লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
আজ শুক্রবার। মসজিদ থেকে আসা খুতবার শব্দ চারপাশ মুখরিত। জুম্মার নামাজ খুতবার পরে পড়া হবে। মহল্লার মুরব্বিদের সাথে সাথে জোয়ান আর ছোট ছোট ছেলেপেলেরাও মসজিদে যাচ্ছে। সারা সপ্তাহও যারা মসজিদে যায় না তারাও জুম্মায় শরীক হয়। রুসবা তাদের নতুন বাসার গেইট এর সামনে দাঁড়িয়ে একজনের জুম্মায় যাওয়ার অপেক্ষা করছে। লোকটা আর যাই করে থাকোক নামাজ মিস করে না। প্রায় সব ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে যেতে চেষ্টা করে। জুম্মার আজান হলেই চলে আসে। খুতবা শুনে। এর জন্যই তো রুসবার তাকে এতো ভালো লাগে।
রুসবারা এই মহল্লায় নতুন। বাসাটা ওই পছন্দ করেছে। বাসার মলিক খুব সৌখিন একজন মানুষ। তাই বাসাটাও খুব সুন্দর। রুসবার ভাই যখন ওকে নিয়ে বাসা দেখার জন্য এলেন বাসার গেইটের উপর সুন্দর বাগানবিলাস গাছটা দেখেই ও বলেছে এই বাসা ছাড়া ও আর কোথায় যাবে না। দুতলা বাসার উপরে ওরা উঠেছে নিচ তলায় মালিক।
মহল্লার মসজিদটা একদম ভেতরে তাই সামনের দিকে যাদের বাসা তাদের রুসবাদের বাসা পেরিয়ে যেতে হয়। রুসবাদের বাসা পেরিয়ে আরো দুইতিনটা বাসা পেরিয়েই ঈদগাহ পরেই মহল্লার মসজিদ।রুসবা এই মহল্লায় আসার পরেই মহল্লার মোস্ট ফেমাস বয়কে দেখে প্রেমে পিছলে পড়ে আছে। ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে যেখান থেকে পারে সব জায়গা ঘেটে নাম্বার জোগার করে কথা বলেছে। এখন ওদের ভালোই একটা সম্পর্কে আছে। অবশ্য এই সম্পর্কের এখনো কোনো নাম দেওয়া যায় না। দুইদিন পরে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু কাল ও এসব কি শুনলো!
রুসবার ভাই রোহান নতুন মহল্লা এসে ওর সমবয়সী কিছু ছেলেদের সাথে কিছুটা ভালো বন্ধুত্ব করেছে তার মধ্যে জাতীয় ক্রাস ও একজন। কাল দুপুরে নাকি লোকটা ওদের বাসায় এসেছিল। ও তখন বাসায় ছিল না। সন্ধ্যায় মা কথায় কথায় না বললে তো ও জানতোই না। লোকটা ওদের বাসায় এলো অথচ ওকেই বলো না! রুসবা তার পর গিয়ে ভাইয়ের কাছে গিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে জিজ্ঞেস করলো -"দুপুরের নাকি তোমার কোন বন্ধু বাসায় এসেছিল। "
রোহান বিছানায় আধ শুয়া অবস্থায় বসে মনোযোগ ফোনের দিকে রেখে " হুম" বললো।
-"কি জন্য এসেছিল? " রুসবা যতটা উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো রোহানের উত্তর শুনে বিস্ময়ে "কি " বলে ততটা চেচিয়ে উঠলো। রুসবার কানে এখনো বাজছে কথা গুলো রোহান বলছে -" ওর বিয়ে সামনের সপ্তাহে। দাওয়াত দিতে এসেছিল। "
রুসবা অস্থিরতায় ডান হাতের নোখ দাত দিয়ে খুঁটছে আর গেইটের সামনে ডানে বামে পায়চারি করছে। হঠাৎ দেখলো রাস্তা অপজিটের সাইড দিয়ে সাদা পাঞ্জাবি পরনে জাতীয় ক্রাস মসজিদে যাচ্ছে। রুসবা মাথার উরনাটা টিক করে আশেপাশে একবার তাকালো। না কেউ নেই।রুসবা দুই ঠোঁট গোল করে কু করে একটা শব্দ করলো যাতে লোকটার দৃষ্টি আকর্শন হয়। প্রথমবার না তাকালেও দ্বিতীয়বার টিকই তাকালো। রুসবা হাত দিয়ে এইদিকে আসার ইশারা দিলো। ইসহাক একবার আশেপাশে তাকালো রুসবা ওকেই ডাকছে কিনা নিশ্চিত হচ্ছে। তা দেখে রুসবা মুখ বাকাল।তারপর ইশারা দিয়ে বললো ওকে ডাকছে সে।
ইসহাক এগিয়ে এসে সন্ধিহান কন্ঠে বললো -" জ্বি আপনি কি আমায়ই ডাকছেন "
রুসবা দাতে দাত চেপে বলো -" আশেপাশে তুমি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখছো? '
লোকটা আশেপাশে তাকিয়ে বললো -" না"
-" তাহলে আমি আপনাকে ডাকছি তা নয় কি?" রুসবার কথায় স্পষ্ট রাগের বহিঃপ্রকাশ।
-" জ্বি বুঝতে পারছি। তা কি জন্য ডেকেছেন বলেন আমি মসজিদে যাবো। "
-" জুম্মার নামাজ শুরু হতে সময় আছে একটু পরে গেলে কিছুই হবে না। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গেলে আমি কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারি।"
ইসহাক অবাক জয়ে বলো -" আশ্চর্য! আপনি আমার সাথে এভাবে রেগে কথা বলছেন কেনো?"
-" একশবার বলবো। আর আপনি কি? হে আপনি কি? "রুসবা মুখ বাকিয়ে বললো-" অথচ নিজেই কি সুন্দর একদিন বললেন আমি কি আপনাকে তুমি বলতে পারি। "
ইসহাক যে আকাশ থেকে পরলো। -"কি? আমি আপনাকে এসব কখন বললাম? আমি তো আপনাকে চিনিই না। আজই আপনাকে প্রথম দেখলাম। "
-"ওওওওও।এখন আমাকে চিনতে যাবে কেনো। এই এই ছেলে। আমাকে যখন চিনোই না তখন নামাজে যাবার সময় সবসময় আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে কেনো? আমি কলেজে যাবার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষা করতে কেনো? আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে।আমার সাথে এতো দিন এতো সুন্দর করে কথা বলতে কেনো? আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে গ্রিফ্ট কেনো দিতে? "বলতে বলতে রুসবার রাগে মুখ লাল হয়ে গেলো।
-" এক্সকিউজ মি। আপনি আমার উপর মিত্যা অপবাদ দিচ্ছেন। আমি আমার জীবনে ২৭টা বছর পার করেছি কোনো মেয়ের সাথে রিলেশন এ যাইনি। কোনো মেয়ের উপর চোখ তুলে তাকাই নি আর সেই আমি আপনার সাথে এসব লেইম কাজ করবো। তা আমি নিজেই ভাবতে পারছি না। "ইসহাক নিজেই এখন রেগে যাচ্ছে। চেনে না জানে না একটা মেয়ে এসে এসব বললে কার রাগ না উঠে?
রুসবা দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বললো -" খুবববব ভালো করেছেন।আমি ও আমার ২০টা বছর পার করেছি তোমাকে ছাড়া আর কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকাই নি। "রুসবা মুখটা হঠাৎ কাদো কাদো করে বললো-" কিন্তু আমার সাথে এমন করলেন কেনো তার জবাব দিন। আমার মতো মাসুম একটা মেয়ের মন নিয়ে তুমি কিভাবে খেলতে পারলে ?একটু দয়া মহব্বত দেখাতে পারতে?"
ইসহাক দেখলো মেয়েটির চোখ ছলছল করছে। ও ভেবেছিল মেয়েটা ওর সাথে মজা করছে কিন্তু চোখ দিকে তাকিয়ে তা লাগছে না। মেয়েটা হয়ত কিছু ভুল বুঝেছে। অন্য কাউকে বুঝতে ওকও বুঝেছে। তাই মাথা ঠান্ডা করে বুঝাবার মতো করে বললো -" দেখুন আপনি যা বলছেন তা আমি একদম করিনি। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি.... "
ইসহাকের কথা শেষ হবার আগে রুসবা তার কথা কেরে নিয়ে বললো -" আমি একদম আমি ভুল করছি না। তুমিই সে। আমার চোখের দেখায় ভুল হতে পারে না। " রুসবা আহ্লাদি কন্ঠে বললো -" এই সত্যি করে বলুন তো তোমার কি সামনের সপ্তাহে বিয়ে?"
-" হে টা সত্যি। সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে। "
ইসহাকের কথা শেষ হবে কি তার আগেই রুসবা চেচিয়ে উঠলো -"কেনো কেনো তোমার বিয়ে সামনে সপ্তাহে? ওও এখন বুঝতে পারছি তুমি দুদিন আগে আমার সাথে দেখা করোনি ফ্যামিলিতে ব্যস্ততা তার কারণে। আর তার আসল কারণ তোমার বিয়ে।তুমি কেনো বিয়েতে রাজি হলে বলো? কেনো? মেয়েটা কি আমার থেকে বেশি ফর্সা? "
ইসহাকের হঠাৎ কেনো যেন মেয়েটাকে জালাতে ইচ্ছে হলো তাই বললো -" আমার হবু বউ আপনার থেকে অনেক বেশিই সুন্দর আর ফর্সা ও।"
রুসবা কপালে চাপরে বললো -" হায়রে বাঙালি ব্যাটা ছেলে
রে। তোমরা আমার মতো মিষ্টি মেয়েদের কেনো যে এতো অবজ্ঞা করো। মানছি আমার গায়ের রং একটু চাপা। তাই বলে তুমি আমায় বিয়ে করলে কোনো খারাপ দেখাবে তা কিন্তু না। এই দেখো।"রুসবা ওর দুই হাত থুতনির নিচে রেখে ডানে বামে করে মুখ দেখালো।
-"বিয়ে করে বউ করার ক্ষেত্রে আমার ফর্সা মেয়েই পছন্দ তাই। "
কথাটা শুনে উত্তেজনায় রুসবা ইসহাকের হাত ধরে বললো-"তুমি বিয়েটা ভেঙ্গে দাও। তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না। একটা শো-পিছ ভাঙ্গে আমি তা সারা জীবন ভুলতে পারি না। তার কষ্ট আমার মন থেকে যায় না। সেখানে তুমি আমার মনটা এতো কাছে এসে ভেঙ্গেদিলে আমি বাচবো কিভাবে?"
ইসহাক ওর হাত সরাতে সরাতে বললো-" এ কি আপনি আমার হাত ধরছেন কেনো? মহল্লার সবাই মসজিদে যাচ্ছে। তারা দেখলে কি বলবে। হাত ছাড়োন আমার। "
-"ছেড়ে দেবো তার আগে বলো তুমি বিয়েটা করবে না "রুসবা ইসহাকের হাত ঝাঁকিয়ে বলো -" আমাকে কথা দাও। কথা দাও যে তুমি......। "
-" কি হচ্ছে এখানে " রুসবার কথা শেষ হবার আগে রাস্তার অপজিটের পাশ থেকে চেচিয়ে বলে উঠলো কেউ।
রুসবা ঘাড় বাকিয়ে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো। ইসহাকের হাত থেকে নিজের হাত আপনা আপনি সরিয়ে ফেলো। -"হায় আল্লাহ ওটা কে? "
ইসহাক ও সে দিকে তাকিয়ে বললো -" ও আমার ভাই ইরহাম "
-"কি?ও ইরহাম! তাহলে তুমি কে? " বিস্মিত হয়ে ইসহাকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো রুসবা। রুসবা এতো বিস্মিত
হয়েছে যে তার চোয়াল ঝুলছে।
-"আমি ওর বড় ভাই ইসহাক।"বলেই হটাৎ ইসহাকের কপাল কোঁচকালো।ইসহাক ইরহাম থেকে দুই বছরের বড় হলে কি হবে ওরা দেখতে প্রায়ই একই রকম। সল্প পরিচিত সবাই ওদের দেখে জমজ বলে। পরিচিতরা আবার আলাদা করতে পারে।ইসহাক এখানে তাকে না। চাকরির কারণে দূরে তাকতে হয় একাই। তাই হয়ত রুসবা কখনো ইসহাকে দেখে নি। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে আসে। একা তাকে বলে তার মা এত তারাতারি বিয়ের আয়োজন করেছেন। -" উফ আমার মাথায় আগে এই কথা আসেনি কেনো? তুমি কি আমাকে ইরহাম ভেবেছিলে? "
রুসবা ওর হা করা মুখটা ডান হাত দিয়ে ডেকে উপর নিচ মাথা নাড়ালো। ততোক্ষনে ইরহাম ওদের কাছে চলে এসে রুসবার ডানদিকে দাঁড়ালো। দুইভাইকে একসাথে একরকম দেখে রুসবার মাথা ঘুরে উঠলো।
-" কি হয়েছে রুসবা? তুমি ভাইকে কি বলছিলে?"ইরহামের কথার উত্তর কে দেয়। রুসবা তো লজ্জায় ডান হাত দিয়ে মুখের ডান পাশ ডেকে একটু কুঁজো হয়ে দৌড়ে গেইটের ভেতর ঢুকে শব্দ করে গেইট লাগিয়ে দৌড়ে বাসার ভিতর চলে গেলো।
ইরহাম অবাক হয়ে ইসহাকের দিকে তাকিয়ে বললো -" এটা কি হলো? ও আমার সাথে কথা না বলে এমন ভাবে লাপাত্তা হলো কেনো?
ইসহাক দুই কাধ উচুয়ে ঠোঁট উল্টে বুঝালোও জানে না। পরে হেসে ইরহামের কাধে হাত রেখে বললো -"চল নামাজে দেরি হচ্ছে। "
ইরহাম গেইটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার প্রিয়সী এভাবে ওর সাথে কথা না বলে লাপাত্তা হলো কেনো ও বুঝতে পারছে না। ইরহাম ভাবলো এটা ওদের প্রথম কাছ থেকে সাক্ষাৎ এর জন্য হয়ত রুসবা লজ্জা পেয়েছে।
...সমাপ্ত....