গল্প: বিষাদও বসন্ত ...
 
Notifications
Clear all

গল্প: বিষাদও বসন্ত (writer:Alakananda Aindri)

Page 2 / 2

Posts: 9
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 5 months ago
পর্ব:১২
 

মিথির মোটামুটি দুই- তিনটে দিন ভাবীর সংসারে কাজকর্ম করে কাঁটাতে হলো অনেক কথা শুনেই। রাতদিন অনেকভাবে অনেকরকমের কথা শুনে মিথি অন্তত এটুকু বুঝে উঠতে পারল যে এক অশান্তির জায়গা থেকে ও আরেক অশান্তির জায়গাতেই এসে পড়েছে। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনে চলার জন্য মানসিক শান্তি প্রয়োজন। মানসিক শান্তি ছাড়া টিকে থাকা অনেকটাই অসম্ভব!  মিথিরও চলার পথে অবশ্যই মানসিক শান্তির প্রয়োজন। অথচ এই মানিসক শান্তির ছিঁটেফোটাও ও বাবা মারা যাওয়ার পর আর টের পায় নি। এমনকি এখনও! মিথি বুঝে উঠে না কি করবে। এভাবে ভাই এর সংসারে পড়ে থেকে, ভাই এর টাকায় খাওয়া চলবে না এটুকু তো ও বুঝে। অথচ হাতে এই মুহুর্তে জমানো কিছু টাকা ছাড়া কিছু নেই ওর। এখান থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তেমন নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ও নেই ওর। আছে একজন, হিয়া। ওর ছোটবেলা থেকে এখন অব্দব সবথেকে কাছের বন্ধু। এইতো দশ মিনিটের দূরত্বে ওদের বাড়িটা। অথচ হিয়া বাড়ি নেই। এইচ.এস. সি এর পর কোচিং করতে শহরে গিয়েছে। যতদূর শুনেছে, হিয়া কয়েকটা মেয়ে সহ মেসে থাকে। এদিকে নিজের হাতে ফোন না থাকায় হিয়ার সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম ও ওর নেই। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। সব রাস্তা যখন বন্ধ তখন ভাবল জমানো টাকাগুলোর একাংশই ভাবীর হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে বসে খাওয়ার থেকে ওভাবে হলে কিছুটা মানবে হয়তো ভাবী।মিথি তাই করল। অর্ধেক টাকাটা নিজের খরচ হিসেবে ভাবীকে তুলে দিয়ে বাকি অর্ধেকটা নিজের কাছে  রাখল। এরপর কোন একটা কাজ শুরু করবে নাহয়। সেলাই কাজটা মিথি বিয়ের আগ থেকে পারলেও এই দুয়েকটা দিনে ও কাজ পায় নি একটাও। পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে বলে মনে হচ্ছে না। পেলেও বা কয় টাকা রোজগার হবে? আগেকার দিনের বাংলা সিনেমার সাবনা তো না ও, যে সেলাই মেশিন দিয়ে বড়লোক হয়ে যাবে। মিথি যখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না, শুধু চিন্তা করছিল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে  তখনই মনে হলো ওর দুটো কানের দূল আর একটা সোনার রিং আছে। এগুলো বিক্রি করে হলেও কিছু একটা ও অবশ্যই শুরু করতে পারবে। এতোটা নিরাশ হলে কি করে হবে? নিরাশ হওয়া যাবে না। এমনটাও মনোবল স্থির করল মনে মনে ও। আরো দুয়েকটা দিন কাঁটার পরই ও সোনার রিংটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিল। ভাই- ভাবী কাউকেই জানানো হয়নি। ওদের উপর মিথির আজকাল বিশ্বাস জম্মায় না। নিজেই সে কারণে একা একাই গ্রামের বাজারে গেল। বাজারের কোণায় একটা সোনার দোকান আছে। মিথিরা কলেজ আসা-যাওয়ার সময় দোকানটা অনেকবারই দেখেছে। মিথি ঐ দোকানেই গেল।অতঃপর দামদর জিজ্ঞেস করল। রিংটা বিক্রি করলে মোটামুটি ভালো অংকের একটা টাকাই ও হাতে পাবে। অথচ এই টাকা দিয়ে শুরুতেই কি করা উচিত মাথায় এলো না। এখনই বিক্রি করে দিবে কিনা তাও বুঝে উঠল না। মিথি অনেকটা ভেবেচিন্তে দামদর জিজ্ঞেস করে আবার বের হয়ে গেল। যেহেতু এখনও কোন কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়নি সেহেতু বিক্রি করল না। তবে পরে বিক্রি করবে এমনটাই জানিয়ে সে বের হয়ে এল। অতঃপর কিছুটা দূর আসতেই দেখা মিলল স্নিগ্ধার বোন সাবিহার। মেয়েটাই প্রথমে হাসল ওকে দেখে। এগিয়ে এসে শুধাল,

“ মিথি, তুমি? তুমিও কি বাজার করতে এসেছো? ”

মিথির ঠিক সাবিহার মতো করে হাসি পেল না। তবুও সৌজন্যতার খাতিরে মুখে হাসি আনল ও। ভদ্রতা দেখিয়ে বলল,

“ না, একটু দরকার ছিল সাবিহা আপু৷ আপনারা? ”

সাবিহা হাসল। হাতের সবজির ব্যাগটা দেখিয়ে বলল,

“ বাজার দেখতেই এলাম হিমেলের সাথে। ”

মিথি কপাল কুঁচকাল।বাজার আবার দেখার বিষয় হলো? এতো ভীড় ঠেলে বাজার করা এসব দেখার মধ্যে আনন্দের কিছু থাকে? তাহলে? মিথি সাবিহার দিকে তাকাল। চোখমুখে সত্যিই খুশির ছাপ। কেউ বাজার করে এতোটা খুশি হতে পারে বলে মিথির মনে হয় না। মিথির মনে হলো অন্য কোন কারণ।কারণটা হয়তোবা হিমেল ভাই। এই কারণেই হয়তো বা এতোটা খুশি৷ মিথি হেসে উত্তর করল,

“ ওহ।”

“ তুমি? তুমি কোথায় গিয়েছিলে? ”

“ একটু ব্যাক্তিগত দরকার  ছিল আপু।আপনাদের বাজার করা শেষ? ”

“আরেহ নাহ। এবার তো মাছ বাজারে যাব হিমেলের সাথে।যায়হোক,  তোমার সেই সুন্দর, হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড কেমন আছে? তার সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনে তাকে দেখার খুব কৈাতুহল হচ্ছে। ”

মিথি এবারে ছোটশ্বাস টানল। মুখে হাসি বজায় রাখল অবশ্য। অথচ যে সৌন্দর্যের কথা শুনে মানুষ এতোটা কৌতুহল জমায়, আকৃষ্ট হয়, আগ্রহ দেখায় সে সৌন্দর্যের আড়ালেও মানুষের কত নিকৃষ্ট রূপ থাকে! এই যে গ্রামের অধিকাংশ মানুষই জানে মিথির কপাল ভালো। কারণ কি? মিথির ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। স্বামী সুন্দর, বড়লোক। অথচ কেউ তো এটাই জানে না যে ওর স্বামীর মনুষত্ব্য নেই। থাকলে কি পারত এমন ব্যবহার করতে? মিথি নিজের মনেই হাসে। উত্তর করল,

“ ভালোই আছে হয়তো।  ”

সাবিহা ফের জানতে চাইল,

“ কল করোনি? ”

“ সময় হয়ে উঠেনি আসলে।তাছাড়া ফোনও নেই। তাই। ”

এইটুকু বলেই মিথি বেঁচে যেতে চাইল। সাবিহা এখানে থেমে গেলেই হলো। অথচ সাবিহা থামল না। নিজের ফোনটা এগিয়ে হাসিহাসিমুখে বলে উঠল,

” তুমি চাইলে আমার ফোন থেকে কল করে খবর নিতে পারো মিথি। তোমার হাজব্যান্ড ধনী, তার তো উচিত ছিল তোমাকে একটা ফোন দেওয়া। তাই না? ”

মিথির এবার বোধহয় মুখ থমথমে হয়ে আসছে। এভাবে আদ্রকে নিয়ে ভদ্রভাবে বলতে ওর ইচ্ছে হচ্ছে না। আর না তো আদ্রকে স্বামী স্বামী করে অন্যের সাথে এই রমরমা আলাপ জমাতে ইচ্ছে হচ্ছে৷ মিথি যখন কিছুটা বিরক্তে কপাল কুঁচকাল ঠিক তখনই পেছন থেকে মাথা বাঁকাল হিমেল। এতোটা সময় যাবৎও এক হাতে সবজির ব্যাগ নিয়ে শুনছিল ও কথাগুলো। এবারে সাবিহাকে বলল,

“ তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে কথাই বলে যাবে মানুষের সাথে সাবিহা? দাঁড়ালে প্লিজ এখানে দাঁড়াও। আমি বাজার শেষ করে আসছি। ”

সাবিহা কেমন করে যেন চাইল হিমেলের দিকে। ফোনটা আবারও গুঁটিয়ে নিল। মিথি ঐ সময়টায় হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ আপনাদের বোধহয় দেরি হচ্ছে।হিমেল ভাই বিরক্ত হচ্ছেন। আমিও যাই তবে। ”

কথাটা বলেই বিদায় নিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে দু পা বাড়াতেই আকস্মিক এক দূর্ঘটনা ঘটতে লাগল। সামনেই সরু রাস্তার মোড়ে সি এনজিটা এদিকেই আসছিল। মিথিও অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে এখান দিয়েই রাস্তার ওপাশে যাচ্ছিল। আরেকটু হলেই খারাপ কিছু একটা ঘটত। অথচ তা হলো না। আচমকাই একটা পুরুষালি শক্তপোক্ত হাত মিথিকে টেনে নিয়ে রাস্তার একধারে। শাসানো ভঙ্গিতে ধমকে বলে উঠল,

“ রাস্তায় চলার সময় মন কোথায় থাকে তোর? আশ্চর্য। আরেকটু হলেই তো গাড়িটা মেরে দিত এক্ষুনি। এত বড় হয়ে রাস্তায় কিভাবে চলতে হয় তা জানিস না মিথি? ”

মিথি একে তো আচমকাই দমকা হাওয়ার মতো টেনে আনায় হতবিহ্বল দৃষ্টি ফেলে চেয়ে আছে। এবারে তার পরপরই এমন ধমক শুনে ও যে কেঁদে দিবে এমন হলো। এমনিতেই ও কত চিন্তার ভেতর আছে। শরীর চব্বিশ ঘন্টাই ক্লান্ত অনুভব হয়। তার উপর কত বাড়তি ঝামেলা। মিথির কি দোষ? এমন পরিস্থিতিতে থেকে কেউ সবসময় বোধবুদ্ধি খোলা রেখে চলাফেরা করতে পারে নাকি? হিমেল উত্তর না পেয়ে আবারও গম্ভীর গলায় বলল,

“ এতোটা বেখেয়ালি  কেন? রাস্তায় একা বের হয়েছিস অথচ একা চলার মতো ম্যাচুরিটি নেই তোর? ”

মিথি চুপ থাকে। এর আগেও কলেজ লাইফে একবার হিমেল ভাই এর সামনে রিক্সা থেকে পড়ে গিয়েছিল ও। সেবার ও ঠিক একইভাবেই হিমেল ভাই এভাবে ধমক দিয়েছিল। মিথির এখনো মনে আছে স্পষ্ট। একটা বড়সড় ধমক দিয়ে পরমুহুর্তে একটা রিক্সা ডেকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল সেবার। মিথি সেটা মনে করে শান্ত কন্ঠে উত্তর দিল,

“ ভুলবশত হয়ে গিয়েছে।”

হিমেল ভ্রু বাঁকাল। শুধাল,

“ ভুলবশত নাকি ইচ্ছাবশত জানতে চেয়েছি আমি? ”

“ না।” 

হিমেল ভ্রু জোড়া কেমন কুঁচকে রাখল। মিথির দিকেই তাকিয়ে। মেয়েটা ভাত টাত খায় না নাকি এখন? দিন দিন এমন শুকিয়ে যাচ্ছে কেন? এই যে চোখের নিচে বিস্তর কালি পড়েছে? এটাও বা কেন? রাতে ঘুমায় না? অবশ্য এখন তো ওর খেয়াল রাখার জন্য ওর স্বামী আছে। নিশ্চয় অনেক ভালোবাসে মিথিকে সে? নয়তো মিথি নিশ্চয় সাবিহার কাছে তার স্বামীর রূপের প্রশংসা করত না? স্বামীর গল্প বলত না? মিথি নিশ্চয় তার স্বামীকে ভালোবাসে অনেকটা? হিমেল চোখ বুঝে। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়াল,

“ সবার ভাগ্যই ভালো। সবাই তোমার ভালোবাসা পেল মিথি। অথচ হিমেল? যে কিনা এক বসন্তে তোমাকে মন দিয়েছিল তার ভাগ্যে তোমার ভালোবাসার  একাংশও জুটেনি।”

 এটুকু মনে মনে ভেবেই হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। বাড়িতে এসেছিল দুদিনের ছুটিতে ও। আজই চলে যাবে। অথচ চলে যাওয়ার আগে আবারও মিথির সাথে দেখা হবে ও ভাবেনি।তবুও হয়েছে। হিমেলের হৃদয়ের অনুভূতি অনেকটা বিষাদ এবং বসন্তের মিশ্রনে। একদিকে যেমন মিথি আজ অন্যের বলে কষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে যার প্রতি তার এতো গভীর অনুভূতি তাকে দেখে শান্তি শান্তি লাগছে। হিমেল শুধু গম্ভীর গলায় শেষে বলল,

” ঠিকঠাকভাবে চলাফেরা করবি এরপর থেকে। নয়তো তোর হাজব্যান্ডকে বলবি তোর যেন ঠিক ভাবে খেয়াল রাখে।”

এইটুকু বলেই হিমেল পা এগোল। মিথি কেমন করে যেন চেয়ে থাকল। হিমেল ভাই কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করে তার সাথে। কেমন যেন অন্যরকম। অনেক আগ থেকেই এমন অদ্ভুত রকমের ব্যবহার করে। 

.

হিমেল যখন পা এগিয়ে সাবিহা সহ মাছ বাজারের দিকে অগ্রসর হলো তখনই সাবিহা বলল,

“ মিথি অনেক ভালো রাইট? তোমার কি কষ্ট হচ্ছে হিমেল? আচ্ছা, মিথির মধ্যে কি এমন আছে যা তোমার ভালো লাগে হিমেল? ও তো একদম চোখ ধাঁধানো সুন্দরী নয় যে সৌন্দর্য দেখে প্রেমে পড়েছিলে।কি এমন আছে যার কারণে তোমার এতোটা অনুভূতি ওর প্রতি?  ”

হিমেল ঘাড় বাঁকায়। মাথা ঘুরিয়ে সাবিহার দিকে তাকায়। পথ চলতে চলতে বলল,

“ আমি তোমায় কখনো বলেছি আমি মিথিকে পছন্দ করি? বাজারে এসে কিসব বকবক করছো? ”

সাবিহা জানাল,

“ আপু বলেছে আমায়।”

হিমেল এবারে উত্তর করল না। চুপচাপ পা বাড়াল। সাবিহা আবারও বলল,

“ সত্যিই তো পছন্দ করো। ”

হিমেলের দৃষ্টি গম্ভীর হলো। পথ চলতে চলতে শুধু বলল,

“ অন্যের ব্যাক্তিগত বিষয়ে আগ্রহ থাকা ভালো নয় সাবিহা। ”

.

মিথি যখন বাড়ি এল তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। শীতকাল হওয়ায় আকাশে আঁধার নেমে এসেছে প্রায়। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে যেন। শীতের পোশাক পরে না যাওয়ায় শীত শীত ও অনুভব হচ্ছে কিছুটা। মিথি যখন ক্লান্ত শরীরে মাত্র পা এগিয়ে ঘরে ডুকল ঠিক তখনই ভাবী মুখ বাঁকিয়ে তাকাল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই বলল,

“ তো মহারানী, কোথায় গেলে? বলেও তো যাও নি। আমি তো ভাবলাম শ্বশুড়বাড়িতেই ফিরে গিয়েছো। তা নয়, আবার তো সে ফিরেই এলে। ”

মিথির আজকাল ভাবীর কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না। কিছুটা তিক্ত অনুভূতিও কাজ করে। তবুও আশ্রয়ের জন্য থাকতে হবে তাকে এখানে। অন্তত আদ্রর আচরণ থেকে তো ভালো!  মিথি চুপচাপ রুমের দিকে পা এগোতে নিচ্ছিল। তার ভাবী তাহিয়া আবারও বলল,

“ কোথাও যাচ্ছো? আশ্চর্য!  উঠোতে দড়িতে দেওয়া কাপড়গুলো এখনো পড়ে আছে। দেখোনি নাকি? দুপুরের থালাবাসন গুলোও তো পড়ে আছে। কে করবে? ”

মিথি তাকাল চোখ ছোটছোট করে। ওর সত্যিই শরীর দুর্বল লাগছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। পায়ের দিকে আজকে দুদিন হলো টানটান হয়ে আছে। হাঁটতে অসুবিধা হয়। তবুও এসব ও বলবে কাকে? বলার মতো তেমন আপন কেউ তো নেই। মিথি শান্তস্বরে শুধু বলল,

“ কাপড় চেঞ্জ করে নিয়ে আসছি। কলে গিয়ে থালাবাসন গুলো ধুঁয়ে আনছি। চিন্তা করো না। ”

অতঃপর কাপড় বদলে ও বাইরে থেকে কাপড় গুলো নিয়ে এল। ভাজ করল। এরপর কলপাড়ে গিয়ে সমস্ত থালাবাসনগুলোও ধুঁয়ে আনল। অতঃপর সন্ধ্যা হতেই বলা হলো, চা বানাতে, নাস্তা বানাত । মিথি এবারেও না করল না। তাই করল। এর একটু পর আবার বলা হলো মিথির চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া ভাই এর মেয়েটাতে পড়াতে বসাতে। মিথি বিয়ের আগেও পড়াত। এতে অসুবিধে নেই। কিন্তু ওর শরীরে টানছে না। ইচ্ছে হচ্ছিল কেবল চোখ বুঝে একটা ঘুম দিতে। অথচ হলো না। ঘন্টা দুয়েক ভাই এর মেয়েকে পড়া দেখিয়ে এর পর ও নিজের রুমে গিয়ে ঘুম দিল। অতঃপর সেই ঘুম ভাঙ্গল রাত একটায়। ততোটা সময়ে সবাই খেয়ে ঘুম। মিথি রাতে না খেয়েই ঘুমিয়েছিল। অথচ কেউ একবার খেতে ও ডাকল না ওকে। পেটে ক্ষিধেটা এতোটা সময়ে মাথাচওড়া হয়ে উঠল যেন মিথির।  ক্ষিধেতে যখন আর পারছিল না তখন ঐ সময়টাতেই ও রান্না ঘরে গেল। আলো জ্বালিয়ে ভাতের পাতিলটা নিতেই দেখা গেল যেটুকু ভাত অবশিষ্ট আছে তাতে এক চামচ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর তরকারি? মিথি তরকারির কড়াইটা এগিয়ে দেখল ওগুলা খালিই পড়ে আছে। অবশিষ্ট অব্দি নেই।

চলবে...
 

Loading spinner

Reply
Posts: 9
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 5 months ago

 
পর্ব:১৩
 

মিথির অল্প কয়েকটা দিন মোটামুটি চললেও এরই মধ্যে তার ভাবীর নানান কথা শুনে গ্রামের আর পাঁচজনও ধারণা করে নিল যে মিথিকে শ্বশুড়বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাও আবার সন্তানসম্ভাবা অবস্থায়। কানাঘেষায় কিছু মানুষ তার ভাবীকে এও বলতে শুনেছে যে মিথির বাচ্চাটা তার নয়।অন্য কারো। এমন নিম্নমানের সমালোচনা যখন গ্রামময় আলোচনা হচ্ছিল তখনও তাকে কেউ একটু আশ্বাস দিল না। মিথিকে সরাসরি কেউ কিছু না বললেও মোটামুটি পুকুরপাড়ে বা বাড়ির উঠোনে বিভিন্ন কথায় বিভিন্ন ভাবে মানুষজন কি বলতে চাইছে তা বোধহয় মিথির বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। মিথি এবারে দমবন্ধ লাগল। ইচ্ছে হলো সব ছেড়েছুড়ে কোথাও চলে যেতে। অনেক দূরে, অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে মন চাইল ওর।  গ্রামে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন বিশ্রী অনুভূতি হবে জানলে মিথি আসত না। সত্যিই আসত না। গ্রামময় তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন আলোচনা হচ্ছে? ছিঃ!  এই তো একটু আগেও একজন পুকুরপাড়ে বলে বসল,

“ মিথি? তো কি জন্য তোকে এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বের করে দিল? কোন দোষ পেয়েছে কি তোর? না মানে, শুধু শুধুই পাঠিয়ে দিল? ”

মিথি কোথাও বলেনি ওকে পাঠিয়ে দিয়েছে ওরা। কিংবা এও বলেনি ও বিনাদোষেই বের করে দিয়েছে। তবুও এই প্রশ্নগুলো ওর কাছে অসহ্য লাগছে। নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা জম্মাচ্ছে ওর। ঠিক এভ আলচোনা সমালোচনার মধ্যে যখন মিথির দমবন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হলো তখন একদিন হিয়া এল। শুনেছে মিথি শ্বশুড়বাড়ি থেকে ফিরেছে। সে শুনেই বান্ধবীকে দেখতে এসেছিল ও। একই গ্রামে থাকায় এসব কানাঘেষা ওর কানেও গিয়েছিল। মিথিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল না হিয়া। অনেকটা সময় একসাথে বসে গল্পগুজব করার পরই হিয়া জিজ্ঞেস করল,

“ রাতে ঘুমাস না নাকি দোস্ত? চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে তোর। ”

মিথি হেসে উত্তর করল,

“ জীবনের মানে বুঝতে বুঝতে রাতের ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছে হিয়া। তোর কথা বল? সব ভালো চলছে নিশ্চয়? কোন কোন ভার্সিটিতে এডমিশন দিবি? ”

একটা সময় মিথি এবং হিয়া দুইজনই একসাথে পড়েছেে।একসাথে ক্লাস করত, পড়ালেখা করেছে, কলেজ গিয়েছে। অথচ আজ দুইজনার পথচলা ভিন্ন। একটা সময় দুইজনই পড়ালেখায় মনোযোগী ছিল, ভালো ছাত্রী ছিল, স্বপ্নও ছিল দুইজনের এক। অথচ বাস্তবতার কাছে অনেককে বোধহয় হার মানতে হয়। স্বপ্নদের দুমড়ে মুঁছড়ে ফেলে দিতে হয়। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। নিজের স্বপ্নের এমন করুণ পরিণতি দেখে ওর নিজেরই দুঃখ হয়। মায়া হয় ওসব স্বপ্নের প্রতি। তখন ও কতোটা আহ্লাদী ছিল। কতোটা আদুরে হুহ? আব্বার আদরের মেয়ে ছিল। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই হিয়া হুট করে জিজ্ঞেস করল,

“ কথা ঘুরাবি না মিথি। ”

“ কোথায় কথা ঘুরাচ্ছি? এমনিই ঘুম হচ্ছে না হয়তো। তার উপর প্রেগনেন্সি প্রবলেম তাই হয়তো। ”

“ তোর শ্বশুড়বাড়ি ভালো মিথি? মিথ্যে বলবি না। ”

“ হু? ”

“ তোর শ্বশুড়বাড়ির লোক ভালো? বর ভালো? ”

মিথি উত্তর করতে চাইল না। হিয়া ওর অনেক আপন। অনেক কাছের বন্ধু। বলতে গেলে ছোটকাল থেকে ও এই একজনকেই অনেক আপন ভেবে এসেছে। অনেক কাছের ভেবেছে। বরাবরই ওর নিজস্ব ভালো লাগা, খারাপ লাগা সবই ও হিয়ার কাছে প্রকাশ করত। অথচ আজ পারছে না। দুঃখরা গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। মিথি কথা কাঁটাতে চাইল। বলল,

“ তোর ওখানকার সময় কেমন যাচ্ছে? মেসে মানাতে পারছিস? ”

হিয়া রাগল বোধহয়। সরাসরিই বলল,

“ আমি তোর বন্ধু হই তাই না মিথি? তো এত চাপাচাপি কেন থাকবে আমাদের মধ্যে? আগে তো ছিল না। আগে তো তুই গলগল করে সব বলতি।তাকা এইদিকে। আমি তোর আপন তাই না মিথি ? অনেক আপন তো। তাহলে আমায় কেন বলবি না তুই কিছু? ” 

“ বলার মতো কি আছে যে তোকে বলব?”

“ তুই কিছু নিয়ে চাপে আছিস। বল কি নিয়ে? ”

” ঐ একটু মুড অফ। ঠিক হয়ে যাবে। ”

হিয়া এবার রেগেই বলল,

“ মিথ্যে বলবি না। যদি নাই বলিস আমি আর কখনো তোর কাছে আসব না মিথি। ”

মিথি তাকাল। হুট করেই হিয়ার দিকে চেয়ে ওর চোখ টলমল করে উঠল যেন। একটা আহ্লাদী জায়গা পেয়ে ও কাঁদতে চাইল যেন। অথচ কান্না আটকাল ঠোঁট কাঁমড়ে। শুধাল,

“ আমি কিছু একটা করতে চাই হিয়া। সবকিছু থেকে, সবার থেকে অনেক দূরে যেতে চাই। এসব, এসব টক্সিকতা আর নিতেই পারছি না আমি। আমি মরে যাচ্ছি বোধহয় হিয়া। ”

হিয়া নিজের বান্ধবীর দিকে চাইল। মিথির মুখে তাকিয়ে ওর নিজেরও মন খারাপ হলো। এগিয়ে বলল,

“ আমায় বল, কি হয়েছে? শ্বশুড়বাড়িতে ঝামেলা? ওরা তোকে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে তাই তো? ”

মিথি বুঝে গেল হিয়া জানে। গ্রামময় আলোচনা থেকে বোধহয় জানে। মুহুর্তেই মিথির সত্যিই কান্না এল। ছিঃ!  মানুষ ওকে কতোটা নিচু ভাবছে। কতোটা! ওকে চরিত্রহীন ভাবছে৷ছিঃ। মিথির ঘৃণা হয় আদ্রর প্রতি। আদ্রর মুখটা চোখে ভেসে উঠতেই ওর রাগে, ঘৃণায় আদ্রকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় যে, কেন করল এমনটা? কেন ওর চরিত্রে দোষ ফেলল আদ্র? মিথি হিয়ার দিকে চেয়ে বলল,

“ তোর বিশ্বাস হয় যে আমি চরিত্রহীন হিয়া? বিশ্বাস হয়? আমি, আমি তো বিয়ের আগের দিন রাতেই মনে প্রাণে তার হওয়ার শপথ নিয়েছিলাম। মুহিব ভাই এর প্রতি তখন অনুভূতি থাকলেও আজ আমার মুহিব ভাইয়ের প্রতি কোন অনুভূতিই নেই। মুহিব ভাই এর নাম শুনলেও আগে যে আমি লজ্জা পেতাম আজ আর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আমি, আমি আমার ভাগ্য মেনে নিয়েছিলাম ভাই ভাবীর কথাতে। একটা সাঁজানো গোছানো সংসার করার শপথ নিয়েছিলাম আমি মনে প্রাণে।তেমনটা ভেবেই তো আমি বিয়েটা করলাম। যদি তেমনটা না ভাবতাম আমি তোর বুদ্ধি ধরে হলেও পালিয়ে যেতাম হিয়া। পালিয়েছিলাম? তখন কষ্ট হলেও আমি বিয়েটা করেছিলাম, বিয়েটাকে মেনে নিয়েছিলাম। একটা সংসার সাঁজানোর আপ্রান চেষ্টা করছিলাম।অথচ হলো কি? বিয়ের রাতেই আমি তার হিংস্র রূপ দেখলাম। আমার সমস্ত শরীরে তার হিংস্র ছোঁয়া পেলাম। আমি তার মধ্যে অনুভূতি দেখতাম না, অথচ লালসা দেখলাম। কামনা দেখলাম। তবুও আমি তার সাথে সংসার করার চেষ্টা করলাম। বহু চেষ্টা করলাম। বারবার মুহু নামটা শুনলেও আমি কখনো ভাবিনি মুহুটা তার প্রেমিকা হতে পারে হিয়া। আমি কতোটা বোকা! দুই দুইটা মাস আমি নিজের মতো করে চেষ্টা করে গেলাম মানিয়ে নিতে। নিজের মতো করে সংসার সংসার খেলা খেললাম। অতঃপর আমি জানতে পারলাম,আমি মা হবো। তুই জানিস হিয়া? আমার কাছে ঐ অনুভূতিটা কতোটা পবিত্র ছিল। কতোটা সুন্দর ছিল? আমি কি ভেবেছি জানিস হিয়া? যে এই অনুভূতিতে আদ্রও খুশি হবে। আমার সংসারে এই নিয়ে হলেও অনুভূতি স্থাপন হবে।আদ্রর মনেও সুন্দর অনুভূতি জাগবে। অথচ আদ্র তো পাষান। উনি নিকৃষ্ট, জঘন্য! উনি কি করল জানিস হিয়া? ”

হিয়া নিশ্চুপে শুনছিল। উত্তর করল,

“ কি করল? ” 

“ আমায় এবরশ করাতে বলল। আমার বাচ্চাটা তার চাই না। কেন জানিস? মুহু তার প্রেমিকা। আমি প্রেগন্যান্ট এমনটা শুনলে তো মুহু জেনে যাবেই যে আমার সাথে সে ফিজিক্যালি ইনভলবড ছিল। তাই, শুধুমাত্র এই কারণে সে আমার বাচ্চাটা চাইল না। মেরে ফেলতে চাইল কতোটা হিংস্রভাবে। আমি ওই রাতটা ভুলব না। কখনো ভুলব না হিয়া। ”

“ তারপর? ”

মিথি হাসল এবার। বলল,

“ তারপর আর কি? নিজের দোষ ঢাকতে আমার উপর দোষ ফেলল। কখনো যদি তার প্রেমিকা জেনে যায়? এই ভয়েই বোধহয় জানাল যে সন্তানটা তার নয়। অন্য কারো। কাপুরুষ!  একটা কাপুরুষের সাথে ভাইয়া আমার বিয়ে দিয়েছিল হিয়া। ”

হিয়া চুপ থেকে শুনল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেকটা সময় পর বলল,

” তোর ভাই ভাবীও তো খুব একটা ভালো না মিথি। আমি শিওর তোকে সাপোর্ট করবে না। পড়ে থাকবি এখানে? ”

“ যাওয়ার মতো জায়গা ও নেই আর। ” 

“ শহরে চল। আমার সাথে মেসে থাকিস। কোন একটা কাজ নিশ্চয় পেয়ে যাবি আস্তে আস্তে।পাশাপাশি টিউশনিই পাওয়া গেলে যেতে পারে। কাজ না পাওয়া অব্দি তোর খরচটা আমি ম্যানেজ করে নিব। যাবি? ”

মিথি কিছুটা সময় চুপ থাকল।  অতঃপর বলল,

“ আমার কাছে জমানো কিছু টাকা আছে এক মাস চলার মতো। এইছাড়া কিছু সোনা ও আছে। বিক্র করতে পারি তাই না হিয়া? ওগুলা দিয়ে ম্যানেজ করা যাবে প্রথম দিকটা। ”

হিয়া শুনল। বলল,

“ বিক্রি করার প্রয়োজন নেই আপাতত ওসব। পরে বড় প্রয়োজনে লাগতে পারে তো। এখনকার দিকটা আমি আর তুই মিলে মিটিয়ে নিতে পারব। আমি ওখানে কথা বলে নিব হু? পরশু বিকালে যাব কেমন? ”

মিথি শুনল। ওর সত্যিই কোথাও স্বস্তি লাগছে এখান থেকে বের হতে পারবে ভেবে। সত্যিই শান্তি লাগছে। বলল,

“ হিয়া? ”

“ কি? খুশি না তুই? ”

মিথি বলল,

“ আমি সত্যিই সব ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ হিয়া। ”

হিয়া মিষ্টি করে হাসল। বলল,

” পাগল। ঐ জানো"য়ারকে দেখিয়ে দিতে হবে না আমার বান্ধবী কি জিনিস? আমার সাথে একবার দেখা হলে ঐ ব্যাটার কপালে নির্ঘাত দুঃখ আছে। শা'লা ক্যারেক্টারল্যাস একটা। এতই যখন প্রেমিকার প্রতি প্রেম তখন বউকে কেন কাছে টানলি শা'লা?এটাই জিজ্ঞেস করতাম সবার প্রথমে। ”

.

হিয়ার সাথে কথা বলার পরই মিথিকে নিশ্চিন্ত দেখা গেল। সেদিনটা ও উৎফুল্ল হয়েই কাজকর্ম করল। অতঃপর রাতে দেখা গেল আদ্রর মা এল। তার ফুফি৷ মিথি কিছুটা অপ্রস্তুতই হলো এতে। সে ভাবেনি ফুফি আসবে৷ তাও তাকে নিতে। আদ্র মা মূলত মিথিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই আসল। অথচ মিথি যেতে রাজি হলো না। অবশেষে উপায় না পেয়ে এমনও প্রস্তাব রাখা হলো যে ওর জন্য আলাদা বাসা ঠিক করবে। আদ্র যাবে না। ও নাহয় আলাদা বাসাতেই থাকবে।তবুও মিথি রাজি হলো না। আদ্রর মা নিজের ছেলের অন্যায়ের জন্য জোর দিয়েও কিছু বলতে লজ্জা হলো। নয়তো মিথিকে জোর করেই নিয়ে যেতেন উনি। পরদিন সকালে উনাকে ফিরতে হলো খালি খালিই। মিথিকে নিতে পারলেন না। তবে মিথির জন্য কিছু টাকা দিয়ে গেলেন মিথির ভাবীর কাছেই। অতঃপর সেদিন বাসায় ফিরেই সর্বপ্রথম দেখা হলো আদ্রর সাথে। আদ্রর সাথে তার মা কথা বলছে আজ অনেকদিনই। মিথি যাওয়ার পরই। আদ্রও কি বুঝতে পেরেছে মায়ের রাগের জায়গাটা? হয়তো বুঝেনি। আদ্র এগিয়ে এল। আজ তার মায়ের জম্মদিন।  তাই তো সুন্দর করে শুধাল,

” আম্মু, হ্যাপি বার্থডে। ”

আদ্রর মা উত্তর করল না। এড়িয়ে যেতে নিলেই আদ্র শুধাল,

“ তুমি আমার সাথে কথা বলছো না আম্মু। কেন বলছো না? কথা বলো আম্মু। ”

আদ্রর মা তাকাল। উত্তর করণ,

“ তোমাকে ছেলে ভাবতে লজ্জা হচ্ছে তাই। ”

“ কি করেছি আমি? ”

“ কি করোনি? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগে আছো। বলেছিলাম সবটা ঠিক করে নাও। সম্পর্কটা ঠিক করো আদ্র। তুমি করলে না। ”

আদ্র চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পর বলে,

“ আমি তো মুহুকে ভালোবাসি তুমি জানো আম্মু। ”

“ আমিও মিথিকে ভালোবাসি। তুমি জানো মিথি কতোটা নিষ্পাপ, সহজ সরল? ভাইয়া মারা যাওয়ার পর ওকে পুত্রবধূ করেছিলাম কেবল ওর কষ্ট দূর করার জন্য। অথচ এখন মনে হচ্ছে ওর কষ্ট আরো বাড়ালাম আমি। তোমার মতো বেয়াদবের সাথে বিয়ে দিয়ে ওর জীবনটাই শেষ করলাম। কি করে পারলে ওকে এতোটা কষ্ট দিতে? ”

আদ্র তার মাকে ভয় পায়  এটা ঠিক। তবে আজ বোধহয় ভয় হলো না। বলল,

“ কি কষ্ট দিয়েছি ওকে? ওর উচিত ছিল না বিয়ের আগে জেনে নেওয়া যে ওর স্বামী অন্য কাউকে ভালোবাসে?ও কি করে মুহুর জায়গা নিবে বলো? ”

“ বারবার মুহুর নাম করবে না। ঐ মেয়েটাকে আমি সহ্য করতে পারি না আদ্র। তুমি জানো। ” 

এটুকু বলেই আবারও বলল,

“ তুমি জানো? মিথি তোমায় কতোটা ঘৃণা করে আদ্র? তোমার সাথে সাথে ওর চোখে আমি আমার জন্যও ঘৃণা দেখেছি। অথচ ওর আম্মু হতে চেয়েছিলাম আমি। আর সে আমিই ওর চোখে এতোটা ঘৃণার হয়ে উঠলাম যে এতবার বলার পরও ও আমার সাথে আসল না। বোধহয় ওভরসা করতে পারছে না আমার উপর। ”

“ ওর এত সাহস হলো যে ও তুমি বলার পরে না করেছে?আমার আম্মুকে না করেছে? ” 

আদ্রর কথা শুনে ওর মা উত্তর করল,

“ কেন আসবে ও? তোমার মতো নিকৃষ্ট মানুষ যেখানে আছে ওখানে নিশ্চয় কোন মেয়ে ফিরবে না আদ্র। ”

“আমি তোমার কাছে নিকৃষ্ট মানুষ আম্মু?”

“ আদ্র, নিজের সন্তানের গুরুত্বই দিতে পারোনি তুমি। নিজের প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতিকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছো। আর তুমি বলছো তুমি নিকৃষ্ট মানুষ নও? ”

মায়ের কথা শুনে আদ্রর এই প্রথম বোধহয় নিজের প্রতি খারাপ লাগল। ওর মায়ের চোখে ওর জন্য রাগ নয়, বরং ঘৃণা দেখাচ্ছে। আদ্র কি বেশি অন্যায় করেছে? ছোটবেলায় যেমন অন্যায় করলে আম্মু রাগ করত? আজ তো রাগ করছে না, ঘৃণা করছে। আদ্র আম্মুকে ভালোবাসে। সত্যিই ভালোবাসে। কিন্তু মুহুকেও ভালোবাসে ও। কি করবে ও. আম্মুর ঘৃণা কাঁটাতে ও অনেকটা সময় পর আবারও আগের মিথ্যেটা বলতে লাগল,

“ উহ, সত্যি বলছি আম্মু। ওটা আমার বাচ্চা...”

অতঃপর কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই আদ্রর গালে স্বশব্দে একটা চড় পড়ল। নিজের মায়ের চড় খেয়ে হাতটা যখন অটোমেটিক গালে গিয়ে পৌঁছাল তখন তার মা বলল,

“ মিথ্যে বলবে না আর। আমি জানি কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে আদ্র। বারবার মিথ্যে বলবে না। তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে দেখতেও। ”

“ আম্মু... ”

“ তোমাকে আমার ছেলে ভাবতেই আজকাল লজ্জা লাগছে আদ্র। একে তো মিথ্যে বলছো, মিথির চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছো। ওসব আমাদের পর্যন্তই থাকলে হতো না? ওসব তুমি ওর ভাবীকেও বলেছো? কোন সাহসে বলেছো? ”

আদ্র নাক লাল হয়ে এসেছে। রাগ হচ্ছে। অদৃশ্য রাগ জমছে মিথির উপরও। বলল,

“ জিজ্ঞেস করল কেন ওর ভাবী?  আমি তো নাহলে বলতাম না। ”

“ তোমাকে যদি ছোটবেলায় মেরেধরে মানুষ করতাম আদ্র, তাহলে এমনটা হতেই না। এমন অমানুষ হতে না অন্তত। মিথি তোমার থেকে মুক্তি চায়, ডিভোর্স চায় এটক তোমার কাছে লজ্জার লাগছে না আদ্র? ”

আদ্র উত্তর করল না। ওর মা আবারও বলল,

“ মুহুর সাথে মেলামেশা বন্ধ না করলে আমি সত্যিই তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিব আদ্র। এমনকি, তোমার একটা খরচও দেওয়া হবে না দেখো। মুহুকে আমি জীবনেও মানব না। কোনভাবেই মানব না। আর না তো মিথির সাথে তোমার ডিভোর্স হতে দিব। আমার নাতি নাতনিকে আমি মা বাবা হীন দেখতে পারব না। বলে রাখলাম তোমায়। ”

আদ্র এবারও নিরুত্তর । ওর মা আবারও বলল,

“ সত্যিই তোমার কোন দায়িত্ববোধ নেই আদ্র? তোমারই তো সন্তান। একবারও নিজের নিজের অনুভব হচ্ছে না? একবারও তোমার খুশি লাগছে না? অথচ তুমি যখন আমার গর্ভে তখন তোমার বাবা কতোটা খুশি হয়েছিল। পুরোটা বাড়ি মাথায় করে রেখেছিল। এখন আমার কি মনে হচ্ছে জানো? সেদিন তোমার উপস্থিতির কথা শুনে তোমার বাবারও খুশি হওয়া উচিক হয়নি। সত্যিই উচিত হয়নি। তোমার জম্মের পর আমারও ঐ সন্তান সন্তান অনুভূতি নিয়ে কেঁদে ফেলা উচিত হয়নি। সেদিনের এতোটা খুশি আজ আমার কাছে অর্থহীন লাগছে আদ্র। তুমি? তুমি কি করে এমন অমানুষ হলে?তোমার, তোমার নিজেরই স্ত্রী সন্তানসম্ভাবা। অথচ তুমি? তুমি কিনা অন্য নারীর সাথে সময় কাঁটাচ্ছো।  ”

.

আদ্র রুমে ফিরে এল মায়ের কথাবার্তা শুনে। অতঃপর  দেখল মুহু কল দিয়েছে। আদ্রর ইচ্ছে হলো না মুহুর কল তুলতে। রাগে হিসহিসিয়ে শুধু বলল,

” মিথি, তুই আমায় বারবার খারাপ করছিস। কি হতো, এবরশন করালে? সবটা ঠিক থাকত। তোর জন্য আমি এতোটা খারাপ হয়েছি। তোর জন্য মিথি। আমি নয়তো বলতামই না এতকিছু। ”

মুহু আবারও কল দিয়েছে। আদ্রর রাগ লাগছে শুধু। মুহুকে বারবার কল করতে দেখে কল তুলল ও। কানে তুলে বলল,

“ কিছু বলবে মুহু?” 

ওপাশ থেকে মুহু বলে উঠল,

“ কল ধরতে দেরি হলো কেন তোমার? ”

“ এমনিই।”

ওপাশ থেকে মুহু শুধাল,

“ এতক্ষন মিটিংয়ে ছিলাম আদ্র। একটা কোম্পানির সাথে ডিল ছিল।বাট কোম্পানির ওউনার যে সে ছেলেটার মধ্যে অদ্ভুত কিছু একটা ছিল আদ্র। ”

মুহু সবসময়ই সব গল্প আদ্রকে বলে।অথচ আদ্রর আজ শুনতে মন চাইল না। মেজাজ খিটখিটে লাগছে।বলল, 

“ তো?” 

মুহু আবারও বলল,

“ তুমি প্রথমবার যেভাবে আমাকে এটিটিউড দেখিয়েছো এই ছেলেটাও আমার সামনে ওভাবে এটিটিউড দেখাল আজ।  পাত্তা দিল না। আমাকে, মুহুকে পাত্তা দিল না আদ্র। আমার ইগোতে লেগেছে। ”

আদ্রর বোধহয় এই প্রথম মুহুকে বিরক্ত লাগে। চিড়বিড়ে স্বরে বলল,

“ এসব শুনে আমি কি করব?” 

“এটিটিউড কেন দেখাল সে?” 

আদ্র উত্তর করে না এবারে। ফোনটা রেখে দিয়ে ছুড়ে ফেলল। অতঃপর বিছানায় চুখ বুঝে গা এলিয়ে বলল,

“ আম্মু, আম্মু বলেছে আমি নিকৃষ্ট মানুষ।আমি অমানুষ। আমার জম্মের সময় তার খুশি হওয়া উচিত ছিল না। আম্মু, আম্মু বলল আমায়।মিথি, মিথি!  তুই দুইদিনে এসে আমার আম্মুর এত প্রিয় হয়েছিস? আমার আম্মু আমায় অমানুষ বলেছে! তোর জন্য। ”

এসব বিড়বিড় করেই ও আবার ফোন তুলে মিথির ভাবীর নাম্বারে কল দিল। শান্ত গম্ভীর কন্ঠে মিথিকে দিতে বলল। অথচ মিথির ভাবী যখন ফোন নিয়ে মিথির কাছে গেল তখন মিথির একটাই কথা শোনা গেল,

“ উনার প্রতি আমার কেবল ঘৃণায় হয় ভাবী। কথা বলার ইচ্ছা আসে না। ”

আদ্র আবারও রাগে ফোন ছুড়ে মারল। মিথি? ঐটুকু মেয়ে? ঐটুকু ভীতু মেয়েটার কি  কথা ফুটেছে আজকাল। ওর সাথে কথা বলার ইচ্ছা আসে না ওর? আদ্রর সাথে? যেখানে আদ্রর সাথে সব মেয়েরা কথা বলতে উৎসুক হয়ে থাকে, সেখানে কিনা এই মিথি ওর মুখের উপর এভাবে প্রত্যাখান করেছে? 

চলবে... 
 

Loading spinner

Reply
Posts: 9
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 5 months ago

পর্ব:১৪

মিথি  আদ্রর স্ত্রী অথচ আদ্র এই মিথিকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল না। তবুও যখন মায়ের চাপে ও মিথিকে বিয়ে করলই সর্বপ্রথম নিজের মধ্যে ঐ মিথির জন্যই রাগ অনুভব করল আদ্র৷ নিজের ভেতরের সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ল সে মিথির উপরেই৷ আজও আদ্রর তেমনই রাগ অনুভব হচ্ছে মিথির উপর। একে তো মায়ের কাছে কথা শুনেছে, দ্বিতীয়ত চড় খেয়েছে। এমনকি তৃতীয়ত মিথি, গ্রামের সেই সহজ সরল তার মুখের উপরে কল রেখে দিয়েছে। আদ্রর শরীর জ্বলে। সেদিন রাতের মিথির চড়টার কথা ভেবেও রাগে শরীর উষ্ণ ঠেকে ওর। অসহ্য লাগছে ওর। বিতৃষ্ণায় আদ্র  দুয়েকটা দিন ওভাবেই কাঁটাল।  এর পরদিনই আদ্র নিজের রাগ, জেদ, ক্ষোভ সব দমিয়ে রাখতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিল মিথির সাথে দেখা করবে। মিথির এই ব্যবহার যে ও মানতে পারেনি এর প্রতিশোধ নেওয়া দরকার। নয়তো ওর শান্তি মিলছে না। সবচেয়ে বড় কথা নাকের উপর দম্ভ নিয়ে থাকা আদ্রর ইগো হার্ট হয়েছে। মিথির মতো একটা মেয়ের সাথে ও কথা বলতে চেয়েছে, অথচ মিথি কথা বলতে চায়নি এটাই ও মানতে পারছে না। আদ্র রাগে হাঁসফাঁস করে। অতঃপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মিথিদের গ্রামেই গেল।  বহুকষ্টে মিথিদের গ্রামে পৌঁছে ওদের বাড়ি যেতেই আদ্র শুনল মিথি নেই। একদিন আগেই নাকি মিথি বাড়ি ছেড়েছে।তাও বান্ধবীর সাথে। আদ্র রাগে দাঁতে দাঁত চাপে। বিরক্ত হয়ে ওর ভাবীকে বলে,

“ কোথায় গিয়েছে? ওকে কল করে বলুন আমি নিতে এসেছি। নিয়ে যাব ওকে। ”

মিথির ভাবী জবাবে উত্তর করল,

” ওর বান্ধবীর ফোন নাম্বার তো নেই আমাদের কাছে। ওর সাথেও যোগাযোগ করার খুব একটা মাধ্যম নেই। ”

আদ্র বিরক্ত হলো দ্বিগুণ। বলল,

” আপনি না ওর ভাবী? ওর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম জানেন না? ”

“ না। ”

“ আপনি কি ওর দূর সম্পর্কের ভাবী? নাকি মিথি নিষেধ করেছে? দাম দেখাচ্ছে ওই জা'নো'য়ার? ”

আদ্র যে এখানেই এভাবে রেগে কথা শুধাবে ওর ভাবী ভাবে নি। বলল,

” সত্যিই জানি। এত প্রয়োজন হলে এতদিন আসোনাই কেন? ”

আদ্রর উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না। আদ্র ভেবেছিল ও নিতে এসেছে শুনে মিথি নেচে নেচে ওর সাথে কথা বলতে আসবে। ওর সাথে বাসায় ফিরবে। অতঃপর বাসায় গেলেই আদ্র তার নিজের রূপ দেখাত। প্রতিশোধ নিত। ওর সাথে এমন ব্যবহারের শাস্তি দিত। অথচ কিছুই হলো না। হাঁসফাঁস করে বলে ও, 

“ ও ফিরলে আমায় জানাবেন। বলবেন, এসে নিয়ে যাব আমি। ”

মিথির ভাবী সঙ্গে সঙ্গেই বলল,

“ যাওয়ার হলে তো তোমার আম্মার সাথেই চলে যেত। যায়নি যেহেতি সেহেতু তুমি আসলেও যাবে না। ”

আদ্র এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“ কিসের এত  ভাব ওর? ”

মিথির ভাবী উত্তর দিল না এইবারে। আদ্ররও ফের কিছু বলল না। রাগে হুড়মুড় করে  বেরিয়ে গেল ও। যেতে যেতে ভাবল মিথির এত কিসের দাম হুহ? এত কিসের ভাব দেখাচ্ছে ও? দুদিন আগেও যে মিথি ওকে ভয় পেত, ওর ভয়ে বিড়াল হয়ে থাকত সে মিথি মা হওয়ার আভাস পেতেই বাঘিনী হয়ে উঠেছে? এতোটা ভাব দেখাচ্ছে ও? আদ্রর হাত থেকে বেঁচে যাবে ও? 

.

মিথি হিয়ার সাথে শহরে এসেছে আজ এক সপ্তাহ হলো। একদম ভিন্নরকমের অনুভূতি নিয়ে ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল একা একা। তার ভাই, ভাবীকে বলেই এসেছিল সে। এমন নয় যে তারা তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছে, আবার এমনও নয় যে তাকে আসতে নিষেধ করেছে। উল্টো তার উপরই সবটা ছেড়ে দিয়েছে এমন একটা ভাব করেছে কেবল। মিথি মনে মনেই হাসে। ওটা হয়তো উপরে উপরেই তার ভাই দেখিয়েছিল যে, সিদ্ধান্তটা মিথিই নিক। ওর উপরই ছেড়ে দিয়েছে। আসল সত্য তো এটা যে, সে বাড়ি ছেড়ে আসাতে তার ভাইও খুশি হয়েছে। হয়তো বোঝা ঘাড় থেকে নামল বলে সেদিন স্বস্তিতে একটা ঘুমও দিয়েছে। মেয়েদের জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের। নাহ তো শ্বশুড়বাড়ি আপন হয়, নাহ তো বাবার বাড়ি। মিথি চুপচাপ উঠে বসে।রুমটার সাথে একটা লাগোয়া বেলকনিও আছে। এই রুমটায় ওরা চারজনই থাকে আপাতত। মিথি, হিয়া এবং ফিজা আর রিধি নামের দুটো মেয়ে। ফিজা ওদের থেকে দুয়েক বছরের সিনিয়র। ভার্সিটিতে পড়ে।  অন্যদিকে রিধি হলো জুনিয়র। ইন্টারে পড়ে। এরা সবাই মিশুক। এই কয়েকদিনেই মিথির সাথে খুব ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।একদম আপন মানুষের মতোই। ফিজা টিউশনিতে, রিধি আর হিয়া কোচিং এ গিয়েছে। হিয়ার চাপাচাপিতে আজকে দুইদিন হলো মিথিও বই নিয়ে বসেছে একটু আধটু। অথচ ওর পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ মরে এসেছে। জীবনের মারপ্যাচে ও বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই তো ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। মিথি বেলকনিতে বসে এসব ভাবতে ভাবতেই হিয়া আর রিধি ফিরল। দরজা খুলতেই সর্বপ্রথম দুইজনের হাতে দেখা গেল আঁচার। হিয়াই প্রথমেই এগিয়ে দিল। হেসে শুধাল,

“ দোস্ত, এই সময় নাকি আঁচার টাচার খেতে মন চায়? আমি জানি না তোর মন চাচ্ছে কিনা। রাস্তায় দেখলাম একটা মামা বিক্রি করছে তাই আনলাম। ”

রিধিও এগিয়ে ধরল। মেয়েটা চঞ্চল। অল্পসময়েই মিথির সাথে খুব ভালো করেই মিশে গিয়েছে। হেসে বলল,

” মিথি আপু, আমারটাও নিশ্চয় খাবে? আমি কিন্তু হিয়া আপুর আগে নিয়েছি তোমার জন্য। ”

মিথি কিছুটা বিব্রতবোধ করল যেন ওদের উচ্ছ্বাস দেখে। তার মোটেই আঁচার খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। বাকি সব মেয়ের মতো প্র্যাগনেন্সির শুরুর থেকে ওর এইসেই খাওয়ার ইচ্ছে আসেনি। তবে ক্লান্তি ছিল, পায়ের দিকে কেমন যেন টান পড়ে মাঝেমাঝে, এমনকি প্রায়সই বমিও হয়। কিন্তু আঁচারের আগ্রহটা অতোটাও প্রবল হয়নি। মিথি হাত এগিয়ে নিল দুইজনের আচার। হেসে বলল,

“ এসবের কি দরকার ছিল? দুইজনই পাগল। ”

হিয়া কাঁধ থেকে ব্যাগ রাখল ফ্লোরে বিছিয়ে রাখা বিছানাটায়৷ টেবিলে বসতে বসতে বলল,

“  অবশ্যই দরকার আছে। ”

