গল্প:হৃদয় ঘটিত
 
Notifications
Clear all

গল্প:হৃদয় ঘটিত


Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

 (অণুগল্প) 

লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী 

হসপিটালের করিডরে বসে থাকতে থাকতে তাসরিফের মাথা ভনভন করছে। মানুষের যাতায়াত, এতো রোগী তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গল্প করা মাথায় ধরিয়ে দিচ্ছে তার। তাসরিফ একবার তার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটার পানে তাকালো। আসার পর থেকেই এই ব্যক্তি পাশে বসে থাকা সমবয়সী লোকের সাথে বকবক করে যাচ্ছেন। বেশির ভাগ গল্প নিজেদের রোগ নিয়ে। যা তাসরিফের কাছে অতি বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে। হাতের রিপোর্টটার দিকে একবার তাকিয়ে নিজেদের টিকিটের দিকেও তাকাল। তাদের সময় আসতে এখনও ঢের সময় বাকি। তাসরিফের মুখ তেতো হয়ে গেল তা দেখে। সে উঠে দাড়াল। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় চলে এলো। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। তার কয়েক ফোটা ছিটকে এসে বাষ্পের মতো তার গায়ে লাগছে। সময় কাটানোর জন্য তাসরিফ নিজের ফোনটা বের করে বন্ধু জাকিরকে কল লাগাল।

**
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বাতাসের দাপটে সন্ধ্যায় ইলেক্ট্রিসিটিতে সমস্যা হয়েছে। রিহানি টিমটিমে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে বসেছে। পড়তে তার একটুও ইচ্ছে করছে না। এই অন্ধকার ঘর। ঝুম বৃষ্টির দিন। এমন দিনে কে পড়তে বসতে চায়? কাঁথা মুড়িয়ে একটা লম্বা ঘুম দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ওর রাক্ষস ভাইয়াটা তাকে চেয়ার থেকে উঠতেই দিচ্ছে না। বড় জ্বালা তো! বাবাকে বললেও বকে দেয়। জাকির মোমবাতির নিবো নিবো আলোতে নিজের এসাইনমেন্ট তৈরি করছিল। হঠাৎ ফোনে কল আসায় তা বাধাপ্রাপ্ত হলো। মোবাইলটা হাতে তুলে নিজের বেক্কল বন্ধুটার নাম্বার দেখতে পেলো। মাথায় আবার কি কূটবুদ্ধি উদয় হলো তা জানতেই ফোনটা কানে ধরল। ওপর পাশ থেকে বিরস কন্ঠ ভেসে এলো-" কি রে! কি করিস রে তুই?"

-" এসাইনমেন্ট করছিলাম। তুই কি করিস? আছিস কেমন? "

-" আছিরে অনেক জামেলায়। "

জাকিরের ভ্রু কুচকে গেলো। আবার কোন কেচ্ছা পাকালো কে জানে।-" কেন? আবার কি করেছিস? এসব উদ্ভট কান্ড করতে তোর ক্লান্ত লাগে না? "

তাসরিফ বিরক্ত হলো বেজায়। তার বন্ধুটা তাকে একটা বেক্কল ভাবে কেন? মুখ কুঁচকে জবাব দিলো-" আমি কিছু করিনি? যা হয়েছে যা তা আমার দাদার। "

-" দাদার আবার কি হলো?কাল না ভালোই দেখলাম! "

-" হৃদয় ঘটিত সমস্যা রে।"

জাকির যেন আকাশ থেকে টুপ করে মাটি পরলো। তাজ্জব বনে গিয়ে বললো-" কি বলিস এসব? এই বয়সে এসব!"

জাকিরের কথা শোনে তাসরিফও যেন আশ্চর্যান্বিত হলো। ওর দাদা অসুস্থ। আর এই বয়সে অসুস্থ হওয়া তো স্বাভাবিক বিষয়।তাসরিফ বিরক্ত হয়ে বললো-" তো কি? আর কোন বয়সে হবে শোনি? এই বয়সেই তো এসব হয়ে থাকে। বেক্কেল!"

