শীতের এক স্নিগ্ধ ও কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। ভোরের মিষ্টি আলো তখনও অন্ধকার ঘেরা ঘরটিতে ঠিকমতো পৌঁছায়নি , চারপাশটা কেমন যেন এক রহস্যময় ছায়ায় ঢাকা। ঠিক এই নিরব ও শান্ত পরিবেশের মাঝে ঘরটিতে ফুল ভলিউমে বাজছে আলেকজান্ডার রাইব্যাকের গান "Fairytale"—
"I'm love with a Fairytale
even though it hurts
cause I don't care
if I lose my mind
I'm already cursed"
🎶🎶🎶🎶🎶
🎶🎶🎶🎶🎶
সেই সুরের আবেশে সম্পূর্ণ বুঁদ হয়ে বিছানায় আধশোয়া তেহজিব। শীতের হালকা আমেজে নিজের মতো করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। চোখে ঘুমের রেশ, বাহ্যিক জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই গভীর ঘুমের ভেতরেও অবচেতন মন যেন সুরের সাথে ঠিকই তাল মিলিয়ে চলেছে; ঘুমের ঘোরেই বুঁদ হয়ে তেহজিব গেয়ে চলেছে সেই পরিচিত টিউনের গুনগুন সুর।
গানটা এতই জোরে বাজছিল যে হঠাৎ করেই তেহজিবের ঘরের দরজায় প্রবল শব্দে বাড়ি পড়ার আওয়াজ শোনা গেল। একটা রাগী অথচ বেশ চেনা মেয়েলি কণ্ঠে বারবার ভেসে আসছে— "তেহজিব! তেহজিব!"
গানটার আওয়াজ আর বাইরে থেকে অনবরত দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে অবশেষে ঘুম ভাঙল তেহজিবের। কিন্তু তেহজিবের মধ্যে কোনো তাড়া নেই। একদম পরোয়া না করা এক নির্বিকার ভঙ্গি নিয়ে, চরম আরামে শরীরটা একটু এলিয়ে দিয়ে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে বিছানা ছাড়ল সে। তারপর ধীরেসুস্থে হেঁটে গিয়ে অবশেষে খুলে দিল ঘরের দরজা। দরজা খোলার পর তেহজিব দরজার সাথে হেলান দিয়ে নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল। আচ্ছন্ন ভাবটা তখনও কাটেনি, তাই চোখ বন্ধ রেখেই কিছুটা বিরক্তি আর উদাসীন সুরে বলে উঠল—"কী হয়েছে, সকাল সকাল চিল্লাচ্ছো কেন?"
"তেহজিবের কথায় এবার আরও রাগী মেয়েলি সুরে অপাশ থেকে উত্তর এল—" "প্রতিদিন সকালে অ্যালার্মের নামে এই সাউন্ড বাজিয়ে রাখিস, তুই তো ঘুম থেকে উঠিস না, কিন্তু বাড়ির সবার মাথাটা সকাল সকাল ব্যথা হয়ে যায়!"
তেহজিব বিরক্তিতে চ শব্দ করে বলল, "ভাই! যাও তো এখন, রেডি হব!"
-"আমি তোর ভাই না, মা লাগি! মুখে ভাষা ঠিক কর, তেহজিব!"
তেহজিব মুখটা পাংশুটে করে নিজের দুই হাত জোড় করে মুখের সামনে ধরে বলল, "ক্ষমা!"
তেহজিব নিজের মায়ের মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিল আর ক্লোজেট থেকে একটা ব্ল্যাক হুডি আর ব্ল্যাক ব্যাগি নিল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলাল। পরনে অফহোয়াইট রঙের টি-শার্ট আর গ্রে রঙের প্লাজো, চুলগুলো খোপা করা।
তেহজিব আফসোসের সুরে বলল - "একটা জামাই থাকলে এখন এভাবে বকা খেতে হতো না! দুই জন মিলে এই সোং বাজিয়ে ঘুম থেকে উঠতাম। "বেচারা কই আছে, কে জানে! এখনো আমার জীবনে এন্ট্রি নিচ্ছে না কেন?"
তেহজিব গোসলে চলে গেল।
শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে নিরিবিলি এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন দোতলা এই ডুপ্লেক্স বাড়ি— "নিহারিকা কুঞ্জ"। আধুনিক স্থাপত্যরীতির সাথে আভিজাত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এই বাড়িটিতে।
বাইরে থেকে দেখলেই চোখে পড়ে বাড়িটির বড় বড় গ্লাস উইন্ডোজ বা কাঁচের জানালাগুলো, যা দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ সরাসরি ড্রয়িংরুমে এসে পড়ে। বাড়ির সামনে রয়েছে ছোট্ট এক টুকরো বাগান, যেখানে সাজানো রয়েছে নানা রঙের ফুলের গাছ আর সবুজ ঘাসের লন। বাগানের একপাশে একটি ছোট পাথরের ফাউন্টেন থেকে হালকা পানির শব্দ চারপাশের পরিবেশকে আরও স্নিগ্ধ করে তোলে।
বাড়ির মূল দরজায় পা রাখতেই চোখে পড়ে প্রশস্ত ও খোলামেলা ড্রয়িংরুম। নিচতলার পুরোটাই ওপেন-প্ল্যান কনসেপ্টে তৈরি; অর্থাৎ ড্রয়িংরুম, ডাইনিং স্পেস আর আধুনিক কিচেনটি এমনভাবে সংযুক্ত যা বাড়িটিকে আরও বড় ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রিমিয়াম হোয়াইট মার্বেল টাইলস, যা সবসময় পরিচ্ছন্ন ও চকচকে থাকে।
ড্রয়িংরুম ম ম করছে তেহজিবের মায়ের বানানো চায়ের ঘ্রাণে। তেহজিব সিঁড়ি দিয়ে নেমে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ঘ্রাণটা নিয়ে বমি করার মতো করল। চা খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা এমন নয়; তেহজিব চা বা কফি যাই হোক দুটোই পছন্দ করে না, যার কারণে চায়ের ঘ্রাণ পেলেই এমন বিদ্রূপ প্রতিক্রিয়া করে।
তেহজিবের মুখ বাঁকা করাটা তেহজিবের বাবা দেখে হেসে ফেললেন আর বললেন, "মামণি, খেয়ে দেখো একবার তোমার মায়ের হাতের চা—জীবনেও এই স্বাদ ভুলবে না!"
তেহজিব সাথে সাথে বলল, "তোমার বউয়ের বানানো চা তুমি খাও, ওইসব ঢলঢলে পানি আমি খাই না। স্মেল—ওয়াক থু! আবার আমার লিপস কালো হয়ে যাবে।"
তেহজিবের মা কিচেন থেকেই তেহজিবের উদ্দেশে বললেন, "তোর খাওয়া লাগবে না চা, অন্য কিছু মুখে দিয়ে যা। না খেয়ে সকাল সকাল বের হওয়া ভালো না।"
তেহজিব বলল - "আমি কিনে খেয়ে নেব পরে, এখন ভালো লাগছে না।"
তেহজিবের বাবা তেহজিবকে ৫০০ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। তেহজিব তা নিয়ে বলল, "আজকে রাতে ফিরতে দেরি হবে।"
এটা বলেই তেহজিব এক ছুট লাগাল বাইরে, যেন কেউ তাকে বাইরে যেতে দেবে না, বাধা দেবে।
তেহজিবের মা কিচেন থেকে বের হয়ে দেখলেন তেহজিব চলে গেছে। তেহজিবের মা তেহজিবের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, "এবার যদি ওর কিছু হয়, আমি তোমায় আর ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেব!"
তেহজিবের বাবা বললেন, "বয়সে একটু থ্রিল থাকতেই হবে, জীবনে কিছু হবে না, আমি জানি! সববারের মতো এইবারও আমার মেয়েই জিতবে, কারণ ওকে বাইক চালানো আমি শিখিয়েছি। দেখতে হবে না ওর টিচার কে!"
বাইরে এসে তেহজিব সোজা নিজের বাইকটার দিকে এগিয়ে গেল। হুডির পকেট থেকে চাবি বের করে ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই একটা জোরালো গর্জন তুলে কেঁপে উঠল বাইকটা। নিহারিকা কুঞ্জ পিছনে ফেলে কুয়াশায় মোড়ানো পিচ্ছিল পিচঢালা পথ ধরে বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল তেহজিব। রাস্তার দুপাশের গাছপালাগুলো চোখের পলকে পেছনে হারিয়ে যেতে লাগল, আর মনে এক অজানা রোমাঞ্চ নিয়ে তেহজিব হারিয়ে গেল সকালের কুয়াশার চাদরে। বাইকের গতি বাড়িয়ে কুয়াশার চাদর ভেদ করে সামনে এগিয়ে চলল তেহজিব। রাস্তার দুপাশে থাকা ঘন কুয়াশার আবছায়া কাটিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলার সাথে সাথে বাতাসের তীব্র শীতলতা ছুঁয়ে যাচ্ছিল তেহজিবের হুডির ওপরের অংশ। মন তখন এক অজানা রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ভরপুর।
কুয়াশার কারণে সামনে না দেখেই তেহজিবের বাইক গিয়ে লাগল একটা ছেলের বাইকের সাথে। মুহূর্তের মধ্যে বিকট একটা শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, আর তেহজিব ছিটকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু তেহজিব বাইক সামলে নিল, এর থেকেও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তার আছে। দুই জনেই বাইক সামলে বাইক থামালো। তেহজিব নিজের হেলমেটের গ্লাস ওঠালো কী হচ্ছে তা ভালোভাবে দেখার জন্য।ছেলেটা নিজের হেলমেট খুলে তেহজিবের দিকে তাকালো। তেহজিব ছেলেটাকে দেখেই চিনতে পারল ছেলেটা তেহজিবের ভার্সিটির সিনিয়র ভাই, আবার তেহজিবের এলাকারই।
তেহজিব কিছু বলার আগেই ছেলেটা ধমকের সুরে বলা শুরু করল—"চোখ কোথায় থাকে আপনার? সমস্যা কী? দেখতে পান না নাকি? কোনদিকে তাকিয়ে বাইক চালান?"
তেহজিব এবার চোখের পলকে হেলমেটটা আরও একটু উপরে ঠেলে দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকাল। গলায় বিন্দুমাত্র ভয় বা অনুশোচনার লেশমাত্র নেই, বরং এক চিলতে ঔদ্ধত্য ফুটিয়ে পাল্টা জবাব দিল—"আপনার মতো ফালতু রাইডাররা রোডের মাঝখানে এসে পোজ দিয়ে দাঁড়ালে তো এমন হওয়াই স্বাভাবিক! আগে নিজের বাইক কন্ট্রোল করা শিখুন, তারপর এসে জ্ঞান দেবেন!"
ছেলেটা বলল-"পোজ দিচ্ছিলাম না, একটা ব্লগের শ্যুট করছিলাম!"
তেহজিব ভুরু কুঁচকে, বিন্দুমাত্র নমনীয় না হয়ে উল্টো কড়া গলায় জবাব দিল— আমার দোষ কোথায়? আমি তো কুয়াশার কারণে কিছুই দেখি নাই!আর বাইক চালানো একদম শিখাতে আসবেন না আমি তেহজিব নূর ঢাকার ওয়ান অব দ্য বেস্ট রাইডারদের তালিকায় আমি সেকেন্ড পজিশনে আছি!
ছেলেটা একটু হেসে বলল, "ও আচ্ছা! আমি তোমায় চিনতে পারি নি, তেহজিব। হেলমেট পরে আছো হয়তো তাই। কিন্তু তুমি আমায় কেন চিনলে না, তা বুঝতে পারছি না।"
তেহজিব এবার হেলমেট খুলে হালকা হেসে বলল—"ফার্স্ট এই চিনতে পেরেছি, কিন্তু আপনি কথা শোনাচ্ছিলেন, তাই আমি কথার রিপ্লাই করছিলাম!"
ছেলেটা আর রাগ না করে এবার বেশ মজার সুরেই বলে উঠল—"আচ্ছা বাবা, বুঝেছি! আর তোমার সাথে পেড়ে ওঠা আমার দ্বারা সম্ভব না। তা এত সকালে কই যাওয়া হচ্ছিল তোমার?"
তেহজিব একটু আড়চোখে ঘড়ি দেখে গম্ভীর গলায় জবাব দিল- ভার্সিটিতে যাচ্ছি। এমনিতেই কুয়াশার কারণে জ্যামে পড়ে লেট হয়ে গেছে, আর আপনার সাথে বকবক করে আরও সময় নষ্ট করতে ইচ্ছা করছে না!"
তেহজিব আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। নিজের বাইকের থ্রটল ঘুরিয়ে সেও সোজা ভার্সিটির রাস্তার দিকে ছুটল। ঘন কুয়াশা আর সকালের হালকা হিমেল হাওয়া ভেদ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এসে পৌঁছাল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (NSU)-এর চত্বরে। বাইকটা পার্কিংয়ে রেখে হেলমেটটা হাতে নিয়ে কাঁধে ঝোলাল সে। চুলগুলো একবার ঠিক করে নর্থ গেট দিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ল—ক্যান্টিনের সামনের বেঞ্চে বসে দিব্যি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে তার বন্ধু শিফা আর মাহি!
শিফা আর মাহির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তেহজিব বিরক্ত মুখে ক্যান্টিনের চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে নাক সিটকালো। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল—এইসব ঢলঢলে পানি না খেলে কি তোদের চলে না রে?"
শিফা তেহজিবের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল—তোর মতো না আমরা! তুই কোন গ্রহের প্রাণী , তুই-ই জানিস!"
তেহজিব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে হেলমেটটা খুলে ক্যান্টিনের টেবিলে রাখল। তারপর কাউন্টার থেকে একটা কোন আইসক্রিম হাতে নিয়ে এসে দিব্যি ওদের সাথে বেঞ্চে বসল। আইসক্রিমের মোড়কটা খুলতে খুলতে সে মাহি আর শিফার দিকে তাকিয়ে বলল—"তোরা তোদের ঢলঢলে পানি খা, আমি আমার শান্তির জিনিস খাই!"
মাহি আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল—হেঁ! এই শীতের মধ্যে আমরা তোর মতো আইসক্রিম খেতে পারব না, তুই-ই খা!"
তেহজিব আইসক্রিমে এক কামড় বসাতে বসাতে তৃপ্তির সুরে বলে উঠল—"আজকের দিনটা আমার সেই ভালো কাটবে!"
মাহি ভুরু বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল—কী রে, দুলাভাইয়ের দেখা পেয়েছিস নাকি?"
তেহজিব চোখ পাকিয়ে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল—"শুধু দেখাই পাই নি, বকেও এসেছি!"
মাহি চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বলল—তোক কিছু বলে নি ভাইয়া ?ভাইয়াতো অনেক রাগী! আর তোর না ক্রাশ? তুই আবার বকা দিলি কীভাবে?"
তেহজিব একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে আইসক্রিম খাওয়ার মায়াবী মনযোগে ফিরে গেল।