ত স্বরে বলল,
"ইয়া'হ… আই এ'ম।"

কথাটা শেষ হতেই দু’জনেই হেসে উঠলো একসাথে।সেই হাসিতে ছিলো স্বচ্ছতা, অচেনা এক আপনত্ব।
সত্যিই তো… একদম বাপের হুবহু প্রতিচ্ছবি এ!কায়রা মনে মনে হেসে ফেললো এসব ভেবে। এভাবে মা-ছেলের স্বাভাবিক আলাপচারিতার ভেতরেই হঠাৎ  এক নতুন উপস্থিতির ছায়া পড়লো। এক মাঝবয়সী নারী, মুখভরা উজ্জ্বল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো তাদের দিকে। প্রীভানকে দেখেই স্নিগ্ধ স্বরে সে বলল,
" হাই প্রীভান! হাউ আর ইয়্যু, বেটা?"

প্রীভানও বিনীত হাসি ফিরিয়ে দিয়ে সংক্ষেপে উত্তর দিলো,
"আ’ম গুড।"

এরপর মহিলার দৃষ্টি গিয়ে থামলো কায়রার উপর। এক মুহূর্ত তাকিয়েই সে চিনে ফেললো তাকে।মহিলাটি কায়রাকে দেখে চিনতে পেরে যায়, কারণ প্রীষানের আইডিতে ছবি দেখেছিলো। তাই কায়রার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,
"ওহ, হাই ভাবী। আমি মৃনালী, প্রীষানের কলেজ ফ্রেন্ড। আপনি এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলুন না, ওদিকে যাই!"

কায়রা একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল,
"এইতো যাচ্ছিলাম'ই, প্রিহার পাপার জন্য একটু অপেক্ষা করছিলাম আর কি...."

প্রীষানদের ফ্রেন্ডস গ্রুপের সবচেয়ে মিশুক মেয়ে এই মৃনালী। তাই সে কায়রার আর কোনো কথা না শুনেই একরকম স্নেহভরা তাড়াহুড়োয় কায়রার হাত ধরে টানতে টানতে সামনে নিয়ে যেতে যেতে বললো,
"আরে ভাবী! প্রীষান তো সব চেনে এখানকার। চলে আসবে। আপনি বরং আমাদের সাথেই আসুন।"

অকস্মাৎ কায়রা বিস্ময়ের ঘোরে পড়ে গেলো। এত বড় একজন মহিলা, তাও আবার কত সহজ স্বরে তাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করছে! তার ওপর ‘ভাবী’ ডাকছে! এই সম্বোধনের ভার কায়রার মনে অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তুললো। সম্পুর্ন নতুন। মনে মনে ভাবলো, সে যে কেন সিনিয়রদের দলে এসে পড়লো? এখানে সবাই তার চেয়ে সিনিয়র। শুধু তাই নয়, দ্বিগুন বয়সের সিনিয়রও আছে। এদের কাছে তো কায়রা বাচ্চাসম। 

এদিকে মৃনালীর হাতের টানে টানে সে এগিয়ে এলো  একদল মানুষের মাঝে। প্রাণবন্ত আড্ডা, হাসি আর গল্পে ভরপুর সেই জায়গাটিতে সবাই প্রায় উপস্থিত। কায়রাকে দেখেই প্রীষানের এক বন্ধু তৌসিফ, কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
" ইনি কে?"

কায়রা ঠিক তখনই নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলো… কিন্তু তার আগেই প্রীষান হঠাৎ কোথা থেকে যেন এসে কায়রার পেছনে দাঁড়ালো। কোনো আড়ম্বর ছাড়াই একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে এক'হাতে আলতো করে কায়রার কোম'র জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। এবং তা কোনোরুপ সংকোচ ছাড়াই স্পষ্ট অধিকারের সহিত। পুরুষালী হাতের স্পর্শ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বেগে পাশ ফিরে তাকালো কায়রা। বিস্ময়ের শেষ প্রান্তে সে।ঠোঁটজোড়া খুলে সামান্য হা হয়ে গেলো তার। প্রীষান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে সামনে তাকিয়ে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ভীষন ক্যাজুয়াল গলায় বলল,

“মিট মাই বিলাভ'ড ওয়াইফ—মিসেস কায়রা শেখ।” 

প্রীষানের পুরো বন্ধুমহল একসাথে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লো তার আগমনে। হাসি, ডাকাডাকি আর চেনা সেই দুষ্টুমিভরা কোলাহলে মুহূর্তটা ভরে উঠলো। মনে হচ্ছিলো, সবাই যেন কেবল তার'ই অপেক্ষায় ছিলো।
তৌসিফ ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু স্বরে বলল,
"ওহো'হো! তার মানে এইটা'ই আমাদের ভাবী!"

প্রীষান হালকা হাসলো। উত্তরে জানায়, 
" জ্বি। "

প্রীষানের এই এক শব্দেই পরিবেশটা আরও সহজ হয়ে যায় কায়রার জন্য। প্রীষান এবার ধীরে ধীরে গা এলিয়ে আরাম করে সোফায় বসলো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের ইশারায় কায়রাকে নিজের পাশে ডাকলো বসতে। এদিকে কায়রা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। কারণ, কায়রা ভাবছে অন্য কথা। এরা কত সহজে কায়রাকে গ্রহন করেছে। একটুও হেজিটেশন নেই। ভেবেই কিছুটা ভালো লাগলো ওর। ঠোঁটের কোণা প্রস্বস্ত হলো ভাবনা বুঝে। চারপাশের এতগুলো স্বাভাবিক আচরণ করা মানুষ, এত সহজ স্বীকৃতি তাকে গ্রহন করার, সব মিলিয়ে তার ভেতরে ধাক্কা লেগেছিলো। নিজের হতবম্ব ভাবনা সরিয়ে ধীরে ধীরে কায়রা গিয়ে প্রীষানের পাশে বসলো। 

ইতিমধ্যে প্রীভান উঠে গেছে তার বন্ধুদের দিকে। তাদের আড্ডার এইদিকটায় শুধু বড়দের উপস্থিতি। বাচ্চাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ, প্রীষানদের গ্রুপে কিছু বেপরোয়া, বেলাগাম স্বভাবের বন্ধুরা আছে যাদের মধ্যে বাচ্চাদের রাখা মানে এক ধরনের ঝুঁকিই বটে। কখন কি বলে ফেলে ঠিক নেই এদের।

কিন্তু কায়রার মন এখন অন্য জায়গায় পাল্টি খেয়েছে। সে ধীরে ধীরে পাশে তাকালো প্রীষানের দিকে। আর ঠিক তখনই, তার পুরো পৃথিবী থেমে যায়। সব শব্দগুলো হারিয়ে যায়, হাসি-আড্ডার কোলাহল মুছে গিয়ে সবকিছু কাচের মতো ঝাপসা হয়ে উঠে। বাকি দুনিয়া হুট করেই কায়রার কাছে ব্লার হয়ে গেছে। কেবল একজনই স্পষ্ট, প্রীষান। 

