পর্ব ১২
অন্য সব বাবা-মেয়েরা যখন ছন্দে ছন্দে নাচছিল, তখন মাহতিমের হাতের সাথে মিলিয়ে কুহুর ছোট্ট পায়ে স্টেপ ফেলার চেষ্টাটা পুরো মঞ্চের সবচেয়ে সুন্দর ও মায়াবী দৃশ্য হয়ে ওঠে। মাহতিমের পরনে ব্ল্যাক সুট আর কুহুর সাদা ফ্রকের ম্যাচিং লুকটা অন্য বিদেশি ফ্যামিলিগুলোর মাঝেও আলাদা নজর কাড়ে।
নাচের একপর্যায়ে মিউজিকের সুর যখন একটু ধীর হয়ে আসে, তখন কুহু হঠাৎ মাহতিমের হাত ধরে মিষ্টি চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে সোজা প্রশ্ন করে বসে— তুমি কি আমার বাবা হবে?"
কুহুর এই সহজ-সাদা কিন্তু মারাত্মক ভারী কথাটি শুনে মাহতিমের পায়ের নিচে যেন মাটি সরে যায়। সে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে যায়। যে মানুষটাকে সে ১২ বছর ধরে নীরবে ভালোবেসে গেছে, আজ সেই মানুষটার আদরের সন্তান যখন তাকে "বাবা" হতে বলে, তখন মাহতিমের হৃদয়ে এক অদ্ভুত আনন্দের ঝড় বয়ে যায়। তার গলা দিয়ে সহজে কোনো শব্দ বের হয় না। তবে চারপাশের হইচই আর পরিবেশের কথা মাথায় রেখে মাহতিম দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। সে কুহুর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে ফিসফিস করে বলে ওঠে—"কুহু, এখন ডান্সটা মনোযোগ দিয়ে করি চলো, এ নিয়ে পরে কথা হবে।"
এদিকে ডান্স ফ্লোর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দর্শকসারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কায়নাত তখন চারপাশের মানুষের আনন্দ ও অন্যান্য বাচ্চাদের পারফরম্যান্স দেখায় ব্যস্ত ছিল। দূর থেকে সে কুহুর ঠোঁটের নড়াচড়া দেখলেও, চারপাশের হালকা শোরগোল ও মিউজিকের শব্দের কারণে কুহুর বলা সেই ভারী কথাটি তার কানে পৌঁছায়নি।
কিছুক্ষণ পরেই বিচারকদের রায়ে ঘোষণা করা হয় যে আজকের ফাদার্স ডে স্পেশাল ডান্স কম্পিটিশনে বিজয়ী হয়েছে কুহু ও মাহতিমের জুটি! হলরুমে তখন সবার হাসিমুখ আর তালি। সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করতে থাকে। কর্তৃপক্ষ যখন পুরস্কার নেওয়ার জন্য কুহুকে মঞ্চের সামনে ডাকতে যায়, তখন কুহু মাথা নেড়ে পুরস্কার নিতে পরিষ্কার মানা করে দেয়। কুহু মিষ্টি ও ছোট্ট গলায় বলে ওঠে—"আমি কোনো প্রাইজ নেব না! তার বদলে আমরা তিনজন আজ একসাথে বাইরে ঘুরব, আইসক্রিম খাব আর শহরের আলো দেখব!"
কুহুর এই অবুঝ ও সরল আবদার শুনে উপস্থিত দর্শকরা অবাক হওয়ার বদলে বেশ মুচকি হাসে এবং চারপাশ থেকে তালি ও প্রশংসার জোয়ার বয়ে যায়। কায়নাত একটু অপ্রস্তুত হয়ে কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে, "এত রাতে বাইরে ঘোরার কি আছে কুহু, চলো এবার বাসায় ফিরি।"
কিন্তু কুহু নাছোড়বান্দা; সে মাহতিমের হাত শক্ত করে ধরে বায়না ধরে বসে। মাহতিম তো মনে মনে এটাই চাইছিল! সে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে - কায়নাত, কুহুর যখন এতই ইচ্ছে করছে, একটু ঘুরে আসতেই পারি।"
কায়নাত আর দ্বিরুক্তি করার সুযোগ পায় না। রাতের ফিনফিনে ঠান্ডার আমেজে তিনজনে মিলে লন্ডনের ম্যারিয়ট হোটেলের চত্বর ছেড়ে রাতের আলো ঝলমলে শহরের রাস্তায় পা বাড়ায়।লন্ডনের ঠান্ডা বাতাসে তিনজনে মিলে হোটেল থেকে বের হয়ে কিছুটা দূর হাঁটার পর রাস্তার কোণায় একটা মিষ্টি আইসক্রিমের দোকান দেখতে পেল। ভেতরে উজ্জ্বল আলো আর কাঁচের শোকেসে নানা ফ্লেভারের আইসক্রিম সাজানো।দোকানের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত মিষ্টি ভ্যানিলা আর রিচ চকোলেটের সুবাস নাকে এসে লাগে। কুহু তো দোকানে ঢুকেই খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। কাউন্টারের সামনে ছোট্ট আঙুল দিয়ে সে "ম্যাগনাম (Magnum)" ব্যান্ডের একটা দামি ডাবল চকোলেট ফাজ আইসক্রিম দেখিয়ে বলে ওঠে—"আমি ওইটা খাব!"
মাহতিম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দোকানদারের দিকে ইশারা করে। মাহতিম শুধু কুহুর জন্যই নয়, বরং তিনজনের জন্যই শহরের সবচেয়ে দামি ও এক্সক্লুসিভ "ম্যাগনাম (Magnum)" ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম চকোলেট আইসক্রিম অর্ডার করে। দোকানদার যখন ব্র্যান্ডেড পেপার কাপে করে আইসক্রিমগুলো বাড়িয়ে দেয়, তখন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এগুলোর টেস্ট আর কোয়ালিটি সাধারণ নয়, বেশ ভালো মানের ও অভিজাত।
আইসক্রিম হাতে পাওয়ার পর কুহু মহাআনন্দে চামচ দিয়ে খেতে শুরু করে। দোকানের ভেতরের নরম হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে তিনজনে মিলে আইসক্রিম খাওয়ার এই ছোট ও সহজ মুহূর্তটায় কুহু একপাশে চুপচাপ ভীষণ ব্যস্ত।
আর ঠিক তখনই মাহতিম একটু এগিয়ে এসে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে—"কুহুর আজকের এই হাসিটার দাম আমার কাছে অনেক বেশি। থ্যাংক ইউ, কায়নাত... ওকে আজ এত সুন্দর একটা দিন উপহার দেওয়ার জন্য।"
মাহতিমের চোখের গভীরের সেই কৃতজ্ঞতা আর মিষ্টি কথার সুর কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে তোলে। সে চটজলদি চোখ সরিয়ে দামি চকোলেট আইসক্রিমে চামচ ডোবানোর ভান করে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে ফ্যাকাশে হাসি ফুটে ওঠে।
আইসক্রিমের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ম্যাগনামের (Magnum) কাপে চামচ ডোবাতে ডোবাতে তিনজনে মিলে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
লন্ডনের রাতের রাস্তা তখন কুয়াশাচ্ছন্ন এক স্নিগ্ধতায় মোড়ানো। যদিও তখন গ্রীষ্মকাল, তবুও সন্ধ্যার পর শহরের বাতাসে একটা বেশ ভালোই ঠান্ডা আমেজ রয়েছে। রাস্তার দুপাশে থাকা প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান আমলের ল্যাম্পপোস্টগুলো থেকে মৃদু হলুদ আলো ঝরে পড়ছে পিচের রাস্তায়। হালকা ফিনফিনে ঠান্ডা বাতাস বইছে, যার ছোঁয়ায় গায়ে একটা হালকা কাঁপুনি দিয়ে যায়। রাস্তাটি বেশ চওড়া এবং পরিপাটি; ফুটপাথগুলো গ্রে রঙের শানবাঁধানো পাথরের তৈরি। একটু দূরে দূরে ব্রিটিশ স্টাইলের লাল রঙের আইকনিক টেলিফোন বুথ আর কালো ট্যাক্সিগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
রাস্তার এই নীরব ও শান্ত পরিবেশে তিনজনের হেঁটে চলার দৃশ্যটি ছিল বড়ই চমৎকার। কুহু তার একহাতে মাহতিমের বড় আঙুলটা আর অন্যহাতে কায়নাত শক্ত করে ধরে ছন্দে ছন্দে পা ফেলছে। আইসক্রিমের মিষ্টি স্বাদের রেশ আর চারপাশের এই জাদুকরী লন্ডন শহরের রাত মিলে মুহূর্তটিকে এক অন্যরকম মায়াবী করে তোলে। মাহতিম একটু পাশ ঘেঁষে হাঁটছিল, যেন ঠান্ডা বাতাসে কুহুর কোনো কষ্ট না হয়।
হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের এই নিরিবিলি মায়াবী পরিবেশটা তিনজনের মাঝে এক অদ্ভুত স্বস্তি এনে দেয়। দিনের সেই জমকালো হোটেলের হৈচই, ডান্স কম্পিটিশন আর কুহুর করা সেই হঠাৎ আবদারের রেশ যেন এই স্নিগ্ধ বাতাসে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল।
কুহু কিছুটা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে এগোতে হঠাৎ করে দুই হাত সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে—
"আকাশের তারাগুলো না আমাদের সাথে সাথে হাঁটছে!"
কুহুর এমন অমলীন শিশুসুলভ কথা শুনে কায়নাত মৃদু হেসে তার দিকে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই মাহতিমের নীল চোখ দুটো কায়নাতের চোখের সাথে মিলে যায়। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় মাহতিমের মুখের সেই শান্ত ও মায়াবী অভিব্যক্তি কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে তোলে। দীর্ঘ বারো বছর আগের না বলা অনেক না পাওয়ার হিসাব এই অচেনা শহরের রাস্তায় যেন এক পলক ম্লান হয়ে যায়। রাতের এই নিস্তব্ধতায় কেউ কোনো কথা বলে না, অথচ না বলা অনেক না-বলা কথাই যেন বাতাসে মিশে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে এগোতেই রাস্তার মোড়ে একটা চমৎকার ফুলের দোকান চোখে পড়ল। কাঁচের বড় বড় শোকেস ঘেরা দোকানটার সামনে ছিমছাম করে রাখা হয়েছে নানা রঙের তাজা ফুল। দোকানের এক কোণায়, পুরোনো আমলের একটা কাঠের টুলের ওপর বসে ছিলেন এক বৃদ্ধা মহিলা। তাঁর পরনে সাদামাটা উলের চাদর, চুলে রুপোলি পাক ধরেছে। মুখের কোণে মিশুকে এক মৃদু হাসি ঝুলছে। তাঁর চারপাশ জুড়ে থরে থরে সাজানো আছে ল্যাভেন্ডার, টিউলিপ, সাদা ডেইজি আর লাল গোলাপের তোড়া। ফুলের দোকানে নানা রঙের ফুলের মাঝে লিলি ফুলও সাজানো ছিল। কুহু যখন অবাক চোখে হরেক রকমের ফুল দেখছিল, তখন তার নজর আটকে যায় একগুচ্ছ সতেজ সাদা ও গোলাপি লিলির দিকে। ছোট্ট কুহুর মনে পড়ে যায় মায়ের পছন্দের কথা। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে একটা সুদৃশ্য লিলি ফুল নিজের ছোট্ট হাতে তুলে নেয় এবং মাহতিমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলে ওঠে—" blue eyes, আম্মুর প্রিয় ফুল কিন্তু লিলি!"
কুহুর কথা শুনে মাহতিমের বুকটা কেমন যেন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় নড়ে ওঠে।
সে তৎক্ষণাৎ দোকানের বৃদ্ধা মহিলার কাছ থেকে বেশ বড়সড় একটা সুন্দর ফুলের তোড়া কিনতে যায়। কিন্তু কায়নাত সেটা দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে বাধা দেয় এবং বলে ওঠে, এত বড় বা এতোগুলো ফুলের তোড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
মাহতিম তখন বারবার অনুরোধ করতে থাকে যেন অন্তত আর কয়েকটি ফুল নেওয়া হয়, কিন্তু কায়নাত তাতে একেবারেই রাজি হয় না। অনেকবার অনুরোধ আর না-করা সত্ত্বেও কায়নাত শেষ পর্যন্ত নিজের জেদে অটল থাকে এবং শুধু কুহুর হাতে থাকা ওই একটা লিলি ফুলই নিতে দেয়।
অগত্যা মাহতিম মৃদু হেসে বাধ্য ছেলের মতো শুধু সেই একটি লিলি ফুলটিরই দাম পরিশোধ করে। রাতের স্নিগ্ধ আলোয় কুহুর ছোট্ট হাতে ধরা সেই একাটি লিলির মিষ্টি সুবাস চারপাশের বাতাসকে যেন আরও বেশি মোহনীয় করে তোলে।
চলবে.......