অমৃত প্রণয় গাঁথা —পর্ব-৩[কপি করা নিষিদ্ধ ]

পরদিন সকাল।

নাস্তা সেরে ধীর পায়ে হেঁটে দুর্গের ছাতার নিচে এসে বসল ইশতিয়াক। হাতে তার কালো রঙের Nokia N95 ফোন। কালো ইয়ারফোনের একটা বাড কানে, আরেকটা গলার পেছনে ঝুলছে অবহেলায়—চোখ বন্ধ, হেলান দিয়ে বসে আছে নিশ্চিন্তে। যেন সে এখন পুরো দুনিয়ার বাইরে।

 

হঠাৎ কেউ একজন তার সামনে এসে দাঁড়াল।ইশতিয়াক খেয়াল করল না।


লেখকের ফেসবুক পেইজের লিঙ্ক , সবাই ফলো করুন

 

কিছুক্ষণ পর একটা গলা শোনা গেল—

“আস্‌সালামু আলাইকুম।”

 

ইশতিয়াক ধীরে কানের বাডটা খুলল। ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সামনে একটা মেয়ে—কালো বোরকা, কাঁধে ব্যাগ।

কর্কশ গলায় বলল,

“ওয়ালাইকুম আস্‌সালাম। কারে খুঁজেন?”

 

মেয়েটা একটু ইতস্তত করে বলল,

“ভাইয়া, আমি গতকালকের… ওই যে আরফান দেওয়ানের হাত থেকে আপনি বাঁচাইলেন। আমি সুমি।”

 

ইশতিয়াক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“ওহ। তো কী হইছে? দেওয়ান সাব কি আবার পথ আটকাইছে?”

 

সুমি বলল,

“না ভাইয়া। ধন্যবাদ দিতে আসছিলাম।”

 

ইশতিয়াক সুমিকে বসতে না বলে নিজেই উঠে দাঁড়াল।

“ধন্যবাদ দিতে হবে না। তবে একটা কথা কও—এইটা কি প্রথমবার হইলো?”

 

সুমি একটু থামল। তারপর ধীরে বলল,

“না ভাইয়া। প্রতিদিনই হয়। শুধু আমার সাথে না—মাদ্রাসার আরো অনেকের সাথে। আরফান দেওয়ানের লোকেরা রাস্তায় পথ আটকায়, কটু কথা বলে… এমনকি গায়ে হাত দেওয়ার মতো কাজও করে।”

 

ইশতিয়াক কিছু বলল না। শুধু একবার দূরের দিকে তাকাল।

 

তারপর বলল,

“একটা কাজ করো, তোমার মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের কাছে দরখাস্ত লেখো। সব মেয়েদের পক্ষ থেকে। আরফান দেওয়ান যা করছে সব লিখবা।”

 

সুমির মুখ একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“ভাইয়া… উনি তো বড় মানুষ। অনেক ক্ষমতা। উনার বিরুদ্ধে গেলে হিতে বিপরীত হইবো না?”

 

ইশতিয়াক সোজা তার চোখের দিকে তাকাল।

“তোমরা ভয় পাও বলেই উনি এই কাজ করতে পারতেছেন। উনি জানেন—কেউ টুঁ শব্দ করবে না। একবার যদি সবার সামনে বিচার বসাতে পারো, তাহলে এই সাহস আর দেখাইবো না।”

 

সুমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল,

“কিন্তু ভাইয়া… ওরা যদি আক্রমণ করে? আমাদের পেছনে তো কেউ নাই।”

 

ইশতিয়াক একটু থামল।

অনেকটা অজান্তেই একবার উপরের দিকে তাকাল। মুখে কোনো কথা নেই। গলাটা যেন একটু কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে—বাইরে বোঝা গেল না।

 

তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“ভাইয়া যেহেতু বলছো… আরফানের বিষয়টা না হয় ভাইয়ের উপরেই ছেড়ে দাও”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো আবার তারপর সালাম দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল

 

এদিকে

বেলা তখন সকাল দশটার কাছাকাছি।

ইমরান মির্জা আর তাহের খান পাশাপাশি হাঁটছেন। সামনে মেঠো পথ, দুপাশে সবুজ। দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে। বয়সের ভার দুজনের পায়ে থাকলেও মনে নেই।

 

তাহের খান চারপাশ দেখতে দেখতে বললেন,

“বন্ধু, গ্রামে তো দেখছি এখনো সবখানে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু তোর এখানে দেখলাম আছে।”

 

ইমরান মির্জা হাসলেন,

“হুম। সরকারিভাবে এখনো আসেনি। বাজারের লাইন থেকে দুই কিলো তার টেনে এনেছি।”

 

তাহের খান মাথা নাড়লেন,

“তুই সেই আগের মতোই আছিস। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করিস।”

 

কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটলেন দুজন।

তারপর তাহের খান গলা একটু নামিয়ে বললেন,

“আচ্ছা দোস্ত, তোর কি এখনো নাতির বউ দেখার ইচ্ছা করে না?”

 

ইমরান মির্জা একটু থামলেন। তারপর বললেন,

“ইচ্ছা আবার কার না করে রে?”

 

তাহের খান এবার একটু ঘুরে তাকালেন,

“আচ্ছা… আমাদের আয়রাকে তোর কেমন লাগে?”

 

ইমরান মির্জা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। বুঝতে দেরি হলো না। হালকা হেসে বললেন,

“এখনো ঘুরিয়ে কথা বলার অভ্যাসটা গেল না তোর। যা বলার সরাসরি বল।”

 

তাহের খান এবার থামলেন। সামনের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বললেন,

“বন্ধু, আমরা বিদেশে আছি অনেক বছর হলো। আয়রা সেখানেই বড় হয়েছে। কিন্তু আমার সবসময় একটাই চিন্তা—মেয়েটার শিকড় যেন না হারায়। বিদেশি ছেলে বিয়ে করলে আর কখনো ফেরা হবে না। আমি চাই আমার নাতনি একটা দেশি ছেলের ঘর করুক। নিজের মাটিতে থাকুক।”

 

এটা বলে তিনি একটু থামলেন।তারপর আবার বলতে লাগলেন,

“তোর পাঠানো সেই ফ্যামিলি অ্যালবামটা মনে আছে? দুই বছর আগে? ওইটা দেখে আমার ছেলে আর ছেলের বউ দুজনেই বলেছে—এই ছেলে হলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। আর আয়রাও… মানে ওর অপছন্দ নয়।”

 

ইমরান মির্জা কিছুক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটলেন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন,

“আসলে বন্ধু, আমার নাতি একটু একরোখা টাইপ আরকি। ও ওর মনের কথাই শোনে। আর ওকে বোঝাতে গেলেও লাভ নেই—তোকে হাজারটা বুঝ দিয়ে দেবে।”

 

তাহের খান হেসে ফেললেন।

“তুই এত চাপ নিচ্ছিস কেন? কী হয় দেখাই যাক।”

 

ইমরান মির্জা বন্ধুর দিকে তাকালেন। তারপর মুচকি হাসলেন।

দুজন আবার হাঁটতে শুরু করলেন।

 

এদিকে,

রোয়াইলবাড়ি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা। টিফিনের বিরতি।

 

আরিশা তখনো ক্লাসরুমে। খাতার স্তূপ সামনে নিয়ে বসে আছেন, কলম হাতে। বাইরে মেয়েদের হইচই, ভেতরে নীরবতা।

 

হঠাৎ সুমি উঠে দাঁড়াল। গলাটা কাঁপছে, কিন্তু সে থামল না। গতকালের ঘটনা বলল। মির্জা ভাইয়ের কথা বলল। দরখাস্তের কথা বলল।

 

আরিশা কলমটা নামিয়ে রাখলেন।

পুরো ক্লাসে এক অদ্ভুত নীরবতা।

 

কেউ জানালার বাইরে তাকাল। কেউ বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিল। কেউ চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

 

তারপর একটা মেয়ে বলে উঠল—

“পাগল হইছস সুমি? আরফান দেওয়ানের বিরুদ্ধে আমরা? আমাদের ফ্যামিলি মানবে? আর ওই মির্জা লোকটা তো নিজেই একটা গুন্ডা!”

