Notifications
Clear all
August 15, 2026 4:02 pm
গল্প : ভালোবাসাটা নিষিদ্ধ ছিলো
লেখিকা:ঊর্মি AnH
পর্ব:০১
ঢাকার শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, পুরোনো এক রাস্তার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বাড়ি।
বাড়িটার নাম—
চৌধুরী বাড়ি।
শুধু বাড়ি বললে হয়তো বাড়িটার বিশালত্ব বোঝানো যাবে না।
এটা যেন একটা ছোট্ট রাজ্য।
বিরাট লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দুপাশে সারি সারি পুরোনো গাছ। আম, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়া, শিউলি আর রাধাচূড়ার গাছগুলো বাড়িটাকে বছরের পর বছর ধরে ছায়া দিয়ে রেখেছে।
মাঝখান দিয়ে পাথর বসানো লম্বা রাস্তা চলে গেছে মূল ভবনের সামনে।
তিনতলা বিশাল ভবন।
সামনে প্রশস্ত বারান্দা।
পেছনে বড় পুকুর।
পুকুরের ওপাশে আমবাগান।
আর বাড়ির ডানদিকে আলাদা একটা পুরোনো দোতলা ভবন—যেটাকে সবাই অতিথিশালা বলে।
চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—
এখানে মানুষ অনেক।
হাসি-আনন্দ যেমন আছে, তেমনই আছে ঝগড়া, অভিমান, খুনসুটি আর অসংখ্য গল্প।
কারণ এই বাড়িতে একসঙ্গে থাকে চৌধুরী পরিবারের তিন ভাইয়ের পরিবার।
---
সবার বড় — মাহমুদ চৌধুরী
চৌধুরী পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় মাহমুদ চৌধুরী।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
গম্ভীর, বিচক্ষণ এবং পরিবারের ব্যাপারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন মানুষ।
বাবার মৃত্যুর পর তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই মূলত পরিবারের বড় হিসেবে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
ব্যবসার দিক থেকেও তিনি সফল।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—
তিনি পরিবারটাকে একসঙ্গে ধরে রেখেছেন।
মাহমুদের স্ত্রী নওরীন চৌধুরী।
নওরীন বয়সে মাহমুদের চেয়ে কিছুটা ছোট।
শান্ত, মার্জিত এবং বুদ্ধিমতী একজন নারী।
বাড়ির সবাই তাকে বড়মা বলে ডাকে।
নওরীন খুব বেশি রাগ করেন না।
কিন্তু তিনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত দেন, তখন সাধারণত কেউ সেটা অমান্য করে না।
বাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন—সবকিছুতেই তার নজর থাকে।
তবে তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা একমাত্র ছেলে—
আব্রাহাম।
আব্রাহাম যতই বড় হয়ে যাক, নওরীনের কাছে সে এখনো সেই ছোট্ট ছেলেটাই।
---
মাহমুদ ও নওরীনের একমাত্র সন্তান — আব্রাহাম
আব্রাহাম চৌধুরী।
বয়স ২৮।
লম্বা, সুদর্শন, গম্ভীর এবং আত্মবিশ্বাসী।
ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ধরনের।
খুব বেশি কথা বলে না।
কারও সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে না।
আর তার স্বভাবের সবচেয়ে পরিচিত দিক—
অ্যাটিটিউড।
কেউ অযথা প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় না।
কেউ বেশি ঘাঁটালে সরাসরি থামিয়ে দেয়।
পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার সামনে একটু হিসেব করেই কথা বলে।
আব্রাহাম ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল।
পরে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কয়েক বছর সেখানেই ছিল।
তারপর বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নিতে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে আসে।
ফিরে আসার পর থেকে বাড়ির ব্যবসায় ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছে।
বাইরে থেকে তাকে কঠিন মনে হলেও পরিবারের মানুষের জন্য সে ভীষণ protective।
বিশেষ করে ছোটদের ব্যাপারে।
---
মেজো ভাই — সামির চৌধুরী
তিন ভাইয়ের দ্বিতীয়জন সামির চৌধুরী।
বয়স ৪৭।
বড় ভাই মাহমুদের তুলনায় স্বভাবে অনেক বেশি হাসিখুশি।
পরিবারে কেউ মন খারাপ করে থাকলে সবার আগে সামিরই তাকে হাসানোর চেষ্টা করে।
ব্যবসায়ও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তার স্ত্রী মেহরিন সামির।
বাড়িতে সবাই তাকে মেজোমা বলে ডাকে।
মেহরিন ভীষণ প্রাণবন্ত একজন নারী।
একটু রাগী।
একটু আবেগী।
আর সন্তানদের ব্যাপারে প্রচণ্ড protective।
তবে আদিবার সঙ্গে তার সম্পর্কটা অন্যরকম।
আদিবাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন তিনি।
কখনো আদিবাকে বকেন।
কখনো আবার তার পক্ষ নিয়ে সবার সঙ্গে ঝগড়া করেন।
সামির আর মেহরিনের দুই সন্তান—
রায়ান এবং আদিবা।
---
রায়ান চৌধুরী
বয়স ২৫।
স্মার্ট, হাসিখুশি এবং ভীষণ social।
তার সঙ্গে আব্রাহামের সম্পর্ক শুধু চাচাতো ভাইয়ের নয়—
তারা একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
ছোটবেলা থেকে একই স্কুল।
একই কলেজ।
একসঙ্গে অসংখ্য দুষ্টুমি।
একসঙ্গে মারও খেয়েছে।
একজনের বিপদে অন্যজন কখনো পিছিয়ে যায়নি।
বাড়ির সবাই বলে—
“আব্রাহাম আর রায়ান দুইজন মিলে একটা মানুষ হলেই ভালো হতো।”
কারণ একজনের যেখানে কম কথা, অন্যজনের সেখানে বেশি কথা।
একজন গম্ভীর, অন্যজন হাসিখুশি।
তবুও দুজনের বন্ধুত্ব অসম্ভব শক্ত।
---
আদিবা চৌধুরী
রায়ানের ছোট বোন।
বয়স ২৩।
চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে প্রাণবন্ত মেয়েদের একজন।
আদিবা ছোট থেকেই এই বাড়িতেই বড় হয়েছে।
তার পৃথিবী বলতে চৌধুরী বাড়ি, পরিবার আর এই বাড়ির মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
স্বভাবে সে একটু জেদি।
খুব সহজেই রাগ করে।
আবার খুব দ্রুত সেই রাগ ভুলেও যায়।
ছোটদের সঙ্গে তার সম্পর্ক বন্ধুর মতো।
আর বড়দের সঙ্গে যথেষ্ট সম্মান রেখে কথা বলে।
তবে নিজের মতের ব্যাপারে সে যথেষ্ট দৃঢ়।
তার সবচেয়ে কাছের মানুষ তার বড় ভাই রায়ান।
দুজনের সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতো।
রায়ান আদিবাকে বকাঝকা করে।
আদিবা সুযোগ পেলেই ভাইয়ের জিনিস লুকিয়ে রাখে।
তারপর নির্দোষ মুখ করে বলে—
“আমি কিছুই করিনি!”
