Notifications
Clear all
Page 2 / 2
Prev
August 15, 2026 4:17 pm
পর্ব:০৬
চিঠিটা ছিনিয়ে নেওয়ার পর থেকেই ছোঁয়ার মনে হচ্ছিল, তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ বদলে গেছে।
বারো বছর ধরে যে স্মৃতিগুলো তার কাছে কুয়াশার মতো ছিল, সেগুলোর আড়ালে যেন একের পর এক দরজা খুলতে শুরু করেছে।
“সেই রাতে একজন মানুষ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।”
বাবার কথাটা বারবার কানে বাজছে।
কে ছিল সেই মানুষ?
কী হয়েছিল সেই রাতে?
আর কেন আবরারও সেই রাতের সত্যিটা জানতে চাইছে?
ছোঁয়া নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল শিমুলগাছটা।
বিকেলের আলোয় গাছটা যেন আরও লাল হয়ে উঠেছে।
ছোঁয়া জানালার কাঁচে হাত রাখল।
“তুমি জানো, তাই না?”
তার নিজের কথাতেই সে থমকে গেল।
একটা গাছকে প্রশ্ন করছে সে!
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হলো, গাছটার সঙ্গে তার কোনো পুরোনো সম্পর্ক আছে।
হঠাৎ মাথার ভেতর একটা অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল।
অন্ধকার রাত।
বৃষ্টি।
সে কারও হাত ধরে দৌড়াচ্ছে।
কেউ তাকে বলছে,
“ছোঁয়া, ভয় পেয়ো না। আমি আছি।”
তারপর একটা বিকট শব্দ।
চিৎকার।
আর তারপর—
সব অন্ধকার।
ছোঁয়া হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।
শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
“আবরার...”
নামটা তার মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এল।
কেন?
সেই রাতের মানুষটা কি আবরার ছিল?
---
এদিকে খানবাড়ির পুরোনো স্টোররুমে বসে আবরার একটা কাঠের আলমারি খুলছিল।
বাবার কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে সে নিজেই পুরোনো কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করেছে।
বারো বছর আগের ঘটনা।
সেই সময় সে ছিল মাত্র বারো বছরের।
অনেক কিছুই তার মনে নেই।
তবে একটা জিনিস মনে আছে—
সেই রাত।
ভয়ংকর বৃষ্টি হয়েছিল।
আর তার পরদিন সকালেই তাকে শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু কেন?
সে একটা পুরোনো ফাইল বের করল।
ফাইলের ওপর লেখা—
“চৌধুরী–খান জমি সংক্রান্ত নথি।”
আবরারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
জমির বিরোধ?
তাহলে কি দুই পরিবারের দূরত্বের কারণ এটা?
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা পুরোনো খবরের কাগজের কাটা অংশ তার হাতে এল।
তারিখ দেখে আবরারের বুক ধক করে উঠল।
বারো বছর আগের সেই রাতের পরের দিন।
খবরের শিরোনাম—
“শিমুলতলীতে নিখোঁজ ব্যবসায়ী, দুই পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা।”
আবরার দ্রুত নিচের লেখা পড়তে লাগল।
নিখোঁজ ব্যক্তির নাম—
নাবিল চৌধুরী।
আবরার থমকে গেল।
নাবিল চৌধুরী?
এই নামটা সে কোথাও শুনেছে।
কিন্তু কোথায়?
ঠিক তখনই দরজা খুলে রাশেদ খান ঢুকলেন।
ছেলের হাতে খবরের কাগজ দেখে তিনি থেমে গেলেন।
“ওটা কোথায় পেলি?”
আবরার বাবার দিকে তাকাল।
“আপনি জানতেন?”
রাশেদ চুপ।
“নাবিল চৌধুরী কে?”
রাশেদ ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেললেন।
“ওসব পুরোনো কথা।”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“আবরার—”
“সেই রাতের সঙ্গে এই মানুষটার কী সম্পর্ক?”
রাশেদ এবার কঠিন স্বরে বললেন,
“তুই এসব নিয়ে মাথা ঘামাবি না।”
আবরার হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।
“আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত সবাই নিয়েছে। এখন অন্তত সত্যিটা জানার অধিকারটা আমার আছে।”
রাশেদ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“নাবিল চৌধুরী ছিল ছোঁয়ার চাচা।”
আবরারের চোখ বড় হয়ে গেল।
“ছোঁয়ার চাচা?”
“হ্যাঁ।”
“সে নিখোঁজ হয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে?”
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সেই রাতের পর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি।”
আবরার কিছুক্ষণ নীরব।
তারপর বলল,
“আর সবাই কেন ভাবল, এর সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক আছে?”
রাশেদ উত্তর দিলেন না।
আবরার এবার বুঝতে পারল—
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা এখনও তার বাবা লুকিয়ে রেখেছেন।
---
চৌধুরীবাড়িতে রাতের খাবারের পর ছোঁয়া বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।
ভেতর থেকে সামিউল আর নওশীনের কথা শোনা যাচ্ছিল।
“ওকে আর কতদিন আটকাবে?”
নওশীনের কণ্ঠ।
“যতদিন পারি।”
“সামিউল, ও যদি আবরারের কাছ থেকে সব শুনে ফেলে?”
“তাহলে আমাদের কিছু করার থাকবে না।”
ছোঁয়ার বুক কেঁপে উঠল।
সে দরজার কাছে আরও একটু এগিয়ে গেল।
সামিউল বললেন,
“নাবিলের ব্যাপারটা ও জানতে পারলে সব শেষ।”
ছোঁয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
নাবিল!
এই নামটা আজ প্রথমবার তার সামনে এলো।
কেন যেন নামটা শুনেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো।
নওশীন কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“কিন্তু আমরা তো জানি না নাবিল আসলে কোথায়।”
“জানি না।”
“তাহলে এত বছর ধরে নিজেদেরই দোষী মনে করে যাচ্ছ কেন?”
সামিউলের কণ্ঠ ভেঙে গেল।
“কারণ সেদিন রাতে আমি ওকে শেষবার দেখেছিলাম।”
ছোঁয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তারপর আর কিছু শোনার আগেই মেঝেতে তার পায়ের শব্দ হয়ে গেল।
ভেতরের কথা থেমে গেল।
ছোঁয়া দ্রুত সরে গিয়ে নিজের ঘরে চলে এল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়ল।
তার মাথায় এখন শুধু একটা নাম—
নাবিল চৌধুরী।
তার চাচা।
যে মানুষটাকে সে কোনোদিন মনে করতে পারেনি।
কেন?
সে কি এত ছোট ছিল যে সব ভুলে গেছে?
নাকি তাকে ইচ্ছে করেই কিছু ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
---
পরদিন সকালে ছোঁয়া কাউকে কিছু না বলে শিমুলতলার দিকে চলে গেল।
গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতেই তার চোখে পড়ল মাটির কাছে একটা ছোট্ট পাথরের নিচে কিছু একটা আটকে আছে।
কৌতূহলী হয়ে সে পাথরটা সরাল।
সেখানে একটা পুরোনো ধাতব বাক্স।
ছোঁয়া বাক্সটা তুলে নিল।
তালা নেই।
ভেতরে একটা শুকনো শিমুল ফুল, একটা ছোট্ট চাবি আর একটা কাগজ।
কাগজটা খুলতেই তার হাত কেঁপে উঠল।
লেখা—
“যদি কোনোদিন ছোঁয়া এই বাক্সটা খুঁজে পায়, তাকে বলবে—সত্যিটা শিমুলতলার পুরোনো বাড়িতে লুকিয়ে আছে।”
নিচে কোনো নাম নেই।
ছোঁয়া হতবাক হয়ে গেল।
পুরোনো বাড়ি?
শিমুলতলীর শেষ প্রান্তে বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত একটা বাড়ি আছে।
গ্রামের সবাই সেটাকে বলে নীলকুঠি।
শোনা যায়, বহু বছর আগে সেখানে ব্যবসায়ীরা থাকত। নাবিল চৌধুরীও নাকি একসময় সেখানে যেতেন।
ছোঁয়া বাক্সটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে আবরারের কণ্ঠ—
“তুমি একা এখানে কী করছ?”
ছোঁয়া ঘুরে তাকাল।
আবরার দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখ বাক্সটার দিকে গিয়ে থেমে গেল।
“এটা কোথায় পেয়েছ?”
“এই গাছটার নিচে।”
আবরার দ্রুত এগিয়ে এল।
কাগজটা হাতে নিয়ে পড়ল।
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“নীলকুঠি...”
ছোঁয়া বলল,
“তুমি জায়গাটা চেনো?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে নিয়ে যাবে?”
আবরার সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“না।”
ছোঁয়া অবাক।
“কেন?”
“জায়গাটা নিরাপদ নয়।”
“তবুও আমি যাব।”
“ছোঁয়া, এটা কোনো খেলা নয়।”
“আমার চাচার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য যদি সেখানে থাকে, তাহলে আমি যাব।”
আবরার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“তুমি বুঝতে পারছ না, তুমি কী করতে যাচ্ছ।”
ছোঁয়া চোখে চোখ রেখে বলল,
“আর তুমি বুঝতে পারছ না, বারো বছর ধরে আমার জীবন থেকে কী লুকানো হয়েছে।”
আবরার চুপ হয়ে গেল।
ছোঁয়ার চোখে তখন ভয় নেই।
শুধু সত্য জানার তীব্র ইচ্ছা।
আবরার ধীরে বলল,
“ঠিক আছে।”
ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকাল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। তবে একা যাবে না।”
“তুমি যাবে?”
আবরার মাথা নাড়ল।
“আমি তোমাকে একা যেতে দেব না।”
ছোঁয়ার চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা ফুটে উঠল।
“কেন?”
আবরার মৃদু স্বরে বলল,
“কারণ তোমাকে হারানোর ভয়টা আমি একবার পেয়েছি।”
একটু থেমে সে বলল,
“দ্বিতীয়বার সেই ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না।”
ছোঁয়া কিছু বলল না।
শুধু হাতে থাকা শুকনো শিমুল ফুলটার দিকে তাকাল।
দুজনেই জানত না—
নীলকুঠির ভেতরে তারা যে সত্য খুঁজতে যাচ্ছে, সেই সত্য শুধু নাবিল চৌধুরীর নিখোঁজ হওয়ার রহস্যই নয়।
সেখানে হয়তো লুকিয়ে আছে তাদের দুজনের ছোটবেলার সেই শেষ রাতের স্মৃতিও।
আর সেই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ—
যাকে সবাই মৃত ভেবেছিল।
কিন্তু সে হয়তো এখনও বেঁচে আছে।
শিমুলগাছের ডালে বসা পাখিটা হঠাৎ উড়ে গেল।
আর আবরার ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
“চলো। এবার সত্যিটাকে আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।”
ছোঁয়া মাথা নাড়ল।
তারপর দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল নীলকুঠির দিকে।
পেছনে পড়ে রইল লাল শিমুলফুলে ভরা সেই গাছ—
যে গাছটা তাদের ভালোবাসার প্রথম সাক্ষী ছিল।
আর সামনে অপেক্ষা করছিল এমন এক সত্য,
যা হয়তো তাদের আরও কাছে নিয়ে আসবে...
অথবা চিরদিনের জন্য আলাদা করে দেবে।
চলবে....
Page 2 / 2
Prev