পর্বসংখ্যা:৪০
কাবিরের কথা শুনে কায়রাভ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে সে ধীরে পাশে ফিরে ঘুরে তাকায়। এক্ষুনি এটা কি বলল কাবির? বউ ছেড়ে দিতো মানে কি? কায়রাভ কন্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট বিস্ময়। গলায় খাদ নামিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“আমি কখনোই ওকে ছাড়তা'ম না… প্রশ্ন'ই আসে না।”
কাবির হালকা হাসলো। এই উত্তরটাই সে আশা করেছিলো। কাবির হাতে থাকা ক্যানটায় ঠোঁটে ছুঁইয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল
“এক্সাক্ট'লি, এইটা'ই! বউ যখন ছাড়তা'ই না তখন তোমারে অতীত জানাইয়া, তোমার সদ্য সংসা'রে আগু'ন লাগাইয়া আমার কি লাভ হইতো? হু?”
কায়রাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কাবিরের কথায় যুক্তি আছে। চাইলেও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই ফিরোজের ফোন আসে, আর সে নীরবে বারান্দায় চলে যায় কথা বলার উদ্দেশ্যে। ঘরে তখন কেবল কাবির আর কায়রাভের ভারী নীরবতা। কায়রাভ নিশ্চল চোখে সামনে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“তোদের কতদিনের সম্পর্ক ছিলো?”
কাবির মাথা নেড়ে হালকা স্বরে বলল,
“প্রেমের সম্পর্কের কথা জিগাইলে একদিনেরও না। বন্ধুত্বের দুই বছর হইছিলো। তোমাদের বিয়ের আগের হিসাব করলে।”
কায়রাভ কপাল কুঁচকালো। সে বুঝলো না কিছু। কাবির কি মিথ্যে বলছে তাকে? কারণ কায়রাভ স্পষ্ট দেখেছে ভালোবাসার কথা লিখেছে কায়েশী। ওসবের মানে কি? কায়রাভ রেগে জিজ্ঞেস করে,
"এই ফাজলা'মি করবি না! প্রেমের সম্পর্ক না থাকলে মানুষ ডায়েরিতে কাব্যিক কথাবার্তা লিখবে কেন? তাছাড়া, তোর আর কায়েশীর ছবিও দেখেছি আমি!"
কাবির চূড়ান্ত বিরক্তিতে চোখ বুজলো। তারপর রুক্ষ কন্ঠে বলল,
“কাব্যিক কথাবার্তা তোমার বউ লেখছে! ওইটা আমার দোষ না। আর যেইসব ছবির কথা বলতাছো ওগুলা ছবিতে এবনরমাল কিছু পাইছো? আ'ম ড্যা'ম সিওর সবগুলাই নরমাল পাশাপাশি বসা বা দাঁড়ানো ছবি? কথা কি ঠিক কইছি?"
কায়রাভ চুপ হয়ে যায়। কায়রাভের স্মৃতিতে ভেসে উঠলো, সত্যি পাশাপাশি বসা ছবি ছিলো দুজনের। ঘনিষ্ঠ কিচ্ছু ছিলো না। সাধারণ ছবি তবুও মন সায় দেয় না। তাই জিজ্ঞেস করে,
"আচ্ছা, ছবি ছাড়। কায়েশী তো স্পষ্ট লিখেছিলো তোকে ভালোবাসে। আবার তুই বলছিস প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না! আমি কিছু বুঝতে পারছি। সব কাহিনি খুলে বল!"
কাবির এবার বাম হাত তুলে দেখালো নিজের কব্জিতে থাকা ব্রেসলেট।
“এইযে দেখো, ফ্রেন্ডশিপ ব্রেসলেট। নিউমার্কেট থেকে কিনছিলাম দুইজন। ভাবীর হাতেও একটা আছে, দেইখো।”
কায়রাভের চোখে ভেসে উঠলো কায়েশীর হাতের সেই একই ব্রেসলেট। কায়েশীরও সেম এমনই ব্রেসলেট আছে হাতে। তবে ফ্রেন্ডশিপ ফরএভার লেখাটা চোখে পড়েনি। হয়তোবা খেয়াল করা হয়নি। কায়রাভ আস্তে করে বিরবির করে বলল,
“ফ্রেন্ডশিপ?”
