Notifications
Clear all
Page 1 / 2
Next
August 15, 2026 10:49 pm
গল্প:প্রফেসর উজান চৌধুরী
লেখনীতে:বন্যা সিকদার
“৩৪ বছরের প্রফেসর উজান চৌধুরী কিনা বিয়ে করলো ১৭ বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে। পৃথিবীতে কি মেয়ের এতই অভাব পড়েছিল যে শেষে হাঁটুর বয়সী মেয়েকেই বিয়ে করতে হলো?
ভরা বিয়ের আসরে কথাগুলো ভেসে আসতেই উজানে’র চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। কটমট দৃষ্টিতে তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ভাই আরিয়ান চৌধুরীর দিকে। আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে এই মুহূর্তে উজানে’র রাগ ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে। উজান একবার নিজের বাবা আরিফুল চৌধুরীর দিকে তাকায়, তো আরেকবার আরিয়ানে’র চলে যাওয়ার দিকে। মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলছে তার। গত সাত-আট বছর ধরে মানুষটা তাকে বিয়ে করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। কিন্তু উজান বিয়ে শব্দটাই সহ্য করতে পারতো না। এক পর্যায়ে সে দেশ ছেড়ে ইউএসএ চলে যায়।
আর তারপর? সেখানে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলে। বর্তমানে সে আমেরিকার নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রফেসর। নিজের জগৎ‚ নিজের নিয়ম‚ নিজের স্বাধীনতা নিয়েই বেশ ভালো ছিল। গতকাল হঠাৎ শুনলো তার বাবা আরিফুল চৌধুরীর অবস্থা নাকি খুবই গুরুতর। খবরটা শোনার পর আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি উজান। দীর্ঘ ছয় বছর পর নিজের জন্মভূমিতে পা রাখে সে। কিন্তু দেশে ফিরতেই বুঝলো এখানে তার জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল। অসুস্থ বাবাকে সামনে এনে আবেগ দেখিয়ে‚ একপ্রকার ব্ল্যাকমেইল করেই আরিফুল চৌধুরী আর আরিয়ান তাকে বিয়ের আসরে বসিয়ে দিয়েছে। উজান চায়নি বিয়ে করতে। কিন্তু বাবার হুইলচেয়ারে বসা অসহায় মুখটা দেখে “না” বলার সাহস হয়নি তার।
কে জানতো সেই অসুস্থতাও ছিল সাজানো নাটক। হঠাৎই কানের পাশে ফুল ভলিউমে বেজে উঠলো।
❝হুলা হুলা...হুলা হুলা তু হ্যায় মেরি ফ্যান্টাসি❞
উজান বিরক্ত হয়ে পেছনে ফিরতেই থমকে গেল। চোখ দুটো প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কারণ যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও হুইলচেয়ারে আধমরা রোগীর মতো বসে ছিল‚ সেই আরিফুল চৌধুরী এখন নিজের বড় ছেলে আরিয়ানে’র সাথে কোমর দুলিয়ে হুলা হুলা গানে ওড়া ধুরা নাচছে। শুধু নাচই না মাঝে মাঝে হাত তুলে স্টেপও দিচ্ছে। আরিয়ান তো হাসতে হাসতে শেষ। উজান ভাবছে সে কি সত্যিই বাস্তবে আছে নাকি কোনো প্র্যাঙ্ক শোতে এসে পড়েছে। তার কপালের রগ ফুলে উঠলো। এতক্ষণে বুঝতে আর বাকি রইলো না এই পুরো নাটকটাই তাকে বিয়ে করানোর জন্য সাজানো হয়েছিল। উজান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। গভীর একটা শ্বাস নিলো এবং দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করে উঠলো,
“মিরজাফরের বংশগুলোর মনে তাহলে এই ছিলো? যে উজান চৌধুরী সবাইকে মুরগি বানিয়ে বেড়ায়‚ আজ তাকেই আস্ত মুরগি বানিয়ে ছাড়লো?
আরিফুল চৌধুরী নাচের তালে তালে হেসে হেসে উজানে’র দিকে এগিয়ে এলেন। চারপাশে বিয়ের আনন্দ, ঢাকঢোলের শব্দ, মানুষের হৈচৈ সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন একেবারে উৎসবের ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে। সেই ভিড়ের মাঝেও আরিফুল চৌধুরীর মুখে এক অদ্ভুত শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। তিনি উজানে’র সামনে এসে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বললেন,
"বাপ আয় তিন বাপ বেডা মিলে ডান্স করি।
উজান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে ভ্রু জোগল কুঁচকে তাকায়। “লাইক সিরিয়াসলি? ড্যাড তুমি আদৌ আমার বাপ তো?
এই কথায় আশেপাশের কয়েকজন হালকা হেসে উঠলেও আরিফুল চৌধুরী একদম নির্লিপ্ত। তিনি যেন কথাটাকে একেবারেই সিরিয়াসলি নিলেন না। উল্টো আরও মজা পেয়ে গেলেন। হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন‚
"যদি তুই এক মাসের মধ্যে আমাকে নাতি-নাতনি হওয়ার সুখবর দিতে পারিস তাহলে আমি তোর বাপ। নয়তো চাচা ডাকবি।
উজানে’র চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে কটাক্ষ স্বরে আওরায়„
“আজ থেকে তোমায় আমি চাচাই ডাকবো তবুও এই বিয়ে মানবো না।
আরিফুল চৌধুরী এবার নাচ থামিয়ে উজানে’র দিকে একটু ঝুঁকে এসে শান্ত গলায় বললেন„
"যার সাথে বিয়ে দিয়েছি সেই তোকে বুঝিয়ে দেবে তুই বিয়ে মানবি নাকি মানবি না।
এই কথা বলেই তিনি আবার গানের তালে তালে নাচতে নাচতে ভিড়ের মাঝে মিশে গেলেন। যেন উজানে’র প্রতিক্রিয়ায় তাঁর কিছুই যায়-আসে না। উজান এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সরে গিয়ে এক পাশে থাকা একটা চেয়ারে বসে পড়ল। চোখে মুখে বিরক্তিকর ছাপ। মনের ভেতর অস্থির ঝড়। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না নিজের বাবাই তার সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে দাঁড়াতে পারে। বিয়ের এই আয়োজনটা তার কাছে এখন উৎসব না‚ বরং এক ধরনের বন্দিত্ব মনে হচ্ছে। যাকে সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না‚ তাকেই তার জীবনে জোর করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছে করছিল একা একা চলে যেতে কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। তাই গাল ফুলিয়ে সেখানেই বসে রইলো।
প্রায় চার ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর‚ অবশেষে সবাই বউ’কে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গাড়ির কনভয় ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল আর উজানও নীরব‚ অস্থির মন নিয়ে সেই যাত্রার অংশ হয়ে গেল। একটা নতুন‚ অনিশ্চিত অধ্যায়ের দিকে।
•
•
🌸🖤
বা'সর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান‚ তার স্ত্রী তুবা‚ উজানে’র ছোট চাচার ছেলে ইফাত‚ যে আবার তার বেষ্ট ফ্রেন্ড আর মেহের‚ সে হচ্ছে উজানের শালিকা যাকে স্পষ্টই জোর করে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ শার্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে আসছে উজান। তাকে দেখা মাএ সকলের চোখে মুখে বিষ্ময়কর ছাপ। সবাই তার কান্ড দেখে মুখ চেপে হাসতে লাগলো। যে ছেলে বিয়ে মানবে না বলে এখনো পর্যন্ত নতুন বউ’য়ের মুখ দেখেনি। এমনি আসার সময় মুরুব্বিদের বকবক শুনতে শুনতে এসেছে তবুও নতুন বউ’য়ের সাথে আসেনি। আর সেই ছেলে এখন রুমে ঢুকার আগেই গায়ে জরানো শার্ট খুলতেছে।
হঠাৎ উজান এসে থমকে দাঁড়াল তাদের সামনে। চারপাশে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো„
“হোয়াই আর ইউ হিয়ার নাউ?
তার কণ্ঠে বিরক্তি আর অবাক হওয়া দুটোই মিশে ছিল। ঠিক তখনই ইফাত এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটিয়ে বলল„
"ইসস কি কপাল নিয়ে জন্মেছিস তুই। তুই বিয়ে করবি না জেনেও তোকে সেই আমেরিকা থেকে টেনে এনে বিয়ে করিয়ে দিলো‚ অথচ আমি বিয়ে করতে চাইতেছি ল্যাংটা কাল থেকে তবুও আমার কথা কেউ কানে নিচ্ছে না। তা দোস্ত‚ ভাবি দেখতে কেমন? প্রথম দেখায় নিশ্চয়ই ভালোবেসে ফেলেছিস?
উজান চোখ ছোট করে তাকাল। বিরক্তির সুরে আওরায়‚
“আই হেট লাভ! ভালোবাসা বলে আমার লাইফে কোনো ওয়ার্ড নেই। আর সবাই এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কি? সরো ফ্রম দ্য ডোর। আমি রুমে যাবো।
তখনই তুবা মুচকি হেসে একটু এগিয়ে এসে বলল‚
"ভাই মানলাম তোমার লাইফে লাভ বলে কোনো ওয়ার্ড নেই কিন্তু বাসরঘরে ঢোকার আগে শার্ট খুলতেছো কেন হুম?
সাথে সাথে পুরো জায়গাটায় হো হো করে হাসির রোল পড়ে গেল।
আরিয়ান হেসে হেসে বলতে লাগলো।
"কেন আবার? যাতে বেশি টাইম ওয়েস্ট না হয়‚ তাই না ভাই? তবে যাই হোক‚ তুই এখন আমাদের ৭০ হাজার টাকা দে।
উজান ভ্রু উঁচু করে তাকাল।
“হোয়াই?
"ঢং বাদ দে। বাসরঘরে যাওয়ার ‘এন্ট্রি ফি’ হিসেবে ৭০ হাজার টাকা। না দিলে ঢুকতে দিবো না।
উজান অবাক হয়ে গেল।
“সিরিয়াসলি? যে বিয়েই আমি মানি না‚ তার আবার টাকা কিসের? উল্টো তোমরা আমাকে টাকা দাও।
ইফাত সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল‚
"দেখছো ভাই? দেখছো তোমার প্রফেসর ভাই কোন লেভেলের কিপটা। বাসরঘরে যেতে চায়‚ অথচ টাকা দিতে চায় না। ভাবি তুমি তো কিছু বলো?
তারপর সে নাক সিঁটকে বলল‚
"মোটে ৭০ হাজার চেয়েছি, সেটাও ভাগ করলে ১০ হাজার করে পড়বে কিনা সন্দেহ। সামনে ঈদও আছে‚ গার্লফ্রেন্ডদের শপিং করাতে হবে। মোটে সাতটা গার্লফ্রেন্ড আমার।
ইফাতে’র কথা শুনে মেহের চোখ বড় বড় করে তাকাল। সাতটা গার্লফ্রেন্ডের কথা যেন তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে অবাক দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
ইফাত আবার তাকে ধমকে দিলো।
"এই মেয়ে কি ভাবতেছো? টাকা চাও তোমার পেয়ার দুলাভাইয়ের কাছে।
মেহের চুপচাপ রইল। সে স্বভাবতই খুব কম কথা বলে‚ বিশেষ করে পুরুষ মানুষের সাথে। তার ভেতরে একধরনের অস্বস্তি কাজ করে। তাই সে আবারও মাথা নিচু করে নিল।
ইফাত আবার চেঁচিয়ে উঠল‚
"এই দোস্ত টাকা দে না।
উজান ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। সবাই খুশিতে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল এই বুঝি টাকা বের হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে ইফাতের হাতে দিল।
“আমার মনটা বিশাল। আমি দান-খয়রাত খুব ভালোবাসি। তোকে পাঁচ টাকা দান করলাম। এটা দিয়ে গিয়ে সামনের দোকান থেকে একটা চকলেট কিনে খা‚ তবুও শরীরের এনার্জি ওয়েস্ট করিস না। আর তোমরা ইমিডিয়েট আমাকে ৭০ হাজার টাকা দাও‚ না হলে আমি বাসরঘরে যাবো না।
ইফাত থমকে গেল।
"কি বললি তুই?
উজান এক পলক ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে আবার আরিয়ানে’র দিকে তাকালো।
“ভাই টাকা দাও না হলে আমি ছাদে চলে যাবো।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কাশতে কাশতে প্রায় মেঝেতে বসে পড়ল। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখে তার মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা।
"ভাই এসব তুই কি বলছিস? বাসর করবি তুই‚ টাকা তো তোর দেওয়ার কথা আর তুই আমার কাছ থেকে চাইছিস?
“দেবে না তো? ঠিক আছে‚ আমি যাচ্ছি তাহলে।
সে পা বাড়াল। সাথে সাথে ইফাত আর আরিয়ান দুজনেই তার হাত ধরে ফেলল।
"ভাই এমনভাবে আমাদের সর্বনাশ করিস না! আমি ফকির‚ আমি মিসকিন‚ আমার ঘর বাড়ি নেই আর তুই আমার কাছ থেকে টাকা চাইছিস?