কোনো আওয়াজ আর পৌছাচ্ছে না কায়রার কানে। ধ্যান, জ্ঞান প্রীষানকে দিয়ে অপলক তাকিয়ে রয়েছে কায়রা। আর ভাবছে, এত সুন্দর কেন এই লোক? কায়রার চোখ আটকে আছে মানুষটার সুদর্শন মুখশ্রীতে। সুট-বুটে কি অসাধারণ লাগছে! বাড়িতে, কলেজে, সবখানেই শুধু তাকিয়ে'ই থাকতে মন চায় কায়রার। এই সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করার মতো কোনো শব্দই যেন তার জানা নেই। ঠিক তখনই প্রীষান হালকা ঘুরে তার দিকে তাকালো কথার মাঝে। দৃষ্টি মিললো দুজনার। কায়রার একদৃষ্ট মাদকতার ন্যায় চাহনি প্রীষান ঠিকই ধরে ফেললো। আবার সেই চাহনি! সেই একই দৃষ্টি! প্রীষান বার বার মানা করেছিলো এভাবে তাকিয়ে থাকতে। এতে ভীষণ ইরিটে'ড হয় প্রীষান। এসব বোঝে না নাকি মেয়েটা! সবার অগোচরে প্রীষান খুব আস্তে করে ধীর গলায় বলল,
"এভাবে দেখতে বারণ করেছিলাম না? মানুষজন আছে এখানে। চোখ নামাও, কায়রা।"

প্রীষানের হুমকিতেও কায়রা একটুও চোখ নামালো না। বরং, বশিভূতর ন্যায় তাকিয়ে সে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
"এই মুহূর্তে আপনার কথাটা রাখতে পারছি না, স্যরি।"

-------------------------

রাত এগারোটার সময় কায়েশীর চকলেট খাওয়ার ক্রেভিংস হয়েছে। যদিও মিষ্টি জিনিস কায়েশীর অতটাও পছন্দ নয় তবে প্রেগন্যান্সির মুড সুইং হচ্ছে। কায়েশী বেশ বুঝতে পারছে তা। তবে কায়রাভের প্রতি একটুও দয়া-মায়া দেখাচ্ছে না সে। যত পারছে জ্বালাচ্ছে, খাটাচ্ছে! সুযোগ ছাড়বে কেন? প্রতিশোধ তারও নেওয়া উচিত। 

যার কারণে, বিপত্তিতে পরেছে কায়রাভ। একটু আগেই পেস্ট্রি কেক খেয়েছে মহাশয়া। এখন আবার চকলেট খাবার ইচ্ছে হয়েছে। তা হোক, কায়রাভ যা লাগবে সব এনে দেবে। কিন্তু এতরাতে কত দোকান ঘুরে আসতে হবে তার ইয়ত্তা নেই। অবশেষে বউয়ের জন্য অনেকটা দূর থেকেই চকলেটের বক্সসহ এনে রেখেছে কায়রাভ। দুটো চকলেট খেয়ে আর খেলো না কায়েশী। কায়েশী এবার ছেলেটাকে একপলক দেখে বারান্দায় গিয়ে বসলো হাওয়া-বাতাস খেতে। ঘুম আসছে না তার। পিছু পিছু কায়রাভও গেলো। কায়েশীর পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, 
"কি হলো? এখানে বসলে কেন? ঘুমাবে না?"

কায়েশী মাথা নেড়ে বলল,
"ঘুম পাচ্ছে না।"

কায়রাভ হতাশ হলো। কায়েশী বলল,
"চলুন, আজ আমরা চন্দ্রবিলাশ করি। সুন্দর চাঁদ উঠেছে। দারুণ হবে না!"

কায়রাভের এমনিতেই ঘুম পাচ্ছিলো প্রচুর। ভেবেছিলো কায়েশীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে যাবে সাথে করে। কিন্তু এ মেয়ে কি বলে! 
"চন্দ্রবিলা'শ!"

কায়েশী সম্মতি জানিয়ে বলল,
"হু হু। চন্দ্রবিলাশ। করবেন না?"

কায়রাভ বুঝ দিয়ে বলল,
"অন্যদিন করবো নাহয়। আজ চলো।"

কায়েশী এবার ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল,
"বিরক্ত হচ্ছেন আপনি?"

কায়রাভ কায়েশীর হাত ধরে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
"না, কায়েশী। তোমার কোনো কিছুতে কখনোই বিরক্ত হইনা আমি। সত্যি বলতে, আমার ঘুম পাচ্ছিলো।"

কায়েশীও কায়রাভের দিকে দীর্ঘক্ষন তাকিয়ে থাকে। কেন, কি কারণ জানা নেই। কিন্তু ছিলো তাকিয়ে। হঠাৎ কায়েশী দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলল,
"আপনার উপর আমার প্রচুর রাগ হচ্ছে, কায়রাভ!"

কায়রাভ ভড়কে যায় সামান্য। হতবুদ্ধি হয়ে জানতে চায়,
"কেন? আমি আবার কি করলাম?"

কায়েশী ভোল পাল্টে আফসোস করে ধিমি গলায় বলল,
"কত সুন্দর করে এরেঞ্জ করেছিলাম বেবি'র সুখবরটা দেবো বলে! কিন্তু আপনার হঠকারি'তা সব ভেস্তে দিয়েছে। এই আফসোস কোথায় রাখবো, বলুন?"

কায়রাভ ঠোঁট বাকিয়ে দুষ্টু হেসে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলে উঠে,
"আফসোস করার প্রয়োজন নেই, কায়েশী। এর জন্য তুমি আরও অনেক সুযো'গ পাবে, বিলি'ভ মি! আমি বার বার সারপ্রাই'জ চাই!"

কায়েশী থতমত খেয়ে যায়। মানে! কি বলল এটা কায়রাভ? কায়েশী রেগেমেগে বলল,
"আমি বার বার সুযোগ পাবো মানে? আপনি কতবার 
বাবা হতে চান?"

এই প্রশ্নে কায়রাভ সলজ্জ কন্ঠে মেকি হেসে বলল,
"আল্লাহর রহমতে না করতে নেই, কায়েশী। ওনার  দেওয়া উপহার সাদরে গ্রহণ করা উচিত আমাদের।"

কায়রাভের চরম নির্লজ্জতার কারণে কায়েশী হা হয়ে গেলো প্রায়। কান দিয়ে গরম ধোয়া বেরোলো ইঙ্গিতপূর্ন কথার মানে বুঝতে পেরে। এ কোন ধরনের পাগল লোক! কায়েশী হতাশার ভারে কপাল চাপড়ে ধরলো নিজের। 

-------------------------------

ইলেকট্রিসিটি ইদানীং প্রচুর হয়রানি করছে মানুষদের। 
এই যাচ্ছে, তো এই আসছে। এই কারেন্টের জন্য সুন্দর নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছে কাবির আর প্রীতিষার। খুব রাত হয় নি, তবে বারোটার কাছাকাছি। প্রীতিষা কাবিরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে ছিলো। কত সুন্দর একটা ঘুম দিচ্ছিলো! কিন্তু এইবার ভেঙে গেলো। কাবির বড় একটা হাই তুলে পাশ থেকে হাতপাখা নিয়ে বাতাস করতে লাগে প্রীতিষাকে। কিন্তু প্রীতিষার তো ঘুম শেষ। ঘরটা অন্ধকার তাই ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে কাবিরকে দেখে প্রীতিষা। কাবির চোখ বন্ধ করেই তাকে বাতাস করে যাচ্ছে অনবরত। অথচ ছেলেটা নিজে ঘেমে একাকার। তাই প্রীতিষা নিজের ওরনা দিয়ে কাবিরের উদাম গা, পিঠ, পেট মুছে দিলো বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই। এরপর কাবিরকে আস্তে-ধীরে ডেকে বলল,
"এই কাবির! ওঠো! এভাবে ঘুম হবে না তো।"

