Golpo:Sensation (Wr...
 
Notifications
Clear all

Golpo:Sensation (Writer:Mahzabin Rafa)

Page 2 / 2

Posts: 8
Topic starter
(@mahzabin-rafa)
Active Member
Joined: 2 weeks ago

পর্ব ১২

 
 
অন্য সব বাবা-মেয়েরা যখন ছন্দে ছন্দে নাচছিল, তখন মাহতিমের   হাতের সাথে মিলিয়ে কুহুর ছোট্ট পায়ে স্টেপ ফেলার চেষ্টাটা পুরো মঞ্চের সবচেয়ে সুন্দর ও মায়াবী দৃশ্য হয়ে ওঠে। মাহতিমের পরনে ব্ল্যাক সুট আর কুহুর সাদা ফ্রকের ম্যাচিং লুকটা অন্য বিদেশি ফ্যামিলিগুলোর মাঝেও আলাদা নজর কাড়ে।

নাচের একপর্যায়ে মিউজিকের সুর যখন একটু ধীর হয়ে আসে, তখন কুহু হঠাৎ মাহতিমের হাত ধরে মিষ্টি চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে সোজা প্রশ্ন করে বসে— তুমি কি আমার বাবা হবে?"

কুহুর এই সহজ-সাদা কিন্তু মারাত্মক ভারী কথাটি শুনে মাহতিমের পায়ের নিচে যেন মাটি সরে যায়। সে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে যায়। যে মানুষটাকে সে ১২ বছর ধরে নীরবে ভালোবেসে গেছে, আজ সেই মানুষটার আদরের সন্তান যখন তাকে "বাবা" হতে বলে, তখন মাহতিমের হৃদয়ে এক অদ্ভুত আনন্দের ঝড় বয়ে যায়। তার গলা দিয়ে সহজে কোনো শব্দ বের হয় না। তবে চারপাশের হইচই আর পরিবেশের কথা মাথায় রেখে মাহতিম দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। সে কুহুর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে ফিসফিস করে বলে ওঠে—"কুহু, এখন ডান্সটা মনোযোগ দিয়ে করি চলো, এ নিয়ে পরে কথা হবে।"

এদিকে ডান্স ফ্লোর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দর্শকসারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কায়নাত তখন চারপাশের মানুষের আনন্দ ও অন্যান্য বাচ্চাদের পারফরম্যান্স দেখায় ব্যস্ত ছিল। দূর থেকে সে কুহুর ঠোঁটের নড়াচড়া দেখলেও, চারপাশের হালকা শোরগোল ও মিউজিকের শব্দের কারণে কুহুর বলা সেই ভারী কথাটি তার কানে পৌঁছায়নি।

কিছুক্ষণ পরেই বিচারকদের রায়ে ঘোষণা করা হয় যে আজকের ফাদার্স ডে স্পেশাল ডান্স কম্পিটিশনে বিজয়ী হয়েছে কুহু ও মাহতিমের জুটি! হলরুমে তখন সবার হাসিমুখ আর তালি। সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করতে থাকে। কর্তৃপক্ষ যখন পুরস্কার নেওয়ার জন্য কুহুকে মঞ্চের সামনে ডাকতে যায়, তখন কুহু মাথা নেড়ে পুরস্কার নিতে পরিষ্কার মানা করে দেয়। কুহু মিষ্টি ও ছোট্ট গলায় বলে ওঠে—"আমি কোনো প্রাইজ নেব না! তার বদলে আমরা তিনজন আজ একসাথে বাইরে ঘুরব, আইসক্রিম খাব আর শহরের আলো দেখব!"

কুহুর এই অবুঝ ও সরল আবদার শুনে উপস্থিত দর্শকরা অবাক হওয়ার বদলে বেশ মুচকি হাসে এবং চারপাশ থেকে তালি ও প্রশংসার জোয়ার বয়ে যায়। কায়নাত একটু অপ্রস্তুত হয়ে কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে, "এত রাতে বাইরে ঘোরার কি আছে কুহু, চলো এবার বাসায় ফিরি।"

কিন্তু কুহু নাছোড়বান্দা; সে মাহতিমের হাত শক্ত করে ধরে বায়না ধরে বসে। মাহতিম তো মনে মনে এটাই চাইছিল! সে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে - কায়নাত, কুহুর যখন এতই ইচ্ছে করছে, একটু ঘুরে আসতেই পারি।"

কায়নাত আর দ্বিরুক্তি করার সুযোগ পায় না। রাতের ফিনফিনে ঠান্ডার আমেজে তিনজনে মিলে লন্ডনের ম্যারিয়ট হোটেলের চত্বর ছেড়ে রাতের আলো ঝলমলে শহরের রাস্তায় পা বাড়ায়।লন্ডনের ঠান্ডা বাতাসে তিনজনে মিলে হোটেল থেকে বের হয়ে কিছুটা দূর হাঁটার পর রাস্তার কোণায় একটা মিষ্টি আইসক্রিমের দোকান দেখতে পেল। ভেতরে উজ্জ্বল আলো আর কাঁচের শোকেসে নানা ফ্লেভারের আইসক্রিম সাজানো।দোকানের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত মিষ্টি ভ্যানিলা আর রিচ চকোলেটের সুবাস নাকে এসে লাগে। কুহু তো দোকানে ঢুকেই খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। কাউন্টারের সামনে ছোট্ট আঙুল দিয়ে সে "ম্যাগনাম (Magnum)" ব্যান্ডের একটা দামি ডাবল চকোলেট ফাজ আইসক্রিম দেখিয়ে বলে ওঠে—"আমি ওইটা খাব!"

মাহতিম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দোকানদারের দিকে ইশারা করে। মাহতিম শুধু কুহুর জন্যই নয়, বরং তিনজনের জন্যই শহরের সবচেয়ে দামি ও এক্সক্লুসিভ "ম্যাগনাম (Magnum)" ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম চকোলেট আইসক্রিম অর্ডার করে। দোকানদার যখন ব্র্যান্ডেড পেপার কাপে করে আইসক্রিমগুলো বাড়িয়ে দেয়, তখন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এগুলোর টেস্ট আর কোয়ালিটি সাধারণ নয়, বেশ ভালো মানের ও অভিজাত।

আইসক্রিম হাতে পাওয়ার পর কুহু মহাআনন্দে চামচ দিয়ে খেতে শুরু করে। দোকানের ভেতরের নরম হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে তিনজনে মিলে আইসক্রিম খাওয়ার এই ছোট ও সহজ মুহূর্তটায় কুহু একপাশে চুপচাপ ভীষণ ব্যস্ত।

আর ঠিক তখনই মাহতিম একটু এগিয়ে এসে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে—"কুহুর আজকের এই হাসিটার দাম আমার কাছে অনেক বেশি। থ্যাংক ইউ, কায়নাত... ওকে আজ এত সুন্দর একটা দিন উপহার দেওয়ার জন্য।"

মাহতিমের চোখের গভীরের সেই কৃতজ্ঞতা আর মিষ্টি কথার সুর কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে তোলে। সে চটজলদি চোখ সরিয়ে দামি চকোলেট আইসক্রিমে চামচ ডোবানোর ভান করে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে ফ্যাকাশে হাসি ফুটে  ওঠে।

আইসক্রিমের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ম্যাগনামের (Magnum) কাপে চামচ ডোবাতে ডোবাতে তিনজনে মিলে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।