“উজান চৌধুরী বারবার কথা রিপিট করে না। টাকা দাও‚ নাহলে আমি যাচ্ছি।
এইবার ইফাত প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা।
"ভাই দ্রুত এই কিপটেকে টাকা দাও‚ না হলে কাল আমাদের ফাঁসি হবে।
অবশেষে আরিয়ান বাধ্য হয়ে টাকা বের করল। উজান টাকাটা হাতে নিয়ে বাঁকা এক হাসি দিল। চোখে বিজয়ের ঝিলিক। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে রুমে ঢুকে গেল। রুমের ভেতরে ঢুকতেই উজান থমকে গেল। পুরো রুমটা সাজানো রজনীগন্ধা‚ লাল গোলাপ আর বেলি ফুলে। হালকা সুগন্ধে চারপাশ মোহময় হয়ে আছে। বিছানার চারপাশে ফুলের ঝালর ঝুলছে‚ মোমবাতির নরম আলোয় পুরো পরিবেশটা আরও স্বপ্নময় লাগছে। কিন্তু উজানে’র চোখ গিয়ে আটকে রইলো বিছানার মাঝখানে। ফুলে সজ্জিত খাটে লাল বেনারসি পরে ছোট্ট করে ঘোমটা টেনে বসে আছে একটা পিচ্চি মেয়ে। তাসফিয়া মৌ। উজানে’র সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী। মেয়েটাকে দেখেই তার বিরক্তি আরও বেড়ে গেল। এখন তার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। তার উপর এই পুঁচকে মেয়েটাকে। মাস কয়েক আগেই স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে মেয়েটা। অবশ্য পড়াশোনার প্রতি মৌ’য়ের খুব একটা আগ্রহ নেই। মেহের না থাকলে হয়তো কলেজেও যেত না।
উজান গভীর শ্বাস ফেললো। তারপর গম্ভীর মুখে সামনে এগিয়ে এলো। হঠাৎ পুরুষ কণ্ঠের শব্দে মৌ কেঁপে উঠলো। ঠিক তখনই উজান বজ্র কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে।
“এই পুঁচকে মেয়ে বয়স তো এখনো আঠারোর নিচে। তাহলে কোন দুঃখে নাচতে নাচতে বিয়ে করে বসলে শুনি? আর শোনো তোমাকে এই উজান চৌধুরী নিজের ওয়াইফ হিসেবে মানে না। সো আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে। আর এটা আমার রুম। একটা জিনিসও যদি এদিক-সেদিক হয় তাহলে কিন্তু মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো। মাইন্ড ইট।
মৌ’য়ের ভেতরে সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠলো। ইচ্ছে করছিল এখনই ঘোমটা ফেলে উঠে দুই কথা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু আজ বাসর রাত বলে দাদি‚ চাচিরা হাজারবার বুঝিয়েছে প্রথম দিন শান্ত থাকতে হয়। তাই অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করলো সে। তবে “উজান চৌধুরী” নামটা শুনে তার কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। মনে হচ্ছে কোথাও শুনেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুতেই মনে করতে পারছে না।
ঠিক তখনই দরজার কাছে শব্দ হলো। উজান ক্যাবিনেট থেকে একটা বালিশ বের করে হাতে নিল। তারপর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলো„
“পুঁচকে মেয়ে পুঁচকে মেয়ের মতোই থাকবে। কখনো বউ’য়ের অধিকার ফলাতে আসবে না। কারণ আমি তোমাকে বউ হিসেবে মানি না আর না এই বিয়েটাকে।
কথাটা বলেই গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই মৌ এক টানে ঘোমটা ফেলে দিল। তারপর বিছানা থেকে ধপ করে নেমে কোমড়ে হাত রেখে ফুঁসতে ফুঁসতে লাগলো।
"এহ্ আমি যেন বিয়ে মানার জন্য বসে আছি। বুড়া বয়সে এত সুন্দর‚ কিউট একটা বউ পেয়ে নিজেকে গর্ভবতী ওহ্ সরি সরি গর্বিত মনে করবে তা না উল্টা.....
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
{গল্পটা কেমন হয়েছে জানিয়ে যাবে সবাই। আর বেশি বেশি রেসপন্স করবে।}
9 Replies
August 15, 2026 10:50 pm
পর্ব—০২
"এহ্ আমি যেন বিয়ে মানার জন্য বসে আছি। বুড়া বয়সে এত সুন্দর‚ কিউট একটা বউ পেয়ে নিজেকে গর্ভবতী ওহ্ সরি সরি গর্বিত মনে করবে তা না উল্টা আমার উপর রাগ দেখায়। রাতটা যাক তারপর তোকে বুঝাবো বউ কাকে বলে আর কত প্রকার। বুড়া খাটাস একটা। বাসর রাতে বউ'কে গিফট না দিয়ে বরং দশটা কথা শুনিয়ে চলে গেলো। গিফটের জন্যই তো বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম। গিফটই যদি না দেয় তাহলে এই স্যা**টার বিয়ে করে লাভটা কি হলো?
সঙ্গে সঙ্গেই নিজের জিভে কামড় দিল মৌ। মুখটা তার বড্ড বেপরোয়া‚ যখন-তখন পেটে যা আসে মুখে বলে ফেলে। আবারও গুটিশুটি মেরে বিছানায় গিয়ে কমফোর্টর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। দীর্ঘ সময় ধরে এপাশ-ওপাশ করল‚ বিছানার চাদর খামচে ধরল‚ বালিশটা উল্টেপাল্টে নিল কিন্তু চোখে কিছুতেই ঘুম ধরা দিল না। বিরক্ত হয়ে আবারও উঠে বসল মৌ। এবার দুহাত দিয়ে শক্ত করে পেটটা চেপে ধরল সে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে‚ খিদের চোটে পেটের ভেতর যেন এক ডজন ইঁদুর কুস্তিকসরত করছে! সকাল থেকে রাগে‚ অভিমানে আর জেদের বশে দানাপানি কিচ্ছু মুখে তোলেনি। নিজের জেদ এখন নিজের পেটের ওপর এসে বোমার মতো ফেটেছে। ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো পুরো রুমে এদিক-ওদিক পায়চারি করল মৌ। তেষ্টা মেটাতে একনাগাড়ে দুই গ্লাস পানিও গিলে ফেলল‚ তবুও পেটের ভেতরের খিদের আগুন বিন্দুমাত্র কমল না।
উজানের মা কয়েকবার সাধাসাধি করেছিলেন খাওয়ার জন্য। কিন্তু মৌ তখন কায়দা দেখাতে গিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলেছিল‚ "আমার খিদে নেই। এখন সেই কায়দার বারোটা বেজে গেছে। অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে‚ পেটের দায়ে চোরের মতো চুপিচুপি নিজের রুমের দরজাটা খুলল সে। করিডোরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল মৌ‚ কাউকে চোখে পড়ল না। ব্যস‚ আর পায় কে। খুশিতে ডগমগ হয়ে নাচতে নাচতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল সে। দুইবার পায়ের শাড়ি জড়িয়ে হোঁচট খেতে খেতেও কোনোমতে দেওয়াল ধরে বেঁচে গেল। ড্রয়িং রুমে এসে থমকে দাঁড়াল সে। চারদিক একদম নিঝুম‚ সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পরিবেশ অনুকূলে দেখে মৌ নিজের মনেই ফিসফিসিয়ে বিড়বিড় করে উঠল„
"যাহ শালী শ্বশুরবাড়ি পা দিতে না দিতেই চোরের মতো মাঝরাতে রান্নাঘরে হানা দিচ্ছিস? ছিঃ ছিঃ। এই না না‚ আমি চুরি একদমই করছি না। এই বাড়িটা কার? আমার শ্বশুরের। আর শ্বশুরের বাড়ি মানে তো এটা আমারও বাড়ি। সেই হিসেবে মাঝরাতে রান্নাঘর ওলটপালট করে সব খেয়ে ফেলার পূর্ণ অধিকার আমার আছে। মৌ তুই আজ বেশি বেশি করে খা‚ পারলে তোর ওই খিটখিটে খড়খড়ে জামাইয়ের মাথাটাও চিবিয়ে খেয়ে ফেল।
মনের আনন্দে গুনগুন করতে করতে কিচেন রুমে ঢুকল মৌ। কিন্তু সুইচ টিপে আলো জ্বালতেই তার মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে গেল। এত বড় কিচেন রুম অথচ চটজলদি মুখে তোলার মতো তৈরি কোনো খাবারই চোখে পড়ছে না। খিদের তাড়নায় মাথা ঘুরছিল তার। খাবার খুঁজতে খুঁজতে পুরো কিচেন রুমে এক চক্কর দিয়ে যখন সে প্রায় ক্লান্ত‚ ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল কোণার বিশাল ডাবল-ডোরের ফ্রিজটার দিকে। আশার আলো দেখে মৌ দ্রুত গিয়ে ফ্রিজের দরজাটা খুলল। আর খুলেই তার চোখ ছানাবড়া! ভেতরে বাহারি রকমের ফলমূল‚ মিষ্টি আর ডেজার্ট সাজানো। তবে অত শত রাজকীয় খাবারের দিকে না তাকিয়ে মৌ‚য়ের নজর গেল একটু আগে শাশুড়ি আম্মা যে খাবারের প্লেটটা তাকে দিতে চেয়েছিলেন সেটার দিকে।
প্লেটের ওপর ঢাকা দেওয়া ছিল। ঢাকনাটা তুলতেই মৌয়ের মনটা জুড়িয়ে গেল‚ আস্ত একটা চিকেন লেগ পিস। চিকেন লেগ পিস মৌ’য়ের বরাবরই মারাত্মক দুর্বলতা। বাপের বাড়িতে এই লেগ পিস নিয়ে কত যুদ্ধ হয়েছে। মেহেরে’র ভাগের লেগ পিসটাও সে কতবার পটিয়ে-পাটিয়ে নিজের পাতে তুলে নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। খুশিতে মৌ’য়ের চোখ চকচক করে উঠল। খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত যাওয়ারও তর সইল না তার। কিচেন রুমের মেঝেতেই ধপাস করে বসে পড়ল সে। তারপর কোনো রাজকীয় ভব্যতার তোয়াক্কা না করে দুই হাত লাগিয়ে তৃপ্তি ভরে চিকেন আর ভাত সাবাড় করতে লাগল। খাওয়া শেষ করে একটা স্বস্তির পেল মৌ। নিজের বাপের বাড়ি হলে হয়তো প্লেটটা ওখানেই ফেলে রেখে চলে যেত কিন্তু আজ আর সেই রিস্ক নিল না। নতুন শ্বশুরবাড়ি বলে কথা। প্লেটটা যত্ন করে ধুয়ে একদম নির্দিষ্ট স্থানে উপুড় করে রেখে দিল। তারপর তৃপ্তি ভরে এক গ্লাস পানি খেয়ে যেই না ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক তখনই ওপরের সিঁড়ি বেয়ে নামছিল উজান। চোখে-মুখে তার রাজ্যের বিরক্তি আর ক্লান্তি মাখানো। নিজের এসি রুম আর নরম বিছানা ছাড়া উজানে’র অন্য কোথাও মোটে ঘুম হয় না। অথচ আজ এই আপদ মেয়েটার চক্করে তাকে নিজের রুম ছেড়ে পুরো বাড়ি টো টো করতে হচ্ছে সামান্য একটু ঘুমের আশায়। একটু আগে ছাদে গিয়েছিল ঠান্ডা বাতাসে ঘুমাতে কিন্তু সেখানকার মশার দল কামড়ে তার পিঠের চামড়া তুলে ফেলার দশা করেছে। অতিষ্ঠ হয়ে শেষমেশ ড্রয়িং রুমের সোফাটায় ঘুমানোর উদ্দেশ্যে নিচে নামছিল সে।
হঠাৎ কিচেন রুমের খোলা দরজার দিকে তাকাতেই উজানে’র পা দুটো জমে গেল। আবছা আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছে একটা ছায়ামানব দাঁড়িয়ে আছে। যে পুরো কিচেন রুম জুড়ে সন্দেহজনকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝরাতে এই বিশাল বাড়িতে চোর ঢোকার আশঙ্কায় উজানে’র গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। চোরটাকে সাইজ করার জন্য সে নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করল। তারপর পা টিপে টিপে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে কিচেন রুমের দিকে এগোতে লাগল। মনে মনে উজান আওড়াল‚
“উজান চৌধুরীর বাসায় চুরি। এত বড় সাহস? দাঁড়া ব্যাটা চোর আজ তোর একদিন কি আমার যে কয়দিন লাগে। তোকে আজ মেরেই তক্তা বানাব।
উজান আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পেছন থেকে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল। মৌ কিছু বুঝে ওঠার আগেই উজান তার শক্ত হাত দিয়ে মৌ’য়ের মুখ চেপে ধরল। আকস্মিক এই হামলায় মৌ’য়ের জান প্রায় কবজ হওয়ার দশা। সে দুই হাত-পা ছুড়ে জানপ্রাণ দিয়ে ছটফট করতে লাগল কিন্তু জিমনেশিয়ামে যাওয়া উজানের পেশিবহুল হাতের শক্তির কাছে সে নিছক এক পুতুল। মৌ নিজের মুখটা ছাড়ানোর জন্য উন্মাদের মতো মাথা ঝাঁকাতে লাগল কিন্তু মুখ চাপা থাকায় শুধু অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ বের হলো।
"উমমম উমমম।
উজান রেগেমেগে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে আওরাল‚
“চোরের বাচ্ছা চোর তোর এত বড় কলিজা যে তুই উজান চৌধুরীর ড্রয়িং রুম পার হয়ে সোজা কিচেন রুমে চুরি করতে এসেছিস? আজ তোকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো। ইফাত‚ ভাইয়া কই তোমরা?