---
সবার ছোট — ফারহান চৌধুরী
তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ফারহান চৌধুরী।
বয়স ৪২।
বড় দুই ভাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি relaxed।
ব্যবসার পাশাপাশি নিজের পরিবার নিয়ে থাকতে ভালোবাসে।
তার স্ত্রী সায়রা ফারহান।
বাড়ির সবাই তাকে ছোটমা বলে ডাকে।
সায়রা খুবই মিষ্টি স্বভাবের।
বাড়িতে সবচেয়ে বেশি হাসাহাসি তার ঘর থেকেই শোনা যায়।
তিনি আবার একটু দুষ্টুও।
কখনো বড় ভাবীর সঙ্গে রান্না নিয়ে তর্ক করছেন।
কখনো মেজো ভাবীর সঙ্গে বসে বাড়ির ছোটদের নিয়ে গল্প করছেন।
আর নিজের সন্তানদের নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই।
ফারহান ও সায়রার তিন সন্তান।
মেহরিন — ১৩ বছর।
রাফি — ১২ বছর।
তাহসিন — ১০ বছর।
তিনজনই আদিবার ভীষণ কাছের।
আদিবা তাদের কাছে শুধু আপু নয়—
একেবারে খেলাধুলার সঙ্গী।
---
চৌধুরী বাড়ির ছোট্ট দল
মেহরিন একটু বুদ্ধিমান আর শান্ত ধরনের।
রাফি প্রচণ্ড দুষ্টু।
আর তাহসিন সবসময় রাফির পেছনে ঘুরে বেড়ায়।
তিনজন মিলে প্রায় প্রতিদিনই বাড়িতে কোনো না কোনো কাণ্ড ঘটায়।
আর তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্গী—
আদিবা।
কখনো চারজন মিলে বাগানে ক্রিকেট খেলে।
কখনো লুকোচুরি।
কখনো আবার চুপিচুপি রান্নাঘর থেকে মিষ্টি নিয়ে পালায়।
তারপর ধরা পড়লে সবাই মিলে একসঙ্গে বলে—
“আমরা কেউ খাইনি!”
---
চৌধুরী বাড়ির নিয়ম
এই বাড়িতে একটা নিয়ম বহু বছর ধরে চলে আসছে।
সকালের নাশতা যতটা সম্ভব সবাই একসঙ্গে করবে।
রাতে সবাই একসঙ্গে খাবে।
আর শুক্রবার রাতে—
পুরো পরিবার একসঙ্গে ড্রয়িংরুমে বসবে।
সেই সময় বড়রা গল্প করবে।
ছোটরা খেলবে।
আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বিষয় থাকলে তিন ভাই মিলে আলোচনা করবে।
এমনকি তিন ভাইয়ের স্ত্রীরাও সেই আলোচনায় অংশ নেন।
এই কারণেই চৌধুরী বাড়িতে পরিবারের সবাই একে অপরের জীবনের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে আছে।
---
সেদিন সকালটাও অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
রান্নাঘর থেকে নাশতার গন্ধ আসছে।
বাগানে ছোটরা দৌড়াচ্ছে।
সায়রা তাদের পেছনে চিৎকার করছেন—
“রাফি! তাহসিন! আবার পুকুরের কাছে যেও না!”
মেহরিন হাতে বই নিয়ে আদিবার ঘরের দিকে ছুটছে।
“আপু! আমার বইটা তুমি নিয়েছ!”
আদিবা ঘর থেকে বেরিয়ে বলল,
“আমি তোমার বই কেন নেব?”
“কারণ কাল রাতে তোমার ঘরে দেখেছি!”
“তাহলে আমার ঘরে কে ঢুকেছিল?”
“তুমি!”
“আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম!”
“ঘুমের মধ্যে বই নিয়ে গিয়েছিলে!”
আদিবা অবাক হয়ে মেহরিনের দিকে তাকাল।
“তোমার যুক্তি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।”
ঠিক তখন নিচ থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“সকাল সকাল বাড়িটা মাথায় তুলেছিস কেন?”
সবাই থেমে গেল।
সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছে—
আব্রাহাম।
কালো শার্ট।
হাতে ঘড়ি।
চোখে সেই পরিচিত কঠিন দৃষ্টি।
রাফি তাহসিনের কানে ফিসফিস করে বলল,
“আব্রাহাম ভাই এসেছে।”
তাহসিন বলল,
“চল পালাই।”
দুজন দৌড়ে বাগানের দিকে চলে গেল।
আদিবা তাদের দেখে হেসে ফেলল।
আব্রাহাম এবার তার দিকে তাকাল।
“তুইও হাসছিস?”
আদিবা একটু থেমে বলল,
“এমনিই।”
“এমনিই হাসিস না।”
“কেন?”
“কারণ তোর হাসির শব্দ পুরো বাড়িতে শোনা যায়।”
আদিবা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এমন করো কেন?”
আব্রাহাম কোনো উত্তর দিল না।
শুধু রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই ওকে বেশি প্রশ্রয় দিস।”
রায়ান হেসে বলল,
“তুই বেশি বকিস।”
পাশ থেকে মেহরিন বলে উঠল,
“আব্রাহাম ভাই, আপনি সবসময় এত serious কেন?”
আব্রাহাম তার দিকে তাকাল।
“তুইও শুরু করিস না।”
মেহরিন হেসে দৌড়ে পালাল।
ডাইনিং রুমে বসে নওরীন সবকিছু দেখছিলেন।
তিনি হেসে মেহরিন সামিরকে বললেন,
“এই বাড়িতে সকালে শান্তি থাকবে—এটা আশা করাই ভুল।”
মেহরিন হেসে বললেন,
“শান্তি থাকলে আবার চৌধুরী বাড়ি কিসের?”
সায়রা দূর থেকে বললেন,
“আপনারা গল্প করেন, আমি এই তিনজনকে সামলাই!”
সামির হেসে বললেন,
“ছোটবেলায় আমরাও এমনই ছিলাম।”
ফারহান সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“ভাই, আপনারা এমন ছিলেন না। আপনারা আরও খারাপ ছিলেন।”
তিন ভাইয়ের হাসিতে পুরো ঘরটা ভরে গেল।
চৌধুরী বাড়ির এই বিশাল সংসারে তখনও সবাই একসঙ্গে।
তিন ভাই।
তিন ভাবী।
চার তরুণ-তরুণী।
তিন ছোট্ট দুষ্টু বাচ্চা।
এক ছাদের নিচে এতগুলো মানুষ।
এতগুলো সম্পর্ক।
এতগুলো গল্প।
কিন্তু তারা কেউ জানত না—
এই বাড়ির পুরোনো দেয়ালের ভেতরে এমন একটা গল্প চাপা পড়ে আছে, যেটা খুব শিগগিরই সামনে আসবে।
আর সেই গল্পের শুরু হবে—
চৌধুরী বাড়ির বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা উত্তরের ঘর থেকে।
চলবে...
4 Replies
August 15, 2026 4:04 pm
পর্ব :০২
চৌধুরী বাড়িতে রাত নামলে বাড়িটা যেন একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়।
দিনের বেলা যেখানে ছোটদের চিৎকার, হাসাহাসি আর সবার ব্যস্ততায় মুখর থাকে পুরো বাড়ি, রাত হলে সেখানে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা।
বিশাল বারান্দাগুলো ফাঁকা হয়ে যায়।
বাগানের গাছগুলো বাতাসে দুলতে থাকে।
পুরোনো দেয়ালের ঘড়িটা প্রতি ঘণ্টায় ভারী শব্দ করে ওঠে।
আর বাড়ির সবচেয়ে উত্তরের দিকে থাকা করিডোরটা?
সেটা রাত হলে প্রায় কেউই ব্যবহার করে না।
কারণ সেই করিডোরের শেষ মাথায় আছে—
উত্তরের ঘর।
প্রায় পনেরো বছর ধরে বন্ধ।
কেন বন্ধ?
সেটা নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে কেউ খুব একটা কথা বলে না।
কেউ বলে, ঘরটায় পুরোনো আসবাবপত্র রাখা আছে।
কেউ বলে, সেখানে এমন কিছু কাগজপত্র আছে যেগুলো পরিবারের বাইরের কাউকে দেখানো হয় না।
আবার বাড়ির পুরোনো কাজের লোকেরা ফিসফিস করে বলে—
“ওই ঘরের সঙ্গে চৌধুরী পরিবারের একটা পুরোনো ঘটনা জড়িয়ে আছে।”
কিন্তু ঘটনাটা কী?
কেউ জানে না।
অথবা...
জানলেও বলতে চায় না।
---
সেদিন রাত।
ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
আদিবা নিজের ঘরে বসে একটা বই পড়ছিল।
হঠাৎ—
ঠক...
একটা শব্দ হলো।
আদিবা বই থেকে মুখ তুলল।
আবার—
ঠক... ঠক...
শব্দটা যেন দূরের করিডোর থেকে আসছে।
আদিবা কিছুক্ষণ চুপ করে শুনল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দরজা খুলল।
বাইরে করিডোর অন্ধকার।
কয়েকটা বাতি জ্বলছে, কিন্তু উত্তরের দিকটা অস্বাভাবিকভাবে অন্ধকার।
আদিবা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
নিজেকেই বলল,
“নিশ্চয়ই বাতাসে কিছু পড়েছে।”
দরজা বন্ধ করতে যাবে—
ঠিক তখনই দূর থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
কেউ একজন উত্তরের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া দেখা গেল।
আদিবা একটু সামনে এগিয়ে গেল।
“কে?”
ছায়াটা থেমে গেল।
তারপর পরিচিত কণ্ঠ—
“তুই এত রাতে এখানে কী করছিস?”
আদিবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“আব্রাহাম ভাই?”
আব্রাহাম আলোয় এসে দাঁড়াল।
কালো টি-শার্ট, ধূসর ট্রাউজার।
হাতে একটা ছোট টর্চ।
আদিবা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আব্রাহাম ভাই, তুমিও এখানে কী করছ?”
“কিছু না।”
“কিছু না হলে টর্চ নিয়ে রাত সাড়ে এগারোটায় উত্তরের করিডোরে কেন?”
আব্রাহাম একবার তার দিকে তাকাল।
“তোর অনেক প্রশ্ন।”
“আর তোমার অনেক গোপনীয়তা।”
“ঘুমাতে যা।”
“তুমি আগে বলো এখানে কী করছ।”
আব্রাহাম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“কাল সকালে বলব।”
“কেন এখন না?”
“কারণ এখন তোর জানার দরকার নেই।”
আদিবা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এমন করো!”
আব্রাহাম শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ। আর তুই সবসময় আমার কথা না শুনে নিজের মতো চলিস।”
আদিবা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, আব্রাহাম ভাই। তুমি যাও। আমিও যাচ্ছি।”
আব্রাহাম কিছু বলল না।
আদিবা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকিয়ে দেখল—
আব্রাহাম উত্তরের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আর তার হাতে একটা পুরোনো চাবি।
---
পরদিন সকাল
ডাইনিং টেবিলে যথারীতি সবাই বসেছে।
নওরীন আব্রাহামের প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বললেন,
“এত সকালে কোথায় গিয়েছিলি?”
আব্রাহাম শান্তভাবে বলল,
“বাড়ির উত্তর দিকটা দেখছিলাম।”
মাহমুদ চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে তাকালেন।
“উত্তর দিক?”
তার গলার স্বর বদলে গেল।
রায়ান সেটা খেয়াল করল।
সামিরও চুপ হয়ে গেলেন।
ফারহান চামচ নামিয়ে রাখলেন।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো টেবিল নিস্তব্ধ।
আদিবা অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
মাহমুদ ধীরে ধীরে বললেন,
“ওখানে যাওয়ার দরকার নেই, আব্রাহাম।”
আব্রাহাম বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেন?”
“বলেছি না, দরকার নেই।”
“কিন্তু বাবা—”
“আব্রাহাম।”
একটা শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দেই বোঝা গেল বিষয়টা নিয়ে আর কথা বলতে চান না মাহমুদ।
আব্রাহাম চুপ করে গেল।
রায়ান নিচু গলায় বলল,
“কী আছে ওই ঘরে?”
মাহমুদ এবার তার দিকে তাকালেন।
“তোদের কারও জানার দরকার নেই।”
আদিবা এতক্ষণ চুপ ছিল।
হঠাৎ বলল,
“কিন্তু আমরা তো ছোট নই।”
মেহরিন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল,
“আপু, আমি মনে হয় জানি।”
আদিবা তাকাল।
“কী?”
মেহরিন গম্ভীর মুখ করে বলল,
“ওই ঘরে ভূত আছে।”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমি কাল রাতে দেখেছি।”
তাহসিন চিৎকার করে উঠল,
“সত্যি?”
মেহরিন হেসে ফেলল।
“তোমাদের ভয় দেখাচ্ছি!”
রাফি মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম!”
পুরো টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেল।
শুধু আব্রাহাম হাসল না।
তার চোখ তখনও বাবার দিকে।
---
নাশতা শেষ হওয়ার পর রায়ান আব্রাহামকে ধরে বাগানের দিকে নিয়ে গেল।
“বল।”
আব্রাহাম হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“কী?”
