Notifications
Clear all
August 7, 2026 7:06 pm
ষোলো বছর বয়সে চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছিলো আমার। ওর বয়সও কম ছিলো তখন। আমরা দুজন সমবয়সী, জন্মের পর থেকে একসাথে বড় হয়েছি। হিসেব করে বললে আমার থেকে মাসখানেকের বড় আমার স্বামী। তো যার কথা এতক্ষণ ধরে বলছিলাম, মানে আমার স্বামীর কথা। তাহলে পরিচয় দিই এবার? তার নাম- দ্য গ্রেট রকস্টার আযহার ভূঁইয়া। বাউন্ডুলে, ছন্নছাড়া, নিজের খেয়ালে চলা এক অদ্ভুত ছেলেমানুষ সে। স্বভাব থেকে জীবনযাপন—সবকিছুতেই আযহার আমার সম্পূর্ণ বিপরীত। আর আমি ইনসিয়া। ভীষণ মিষ্টি এবং বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। অবশ্য কথাটা আমি বলছি না, আশপাশের মানুষ'ই বলে। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ইনসিয়া। ছোটবেলা থেকে বইয়ের পাতার মুখ গুজে বড় হওয়া মেয়ে সে। পরীক্ষার খাতায় নম্বরকে গুরুত্ব দিয়ে বাঁচতে শেখা এক সাধারণ মেয়ে। তার জীবনে বড় স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া। সে গবেষণা করবে, বই লিখবে, নিজের পরিচয় নিজের হাতে গড়বে। এতটুকুই। খুব বেশি চাওয়া নেই তার।
অন্যদিকে গিটারের ছয়টা তারে আঙুল ছুঁইয়েই পুরো পৃথিবী ভুলে যাওয়া আযহার ভূঁইয়া। ইনসিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া থাকলেও, আযহারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটা। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের হাজার হাজার মানুষ যখন একসাথে চিৎকার করে আযহারের নাম ধরে ডাকে, সেটাই ওর অর্জন। এইযে, এখনো গলা ফাটিয়ে ডেকে যাচ্ছে আযহারের ভক্তরা,
"রকস্টার আযহার! রকস্টার আযহার!"
কি অদ্ভুত না? যে ছেলেটাকে ইনসিয়ার পরিবার একসময় ছন্নছাড়া, ভবঘুরে, বেকার বলে তাচ্ছিল্য করতো, আজ সেই ছেলের একটা কনসার্টের টিকিট পেতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ পেশা এবং শখে আযহার একজন সিঙ্গার। ধীরে ধীরে সময় বদলেছে, আচরণের পরিবর্তন হয়েছে আযহাররেও। তবুও ইনসিয়ার চোখে সে আজও সেই আগের আযহার'ই। যে পড়াশোনায় কখনো মন বসাতে পারেনি।এইচএসসি বহু কষ্টে পাশ করেই বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেছিলো সে। এরপর বাড়িতে বাবার বকুনি, আত্মীয়দের খোঁটা, অসংখ্য বাধা পেরিয়ে আজ এই স্থানে আযহার।
সেদিনও কেউ বিশ্বাস করেনি আযহারকে। ইনসিয়া ছাড়া। ইনসিয়ার যুক্তি বলতো, সব মানুষ কি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অধ্যাপক হওয়ার জন্য জন্মায়? না তো! বাঙালি পরিবারে পড়াশোনা ছাপিয়ে ছেলে-মেয়েদের শখগুলোকে দাম দেওয়া হয় না কখনো। যেমন আযহারও পরিবারের সমর্থন পায় নি। কিন্তু ওর স্ত্রীর সমর্থন, ভরসা দুটোই পেয়েছিলো।
ওদের পরিবার একটা ঠিক কাজ করেছিলো অবশ্য। তা হলো ওদের বিয়ে দিয়ে। পরিবারের সিদ্ধান্তে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো ওরা। আযহার আর ইনসিয়ার দাদুর জেদের ফলস্বরূপ বিয়েটা হয়। তারপর আর কি, এভাবেই চলছে।
~ বর্তমান ~
এখন সন্ধ্যা। সময় সাতটা পয়তাল্লিশ। একটু পরই আযহারের কনসার্ট শুরু হতে চলেছে। আজ আযহার ইনসিয়াকে সাথে করে নিয়ে এসেছে রাজশাহীর বাইরের এই কনসার্টে। অবশ্য প্রায় কনসার্টেই ইনসিয়া আসে। আযহার নিয়ে আসে ওকে। সেদিন ওকে বিশ্বাস করে সাথে ছিলো বলেই আজও ওর প্রতিটা কনসার্টে ইনসিয়া থাকে। স্টেজের সামনেই। আজও ইনসিয়া সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে দাঁড়িয়ে থেকেও ইনসিয়া লক্ষ্য করলো কারো সাথে আলাপ-আলোচনা সেরে আযহার এদিকেই আসছে। ইনসিয়ার চোখে পড়ে যায় আযহারের নার্ভাস হয়ে যাওয়া হাত দুটো। সামান্য কাঁপছে কি? হয়তো। আযহার সামনে এসে দাঁড়াতেই ইনসিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। চারপাশে তখনও দর্শকদের উচ্ছ্বাস থামেনি। আলো নিভে আবার জ্বলছে, সাউন্ডচেকের শেষ মুহূর্তের শব্দ ভেসে আসছে চারদিক থেকে। কিন্তু এত কোলাহলের মাঝেও ইনসিয়ার চোখ এড়ালো না আযহারের হাতের সূক্ষ্ম কাঁপুনিও। কি তীক্ষ দৃষ্টি মেয়েটার! আযহার কাছে আসতেই ইনসিয়া জানতে চায়,
" কী হয়েছে? "
খুব স্বাভাবিক গলায় প্রশ্নটা করলো ইনসিয়া।
আযহার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি টেনে মাথা নাড়লো। বলল,
" কিছু না।"
" কিছু না হলে হাত কাঁপছে কেন?"
আযহার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ তুলে ইনসিয়ার দিকে চাইলো। ধিমি গলায় বলল,
" একটু নার্ভাস লাগছে।"
ইনসিয়া ভ্রু উঁচু করলো,
" তুই? নার্ভাস?"
কথাটার ভেতরে অবাক হওয়ার সুর স্পষ্ট। আযহার হালকা হেসে বলল,
" আমি কি মানুষ না? আশ্চর্য! আমার ভয় লাগতে পারে না?
" এত বছর স্টেজে গান গাওয়ার পরও?"
" তারপরও.."
একটু থেমে নিঃশ্বাস ছাড়লো আযহার। বলল,
" প্রতিটা কনসার্টের আগেই এমন লাগে রে, ইন্সু। তোকে যে কি করে বোঝাই!"
ইনসিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। বাইরে থেকে যতটা আত্মবিশ্বাসী দেখায়, ভেতরে আযহার যে হালকা হলেও একটা চাপ নিয়ে প্রতিটা স্টেজে ওঠে। সেটা খুব কম মানুষই জানে। হয়তো জানেও না।
ইনসিয়া ধীরে ধীরে আযহারের দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে মুঠো করে ধরলো। আঙুলগুলো আলতো করে চেপে ধরে মৃদু স্বরে বলল,
"তোর নার্ভাসনেস কমাতে পারি আমি!"
আযহার জিজ্ঞেস করলো,
"কিভাবে?"
"হাগ কর, আমাকে। আ হাগ ইজ দ্য বেস্ট মেডিসিন ফর এভরি নার্ভাস মোমেন্ট। লাইক, অসুখে যেমন ক্যাপসুল কাজ করে!"
আযহার ইনসিয়ার আহবানে অবাক হলো। মেয়েটা আজকাল হুটহাট কাছে আসে, জড়তা কাজ করে না। তাই না করলো না আযহার। ওর বউ'ই তো মেয়েটা! জড়িয়ে ধরতে বিধিনিষেধ নেই ওদের। তাছাড়া মানসিক শান্তি, স্বস্তি বলতে আযহার ইন্সুকেই বোঝে। তাই আযহার দু-হাত বাড়িয়ে দিলে ইনসিয়া নরমভাবে দু-হাতে জড়িয়ে ধরলো একুশ বছরের বলিষ্ঠ পুরুষকে। আযহারও একটু শান্তি পেলো। কয়েক মুহূর্তের সেই ক্ষনে আযহারের বুকের ধুকপুকানিটাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো। অস্থিরতাগুলো গলে গিয়ে জায়গা করে নিলো এক টুকরো শান্তি। ইনসিয়া আলতো করে সরে এসে ওর চোখের দিকে তাকালো,
"এবার? কমেছে?"
আযহার কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। তারপর মাথার পেছনটা চুলকে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
"তোর যদি কোনো আপত্তি না থাকে... তাহলে আরেকটা ক্যাপসুল দিবি?"
ইনসিয়া আর হাসিটা আটকে রাখতে পারলো না। ঠোঁট কামড়ে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে আবারও এগিয়ে গেলো। দ্বিতীয়বারের মতো জড়িয়ে ধরলো নিজের স্বামী নামক মানুষটাকে। এইবার আর শুধু আযহারের নার্ভাসনেস কমলো না— দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য এক দূরত্বও নিঃশব্দে গলে গেলো। ইনসিয়া সরে আসলে আযহার আস্তে করে বলল,
" ধন্যবাদ, ইন্সু।"
ইনসিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা কাত করলো,
" আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিস কেন?"
" এভাবে সবসময় পাশে থাকিস, তাই।"
ইনসিয়া ছোট্ট করে হেসে ফেললো।
" স্ত্রী যদি স্বামীর পাশে না-ই থাকে, তাহলে আর কে থাকবে? হুহ!"
কথাটা শুনে আযহারও হাসলো। তারপর খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
"দোয়া কোরিস, ইন্সু।"
ইনসিয়া একবার স্টেজের দিকে তাকিয়ে আবার আযহারের চোখে চোখ রাখলো। হেসে বলল,
" দোয়া তো সবসময়ই করি। যাহ এবার।"
আযহার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ঠিক তখনই ব্যাকস্টেজ থেকে একজন স্টাফ দৌড়ে এসে বলল,
" ভাই, টাইম হয়ে গেছে।"
আযহার শেষবারের মতো ইনসিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। ইনসিয়ার মুখের সামনে আসা চুলে ফু দিলে ইনসিয়া চোখ-মুখ কুচকে নিলো। তা দেখে আযহার গিটার কাঁধে নিয়ে বলল,
" ফিরে এসে দেখা হচ্ছে, মিসেস রকস্টা'র। বৌকে বৌ রুপে দেখতে চাই।"
ইনসিয়া হেসে এগিয়ে গিয়ে ওর শার্টের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
"অবশ্যই, কেন নয়? অল দ্য বেস্ট, মিস্টার রকস্টা'র।"
---------------------------------
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ঘোষকের গলা ভেসে এলো,
"মেক সাম নয়েজ ফর... দ্য রকস্টার... আযহার!"
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো স্টেডিয়াম কেঁপে উঠলো হাজারো মানুষের চিৎকারে। ঘোষকের কণ্ঠ থেমে যেতেই চারদিক কেঁপে উঠলো করতালিতে।
ধোঁয়াভরা মঞ্চজুড়ে একে একে জ্বলে উঠলো স্পটলাইট। ড্রামের তালে তালে গিটারিস্টরা নিজেদের জায়গা নিলো। বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠলো,
' THE ROCKSTAR AZHAR '
হাজার হাজার মানুষের গর্জনে স্টেডিয়াম দুলে উঠলো। স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে ইনসিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। পলক ফেলছে না ও। এদিকে আযহার মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিতেই দর্শকদের চিৎকার আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। সে একবার চারদিকে তাকালো। ঠোঁটের কোণে চিরচেনা সেই হাসিটা ফুটে উঠলো।
ড্রামার স্টিক তুললো। অন্যান্য গিটারিস্ট প্রথম কর্ড বাজানোর জন্য প্রস্তুত। ঠিক তখনই, আযহার ডান হাতটা উঁচু করে ইশারা করলো থামতে। মুহূর্তেই সব থেমে গেলো। গিটার থেমে গেলো, ড্রাম থেমে গেলো।
কীবোর্ডের সুরও মিলিয়ে গেলো বাতাসে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে শব্দে শব্দে ভরে ছিলো পুরো স্টেডিয়াম, সেখানে হঠাৎ নেমে এলো অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। ইনসিয়াসহ দর্শকরা চমকে উঠলো।
কী হলো? সাউন্ডে কোনো সমস্যা? নাকি...বুকের ভেতরটা কেমন ধকধক করে উঠলো সবার। হঠাৎ আযহার ধীরে ধীরে স্টেজের একদম সামনের দিকে এগিয়ে এলো। তারপর হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি ইনসিয়ার দিকেই তাকালো।
ইনসিয়ার দিকে! ইনসিয়ার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আযহার হাসলো। ইনসিয়া বোকার ন্যায় চেয়ে আছে। কিচ্ছু বোধগম্য হচ্ছে না ওর। তারপর আযহার আচমকাই ডান হাতটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
"ইন্সু.. প্লিজ কাম টু দ্য স্টেইজ!"
ইনসিয়া স্থির হয়ে গেলো। চারপাশের অসংখ্য মানুষ একসাথে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। আর ইন্সু? স্টেজে? ভাবতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো ওর। ইনসিয়া মাথা নেড়ে না বোঝাতে চাইলো। কিন্তু আযহার জেদি হাসি হেসেই দাঁড়িয়ে রইলো। তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা একটুও নামালো না। দর্শকদের ভেতর থেকে শিস, করতালি, উল্লাস ভেসে আসতে লাগলো। এতে সামান্য লজ্জা পেলো ইনসিয়া।
শেষমেশ আর না করতে পারলো না। উপায় কই?
ধীরে ধীরে স্টেজে উঠতেই আযহার ইনসিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো মুঠোয় বন্দি করে। মুঠো বলছে, এত মানুষের মাঝেও হারিয়ে যেতে দেবে না ওকে।
আযহার ইনসিয়াকে নিয়ে গিয়ে নিজের ঠিক পাশেই রাখা একটি স্টুলে বসিয়ে দিলো। স্টুলটা যে আগে থেকেই রাখা ছিলো, সেটা দেখে বুঝলো ও... তারমানে সবকিছুই আগে থেকে পরিকল্পনা করা। ইনসিয়া বিস্মিত চোখে আযহারের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আযহার এবার মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের কাছে এনে কিছুক্ষণ নীরব থাকলো। পুরো স্টেডিয়াম অপেক্ষা করছে কিছু শুনতে। তারপর শান্ত, গভীর কণ্ঠে আযহার বললো,
"পিপল নো মি টুডে অ্যাজ 'দ্য রকস্টার আযহার।' বাট দিস নেইম, দিস স্টেইজ, অ্যান্ড দ্য লাভ অব থাউজ্যান্ডস অব পিপল... আই ডিডন্ট আর্ন এনি অব ইট অ্যালোন।"
কথাগুলো বলে আযহার একবার ইন্সুর দিকে তাকালো। চোখে এমন এক কোমলতা, যা শুধু ওর জন্যই। তারপর ইনসিয়ার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশে গর্ব করে বললো,
"সাকসেস শব্দটা আমার জীবনে এসেছে আমার স্ত্রীর জন্যই। এন্ড শী ইজ... মাই ওয়াইফ। মাই লাভ। শী ইজ দ্য রিজন আই'ম স্ট্যান্ডিং হিয়ার টুডে। শি ইজ দ্য রিজন আই নেভার গেইভ আপ।"
চারদিকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আযহার হাসলো ওর বৌয়ের দিকে চেয়ে। ইনসিয়াও বাকরুদ্ধ। কি হচ্ছে এসব! এরপর এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড সময় যাওয়ার পর পুরো স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো করতালিতে। শিস, উল্লাস, মানুষের চিৎকার বাজলো।
মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটে রাতের আকাশ তারাভরা হয়ে উঠলো।
ইনসিয়া এখনো নির্বাক। কথা বলতে পারছিলো না ও।
শুধু আযহারের দিকে তাকিয়ে ছিলো। ছেলেটা এসব কবে পরিকল্পনা করলো? ওকে একবারও জানালো না কেন? এরইমধ্যে আযহার ইনসিয়ার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলো। নিচু স্বরে শুধু ওকেই শোনানোর মতো করে বললো,
"আই লাভ ইয়্যু।"
তিনটি ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ড শুনে ইনসিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। অপেক্ষা ছিলো এই শব্দগুলোর। ঠিক তখনই আযহার বাম হাতে গিটারটা তুলে নিলো।
ডান হাতের আঙুল দিয়ে প্রথম স্ট্রামটা করতেই নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক মোহময় সুর।
এক মুহূর্তের মধ্যে ড্রাম, বেইস, কীবোর্ড—সবকিছু সেই সুরের সঙ্গে মিশে গেলো। গলা চড়িয়ে গিটার উঁচু করে আযহার বলল,
"এন্ড দিস ওয়ান'স ফর মাই ওয়াই'ফ।"
আর ইনসিয়া... ইনসিয়া বসে রইলো ওর ঠিক পাশে।
স্টেজের আলোয় ভেসে থাকা সেই ছন্নছাড়া ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। যে ছেলেটাকে সবাই একদিন ব্যর্থ বলেছিলো। আজ সেই ছেলেটাই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় কনসার্টে, হাজারো মানুষের সামনে, নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে নিজের বৌকে পরিচয় করিয়ে দিলো। এটা কি শুধু আযহারের প্রাপ্তি? না, ইনসিয়ারও প্রাপ্তি। ভালোবাসা, সফলতা সবটাই পেলো ওরা।
ইতিমধ্যে আযহারের কণ্ঠ ভেসে বেড়াচ্ছে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতে শুরু করলো আযহারের কন্ঠস্বরে জনপ্রিয় হওয়া সেই বিখ্যাত গান,
কি যেন হয়ে গেল আমার অন্তরে
বাড়ছো তিলে তিলে মনের অগোচরে
এভাবে দিন যায় কত, কত দিন আসে
মিশে যেতে থাকো তুমি শত অভ্যাসে
ভীষণ খরাতেও আমি ভিজে যাই
অধিকারের বৃষ্টিতে
আমার বেঁচে থাকার প্রার্থনাতে
বৃদ্ধ হতে চাই তোমার সাথে
অনেক খুজে তোমায় নিলাম চিনে
ভালোবাসার এই দিনে........
গানটা ইনসিয়া হাজারবার শুনেছে। বাসায়, গাড়িতে, আযহারের রিহার্সালেও। তবুও আজকের মতো করে কোনোদিন শুনেনি বোধহয়। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে কোরাস ধরেছে। কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে দুলছে, কেউ গলা ফাটিয়ে গাইছে। বিশাল স্টেডিয়ামটা যেন আর স্টেডিয়াম নেই—এ যেন এক সমুদ্র, আর সেই সমুদ্রের ঢেউ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আযহারের কণ্ঠ। ইনসিয়া চুপচাপ বসে আছে ওর স্বামীর পাশেই। মাঝে মাঝে আযহার গান গাইতে গাইতেই ইন্সুর দিকে তাকাচ্ছে, আবার একটু হাসছে। আবার দর্শকদের দিকে ফিরে যাচ্ছে। গানের উদ্দেশ্য তো ইনসিয়া'ই। ইনসিয়া কি বোঝেনি?
খানিকক্ষন পর গান শেষ হলো। মাইক্রোফোন তখনও আযহারের হাতেই। ইনসিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই আযহার আলতো করে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। কপালে একটুখানি চুমু খেলো আযহার, ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে।
স্টেডিয়াম আবারও উল্লাসে ফেটে পড়লো। আর ইনসিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। এত মানুষের সামনে ভালোবাসা প্রকাশ করতে ইনসিয়া কোনোদিনই অভ্যস্ত ছিলো না। কিন্তু আযহার ছিলো। সবসময় ছিলো। কারণ সে গান গেয়ে যেমন ভালোবাসতে জানে...তেমনি ভালোবাসাটাও গর্ব করে সারা পৃথিবীকে জানাতে জানে। আর এভাবেই সারাটা জীবন পথ চলতে চায় ইনসিয়া, চায় আযহার নিজেও। একইসাথে, #সহযাত্রী হয়ে।
|| সমাপ্ত ||
লেখিকা:প্রিয়াংশি চৌধুরী
অণুগল্প
[ কেমন লাগলো মন্তব্য করে জানাবেন কিন্তু! অনেক আগের লেখা একটি অনুগল্প, এতদিন নোটপ্যাডেই পড়ে ছিল। সিরিয়ালি পরীক্ষার জন্য কয়েকটা দিন রানিং গল্পের নতুন পর্ব দিতে পারছি না, দুঃখিত। একটু চাপে আছি। তাই ভাবলাম, আজ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই নতুন দুটো চরিত্রকে। আপনাদেরও পরিচয় হোক 'আযহার ভূঁইয়া আর ইনসিয়ার' সঙ্গে। 🤍 ]