-" বেক্কল আমি না তুই গাধা। ওই বয়সে ওসব মানে কি? তোর মাথায় কাজ করছে তো। পাগল! বুড়ো বয়সে আবার ওসব কি রে। এখন তো সময় তোর। "

-" এই,, এই তোর কি মাথা গেছে? এই বয়সে যদি আমার এসব হয়। তাহলে বাকি জীবন তো পরেই রইল। "

জাকিরের রাগ উঠলো। চিরচির করে তার ধৈর্যের সীমা ছিড়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে বোনকে নিজের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে কথা শোনতে দেখে দিলো এক ধমক।রিহানি ধমক শোনে মানে মানে আবার পড়তে শুরু করল। জাকির আবার তাসরিফকে শান্ত স্বরে বললো-" দেখ তুই কিন্তু এখন আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছিস। আমার মাথাট ভীষণ খারাপ হচ্ছে। "

-" আরে জ্বালা তো! এখানে রাগার কি আছে?"

-" রাগবো না তো কি করবো? বুড়ো বয়সে হৃদয় ঘটিত সমস্যায় কে পরে ইয়ার! উনার কি এখন মেয়েবাজি করার সময়? "

তাসরিফ জাকিরের কথা শোনে দাঁত কিড়মিড় করে বললো-" তোকে কে বলছে দাদা মেয়েবাজি করছে? "

-" তুই তো এখন বললি দাদার হৃদয় ঘটিত সমস্যা হয়েছে। এখন বল কে কথাটা আগে বলেছে?"

-" তোকে কে বলেছে আমি হৃদয় ঘটিত সমস্যা বলে মেয়েবাজি বুঝিয়েছি? আরে আমি তো বুঝাতে চেয়েছি দাদার হৃদপিণ্ডে সমস্যা ।তাই তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে এলাম। "

-" ওরে বেকুব। এটা আগে বলবি না হার্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিস। "

-" ওই তোরে না বলছি বাংলায় ছাড়া আমি কথা বলি না। তাই তো এমন করে বললাম। "

-" ওরে আমার বাংলাবিদরে। এটাও তো বলতে পারতি যে হৃদরোগ দেখা দিয়েছে। তুইও এতো কাহিনি করিস না! "
তাসরিফের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ছ্যাহ কোন অলক্ষুণে যে সে তার এই বন্ধুটাকে কল করতে গেল। -" ধ্যাত শালা " বলে তাসরিফ কল কেঁটে দিলো।

জাকির নিজের ফোনটা চোখের সামনে ধরে তাজ্জব বনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। পরে হুট করে হেঁসে ফেললো। হাঁসতে হাঁসতে তার চোখে জল চলে এলো। তাসরিফ যখন থেকে অনার্সে বাংলায় চান্স পেয়েছে তখন থেকেই এমন কান্ড করে যাচ্ছে। বাংলা ছাড়া কথা বলবে না। আমাদের দেশের মানুষের মুখে মুখে ইংরেজদের ভাষা। ওরা সবাই মাথা নত করলেও সে করবে না। সে কথায় কথায় ইংরেজি বলবে না।কিন্তু সমস্যা হলো সব বাংলাবাক্যের উচ্চারণ সে পারে না।  রিহানি হা করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষণ কান ভরে শুনলেও সে বিষয়টা বুঝেনি। রিহানিকে এমন তাকিয়ে থাকতে দেখে জাকির মজার ঘটনাটা শেয়ার করলো। -" জানিস কি হয়েছে? তাসরিফের দাদার হৃদপিণ্ডের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর সে এটাকে সে বলছে হৃদয় ঘটিত সমস্যা। হা হা। "

রিহানি বড় ভাইয়ের কথা শোনে গেলো। কিন্তু তার ছোট মাথায় এই বিষয়টা ঠিক ঢুকলো না। 

******
সকাল ছয়টা। শীতল স্নিগ্ধ সকাল। রাতে বৃষ্টি হয়েছে বলে পরিবেশটা এখন শীতল। বাতাসে ভেজা মাটির ঘ্রাণ। বাতাসের হালকা ঝাটকায়  গাছের পাতা থেকে হুটহাট বৃষ্টির ফোটা ঝরে পরছে। তাসরিফ তার দাদা আতিকুল কবিরকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছে। ডাক্তার শরীরের চর্চা করতে বলেছে। আর প্রাতঃভ্রমন তার একটা উত্তম মাধ্যম।তাই বের হওয়া। আতিকুল কবির বের হতে চাননি। কিন্তু তাসরিফের টানাটানিতে উঠে আসতে হলো। কোন ভবনে নাকি নিয়ে যাবে। তাই তিনি অতি আগ্রহ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। অনেকটুকু পথ হাটার পরে জিজ্ঞেস করলেন -" তা দাদাভাই আমরা কোন ভবনে যাচ্ছি?আর কত হাঁটবো?"

তাসরিফ ভ্রু উঁচিয়ে বললো-" আমরা আবার কোন ভবনে যাচ্ছি? "

-" তুই না বললি আমরা কোন ভবনে যাচ্ছি?"

-" আমি কখন বললাম? "

-" ওই গাধার বাচ্চা! তাহলে আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিস কই?"

-" আমরা তো প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছি। "

-" কোন ভবনে?"

তাসরিফের রাগ উঠে গেলো। সে কোমড়ে হাত রেখে আতিকুল কবিরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো-" দাদা তুমি না শিক্ষিত? তাহলে এই সামান্য বিষয় কেন বুঝতে পারছো না? "

আতিকুল কবির এখন বিষয়টা বুঝতে পারলেন। বয়সের বাড়ে আর ঘুম থেকে উঠেই কথাটা তিনি বুঝতে পারেননি। তার উপর মুখ্যভাষার সাথে ইংরেজিটা এতোই মিশে গেছে যে তাসরিফ মাঝে মাঝে কি বলে সোজা গিয়ে উনার মাথয় ক্যাচ করে না। বিষয়টা অতি দুঃখের। নিজের ভাষার আজ এ হাল। কিন্তু কিছু করার তো নেই। তিনি তাসরিফের কথাটা এখন বুঝতে পেরে বললেন -" বেকুবের বুঝিয়ে বলবি তো। জানিস না এখন আমি কম বুঝি?কানে কম শুনি!"

তাসরিফের বিষয়টা মাথায় ঢুকলো। দাদা তার এতোক্ষণ কি ভাবছিলেন। তাই সে মুখ ব্যাঙ্গচিয়ে চলে গেলো-" থাকো তুমি তোমার। আমি চললাম. "

আতিকুল কবির কত ডাকলেন সে পিছু ফিরেও তাকাল না। তড়িঘড়ি করে পা চালিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল

একটা সরু গলির রাস্তা ধরে রিহানি হেঁটে চলছে। গোধুলি বেলা। দেড়ি হওয়ার ফলে সটকার্ট পথ বেছে নিয়েছে। । রিহানি সামনে এইচএসসি দিবে। তাই তার ব্যস্ত দিন যাচ্ছে। কলেজ, কলেজ পরে টিউশনিতে যেতে হচ্ছে।আজ তার মাথার গরম ভীষণ। একটা পড়াও পারেনি সে। নাহলে এই যে তাসরিফ ওর পিছনে পিছনে হেঁটে আসে প্রতিদিন তাতে তার কতই না ভালো লাগে। মনে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। কিন্তু আজ বিরক্ত লাগছে। রিহানি হঠাৎ দাড়িয়ে গেল। আজ এটার একটা বিহিত করেই ছাড়বে। রিহানিকে হঠাৎ দাড়িয়ে যেতে দেখে তাসরিফ থতমত খেয়ে গেলো। আর রিহানি যখন ঘুরে রণমুর্তি হয়ে ওর দিকে তাকাল ওর তো প্রাণ পাখি উড়ে যাবার মতো অবস্থা। তাসরিফ রিহানির এই রণমুর্তি রূপ দেখে উল্টো ঘুরে দাড়াল। রিহানির দাঁত  কিড়মিড় করে উঠলো। চেঁচিয়ে ডাকলো-" তাসরিফ ভাই। এই তাসরিফ ভাই। এইদিকে আসেন। এক্ষুনি এইদিকে আসেন। "

তাসরিফ আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।মেয়েটা যা রেগে আছে একটা কেলেঙ্কারি করেই ছাড়বে। তাসরিফকে থম মে*রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিহানি নিজে এগিয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝাল স্বরে বললো-" আপনার সমস্যা কি তাসরিফ ভাই। প্রতিদিন পিছু পিছু আসেন কেন?"

তাসরিফ ঘাড় চুলকে বললো-" কই? কিছু না তো। "

-" অবশ্যই কিছু আছে। আপনি আজ সত্যিটা না বললে আমি আপনাকে আস্ত ছাড়বো না বললম। বলেন বলছি কি সমস্যা আপনার।"

তাসরিফ নিশ্চুপ হয়ে মাথা নত করে ফেললো। তা দেখে রিহানির গা জ্বলে গেলো। এতো মিউ মিউ করা মানুষ ওর পছন্দ না একদম। তবুও এই লোকটার জালে ফেসে  কেমন করে সে ফেসে গেছে  নিজেও জানে না।রিহানি এবার জোড়ে একটা ধমক দিলো-" কি হলো?বলছেন না কেন? "

তাসরিফ মাথা নিচু করে জোতা দিয়ে রাস্তা খুঁটতে খুঁটতে বলল -" আসলে! বিষয়টা হলো। আমার হৃদয় ঘটিত সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি......"

তাসরিফ তার মুখের কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই রিহানি মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলো-" আল্লাহ গোওও! এ কি বলছেন তাসরিফ? ওওও তাসরিফ ভাই এটা কি করে হলো আপনার?এই বয়সে!  আল্লাহ গোও আমার এখন কি হবে গোওও। "

তাসরিফ একদম থতমত খেয়ে গেলো রিহানির এমন অবস্থা দেখে। আতঙ্কিত হয়ে বললো-" কি? কি হয়েছে রিহানি? এমন করছো কেন?এই"

রিহানি ওর কথায় কানও দিলো না। সে তাসরিফকে ধরে পাশের একটা দোকানের বেঞ্চে বসালো।তাসরিফ বার বার জিজ্ঞেস করে  আসল ঘটনা বের করতে পারলো না। বেকুব বনে রিহানির কান্ডকারখানা দেখে গেলো।রিহানি ওর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে কাকে যেন কল করে আসতে বললো। পরে দোকান থেকে পানি এনে থাকে খেতে দিলো। বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল বুকে ব্যাথা হচ্ছে নাকি।তাসরিফ এসবের কিছু না বুঝে বসে থাকলো। খানিকক্ষণ পরে জাকিরকে আসতে দেখা গেলো গলি দিয়ে। অস্থির হয়ে দৌড়ে তাদের দিকে আসছে। বোন আর বন্ধুকে দেখে এসে পাশে দাঁড়াল। তাসরিফকে ঝাপটে ধরে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে তোর?তোর এই সমস্যা আগে বললি না কেন আমাকে?এই তোর বন্ধুত্ব? চল আমার সাথে চল।"

তাসরিফ বেকুবের মতো প্রশ্ন করলো -" কোথায় যাবো? "

-" হসপিটালে।"

-" হসপিটালে কেন?"

-" তোর না হৃদরোগ? "

তাসরিফ নিজের কাঁধ থেকে জাকিরের হাত ঝাটকা দিয়ে সরিয়ে বললো-" মাফ কর ভাই। তোকে এসব কে বলছে?আমার এসব কিছু নাই। "

জাকির রিহানিকে ইঙ্গিত করে বললো -" ওই তো কল করে বললো তোর হৃদরোগ। কি রে তুই এসব বললি কেন?"

রিহানি মিনমিন করে বললো-" উনিই তো বললেন উনার হৃদয় ঘটিত সমস্যা। উনি তো হৃদরোগকে এসব বলেন। "

রিহানির কথা শোনে তাসরিফের নিজের মাথা ফাটাতে ইচ্ছে করল। জাকির আসল ঘটনা উদঘাটন করতে পেরে রক্তিম চোখে তাকালো তাসরিফের পানে। তাসরিফ মাথা নিচু করে নিলো ফের। জাকির সেখানে দাঁড়িয়েই দুজনকে এক ধাপ বকা ঝকা করলো। পরে বোনকে নিয়ে বাসার পথ ধরল। তাসরিফ ধরলো তার নিজের পথ। 

.......সমাপ্ত......

( কেমন লাগলো বলবেন পাখিরা। হঠাৎ মনে আসতেই লিখে ফেললাম। 🤦‍♀️🤦‍♀️)

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner