পুরো সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শহরের ব্যস্ততা আগের তুলনায় একটু কমলেও চারপাশ এখনো আলোয় ঝলমলে। রাস্তার দুই পাশে দোকানগুলোর আলো এখনো জ্বলছে। কোথাও চায়ের দোকানে আড্ডা, কোথাও ফুচকার দোকানের সামনে ভিড়।
গরম অনেকটাই কমে গেছে। বাতাসে এখন একটা শান্ত ঠান্ডা ভাব।
রিক্তা চোখের চশমা খুলে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। তারপর পুনরায় চশমা পরে নেয়। মিনিট কয়েক পর রিকশা আহমেদ বাড়ির সামনে এসে থামে।
হাঁটুর উপর থেকে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রিক্তা নেমে ভাড়া দেয়। রিকশাওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে যায়।
রিক্তা এগিয়ে যায় বাড়ির বড় গেইটের কাছে। গেইটের ছোট দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যায়। তারপর এগিয়ে যায় বাড়ির মধ্যে। জুতা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে।
ভিতরে ঢুকে দেখে সবাই সোফায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। রিক্তা কাঁধের ব্যাগটা সোফায় রেখে সৈয়দ আহমেদের পাশে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে।
সোহেল আহমেদ জিজ্ঞেস করে„“আজ এত দেরি কেন?”
রিক্তা সোজা হয়ে বসে উত্তর দেয়„“আরশিদের সাথে একটু গ্রুপ স্টাডি করেছি।”
সৈয়দ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন„“দোয়া করি মা, বড় হয়ে একজন ল’ইয়ার হও।”
রিক্তা বাবার কথার জবাবে বলে„“আপনার ইচ্ছে কি?”
„“আমার ইচ্ছে আমার মেয়ে একদিন ল’ইয়ার্স গাউন পরে, হাতে ফাইল থাকবে, তার নামের পাশে লেখা থাকবে অ্যাডভোকেট। যখন সবাই বলবে অ্যাডভোকেট আদিবা আহমেদ রিক্তা। গর্বে তখন বুক ভরে যাবে আর এটাই আমার ইচ্ছে।”
কথা শেষ করে সৈয়দ আহমেদ বুক ভরে শ্বাস নেন।
সোহেল আহমেদ জিজ্ঞেস করেন„“পারবে তোমার আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করতে?”
রিক্তা মলিন হেসে বলে„“আমার জীবন দিয়ে হলেও আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করবো।”
„“কে কিসের স্বপ্ন পূরণ করছে শুনি?”
রাহাদের কণ্ঠে সবাই পিছন ফিরে তাকায়। রাহাদ দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে„“কে কার স্বপ্ন পূরণ করছে?”
রাহাদ ভিতরে এসে সোফায় বসে।
রিতু চিপস খেতে খেতে বলে„“রিক্তা আপু ছোট আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করবে।”
„“কি স্বপ্ন?”
„“আপুর নামের আগে অ্যাডভোকেট হবে—সেটাই।”
রাহাদ অবিশ্বাসী চোখে সৈয়দ আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলেন„“ছোট আব্বু, তোমার ইচ্ছে বোনুকে ল’ইয়ার বানানো?”
রাহাদের কথায় সৈয়দ আহমেদ হালকা হেসে বলেন„“হ্যাঁ। আমি চাই আমার মেয়ে একজন ভালো ল’ইয়ার হোক।”
রাহাদ কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ রিক্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলে„“মন্দ না। আমাদের বোনু কোর্টে দাঁড়িয়ে সবার সামনে কথা বলবে—আহা, কী ফিলিংস!”
রিতু সাথে সাথে বলে উঠে„“হ্যাঁ! আপু তো এখন থেকেই অনেক বকবক করে।”
রিক্তা চোখ ছোট করে রিতুর দিকে তাকায়„“তুই আর একবার বল তো কথাটা।”
রিতু সাথে সাথে চিপস মুখে ঢুকিয়ে নিরীহ মুখ করে বসে পড়ে।
সোহেল আহমেদ হেসে বলেন„“আসলে রিক্তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে। কথা গুছিয়ে বলতে পারে। তাই সৈয়দের এমন ইচ্ছে হওয়াটাও স্বাভাবিক।”
সৈয়দ আহমেদ শান্ত গলায় বলেন„“আমি চাই আমার মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াক। মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে চলুক।”
রিক্তা বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। তার চোখে তখন অন্যরকম কোমলতা।
রাহাদ সোফায় হেলান দিয়ে বলে„“তা বোনু, তখন কিন্তু আমাদর কোনো কেস হলে ফ্রি-তে লড়বি।”
রিক্তা ভ্রু তুলে বলে„“তোমার কেস কেন হবে শুনি?”