এর পরপরই রিধি এসে বলল,

“ মিথি আপু, তুমি কি ভাবছো বাবুর আম্মু তুমি? মোটেই না। বাবুর প্রথম আম্মু কিন্তু আমি, দ্বিতীয় আম্মু হিয়া আপু, তারপর ফিজা আপু এবং সর্বশেষ তুমি। কাজেই আমগো বাচ্চার খেয়াল আমরা রাখব বুঝলা?তুমি পাগল,ছাগল যাই বলো।  ”

হিয়া হেসে বলল,

“ তোরে দেখতেই তো লাগে দুদিনের বাচ্চা। তোরে আবার কি আম্মু ডাকবে? ও আমার বাবু সবার প্রথমে।”

মিথি দুইজনের কথা শুনে হাসল। আজকাল এখানে থেকে ওর মন উৎফুল্ল লাগে। মাঝেমাঝেই মন খুলে হাসতে পারে। বলল,

“ তোদের দুইজনেরই বাবু বোন। ঠিক আছে? ”

দুইজনই হাসল। অতঃপর দুইজনই ফ্রেশ হয়ে নিল। হিয়া মিথির মুখচোখ পরখ করে জিজ্ঞেস করল,

“ মন খারাপ নাকি তোর? ”

মিথি না হিসেবে মাথা নাড়ল। বলল,

“ তোদের মতো মানুষকে পেয়ে আমার মন খারাপ কিভাবে হয়? থ্যাংক্স হিয়া,আবার ও থ্যাংক্স। আমি সত্যিই এই এক সপ্তাহে নিঃশ্বাস নিতে পারছি মন খুলে। ”

“ দেখে তো মনে হচ্ছে না তোকে। ”

“ একটা কাজের প্রয়োজন ছিল। ঐ কারণেই ভাবছি। ”

হিয়া আশ্বাস দিয়ে বলল,

“ কাজ পেয়ে যাবি। আমরা খোঁজ করছি তো। হয়তো কিছুটা সময় লাগবে।চিন্তা করিস না। ”

রিধি তখন বেলকনি ছেড়ে এল। কথা শুনে বলল,

“ চিললললল মিথি আপু ,চিললললল। সবকিছু নিয়ে এত ভাবলে হবে হু? আমি আমার পুরা বন্ধুমহলকেই কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। ওরা কোন একটা খোঁজ অবশ্যই দিবে আমি আশা করি। তুমি চিন্তা করো না বুঝলে? আমরা আছি না?”

এইটুকু একটা মেয়ে। অথচ কতোটা মনোবল দিতে পারে। মিথির আসলেই রিধির মনোবল দেখে ভালো লাগে । একদম আদুরে একটা বাচ্চা লাগে রিধিকে। এর মধ্যেই এল ফিজাও। এসে মিথিকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে কিছুটা সময় কথা বলল। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে এসে শুধাল,

“ বাজারে যাব মিথি। তুই যাবি? রিধিও যাবে। হিয়াকে নিব না। হয়তো রুমে বসে থেকে বোরিং লাগছে তোর। যাবি? ”

হিয়া তাকাল মিথির দিকে। বলল,

“ বের হতে মন চাইছে? আমাকে বললে আমি তোকে ঘুরিয়ে আনতাম মিথি। যাবি? ”

মিথি উত্তর করল,

“ যাই বরং। ফিজা আপুর থেকে বাজার করা শিখব। ”

হিয়া শুনল। বড়দের মতো বলল,

“ তাহলে সাবধানে যাবি। দেখেশুনে হাঁটাচলা করবি। ”

মিথির কেন জানি এই বাসাটায় এসে  এই মেয়েগুলোর থেকে এতোটা আদর, স্নেহ,ভালোবাসা পেয়ে কান্না আসে মাঝেমাঝে। এরা এত ভালো কেন? এত ভালো কেন? হিয়া আবারও ফিজার উদ্দেশ্যে বলল, 

“ সাবধানে নিয়ে যেও আপু। ও কিন্তু কিছুটা ভীতু। দরদাম করতে পারে না।”

ফিজা মজা করে বলল,

“ না, অসাবধানে নিয়ে যাব ওকে। ”

অতঃপর রিধি, মিথি আর ফিজা বের হলো। রুমে হিয়া থাকল শুধু। এখান থেকে পাঁচ মিনিটেই বাজার। তাই ওরা তিনজন হেঁটেই গেল। হাঁটতে হাঁটতে ফিজাই জিজ্ঞেস করল,

“ মিথি, আগে কখনো বাজার করেছিস? ”

মিথি উত্তর করল,

“তেমন একটা করা হয়নি আপু। তুমি নিশ্চয় খুব এক্সপার্ট? ”

ফিজা বিনিময়ে হেসে উত্তর দিল,

“ একদমই নয়। আমি হিয়ার থেকে শিখেছি কিছুটা বাজার করা। প্রথমবার বাজার করে অর্ধেক সবজি পঁচাই পড়েছিল আমার। ”

অতঃপর রিধি আর ফিজা মিলে ধরদাম করল। সবজি কিনল। সবজির ব্যাগটা মিথি নিতেই ওটা ফিজা নিয়ে নিল। বলল,

“ ব্যাগ নিতে হবে না তোকে।” 

“ কিছু হবে না। আমি নিতে পারব তো।”

“ আরেহ, আমিই নিচ্ছি। ”

অতঃপর ওরা বাজার থেকে বের হয়ে এল। আবারও বাসায় ফিরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময় ফিজা দাঁড়িয়ে গেল নিচে। মিথি আর রিধি সিঁড়ির কোণে গিয়ে দেখল ফিজা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একধারে। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে কিছুটা সময় তাকাতেই দেখা গেল দুটো পুরুষালি অবয়ব। যার মধ্যে একজনকে দেখে মিথি চমকাল কিছুটা। হিমেল ভাই। হ্যাঁ, ফিজা যে ছেলেটার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে তার পাশের জন হিমেল ভাই-ই। মিথি সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে কিছুটা আড়াল করে নিল। রিধি তখন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,

“ দুটো ছেলেই সুন্দর বলো মিথি আফা? একটা ফিজার আপুর বর, অপরটা কেমন জানি গম্ভীর! ব্যাটা পাশের বিল্ডিং এ থাকে এতদিন অথচ কেমন রোবটিক! ”

মিথি তাকাল রিধির দিকে। বলল,

“ পাশের বিল্ডিং এ থাকে? ”

রিধি ওকে নিরাশ করে দিয়ে বলল,

“ এখানে দুইডা পোলাই পাশের বিল্ডিং এ থাকে আপা। পাশাপাশি বিল্ডিং এ থাকতে থাকতেই তো ফিজা আপুরে পটিয়ে ফেলেছে আয়মান ভাইয়া। ”

মিথি মাথা নাড়াল। মৃদু হাসলও কথাটা শুনে। 

.

আদ্র সন্ধ্যার দিকে রেস্টুরেন্টে এসেছিল মুহুকে নিয়ে। অতঃপর অনেকটা সময় পর মুহুকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যখন নিজ বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা হলো ঠিক তখনই চোখে পড়ল রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা আরেক জোড়াকেও। তার আব্বু, এবং পাশে যে আছে সে তার আম্মু নয়। বরং অল্পবয়সী সুন্দরী একটা মেয়েকেই চোখে পড়ল আদ্রর। মেয়েটার চোখেমুখে আলাদা খুশি চোখে পড়ল। আদ্র ভ্রু কুঁচকাল। গাড়ি থামাল সঙ্গে সঙ্গেই। অতঃপর দেখা গেল তার চোখের সামনে দিয়েই তার আব্বু এবং সে মেয়েটি গাড়িতে উঠল। আদ্র পিছু পিছুই গাড়ি চালিয়ে নিল৷ মেয়েটাকে পৌঁছে দিয়ে যখন তার বাবাও বাড়ি  ফিরল তখন বাবা ছেলে মুখোমুখি হলো বাড়ির গেইটে।আদ্রই প্রথমেই বলল,

“ আব্বু, কোথায় থেকে  ফিরছো? ”

ওর বাবা তাকাল। উত্তর করল,

“ অফিস থেকেই তো ফিরব। তুমি এত বড় ছেলে হয়েছো। বাবার বিজন্যাসও সামলাতে পারো কিছুটা। ”

আদ্র ওসব কানে নিল না। বরং বলল,

“ তোমার গাড়িতে কেউ ছিল? ”

“ না তো, কে থাকবে?”

“ আমি স্পষ্ট দেখলাম তোমার গাড়িতে ছিল কেউ আব্বু। একটা মেয়েকে তুমি নামিয়ে দিয়ে এসেছো, দেখেছি আমি।”

ওর বাবার মুখে প্রথমে বোধহয় একটা ঘাবড়ে যাওয়া ভাব ফুটে উঠল। পরমুহুর্তেই হেসে বলল,

“ ওহ, ও আমার পি এ মিস ইশিতা ছিল। তুমি তো অফিসে যাও-ই না। গেলে চিনতে পারতে আদ্র। ও গাড়ি পেল না তাই ভাবলাম পৌঁছে দিই। এইটুকুই।  ”

আদ্র শুনল। এবার বোধহয় উত্তর পেয়ে ও সন্তুষ্ট হলো। জানাল 

“ওহ, আমি ভাবলাম কে না কে। ”

চলবে...

Loading spinner

Reply
Posts: 9
Topic starter
(@alakananda-aindri)
Joined: 5 months ago

পর্ব:১৫
 

 মিথির অনেক সকালেই ঘুম ভাঙ্গল আজ। বলা চলে রাতে তেমন একটা ভালো ঘুম হয় ও নি ওর। তাই তো ভোর হয়েছে বুঝে উঠেই বেলকনিতে গিয়ে বসল। হিয়া, রিধি, ফিজা তিনজনই তখনও ঘুমে। মিথি বেলকনিতে বসে তাকিয়েই থাকল। বাইরে কুয়াশা পড়েছে কিছুটা। তখনও ভালো করে আলো ফুটে নি। শীত শীত অনুভবটা বেলকনিতে আরো তীব্র ভাবে বোধ হচ্ছে। অতঃপর ওভাবে আরো কিছুটা সময় যাওয়ার পর রিধি এল ঘুমঘুম চোখ মুখ নিয়ে। সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠার কারণে ওর মুখচোখ ফুলোফুলো ঠেকছে। মিষ্টিই দেখাচ্ছে। মিথি হাসল রিধিকে এগিয়ে আসতে দেখে। রিধি বলল, 

“ তুমি ঘুমাও নি আপু? ”

মিথি উত্তর করল,

“ ঘুমালাম তো। ঘুম ভাঙ্গার পরই এসেছি। ”

“ চলো ঘুরে আসি। কুয়াশা কুয়াশা ভোরে ঘুম থেকে উঠেছি এটা ছবি টবি তুলে পোস্ট স্টোরি করতে হবে না বলো? ”

“ এই ভোরে? আলোও তো ফুটে নি ভালো করে। ”

“ তাতে কি? দেখছো না শহর কত ব্যস্ত। আচ্ছা থাক, তুমি না বললে যাব না আপু। ”

রিধির মুখটায় মন খারাপ মন খারাপ ভাব ফুটে উঠল যেন। মিথি তাকিয়ে হেসে বলল,

“ ওরা ঘুমোচ্ছে। উঠলে না হয় একসাথে যাব। ”

“ ওরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের খোঁজ করুক একটু। ওদের জন্য সারপ্রাইজ। চলো না আপু..”