“হ্যাঁ।”
কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিষণ্ণ কণ্ঠে কাবির সামনে তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে বলতে শুরু করে,
"হ্যাঁ, ফ্রেন্ডশি'প। আমাদের সম্পর্ক এই ফ্রেন্ডশিপ অব্দিই সীমাবদ্ধ আছিলো। কোনো প্রেমঘটি'ত সম্পর্ক না। কায়েশী ফারিয়াহ নামক মেয়েটা খুব ভালো বন্ধু আছিলো আমার। কিন্তু তোমার সাথে বিয়ের পরে কথা বলা বন্ধ কইরা দেয়, ভাবী। আমিও তেমন কথা বলতাম না শুরুতে। দেখা হইলে মাঝেমধ্যে টুকটাক শয়তানি করতাম, ব্যস এই পর্যন্তই। মানে আগের মতো মনপ্রা'ণ খুইলা আমাদের কথা হয় নাই আর। তোমার ভাই হওয়ার কারণে সে অস্বস্তিবো'ধ করতো আমার সামনে, বুঝতাম আমি। তোমার বিয়ের পর কার কি ক্ষতি হইছে জানি না, কিন্তু আমাদের সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক নষ্ট হইছে ভালোভাবেই।"
কাবিরের কথায় আফসোস স্পষ্ট। কায়রাভ চুপ করে শুনছিলো সব কথাগুলো। সত্যি তো, কায়েশী বিয়ের পর থেকে কাবিরকে এড়িয়ে চলতো। হয়তো পুরোনো সম্পর্কের জের টেনে দিয়েছিলো। ধীরে ধীরে কাবিরের প্রত্যেকটা কথার সত্যতা টের পাচ্ছে কায়রাভ। সত্যিই কায়েশীর কাবিরকে এড়িয়ে চলা অনেকবার নজরে এসেছিলো কায়রাভের। তখন সেসব না বুঝলেও আজ সব বুঝলো সে। ধীর গলায় কায়রাভ জানতে চাইলো,
“তাহলে ওর অনুভূতি…”
কায়রাভ জিজ্ঞেস করতেই কাবির সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
"একতরফা। এর বেশি কিচ্ছু না। আমার তরফ থেকে কোনো ফিলিং'স আছিলো না। সেও জানতো। তবে হ্যাঁ, মা'য়া কাজ করতো। বিয়ের আগে কায়েশী ফারিয়াহ নামক মেয়েটার তিনকু'লে কেউ আছিলো না। সে আমাকে বিশ্বাস করতো, ভরসা করতো। একটা ছেলের সাথে মিশতে মিশতে অনুভুতি জাগা কোনো ব্যাপার না। তার মধ্যে বয়স কম। সে আমার সাথে সংসার করার পরিকল্পনা পর্যন্ত করছিলো। কিন্তু আমার বিয়ে-সাদি নিয়া ইন্টারেস্ট ছিলো না, তুমি জানোই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হইতো, বিয়ের প্রসঙ্গ জীবনে আসলে করমুনি তারে বিয়ে। এত প্যা'রা নাই। দেখতে শুনতে ভালো আছে, সমস্যা কি? মানে ইম্পর্টেন্স দেই নাই কখনো তারে। তারে না পাইলে মইরা যামু এই টাইপের জোরও আছিলো না। কারণ, আমি তো আমিই! যেখানে ভালোবাসা নাই, সেখানে কিসের জোর থাকবো? আমি আরও কইতাম, ভালো চাকরিজীবী পোলা পাইলে তারে বিয়ে দিয়া দিমু!"
