গল্প :প্রফেসর উজান ...
 
Notifications
Clear all

গল্প :প্রফেসর উজান চৌধুরী (লেখনীতে:বন্যা সিকদার)

Page 2 / 2

Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
পর্ব— ০৫
 
 
 
 
​চৌধুরী বাড়ির পেছনের পুকুর ধারের শানবাঁধানো সিঁড়িতে‚ বিশাল এক বকুল ফুল গাছের নিচে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে গুটিশুটি মেরে বসে আছে মেহের। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা বিকেলের স্নিগ্ধ শীতল বাতাস বারবার এসে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শরীর। পিঠের ওপর তার রেশমি কালো চুলগুলো সম্পূর্ণ মেলানো। বাতাসে সেই অবাধ্য চুলগুলো উড়ে এসে বারবার তার মুখমণ্ডল এলোমেলো করে দিচ্ছে। আজ ঈদের খুশির দিনে আকাশের বুকটা মেঘাচ্ছন্ন না হলেও‚ মেহেরে’র মনের আকাশটা আজ ভীষণ রকম মেঘে ঢাকা। চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জল গুলো চিকচিক করে উঠছে। বুক চিরে আসা এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তার।
 
​ঠিক তখনই শুকনো পাতার ওপর কারো পায়ের আওয়াজ আর জোরালো উপস্থিতি টের পেয়ে ধড়ফড় করে উঠল মেহের। সে তড়িঘড়ি করে নিজের ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিয়ে চমকে পেছনে তাকাল। ইফাত কখন যে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে‚সে টেরই পায়নি। মেহের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইফাত মুখে এক চিলতে চঞ্চল হাসি নিয়ে হুট করে মেহেরে’র একদম গা ঘেঁষে পাশে বসে পড়ল। ইফাত’কে অতটা কাছাকাছি দেখে মেহেরে’র ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সে যখনই নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ি থেকে ঝটপট উঠে চলে যেতে চাইল‚ ঠিক তখনই ইফাত বিদ্যুৎ গতিতে মেহেরে’র কবজিটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। ​ইফাতে’র সেই অনাকাঙ্ক্ষিত শক্ত হাতের স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যে মেহেরে’র পুরো শরীর একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।
 
 পাঁচ বছর আগের এক ভয়ঙ্কর অতীত যেন এক পলকে তার চোখের সামনে ভেসে এলো। সে বিদ্যুৎ গতিতে মোচড় দিয়ে নিজেকে ইফাতে’র হাতের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। ​কিন্তু ইফাতও এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়‚ সে মেহেরে’র ছটফটানি দেখে কবজির বাঁধনটা আরও কিছুটা শক্ত করে তাকে জোরপূর্বক নিজের পাশে বসিয়ে দিল। মেহেরে’র ফর্সা মুখটা এবার ভয়ে ও আতঙ্কে একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ইফাতে’র চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকু হারিয়ে কম্পিত ও মিনমিনে স্বরে আকুতি জানাল। 
 
​"ছ ছ ছ ছাড়ুন আমাকে।
 
​ইফাত মেহেরে’র চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক ভ্রু কুঁচকে শুধাল। “আই জাস্ট ওয়ান্ট টু নো‚ বাট হোয়াই? কেন ছাড়ব হুম?
 
​"ছাড়ুন প্লিজ কেউ এভাবে দেখলে খারাপ ভাববে।
মেহেরের গলায় স্পষ্ট কান্নার সুর।
 
​“আই ডোন্ট কেয়ার। যে যাই বলুক তাতে ইফাত চৌধুরীর কিচ্ছু যায় আসে না। তার আগে বলো তুমি কোন সাহসে এই ইফাত চৌধুরীকে এভাবে এভয়েড করে চলছো হ্যাঁ? তুমি কি জানো‚ আমার সাথে প্রেম করার জন্য কত শত রূপবতী মেয়ে দিন-রাত পাগল হয়ে ঘুরে বেড়ায়?
 
​মেহের অনবরত ইফাতে’র শক্ত হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা মোচড় দিয়ে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু ইফাতে’র পুরুষালী শক্তির সামনে তার এই ছোট্ট চেষ্টা কিছুতেই সফল হচ্ছিল না। একপর্যায়ে নিজের সবটুকু চেষ্টা ব্যর্থ হতে দেখে মেহের সোজা ইফাতে’র চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চঞ্চল চাউনি দেখে মেহেরে’র ঠোঁটের কোণে এক তীব্র তাচ্ছিল্য ও বিষাদের হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল‚
 
​"আমি আপনার পেছনে ঘুরে বেড়ানো সেইসব সস্তা মেয়েদের কাতারে পড়ি না মিস্টার। আর আমি আপনাকে একটুও এভয়েড করছি না‚ শুধু আপনার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলছি মাত্র। অবশ্য এই দূরত্ব বজায় রেখে চলার বুদ্ধিটা যদি আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে আমার মাথায় আসত‚ তবে অন্তত আজ সমাজের কাছ থেকে এত জঘন্য 'অপবাদ' বা উপাধি আমাকে উপহার পেতে হতো না। আর না চোখের সামনে আমার কলিজার টুকরো মা-বাবাকে চিরকালের মতো হারাতে হতো। 
 
​মেহেরে’র কথার ভেতরের সেই আকাশসম গভীরতা আর তীব্র লুকানো কষ্টটা চঞ্চল প্রকৃতির ইফাত এক পলকে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে মেহেরে’র মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল।
 
​“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি? পাঁচ বছর আগে কী হয়েছিল?
 
​"আপনি আমার কথার মানে বুঝবেন না‚ আর বোঝার দরকারও নেই। প্লিজ এবার অন্তত আমার হাতটা ছাড়ুন। 
 
মেহেরে’র কণ্ঠস্বর এবার ক্ষোভে কাঁপতে লাগল। তবুও ইফাত ছাড়লো না। সে দৃঢ় গলায় বলল‚ ​“তাহলে পুরো ব্যাপারটা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে যাও।
 
ইফাত নিজের জেদ ধরে রাখল।
​মেহেরে’র ভেতরের জমানো ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে এক চরম রাগান্বিত ও কঠোর কণ্ঠে চিৎকার করে আওড়াল। ​"আপনাকে বললাম না আমার হাতটা ছাড়ুন? এক কথা কি কানে যায় না আপনার?
 
​কথাটা শেষ করেই মেহের নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এক ঝামটা মেরে ইফাতে’র হাতের শক্ত বাঁধন থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ইফাত হুট করে এমন ঝটকা পাওয়ায় হাতটা আলগা করে ফেলল। মেহের আর এক সেকেন্ডও সেই বকুল তলায় দাঁড়িয়ে রইল না। সে নিজের আঁচলটা হাত দিয়ে চেপে ধরে চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে পুকুর পাড় থেকে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেল। ​ইফাত সেই সিঁড়িতে বসে রইল। সে মেহেরে’র ওভাবে হন্তদন্ত হয়ে চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে মাথা চুলকালো। তারপর আপন মনেই এক চিলতে অদ্ভুত ও মুগ্ধতার হাসি হাসল। সে নিজের ফিসফিসানি কণ্ঠে আওড়াল‚
 
​“আই অ্যাম রিয়েলি সরি‚ আমার ফুলকন্যা। তবে তোমায় তো আমি এত সহজে ছাড়ছি না। বিকজ‚ তোমার ওই রহস্যময়ী শান্ত চোখের মধ্যে এমন কিছু একটা লুকিয়ে আছে। যার জন্য এই ইফাত চৌধুরী নিজের ডজন ডজন সুন্দর সুন্দর গার্লফ্রেন্ড সাইডে রেখে শুধু তোমার ওই মলিন মুখের দিকেই সারাদিন একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তোমাকে দেখলেই কেন জানি হৃদয়ে এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে‚ এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয়। 
———————
——————————
 
🖤🌸
উজান সোফায় বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে ভার্সিটির কিছু জরুরি কাজ করছে। বাইরের কোনো কোলাহল যেন তার কানে প্রবেশ করতে না পারে‚ সেজন্য সে কানে ব্লুটুথ হেডফোন গুঁজে চড়া ভলিউমে গান ছেড়ে রেখেছে। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় ছোটখাটো একটা ছায়া এসে উঁকি দিল। রুমের ভেতরে উজান’কে ওভাবে গম্ভীর মুখে একাকী কাজ করতে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু ও বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। ​মৌ একহাতে একটা চকোলেট কোণ আইসক্রিম কামড়ে খেতে খেতে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে ধপাস করে একদম উজানে’র গা ঘেঁষে পাশে বসল। চেনা সুবাস আর পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে উজান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে চরম বিরক্তিকর দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে সোফার অন্য প্রান্তে একটু সরে বসল। কিন্তু মৌ-ও দমবার পাত্র নয়‚ সে তড়িৎ গতিতে আবারও উজানে’র একেবারে পাশে গিয়ে লেপ্টে বসল। উজান যতবারই দূরত্ব বজায় রাখতে সোফার এপাশ-ওপাশ সরে যেতে চাইল‚ মৌ ততবারই ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে গিয়ে তার সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে লাগল।
 
​অবশেষে উজান নিজের ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে কপাল কুঁচকে‚ কান থেকে হেডফোনটা টেনে নামিয়ে অত্যন্ত রাগান্বিত কণ্ঠে আওড়াল‚
​“এই ফাজিল মেয়ে আমার গায়ের ওপর এভাবে এসে ঘেঁষাঘেঁষি করছ কেন হ্যাঁ? পাখা গজিয়েছে তোমার?
 
​মৌ আইসক্রিমে একটা বড় কামড় দিয়ে মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল‚ "এই যে প্রফেসর সাহেব। আপনি কি সারাক্ষণ ওই বাজখাঁই গলায় চিৎকার করা ছাড়া আর কোনো শান্ত ভাষায় কথা বলতে পারেন না? তাছাড়া আপনি তো এখন আমার বিবাহিত বর হন‚ সো নিজের বরের একটু কাছাকাছি আমি যেতেই পারি। তাতেও আপনার প্রব্লেম?
 
উজান তর্জনী উঁচিয়ে কড়া সুরে বলল‚ ​“হ্যাঁ প্রব্লেম‚ ভীষণ প্রব্লেম। তোমার এই সস্তা আদিখ্যেতা আমার একদম পছন্দ নয়। এখন চুপচাপ দূরে গিয়ে বসো‚ আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
 
​উজান ভেবেছিল ধমক খেয়ে মেয়েটা এবার অন্তত দূরে গিয়ে বসবে। কিন্তু তার সেই ধারণাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে মৌ মুহূর্তের মধ্যে সোফা থেকে ডানা মেলে সোজা উজানে’র কোলের ওপর গিয়ে আয়েশ করে বসে পড়ল। ​উজান একদম আহাম্মকের মতো চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তার মগজ যেন এক সেকেন্ডের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মেয়েটা আসলে কোন উপাদানে তৈরি? তাকে মুখে বলা হচ্ছে দূরে গিয়ে বসতে অথচ সে দূরত্ব কমানো তো দূর‚ একেবারে তার কোলের ওপর চড়ে বসে আছে! 
 
“এই বেয়াদব মেয়ে এক্ষুনি নামো আমার কোল থেকে। এটা কি তোমার দোলনা মনে হয় যে যখন ইচ্ছে এসে দোল খাবে? একদম বেসরম‚ অসভ্য মেয়ে একটা।
 
​উজানের মুখে 'অসভ্য' শব্দটা শোনা মত্রই মৌ’য়ের গাল দুটো রাগে রসগোল্লার মত উঠল। সে কোলের ওপর বসেই উজানে’র কলারটা টেনে ধরে খটখট করে উত্তর দিল।
​"আপনি অসভ্য‚ আপনার চৌদ্দ গুষ্টি অসভ্য। হুহ এসেছে আমাকে অসভ্যতার সার্টিফিকেট দিতে। নিজের ক্যারেক্টারের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ঘুমের ঘোরে আমাকে জড়িয়ে ধরে 'শিরিন শিরিন' বলে চুমু খায় তার হিসাব নেই। আর এখন আমার দিকে আঙুল তুলছে? বেশি ত্যাড়াবেঁড়ি করলে কিন্তু বলে দিচ্ছি শুধু কোল নয়‚ একদম আপনার ওই মাথার ওপর গিয়ে চড়ে বসে থাকব।
 
​উজান নিজের কটমট ও রক্তচক্ষু দৃষ্টি নিয়ে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। রাগে তার কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সে নিজের দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে বলে ফেলল। “এখন তো শুধু ওই মাথার ওপর চড়ে বসাটাই তো বাকি রেখেছো‚ বেয়াদব মেয়ে। 
 
​উজানে’র ওই অসহায় রাগী মুখটা দেখে মৌ আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। উজান তখনও নিজের গম্ভীর মার্কা রক্তচক্ষু দৃষ্টি দিয়ে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মৌ হঠাৎই নিজের হাতের অর্ধেক খাওয়া চকোলেট আইসক্রিমটা উজানে’র ঠোঁটের একদম সামনে এগিয়ে দিল এবং চোখে একরাশ মায়া ও মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে নরম সুরে আওড়াল‚
 
​"আইসক্রিম খাবেন? আমার খুব ফেভারিট‚ অনেক টেস্ট কিন্তু.
 
​উজান আইসক্রিমটা এক হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “আমি এসব ফালতু অখাদ্য-কুখাদ্য খাবার খাই না।
 
"তা তো বলবেনই। আমার হাতের মিষ্টি আইসক্রিম আপনার কাছে তো 'অখাদ্য' মনে হবেই। আপনার তো ওই ডাইনি শিরিনে’র হাতের বিষ খেলেও অমৃত মনে হতো তাই না? শুধু এই মৌ’কে দেখলেই আপনার গায়ে জন্ডিস চড়ে বসে‚ আমাকে আপনার একটুও ভালো লাগে না। 
 
​ “বুঝতেই যখন পারছো৷ যে তোমাকে আমার সহ্য হয় না‚ তাহলে কেন শুধু শুধু আমার লাইফে আঠার মতো লেগে আছো? চলে যাও না আমার জীবন থেকে।
 
​"এহ্ উনি বললেন আর আমি অমনি পুটলা-পুটলি বেঁধে চলে গেলাম তাই না?
 
মৌ কোল থেকে এক ঝটকায় নেমে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর উজানে’র দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল‚
"এই জন্মে তো আপনার পিছু ছাড়ছি না এমনকি মরে গেলেও আপনার হাড়‚ মাংস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে একদম কয়লা বানিয়ে ছাড়ব।
 
উজান চোখ জোড়া কপালে তুলে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে সোফা ছেড়ে এবার সোজা বিছানায় গিয়ে বসল। কিন্তু মৌ’য়ের আজ তার পিছু ছাড়ার কোনো নামই নেই! সে-ও বিড়ালের বাচ্চার মতো পিছু পিছু গিয়ে ঠিক উজানে’র গা ঘেঁষে বিছানার ওপর আয়েশ করে বসল। উজান মৌ’য়ের দিকে এক পলক আড়চোখে তাকিয়ে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আবারও নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে তীব্র মনোযোগ দিল। ​ঠিক তখনই মৌ মুচকি হাসতে হাসতে ফিসফিস করলো। 
 
​"প্লিজ ছাড়ুন আমায়‚ শাশুড়ি আম্মা এসে পড়বে। 
 
​মৌ’য়ের মুখে এই কথাটি শোনা মাত্রই উজান বিষম খেল। সে কাশতে কাশতে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে নিজের চোখ দুটো বড় বড় ও রাঙিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল‚
​“এই অভদ্র মেয়ে তোমায় আমি ধরলাম কখন যে ছেড়ে দেবো? 
 
​মৌ লাজুক হাসি দিয়ে বলতে লাগে।
​"না মানে আপনি একদিন এমন করবেন তো তাই আগে ভাগেই প্র্যাকটিস করছি। 
 
“শয়তানের হাড্ডি বলে কী? 
 
​এই বলেই উজান.....
 
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
পর্ব— ০৬
 
 
 
​মৌ’য়ের মুখে এই কথাটি শোনা মাত্রই উজান বিষম খেল। সে কাশতে কাশতে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে নিজের চোখ দুটো বড় বড় ও রাঙিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল‚
​“এই অভদ্র মেয়ে তোমায় আমি ধরলাম কখন যে ছেড়ে দেবো? 
 
​মৌ লাজুক হাসি দিয়ে বলতে লাগে।
​"না মানে আপনি একদিন এমন করবেন তো তাই আগে ভাগেই প্র্যাকটিস করছি। 
 
“শয়তানের হাড্ডি বলে কী? 
 
​​এই বলেই উজান ক্ষিপ্ত পায়ে মৌ’য়ের পিছু নিল তাকে ধরার জন্য। মৌ খিলখিল করে হেসে এক লাফে সরে গেল। উজানও দমবার পাত্র নয়‚ সে-ও তার পিছু দৌড়াতে লাগল। মৌ পুরো রুম জুড়ে প্রজাপতির মতো এদিক থেকে ওদিক ছুটে বেড়াতে লাগল। উজানে’র হাত থেকে বাঁচতে তার এই চিলতে ছটফটানি দেখে উজান মাঝপথেই থেমে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
 
​“এই ইডিয়ট দাঁড়াও বলছি। এইটুকু বয়সে মুখ দিয়ে পাকা পাকা কথা বের করছি? এখনো দুধের দাঁতও পড়েনি অথচ অভদ্রদের মতো ব্যবহার। 
 
​মৌ বিছানার ওপাশে গিয়ে তড়িৎ গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখটা বাঁকিয়ে নিলো। "সত্যি কথা বললেও আমার দোষ তাই না?
 
​“চুপ কর অসভ্য মেয়ে। একবার যদি তোমায় হাতেনাতে ধরতে পারি‚ তবে মেরে একদম তক্তা বানিয়ে ফেলব মনে রেখো।
 
"আপনি চুপ করুন সভ্য পুরুষ। এই বা*লের কথা ছাড়া আর কি বা পারেন।  
 
​“ননসেন্স বলে কী ? এমন বেয়াদব মেয়ে আমার কপালেই জুটতে হলো। হে মাবুদ‚ দয়া করে হয় তুমি আমাকে নিজের কাছে তুলে নাও নয়তো এই খাচ্চর মেয়েটাকে তুলে নাও।
 
​কথাটা মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই উজান নিজেই কেমন যেন থতমত খেয়ে থেমে গেল। ​এদিকে মৌ দৌড়াতে দৌড়াতে মাঝপথেই থমকে দাঁড়িয়ে উজানে’র দিকে তাকিয়ে মুখটা বিশ্রীভাবে ভাঙাল। তারপর বিছানার অন্য পাশে গিয়ে দু-হাতে নিজের কোমর শক্ত করে চেপে ধরে কর্কশ গলায় আওড়াল„ "অন্যদের ভাতার তার বউয়ের সাথে কত রোমাঞ্চ করে অথচ আমার ভাতার আমাকে দু-চোখেও সহ্য করতে পারে না। আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো আপনার সিস্টেমে কোনো প্রব্লেম ট্রব্লেম নেই তো আবার? নয়তো আমাকে বারবার ওপরে তুলে নিতে কেন বলেন হুম?
 
 
 
​উজানে’র জোড়া ভ্রু এবার কুঁচকে গেল। রাগে তার কপালের ও গলার শিরাগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে। এই মেয়েটা দিন দিন কতটা বেসরম আর অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। বয়সে সে মৌ’য়ের চেয়ে বেশ অনেকটা বড়‚ অথচ মেয়েটার মনে সেই নিয়ে বিন্দুমাত্র ভয় বা সমীহ নেই। ​আচমকাই উজান আর কোনো কথা না বলে বাঘের মতো ক্ষিপ্ত গতিতে বিছানা পার হয়ে মৌ’কে ধরার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। মৌ বিপদ টের পেয়ে পালানোর জন্য যেই না উল্টো দিকে এক দৌড় দিতে চাইল‚ ঠিক তখনই উজানে’র শক্ত হাতের টানে ভারসাম্য হারিয়ে সে সোজা বিছানার ওপর হুড়মুড় খেয়ে আছড়ে পড়ল। আর ঠিক একই সাথে নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মৌ’য়ের ঠিক গায়ের ওপরে গিয়ে আছড়ে পড়ল উজান!
 
​আকস্মিক এই পতনে তীব্র ভয়ে আর লজ্জায় মুহূর্তের মধ্যে নিজের চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল মৌ। আর ঠিক তখনই উজানে’র ঠোঁট দুটো গিয়ে সরাসরি স্পর্শ করল মৌয়ে’র নরম ঠোঁটের কোল। ​মুহূর্তের মধ্যেই মৌ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার সারা শরীরের ভেতর এক তীব্র‚ অদ্ভুত ও অচেনা শিহরণ বিদ্যুৎ বেগে বয়ে গেল। সে নিজের দু-হাত দিয়ে বেডশিট শক্ত করে খামচে ধরল। তার বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা যেন আজ খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য পাগলের মতো লাফাচ্ছে। ​এদিকে উজান নিজের ঠোঁটে মৌ’য়ের উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই কেমন যেন অবশ হয়ে গেল। মৌ’য়ের ওই আকুল‚ ভিতু আর লালচে হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে উজান যেন এক পলকে অন্য কোনো এক চেনা-অচেনা মায়াবী জগতে হারিয়ে গেল। সে পলকহীন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৌ’য়ের মুখের দিকে। তার গভীর চোখ জোড়া হুট করেই আটকে গেল মৌ’য়ের ঠোঁটের ঠিক কোণায় থাকা ছোট কুচকুচে কালো তিলটার ওপর। আবছা আলোয় তিলটা মেয়েটার মায়াবী মুখে বড্ড বেশি মানিয়েছে।
 
​উজান যুক্তির খাতিরে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল কিন্তু তার অবাধ্য মন ও শরীর যেন বারবার এই মায়াবিনীর দিকেই তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত অনুভূতিতে তার ভেতরটা তোলপাড় হতে লাগল। যে মেয়েটা সারাদিন তাকে জ্বালিয়ে শেষ করে ফেলে‚ ঠিক এই মুহূর্তে তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শান্ত ও পবিত্র মায়াবিনী বলে মনে হচ্ছে উজানে’র। ​ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে মৌ’য়ের চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে খুলে গেল এবং উজানে’র কানের কাছে অত্যন্ত ফিসফিসানি ও ভেজা গলায় ভেসে এলো।
 
​"ভালোবেসে ফেললেন নাকি মি. প্রফেসর?
 
​মৌ’য়ের এই চপল কথায় মুহূর্তের মধ্যে ঘোর কাটল উজানে’র। সে তীব্রভাবে হকচকিয়ে উঠে সটান বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে যখনই রুম ছেড়ে দূরে সরে যেতে চাইল ঠিক তখনই বিদ্যুৎ গতিতে মৌ বিছানা থেকে উঠে উজানে’র হাতটা শক্ত করে টেনে ধরল। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌ তাকে এক ঝটকায় ধাক্কা দিয়ে বিছানার ওপর ফেলে দিল এবং বিদ্যুৎ গতিতে নিজে উজানে’র শক্ত বুকের ওপর আয়েশ করে উঠে বসল। ​উজান নিচে শুয়ে থেকে মৌ’কে বারণ করার জন্য কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে যেন আবারও এক গভীর ঘোরের গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। মৌ নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি ও বিজয়ী হাসি ঝুলিয়ে উজানে’র মুখের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলো। অত্যন্ত নরম ও দাবিদার কণ্ঠে শুধাল। 
 
​"প্রফেসর সাহেব কবে বউ হবো আমি আপনার?
 
​মৌ’য়ের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল উজান কিন্তু তার শরীরে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা রইল না। সে আগের মতোই অপলক‚ মুগ্ধ দৃষ্টিতে মৌ’য়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মৌ এবার নিজের হাতটা বাড়িয়ে উজানে’র কপালে পরম মমতায় ধীরে ধীরে স্পর্শ করল এবং সেখানে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। তারপর নিজের ছোট্ট ও নরম আঙুলগুলো দিয়ে উজানে’র পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। অত্যন্ত নিচু ও আকুল স্বরে সে বলতে লাগল।
 
​"আমি আপনার লক্ষ্মী বউটা হতে চাই প্রফেসর সাহেব। জানেন প্রফেসর সাহেব আমি জীবনে কখনো এতটা বেহায়া হইনি যতটা প্রতিদিন আপনার বেলায় হচ্ছি। যে মৌ একসময় বন্ধুদের আড্ডায় বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলত‚ সে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব জীবনে কখনো অন্য কাউকে দেবে না‚ কাউকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসবে না। অথচ আজ দেখেন আমার পুরোটা জীবন‚ আমার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা ও শেষ আশ্রয়স্থল আপনি নিজে হয়ে দাঁড়িয়েছেন। 
 
​মৌয়ের চোখ দুটো এবার কানায় কানায় ভরে উঠল। সে উজানে’র শার্টের বোতামটা নিজের আঙুলে জড়াতে জড়াতে আরও ভাঙা গলায় বলল„ ​"খুব ইচ্ছে হয় জানেন? আপনার ওই গম্ভীর মুখ থেকে অন্তত একটিবারের জন্য হলেও ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনতে। সেই আশায় প্রতিদিন আমার বুকটা ছটফট করে কিন্তু দিনশেষে আপনার ডিকশনারিতে আমার জন্য শুধুই এক মস্ত বড় শূন্যতা। 
 
যদি কখনো দেখেন আমি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু চলার অপেক্ষায় আছে‚ তখন আপনি শুধু আমাকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে একটিবার বলবেন ‘ভালোবাসি মৌ’। দেখবেন এই বেহায়া মেয়েটা শুধুমাত্র আপনার ওই ভালোবাসার লোভে আবারও আপনার কাছে ফিরে আসবে।
 
​মৌ উজানে’র বুকে নিজের হাতটা রেখে চোখ বন্ধ করে নিলে।
"এই বেহায়া মেয়েটা শুধু আপনাকেই চায়‚ একদম পুরোপুরি নিজের করে চায়। যেখানে মৌ ব্যতীত অন্য কেউ আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র অধিকার ফলাতে আসবে না। ভালোবাসি প্রফেসর সাহেব ভীষণ‚ ভীষণ‚ ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে!
 
​উজান তখনও আগের মতোই নিথর দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে রইল। এতকাল এই মেয়েটার প্রতিটা বাচ্চামো আর পাগলামিতে সে ভীষণ বিরক্ত হতো‚ তার প্রতিটা কথা তার কানে কর্কশ শোনাত। অথচ আজ কেন জানি তার একটুও বিরক্তি লাগল না। বরং তার অবাধ্য মন বলছিল‚ এই বেহায়া মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে এভাবেই পুরোটা জীবন পার করে দেওয়া যায়। ​পর মুহূর্তেই উজান নিজের ভেতরের প্রবল পুরুষালী ঘোর কাটিয়ে উঠল। সে মৌ’কে আলতো করে নিজের বুক থেকে নামিয়ে বিছানার ওপর সোজা করে বসাল এবং নিজে তার একদম মুখোমুখি বসল। মৌয়ের অশ্রুসজল চোখের দিকে সরাসরি নিজের স্থির চোখ রেখে অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল„
 
​“শোনো মেয়ে ভালোবাসা কোনো ছেলেখেলা বা পুতুলখেলার নাম নয়। তুমি এখনো বড্ড ছোট‚ ইমম্যাচিউর তাই তুমি ভালোবাসার আসল নির্মম মানে জানো না। ভালোবাসা মানে হলো নিজের সাজানো সুন্দর জীবনটাকে নিজের হাতে ধ্বংস করা। আর একবার যদি সেই জীবনের সুতো কেটে ধ্বংসের মুখে পড়ে যাও‚ তবে দুনিয়ার কোনো শক্তি তোমাকে আর টেনে তুলতে পারবে না।
 
​মৌ নিজের চোখের কোণের অশ্রুটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র আকুতি নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে। 
 
​"তবুও আমি আপনার দেওয়া সেই ধ্বংসটুকুই নিজের জীবনে চাই প্রফেসর সাহেব। আপনার ভালোবাসায় ধ্বংস হতেও আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।
 
উজান তার গভীর দৃষ্টি দিয়ে মৌ’য়ের ওই অশ্রুসজল ও জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বুক চিরে এক দীর্ঘ ও ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই অবুঝ মেয়েটাকে সে কিছুতেই জীবনের কঠিন সমীকরণগুলো বুঝিয়ে উঠতে পারে না। সে যতই মৌ’কে দূরে ঠেলে দিতে চায়‚ মেয়েটা যেন ততটাই তীব্র এক মায়াবী আকর্ষণে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চাইছে। উজান আর কথা বাড়িয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত করতে চাইল না। সে কিছুটা অতিষ্ঠ হয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং আবারও সোফায় গিয়ে নিজের ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিল।
 
​তবে এবার আর মৌ উজান’কে একটুও বিরক্ত করতে গেল না। সে শান্ত হয়ে বিছানার ওপর দু-হাঁটু মুড়ে বসে‚ এক হাত গালে দিয়ে অপলক চোখে সোফায় বসা উজান'কে দেখতে লাগল। তার চোখে তখন একরাশ মুগ্ধতা আর দাবিহীন ভালোবাসা। এদিকে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কোডিং আর ভার্সিটির কাজের ফাঁকে ফাঁকে উজানও বারবার আড়চোখে বিছানার দিকে তাকাচ্ছিল। প্রতিবারই সে দেখছিল‚ মেয়েটা একটুও নড়চড় না করে চাতক পাখির মতো তার দিকেই চেয়ে আছে।
 
​এভাবে কেটে গেল প্রায় ঘণ্টা দুয়েক। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত বারোটা‚ তখন উজান কাজ শেষ করে ল্যাপটপটা অফ করল। সে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা এখনো ঘুমায়নি। বিছানায় একাকী এপাশ-ওপাশ করছে। মৌ কেন এমন ঘুমানোর জন্য ছটফট করছে আর কেনই বা সে একা ঘুমাতে পারছে না‚ তার কারণ উজান চৌধুরী খুব ভালো করেই জানে। ​উজান নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নিঃশব্দ হাসি ফুটিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। 
 
তারপর ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে মৌ'য়ের পাশে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। মৌ কিছু বুঝে ওঠার আগেই উজান নিজের এক জোরালো ও শক্ত হাত বাড়িয়ে মৌ’কে টেনে সরাসরি নিজের চওড়া বুকের মাঝে নিয়ে এলো। ​বুকের মাঝে চেনা উষ্ণতা আর উজানে’র শরীরের ঘ্রাণ পাওয়া মাত্রই মৌ’য়ের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে একটুও দ্বিধা না করে মুহূর্তের মধ্যে উজা’নের শক্ত বুকে নিজের নরম মুখটা গুঁজে দিল। আসলে কাউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোটা মৌ’য়ের বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস; চৌধুরী বাড়িতে আসার আগে নিজের বাসায় সে সবসময় মেহের’কে এভাবে জড়িয়ে ধরে ঘুমাত। আর আজ এই চৌধুরী বাড়িতে এসে উজান চৌধুরী নামক এই খিটখিটে মানুষটা খুব অল্প দিনেই তার বেঁচে থাকার প্রধান অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ​মৌ উজানে’র বুকে মুখ রেখেই নিজের ছোট্ট ও ভেজা গলায় অত্যন্ত আদুরে সুরে ফিসফিসি করলো।
 
"আপনি অনেক ভালো প্রফেসর সাহেব? লাভ ইউ!
 
​কথাটা শেষ করতে করতেই মৌ’য়ের চোখের পাতা দুটো এক অদ্ভুত শান্তিতে ও ঘুমে বুজে এলো। উজানে’র বুকে নিরাপদ আশ্রয়ে সে নিমেষেই গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল। ​উজান নিজের বুকের ওপর মৌ’য়ের শান্ত নিশ্বাস অনুভব করে অন্ধকারে নিঃশব্দে ও পরম তৃপ্তিতে হাসল। তার নিজেরও জানা নেই‚ কখন এই পুঁচকে মেয়েটা তার পাথুরে হৃদয়ে কিছুটা অধিকার হরণ করে নিয়েছে। সে নিজের অলক্ষ্যেই‚ অত্যন্ত আলতো ও কোমল ছোঁয়ায় মৌ’য়ের রেশমি চুলগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একসময় উজান নিজেও মৌ’কে বাহুবন্ধনে আগলে রেখে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমাল।
 
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
পর্ব— ০৭
 
 
 
 
মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। পুরো আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আছন্ন। আজ আকাশটা যেন ভীষণ অভিমান করে বসে আছে‚ সেই অভিমানেই হয়তো চাঁদেরও আজ দেখা মেলেনি। মাথার ওপরের সেই মেঘলা আকাশটার দিকেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেহের। রাত তখন বেশ গভীর‚ চারদিক নিস্তব্ধ‚ অথচ এই অসময়েও মেহের একাকী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই চৌধুরী বাড়িটা তার ভীষণ পছন্দের একটা জায়গা হয়ে উঠেছে‚ কারণ এখানে সে নিজের মনের মতো করে থাকতে পারে। কেউ কখনো তার কোনো ইচ্ছেতে অনধিকার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে বাধা দেয় না। ​এত রাতে সে যখন ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিল‚ তখন আকবর চৌধুরী (যিনি সম্পর্কে উজানে’র চাচা এবং ইফাতে’র নিজের বাবা) তাকে এত রাতে ছাদে যেতে বারণ করেছিলেন বটে‚ তবে মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে তার ইচ্ছেতে আর জোর খাটাননি। এই অল্প কদিনের মধ্যেই মেহেরে’র প্রতি এক অন্যরকম পিতৃত্বের টান অনুভব করেন তিনি। নিজের কোনো কন্যাসন্তান নেই বিধায় মেহের’কে তিনি একদম নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। তাই তো মেহের ছাদে আসার পর থেকে এই গভীর রাতের মাঝেও সেই মানুষটা দূর থেকে বারবার উঁকি দিয়ে দেখে গিয়েছেন যে তার মা জননী একা একা ভয় পাচ্ছে কিনা। 
 
মেহের অবশ্য তার সেই স্নেহমাখা চাউনি বুঝতে পেরেছিল। তাই সে নিজে থেকেই তাকে হেসে বলেছিল‚ সে যেন রুমে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান। এই পৃথিবীতে যদি তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কোনো জায়গা থাকে, তবে তা হলো আপনাদের এই বাড়িটা। মেহেরে’র মুখে এমন ভরসার কথা শুনে আকবর চৌধুরী নিজের মনের সমস্ত চিন্তা কাটিয়ে কিছুক্ষণ আগেই রুমে ফিরে গিয়েছেন। ​মেহের এবার নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদের দিকে তাকাল এবং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। পাশের ছাদের একটা দোলনায় বসে এক কপোত-কপোতী পরম আনন্দে দুলছে আর গল্প করছে। এই চৌধুরী বাড়িতে আসার পর মেহেরে’র ওদের সাথে কয়েকবার কথা হয়েছে। দুজনেই ভালোবেসে একে অপরকে বিয়ে করেছে এবং এখন তারা হাসব্যান্ড-ওয়াইফ। বেশ মানিয়েছে দুজনকে কিন্তু ওই সুখী দম্পতিকে দেখতে দেখতেই আচমকা মেহেরে’র সেই হাসোজ্জ্বল মুখটা যেন এক নিমিষে কালবৈশাখীর কালো মেঘে ঢেকে গেল। ছাদের তীব্র ঠান্ডা বাতাস এসে যেমন তার খোলা চুলগুলোকে ওড়াতে লাগলো‚ ঠিক তেমনি তার ভেতরের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টাকেও চট করে এলোমেলো করে দিল।
 
পাঁচ বছর আগের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়ঙ্কর কালরাত আজও তার পিছু ছাড়েনি। প্রতি নিয়ত সেই অতীত মনের ভেতর এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গিয়েছে। ​ঠিক তখনই মেহেরে’র নাসিকাপটে পুরুষালী পারফিউমের এক মিষ্টি ও চেনা ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দিল। এই সুবাস বড্ড চেনা তার। সে আলতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল ইফাত এসে দাঁড়িয়েছে। মেহের এবার আর আগের মতো রাগ করে বা ঝামটা দিয়ে চলে গেল না বরং রেলিং ধরে আগের মতোই শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই চঞ্চল লোকটার সাথে তার মোটেও কথা বলতে ইচ্ছে করে না কিন্তু লোকটা চুইংগামের মতো সারাক্ষণ তার পিছু ছাড়ে না। অবশ্য এতদিনে মেহের ইফাতে’র মধ্যে কোনো খারাপ বা কুৎসিত উদ্দেশ্য খুঁজে পায়নি। আর ঠিক সেই ভরসাতেই সে এখনো শান্ত হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ​ততক্ষণে নীরবতা ভেঙে ইফাতে’র ভরাট কণ্ঠস্বর মেহেরে’র কানের কাছে ভেসে এলো।
 
​“আই অ্যাম রিয়েলি সরি‚ আমার ফুলকন্যা!
 
​ইফাতে’র মুখে ওই একটি শব্দে মেহেরে’র থমকে যাওয়া হৃদয়ে হঠাৎই এক অজানা দোলা দিয়ে উঠল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে এক রাশ গভীরতা নিয়ে ইফাতে’র চোখের দিকে তাকাল। ‘ফুলকন্যা’ নামটা শুনতে ভীষণ কিউট আর মিষ্টি লাগে বটে‚ তবে নামটা যে তার এই অন্ধকারময় জীবনের সাথে বড্ড বেশি বেমানান। সে এক বিষাদময় তপ্ত হাসি হাসলো। 
 
​"নামটা ভীষণ সুইট। তবে এই সুন্দর উপাধিটা আমার মতো মেয়ের জন্য একদমই নয়। সেই জন্য আপনি আমাকে ‘মেহের’ নামেই ডাকতে পারেন। আর হ্যাঁ‚ হঠাৎ এত রাতে সরি বলার কারণটা জানতে পারি?
 
​মেহেরে’র মুখে কোনো রাগ বা বিরক্তি না দেখে ইফাতে’র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চঞ্চল হাসি ফুটে উঠল। মেহেরে’র কথার মাঝে আজ একটুও বিরক্তির ছোঁয়া নেই। ইফাত ঠিক এইটুকুই চেয়েছিল মেয়েটার কাছ থেকে। সে নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে চপল সুরে আওড়ায়‚
 
​“তুমি এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলো কী করে‚ হ্যাঁ? আর তুমি কি জানো‚ যখন তুমি হাসো তখন দেখতে বড্ড বেশি কিউট লাগে তোমায়?
 
​মেহের এবার এক ভ্রু কুঁচকে ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে বলল‚ "ফ্লার্ট করছেন আমার সাথে? 
 
​“আরে না। আমি একদম সিরিয়াসলি বলছি। 
 
​মেহের নিজের মুখটা ঘুরিয়ে আবারও সামনের ওই মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। বুক চিরে এক গভীর শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল‚ "তা আপনার ডজন ডজন গার্লফ্রেন্ড বুঝি আজ অভিমান করে বসে আছে? তাই তাদের না পেয়ে আমার সাথে টাইম পাস করতে এসেছেন এখানে?
 
​“আচ্ছা তুমি কথায় কথায় ওইসব মেয়েদের কেন টেনে আনো বলো তো? শোনো ফুলকন্যা‚ এই গার্লফ্রেন্ড বলে আমার ডিকশনারিতে কোনো শব্দ নেই। ওরা আমার জাস্ট ফ্রেন্ড‚ ব্যস। 
 
​"হুম বুঝতে পারছি।
 
​এরপর দুজনেই কিছু সময়ের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল। মেহের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও‚ ইফাতে’র অবাধ্য চোখ জোড়ার সমস্ত দৃষ্টি কিন্তু পুরোপুরি মেহেরে’র ওই মায়াবী মুখের ওপরই আটকে ছিল। কেন যে তার এই চঞ্চল চোখ দুটো দুনিয়ার সব মেয়েকে বাদ দিয়ে শুধু এই শান্ত মেয়েটার কাছে এসেই থমকে যায়। তা ইফাত নিজেও জানে না। সে অনেক চেষ্টা করেছে মেহেরে’র থেকে দূরে থাকার কিন্তু মন যেন কিছুতেই সায় দেয় না। যে ইফাত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাইশ ঘণ্টাই বাড়ির বাইরে বন্ধুদের সাথে টইটই করে আড্ডা দিয়ে বেড়াত। যা নিয়ে তার মায়ের অভিযোগের কোনো শেষ ছিল না। সেই ইফাত এখন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাতে গোনা মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকে আর বাকিটা সময় ঘরের কোণে কাটায়। আর এই জাদুকরী পরিবর্তনের মূল কারণ যে মেহের নিজেই‚ তা বাড়ির অন্য সবাই বুঝতে না পারলেও উজানে’র তীক্ষ্ণ চোখ কিন্তু ঠিকই ফাঁকি দিতে পারেনি। উজান অবশ্য বারণ করেনি‚ তবে সব কিছু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। কারণ একটা ভুল সিদ্ধান্ত যে পুরো লাইফটা এক নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারে‚ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ তো উজান নিজেই।
 
​এই গভীর নীরবতার মাঝেই হুট করে ইফাতের পকেটে থাকা ফোনটা অনবরত কেঁপে উঠল। আজ এইটুকু সময়ে কম হলেও অন্তত পঞ্চাশবারের ওপর ফোন এসেছে তার মোবাইলে। আর মেসেজের তো কোনো হিসাবই নেই। এই অনবরত নোটিফিকেশনের শব্দে ইফাত ভীষণ বিরক্ত হলো। মনে মনে ভাবল‚ যেখানে সে নিজে থেকে কারো ফোন ধরছে না‚ সেখানে এই মেয়েদের এত মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করার কী দরকার। ইফাতে’র ওই চরম বিরক্তি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে মেহের আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না‚ সে খিলখিল করে হেসে উঠল। মেহেরে’র সেই মুক্তো ঝরানো হাসির দিকে তাকিয়ে ইফাতও নিজের সমস্ত বিরক্তি ভুলে নিঃশব্দে হেসে ফেলল। ​মেহের নিজের হাসি থামিয়ে বলল‚
 
"আপনার এত এত ভালোবাসার মানুষ আপনাকে মনে করে ফোন-মেসেজ করছে অথচ আপনি রোমিও সেজে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? তাদের সাথে কথা বলছেন না কেন?
 
​“আরে চুপ কর তো। ওই অসহ্য মেয়েদের সাথে এখন আর বিন্দুমাত্র কথা বলতে ইচ্ছে করে না আমার। জানো‚ গত এক সপ্তাহ থেকে আমি কারো সাথে একটাও কথা বলিনি। সবার সাথে একদম অফিশিয়ালি ব্রেকআপ করে নিয়েছি। তবুও কিছু বেয়াদব মেয়ে নাছোড়বান্দার মতো আমাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে।
 
"তবে আমি তো জানতাম ওইসব সুন্দরী মেয়েদের সাথে চ্যাট করতে আর ফ্লার্ট করতে না পারলে আপনার মনের নাকি শান্তি মেলে না?
 
​“ওটা শান্তি ছিল না ফুলকন্যা‚ ওটা ছিল একটা সস্তা নেশা। অবশ্য সেই সস্তা নেশা আমার মন থেকে এখন পুরোপুরি কেটে গিয়েছে। এখন আমার লাইফে এমন একজন বিশেষ মানুষ এসেছে‚ যাকে ঘিরে এই চঞ্চল আমিটা বাকি জীবনটা শান্ত হয়ে কাটাতে চাই। তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য শুধু এই মেয়েদের নেশা কেন‚ আমার লাইফের যত রকমের বাজে অভ্যাস আছে। আমি এক পলকে সব ছেড়ে দিতে রাজি আছি।
 
​মেহের ইফাতে’র চোখের সেই গভীর আকুলতা দেখতে পেলো না। তাই মুচকি হেসে বলল‚ "বেশ ভালো তো। তা আপনার সেই বিশেষ মানুষটার সাথে আমাকে কোনোদিন একটু দেখা করিয়ে দিয়েন তো? না মানে‚ আমি তাকে পার্সোনালি একটু বলে দিতাম। যাতে সে আপনাকে সারাদিন ওভাবে টইটই করে ঘুরতে না দিয়ে জলদি কোনো একটা জবে জয়েন করতে বাধ্য করে।
 
​ইফাত মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো উজ্জ্বল করে বলল‚ “আমি কোনো জব বা বিজনেস করলে তুমি খুশি হবে ফুলকন্যা?
 
​"আমার খুশির চেয়েও আপনার মা-বাবা সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। তারা সবসময় চান তাদের একমাত্র ছেলে যেন এবার একটু সংসারী হয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়াক।
 
​“ওকে ফাইন। আগামীকাল থেকেই আমি ড্যাডের সাথে অফিসে যাব আর মন দিয়ে বিজনেস শিখব।
 
​এরপর মেহের আর কথা বাড়াল না। রাতের শীতল বাতাসের গতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকায় তার শরীরটা কিছুটা কাঁপছিল। তাই সে রেলিং ছেড়ে পাশের দোলনাটায় গিয়ে বসল। ইফাতও কোনো দ্বিধা না করে ধীরপায়ে গিয়ে তার ঠিক পাশেই বসল। গত এক সপ্তাহে এই মানুষটাকে মোটামুটি খুব কাছ থেকে চিনেছে মেহের। সে মনে মনে যতটা খারাপ ভেবেছিল‚ লোকটা আসলে তেমন নয়। শুধু একটু ছন্নছাড়া আর অবাধ্য। এতকাল পুরুষ জাতির প্রতি মেহেরে’র মনে যে তীব্র ঘৃণা আর ভয় জন্মেছিল। চৌধুরী বাড়ির ছেলেদের ব্যবহার দেখে তা যেন এখন একটু হলেও কমতে শুরু করেছে। এই বাড়ির প্রতিটা ছেলেই একদম ভিন্ন ধাতুতে গড়া‚ তারা নারীদের সম্মান করতে জানে। ​ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে ইফাত আবারও ফিসফিস করে মেহেরে’র কানের কাছে মুখ এনে শুধাল।
 
​“আচ্ছা ফুলকন্যা‚ এই মাঝরাতে একা একা অন্ধকার ছাদে চলে এলে। তোমার একটুও ভয় করছিল না? যদি হুট করে কোনো ভূত-প্রেত চলে আসত?
 
​মেহের এবার নিজের পুরো দৃষ্টিটা স্থির করে ইফাতে’র চোখের ওপর রাখাল। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই চিরচেনা বিষাদময় তপ্ত হাসিটা ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় উওর দিল। 
 
​"তাসনুভা মেহের কোনো কাল্পনিক ভূত-প্রেতকে ভয় পায় না মিস্টার। সে যদি এই পৃথিবীতে কাউকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়‚ তবে তা হলো এই নিষ্ঠুর পুরুষ জাতিকে। যারা নিজের স্বার্থের জন্য একটা মেয়ের আলোয় ভরা সুন্দর জীবনটাকে এক নিমেষে অন্ধকার নরক বানিয়ে দিয়েছিল।
 
​মেহেরে’র কথার ভেতরের সেই তীব্র লুকানো ক্ষত টের পেয়ে ইফাতে’র বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে অত্যন্ত নরম সুরে জিজ্ঞেস করল‚ “সেই জন্যই কি তাহলে তুমি এতদিন আমার সাথে একটাও কথা বলোনি। আমাকে এড়িয়ে চলেছো? কিন্তু কেন তুমি পুরুষ জাতিকে এত ভয় পাও ফুলকন্যা? কী হয়েছিল তোমার অতীতে?
 
​মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। "সেসব কথা আপাতত মনের গহীন কোণেই লুকানো থাক। সময় হলে কোনো একদিন না হয় বলব। 
 
 “কিন্তু তার আগে বলো‚ শুনলাম তুমি আমাদের এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছ? কথাটা কি সত্যি? 
 
"আপনাদের বাসায় মেহমান হয়ে রয়েছি আজ প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেল। তাছাড়া আগামীকাল থেকে আমাদের কলেজও খুলে যাবে। তাই ভাবছি আমি কাল কলেজ শেষ করেই সরাসরি ফুঁপির বাসায় চলে যাব। ভাইয়াকে বলে দিয়েছি‚ সে এসে আমার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাবে।
 
​“মাত্র পনেরো দিনেই কেউ এভাবে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়? 
 
 "বোনের বাড়িতে এত বেশিদিন থাকতে নেই।  
 
মেহের দোলনায় দুলতে দুলতে বলল। ​ইফাত মেহেরে’র কথা শুনে নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল‚ ​“তাহলে নিজের শ্বশুর বাড়ি বানিয়ে ফেলো। 
 
​মেহের ইফাতে’র সেই অস্পষ্ট কথা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল‚ "কিছু বললেন আপনি? 
 
“না না‚ কিছু বলিনি। অনেক রাত হলো আকাশে মেঘও বাড়ছে‚ চলো এবার নিচে নামা যাক।
 
মেহের ইফাতে’র পায়ে পা মিলিয়ে নিচে নেমে গেলো। আর ইফাত আড় চোখে বারবার মুগ্ধকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
 
 
 
🌸🖤
​আজ উজানে’র ভার্সিটির প্রথম দিন। তাই আগেই রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়। তারপর ধীরে ধীরে আরিয়ানে’র পাশে গিয়ে বসলো । সোফার অন্য প্রান্তে বসে আরাম করে সকালের গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আরিফুল চৌধুরী ও আকবর চৌধুরী। উজান সোফায় বসে কোনোদিকে না তাকিয়ে একমনে নিজের ফোনের স্ক্রিন স্ক্রল করতে লাগল। ঠিক তখনই আরিফুল চৌধুরী চায়ের কাপটা পিরিচে রেখে‚ ছেলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলে উঠলেন। 
 
​"কী রে বাপ? গত রাতের ঘুম কেমন হলো তোর?
 
​বাবার মুখ থেকে হুট করে এমন অদ্ভুত ও বাঁকা প্রশ্ন শুনে উজান নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সকাল সকাল বাবা হঠাৎ তাকে ঘুমের ব্যাপারে কেন এমন জেরা করছেন? তার মাথায় ঠিক ঢুকল না। সে নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে সংক্ষেপে জবাব দিল।
 
​“কেমন আবার হবে? রোজ যেমন স্বাভাবিক ঘুম হয়‚ গত রাতেও তেমনই হয়েছে।
 
​আরিফুল চৌধুরী এবার সোফায় আরও একটু ঝুঁকে এসে চোখ টিপে বললেন‚ "একদম ঠিকঠাক‚ শান্তিমতো ঘুমটা হয়েছে তো?
 
​বাবার এই মাত্রাতিরিক্ত কৌতুহল আর চপল চাহনি দেখে উজান এবার পুরোপুরি বিরক্ত হলো। সে ফোনটা পকেটে পুরে ফিসফিসিয়ে করলো। “ড্যাড সকাল সকাল দয়া করে আমার সাথে ফাজলামো করো না তো। নিজের জোয়ান ছেলেকে সবার সামনে এমন লজ্জাজনক প্রশ্ন করতে তোমার একটুও বাধল না? ছিঃ।
 
​"আরে এতে আমার লজ্জা করতে যাবে কেন‚ হ্যাঁ?
 
আরিফুল চৌধুরী বুক ফুলিয়ে মোক্ষম জবাব দিলেন। ​বাবার এমন ত্যাড়াবেঁড়ি উত্তরের পর উজানে’র অবস্থা এখন একদম বেহাল! মনে মনে ভাবল‚ তার কপালটাই আসলে মন্দ। একদিকে ঘরে আছে তার ফাজিল বউ‚ তো অন্যদিকে নিজের ঘরের ভেতরেই বসে আছে সবচেয়ে বড় শত্রু নিজের জন্মদাতা বাপ। রুমে থাকলে বউ সারাদিন জ্বালিয়ে মারে আর একটু শান্তির জন্য বাইরে বের হলে এই বাবা নামক শত্রু পেছনে লেগে থাকে। ​উজান’কে চুপ থাকতে দেখে আরিফুল চৌধুরী এবার মুখটা বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে উঠলেন‚
 
"ছিঃ তুই আমার ছেলে ভাবতেও লজ্জা লাগে। বিয়ের দুই সপ্তাহ হয়ে গেলো এখনো দাদা হওয়ার সু খবর দিতে পারলি না শালা৷ লজ্জায় আমার মাথা কাঁটা যাচ্ছে। কেমন ছেলে পয়দা করলাম আমি ছিঃ ছিঃ।
 
​বাবার মুখ থেকে সবার সামনে 'শালা' উপাধি শোনা মাত্রই উজান সোফা থেকে একপ্রকার ছিটকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। সকাল সকাল এই টর্চার সে আর নিতে পারছে না। সে ডাইনিং স্পেসের দিকে তাকিয়ে বাচ্চার মতো চেঁচিয়ে ডাকল।
 
​“আম্মু ও আম্মু! তাড়াতাড়ি এদিকে এসে দেখে যাও তোমার ওই শয়তান জামাই সকাল সকাল আমার সাথে কেমন জঘন্য ব্যবহার করছে।
 
​ঠিক সেই মুহূর্তেই কিচেন রুম থেকে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন মৌসুমি চৌধুরী। এসেই নিজের স্বামীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বললেন‚ ​"তুমি আবার সাতসকালে আমার ছেলেটার পেছনে লেগেছো? ছেলেটার আজ ভার্সিটির প্রথম দিন। নতুন করে ক্লাসে নেবে‚ মনটা ফ্রেশ রাখা দরকার। তোমার বুড়ো বয়সের ফাজলামো আর বিরক্ত করা একটুও বাদ যায় না?
 
​বউয়ের ওই বাঘিনী রূপ দেখে আরিফুল চৌধুরী মুহূর্তের মধ্যে মিইয়ে গেলেন। সে আমতা-আমতা করে বললেন‚ "আরে না মৌসুমি তুমি ভুল বুঝছো। আমি তো জাস্ট ওকে....
 
​"তুমি একদম চুপ করো। আর একটাও বাড়তি কথা যদি আমার ছেলের উদ্দেশ্যে বলেছো‚ তবে আজ তোমার কপালে কোনো ভাত জুটবে না বলে দিলাম।
 
​বউয়ের মুখে ভাত বন্ধের হুমকি শোনা মাত্রই আরিফুল চৌধুরী একদম ভেজা বেড়ালের মতো চুপসে গিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসলেন। বাবার এই করুণ দশা দেখে উজান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে সোফায় বসে শব্দ করে হেসে উঠল এবং বাবার দিকে তাকিয়ে টিটকারির সুরে বলল‚ “কী হলো ড্যাড? এখন একেবারে চুপ মেরে গেলে কেন? হু এসেছে আমার সাথে লাগতে। 
 
​মৌসুমি চৌধুরী তখন উজানে’র পাশে বসে তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে লাগলেন। ঠিক তখনই পাশে বসা আরিয়ান উজানে’র গলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে হঠাৎ অত্যন্ত গম্ভীর ও রসাত্মক সুরে বলে উঠল‚ ​"আচ্ছা ভাই তোর গলার ডানপাশে ওটা কিসে কামড় দিয়েছে রে? লাল হয়ে ফুলে আছে যে।
 
​সবার সামনে আরিয়ানে’র এমন মারাত্মক ও বোমা ফাটানো প্রশ্নে উজান মুখের খাবার গিলতে গিয়ে একদম থমকে গেল। সে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা করে সাথে সাথে নিজের এক হাত দিয়ে গলার সেই নির্দিষ্ট অংশটা চেপে ধরল। হ্যাঁ‚ সেখানে স্পষ্ট একটা লালচে কামড়ের দাগ বসে আছে। গত রাতে ঘুমানোর ঘোরে মৌ মহাশয়া উজান’কে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় হঠাৎ করেই উজানে’র গলাটাকে 'চিকেন লেগ পিস' ভেবে সজোরে কামড় বসিয়ে দিয়েছিল। এটা নিয়ে আজ সকালেই ঘুম থেকে ওঠার পর দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া আর যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আর সেই রাগে-ক্ষোভে মেজাজ গরম করে নিচে নামতেই এখন সবার সামনে এই নতুন কাণ্ড। ​উজান নিজের লজ্জাটুকু রাগ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে আরিয়ানে’র দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে চরম হুমকি দিলো।
 
“ভাইয়া বেশি কথা বললে তোমাকে আজ এমন জায়গায় লাথি মারব যে সারাদিন মানুষের সামনে মুখ লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে‚ মনে রেখো। 
 
​আরিয়ানে’র কথার খেই ধরে এবার ছোট চাচা আকবর চৌধুরীও নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে কৌতূহলী গলায় বললেন‚ "সত্যিই তো আরিয়ান তো ভুল কিছু বলেনি। ওভাবে কিসে দাগ হলো তোর গলায়? মশা তো এত বড় কামড় দেয় না। 
 
​আরিয়ান হাসতে হাসতে বলে‚ "এখনো বুঝলে না ছোট চাচ্চু? নতুন নতুন বিয়ে করেছে। রুমে একদম ব্র্যান্ড নিউ বউ এসেছে সো গলায় এমন মশা-মাছির কামড়ের দাগ তো একটু-আধটু থাকবেই। অথচ আমাদের সামনে জেন্টলম্যান সেজে এমন ভাব ধরে থাকে‚ যেন কত বড় সাধু পুরুষ। 
 
 “ভাইয়াআআআআ
 
 
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
 
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব— ০৮+০৯
 
"এখনো বুঝলে না ছোট চাচ্চু? নতুন নতুন বিয়ে করেছে। রুমে একদম ব্র্যান্ড নিউ বউ এসেছে সো গলায় এমন মশা-মাছির কামড়ের দাগ তো একটু-আধটু থাকবেই। অথচ আমাদের সামনে জেন্টলম্যান সেজে এমন ভাব ধরে থাকে‚ যেন কত বড় সাধু পুরুষ। 
 
 “ভাইয়াআআআআ
 
​ততক্ষনে আরিয়ান দৌড়ে তুবা’র কাছে চলে গেলো। একটুর জন্য প্রানটা বেরিয়ে যায়নি। হঠাৎ সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ড্রয়িং রুমের সিঁড়ির মুখে। ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে ধীরপায়ে নিচে নেমে আসছে ইফাত। তাকে ওভাবে দেখে ড্রয়িং রুমের হাসির রোল এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল‚ সবার চোখ যেন ছানাবড়া। যে ছেলে প্রতিদিন দুপুর বারোটা কিংবা একটার আগে ঘুম থেকে চোখই মেলে না‚ সেই কুঁড়ে ও ছন্নছাড়া ছেলেটা আজ সকাল আটটার মধ্যে নিজে থেকে ঘুম থেকে উঠে একদম রেডি হয়ে নিচে নামছে। এটা যেন কারো বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। ​ইফাত অবশ্য কারো দিকে ফিরেও তাকাল না। সে সোজা ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল‚ যেখানে তার মা ইমরোজা চৌধুরী সকালের নাস্তা সার্ভ করছিলেন।
 
 ইফাত টেবিলে গিয়ে কোনো কথা না বলে হঠাৎ করেই একটু নিচু হয়ে মায়ের পা ছুঁয়ে পরম শ্রদ্ধায় সালাম করল। তারপর পাশে দাঁড়ানো বড় আম্মা অর্থাৎ আরিয়ান-উজানে’র মা মৌসুমি চৌধুরীর পা ছুঁয়েও সালাম করল। আকস্মিক এই কাণ্ডে দুই মায়ের কেউই তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন না। ইমরোজা চৌধুরী ছেলের এমন অভাবনীয় পরিবর্তনে চোখ দুটো মুছলেন। তারপর পরম মমতায় ছেলেকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে মুচকি হাসলেন। 
 
​"পাগল ছেলে আমার। ওভাবে হুট করে পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেই আব্বা‚ এতে পাপ হয়।
 
​ইফাত মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত নরম সুরে বলল‚ “কে বলেছে তোমায় এই ভুল কথা আম্মু? যে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত লুকিয়ে থাকে‚ সেই পুণ্যময় পায়ে সালাম করা যদি পাপ হতো তবে আল্লাহ তায়ালা কখনোই মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত লিখে দিতেন না। তুমি আমার মা‚ আমার আম্মু‚ আমার জন্মদাত্রী জননী।
 
​ছেলের মুখ থেকে এমন পরিণত ও সুন্দর কথা শুনে ইমরোজা চৌধুরীর চোখ দুটো আনন্দে কানায় কানায় ভরে উঠল। তিনি পরম আদরে ছেলের কপালে একটা স্নেহের চুমু খেয়ে মনে মনে হাসলেন। যাক‚ অবশেষে তার এই ছন্নছাড়া‚ অবাধ্য ছেলেটা তবে তার অন্ধকার ও দিশাহীন জীবন থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। তিনি ইফাতে’র দিকে কিছুটা ঝুঁকে অত্যন্ত নিচু ও ফিসফিসানি স্বরে আওড়ালেন। 
 
​"তোর মনের ভেতরের সেই পবিত্র আশা আল্লাহ খুব জলদি পূরণ করুক আব্বা। আমি মা হয়ে আজ অন্তরের অন্তস্তল থেকে আল্লাহর কাছে এটাই চাই। তিনি নিশ্চয়ই একজন মায়ের আকুতি কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।
 
​ইফাত মায়ের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে এক মায়াবী মৃদু হাসল। সে মেহেরে’র দেওয়া সেই রূপান্তরের কথা মনে করে মনে মনে এক নতুন শক্তি পেল। এরপর সে বড় আম্মার সাথেও মিষ্টি করে কুশল বিনিময় করে সোজা এসে আরিয়ানে’র সামনে দাঁড়াল। তারপর নিজের চপল ভাবটা সম্পূর্ণ লুকিয়ে মুখে এক রাশ গম্ভীরতা ফুটিয়ে আওড়াল„
 
​“ভাইয়া তাড়াতাড়ি চল লেট হয়ে যাবে। 
 
​আরিয়ান মুখের পরোটা চিবানো বন্ধ করে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে বোকার মতো তাকাল। "যাবো মানে? কী বলছিস এসব?
 
​“ভাইয়া প্লিজ অন্তত আজ একটু সিরিয়াস হও তো
 
​"আরে আমি আবার কী করলাম? আর তুই এত সকাল সকাল কর্পোরেট লুক নিয়ে রেডি হয়ে বা কোথায় যাওয়ার জন্য আমায় তাড়া দিচ্ছিস শুনি?
 
​“কোথায় আবার‚ আজ থেকে তোমার সাথে রোজ অফিসে যাবো। বয়স তো কম হলো না‚ এবার তো কিছু একটা করা উচিত তাই না? 
 
​"হোয়াটটটটটট?
 
​ডাইনিং টেবিলের ওপাশ থেকে সোফা ছেড়ে এক সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন ইফাতে’র বাবা আকবর চৌধুরী। চায়ের কাপটা তার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। যে ছেলে নিজের হাতে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত গড়িয়ে খায় না‚ বাসার একটা ছোট কাজ করতে বললে সারা বাড়ি মাথায় তোলে। সেই ছন্নছাড়া ছেলে আজ থেকে রোজ সকালে অফিসে যাবে‚ এটা ভাবাও যেন এক মস্ত বড় অলৌকিক ঘটনা! ​ইফাত একরাশ বিরক্তিমাখা দৃষ্টি নিয়ে তার বাবার দিকে তাকাল। এই বাড়িতে কোনো ভালো কাজ করতে গেলেও বিপদ। যখন সে সারাদিন বন্ধুদের সাথে টইটই করে ঘুরে বেড়াত‚ কোনো কাজ করত না‚ তখন সবাই তাকে বকাঝকা করত। আর আজ যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাচ্ছে তখনই সবাই তাকে নিয়ে রসিকতা করছে। 
 
“ড্যাড তুমি আসলে কী বলতে চাও বলো তো? যখন তুমি নিজে থেকে আমায় বারবার অফিসে যাওয়ার জন্য জোর করতে‚ তখন আমি যাইনি‚ সেটা আমার ভুল ছিল। কিন্তু আজ যখন আমি নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে অফিসে যেতে চাচ্ছি‚ তখনো তোমাদের এত প্রবলেম? আর হ্যাঁ‚ ভাইয়া শোনো আজই অফিসে গিয়ে আমার মাসিক স্যালারি কত হবে তা ফিক্সড করে দেবে। আমি আর আজ থেকে বাপ-ভাইয়ের পকেটের ফ্রিতে দেওয়া টাকায় এক আনাও চলব না। অফিসে বাকি সব কর্মচারীদের যেমন যোগ্যতা অনুযায়ী স্যালারি দাও‚ আমাকেও ঠিক তেমনটাই দেবে বুঝলে?
 
​আকবর চৌধুরী ছেলের এই রুদ্র ও পরিণত রূপ দেখে সম্পূর্ণ চমকে গেলেন। ছেলের মুখের ওপর এমন গম্ভীর ও দায়িত্বশীল কথা তিনি এতো বছরেও শোনেননি। তবে ছেলের এই জেদ দেখে তার মনের ভেতরে এক বিশাল আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। মনে মনে ভাবলেন‚ দেরি করে হলেও ছেলেটা অবশেষে নিজের ভবিষ্যৎ আর জীবনের মূল্য বুঝতে পেরেছে।
 
​এদিকে উজান সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ইফাতে’র দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে একটা আলতো চাপ দিয়ে মৃদু হেসে বলল‚ “বেস্ট অফ লাক দোস্ত! তোর এই নতুন শুরুর জন্য অনেক শুভকামনা রইল। আচ্ছা আমি এবার আসি‚ লেট হয়ে যাচ্ছে। 
 
​উজান সদর দরজার কাছাকাছি যেতেই ঠিক তখনই কোথা থেকে মৌ তড়িৎ গতিতে চিলের মতো ছুটে এসে পেছন থেকে উজান’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ​বেচারা উজান আকস্মিক এই অতর্কিত আক্রমণে তীব্র ভয়ে আর আতঙ্কে এক লাফে প্রায় দুই হাত দূরে সরে গেল। পরক্ষণেই পেছনে তাকিয়ে মৌ’কে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুক থেকে এক মস্ত বড় ভয়ের খাঁচা নেমে গেল। সে নিজের বিরক্তিমাখা চোখ দুটো বড় বড় করে রাগান্বিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল„
 
​“এই ইডিয়ট মেয়ে সকাল সকাল আমাকে এভাবে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মার্ডার করতো চাও? আর বাসার সবার সামনে ওভাবে জড়িয়ে ধরলে কেন? লজ্জা-শরমের মাথা কি একদম চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছো?
 
​মৌ উজানে’র ওই রাগী ধমক শুনে বিন্দুমাত্র দমল না বরং নিজের ওড়নাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলে‚ "সব সময় শুধু শুধু আমার ওপর এমন চিল্লাইবেন না তো। আমি কি ইচ্ছে করে সবার সামনে আপনাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরেছি নাকি? আর একটু প্লিজ আমার সাথে রুমে চলুন।
 
​“এই মেয়ে তোমার প্রবলেম কী? একটু আগে আমার সাথে অত বড় ঝগড়া করলে আর এখন আবার কোন আক্কেলে আমায় রুমে যেতে বলছো?
 
​ "রুমে আরশোলা ঢুকেছে। প্লিজ চলুন না আমার সাথে? আমার বড্ড ভয় করছে।
 
​“সামান্য একটা আরশোলা দেখে তোমার এত ভয়? আর আমি এখন কোনোমতেই তোমার সাথে উপরে যেতে পারব না। আমার ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস আছে। তোমার ভয় লাগলে তুমি অন্য কোথাও গিয়ে চুপচাপ বসে থাকো।
 
​"প্লিজ প্রফেসর সাহেব। একটিবারের জন্য চলুন না‚ প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
 
মৌ এবার উজানে’র শার্টের হাতা ধরে একদম ঝুলে পড়ল। ​উজান ডাইনিং টেবিলের দিকে এক পলক তাকলো। তারপর সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌ’য়ের পিছু পিছু আবার দোতলার রুমের দিকে পা বাড়াল। উজান ​রুমে প্রবেশ করা মাত্রই মৌ তড়িঘড়ি করে পেছনের দরজাটা লক করে দিল এবং উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানার ওপর ফেলে দিল। উজান বিছানায় আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই মৌ নিজে এক লাফে এসে উজানে’র চওড়া বুকের ওপর পুরোপুরি শুয়ে পড়ল।
 
​মৌয়ের এমন আকস্মিক ও মারাত্মক কাণ্ডে উজান একদম স্তব্ধ ও আহাম্মক হয়ে রইল। সে মৌ’কে নিজের গায়ের ওপর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু সরাতে পারল না। মৌ নিজের ছোট ছোট দু-হাত দিয়ে উজানে’র শার্ট এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে যেন কোনোভাবেই তাকে ছাড়বে না। উজান এবার দাঁতে দাঁত পিষে চেঁচিয়ে উঠল‚
 
​“এই ফাজিল মেয়ে তুমি না নিচে বললে রুমে আরশোলা ঢুকেছে? কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি রুমে এনে আমার সাথেই চরম ফাজলামো করছো এক্ষুনি নামো আমার ওপর থেকে। 
 
​মৌ উজানে’র ধমক শুনে এবার নিজের মুখটা একটু ওপরে তুলল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক মায়াবী ও চপল মুচকি হাসি। সে কোনো কথা না বলে অত্যন্ত পরম মমতায় উজানে’র ধারালো চিবুকের ওপর আলতো করে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। ​উজান একদম বিস্ময়কর ও স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মৌ’য়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মগজ যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মেয়েটা দিন দিন কতটা অভদ্র আর বেহায়া হয়ে যাচ্ছে। কোনো বারণ বা ধমক সে কানেই তোলে না। উজান নিজের চোখ দুটো রাঙিয়ে কঠোরভাবে তাকাল তবুও মৌ’য়ের মধ্যে সেই নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ বা ভয় দেখা গেল না। সে উজানে’র কানের লতির কাছে নিজের ঠোঁট দুটো ঠেকিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ফিসফিসানি স্বরে আওরায়‚
 
​"ভালোবাসি...ভীষণ ভালোবাসি আমার প্রফেসর সাহেব। 
 
​মৌ’য়ের মুখ থেকে ওই 'ভালোবাসি' শব্দটা শোনা মাত্রই উজানে’র মুখের রং পাল্টে গেলো। সে তীব্র এক ঝটকায়‚ তড়িৎ গতিতে মৌ’কে নিজের বুকের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে পাশে ফেলে দিল। ​উজান এত জোরে ঝটকা দিয়েছিল যে মৌ সামলাতে না পেরে বিছানা থেকে ছিটকে সোজা শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। আর মেঝের কোণে আঘাত লাগা মাত্রই ব্যথায় কোঁকানি দিয়ে গুঙিয়ে উঠল সে।
 
​মৌয়ের ওই যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই উজানে’র ভেতরের সমস্ত রাগ আর জেদ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে তীব্র এক অনুশোচনা বুকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে মেঝের ওপর মৌ’য়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। নিজের দুই হাত দিয়ে মৌ’য়ের গাল দুটো ছুঁয়ে আকুল স্বরে বলে উঠল।
 
​“আই অ্যাম রিয়েলি সরি পিচ্চি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি যে আমার ধাক্কাটা এত জোরে লাগবে। অনেক বেশি লেগেছে‚ তাই না? কোথায় লেগেছে আমায় দেখাও?
 
​এই বলেই উজান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মৌ’কে নিজের পাজা কোলে তুলে নিল এবং বিছানার ওপর সাবধানে বসিয়ে দিল। উজান অত্যন্ত উদগ্রীব ও ব্যাকুল হয়ে মৌ’য়ের হাত-পা ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগল। মেয়েটা কোথাও বড় কোনো আঘাত পেয়েছে কিনা। ঠিক তখনই তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আটকে গেল মৌ’য়ের ডান পায়ের গোড়ালির ওপর। সেখানে একটা বড়সড় নীলচে কালশিটে দাগ পড়ে আছে‚ যা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোনো জায়গায় মারাত্মক হোঁচট খাওয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। ​উজান এবার অত্যন্ত রাগান্বিত ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আওড়াল‚
 
“স্টুপিড গার্ল একটা। এখানে কীভাবে এত বড় কালশিটে দাগ ফেলে ব্যথা পেলে‚ হ্যাঁ?
 
​"ওটা কালকে দুপুরে দৌড়াতে গিয়ে পা মচকে গিয়েছিল।
 
​উজান আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে রুম থেকে ফার্স্ট এইডের বক্সটা এনে বিছানায় বসল। সে নিজের ঠান্ডা হাত দিয়ে মৌ’য়ের সেই আঘাতপ্রাপ্ত লাল-নীল হয়ে যাওয়া জায়গায় মলম নিয়ে অত্যন্ত আলতো হাতে মালিশ করে দিতে লাগল। মালিশ করার মাঝেই তার ভেতরের রাগটা আবারও উগড়ে উঠে। 
 
​“আস্ত একটা ফাজিল তুমি। নিজের হাত-পায়ের কোনো ব্যালেন্স নেই তোমার? সারাদিন পুরো বাসা জুড়ে বানরের মতো এত দৌড়াদৌড়ি কেন করো শুনি? একটু সোজাভাবে‚ শান্ত হয়ে চললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? এই জন্যই তো কালকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলে। তুমি জানো তোমার যদি কোনো বড় ক্ষতি হয়ে যায় তবে আমার.....
 
​উজান কথা বলতে বলতে মাঝপথেই হঠাৎ থেমে গেল। "আমার কিছু হলে আপনার কী হতো প্রফেসর সাহেব? 
 
মৌ উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল। ​মৌয়ে’র এই সরাসরি প্রশ্নে উজান নিজের ভেতরের ব্যাকুলতা টের পেয়ে চট করে স্বাভাবিক হলো। তারপর তোতলা তোতলা স্বরে বলল‚ “আ আ আমার আবার কী হবে? আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি আমার কে হও যে তোমার কিছু হলে আমার দুনিয়া উল্টে যাবে‚ হ্যাঁ? তাছাড়া তোমার যদি কোনো ক্ষতি হয়‚ তবে আম্মু আর ড্যাড মিলে আমাকেই এই চৌধুরী বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। সবাই ভাববে আমি ইচ্ছে করে তোমায় আঘাত করেছি। দেখি পা-টা সোজা করো তো‚ এখন হাঁটতে কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তো তোমার?
 
​মৌ এবার এক অদ্ভুত ও গভীর অবাক দৃষ্টিতে উজানে’র এই রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল এই অদ্ভুত মানুষটা মুখে সারাদিন দাবি করে যে সে মৌ’কে একটুও ভালোবাসে না অথচ তার প্রতি উজানে’র এই যত্ন আর কেয়ারিং তো অন্য কথা বলে। মৌ যদি কোনোদিন রাগ করে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে‚ তবে এই উজান মাঝরাতে তাকে ঘুম থেকে তুলে নিজের হাতে লোকমা খাইয়ে দেয়। মৌ উজানে’র বুকে না জরিয়ে ঘুম আসে না বলে। সে রোজ রাতে শত কাজ থাকলেও জলদি বাসায় ফিরে মৌ’কে নিজে থেকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমায়। মৌ’য়ের জামাকাপড় থেকে শুরু করে তার প্রয়োজনীয় প্রতিটা ছোটখাটো জিনিস সে মুখে চাওয়ার আগেই উজান অলৌকিকভাবে তার চোখের সামনে এনে হাজির করে তবুও এই মানুষটা নাকি মৌকে ভালোবাসে না। এটা কি আদৌ কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব? হয়তো সম্ভব‚ কিংবা হয়তো এক মস্ত বড় মিথ্যা অহংকার। ​মৌ এবার অত্যন্ত নরম স্বরে ডাকল‚
 
"প্রয়োফেসর সাহেব?
 
​উজান ফার্স্ট এইডের বক্সটা গুছিয়ে বলল‚ “হুম বলো?
 
​"আপনি তো আমায় একটুও ভালোবাসেন না‚ তাহলে কেন আমার এত যত্ন করেন? আমি মরে গেলেও তো আপনার জীবনে কোনো ফারাক পড়ার কথা না। কিন্তু আমি একটুখানি আঘাত পেলেই আপনি কেমন পাগল পাগল হয়ে যান। এরপরেও কি বলবেন আপনি আমায় সত্যি সত্যি ভালোবাসেন না?
 
​মৌ’য়ের এই অকাট্য ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে উজান এক মুহূর্তের জন্য পুরো থমকে গেল। মেয়েটা বয়সে ছোট আর চপল হলে কী হবে‚ মাঝেমধ্যে এমন কিছু কথা বলে যা সরাসরি বুকে গিয়ে আঘাত করে। উজান বিছানা থেকে উঠে মৌ’য়ের একদম পাশে গিয়ে বসল। মৌ এক দৃষ্টিতে তার চোখের ভেতরের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছিল। উজান নিজের ভেতরের এক তীব্র তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাথাটা সামান্য উঁচুর দিকে তুলে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় উত্তর দিল।
 
​“শোনো পিচ্চি তোমায় আমি মন থেকে নিজের বউ হিসেবে কখনো না মানলেও‚ সামাজিকভাবে আর আইনগতভাবে তুমি এখন আমার বিবাহিতা স্ত্রী। তাই আমার জীবনে তুমি হলে জাস্ট একটা 'রেসপন্সিবিলিটি'। এই রেসপন্সিবিলিটি শব্দটার মানে বোঝো তুমি? এর মানে হলো তুমি আমার 'দায়িত্ব'। পৃথিবীর একটা পুরুষ মানুষ সব কিছু এড়িয়ে যেতে পারলেও‚ তার ঘাড়ে আসা দায়িত্ব সে কখনো এড়িয়ে যেতে পারে না। আমি তোমার যত্ন করি‚ তোমার দায়িত্ব নেই‚ তোমার সাথে একই বিছানায় ঘুমাই তার মানে এই নয় যে আমাদের মধ্যকার এই জোরপূর্বক সম্পর্কের কোনো উন্নতি হবে। 
 
আমরা আজ যেমন আছি‚ আমাদের ফিউচারেও আমাদের সম্পর্কটা ঠিক এমনই থাকবে। তবে তোমার যদি মনে হয় যে এই নামমাত্র সম্পর্কে থেকে তুমি তোমার বউয়ের পূর্ণ অধিকার বা ভালোবাসা পাচ্ছো না‚ তবে তুমি চাইলে আমার লাইফ থেকে চিরকালের মতো চলে যেতে পারো। কারণ আমি তোমাকে কোনোদিনও মন থেকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা বা ভালোবাসা দিতে পারব না। আই অ্যাম রিয়েলি সরি। 
 
​মৌ’য়ের মুখ থেকে কোনো উত্তর শোনার আগেই উজান বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। মৌ বিছানার ওপর পাথরের মূর্তির মতো বসে ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। এই অদ্ভুত মানুষটাকে সে কোনো সমীকরণ দিয়েই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারে না। এই মানুষটা এক লহমায় এত ভালো‚ এত কেয়ারিং হয়ে ওঠে যে মনে হয় দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ স্বামী। আবার ঠিক পরের লহমায় এত নিষ্ঠুর‚ এত খারাপ হয়ে যায় যে মনে হয় এক আস্ত পাষাণ। ​মৌ ও দেখবে‚ এই প্রফেসরের দায়িত্বের দেয়ালটা তার ভালোবাসার ঝড়ের সামনে আর কতদিন টিকে থাকতে পারে।
——————
——————————
 
🌸🖤
​পুরো ক্লাসরুম জুড়ে চিৎকার‚ চিল্লাচিল্লি আর হট্টগোলে কান পাতা দায়। আজ তাদের ফিজিক্স ক্লাসের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একজন প্রফেসর আসার কথা রয়েছে। কিন্তু কে সেই প্রফেসর‚ কেমন দেখতে হবেন তিনি এই নিয়ে ক্লাসের সবার মনেই কৌতুহলের শেষ নেই। হঠাৎ মৌ নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কাম বোন মেহেরে’র কাঁধে ক্লান্ত মাথাটা রেখে মিনমিন স্বরে আওড়াল„ ​"মেহু এখন আবার আমাদের হাড়মাস জ্বালাতে কোন নতুন ইবলিশ শয়তান আসবে বল তো ভাই? এই কলেজের প্রিন্সিপাল বুড়োটাও যে কী পায়‚ রোজ রোজ টিচার চেঞ্জ করে। 
 
মেহের নিচু স্বরে জবাব দিলো। ​“ঠিক বুঝতে পারছি না রে মৌ। তবে ক্যাম্পাসের সিনিয়র আপুদের মুখে শুনলাম‚ আজ যিনি আমাদের ফিজিক্স ক্লাস নিতে আসছেন তিনি নাকি ভীষণ কড়া আর বদরাগী টাইপের মানুষ। কিন্তু মানুষটা নাকি দেখতে অসম্ভব হ্যান্ডসাম আর ড্যাশিং। 
 
​মেহেরের মুখে অন্য পুরুষের হ্যান্ডসাম হওয়ার প্রশংসা শুনে মৌ চট করে তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বসল। সে নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট বলল‚ "সে যত বড়ই হ্যান্ডসাম হোক না কেন? আমার প্রফেসর সাহেবের মতো হিরো কিন্তু এই দুনিয়ায় কেউ হবে না বুঝেছিস? কিন্তু একটা জিনিস ভাব তো মেহু‚ আমার ওই খিটখিটে প্রফেসর সাহেব ঠিক কোন কলেজের প্রফেসর বল তো? আজ তো ওনারও ভার্সিটির প্রথম দিন।
 
​মেহের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল‚ “আই ডোন্ট নো। কিন্তু তুই তো ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে পারতি কোন কলেজের প্রফেসর। 
 
​মৌ এবার ভেংচি কেটে মুখটা কালো করে নিলো। "খাটাশ লোক আমায় কিছু বললে তো।
 
​তাদের এই ফিসফিসানির মাঝেই হঠাৎ গম্ভীর মুখে স্বয়ং কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। প্রিন্সিপাল স্যারকে দেখা মাত্রই পুরো ক্লাসরুমের ওই হইচই এক নিমেষে পিনপতন নীরবতায় রূপ নিল। সব স্টুডেন্ট একসাথে তড়িৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পরম শ্রদ্ধায় সমস্বরে বলে উঠল। 
 
​“গুড মর্নিং স্যার। হাউ আর ইউ? 
 
​প্রিন্সিপাল স্যার নিজের গম্ভীর মুখে খানিকটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে দুই হাত তুলে সবাইকে বসার ইশারা করে আওড়ালেন‚ "গুড মর্নিং‚ সিট ডাউন এভরিবডি। তবে সত্যি কথা বলতে আমি তোমাদের ওপর আজ বিন্দুমাত্র খুশি নই। এই বিগত মাত্র কয়েক মাসের ভেতরে তোমাদের এই সেকশনের জন্য আমাকে পুরো ছয়-ছয়জন ফিজিক্স টিচার চেঞ্জ করতে হয়েছে। তোমরা এই ক্লাসের স্টুডেন্টরা সবাই এত বড় মাপের ফাজিল আর বেয়াদব যে তোমাদের যন্ত্রণায় কোনো টিচার এই ক্লাসে টিকতেই চায় না‚ সবাই ইস্তফা দিয়ে চলে যায়।
 
​প্রিন্সিপাল স্যার একটু থামলেন। তারপর ক্লাসের সবার দিকে এক কড়া দৃষ্টিপাত করে আবার বলতে লাগলেন‚ "অবশেষে একজনকে অনেক অনেক রিকোয়েস্ট করার পর তিনি তোমাদের এই ক্লাসের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। অবশ্য বলে রাখা ভালো তিনি ইন্টারমিডিয়েটের কোনো ক্লাস নেওয়ার জন্য এই কলেজে জয়েন করেননি‚ তিনি মূলত অনার্সের গোল্ড মেডেলিস্ট প্রফেসর। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অনুরোধে তিনি তোমাদের ফিজিক্সের বেসিক ঠিক করতে রাজি হয়েছেন। তবে এখন তোমাদের নিয়ে আমার বড্ড টেনশন হচ্ছে। কারণ আজ যিনি তোমাদের সামনে আসছেন তিনি বড্ড কড়া ধাতের মানুষ‚ ওনার মুখের কথার চেয়ে হাতের অ্যাকশন বেশি চলে! সো এভরিবডি...প্লিজ ওয়েলকাম মিস্টার উজান চৌধুরী!
 
​'উজান চৌধুরী' নামটা প্রিন্সিপাল স্যারের মুখে শোনা মাত্রই মৌ আর মেহেরে’র চমকে উঠলো। তারা তীব্র এক ধাক্কা খেয়ে চোখ বড় বড় করে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। মেহেরে’র হাতের কলমটা হাত থেকে ফসকে নিচে পড়ে গেল। ​ঠিক সেই মুহূর্তেই গাম্ভীর্য নিয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করল উজান। আজ সাদা শার্ট আর ফরমাল প্যান্টে তাকে দেখতে এতটাই ড্যাশিং আর অসম্ভব সুন্দর লাগছিল যে ক্লাসের প্রতিটা মেয়ে স্টুডেন্ট এক পলকে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। পুরো ক্লাসের মেয়েদের চোখ যেন আজ উজানে’র ওপর গিয়ে একদম আঠার মতো আটকে গেল। ​প্রিন্সিপাল স্যার উজানে’র কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে সিলেবাস নিয়ে কিছু সময় কথা বললেন এবং উজান’কে ক্লাসের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।
 
​উজান ক্লাসের পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত নিজের চোখের সানগ্লাসটা খুলল। তারপর ক্লাসের স্টুডেন্টদের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা দিল সাথে সাথে সে নিজেও তীব্র এক শক খেয়ে একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। ​ক্লাসে ঠিক মাঝখানের ব্রেঞ্চে বসে আছে তার ঘরের বউ মৌ মহাশয়া‚ যে নিজের বড় বড় হরিণী চোখ দুটো মেলে তার দিকেই তপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। উজান নিজের অজান্তেই একটা ঢোক গিলল। মৌ যে এই কলেজেই পড়াশোনা করে‚ তা উজান আগে জানত না। জানলে নেচে নেচে প্রিন্সিপাল স্যারের রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে আসত না! এতক্ষণ বাড়ির বাইরে এসে একটু শান্তির নিশ্বাস ফেলবে বলে মনের ভেতর যে আনন্দটুকু ছিল।।এখন এই ক্লাসরুমে বউ নামক 'মোস্ট ডেঞ্জারাস' মেয়েটাকে নিজের স্টুডেন্ট হিসেবে দেখে উজানে’র গলার জল নিমেষেই শু’কিয়ে কাঠ হয়ে গেল। 
 
​আর এদিকে মৌ নিজের গাল দুটো রাগে রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে‚ হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে বরের দিকে চোখ রাঙিয়ে বসে রইল। মনে মনে ভাবল‚ এই খাটাস লোকটা তাকে মনে মনে একটুও ভালোবাসে না। তা তো সে ভালো করেই জানে। কিন্তু তাই বলে কি নিজের বিবাহিতা বউকে এত বড় একটা কথা লুকিয়ে যাবে? তারই কলেজের ফিজিক্স প্রফেসর হিসেবে জয়েন করতে আসছে অথচ তাকে একবারের জন্যও মুখ ফুটে তাকে বলল না। এত বড় ধোঁকাবাজ লোক তো দুনিয়ায় দুটো নেই। ​পুরো ক্লাসের এই স্তব্ধতার মাঝে মেহেরও নিজের ঘোর কাটিয়ে উঠল। সে চরম বিস্ময় নিয়ে পাশে বসা মৌ’য়ের পাঁজরে নিজের কনুই দিয়ে একটা জোরালো খোঁচা মারল। তারপর উজানে’র দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত ফিসফিসানি স্বরে জিজ্ঞেস করল।
 
​“মৌ ভাইয়া এখানে কী করছে?
 
মৌ’য়ের মুখের ভাষা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গিয়েছে। সে এখনো নিজের বড় বড় চোখ জোড়া মেলে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সামনের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা উজানে’র দিকে তাকিয়ে আছে। ​এরই মাঝেই উজান নিজেকে দ্রুত স্বাভাবিক করে নিল। ক্লাসের বাকি মেয়েদের হা করে তাকিয়ে থাকা আর মৌ’য়ের ওই বোকা বনে যাওয়া মুখ দেখে সে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর ও মুচকি হাসি ঝুলাল। তারপর ডাস্টার আর চকটা টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ ও ভরাট গলায় বলতে লাগল।
 
​“হাই এভরিবডি। আমি তোমাদের নিউ ফিজিক্স টিচার উজান চৌধুরী। আজ যেহেতু তোমাদের সাথে আমার ফার্স্ট ক্লাস‚ তাই আমি সরাসরি পড়ালেখায় যাব না। আমি চাই আজ সবাই সংক্ষেপে নিজেদের একটা ফরমাল পরিচয় দাও।
 
​কথাটা শেষ করেই উজান প্রথম বেঞ্চের কর্নারে বসা মেয়েটির দিকে নিজের ধারালো ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে সে এক ভ্রু উঁচিয়ে অত্যন্ত পেশাদার কণ্ঠে বলে উঠল‚ “হেই গার্ল স্ট্যান্ড আপ। হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?
 
​উজান মূলত মৌ’কে খেপানোর জন্য এবং ক্লাসের সবার সামনে নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতেই প্রশ্নটা করেছিল। কিন্তু উজান যেদিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেছিল সে ছিল এই কলেজের সবচেয়ে অহংকারী আর ডানপিটে মেয়ে ললিতা আফরিন। পুরো কলেজে মাসে মাসে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দেওয়া মিস্টার আরকাম সাহেবের মেয়ে সে। কলেজের তথাকথিত সুন্দরী ও স্টাইলিশ নারীদের মধ্যে অন্যতম একজন। যার ক্ষমতার দাপটে কলেজের সাধারণ স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে অনেক টিচারও মাথা নিচু করে কথা বলেন নয়তো সামান্য অজুহাতে তাকে সোজা কলেজ থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দেওয়া হয়। 
 
বাবা আরকাম আফরিন দেশের নামকরা ও বড় মাপের বিজনেসম্যান হওয়ায় ললিতার অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। মেয়েটা বড্ড একরোখা আর জেদি‚ জীবনে সে যা চেয়েছে তা যেকোনো মূল্যে পেয়েই ছেড়েছে। ​ললিতা ভাবল এই হ্যান্ডসাম ও ড্যাশিং প্রফেসর বুঝি তার দিকে তাকিয়েই মুগ্ধ হয়ে নামটি জানতে চেয়েছে। সে নিজের ঠোঁটে এক চিলতে চপল হাসি ঝুলিয়ে খানিকটা উজানে’র দিকে ঝুঁকে এলো। এবং আদুরে গলায় বলল‚
 
​"আই অ্যাম ললিতা আফরিন। মিস্টার আরকাম আফরিন সাহেব ওরফে এই কলেজের যিনি মূল প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা‚ আমি ওনার একমাত্র মেয়ে।
 
​ললিতা’র ধারণা ছিল তার বাবার নাম আর বিপুল প্রতিপত্তির কথা শুনলে এই নতুন প্রফেসরও বাকিদের মতো থতমত খেয়ে তাকে সমীহ করা শুরু করবেন। কিন্তু মেয়েটির এই দেমাকী ও বাড়তি উত্তরে উজান বিন্দুমাত্র খুশি হলো না। বরং তার গম্ভীর মুখাবয়ব আরও শক্ত ও শীতল হয়ে উঠল। সে ললিতা’র দিকে এক পলক তাকিয়ে অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর স্বরে ক্লাসরুম কাঁপিয়ে আওড়াল„
 
​“জাস্ট শাট আপ....
 
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব— ১০
 
 
 
“জাস্ট শাট আপ‚ মিস আফরিন। ক্লাসে অতিরিক্ত কথা একদম অপছন্দ আমার। আমি তোমাকে শুধু তোমার নিজের নামটুকু জিজ্ঞেস করেছি‚ তোমার বাবার নাম কিংবা ওনার সম্পত্তির খতিয়ান জানতে চাইনি। সো‚ বিহেভ ইয়োরসেলফ।
 
​উজানে’র মতো একজন অত্যন্ত হ্যান্ডসাম কিন্তু কঠোর শিক্ষকের কাছ থেকে পুরো ক্লাসের সামনে এমন অপমানজনক ও কড়া ধমক খাবে‚ তা ললিতা নিজের স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসের সামনে ললিতার অহংকারী ফর্সা মুখের রঙ পাল্টে গিয়ে লাল-কালো হয়ে গেল। অপমানে আর রাগে তার শরীর কাঁপতে লাগল।
 
উজান ও দ্রুত ললিতা’র সামনে থেকে সরে গেলো। সে এবার এক এক করে ক্লাসের বাকি সকল স্টুডেন্টের কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় জেনে নিতে লাগল। এভাবে একে একে সবার পরিচয় নেওয়া শেষ করে উজান এবার ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মৌ’য়ের বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল। ক্লাসের বাকি সব স্টুডেন্ট উজান’কে সামনে আসতে দেখে সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেও‚ মৌ কিন্তু নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ল না। সে আগের মতোই গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে অভিমানী মুখ করে বেঞ্চে বসে রইল। পাশে বসা মেহের তাকে কনুই দিয়ে কয়েকবার খোঁচা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ার কথা বলল‚ তবুও মৌ উজানে’র ওপর অভিমানে একটুও শুনল না।
​উজান নিজের মুখে চরম গাম্ভীর্য বজায় রেখে ভরাট গলায় মৌ’কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল।
 
“মিস তাসফিয়া মৌ প্লিজ স্ট্যান্ড আপ।
 
​মৌ এবার উজানে’র কড়া ধমক শুনে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল বটে কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। উজানে’র চোখের দিকে একবারের জন্যও তাকাল না। মৌ’য়ের এমন বাচ্চাদের মতো অভিমানী ও রাগী মুখখানা দেখে উজান নিজের মনের ভেতর এক চিলতে নিঃশব্দে হাসল। তবে ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টরা এবার একদম ড্যাবড্যাব করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কারণ‚ মৌ তো এখনো নিজের মুখ ফুটে নামই বলেনি তাহলে এই নতুন প্রফেসর প্রথম দিনেই তার নাম ‘তাসফিয়া মৌ’ কীভাবে নিখুঁতভাবে জানতে পারলেন। সেটাই সবার মাথায় ঢুকছিল না। ​উজান সবার মনের কৌতুহল টের পেয়ে কিছুটা নিচু হয়ে মেঝে থেকে মৌ’য়ের পড়ে থাকা ফিজিক্স বইটা কুড়িয়ে নিল। বইয়ের প্রচ্ছদে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘তাসফিয়া মৌ’। উজান বইটা আলতো করে মৌ’য়ের বেঞ্চের ওপর রেখে ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টদের উদ্দেশ্য করে আওড়াল„
 
​“লিসেন এভরিবডি। মিস তাসফিয়া মৌ’য়ের নামটা আমি এত নিখুঁতভাবে কীভাবে জানতে পারলাম তা এবার নিশ্চয়ই তোমরা বুঝতে পেরেছো? সো‚ আমার মুখের দিকে ওভাবে হাঁ করে না তাকিয়ে‚ সবাই নিজেদের সামনের বইয়ের দিকে মনোযোগ দাও!
 
​উজানে’র চতুর বুদ্ধি দেখে ক্লাসের সকল স্টুডেন্ট লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। আর ঠিক সেই সুযোগেই উজান মৌ’য়ের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে এসে একদম নিচু ও ফিসফিসানি স্বরে কড়া গলায় বলে উঠল।
 
​“মিসেস চৌধুরী ক্লাস টাইম শেষ হওয়া মাত্রই সরাসরি আমার পার্সোনাল কেবিনে এসে দেখা করবেন‚ নয়তো কলেজের প্রথম দিনেই কিন্তু বড় রকমের পানিশমেন্ট পেতে হবে। মনে থাকে যেন!
 
​কথাটা বলেই উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এগিয়ে গিয়ে ফিজিক্সের কিছু বেসিক ম্যাথ আর সূত্র বোর্ডে করাতে লাগল। দেখতে দেখতে ক্লাসের নির্ধারিত সময় প্রায় শেষের দিকে চলে এলো। উজান সবার উদ্দেশ্যে কড়া গলায় জানাল।
 
​“এভরিওয়ান‚ আজ যেহেতু তোমাদের সাথে আমার ফার্স্ট ক্লাস সেই জন্য আজকে আর বেশি কিছু করাচ্ছি না। নেক্সট ক্লাসে আসার আগে বোর্ডে দেওয়া এই ম্যাথগুলো সবাই হোমওয়ার্ক হিসেবে করে নিয়ে আসবে নয়তো ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
 
​উজানে’র এই কড়া নির্দেশ শোনা মাত্রই ক্লাসের মাঝখানের বেঞ্চ থেকে একটা ছেলে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে অত্যন্ত দেমাকী সুরে বলল‚ "পানিশমেন্ট মানে? কিসের পানিশমেন্টের কথা বলছেন স্যার? এই কলেজের হিস্ট্রিতে আজ পর্যন্ত কোনো বড় বড় টিচারও আমাদের এই সেকশনকে পানিশমেন্ট দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেনি। আর আপনি কলেজে পা রাখার কয়েক ঘণ্টাও হয়নি‚ এর মধ্যেই আমাদের পানিশমেন্ট দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন? শোনেন স্যার, আমি হলাম এই এলাকার ওসির ছেলে। আমাকে এসব ফালতু ভয় দেখাবেন না নয়তো আপনার চাকরি...
 
​ছেলেটির হুমকি মাখা কথা শেষ হওয়ার আগেই উজান বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির কলার চেপে ধরে তার গালে পরপর কয়েকটা সজোরে ঠাসস ঠাসস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ​আচমকা ক্লাসরুমে এমন একটা কাণ্ড ঘটে যাবে তা কেউ ভাবেনি। থাপ্পড় খেয়ে ওসির বখে যাওয়া ছেলে জিহাদ নিজের গাল চেপে ধরে চরম ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। পুরো ক্লাসরুম জুড়ে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। যেখানে এই কলেজে জিহাদে’র চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কোনো সাধারণ স্টুডেন্ট বা কোনো টিচারের হতো না‚ সেখানে এই নতুন প্রফেসর প্রথম দিনেই তাকে সবার সামনে চড় মারল। এটা ভেবেই জিহাদে’র রাগে গা জ্বলছিল কিন্তু উজানে’র রুদ্ররূপ দেখে সে টু শব্দ করার সাহস পেল না। ​উজান এবার বাঘের মতো গর্জন তুলে পুরো ক্লাস কাঁপিয়ে তুললো। 
 
 “লিসেন টু মি কেয়ারফুলি। উজান চৌধুরী কারো বাপের কেনা গোলাম নয়। এই ক্লাসের সময়টুকু যেহেতু আমার‚ সো এই ৪টি দেয়ালের ভেতর সবকিছু শুধুমাত্র আমার রুলস অনুযায়ী চলবে। কার বাবা মিনিস্টার‚ আর কার বাবা ওসি এসব ফালতু জিনিস দেখার টাইম বা ইন্টারেস্ট আমার বিন্দুমাত্র নেই। আজ ফার্স্ট ডে বলে তোমাকে শুধু ছেড়ে দিলাম। নেক্সট টাইম যদি আমার ক্লাসে এমন ত্যাড়াবেঁড়ি করো তবে কান ধরে পুরো ক্যাম্পাস এক পায়ে ঘোরটাবো মাইন্ড ইট! আর হ্যাঁ‚ লিসেন গার্লস তোমরা মেয়ে বলে পার পেয়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্যায় করলে কাউকে ছেড়ে দেওয়া উজান চৌধুরীর ধাতে নেই‚ মনে রেখো সবাই!
 
​যে ক্লাসে সবসময় টিচারের চেয়ে স্টুডেন্টদের চিলানোর শব্দে কান পাতা যেত না। আজ সেই ক্লাসের প্রতিটা স্টুডেন্ট একদম মুখে কুলুপ এঁটে বিড়ালের মতো চুপ হয়ে রইল। কারো মুখে একটা কথাও সরল না। এরই মাঝে উজান নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত ক্লাসরুম ত্যাগ করে করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের পার্সোনাল কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
 
​ক্লাস শেষ করে উজান নিজের ক্লান্তি দূর করতে যেই না নিজের পার্সোনাল কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছে‚ ঠিক তখনই হঠাৎ কেউ একজন এসে তীব্র আবেগে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরল। ​উজান মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ ও নিথর হয়ে গেল। তাকে এভাবে হুটহাট হুট করে জড়িয়ে ধরার অধিকার আর পাগলামি শুধুমাত্র তার পুঁচকে বউ মৌ’য়েরই আছে। কিন্তু মৌ তো এখন মাত্রই ক্লাস শেষ করে বান্ধবীদের সাথে ক্লাসরুমে থাকার কথা‚ তাহলে এই বন্ধ কেবিনের ভেতর এত সাহস নিয়ে তাকে কে জড়িয়ে ধরল? ​উজান নিজের সমস্ত পুরুষালী শক্তি দিয়ে নিজেকে সেই বাঁধন থেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ঠিক তখনই তার কানের কাছে এক চেনা বিষাক্ত মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
 
​"উজান কেমন আছ তুমি? এতগুলো বছর পর আজ সামনাসামনি দেখেও এভাবে চট করে ভুলে গেলে আমায়?
 
​কণ্ঠটা শোনা মাত্রই উজানে’র চেনা পৃথিবীর সব আলো যেন এক পলকে নিভে গেল। সে তীব্র এক ঝটকায় মেয়েটিকে নিজের শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দিল। মেয়েটির মুখের দিকে তাকানো মাত্রই উজানে’র চারপাশের চেনা জগৎটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। এই তো সেই শিরিন যাকে উজান নিজের তরুণ বয়সে‚ নিজের উদ উদীয়মান যৌবনে প্রথম দেখার পর পাগলের মতো ভালোবেসেছিল। মেয়েটির মুখের অবয়ব এখনো ঠিক আগের মতোই আছে‚ চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এক সময় এই মেয়েটিকে উজান যতটা না ভালোবাসত আজ তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি ঘৃণা করে। ​যাকে নিয়ে একসময় স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের জীবনের ঘরণী বানানোর হাজারো রঙিন স্বপ্ন বুনত উজান। ঠিক সেই মেয়েটিই একদিন উজান’কে একাকী এক মাঝ দরিয়ায় ফেলে‚ তারই সবচেয়ে কাছের বন্ধুর হাত ধরে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেছিল। আজ দীর্ঘ চোদ্দোটা বছর পর তাদের আবার এভাবে সামনাসামনি দেখা হলো।
 
​উজানে’র বয়স যখন মাত্র ষোলো। তখন তাদের স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছিল শিরিন। মেয়েটি ছিল উজানে’র চেয়ে তিন বছরের জুনিয়র। প্রথমে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব তারপর ধীরে ধীরে তা এক গভীর ও অন্ধ ভালোবাসায় রূপান্তর হয়। একসাথে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন তারা কলেজ লাইফের শেষ প্রান্তে‚ ঠিক তখনই এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস আগে শিরিন উজানে’রই পরম বন্ধুর সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নেয়। অথচ উজান তাকে নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসত। উজানে’র সাথে শিরিনে’র চার বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল কিন্তু পরে উজান জানতে পারে তার আড়ালে তার বন্ধুর সাথেই নাকি শিরিনের পাঁচ বছরের গভীর সম্পর্ক ছিল।
 
​শুধুমাত্র এই একটি মেয়ের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য উজানে’র সাজানো সুন্দর জীবনটা এক নিমেষে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। সে এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছিল যে জীবনের প্রথম পরীক্ষা এইচএসসিতে সেফ ফেইল করে বসেছিল। তারপর বছরের পর বছর একা কেঁদে,‚ নিজেকে পুড়িয়ে সে ধীরে ধীরে মুভ অন করে আজকের এই স্বনামধন্য গোল্ড মেডেলিস্ট প্রফেসর উজান চৌধুরী হয়েছে। এখন সে এই মেয়েটিকে তীব্র ঘৃণা করলেও‚ মনের কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে তার নামটা পুরোপুরি ভুলতে পারেনি। 
 
তবে এই বিগত কয়েকটা দিন ধরে মৌ তার লাইফে আসার পর থেকে এই বিষাক্ত মেয়েটির কথা উজান যেন ভুলেই গিয়েছিল। তার মনেই থাকত না শিরিনে’র কথা। ​উজান’কে ওভাবে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিরিন আবারও এক পা এগিয়ে এসে চোখের জল ফেলে তীব্র আবেগে উজান’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আর ঠিক সেই চরম মোক্ষম মুহূর্তেই প্রফেসরের কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরের রুমে প্রবেশ করল মৌ। ​ভেতরে ঢুকেই উজান আর শিরিন’কে অমন এক অতি ঘনিষ্ঠ ও অপ্রস্তুত অবস্থায় জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখে মৌ’য়ের মাথার ওপর যেন আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হাজারটা টুকরো হয়ে গেল। যাকে সে ভালোবাসে‚ সে এখন অন্য একটা অচেনা মেয়ের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ। 
 
মৌ’য়ের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ভরে উঠল এবং আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। ​উজান দরজার দিকে তাকিয়ে মৌ’য়ের ভাঙা চাউনি দেখে পুরোপুরি থমকে গেল। সে তড়িঘড়ি করে শিরিন’কে নিজের শরীর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু শিরিন এবার বড্ড শক্ত করে উজান’কে আঁকড়ে ধরে রাখায় উজান তাকে সরাতে ব্যর্থ হলো। আর উজানে’র বুকে অন্য নারীর এই অধিকার দেখা মাত্রই মৌ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মসম্মান বিলিয়ে দিল না। সে কাঁদতে কাঁদতে তড়িৎ গতিতে কেবিন ছেড়ে করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে ছুটে চলে গেল।
 
​উজান এবার নিজের সর্বশক্তি খাঁটিয়ে শিরিন’কে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিয়ে তার গাল বরাবর দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। ​উজান মুহূর্তের মধ্যেই বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। “খা তুই কোন সাহসে আমাকে জরিয়ে ধরলি?
 
​শিরিন হকচকিয়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল‚ "উজান, তুমি আমাকে থাপ্পড় দিলে? আবার এত নোংরা ভাষায় গালি দিচ্ছো? নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে কেউ কি এভাবে রুড বিহেভিয়ার করে?
 
​উজান সঙ্গে সঙ্গে শিরিনে’র গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে‚ “তোর মতো বা উজান চৌধুরী অন্তত ভালোবাসে না। কালনাগিনী আমি তোকে চোদ্দো বছর আগেই আমার লাইফ থেকে আউট করে দিয়েছি আর আজ এত বছর পর তুই এসে আমাকে ভালোবাসা দেখাচ্ছিস? সর মা***
 
​উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে মৌ’য়ের পিছু পিছু দৌড় দিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। করিডোরের শেষ প্রান্তে মেহের’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উজান উদগ্রীব কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল‚ “মেহের পিচ্চি কোথায়? ওকে দেখেছো?
 
​ "মৌ তো কাঁদতে কাঁদতে কলেজ গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ভাইয়া সরি স্যার আপনি মৌ’কে এমন কী বলেছেন যে ও ওভাবে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল? আপনি কি আবার ওকেও থাপ্পড় দিয়েছেন?
 
“এই মেয়ে তোমার কি সেন্স নেই? আমি কোনো বরদে ওইটুকু একটা মেয়েকে মারতে যাব? তাছাড়া ও তো আমার বউ!
 
​উজান আর কোনো কথা না বলে বড় বড় পা ফেলে দ্রুত গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার দ্রুত চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মেহের মুগ্ধ হয়ে হাসল। অনিচ্ছায় হলেও আজ প্রথমবারের মতো উজান মৌ’কে নিজের ‘বউ’ বলে স্বীকৃতি করলো। 
 
 
🌸🖤
​এদিকে মৌ বাসায় ফিরে নিজের রুমে ঢুকেই একটার পর একটা জিনিস মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে ভাঙতে শুরু করল। পুরো রুম লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। তার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাড়িতে আজ শুধু আরিফুল চৌধুরী‚ তুবা আর মৌসুমি চৌধুরী রয়েছেন; বাকিরা সবাই কাজে বাইরে। তুবা অনেক চেষ্টা করছে মৌ’কে শান্ত করার কিন্তু মৌ তাকে নিজের ধারেকাছেও আসতে দিচ্ছে না। আরিফুল চৌধুরী আর তুবা রুমের দরজার বাইরে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটার হঠাৎ এমন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার কারণ কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।
 
​মৌ হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর পাশ থেকে একটা ফুলদানি নিয়ে সজোরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে ছুঁড়ে মারল। ঝনঝন শব্দে সেটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলে উঠল‚ "থাকব না আমি এই বাড়িতে। আমি একটুও থাকব না! আমায় কেউ ভালোবাসে না, আমি চলে যাব এখান থেকে। 
 
​ঠিক সেই মুহূর্তে উজান তড়িঘড়ি হয়ে রুমে প্রবেশ করল। মৌ’য়ের কাছাকাছি আসতেই সে আবারও চিৎকার করে উঠল‚ "একদম আমার কাছে আসবেন না। আমি এই রুমের সব ভেঙে ফেলব‚ কিছু রাখব না। আর চলেই যাবো আমি আপনার জীবন থেকে‚ থাকব না এক মুহূর্তও। 
 
​উজান মৌ’য়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না‚ কারণ মৌ তার ওপর একে একে জিনিস ছুঁড়ে মারছে। কাঁদতে কাঁদতে মৌ’য়ের মুখটা অনেকটা ফুলে উঠেছে। উজান নরম স্বরে বলল‚ “পিচ্চি,প্লিজ স্টপ। কেন এমন করছ?
 
​"বললাম না আসবেন না আমার কাছে।
 
​এই বলেই মৌ উজানে’র শখের টফিগুলো মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল। রুমভর্তি এখন ভাঙা কাঁচ আর ধ্বংসস্তূপ কিন্তু উজান তবুও শান্ত। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তুবা আর আরিফুল চৌধুরী হা করে তাকিয়ে আছেন। যে জিনিসগুলো উজান ইফাত’কে পর্যন্ত স্পর্শ করতে দিত না ভেঙে যাওয়ার ভয়ে। আজ মৌ সেগুলো ভেঙে ফেলার পরেও উজান একদম চুপ। তার মুখে সামান্যতম রাগের আঁচড়ও নেই। ​তুবা আরিফুল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলো। 
 
"বাবা এসব কী দেখছি? ভাই মৌ’কে এত বড় কাণ্ডের পরেও একটা বকাও দিচ্ছে না।
 
​ "সেটাই তো ভাবছি আম্মাজান। ছেলেটার আজ কী হলো?
 
​উজান কয়েক ধাপ এগিয়ে মৌ’য়ের দিকে হাত বাড়াল। মৌ সাথে সাথে ভাঙা কাচের টুকরো হাতে নিয়ে সাথে সাথে আবারও চিৎকার করে উঠল‚ "আসবেন না আমার কাছে। যদি আসেন তাহলে আমি নিজেই নিজেকে আঘাত করব। 
 
​ঠিক সেই মুহূর্তেই উজান বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে মৌ’য়ের হাত থেকে কাচের টুকরো ফেলে দিয়ে নিজের দুই বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত আদুরে ও শান্ত স্বরে আওড়াল‚
 
“মিসেস উজান চৌধুরী‚ প্লিজ রাগটা একটু কন্ট্রোলে আনেন। আপনার এই অগ্নিকন্যা রূপ উজান চৌধুরী নিতে পারছে না।
 
​মুহূর্তের মধ্যে...... 
 
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
 
উজান মৌ’য়ের কবে মিল হবে? তারা কোনোদিন এক হবে না? তাদের বা'স'র কবে হবে? উজান কবে মৌ’কে বউ হিসেবে মানবে? উজান কবে মৌ’য়ের ভালোবাসা বুঝবে? ব্লা ব্লা ব্লা....
 
 
Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner