গল্প : শিমুলফুল (লে...
 
Notifications
Clear all

গল্প : শিমুলফুল (লেখিকা:ঊর্মি AnHa)

Page 1 / 2

Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
গল্প: শিমুলফুল
লেখিকা:ঊর্মি AnHa 
পর্ব:০১
 
 
 
গ্রামের নাম শিমুলতলী।
 
নামটার মতোই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল শিমুলের গাছ। বসন্ত এলে দূর থেকে মনে হয়, সবুজের বুকের ওপর কেউ যেন মুঠো মুঠো লাল রং ছড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরোনো শিমুলগাছটাকে সবাই বলে—শিমুলতলার গাছ।
 
গাছটার বয়স কত, কেউ জানে না। তবে গ্রামের বয়স্ক মানুষদের মুখে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়—
 
“এই গাছটা অনেক ভালোবাসার গল্প দেখেছে।”
 
সেই গ্রামেরই এক প্রান্তে পুরোনো জমিদারবাড়ির আদলে তৈরি বিশাল এক দোতলা বাড়ি। নাম—চৌধুরীবাড়ি।
 
এই বাড়ির কর্তা সামিউল চৌধুরী। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করে। একসময় শহরে ব্যবসা করলেও বাবার মৃত্যুর পর নিজের গ্রামেই ফিরে এসেছিলেন। কৃষিজমি, পুকুর আর ব্যবসা—সব মিলিয়ে তার সংসার বেশ স্বচ্ছল। তবে অর্থের চেয়ে পরিবারের সম্মানকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
 
সামিউলের স্ত্রী নওশীন চৌধুরী। শান্ত স্বভাবের এই নারী পুরো সংসারটাকে নিজের মায়ায় আগলে রেখেছেন। গ্রামের দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে বাড়ির কাজের মানুষ—সবাই তার কাছে আপন।
 
তাদের একমাত্র মেয়ে—ছোঁয়া।
 
ছোঁয়ার জন্মের পর থেকেই নওশীন মেয়েটাকে নিয়ে একটু বেশি চিন্তিত। কারণ ছোঁয়া ছিল অন্যরকম। খুব বেশি চঞ্চল নয়, আবার একেবারে শান্তও নয়। নিজের জগতে থাকতে ভালোবাসত। বই পড়ত, পুকুরঘাটে বসে পানিতে পা দোলাত আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত শিমুল ফুল।
 
ছোটবেলায় শিমুল ফুল দেখলেই ছুটে গিয়ে কুড়িয়ে আনত।
 
নওশীন প্রায়ই হেসে বলতেন,
 
“মা, ফুল কুড়িয়ে ঘর ভরালে তো একদিন তোমার নিজের ঘরেই জায়গা থাকবে না!”
 
ছোঁয়া তখন গম্ভীর মুখে বলত,
 
“আমার ঘর লাগবে না মা। শিমুলগাছের নিচেই থাকব।”
 
সেই কথা শুনে নওশীন হাসলেও সামিউল মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলতেন,
 
“এই মেয়েটাকে নিয়ে একদিন অনেক ঝামেলা হবে।”
 
ছোঁয়া তখন বুঝত না বাবার কথার অর্থ।
 
আজ ছোঁয়া আঠারো বছরের তরুণী।
 
লম্বা কালো চুল, শান্ত চোখ আর মুখজুড়ে অদ্ভুত এক মায়া। গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু ছোঁয়ার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এখনও সেই শিমুলগাছের নিচে।
 
অন্যদিকে শিমুলতলীর অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বড় বাড়ি—খানবাড়ি।
 
এই বাড়ির কর্তা রাশেদ খান। কঠোর স্বভাবের মানুষ হলেও নিজের পরিবারের প্রতি ভীষণ দায়িত্বশীল। বহু বছর আগে শহরে চাকরি করতেন। পরে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে গ্রামের বাড়িতেই স্থায়ী হন।
 
তার স্ত্রী মাহিরা খান একেবারেই ভিন্ন স্বভাবের। হাসিখুশি, অতিথিপরায়ণ আর মায়াবতী। বাড়িতে কেউ এলে খালি হাতে ফেরান না।
 
রাশেদ আর মাহিরার একমাত্র ছেলে—আবরার খান।
 
আবরারের বয়স একুশ।
 
ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা একটু গম্ভীর। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। গ্রামের অন্য ছেলেদের মতো সারাদিন আড্ডা দেওয়া কিংবা অকারণে ঘুরে বেড়ানো তার স্বভাবে নেই।
 
বাবার সঙ্গে থেকে ব্যবসার অনেক কিছু শিখেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও সে ভীষণ সচেতন।
 
তবে একটা ব্যাপার কেউ জানে না।
 
ছোটবেলায় একবার এই গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে আবরারও শিমুলগাছটার নিচে দাঁড়িয়েছিল।
 
সেদিন তার বয়স ছিল মাত্র বারো।
 
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে।
 
দুই বেণী করা মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
 
“তুমি আবার আসবে?”
 
ছোট্ট আবরার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,
 
“আসব।”
 
“কবে?”
 
আবরার শিমুলগাছটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
 
“যেদিন এই গাছটা আবার লাল ফুলে ভরে যাবে।”
 
মেয়েটা তখন বিশ্বাস করে নিয়েছিল।
 
কিন্তু সময় মানুষের অনেক কথা ভুলিয়ে দেয়।
 
আবরার শহরে চলে গেল। তারপর বছর কেটে গেল।
 
ছোঁয়াও বড় হয়ে গেল।
 
কেউ জানত না, সেই ছোট্ট মেয়েটার মনে কথাটা এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে।
 
---
 
সেদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
 
হালকা বাতাসে শিমুলগাছের ডালে ডালে লাল ফুল দুলছিল।
 
ছোঁয়া সাদা-লাল শাড়ি পরে একা এসে দাঁড়াল গাছটার নিচে। মাটিতে পড়ে থাকা একটা শিমুল ফুল তুলে হাতে নিল।
 
ফুলটার দিকে তাকিয়ে অকারণেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
 
ঠিক তখনই দূর থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে এল।
 
ছোঁয়া মাথা তুলে তাকাল।
 
কালো একটা গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে এসে খানবাড়ির সামনে থামল।
 
গাড়ির দরজা খুলে একজন যুবক নামল।
 
কালো পাঞ্জাবি, হাতে ঘড়ি, মুখে গম্ভীরতা।
 
ছোঁয়া দূর থেকেই তাকিয়ে রইল।
 
যুবকটাও একসময় মাথা তুলে তাকাল শিমুলগাছের দিকে।
 
তার চোখ গিয়ে থামল ছোঁয়ার ওপর।
 
কয়েক সেকেন্ড।
 
দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল।
 
আবরারের মুখের কঠোরতা হঠাৎ বদলে গেল।
 
  • সে খুব আস্তে বলল—
 
“ছোঁয়া...?”
 
আর শিমুলগাছ থেকে ঠিক তখনই একটা লাল ফুল ঝরে পড়ল ছোঁয়ার পায়ের কাছে।
 
সে জানত না—
 
বারো বছর আগে দেওয়া একটা প্রতিশ্রুতি আজ থেকে তার জীবনটা বদলে দিতে চলেছে।
 
চলবে....
Loading spinner

Reply
5 Replies
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব:০২
 
 
ছোঁয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
 
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে সে চিনতে পারছিল না, অথচ তার কণ্ঠের একটা শব্দ যেন বহু বছর আগের কোনো বিকেলকে টেনে আনছিল।
 
“ছোঁয়া...?”
 
নামটা আবার শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার।
 
ছোঁয়া চোখ সরিয়ে নিল।
 
এত বছর পর কেউ তাকে এভাবে ডাকেনি।
 
আবরার ধীরে ধীরে শিমুলগাছটার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখ বারবার ছোঁয়ার মুখের দিকে আটকে যাচ্ছিল। বারো বছর আগে যে ছোট্ট মেয়েটা দুই বেণী করে তার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল, সেই মেয়েটাই আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
 
শুধু বদলে গেছে সময়।
 
ছোট্ট মেয়েটার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।
 
আবরার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
 
“তুমি আমাকে চিনতে পারোনি?”
 
ছোঁয়া এবার তাকাল।
 
চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে সামান্য কাঁপন।
 
“চেনার মতো কিছু তো রেখে যাওনি।”
 
কথাটা শুনে আবরারের চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে গেল।
 
“আমি তো বলেছিলাম, ফিরে আসব।”
 
ছোঁয়া মাটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
 
“বারো বছর অনেক বড় একটা সময়, আবরার।”
 
“জানি।”
 
“এতদিন কোথায় ছিলে?”
 
আবরার উত্তর দিল না।
 
কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখে বলা যায় না। কিছু উত্তর মানুষের চোখে জমে থাকে।
 
ছোঁয়া আবার বলল,
 
“তুমি কি সত্যিই মনে রেখেছিলে?”
 
“কী?”
 
“এই গাছটা... আর সেই কথাটা।”
 
আবরার শিমুলগাছটার দিকে তাকাল।
 
গাছের ডালে ডালে তখন লাল ফুল ফুটে আছে।
 
“কিছু কথা মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, ছোঁয়া।”
 
ছোঁয়ার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
 
ঠিক তখনই খানবাড়ির বারান্দা থেকে মাহিরা খানের কণ্ঠ ভেসে এল,
 
“আবরার! বাবা, ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঘরে আয়।”
 
আবরার ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
 
“আমাকে যেতে হবে।”
 
ছোঁয়া কিছু বলল না।
 
আবরার কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
 
“ছোঁয়া।”
 
“হুম?”
 
“তুমি এখনও শিমুল ফুল ভালোবাসো?”
 
ছোঁয়া হাতে ধরা ফুলটার দিকে তাকাল।
 
“হ্যাঁ।”
 
আবরারের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
 
“ভালো। অন্তত একটা জিনিস বদলায়নি।”
 
সে চলে গেল।
 
ছোঁয়া অনেকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
 
তারপর নিজের অজান্তেই ফুলটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
 
---
 
খানবাড়িতে তখন ব্যস্ততা।
 
আবরার ঘরে ঢুকতেই মাহিরা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
 
“কী হলো? এত চুপচাপ কেন?”
 
“কিছু হয়নি মা।”
 
রাশেদ খানও পাশে বসে ছিলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
 
“গ্রামে ফিরে এসেছিস, এখন ব্যবসার দায়িত্বটা ধীরে ধীরে নিতে হবে। শহরের কাজগুলোও সামলাতে হবে।”
 
আবরার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
 
কিন্তু তার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে।
 
একটা শিমুলগাছের নিচে।
 
একজোড়া শান্ত চোখের কাছে।
 
মাহিরা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
 
“চৌধুরীবাড়ির ছোঁয়াকে দেখেছিস?”
 
আবরার চমকে মায়ের দিকে তাকাল।
 
“হ্যাঁ।”
 
“কী সুন্দর বড় হয়েছে মেয়েটা, তাই না?”
 
আবরার কোনো উত্তর দিল না।
 
রাশেদ খান হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন,
 
“চৌধুরীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা যেন ঠিক থাকে। অনেক বছর পর তোদের দেখা হচ্ছে। পুরোনো বিষয়গুলো যেন আবার সামনে না আসে।”
 
আবরারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
 
“পুরোনো বিষয়?”
 
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
 
“সবকিছু জানার সময় এখনও আসেনি।”
 
আবরার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
 
কথাটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তার মনে অদ্ভুত একটা প্রশ্নের জন্ম দিল।
 
---
 
অন্যদিকে চৌধুরীবাড়িতে ফিরেছে ছোঁয়া।
 
নওশীন মেয়ের মুখ দেখেই বুঝে গেলেন কিছু একটা হয়েছে।
 
“কী হয়েছে মা? এত চুপচাপ কেন?”
 
“কিছু হয়নি।”
 
“তাহলে চোখে এত কথা কেন?”
 
ছোঁয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
 
তারপর আস্তে করে বলল,
 
“মা... আবরার এসেছে।”
 
নওশীনের হাত থেমে গেল।
 
মুহূর্তের জন্য তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
 
“আবরার?”
 
“হ্যাঁ।”
 
“তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে?”
 
ছোঁয়া মাথা নাড়ল।
 
“হয়েছে।”
 
নওশীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
 
“ওর কাছ থেকে দূরে থাকবে, ছোঁয়া।”
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে গেল।
 
“কেন?”
 
নওশীন উত্তর দেওয়ার আগেই সামিউল চৌধুরী ঘরে ঢুকলেন।
 
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝে গেলেন কথাটা কী নিয়ে।
 
“আবরার ফিরেছে?”
 
নওশীন ধীরে মাথা নাড়লেন।
 
সামিউলের চোখে হঠাৎ কঠিন একটা ছায়া নেমে এল।
 
“তাহলে সময়টা আবার ফিরে এসেছে...”
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
 
“কোন সময়, বাবা?”
 
সামিউল কিছু বললেন না।
 
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা লাল শিমুলফুলগুলোর দিকে চেয়ে রইলেন।
 
আর সেই মুহূর্তে ছোঁয়ার মনে প্রথমবারের মতো প্রশ্ন জাগল—
 
আবরারের ফিরে আসার সঙ্গে তার পরিবারের এমন অদ্ভুত নীরবতার সম্পর্ক কী?
 
সে জানত না, শিমুলফুলে ভরা এই বসন্ত শুধু পুরোনো ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনেনি—
 
সঙ্গে ফিরিয়ে এনেছে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা এক সত্যও। 
 
চলবে.....
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব:০৩
 
 
সন্ধ্যার পর শিমুলতলী গ্রামটা যেন আরও নীরব হয়ে যায়। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসে এশার আজান, পুকুরের পানিতে জোনাকির আলো কাঁপে, আর বাতাসে শিমুল ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিশে থাকে।
 
ছোঁয়া জানালার পাশে বসে ছিল। হাতে একটা বই, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে একই পাতায় চোখ আটকে আছে।
 
বারবার মনে পড়ছে আবরারের কথা।
 
“কিছু কথা মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, ছোঁয়া।”
 
কথাটা কেন যেন বুকের ভেতর আটকে গেছে।
 
ঠিক তখনই নওশীন ঘরে এসে মেয়ের পাশে বসলেন।
 
“কী ভাবছিস?”
 
ছোঁয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“কিছু না।”
 
“মায়ের কাছে কিছু না বলে পারবি?”
 
ছোঁয়া চুপ করে রইল।
 
নওশীন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“আবরারকে নিয়ে ভাবছিস?”
 
ছোঁয়া এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
 
“জানি না মা।”
 
“জানিস।”
 
ছোঁয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
 
“মা, ছোটবেলার একটা মানুষ এত বছর পর ফিরে এলে তাকে কি আগের মতো মনে হয়?”
 
নওশীন কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
 
“সব মানুষ আগের মতো থাকে না। সময় মানুষকে বদলে দেয়।”
 
“আবরারও বদলে গেছে?”
 
নওশীনের মুখে অদ্ভুত একটা ছায়া নেমে এল।
 
“হয়তো।”
 
“তুমি ওকে এত ভয় পাও কেন?”
 
প্রশ্নটা শুনে নওশীন থমকে গেলেন।
 
“ভয় পাই না।”
 
“তাহলে বাবাও চুপ হয়ে গেল কেন ওর নাম শুনে?”
 
নওশীন কোনো উত্তর দিলেন না।
 
শুধু উঠে যাওয়ার সময় বললেন,
“সব প্রশ্নের উত্তর এখনই জানতে হয় না, ছোঁয়া।”
 
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
 
ছোঁয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
 
তার মনে হলো, তার নিজের পরিবারই যেন তার কাছ থেকে কোনো বড় সত্য লুকিয়ে রেখেছে।
 
 
অন্যদিকে খানবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল আবরার।
 
আকাশে চাঁদ উঠেছে। দূরের চৌধুরীবাড়ির কিছু জানালায় আলো জ্বলছে।
 
আবরারের চোখ আটকে গেল সেই বাড়ির দিকে।
 
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটা বিকেল।
 
ছোট্ট ছোঁয়া তার হাত ধরে বলেছিল,
 
“তুমি গেলে আমি কার সঙ্গে শিমুল ফুল কুড়াব?”
 
আবরার হেসে বলেছিল,
“আমি ফিরে আসব।”
 
“সত্যি?”
 
“সত্যি।”
 
ছোট্ট ছোঁয়া তখন তার হাতে একটা শিমুল ফুল দিয়ে বলেছিল,
“তাহলে এটা রেখে দাও। হারিয়ে ফেলো না।”
 
আবরার চোখ বন্ধ করল।
 
এত বছর পরও সেই মুহূর্তটা এত স্পষ্ট কেন?
 
“কী ভাবছিস?”
 
পেছন থেকে রাফি নামে তার চাচাতো ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবরার ঘুরে তাকাল।
 
“কিছু না।”
 
রাফি হাসল।
 
“তুই ছোটবেলা থেকে একটা কথা খুব ভালো পারিস—মনের কথা লুকাতে।”
 
আবরার চুপ করে রইল।
 
রাফি এবার বলল,
“চৌধুরীবাড়ির ছোঁয়াকে দেখেছিস?”
 
আবরারের চোখ সরু হয়ে গেল।
 
“কেন?”
 
“এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
 
“তুই বেশি প্রশ্ন করিস।”
 
রাফি হেসে চলে গেল।
 
আবরার আবার চৌধুরীবাড়ির দিকে তাকাল।
 
তারপর খুব আস্তে বলল,
 
“তুই আমাকে মনে রেখেছিস, ছোঁয়া?”
 
 
পরদিন সকালে চৌধুরীবাড়ির উঠানে বেশ ব্যস্ততা।
 
নওশীন রান্নাঘরে, সামিউল বাইরে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলছেন।
 
ছোঁয়া শিমুল ফুল কুড়াতে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
 
ঠিক তখনই বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে থামল।
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকাল।
 
গাড়ি থেকে মাহিরা খান নামলেন।
 
তার হাতে একটা বড় ঝুড়ি।
 
নওশীন এগিয়ে গিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন।
 
দুই পরিবারের মধ্যে অনেকদিন পর এমন স্বাভাবিক দেখা হওয়ায় বাড়ির সবাই অবাক।
 
ছোঁয়াও একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
 
মাহিরা তাকে দেখে কাছে এসে বললেন,
 
“তুই তো একেবারে বড় হয়ে গেছিস!”
 
ছোঁয়া মৃদু হেসে সালাম করল।
 
মাহিরা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আবরার তোকে দেখেই চিনে ফেলেছে।”
 
ছোঁয়ার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।
 
কিন্তু সামিউল দূর থেকে কথাটা শুনে আচমকা গম্ভীর হয়ে গেলেন।
 
“মাহিরা, ভেতরে এসো।”
 
মাহিরা তার মুখের দিকে তাকালেন।
 
কিছু একটা বুঝতে পেরে চুপ করে গেলেন।
 
দুই পরিবারের বড়রা ভেতরে চলে গেলেন।
 
ছোঁয়া উঠানে একা দাঁড়িয়ে রইল।
 
কিছুক্ষণ পর তার চোখ গেল শিমুলগাছটার দিকে।
 
গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আবরার।
 
কখন যে সে এসেছে, ছোঁয়া টেরই পায়নি।
 
আবরার দূর থেকে বলল,
 
“আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছ?”
 
ছোঁয়া মাথা নাড়ল।
 
“না।”
 
“তাহলে এত দূরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
 
ছোঁয়া কিছু বলল না।
 
আবরার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মাটিতে পড়ে থাকা একটা শিমুল ফুল তুলে নিল।
 
তারপর ফুলটা ছোঁয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
 
“এটা তোমার।”
 
ছোঁয়া ফুলটা নিল না।
 
“তুমি এত বছর পর ফিরে এসে আবার শিমুল ফুল দিচ্ছ কেন?”
 
আবরার মৃদু হেসে বলল,
 
“কারণ বারো বছর আগে একটা অসমাপ্ত কথা রেখে গিয়েছিলাম।”
 
“কী কথা?”
 
আবরার কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
 
“সেটা তোমাকে একদিন বলব।”
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
 
আবরার চলে যেতে শুরু করল।
 
হঠাৎ ছোঁয়া পেছন থেকে বলল,
 
“আবরার!”
 
সে থেমে ফিরে তাকাল।
 
ছোঁয়ার কণ্ঠ কাঁপছিল।
 
“তুমি এবারও কি চলে যাবে?”
 
আবরারের চোখে এক মুহূর্তের জন্য গভীর আবেগ ফুটে উঠল।
 
সে ধীরে বলল,
 
“না, ছোঁয়া। এবার যদি যাই... তোমাকে নিয়েই যাব।”
 
কথাটা বলে সে চলে গেল।
 
ছোঁয়া শিমুলগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
 
তার হাতে তখনও সেই লাল ফুলটা।
 
কিন্তু সে জানত না—
 
এই ছোট্ট শিমুল ফুলটার সঙ্গেই খুব শিগগির জড়িয়ে যাবে এমন এক সত্য, যা জানার পর হয়তো তাদের ভালোবাসার পথটা আর এত সহজ থাকবে না।
 
আর চৌধুরীবাড়ির বন্ধ দরজার ওপাশে তখন সামিউল আর নওশীনের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বহু বছর আগের সেই পুরোনো গল্পের আলোচনা।
 
চলবে....
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব:০৪
 
 
 
চৌধুরীবাড়ির ভেতরের ঘরটায় তখন অদ্ভুত এক নীরবতা।
 
বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। উঠানের একপাশে শিমুলগাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। বাতাসে শুকনো পাতার মৃদু শব্দ, অথচ ঘরের ভেতর সামিউল চৌধুরী আর নওশীনের মুখে কোনো কথা নেই।
 
সামিউল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
 
নওশীন ধীরে ধীরে বললেন,
 
“এভাবে আর কতদিন লুকিয়ে রাখবে?”
 
সামিউল চোখ বন্ধ করলেন।
 
“আমি জানি না।”
 
“ছোঁয়া এখন ছোট নেই, সামিউল। সত্যিটা একদিন না একদিন জানবেই।”
 
“জানি।”
 
“তাহলে আজই বলো।”
 
সামিউল ধীরে ঘুরে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
 
“আজ বললে শুধু একটা পুরোনো ঘটনা সামনে আসবে না, নওশীন। ছোঁয়ার জীবনটাও বদলে যেতে পারে।”
 
নওশীনের চোখ ভিজে উঠল।
 
“কিন্তু সত্যি লুকিয়ে রেখে কি ওকে রক্ষা করা যাবে?”
 
সামিউল কিছু বললেন না।
 
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বললেন,
 
“বারো বছর আগে যা ঘটেছিল, সেটা যদি আবার ফিরে আসে?”
 
নওশীন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
 
“হয়তো ফিরে এসেছে।”
 
দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন।
 
কারণ দুজনের মনেই তখন একই কথা—
 
আবরার ফিরে এসেছে।
 
---
 
নিজের ঘরে বসে ছোঁয়া শিমুলফুলটা হাতে নিয়ে ছিল।
 
ফুলটা বারবার দেখছিল সে।
 
কেন জানি মনে হচ্ছিল, ফুলটার সঙ্গে কোনো পুরোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু যতই মনে করার চেষ্টা করে, ততই স্মৃতিটা ঝাপসা হয়ে যায়।
 
বারো বছর আগে সে কী বলেছিল আবরারকে?
 
আবরারই বা কেন তাকে এমনভাবে মনে রেখেছে?
 
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
 
তার বাবা-মা আবরারের নাম শুনলেই কেন এত অস্বস্তিতে পড়ে যান?
 
ছোঁয়া বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
 
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বলল,
 
“আমি কি সত্যিই ওকে চিনতাম?”
 
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।
 
নওশীন ঢুকলেন।
 
“ঘুমাসনি?”
 
“না মা।”
 
নওশীন মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
 
ছোঁয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
 
“মা, তুমি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছ?”
 
নওশীন থমকে গেলেন।
 
“কেন এমন মনে হলো?”
 
“কারণ আবরারকে দেখার পর সবাই এমন আচরণ করছে, যেন ও শুধু ফিরে আসেনি… সঙ্গে কোনো বিপদও নিয়ে এসেছে।”
 
নওশীন মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
 
“সব মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই, ছোঁয়া।”
 
“তুমি কি আবরারকে বিশ্বাস করো না?”
 
নওশীন উত্তর দিতে পারলেন না।
 
ছোঁয়া এবার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
 
“তুমি যদি ওকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমাকে কারণটা বলো।”
 
নওশীনের চোখে পানি জমল।
 
“কারণটা জানলে হয়তো তুই ওকে ঘৃণা করতে শুরু করবি।”
 
ছোঁয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
 
“আমি সত্যিটা শুনে কাউকে ঘৃণা করব কি না, সেটা আমি নিজেই ঠিক করব।”
 
নওশীন মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
 
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
 
“সব সত্যি সবসময় মানুষকে মুক্তি দেয় না, মা। কিছু সত্যি মানুষকে সারাজীবন কষ্ট দেয়।”
 
ছোঁয়া কিছু বলল না।
 
শুধু মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
 
“তবু আমি জানতে চাই।”
 
নওশীন উঠে দাঁড়ালেন।
 
“আজ না।”
 
“কবে?”
 
“যেদিন সময় হবে।”
 
“আর যদি সেই সময় আসার আগেই সবকিছু বদলে যায়?”
 
নওশীন থেমে গেলেন।
 
পেছন ফিরে মেয়ের দিকে তাকালেন।
 
তার চোখে তখন এমন এক ভয়, যা ছোঁয়া আগে কখনো দেখেনি।
 
---
 
অন্যদিকে খানবাড়িতে রাতের খাবারের টেবিলে বসেও আবরারের মন অন্য কোথাও।
 
মাহিরা কয়েকবার ছেলের দিকে তাকিয়ে অবশেষে বললেন,
 
“তুই আজ খুব চুপচাপ।”
 
“কাজের কথা ভাবছি।”
 
রাশেদ খান হালকা গলায় বললেন,
 
“কাজের কথা ভাবলে মানুষের মুখে এমন হাসি আসে?”
 
আবরার চমকে বাবার দিকে তাকাল।
 
“আমি হাসছি?”
 
রাশেদ মৃদু হাসলেন।
 
“হ্যাঁ।”
 
মাহিরাও হাসলেন।
 
“চৌধুরীবাড়ির মেয়েটাকে দেখে এসেছিস, তাই না?”
 
আবরার এবার চুপ হয়ে গেল।
 
মাহিরা মজা করে বললেন,
 
“ছোটবেলায় তোকে যে মেয়েটা শিমুল ফুল দিত, তাকে এতদিন পর দেখে কেমন লাগল?”
 
আবরার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
 
“তুমি এখনও মনে রেখেছ?”
 
“মায়েরা কিছু ভুলে না।”
 
আবরার মাথা নিচু করল।
 
“ও অনেক বদলে গেছে।”
 
মাহিরা হেসে বললেন,
 
“মানুষ বড় হলে বদলায়।”
 
আবরার খুব আস্তে বলল,
 
“চেহারা বদলেছে। চোখ দুটো বদলায়নি।”
 
মাহিরার হাসি থেমে গেল।
 
রাশেদও চুপ করে ছেলের দিকে তাকালেন।
 
কয়েক মুহূর্ত পর তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
 
“আবরার, একটা কথা বলব?”
 
“বলুন।”
 
“চৌধুরীবাড়ির কারও সঙ্গে কোনো সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করবি না।”
 
আবরার ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
 
“কেন?”
 
“কারণ আমি বলছি।”
 
“এটা কোনো কারণ হলো?”
 
রাশেদের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
 
“তুই এখনো জানিস না, ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের কী হয়েছিল।”
 
আবরার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
 
“তাহলে বলুন।”
 
“সবকিছুর সময় আছে।”
 
“আমি সেই সময়ের অপেক্ষা করতে চাই না।”
 
রাশেদ টেবিলে হাত রাখলেন।
 
“আবরার!”
 
আবরার থেমে গেল।
 
বাবার চোখে সে এমন একটা কষ্ট দেখল, যা তাকে আর প্রশ্ন করতে দিল না।
 
কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সে শুধু বলল,
 
“যদি সত্যিটা আমার জীবনকে বদলে দেয়, তাহলে সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”
 
রাশেদ কিছু বললেন না।
 
আবরার চলে গেল।
 
মাহিরা স্বামীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
 
“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”
 
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
 
“হ্যাঁ।”
 
“কিসের?”
 
“এই যে পুরোনো ভুলটা আবার আমাদের সন্তানদের জীবন নষ্ট না করে।”
 
---
 
পরদিন সকাল।
 
শিমুলতলীর আকাশ পরিষ্কার। রাতের শিশিরে ঘাস ভেজা। শিমুলগাছের নিচে লাল ফুলের স্তর পড়ে আছে।
 
ছোঁয়া হাতে একটা ঝুড়ি নিয়ে ফুল কুড়াতে এসেছিল।
 
একটা ফুল তুলতে গিয়ে হঠাৎ পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এল,
 
“তুমি এখনও একাই ফুল কুড়াও?”
 
ছোঁয়া চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
 
আবরার।
 
আজ তার পরনে সাধারণ সাদা পাঞ্জাবি। চোখে সেই পরিচিত গম্ভীরতা।
 
ছোঁয়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
 
“তুমি কি সবসময় আমাকে অনুসরণ করো?”
 
আবরার হেসে বলল,
 
“তুমি কি সবসময় আমাকে ভুল বোঝো?”
 
“আমি তোমাকে চিনি না।”
 
“চিনতে চাইছ না।”
 
ছোঁয়া চুপ করে গেল।
 
আবরার গাছের নিচে এসে দাঁড়াল।
 
“বারো বছর আগে তুমি আমাকে একটা কথা বলেছিলে।”
 
“কী কথা?”
 
“তুমি বলেছিলে, আমি ফিরে এলে তুমি আমাকে একটা শিমুল ফুল দেবে।”
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকাল।
 
“আমি?”
 
“হ্যাঁ।”
 
“আমার মনে নেই।”
 
আবরার মৃদু হেসে বলল,
 
“তোমার মনে না থাকলেও আমার আছে।”
 
সে পকেট থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।
 
কাগজটা বহু পুরোনো। ভাঁজে ভাঁজে সময়ের ছাপ।
 
ছোঁয়া কৌতূহলী হয়ে তাকাল।
 
“এটা কী?”
 
আবরার কাগজটা খুলল।
 
ভেতরে শুকনো একটা শিমুলের পাপড়ি।
 
আর তার নিচে শিশুসুলভ হাতের লেখায় কয়েকটা শব্দ—
 
“আবরার ফিরলে আমি ওকে আর যেতে দেব না।”
 
ছোঁয়ার বুক কেঁপে উঠল।
 
“এটা…”
 
“তুমি লিখেছিলে।”
 
ছোঁয়া কাগজটা হাতে নিল।
 
তার চোখের সামনে যেন হঠাৎ পুরোনো একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
 
শিমুলগাছ।
 
দুই শিশু।
 
একটা বিদায়ের বিকেল।
 
আর একটা কণ্ঠ—
 
“আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
 
ছোঁয়া কপালে হাত রাখল।
 
“আমার মাথাটা কেমন করছে…”
 
আবরার উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
 
“ছোঁয়া!”
 
“আমি ঠিক আছি।”
 
আবরার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
 
“তুমি চাইলে আমি সবকিছু মনে করিয়ে দিতে পারি।”
 
ছোঁয়া তার দিকে তাকাল।
 
“সবকিছু?”
 
“হ্যাঁ।”
 
“তাহলে বলো।”
 
আবরার চোখ নামিয়ে ফেলল।
 
“আজ নয়।”
 
“কেন?”
 
“কারণ কিছু স্মৃতি ফিরে আসার আগে মনকে প্রস্তুত হতে হয়।”
 
ছোঁয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
 
“তুমি সবকিছু এত রহস্য করে বলো কেন?”
 
আবরার মৃদু হেসে বলল,
 
“কারণ তোমার গল্পটা শুধু আমার সঙ্গে জড়িত নয়।”
 
“তাহলে কার সঙ্গে?”
 
আবরার উত্তর দেওয়ার আগেই দূর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
 
“ছোঁয়া!”
 
দুজনেই তাকাল।
 
সামিউল চৌধুরী দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
 
তার মুখ দেখে ছোঁয়া বুঝে গেল—
 
বাবা রাগ করেননি।
 
বাবা ভয় পেয়েছেন।
 
সামিউল এসে আবরারের দিকে তাকালেন।
 
“তুমি এখানে কেন?”
 
আবরার শান্ত গলায় বলল,
 
“ছোঁয়ার সঙ্গে কথা বলতে।”
 
“ওর সঙ্গে তোমার কথা বলার দরকার নেই।”
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
 
“বাবা!”
 
সামিউল মেয়ের দিকে না তাকিয়ে বললেন,
 
“চলো বাড়ি।”
 
আবরার কিছু বলল না।
 
কিন্তু সামিউল চলে যাওয়ার আগে তার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বললেন,
 
“বারো বছর আগে যা শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটা আবার শুরু করতে এসো না।”
 
আবরারের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
 
“আমি কিছু শুরু করতে আসিনি, চাচা।”
 
একটু থেমে সে বলল,
 
“আমি শুধু জানতে এসেছি—সেদিন আসলে কী হয়েছিল।”
 
সামিউলের মুখের রং বদলে গেল।
 
ছোঁয়া অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
 
আবরার আবার বলল,
 
“কারণ এত বছর ধরে আমাকে একটা মিথ্যা বিশ্বাস করিয়ে রাখা হয়েছে।”
 
সামিউল কিছু বললেন না।
 
শুধু ছোঁয়ার হাত ধরে তাকে নিয়ে চলে গেলেন।
 
পেছনে দাঁড়িয়ে আবরার শিমুলগাছটার দিকে তাকাল।
 
গাছ থেকে একটা লাল ফুল ঝরে পড়ল।
 
সে ফুলটা তুলে মুঠোয় চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
 
“সত্যিটা যতই কষ্টের হোক, এবার আমি জানব।”
 
আর চৌধুরীবাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে ছোঁয়ার মনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—
 
বারো বছর আগে এমন কী ঘটেছিল, যার জন্য দুই পরিবারের মানুষ আজও একে অপরের চোখের দিকে তাকাতে ভয় পায়?
 
শিমুলগাছটা নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
 
কারণ সে জানে—
 
এই ভালোবাসার গল্পের সবচেয়ে বড় সাক্ষী সে নিজেই। 
 
চলবে.....
Loading spinner

Reply
Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব:০৫
 
 
চৌধুরীবাড়ির বড় দরজাটা পেরিয়ে ছোঁয়া যখন ভেতরে ঢুকল, তখনও তার মাথার ভেতর আবরারের শেষ কথাগুলো ঘুরছিল।
 
“আমি শুধু জানতে এসেছি—সেদিন আসলে কী হয়েছিল।”
 
সেদিন কী হয়েছিল?
 
ছোঁয়া জানে না।
 
কিন্তু তার বাবা-মায়ের আচরণ দেখে এখন আর এটাকে নিছক ছোটবেলার কোনো ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না।
 
সামিউল চৌধুরী মেয়ের হাত ছেড়ে দিয়ে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। নওশীন তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বামী আর মেয়ের মুখ দেখেই তিনি বুঝে গেলেন, শিমুলতলায় আবার এমন কিছু কথা হয়েছে, যেটা এতদিন চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
 
“কী হয়েছে?”
 
সামিউল কোনো উত্তর দিলেন না।
 
ছোঁয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
 
“মা, বাবা আমাকে কিছু বলছে না। তুমি বলো।”
 
নওশীন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
 
সামিউল হঠাৎ পেছন ফিরে বললেন,
 
“ছোঁয়া, তুই নিজের ঘরে যা।”
 
“কিন্তু বাবা—”
 
“আমি বলেছি, নিজের ঘরে যা।”
 
কণ্ঠটা কঠিন ছিল।
 
ছোঁয়া বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর অভিমানী চোখে নিজের ঘরে চলে গেল।
 
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা মিলিয়ে যেতেই নওশীন ধীরে ধীরে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়ালেন।
 
“এভাবে আর কতদিন?”
 
সামিউল জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
 
“আমি চাই না ও জানুক।”
 
“কিন্তু ও এখন নিজেই জানতে চাইছে।”
 
“ও জানলে আবরারের কাছ থেকে দূরে থাকবে না।”
 
নওশীন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
 
“হয়তো দূরে থাকবে না। কিন্তু সত্যিটা না জানলে ওর ভয়টা আরও বাড়বে।”
 
সামিউল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
 
তারপর আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে নিচের তাকে রাখা একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন।
 
বাক্সটার ওপর ধুলোর আস্তরণ।
 
নওশীনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে গেল।
 
“এটা তুমি এখনও রেখেছ?”
 
“ফেলে দিতে পারিনি।”
 
“কেন?”
 
সামিউল বাক্সটা হাতে নিয়ে ধীরে বললেন,
 
“কারণ কিছু জিনিস ফেলে দেওয়া যায় না। শুধু লুকিয়ে রাখা যায়।”
 
তিনি বাক্সটা খুললেন।
 
ভেতরে পুরোনো কিছু কাগজ, একটা ছোট্ট নীল ফিতা আর কয়েকটা শুকনো ফুল।
 
নওশীনের চোখ গিয়ে থামল একটা চিঠির ওপর।
 
চিঠিটার কাগজ হলদে হয়ে গেছে।
 
কোণাটা সামান্য ছেঁড়া।
 
সামিউল চিঠিটা হাতে তুলে নিলেন।
 
“এই চিঠিটাই সবকিছুর শুরু।”
 
নওশীন কাঁপা গলায় বললেন,
 
“ছোঁয়াকে দেখানোর আগে তুমি নিশ্চিত তো?”
 
সামিউল চুপ করে রইলেন।
 
তারপর বললেন,
 
“এখনও সময় হয়নি।”
 
---
 
নিজের ঘরে বসে ছোঁয়ার মনটা অস্থির হয়ে উঠেছিল।
 
সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
 
দূরে শিমুলগাছটা দেখা যাচ্ছে।
 
লাল ফুলগুলো বাতাসে দুলছে।
 
ছোঁয়ার মনে হলো, গাছটা যেন তাকে কিছু বলতে চাইছে।
 
হঠাৎ তার চোখে ভেসে উঠল ছোটবেলার একটা দৃশ্য।
 
সে দৌড়ে যাচ্ছে।
 
পেছনে আবরার।
 
তার হাতে একটা লাল শিমুল ফুল।
 
“ধরো তো!”
 
“না, তুমি আগে ধরো!”
 
তারপর দুজনেই হেসে উঠছে।
 
স্মৃতিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
 
ছোঁয়া কপালে হাত রাখল।
 
“আমি এত কিছু কেন মনে করতে পারছি না?”
 
ঠিক তখন দরজায় নক হলো।
 
নওশীন ঢুকলেন।
 
মেয়ের পাশে এসে বসে বললেন,
 
“মন খারাপ?”
 
ছোঁয়া মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
 
“মা, আমি কি ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলাম?”
 
নওশীন হেসে ফেললেন।
 
“অনেক।”
 
“আবরারকে চিনতাম?”
 
নওশীনের হাসি মিলিয়ে গেল।
 
“হ্যাঁ।”
 
“কতটা?”
 
“অনেকটা।”
 
ছোঁয়া উঠে বসল।
 
“তাহলে আমি কেন ওকে মনে করতে পারছি না?”
 
নওশীন মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
 
“সব স্মৃতি মানুষের মনে সমানভাবে থাকে না।”
 
“কিন্তু আবরার সব মনে রেখেছে।”
 
নওশীন চুপ।
 
ছোঁয়া মায়ের হাত ধরে বলল,
 
“মা, একটা কথা বলো। আমি কি ওকে কোনোদিন ভালোবাসতাম?”
 
প্রশ্নটা শুনে নওশীনের চোখ ভিজে উঠল।
 
“ভালোবাসা কী, সেটা বোঝার বয়স তখন তোমার ছিল না।”
 
ছোঁয়া মৃদু স্বরে বলল,
 
“কিন্তু আবরার বলছে, আমাদের মধ্যে একটা প্রতিশ্রুতি ছিল।”
 
নওশীন কিছু বললেন না।
 
ছোঁয়া এবার ফিসফিস করে বলল,
 
“আমি কি ওকে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম?”
 
নওশীন চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
 
তারপর খুব আস্তে বললেন,
 
“হ্যাঁ।”
 
ছোঁয়ার বুক কেঁপে উঠল।
 
“তাহলে?”
 
“তারপর সবকিছু বদলে গেল।”
 
“কীভাবে?”
 
নওশীন উঠে দাঁড়ালেন।
 
“এখন না, মা।”
 
ছোঁয়া মায়ের হাত ধরে ফেলল।
 
“তুমি প্রতিবার ‘এখন না’ বলো কেন?”
 
নওশীনের চোখ দিয়ে এবার এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
 
“কারণ আমি চাই না আমার মেয়ের চোখে এমন কষ্ট আসুক, যেটা একজন মা নিজের চোখে দেখেছে।”
 
ছোঁয়া কিছু বলতে পারল না।
 
নওশীন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
 
আর ছোঁয়া প্রথমবার বুঝল—
 
এই গল্পে শুধু তার আর আবরারের পুরোনো পরিচয় নেই।
 
এর পেছনে আরও বড় কিছু আছে।
 
---
 
সন্ধ্যার একটু আগে আবরার আবার শিমুলগাছের নিচে এসে দাঁড়াল।
 
তার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
 
ডায়েরিটা সে বহু বছর ধরে নিজের কাছে রেখেছে।
 
পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে একটা জায়গায় এসে থামল।
 
পাতার ওপর শিশুসুলভ অক্ষরে লেখা—
 
“আজ ছোঁয়া বলেছে, আমি যদি চলে যাই, সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।”
 
তার নিচে আবরার নিজে লিখেছিল—
 
“আমি ফিরে আসব। যত বছরই লাগুক।”
 
আবরার ডায়েরিটা বন্ধ করল।
 
“আমি ফিরেছি, ছোঁয়া।”
 
পেছন থেকে হঠাৎ ছোঁয়ার কণ্ঠ এল,
 
“কিন্তু আমি তো তোমাকে অপেক্ষা করতে বলিনি।”
 
আবরার চমকে ফিরে তাকাল।
 
ছোঁয়া দাঁড়িয়ে আছে।
 
চোখে প্রশ্ন।
 
আবরার ধীরে বলল,
 
“তুমি বলেছিলে।”
 
“আমার মনে নেই।”
 
“আমি জানি।”
 
“তাহলে তুমি কেন এত বছর ধরে সব মনে রেখেছ?”
 
আবরার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
 
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
 
“কারণ তোমার বলা প্রতিটা কথা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
 
ছোঁয়ার চোখ নরম হয়ে এল।
 
“তুমি কি আমাকে সত্যিই এতটা মনে রেখেছিলে?”
 
আবরার হেসে বলল,
 
“তোমাকে মনে রাখার জন্য আলাদা করে চেষ্টা করতে হয়নি।”
 
“কেন?”
 
“কারণ তুমি কখনো আমার স্মৃতি থেকে বের হওনি।”
 
ছোঁয়া চোখ নামিয়ে ফেলল।
 
বাতাসে তার চুল উড়ে মুখের ওপর এসে পড়েছে।
 
আবরার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
 
তারপর পকেট থেকে সেই পুরোনো চিঠিটা বের করল।
 
ছোঁয়া চিঠিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
 
“এটা কী?”
 
“তোমার জন্য।”
 
“আমি লিখেছিলাম?”
 
“হ্যাঁ।”
 
ছোঁয়া হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে সামিউলের কণ্ঠ ভেসে এল—
 
“ছোঁয়া!”
 
দুজনেই ফিরে তাকাল।
 
সামিউল দ্রুত এগিয়ে আসছেন।
 
তার চোখ চিঠিটার ওপর পড়তেই মুখের রং বদলে গেল।
 
“ওটা কোথা থেকে পেলি?”
 
আবরার শান্তভাবে বলল,
 
“আমার কাছে ছিল।”
 
সামিউল চিঠিটা কেড়ে নিতে এগিয়ে এলেন।
 
আবরার এক পা পিছিয়ে গেল।
 
“চাচা, এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”
 
“চিঠিটা আমাকে দাও।”
 
“কেন?”
 
“কারণ এটা তোমার নয়।”
 
আবরারের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
 
“তাহলে কার?”
 
সামিউল উত্তর দিলেন না।
 
ছোঁয়া এবার বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।
 
“বাবা, আমি চিঠিটা দেখতে চাই।”
 
“না।”
 
“কেন?”
 
“কারণ তোর ভালো হবে না।”
 
ছোঁয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
 
“আমার ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত আমি নিতে চাই।”
 
সামিউল মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
 
আবরারও চুপ।
 
শেষ পর্যন্ত সামিউল ধীরে ধীরে বললেন,
 
“তুই যদি এই চিঠিটা পড়িস, তাহলে আর আগের মতো কিছুই থাকবে না।”
 
ছোঁয়ার চোখে পানি জমল।
 
“হয়তো আগের মতো কিছু রাখার দরকারই নেই, বাবা।”
 
সামিউল যেন কথাটা শুনে ভেতর থেকে ভেঙে পড়লেন।
 
তিনি চিঠিটা ছোঁয়ার হাতে দিয়ে দিলেন।
 
ছোঁয়া কাঁপা হাতে কাগজটা খুলল।
 
ভেতরে মাত্র কয়েকটা লাইন।
 
কিন্তু প্রথম লাইনটাই তার বুক কাঁপিয়ে দিল—
 
“প্রিয় আবরার, তুমি যদি সত্যিই ফিরে আসো, তাহলে আমাকে সেই রাতটার সত্যিটা বলবে। কারণ সবাই বলছে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি...”
 
ছোঁয়ার হাত কাঁপতে লাগল।
 
সে পরের লাইন পড়তে যাবে—
 
ঠিক তখনই সামিউল তার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ফেললেন।
 
“আজ এতটুকুই যথেষ্ট।”
 
ছোঁয়া বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
 
আবরারের চোখে তখন তীব্র প্রশ্ন।
 
“চাচা, সেই রাতে কী হয়েছিল?”
 
সামিউল এবার আর উত্তর দিলেন না।
 
শুধু শিমুলগাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
 
“যে রাতের কথা তোমরা জানতে চাইছ, সেই রাতেই একজন মানুষ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।”
 
ছোঁয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
 
“কে?”
 
সামিউল চোখ বন্ধ করলেন।
 
কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না।
 
আর আবরার বুঝে গেল—
 
বারো বছর আগে শুধু সে আর ছোঁয়া আলাদা হয়নি।
 
সেই রাতের অন্ধকারে এমন একজন হারিয়ে গিয়েছিল, যার সঙ্গে তাদের দুজনের ভাগ্যও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
 
শিমুলগাছের ডাল থেকে একসঙ্গে কয়েকটা লাল ফুল ঝরে পড়ল।
 
মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছোঁয়া মনে মনে বলল—
 
“যে সত্য এত বছর লুকিয়ে ছিল, এবার আমি তাকে খুঁজে বের করব।”
 
আর দূরে দাঁড়িয়ে আবরারও একই সিদ্ধান্ত নিল।
 
কারণ এবার তাদের সামনে শুধু ভালোবাসার প্রশ্ন নয়—
 
একটা পুরোনো রাতের রহস্যও দাঁড়িয়ে আছে। 
 
চলবে.....
Loading spinner

Reply
Page 1 / 2
Share:

Loading spinner