হাত-মুখে পানি, শরীরে ওড়না নেই। তাড়াহুড়ো করে ওড়নাটা রুমে ফেলেই ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিল। চোখে-মুখে এখনো পানির ফোঁটা।
শিখা রুমের মধ্যে আসতেই একবার চোখে পড়ে রাহাদ টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেটা সে পাত্তা দেয়নি, মনের ভ্রম ভেবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সামনে তাকিয়ে রাহাদকে দেখে চমকে উঠে অন্য দিকে ঘুরে যায়।
রাহাদও অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
শিখা নিজেকে দুই হাতে আড়াআড়ি করে অন্য পাশ ফিরে বলে„“ আপনি এখানে কেনো? "
রাহাদ থতমত খেয়ে বলে„“ সরি, সরি। আমি বুঝতে পারিনি। "
শিখার এখন কথা বলতেই লজ্জা লাগছে। কী একটা পরিস্থিতি! এখন যদি কেউ এসে পড়ে তাহলে নিশ্চিত অন্য কিছু ভেবে বসবে।
রাহাদ খাটের উপর থেকে ওড়না নিয়ে এক পা দুপা করে এগোতে থাকে।
শিখা এবার খুব ভয় পেয়ে যায়। সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে„“ কি... কি করছেন? "
রাহাদ এক হাত দিয়ে আলতো করে শিখাকে নিজের দিকে ঘুরায়। শিখার হাত-পা কাঁপছে। লজ্জায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। তার মনে হচ্ছে এখনই হয়তো বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটা বের হয়ে আসবে। কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। কিন্তু আশ্চর্য, কিছুই হয় না। বরং মাথার উপর নরম একটা স্পর্শ অনুভব করে সে।
শিখা ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়।
দেখে রাহাদ চোখ বন্ধ করে খুব যত্ন করে তার মাথায় ওড়না পরিয়ে দিচ্ছে।
রাহাদ শিখার মাথায় ওড়না পরিয়ে দিতে থাকে।
ওড়নাটা ঠিক করে কাঁধের উপর গুছিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে„“ এমন একটা সময় আসবে, তখন ওড়না আমিই পরাবো, আমিই খুলবো। "
লজ্জায় তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। নিজেকে সামলে বলে““ মানে? "
রাহাদ অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলে„“ কিছু না। "
রাহাদ কিছুটা সরে দাঁড়িয়ে চোখ খুলে বলে„“ আসলে আমি দরজা নক করেছিলাম। হয়তো তুমি শুনতে পাওনি। আমি ভেবেছিলাম রুমে কেউ নেই। "
„“ তখন আমি ওয়াশরুমে ছিলাম। "
„“ হয়তো বা। "
রাহাদ রুম থেকে বের হতে পা বাড়ায়।পিছন ফিরে তাকিয়ে চশমিসকে পরখ করে নেয়।
শিখা ভ্রু কুঁচকে বলে““ কি? "
রাহাদ মাথা নাড়িয়ে বলে„“ কিছু না। টেবিলের উপর তোমার গিফট। "
এই বলে রাহাদ চলে যায়।
শিখা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।টেবিলের ওপর ছোট একটা প্যাকেট রাখা।
শিখা প্যাকেট নিয়ে বিছানায় বসে পড়ে।
শিখা হাত বাড়িয়ে প্যাকেট থেকে বের করে সাদা রঙের একটা গাউন। পাশে ছোট একটা বক্স, দুটো লাল গোলাপ এবং পাশে একটা ছোট চিরকুট পড়ে।
শিখা হাত বাড়িয়ে চিরকুটটা হাতে নিয়ে রাহাদের ছোট ছোট হাতের লেখা চিরকুট টা পড়তে শুরু করে„“ চশমিস,
সুপ্ত নীলিমায় উড়ুক মলিন, নিস্তব্ধ ক্ষুধাবিক্ষিপ্ত বেদনা-বিষাদ।
কিছু বিকেল রয়ে যায় স্মৃতির পাতায়, কিছু মানুষ রয়ে যায় মনের জানালায়, আর কিছু অনুভূতি রয়ে যায় নীরবতায়।