একটু থেমে কাবির প্রীতিষার মুখ মনে করে মুচকি হাসে। তারপর আবার বলল,
"আমার প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসা প্রীতি, নিঃসন্দেহে। ওই সেই মেয়ে যার প্রতি আমার জো'র আসছে। যারে দেখে মনে হইছে যে হ্যাঁ, এই মেয়েরেই লাগ'বো। এই মেয়েরে না পাইলে মইরা যামু। ওর আগে পরে কেউ আমার মনে জায়গা পায় নাই। এই বেখাপ্পা, ভবঘুরে কাবিররে প্রীতি চেঞ্জ করছে। সো… প্রীতি ইজ দ্য ওন'লি ওয়ান লেই'ডি, দ্যাট কাবির লাভ'স।"
কায়রাভ এবার মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"খুব ভালোবাসিস মেয়েটাকে, তাইনা?"
কাবির মৃদু হেসে সুর টেনে জবাব দেয়,
"খুউউব!"
এসব শুনে কায়রাভের বুকের ভার ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছিলো। কায়রাভ এবার আনমনেই বলল,
"তোর দিক থেকে কিছুই ছিলো না, বুঝলাম। তাহলে এতবছরেও আমাকে মেনে নিতে পারলো না কেন কায়েশী?"
কথা শুনে কাবির ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। কাবির ঠান্ডা গলায় নির্মম সত্য বলেই ফেললো,
“একটা মেয়ের অন্য ছেলের প্রতি ফিলিংস আছে জানা সত্ত্বেও জোর কইরা বিয়ে করছো। এখন তুমি আশা করতাছো সেই মেয়ে তোমারে ইজি'লি স্বামী স্বামী করবো! কথাটা জোক'স হইলো না? সবশেষে, ভাবীর কোনো দোষ নাই। সব দোষ তোমার।”
কায়রাভ এবার চুপ হয়ে যায়। কায়রাভ ধীরে মাথা নামিয়ে নেয়।
"হ্যাঁ জানি, সব দোষ আমার। আমি অসংখ্য বার ক্ষমাও চেয়েছি ওর কাছে। কিন্তু তারপরেও...."
কাবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
"ইয়াপ! ভাবী ক্ষমা করছে তাই সংসার করতেছে। নাহলে ওই থুথু দেওয়া পাবলিক এত সহজে মানতো না। এখন আদৌও তোমারে ভালোবাসতে পারছে নাকি সেইটা তো আমি জানি না।"
এই কথাটা কায়রাভকে একেবারে ভেঙে দিলো।
সে মাথা চেপে ধরলো দু'হাতে,
“বুঝেছি…সব ভুল আমার। আমি আবার ভুল করেছি রে ভাই! আবার কষ্ট দিয়েছি ওকে!”
ডিপ্রেশন কমাতে পকেট থেকে সিগারেট বের করলো কায়রাভ। সিগারেট জ্বালিয়ে দুটো টান দিয়ে ধোয়া উড়ালো। তারপর কাবিরকে সাধলে কাবির দাঁত কেলিয়ে হেসে মানা করে বলল,
"বাদ দিছি এইডি খাওয়া। বউ পছন্দ করে না। সিগারেটের ধোয়ায় সমস্যা হয় ওর।"
কায়রাভ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে।
"বাহ, এত উন্নতি! অবশ্য উপযুক্ত বউ মানুষ ঘরে আসলে অনেক উন্নতি হয় স্বামীদের। তোর বউও তার প্রমাণ দিলো।"
কাবির স্বাভাবিকভাবে উঠে দাঁড়ালো। কায়রাভকেও হাত বাড়িয়ে টেনে তুললো। ব্যস্ত স্বরে কাবিরে বলে,
“বাইকে বসো যাইয়া। ওই দিক দিয়াই যামু।”
"লাগবে না। তুই তারাতাড়ি বাসায় চলে যা। তোর বউ তো একা বাসায় রয়েছে।"
কাবির জেদ করে বলল,
"কথা বাড়াইয়ো না, ভাইজান। বাইকে যাইয়া বসো।আসতাছি।"
কায়রাভ আর আপত্তি করলো না। সিগারেট পা দিয়ে পিষে চলে গেলো। এবার কাবির বারান্দায় উঁকি দিয়ে শয়তানি হেসে বলল,
"কি ফিরোজ ভাই? প্রেম চলে নাকি!"
ফিরোজ আঁতকে উঠে কল কেটে দিলো। কাবিরকে বিশ্বাস নেই, কখন কি বেফাঁস কথা বলে ফেলে। পরে না আবার ওর ব্রেকআপ হয়ে যায়। ফিরোজ উঠে এসে প্রসঙ্গ বদলে বলল,
"প্রবলেম সলভ?"
"একবারে আগা থেকে সলভ। আশা করি আর গেঞ্জাম করবো না এই লাইলি মজনু।"
কাবির আর ফিরোজ হাঁটতে হাঁটতে ঘর ছেড়ে বেরিয়েই আসছিলো। হঠাৎই কাবির তিনশ ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গিয়ে ফিরোজের দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
"ফিরোজ ভাই, একটা জিনিস খেয়াল কইরা দেখছেন?”
ফিরোজের চোখে কৌতূহল খেলে গেলো,
“কি?”
কাবির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টানে। সে খুব গভীর কোনো রহস্য আবিষ্কার করেছে এমন ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ভাইজান আর ভাবীর মধ্যে ঝড়-তুফান, ঝামেলা ডেইলি রুটিন। এত কিছুর পরেও চার বছরে দুইবার সুখবর আপডে'ট দিছে! মানে বাইরে ঝগড়া যতই হোক, ভিতরের টিমওয়ার্ক কিন্তু একদম সলি'ড! এইবার একটু ক্যালকুলেশন করেন। যদি এদের মধ্যে ঝগড়া না থাকতো, সব কিছু যদি মাখন মাখন হইতো, তাইলে তো প্রতিবছর সুখবর দিতো। সোজা কথা, এদের ঝগড়া শুধু বাইরের শো। দিনশেষে জামাই-বউ মিলে ঠিকই ফ্যামিলি প্ল্যানিং করে। ধুর শা'লা! পিছায়া গেলাম জীবনে!”
ফিরোজ হতবুদ্ধি হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে,
"কিহ! ভাবী প্রেগন্যান্ট নাকি? তুমি জানলে কি করে?"
এদিকে কায়রাভ বাইরে থেকে কাবিরকে অনবরত ডাকছে তারাতাড়ি আসতে। কায়রাভ যত দ্রুত সম্ভব কায়েশীর কাছে যেতে চায় এখন। কাবির ভাইয়ের ডাক শুনে তারাহুরো করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেলো,
"কাবির সব জানে। অবস্থা দেখছেন, একটু আগে বউয়ের সাথে হাঙ্গা'মা কইরা আইসা এখন বউয়ের কাছে যাওয়ার জন্য অস্থি'র হইতাছে! শেইমলে'স ব্রাদা'র!"
ফিরোজ প্রতিউত্তরে কিছু না বলে পেট চেপে হাসলো। এই কাবির সত্যি একটা চিজ! লা'খে এমন একটা ভাই মেলে। এদিক থেকে কায়রাভ সত্যিই ভাগ্যবান।
----------------------
মুষলধারের বৃষ্টি থেমেছিলো ঠিকই। তবে আকাশের বুক থেকে মেঘের কালচে ভার নামেনি এখনো। আবার যেকোনো সময় ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি নামবে ভাব। এই মেঘলা ভেজা বাতাস চিরে কাবিরের বাইক ছুটে চলেছে খান বাড়ির দিকে। পেছনে বসে কায়রাভ।
সে খানিকটা চুপচাপ'ই রয়েছে। হঠাৎই কাবির গতি সামান্য কমিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“ভাইজান, ভাবীরে আবার উল্টাপাল্টা কথা শুনাও নাই তো?”
