Notifications
Clear all
August 17, 2026 1:52 pm
লেখিকা:আরিফা বিনতে মায়া
Part:০১
প্রশস্ত ও মসৃণ মহাসড়ক ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে এক ধবধবে সাদা স্পোর্টস কার। ড্রাইভিং সিটে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছেন মূসা চৌধুরী, আর প্যাসেঞ্জার সিটে বসে হালকা মৃদু মিউজিকের তালে মাথা দোলাচ্ছেন তার স্ত্রী ক্রিতীকা চৌধুরী। পেছনের সিটে জানালার কাঁচে নাক ঠেকিয়ে বসে আছে তাদের দুই সন্তান—বড় ছেলে আসিফ চৌধুরী আর পরিবারের সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে ছটফটে ছোট্ট সদস্য হৃদী চৌধুরী ।
হৃদীর বয়স মাত্র ছয় বছর। মাথায় দুটো কিউট বেণী করা, চোখে-মুখে সারাক্ষণ দুষ্টুমির এক অদ্ভুত আলো লেগে থাকে। সে কখনো জানালার বাইরে দ্রুত চলে যাওয়া গাছপালা দেখছে, কখনো আবার আসিফের ফোনের স্ক্রিনের সামনে হাত দিয়ে ভাইয়ের মনোযোগ কাড়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ সে বাবার দিকে একটু ঝুঁকে দুই হাত বাড়িয়ে মিষ্টি গলায় ডেকে উঠল—
"বাবাই!"
মূসা চৌধুরী রিয়ার-ভিউ মিররে মেয়ের সেই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে হেসেই ফেললেন—
"হুম, আমার রাজকন্যা? বলো?"
"আমরা ঠিক কোথায় যাচ্ছি, বাবাই?"
"আমরা অনেক দূরে, অনেক সুন্দর একটা জায়গায় ঘুরতে যাচ্ছি, মা।"
ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনতেই হৃদীর বড় বড় চোখ দুটো খুশিতে একদম চকচক করে উঠল—
"সত্যি বলছো, বাবাই? একদম সত্যি?"
"হ্যাঁ মা, একদম একশভাগ সত্যি।"
"ইয়া-হুুু!"
সে সিটের ওপর বসেই খুশিতে ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে তালি দিতে লাগল। তারপর পাশে বসা গম্ভীর আসিফের দিকে ঘুরে তার গালটা টেনে দিয়ে বলল—
"ভাইয়ু! শুনেছো? আমরা ঘুরতে যাচ্ছি! অনেক মজা হবে!"
আসিফ তার ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই কিছুটা ভাব নিয়ে বলল—
"হুম, শুনেছি।"
"উফ ভাইয়ু! তুমি একটুও খুশি হওনি?"
"হয়েছি তো।"
"তাহলে তোমার মুখটা এমন কেন? তুমি হাসছো না কেন?"
"ধুর পিচ্চি! তোর কথা শুনে এখন কি আমাকে আলাদা করে দাঁত বের করে হাসতে হবে নাকি?"
কথাটা শুনেই হৃদী সঙ্গে সঙ্গে অভিমানী মুখে নিজের নিচের ঠোঁটটা ফুলিয়ে ফেলল। সে পেছনের সিট থেকে সোজা মায়ের সিটের কলার চেপে ধরে নালিশ করার সুরে বলল—
"মাম্মাম! দেখো না, ভাইয়ু আবার আমাকে রাগাচ্ছে! ও পচা!"
ক্রিতীকা চৌধুরী পেছন ফিরে হেসে আসিফের মাথায় একটা হালকা টোকা দিয়ে বললেন—
"আসিফ, একদম বোনটাকে জ্বালাতন করবে না। একটু শান্তিতে থাকতে দাও তো ওকে।"
"আরে মম, আমি তো কিছুই করিনি!"
"করেছো!"
হৃদী দ্রুত মাথা নেড়ে চিৎকার করে উঠল।
"কী করেছি, শুনি?"
"করেছো!"
"আরে কী করেছি, সেটা বলবি তো?"
"আমি জানি না। কিন্তু তুমি কিছু একটা করেছো!"
হৃদীর এই অদ্ভুত যুক্তিতে পুরো গাড়ির ভেতর একসাথে হাসির রোল উঠল। আসিফ নিজের কপালে হাত দিয়ে মাথা নেড়ে বলল—
"উফ! এই মেয়েটার লজিকের সাথে দুনিয়ার কেউ কোনোদিন পেরে উঠবে না!"
হৃদী তার সেই দুটো বেণী দুলিয়ে অত্যন্ত গর্বিত মুখে বলল—
"পারবে না-ই তো! কারণ আমি আমার বাবাইয়ের একমাত্র রাজকন্যা!"
মূসা চৌধুরী স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে মাথা
নাড়লেন—
"একদম ঠিক বলেছো, মা। তুমিই আমার একমাত্র রাজকন্যা।"
"দেখলে তো ভাইয়ু?"
হৃদী এবার নিজের ছোট্ট জিভটা বের করে ভেংচি কেটে ভাইকে দেখাল। আসিফ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বিড়বিড় করল—
"এক্কেবারে পিচ্চি একটা!"
হৃদী সিটের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে বলল—
"আমি একদম পিচ্চি না, বলে দিলাম!"
"তাহলে তুই কী?"
"আমি অনেক বড়!"
"তাই নাকি? তা কত বড়?"
হৃদী নিজের দুই হাত যতদূর সম্ভব টানটান করে ছড়িয়ে দিয়ে বলল—
"এত….. এত….. এত বড়!"
আবারও গাড়ির ভেতরের থমথমে বাতাস হাসিতে হালকা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হৃদী আসিফের কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা আলতো করে রাখাল। তার চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছিল। সে ফিসফিস করে বলল—
"ভাইয়ু..."
"হুম?"
"তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে না তো?"
আসিফ বোনের এই আচমকা প্রশ্নে বেশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল—
"হঠাৎ এই কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস, পিচ্চি?"
"এমনিই। বলো না, যাবে না তো?"
"না রে পাগল, কখনো যাব না।"
"প্রমিস?"
"হুম, প্রমিস।"
হৃদী এক গাল হেসে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই— পুরো গাড়িটা এক ভয়ানক ঝাঁকুনি দিয়ে অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। মূসা চৌধুরীর মুখের চওড়া হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তির টানে ওনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল। চাকাগুলো পিচের বুক চিরে ডানে-বামে মারাত্মকভাবে দুলতে শুরু করল।
ক্রিতীকা চৌধুরী প্রচণ্ড ভয় পেয়ে সামনের ড্যাশবোর্ড আর সিটটা দুহাতে আঁকড়ে ধরলেন—
"মূসা! কী হচ্ছে এসব? গাড়ি এমন করছে কেন? স্পীড কমাও!"