সবকিছুর উত্তর খুঁজতে নেই। কিছু প্রশ্ন সুন্দর, কারণ তারা উত্তরহীন।
~ রাহাদ
চিরকুটটা পড়ে কেমন যেন এক অনুভূতির জন্ম হয়। এমন অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। মুখের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে ওঠে। সে আবারও চিরকুটটা পড়ে।
তারপর গোলাপ দুটো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।কেন জানি আজ গোলাপ দুটোকে খুব নিজের মনে হচ্ছে।ছোট্ট বক্সটা খুলে দেখে ভেতরে একটা সুন্দর রুপালি ব্রেসলেট।ব্রেসলেটটার মাঝখানে ছোট্ট করে লেখা"চশমিস"
লেখাটা দেখেই শিখার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গভীর হয়ে যায়।সে আলতো করে ব্রেসলেটটা হাতে পরে নেয়।তারপর গোলাপ আর চিরকুটটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
চোখ বন্ধ করতেই বারবার ভেসে উঠতে থাকে কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা—রাহাদের সেই অপ্রস্তুত মুখ, তার মাথায় ওড়না পরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটা, আর সেই কথাটা..."এমন একটা সময় আসবে, তখন ওড়না আমিই পরাবো... আমিই খুলবো।"
শিখা লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজে ফেলে।বুকের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে।কিন্তু সেই অস্থিরতাও আজ বড় মধুর।
জানালার বাইরে দুপুরের আলো ধীরে ধীরে রুমে ঢুকছে। আর শিখা গোলাপ, চিরকুট আর নিজের নতুন অনুভূতিগুলো বুকের মাঝে আগলে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে।
এরমধ্যেই বাইরে দরজায় টোকা পড়ে।শিখা চমকে উঠে বসে।তড়িঘড়ি করে সবকিছু শপিং প্যাকেটে রেখে সরিয়ে রাখে।স্বাভাবিক হয়ে দরজা খুলে।
রিক্তা ভিতরে ঢুকে বলে„“ কি রে ময়না, কি করছিস? "
শিখা তোতলানো কণ্ঠে বলে„“ কই?.. কিছুই না। "
রিক্তা শিখার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলে„“ তুই এমন ঘামছিস কেন? আর কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কেন তোর? "
শিখা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে„“ আরে না তো! গরম লাগছিল তাই। "
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে রুমের ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকায়„“ গরম লাগছিল, নাকি অন্য কিছু লাগছিল? "
শিখা ঢোক গিলে বলে„“ মানে? "
রিক্তা খাটের উপর বসে বলে„“ মানে তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। "
শিখা তাড়াতাড়ি বিষয় বদলানোর জন্য বলে„“ তুই এখানে কেন এসেছিস? "
রিক্তা মুখ ফুলিয়ে বলে„“ আমি তোকে ডাকতে এসেছি। সবাই নিচে অপেক্ষা করছে। সবাই খেতে ডাকছে। আর তুই এখানে বসে আছিস। "
„“ ওহ। আচ্ছা চল। "
রিক্তা উঠে দাঁড়াতে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায়।
তার চোখ গিয়ে পড়ে খাটের পাশে রাখা শপিং ব্যাগটার দিকে।
„“ এটা কি? "
শিখার বুক ধক করে ওঠে„“ কোনটা? "
রিক্তা ব্যাগের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে„“ এই ব্যাগটা। "
„“ ওহ এটা? কিছু না। "
রিক্তা সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে„“ কিছু না মানে? "
„“ আরে একটা ড্রেস। "
„“ দেখাবি না? "
শিখা তাড়াতাড়ি ব্যাগটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলে„“ পরে দেখাবো। "
রিক্তার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়„“ পরে কেন? এখন দেখ। "
„“ না, এখন না। "
„“ শিখা... "
„“ আরে বাবা বললাম তো পরে দেখাবো! "
রিক্তা কয়েক সেকেন্ড শিখার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ চোখ সরু করে বলে„“ আচ্ছা... ব্যাপার কি রে? "
„“ কি ব্যাপার? "
„“ তুই কি প্রেমে পড়েছিস? "
শিখা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
বিস্মিত কণ্ঠে বলে„“ কি!!! "
রিক্তা হো হো করে হেসে ওঠে।হাসি থামিয়ে বলে„“ এই রিঅ্যাকশনটাই তো চাইছিলাম। "
শিখা বালিশ তুলে মারে„“ চুপ কর! "
„“ আচ্ছা আচ্ছা, মারিস না। "
রিক্তা শিখার কাঁধে হাত রেখে বলে„“ আচ্ছা, জোর করবো না। মন চাইলে বলিস। যদি কোনো সমস্যা হয়, জানাবি। "
শিখা চোখ নামিয়ে ফেলে।
কারণ সে নিজেও জানে, আজকে তার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে।খুব ছোট্ট একটা অনুভূতি...যেটার নাম হয়তো সে এখনো জানে না।হয়তো জানে, কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পায়।ঠিক তখনই নিচ থেকে রিতুর চিৎকার শোনা যায়„“ আপুরা! আর কতক্ষণ? "
রিক্তা দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে„“ চল চশমিস। সবাই অপেক্ষা করছে। "
শিখা অবাক হয়ে বলে„“ তুই আবার আমাকে চশমিস বলছিস কেন? "
রিক্তা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে„“ জানি না। বাট কোথায় যেন লেখা দেখেছিলাম, মনে নেই। "
শিখার বুকটা আবার ধক করে ওঠে।
মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুপালি ব্রেসলেটটার উপর খোদাই করা সেই শব্দটা"চশমিস"
শিখা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আর রিক্তা কিছু না বুঝেই তার হাত ধরতে যাবে, তখন তার হাতে ব্রেসলেটটা চোখে পড়ে।রিক্তা বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে"চশমিস..."
রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে„“ এটা কবে কিনলি? আর চশমিস কেনো? "
শিখা দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে বলে„“ কাল কিনেছি। "
„“ দেখালি না কেন? "
„“ মনে ছিল না। "
„“ তাহলে চশমিস কেনো? "
„“ ওটা এমনি দিয়েছি। "
রিক্তা কিছুটা আন্দাজ করলো, কিন্তু ধরা দিল না।শিখার হাত ধরে নিচে নেমে আসে।
নিচে নেমেই দুজন দেখতে পায় ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সবাই বসে আছে।
নতুন বাড়িতে আজ প্রথম একসাথে খাওয়া-দাওয়া হবে বলে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা রকম খাবারের ঘ্রাণ।খাবার টেবিলের কাছে দুজনে আসে।
বড়রা আগেই খেয়ে উঠেছে। এখন ছোটরা আছে।
রিয়ার বড় মামার সন্তান: সোহাগ, নুপুর।
আর সেজো মামার সন্তান: সাহিন, সুমন, বৃষ্টি।
আর রিয়ার খালাতো ভাই-বোন: মুক্তা, মিরন, উর্মি।
রিয়ার মা, খালা-মামারা চারজন। রিয়ার মা দ্বিতীয়।
রিক্তার বড় মামার সন্তান: সাকিব, সুমি, সুরাইয়া।
রিক্তার মা আর তার মামা দুজনেই।
সবাই এসেছে নতুন বাড়িতে।
এখন টেবিলে বসে খাচ্ছে সোহাগ, সাকিব, সুরাইয়া, রিতু, শুভ, লুমিনা, রাহাদ।
শিখা একটা চেয়ার টেনে লুমিনার পাশে বসে।রিক্তা রিয়ার পাশে বসে।
সানজিদা আহমেদ দুজনকে খাবার দিতে দিতে বলে„“ এত দেরি হলো কেন? "
রিক্তা জবাব দেয়„“ বড় আম্মু, একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম। "
„“ তা না খেয়ে? "
রিক্তা কোনো জবাব দেয় না।খাবার মুখে নিয়ে খেতে থাকে।
শিখা আড়চোখে বারবার রাহাদের দিকে তাকাচ্ছে।
কিন্তু রাহাদ তাকায়নি।
রিক্তা এক পলক শুভকে দেখে বুকের ভিতর কেমন যেন করে ওঠে।তিন মাস পর তাকে দেখছে।
কত রাত গেছে তাকে একপলক দেখার জন্য ছটফট করে, কত রাত গেছে তার ছবি বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে।
আর আজ সেই লোক তার সামনে কী সুন্দর পাষাণের মতো খাচ্ছে।
শুভ যেন রিক্তার উপস্থিতিটাই টের পাচ্ছে না।খুব স্বাভাবিকভাবে খাবার খাচ্ছে, মাঝে মাঝে সাকিবের সাথে কথা বলছে, আবার কখনো লুমিনার কথায় মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিচ্ছে।
রিক্তার ইচ্ছে করছে একটা গ্লাস ছুড়ে মারে তার দিকে।
মনে মনে বলে„“ হুম, খুব ভালো। তিন মাস কথা না বলে থাকছেন, এখন এমন ভাব করছেন যেন কিছুই হয়নি! "
রিয়া পাশ থেকে সব লক্ষ্য করছিল।সে মুখে খাবার দিয়ে নিচু স্বরে বলে„“ কাউকে খুন করার প্ল্যান করছিস নাকি? "
রিক্তা চমকে উঠে বলে„“ কি? "
„“ তোর চোখ দেখে তাই মনে হচ্ছে। "
রিক্তা মুখ গোমড়া করে খাবার খেতে থাকে।ওপাশে শুভ হঠাৎ পানির গ্লাস নিতে গিয়ে একবার চোখ তুলে তাকায়।কিন্তু রিক্তা খেয়াল করেনি।রিক্তাকে দেখে শুভ মুচকি হাসে।নিচু স্বরে বিড়বিড় করে„“ বোকা পিচ্চি। "
শুভ পানি খেয়ে হাত ধোয়ার জন্য বেসিনের দিকে চলে যায়।
শিখা বারবার রাহাদের দিকে তাকাচ্ছে।যতই নিজেকে বুঝাক তাকাবে না, ততই যেন বেহায়া মনটা তার কথা শুনছে না।বারবার চোখ চলে যাচ্ছে রাহাদের দিকে।
রাহাদ অবশ্য বেশ স্বাভাবিকভাবেই খাচ্ছে।মাঝে মাঝে সোহাগ আর সাকিবের সাথে কথা বলছে।যেন কিছুই হয়নি।
শিখা নিচের দিকে তাকিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করতে থাকে।ঠিক তখনই লুমিনা হঠাৎ বলে ওঠে„“ শিখা, তোমার হাতটা দেখি তো। "
শিখা চমকে উঠে বলে„“ কেন? "
„“ এমনি। "
লুমিনা হাত ধরে টেনে নেয়।ব্রেসলেটটা চোখে পড়তেই লুমিনার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে„“ ওয়াও! সুন্দর তো। নতুন কিনেছো? "
শিখার বুক ধক করে ওঠে„“ হুম। "
লুমিনা ব্রেসলেটটা ঘুরিয়ে দেখে।তারপর উচ্চস্বরে পড়ে"চশমিস..."
মুহূর্তেই রাহাদের হাত থেমে যায়।এক পলক শিখার হাতের ব্রেসলেট দেখে নেয়।
শিখা লজ্জায় প্রায় মরে যাওয়ার অবস্থা।
রিক্তা সঙ্গে সঙ্গে বলে„“ এই তো! আমিও জিজ্ঞেস করছিলাম। "
সাকিব মুচকি হেসে বলে„“ চশমিস আবার কেমন নাম? "
রিতু বলে„“ নিশ্চয়ই কেউ দিয়েছে। "
শিখা কাশি দিয়ে বলে„“ না...... "
রাহাদ তাড়াতাড়ি গ্লাস তুলে পানি খেতে শুরু করে।
লুমিনা ভ্রু নাচিয়ে বলে„“ কেউ দেয়নি? "
„“ না। "
„“ শিওর? "
„“ হুম। "
„“ তাহলে নিজের নাম বাদ দিয়ে চশমিস লিখালে কেন? "
শিখা এবার পুরোপুরি চুপ।কি জবাব দিবে এখন?
যদি বলে রাহাদ ভাইয়া দিয়েছে, তাহলে সবাই কি ভাববে?
রাহাদ মাথা নিচু করে খাবার খেতে থাকে।
হৃদয় থাকলে হয়তো এখানেই তেল ঢেলে দিত, কিন্তু সে এখন অন্য টেবিলে মামাতো ভাইদের সাথে গল্প করছে।
রাহাদ এবার কাশি দিয়ে বলে„“ খাবার খাও সবাই। এত তদন্তের কি আছে? "
সাকিব হেসে বলে„“ ওহহহ... এখন বুঝলাম। "
„“ কি বুঝলি? "
„“ কিছু না ভাইয়া। "
টেবিল জুড়ে চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
শিখা মনে মনে দোয়া করতে থাকে, মাটি ফেটে যাক আর সে তার মধ্যে ঢুকে যাক।
বেশ হাসাহাসির মাঝে খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে যায়।
সবাই উঠে গিয়ে সোফায় বসে।
এরমধ্যেই ইব্রাহিম এসেছে আরশিকে নিয়ে।দুজনের পরনে ম্যাচিং শাড়ি আর শার্ট।লাল শাড়িতে আরশিকে বেশ মানিয়েছে।ইব্রাহিমকে লাল শার্টেও খুব মানিয়েছে।
আসলে তাদের রাহাদ আসতে বলেছিল কলেজ প্রোগ্রামের সময়। ইব্রাহিম রিক্তা-শিখাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন করে।
দুজনে ফুল নিয়ে ইব্রাহিমকে ধন্যবাদ জানায়।
এরমধ্যেই রাহাদের শরীরে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ে জিসান আর সিয়াম।রাহাদ তাদের নিয়ে সোফায় পড়ে যায়।সাকিব এক লাফে সোফা থেকে সরে যায়।
রাহাদ দুজনকে সরিয়ে বলে„“ এই ছাগলগুলো, তোরা কি মানুষ হবি না? "
দুজনে উঠে দাঁড়ায়।জিসান হেসে বলে„“ দোস্ত, অনেক দিন পর দেখেছি তো, তাই এক্সাইটেড হয়ে জড়িয়ে ধরেছি। "
সাকিব ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে„“ যাক বাবা, বেঁচে গেছি। "
সিয়াম দুই হাত বাড়িয়ে সাকিবের কাছে এগিয়ে যায়„“ আরে জানে জিগার! "
সাকিব চিৎকার করে বলে„“ দোস্ত, ওখানেই থাক! "
সিয়াম কি আর কথা শুনবে?সে এগিয়ে গিয়ে সাকিবকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে ফেলে দেয়।
সবাই হেসে ওঠে তাদের কাণ্ডে।জিসান গিয়ে তাদের উঠায়।
সাকিব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সিয়ামকে পিঠে চাপড় মেরে বলে„“ এই, তুই খাস কি? হ্যাঁ? আমার মাজাটা গেল! "
„“ দোস্ত, আম্মুর হাতের স্পেশাল খাবার খাই। "
এরমধ্যেই সানজিদা আহমেদ বাহারি নাস্তা এনে দিয়ে যায়।সবাই সোফায় বসে কথা বলতে থাকে আর খেতে থাকে।
রিক্তা, শিখা, আরশিরা রুমে চলে গেছে আড্ডা দিতে।
রিতু, সুরাইয়া, সুমি, নুপুর, সুমন, মুক্তা, মিরন এবং ছোট উর্মিকে নিয়ে তারা রিতুর রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
আর বড়রা ছাদে বসে কথা বলছে।
বিকেলের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার প্রশান্তিতে বদলে যেতে শুরু করেছে।নতুন বাড়িটার প্রতিটা কোণ আজ মানুষের কোলাহলে ভরে উঠেছে।কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও গল্পের আসর, কোথাও আবার পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ।বাইরের আকাশটাও যেন আজ অন্যরকম সুন্দর।পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।
লালচে আভায় রঙিন হয়ে উঠেছে চারদিক।
দূরে গাছের ডালে ডালে পাখিরা ফিরে যাচ্ছে নিজেদের নীড়ে।হালকা বাতাসে নতুন বাড়ির বারান্দার সাদা পর্দাগুলো দুলে উঠছে বারবার।
চলবে...