লন্ডনের রাতের রাস্তা তখন কুয়াশাচ্ছন্ন এক স্নিগ্ধতায় মোড়ানো। যদিও তখন গ্রীষ্মকাল, তবুও সন্ধ্যার পর শহরের বাতাসে একটা বেশ ভালোই ঠান্ডা আমেজ রয়েছে। রাস্তার দুপাশে থাকা প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান আমলের ল্যাম্পপোস্টগুলো থেকে মৃদু হলুদ আলো ঝরে পড়ছে পিচের রাস্তায়। হালকা ফিনফিনে ঠান্ডা বাতাস বইছে, যার ছোঁয়ায় গায়ে একটা হালকা কাঁপুনি দিয়ে যায়। রাস্তাটি বেশ চওড়া এবং পরিপাটি; ফুটপাথগুলো গ্রে রঙের শানবাঁধানো পাথরের তৈরি। একটু দূরে দূরে ব্রিটিশ স্টাইলের লাল রঙের আইকনিক টেলিফোন বুথ আর কালো ট্যাক্সিগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

রাস্তার এই নীরব ও শান্ত পরিবেশে তিনজনের হেঁটে চলার দৃশ্যটি ছিল বড়ই চমৎকার। কুহু তার একহাতে মাহতিমের বড় আঙুলটা আর অন্যহাতে কায়নাত শক্ত করে ধরে ছন্দে ছন্দে পা ফেলছে। আইসক্রিমের মিষ্টি স্বাদের রেশ আর চারপাশের এই জাদুকরী লন্ডন শহরের রাত মিলে মুহূর্তটিকে এক অন্যরকম মায়াবী করে তোলে। মাহতিম একটু পাশ ঘেঁষে হাঁটছিল, যেন ঠান্ডা বাতাসে কুহুর কোনো কষ্ট না হয়। 

হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের এই নিরিবিলি মায়াবী পরিবেশটা তিনজনের মাঝে এক অদ্ভুত স্বস্তি এনে দেয়। দিনের সেই জমকালো হোটেলের হৈচই, ডান্স কম্পিটিশন আর কুহুর করা সেই হঠাৎ আবদারের রেশ যেন এই স্নিগ্ধ বাতাসে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল।

কুহু কিছুটা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে এগোতে হঠাৎ করে দুই হাত সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে—

"আকাশের তারাগুলো না আমাদের সাথে সাথে হাঁটছে!"

কুহুর এমন অমলীন শিশুসুলভ কথা শুনে কায়নাত মৃদু হেসে তার দিকে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই মাহতিমের নীল চোখ দুটো কায়নাতের চোখের সাথে মিলে যায়। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় মাহতিমের মুখের সেই শান্ত ও মায়াবী অভিব্যক্তি কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে তোলে। দীর্ঘ বারো বছর আগের না বলা অনেক না পাওয়ার হিসাব এই অচেনা শহরের রাস্তায় যেন এক পলক ম্লান হয়ে যায়। রাতের এই নিস্তব্ধতায় কেউ কোনো কথা বলে না, অথচ না বলা অনেক না-বলা কথাই যেন বাতাসে মিশে থাকে। 

হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে এগোতেই রাস্তার মোড়ে একটা চমৎকার ফুলের দোকান চোখে পড়ল। কাঁচের বড় বড় শোকেস ঘেরা দোকানটার সামনে ছিমছাম করে রাখা হয়েছে নানা রঙের তাজা ফুল। দোকানের এক কোণায়, পুরোনো আমলের একটা কাঠের টুলের ওপর বসে ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। তাঁর পরনে সাদামাটা উলের চাদর, চুলে রুপোলি পাক ধরেছে। মুখের কোণে মিশুকে এক মৃদু হাসি ঝুলছে। তাঁর চারপাশ জুড়ে থরে থরে সাজানো আছে ল্যাভেন্ডার, টিউলিপ, সাদা ডেইজি আর লাল গোলাপের তোড়া। ফুলের দোকানে নানা রঙের ফুলের মাঝে লিলি ফুলও সাজানো ছিল। কুহু যখন অবাক চোখে হরেক রকমের ফুল দেখছিল, তখন তার নজর আটকে যায় একগুচ্ছ সতেজ সাদা ও গোলাপি লিলির দিকে। ছোট্ট কুহুর মনে পড়ে যায় মায়ের পছন্দের কথা। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে একটা সুদৃশ্য লিলি ফুল নিজের ছোট্ট হাতে তুলে নেয় এবং মাহতিমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলে ওঠে—" blue eyes, আম্মুর প্রিয় ফুল কিন্তু লিলি!"