মূসা চৌধুরী নিজের পুরো শক্তি দিয়ে স্টিয়ারিং সোজা রাখার চেষ্টা করছেন, ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কণ্ঠে স্পষ্ট মৃত্যুর আতঙ্ক—
"ক্রিতীকা! ব্রেক কাজ করছে না! আমি... আমি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না!"
গাড়ির গতি কমার কোনো লক্ষণই নেই, বরং একটা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্পীডোমিটারের কাঁটা আরও দ্রুত উপরের দিকে উঠছে। হৃদী পেছনের সিট থেকে ছিটকে গিয়ে মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল—
"মাম্মাম... ও মাম্মাম!"
"হুম, আমার সোনা মা?"
"আমার... আমার খুব ভয় লাগছে, মাম্মাম!"
ক্রিতীকা চৌধুরীর চোখ ফেটে নোনা জল চলে এলো। তিনি নিজের শরীরটা যতটা সম্ভব পেছনের দিকে ঘুরিয়ে মেয়ের ছোট্ট মুখটা স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন—
"কিচ্ছু হবে না, সোনা। কিচ্ছু হবে না। মা আছে তো..."
কিন্তু ওনার নিজের কণ্ঠস্বরই তখন কাঁপছিল।
মূসা চৌধুরী রিয়ার-ভিউ মিররে শেষবারের মতো নিজের স্ত্রী আর সন্তানদের মুখের দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটোও তখন অশ্রুতে ভেজা। তিনি বুঝতে পারছিলেন, আর কোনো পথ নেই।
"ক্রিতীকা..."
"হুম, বলো?"
"আমি... আমি তোমাকে আর আমাদের সন্তানদের খুব ভালোবাসি।"
ক্রিতীকার গাল বেয়ে তখন অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি চোখ বন্ধ করে বললেন—
"আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি, মূসা।"
দুজনের চোখে তখন শুধু তাদের নিষ্পাপ সন্তানদের মুখ। আর ঠিক তখনই
এক বিকট, কানফাটানো শব্দে গাড়িটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারের রেলিং ভেঙে সজোরে পাশের একটা খাদের দিকে ছিটকে গেল। সবকিছু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটা ঝড়ের মতো ঘটে গেল। গাড়ির পেছনের লক হয়ে থাকা দরজাটা তীব্র ইমপ্যাক্টে খুলে গেল এবং ছোট্ট হৃদীর শরীরটা গাড়ি থেকে ছিটকে সোজা বাইরের শক্ত পিচ রাস্তার ওপর গিয়ে আছাড় খেল।
হৃদী নিজের শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল—
"মাআআআ!"
মাটিতে পড়েই তীব্র গতিবেগের কারণে সে কয়েকবার ডিগবাজি খেল এবং রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ইটের একটা ধারালো কোণায় তার মাথার পেছনটা সজোরে আঘাত করল। সাথে সাথে তার সেই ফর্সা কপাল আর মাথা চিরে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল। ছোট্ট মেয়েটা যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে সামনের দিকে নিজের হাতটা বাড়াল—
— "মা... মা... মাম্মাম… ভাইয়ূ…"
তার চোখের চারপাশের পৃথিবীটা আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে আসছিল। চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা শেষ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রক্তমাখা গালে। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা দুটো বন্ধ হয়ে গেল। পুরো পৃথিবীটা এক নিমিষে অন্ধকার হয়ে এলো, আর ছোট্ট হৃদী চৌধুরী অচেতন হয়ে পড়ে রইল সেই রক্তাক্ত, নিঝুম রাস্তার বুকে...
তখনই কেউ ধরফরিয়ে উঠে
"নাআআআ!"
এক তীব্র চিৎকার করে ঘুম ভেঙে গেল হৃদীর। সে ধড়ফড় করে নিজের বিছানার ওপর উঠে বসল। তার বুকটা কামারের হাপরের মতো অস্বাভাবিক দ্রুত ওঠানামা করছে। শ্বাসপ্রশ্বাস এত জোরে চলছে যে মনে হচ্ছে বুকটা এখনি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। কপাল আর ঘাড় বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে বিছানার চাদরে। কয়েক সেকেন্ড সে একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর নিজের কাঁপা কাঁপা দুই হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিল।
আবার... আবার সেই একই পুরনো স্বপ্ন। একই দুর্ঘটনা। সেই চাকার ঘর্ষণের শব্দ, সেই রক্ত, সেই কানফাটানো চিৎকার। আর সেই ছোট্ট মেয়েটা... যে নিজের মাকে শেষবারের মতো ডাকতে ডাকতে অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। হৃদী জোরে চোখ দুটো বন্ধ করল। ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো।
হৃদী চোখ বন্ধ রেখেই নিজের ভেতরের বিরক্তি আর গলার ভেজা ভাবটা চেপে ধরে কড়া গলায় বলল—
"দরজা খোলা আছে। ভেতরে আয়।"
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তিশা চৌধুরী। আজ তিশার পরনে ছিল একটি ডার্ক গ্রে রঙের স্মার্ট ফরমাল জ্যাকেট, ভেতরে ধবধবে সাদা শার্ট, নিচে ব্ল্যাক স্কিনি জিন্স আর পায়ে মানানসই সাদা স্নিকার্স। চুলগুলো পেছনে পনিটেল করা।
তিশা রুমে ঢুকেই নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
"কিরে মহারানী? আজ কি ভার্সিটি যাবি না? ক্লাসের সময় তো পার হয়ে যাচ্ছে!"
হৃদী তিশার কথার কোনো উত্তর দিল না। সে বিছানার চাদরটা একপাশে সরিয়ে পা দুটো নিচে নামিয়ে চুপচাপ বসে রইল। তিশা হৃদীর এই গম্ভীর ভাব দেখে একটা ভ্রু কুঁচকে ওনার সামনে এসে দাঁড়াল—
"হুম? কী হলো? কথা বলছিস না কেন?"
"যাব।"
হৃদী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।
"তাহলে এমন দেবদাসের মতো মুখ করে বসে আছিস কেন সকাল সকাল?"
"এমনিই।"
তিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব ভালো করেই জানে হৃদীর এই রূপের মানে কী। সে হৃদীর একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল—
"হৃদী, আমার কথা শুন তো একটু।"
"শুনছি, বল।"
"তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস?"
"না।"
"তাহলে তোর মুখটা সবসময় এমন তিতা করলার মতো হয়ে থাকে কেন?"
"আমার মুখ জন্ম থেকেই এমনই।"
"কালকের ওই ছোটখাটো জেনুইন ম্যাটারটার জন্য তুই এখনো রাগ করে আছিস, তাই না?"
"বললাম তো, না।"
তিশা নিজের মাথা চুলকাল, তারপর বেশ অসহায় একটা মুখ করে বলল—
"আচ্ছা বাবা, সরি ইয়ার! একদম কান ধরে সরি বলছি। দেখ, তুই তো আমার কলিজা, তাই না? এখন থেকে তুই যা বলবি, তোর সব কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে শুনব। এবার তো একটু হাস!"
হৃদী চরম বিরক্ত হয়ে তিশার দিকে তাকিয়ে বলল—
"প্রতিদিন সকালে এসে একই স্ক্রিপ্টের কথা বলতে তোর নিজের বোরিং লাগে না? আমার ভালো লাগে না এসব।"
"আচ্ছা ঠিক আছে, আজ যদি তুই ক্লাস ফাঁকি দিতে বলিস—আমি এক পায়ে রাজি! ম্যামের ক্লাস বাঙ্কার মারব!"
"কোনো লাগবে না।"
"চল, তোকে তোর প্রিয় ক্যাফে থেকে কফি খাইয়ে আনি?"
"নিজের টাকায় কফি কিনে খাওয়ার মতো যোগ্যতা আমার আছে।"
"আচ্ছা বাবা, প্রমিস করছি—আজ থেকে পুরো এক সপ্তাহ আমি তোর সাথে কোনো বিষয়ে একটা সিঙ্গেল ঝগড়াও করব না। এবার তো রাগটা ভাঙবি?"
হৃদী ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তিশার চোখের দিকে নিজের রহস্যময় চোখ দুটো তুলে একবার তাকাল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—
"তুই কি তোর এই ফালতু কথা বাড়ানোটা একটু বন্ধ করবি?"
আর তার পরের মুহূর্তেই ওয়াশরুমের দরজাটা সে তিশার মুখের ওপর সজোরে বন্ধ করে দিল। তিশা হতবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের রাগটা সামলাতে না পেরে বিছানার ওপর গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল এবং ব্যাগ থেকে ফোন বের করে স্ক্রল করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ভার্সিটির অফিশিয়াল গ্রুপ থেকে একের পর এক মেসেজের নোটিফিকেশন আসতে দেখে তিশা দ্রুত টাইপ করল—
"আসছি।"
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখতেই— ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে গেল। তিশা মাথা তুলে তাকাল।
ভেতর থেকে বের হয়ে এলো এক সম্পূর্ণ অন্য রূপের হৃদী চৌধুরী। পরনে ড্যাশিং একটা সাদা লেদার জ্যাকেট, ভেতরে কালো টপস, নিচে ফিটেড ব্ল্যাক জিন্স আর চোখে তার সেই সিগনেচার পাতলা মেটালের ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচের ওপাশে তার চোখ দুটো হেডলাইটের আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে—ডান চোখটা এক অদ্ভুত অতিপ্রাকৃতিক সবুজাভ Hazel-Green রঙের, আর বাম চোখটা একদম গাঢ় কুচকুচে বাদামী। হৃদী নিজের নাকের ওপর চশমাটা একটু ঠিক করে পরে বলল—
"চল।"
তিশা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গ করে বলল—
"ওহ! অবশেষে আমাদের মহারানীর মৌনব্রত ভাঙল তাহলে!"
হৃদী অত্যন্ত শীতল ও ধারালো গলায় বলল—
"বেশি কথা বললে কিন্তু আমি তোকে এখানেই ফেলে একাই গাড়ি নিয়ে চলে যাব।"
হৃদী দরজার দিকে হনহন করে হাঁটতে লাগল। তিশা নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলতে তুলতে তার পেছনে পেছনে গিয়ে বিড়বিড় করল—
"দেখিস, একদিন না একদিন তোর এই পাথর মুখ দিয়ে আমি টানা দশ লাইনের কথা বের করিয়েই ছাড়ব!"
হৃদীর ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত ক্ষীণ একটা বাঁকা হাসি ফুটল, কিন্তু তিশা পেছনে থাকায় সেটা দেখতে পেল না।
★★★
কালো রঙের চকচকে হাই-স্পিড স্পোর্টস কারটা তীব্র গতিতে ভার্সিটির প্রধান লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে এসে প্রবেশ করল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে অত্যন্ত পারফেক্ট গ্রিপে হাত রেখে বসে আছে হৃদী চৌধুরী, আর পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে তিশা চৌধুরী। গাড়িটা নিখুঁত একটা ব্রেক কষে পার্কিং লটে থামতেই দুজন নেমে এল। তিশা নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হৃদীর পাশে এসে দাঁড়াল।
"চল দ্রুত, আজকে যা খড়খড়ে মেজাজ ওনার, লেট হলে ম্যাম আমাদের জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।"
"হুম।"
"উফ হৃদী! তোর এই এক লাইনের 'হুম' রোগটা কবে যাবে বল তো?"
"যখন তুই পৃথিবীতে তোর এই অতিরিক্ত অনর্থক কথা বলা বন্ধ করবি, তখন।"
দুজন আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা করিডোর দিয়ে হেঁটে ক্লাসরুমের দিকে চলে গেল। ক্লাসে ঢুকে হৃদী আর তিশা একদম পেছনের সারির নিজেদের চেনা সিটটাতে গিয়ে বসল। ক্লাস শুরু হলো। তিশা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ম্যামের লেকচার শুনছে আর খাতায় নোট নিচ্ছে, আর ওদিকে হৃদী নিজের মোটা টেক্সট বইটা খুলে বেঞ্চের ওপর খাড়া করে মাথার সামনে তুলে রেখে মনের সুখে চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে।
ঠিক বিশ মিনিট পর— পুরো ক্লাসরুম ম্যামের তীক্ষ্ণ ও কর্কশ কণ্ঠস্বরে কেপে উঠল—
"মিস হৃদী চৌধুরী!"
হৃদী অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে চোখের সামনে থেকে বইটা নিচে নামাল। তার চোখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। সে শান্ত গলায় বলল—
"জি, ম্যাম?"
"আপনি কি আমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসে বসে ঘুমাচ্ছেন?"
"সম্ভবত।"
হৃদীর এই সোজাসাপ্টা ও বেপরোয়া জবাবে পুরো ক্লাসরুম এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই পেছনে ঘুরে হৃদীর দিকে তাকাল। তিশা লজ্জায় আর রাগে নিজের কপালে হাত চাপল।
ম্যামের ইগোতে এবার প্রচণ্ড আঘাত লাগল, ওনার ফেস রাগে লাল হয়ে গেল—
"হোয়াট অ্যান অডাসিটি! এই নোংরা ম্যানার্স আর শিক্ষাই কি পেয়েছেন আপনি আপনার বাবা-মায়ের কাছ থেকে?"
'বাবা-মা' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই হৃদীর চোখের পাতাটা মাত্র একবার কেপে উঠল। মাত্র একবার। আর তার পরের মুহূর্তেই তার চোখের সেই দুই রঙের মণি দুটো যেন জ্যান্ত বরফ হয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর এক ধাক্কায় নরকের চেয়েও ঠান্ডা শুনিয়ে গেল—
"আমার ফ্যামিলিকে এই নোংরা আর সস্তার তর্কের ভেতর টানার চেষ্টা ভুলেও করবেন না, ম্যাম। নিজের লিমিটের মধ্যে থাকুন।"
ম্যাম নিজের লাইফে কোনো ছাত্রীর কাছ থেকে এমন থ্রেড শোনেননি। ওনার পুরো শরীর অপমানে কাঁপতে লাগল—
"গেট আউট! জাস্ট গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস রাইট নাও!"
"ওকে। থ্যাংকস।"
একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ব্যাগটা এক কাঁধে তুলে নিয়ে ম্যামের চোখের দিকে তাকিয়ে ক্লাস থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল হৃদী। তিশা তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে টেবিলের নিচে চুপিচুপি নিজের ফোনটা বের করল। সে স্ক্রিনে কারো নাম সিলেক্ট করে দ্রুত কল দিয়ে ওপাশে অত্যন্ত নিচু অথচ কড়া গলায় বলল—
"কাজটা এখনই, এই মুহূর্তের মধ্যে হওয়া চাই। ডিল ইট!"
ক্লাস শেষ হতেই তিশা প্রায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। করিডোরের দেয়ালের এক কোণে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত পকেটে পুরে একদম নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল হৃদী। তিশা দ্রুত ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল—
"হৃদী জান, মাই বেবি! রাগ করিস না প্লিজ!"
"কী চাস?"
"চল না, আজকে একটু কোথাও বসি? একটু কথা বলি দুজনে?"
"মুড নেই।"
"উফ! তুই সবসময় এত পাষাণ আর এমন খিটখিটে কেন থাকিস রে?"
"জন্মগত সমস্যা। হরমোনাল ডিফেক্ট।"
"একদম বড় বড় ড্রামাবাজি করবি না আমার সাথে। চল এখন!"
এই বলেই তিশা জোর করে হৃদীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিয়ে করিডোর ধরে হাঁটতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই করিডোরের অন্য প্রান্ত থেকে হঠাৎ বিশাল হৈচৈ আর গুঞ্জন শোনা গেল। অফিসের এক পিয়ন নোটিশ বোর্ড একটা কাগজ সেঁটে দিতেই চারপাশের ছাত্র-ছাত্রীরা চিৎকার করে উঠল—
যে ম্যাম মাত্র কয়েক মিনিট আগে হৃদীকে ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছিলেন, ওনাকে নাকি উপর মহলের অর্ডারে সাময়িক বরখাস্ত (Suspend) করা হয়েছে! বরখাস্তের অফিশিয়াল নোটিশ অলরেডি ওনার হাতে পৌঁছে গেছে!
করিডোরের সবাই এই আকস্মিক ঘটনায় স্তব্ধ ও অবাক, শুধু হৃদী ছাড়া। সে এক পলক তিশার মুখের দিকে তাকাল, যে মুখে এখন এক বিজয়ী শয়তানি হাসি খেলা করছে। হৃদী নিজের ঠোঁটের কোণে একটা চেনা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল—
"ক্যান্টিনে যাবি?"
তিশা নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে অবাস্তব চোখে তাকাল—
"তুই সিরিয়াসলি বলছিস? হৃদী চৌধুরী নিজে থেকে ক্যান্টিনে যাওয়ার অফার দিচ্ছে?"
"আমার খুব খিদে পেয়েছে।"
বলেই তিশার হাত ছেড়ে নিজের মতো ধীর পায়ে ক্যান্টিনের দিকে হাঁটতে শুরু করল হৃদী। পেছনে দাঁড়িয়ে তিশা মাথা নেড়ে মুচকি হেসে বিড়বিড় করল—
"যত সব ন্যাকামো!"
★★★
ক্যান্টিনের একদম ভেতরের দিকের একটা কোণায় ভার্সিটির পলিটিক্যাল লিডারের ছেলে রায়ান খান তার দুই চামচাকে নিয়ে একটা সাধারণ ঘরের জুনিয়র মেয়ের পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার শরীর ভয়ে কাঁপছে, সে স্পষ্ট অস্বস্তিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।
রায়ান মেয়েটার একদম মুখোমুখি বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে এক নোংরা হাসি হাসল—
"কী ব্যাপার সুন্দরী? আমাদের দেখে এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমরা কি বাঘ নাকি?"
মেয়েটা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে কাঁপতে থাকা গলায় বলল—
"প্লিজ রায়ান ভাইয়া, আমাকে যেতে দিন। আমার ক্লাসের টাইম হয়ে গেছে।"
"যেতে তো দেবই। কিন্তু তার আগে আমাদের সবাইকে একটু ভালো করে কফি খাওয়াও, তারপর ভেবে দেখব।"
মেয়েটার চোখ দিয়ে এবার টপটপ করে পানি চলে এলো। পুরো ক্যান্টিনের কেউ রায়ানের ক্ষমতার ভয়ে এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছিল না। আর ঠিক তখনই, টেবিল থেকে পানির গ্লাস নামিয়ে রেখে সোজা রায়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল হৃদী চৌধুরী। তার পেছনে তিশা।
হৃদী তার সেই দুই রঙের চোখের ধারালো দৃষ্টি রায়ানের ওপর ফেলে শীতল কণ্ঠে বলল—
"ওর রাস্তাটা ছাড়ো। ওকে যেতে দাও।"
পুরো ক্যান্টিন এক সেকেন্ডে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান খান বেশ অবাক হয়ে ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা ঘুরিয়ে হৃদীর দিকে তাকাল। তারপর সাদা জ্যাকেট আর দুই রঙের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে হাসল—
"আর আমি যদি না ছাড়ি? তখন কী করবে, শুনি?"
হৃদী নিজের চোখের চশমাটা এক আঙুলে একটু ওপরে তুলে নির্বিকার মুখে বলল—
"তাহলে নিজের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়—রাস্তা ছাড়তে বাধ্য হবি।”
রায়ান এবার নিজের দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে হৃদীর একদম গা ঘেঁষে এক পা এগিয়ে এলো—
"তুমি কি এই রায়ান খানকে অর্ডার দিচ্ছো, মেয়ে?"
"হ্যাঁ, দিচ্ছি। কারণ মানুষের হাঁটার রাস্তা আটকে কুত্তার মতো দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা এটা না। এটা ভার্সিটি।"
"হাহা! বেশ মজার মেয়ে তো !"
তখনই বিকটা আওয়াজ এলো। এক তীব্র আর কানফাটানো চড়ের শব্দে পুরো ক্যান্টিনের বাতাস যেন থমকে গেল। রায়ানের মুখটা এক ঝটকায় ডান দিকে ঘুরে গেল। ফর্সা গালে লাল হয়ে পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট একটা ছাপ বসে গেছে। রায়ানের সামনে এখন ডান হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে তিশা চৌধুরীর চোখে তখনও জ্যান্ত আগুন জ্বলছে।
তিশা নিজের হাতটা ঝেড়ে কড়া গলায় বলল—
"মুখ সামলে কথা বলবি, রায়ান খান! নিজের ওই নোংরা জিবটা সীমার মধ্যে রাখ!"
রায়ান ধীরে ধীরে নিজের মুখটা তিশার দিকে ফিরিয়ে আনল। ওনার চোখ দুটো এখন রাগে আর অপমানে একদম রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। সে নিজের গালে হাত বুলিয়ে এক হিংস্র হাসি হেসে বলল—
"তুই... তুই এই রায়ান খানকে সবার সামনে চড় মারলি?"
তিশা নিজের দুই হাত বুকের সামনে শক্ত করে ভাঁজ করে এটিউড নিয়ে বলল—
"না রে সোনা, চড় মারব কেন? আদর করেছি মাত্র। কেন, আরেকটা গাল খালি আছে? ওটাতেও একটু আদর চাই নাকি?"
"নিজেকে কী মনে করিস তুই, হ্যাঁ?"
"আমি নিজেকে একজন সুস্থ মানুষ মনে করি। তোর মতো কোনো নোংরা জানোয়ার মনে করি না।"
রায়ান দাঁতে দাঁত চেপে আরও এক পা সামনে এগোল—
"আমার ক্ষমতা আর আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে তুই খুব কম জানিস, তিশা চৌধুরী।"
"উফ! তোর সম্পর্কে যতটুকু ছাই-পাঁশ জানি, তোকে জুতো মেরে গরু দান করার জন্য সেটাই যথেষ্ট।"
"ওহ! তার মানে তুই আমাকে নিয়ে আড়ালে বেশ ভালোই রিসার্চ করিস নাকি?"
"তোর মতো একটা থার্ড ক্লাস সস্তার ছেলেকে নিয়ে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করার ফালতু ইচ্ছে আমার লাইফে কোনোদিন নেই।"
"কিন্তু তোর তো দেখছি সকাল-বিকাল আমাকে নিয়েই সব মাথাব্যথা!"
— "ভুল। একদম ভুল ধারণা তোর। আমার মাথাব্যথা তোর মতো সস্তার মালের জন্য না, আমার মাথাব্যথা তোর এই নোংরা আর ইতর কাজকর্মগুলোর জন্য।"
— "বড় বড় ডায়লগ মারতে পারিস বেশ, দেখতে পাচ্ছি।"
"আর তুই নিজের বড়লোক আর রাজনৈতিক বাপের নাম ভাঙিয়ে এখানে দালালি করে ঘুরিস বেশ, সেটাও সবাই দেখে।"
রায়ান নিজের চোয়াল শক্ত করে আঙুল তুলল—
"আমার বাবাকে এই ড্রামার মধ্যে টানবি না বলে দিলাম!"
"তাহলে তুইও তোর ওই বাপের অবৈধ ক্ষমতার জোর ব্যবহার করে দুর্বল মেয়েদের ভয় দেখানো বন্ধ কর!"
— "আমি কাউকে ভয় দেখাই না, নিজের ইমেজে চলি।"
"হ্যাঁ, সবাই তো স্বেচ্ছায় তোর ওই কুৎসিত নামটা শুনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ডাস্টবিনে গিয়ে লুকায়!"
তিশা এবার নিজের তর্জনী আঙুলটা রায়ানের নাকের সামনে তুলে স্পষ্ট ওয়ার্নিং দিয়ে বলল—
"ভালোর ভালোয় শুনে রাখ রায়ান, আজকে তোকে স্রেফ একটা চড় মেরে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু নেক্সট টাইম যদি আর কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে এমন ছোটলোকি ব্যবহার করতে দেখি..
তো!"
"তুই কী করবি শুনি? কী ওখড়াবি আমার?"
"প্রয়োজন হলে তোকে এই পুরো ভার্সিটির হাজারটা মানুষের সামনে জুতোপেটা করে নগ্ন করে অপমান করব। তিশা চৌধুরী যা বলে, তা করে দেখায়।"
"ওহ বাবা! আমি তো ভয়ে একদম প্যান্টে ভিজিয়ে দিলাম!"
"দেওয়া উচিত। কারণ তোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।"
রায়ান একটা কৃত্রিম হাসি হেসে মাথা নেড়ে বলল—
"তুই সবসময় এমন পাগলী আর একরোখা?"
"আর তুই কি জন্ম থেকেই সবসময় এত বেশি বিরক্তিকর আর ঘেন্নাধরা?"
"আজ পর্যন্ত এই ক্যাম্পাসে আমার সাথে কেউ এভাবে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পায়নি।"
— "তাহলে আজ থেকে সেই অভ্যাসটা নতুন করে তৈরি করে নে। কারণ এখন থেকে প্রতিদিন তোকে এই ডোজটা গিলতে হবে।"
কথাটা শেষ করেই তিশা এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল—
"হৃদী, চল। এখানে বাতাসের অক্সিজেন নষ্ট হচ্ছে।"
হৃদী এতক্ষণ ধরে রায়ানের প্রতিটি মুভমেন্ট নিজের সেই শান্ত, শীতল দুই রঙের চোখ দিয়ে অবজেক্ট করছিল। সে রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব ভারী ও নিচু গলায় বলল—
"চল, এই সস্তার মালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে নিজের সময়টার অপচয় করা।"
তারা দুজন ধীর পায়ে ক্যান্টিনের এক্সিট গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পরই পেছনের অন্ধকার থেকে রায়ানের হিংস্র কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এলো—
"এই তিশা! তোর কলিজার পাটা আর সাহস আছে, এটা কিন্তু মানতেই হবে রে!”
তিশা এক সেকেন্ডের জন্যও পিছনে না তাকিয়েই হেঁটে যেতে যেতে ডান হাত তুলে জবাব দিল—
"আর তোর মাথায় বিন্দুমাত্র আক্কেল আর মনুষ্যত্ব নেই, এটাও পুরো দুনিয়াকে মানে রে…হ!”
চারপাশের টেবিল থেকে আবারও রায়ানের চামচাদের মুখ কালো করে হাসির রোল উঠল। রায়ান নিজের গালে হাত দিয়ে রাগে আর অপমানে ফুঁসতে ফুঁসতে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তবুও জ্বলন্ত হিংস্র দৃষ্টিটা চড় মারা তিশার ওপর নয়, অদ্ভুত এক আকর্ষণে বারবার গিয়ে থমকে যাচ্ছিল দুই রঙের চোখের অধিকারী, সেই রহস্যময়ী নারীর উপর, শান্ত পাথর-মুখো মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
“ এই মেয়েটা আসলে কে? বড্ড চেনা….”
চলবে..........
1 Reply
August 17, 2026 1:54 pm
Part:02
দুপুরের কড়া রোদ মাথায় নিয়ে চৌধুরী ভিলার বিশাল মেইন ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকল হৃদী আর তিশা। দুজনেই সবেমাত্র ভার্সিটি থেকে ফিরেছে। তিশা নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ড্রয়িংরুম থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
"তিশা!"
শব্দটা শুনে তিশা ওখানেই থেমে গেল এবং ঘুরে তাকালো। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ছিলেন রাশেদ চৌধুরী। তার অবয়বে চরম গাম্ভীর্য।
তিশা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল—
"জি,ড্যাড?"
রাশেদ চৌধুরী কড়া গলায় বললেন—
"ভার্সিটিতে গিয়েছো নিজের বাপের ক্ষমতা দেখাতে নাকি পড়াশোনা করতে?"
তিশা বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে সরাসরি উত্তর দিল—
"দুটোই করতে, ড্যাড ।"
কথাটা শুনে রাশেদ চৌধুরীর মুখ রাগে আরও শক্ত হয়ে গেল। এবার তার চোখ সোজা গিয়ে থামলো হৃদীর ওপর। হৃদীকে দেখা মাত্রই রাশেদ চৌধুরীর ভেতর এতদিন ধরে জমে থাকা বিরক্তি যেন একসাথে বেরিয়ে এলো। তিনি তীব্র কড়া গলায় বললেন—
"নিজের বাপ-মাকে খেয়েছে তো খেয়েছিস। এখন আমার মেয়েটাকে খাওয়ার ধান্দা। ওইদিন মরে গেলেই পারতি। আর জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করা লাগতো না।
পুরো সোফার রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিশা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
আর হৃদী... সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার অতীত আর মা-বাবাকে নিয়ে বলা এই নোংরা কথাগুলো শোনার পর সে ধীরে ধীরে মাথা তুললো। এই মুহূর্তে তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত। আর সেই শান্তির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর কিছু।
হৃদী আর সহ্য করতে পারলো না। সে এক পা সামনে এগিয়ে এসে অত্যন্ত নিচু অথচ ধারালো গলায় সোজা উত্তর দিয়ে বলল—
"নিজেকে শহরের রাজা মনে করেন চৌধুরী সাহেব। দাবার চাল কিন্তু উল্টো হতে সময় লাগে না। আমি চুপ আছি, চুপ থাকতে দিন। ভুলে গর্ত থেকে সিংহকে জাগ্রত করবেন না। না হলে এর ফল হারে হারে টের পাবেন। কথাটা মাইন্ড ইট!"
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ একটুও উঁচু হয়নি। কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন ড্রয়িংরুমের ভারী বাতাস কাঁপিয়ে দিল। রাশেদ চৌধুরী কয়েক মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
হৃদী আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালো না। এই সাধারণ হুঁশিয়ারিটা দিয়ে সে সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
"হৃদী!"
তিশা পেছন থেকে চিৎকার করে ডাকলো।
"হৃদী! দাঁড়া!"
কিন্তু হৃদী একবারও পেছনে তাকালো না। সে দরজার লক খুলে তরতরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। তিশা অত্যন্ত অসহায় চোখে সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর সে ধীরে ধীরে বাবার দিকে ফিরে তাকালো এবং শান্ত অথচ শক্ত গলায় বলল—
"কাজটা ঠিক করলে না।"
এর বেশি সে আর কিছু বলল না। সোজা নিজের রুমে চলে গেল। আর পেছনে পুরো ড্রয়িংরুমে নেমে এলো এক ভারী এবং দমবন্ধ করা নীরবতা...
★★
খান ম্যানশন....
খান ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার বিশাল রুমটা এলোমেলো হয়ে আছে। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে বই, ফাইল, ফুলদানি আর টেবিল ল্যাম্প। রাগে একের পর এক জিনিস ছুড়ে ফেলছে রায়ান মাহির খান। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে আছে, মুখে স্পষ্ট অপমানের ছাপ।
আরেকটা দামি শোপিস গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। রায়ান দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠল—
"তিশা চৌধুরী! আমি তোকে ছাড়বো না! এই থাপ্পড়ের বদলা আমি নিবোই! সবার সামনে রায়ান খানকে অপমান করার মূল্য তোকে দিতেই হবে!"
ঠিক তখনই রুমের দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেন শাহরিয়ার খান—খান গ্রুপের চেয়ারম্যান আর রায়ানের বাবা। ঘরে ঢুকেই তিনি চারপাশের ধ্বংসস্তূপের ওপর একবার চোখ বুলালেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন—
"শান্ত হও, বেটা।"
রায়ান চরম বিরক্ত হয়ে বাবার হাত থেকে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিল।
"ড্যাড, তুমি জানো আজকে ভার্সিটির ক্যান্টিনে কী হয়েছে?"
"জানি।"
"ওই তিশা চৌধুরী আমাকে সবার সামনে..."
শাহরিয়ার খান হাত তুলে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। তার ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন—
"বিষয়টা আমি দেখছি। রাশেদ চৌধুরীর এত কলিজা হয়নি যে আমার সাথে খেলবে।"
বাবার মুখে এই আশ্বাস শুনে রায়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
"কিন্তু ড্যাড..."
"কোনো কিন্তু না।"
শাহরিয়ার খান নিজের পকেট থেকে একটা চকচকে ব্ল্যাক কার্ড' বের করে ছেলের হাতে দিলেন।
"জাস্ট এনজয় করো। এখানে যত খুশি আনলিমিটেড খরচ করার মতো টাকা আছে।"
কার্ডটা হাতে পেয়ে রায়ানের অপমানে জ্বলতে থাকা মুখে অবশেষে একটা ক্রুর হাসি ফুটল।
"থ্যাঙ্কস, ড্যাড।"
"দ্যাটস মাই বয়।"
শাহরিয়ার খান আর কথা না বাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দরজাটা বন্ধ হতেই রায়ান ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসল। দামি ব্ল্যাক কার্ডটা নিজের লম্বা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে লাগল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। সেই হাসিতে যেমন দুষ্টুমি ছিল, তেমনি ছিল অহংকার আর এক তীব্র বিপদের ইঙ্গিত। সে কার্ডটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
"শান্ত? মাই ফুট! এবার আসল খেলা হবে।"
তার চোখের সামনে এই মুহূর্তে বারবার ভেসে উঠছে তিশার সেই উদ্ধত মুখ। ক্যান্টিনের সেই চরম তর্ক, সেই চড় আর তিশার চোখের সেই জ্যান্ত আগুন। রায়ান হালকা হেসে মাথা নাড়ল—
"তিশা চৌধুরী... এবার কী হবে তোর?"
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে শূন্যে তাকিয়ে আবার বিড়বিড় করল—
"বাট... আই লাইক ব্লুবেরি..."
হুট করে এই কথাটা সে কেন বলল? সেটা সে নিজেও জানে না.....
★★
শহরের এক অন্ধকার প্রান্তে...
একটি নির্জন ও নিঝুম ঘর। পুরো ঘরজুড়ে এক থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। পরিবেশটা এতটাই নীরব যে, দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি টিকটিক শব্দও সেখানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো শক্ত করে টানা, ফলে বাইরের পৃথিবীর কোনো আলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। পুরো ঘরের আলোর একমাত্র উৎস টেবিলের ওপর রাখা একটি ক্ষীণ, টিমটিমে হলুদ বাতি।
সেই আবছা আলো-ছায়ার খেলায় দেখা গেল— একজন রহস্যময় ব্যক্তি চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার মুখাবয়ব পুরোপুরি অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। তবে কে সে? এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত এক গভীর রহস্য।
তার ডান হাতে রয়েছে রেড ওয়াইন গ্লাস, যা থেকে ক্ষণে ক্ষণে গ্লাসটা চারদিকে ঘুরাচ্ছে। আর তার বাম হাতে ধরা একটি মারাত্মক ধারালো নাইফ বা ছুরি। নাইফটা অত্যন্ত নিখুঁত দক্ষতায় আঙুলের ফাঁকে ঘোরাতে ঘোরাতে সে শান্ত চোখে সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল।
টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে একটি দাবার বোর্ড। লাল আর কালো ঘুঁটিগুলো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেন কোনো এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চূড়ান্ত অপেক্ষায় আছে।
হঠাৎ রহস্যময় মানাব এক অবিশ্বাস্য ঝটকায় হাতের নাইফটা সামনের দিকে ছুড়ে মারল। ছুরিটা সুতীব্র গতিতে বাতাস চিরে সোজা গিয়ে গেঁথে গেল দাবার বোর্ডের একটি ঘুঁটির ঠিক পাশে। বোর্ডে কম্পন সৃষ্টি হলো।
দাবার বোর্ডের ঠিক পাশেই রাখা ছিল কয়েকটি গোপন ছবি। তার মধ্যে সবার ওপরে জ্বলজ্বল করছে— রাশেদ চৌধুরীর ছবি।
মানবটি অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে চুরুটের ধোঁয়ার আড়াল থেকে রাশেদ চৌধুরীর ছবিটার দিকে তাকাল। ওনার ঠোঁটের কোণে এক ক্রুর ও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত শীতল, ফিসফিস করে বলল—
"You've grown too much.
But when the time comes...
The tiger will walk into the cage itself.
For now... patience."
কথাগুলো শেষ করেই সে হাতের ওয়াইনে শেষবারের মতো আরেকটা জোরালো চুমুক দিল। তারপর হাতের ক্লাসটা সোজা মেজেতে আছাড় মেরে দিলো। আর তার পরের মুহূর্তেই... সে হঠাৎ তীব্র ও বিকট শব্দে জোরে হেসে উঠল—
"হা... হা... হা...!"
সেই পৈশাচিক হাসি পুরো বন্ধ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। অত্যন্ত ভয়ংকর, তীব্র অস্বস্তিকর সেই হাসি! যেন বহু বছরের বুকে চেপে রাখা প্রতিশোধের এক লেলিহান আগুন সেই হাসির প্রতিটি তরঙ্গে লুকিয়ে আছে।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই— আবারও সবকিছু এক নিমিষে একদম শান্ত হয়ে গেল। ঘরের ভেতর আবার সেই চেনা দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এলো।
শুধু দাবার বোর্ডের ওপর গেঁথে থাকা তীক্ষ্ণ নাইফটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চকমক করে উঠল। আর রাশেদ চৌধুরীর ছবির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল অন্ধকারের সেই অজানা মানুষটি.....
★★
বিকেলের রোদটা আজ অস্বাভাবিক তীব্র। ইতালির এই রোম শহরে বছরের বেশিরভাগ সময় আবহাওয়া কনকনে ঠান্ডা থাকলেও গত দুদিন ধরে গরমটা বেশ ভালোই পড়েছে। পিচ ঢালা চওড়া রাস্তা ধরে হৃদী একা হেঁটে চলেছে। উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে সে তার সাদা টপের ওপর থাকা ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেটটা খুলে কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। চোখে সেই সিগনেচার পাতলা ফ্রেমের চশমা। মুখাবয়ব পাথরের মতো গম্ভীর। দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে আর ওমুখো হয়নি। মাথার ভেতর অবিরাম হাতুড়ির মতো পিটছে রাশেদ চৌধুরীর সেই বিষাক্ত কথাগুলো।
ঠিক তখনই টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে কানফাটানো শব্দ তুলে চার-পাঁচটি হাই-স্পিড স্পোর্টস বাইক এসে হৃদীর ঠিক সামনে আড়াআড়িভাবে ব্রেক কষল। ধুলো উড়িয়ে পথ আটকে দাঁড়াল তারা। হৃদী নিজের পায়ের গতি থামাল। তার চোখে এক ফোঁটা ভয়ের লেশ নেই, বরং এক তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠল। একে একে বাইক থেকে নামতে লাগল কয়েকজন উগ্র চেহারার ছেলে। আর সবার শেষ ধীর পায়ে বাইক থেকে নেমে হেলমেটটা খুলল রায়ান মাহির খান।
মুখে সেই চেনা অহংকারী বাঁকা হাসি। চুলগুলো হাত দিয়ে একঝাঁক ঝাঁকিয়ে ধীরে ধীরে হৃদীর দিকে এগিয়ে এলো সে। তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার হৃদীকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—
"কী ব্যাপার চৌধুরী বাড়ির ছোট মেয়ে? বাড়িতে বুঝি আর ঠাঁই হয়নি? তা রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এভাবে ফকিরের মতো রাস্তায় রাস্তায় কেন হাঁটছো?"
হৃদী সম্পূর্ণ নির্বিকার। তার দুই রঙের চোখ দুটো চশমার আড়াল থেকে রায়ানের দিকে স্থির লক্ষ্য রাখল। অত্যন্ত ধারালো ও কড়া গলায় সে বলল—
"আগে নিজের এই নোংরা মুখ আর বাজে কথা বন্ধ কর, রায়ান খান। তারপর আমার রাস্তা থেকে সর। এমনিতেই আজ আমার মুড অফ, চুপচাপ শান্ত আছি। না হলে ইউ আর জাস্ট ফিনিশড!"
রায়ান এক মুহূর্ত স্তব্ধ হলেও পরক্ষণেই উচ্চস্বরে হেসে উঠল—
"ওহ বাবা! আমি তো ভয়ে একদম কেঁপেই গেলাম! কিন্তু শোনো মেয়ে, আমি এখানে তোমার সাথে কোনো চক্কর বা নোংরা খেলা খেলতে আসিনি। আমি এসেছি ওই লিলি ফুটের সাথে আমার ক্যান্টিনের হিসাবটা চুকিয়ে নিতে।"
লিলি ফুট শব্দটা শুনতেই হৃদীর দুই জোড়া ঘন ভ্রু কুঁচকে গেল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল রায়ান তিশার কথাই বলছে। হৃদীর কণ্ঠস্বর এবার আগের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ঠান্ডা আর গম্ভীর হয়ে গেল। সেই ঠান্ডার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক চরম বিপদ সংকেত। সে বলল—
"তিশার নাম আরেকবার নিজের এই অপবিত্র মুখে নিলে জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলব। এটাই লাষ্ট ওয়ার্নিং।"
রায়ান কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওর পেছন থেকে রায়ানের এক চামচা এসে আচমকা হৃদীর কাঁধে হাত রাখল।
পরের ঘটনাটা ঠিক কত সেকেন্ডে আর কীভাবে ঘটল, তা উপস্থিত কেউ চোখের পলকে বুঝতেই পারল না। হৃদী বিদ্যুৎ গতিতে নিজের ডান হাত দিয়ে ছেলেটার কব্জিটা চেপে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে নিজের শরীরটা পুরো ঘুরিয়ে দিল। ছেলেটা নিজের ভারসাম্য হারিয়ে বিকট শব্দে শক্ত পিচ রাস্তার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে যন্ত্রণায় কোঁকাতে লাগল। এক নিমেষে পুরো চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ানের মুখের সেই চওড়া শয়তানি হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। সে চমকে উঠে বলল—
"ওহ... তাই নাকি? এত জোর!"
হৃদী এবার অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে নিজের চোখের চশমাটা খুলল। তারপর সেটা ভাঁজ করে পকেটে রেখে রায়ানের সঙ্গীদের দিকে তাকাল। তার ডান চোখটা সেই অদ্ভুত সবুজাভ মণি আর বাম চোখটা গাঢ় বাদামী মণি—দুটো এক সাথে জ্যান্ত আগুনের মতো জ্বলছে। সে শীতল গলায় বলল—
"শেষবারের মতো বলছি। রাস্তা ছাড়।"
কিন্তু রায়ানের একটা ইগো আছে, ওর সিগন্যালে কেউ এক পা-ও সরল না। পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। রায়ানের বাকি চারজন ছেলে একসাথে হৃদীর দিকে তেড়ে গেল।
কয়েক মিনিট পর...
রাস্তার ধুলোবালি তখন শান্ত হয়েছে। রায়ানের সঙ্গীরা আর আগের মতো দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। কেউ মাটিতে বুক চেপে ধরে কোঁকাচ্ছে, কেউ নিজের মচকানো হাত ধরে রাস্তার পাশে বসে পড়েছে। আর রায়ান? সে নিজের জায়গায় একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে এই প্রথমবার কোনো অহংকার নেই, আছে কেবল তীব্র বিস্ময় আর একরাশ ভয়! কারণ সে আজ নিজের হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে—হৃদী চৌধুরীকে সে যতটা সহজ, শান্ত আর দুর্বল ভেবেছিল, এই মেয়েটা আসলে তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি বিপজ্জনক!
হৃদী কোনো হন্তদন্ত না হয়ে অত্যন্ত ধীর পায়ে নিজের কোমরে বাঁধা লেদার জ্যাকেটটা একটু টেনে ঠিক করল। তারপর রায়ানের একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। দুজনের চোখে চোখ। হৃদীর দুই রঙের চোখের সেই অতিপ্রাকৃতিক তীব্র চাহনির সামনে রায়ান যেন নিজের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল।
হৃদী অত্যন্ত নিচু, ভারী অথচ বুক কাঁপানো স্বরে
বলল—
"এটা আমার পক্ষ থেকে তোকে দেওয়া একদম শেষ ওয়ার্নিং, রায়ান খান। তিশা চৌধুরীর দিকে হাত বাড়ানোর আগে নিজের জীবনের কথা অন্তত দু'বার ভাববি। আর আমার পথে এসে দাঁড়ানোর আগে নিজের দেহ কথা অন্তত দশবার ভাববি! কারন শরীর আর রুহের মূল্য আছে। শুধু শুধু কষ্ট দিস না। ডোন্ট ডু দ্যাট অ্যাগেইন!"
রায়ান সম্পূর্ণ নির্বাক, ওর মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোচ্ছে না। হৃদী রায়ানের আরও এক পা কাছে এগিয়ে এলো। ওর চোখের মণি দুটো যেন রায়ানের অস্তিত্বকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে যোগ করল—
"কারণ দাবার বোর্ডে শুধু মন্ত্রী বা রাজাই সবচেয়ে শক্তিশালী নয়, রায়ান। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো সেই সাইড প্লেয়ার, যে এতক্ষণ চুপচাপ বসে খেলা দেখছিল। আমি এখনো নিজের আসল গেম শুরুই করিনি। জাস্ট রিমেম্বার দ্যাট! তাই নেক্সট টাইম আমার পথ আটকানোর আগে নিজের এই পরে থাকা সাঙ্গ-পাঙ্গদের কথা মনে করিস।"
কথাগুলো রায়ানের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধিয়ে দিয়ে হৃদী এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। তারপর ধীর, স্থির পায়ে রাস্তা ধরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পুরো এলাকার কেউ, এমনকি রায়ান খান নিজেও তাকে আর পেছন থেকে ডাকার বা আটকানোর ন্যূনতম সাহসটুকু পেল না।
আর রায়ান? সে রোমের সেই তপ্ত রাস্তার মাঝখানে একাকী মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর লাইফে এই প্রথম কোনো মেয়ে ওকে ভয় না পেয়ে, ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এভাবে বুক কাঁপানো ধমক হুমকি দিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া হৃদীর সেই ড্যাশিং অবয়বের দিকে তাকিয়ে রায়ান নিজের গালে হাত বুলাল। তারপর অত্যন্ত নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল—
"ইনক্রেডিবল... জাস্ট ইন্টারেস্টিং!
বাট আই লাইক ইট..."
ওর ঠোঁটের কোণে আবারও সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফিরে এলো। তবে এবার সেই হাসিতে কোনো রাগের বা অপমানের আগুন ছিল না; সেখানে ছিল এক নতুন শিকারকে পাওয়ার তীব্র রহস্য আর উন্মাদনা....
চলবে.......
[ কেমন হয়েছে অবশ্যই বড় করে কমেন্ট করে জানাবে🥰]