“উত্তরের ঘর।”
“কিছু না।”
“আমাকে বোকা বানাস না।”
আব্রাহাম থেমে গেল।
রায়ানও থামল।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আব্রাহাম পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করল।
রায়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।
“এটা কোথায় পেলি?”
“বাবার স্টাডি রুমে।”
“চুরি করেছিস?”
“না।”
“তাহলে?”
“টেবিলের ড্রয়ারে ছিল।”
রায়ান চাবিটা হাতে নিয়ে দেখল।
চাবিটা বেশ পুরোনো।
তার গায়ে ছোট করে খোদাই করা—
C-17
রায়ান বলল,
“এটা কী?”
আব্রাহাম বলল,
“জানি না।”
“তাহলে ঘর খুলবি?”
“হ্যাঁ।”
“কখন?”
আব্রাহাম চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ রাতে।”
রায়ান একটু হেসে বলল,
“জানিস তো, তুই পাগল।”
“জানি।”
“আমি তোর সঙ্গে আছি।”
আব্রাহাম মৃদু হাসল।
“সেটাও জানি।”
---
এদিকে আদিবা তখন বাগানে বসে ছোটদের সঙ্গে গল্প করছিল।
তাহসিন একটা পাতা হাতে নিয়ে বলল,
“আদিবা আপু, তুমি কি ভূতে বিশ্বাস করো?”
আদিবা হেসে বলল,
“না।”
রাফি বলল,
“উত্তরের ঘরে কিন্তু ভূত আছে।”
আদিবা বলল,
“তোমরা সবাই মিলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?”
মেহরিন বলল,
“ভয় না। সত্যি বলছি।”
আদিবা হেসে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে আজ রাতে আমি নিজেই গিয়ে দেখে আসব।”
কথাটা বলেই সে বুঝতে পারল—
কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
দূরে দাঁড়িয়ে আব্রাহাম।
তার মুখে আগের মতোই গম্ভীর ভাব।
আদিবা হাত নেড়ে বলল,
“কী?”
আব্রাহাম দূর থেকেই বলল,
“কিছু না।”
“তাহলে তাকিয়ে আছ কেন?”
“তুই কী বললি শুনলাম।”
“কী বলেছি?”
“উত্তরের ঘরে যাবি?”
আদিবা হেসে বলল,
“হ্যাঁ।”
আব্রাহামের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“যাস না।”
“কেন?”
“বলেছি না।”
আদিবা জেদ করে বলল,
“তুমি নিষেধ করলেই আমি যাব।”
রায়ান পাশ থেকে হেসে বলল,
“ভাই, তুই ভুল মানুষকে নিষেধ করেছিস।”
আদিবা হেসে বলল,
“দেখেছ, ভাইয়া আমাকে বোঝে।”
আব্রাহাম বিরক্ত হয়ে রায়ানের দিকে তাকাল।
“তুই ওকে মাথায় তুলেছিস।”
রায়ান হাসতে হাসতে বলল,
“আর তুই ওকে বেশি ভয় দেখাস।”
---
সেদিন রাত।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে।
ঘড়িতে বারোটা পনেরো।
উত্তরের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহাম আর রায়ান।
আব্রাহাম চাবিটা তালায় ঢুকাল।
ক্লিক।
তালা খুলে গেল।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
“প্রস্তুত?”
আব্রাহাম দরজার হাতলে হাত রাখল।
“হ্যাঁ।”
দরজা ধীরে ধীরে খুলল।
ভেতর থেকে পুরোনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ বেরিয়ে এল।
ঘরটা অন্ধকার।
টর্চের আলো ঘুরতেই দেখা গেল—
পুরোনো আলমারি।
একটা কাঠের টেবিল।
দেয়ালে কয়েকটা পুরোনো ছবি।
আর কোণের দিকে একটা বড় লোহার সিন্দুক।
রায়ান এগিয়ে গিয়ে একটা ছবির ওপর থেকে ধুলো সরাল।
ছবিটা দেখে তার মুখ বদলে গেল।
“আব্রাহাম...”
“কী?”
“এদিকে আয়।”
আব্রাহাম এগিয়ে গেল।
ছবিতে চৌধুরী পরিবারের তিন ভাই দাঁড়িয়ে আছে।
অনেক বছর আগের ছবি।
কিন্তু ছবির এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অচেনা মানুষকে দেখে আব্রাহাম থমকে গেল।
লোকটির হাতে একটা ছোট্ট মেয়ে।
মেয়েটার মুখ স্পষ্ট নয়।
আব্রাহাম ছবিটা হাতে তুলে নিল।
পেছনে লেখা—
“১৯ বছর আগে — সেই রাতের আগে।”
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
“সেই রাত মানে?”
আব্রাহাম উত্তর দিল না।
তার চোখ তখন ছবির পেছনে লেখা আরেকটা লাইনে আটকে গেছে—
“যদি সত্যিটা একদিন ফিরে আসে, চৌধুরী বাড়ি আর আগের মতো থাকবে না।”
ঠিক তখনই বাইরে করিডোরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
দুজনেই থেমে গেল।
রায়ান টর্চ বন্ধ করে দিল।
অন্ধকার ঘরে নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছে না।
তারপর—
দরজার বাইরে খুব আস্তে একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
“আব্রাহাম ভাই...?”
আব্রাহাম আর রায়ান একে অপরের দিকে তাকাল।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
“ও এখানে কী করছে?”
আব্রাহাম দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলতেই আদিবা সামনে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটা টর্চ।
চোখে বিরক্তি।
“তোমরা এখানে কী করছ?”
আব্রাহাম কঠিন গলায় বলল,
“তুই এখানে কেন এসেছিস?”
“তুমি আমাকে বলেছিলে না আসতে। তাই এসেছি।”
রায়ান মুখ চেপে হাসল।
আব্রাহাম চোখ রাঙাল।
“হাসিস না।”
আদিবা ঘরের ভেতর তাকাল।
“এখানে কী আছে?”
আব্রাহাম এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
“কিছুই না।”
আদিবা ভেতরে ঢুকে গেল।
“তাহলে লুকাচ্ছ কেন?”
তার চোখ গিয়ে পড়ল লোহার সিন্দুকের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটায়।
আদিবা ছবিটা হাতে তুলে নিল।
তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কারণ ছবির সেই অচেনা মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটার মুখের একটা অংশ—
অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
আদিবা ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এই মেয়েটা কে?”
আব্রাহাম উত্তর দেওয়ার আগেই—
পেছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
ধাম!
তিনজনই ঘুরে তাকাল।
দরজার বাইরে কেউ নেই।
কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা পুরোনো খাম।
খামের ওপর শুধু একটি নাম লেখা—
“আদিবা।”
আদিবা স্থির হয়ে গেল।
আর আব্রাহামের মুখের সবটুকু স্বাভাবিকতা মুহূর্তেই হারিয়ে গেল।
কারণ সে বুঝতে পারল—
উত্তরের ঘরের রহস্য শুধু চৌধুরী পরিবারের অতীত নয়।
এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে—
আদিবার পরিচয়।
চলবে...
August 15, 2026 4:05 pm
পর্ব:০৩
“আদিবা।”
খামের ওপর নিজের নামটা দেখে আদিবা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাতে তখনও পুরোনো ছবিটা।
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।
রায়ান ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল।
কেউ নেই।
আব্রাহাম নিচু হয়ে মেঝে থেকে খামটা তুলে নিল।
আদিবা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আব্রাহাম ভাই, ওটা আমার নামে কেন?”
আব্রাহাম কোনো উত্তর দিল না।
খামটা উল্টেপাল্টে দেখল।
পুরোনো কাগজ।
হলদেটে হয়ে গেছে।
কোনো প্রেরকের নাম নেই।
শুধু সামনে লেখা—
আদিবা চৌধুরী।
রায়ান বলল,
“খুল।”
আদিবা একটু দ্বিধা করে বলল,
“আমার ভয় করছে।”
আব্রাহাম তার দিকে তাকাল।
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“আমি আছি।”
দুই শব্দ।
কিন্তু কথাটা শুনে আদিবার ভয়টা কিছুটা কমে গেল।
সে আস্তে করে খামটা আব্রাহামের হাত থেকে নিল।
খাম খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কাগজ আর পুরোনো একটা ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিটা দেখে আদিবার চোখ বড় হয়ে গেল।
ছবিতে একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।
তার কোলে একটা ছোট্ট শিশু।
ছবির পেছনে লেখা—
“এই শিশুটাকে সত্যিটা জানানো হয়নি।”
আদিবা কাঁপা গলায় বলল,
“শিশুটার নাম কী?”
রায়ান ছবিটা হাতে নিয়ে পেছনটা আবার দেখল।
“কিছু লেখা নেই।”
আব্রাহাম কাগজটা হাতে নিল।
সেখানে মাত্র একটা লাইন—
“উত্তরের ঘরের নিচে যা আছে, সেটা খুঁজে বের করো।”
আদিবা অবাক হয়ে বলল,
“নিচে?”
রায়ান ঘরের মেঝের দিকে তাকাল।
“এই ঘরের নিচে কিছু আছে?”
আব্রাহাম চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল।
তারপর ঘরের এক কোণে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
মেঝের পুরোনো কাঠের অংশে হাত বুলিয়ে দেখল।
“এখানে কিছু একটা আছে।”
রায়ান এগিয়ে এল।
“কীভাবে বুঝলি?”
“কাঠটা অন্যগুলোর চেয়ে নতুন।”
আদিবা টর্চের আলো ফেলল।
সত্যিই জায়গাটার কাঠের রং সামান্য আলাদা।
রায়ান বলল,
“খুলবি?”
আব্রাহাম কাঠের অংশটা তুলতে চেষ্টা করল।
নড়ল না।
আরেকবার জোর দিতেই—
কড়াৎ!
কাঠটা উঠে গেল।
নিচে একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গা।
তার ভেতরে রাখা একটা পুরোনো লোহার বাক্স।
আদিবা অবাক হয়ে বলল,
“এটা এখানে কত বছর ধরে?”
আব্রাহাম বাক্সটা তুলে আনল।
তালাটা পুরোনো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
চাবিটা তার কাছেই ছিল।
কিছুক্ষণ পর বাক্সটা খুলে গেল।
ভেতরে কয়েকটা পুরোনো কাগজ।
একটা ডায়েরি।
আর একটা ছোট্ট শিশুর হাসপাতালের ব্রেসলেট।
আদিবা ব্রেসলেটটা হাতে তুলে নিল।
তার ওপর লেখা—
BABY — A.
আদিবা থমকে গেল।
“এটা কী?”
রায়ান বলল,
“হাসপাতালের ব্রেসলেট মনে হচ্ছে।”
আদিবা আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
তারপর নিজের হাতের ব্রেসলেটটার দিকে।
“আব্রাহাম ভাই...”
“হুম?”
“আমার জন্মের সময় কি আমি কোনো হাসপাতালে ছিলাম?”
আব্রাহাম চুপ করে গেল।
প্রশ্নটা শুনে তার মুখ বদলে গেল।
কারণ সে জানে—
আদিবার জন্মের ব্যাপারে চৌধুরী পরিবারে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে।
আদিবার জন্মের পরপরই তার মা অনেকদিন হাসপাতালে ছিলেন।
কিন্তু এত বছর ধরে কেউ কখনো সেই সময়ের বিস্তারিত কথা বলেনি।
আদিবা আবার বলল,
“তুমি কিছু জানো?”
আব্রাহাম ধীরে ধীরে বলল,
“যতটুকু জানি, তুই ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে ছিলি।”
“আমি সেটা জানি।”
“তাহলে?”
“আমি জানতে চাই, আমার জন্মের সময় কী হয়েছিল।”
আব্রাহাম উত্তর দেওয়ার আগেই রায়ান ডায়েরিটা খুলে ফেলল।
প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা ফাঁকা।
তারপর একটা পাতায় বড় করে লেখা—
“৩১ আগস্ট।”
রায়ান পড়তে শুরু করল।
“আজ রাতে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, যার ফল একদিন পুরো পরিবারকে ভুগতে হবে...”
তারপরের অংশ ছেঁড়া।
পরের পৃষ্ঠায়—
“শিশুটাকে বাঁচাতে হলে সত্যিটা লুকাতেই হবে।”
আদিবা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
“কোন শিশুকে?”
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ বাইরে থেকে শব্দ হলো।
খট!
তিনজনই চমকে উঠল।
আব্রাহাম দ্রুত দরজার দিকে গেল।
দরজা খুলে বাইরে তাকাল।
করিডোর ফাঁকা।
শুধু দূরে একটা জানালা খোলা।
বাতাসে পর্দা উড়ছে।
রায়ান বলল,
“কেউ ছিল?”
“জানি না।”
আদিবা আস্তে করে বলল,
“আমাদের কেউ দেখছিল?”
আব্রাহাম তার দিকে তাকাল।
“তুই এখনই নিজের ঘরে যাবি।”
আদিবা প্রতিবাদ করল,
“কিন্তু—”
“কোনো কিন্তু না।”
“আমি ভয় পাচ্ছি না।”
“আমি বলেছি যা।”
আদিবা মুখ ভার করে বলল,
“তুমি সবসময় আমাকে বাচ্চা ভাবো।”
আব্রাহাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তুই আমার কাছে এখনও এই বাড়ির সবচেয়ে ঝামেলার মানুষ।”
আদিবা চোখ বড় করে বলল,
“এটা আবার কেমন কথা?”
রায়ান হেসে ফেলল।
“তুই ভাগ্যবান। আব্রাহাম তোকে ঝামেলার মানুষ বলে। আমাকে তো সরাসরি বিপদ বলে।”
আদিবা হাসতে শুরু করল।
ঘরের ভারী পরিবেশটা কিছুটা হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু আব্রাহামের মুখে হাসি এল না।
কারণ তার মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরছে—
“শিশুটাকে বাঁচাতে হলে সত্যিটা লুকাতেই হবে।”
---
পরদিন সকাল।
চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং রুমে সবাই বসেছে।
নওরীন আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কাল রাতে কোথায় ছিলি?”
আব্রাহাম চুপ করে রইল।
সামির প্রশ্ন করলেন,
“কী হয়েছে?”
রায়ান দ্রুত বলল,
“কিছু না।”
আদিবা চুপচাপ বসে ছিল।
তার চোখ বারবার মাহমুদ চৌধুরীর দিকে যাচ্ছে।
মাহমুদও যেন অস্বাভাবিকভাবে চুপ।
হঠাৎ আদিবা জিজ্ঞেস করল,
“বাবা?”
সামির তাকালেন।
“কী?”
“আমার জন্মের সময় কি কোনো সমস্যা হয়েছিল?”
টেবিলের ওপর চামচের শব্দ থেমে গেল।
মেহরিন খাওয়া বন্ধ করে সবার দিকে তাকাল।
সায়রাও চুপ হয়ে গেলেন।
মাহমুদ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
“এ কথা হঠাৎ কেন?”
“এমনিই জানতে চাইলাম।”
“কেন?”
আদিবা উত্তর দিল না।
রায়ানও চুপ।
আব্রাহাম নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
সামিরের মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি বললেন,
“তোর জন্মের সময় সব ঠিকই ছিল।”
আদিবা আবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আমার জন্মের কোনো পুরোনো ছবি নেই কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
এবার আব্রাহাম বাবার দিকে তাকাল।
মাহমুদ চোখ নামিয়ে ফেললেন।
আর সেই মুহূর্তে আব্রাহাম বুঝল—
এই বাড়িতে শুধু একটা রহস্য লুকানো নেই।
চৌধুরী পরিবারের প্রত্যেক বড় মানুষের কাছে সত্যির আলাদা একটা অংশ আছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
কেন সেই সত্যিটা আদিবার কাছ থেকে এত বছর লুকানো হলো?
---
সেদিন বিকেলে আদিবা একা বাগানে বসে ছিল।
হাতে সেই পুরোনো ছবিটা।
সে ছবির মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার ভাবছিল—
“তুমি কে?”
পেছন থেকে রায়ানের কণ্ঠ এল,
“একা একা কী ভাবছিস?”
আদিবা বলল,
“ভাইয়া, তুমি কি আমার জন্মের ব্যাপারে কিছু জানো?”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“না।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
আদিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সবাই আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে মনে হচ্ছে।”
রায়ান পাশে বসে বলল,
“যদি সত্যি কিছু থাকে, একদিন বের হবেই।”
“আর যদি সত্যিটা খারাপ হয়?”
রায়ান কিছু বলার আগেই দূর থেকে আব্রাহামকে আসতে দেখা গেল।
আদিবা তার দিকে তাকাল।
“আব্রাহাম ভাইও কিছু জানে।”
রায়ান বলল,
“হয়তো।”
“তাহলে ওকে জিজ্ঞেস করব।”
রায়ান মাথা নাড়ল।
“জিজ্ঞেস কর।”
আদিবা উঠে দাঁড়াল।
আব্রাহামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আব্রাহাম ভাই।”
“হুম?”
“তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?”
আব্রাহাম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“হ্যাঁ।”
আদিবা অবাক।
“কী?”
আব্রাহাম শান্ত গলায় বলল,
“কিন্তু এখনো তোকে বলার সময় হয়নি।”
আদিবা হতাশ হয়ে বলল,
“সবাই একই কথা বলে!”
আব্রাহাম এবার একটু নরম স্বরে বলল,
“সময় হলে প্রথম মানুষ হিসেবে তোকে আমিই বলব।”
আদিবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
“কথা দাও?”
আব্রাহাম বলল,
“কথা দিলাম।”
দূরে দাঁড়িয়ে রায়ান দুজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু তাদের কেউই জানত না—
চৌধুরী বাড়ির দেয়ালের ওপাশে তখন একজন দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে সেই একই ধরনের পুরোনো খাম।
আর খামের ওপর লেখা—
“আদিবার সত্যি জানার সময় খুব কাছে।”
চলবে...
August 15, 2026 4:06 pm
পর্ব:০৪
রাত তখন প্রায় একটা।
চৌধুরী বাড়ির সব আলো নিভে গেছে।
শুধু দ্বিতীয় তলার করিডোরে দুটো হলুদ বাতি জ্বলছে।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
কিন্তু একজনের চোখে ঘুম নেই।
আদিবা।
বিছানায় শুয়ে বারবার পাশ ফিরছে সে।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“শিশুটাকে বাঁচাতে হলে সত্যিটা লুকাতেই হবে।”
কোন শিশুর কথা বলা হয়েছিল?
কেন সেই কথাটা তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
উত্তরের ঘরের সেই ছবিতে থাকা মেয়েটি কে?
আদিবা চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
ঠক... ঠক...
শব্দ।
সে চোখ খুলে ফেলল।
কেউ যেন তার ঘরের দরজায় ধীরে ধীরে নক করছে।
আদিবা উঠে বসে বলল,
“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার—
ঠক... ঠক...
আদিবা বিছানা থেকে নামল।
ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
“কে?”
এবারও কোনো উত্তর নেই।
সে দরজা খুলল।
করিডোর ফাঁকা।
আদিবা বাইরে তাকিয়ে রইল।
“অদ্ভুত...”
দরজা বন্ধ করতে যাবে—
হঠাৎ করিডোরের শেষ মাথায় একটা ছায়া নড়ল।
আদিবা স্থির হয়ে গেল।
“কে ওখানে?”
ছায়াটা থেমে গেল।
তারপর দ্রুত উত্তরের দিকের করিডোরে চলে গেল।
আদিবার বুক ধক করে উঠল।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর সাহস করে পেছনে তাকাল।
দূরে কারও পায়ের শব্দ।
ঠক... ঠক... ঠক...
আদিবা ফিসফিস করে বলল,
“আব্রাহাম ভাই?”
কোনো উত্তর নেই।
সে দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু দরজা বন্ধ করার সময় তার চোখ পড়ল মেঝের দিকে।
দরজার সামনে পড়ে আছে একটা ছোট্ট কাগজ।
আদিবা সেটা তুলে নিল।
কাগজে লেখা—
“উত্তরের ঘরে যা দেখেছ, সেটা ভুলে যাও।”
তার হাত কেঁপে উঠল।
---
পরদিন সকাল।
চৌধুরী বাড়িতে নাশতার সময় আদিবা একদম চুপ।
নওরীন সেটা খেয়াল করলেন।
“কী হয়েছে মা?”
“কিছু না বড়মা।”
“মুখটা এমন কেন?”
“ঘুম হয়নি।”
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“রাতে আবার বই পড়েছিস?”
আদিবা মাথা নাড়ল।
“না।”
আব্রাহাম এতক্ষণ চুপচাপ খাচ্ছিল।
হঠাৎ বলল,
“কী হয়েছে?”
আদিবা তার দিকে তাকাল।
“কিছু না।”
“মিথ্যা বলিস না।”
আদিবা একটু ইতস্তত করে বলল,
“আব্রাহাম ভাই...”
“হুম?”
“কাল রাতে আমার দরজার সামনে একটা কাগজ ছিল।”
আব্রাহামের হাত থেমে গেল।
রায়ানও সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
“কী লেখা ছিল?”
আদিবা চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“উত্তরের ঘরে যা দেখেছ, সেটা ভুলে যাও।”
টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
মাহমুদ চৌধুরীও শুনে ফেলেছেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“কে বলেছে তোকে উত্তরের ঘরে যেতে?”
আদিবা চুপ।
মাহমুদ এবার কঠিন গলায় বললেন,
“আদিবা।”
“আমি...”
রায়ান বলল,
“ও একা যায়নি।”
মাহমুদ এবার আব্রাহামের দিকে তাকালেন।
“তুই?”
আব্রাহাম শান্তভাবে বলল,
“হ্যাঁ।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর মাহমুদ বললেন,
“আজকের পর ওই ঘরে আর কেউ যাবে না।”
আব্রাহাম কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে একটা দৃঢ়তা দেখা গেল।
---
নাশতার পর আব্রাহাম রায়ানকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
দরজা বন্ধ করে বলল,
“কাগজটা দেখ।”
রায়ান কাগজটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল।
“হাতের লেখা বদলানো হয়েছে।”
“কীভাবে বুঝলি?”
“দেখ। কালির রং এক জায়গায় গাঢ়, অন্য জায়গায় হালকা।”
আব্রাহাম বলল,
“মানে?”
“মানে একই কলমে লেখা হয়নি।”
আব্রাহাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“বাড়ির ভেতরের কেউ।”
রায়ান তাকাল।
“তুইও সেটাই ভাবছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু কে?”
আব্রাহাম উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আদিবার কণ্ঠ—
“আব্রাহাম ভাই?”
দুজনেই দরজার দিকে তাকাল।
আব্রাহাম দরজা খুলল।
আদিবা হাতে একটা ছোট্ট বাক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে।
“এটা আমার ঘরের আলমারির পেছনে পেয়েছি।”
রায়ান বাক্সটা দেখে বলল,
“খুলেছিস?”
“না।”
আব্রাহাম বাক্সটা নিল।
“কোথায় পেয়েছিস?”
“পুরোনো কাপড়ের নিচে।”
আব্রাহাম বাক্সটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো চিঠি।
আর একটা ছোট্ট রুপার লকেট।
আদিবা লকেটটা হাতে নিল।
“এটা আমার?”
লকেটের পেছনে খোদাই করা—
A.C.
আদিবা বলল,
“আমার নামের প্রথম অক্ষর A.C. তো...”
রায়ান বলল,
“হতে পারে।”
আব্রাহাম চিঠিটা খুলল।
চিঠির প্রথম লাইন—
“যদি এই চিঠি আদিবার হাতে পৌঁছে থাকে, তাহলে বুঝবে আমি আর ফিরতে পারিনি।”
আদিবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কে লিখেছে?”
আব্রাহাম পরের লাইন পড়তে শুরু করল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
ঠাস!
ঘরের জানালার কাচে কিছু একটা আঘাত করল।
আদিবা চমকে উঠল।
রায়ান দ্রুত জানালার কাছে গেল।
বাইরে তাকিয়ে বলল,
“কেউ নেই।”
আব্রাহামও জানালার কাছে গেল।
নিচে বাগান।
কেউ নেই।
কিন্তু জানালার নিচে পড়ে আছে একটা ছোট পাথর।
তার সঙ্গে বাঁধা একটা কাগজ।
আব্রাহাম কাগজটা খুলল।
মাত্র তিনটি শব্দ—
“ওকে বিশ্বাস করো না।”
আদিবা অবাক হয়ে বলল,
“কাকে?”
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ আব্রাহামের চোখ ঘরের দরজার দিকে গেল।
দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।
আধখোলা।
আর দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল।
আব্রাহাম এক ঝটকায় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
করিডোর ফাঁকা।
কিন্তু দূরে সিঁড়ির কাছে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আব্রাহাম দৌড়ে নিচে নামল।
রায়ান তার পেছনে।
আদিবাও পিছনে পিছনে ছুটল।
“আব্রাহাম ভাই!”
“তুই এখানেই থাক!”
“না!”
“আদিবা!”
আব্রাহামের গলার কঠোরতা শুনে আদিবা থেমে গেল।
আব্রাহাম আর রায়ান নিচতলায় পৌঁছে গেল।
সিঁড়ির পাশে একটা দরজা খোলা।
সেটা বাড়ির পুরোনো স্টোররুম।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
“ভেতরে গেছে।”
আব্রাহাম দরজা ঠেলে খুলল।
অন্ধকার।
টর্চ জ্বালানো হলো।
ঘরের ভেতর কেউ নেই।
কিন্তু একটা চেয়ার দুলছে।
যেন কয়েক সেকেন্ড আগেও কেউ সেখানে বসেছিল।
রায়ান ধীরে বলল,
“আমরা দেরি করে ফেলেছি।”
আব্রাম মেঝের দিকে তাকাল।
সেখানে পড়ে আছে একটা পুরোনো ছবি।
সে ছবিটা তুলে নিল।
ছবিতে তিন ভাইয়ের সঙ্গে আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এবার অদ্ভুত বিষয়টা অন্য জায়গায়।
ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে—
আদিবার বাবা।
তার বয়স তখন অনেক কম।
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অচেনা নারীকে দেখে আব্রামের চোখ স্থির হয়ে গেল।
কারণ সেই নারীই—
উত্তরের ঘরের ছবিতে থাকা নারী।
রায়ান ধীরে বলল,
“এটা অসম্ভব...”
আব্রাহাম কোনো উত্তর দিল না।
তার হাতে থাকা ছবিটা শক্ত করে চেপে ধরল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“তোমরা এখানে কী করছ?”
দুজন ঘুরে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে—
মাহমুদ চৌধুরী।
তার মুখে এমন একটা ভয় দেখা যাচ্ছে, যা আব্রাহাম আগে কখনো দেখেনি।
মাহমুদের চোখ ছবিটার দিকে গেল।
তারপর আব্রাহামের দিকে।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“ওই ছবিটা কোথায় পেলি?”
আব্রাহাম বলল,
“এটা আপনি চেনেন?”
মাহমুদ কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু খুব নিচু গলায় বললেন—
“এই ছবি তো... পনেরো বছর আগে পুড়িয়ে ফেলার কথা ছিল।”
আর ঠিক তখনই বাইরে থেকে আদিবার কণ্ঠ শোনা গেল—
“বাবা?”
মাহমুদের মুখের রং বদলে গেল।
কারণ তিনি জানেন—
এবার আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখা যাবে না।
চলবে...
August 15, 2026 4:07 pm
পর্ব:০৫
“এই ছবি তো... পনেরো বছর আগে পুড়িয়ে ফেলার কথা ছিল।”
মাহমুদ চৌধুরীর কথা শুনে ঘরের সবাই যেন পাথর হয়ে গেল।
আব্রাহাম ছবিটা শক্ত করে ধরে বলল,
“কেন পুড়িয়ে ফেলেছিলেন?”
মাহমুদ কোনো উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল আদিবা।
“বাবা?”
মাহমুদ দ্রুত ছবিটার দিকে তাকালেন।
“তুই এখানে কেন?”
“তোমরা সবাই এত চুপচাপ কেন?”
আদিবা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
তার চোখ গিয়ে পড়ল আব্রাহামের হাতে থাকা ছবির ওপর।
“ওই ছবিটা কী?”
মাহমুদ বললেন,
“কিছু না।”
আদিবা এবার বাবার দিকে সরাসরি তাকাল।
“সবাই আমাকে একই কথা বলছে। ‘কিছু না।’ অথচ কিছু একটা তো অবশ্যই আছে!”
সামির দূর থেকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
আদিবা সেটা বুঝতে পারল।
“বাবা, তুমি কিছু জানো?”
সামির মুখ খুললেন, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না।
মাহমুদ এবার কঠিন স্বরে বললেন,
“আদিবা, তুই নিজের ঘরে যা।”
“কিন্তু—”
“এখনই।”
আদিবা কষ্ট পাওয়া চোখে সবার দিকে তাকাল।
“ঠিক আছে।”
সে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এই বিষয়টা এখানেই শেষ।”
আব্রাহাম শান্ত গলায় বলল,
“না, বাবা। এটা এখন আর শেষ হবে না।”
মাহমুদ ছেলের দিকে তাকালেন।
“তুই বুঝতে পারছিস না।”
“তাহলে বুঝিয়ে বলুন।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মাহমুদ বললেন,
“যে নারীকে ছবিতে দেখেছিস... তার নাম ছিল নাবিলা।”
রায়ান অবাক হয়ে বলল,
“কে ছিলেন তিনি?”
মাহমুদ উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একটা শব্দ হলো।
ধাম!
সবাই চমকে দরজার দিকে তাকাল।
আব্রাহাম দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।
করিডোর ফাঁকা।
কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা ছোট্ট কালো কাপড়ের টুকরো।
আব্রাহাম সেটা তুলে নিল।
রায়ান পাশে এসে বলল,
“কেউ আমাদের কথা শুনছিল।”
আব্রাহাম মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
---
এদিকে আদিবা নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।
তার মাথায় শুধু একটা নাম—
নাবিলা।
হঠাৎ দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
আদিবা ভেবেছিল আব্রাহাম ভাই এসেছে।
কিন্তু দরজা খুলতেই কাউকে দেখা গেল না।
শুধু মেঝেতে একটা ছোট্ট খাম।
আদিবা খামটা তুলে নিল।
ভেতরে একটা পুরোনো কাগজ।
মাত্র এক লাইন—
“তোর জন্মের সত্যিটা জানতে চাইলে আজ রাত বারোটায় পেছনের পুকুরঘাটে আয়।”
আদিবার বুক ধক করে উঠল।
সে কাগজটা আবার পড়ল।
তারপর নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
“আমি যাব।”
---
রাত এগারোটা পঞ্চাশ।
চৌধুরী বাড়ি নিস্তব্ধ।
আদিবা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলো।
কাউকে কিছু জানাল না।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পেছনের দরজাটা খুলল।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস।
পুকুরের পানি চাঁদের আলোয় অদ্ভুত কালো দেখাচ্ছে।
আদিবা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল।
“কেউ আছেন?”
কোনো উত্তর নেই।
“আমি এসেছি।”
দূরের গাছের আড়াল থেকে একটা ছায়া নড়ল।
আদিবা থেমে গেল।
“আপনি কে?”
ছায়াটা ধীরে ধীরে সামনে আসতে লাগল।
ঠিক তখনই—
পেছন থেকে কেউ আদিবার হাত চেপে ধরল।
আদিবা চিৎকার করতে যাবে—
একটা পরিচিত কণ্ঠ খুব নিচু স্বরে বলল,
“চুপ! আমি।”
আদিবা ঘুরে তাকাল।
আব্রাহাম ভাই।
আদিবা ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এখানে?”
“তুই এখানে কী করছিস?”
“আমাকে একটা চিঠি দিয়ে ডেকেছে।”
আব্রাহামের চোখ সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে গেল।
“চিঠিটা কোথায়?”
আদিবা কাগজটা বের করল।
আব্রাহাম পড়েই বুঝল—
এটা ফাঁদ।
“তুই আমার সঙ্গে থাকবি। একা কোথাও যাবি না।”
হঠাৎ পুকুরের ওপাশে শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ হলো।
দুজনেই তাকাল।
একজন লোক গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাদের দেখে দৌড় দিল।
আব্রাহাম সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ছুটল।
“আব্রাহাম ভাই!”
আদিবা পেছন থেকে ডাকলেও সে থামল না।
কিছু দূর গিয়ে লোকটা অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
আব্রাহাম মাটির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখতে পেল।
একটা পুরোনো লকেট।
সে সেটা তুলে নিল।
লকেটের পেছনে খোদাই করা—
N. C.
আব্রাহাম স্থির হয়ে গেল।
নাবিলা চৌধুরী।
কিন্তু নাবিলা কে ছিলেন?
আর কেন তার জিনিসগুলো বারবার আদিবার কাছে ফিরে আসছে?
আব্রাহাম লকেটটা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
রায়ান।
আব্রাহাম ফোন ধরতেই রায়ানের কাঁপা কণ্ঠ—
“আব্রাহাম... তুই যেখানে আছিস, সেখান থেকে এখনই বাড়িতে আয়।”
“কেন?”
“উত্তরের ঘরের দরজা আবার খোলা।”
“তারপর?”
রায়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল—
“ভেতরে একটা নতুন ছবি পাওয়া গেছে।”
“কার ছবি?”
রায়ানের গলা আরও নিচু হয়ে গেল।
“আদিবার মায়ের।”
আব্রাহাম স্তব্ধ।
আর ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবা সব শুনে ফেলেছে।
তার মুখ থেকে শুধু একটা কথাই বের হলো—
“আমার মায়ের ছবি... উত্তরের ঘরে কেন?”
চলবে...