কুহুর কথা শুনে মাহতিমের বুকটা কেমন যেন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় নড়ে ওঠে। 
 
সে তৎক্ষণাৎ দোকানের বৃদ্ধা মহিলার কাছ থেকে বেশ বড়সড় একটা সুন্দর ফুলের তোড়া কিনতে যায়। কিন্তু কায়নাত সেটা দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে বাধা দেয় এবং বলে ওঠে, এত বড় বা এতোগুলো ফুলের তোড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

মাহতিম তখন বারবার অনুরোধ করতে থাকে যেন অন্তত আর কয়েকটি ফুল নেওয়া হয়, কিন্তু কায়নাত তাতে একেবারেই রাজি হয় না। অনেকবার অনুরোধ আর না-করা সত্ত্বেও কায়নাত শেষ পর্যন্ত নিজের জেদে অটল থাকে এবং শুধু কুহুর হাতে থাকা ওই একটা লিলি ফুলই নিতে দেয়।

অগত্যা মাহতিম মৃদু হেসে বাধ্য ছেলের মতো শুধু সেই একটি লিলি ফুলটিরই দাম পরিশোধ করে। রাতের স্নিগ্ধ আলোয় কুহুর ছোট্ট হাতে ধরা সেই একাটি লিলির মিষ্টি সুবাস চারপাশের বাতাসকে যেন আরও বেশি মোহনীয় করে তোলে।

 

চলবে.......

  

Loading spinner

Reply
Posts: 8
Topic starter
(@mahzabin-rafa)
Active Member
Joined: 2 weeks ago
পর্ব ১৩
 

 
লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলের ঠান্ডা হাওয়া ভেদ করে গ্রেট অর্মন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের (Great Ormond Street Hospital) কাঁচের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় কায়নাত। বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক আশঙ্কায় কাঁপছে।লন্ডন  আসার একটাই কারণ—ছোট্ট কুহুর ব্রেন টিউমারের অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন। টিউমারটি মস্তিষ্কের এমন এক সংবেদনশীল জায়গায় বাসা বেঁধেছিল যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের চিকিৎসকদের জন্যই এটি একটা বড় চ্যালেঞ্জ । 

কুহুর এই অসম্ভব কঠিন লড়াইয়ে আশার আলো হয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় মাহতিম। মাহতিম শুধু বাংলাদেশ বা এশিয়ার ১ নম্বর নিউরোলজিস্টই নয়, বরং আধুনিক নিউরোসার্জারিতে মাহতিমের হাতের জাদুকরী দক্ষতার কথা আন্তর্জাতিক মহলেও সমাদৃত।

গ্রেট অর্মন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের সর্বাধুনিক অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে তখন জীবন-মৃত্যুর এক নীরব লড়াই চলছে। থিয়েটারের বাইরে করিডোরে কায়নাতের বুকফাটা প্রার্থনা আর দীর্ঘশ্বাসের এক একটি মুহূর্ত যেন কাটতেই চায় না। তার চোখ গড়িয়ে নামছে নোনাজল, ঠোঁটে কেবল একটাই আকুতি—তার কলিজার টুকরো কুহুকে যেন সে অক্ষত ফিরিয়ে পায়।

ঠিক তখনই মাহতিমের মা এগিয়ে এসে স্নেহের সাথে কায়নাতকে জড়িয়ে ধরেন।কায়নাতের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি আদুরে গলায় বলেন  
-মা আমার, এবার একটু শান্ত হও। তুমি তো আগের রাত থেকে কিচ্ছু মুখে তোলোনি, এভাবে শরীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না! এসো, একটু কিছু মুখে দাও।"

কিন্তু কায়নাত মাথা নেড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে এবং মাহতিমের মায়ের বুকে মাথা রেখেই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে।মাহতিমের মা কায়নাতের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে আনমনে অতীতের অতল গহ্বরে হারিয়ে যান। বারো বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা মনে পড়ে তাঁর বুক কেঁপে ওঠে।

~ অতীত পাতা ~

মাহতিমের জ্ঞান ফিরছে না। প্রণয়ের ফোনে মাহতিমের মা-বোন, প্রণয়ের মা-বাবা সবাই হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। মাহতিমের মায়ের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ—কান্না করতে করতে তাঁর চোখ ফুলে গেছে। মাহতিমের বোনের বয়স বেশি নয়, চোদ্দো কি পনেরো হবে, আর তার অবস্থাও ভালো নয়।মেয়েটির কান্নার আওয়াজ থামছে না। সে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে, যেন তার বুকের  পাথরটা কিছুতেই নামতে চাইছে না। ভাইয়ের এই চরম অবস্থায তার ছোট মনটা আর এই ধকল সহ্য করতে পারছে না।প্রণয়ের মা-বাবার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। প্রণয়ের মা নিজের ভাগ্নের এমন করুণ অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না; শোকে ও কান্নায় তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, আর তাঁর স্বামী তাকে ও অন্য সবাইকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে নিজেও ভেঙে পড়েছেন ভেঙে। প্রণয় কাকে সামলাবে বা কী করবে, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। একদিকে হাসপাতালের এই থমথমে পরিবেশ, অন্যদিকে মাহতিমের জ্ঞানহীন অবস্থা আর মা-বোনসহ সবার কান্না-কাটি—সব মিলিয়ে তার মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কার সান্ত্বনা দিয়ে কার দিকে তাকাবে হদিশ পাচ্ছে না।

মাহতিমের বন্ধু মীরা ও নীরা বিয়ে অনুষ্ঠান থেকে সোজা চলে এসেছে হাসপাতালে প্রিয়মের কল পেয়ে। নীরা হাসপাতালে আসার পর থেকে মাহতিমের জন্য এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে যে সে একটানা কেঁদেই চলেছে। মীরা নীরাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। মাহতিমের জন্য মীরারও খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু মীরা এত সহজে ভেঙে পড়ে না মীরা অনেক স্ট্রং। 

মাহতিমের বোন প্রণয়ের কাছে ছুটে এসে কান্নাকাটি করতে করতে বলতে থাকে—"ভাই, বল না! ভাইয়ের এই অবস্থা কীভাবে হলো? আমি তো সন্ধ্যায় ভাইয়ের সাথে কথা বলছি, সব ঠিক ছিল!"

প্রণয় প্রতি উত্তরে বলে— "বোন হয়েছে যা হওয়ার, পরে বলি। এখন সবার অবস্থা কেমন, তা তো বুঝতেই পারছিস।"

~ বর্তমান ~

অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটা সশব্দে খুলে যায়। পরনের নীল সার্জিক্যাল গাউনে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত অথচ বিজয়ী এক চিলতে হাসি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে মাহতিম। তাঁর চোখের চাউনিতে যে পরম আশ্বাসের বার্তা ছিল, তাতে কায়নাতের বুকের ওপর থেকে যেন পাহাড়সমান একটা পাথর নেমে যায়।

মাহতিম এগিয়ে এসে দৃঢ় গলায়  বলে ওঠে —"সব ঠিক আছে, কায়নাত! কুহু একদম নিরাপদ। অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে।"

মাহতিমের সেই কথা শোনার পর কায়নাত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। হাসপাতালের করিডোরেই সে ভেঙে পড়ে কান্নায়—সে কান্না ভয়ের নয়, সমস্ত শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কুহুকে ফিরে পাওয়ার পরম স্বস্তির।

 
চলবে..........
Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner