গল্প :ঝড়ের বেশে
 
Notifications
Clear all

গল্প :ঝড়ের বেশে


Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

 (অণুগল্প) 

লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী 


তিথি দরজার সামনে ঝুকে জোতার ফিঁতা বাঁধছিল। নাজমিনা খাতুন এসে তিথির ব্যাগটা এগিয়ে দিতেই তিথি উঠে দাড়াল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে অসন্তোষ স্বরে শুধালো -" আমার ব্যাগ নোংরা হলে কিন্তু তোমার খবর করে ছাড়বো খালা।"

নাজমিনা খাতুন অভয় দিয়ে বললেন -" এমন শক্ত করে বেঁধে দিয়েছি যে দুই তিনটা আছাড় মারলেও তরকারির কিছু হবে না। জেদ ধরে তো এতো রাতে চলে যাচ্ছিস। সকাল পর্যন্ত থাকলে কতকিছু করে তোকে খাওয়াতে পারতাম। কত নতুন নতুন রেসিপি যে শিখেছি! "

তিথি বিরক্ত মুখে নাজমিনা খাতুনের পানে চাইল। নাজমিনা খাতুনের মুখে বিগলিত হাসি। তাকে নতুন নতুন আজগুবি রান্না করে খাওয়ানোই যেন তার একমাত্র শখ।তিথি বললো-" তুমি তো বলেই খালাস। আমার এই সাইট ব্যাগটার দাম শুনলে তো আঁতকে উঠবে।"

নাজমিনা খাতুন শ্লেষ করে বললেন -" কি মেয়েরে তুই তিথি?  একটা ব্যাগের জন্য ম*রেই যাচ্ছিস। কত দাম শুনি? আমি না হয় টাকাটা দিয়ে দিবো। "

তিথি ঠোঁট কামড়ে নিজের তীক্ষ্ণ হাসিটা আড়াল করলো। প্লানিং মতোই কাজ হয়েছে। তিথি হেয়ালি কন্ঠ বললো -" রাখো তো!  দিতে হবে না। "

নাজমিনা খাতুন চোখ রাঙিয়ে তাকালেন -" বলতে বলছি না? "

তিথি মিনমিন করে বলল -"পাঁচ দিলেই হবে। "

নাজমিনা খাতুন দুষ্টুমি করে বললেন -" শুধু পাঁচ টাকা দিলেই হবে?"

তিথি  মুখটা ভোঁতা করতেই নাজমিনা খাতুন হেসে বললেন -" আচ্ছা যা।বাড়িতে পৌঁছেনোর আগেই তোর বিকাশে চলে যাবে। কিন্তু একটা শর্ত। সামনের সপ্তাহের ছুটিতে আমার বাসায় আসতেই হবে।"

তিথি নাজমিনা খাতুনের গাল টেনে দিয়ে বললো -"আচ্ছা। "
ব্যস্ততা দেখিয়ে বললো -"আচ্ছা, আচ্ছা এখন যাই। অনেক রাত হয়ে গেলো গো! "

নাজমিনা ম্লান স্বরে বললেন -" আচ্ছা যাও। রাস্তা ঘাট দেখে যাস।  "

"হুম" বলে খালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিথি নিমেষেই তিন তলার সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। 

তপন ভালো করে চোখে চশমাটা আটলো। পিছন ফিরে দেখলো নাহ কেউ নেই। তবুও তপনের গা কেমন ছমছম করেছে। নতুন মহল্লা বাসায় নেওয়া পর থেকেই শুনতে পেয়েছে এই রাস্তা নির্ঝন থাকে বলে প্রায়ই ছিনতাই হয়।আর এই একটাই রাস্তা মহল্লায় ঢোকার। তপন আবার সামনে চেয়ে হাঁটা গতি বাড়িয়ে দিলো। অফিস থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় আজ এতো দেরি হয়ে গেল। নির্ঝন রাস্তাটাকে এখন আরও নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে। নিরিবিলি রাস্তায় একা একা মাথা নত করে কিছুক্ষণ হাঁটার পরে হঠাৎ একটা লোক এসে তপনের রাস্তা রোধ করতেই তপন আঁতকে উঠল। ভীবৎষ  দেখতে লোকটা তার কালো কালো দাঁত বের তপনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। কর্কশ স্বরে বললো-" সাথে যা আছে এখনই দিয়া দে নাইলে এইটা দেখতে পারতাছোস? এইটা দিয়ে পেট ফুটো করে দিবো। "

তপন লোকটার হাতে পানে দৃষ্টিপাত করলো। চা*কুটা ল্যাম্পপোস্টের আলোতে কেমন ঝিলিক দিয়ে উঠলো। বেশ ধারালো দেখেই অনুধাবন করা যাচ্ছে। 

তিথি গুনগুন করে গান গেয়ে খালার বাসার মহল্লা থেকে বের হলো।তাদের বাসাটা বেশি দূরে না। আরও কিছুক্ষণ হাঁটলেই চলে যাবে। এই রাস্তা দিয়ে রাতে সবাই যেতে ভয় পেলেও সে পায় না।তার আবার ভয়ডর একটু কম আছে। আকস্মিক একটা কর্কশ কন্ঠ এসে তার কানে বাজতেই তিথি থমকে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজে কথাগুলোর কেন্দ্রস্থল বের করলো।একটা বেঁটে দেখতে লোক আরেকটা  সাদাসিধা তাগড়া যুবকের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি মুখ কুঁচকে নিলো সে দিকে তাকিয়ে। সেই যুবক পারলেই এইলোকটাকে নিমেষেই দুইতিন গা লাগিয়ে দিতে পারে। তিথি যুবকটাকেও দোষ দিতে পারলো না।উপস্থিত সময়ে অনেকেরই হুস উড়ে যায়।তিথি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের রাস্তা মাপলো।সে মেয়ে মানুষ হয়ে এসবে নাক গলাবে না। তবে তিথির উদার মন খচখচানি শুরু করল। তিথি নিজের হাত দুটো শক্ত করে সাইড ব্যাগে ধরল। নাহ সে নাক গলাবে না।একদম না।

তপন বেশি ঝামেলা না করে ঘটনাটার পাশ কে*টে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো।আপাততঃ রাস্তায় কেউ নেই। এই সয়ম কিছু করলে নিজে বিপদে পরবে তাই তার মানিব্যাগ বের করে লোকটার হাতে দিবে তখনই একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে গেল। একটা মেয়ে তার সাইট ব্যাগ দিয়ে লোকটার পিছন থেকে দিলো এক বারি। লোকটা অসচেতন থাকায় দুই তিন পা এগিয়ে গিয়ে রাস্তায় পরে গেলো। মেয়েটার ব্যাগে যে মজবুত কিছু ছিলো তা লোকটার পরে যাওয়া দেখেই বুঝা যাচ্ছে। লোকটা খানিকক্ষণ অচেতন হয়ে রাস্তায় পরে রইল। তপনও নিজের মুখটা ব্যাগের আক্রোশী ধাক্কা থেকে বাঁচাতে পিছনে হেলতে হেতলে ধপ করে রাস্তায়ই বসে পরল। মেয়েটার ঢিলে খোঁপা থেকে চুলগুলো অগোছালো হয়ে বের হয়ে এসেছে। মুখটা তাই অস্পষ্ট। মেয়েটা ছিনতাইকারীর দিকে দৃষ্টি রেখে বলে উঠলো -" এতো বছর ধরে এতো চেষ্টা করলাম নিজেকে লোকাইয়া রাখার। আর পারলাম না। আপনাদের কারণে বাইর হইতেই হলো আমার। হতাশ! আমি খুবই হতাশ! "

তিথি কথাটা বলে সচেতন হয়ে গেল। লোকটা নড়েচড়ে উঠছে। তপন চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে মিষ্টি ভাষিনীর পানে। তিথি রাস্তায় বসে হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটার বাহু ধরে টান মেরে উঠে দাঁড় কারালো। তপন যেন চাবি চালিত পুতুল। মেয়েটা যা করাচ্ছে তাই করছে। লোকটা গালিগালাজ করে উঠে দাড়ালো। তা দেখে তিথি আঁতকে উঠে চেচিয়ে উঠলো -" ও মা গোওওও।"

তপনের দিকে চেয়ে দেখলো বেকুবটা ওর দিকেই চেয়ে আছে। তিথি তপনের হাত খামচে ধরে প্রানপণে দৌড়াতে শুরু করল। পিছনে লোকটাও তাদের পিছন পিছন দৌড়ে আসছে। তিথি দৌড়ানোর বেগ বাড়িয়ে দিলো। তপনও তিথির সাথে তাল মেলালো। কিন্তু তার দৃষ্টি এখনও অগোছালো মেয়ের পানে আবদ্ধ। দৌড়ের জন্য বাতাসের দাপটে মুখের সামনের চুলগুলো পিছনের দিকে চলে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে মেয়েটা চেহারা এখন স্পষ্ট। তপন মুগ্ধ হয়ে গেল ঝড়ে বেশে আসা মেয়েটার উপর। তপনের মনে তখন একটাই সুর বেজে উঠলঃ- 

                      ঝড়ে বেশে.. এলো কে সে?
                        কাজল সে চোখ দুটি
             দিলো কঠিন কথার, বিষন্নতার ছুটি.......🎶🎶

সমাপ্ত।

Loading spinner

Reply
Share:

Loading spinner