মিথি এই ঠান্ডায় বের হতে চাচ্ছিল নুা। একেই কুয়াশা, ঠান্ডা। এর উপর ও বাড়ি থেকে জামা কাপড়ের সাথে শাল আনেনি। এভাবে বের হলে পরে ক্ষতি হলে? রিধি হয়তো ছোট মানুষ। না বুঝেই আবদার করছে। মিথি উশখুশ ভঙ্গিতে বলল,

“ আমি আসলে বাড়ি থেকে শাল আনিনি রিধি। এই ঠান্ডায় বাইরে যাওয়াটা খুব একটা ভালো হবে না। তাই না? আমরা আরেকদিন যাই?কিংবা আরেকটু পর?  ”

রিধি খুশি হলো। উত্তর করল,

“ ওকে, রোদ উঠলে তখন বের হবো আপু। পড়ি এখন তাহলে।  ”

রিধি পড়তে গেল এর পরপরই। কিছুটা সময় বই নিয়ে বসে থেকে এর পরপরই উঠে গেল চুলার সামনে। রিধি চা টাই কেবল ভালো পারে বানাতে। বাকি সবে ও কাঁচা। এ বাসায় রান্নাটা প্রায়সই হিয়াকেই করতে হতো। রিধি সাহায্য করত। আর ফিজা রান্নায় পুরোপুরিই কাঁচা বলা চলে। রিধি দুই কাপ চা নিয়েই ছুটল আবার বেলকনিতে। হিয়া আর ফিজা তখনও ঘুম ছেড়ে উঠেনি। মিথি বোধহয় আকাশ দেখছে এতো মনোযোগ দিয়ে। রিধি তাকাল। বলল,

“ মিথি আপু? কি দেখছো এত মনোযোগ দিয়ে? তুমি কেন এমন আপসেট হয়ে থাকো সবসময়? তুমি জানো তোমায় হাসলে সুন্দর লাগে? ”

“তুমি সাথে থাকলে তো হাসিই রিধি। ”

রিধি মানল না। পাশে বসতে বসতেই ঠোঁট উল্টে বলল,

“ কোথায়? কেমন যেন প্রাণহীন হাসি। কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছো না বলে মুড অফ হু? তোমায় বললাম না, কাজ তোমায় অবশ্যই খুঁজে দিব আপু। তুমি সবসময় হাসিখুশি থাকবা হুহ? ”

মিথি হাসার চেষ্টা করল। হাসল এবং বলল,

“ থাকব। ”

রিধি ততক্ষনে চায়র কাপ এগিয়ে ধরেছে। মিথিও চুমুক বসাল।রিধি তাকিয়ে থেকে বলল,

“ তোমার জন্য চা করলাম। বলো কেমন হয়েছে হু?”

মিথি হেসে শুধাল,

“ খুব ভালো হয়েছে। এটুকু মেয়ে, তুমি এমন চমৎকার চা ও বানাতে পারো? ”

রিধি লজ্জা পেল যেন প্রশংসা শুনে। শুধাল,

“ শুধু চা-টাই ভালো পারি। ”

“ খুবই ভালো পারো। ”

“ তুমি কি কি রান্না পারো? ”

“ মোটামুটি সব। ”

অতঃপর রিধিও চায়ে চুমুক বসাল। কয়েক মিনিট যাওয়ার রিধি যখন চায়ে শেষ চুমুকটা দিবে ঠিক তখনই মাথায় হুট করে কোন বুদ্ধির উদয় হয়েছে এমন ভাবভঙ্গি করে ও মিথির দিকে চাইল। চায়ে শেষ চুমুকটা না দিয়েই বলে উঠল,

“ আপু? প্র্যাক্টিকাল খাতা লিখবা? এটা তে আমি তোমায় অনেক অর্ডার এনে দিতে পারব। তোমার আয়ও হবে। যদিও একটু কষ্টকর। ”

মিথি চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ শুনে শুধাল,

“ হুহ? ”

“ আমার কলেজের অনেকেই করাবে।তোমার হয়ে প্রচারটা আমি করে দিব।”

মিথি শুনল। অতঃপর বলল,

“ করা যাক। এমনিতেও তো বসেই তো আছি তাই না?  কিছু একটা করলে সময় যাবে। ”

রিধি ছটফট ভঙ্গিতে বলল,

“ ভেরি গুড। এবার আর মন খারাপ করবে না ওকে? চলো হেঁটে আসি। রোদ উঠে গেল তো।  ”

“ আচ্ছা। ”

হিয়া, ফিজা তখনও ঘুমে। ওদের ঘুমে রেখেই মিথি আর রিধি বের হয়ে এল। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই রাস্তার ধারে চোখে পড়ল হিমেলের ভাবী স্নিগ্ধা ভাবীকে। মিথিকেই দেখেই সর্বপ্রথম স্নিগ্ধা একটা হাসি উপহার দিল। এগিয়ে এসে শুধাল,
 
“ মিথি না?তুমি এখানে? ”

মিথি চাইছিল তাকে না দেখুক। প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে স্নিগ্ধা ভাবী নামক মানুষটা বরাবরই তার সাথে বিনয়ী আচরণ করে এসেছে। নিজ থেকেই কথা বলেছে প্রতিবার। কোন অহংকার নেই, দম্ভ নেই। মিথির এই ধরণের মানুষদের ভালো লাগে। হেসে উত্তর করল ও,  

“ জ্বী, আমি মিথিই ভাবী। ”

“ তো তুমি এদিকে? কোথাও বেড়াতে এলে নাকি? তোমার শ্বশুড়বাড়িটা এদিকেই নাকি? ”

মিথি উত্তর করল,

“ নাহ, তেমন নয়। হিয়ার সাথে এসেছিলাম একটু। ”

স্নিগ্ধা প্রশ্ন ছুড়ল,

“ হিয়া? ”

“ আমার বান্ধবী। ”

“ সে কোথায় থাকে? ”

মিথি বাসাটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে শুধাল,

“ এই বাসায়। ”

স্নিগ্ধাকে প্রফুল্ল দেখাল। শুধাল,

“ ওহ, আমাদের তো পাশের বাসাই!  একদিন এসো বাসাতে মিথি। ”

মিথি ছোট করে উত্তর করল,

“ আসব। ”

.

ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল হিমেল আর আয়মান। হিমেল ছেলেটাকে গম্ভীর স্বভাবের দেখালেও বাস্তবে সে কাছের মানুষদের কাছে খুবই চঞ্চল ধরণের। যেমন কাছের বন্ধ, পরিবারের মানুষ। এর বাইরে বাকিদের কাছে ও বরাবরই নাক উঁচু স্বভাবের গম্ভীর মানুষ। তবে যাদের সাথে ও মিশে তাদের সাথে ও পুরোপুরিই মিশে। হিমেল ছাদের একোকোণ থেকেই তাকিয়ে ছিল নিচের দিকে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে এল হঠাৎ। ওর তাকানোর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আয়মানও অনুসরন করে তাকাল। পেছন দিক থেকে দুটো মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। অপরপাশে হিমেলের ভাবীকে। যে দুটো মেয়েকে দেখা যাচ্ছে এদের মধ্যে একজন রিধিই হবে।  চেহারা না দেখেও আয়মান ধারণা করল। অপরজন হয়তো ফিজার থেকে শোনা সে নতুন মেয়েটি হবে। আয়মান সঙ্গে সঙ্গেই হিমেলের কাঁধে চাপড় মেরে বলল,

“ কি ব্যাপার? এমন হাবলুর মতো তাকিয়ে আছিস কেন মেয়েটেয়ের দিকে? তাও আবার আমার শালিকাদের দিকে। ”

হিমেল যেন অনেকটা মনোযোগ দিয়েই দেখছিল। কিছু বুঝার চেষ্টা চালাচ্ছিল যেন। ভ্রু জোড়া ওভাবেই কুঁচকানো ছিল। কিন্তু আয়মানের কথা শুনে কুঁচকানো ভ্রু শিথীল হলো। আয়মানের দিকে এমন ভাবে চাইল যে আয়মান ফের বলল,

“ না মানে, তুই তো এমন মেয়ে টেয়ের দিকে তাকাস না। হঠাৎ এমন ভাবে চেয়ে আছিস তাই প্রশ্ন জাগল।  ”

হিমেল আবারও তাকাল। অতঃপর শার্টের হাতা গুঁটাতে গুঁটাতে বলল,

“ আমার মনে হলো আমি তাকে চিনি। কিন্তু এই মেয়েটা সে হবার পসিবিলিটি নেই।  সে নয় এটা নিশ্চয়। ”

আয়মান ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ কে? ”

“ কেউ না। ”

“ কেউ না হলে তুই ওভাবে তাকিয়ে ছিলি কেন দোস্ত? ”

হিমেল এবার আয়মানের দিকে চাইল। শান্ত ভঙ্গিতে আয়মানের কলারটা চেপে ধরে ছাদের কর্নারে ওকে ঠেকিয়ে বলল,

“ তোকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার প্ল্যান করছিলাম মনে মনে। ফেলে দেই? ”

“ বিয়ে করিনি এখনো ভাই। আমার না হওয়া বউ কান্না করবে।বিয়েটা করতে দে ভাই। ”

হিমেলের হাসি এল আয়মানের কথা শুনে। বলল,

“ ছাদ থেকে না ফেললে কি এখনই কি গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলবি ফিজার সাথে? ”

আয়মান পাল্টা উত্তরে বলল,

“ তুই কেন বিয়ে সেরে ফেলছিস না সাবিহার সাথে? পুরো পরিবার রাজি তবুও এত বাহানা কিসের এটাই বুঝি না বাপু। ”

হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। আয়মানের কথা অনুযায়ী হঠাৎ মুখ গম্ভীর হয়ে এল। বলল,

“ কে সাবিহা? ”

“ ভাবীর ছোটবোন। ”

হিমেলের মুখ তখনও গম্ভীর। বলল,

“ ওকে বিয়ে করার প্রশ্ন এল কেন? ”

“ কারণ তোর বিয়েটা ওর সাথেই হবে যে শতভাগ শিওর আমি। ”

 হিমেল বিনিময়ে উত্তর করল,

“ আমার জন্য আমার একাকীত্ব এবং কল্পনাই যথেষ্ট। কোন সাবিহার এন্ট্রি হবে না আমার লাইফে। ”

আয়মানকে নিরাশ দেখাল। বলল,

“ বাট হোয়াই? সত্যিই ভাবীর কথা মতো কেউ আছে নাকি তোর লাইফে? বা ছিল? আমার বিশ্বাস হয় না তোর মতো  একটা ছেলে কোন মেয়ের জন্য প্রেম ট্রেম পুষতে পারে বলে। ”

হিমেল রেগে তাকাল। বলল,

“ কেন? আমি কি গে? ”

“ তা নয়। কিন্তু তোর লাইফে কেউ থাকবে বা ছিল তা আমিও জানব না?এটা হয়? ”

উত্তর এল,

 “ কারণ সে আমার একান্তই ব্যাক্তিগত কল্পনা ।”

“কে ভাই এই মেয়ে? আমার খুব ইচ্ছা দেখার। আর নয়তো তুই মিথ্যে বলছিস। হতে পারে ওটা কেবলই তোর কল্পনা।  ”

“ কল্পনা বললাম কারণ সে এখন অন্যকারো। তবে কল্পনা হলেও সে আমার লাইফের খুব শক্তপোক্ত এক সত্য। ”

আয়মান বন্ধুর কথা শুনে হায়হায় করল। বলল,

“ ঠকাল তো তোকে। ছিহ!  কোন মেয়ে তোকে ঠকিয়ে চলে গেল আর তুই কিনা বলছিস ওর জন্য কোন সাবিহার এন্ট্রি হবে না। ”

হিমেল গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,

“ ঠকায়নি সে আমাকে। ”

“ তাহলে? ”

“ আমি কখনো কাউকে বুঝতেই দেইনি যে আমার তার প্রতি কিছু আছে।  এমনকি তাকেও না। ভাবী তো গোয়েন্দাদের মতো বহু পর্যবেক্ষনের পর জেনে গিয়েছিল।”

আয়মান বোধহয় এবারে বিশ্বাস করল। কারণ তার বন্ধু কিছু কিছু বিষয়ে অবশ্যই চাপা ধরণে সে হিসেবে তাকে না বলাটা স্বাভাবিক। আয়মান ছবিও দেখতে চাইল না।  কারণ ও জানে হিমেল দেখাবে না। শত বললেও দেখাবে না। বলল,

“ কষ্ট হয় না ? ”

“ কষ্ট হয় না। তবে রাগ হয় তার প্রতি। তাকে দেখলেও রাগ হয়। সে আমার হলেও হতে পারত। বহু যত্নে রাখতাম তাকে আয়মান।হলো না।  ”

“ না পেলে তখন সবাই বলে যত্নে রাখত। পেলে নির্ঘাত সাবিহার মতো ইগ্নোর করতি।  ”

হিমেল হাসল এবার। বলল,

“ আমি শুরু থেকেই তাকে ইগ্নোর করেছি শুধু পাওয়ার পর যত্ন করব বলে। আমার লাভ ল্যাংগুয়েজ বোধহয় এড়িয়ে চলাটাই ছিল। ভেবেছিলাম তাকে পেলে সব পুষিয়ে নিব।  কিন্তু পাওয়া হয়নি। আর, সাবিহাকে আমি ইগ্নোর করি না কখনো। ওর সাথে বরাবরই আমার যোগাযোগ ভালো। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখিস। ”

.

মিথিরা বাইরে থেকে আসার পরই হিয়াকে সর্বপ্রথম মিথি এটা বলল যে, 

“ হিয়া, পাশের বিল্ডিং এ হিমেল ভাইরা থাকে। স্নিগ্ধা ভাবীর সাথে আজ দেখা হয়ে গেল। ”

হিয়া ঘুম ছেড়ে উঠেছে। চোখ কচলে বলল,

“কোন হিমেল ভাই? কোন স্নিগ্ধা ভাবী?”

“আমাদের পাশের বাড়ির হিমেল ভাইরা। ফিজা আপুর উনার বন্ধু হিমেল। চিনতে পেরেছিস? ”

হ্যাঁ হ্যাঁ। হিয়া দেখেছে ফিজা আপুর প্রেমিক পুরুষের বন্ধুটিকে। গম্ভীর গম্ভীর। বলল,

“ চিনতে পেরেছি। কিন্তু তোদের বাড়ির পাশের হিমেল ভাই এটা চিনি না আমি। আশ্চর্য, একই গ্রামেরই তাহলে?অথচ আমি চিনি না। ” 

“ হু। দেখা হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল এখানে কোথায় এসেছি। বলেছি তোর সাথে এসেছি হিয়া। ”

“ তো কি হয়েছে? তুই মানুষ নোস নাকি? লুকিয়ে বেঁচে আছিস নাকি তুই পাগল? ”

মিথির হুট করে শুধাল,

“কখনো আবার প্রশ্নের সম্মুখীন হলে গ্রামের মতো? ”

হিয়া আর মিথি কথা বলতে বলতেই হুট করে হিয়ার ফোনে কল এল। আননোন নাম্বার। হিয়া ভ্রু কুঁচকে রেখে কল তুলল। কানে নিতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল,

“ মিথি, ”

হিয়া ভ্রু আরো কুঁচকে নিল। শুধাল,

“ মিথি নয়, হিয়া বলছি। আপনি কে? মিথির ভাইভাবী কেউ হোন নাকি?” 

ওপাশ থেকে উত্তর এল না। বরং ত্যাড়া স্বরে জানাল,

“ মিথিকে ফোন দিন। কথা আছে আমার।”  

গলাটা খুবই রূঢ শোনাল। যেন ওপাশের ব্যাক্তিটি আদেশ করছে। হিয়্ শুধাল,

“কিসের কথা? কে আপনি? ”

“মিথিকে দিচ্ছেন না কেন ফোন? কথা কানে যাচ্ছে না আপনার? ঐ জা'নোয়ারকে ফোন দিন। ওর অনেক দাম বেড়েছে তাইনা? এত দাম ও কোথায় রাখে আমিও দেখব।  দিন ও পাশে থাকলে। ”

পাশ থেকে মিথি সমস্তটা শুনে বোধহয় একমুহুর্তেই ধারণা করে নিল যে এটা আদ্র। আদ্র ছাড়া কেউ এভাবে কল করে কাউকে হুমকিধামকি দিয়ে অভদ্রের মতো কথা বলতে পারে না। এটা আদ্রই। অন্যদিকে হিয়া বুঝল না এই লোক কে। ওকে বড্ড বিরক্ত দেখাল সকাল সকাল এই ঝামেলাতে। বলল,

” ও পাশে নেই। রাখুন ব্যাটা। আননোন নাম্বার থেকে কল দিয়েছেন,  কথা বলছি এই তো অনেক। আবার রুডলি কথা বলছেন। ”

এইটুকু বলেই ও কল রাখল। অথঃপর সোজা এই নাম্বারটা ব্লক করল। বিরক্ত গলায় শুধাল,

“ কোন বেয়াদব এ কিজানি। ”

মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“ উনি আদ্র হিয়া। আমি শিওর উনি আদ্র। কেন কল করলেন উনি? ”

হিয়ার মুহুর্তেই রাগ হয়। বলে,

“ তোর বর জা'নোয়ারটা? ”

“ কন্ঠ এবং উগ্রতা তেমনই। ”

হিয়া আপসোস নিয়ে বলল,

“ ইশশ কল রেখে তো ভুল করে ফেললাম। ট্র্যাপে ফেলা যেত এই জা' নোয়ারকে। ”

.

মুহিব!  একাধারে রিধির কোচিং এর ভাইয়া এবং তার বাবার বন্ধুর ছেলে। অথচ এই লোকটাকে কেন জানি রিধির আজকাল সহ্য হয় না। একদম দেখলেই রাগ গা চিড়বিড় করার মতো অবস্থা যেন। এর অন্যতম কারণ অবশ্য ওকে কোচিং এ পড়ালেখা নিয়ে চাপে রাখার জন্য। রিধি তাকাল রাস্তার একপাশে। মুহিব দাঁড়িয়ে আছে। স্বগৌরবে ধূমপান করছে বুক ফুলিয়ে। রিধির এটা দেখেও অসহ্য লাগে। ওপাশ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মুহিবের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“ মুহিব ভাই, জনসম্মুখে পথে প্রান্তরে এমন ধূমপান করে কি সুখ পান? আশ্চর্য! ”

মুহিবকে বিরকাত দেখাল। বলল

“ তোমার সমস্যা রিধি? ”

“ অবশ্যই সমস্যা। আপনার ধূমপান করার হলে আমি দূরে কোথাও দরজা জানালা বন্ধ করে বদ্ধ রুমে ধূমপান করুন, কে নিষেধ করেছে? কিন্তু পথেপ্রান্তরে ধূমপান করে তো নিজের সাথে সাথে আমাদের ও ক্ষতি করছেন? একজন সচেতন বালিকা হয়ে কি করে মেনে নিই এসব? ”

মুহিব যেন মজা পেল। বলল,

“ সচেতন বালিকা? ”

“ অসচেতন নাকি? ”

“ সচেতন বালিকা হলে কোচিং এর পরীক্ষায় এমন গোল্লা পায় কিভাবে?”

রিধির রাগ এবার ফুঁসে উঠল। একটু আগেই কালকের পরীক্ষায় জিরো পাওয়ার কারণে ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, কোচিংয়ের সবার সামনে মজা ও করেছে। এর জন্য আরো রাগ লাগছে এসব মনে করে। বলল,

“ওটার সাথে সচেতনতার কি সম্পর্ক?” 

মুহিব সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল একদম রিধির কানের পাশ দিয়ে। অতঃপর হেসে বলল,

“কতখানি সচেতন তাই দেখালাম আরকি। ”

“ আমি এই চ্যাপ্টারটা পড়িনি ভালো করে। নয়তো গোল্লা পেতাম না। ”

“ এভাবে রেগে কথা বলছো কেন? খারাপ কিছু বলেছি? এপ্রেশিয়েট করছি। গোল্লা পাওয়া ভালোই তো। তুমি কন্টিনিউ করতে পারো এটা । এমন সচেতন কাজ দেখে সবাই খুশি হবে।”

রিধির রাগে অসহ্য লাগে। মুহিবকেই অসহ্য লাগছে ওর। বলল,

“ আপনি খুব অসহ্য মুহিব ভাই। আমায় কোচিং এ দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, সবার সামনে গোল্লা পেয়েছি বলে উপহাস করেছেন। এখন আবার পঁচাচ্ছেন। কি ভাবেন? আপনি খুব ভালো স্টুডেন্ট নাকি? আপনার সিজিপিএর খবরও আমি রাখি। বুঝলেন? ”

“ ভেরি গুড। তো পরীক্ষায় গোল্লা পেয়ে তুমি কি সুখ পেয়েছো? ”

রিধি এবারে উত্তরই করল না। সোজা ধুপধাপ  পা ফেলে এগিয়ে গেল। রাগ লাগছে ওর। রাগে শরীর জ্বলছে। আব্বুকে ও আজকেই বলবে যে মুহিব ভাই এর কোচিং এ ও আর পড়বে না। 

চলবে....
 

Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner