লেখিকা:জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৬
মাগরিবের নামাজের পর বসার ঘরে দু কাপ চা দিয়ে এসে মেহেরুন উপরের তলার বেলকনিতে চলে যায়। বাইরে বাতাস বেড়েছে। এই সময় সেখানে গেলে মনটা ভালো হয়ে যাবে নিশ্চিত।
চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে মামুন শিকদার ছেলের দিকে তাকালেন। ছেলে অন্য সোফায়। আয়েশী ভঙিতে বসা তার এক হাতে চায়ের কাপ অন্যটাতে একটা ম্যাগাজিন। তিনি তাকে অল্প কিছুক্ষণ পরখ করে গম্ভীর গলায় শুধালেন, ‘কী শুরু করেছ, ওয়াহীদ?’
ওয়াহীদ চোখ তুলে একবার বাবাকে দেখল। এরপর আবার চাইল ম্যাগাজিনের দিকে। সপ্রতিভ সুরে বলল, ‘কী করেছি?’
‘মেহেরুনের অন্যায় কোথায়? ওর সাথে তুমি এমন করছ কেন?’
ম্যাগাজিনটা এবার টি-টেবিলের উপর রেখে দিল ওয়াহীদ। খানিকটা শব্দ হলো। শিকদার সাহেব একবার সেদিকে চেয়ে আবার ছেলের দিকে তাকালেন। ওয়াহীদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে প্রথমে এরপর বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
‘মেহেরুনের সাথে আমি কী অন্যায় করেছি, আব্বা? ওকে আমি মেরেছি, বকেছি, গালাগালি করেছি? কোনটা? কোন অন্যায়টা আমি করেছি ওর সাথে?’
‘স্ত্রীকে কেবল মারা আর গালাগালি করাটাই অন্যায় না। তাকে মানসিক অশান্তি দেওয়াও অন্যায়। তুমি অবুঝ নও, ওয়াহীদ। বয়স কম হয়নি। তোমার জন্য যেন আমাকে কারোর কাছে ছোট হতে না হয়। আমি তোমার সম্পর্কে মেহেরুনের কাছ থেকে আর কোনো অভিযোগ শুনতে চাই না। স্ত্রীকে সম্মান করবে। প্রয়োজন পড়লে শাসন করবে, তবে অপমান না। মনে থাকে যেন।’
চায়ের কাপ হাতে উঠে পড়লেন মামুন শিকদার। ওয়াহীদ একাই বসে রইল। চোয়াল দৃঢ় হলো তার। রাগ বাড়ল তরতরিয়ে। কপালের কাছটা ঘামল অল্প। সেখানে সামান্য আঙ্গুল ঘঁষে বিড়বিড়াল, ‘স্ত্রীকে সম্মান করব? এই স্ত্রী জাতের আদতে সম্মান পাওয়ার কোনো যোগ্যতা আছে? না, নেই। কোনো যোগ্যতা নেই এদের।’
চায়ের কাপটা একপ্রকার ছুড়ে ফেলে উঠে বাসার বাইরে চলে গেল সে। বাইরে তখন বাতাস ভীষণ। মেহেরুন ব্যালকনি থেকেই দেখল, লোকটা হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে যাচ্ছে কোথাও। তাতে যেন সে খুশিই হলো ভীষণ। ভাবল, এই সুযোগ! এখন একবার চট করে ঐ বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে।
সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল মামুন শিকদারকে। তাকে হঠাৎ দেখে খানিকটা অপ্রস্তুতই হলো মেহেরুন। হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘বাবা, কিছু বলবেন?’
‘হ্যাঁ, মা। বসো।’
ব্যালকনিতে রাখা চারটা আসনের একটাতে মেহেরুন বসল। অপর পাশের আরেকটাতে বসলেন মামুন শিকদার। বাতাসে তার মাথার আধ পাঁকা চুলগুলো উড়ছে। তিনি হাসলেন অল্প। মেহেরুনের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোমাকে বাবা হিসেবে আজ একটা কথা বলি, মনে রাখবে সবসময়। আগুনকে না কখনো আগুন দিয়ে নেভানো যায় না। আগুন নেভাতে হয় পানি দিয়ে। আমার ছেলেটা হলো সেই আগুন, বিপরীতে যদি তুমিও আগুন হও তবে সেই আগুনে আগুনে মিলে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়ে যাবে। তোমাকে তাই পানি হতে হবে, মা। ঠান্ডা, শীতল পানি। তাহলেই দেখবে সেই পানির সংস্পর্শে আগুন কেমন করে নিভে যায়।’
মেহেরুন মিইয়ে যাওয়া সুরে বলল, ‘কিন্তু এমনটা আমি কেমন করে করব, বাবা? উনি তো আমাকে সহ্য করতে পারেন না।’
‘মানুষ কখন সবথেকে বেশি তৃপ্ত হয় জানো? যখন সে কাউকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে এবং দেখে যে, অপর পাশের মানুষটা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে। অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এবং তোমাকে এই জিনিসটাই আটকাতে হবে। ওয়াহীদের উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না, মেহেরুন। ও চাইছেই তোমাকে কষ্ট দিতে, এবং বিপরীতে যদি তুমিও এমনটা প্রকাশ করো যে, হ্যাঁ, তুমি সত্যিই কষ্ট পাচ্ছ তাহলেই ও তৃপ্তি পেয়ে যাবে। আনন্দ পাবে, আরো দ্বিগুণ উৎসাহে পরবর্তীতে কাজটা করবে। এখানেই উল্টো চালটা চালতে হবে তোমার। তুমি এমন ভাব ধরবে যেন ওয়াহীদের কোনো কাজ, কোনো কথা তোমার গায়েই লাগছে না। ওয়াহীদ তোমাকে সারাক্ষণ কাজ করিয়ে খাটাচ্ছে তো, তুমি তাই আগ বাড়িয়ে সারাদিক ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে বেশি কাজ করবে। যেন ও তোমাকে কিছু বলার সুযোগই না পায়। ঠিক এভাবে ধীরে ধীরে যখন ও বুঝবে, ওর কোনো কথা বা কাজে তোমার কিচ্ছু যায় আসছে না তখন দেখবে বিরক্ত হয়ে নিজেই এক সময় ছেড়ে দিবে সব। উদ্দেশ্যে সফল করতে না পারলে মানুষ নিজের পছন্দের কাজটাও ছেড়ে দেয়, মেহেরুন।’
একটু থামলেন ভদ্রলোক। এরপর হালকা গলা ঝেরে বললেন, ‘আমার কথায় অবাক হচ্ছ, তাই না? ভাবছ, বাবা হয়ে নিজের ছেলের বিরুদ্ধে কেউ এসব শেখায় নাকি। আমি বাবা হিসেবে ওয়াহীদকে যতটা ভালোবাসি, আমার ভাইয়ের মেয়ে, ভাতিজি, এবং আমার পুত্রবধূ হিসেবে তোমাকে তার থেকেও অধিক ভালোবাসি। ছেলেটা আমার বড্ড জেদি। বিয়ে করতে চায়নি কখনো। এই বিয়ে, সম্পর্ক, সংসার এসবে তার বড্ড বিতৃষ্ণা। কিন্তু বাবা হিসেবে ওর একটা গোছানো সংসার না দেখে আমি কীভাবে চোখ বুজতাম, বলো? একটাই ছেলে, ওকে নিয়ে আমার চিন্তার শেষ নেই। তোমার হাতে তুলে দিতে পেরে বেশ নিশ্চিন্ত হয়েছি এখন। তাও, তাও তোমার যদি একবারের জন্যও মনে হয়, আর পারছ না। বাবাকে বোলো, বাবা সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকব। উঠি, মা। বাবার কোনো কথায় খারাপ লাগলে ক্ষমা কোরো।’
মেহেরুনের মাথায় হাত বুলিয়ে সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন মামুন শিকদার। মেহেরুন স্তম্ভিত হয়ে বসে। এত কথা, সব গোলমাল পাকাচ্ছে মাথার ভেতর। এতকিছু সে মনে রাখবে কেমন করে! কেমন করে মানবে কথাগুলো! আদতে বাবার কথাগুলো কি যথার্থ? লোকটার দেওয়া কষ্টগুলোকে পরোয়া না করলে কি লোকটা থেমে যাবে? আচরণ বদলাবে তার? নাকি বাবা শুধুমাত্র তাকে মিথ্যে বোঝ দেওয়ার জন্য এমনটা বলেছেন? মেহেরুন ভেবে পায় না। এত জটিল সবকিছু। বিয়ের আগের জীবনটা কত সহজ ছিল। দুশ্চিন্তা বলতে সামান্য পড়ালেখাটাই ছিল তখন। আর এখন কত কিছু নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাকে।
ভাবতে ভাবতে কখন যে সেই ব্যালকনিতে বসা আসনটাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে তা মেয়েটার খেয়াল নেই। ওয়াহীদ ফিরেছে সবে। একেবারে এশা আর তারাবীহ শেষ করে এসেছে সে। নিচে, ঘরে কোথাও মেহেরুনকে না দেখে কপাল ভাঁজ ফেলল অমনি। মেয়েটা আবার বাপের বাড়িতে চলে যায়নি তো। তবে আরেক কুরক্ষেত্র হবে আজ। ঐ বাড়ি থেকে মেয়েটাকে আর কখনোই আনবে না। হম্বিতম্বি দেখিয়ে খালাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ইফতারের পর ব্যালকনিতে যেতে দেখেছেন, এরপর আর নিচে কোথাও দেখেনি।
ওয়াহীদ পাঞ্জাবী ছেড়ে আগে একটা ঢোলা জামা-পাজামা পরল। এরপর পা বাড়াল ব্যালকনির পথে। বাইরে বাতাসের বেগ কমেছে। ব্যালকনিতে গেলেই একটা মিষ্টি ফুলের ঘ্রাণ নাকে আসে। চারপাশে অল্প আলোর বাতি লাগান। দূর থেকেই ওয়াহীদ নারীদেহটা দেখতে পাচ্ছে। জড়োসড়ো হয়ে বড়ো আসনটাতে ঘুমিয়ে আছে চুপচাপ। সে এগিয়ে গেল নীরবে। পায়ে আওয়াজ নেই। ভীষণ নিঃশব্দে মেহেরুনের সামনে এসে দাঁড়াল। নিগূঢ় ভঙিতে দেখতে লাগল তার ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখটা। কাটাকাটা নাক, মুখ তার। থুতনিটা বাংলাদেশী নায়কা মৌসুমির মতো। গায়ের রং উজ্জ্বল ফরসা। চুলও বেশ সুন্দর। পড়াশোনাসহ অন্যান্য গুন, কোনোকিছুর কমতি নেই মেয়ের। তাও ওয়াহীদ তাকে মানতে পারছে না। মানতে পারছে না শুধুমাত্র সে মেয়ে বলে। এই মেয়ে মানুষগুলোকে তার পছন্দ হয় না। তার চোখে ওরা হলো বিষধর সাপ। এক ছোবলে সব শেষ করে ফেলে। ওয়াহীদ হাঁটু ভেঙে বসল। হাতটা রাখল মেহেরুনের গালের উপর। আস্তে করে বুলিয়ে দিয়ে বলল,
‘অন্যায় তোমার নয়। তোমাদের। তোমাদের সবার। তোমরা সবাই এক। আমি তোমাদের কাউকে বিশ্বাস করি না। কাউকে না।’
এরপর চট করে সে উঠে দাঁড়ায়। সামনে রাখা টেবিলটাতে একটা পানির গ্লাস দেখে। সেখানে পানি আছে অল্প। সেটা তুলে মেহেরুনের দিকে নির্দ্বিধায় ছুড়ে মারে সে। ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ায় মেহেরুন। আচমকা ঘুম ভাঙাতে বুক কাঁপছে তার। শ্বাস ফেলছে জোরে জোরে। চোখের সামনে অকস্মাৎ ওয়াহীদকে দেখে আতঙ্কিত হয় বেশ। পরক্ষণেই হাত দিয়ে নিজের মুখের পানিটা ছুঁতেই রাগ হয় তার। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। এক লহমায় নিজের অভিব্যক্তি পাল্টে ফেলে বলে,
‘কখন এলেন?’
‘অনেকক্ষণ। এখন নিশ্চয়ই ঘুমানোর সময় নয়। নামাজ হয়েছে?’
মাথা নাড়ল মেহেরুন। ওয়াহীদ শক্ত গলায় বলল, ‘নামাজ শেষ কোরো। তারপর সেহেরির আয়োজন করতে যাবে।’
মেহেরুন মাথা হেলিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার কী ভেবে দাঁড়াল। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘বাইরে থেকে এলেন। এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত বানিয়ে দেই?’
বিস্মিত না হয়ে পারল না ওয়াহীদ। কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল তার। সামান্য কাজের কথা বললেই যে ছ্যাৎ করে উঠে সে কি-না যেচে পড়ে তাকে শরবত সাধছে! ব্যাপারটায় মৃদু হাসলও। চোখের পাতা ঝাপ্টে সরস গলায় বলল, ‘অবশ্যই। তবে রেডিমেড ট্যাং এর শরবত না, হাতে চিপে লেবুর শরবত করে নিয়ে এসো।’
এই বলে ঘরে চলে গেল সে। মেহেরুন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘সঙ্গে একটু বিষও মিশিয়ে নিয়ে আসব।’
চলবে…
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
৭.
মেহেরুন এক গ্লাস শরবত নিয়ে ঘরে এলো। ওয়াহীদকে দেখল ঘর জুড়ে পায়চারি করছে আর কথা বলছে কারোর সাথে। মেহেরুন দাঁড়িয়ে রইল এক কোণায় চুপটি করে। ওয়াহীদ ফোন কাটল আরও কতক্ষণ পর। এরপর মেহেরুন এগিয়ে এল। শরবতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে। ওয়াহীদ তাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে গ্রহণ করল সেটা। চুমুক বসিয়ে বলল,
‘লেবুর টেস্ট কম পাচ্ছি।’
‘ঘরে যা ছিল তাই দিয়েই করেছি।’
ওয়াহীদ আর কিছু বলল না। সে ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি ফেলতেই মেহেরুন জিজ্ঞেস করল, ‘সেহেরিতে আজ কী খাবেন?’
ভ্রু উঁচাল ওয়াহীদ। বিস্ময় নিয়ে মেহেরুনের দিকে চাইল সে। অদ্ভুত ভাবে মেহেরুনের দিকে কয়েক পল চেয়ে কপাল কুঁচকাল আবার। বলল হেঁয়ালি করে, ‘উদ্দেশ্য কী? হঠাৎ এত বদল?’
মাথা নুইয়ে মৃদু হাসল মেহেরুন। নরম সুরে বলল, ‘মেনে নেওয়াটা কষ্টের তাই মানিয়ে নিতে চাইছি।’
তাচ্ছিল্যের হাসির দেখা মেলল ওয়াহীদের ঠোঁটে। মেহেরুনের আগাগোড়া দেখে নিয়ে বলল, ‘ভালো বলেছ। তাছাড়া তোমার কাছে আর কোনো পথও খোলা নেই। আপাতত খালার কাছ থেকে জেনে নিয়ে রান্না বসাও। আমার ওতো পছন্দ অপছন্দ নেই।’
মেহেরুন কিছু না বলে ওযু করে নামাজটা সারল আগে। এরপর গেল রান্নাঘরে। ততক্ষণে খালা মোটামুটি সব সেরে নিয়েছেন। মেহেরুন টুকটাক বাকি কাজগুলো করতে করতেই খালাকে বলল, ‘আচ্ছা খালা, বাবা এত নরম সরম একজন মানুষ, তাহলে উনার ছেলেটা এমন কেন হলো? মা কি খুব কঠিন ধাঁচের মানুষ ছিলেন? উনি বোধহয় মায়ের মতোই হয়েছেন, তাই না?’
খালা এঁটো বাসনগুলো মাজছিলেন। হঠাৎ হাত থামল তার। খানিক কী ভেবে যেন বললেন, ‘না, ছোট আব্বার কপাল অত ভালা না। উনি উনার মায়ের ছায়ায় বড়ো হন নাই।’
‘মা বোধহয় খুব অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন, তাই না? আমার মনে হয়, উনি মায়ের ভালোবাসাটা যথাযথ পাননি বলেই একটু এমন কাঠখোট্টা হয়ে গেছেন। আসলে সন্তানদের জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত মা’কে লাগে।’
খালা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আপা তো মারা যান নাই।’
সেই কথা আর মেহেরুনের কানে গেল না। সে মনোযোগী নিজের কাজে। খালাও ব্যাপারটায় আর কথা বাড়ালেন না এরপর।
___
হাতমুখ ধুয়ে মুছে বিছানায় এসে বসল মেহেরুন। ওয়াহীদ বারান্দায় ছিল। ফোনে করছিল কিছু একটা। এখন দরজাটা আটকে দিয়ে ঘরে এসেছে। মেহেরুনকে আমলে না নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল লম্বা হয়ে। মেহেরুন আড় চোখে তাকে দেখল একবার। শুতে গিয়েও কী ভেবে যেন বলল,
‘আপনার পা টিপে দিব?’
চোখ বোজা ছিল ওয়াহীদের। মেহেরুনের প্রশ্নে কপালের চামড়া টেনে তাকাল সে। হয়তো মেয়েটার হাবভাব কিংবা উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে সে। কালও যে কাজের কথা বললেই মেজাজ হারাত, আজ সে সেধে সেধে কাজ করতে চাইছে কেন? কোন উদ্দেশ্যে? পরক্ষণেই আবার ভাবল, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, সে সেটা কখনোই সফল হতে দিবে না। তাই চোখ বুজল আবার। বলল, ‘দাও।’
মেহেরুন পায়ের কাছটায় বসল গিয়ে। সত্যি সত্যিই টিপে দিতে লাগল। সঙ্গে বলল, ‘তাছাড়া হাত, মাথা, গলা যা বলবেন তাই টিপে দিতে পারব, আমার কোনো অসুবিধা নেই।’
তড়াক চোখ মেলল ওয়াহীদ। হালকা চেঁচানোর সুরে বলল, ‘কী?’
মেহেরুন হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘না মানে, হাত বা মাথা-টাথা ব্যথা করলে বলবেন। আমি মাথায় খুব সুন্দর ম্যাসাজ করতে পারি।’
‘প্রয়োজন নেই। পা ছাড়ো। ঘুমাও।’ ওয়াহীদ বোধহয় মেজাজ হারাল।
‘কেন? আরাম পাচ্ছেন না আজ?’
‘আমার আরামের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমাকে যা বলা হয়েছে তাই করো।’
মেহেরুন গাল ফুলাল এমন ভাবে যেন পা টিপতে না দেওয়াই তার ভীষণই মন খারাপ হয়েছে। সে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে এসে শুয়ে পড়ল চুপচাপ। ভাবল, বাবার কথাই বোধহয় সত্যি। এভাবেই লোকটাকে জব্দ করতে হবে।
সেহেরিতে খেতে বসে ওয়াহীদের প্রতি ভীষণ আহ্লাদ দেখাল মেহেরুন। জোর করে এটা ওটা দিয়ে দিত চাইল তার পাতে। এত যত্ন দেখাল যে ওয়াহীদ খাওয়ার মাঝেই বিষম খেল কয়েকবার। চোখ পাকিয়ে বারংবার তাকালেও মেহেরুন সেসবে মাথা ঘামাল না। সে দ্রুত উঠে যেতেই মেহেরুন বসল। নিজের পাতে খাবার তুলতে তুলতে শ্বশুরকে বলল,
‘আপনার টোটকা বোধহয় কাজে দিচ্ছে, বাবা।’
ভদ্রলোক হাসলেন সশব্দে। বললেন, ‘লেগে থাকো। ইনশাআল্লাহ, ভালো ফল পাবে।’
ঈদের আর বেশি বাকি নেই। তিন থেকে চারদিন হয়তো। ছেলেকে নিয়ে বসে সকালের খবরের কাগজটা পড়তে পড়তেই মামুন শিকদার বললেন, ‘হাতে আর সময় নেই বেশি। শহরে গিয়ে মেহেরুনকে নিয়ে ঈদের শপিংটা সেরে এসো।’
খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বাবার দিকে তাকাল ওয়াহীদ। অভিব্যক্তিতে বিরক্তির ছাপ। বাবার কথা পছন্দ হয়নি তা যে কেউ বুঝবে। রাশভারী স্বরে বলল, ‘ছোট বাচ্চা নয় যে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে শপিং করাতে হবে। টাকা দিয়ে দিব, ও ওর পছন্দ মতো কিনে নিবে।’
‘ছোট বাচ্চা না কিন্তু তোমার স্ত্রী। তাকে নিয়ে ঈদের শপিং এ যাওয়া তোমার দায়িত্ব। এবং তুমি অবশ্যই সেই দায়িত্ব পালন করবে। আমাকে যেন আর বলতে না হয়।’
মামুন শিকদার উঠে দাঁড়াতেই ওয়াহীদ চোয়াল দৃঢ় করে বলল, ‘আব্বা, আপনি সবকিছু আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।’
‘তোমার ভালোর জন্য বাধ্য হচ্ছি। আশা করছি, একদিন তুমি বুঝবে ঠিক।’
চলে গেলেন তিনি। ওয়াহীদ আগের মতোই বসে। হাতের খবরের কাগজটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিল নিচে। এরপর গলা উঁচিয়ে ডাকল, ‘মেহেরুন! মেহেরুন!’
ফিহাকে দিয়ে ঐ বাড়ি থেকে কিছু কাপড় আনিয়েছিল মেহেরুন। সেসবই ভাঁজ করে আলমারিতে রাখছিল এখন। আচানক ওয়াহীদের গলা পেতেই সব কাজ ফেলে সে ছুটে যায়। বেলকনিতে গিয়ে বড়ো নিশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, ‘ডাকছিলেন?’
নিজেকে সংযত করল ওয়াহীদ। বলল, ‘তৈরি হও। আমার সাথে বেরুবে।’
‘কোথায় যাব?’
চট করে উঠে দাঁড়াল ওয়াহীদ। আমর্ষ গলায় বলল, ‘জাহান্নামে। কোনো সমস্যা আছে?’
মাথা নাড়ল মেহেরুন। কোনো সমস্যা নেই। ওয়াহীদের সাথে সে সব জায়গায় যেতে পারবে। ওয়াহীদের বড্ড বাধ্যগত বউ কিনা!
সত্যি সত্যিই আর কোনো প্রশ্ন ছাড়া তৈরি হলো মেহেরুন। নতুন বউ হিসেবে শাড়ি পরে একটু ভালো মতোই তৈরি হলো সে। ওয়াহীদ বেলকনি থেকে ঘরে এসে আরও চটল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ, তারউপর মেহেরুনের এত আয়োজন করা সাজ দেখে রাগে ধমকে উঠল সে, ‘শপিং এ যাচ্ছি। বিয়ে খেতে না। ঠোঁট, চোখ মুছে এসো, যাও।’
মেহেরুন রাগের কারণ বুঝল না। সে তো অতিরিক্ত কিছু করেনি। কাজল আর লিপস্টিকটাই দিয়েছিল। তাও লোকটার মনে ধরল না? ফুঁস করে নিশ্বাস ফেলল মেয়েটা। তর্ক করল না। লিপস্টিক আর কাজল তুলে এল। তাকে আরেক ঝলক দেখে নিয়ে ওয়াহীদ বলল,
‘মাথায় কাপড় দাও। বাইরে গেলে যেন মাথা থেকে কাপড় না সরে।’
মেনে নিল মেহেরুন। বাধ্য মেয়ের মতো মাথায় কাপড় দিল। এরপর ওয়াহীদের সাথে রওনা দিল পেছন পেছন। ওয়াহীদ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে না। ভুলভাল কোনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলার ভয়টা অবশ্য তার নেই। মেজাজ যা দেখছে, নিশ্চিত বাবার কথাতেই কোথাও নিয়ে যাচ্ছে হয়তো।
গাড়িটা গ্রাম পেরিয়ে শহরের রাস্তায় উঠতেই চমকাল মেহেরুন। জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা শহরে কেন যাচ্ছি?’
‘গেলেই বুঝতে পারবে।’ কাঠকাঠ গলায় জবাব ছুড়ল ওয়াহীদ।
মেহেরুন কিছু বলল না আর। সিটে মাথা হেলিয়ে একবার অনুরোধ করল, ‘এসিটা বন্ধ করে জানলার গ্লাসগুলো একটু নামিয়ে দিবেন?’
‘না।’
জবাবে মন খারাপ হলেও মেহেরুন কিছু মনে রাখল না। চুপচাপ চেয়ে রইল বাইরে। গাড়ি গিয়ে থামল শহরের সবচেয়ে বড়ো শপিং মলটার সামনে। এবার কিছু আন্দাজ করতে পারল মেহেরুন। গাড়ি থেকে নেমেই বলল, ‘আমার ঈদের শপিং হয়ে গিয়েছে আরও আগেই। আর লাগবে না।’
ওয়াহীদ গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি বেকার কিংবা ছোটলোক না যে, আমার স্ত্রীকে তার বাপের কিনে দেওয়া ড্রেস দিয়ে ঈদ করাব।’
ওয়াহীদ হাঁটা ধরল। মেহেরুন ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে পেছন পেছন পা বাড়াল তার।
চলবে…