গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩৩)

পর্বঃ৩৩

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[সেনসেটিভ কন্টেন্ট এলার্ট।⛔]

 

ইহজজগতে অধিক প্রবৃত্তি লক্ষ্য করা যায় মানবজাতির মধ্যে৷ সাইকোলজি বলে পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যে নিজেকে সর্ব সুখী মনে করে। এর কারণ পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যার মধ্যে লোভের উপস্থিতি বিদ্যমান। সেই লোভ, স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে মানুষ কখনো কখনো খুইয়ে বসে নিজের বিবেক ও নীতি ঔচিত্যবোধ! তেমনটাই ধ্রুব ওয়াহিদ নিজের জীবনে করেছিল। স্ত্রী-সন্তান, একটা সুখি পরিবার থাকা স্বত্বেও ধ্রুব কোনদিন নিজেকে সুখি দেখাতে পারেনি। এর কারণ ওর দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি এবং অতিতের হতাশা। সেই হতাশার কালো ছাঁয়া ওকে এতটাই গ্রাস করলো যে নিজেকে নিজের হাতেই সুকৌশলে ধ্বংস করলো। ধ্রুবর এই লোমহর্ষক মৃত্যুটা বিধাতা ওর পাপের প্রতিফল দিলেন নাকি কোন এক ঠকে যাওয়া নারীর সকরুণ প্রার্থনা কবুল করে নিলেন সেটা বিধাতাই সঠিক জানেন। সেই প্রসঙ্গে না যাওয়াটাই সমীচীন।

অংশুমালীর মৃদু লাল কিরণে সবে ধরণী আলোকিত হতে শুরু করেছে। আবৃতি ফজরের নামাজ পড়ে জায়নামাজেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল মাথা ঠেকিয়ে। সারারাত না ঘুমানোর দরুন এখন বেশ প্রগাঢ় ঘুমে তলিয়ে আছে। বিছানায় আরশান একা একা হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। এই শান্ত কক্ষটিতে আহানটা কোত্থেকে যেন ছুটে আসলো। হাঁপাতে হাঁপাতে দেখে আবৃতি মেঝেতে শুয়ে আছে। আহান ঢোক গিলে হাঁটু গেঁড়ে বসলো আবৃতির শিয়রে। কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে আবৃতির কাঁধে রাখল। ওর কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে ডাকলো,

— আবৃতি, এই আবৃতি? উঠ প্লিজ৷

আবৃতি চোখের ভারী পাতা পিটপিট করে খুলতেই সামনে একটা পরিচিত ঝাপসা অবয়ব ভেসে উঠে। হাত তুলে চোখ ডলে ভাল করে তাকাতেই আহানের অবয়ব বোধগম্য হলো। আবৃতি কয়েক সেকেন্ড স্থবির হয়ে চেয়ে রইল। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা মস্তিস্ক সজাগ হয়ে উঠতে খানিক সময় দরকার। কিন্তু আহানের নিকট মনে হচ্ছে সেই সময়টুকুই নেই তাইতো ও রুদ্ধশ্বাসে বলো উঠলো,

— আবৃতি একটু উঠে বোস না প্লিজ।

আবৃতি চোখ কচলে উঠে বসে। চারদিকে তাকিয়ে ঘুম কাতুরে গলায় শুধায়,

— কি হয়েছে? তুই এত সকালে? রাতে কখন ফিরলি?

আহান জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে প্রকম্পিত গলায় বললো,

— একটা মারাত্মক এক্সিডেন্ট ঘটে গিয়েছে।

আবৃতির টনক নড়ে যেন। ত্রস্ত কপালের ভাঁজ মিলিয়ে মস্তিষ্ক সপ্রতিভ হয়। হতবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— মানে? এক্সিডেন্ট? কার এক্সিডেন্ট?

আহান কপালের ঘাম মুছে ৷ রাত চারটে নাগাদ হঠাৎ হসপিটালে জরুরী অবস্থায় এক এক্সিডেন্টের রোগীকে নিয়ে আসা হয়। নিমিষেই পুরো হসপিটালে ছেঁয়ে যায় খবরটা। কোন রোগীর ভিজিট না থাকায় আহান নিজের কেবিনে বসে ঝিমুচ্ছিল। হাসপাতালে তখন কোন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক উপস্থিত ছিলনা। তাই একজন নার্স ছুটতে ছুটতে আহানকে তলব করে। আহান দেরী না করে ওটি রুমে ছোটে। পথিমধ্যে নার্স থেকে যতটুকু শুনে তা হলো হাইওয়েতে একটা মারাত্মক কার এক্সিডেন্ট ঘটেছে একটু আগে। উদ্ধারকারী সিভিল সার্ভিস মুমূর্ষু অবস্থায় এক অজ্ঞাত যুবককে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু ওটি রুমে ঢুকতেই আহানের পায়ের নিচের জমিন সরে যায় চেনা মুখটি নজরে আসতেই। রক্তে রঞ্জিত থেতলে যাওয়া মাথায় ধ্রুবর চেহারাই চেনা যাচ্ছিল না। পুরো চেহারা ফুলে বিভৎস আকার ধারণ করেছিল। আহান কাঁপা হাতে ধ্রুবর পালস চেইক করে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।

— আহান কি হলো বলছিস না কেন? কার এক্সিডেন্ট?

আবৃতি ওকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে শুধায়। আহান একটা শুষ্ক ঢোক গিলে প্রকম্পিত কন্ঠে বললো,

— ধ্রু..বর?

আবৃতি কয়েক সেকেন্ড আহানের মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। যেন কানে ভুল শুনেছে ও। তাই পরিস্কার হতে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,

— কা.র এক্সি..ডেন্ট বল..লি?

— আবৃতি কাল রাতে ধ্রুবর কারের একটা মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়েছে। আর সেই দূর্ঘটনায়..

আবৃতি যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। কেটে কেটে শুধু এটুকু জিজ্ঞেস করলো,

— বেঁচে আছে?

আহান কিছুই বলতে পারলনা। তখন হাসপাতালে নিয়ে আসার অনেক আগেই ধ্রুব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল। ইহকালের মায়া বিসর্জন দিয়ে পাড়ি দিয়েছিল এক অনন্তকালের খোঁজে। বেচারা ধ্রুব জানতেই পারলনা ও ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার পর পরই ওর ভালবাসার স্ত্রী ইরার প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। সেই একই হসপিটালের গাইনী বিভাগের ওটি রুমে ইরা একটা ফুটফুটে মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু নিয়তির কি বিচার! সেই হসপিটালেই বাচ্চাটির মৃত পিতাকে নিয়ে আসা হয়েছে।
কিন্তু তার পিতা যে তার জন্মের আধঘন্টা আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। আহারে অভাগা পিতা নাকি সদ্য ভূমিষ্ট শিশুকন্যাটি ? বাচ্চাটা দুনিয়াতে এসেই এতিম হলো, আর ধ্রুব জানতেই পারলনা একটু আগেই সে ফুটফুটে দ্বিতীয় সন্তানের জনক হয়েছে।

আবৃতি আহানকে ঝাঁকাল। কেমন বুদ্ধিহতের ন্যায় আওড়াল,

— কি হলো বল? বেশি ইনজুরড হয়নি তো?

আহান কাঁপা গলায় বললো,

— ধ্রুব ওয়াজ ডেড আবৃতি। এক ঘন্টাই আগেই ও মারা গিয়েছে।

আবৃতি কেমন অনুভব করলো তা আহান ঠাহর করতে পারলোনা। কিন্তু স্পষ্ট দেখলো কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠছে ওর নারী কায়া। হসপিটাল থেকে আহান এক প্রকার দৌঁড়ে এসেছে৷ ধ্রুবর মৃত্যুর পর থেকেই আহান প্রচন্ড বিপর্যস্ত হয়ে আছে৷ ওর মেডিকেল লাইফ থেকে ইন্টার্নি পিরিয়ডে ও বহু মানুষের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছে কিন্তু এমনটা আগে কখনো ফিল করেনি। আইসিইউ থেকে বের হতেই ধ্রুবর মা ওর উপর হামলে পড়েছিলেন। কেননা তখন পুরো হসপিটালে ছড়িয়ে পড়েছিল ধ্রুবর মৃত্যুর খবরটা। ভদ্রমহিলাকে আহান নিজের মুখে বলে এসেছে তার ছেলে মৃত! তারপর তিনি আহানের গায়েই ঢলে পড়েন। আহান আবৃতির দিকে চেয়ে দেখে ও কেমন স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। স্থির দৃষ্টিতে মেঝের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছে। আহান লক্ষ্য করলো আবৃতির স্থির দুই লোচনে জল টলমল করছে৷ আহান ওকে আগলে বলে,

— আবৃতি তুই ঠিক আছিস?

আবৃতির পিলে চমকে উঠে। চারদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। গলাটটা সামান্য খাঁকারি দিয়ে বলে,

— হ্যাঁ ঠিক আছি৷ আহান, আরশানকে কি বলব? বলতো আমায়? কাল বিকেলেও তো কথা বললো পাপার সাথে। আচ্ছা মানুষের হায়াতের কোন নিশ্চয়তা নেই কেন বলতো?

আহান বুঝলো আবৃতি ঠিক নেই। ওকে ধরে বিছানায় বসিয়ে পানির গ্লাসটা মুখের সামনে ধরে বললো,

— আবৃতি কাম ডাউন। নে পানিটা খেয়ে নে।

আবৃতি ঢকঢক করে পুরোটা পানি পান করল। ওর পুরো শরীরটা হঠাৎ থরথরিয়ে কাঁপছে। আহান বুঝলো আবৃতি নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর বৃথা চেষ্টায় রত।
আহান ওকে জড়িয়ে নিল। বোনের মনের অবস্থা ও খুব ভাল করেই জানে। যেখানে নিজের শত্রুর মৃত্যুতেও আমাদের চোখ ছলছল করে উঠে সেখানে ধ্রুব তো ওর সন্তানের বাবা! আবৃতি আহানের বুকে শরীর ছেড়ে দিল। টলমল চোখে বিছানায় এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে থাকা আরশানের উপর পড়তেই আবৃতি হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

— আহান, আমার আরশানের কি হবে? ওকে কিভাবে বলব ওর পাপা যে আর নেই! কিভাবে বলব?

ইরাকে সকাল ঘেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রাখা হয়েছিল ধ্রুবর মৃত্যু থেকে। কেননা ওর নিজের লাইফই রিস্কে আছে। বাচ্চাটা সুস্থভাবে দুনিয়াতে আসলেও ওর নিজের শরীরের কন্ডিশন খুবই নাজুক। কিন্তু এমন একটা খবর কতক্ষণ চেপে রাখা যায়। বুদ্ধিমতী ইরার মনে প্রথম সন্দেহ হানা দেয় তখন জ্ঞান ফিরে যখন শাশুড়ী, দেবর, ননদ কাউকে নিজ সন্তানের শিয়রে পেল না৷ কেবিনে ইরার পাশে কেবল ওর মা ছিলেন। ইরা চারদিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধায়,

– মা? সবাই কোথায়? কাউকেই তো অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম না। আর ওর ধ্রুব এখনো এলোনা? তোমরা ওকে কল করে বলোনি ওর একটা প্রিন্সেস এসেছে?

— ওনারা একটু বাসায় গিয়েছেন।

— তোমার গলাটা ভাঙ্গা লাগছে কেন মা? কেঁদেছো?

ইরার মা জোরপূর্বক হেসে বললো,

— ওই তোমার জন্য চ…

— মা ধ্রুব এখনো আসেনি তাইনা?

— আসবে…

ইরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো,

— আসবে মানে? আমার মেয়ে দুনিয়াতে এসেছে কয়েক ঘন্টা হতে চললো আর ও এখনো চোখের দেখা দেখতে আসেনি? মা আমার ফোনটা কোথায়? ফোনটা দাও তাড়াতাড়ি। আমি জানি ও কোথায়।

ইরার মা ওকে শান্ত করাতে বললেন,

— আচ্ছা এখন একটু রেস্ট নাও৷ পরে কল করে না হয়।

প্রসব পরবর্তী শারীরিক মানসিক ধকলে এমনিতেই নুয়ে ছিল। তার উপর কেবিনের অস্বাভাবিক পরিবেশ, মায়ের ফ্যাকাশে অশ্রুসিক্ত চোখ যেন ওকে আগাম কোন বিপদের আভাস দিল। সন্দিগ্ধ গলায় উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করলো,

— তুমি ফোন দেবে? থাক লাগবেনা আমি খুঁজে নিচ্ছি আমার ফোন।

এই বলে ইরা উত্তেজিত হয়ে বেড থেকে নামতে নিল। ইরার মা হন্তদন্ত হয়ে ইরাকে ধরে ফেললেন। হাহাকার করে বললেন,

— মা একটু শান্ত হো। সেলাইয়ে টান পড়বে। দিচ্ছি ফোন। দিচ্ছি আমি।

ইরার মা আর না পেরে ফোনটা বের করে দিলেন। ইরা ফোনটা তুলে অন করলো ধ্রুবকে কল দেওয়ার জন্য।কিন্তু ডাটা অন করতেই নোটিফিকেশনের শব্দে ফোনটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে৷ ইরা হতবাক হয়ে দেখল ওকে ট্যাগ করে কয়েকটা ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম পোস্টের নোটিফিকেশন আসছে ক্রমান্বয়ে। ইরা বিক্ষিপ্ত হাতে একটা নোটিফিকেশননে ক্লিক করলো।
তারপর আর কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে ইরা ঠিকই জেনে গেল ওর শত প্রতারণা, ছলনা করে পাওয়া স্বামীটির অস্তিত্ব আর এই দুনিয়াতে অবশিষ্ট নেই। ইরা কতক্ষণ হতবিহ্বল চোখে স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিল। যখন দেখল ওর সেই আকাঙ্খিত প্রেমিক স্বামীর পরিচিত ব্রাউন শ্যাডের গাড়িটা ক্রেনের সাহায্যে শূণ্যে তুলে ধরা হয়েছে তখন সকল জাগতিক জ্ঞান লোপ পেল। কেমন হতবুদ্ধের ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মোবাইলের স্বচ্ছ স্ক্রিনে। পোস্টটার উপরের ক্যাপশনে লেখা…

” আজ ভোররাতে হাইওয়েতে প্রচন্ড ঝড়ের কবলে পড়ে একটা ভয়াবহ রোড এক্সিডেন্টে স্পট ডেথ করেছেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ তম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ধ্রুব ওয়াহিদ৷ তার এমন আকষ্মিক ভয়াবহ মৃত্যুতে আমরা সকলে শোকাহত!”

সাথে সৌম্য ধ্রুবর বেশ আগের একটা হাসোজ্জ্বল ছবি ভাসছে।
ইরার হতবাক দৃষ্টি মা বুঝতে পারেন ইরা ইতোমধ্যে সব জেনে গিয়েছেন। তিনি ইরাকে কি সামলাবেন মেয়ের পরবর্তী ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া অনুমান করে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

.

বিষাক্ত, বিপর্যস্ত এক সকাল। ধ্রুবদের এরিয়ার স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গনে আজ জোহরের পরে ধ্রুবর লাশ দাফন করা হবে। পুরো ফ্ল্যাটে আজ শোকের মাতম। চারদিকের বাতাসও যেন আজ ভারী শোকের ছায়ায়! ধ্রুবর মা মেঝে চাপড়ে চাপড়ে কাঁদছেন৷ ভদ্রমহিলা কাল থেকে বেশ কয়েকবার চেতনা হারিয়েছেন। ধ্রুবর ভাই দীপ্ত বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। ছোট থেকেই দুই ভাই পিঠাপিঠি বড় হয়েছে। কত ঝগড়া, কত ভালবাসার স্মৃতি জড়িয়ে এই ভাইটার সাথে। কাল রাতেও তার ভাইটা তরতাজা ছিল আর আজ নাকি তার ভাইটা এই দুনিয়াতে অবশিষ্ট মাত্র নেই এটা কিছুতেই মানতে পারছেনা ও।
ঐক্য একপাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে নিউজে খবরটা শোনার পরপরই আর এক মুহুর্ত দেরী না করে হাসপাতালে ছুটেছে। সেখানে ধ্রুবর মৃত্যুর খবরটা শুনে ঐক্য নিজেও ভেঙ্গে পড়ে। প্রায় চারবছর ধরে ধ্রুব ঐক্যর কোম্পানিতে আছে। ছেলেটা একজন সাধারণ কর্মচারী থেকে ধীরে ধীরে এই অবস্থানে নিজের জায়গা তৈরী করেছে এটা অস্বীকার করার কোন জো নেই। তারপর আইনি কার্যক্রম শেষ করে ধ্রুবর লাশটা নিজ উদ্যোগে এখানে নিয়ে এসেছে পরিবারের সাথে শেষ মোলাকাতের জন্য।

বিড়াল পায়ে কেউ সেই শোকাভিভূত ভূতুড়ে ফ্ল্যাটটিতে প্রবেশ করে। ঐক্য অনুভব করতেই চমকে তাকাল। দেখল ওর প্রিয় দুটি মুখ। যেই মুখ গুলো আজ অত্যন্ত মলিন। আবৃতির কোলে গলা জড়িয়ে আরশান চুপটি মেরে আছে। ঘুম থেকে উঠে যখন শুনলো আজ স্কুলে যেতে হবেনা তখন নিষ্পাপ বাচ্চাটির খুশি দেখে কে! জাহানারা তৈরী করে দিলে মায়ের হাত আঁকড়ে উদ্ভাসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল,

— মাম্মাম আমরা কোথায় যাব?

— তোমার পাপার বাড়িতে।

স্তব্ধ, হতবাক আবৃতি কেবল এটুকুই বলেছিল। আরশান বুঝলোনা না মাম্মাম ওদের বাড়িকে কেন পাপার বাড়ি বলেছিল? কিন্তু অনেকদিন পর পাপার সাথে দেখা হবে ভেবেই ওর শিশু সুলভ মনটা নেচে উঠেছিল। উচ্ছ্বাসিত হয়ে মামার হাত ধরে নানুমনিকে বিদেয় দিয়ে নাচতে নাচতে ঘর থেকে বের হয়েছিল। জাহানারা নাতির খুশি দেখে আঁচলে চোখ মোছেন। এই ধ্রুবকে তিনি কখনো নিজের সন্তানদের চেয়ে আলাদা চোখে দেখেননি। তার মেয়েটার এত বড় সর্বনাশের পরও অভিশাপ দেননি তিনি, তাহলে কেন ছেলেটার এই নির্মম পরিণতি!

আরশানের সব উচ্ছ্বাস মিলিয়ে গেল যখন নিজের অতি চেনা পরিচিত বাসভবনের সামনে মানুষের ঢল আর লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িটা চোখে পড়ে। ছয়বছরের বাচ্চাটির মস্তিস্কে হানা দিল এখানে আজ কারো অন্তর্ধান ঘটেছে। ভয়ে আঁতকে উঠে সেই যে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছিল উপরে উঠা অব্দি আর ছাড়েনি। ঐক্য এক দৃষ্টিতে স্থবির আবৃতিকে দেখছিল। ধ্রুবর লাশটা ড্রয়িং রুমের মেঝেতে রাখা। মুখটা ঢাকা। পরিচিত কেউ আসলে এক পলক দেখিয়ে আবার ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। ধ্রুবর অচেতন মাকে রুমে কয়েকজন মিলে পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছেন৷ ওনার অবস্থা বেগতিক দেখে এম্বুল্যান্স খবর দেওয়া হয়েছে। দীপ্ত ধ্রুবর মাথার কাছে পা ছড়িয়ে ওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। এখন আর কাঁদছেনা। শূণ্যে তাকিয়ে কি যেন দেখছে। আবৃতিকে দেখে একজন বলে উঠে,

— ওইতো ধ্রুবর প্রথম বৌ আসছে। আহারে বৌ এদিকে আসো পোলাটারে এক নজর বাপরে দেখাও।

আবৃতির পুরো গাত্র থরথরিয়ে কেঁপে উঠে। আরশানকে ধরে রাখতেও যেন ওর কষ্ট হচ্ছে। আহান আরশানকে নিতে চাইলে আবৃতি দিল না। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে ধ্রুবর লাশের সামনে বসলো। ফিসফিস করে বললো,

— আরশান, পাপাকে দেখে নাও।

আরশান ওর গলা থেকে মুখ তুলে ভয়ে ভয়ে পেছনে ফিরল। ঐক্য চোয়ালে হাত হাত চেপে ভাবলো একবার নিষেধ করবে কিনা? কেননা বাচ্চাটা নিতে পারবেনা এই শকটা। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো নিজের জন্মদাতাকে শেষ বারের মতো দেখা এই বাচ্চাটার অধিকার। আবৃতি কাঁপা কাঁপা হাতে ধ্রুবর মুখের উপরের সাদা কাপড়টা সরালো। ধ্রুবর প্রাণহীন, ফ্যাকাশে ক্ষতবিক্ষত ফুলে কালো বর্ণ ধারণ করা মুখটা দেখতেই আরশান ভয়ে বিকট এক চিৎকার করে আবৃতিকে জড়িয়ে ধরল।

চলমান…..

 

[আমাকে কেউ নিষ্ঠুর ভাববেন না। এই পর্বটা লিখতে আমার হাতটাও থরথর করে কেঁপেছে।😓]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x