কায়রাভের নিচু গলায় উত্তর দেয়,
“অনেক কিছুই শুনিয়েছি রে… এখন আমাকে সামনে পেলে তোর ভাবী নিশ্চিত আবার থুথু দিবে। না হলে একটা থাপ্পড় মেরে বসবে।”
কাবির হো হো করে হেসে ওঠে। আর কায়রাভ হালকা করে নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর অশান্তি নিয়ে বসে থাকে। কায়েশীর মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মেয়েটা কাঁদছিলো আসার সময়, কিন্তু কায়রাভ ফিরেও দেখেনি। পাষাণ হয়ে গিয়েছিলো রাগে। এখন খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য।
এদিকে কায়রাভ এখনো জানে না, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর খবরটা ঠিক তার জন্যই অপেক্ষা করে আছে। ফিরোজ বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু কাবির থামিয়ে দিয়েছিলো তাকে। কারণ কাবির জানে, কিছু সত্যি উপযুক্ত সময়ে প্রকাশ পেলেই তার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি হয়। হয়তো এই খবরটা দুটোকে মিলিয়ে দিতে পারবে।
অবশেষে খান বাড়ির সামনে এসে বাইক থামে।
ঠিক তখনই যেন অপেক্ষা করছিলো বৃষ্টি। আবার ঝপঝপ করে বৃষ্টি নামে। হালকা টুপটাপ শব্দে ভিজে ওঠে চারপাশ। বাইক থেকে নেমে দু’জনই এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। চোখ চলে যায় সামনের উঠোনে।
একটু সামনেই খোলা আকাশে নীচে ঘাসের উপর বসে আছে কায়েশী। পুরো ভিজে গেছে সে। চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। আঁচলটা একপাশে সরে গেছে, চুলগুলো ভিজে কপাল বেয়ে গাল ছুঁয়ে নামছে। কাপড় জবজবে হয়ে গায়ে লেপ্টে আছে। তার গায়ের হালকা রঙের শাড়িটা বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় হয়ে উঠেছে। অথচ সে নড়ছে না। চুপচাপ বসে আছে দূরে কোথাও নিশ্চল, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মেয়েটার ঠোঁটদুটো সামান্য কাঁপছে। আজ ইচ্ছে করেই ভিজছে কায়েশী। এত যন্ত্রণা, এত অশান্তির মাঝে একটু মানসিক শান্তি পেতে ঠাঁই নিয়েছে খোলা আকাশের নীচে।
দু'জন পুরুষ এই দৃশ্যের মর্মার্থ বুঝতে পারলো না। তবে কাবির বুঝলো, এই মুহূর্তটা শুধু তাদের দু’জনেরই হওয়া উচিত। কাবির সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিয়ে বাইকে বসে চাবি ঘুরিয়ে আবার ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। কাবির তার যথাসাধ্য দায়িত্ব পালন করেছে। দুটোকে মিলিয়ে দিয়েছে। এবার এরা ঝগড়া করুক, মাথা ঠোকাঠুকি করুক, কাবিরের কি? অগত্যা কাবির ধীরে ধীরে বৃষ্টি ভেদ করে মিলিয়ে যায়।
আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে কায়রাভ অবাক, স্তব্ধ ভঙ্গিতে। আপাতত হুসে নেই সে। জ্ঞান ফিরতেই আর এক মুহূর্তও নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না কায়রাভ। ছুটে গেলো কায়েশীর দিকে বৃষ্টিভেজা ঘাস পেরিয়ে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তাড়না নিয়ে।
কায়েশীর কাছে পৌঁছে তার শরীরে হাত রাখতেই কায়রাভ চমকে উঠলো। শরীরটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা।
কায়রাভ এক ঝটকায় কায়েশীকে তুলে দাঁড় করালো। কণ্ঠে জমে থাকা রাগ আর দুশ্চিন্তা মিশিয়ে বলল,
“এসব কি ধরনের পাগলামি, কায়েশী? বাইরে ভিজছো কেন?”
কায়েশী ধীরে মুখ তুললো। তার চোখদুটো লাল, ভেজা চুল গাল বেয়ে নেমে এসেছে। কিন্তু দৃষ্টিটা কঠিন। অভিমানে জমাট বাঁধা।
“এবার বলবেন আপনার ভুল হয়ে গেছে, তাইনা? আমাকে ধরাসায়ী করে, আমাকে ভেঙেচুড়ে দিয়ে আপনি বারবার ভুল করেন। আর প্রতিবার সেই ভুলগুলোর ফল ভোগ করতে হয় আমাকে!”
ভীষন কঠিন স্বরে বলে উঠলো কায়েশী। কায়রাভ থেমে গেলো এক মুহূর্ত। তারপর নিঃশব্দে কায়েশীর হাতটা টেনে ধরে বলল,
“হুম… এবারও ভুল করেছি আমি। এখন ভেতরে চলো, এভাবে থাকলে অসুস্থ হয়ে পরবে। এরপর যা শাস্তি দিতে চাও, দিও।”
কথাটা শেষ হতেই ঠা'স করে শব্দ হলো। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝে তীক্ষ্ণ শব্দে কায়রাভের গালে এসে পড়লো এক দাবাং চ'ড়। আর সর্বশক্তি দিয়ে চড়টা কায়েশী'ই মেরেছে। তবে কায়রাভ একটুও চমকালো না। সে জানতো, এইটা তার প্রাপ্য। তার সমস্ত ভুলের খেসারত। কায়েশী কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“এবার আমাকে এটার জন্য শাস্তি দিন… আর কি শাস্তি বাকি আছে? দিন, সব দিন!”
কায়রাভ আর কোনো উত্তর দিলো না। শুধু কয়েক পল তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটাকে। কায়েশী ছটফট করতে লাগলো বাহুবন্ধনীতে। কিন্তু লাভ হলো না। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ নিয়ে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা,
“আপনার মতো খারাপ মানুষ আমি কখনো দেখি নি! আমি আপনাকে জীবনেও ছাড়'বো না!”
কায়রাভ তার কাঁধে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“প্লিই'জ… ছেড়ো না, কায়েশী। আমিও চাই না তুমি আমাকে ছাড়ো…”
কথাগুলো কায়েশীর বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করলো। সে ফুঁপিয়ে উঠলো শরীর কাঁপিয়ে, গলা ভেঙে গেলো কান্নায়,
“এখন কেন ফিরে এসেছেন? চলে গেছিলেন তো!”
কায়রাভ একটু দূরে সরে তাকালো তার দিকে। তার চোখে ক্লান্তি, অনুতাপ। কায়রাভ ধীর গলায় বলল,
“এই কথাগুলো আগে বললেই হতো… তাছাড়া, হুট করে এসব জেনে আমার রিয়েক্ট করা কি অস্বাভাবিক ছিলো? তারমধ্যে কত পেঁচানো ব্যাপার!”
কায়েশী তীব্র অভিমানে বলে উঠলো,
“আপনি আমার কথা শুনেছেন কবে? আমি বার বার বলতে চেয়েছি আপনাকে।”
এখানেও ভুল করেছে কায়রাভ। সত্যিই কায়েশীর কোনো কথাই শোনেনি সে। কায়রাভ এবার কায়েশীর গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
"কাবিরের পক্ষ থেকে সব শুনেছি। এবার তুমি বলো, কাবিরের প্রতি এখনো কোনো অনুভূতি বেঁচে আছে তোমার?
কায়েশী ক্রমাগত মাথা নেড়ে বলল,
"নেই...কোনো অনুভূতি নেই। বিশ্বাস করুন, আপনাকে কবুল বলার পরই সব অনুভুতি বিসর্জন দিয়েছিলাম। আমি কোনো চরিত্রহীনা মেয়ে নই যে স্বামী থাকতে অন্য কারো জন্য মনে অনুভূতি রাখবো। বিয়েটা যেভাবেই হোক, কিন্তু আমি ওই মানিয়ে নেওয়া নারীদের পর্যায়েই পরি।"
কায়রাভ মাথা নেড়ে বলল,
"আমি জানি তুমি কেমন? তোমাকে বিশ্বাস করি আমি। আজকে স্বীকারক্তিটুকু নিলাম শুধু।"
এদিকে বৃষ্টি থেমে গেছে আবার। চারপাশে শুধু ভেজা। এবার দুজনেই ভিজে জবজবে। কায়রাভ ভারী গলায় কায়েশীর হাত ধরে বলল,
“কাবিরের সাথে বন্ধুত্বটা নষ্ট করো না… ওর মতো বন্ধু দ্বিতীয়জন পাবে না। তাছাড়া, এখন নিশ্চয়ই অস্বস্তির কারণ নেই।”
কায়েশী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি বন্ধুত্ব নষ্ট করিনি। তবে হ্যাঁ, আগের মতো কিছু নেই। সময়, পরিস্থিতি আমাদের বদলেছে। আচ্ছা এসব ছাড়ুন, আপনি একটা কথা বলুন তো। আপনি সবাইকে বোঝেন, জানেন… শুধু আমাকে ছাড়া!”
কায়রাভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
কায়েশী হঠাৎ যেন ভেঙে পড়লো,
“এখনো বুঝতে পারছেন না আমি আপনাকে ভালোবাসি? আজ নির্লজ্জের মতো বলতে হচ্ছে এই কথা। আপনার মতো একটা উন্মাদ, মানসিক বিকারগ্রস্ত লোককে ভালোবাসলাম কি করে জানি না, কিন্তু বেসেছি। যার জন্য আমি এত আয়োজন করলাম… আর সেই আপনি সব গুছিয়ে নষ্ট করে দিলেন!”
কায়রাভ থমকালো, চমকালো। ও কি ঠিক শুনছে এসব? কায়েশী তাকে এইমাত্র ভালোবাসার কথা বলেছে! কায়রাভের প্রতিক্রিয়ার আগেই কায়েশীর কণ্ঠ ভেঙে এলো,
“এবারেও আমাদের সুন্দর মুহুর্তটা নষ্ট করে দিলেন। আপনার বাচ্চার কথাটাও জানাতে দিলেন না…”
কায়রাভ থমকে গেলো। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। বিচলিত হলো নিজের ছেলের জন্য।কায়েশীর দুই বাহু চেপে ধরে ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মানে? আমার কায়ানের কি হয়েছে? ঠিক আছে তো ও?”
কায়েশী চোখ মুছে ধীরে মাথা নাড়লো,
“কায়ান নয়। আপনি… আপনি আবারও বাবা হবেন…”
এই কথায় কায়রাভের চোখ বিস্ফারিত।
“কিহ?”
কায়েশী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ… আপনি বাবা হবেন। এবার প্লিই'জ আমার প্রতি একটু সদয় হোন। আমি এইসব মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না। আমাকে একটা স্বাভাবিক সংসার দিন।”
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই কায়রাভ তাকে টেনে নিলো নিজের বুকে। আগের চেয়েও আরও শক্ত করে। যেন এইবার আর ছাড়বে না কোনোদিন। কায়রাভের কণ্ঠ মৃদু, কিন্তু অটলভাবে বলল,
“সংসার হবে… একটা খুব সুন্দর সংসার হবে আমাদের।”
কায়েশী পুরুষালী ভেজা বুকে মুখ লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“আমি এবার আমার মাতৃত্ব'টা উপভোগ করতে চাই। কায়ানের সময়ের মতো হঠকারিতা করবো না, প্রমিস! আপনি-ও কথা দিন… আর কষ্ট দেবেন না আমাকে?”
কায়রাভ চোখ বন্ধ করে কায়েশীর মাথায় চু'মু দিয়ে বলল,
“আমার পক্ষ থেকে আর কোনো ভুল হবে না, প্রমিস! কোনো কষ্ট দেবো না তোমায়। অনেক অনেক ভালোবাসবো। তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো… হ্যাঁ?”
কায়েশী ধীরে মাথা নাড়লো। সে তো সবসময়ই তার ছিলো। কিন্তু কায়রাভ বোঝে নি, বোঝেনি ধীরে ধীরে জন্মানো কায়েশীর সুপ্ত অনুভূতি। মুখে না বললে আজও বুঝতো না। হম্বিতম্বি করা লোকের ঘটে এক ফোটাও বুদ্ধি নেই। শুধু মুখেই গম্ভীর ভাব নিয়ে চলে। কায়েশী বুঝে গেছে। এসব ভেবে নাক টানলো কায়েশী। এতক্ষন বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লেগে গেছে তার। তবে আজ এই বৃষ্টির মাঝেই দুজনের মধ্যেকার সব ঝামেলার অবসান হলো।
চলমান.......
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]