কথাটা শেষ করার আগেই চোরকে বাগে আনতে উজান নিজের ডান পা দিয়ে মৌ’য়ের পায়ে একটা জোরদার ল্যাং মারল। বেচারা মৌ আচমকা পায়ে আঘাত পেয়ে ব্যথায় আর আতঙ্কে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন দেখল কোনো লাভ হচ্ছে না। তখন উজান আরও বেশি গলা ফাটিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল।
“আম্মু আব্বু তাড়াতাড়ি নিচে এসো। দেখে যাও আমাদের কিচেন রুমে চোর ঢুকেছে। চোর... চোর... চোর।
উজানে’র এই গগনবিদারী চিৎকার শুনে মৌ’য়ের মাথায় রাগের রক্ত চড়ে গেল। অপমানে আর রাগে অন্ধ হয়ে মৌ আর কোনো উপায় না পেয়ে উজানে’র মুখের সামনে থাকা হাতের তালুতে নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল। ব্যথায় আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল উজান। কামড়ের চোটে হাতটা এক ঝটকায় আলগা হয়ে যেতেই মৌ নিজেকে মুক্ত করে নিল। এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে শরীরের সমস্ত শক্তি পায়ের পাতায় এনে সে উজান’কে একটা লাথি মারতে গেল। উদ্দেশ্য ছিল উজানের পায়ে লাথি মারা। কিন্তু তাড়াহুড়োয় নিশানা একদম ভুল হয়ে গেল! মৌয়ের শক্ত পায়ের লাথিটা সটান গিয়ে লাগল উজানে’র শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় একদম মেইন পয়েন্ট বরাবর।
"শাউ*য়্যার নাতি ছাড়। আমি চোর নয় তোর বিয়ে করা বউ লাগি বউ।
হাঁপাতে হাঁপাতে চেঁচিয়ে উঠল মৌ। লাথিটা লাগার সঙ্গে সঙ্গেই উজানে’র চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের সমস্ত রঙ উবে গেল। ব্যথায় পুরো শরীর কুঁকড়ে সোজা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দুই হাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরে ব্যথায় তার কথা ফোটাই দায় হয়ে পড়েছে। এতক্ষণে মগজে আলো ঢুকল তার। যাকে সে এতক্ষণ 'চোরের বাচ্চা চোর' বলে উত্তম-মধ্যম দিচ্ছিল। সে অন্য কেউ নয়‚ এই বিকেলেই ধুমধাম করে বিয়ে করে আনা তার অর্ধাঙ্গিনী! উজান ব্যথায় নীল হয়ে‚ আহত ও করুণ কণ্ঠে মরণ আর্তনাদ করে উঠল„
“মাবুদ গো এই মেয়ে আমার জীবনে লাল বাতি জ্বালিয়ে দিলো। আপন বউ'কে পাওয়ার আগেই আমার বংশ নিরবংশ করে দিল। এই খাচ্ছুনি মেয়েকে তোমার কাছে তুলে নাও।
সঙ্গে সঙ্গেই আবারও উজানে’র পায়ে সজোরে আরেকটা লাথি বসাল মৌ। মাথা নিচু করে দুহাতে কোমর গুঁজে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।
"গোলামের পুতের শখ দেখো। পিরিত করে বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করতে পারলাম না‚ আর এই বুড়ো খবিশ বলছে আমাকে তুলে নিতে? তোকে তো....
বলতে বলতেই মৌ উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। আপনা-আপনিই তার মুখ হাঁ হয়ে গেল‚ চোখ দুটো কপালে উঠল। ঘাড় কাত করে সে উজানে’র দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন কোনো এলিয়েন দেখছে। ততক্ষণে উজানে’র চিৎকার-চেঁচামেচিতে ড্রয়িং রুমে বাসার একে একে সবাই হাজির হয়ে গেছে। মৌ একদৃষ্টিতে উজানে’র দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই মেহের দৌড়ে এসে তাকে পেছন থেকে ধরে ফেলল। সবার সামনে নিজের ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখে বাড়ির কর্তা আরিফুল চৌধুরী বাজখাঁই মেজাজে গর্জে উঠলেন‚
"এই ছেলে তোর লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই? তোদের জন্য বাসর ঘর সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া হলো আর তুই সেখানে না থেকে মাঝরাতে চোর চোর বলে চিৎকার করে পুরো ড্রয়িং রুম মাথায় তুলছিস। চ্যালাকাঠের বাড়ি খাওয়ার খুব শখ হয়েছে তাই না? চুপচাপ বউমাকে নিয়ে নিজের রুমে যা।
বাবার কথা শুনে উজান ব্যথায় দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে উঠল‚ “আমার লজ্জা নেই‚ না? তোমার ওই আদরের বউমাকে একবার জিজ্ঞেস করো ও এইমাত্র আমার সাথে কী কী করেছে। এই পুঁচকে বিড়ালের বাচ্চার লজ্জার 'ল'-ও নেই। মুখের ভাষার কী ছিরি! একটা আস্ত ইডিয়েট।
আরিফুল চৌধুরী ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে বললেন‚ "তুই একদম চুপ কর। আমার বউমা এক্কেবারে লক্ষ্মী ও ভালোই আছে। তুই নিজে খারাপ‚ তোর চৌদ্দ গুষ্টি খারাপ।
বাবার মুখে নিজের বংশের বদনাম শুনে উজান কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল‚ “লে হালুয়া। নিজের গুষ্টিকে খারাপ বলতে যার একটুও দ্বিধা হয় না অথচ এই বজ্জাত বউমাকে কিচ্ছু বলা যাবে না। পৃথিবীর এক নম্বর পক্ষপাতী শ্বশুর তুমিই হবে ড্যাড।
আরিফুল চৌধুরী কাঁচুমাচু হয়ে খানিকটা ভাব নিয়ে বললেন, "তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তুই চোর চোর বলে ওভাবে চিৎকার করছিলি কেন? আগে সেটা বল?
ঠিক তখনই ইফাত পা টিপে টিপে উজানে’র কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল‚ "দোস্ত সব বুঝলাম। কিন্তু তুই বাসর ঘরে রোমাঞ্চ না করে মাঝরাতে এখানে এসে এভাবে টাইম ওয়েস্ট কেন করছিস? আমি তোর জায়গায় হলে তো এতোক্ষনে তোকে চাচা বানানোর প্ল্যানিং কবেই শুরু করে দিতাম।
ইফাতের এই রসিকতায় উজান রক্তচক্ষু মেলে তাকাতেই ইফাত ভয়ে গুটিয়ে গেল। দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করে সে আরিয়ানে’র পাশে গিয়ে দাঁড়াল। উজান আগের মতোই চোখ-মুখ শক্ত করে বাবার প্রশ্নের উত্তর দিল, “কেন চিৎকার করছিলাম? এই পুঁচকে বিড়ালের বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করো! মাঝরাতে চোরের মতো পুরো বাসা জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। আমি যেই চোর ভেবে একে ধরতে গিয়েছি ঠিক তখনই ও আমার বংশের বাতিতে লাথি মেরে দিয়েছে।
আচমকা রাগের মাথায় মুখ ফস্কে একদম খাঁটি সত্য কথাটি বের হয়ে আসায় উজান দ্রুত নিজের মুখ চেপে ধরল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। তার এমন অদ্ভুত উত্তর শুনে আরিয়ান‚ ইফাত‚ তুবা সহ মেহেরও আর নিজেদের সামলাতে পারল না সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসির শব্দের মাঝে ইফাত হঠাৎ ঘাড় বাঁকিয়ে মেহেরে’র দিকে তাকাল। মেয়েটা এই বাড়িতে আসার পর থেকে একটুও হাসেনি‚ সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে ছিল। কিন্তু এখন তার মুখের এই খিলখিলে হাসিটা এক কথায় মাশাআল্লাহ! দেখতে বড্ড সুন্দর লাগছে। আচমকা ইফাতে’র গভীর চোখের দিকে নজর পড়তেই মেহেরে’র হাসি চট করে থেমে গেল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। ততক্ষণে আরিয়ান নিজের নাক সিঁটকে উজান’কে টিটকারি মেরে বলল‚
"ভাই তোর বংশের বাতি এখনো ঠিকঠাক আছে নাকি....
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
August 15, 2026 10:51 pm
পর্ব— ০৩
"ভাই তোর বংশের বাতি এখনো ঠিকঠাক আছে নাকি এক লাথিতে সোজা চান্দের দেশে চলে গিয়েছে?
আরিয়া’নের এই কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। বাড়ির সবার এই কাণ্ড দেখে ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া উজান একদম তাজ্জব বনে গেল!
আর এদিকে এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও মৌ এখনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোভাতুর দৃষ্টিতে উজানে’র দিকে তাকিয়ে ছিল। তার এভাবে তাকিয়ে থাকার আসল কারণ ড্রয়িং রুমের বাকিরা না বুঝলেও‚ মেহের কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। মৌ’য়ের এই অস্বাভাবিক আর হাভাতের মতো চাহনিতে উজান নিজেই বেশ বিরক্ত হলো। সে চরম গম্ভীর স্বরে আওড়াল‚
“এই স্টুপিড ওভাবে হা করে তাকিয়ে আছো কেন?
মৌ এবার ঝট করে মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো সরু করে ফিসফিসিয়ে বলল‚ "জানু আমি কি সত্যি ঠিক দেখছি রে? এই বুড়ো খবিশ ওহ্ সরি‚ টমেটো... ধুররর। এই প্রফেসর সাহেব আমার আসল বর?
মেহের মনে মনে নিঃশব্দে হাসল। এই পাগল মেয়েটার কথার ধরন এমন কেন‚ তার কারণ মেহেরে’র চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে 'হ্যাঁ' বলতেই মৌ খুশিতে একেবারে উৎফুল্ল হয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল।
"জানু জানু জানু আমার ২৭৫ নম্বর ক্রাশ এখন আমার নিজের বর? আব্বাজান শেষমেশ আমার এই ক্রাশটার সাথেই আমার বিয়ে দিয়েছে? ইয়াহু এখন তো আমার খুশিতে নাগিন ড্যান্স দিতে ইচ্ছে করছে। নাগিনী নাগিনী....
এই বলেই মৌ কারও তোয়াক্কা না করে নিজের মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রয়িং রুমের মাঝখানেই কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগল। তার এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে বাড়ির সবার চোখ চড়কগাছ! সবাই বিস্ময়কর দৃষ্টিতে এই নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছে‚ কেউ ঠিক করে ঘটনা বুঝে উঠতে পারছে না। পাত্র না দেখেই এক প্রকার জেদ আর অভিমান করে উজান’কে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল মৌ। তার বাবা বিয়ের আগে বারবার ছেলের ছবি দেখতে বললেও সে রাগে দেখেনি। আর মেহের সবটা জেনে-শুনেও মৌ’কে একটা বিশাল সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য সত্যিটা গোপন রেখেছিল।
উজান’কে মৌ প্রায় দুই বছর ধরে চেনে। তবে সামনাসামনি চেনা নয়‚ ফেসবুকে উজানে’র একটা ড্যাশিং ছবি দেখেই সে তার ওপর মারাত্মক ক্রাশ খেয়েছিল। আর উজানে’র ওপর ক্রাশ খাওয়ার সংখ্যাটা ছিল ঠিক ২৭৫ নম্বর! দিনে যে কত শ' জনের প্রতি মৌ ক্রাশ খায়’ তার হিসাব সে নিজেও জানে না। তবে বাকিদের নিয়ে সে মোটেও সিরিয়াস না হলেও‚ উজান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফেসবুকে উজান‚কে সে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ফলো করে। উজানে’র এমন কোনো পোস্ট ছিল না‚ যেখানে গিয়ে মৌ সবার সামনে 'আই লাভ ইউ' বলে কমেন্ট করেনি। কোনো মেয়ে যদি ভুল করেও উজানে’র ছবিতে একটা 'লাভ' ইমোজি বা প্রশংসার কমেন্ট করত মৌ ডিরেক্ট সেই মেয়ের ইনবক্সে গিয়ে চুলোচুলি আর ঝগড়া বাধিয়ে দিত।
এই দীর্ঘ দুই বছরে উজানে’র সাথে তার মাত্র একবারই কথা হয়েছিল। যখন উজান বিরক্ত হয়ে টেক্সট করেছিল। কেন মৌ সবার সাথে ঝগড়া করে। এরপর মৌ শত শত মেসেজ দিলেও উজান আর কোনোদিন তা সিন পর্যন্ত করেনি। মৌ এখনো মনের সুখে নেচেই চলেছে। মেহের তাকে টেনে ধরে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল‚
"মৌ প্লিজ এবার থাম বইন। সবাই হাঁ করে দেখছে তোকে!
