গল্প:পারমিতা
লেখিকা:ফাতেমা তুজ নৌশি
চারদিকে রঙিন আলো ঝলমল করছে। আরটিফিশিয়াল ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো বাড়ি। কোথাও কোনো ক্রটি নেই। বিয়ে বাড়ি বলে কথা। তবে কোনো গান বাজনার আওয়াজ ও শোনা যাচ্ছে না। বাড়ির উঠানে লাল টুকটুকে বেনারসি পরে শুয়ে আছে পারমিতা। চারিদিকে শুনশান বিরাজমান। কারো মুখে কোনো কথা নেই। পারমিতার মেহেদি রাঙা হাতটি ধরে বসে আছে আরাফ। পরনে মেরুন শেরওয়ানি, মাথায় পাগড়ি। মনে হচ্ছে কোনো রাজকুমার বসে আছে তার প্রাণ প্রিয় সখির জন্য ।
অতীত....
"আচ্ছা আরাফ যদি কখনো আমি আকাশের তারা হয়ে যাই তুমি কি খুব বেশি মিস করবে আমায়?"
" উমমম মোটে ও না।"
ছেলেটার কথায় পারমিতার হৃদয় ভে ঙে আসে। মুখ গোমড়া করে ছলছল চোখে আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,"কেন?"
পারমিতার দিকে তাকিয়ে আরাফ দেখতে পায় মেয়েটার চোখের পানি এখনই পড়ে যাবে। এতক্ষণ আরাফ মিনমিনে হাসলেও এখন হাসি টা নেই। বোধহয় মেয়ে টাকে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে সে। এবার ওর নিজের ই কষ্ট হতে লাগল। কিছু না ভেবেই প্রিয়তমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,"তুমি আকাশের তারা হলে তোমার আরাফ কী করে এখানে থাকবে বলো? তোমাকে ছাড়া সে এক মুহূর্ত ও থাকতে পারবে না। সে ও আকাশের তারা হয়ে যাবে।"
এবার পারমিতার চোখের পানি লাগামহীন হয়ে ছেড়ে দিল। ছেলেটার এহেন কথায় বড়ো রাগ হলো ওর। এলোপাথাড়ি কি ল ঘু ষি দিয়ে বলা শুরু করল," তুমি সত্যিই অনেক বেশি বাজে আরাফ। তোমার সাথে আমি এক মুহূর্ত ও থাকব না। আমাকে কষ্ট দেয় যে তার সাথে কেন থাকব আমি? দরকার নেই এমন ভালোবাসার।"
কথাটা বলে পারমিতা চোখের পানি ডান হাত দিয়ে মুছে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করল। পেছন থেকে আরাফ শুধাল,"আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে তুমি?"
বিপরীতে পারমিতা বলল,"কেন পারব না? খুব পারব। আমার কাউকে লাগবে না। আমি একাই ভালো থাকব।"
ওর কথায় ঠোঁট কামড়ে ধরল আরাফ। ভাবল মেয়েটাকে এবার বেশিই রাগিয়ে দিয়েছে। এখন না সামাল দিলে পরে ঝামেলা হবে। তাই সে দৌড়ে পারমিতার সামনে গেল। হাঁটু গেড়ে কান ধরে বলল,"সরি পারু। প্লিজ এবারের মতো মাফ করে দেও। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি হিনা আমি যে পাগল হয়ে যাব। এভাবে রাগ করে না প্রিয়তমা আমার।"
পারমিতা চুপ। ও দেখতে চায় আরাফ কতখানি যেতে পারে। তাই হাসি থামিয়ে রাখে। তবে খানিক বাদে আরাফের ক্রমাগ এমন কান্ডে না চাইতে ও হেসে উঠে। খিলখিল হাসিতে অধর রাঙিয়ে রেখে বলে,"আরাফ, তুমি না পুরো বাচ্চা টাইপের। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কোনো দশ বছরের বাচ্চা, যে চুরি করে ধরা পড়ে গেছে। এখন কান ধরে মাফ চাচ্ছে।"
এই টুকু বলে পারমিতা ফের অট্টহাসি তে মেতে উঠে। ওর সুন্দর হাসির দিকে তাকিয়ে থাকে আরাফ। খানিক বাদে প্রিয়তমার হাসির সাথে যোগদান করে সে ও।
পারমিতা আর আরাফের সম্পর্ক চার বছরের। কিশোরী বয়স থেকে প্রেম। পারমিতা তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী, আর আরাফ এস এস সি পরীক্ষার্থী। সেই দিন টা ছিল স্কুলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। পঞ্চাশ বছর উদযাপন উপলক্ষে বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সেইদিন পারমিতার গানের গলায় মুগ্ধ হয়েছিল আরাফ নামের কিশোরটি। তার ভেতরটা ভে ঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটার মুখ থেকে আসা প্রতিটা লাইন এত ভালো লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল এ কণ্ঠের জন্য সদা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত সে। এই তো প্রথম প্রেমে পড়ার অনুভূতি যা ছুঁয়ে গিয়েছিল আরাফ নামের কিশোরটিকে। অসম্ভব সুন্দর গানের গলা পারমিতার। তাই যো সেই দিনই আরাফ পারমিতাকে প্রপোজ করে বসে আর সেই থেকেই ওদের পথচলা শুরু হয়। এভাবেই কখন যে কেটে যায় চার চারটি বছর কে জানে।
বর্তমান....
পারমিতার বাবা স্তব্ধ হয়ে আছেন। মনে হচ্ছে তিনি পাথর হয়ে গেছেন,হবেন ই তো। কারণ পারমিতার এই অবস্থার জন্য দায়ী ওনি নিজেই। কথায় আছে না অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পথর ঠিক তেমনই অবস্থা ওনার।
অন্যদিকে পারমিতার মায়ের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। জ্ঞান হীন হয়ে পড়ে আছেন তিনি। কত স্বপ্ন ছিল দুই মেয়ে কে নিয়ে। কিন্তু সমস্ত কিছু উলোট পালোট হয়ে গেল পারমিতারা দুই বোন। পারমিতা ছোট আর সুজাতা বড়ো। সুজাতা ছোট থেকেই বেশ বদমেজাজি, আর পারমিতা অসম্ভব ঠান্ডা মেজাজের। পরিবার কে অনেক ভালোবাসে । তাই তো আজ প্রতিদান হিসেবে উঠানে পড়ে আছে সে।
ছোট থেকে সুজাতা তার মামা বাড়িতে থাকে। মূল কারণটা হলো ছোট বোন পারমিতা। মেয়েটিকে বিন্দু মাত্র সহ্য করতে পারে না সুজাতা। তাই সে তার মামা বাড়িতে চলে যায়। ওখানেই বড়ো হতে থাকে।
এই তো তিন মাস আগের কথা। সুজাতা বছর দুইয়েক পর বাসায় ফিরেছে। আসতে চাই নি সে, তার বাবা মায়ের জোড়াজোড়ি তে এসেছে। দিন দুইদিনের মাথায় বাবার কাছে এসে আবদার শুরু করেছে সে একটি ছেলেকে পছন্দ করেছে। যদি তার সাথে বিয়ে না দেওয়া হয় তো সে তখন ই আ ত্মহ ত্যা করবে। মেয়ের এহেন আচরণে শিউরে উঠেন আলতাফ মাহমুদ। ছোট থেকেই মেয়েটা তাদের কাছে থাকে না। আর সুজাতা আজ কি বলছে এসব! ভাগ্য এক নির্মম খেলা খেলেছে। সুজাতা যাকে পছন্দ করেছে সে আর কেউ নয় বরং পারমিতার ভালোবাসার মানুষ আরাফ। যখন এই কথা পারমিতা জানতে পারল, তখন সে তার পরিবারকে তার আর আরাফের সম্পর্কে সব কিছু বলল। সুজাতা যখন শুনল আরাফ পারমিতার ভালোবাসা তখন তো আরাফ কে তার চাই ই চাই। ছোট থেকে পারমিতার সব কিছু তে হিং সে তার। সব সময় বড়োদের কাছ থেকে বেশি আদর পেয়েছে পারমিতা। কারণ সে অত্যন্ত বাধ্য, নম্র, ভদ্র। আর সুজাতা প্রচন্ড রকমের বে য়া দব। সব মিলিয়ে ছোট বোনটির প্রতি বিশেষ রাগ ছিল তার। তাই তো যখন তার বাবা বলল
,"মা এটা তো সম্ভব নয় রে।"
এ কথা শুনে সুজাতা আ ত্ম হ ত্যা করতে চলে যায়। বহু কষ্টে সুজাতা কে বাঁচানো হয়। মেয়ের এমন কান্ডে আলতাফ মাহমুদ পারমিতার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করান আরাফ কে সে যেন তার বোনের জন্য ছেড়ে দেয়। তারই সাথে আরাফ কে রাজি করায় সুজাতাকে বিয়ে করতে। পিতার এমন পতিজ্ঞা তে পাথর হয়ে যায় পারমিতা নামের যুবতী। সে কাঁদছে প্রচুর কাঁদছে কিন্তু সেই কান্না টা যেন বাইরের জগতের কেউ শুনতেই পাচ্ছে না। সে নিরুপায় হয়ে আরাফের কাছে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করায় তার বোনকে বিয়ে করার জন্য। ভালোবাসার প্রতিদান দিতে হয় আরাফ কে। আরাফ ও শর্ত লাগিয়ে দেয়। সে সুজাতা কে বিয়ে করবে কিন্তু এক শর্ত। শর্ত টা হলো পারমিতাকে ও সেইদিন বউ সাজতে হবে আর দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিতে হবে। পারমিতা চোখের কার্নিশ থেকে পানি মুছে বলে সে রাজি। হয়তো বুকের পাথর টা দীর্ঘ হয়ে গেল। আরাফ কে বড্ড ভালো বাসে সে, কিন্তু পিতার পতিজ্ঞা যে। সে আর ভাবতে পারে না। শুধু মনে মনে উচ্চারণ করে এ কেমন নি ষ্ঠু র পরিস্থিতি এল তার জীবনে?
তারপরের দিনই পারমিতা কে আরাফ লাল বেনারসি
হাতে দিয়ে বলে,"ভালোবাসার প্রতিদান দিতে প্রেমিকার বোন কে বিয়ে করছি , দোয়া করো আল্লাহ্ যেন সইবার ক্ষমতা আমায় দেয়।"
পারমিতার বুকের ভেতর টা মোচড় দিয়ে উঠে। সে যে শেষ হয়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে। কিন্তু সত্য হলো সে নিরুপায়। আরাফ কে বিদায় জানিয়ে চলে আসে সে। আরাফ পারমিতার যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টি তে চেয়ে থাকে। পরক্ষণেই সে তার চোখের জল আড়াল করতে ডান হাত দিয়ে মুছে ফেলে। সেই বেনারসি পরে শুয়ে আছে প্রাণের চেয়ে প্রিয় প্রেমিকা পারমিতা। অসম্ভব মায়ায় ভরা মেয়ে টি ,এক দৃষ্টি তে চেয়ে থাকে আরাফ। কিছু বলার ভাষা নেই তার। পরক্ষণেই মনে পড়ে সে একদিন বলেছিল পারমিতাকে,তার অনেক ইচ্ছে যখন পারমিতা বউ সাজবে তখন যেন আরাফের নাম টি পারমিতার হাতে মেহেদীর লাল রঙে ঝলমল করে। বিষয়টি মনে করে, পারমিতার ডান হাত ধরে সে। তারপর ই হাতের মুঠোয় আবিষ্কার করে নিজের নামের সাথে জড়িয়ে রাখা চিরকুট। চিরকুটে লেখা....
"পিতার প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে দিয়েছি প্রেমিক কে প্রতিজ্ঞা।
বাসরে প্রেমিকের হাত বোন কে স্পর্শ করার আগে যেন, মৃত্যু হয় প্রেমিকার।"
ইতি
অভাগী প্রেমিকা
পারমিতা
~সমাপ্ত~