দুইবার মেয়েলি রিনরিনে স্বরের ডাকেই কাবিরের ঘুম ভেঙে যায়। কাবির ঢুলুঢুলু চোখ মেলে তাকায় বহুকষ্টে। প্রীতিষা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো হাতখোপা করতে করতে বলল,
"বাইরে চলো। ঘুম আসবে না এভাবে।"

প্রীতিষা চলে যায় ঘরের দরজা খুলে। কাবির শোয়া থেকে উঠে বসে শরীরটা ধাতস্থ করে। তারপর ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে পরনের ট্রাউজারের ফিতেটা শক্ত করে গিট দেয়। এরপর মেয়েটার পিছু পিছু বেরিয়ে যায় বাইরে। উঠোনের কাছে দাঁড়াতেই দমকা বাতাস ছুঁয়ে যায় প্রীতিষার তনু-মন। বাইরে প্রাকৃতিক বাতাস বইছে। কাবির পেছন থেকে বলে উঠে, 
"এখানে শুইবা? ঠান্ডা বাতাস আইতাছে কিন্তু!"

প্রীতিষা খানিকটা ভেবে ঠোঁট কামড়ে বলল,
"এখানেই বেটার। ওয়েট, আমি বালিশ নিয়ে আসি।"

এই বলেই প্রীতিষা বিছানা থেকে দুটো বালিশ নিয়ে আসে চট করে। ইতিমধ্যে কাবির মাদুর বিছিয়ে দিয়েছে। সাথে জ্বালিয়েছে দুটো কয়েল। নাহলে, মশার তোপে টিকে থাকা যাবে না এখানে। এরপর কাবির আর প্রীতিষা দুজনেই শুলো পাশাপাশি, লেপ্টে। সত্যি, ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁয়ায় গরম ছুটে পালিয়েছে। মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে যেন। প্রীতিষা ঘুরে দেখে কাবির আকাশের দিকে নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে আছে। তাই প্রীতিষা বালিশ থেকে মাথা তুলে কাবিরের ডান হাত মেলে সেখানে মাথা দেয়। আর কাবিরের বুকে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে। কাবির এসব দেখে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে বলল,
"এগুলা কি?"

প্রীতিষা উল্টো জিজ্ঞেস করে, 
"তুমি বলো এগুলো কি? চুপচাপ কেন তুমি? আমার সিরিয়া'স কাবিরকে একদম ভালো লাগে না।"

কাবির মৃদু হেসে বলল,
"আমি এখনো সিরিয়াস নাই, সোনা। কথা খুঁইজা পাইতাছি না আপাতত। তাই চুপ আছি।"

প্রীতিষা এবারে ভীষণ আগ্রহী হয়ে বলল,
"তো আমার কথা শোনো! আমার অনেক কথা আছে, শুনবে?"

কাবির কাত হয়ে প্রীতিষার দিকে ঘুরে শুলো। তারপর মেয়েটার কোমরে হাত রেখে ধীর কন্ঠে বলল,
"আচ্ছা, সব কথা শুনতেছি। স্টার্ট করো!"

প্রীতিষা সম্মতি পেয়ে আলতো হেসে বলতে লাগলো গতকাল ভার্সিটিতে কি কি হয়েছে, না হয়েছে সব খুঁটিনাটি কথা। কিন্তু কাবির মোটেও ধ্যান দিচ্ছে না প্রীতিষার ভার্সিটির কাহিনিতে। কারণ কাবিরের সব আগ্রহ প্রীতিষাতে। তার সম্পুর্ন ধ্যান এখন প্রীতিষার ডাগর-ডোগর আঁখিতে পৌছেছে। অদ্ভুত বড় বড় চোখ মেয়েটার। ঘন পাপড়িগুলো আরও সৌন্দর্য্য বর্ধন করেছে। কাবিরের চোখজোড়া এবার এসে থামলো 
তার প্রেয়সীর চঞ্চল ঠোঁট দুটোয়। যা অনবরত নড়ছে, কথা বলছে। কাবিরের চোখ আপাতত ওখানেই নিবদ্ধ হলো, সরলো না কোথাও। হঠাৎ করেই নেশা ধরে গেলো কাবিরের। তাই আর কিছু নিরীক্ষণ না করে নিমিষেই কাবির সোজা হামলে পড়লো ওই চঞ্চল ওষ্ঠজোড়ায়। রুক্ষ হাতে আরও কাছে টেনে নিলো মেয়েটার নাজুক শরীরখানা। ব্যস, প্রীতিষার আর কিছু বলার অবকাশ রইলো না। উহু, কাবির সুযোগ'ই দিলো না। কাবিরের উন্মুক্ত বক্ষে হাতদুটো রেখে অসাড় হয়ে পড়ে রইলো প্রীতিষা। তপ্ত অনুভুতির তোপে চোখ দুটো বুজে আসলো দুজনের'ই। 

--------------------------------

প্রীষানদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে তখন প্রায় রাত একটার কাছাকাছি বেজে গেছে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে প্রীভান আর দেরি করলো না, বাড়িতে ফিরেই নিজের রুমে গিয়ে সোজা ঘুমিয়ে পড়লো। প্রীষান একবার বাচ্চাদের রুমে উঁকি দিয়ে দেখে এলো, তারা ঠিকঠাক আছে কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে এসে নিজের ঘরে ঢুকলো। বাইরের পোশাক পাল্টে হালকা হয়ে নিলো সে।

তখনই তার নজর গেলো ওয়াশরুমের দিকে। কায়রা অনেকক্ষণ ধরেই ভেতরে ঢুকেছে। এখনো বেরোনোর নাম নেই। তাই প্রীষান হালকা গলায় ডাকলো,
" ঘুমিয়ে পড়লে নাকি, ওয়াশরুমে?"

ভেতর থেকে কায়রার কণ্ঠ ভেসে এলো,
"না। আসলে একটা সমস্যা হয়ে গেছে… এজন্যই শাড়ি-ফাড়ি পরতে চাই না!"

প্রীষান ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
" কী হয়েছে?"

কিছুক্ষণ পর কায়রা দরজা খুলে বের হলো। শাড়িটা এখনো পাল্টাতে পারেনি মেয়েটা। একটু অস্বস্তি লুকিয়েই কায়রা বললো,
" বলছি… প্রিহাকে একটু ডেকে দিন না? এই ফিতেটা আমি একা কিছুতেই খুলতে পারছি না।"

প্রীষান ডাকতে গিয়েও একবার ভাবে মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে, অযথা জাগানো ঠিক হবে না। এই ভেবে সে শান্ত গলায় বললো,
" কা'ম… লেট মি হে'ল্প ইয়্যু।"

কায়রা হালকা চমকে উঠলো। অস্ফুটে বলল, 
" অ্যাহ!"

প্রীষান এবার দৃঢ় স্বরে জোরালো গলায় বললো,
" প্রিহাকে কেন প্রয়োজন? হোয়েন ইয়োর হাসব্যান্ড ইজ রাইট হিয়ার। আই’ম ক্যাপাবল অফ হ্যান্ডলিং এভরিথিং ফর মাই ওয়াইফ।"

কায়রা আর আপত্তি করলো না, দিরুক্তও করলো না। 
মৃদু পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। পেছনে এসে দাঁড়ালো প্রীষান। মাঝখানে নীরবতা, শুধু শ্বাসের শব্দ আসছে। আয়নায় দু’জনের চোখ এক মুহূর্তে মিললো। কারণ, প্রীষানের চোখ আয়নায় কায়রাকে দেখছে। কেও কারো থেকে চোখ সরাচ্ছে না। চোখ আয়নাতে কায়রার অবয়বের দিকে রেখেই প্রীষান এক ঝটকায় ফিতের গিঁটটা টেনে খুলে দিলো। ব্যস, কাজ শেষ। এরপর সাথে সাথেই সরে এলো প্রীষান। 

কায়রা বুঝেছে, এই ছোট্ট কাজ করতেই লোকটার ঘাম ছুটে গিয়েছিলো। ঠোঁট টিপে হাসলো কায়রা। কারণ, কায়রা ছিলো একদম স্বাভাবিক। মুখে বিন্দুমাত্র অস্বস্তির চিহ্ন ছিলো না। পরক্ষণেই কায়রা শান্তভাবে ঘুরে ওয়াসরুমে গিয়ে শাড়ি পাল্টে নিলো। কিছুক্ষণ পর কামিজ পরে বেরিয়ে এলো সে।

প্রীষান তখনো দাঁড়িয়ে নিজ ভাবনায় মগ্ন হয়ে। সে একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। প্রীষান ভেবেছিলো অস্বস্তি হবে কায়রার। কিন্তু নাহ! কায়রা তো পুরোদম স্বাভাবিক ছিলো! তাই প্রীষান হতবাক হয়ে বলেই ফেললো ,
"এই… তোমার অস্বস্তি লাগলো না আমি কাছে আসার সময়?"

কায়রা বিছানাটা গোছাতে গোছাতে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
" অস্বস্তি কেন হবে? আপনি কি পরপুরুষ?"

প্রীষান এমন সরাসরি কথায় একটু থমকে গেলো। আবার প্রশ্ন করলো,
" একটুও হয় নি?"

কায়রা মাথা নেড়ে বললো,
" উহু, হয় নি। বিয়ের পরদিন থেকেই আপনাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি। আমি তথাকথিত মেয়েদের মতো অযথা কাঁপাকাঁপি করতে পারবো না সাধারণ একটা ব্যাপারে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে হুট করে কাছে আসায় আমি অবাক হয়েছি। এর বেশি কিছু না।"

কায়রা বিছানা গুছিয়ে নিজেই বসলো। তারপর প্রীষান তার স্তম্ভিত ভাব কাটিয়ে কায়রার পাশে এসে বসলো ধীরে। কায়রার দিকে একপল তাকিয়ে থেকে নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলো, 
"সবকিছু এত ইজিলি নাও কীভাবে?"

কায়রা একবার হালকা হাসলো। বলল,
"কারণ, আসলে সবই ইজি'ই থাকে। আমরা মানুষেরা'ই সহজভাবে না ভেবে অযথা জটিল করে ফেলি।"

প্রীষান কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বললো,
"হোল্ড মি, কায়রা।"

কায়রা চমকে তাকালো। বুঝতে না পেরে বলল, 
" হ্যাঁ?"

"আই জাস্ট ওয়ান্ট ইয়্যু টু হা'গ মি রাই'ট নাও।"

"না মানে...আপনি সিওর তো!"

প্রীষান হালকা মাথা নেড়ে ধীর কন্ঠে বলল,
"হুম, সিওর। তুমি এত সাহসী, তাই আমাদের মধ্যে তুমি'ই এগোও প্রথমে। জড়িয়ে ধরো..."

কায়রা এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলো। ঘরের ভেতর বাতাসটা হঠাৎ আরও ভারী হয়ে এসেছে বোধহয়। ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও এখন অদ্ভুতভাবে জোরে শোনা যাচ্ছে। এদিকে প্রীষান আবার তাকিয়ে রয়েছে কেমন করে! 

তবে কায়রা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো দ্বিধা না রেখে। 
প্রীষানের সামনে এসে থামলো সে। এক মুহূর্তের জন্য কায়রা চোখ তুলে তাকালো মানুষটার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কোনো অস্বস্তি নেই, নেই কোনো দ্বিধা এখন। আছে শুধু কায়রার প্রতি একরাশ শান্ত গ্রহণযোগ্যতা। যা প্রীষানের ওই চোখদুটো বলে দিচ্ছে। 

তারপর ধীরে, খুব ধীরে কায়রা প্রীষানকে জড়িয়ে ধরলো। প্রীষানের বুকের কাছটায় মাথা রেখে এক অদৃশ্য টান অনুভব করলো কায়রা। যেখানে কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো অতিরঞ্জন নেই। শুধু দুইজন মানুষের মধ্যেকার এক অদ্ভুত স্বস্তিবোধ মিশে আছে। 

প্রীষান প্রথমে একটু স্থির হয়ে রইলো নিজেকে ধাতস্থ করতে। তারপর তার হাত দুটো নিজে থেকেই কায়রার চারপাশে জড়িয়ে গেলো। কায়রার কপাল হালকা করে তার বুকের কাছে ঠেকে আছে টের পেলো সে। আর দূরত্ব রইলো না দুজনের। এবার দুজনের হৃদস্পন্দন সমান গতিতে দৌড়াচ্ছে। অনুভূতিটা ঠিক কেমন তা দুজনের কেউ'ই ঠাওর করতে পারলো না। কিছুক্ষণ তারা ওভাবে থাকার পর, একটা সময় বিছানাতে মাথা ঠেকলো দুজনার। কায়রা অনুভব করেছিলো, পুরুষালী স্পর্শ তার কপাল ছুঁলো সর্বপ্রথম। এরপর মানুষটা নিগুঢ় হলো একের পর এক স্পর্শের আধিপত্য বিস্তার করতে তার সমস্ত কায়া জুড়ে। সে রাতে অস্বস্তি, সংকোচ নামক শব্দ চিরতরে দূর হলো তাদের মাঝে। একটুও ব্যবধান রইলো না আর। একাত্ম হলো দুজন অজানা অনুভুতির স্রোতে। কায়রা এগিয়ে গেলো নিজের মতো। আর প্রীষান শুধু থেকে গেলো ওর হয়ে, স্নেহের পরশ ফলানোর মাধ্যমে নব্য জাগা অনুভুতিকে সায় দিয়ে। 

চলমান.......
 

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:৪৪

 

দীর্ঘ রজনী পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। কায়রা সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে গেলেও প্রীষানের ওঠার নামগন্ধ নেই। অনেকদিন পর আজ বেঘোরে ঘুমোচ্ছে মানুষটা। বহুদিন পর এমন নির্ভার, গভীর নিদ্রা নেমে এসেছে তার দুটো চোখে। আজ তার ঘুম ভাঙার তাড়া নেই। প্রীষানের উন্মুক্ত পেশিবহুল শরীরটা উপুড় হয়ে আছে বিছানায়। বলিষ্ঠ চওড়া কাঁধ দৃশ্যমান। যেখানে ক্ষীণ আচড়ের দাগ দেখা যাচ্ছে। সাদা চাদরে ঢাকা কোমর থেকে নিচের অংশ, আর উন্মুক্ত পিঠজুড়ে এক অদম্য পুরুষালি আবেশ। সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ভাস্কর্যের চেয়ে কম নয়। ক্রমে ক্রমে নিঃশ্বাসের সাথে ভারিক্কি শরীরটা উঠানামা করছে। একরকম ম্যান'লি ভঙ্গি বলা চলে। নিয়মিত শারীরিক কসরত করার দরুন পুরুষালী উন্মুক্ত শরীরটা বরাবরই আকর্ষনীয় লাগে। 

দরজা সতর্কতার সাথে নিঃশব্দে খুলে কায়রা ধীর পায়ে কফি নিয়ে আসে। হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম কফির কাপ। কায়রা এগিয়ে এসে বেডসাইট টেবিলের উপর কাপটা রেখে এক মুহূর্ত থামে। এরপর চেয়ে থাকে মানুষটার দিকে বিমুগ্ধ নয়নে। 

এদিকে কায়রার সদ্য গোসল করা শরীর। সতেজতায় ফুরফুরে লাগছে ভীষন। মাথায় জড়ানো তোয়ালে বেয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে বিছানার কোণে। এরপর ধীর পায়ে বিছানায় উঠে বসে কায়রা। একটু ঝুঁকে আসে প্রীষানের দিকে। তারপর অত্যন্ত মৃদু, প্রায় নিঃশব্দ স্পর্শে তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় প্রীষানের গাল। পরমুহূর্তেই সে চট করে সরে আসে। এই মুহূর্তটাকে দীর্ঘায়িত করে রাখার প্রয়োজন নেই। পাছে না ধমক জোটে কপালে। এইসব অযাচিত ভাবনায় কায়রা দ্রুত সরে বসে। নিজের উদ্ভট কাজকর্মে নিজেই হাসলো কায়রা। 

আজ কায়রার সকালটা পাক্কা সংসারী মেয়ের মতো শুরু হয়েছে। সকালে উঠে রান্নাবান্না সেরে গোসল করেছে সে। যার দরুন মাথায় এখনো তোয়ালে জড়ানো। যদিও তার আগেই গোসল করা উচিত ছিলো কিন্তু রান্না করার পর ঘেমে-নেয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়। তাই রান্না শেষে একেবারে গোসল করেছে। তারপর বাচ্চা দুটোকে যথাসময়ে খাইয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে স্কুলে। 

এমন ভাবনায় ডুবে থাকার মাঝেই প্রীষানের সামান্য নড়চড় টের পেলো কায়রা। ঘুমের ভাঙনে ধীরে ধীরে পাশ ফিরে কাত হয়ে চোখ কুঁচকে তাকালো প্রীষান।অর্ধনিদ্রার আবেশ এখনও তার দৃষ্টিতে লেপ্টে আছে। কায়রা সেদিকে তাকিয়ে একগাল হাসি ছড়িয়ে নরম স্বরে বলে উঠল,
“গুড মর্নিং। আপনাকে এই প্রথম এতো দেরিতে ঘুম থেকে উঠতে দেখছি। এগারোটা বাজে এখন।”

প্রীষান ভ্রু কুঁচকে তাকালো মেয়েটার দিকে। বোধ ফিরতে কায়রার কথা শুনে নজর ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে যায় প্রীষানের। মস্তিষ্ক বার্তা পাঠাতেই মুহূর্তের মধ্যেই ধ'প করে উঠে বসে সে। বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা একসাথে গলায় ভিড় জমালো,
“মাই গড! এত লেট করলাম কিভাবে আমি? আজ তো সাড়ে ন'টা থেকে প্রিহার এক্সাম ছিলো! প্রীভানের স্কুলও আছে! আমি কিভাবে...”

কায়রা প্রথমে ভড়কে গেলেও প্রীষানের অস্থিরতা থামিয়ে সে কোমল কণ্ঠে বলে,
“রিল্যাক্স…রিল্যাক্স। প্রিহা আর প্রীভানকে সময়মতো স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছি আমি। ড্রাইভার আংকেলের সাথে গেছে ওরা। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।”

প্রীষান একটু থেমে তাকালো কায়রার দিকে। বিস্ময়ের রেখা এখনো চোখে লেগে আছে,
“স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছো? কিন্তু ওরা কি খেয়েছে? খালা তো আসবে না দু'দিন…”

কায়রার চোখে-মুখে এখন গর্বের রেখা। আজ বহুত কাজ করেছে সে। তাই নিজের উপর প্রসন্ন হয়ে নিজেই বলল,
“আমি রান্না করেছি সকালে। ব্রেকফাস্ট করিয়ে তবেই পাঠিয়েছি বাচ্চাদের। খালাকে এমনিতেও রান্না করতে দিই না। আজও সব আমি করেছি। আর এখন থেকে আমি'ই করব।”

এই 'আমি' বলার মধ্যে একটা অদ্ভুত জোর ছিলো কায়রার। প্রীষান তা বুঝে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে ধীরে জিজ্ঞেস করলো,
“এসব রেসপন্সিবিলিটি থেকে করছো?”

কায়রা হালকা হেসে বেশ জোর দিয়ে বলল,
“কেন? আমার কি করা উচিত নয়? তাছাড়া এসব আমি দায়িত্ববোধ থেকে করছি না… ভালো লাগে বলেই করছি। এই সংসারটা আমার, বাচ্চাগুলোও আমার, আর আপনিও… আপনিও তো আমার'ই।”

কায়রার কণ্ঠের গভীরতায় এক অনুচ্চারিত অধিকার এবং এক নির্ভেজাল আপনত্ব ছিলো। যা বুঝতে পেরে প্রীষান এইবার আর অবাক হলো না। বরং অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো স্নিগ্ধ হাসি। কায়রা তখন কিছুটা এগিয়ে এসে গভীর চোখে তাকালো প্রীষানের দিকে। কৌতূহলের মৃদু ছোঁয়া তার কণ্ঠে, 
“আচ্ছা, আমি না অনেকদিন ধরে একটা জিনিস নোটিস করেছি। আপনাকে দেখতে কেমন যেন ফরেই'ন লাগে। পুরো দেশী লাগে না কেন, বলুন তো? তাছাড়া, আপনার আর প্রিহার চোখের মণির রঙটা… এমন কেন?”

প্রীষান মৃদু শ্বাস ফেললো। শান্ত স্বরে জবাব দিলো,
“একচুয়ালি, আমার মা রাশিয়ান ছিলো। তাই ছোটবেলা থেকেই সবাই বলতো, আমি নাকি পুরোপুরি মায়ের মতো হয়েছি। তবে প্রীতিষা বাবার মতো হয়েছিলো। সেইমভাবে প্রিহা প্রায় আমার মতো দেখতে। কিন্তু প্রীভান ওর মায়ের মতো হয়েছে।”

সব শুনে কায়রা ধীরে মাথা নাড়ালো। এবার সে বুঝেছে আসল কাহিনি। তার বরের এমন রুপের রহস্য আজ জানলো সে। ঠোঁট চেপে হাসলো কায়রা। এবার তার নজর গেলো প্রীষানের দিকে। লোকটার উর্ধাংশ অনাবৃত কায়রার সামনে। নিজের বরের এমন সুন্দর বডি-সডিতে কায়রা আবার ঘায়েল হলো। তাই কায়রা আবারও দেখতে লাগলো প্রীষানকে। সেই একই বেপরোয়া চাহনিতে। প্রীষান তা বুঝতে পেরে গলা খাকারি দিয়ে বলল,
"আবার এভাবে দেখছো?"

কায়রার দেখাতে ব্যাঘাত ঘটায় সে উল্টো রেগে বলল,
"সবসময় এমন করেন কেন আপনি? ঠিকমতো দেখতেই দেন না আপনাকে!"

প্রীষান থতমত খেয়ে সামান্য বিস্ময়কর স্বরে বলল,
"আশ্চর্য! আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে এতো কি দেখো তুমি?"

কায়রা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
"আমার ভালো লাগে, তাই দেখি। তাছাড়া, আমার স্বামীর দিকে দেখবো না তো কি পরপুরুষের দিকে তাকাবো?"

কথাটা শুনে প্রীষানের সবসময়কার মতো কুঁচকানো কপাল ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে এলো। কায়রার পাগলামি বুঝে ঠোঁটের কোণে নরম হাসি ফুটে উঠলো না চাইতেও। এবার কঠিন থেকে একটু নরম হলো প্রীষান। তাই প্রীষান হাত বাড়িয়ে কায়রাকে নিজের দিকে টেনে মৃদু গলায় বলল,
“না… প্লিজ। আমাকেই দেখো তুমি। আর সত্যিই তো, আমাকেই তো দেখবে! রাইট রাইট..."

প্রীষানের আহ্লাদ পেয়ে সুরসুর করে কায়রা বিড়ালছানার মতো প্রীষানের বুকে লেপ্টে গেলো। এই বুকে কায়রা স্বস্তির খোঁজ পেয়েছে কাল, এখন থেকে রোজ পাবে। বাঁধা নেই আর। কায়রার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একসময় প্রীষান নিরেট স্বরে বলল,
"থ্যাঙ্ক ইয়্যু, কায়রা। থ্যাঙ্ক ইয়্যু ফর অল অফ দি'স।"

বিনিময়ে কায়রা প্রসন্ন হাসলো। খানিকক্ষণ পর প্রীষানের বুকের উষ্ণতা থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুললো সে। টেবিলে রাখা এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির দিকে তাকিয়ে মৃদু আহাজারি করতে করতে বলল,
“উফ! আপনার জন্য কফি এনেছিলাম। ঠান্ডা হয়ে গেলো!”

প্রীষান সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর একগাল হেসে অনুনয় মেশানো স্বরে বলল,
“কফি'টা আরেকবার গরম করা যাবে…ওয়াইফি?”

কায়রা মুহুর্তেই গলে গেলো প্রীষান বিগলিত হাসিতে। তাই দ্রুত বেগে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“অবশ্যই! আপনার এত সুন্দর হাসি দেখার জন্য হলেও বার বার কফি ঠান্ডা হোক! এরজন্য বার বার কফি গরম করতেও রাজি আমি।”

---------------------------

কাবির আজ দুপুরে খেয়ে-দেয়ে সেই যে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে, আর উঠার নাম নেই তার। বিকেল হয়ে এসেছে তাও রেহাই নেই যন্ত্রটার। অবশ্য শুধু শুধু ল্যাপটপ চালাচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে সে। কাবিরকে এভাবে প্রফেশনালি ল্যাপটপ চালাতে এই প্রথম দেখছে প্রীতিষা। এমনকি কাবিরের যে এত দামী ল্যাপটপ আছে তাও জানতো না সে। কাবির নিজের পেশার পাশাপাশি ফ্রিলান্সার আজ জানলো প্রীতিষা। শুনে অবশ্য অবাক হয়নি। কারণ, প্রীতিষা জানে কাবির ব্যাটা মাল্টি-ট্যালেন্টেড, অনেক গুন আছে তার। প্রীতিষা পড়ার টেবিলে বসলেও মনোযোগ থাকছে না। ঘুরেফিরে সেই কাবিরকেই দেখছে প্রীতিষার বেহায়া চোখদুটো। ব্যস্ত কাবিরকে তার মোটেও ভালো লাগছে না। কই একটু জ্বালাবে, কথা-টথা বলবে! গত কয়েক ঘন্টাযাবত প্রীতিষা ভীষন মিস করছে এসব। কিন্তু কাবির গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে বলে প্রীতিষা মুখে কুলুপ এঁটে আছে। এদিকে বেচারি পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। কিছু বলতেও পারছে না, থাকতেও পারছে না।

অদুরে বিছানায় বসে থাকা কাবির হাঁটুর উপর ল্যাপটপ নিয়ে ভীষন মনোযোগী। সে কাজে মনোযোগ দিলেও বউয়ের হাবভাব লক্ষ্য করছিলো। টের পাচ্ছে সে বউয়ের অস্থিরতা। স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করা অবস্থাতেই মৃদু হাসলো কাবির। কয়েক মুহুর্ত পর ল্যাপটপ ক্লোজ করে সে প্রীতিষার দিকে ঘুরে বসে। প্রীতিষা তখন ওরনার কোণা আঙুলে পেচিয়ে আনমনেই খেলছিলো। কাবির সেদিকে তাকিয়ে বলল,
"আজকে ম্যাডাম বহুত পড়াশোনা করলেন মনে হয়?"

অকস্মাৎ কাবিরের গলা পেয়ে মৃদু কেঁপে উঠে প্রীতিষার তনুমন। কাবিরের দিকে ঘুরে তাকিয়ে প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করে, 
"তোমার কাজ শেষ?"

কাবির উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা শুন্যে তুলে এপাশ-ওপাশ মোচরায়। তারপর ছোট করে জবাব দেয়, 
"জ্বি।"

_"এই ফ্রিল্যান্সিং-এ মাসিক ইনকাম কত তোমার?"

_"এমনিতে সত্তুর-আশি। নিয়মিত ক্লায়েন্ট পাইলে লাখ ছাড়ায়।"

প্রীতিষা বিস্মিত হলো। কি ভেবে যেন তেড়ে এসে কাবিরের বাহুতে চাপড় মেরে দাঁত কটমট করে বলে,
"তাহলে সিনেমার মতো অভাবের কাহিনি শোনাও কেন? তাও তো তোমার এই কাজ সম্পর্কে আমি জানতাম'ই না।"

কাবির হাসলো। বলল,
"এখন তো জানছো? হইছে। আসলে এই কাজে আমি মিড লেভেলে আছি। নিয়মিত না। তাই জানতা না। কিন্তু এখন থেকে নিয়মিত হমু।"

_"কেন?"

_"আমাদের ফিউচারের জন্য। "

প্রীতিষা থামলো এবার। তাকিয়ে রইলো কাবিরের দিকে অপলক। কাবির প্রীতিষার হাত ধরে বলল,
"উঠানে বসি, আসো।"

_"কিন্তু পড়া? "

_"জামাইয়ে'র দিকে চাইয়া চাইয়া কত পড়লা দেখলাম'ই তো!"

এই কথায় প্রীতিষা লজ্জা পেলো। তার মানে কাবির খেয়াল করেছে। কি লজ্জার বিষয়! প্রীতিষা আর দ্বিমত না করে কাবিরের সাথে গিয়ে উঠানে বসলো। ববরাবরে মতো কাবিরের এক-হাত জড়িয়ে ধরে। 
কাবির খুব সন্তপর্ণে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। যা নজর এড়ায়নি প্রীতিষার। তবে প্রীতিষা এবার রাগলো না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো কাবিরের দিকে। সে দৃষ্টি বুঝে কাবির মলিন হেসে অনুমতি চাইলো,
"একটা খাই আজকে? ক্রেভিংস হইতাছে। অনেকদিন পর কইছি কিন্তু! প্লিইইইইজ..."

প্রীতিষা জোর করে মেকি হাসলো। সায় জানিয়ে বলল,
"ওকে, খাও। প্লি'জ বলছো কেন? খাও খাও।"

কাবির বেজায় খুশি হলো। আসলেই অনেকদিন পর একটা সুখটান দিতে পারবে মনে হচ্ছে। বিয়ের পর বউয়ের জ্বালায় সিগারেট নামক বন্ধুকে ভুলেই গেছিলো কাবির। কথা দিয়েছিলো প্রীতিষাকে, এসব কোনোদিন খাবে না ইচ্ছে হলেও। তাই আজ অনুমতি নিয়েছে। যাক, আজ তো সুযোগ পেয়েছে। যেইনা কাবির একটা সিগারেট বের করতে যাবে পাশ থেকে প্রীতিষা আরেকটা সিগারেট নিলো। নিয়ে ঠোঁটে গুজে বলল,
"চলো, আজকে আরেকটা এক্সপেরিমেন্ট করি তোমার সাথে। আমিও দেখি কত স্বাদ এর! লাইটার বের করো জলদি...."

কাবির হতবিহ্বল হয়ে যায়। চোয়াল খুলে পড়ার উপক্রম হয় তার। বউ'টা কি চালাক হয়ে যাচ্ছে দিনদিন? নাকি ভয়-ডর কমে আসছে? নরম-সরম প্রীতিটা মাঝে মাঝেই আজকাল কাবিরকে অবাক করে দেয়। এই যেমন আজ করলো! এবার বুঝেছে কাবির, যে কেন প্রীতিষা অনুমতি দিলো। 

এরপর মেয়েটার ঠোঁটে সিগারেট গোজা দেখে কাবির চট করে তা ফেলে দেয়। এরপর পুরো বাক্সটাই ফেলে দেয়। বুঝেছে, এইসব তার কপালে নেই। চুপসে যায় মুখটা। তবে কটমটে কন্ঠে বলল,
"চালাকি করলা আমার সাথে? ইদানীং বহুত চালাক হইয়া গেছো, প্রীতি! "

প্রীতিষা ফিচ করে হাসলো। বেশ জব্দ হয়েছে ষাড়'টা। 
আর জীবনে এসব ছাইপাঁশ খেতে চাইবে বলে মনে হয় না। কাবির চুপসে যাওয়া মুখ দেখে প্রীতিষা এবার কাবিরের কোলে চড়ে বসলো। ভীষন আহ্লাদী হয়ে কাবিরের গলা জড়িয়ে বলল,
"চালাকি ভাবলে চালাকি! আমার কথা, তোমার সব ভালোটুকু আমার, আর খারাপটাকেও আমি ভালো করেই নিজের করে নেবো। যেহেতু এই সিগারেট খাওয়া তোমার খারাপ অভ্যাস, সেহেতু এটা ছাড়ানো আমার বউগত দায়িত্ব।"

কথাগুলো শুনতে শুনতে কাবির চেয়ে রইলো অপলক। রাগ না অন্য কিছু বোঝা গেলো না। তবে প্রীতিষা ভাবলো রাগ করেছে বোধহয় কাবির। তাই নিজেও সামান্য চটে গিয়ে বলল,
"রাগ করলে নাকি? এমন হুটহা'ট রেগে যাও কেন? এই রাগ ছাড়া আর পারো কি, বলো?"

কাবির ভোল পাল্টালো মুহুর্তেই। প্রীতিষার কোমর আঁকড়ে নিজের আরও কাছে টেনে বলল,
"আমি অনেক সুন্দর আদ'র করতে পারি। দেখবা নাকি খালি কও?"

প্রীতিষা চমকালো এমন পুরুষালী গভীর কন্ঠে। এই গলার স্বর পরিচিত তার। উদ্দেশ্য বুঝে কোল ছেড়ে উঠতে চাইলো সে। আড়ষ্ট হয়ে খানিকটা ছটফটিয়ে বলল,
"না..নাহ! এখন কিছু দেখবো না। আজকে আর গলছি না আমি। তুমি তোমার কথা রাখো নি, কাবির। সেসব কিন্তু ভুলি নি আমি।"

কাবির প্রীতিষার নরম গালে নাক ডুবিয়ে জিজ্ঞেস করে, 
"কোন কথা রাখি নাই?"

প্রীতিষা মৃদু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
"তুমি ওইদিন ফুল আনো নি!"

কাবির বেশ জোরেই হেসে ফেললো। এরপর বলল,
"আসলে ওইদিন ভালোবাসার ক্রেভিংস উঠছিলো। তখন ফুল-টুলের কথা কি আর মাথায় থাকে?সিগারেটের ক্রেভিংস সামলানো যায়, কিন্তু ভালোবাসার যায় না, সোনা! ইয়্যু নো ভেরি ওয়েল.."

-----------------------------

একটা স্নিগ্ধ বিকেল কেটেছে। আলোর রেশ নামতে শুরু করেছে। সূর্যাস্ত হতে খুব বেশিক্ষন বাকি নেই। 
প্রীভান মাঠ থেকে ফিরেছে মাত্রই। ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলো সে। বাড়ি ফিরে যথাস্থানে ব্যাট'টা হেলান দিয়ে রাখে। এরপর কায়রার কাছে চলে যায়। কিন্তু ড্রয়িংরুমে গিয়ে সে অবাক। প্রীভানের চোখ বড় বড় হয়ে যায় সামনের দৃশ্য দেখে। কারণ, কায়রা টেবিলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে লাইট নিয়ে কিছু একটা করছে। প্রীভান হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসে,
"এসব কি করছো, মম? তোমার পা-য়ে এমনিতেই প্রবলেম আর এর মধ্যে তুমি..."

কায়রা পিছু ফিরে একপলক প্রীভানকে দেখে আবার কাজে হাত চালিয়ে বলে,
"সমস্যা নেই, বাচ্চা। পড়বো না আমি। বাম পায়ে ব্যালেন্স করা শিখেছি।"

প্রীভান নাছোরবান্দা হলো। বলল,
"তবুও দরকার নেই। নেমে আসো। পাপা দেখলে খুব বকবে!"

কায়রা কাজ শেষ করে নেমে আসে। তারপর ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলে, 
"তোমার পাপাকে আমি ভয় পাই নাকি? হুহ! এইতো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করলাম। এই রুমের লাইট নষ্ট হয়ে গেছিলো। আমি অন্য একটা নতুন বাল্ব লাগিয়ে দিলাম।"

প্রীভান ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
"আচ্ছা, এক মিনিট! কি বললে? তুমি পাপাকে ভয় পাওনা?"

_"নোপ!"

_ "সেদিনও তো দেখলাম পাপার ধমক খেয়ে পড়তে বসলে। ওটা কি ছিলো তাহলে?"

কায়রা ঠোঁট চেপে বলল,
"তুমি আমাকে পঁচাচ্ছো!"

_"আ'ম জাস্ট কিডিং। "

কায়রা আবার ছোট ছোট চোখে তাকায়। প্রীভান এবার হাতের ঠোঙাটা সামনে বাড়িয়ে বলল,
"তুমি কি সিঙ্গারা খাও? একদম গরম গরম এনেছি।"

কায়রা উজ্জ্বল চোখে ঠোঙা থেকে একটা সিঙারা খপ করে নিয়ে বলে,
"খাবো না মানে? এটা আবার জিজ্ঞেস করার মতো কথা নাকি?"

প্রীভান নিজেও কায়রার পাশে বসে খেতে খেতে বলে,
"কিজানি! তাও জিজ্ঞেস করে নিলাম।"

খেতে গিয়েও কায়রা একবার সুধালো,
"প্রিহা খাবে না? ওর জন্য রেখে দেই?"

প্রীভান নাকোচ করে বলে,
"নাহ, আপু ডায়েট করে। এসব বাইরের খাবার খায় না।"

এবার কায়রা বেশ ভাবুক স্বরে বলে, 
"হাইজিন ফ্যামিলিতে তুমিই একমাত্র আছো যে কিছুটা আমার মতো!"

প্রীভান দুষ্টু হেসে বলল,
"এই কথাটা ঠিক। কিছুটা না, বলো পুরোটাই। কারণ তুমিও আমারই মতো, পড়াচো'র! তোমার মতো আমিও পাপার কাছে পড়া নিয়েই ধমক খাই।"

কায়রা মেকি রাগ দেখালো।
"হয়েছে হয়েছে। আর পঁচিয়ো না আমায়।"

কথাবার্তার মাঝেই প্রিমা চলে আসে। তার হাতভর্তি শপিং ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে শপিং করে এসেছে। তা দেখে প্রীভান উঠে দাঁড়িয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে, 
"শপিং করলে নাকি, মিমি?"

প্রিমা সোফায় বসে আরাম করে। মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, 
"হ্যাঁ রে। মুড অফ ছিলো, তাই শপিং করলাম।"

প্রীভান চলে গেলে কায়রাও উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। এই মহিলার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই কায়রার। কিন্তু যাওয়ার পথেই প্রিমা পথ রোধ করে হাত বাড়িয়ে ধরে বলে,
"দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছো? দু'দিন হলো এসেছি। কিন্তু তোমার সাথে কথাই হচ্ছে না।"

কায়রা ফোস করে শ্বাস ফেলে। এবার আর গেলো না সে। মেকি মৃদু হেসে প্রিমার ঠিক পাশেই বসলো। তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
"এখন ফ্রি আছি আমি। কি গল্প করবো, বলুন?"

প্রিমা বাঁকা হাসলো। প্রথমেই প্রশংসা করে বলল,
"শাড়ি পড়েছো? সুন্দর লাগছে দেখতে।"

কায়রা বিনয়ী কন্ঠে বলল,
"থ্যাঙ্ক ইয়্যু।"

পরক্ষনেই প্রিমা দুম করে বলে বসে,
"এই সংসারের একটা অনেস্ট রিভিউ দাও তো! ভালো লাগছে পরের সংসারে অধিকার ফলাতে?"

কায়রা অবাক হলো না এমন কথায়। যেন তৈরিই ছিলো সে উত্তর দিতে। সুউচ্চ গলায় বলল, 
"সংসারের রিভিউটা দেই, আমার মনের মতো সংসার পেয়েছি। যেমনটি চেয়েছি, ঠিক তেমনটা। আর আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নই হয়নি, উত্তর দেব কি করে আমি। আপনি বলতে পারতেন এটা পৃথা আপার সংসার ছিলো। এটা আমি মানি। কিন্তু সে তো নেই, তার স্মৃতি আছে। সে স্মৃতি সারাজীবন থাকুক। কিন্তু বর্তমানে এটা কায়রার সংসার। শুধুমাত্র কায়রা'র! অধিকার আছে আমার।"

প্রিমা ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
"ভীষণ পজিটিভ তুমি, বুঝলাম। আচ্ছা, একটা গোপন কথা জিজ্ঞেস করি? আমরা মেয়ে-মেয়ে'ই তো। আশা করি, তুমি লজ্জা পাবে না।"

কায়রা সামান্য ভ্রু কুঁচকালো। কি এমন গোপন কথা?  তবে ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, 
"করুন জিজ্ঞেস। শুনি আপনার গোপন কথা।"

প্রিমা একবার আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিচুস্বরে বলল,
"তুমি আর প্রীষান কাছাকাছি এসেছো? সত্যিটা বলবে!"

কায়রা এবারে চমকালো, থমকালো। এসব কোন ধরনের প্রশ্ন? কান ঝা ঝা করে উঠলো কায়রার। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো সে। নাহ, এই মহিলাকে শিক্ষা দিতে হবে। কায়রা বেশ জোর গলায় বলল,
"হুম, এসেছি।"

প্রিমা ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে চাইলো না। চোখ সরু করে বলল,
"মিথ্যে বলছো?"

কায়রার রাগ হলো এবার। সে কেন মিথ্যে বলবে, আশ্চর্য! রেগেমেগে কায়রা হিসহিসিয়ে বলল,
"মিথ্যে বলি নি আমি। ওয়েট, আপনাকে মার্কস দেখাই আমার শরীরের। এই যে দেখুন... "

এই বলে কায়রা শাড়ির আঁচল সরাতে গেলে প্রিমা আঁতকে উঠে তারাহুরো করে বলল,
"নো নো নো! প্লিজ! লাগবে না।"

কায়রা বাঁকা হেসে বলল,
"কেন? দেখাই না! লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আমরা মেয়ে-মেয়ে'ই তো!"

চলমান.......

 
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
Loading spinner

Reply
Page 5 / 7
Share:

Loading spinner