 

এমন সময়,

আরিশা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন।

ক্লাসের সবাই একবার তাঁর দিকে তাকাল। ম্যাডাম কী বলবেন?

 

তিনি কোনো কথা বললেন না। সোজা হেঁটে সুমির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ক্লাসের দিকে ঘুরে বললেন—

“লোকটা গুন্ডা না কি জানি না। আর যদি গুন্ডাও হয়, তাতে কী? লোকটা যেটা বলছে সেটা ভুল কিছু না। আর আমরা যদি আজ না দাঁড়াই, কাল হয়তো আমাদের মধ্যে আরেকজনের ওড়না আরফান দেওয়ানের হাতে থাকবে। আমি সুমির সাথে আছি।”

ক্লাসে আবার নীরবতা।

 

একজন শিক্ষিকা পাশে দাঁড়িয়েছেন—এটা দেখে একজন হাত তুলল। আরেকজন। মোট তিনজন।

বাকিরা তখনো দ্বিধায়।

 

এদিকে ইশতিয়াকের বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেল।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের রুমের দরজা ঠেলতে গিয়ে ইশতিয়াক থামল।

 

দরজা খোলা।

ভেতরে ঢুকতেই দেখল—আয়রা। টেবিলের উপর রাখা ক্যাসেট প্লেয়ারটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছে। তারপর সেটা নামিয়ে রেখে দেয়ালে ঝোলানো একটা পুরনো সাদাকালো ছবির দিকে এগোল। খুঁটিয়ে দেখছে।

 

ইশতিয়াক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে রইল।

 

কিছুক্ষণ পর আয়রা ঘুরতেই চোখে চোখ পড়ল।

সে চমকে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি কখন আসলে?”

 

ইশতিয়াক জবাব দিল না।

 

আয়রা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তবু ছবিটার দিকে ঘুরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,

“এই ছবিতে… এই ছেলেটা তুমি, তাই না? ছোটবেলার।”

 

ইশতিয়াক কিছু বলল না।

আয়রা আরেকটু মনোযোগ দিয়ে দেখল।

“আর এই দুজন… বয়স দেখে মনে হচ্ছে তোমার মা-বাবা।”

ইশতিয়াক এখনো নিরব।

 

আয়রা একটু থামল। তারপর ছবির একটা জায়গায় চোখ আটকাল।সে আবারো বলল,

 

“আর এই ছোট্ট মেয়েটা? তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে… হয়তো তোমার বোন?”

 

রুমে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।

 

আয়রা সেটা টের পেয়েও থামল না।

 

“কিন্তু বাড়িতে তো ওকে দেখলাম না। ও কোথায়?”

 

ইশতিয়াক এবার দরজাটা পুরো খুলে ধরল। শান্ত গলায় বলল,

“ডোন্ট মাইন্ড, মিস আয়রা। আমার রুমে কেউ না থাকলে আমি একটু বেশি কমফোর্ট ফিল করি।”

 

আয়রা বুঝল সে হয়তো সেনসিটিভ কোথাও হাত দিয়ে ফেলেছে। কী বলবে বুঝতে পারল না। মাথা সামান্য উঁচু রেখে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।

 

দরজাটা বন্ধ হলো।ইশতিয়াক একা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।তারপর ধীরে এগিয়ে গেল দেয়ালের ছবিটার কাছে।

 

ছবিতে বাবা-মার মুখের দিকে একবার তাকালো তারপর সেই ছোট্ট মেয়েটার দিকে একবার তাকাল।

 

তারপর আচমকাই চোখ সরিয়ে নিল।তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল আর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।

 

এদিকে বিকেল বেলা।

 

পৌরসভা ভবনের ছাদের এক কোণে ছাতা টাঙানো ছোট একটা টেবিল। চারপাশটা নিরিবিলি।হানিফ হোসেন বসে আছেন মাঝখানের চেয়ারে। তার সামনে দলের বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক আর আরফান দেওয়ান। সবার মুখ থমথমে।

 

একজন নেতা গলার স্বর নিচু করে বলল,

“মেয়র সাব, নির্বাচন তো একদম ঘাড়ের ওপর আইসা পড়ল। কিন্তু কাজের কাজ তো কিছুই হইতাছে না। বিরোধী দল তো তলে তলে কোমর বাঁধতাছে।”

 

আরেকজন যোগ করল,

“ঠিকই কইছে। আমাদের যে ‘সামান’ রেডি করার কথা ছিল, সেগুলার কি খবর? খালি হাতে তো আর শিকারে নামা যাইবো না। মাঠ গরম করতে হইলে তো জিনিস লাগবো।”

 

মেয়র একটা সিগ্রেট ধরালেন। ধোঁয়াটা ধীরেসুস্থে ছেড়ে বললেন,

“সবুরে মেওয়া ফলে, বুঝলেন? জিনিসের ব্যবস্থা হইতাছে। তবে সময়টা একটু খারাপ। বর্ডার এলাকায় কড়াকড়ি বেশি, তাই একটু দেরি হইতাছে।”

 

আরফান দেওয়ান পান চিবোতে চিবোতে মেজাজ নিয়ে বললেন,

“দেরি হইলে তো চলবো না মেয়র সাব। প্রতিপক্ষ কিন্তু প্রতিটা কদম মেপে মেপে ফেলতেছে। ওগো অবস্থান এখন বেশ শক্ত।”

 

মেয়র আরফানের দিকে আড়চোখে তাকালেন। তার চোখে এক ধরনের অবজ্ঞা।

“দেওয়ান সাব, পলিটিক্স হইলো দাবার বোর্ডের মতো। হুটহাট চাল দিলে কিস্তি মাত হয় না। আমার একটা বিশ্বস্ত পার্টির সাথে কথা হইছে। মাল সাত দিনের মধ্যে ঢুকবে। এক একটা জিনিস একদম ফ্রেশ, সরাসরি ওপার থেইকা আসবো।”

 

আর কি যেন বললেন? প্রতিপক্ষ এখন শক্ত?

 

এসব চিন্তা এখন কেন মাথায় আনেন? এখন পাবলিকের সামনে যত সংযত থাকা যায় ততই আমাদের মঙ্গল। বেশি সেয়ানা গিরি করতে গেলে আবার হিতে বিপরীত হইবো।

 

এটা বলে হানিফ হোসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। সিগ্রেটের শেষ অংশটুকু ছাইদানিতে পিষে মারলেন। চারপাশের সবার ওপর একবার তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে একদম নিচু স্বরে বললেন—

 

“মনে রাইখেন, এবারের বাজিটা অনেক বড়। আর কোথায় থেইকা মাল আসতাছে আর কে আনতাছে—এইটা নিয়া দ্বিতীয়বার কেউ প্রশ্ন করবেন না। শুধু এইটুকু জাইনা রাখেন,এবার এই কেন্দুয়ায় এমন কিছু নামবো যা এই তল্লাটের কেউ কোনোদিন চোখে দেখে নাই।”

 

মেয়র ছাদের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বললে,

 

“খেলার ঘুঁটি সব সাজানো শেষ। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

 

চলবে…(ইনশাআল্লাহ)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x