গল্প:বিরহ বৃত্তান্ত (০৫)

লেখিকা:জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

পর্ব:০৫

 

‘খালা, পানির পাতিল আবার রান্নাঘরে রেখে আসুন।’

খালা অপ্রস্তুত হলেন। একবার তাকালেন মেহেরুনের দিকে। মেয়েটার চোখ মুখ কুঁচকানো। আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

‘খালা, কথা কানে যায়নি?’

খালা মাথা নুইয়ে পানির পাতিল নিয়ে পা বাড়ালেন আবার। মেহেরুন নড়ল না। খালা দৃষ্টির আড়াল হতেই ওয়াহীদ তার দিকে এগিয়ে এল। খুব কাছে এসে তাকে হেঁচকা টানে ঘরের ভেতরে নিয়ে এল ততক্ষণাৎ। মেহেরুন হাত মোচড়াচ্ছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। ওয়াহীদ ছাড়ল না। হাতের শৃঙ্খল শক্ত করল বরং। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘দশ লক্ষ টাকা মোহরানা দিয়ে তোমাকে এই বাড়িতে এনেছি। বাকি জীবন খাওয়া-পরার দায়িত্ব নিয়েছি। এর বেশি আর কী চাও তুমি? আমার সংসারের কাজ করবে না তো কী করবে? তোমাকে তো বিয়ে করেছিই এজন্য। নয়তো আমার ঘরে মেয়ে মানুষ তোলার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।’

বলেই আরো শক্ত করে মেহেরুনের হাতটা চেপে ধরল সে। ব্যথায় ককিয়ে ওঠল মেয়েটা। চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। তা দেখে মৃদু হাসল ওয়াহীদ। গলার স্বর নরম করল। বড্ড আদর নিয়ে বলল, ‘ব্যথা পাচ্ছ, জান? আমি তো ব্যথা দিতে চাইনি। তুমিই তো বাধ্য করলে। আর এমন কোরো না, কেমন?’

হাতটা ছেড়ে দিল ওয়াহীদ। মেহেরুন চোখ খুলল। দৃষ্টি ভেজা। হাতের দিকে চেয়ে দেখল লাল হয়ে গেছে। সে তাকাল ওয়াহীদের দিকে। কান্না দমিয়ে আমর্ষ গলায় বলে উঠল,

‘করব না আমি আপনার সংসারের কাজ। আপনার কোনো কাজ আমি করব না। আর দশ লক্ষ টাকার মোহরানার কথা বলছেন তো, ওটা আমার হক। যেটা আপনি এখনো দেননি। খাওয়া-পরার দায়িত্ব যেটা নিয়েছেন সেটা না নিলেও আমি ঠিক চলতে পারব। ঐটুকু যোগ্যতা আমার আছে, মিস্টার ওয়াহীদ শিকদার।’

রাগে বড়ো বড়ো করে নিশ্বাস ফেলছে মেহেরুন। কান্না পাচ্ছে তার ভীষণ। মা-বাবা এ কার সাথে বিয়ে দিল তার। এই আচরণ সে কেমন করে সহ্য করবে?

মেহেরুন না পেরে সেখান থেকে দৌড়ে বের হয়ে তার শ্বশুরের ঘরের সামনে গেল। নাক টেনে কান্নাটুকু গিলে মৃদু সুরে বলল,

‘বাবা, ভেতরে আছেন? আসব?’

‘এসো, মা।’

দরজা ঠেলে ভেতরে গেল মেহেরুন। ভদ্রলোক বিছানায় আধশোয়া ছিলেন। মেহেরুনকে দেখে উঠে বসলেন। হেসে বললেন, ‘কিছু বলবে, মা?’

পরক্ষণেই আবার থেমে গেলেন। মেহেরুন সংকীর্ণ লালচে মুখটা দেখে চিন্তিত হলেন খানিক। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে, মেহেরুন? তোমার চোখ মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?’

মেহেরুন আর থাকতে না পেরে কেঁদে ফেলল।

‘বাবা, কী দরকার ছিল জোর করে আপনার ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার? উনি এখন কোনোভাবেই আমাকে মেনে নিতে পারছেন না। আমার সাথে ইচ্ছে করে খারাপ আচরণ করছেন। এখানে আমার দোষটা কোথায়, বাবা? আমি কী করেছি? আমার সাথে কেন এমন করা হচ্ছে?’

মেহেরুন অঝোরে কাঁদছে। তার সাথে কেউ কখনো রূঢ় ভাষায় দুটো কথা বলেনি। সবার বড়ো আদরে, আহ্লাদে বড়ো হওয়া মেয়ে সে। এখন বিয়ে করেই স্বামীর এই আচরণ সে আর নিতে পারছে না।

মামুন শিকদারের চোখে মুখে হতাশা ফুটে উঠল। মেয়েটাকে বড্ড শখ করে এই বাড়ির বউ করে এনেছেন। নিজের ভাইয়ের মেয়ে, তারা শুধুমাত্র তার মুখের দিকে তাকিয়ে এক কথায় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এখন যদি এসব কথা তাদের কানে যায় তবে আর তার মুখ দেখানোর জো থাকবে না। তিনি ছোট্ট নিশ্বাস ফেললেন। মেহেরুনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

‘কেঁদো না, মা। আমি ওয়াহীদের সাথে কথা বলব। তুমি এখনই তোমার মা-বাবাকে বোলো না কিছু। উনারা আমাকে ভুল বুঝবেন।’

‘আমি নিজেও এমনটা চাই না, বাবা। বিয়ে করেছি, আর পাঁচটা মেয়ের মতো আমিও একটা সুন্দর, সুখের সংসার চাই। কিন্তু আপনার ছেলের জন্য সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। উনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না, বাবা। কাজ করানোর নামে উনি অযথা আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন।’

‘আমি বুঝতে পেরেছি। এমন কিছুই হবে না। ওয়াহীদকে আমি শাসন করব। চিন্তা কোরো না, মা। যাও, ঘরে যাও।’

মেহেরুন চোখ মুছে সেই ঘর থেকে বের হয়ে এল। কী ভেবে নিচে রান্নাঘরে গেল সে। খালা এখনও পানির পাতিল নিয়ে রান্নাঘরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মেহেরুন গিয়ে তার কাছ থেকে পাতিলটা নিল। খালা চিন্তিত হলেন, ‘আপনি পারবেন, খালা?’

‘সংসারটা তো আমারই, খালা। আমি না পারলে আর কে পারবে?’

মেহেরুন পাতিলসহ ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। পেছন থেকে খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়ালেন, ‘আহারে, মিষ্টি এই মাইয়াডার ভাগ্যে কী জামাই জুটল!’

মেহেরুন ঘরে এসে চুপচাপ পানি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ওয়াহীদ তখন বিছানায় বসে ছিল। মেহেরুনকে দেখে সে আর কিছু বলে না। মেহেরুন বালতিতে পানি রেখে ঘর থেকে চলে আসার সময় ওয়াহীদ বলে উঠে,

‘হাতে বেশি ব্যথা লাগলে ওষুধ খেয়ে নিবে। এই নিয়ে এত আহ্লাদের কিছু নেই।’

মেহেরুন কিছু বলার জন্য পেছনে ঘুরতেই দেখল লোকটা ওয়াশরুমের দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছে। সে ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘জঘন্য লোক একটা!’

___

শ্বশুরবাড়িতে মেহেরুনের প্রথম ইফতার। সে টুকটাক ইফতারি বানাতে পারে। তাই করছে। খালা পাশ থেকে সাহায্য করায় সবকিছু আরো সহজ হচ্ছে তার জন্য। এর মাঝেই ফিহা আর সাদ এল আবার। হাতে দুটো বড়ো বড়ো স্টিলের থালা। মেহেরুন দেখেই বুঝল, মা-চাচিরা মিলে ইফতার বানিয়ে পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই। সে সময়ই উপর থেকে বসার ঘরে আসে ওয়াহীদ। দু দুটো বিশাল থালা দেখে সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

‘এগুলো কী?’

মেহেরুন তার প্রশ্নের জবাব দিল না। তবে ফিহা হেসে বলল, ‘আমাদের বাড়ি থেকে ইফতার নিয়ে এসেছি, ভাইয়া।’

নেমে এল ওয়াহীদ। এসে এক ঝলক মেহেরুন মুখটা আড়চোখে দেখে নিয়ে ফিহার দিকে তাকাল। বলল,

‘কেন? তোমাদের বাড়ি থেকে ইফতার নিয়ে এলে কেন? আমাদের এখানে কি তোমাদের বোনকে ইফতার করানো হবে না?’

‘সেজন্য নয়, ভাইয়া। ইফতার আপনাদের সবার জন্য আনা হয়েছে।’

‘ওয়াহীদ শিকদার এত অক্ষম নয় যে তাকে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে আনা ইফতার দিয়ে রোজা ভাঙতে হবে। এসব আমার পছন্দ নয়। দ্বিতীয়বার আর কখনো যেন তোমাদের ওখান থেকে এই বাড়িতে কিছু না আসে।’

ফিহার হাসিটা নিভে গেল। জবাবে মাথা হেলাল কেবল। ওয়াহীদ বেরিয়ে গেল এরপর। ফিহা বোনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘আপু, ভাইয়া কি রাগ করেছেন?’

‘না, চাচ্চু। তোমাদের ভাইয়া রাগ করে এই কথা বলেনি। বরং বলেছে তোমাদের ভুল ভাঙার জন্য। শ্বশুরবাড়ি থেকে ইফতারের জন্য এক গাদা খাবার নেওয়া খুবই দৃষ্টিকটু ব্যাপার। অনেক জায়গায় তো রীতিমত চাপ প্রয়োগ করে ব্যাপারটা আদায় করে নেওয়া হয়। তাই তোমাদের ভাইয়া বারণ করেছে। আমরা যদি বারণ না করি তবে কিছু সংখ্যক খারাপ আর লোভী মানুষগুলো প্রশ্রয় পেয়ে যাবে।’

মামুন শিকদারের কথায় ফিহার ভুল ভাঙতেই সে হাসল আবার। মেহেরুন চিন্তায় পড়ল। ঐ লোকটা আদতে এত সুবিবেচক নাকি? এখানে আসার পর তো একবারও তা মনে হয়নি। ন্যায়-অন্যায়ের চিন্তা আদতে তিনি করেন? না বোঝেন ব্যাপারটা? মেহেরুনের তো তা মনে হয় না। নয়তো সদ্য বিয়ে করা বউয়ের সাথে কেউ এমন আচরণ কেন করবে!

ফিহা আর সাদকে ইফতারের জন্য বললেও চলে যায় তারা। বাড়িতে না বলে এখানে বসে ইফতার করলে বকা শুনবে নিশ্চিত। তারা চলে যাওয়ার পরপরই মেহেরুন সব আয়োজন শেষ করে খাবার টেবিলটা চমৎকারভাবে গুছিয়ে ফেলে। বাইরে থেকে তাজা ফুল আর ঘরে থাকা কিছু মোমবাতি দিয়ে নতুন করে সাজায় জায়গাটা। ইফতারের আর বেশি সময় নেই। ওয়াহীদ বাইরে থেকে ফিরেছে। হাতে করে কিছু নিয়ে এসেছে হয়তো। মেহেরুনকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না। খালাকে ডেকে প্যাকেট দিয়ে বলল,

‘কিছু ফলমূল আছে। মেহেরুনকে বলবেন কেটে টেবিলে দেওয়ার জন্য।’

ওযু করে তৈরি হয়ে ইফতারের টেবিলের সামনে আসতেই চোখ মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল মামুন শিকদারের। টেবিল দেখে বড্ড খুশি হলেন তিনি। এতদিনে ঘরের বউয়ের ছোঁয়া পেয়ে নিস্তেজ টেবিলটা আবারও যেন প্রাণ পেয়েছে। তিনি হেসে বললেন,

‘টেবিলটা দেখে মনটা ভালো হয়ে গিয়েছে, মা। দোয়া করি, আল্লাহ তোমাকে অনেক সুখী করুক।’

মাথা নুইয়ে মৃদু হেসে মেহেরুন মনে মনে বলল, ‘আমিন।’

মামুন শিকদার চেয়ার টেনে বসতেই সেখানে ওয়াহীদ এল।

‘দেখ, বউমা কী সুন্দর টেবিল গুছিয়েছে। বিয়ে না করলে এমন গোছানো টেবিলে খাওয়ার সুযোগ হতো কখনো?’

পাঞ্জাবীর হাতা গোটাতে গোটাতে বাবার কথা শুনে টেবিলটার দিকে তাকাল ওয়াহীদ। দেখল, সত্যিই ভীষণ সুন্দর গোছানো সব। ফুল আলো আর সুস্বাদু খাবারের সাজে কেবল ঝলমল করছে টেবিলটা। অথচ কাল অবধিও এমনটা ছিল না। সে এক ঝলক মেহেরুনকে দেখল। মাথায় ঘোমটা টানা মেয়েটা মাথা নিচু করে শরবতের গ্লাসে শরবত ঢালছে। প্রসন্নবোধটুকু গিলে নিয়ে ওয়াহীদ বলল,

‘এগুলো আজকাল যেকোনো রেস্টুরেন্টে গেলেই পেয়ে যাবেন, আব্বা।’

মামুন শিকদার বীতঃস্পৃহ ভঙিতে বললেন, ‘বাড়িতে যে ভালোবাসা আছে রেস্টুরেন্টে সেই ভালোবাসা পাবে না, ওয়াহীদ। সবসময় সবকিছুকে কৃত্রিম জিনিসের সঙ্গে তুলনা দিবে না। কারোর দায়িত্বের চাপে করা কাজ আর কারোর ভালোবাসা দিয়ে করা কাজের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত থাকে।’

ওয়াহীদ কিছু না বলে অল্প হাসল কেবল। মামুন শিকদার মেহেরুনের দিকে চেয়ে বললেন, ‘অনেক কাজ হয়েছে, মা। এখন তুমিও বসে পড়ো।’

লোকটা সেহেরির সময় একটা নাটক করেছিল। এখন বসতে নিলে আবার কী নাটক করে কে জানে। তবে তাকে হঠাৎ চরম অবাক করে দিয়ে ওয়াহীদ তার নিজের পাশের চেয়ারটা একটু ঢেলে দিয়ে মেহেরুনকে বসার জায়গা করে দিল। যদিও সে তাকায়নি। তাও মেহেরুন বুঝল, লোকটা তাকে পাশেই বসতে বলছে হয়তো। কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বসল সে। ওয়াহীদ নিজের চেয়ারটায় হেলান দিল। গলার স্বর খুবই সামান্য করে ধীর গলায় বলল,

‘বাবাকে কীভাবে হাতের মুঠোয় নিতে হবে খুব ভালোই জানো দেখছি। তুমি মেয়ে ভারী চালাক।’

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x