রাহাদ হালকা চোখ টিপে বলে„“সময় বলে দেবে।”
রিক্তা জহুরি দৃষ্টিতে রাহাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
রাহাদ আর কিছু না বলে কোর্ট নিয়ে উপরে চলে যায়। রিক্তা কিছুটা সন্দেহ করে, কিন্তু প্রকাশ করে না।
ডাইনিং রুম থেকে মনিরা আহমেদের কণ্ঠ ভেসে আসে„“টেবিলে খাবার সাজানো হয়েছে, খেতে এসো।”
রিক্তা ব্যাগ নিয়ে উপরে চলে যায় ফ্রেশ হতে, আর বাকিরা টেবিলে বসে।
রিক্তা রুমে গিয়ে ব্যাগ টেবিলে রেখে ফোন চার্জে দেয়। ড্রয়ার থেকে একটা থ্রি-পিস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। মিনিটখানেক পর রিক্তা বের হয়।
রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে একটু ক্রিম লাগিয়ে নেয়। তারপর নিচে চলে আসে।
রিক্তা একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। মনিরা আহমেদ খাবার দিতে থাকেন।
সোহেল আহমেদ খেতে খেতে রাহাদকে জিজ্ঞেস করে„“আজ এত তাড়াতাড়ি আসলে?”
রাহাদ মুখের খাবার শেষ করে বলে„“আজ কোনো কাজ ছিল না, তাই তাড়াতাড়ি আসলাম।”
„“যাক, ভালোই হয়েছে।”
সবাই নীরবে খাবার খায়। খাবার শেষে সবাই উঠে যে যার রুমে চলে যায়। শুধু নিচে থেকে যায় মনিরা আহমেদ, সানজিদা আহমেদ এবং সাথী। তারা খাবার গুছিয়ে পরে রুমে যাবে।
রিক্তা রুমে এসে দেখে বিছানায় শুয়ে রিতু তার ফোনে স্ক্রল করছে।
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে„“পড়া নেই?”
„“না আপু, স্যার সব পড়িয়ে গেছে।”
রিক্তা কিছু বলে না। গিয়ে টেবিলের চেয়ারে বসে। ল্যাম্পলাইট অন করে নেয়। চশমা চোখে দিয়ে পড়তে থাকে।
রুমে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
শুধু টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো আর পাতা উল্টানোর শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
রিক্তা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। চশমার কাঁচে লাইটের হালকা প্রতিফলন পড়ছে। মাঝে মাঝে সে কলম দিয়ে নোট করছে।
বিছানায় শুয়ে থাকা রিতু উঠে গিয়ে ফোন চার্জে রেখে রিক্তাকে দেখে বলে„“আপু, তুমি কি সারারাত পড়বা?”
রিক্তা চোখ না তুলেই বলে„“হুম, তুই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
রিতু হাই তুলতে তুলতে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে কাঁথা দিয়ে ঢেকে কিছুক্ষণ পর আবার ফিসফিস করে বলে„“আপু… বেশি পড়লে পাগল হয়ে যাবে।”
রিক্তা এবার কলম রেখে একটু পাশে তাকায়। দেখে রিতু শুয়ে পড়েছে।
„“তুই ঘুমা।”
রিতু আর কিছু বলে না। এবার সত্যিই চুপ হয়ে যায়।
রুমে আবার নীরবতা ফিরে আসে।
বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা একটু নড়ে উঠছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।
রিক্তা আবার পড়ায় মনোযোগ দেয়। হঠাৎ করেই টেবিলের উপর রাখা ফোনটা হালকা ভাইব্রেট করে উঠে।
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে একপলক ফোনের দিকে তাকায়।
এত রাতে সাধারণত কেউ তাকে মেসেজ দেয় না।
সে ধীরে ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে উঠে অচেনা একটা আইডি।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর ধীরে মেসেজটা ওপেন করে।
— “মায়াবিনী এখনো জেগে?”
রিক্তার চোখের পাতা কেঁপে উঠে।
আবারও সেই নাম। “মায়াবিনী…”
ওই দিন রাগের জন্যই ফোন ভেঙেছে, আবার সেই মেসেজ করছে।
রিক্তা বিরক্ত হয়ে টাইপ করে—
— “আপনার সমস্যা কি?”
ওপাশ থেকে সাথে সাথেই রিপ্লাই আসে—
— “এত রাগ তোমার? যার জন্য ফোনটাই ভেঙে ফেলেছো?”
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে আবার টাইপ করে—
— “আপনি জানলেন কি করে? আমি ফোন ভেঙেছি?”
কয়েক সেকেন্ড সিন হয় না। তারপর রিপ্লাই আসে—
— “বললাম না, আমি খুব কাছের কেউ তোমার।”
— “কাছের না ছাই। আপনি বলেন কাছের, বাট কখনো দেখিনি আপনাকে।”
— “যদি বলি দেখেছো?”
— “দেখি নি। আমি জানি।”
— “আর মাত্র কিছু মাস, তারপর তোমার সামনে আসবো মায়াবিনী… মায়াবীলতা।”
রিক্তা আর রিপ্লাই দেয় না। সে দ্রুত ফোনটা টেবিলে রেখে দেয়। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
„“আজব লোক একটা…”
খুব আস্তে করে বিড়বিড় করে সে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার নিজেই ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে এখনো সেই চ্যাট খোলা।
রিক্তা ঠোঁট ফুলিয়ে টাইপ করে—
— “আপনি কি সবাইকে এমন বিরক্ত করেন?”
ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসে—
— “সবাইকে বিরক্ত করার প্রয়োজন মনে করি না।”
রিক্তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠে। সে দ্রুত সেটা চাপা দেয়।
— “আমাকে কেন?”
— “কারণ তুমি আমার।”
রিক্তার বুকের ভিতর আবারও কেমন যেন করে উঠে। সে কিছুক্ষণ কোনো রিপ্লাই দেয় না।
বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা নড়ে উঠে।
রুমের নীরবতার মাঝে ফোনের আলোটা আরো উজ্জ্বল লাগছে।
ঠিক তখনই আবার মেসেজ আসে—
— “এত চুপ কেন মায়াবিনী… মায়াবীলতা?”
রিক্তা টাইপ করে না, শুধু ভাবছে। সামনে বই খোলা, হাতে কলম, চুলগুলো এলোমেলো, চোখে চশমা আর মাথার মধ্যে সেই অচেনা আইডির ব্যক্তির পরিচয় মিলানো।
আবার ওপাশ থেকে মেসেজের শব্দ রিক্তার ধ্যান ভাঙে
— “আমার কথা ভাবছো মায়াবীলতা?”
রিক্তা এবার বিস্ময় নিয়ে রিপ্লাই দেয়—
— “আপনি কি ভাবে জানলেন? আপনি তো মহা মনপড়া। না দেখেই মন পড়তে পারেন?”
— “তুমি খুবই নাদান। একজনকে না দেখেই কি কেউ কিছু বলতে পারে?”
— “তাহলে আপনি আমাকে দেখছেন কিভাবে?”
— “আমি তোমার সম্পর্কে বলবো?”
— “বলেন দেখি।”
— “তুমি এখন পড়ার টেবিলে, চুলগুলো এলোমেলো, চোখে চশমা, হাতে কলম এবং চিকন ব্রেসলেট, তার মাঝে S লেখা। গলায় সেম একটা নেকলেস, তার মাঝেও S। সামনে বই, পুরো রুম অন্ধকার, শুধু তোমার টেবিলে ল্যাম্পলাইট আর বারান্দায় লাইট। আমি যা কিছু বললাম সব কি সত্যি?”
রিক্তার এবার জ্ঞান হারানোর অবস্থা হয়ে গেছে।
রিক্তা দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকায়, কিন্তু চারপাশে কিছুই নেই। আবার হতাশ হয়ে রুমে ফিরে আসে। পাশে তাকিয়ে সব বুঝার চেষ্টা করে, কিন্তু সন্দেহের কিছুই পায় না।
হতাশ হয়ে টেবিলে বসে ফোনের দিকে তাকায়। দেখে লোকটা মেসেজ করেছে—
— “আমাকে খুঁজছো মায়াবিনী… মায়াবীলতা? আরে বোকা, এত তাড়া কেন? আমি তোমার মধ্যেই আছি। তাই শুধু শুধু খুঁজে হয়রান হয়ো না।”
— “কিন্তু আপনি কোথা থেকে দেখছেন আমাকে?”
— “সময় হলে সব বলবো। এখন পড়ো। আর হ্যাঁ, বেশি পড়ো না, তাহলে ব্রেইনে প্রবলেম হবে। গুড নাইট মায়াবিনী… মায়াবীলতা।”
এই মেসেজ দিয়ে লোকটি অফলাইনে চলে যায়।
মেসেজটুকু পড়ে রিক্তা হতাশ হয়ে ফোন রেখে বইয়ের দিকে তাকায়।
কিন্তু কয়েক লাইন পড়ার পরও মন বসে না।
বারবার চোখ ফোনের দিকে চলে যাচ্ছে।
বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফোন নিয়ে বিছানার কাছে এগিয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে পাশের টেবিলে চশমা আর ফোন রেখে সব লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে।
বাইরে তখন গভীর রাত নেমে এসেছে। চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা। দূরের রাস্তার লাইটের হলুদ আলো জানালার কাঁচে এসে হালকা প্রতিফলন তৈরি করছে।
খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ভিতরে ঢুকছে।
বাতাসে রাতের স্নিগ্ধ গন্ধ মিশে আছে।
জানালার পাশে রাখা পাতাবাহার গাছের পাতাগুলো হালকা দুলছে।
দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে কোনো গাড়ি রাস্তা দিয়ে চলে গেলে তার আলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য রুমের দেয়ালে পড়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
আকাশে আধখানা চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে। চাঁদের আবছা আলো বারান্দার গ্রিলে পড়ে নরম ছায়া তৈরি করেছে।
চলবে....