"দেখুক তাতে আমার কী? ফাইনালি আমি আমার ২৭৫ নম্বর ক্রাশকে পার্মানেন্টলি পেয়ে গিয়েছি‚ আজ আমি নাচবই।
মৌ এতটাই এক্সাইটেড যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফুল চৌধুরী ওরফে নিজের শ্বশুরের হাতটাই খপ করে ধরে গোল হয়ে নাচতে শুরু করল এবং সাথে তাল মিলিয়ে গাইতে লাগল।
"ধুম্মা চলে ধুম্মা চলে উজানে’র নানি খ্যাতার তলে। মূলা খাইয়া বোম মারে। লালা লা লা লায়য়য়য়য়....
নতুন বউয়ের মুখে এমন অখাদ্য আর অদ্ভুত মার্কার গান শুনে উজান হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা! সে নিজের বাবা-মায়ের দিকে চরম কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। উজান বরাবরই খুব গম্ভীর আর কম কথার মানুষ অথচ এই আজব বিয়ের চক্করে পড়ে আজ এক রাতেই তাকে জীবনের সবচেয়ে বেশি কথা বলতে হয়েছে। ছেলের এই রাগান্বিত আর থমথমে ফেস দেখে মা মৌসুমী চৌধুরী একটু ভয় পেয়ে এগিয়ে এলেন এবং সান্ত্বনার সুরে বললেন‚ "বাবা এমন করে রাগ নিয়ে তাকাচ্ছিস কেন? মেয়েটা কিন্তু মনে মনে অনেক ভালো রে।
“ভালো মাই ফুট। একটা পাবনা পাগল গারদ থেকে পালিয়ে আসা বিড়ালের বাচ্চার সাথে তোমরা আমাকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দিয়েছ। সে নিজে তো আস্ত একটা পাগল সাথে আমাকেও আজ রাতারাতি পাগল বানিয়ে ছাড়বে। আমার সাথে সাথে আমার নানির গুষ্টিও উদ্ধার করে ছাড়ল‚ ডিসগাস্টিং! এই স্টুপিড মেয়ে যেন ভুলেও আজ আমার রুমে না আসে‚গট ইট?
এই বলেই উজান চরম রাগে গজগজ করতে করতে বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। উজান চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মৌ’য়ের নাচের ভূত মাথা থেকে নামল। সে চারদিকে তাকিয়ে উজান’কে না দেখে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ "শ্বশুর আব্বা আমার হ্যান্ডসাম প্রফেসর সাহেব কই গেল?
আরিফুল চৌধুরী ততক্ষণে মৌ’য়ের এই ঝোড়ো হাওয়ার পাল্লায় পড়ে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তিনি ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে নিজের কপাল মুছতে লাগলেন। মৌ এবার সোজা শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোমর বাঁকিয়ে বলল‚ "এই শাশুড়ি আম্মা আমার বরটা হুট করে কই পালাল?
মেহের এবার আর সহ্য করতে না পেরে এক প্রকার জোর করে টেনে মৌ’কে আড়ালে নিয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু করে ধমকের সুরে বলল‚ "বইন তুই এসব কী বলছিস? মাথা ঠিক আছে তোর? এটা আমাদের বা ফুপিদের বাসা নয়। এটা তোর শ্বশুরবাড়ি ‚ প্লিজ তোর এই বাচ্চামো এবার বন্ধ কর। আমি বুঝতে পারছি তুই তোর ক্রাশকে বর হিসেবে পেয়ে কতটা হ্যাপি কিন্তু তোর এই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে বাড়ির সবাই তোকে অলরেডি পাগল ভাবতে শুরু করেছে। আর এত 'বর বর' করতে হবে না। সে নিজের রুমে গেছে। এখন তুইও সোজা নিজের রুমে গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড় আর একটা কথাও যেন তোর মুখ থেকে না বের হয়।
মেহেরে’র এমন বাঘা আর রাগী দৃষ্টি দেখে মৌ এবার কিছুটা দমে গেল। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে একটা কিউট হাসি দিল। তারপর ভারী বেনারসি শাড়িটা দু-হাতে আলতো করে উঁচু করে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে পেছন ফিরে চেঁচিয়ে বলল‚ "শাশুড়ি আম্মা মেনি মেনি থ্যাংকস আপনার এই ড্যাশিং‚ হ্যান্ডসাম ছেলেকে আমার কপালে জুটিয়ে দেওয়ার জন্য। কাল সকালে আমার আব্বাজানকে ফোন দিয়ে একটু বলে দিয়েন‚ তার মেয়ে এই বিয়েতে বেজায় খুশি হয়েছে। আব্বাজানকে মন থেকে একরাশ আই লাভ ইউ!
আর এক মুহূর্তও সেখানে দেরি করল না মৌ‚ বরের রুমে যাওয়ার জন্য শাড়ি সামলে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। এদিকে ড্রয়িং রুমে বাকিরা সবাই হা হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
রুমে ঢুকেই আচমকা থমকে গেল মৌ। পুরো চারদিক চোখ বুলিয়ে দেখল উজান রুমে নেই। মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে গেল। সে ভাবল‚ ড্রয়িং রুমের ওই তুলকালাম কাণ্ডের পর রাগ করে উজান হয়তো আবারও রুম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। যেহেতু এই বিশাল রাজপ্রাসাদ সম্বলিত বাড়ির কোনো কিছুই তার চেনা নয়‚ তাই সে আর একা একা রুম থেকে বের হওয়ার সাহস পেল না। অভিমানে ঠোঁট উল্টে‚ গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে ধপাস করে বিছানার মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ল সে।
এর কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের দরজা খুলে উজান কোমরে একটা সাদা টাওয়াল জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। তার ভেজা চুল আর মাথা থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে। ড্রয়িং রুমের ওই চরম অপমানের পর নিজের মাথা ঠান্ডা করতে মাঝরাতেই তাকে শাওয়ার নিতে হয়েছে। কিন্তু বের হয়েই যখন সে বিছানার ওপর লাল টুকটুকে বেনারসি পরা মৌ’কে ওভাবে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখল‚ তখন রাগে তার কপালের রগগুলো দপদপ করে ফুলে উঠল। মাথাটা যেন মুহূর্তের মধ্যে ঝিমঝিম করে উঠল। যে বিয়েটাকে সে মনের ভুলেও স্বীকার করে না অথচ সেই বিয়ের মেয়েটা তার বিছানা দখল করে বসে আছে। উজান আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। বাজখাঁই মেজাজে চেঁচিয়ে উঠে বলল„
“হেই স্টুপিড গার্ল তুমি এখানে কেন এসেছ? এক্ষুনি আমার রুম থেকে বের হও।
এতক্ষণ পর নিজের ক্রাশ-মার্কা জামাইয়ের কণ্ঠস্বর পেয়ে মৌ’য়ের ভেতরের সব দুঃখ এক পলকে উধাও। খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে সে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে সোজা উজানে’র সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এমনিতেই মৌ’কে দেখে উজানের’ পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল। তার ওপর মেয়েটা এখন এক হাত দূরত্বের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। উজান আবারও সিংহের মতো ধমকে উঠল।
“স্টুপিড গার্ল কথা বলছ না কেন? হোয়াই আর ইউ সাইলেন্ট?
মৌ সেদিকে পাত্তাই দিল না। উজানে’র ভেতরের রাগ না দেখে সে তার ভেজা চুলের সুঠাম অবয়ব দেখে মুগ্ধ হয়ে দুই গালে হাত দিয়ে আলতো করে আওড়াল‚ "সো কিউট!...
মৌ’য়ের মুখে এই কথা শুনে উজানে’র মুখের রঙ পাল্টে গেল। মেয়েটাকে সে জানপ্রাণ দিয়ে ধমকাচ্ছে অথচ সে রাগ গায়ে মাখা তো দূর‚ উল্টো তাকে দেখে ফ্লার্ট করছে! এই অবাধ্য মেয়ের সাথে কথা বলাই বৃথা। উজান নিজের বিরক্তি চেপে ধরে নিজেই একপাশ হয়ে সরে দাঁড়াল। এই ডানপিটে মেয়েটার চক্করে মাঝরাতে তাকে ঠান্ডা পানিতে শাওয়ার নিতে হয়েছে। সে আর নতুন করে ঝগড়া করে এনার্জি নষ্ট করতে চায় না। সে ক্যাবিনেট থেকে দ্রুত একটা ব্ল্যাক টি-শার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিল।
কিন্তু মৌ এখনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে তাকিয়েই আছে। হঠাৎ করেই সে ঘোর কাটিয়ে উজান নিজের রুমের ভেতরে যেদিকে পা বাড়ায়‚ মৌও ঠিক ছায়ার মতো তার পিছু পিছু সেদিকেই যায়। উজান ডানে গেলে মৌ ডানে যায়‚ উজান বাঁয়ে গেলে মৌ বাঁয়ে। তা দেখে রাগে একেবারে বোম ফাটল উজানের। সে ঝট করে পেছন ফিরে কটমট করে তাকিয়ে গর্জে উঠল‚
“ইডিয়টের মতো আমার পিছু পিছু ঘুরছো কেন? প্রব্লেম কী তোমার?
মৌ শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে একগাল হেসে বলল‚ "আরে ক্রাশ বর আপনি এখনো আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মৌ ‚মৌ ‚'তাসফিয়া মৌ! যে আপনাকে ফেসবুকে রোজ কম হলেও একশোটা করে মেসেজ পাঠাতাম। ভুলেই গেলেন আমায়?
কথাটা কান দিয়ে মগজে পৌঁছাতেই উজান যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে চোখ দুটো সরু করে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল। মৌ’কে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিজের কপাল চাপড়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল‚ “শেষমেশ একটা স্টুপিড গার্লই আমার কপালে জুটল। তোমার ওই পাগলামির জন্য ফ্রেন্ড সার্কেলের কারও সাথে আমি লজ্জায় কথা বলতে পারি না। ফ্রেন্ডলিস্টের যার সাথেই আমার ছবি দেখেছো‚ তার ইনবক্সে গিয়েই তুমি তুমুল ঝগড়া বাধিয়েছ! আর এখন তুমি পার্মানেন্টলি আমার রুমে বউ সেজে চলে আসলে?
মৌ এবার লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতা করলো। শাড়ির পাড় দিয়ে মুখটা সামান্য আড়াল করে মাথা নিচু করে বলল, "আমি ওদের সাথে এমনি এমনি ঝগড়া করেছি নাকি? ওই ডাইনিগুলো কেন আপনাকে কমেন্টে আর ইনবক্সে ওভাবে লাভ ইমোজি দেবে? আমার ক্রাশের দিকে অন্য কেউ তাকাবে এটা আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না।
মৌ’য়ের লজিক শুনে উজান নিজের চুলে মুঠি টেনে ধরে চিৎকার করে বলল‚ “জাস্ট শাট আপ!
ব্যাস‚ বরের ধমক শুনে মৌ লক্ষ্মী মেয়ের মতো চট করে নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে মুখ বন্ধ করে ফেলল। উজান নিজের মাথা চেপে ধরে একটু শান্তির খোঁজে বেলকনির দিকে গেল। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়‚ সেখানে গিয়েও বিপদ তার পিছু ছাড়ল না। মৌ ঠিক ছায়ার মতো সেখানেও তার পেছনে এসে হাজির হলো। উজান এবার চরম গম্ভীর স্বরে দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে আওরায়‚ “হোয়াই আর ইউ ফলোইং মি এগেইন?
মৌ মুখে আঙুল রেখেই চোখ দুটো বড় বড় করেই বলল‚ "আপনি কত সুন্দর।
উজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গর্জন তুলল। “এক থাপ্পড় দিয়ে তোমার সব কটা দাঁত ভেঙে দেবো। বয়স কত তোমার‚ হ্যাঁ? কোন ক্লাসে পড়?
মৌ নিজের বুক টান টান করে বেশ দেমাকের সাথে উত্তর দিল„ "আমার বয়স সতেরো। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
উজানে’র চোখ জোড়া এবার কপালে উঠল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল‚ “পুঁচকে একটা মেয়ে।
মৌ নিজের কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে মুখটা বেঁকিয়ে তেজ দেখিয়ে প্রতিধ্বনিত করে। "আমি মোটেও পুঁচকে নই হুহ! আমি অনেক বড় হয়েছি।
উজান সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। “তা দেখেই বুঝতে পারছি। তা কোন গ্রুপ নিয়েছো?
মৌ খানিকটা ভান নিয়ে উওর দিল। "এটা আবার কেউ জিজ্ঞেস করে নাকি? আমি খুবই ইনটেলিজেন্ট স্টুডেন্ট তাই সায়েন্স নিয়েছি।
“তাহলে নিউটনের প্রথম সূত্রটা বলো?
মৌ যেন আকাশ থেকে পরলো। পড়াশোনায় সে বরাবরই ডাব্বা। তবুও সে সায়েন্স ছাড়া কোনোটি নেবে না তাই কলেজে গিয়েও সায়েন্স নিয়েছে। সে পদার্থ বিজ্ঞান কেন? শুধু বিজ্ঞান পড়তে গিয়েও দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম আর এই লোকটা তাকে নিউটনের সূত্র ধরছে ভাবা যায়। মৌ উপরে তাকিয়ে দু-হাত দিয়ে মোনাজাত ধরে বলতে লাগলো।
"মাবুদ তুমি আমাকে কোনো জালিমের হাতে তুলে দিলে? বাসর রাতে রোমাঞ্চ না করে কোন দেশের ইবলিশ শয়তানের সূত্র বলতে বলছে। এর থেকে তুমি আমায় তুলে নাও।
উজান আড়ালে মুচকি হাসল। মেয়েটার ওপর সে চরম বিরক্তও হচ্ছে‚ আবার তার এমন পাগলাটে কথাবার্তায় না হেসেও পারছে না। ঠিক তখনই মৌ নিজের ঠোঁট টিপে ধরে ফিসফিসিয়ে হাসতে হাসতে আচমকা বলে উঠল‚
"আই লাভ ইউ প্রফেসর সাহেব...!
হুট করে এমন বাণ শুনে উজান খকখক করে কাশতে শুরু করল। নিজের হ্যান্ডসাম লুক আর প্রফেশনের কারণে জীবনে সে মেয়েদের কাছ থেকে অনেক প্রপোজাল পেয়েছে সত্যি কিন্তু বাসর রাতে ওভাবে মুখের ওপর হুটহাট কেউ প্রপোজ করতে পারে‚ তা তার জানা ছিল না। তার ওপর এই পিচ্চি মেয়েটার বয়স তার চেয়ে প্রায় অর্ধেক। উজান ভাবল‚ এখন যদি সে একটুও স্বাভাবিকভাবে কথা বলে তবে এই অবাধ্য মেয়েটা মাথায় উঠে নাচবে। তাই সে নিজের নাক সিঁটকে চরম রাগান্বিত কণ্ঠে ধমকে উঠল।
“চুপ কর ইডিয়েট। নাক টিপলে যার দুধ বের হয় সে কিনা ভালোবাসি বলে। শোনো মেয়ে‚ পিচ্চি পিচ্চির মতো থাকবে নয়তো বাসর রাতে ম্যাথ করাবো।
এতক্ষণ সব ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু এই গভীর রাতে রোমান্সের বদলে হুট করে 'ম্যাথ' এর কথা শুনে মৌ’য়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! গণিতের নাম শুনলেই তার গায়ে জ্বর আসে। সে দ্রুত নিজের সব কটা দাঁত কেলিয়ে একটা কাঁচুমাচু হাসি দিয়ে বলল‚ "এই না না আমি তো জাস্ট এমনি ইয়ার্কি করেছি! ম্যাথ করতে যাবো কোন দুঃখে তবে....
মৌ নিজের কথা শেষ করার আগেই উজান গটগট করে পা ফেলে সোজা রুমের ভেতর চলে গেল। মৌ বাইরে দাঁড়িয়ে মুখটা বাঁকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল।
"খবিশ একটা। শেয়ালের সামনে আস্ত একটা মুরগি ঘুরঘুর করছে অথচ তার চোখে পড়ছে না। যেদিন নিজে পিরিত করতে আমার পেছনে ঘুরঘুর করবে‚ সেদিন তোকে লাথি মেরে সোজা উগান্ডায় পাঠিয়ে দেবো হুহ।
উজানে’র পিছু পিছু মৌও রুমে ঢুকল। সে এবার উজানে’র সামনে গিয়ে ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু উজান তার দিকে এক পলক তাকানোরও প্রয়োজন মনে করল না। সে বেড থেকে নিজের একটা বালিশ টেনে নিল। তারপর মৌ’য়ের পাশ কাটিয়ে সোজা গিয়ে কোণার সোফাটায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করার আগে সে বরাবরের মতো গম্ভীর স্বরে শেষ হুঁশিয়ারি দিল।
“এই স্টুপিড গার্ল! তুমি ওই বিশাল বিছানায় ঘুমাবে আর আমি এখানে সোফায়। রাতে যদি কোনো কারণে আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছ‚ তবে একটা থাপ্পড় দিয়ে মাঝরাতেই রুম থেকে বের করে দেবো মাইন্ড ইট! না তুমি আমার কেউ হও‚ আর না আমি তোমার। সো আমার থেকে সবসময় অন্তত দশ হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলবে‚ বুঝতে পেরেছ?
মৌ উজানে’র দিকে মুখটা কুঁচকে এক বিশ্রী ভেংচি কাটল। কিন্তু উজান হুট করে চোখ খুলে যেই না তার দিকে একটা রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল‚ মৌ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে এক দৌড়ে বিছানায় গিয়ে কমফোর্টারটা সারা গায়ে জড়িয়ে নিল। সারাদিনের ধকলের পর বিছানার নরম স্পর্শ পেতেই মৌ মুহূর্তের মধ্যে গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
কেমন হলো পর্বটা„ 🙃
August 15, 2026 10:51 pm
পর্ব— ০৪
ভোরের মৃদু আলো এসে চোখে-মুখে পড়তেই বিরক্তি নিয়ে ঝট করে চোখ বন্ধ করে নিল উজান। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে মাথাটা চেপে ধরল সে। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। ঠিক তখনই শরীরের ওপর কেমন যেন একটা অতিরিক্ত ভার অনুভব করল উজান। চোখ মেলে সামনে তাকাতেই সে চমকে উঠল‚ তার হৃৎস্পন্দন যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল! সামনে এ কী দৃশ্য। মৌ তাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সোফার এক চিলতে জায়গাতেই মেয়েটা কখন যে এসে তার ওপর এভাবে ঘুমিয়ে আছে উজান টেরই পায়নি। রাগে উজানে’র ফর্সা মুখ মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। সে বিদ্যুৎ গতিতে মৌ’কে নিজের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
হুট করে ঘুমের ঘোরে এমন অতর্কিত ধাক্কা পাওয়ায় ঘুমন্ত মৌ’য়ের পুরো ব্যাপারটা বুঝতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হলো। সোফা থেকে সটান মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে। শাড়ির আঁচলটা একপাশে লুটিয়ে পড়েছে। মৌ নিজের কোমরটা চেপে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে উজানে’র রাগান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ভোর হতে না হতেই লোকটার কাছ থেকে এমন অমানবিক আচরণ পেতে হবে‚ তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। মৌ কোনো রকমে টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল তবে চোখ থেকে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে আবারও মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে উজান এবার নিজের অজান্তেই বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে তার কোমর ধরে তাকে সামলে নিল। পরক্ষণেই নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বরাবরের মতো বাজখাঁই মেজাজে চেঁচিয়ে উঠল।
“এই বেয়াদব মেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াও। আর তুমি কোন সাহসে মাঝরাতে আমার বুকের ওপর এসে শুয়েছিলে হ্যাঁ? কাল রাতেই তোমাকে কড়া ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না যে ভুলেও আমাকে টাচ করবে না?”
উজানের এমন ধমকের চোটে মৌ’য়ের চোখের সব ঘুম এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে নিজের শাড়িটা টেনেটুনে কোনোমতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একরাশ নির্বাক দৃষ্টি। সোফা থেকে আচমকা শক্ত মেঝেতে ফেলে দেওয়ার কারণে তার কোমরে বেশ চোট লেগেছে‚ প্রচন্ড ব্যথা করছে। কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথা সে মুখ চেপে সহ্য করে নিলেও। সাতসকালে উজানে’র এমন নির্মম ব্যবহার তার মনটাকে তছনছ করে দিল। সে অভিমানী মুখ করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল‚
"এমন করে সবসময় কেন বকেন বলুন তো? আমি কি ইচ্ছে করে আপনার সোফায় এসেছিলাম নাকি? রাতে বাইরে প্রচণ্ড জোরে মেঘ ডাকছিল আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমাদের তো এখন বিয়ে হয়েছে আর আমি তো আপনাকে সত্যি সত্যি অনেক ভালোবাসি। সেই হিসেবে নিজের বরকে একটু জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেই পারি‚ তাই না? এতে এত মহাভারত অশুদ্ধ কী হলো?
উজান তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল‚ “জাস্ট শাট আপ। বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানেই যা ইচ্ছে তাই করবে? লিসেন টু মি কেয়ারফুলি‚ নেক্সট টাইম একদম আমার ধারেকাছে আসার চেষ্টা করবে না। আমি ঘৃণা করি তোমার মতো মেয়েদের। যাদের কাছে ভালোবাসা মানে সস্তা একটা খেলা। যখন ইচ্ছে হলো ইমোজি পাঠালাম‚ আর যখন ইচ্ছে হলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম। আই হেট লাভ অ্যান্ড আই হেট ইউ। তোমাকে আমি কোনোদিন বউ হিসেবে মানি না আর না কোনোদিন মানবো। বুঝতে পেরেছো?
এই বলেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল উজান। তার চলে যাওয়ার দরজার দিকে মৌ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোণটা অশ্রুতে ভরে উঠেছে। মৌ মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। উজান তাকে বউ হিসেবে মানছে না সেটা বুঝল। উজান তার ২৭৫ নম্বর ক্রাশ সেটাও সত্য। কিন্তু তার মানে কি এই যে মৌ উজান’কে সত্যি সত্যি ভালোবাসে না? যদি মনে ভালোবাসা নাই থাকত‚ তবে গত দুটো বছর ধরে উজানে’র পাশে অন্য কোনো মেয়েকে দেখলে মৌ’য়ের বুকে কেন এত তীব্র হিংসা হতো? কেন সে অন্য মেয়েদের সহ্য করতে পারত না? কেন দিনে শত শত মেসেজ করে নিজেকে এভাবে উজানে’র সামনে পাগল প্রমাণ করত? কেন 'ভালোবাসি ভালোবাসি' বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত? এসব কি শুধুই একটা পুঁচকে মেয়ের সাময়িক মোহ নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে খাঁটি গভীর কোনো ভালোবাসা?
মৌ চুপ করে কিছুক্ষণ রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। বাপের বাড়িতে সে বড্ড আদরে‚ রাজকন্যার মতো মানুষ হয়েছে। তাই খুব ছোটখাটো কড়া কথাও তার মনের ভেতর তিরের মতো এসে বিঁধে। তাকে ভেতর থেকে রক্তাক্ত করে দেয়। অথচ পাথরের মতো শক্ত এই উজান চৌধুরী তার সেই নরম ছোট্ট মনটা একটুও বুঝতে পারল না। মৌ নিজের চোখের পানিটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর জোর করে মুখে একরাশ হাসি ঝুলিয়ে নিজের জামা নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। শাওয়ার নেওয়ার পর তার ভেজা চুলগুলো থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরে মেঝেতে পড়ছে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজের চুল আঁচড়ানোর জন্য চিরুনিটা হাতে নিল কিন্তু কিছুতেই তা গুছিয়ে উঠতে পারল না। চুলগুলো তার কোমর অবধি ছড়ানো‚ ঘন কালো কৃষ্ণচূড়ার মতো লম্বা। লম্বা চুল মৌ’য়ের নিজের খুব একটা পছন্দ নয়‚ আর সে নিজে কখনো নিজের চুল বাঁধতেও পারে না। বাপের বাড়িতে তার চুলের সব রকম যত্ন মেহের আর তার ফুপাতো ভাই সাব্বির নিয়ে থাকে। সাব্বির, মেহের আর মৌ একই কলেজে পড়াশোনা করে। যেখানে সাব্বির মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। অভিভাবকের মতো এই দুই পিচ্চি বোনকে সবসময় চোখে চোখে আগলে রাখাই সাব্বিরে’র প্রধান কাজ।
মৌ নিজের অবাধ্য চুল কিছুতেই ঠিক করতে না পেরে চিরুনিটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। ঠিক এর কিছুক্ষণ পরেই উজান গম্ভীর মুখে রুমে ঢুকল। মৌ’কে ওভাবে চুপচাপ শান্ত হয়ে বিছানায় বসে থাকতে দেখে উজানে’র জোড়া ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটার তো একটুও শান্ত হয়ে বসে থাকার কথা নয়! যে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না আসতেই মাঝরাতে এত বড় তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসে থাকে‚ সে অন্তত এতটা শান্ত থাকার পাত্রী নয়।
উজান মৌ’য়ের দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে নিজের মতো করে রেডি হতে লাগল। একটা অফ-হোয়াইট শার্ট পরে সে বাইরে যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত। হঠাৎ করেই মৌ বিছানা থেকে উঠে সোজা উজানে’র সামনে গিয়ে গাল ফুলিয়ে দাঁড়াল। তবে এবার আর উজান রেগে গেল না বরং তার চোখ-মুখের শান্ত রূপ দেখে বেশ শীতল ও নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল‚
কী চাই তোমার?
মৌ চোখের পলক না ফেলে বলল‚ "আমার তো জীবনভর শুধু আপনাকেই চাই। তবে এখন শুধু আমার এই ভেজা চুলগুলো একটু আঁচড়ে দেবেন প্লিজ? আমি নিজে চুল আঁচড়াতে পারি না।
উজানে’র চোখ জোড়া কপালে উঠল‚ “হোয়াটটট? এত বড় হয়েছ অথচ এখনো নিজের চুল আঁচড়াতে পারো না?
মৌ মুখটা একটু বাঁকিয়ে নিলো। "কই বড় হলাম? আপনিই তো আমায় সবসময় পুঁচকে আর বিড়ালের বাচ্চা ভাবেন। তাহলে আমার চুলগুলো একটু ঠিক করে দিন না প্লিজ? আমি মেহেরে’র কাছেই যেতাম, তবে আমার মিষ্টি বোনটা এখন একটু আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তাই ডাকতে ইচ্ছে হলো না। আর জানেন‚ আমার বোনটা গত পাঁচটা বছর ধরে একটা রাতও ঠিক করে ঘুমাতে পারে না। ঘুমাতে গেলেই সেই কালো‚ অন্ধকার দিনটার কথা ওর বারবার মনে পড়ে যায়। তখন ও ভেতরে ভেতরে বড্ড কষ্ট পায় কিন্তু বাইরে কাউকে নিজের কষ্টটা বুঝতে দেয় না। সেই অভিশপ্ত অন্ধকার দিনটার জন্যই মেহের একাধারে নিজের বাবাকে হারাল আর তার কিছুদিন পরই নিজের মা-কেও হারিয়ে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। আমার জানুটা আগে এমন চুপচাপ ছিল না জানেন? ও আগে কত দুষ্টুমি করত‚ সারাক্ষণ হাসত! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ওর জীবনের সব আনন্দ বদলে গিয়েছে। আমার সেই পুরনো জানুটা আর আগের মতো নেই..।
কথাগুলো বলতে বলতে মৌ’য়ের চোখ বেয়ে আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। মৌ’য়ের কথা শুনে উজানে’র মনটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। সে নিজেও বিয়ে বাড়ি থেকে লক্ষ্য করেছে‚ মেহের মেয়েটা ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের। কারও সাথে খুব একটা কথা বলে না‚ সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রাখে। তাকে আর ইফাত’কে দেখলে তো মেয়েটা সোজা দশ হাত দূর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। কিন্তু কেন এমন করে তা উজান নিজেও জানত না। বিয়ের দিন যখন সবাই আলো আর বাজনার মাঝে আনন্দ করছিল্ তখন মেহেরকে সে ছাদের এক কোণায় একা একা বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কান্না করতে দেখেছিল। উজান তখন মেহেরে’র কাছে গিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেও মেহের তাকে এড়িয়ে গিয়ে একটা কথাও বলেনি।
হঠাৎ উজান কৌতূহল সামলাতে না পেরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল‚ “কী এমন হয়েছিল মেহেরে’র লাইফে?
উজানে’র প্রশ্নে মৌ’য়ের এবার ঘোর কাটল। সে বুঝতে পারল আবেগের বশে সে মেহেরে’র গোপন কষ্টের কথা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে। সে উজানে’র দিকে এক পলক তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল‚ "না মানে কিছু না।
উজান বুঝতে পারল মৌ সেই অন্ধকার দিনের কথা আর বিস্তারিত বলতে চায় না তাই সে আর জোরাজুরি করল না। তবে সে আলতো করে মৌ’য়ের হাত ধরে তাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করাল। টেবিল থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা হাতে নিয়ে সে পরম যত্নে মৌ’য়ের ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিতে লাগল। মৃদু বাতাসে মৌ’য়ের অবাধ্য লম্বা চুল গুলো বারবার উড়ে এসে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়ছিল। অথচ আশ্চর্য বিষয় উজানে’র এখন আর বিন্দুমাত্র বিরক্তি লাগছিল না! বরং তার হৃদয়ের গভীর কোণে কেমন যেন এক অদ্ভুত‚ অচেনা অনুভূতির সৃষ্টি হতে লাগল। এই অনুভূতিটা তার জীবনের অন্য বসন্তের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন‚ একদম নতুন।
চুল শুকানো শেষ হলে উজান চিরুনি দিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মৌ’য়ের মাথায় একটি সুন্দর খোঁপা করে দিল এবং আয়নায় মৌ’য়ের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে অবচেতনভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। বরের হাতের সেই কোমল স্পর্শ আর আয়নায় তার মুচকি হাসি দেখে মৌ’য়ের বুকটা ধক করে উঠল। সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা লুকিয়ে দ্রুত পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করে নিচে চলে গেল। আর উজান মৌ’য়ের লজ্জামাখা হাসি দেখে শব্দ করে হাসলো।
—————
————————
সিঁড়ি বেয়ে নিজের অফ-হোয়াইট শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি ফোল্ড করতে করতে নিচে নেমে আসছে উজান। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসা মৌ তার দিকে তাকিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসছে। ডাইনিং টেবিলে তখন শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী পরম আদরে মৌ আর মেহের’কে নিজ হাতে খাবার তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। আজ যেহেতু চাঁদ রাত আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই খুশির ঈদ‚ তাই মেহের আজ বিকেলেই নিজের ফুঁপির বাসায় চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চৌধুরী বাড়ির কেউ তাকে একা একাকী সেই বাসায় ফিরে যেতে দেয়নি। বাড়ির কর্তা আরিফুল চৌধুরী মনে মনে সিদ্ধান্তই নিয়ে রেখেছেন মেহের’কে আর ওর ফুপির বাসায় রেখে কষ্ট দিয়ে পড়াশোনা করাবেন না। এখন থেকে ও এই বাড়িতেই সবার সাথে থাকবে। যেহেতু আরিফুল চৌধুরীদের দুই ভাইয়ের কোনো কন্যাসন্তান নেই তাই ঘরের বউমা তুবা, মৌ আর মেহেরে’র প্রতি তারা এক অন্যরকম পিতৃত্বের টান অনুভব করেন। বাড়ির বড় বউ তুবা একপাশে বসে আগামীকালের ঈদের সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মৌ চট করে শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরীর হাতে একটা আলতো খোঁচা দিল উজান’কে কিছু বলার জন্য। মৌসুমী চৌধুরী মৌ’য়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে মুচকি হেসে উজানকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন‚ "উজান বাবা সকাল সকাল রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
উজান ঘাড় বাঁকিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। মৌ’কে ওভাবে চোরের মতো মুখ টিপে হাসতে দেখে তার মগজে প্রচন্ড রাগ চড়ে গেল কিন্তু মায়ের সামনে সে নিজের রাগ প্রকাশ না করে শান্ত গলায় বলল„
“একটু ভার্সিটি যাচ্ছি আম্মু। কোনো দরকার ছিল?
"দরকার থাকবে না কেন? আজ বাদে কাল ঈদ‚ ঘরের মেয়েদের ঈদের শপিং করিয়ে দিতে হবে না? তুই গিয়ে ওদের সাথে করে শপিংমল থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়।
উজান নিজের বিরক্তি চেপে বলল‚ “সেটা আমাকে বলছ কেন আম্মু? তুমি‚ তুবা ভাবি আছে। তোমরা সবাই মিলে গিয়ে শপিং করে এসো। আমার অনেক কাজ।
মৌসুমী চৌধুরী এবার একটু কড়া গলায় বললেন‚ "আমরা গিয়ে করে আসব মানে কী? চুপচাপ ঘন্টাখানেকের মধ্যে ভার্সিটির কাজ শেষ করে বাসায় চলে আসবি। তারপর তোরা সবাই মিলে একসাথে শপিংয়ে বের হবি। ব্যস‚ এটাই আমার শেষ কথা।
“সিরিয়াসলি আম্মু?
উজান এবার মায়ের ওপর কিছুটা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলল„ “একটা আস্ত আপদকে এমনিতেই তোমরা জোর করে আমার ঘাড়ে তুলে দিয়েছ। এখন আবারও নতুন করে উটকো ঝামেলার জন্য ফোর্স করছ? আমি আগেই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি‚ এইসব শপিং-টপিংয়ের ফালতু ঝামেলার মধ্যে আমি একদমই নেই। আর আজ রাতে বাসায় ফিরতে আমার বেশ দেরি হবে। ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে আমাদের ঈদের আগের রাতের একটা বিশেষ গেট-টুগেদার পার্টি আছে।
মৌসুমী চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন‚ "ঘরে নতুন বিয়ে করা বউ রেখে তুই মাঝরাত পর্যন্ত বাইরে বন্ধুদের সাথে পার্টি করবি?
“আম্মু প্লিজ স্টপ। আমি তোমাদের আর কতবার বলব যে‚ না আমি এই জোরপূর্বক বিয়েটাকে মানি আর না এই ইডিয়ট মেয়েটাকে নিজের বউ বলে স্বীকার করি!
এই বলেই উজান আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মৌ ডাইনিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
"ক্রাশ বর শপিংয়ে না যান ভালো কথা কিন্তু বিকেলে আসার সময় আমার জন্য মেহেদী নিয়ে আসবেন। আমি কিন্তু বিয়ের দিন হাতে মেহেদী ছোঁয়াতেও পারিনি। তবে আজ রাতে অবশ্যই দেবো। আপনি যদি নিজ হাতে মেহেদী এনে না দেন তাহলে আমি কিন্তু এই ঈদে হাত খালি রাখব কিচ্ছু দেবো না।
উজান দরজার কাছে গিয়ে এক পলকের জন্যও মৌ’য়ের দিকে ফিরে তাকাল না। শুধু যাওয়ার আগে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল‚ “যা ইচ্ছে করো‚ আই ডোন্ট কেয়ার!
"সত্যি সত্যি বলছি‚ এনে না দিলে আমি কিন্তু হাতে মেহেদীই ছোঁয়াবো না।
মৌ পেছন থেকে পা দাপাল। কিন্তু উজান ততক্ষণে ধুপধাপ পা ফেলে দেউড়ি পার হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। উজানে’র এমন বেখায়ালি দেখে মৌ এবার শাশুড়ির সামনে গিয়ে রসগোল্লার মতো গাল ফুলিয়ে বসে পড়ল। অভিমানী সুরে বলল‚
"শাশুড়ি আম্মা আমি আগেই আপনাদের ডিক্লেয়ার দিয়ে রাখছি। আপনার ওই খিটখিটে ছেলে যদি আজ বিকেলে আমার জন্য মেহেদী কিনে না আনে‚ তবে আমি কাল ঈদের দিনে কোনো নতুন জামাকাপড় পরব না হুহ!
মৌ-ও আর সেখানে দাঁড়াল না। রাগ করে এক দৌড়ে দোতলার দিকে চলে গেল। মৌসুমী চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ চোখে মেহেরে’র দিকে তাকালেন। ছেলেটা কেন যে এমন অবুঝের মতো ব্যবহার করছে। মেহেরও চিন্তিত মুখে দৌড়ে মৌ’য়ের পিছু নিল।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো‚ আর বিকেল গড়িয়ে ঘুটঘুটে রাত নামল তবুও উজান বাসায় ফিরল না। এদিকে মৌ নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে চরম মুড অফ করে বিছানায় বসে রইল। শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কত অনুনয়-বিনয় করলেন কিন্তু মৌ জেদের বশে দরজা তো খুলেইনি ‚উল্টো এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলেনি। মৌ আজ সারাদিনে নিজের রাগ আর অভিমান চেপে রাখতে না পেরে শাশুড়ির ফোন থেকে উজান’কে কম করে হলেও পঞ্চাশবারের ওপর কল করেছিল। উজান প্রথমবার রিসিভ করে মৌ’য়ের গলার আওয়াজ পেয়েই কেটে দিয়েছিল আর তারপর থেকে ফোনটা পকেটে পুরে রেখেছিল। একবারের জন্যও রিসিভ করেনি। মৌ মেঝেতেই উপুড় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত যখন প্রায় দু'টো তখন উজান অত্যন্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরপায়ে বাসায় ফিরল। কিন্তু সে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই সোফা থেকে বাজখাঁই মেজাজে উঠে দাঁড়িয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠলেন আরিফুল চৌধুরী। বাবার এমন রুদ্ররূপ দেখে উজানে’র পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি কেঁপে উঠল। আরিফুল চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন‚
"বেয়াদব ছেলে আমি কি তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি? যেখানে আজ পর্যন্ত এই বাড়ির কোনো মেয়ে বা বউকে সামান্য কথার আঘাত পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সেখানে তুই আমাদের ঘরের নতুন বউমাকে সারাদিন এভাবে কাঁদিয়েছিস? নিজেকে কী মনে করিস তুই হ্যাঁ? একজন সামান্য ভুল নারী তোর জীবন থেকে চলে গিয়েছে বলে তুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এভাবে আরেকটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বিষিয়ে তুলবি? মেয়েটার বাবার হাত ধরে আমি নিজে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে ওকে আমি নিজের মেয়ের মতো রাজমোহিনী করে রাখব। কখনো কোনো কষ্ট পেতে দেবো না। অথচ তুই আমার সেই আদরের বউমার চোখে আজ ঈদের আগের রাতে অশ্রু ঝরালি?
“ড্যাড...
"একদম চুপ কর তুই। একটা সামান্য মেহেদী এনে দিলে তোর কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো হ্যাঁ? সারাদিন মেয়েটার ওই ফ্যাকাশে আর ক্রন্দনরত মুখের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। সারাদিন কারো সাথে একটা কথাও বলেনি‚ এমনকি রাতে এক লোকমা ভাতও পেটে দেয়নি ও।
বাবার মুখ থেকে মৌয়ের সারাদিন না খেয়ে থাকার কথাটি শোনা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। নিজের অজান্তেই তার নিজের প্রতি এক তীব্র রাগ ও অপরাধবোধ জন্ম নিল। সে মনে মনে যতই মেয়েটাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করুক না কেন কিন্তু দিনশেষে সমাজের আইন আর ধর্মের বাঁধনে এই মেয়েটি তারই বিবাহিতা স্ত্রী। উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা ফেলে আবারও বাসা থেকে বের হয়ে রাতের অন্ধকারের মাঝে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। আরিফুল চৌধুরী রাগান্বিত চোখে ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উজান যখন ফিরে এলো তখন তার একহাতে গুনে গুনে দশটা ব্র্যান্ডের মেহেদীর আর অন্যহাতে ঈদ উপলক্ষে একটি চমৎকার শাড়ি। মেয়েদের শাড়ি বা ড্রেসের ব্যাপারে উজানে’র বিন্দুমাত্র ধারণা নেই‚ তাই মলে গিয়ে নিজের চোখে যে শাড়িটা সবচেয়ে উজ্জ্বল আর সুন্দর লেগেছে সেটাই সে মৌ’য়ের জন্য নিয়ে এসেছে। ধীরপায়ে মৌ’য়ের রুমে লকটা নিজের চাবির ডুপ্লিকেট সেট দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকল উজান। রুমে ঢুকে জিরো ওয়াটের আবছা নীল আলোয় সে দেখতে পেল‚ মৌ অবোধ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট দুটো উল্টে, কমফোর্টর ছাড়া রুমের শক্ত ঠান্ডা মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। কান্না করার কারণে তার চোখের পাতা আর মুখটা বেশ ফুলে গিয়েছে। মৌ’য়ের সেই ফোলা ফ্যাকাশে মুখটা দেখা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। তার নিজের ওপরই নিজের ঘৃণা হতে লাগল।
সে অন্য একজনের ওপর থাকা পুরনো ক্ষোভ ও ঘৃণা উগড়ে দিতে গিয়ে একটা ছোট্ট‚ অবুঝ মেয়ের প্রতি কতটা কঠোর আর নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। একজনের করা ভুলের শাস্তি সে অন্যায়ভাবে আরেকজন নিষ্পাপ মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। উজান শাড়ির প্যাকেটটা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অত্যন্ত আলতো পায়ে মৌ’য়ের সামনে গিয়ে বসল। সে পরম মমতায় দুই হাত দিয়ে মৌ’কে পাঁজা কোলে তুলে নিল। মৌ ঘুমের ঘোরেই উজানে’র চেনা গায়ের পারফিউমের সুবাস পেয়ে তার বুকে নিজের মুখটা আরেকটু গুঁজে দিল। উজান তাকে সাবধানে এনে নরম বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে গায়ে কমফোর্টারটা জড়িয়ে দিল। এই গভীর ঘুমে নিমগ্ন মৌ’কে আর জাগাতে ইচ্ছে করল না উজানের। কিন্তু তার হঠাৎ মনে হলো কাল সকাল হলেই ঈদের দিন‚ এই আনন্দের দিনে সব মেয়ের হাত মেহেদীর রঙে রঙিন থাকবে অথচ তার নিজের জিদ্দি ব্যবহারের জন্য মৌ’য়ের এই ছোট্ট হাত দুটো খালি পড়ে থাকবে। এটা ভেবে উজানে’র নিজের ভেতরেই কেমন যেন একটা খটকা লাগল। মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়‚ তার অবুঝ মনে কতটা গভীর অভিমান জমা হয়ে আছে।
উজান বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবল। কীভাবে এই ঘুমন্ত মেয়েটার অভিমান ভাঙানো যায় এবং তার হাত দুটো রাঙিয়ে দেওয়া যায়? হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে গুগলে কয়েকটা সুন্দর ও সহজ মেহেদীর ডিজাইন দেখে নিল। তারপর একটি মেহেদী হাতে নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও সাবধানী মনোযোগ দিয়ে মৌ’য়ের ফর্সা নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মেহেদী পরাতে লাগল। মেহেদীর ঠান্ডা ছোঁয়া লাগতেই মৌ ঘুমের ঘোরে বারবার নিজের হাতটা নড়েচড়ে সরিয়ে নিতে চাইল। তাতে অতিষ্ঠ হয়ে উজান মৌ’য়ের হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে কপালে ভাজ ফেলে ফিসফিসিয়ে বকল।
“পুঁচকে মেয়ে একটা। ঘুমের ঘোরেও একটু শান্ত হয়ে থাকতে পারে না। বিকেলে মেহেদী কিনে দিইনি বলে কত অভিমান। আর এখন উজান চৌধুরী নিজের জীবনে প্রথমবার কোনো নারীর হাত নিজ দায়িত্বে এত যত্ন করে মেহেদী দিয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তবুও এই বিড়ালের বাচ্চার শান্তভাবে ঘুমানোর নাম নেই হুহ!
মৌ ঘুমের ঘোরে আবারও দু-একবার নড়েচড়ে উঠল। তবুও উজান তার নরম হাতটা নিজের শক্ত পেশিবহুল হাতের মুঠোয় আগলে রেখে শেষ রাত অবধি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেহেদী দিয়ে পুরো হাত ভরিয়ে দিল। যদিও ডিজাইনটা প্রফেশনাল মেহেদী ডিজাইনারদের মতো অতটা নিখুঁত হয়নি কিন্তু একজন গম্ভীর প্রফেসরের প্রথম হাতের ছোঁয়ায় তৈরি সেই নকশাটি দেখতে মোটেও খুব একটা মন্দ লাগছিল না। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে‚ আর উজান মৌ’য়ের মেহেদী রাঙা হাতটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি হাসল।
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
August 15, 2026 10:56 pm
পর্ব :০৪-২
দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসা নামাজের মিষ্টি মধুর ধ্বনি কানে আসতেই আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল মৌ। প্রতিদিন নিয়ম করে ফজরের সালাত আদায় করা তার বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস‚ তবে বিয়ের হুলস্থুল আর ঝামেলার কারণে গত দুটো দিন ভোরে ঠিকমতো ওঠা হয়নি। কিন্তু আজ ঈদের পবিত্র সকালে ঠিক সময়েই তার ঘুমটা ভেঙেছে। ঘুম ভাঙতেই নিজেকে নরম ও আরামদায়ক বিছানায় আবিষ্কার করে তীব্র অবাক হলো মৌ। তার স্পষ্ট মনে আছে‚ কাল রাতে উজানে’র ওপর চরম অভিমান করে সে মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে বিছানায় সে এলো কীভাবে? তবে তার চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছিল যখন সে ডানপাশে ঘুরে তাকাল। বিছানার ঠিক পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে উজান! শুধু শুয়েই নেই‚ সে মৌ’য়ের ওড়নার আঁচলটা নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী ও মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই নিজের দুই হাতের দিকে তাকাতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল! এ কী? তার দুই হাত কনুই অবধি অপরূপ সুন্দর মেহেদীর লালচে রঙে রাঙানো! হাতের তালু আর পিঠের নিখুঁত নকশা দেখলেই বোঝা যায় ‚ কেউ একজন পরম মমতা আর অত্যন্ত যত্ন সহকারে সারা রাত জেগে এই ছবি এঁকেছে।
বিছানার পাশে তাকাতেই দেখল বেশ কয়েকটি মেহেদী ছড়ানো-ছিটানো পড়ে আছে। কিছু সময় একদম চুপ করে গভীর ভাবনায় ডুব দিল মৌ। মনে মনে ভাবল এই গভীর রাতে দরজা বন্ধ রুমে কে তাকে এত সুন্দর করে মেহেদী পরিয়ে দিল? একবার তার অবুঝ মনে উজান চৌধুরীর নামটা ভেসে উঠলেও সে নিজেই নিজের মাথা নাড়িয়ে উড়িয়ে দিল‚ এটা অসম্ভব! যে লোক তাকে দু-চোখে দেখতে পারে না‚ সে মাঝরাতে তাকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়াবে আর হাত ধরে মেহেদী দেবে? অবাস্তব। আপাতত এই রহস্যময় চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সালাত আদায় করার জন্য বিছানা থেকে নামল সে। ওজু শেষ করে অত্যন্ত শান্ত মনে নামাজ আদায় করে নিল মৌ।
নামাজ শেষ করে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখলো।
ঠিক তখনই ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা প্যাকেট দেখে কৌতূহলী বশত সেটা হাতে নিল এবং খুলে দেখলো। সাথে সাথে চমকে তাকালো মৌ। সেখানে একটা মেরুন রঙের শাড়ি‚ সাথে ম্যাচিং চুরিও৷ মূহুর্তেই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। মানুষটা তাহলে তার জন্য মেহেদীর সাথে শাড়িও কিনে এনেছে। সে মুচকি হেসে প্যাকেটা সেখানেই রেখে গুটি গুটি পায়ে উজানে’র পাশে শুয়ে পরলো।
লোকটা সেদিন রাতে দেমাক নিয়ে বলেছিল বিছানায় শুধু মৌ ঘুমাবে আর উজান ঘুমাবে সোফায়। তাহলে আজ নিজের আইন ভেঙে মহাশয় নিজেই কেন বিছানায় এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন? হয়তো ভুল করে ঘুমের ঘোরে উঠে এসেছেন। তবে মৌ মনে মনে চাইল না যে উজান কষ্ট করে ওই ছোট সোফাটায় গিয়ে ঘুমাক। তার মায়ায় ব্যাকুল হয়ে মৌ বিছানার ওপর উজান’কে দেখার জন্য এতটা ঝুঁকে পড়ল যে তার ভেজা চুলের সুবাস আর মুখের উষ্ণ ভারী নিশ্বাসগুলো সটান গিয়ে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। ঠিক তখনই ঘটল চরম অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনা! উজান চোখ না মেলেই ঘুমের ঘোরেই আচমকা এক ঝটকায় মৌ’য়ের কোমর ধরে তাকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে টেনে নিল।
আকস্মিক এই হামলায় মৌ’য়ের জান প্রায় কবজ হওয়ার দশা! মুহূর্তের মধ্যে উজান নিজের নাক ডুবিয়ে দিল মৌ’য়ের গলার নরম ভাঁজে। ঠোঁট ছোঁলাল তার মসৃণ মখমল ত্বকে‚ আলতো করে এঁকে দিল গভীর এক ভালোবাসার চুম্বন!
শরীরের ভেতর এক তীব্র ও অদ্ভুত অবশ করা শিহরণ বয়ে গেল মৌ’য়ের। বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে‚ কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সেই ধকধক শব্দ। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। কিন্তু সেই সুখকর অনুভূতির রেশ কাটতে না কাটতেই উজানে’র মুখ থেকে অবিন্যস্ত ও কাঁপা কাঁপা গলায় কানের কাছে ভেসে এলো এক নির্মম সত্য।
“আই লাভ ইউ শিরিন। আমি তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। প্লিজ আর একটাবার ফিরে এসো আমার লাইফে। ট্রাস্ট মি‚ আমি আর একটুও ভুল বুঝব না তোমায়। তুমি ছাড়া শূন্য আমি।
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ তিরের মতো এসে সরাসরি মৌ’য়ের ছোট্ট কোমল বুকে বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটার সাজানো ভালোবাসার পৃথিবী আর কাঁচের মতো নরম হৃদয়টা চুরমার হয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! এতক্ষণে মৌ’য়ের মগজে আলো ঢুকল। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে উজান চৌধুরী কেন 'ভালোবাসা' শব্দটাকে এত তীব্রভাবে ঘৃণা করে‚ কেন তার মনে মেয়েদের প্রতি এত ক্ষোভ। তবে মৌ-ও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে বড্ড জেদি আর একরোখা মেয়ে। হোক না উজানে’র হৃদয়ে পুরোনো কোনো ক্ষতের দাগ‚ মৌ নিজের পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে আবারও নতুন করে উজানে’র বুকে নিজের নাম লিখে ছাড়বে!
ঠিক তখনই উজানে’র ঘুমের ঘোর কাটল এবং সে চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু চোখের সামনে মৌ’কে নিজের বাহুবন্ধনে ওভাবে লেপ্টে থাকতে দেখে সে এক ধাক্কায় ছিটকে উঠল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে দ্রুত নেমে দাঁড়িয়ে গেলো।
“তু তু তু তুমি আবারও কোন সাহসে আমার আমার কাছে এসেছো?
মৌ নিজের বুকের ভেতরের কান্না আর ভাঙচুর লুকিয়ে রেখে তড়িৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসল। মুখটা কুঁচকে দেমাকের সাথে বলল‚ "বাহ্ বাহ্ যত দোষ নন্দ ঘোষ। এখন আমি একটুও আপনার কাছে যাইনি প্রফেসর সাহেব বরং আপনিই নিজে মাঝরাতে সোফা ছেড়ে আমার বিছানায় এসেছেন। আর একটু আগে আপনিই আমাকে জোর করে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়েছেন হুহ।
“হোয়াটট? উজান চৌধুরীর চরিত্র এতটাও সস্তা বা বাজে নয় যে‚ সে যাকে তাকে মাঝরাতে বুকে টেনে নেবে।
মৌ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে উজানে’র সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। "ওহ্ তাই নাকি? বউকে মুখে স্বীকার করে না অথচ সেই বউয়ের জন্য মাঝরাতে মল ওলটপালট করে শাড়ি কিনে নিয়ে আসে। আবার সারা রাত জেগে নিজের হাতে এত যত্ন করে মেহেদীর নকশাও এঁকে দেয়! এমনকি শেষ রাতে জড়িয়ে ধরে টুপটুপ করে চুমুও খায়। সে আবার এসেছে এখানে নিজের চরিত্র নিয়ে বড় বড় লেকচার দিতে? ঢং‚ এই খিটখিটে স্বভাবের জন্যই মনে হয় ওই শিরিন ডাইনি আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
শিরিনে’র নামটা মৌ’য়ের মুখে শোনা মাত্রই উজান যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেল না। পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল তার। শিরিনে’র ব্যাপারে এই চৌধুরী বাড়ির লোকজন ছাড়া বাইরের কেউ তেমন কিছু জানে না। বাড়ির লোকও শুধু এতটুকুই জানত যে উজানে’র অতীতে একটা গভীর প্রেম ছিল কিন্তু সেই মেয়ের নাম‚ পরিচয় বা ইতিহাস কেউ জানত না। তাহলে এই পুঁচকে মেয়েটা কীভাবে জানল?
সে অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা ও ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল‚
“শ শ শ শিরিনে’র ব্যাপারে তুমি কীভাবে জানলে?
মৌ দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল‚ "যাহ্ বাবা একটু আগে নিজেই তো আমাকে ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে সেই ডাইনিকে দশবার 'আই লাভ ইউ' বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। এখন আবার আমাকেই উল্টো জিজ্ঞেস করছেন আমি কীভাবে জানলাম?
কথাটা শুনে উজান শুকনো ঢুক গিলল। নিজের ওপর তীব্র রাগ আর ক্ষোভ হতে লাগল তার। ঘুমের ঘোরে সে নিজের অজান্তেই এসব কী আবোলতাবোল বকে ফেলেছে! শিরিন’কে সে মন থেকে যতই মুছে ফেলতে চায়‚ সে ততই জেকে বসে। কাল বিকেলে দূর থেকে হুট করে মেয়েটাকে অন্য একজনের সাথে দেখার পর থেকেই মগজে যেন নতুন করে পুরোনো ক্ষতটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই মৌ বাঘিনীর মতো পা ফেলে উজানে’র একেবারে গায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর উজানে’র মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে চোখ দুটো সরু করে অত্যন্ত মারমুখী ও ফিসফিসানি গলায় স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিল।
"শুনুন প্রফেসর সাহেব। বিয়ের আগে আপনার লাইফে কোন পেত্নী‚ ডাইনি বা চামচিকি ছিল‚ তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। বাট‚ এখন যেহেতু আপনি আমার বিবাহিত ক্রাস বর সো আজ থেকে যদি আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছেন কিংবা ওই পুরোনো পেত্নীকে আবারও নিজের ঘাড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে আমি আপনাকে একদম আল্লাহর নামে কুরবানি দিয়ে দেবো হুহ!
এই বলেই মৌ উজানে’র মুখের ওপর এক বিশ্রী ভেংচি কেটে দরজার দিকে চলে গেল। উজান যেন পাথরের মূর্তির মতো একদম আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটার কথার তেজ দেখে মনে হচ্ছে‚ সুযোগ পেলে সে উজান’কে সত্যি সত্যি জ্যান্ত জবাই করে কুরবানি দিয়ে দেবে। উজান যখন নিজের স্তব্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে‚ ঠিক তখনই মৌ কোথা থেকে যেন দমকা হাওয়ার মতো আবার দৌড়ে ফিরে এলো। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচিয়ে উঠে উজানে’র ডান গালে ঠোঁট চেপে এক জোরালো মিষ্টি চুম্বন এঁকে দিল। তারপর উজানে’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আওড়াল„
“ভালোবাসি আমার খিটখিটে প্রফেসর সাহেব! শুভ ঈদ মোবারক!
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না মৌ‚ খিলখিল করে হাসতে হাসতে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। উজান রাগে গজগজ করে উঠল‚ “অসভ্য মেয়ে একটা। লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই তার ডিকশনারিতে। ইডিয়েট একটা‚ সুযোগ পায় মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো একদম।
•
•
🖤🌸
মেরুন রঙের সেই চমৎকার জমকালো শাড়িটা পরিধান করে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়েছে মৌ। বেনারসি শাড়িতে তাকে আজ সত্যিই কোনো পরীর মতো লাগছে। বাড়ির পুরুষ মানুষ আরিফুল চৌধুরী‚ আকবর চৌধুরী‚ ইফাত‚ আরিয়ান এবং উজান সহ সবাই ঈদের নামাজ শেষ করে এইমাত্র মাত্র বাসায় ফিরেছে। সবার পরনে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা। মৌ ড্রয়িং রুমে ঢুকেই বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে শ্বশুর আরিফুল চৌধুরী থেকে শুরু করে একে একে সবাইকে নিচু হয়ে সালাম করল এবং অত্যন্ত আদায় করে সবার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চকচকে কড়কড়ে সালামি লুফে নিল।
এবার সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল উজানে’র সামনে। উজান তখন নিজের দুই জোড়া ভ্রু কুঁচকে মৌ’য়ের এই মেরুন শাড়ি পরা রূপের দিকে তাকিয়ে অবচেতন ভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। ঠিক তখনই মৌ তার সামনে নিজের ডান হাতটা পেতে বেশ কায়দা করে বলে উঠল‚
"ঈদের সালামি দিন।
উজান সালামির কথা শুনে কোনো পাত্তা না দিয়ে বেশ আরাম করে গিয়ে সোফাটায় পা ছড়িয়ে বসল। মৌ-ও ছাড়ার পাত্রী নয়‚ সে-ও ঠিক ছায়ার মতো সোফার পাশে গিয়ে তপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। উজান এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে তার গম্ভীর ও কর্কশ স্বরে সংক্ষেপে আওড়াল‚ “কত?
মৌ খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে দুই হাত নেড়ে উত্তর দিল‚ "৩৪ হাজার।
মৌয়ের মুখে এই আকাশচুম্বী অঙ্কের কথা শোনা মাত্রই উজানে’র চোখ জোড়া কপালে ওঠার উপক্রম হলো। সে সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
“হোয়াটটট? টাকা কি ঘোড়ার পেছন দিয়ে বের হয় যে চাইলেই দিয়ে দেবো?
উজানে’র এমন কিপটেমি মার্কা চিৎকার শুনে মৌ আর নিজের মুখ সামলাতে পারল না। সে নিজের কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে তড়িৎ গতিতে উত্তর দিল।
"না আপনার নিজের পেছন দিয়ে বের হয়।
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই মৌ’য়ের নিজের হুশ ফিরল। সে দ্রুত নিজের দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। মনে মনে নিজেকেই গালি দিল‚ ধুর ছাই। এই পোড়া মুখটা কি এক সেকেন্ডও চুপচাপ থাকতে পারে না? বাড়ির সবার সামনে এই নোংরা কথাটা না বললে কি পেটের ভাত হজম হতো না তার? এদিকে মৌ’য়ের এমন অভাবনীয় ও মারাত্মক ভাষার উত্তর শুনে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই "হো হো" করে হাসির রোল পড়ে গেল। ইফাত আর আরিয়ান তো হাসতে হাসতে সোফা থেকে মেঝেতেই গড়িয়ে পড়ার দশা। বাড়ির সবার সামনে নিজের বউয়ের মুখে এমন অবাস্তব কথা শুনে উজানে’র ফর্সা মুখ এবার রাগে একেবারে বেগুনি হয়ে গেল। সে রাগী চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকাতেই মৌ চোরের মতো মুখ লুকিয়ে শাশুড়ীর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল।
সবার হাসির রোল দেখে উজান নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে রাগে-ক্ষোভে একেবারে বাঘের মতো গর্জন করে উঠল‚ “দেখেছ আম্মু? তোমাদের এই পরম আদরের ফাজিল বউমা কেমন ভাষায় কথা বলছে? এরপরেও কি তোমাদের মনে হয় যে এই বেয়াদব মেয়ের সাথে আমার একটুও ভালো ব্যবহার করা উচিত? আমার তো এখন মন চাইছে যে ওকে আমি...
উজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে যেই না মৌ’য়ের দিকে এক পা দু-পা করে এগিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো ইফাত।
"আরে হোপ শালা। ঘরে এমন রূপবতী বউ থাকতে বিন্দুমাত্র কদর করিস না‚ সারাক্ষণ শুধু রাগ দেখাস। তোর যদি এতই অপছন্দ হয়, তবে মৌ’কে আমাকে দিয়ে দে। আমার নিজের বাপ তো আর জীবনেও আমাকে নিজে থেকে এভাবে ধরে-বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেবে না। তাই তোরটাই আমাকে দে।
ইফাতের এমন রসাত্মক আর ধেষ্টামো মার্কা কথা শোনা মাত্রই উজান নিজের দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল। সে আচমকা ইফাতে’র পিঠের ওপর সজোরে এক মোক্ষম কিল বসিয়ে দিল। “শালা তোকে আমি রাতে দেখে নেব।
ইফাত পিঠে কিল খেয়েও বিন্দুমাত্র দমল না বরং মুখ কুঁচকে আরও জোরে হেসে উঠল। "ঘরে এত সুন্দর নতুন বউ রেখে তুই মাঝরাতে আমার রুমে আমার কাছে আসবি? সিরিয়াসলি? নাকি তোর মধ্যে ভেজাল আছে‚ হ্যাঁ?
কথাটা বলেই ইফাত আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। উজানে’র পরবর্তী মার থেকে বাঁচতে এক লাফে ড্রয়িং রুমের অন্য প্রান্তে দৌড়ে গিয়ে সবার পেছনে সরে দাঁড়াল। উজান এবার রাগে একদম বোম হয়ে গেল। এই বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা মানেই নিজের সম্মান ধূলিসাৎ হওয়া। সে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে যেই না ড্রয়িং রুম পার হয়ে সদর দরজার দিকে চলে যেতে চাইল‚ ঠিক তখনই মৌ একদম চিলের মতো ডানা মেলে উজানে’র যাওয়ার পথ আটকে সোজা সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে নিজের ডান হাতটা উজানে’র সামনে পেতে বলে‚
"সালামিটা দিয়ে যান।
উজান নিজের ক্ষিপ্ত ও তপ্ত দৃষ্টি দিয়ে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। যেন চাউনি দিয়েই মেয়েটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। তবুও মৌ’য়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিজের বড় বড় হরিণী চোখ দুটো মেলে একদম নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়েই রইল। মৌ’য়ের এমন নাছোড়বান্দা রূপ দেখে উজানে’র ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম বাঁকা ও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের প্যান্টে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খুঁজল। তারপর অত্যন্ত ভাব নিয়ে পকেট থেকে একটি 'দুই টাকার নোট' বের করে মৌ’য়ের হাতের মুঠোয় শক্ত করে গুঁজে দিল। নোটটা গুঁজে দিয়েই উজান খানিকটা নিচু হয়ে মৌ’য়ের কানের একদম কাছে মুখ এনে ফিসফিসানি স্বরে আওড়াল—
“লিসেন পুঁচকে মেয়ে। উজান চৌধুরী তার বাপের জন্মেও কোনোদিন এত বড় অঙ্কের টাকা কাউকে ফ্রিতে সালামি দেয়নি। কিন্তু আজ তোমাকে দিল। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো তুমি কতটা স্পেশাল?
মৌ নিজের হাতের ওই দুই টাকার নোটটার দিকে একবার তাকাল‚ আর একবার উজানে’র দেমাকী মুখের দিকে তাকাল। তার খুশিতে ডগমগ করা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে তপ্ত হয়ে উঠল। সে রাগে রি রি করে উঠে বলল‚ "কী বললেন? খাটাশ লোক একটা। আপনি কি এই দুই টাকা আমাকে ভিক্ষা দিচ্ছেন?
উজান নিজের কলারটা একটু সোজা করে বলল‚ “লাইক সিরিয়াসলি? এটা তোমার কাছে ভিক্ষা মনে হচ্ছে? তুমি আমার আম্মুর অতি আদরের নতুন বউমা তাই তোমাকেই স্পেশালি দিলাম। অন্য কেউ হলে তো আজ এক আনাও পেত না।
উজানে’র এমন চরম কিপটেমি সহ্য করতে না পেরে মৌ’য়ের মাথার সমস্ত রক্ত এক নিমেষে চড়ে গেল। সে আর নিজের রাগ সামলাতে পারল না। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌ নিজের হাতের আঙুল দিয়ে উজানে’র শক্ত পেশিবহুল হাতের ওপর শরীরের সমস্ত শক্তি খাঁটিয়ে এক মারাত্মক চিমটি কেটে দিল। উজান ব্যথায় ককিয়ে ওঠার আগেই মৌ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পা দাপাতে দাপাতে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
Page 1 / 2
Next