আমি যখন ভয়ে ঢোক গিলছিলাম, ফুফু আস্তে করে সরে গিয়ে আমার জন্য ভাত নিয়ে এলো।
টেবিলে প্লেটটা রেখে বলল,
-এখানে খাবার রাখা আছে, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।
আমি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
তারপর আর কিছু না ভেবে খাবার খেতে বসে পড়লাম। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, এতো কিছু ভাবার সময় কই? আমি যে সারা দিনের অনাহারী।
খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম, খুব দ্রুত লোকমা মুখে দিচ্ছি।
হঠাৎ মনে পড়ল
মা থাকতে কত বলেও আমাকে এভাবে তাড়াতাড়ি খাওয়াতে পারত না।
ক্ষণিকের জন্য মনে একটা প্রশ্ন জাগল
-বড় হতে কি বয়স বাড়তে হয়?
নাকি মায়ের অনুপস্থিতিই একটা বাচ্চাকে হঠাৎ বড় করে দেয়, মানিয়ে নিতে শেখায়?
তবে কি মায়ের আদরের আঁচলে ঢাকা থাকে বলেই বাচ্চাদের ম্যাচিউর হতে এত সময় লাগে? মা হীন বাচৃচারা চোখের পলকে বেড়ে ওঠে
পরমুহূর্তেই আবার খাবারে মন দিলাম।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, ফুফুরা চলে গেছে।
কেন জানি সেদিন ঝুমুরের প্রতি একটু অভিমান জমেছিল। মনে মনে শপথ করেছিলাম
ওর সঙ্গে আর কোনো কথা নেই।
_________
চেয়ারে বসে আছে হাসনা।
তার হাঁটুর উপর মাথা রেখে অনেকক্ষণ ধরে মেঝেতে বসে আছে তনিমা।
অবশেষে বিনয়ী সুরে বলল
-আম্মাকে একটু বুঝাও না, মামিমনি। আমিও নাদিমকে ভালোবাসি। ও তো খারাপ ছেলে না, ভালো চাকরিও করে। তুমি একটু বুঝাও না…
হাসনা বেগম পরম আদরে তনিমার চুলে বিলি কাটছিলেন।
বিলি কাটতে কাটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
-তোর মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সুপারিশ করার মতো সাহস আমার নেই রে মা।
সে কখনোই রাজি হবে না। উল্টো ঝামেলা করবে, চিল্লাচিল্লি করে সারা বাড়ি মাথায় তুলবে…
তনিমার মুখটা ছোট হয়ে এল। চোখ ছলছল করছে।
-তাহলে কি আর কোনো উপায় নেই, মামিমনি?
-যে সংসারে তার নিজের ঠাঁই হয়নি, সে পরিবারে নিজের মেয়েকে পাঠাবে?
তা সে কখনোই চাইবে না।
জানিস তো
চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দই দেখলেও তো ভয় লাগে।
তনিমা আর কিছু ভাবতে পারল না। কান্নারত অবস্থায় ছুটে চলে গেল মামির ঘরে।
নিজের বলে আলাদা কোনো ঘর নেই তার। সে মায়ের সাথেই ঘুমায়।
কিন্তু সেই ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। মা সারাদিনই বকবক করেন। দেখলেই কোনো না কোনো বিষয়ে কথা শোনাবেন।
তাই বেশিরভাগ সময় মামির ঘরেই কাটায় তনিমা।
মামি মায়ের মতো বকাঝকা করেন না। নাম ধরেও ডাকেন না,
আদর করে মা ছাড়া কিছুই বলেন না।
তবে এর জন্য আবার মায়ের কাছে এক দফা বকা খেতে হয়।
মায়ের ঘরে গেলেই বলবেন
— কেন আসলি? এখানে তোর কী আছে? প্রয়োজন ছাড়া এ ঘরে আসবি না। আমি কে তের? তোর মা তো ঐটা
সারাদিন থাকার জন্য তো একটা ঘর পেয়েছিস। রাত হলেই আবার এখানে কেন আসিস? কী দরকার?
যা, এখন মামির আঁচলের নিচেই থাক।
তনিমা তখন কিছু বলে না।
চুপচাপ কান চেপে ঘুমিয়ে পড়ে। অভ্যাস হয়ে গেছে।
*
অনেকক্ষণ কান্না করার পর তনিমা মামির ফোন থেকে নাদিমকে কল করল।
নাদিম তখন অফিসের ফাইলে মুখ গুঁজে কাজ করছিল। কল আসতে দেখে সব ব্যস্ততা ফেলে রিসিভ করল।
— হ্যালো?
তনিমা কোনো কথা বলছে না। তার মন ভার।
নাদিমের বুঝতে বাকি রইল না।
মায়া মাখা কণ্ঠে ডাকল—
— তনি পাখি, কী হয়েছে?
তনিমা চুপ। আবার ফুপিয়ে কান্না আসছে
— এই তনি, একদম কাঁদবি না। কী হয়েছে বল আমায়।
— মামিমনি বলেছে, মা’কে রাজি করাতে পারবে না। এখন কী করব?
নাদিম হালকা হাসল।
— এই জন্য কাঁ*দছিস? বোকা মেয়ে. কাঁদিস না। রাতে আসছি আমি, কাজ শেষ করে।
তোর বর কি তোকে বলেনি এসব নিয়ে চিন্তা না করতে?
আমি বললাম না
সব ঠিক করে দেব।
মামি নিজেই তোকে আমার হাতে তুলে দেবে। আর কয়টা দিন শুধু…
— আচ্ছা…
— ঠিক আছে পাখি, এখন রাখছি। অনেক কাজ পড়ে আছে।
__________
অতীত
নতুন মা নিখোঁজ হলেন নির্বাচনের মাত্র দশ দিন আগে।
একদিকে ফুফার নির্বাচন, অন্যদিকে নতুন মাকে খোঁজাখুঁজি
সব মিলিয়ে পুরো পরিবারে হুলুস্থুল অবস্থা।
নতুন মায়ের সাথে বাবার মাত্র কয়েক মাসের সংসার।
সেটা ছেড়েই পালিয়ে গেলেন নতুন মা ।
যে বাসা থেকে তাকে বিয়ে করে আনা হয়েছিল, সেখানে খোঁজ নিয়েও বাবা ব্যর্থ হলেন।
জানতে পারলেন
নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন আগেই তার মা বাসা ছেড়ে চলে গেছেন।
নতুন মা আর তার মা ভাড়া বাসায় থাকতেন।
তার মা অসুস্থ ছিলেন, তাই তিনি কয়েকটা বাচ্চাকে টিউশনি করাতেন, যেমন আমাকেও।
কিন্তু বাবার সঙ্গে বিয়ের পর থেকে সব খরচ বাবাই চালাতেন।
তাহলে হঠাৎ করে সেই মহিলা একা একা বাসা ছাড়লেন কেন?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়,
তিনি নাকি নিজে কিছুই করেননি।
দুজন পুরুষ এসে সব মালামাল গাড়িতে তুলে দেয়, তারপর তাকেও বাসে উঠিয়ে দেয়।
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার
এই বিষয়ে নতুন মা বাবাকে কিছুই জানাননি।
এমনকি তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
ব্যাপারটা মোটেও কাকতালীয় নয়।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল, হয়তো নতুন মা কোনো বিপদে পড়েছেন।
কিন্তু যখন জানা গেল তার মা দুই দিন আগেই বাসা ছেড়ে গেছে, তখন আর কারও বুঝতে বাকি রইল না
-সবই ছিল নতুন মায়ের পূর্বপরিকল্পিত কাজ।
বাবা হতাশ হয়ে ঘরে পড়ে রইলেন।
কী করবেন, কোন দিক যাবেন
কিছুই বুঝতে পারছিলেন না।
কারণ শুধু নতুন মা নিখোঁজ নন,
তার সঙ্গে বাবার অফিসের পাঁচ লক্ষ টাকাও আলমারি থেকে উধাও।
এমন সময়ে ফুফুরাও আসেনি।
ছোট ফুফুর অজুহাত
"ফুফা নির্বাচন প্রার্থী। বাড়িতে সারাদিন কাজ, শত মানুষের আসা–যাওয়া। তাই তার পক্ষে আসা সম্ভব নয়।
বাবা প্রায় পা"গলের মতো হয়ে গেলেন।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলেন
" চট্টগ্রাম যাবেন।
নতুন মা বলেছিলেন, চট্টগ্রামই তাদের জন্মস্থান।
সেখানে গিয়ে শেষবারের মতো খুঁজে দেখবেন।
হয়তো সেখানেই তাকে পাওয়া যেতে পারে।
চলবে ইনশাআল্লাহ…