পর্ব:০৫
শীতের মিষ্টি সকাল! মিষ্টি বলার যথাযথ কারণ আছে বৈকি। কেননা শীতের সূর্যি মামার উত্তাপ আর কারোরই বিরক্ত লাগেনা। বরঞ্চ আরামে চক্ষু মুদে আসে এই মিষ্টি রোদে!
–মাম্মাম আমি নতুন স্কুলে কেন যাব? আগের স্কুলে কি হয়েছে? আমার তো ওখানে অনেক ফ্রেন্ডস্ আছে। পাপা কিছু বলবেনা?
ছেলের একসাথে এতগুলো প্রশ্নে তৈরী হতে থাকা আবৃতি বিরক্ত হলো। এমনিতেই লেইট হয়ে গিয়েছে অনেক। আরশানকে এডমিট করিয়ে আবার আহানকে ডিউটিতে যেতে হবে। তাই এত তাড়াহুড়ো করছে।
— আহ আরশান৷ এত প্রশ্ন করছো কেন? এখন থেকে আমরা নানুমনি আর মামুর সাথে থাকব। এখান থেকে ওই স্কুলটা অনেক দূরে হয়ে যাবে। তাই এখানকার একটা নতুন স্কুলে এডমিশন করাব তোমার।
আরশানের মুখটা ছোট হয়ে যায়। এখন থেকে তারা নানুমনির বাসায় থাকবে? কিন্তু কেন?
— কিন্তু মাম্মাম তাহলে পাপা কোথায় থাকবে।
আবৃতির ব্যস্ত হাতদুটো থেমে যায় আরশানের প্রশ্নে। ও অসহায় চোখে নিজের অভাগা সন্তানের পানে তাকায় যে কিনা উত্তরের আশায় তার দিকে চেয়ে আছে। আবৃতি ঢোক গিলে চারদিকে এলোমেলো চোখের পাতা ফেলে। কি বলবে সে এখন আরশানকে? তাছাড়া কতদিনই বা আরশানকে ছয়নয় বুঝিয়ে রাখবে। একদিন না একদিন তো বলতেই হবে সত্যিটা। কিন্তু কিভাবেই বলবে? এত ছোট বাচ্চা তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কি বুঝবে?
— তোমার পাপা তোমার পাপার বাসায় থাকবে আর তুমি থাকবে তোমার মাম্মামের বাসায়।
আবৃতি চকিতে পিছনে ফিরলো। হাতে সাদা এপ্রোন আর স্টেথোস্কোপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে আহান। মামুর কথায় আরশান চোখ বড় বড় করে ফেলে বলে,
— কেন কেন?
আহান এগিয়ে এসে আরশানকে কোলে তুলে নেয়। অতিরিক্ত সাদাটে মুখটায় একটা চুমু খেয়ে বলে,
— কেননা তুমি যেমন তোমার মাম্মামকে ছাড়া থাকতে পারনা। তেমনি তোমার মাম্মামও তার মাকে ছাড়া থাকতে পারবেনা। তাই এখন থেকে তোমার মাম্মাম এখানেই থাকবে তোমার নানুমনির সাথে। কেন তুমি কি তোমার মাম্মামের সাথে থাকতে চাওনা?
আরশান দ্রুত উপরনিচ মাথা দুলিয়ে বললো,
— চাই চাই৷ আমি মাম্মামকে ছাড়া কিভাবে থাকব? মাম্মামকে ছাড়াতো আমার স্লিপি স্লিপিও আসেনা৷
আবৃতি কাষ্ঠ হাসলো। তার ভাইটা কিভাবে যেন সব পরিস্থিতি সামলে নেয়। যেভাবে আবৃতিকে সামলেছে জীবনের নির্মম ধাক্কায়। দুজন জমজ হলেও আহান সবসময় আবৃতিকে একজন বড় ভাইয়ের মতই আগলে রেখেছে, রাখছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরতো কেউ আবৃতির পড়াশোনার ব্যপারে কিছু বলেনি। তার ভাইটা নিজ দায়িত্বে ওকে গ্রাজুয়েশন করিয়েছে। ডাক্তারি না অন্তত স্নাতকোত্তর টা করা উচিত বলেই আবৃতিও না করেনি।
আবৃতি চোখ দিয়ে ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানায়।
আহান তাড়া দিয়ে বললো,
— তাড়াতাড়ি করনা। বাচ্চার স্কুলেই তো যাচ্ছিস এত সাজগোজের কি আছে। চল।
–আহান বাংলা মিডিয়ামে আরশানের এডমিশন করিয়ে দিলে হয়না?
আহান স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে আবৃতির দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
— কেন আমার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ভাগ্নেকে এখন কোন দুঃখে বাংলা মিডিয়ামে পড়াব?
আবৃতি মিনমিন করে বললো,
–ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে তো শুনেছি অনেক খরচা!
–হোক তাতে কি। একটা বাচ্চার পড়াশোনার খরচটা আমি সামলাতে পারবনা?
— না না সেটা বলছি না। তোর ইন্টার্নিতে আর কতই বা স্যালারি দেয়। এদিয়ে মায়ের ঔষধ, সংসারের খরচ তোর উপর চাপ পড়ে যাবেনা?
— তোকে এতসব চিন্তা করতে হবেনা। আমি সব সামলে নেব। ওই রাস্কেলটার কাছ থেকে আরশানকে বড় মুখ করে মুক্ত করে নিয়ে এসেছি৷ ওর কাছে যেভাবে আরশান ছিল আমিও আমার ভাগ্নেকে সেভাবেই বড় করব। কোন ত্রুটি রাখবনা। এখন চল দেরী হচ্ছে।
★★
কলিংবেলের আওয়াজে ইরা শোয়া থেকে উঠে বসলো। ঘড়িয়ে তাকিয়ে দেখলো সকাল এগারোটা বেজে বিশ মিনিট। ধ্রুব তো দুইটায় খাবার নিয়ে আসে। প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই ধ্রুব বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসে। তেল মসলার গন্ধ ইরা একদম সহ্য করতে পারেনা, বমি হয়। ইরা সাবধানে পা ফেলে নিচে নামলো৷ ধ্রুব যাওয়ার আগে সবসময় পই পই করে বলে যায় যেন ও বাসায় না থাকলে হাঁটাচলা খুবই সাবধানে করে। সেসব মনে পড়তেই মুচকি হাসলো। তার জীবনটা হঠাৎই যেন রঙিন হয়ে উঠেছে। তার ধ্রুব এখন পুরোপুরি তার। কেন যেন এটা বিশ্বাসই হতে চায়না। মনে হয় এখনো স্বপ্নে আছে সে।
দরজা খুলতেই ইরা হতবাক হয়ে যায়,
— আন্টি আই মিন মা তুমি?
দরজার সামনে একটা বড় ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ধ্রুবর মা শায়েলা ওয়াহিদ৷ ইরাকে আপাদমস্তক দেখে গম্ভীর গলায় বলেন,
–ভিতরে ঢুকতে দেবেনা নাকি তোমার স্বামীর ফ্ল্যাটে আমার আসা নিষেধ?
ইরা তড়িঘড়ি করে বলে,
— ছিঃ ছিঃ মা এসব কি বলছো? তোমার ছেলের বাড়ি তো তোমারই বাড়ি।
ইরার কথাটা শুনে ধ্রুবর মা খুশি হলেন মনে মনে। এই মেয়েটা শুরু থেকেই তার খুব পছন্দের ছিল। উনি খুব চাইতেন ইরাকে তার ছেলের বৌ করতে। বৌ তো হয়েছে কিন্তু? তিনি ভিতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
— ধ্রুব কখন আসে প্রতিদিন?
ইরা আমতাআমতা করে বলে,
— মা প্রতিদিন তো ও আসতে পারেনা।
— আমি বলতে চেয়েছি দুপুরে কখন আসে?
— দেড়টা বা দুটোয় আসে।
— সকালে কিছু খেয়েছ।
— না মা। শরীর ভাল লাগছিলো না বলে শুয়ে ছিলাম।
–এই অবস্থায় এত বেলা অবধি না খেয়ে না থাকা ঠিক না জাননা?
ইরা কি বলবে ভেবে পেলনা। তিনি নিজেই সাথে আনা ব্যাগটা খুলে একটা টিফিন ক্যারিয়ার বের করলেন। টিফিন খুলে বিভিন্ন পদের খাবার দাবার বের করে টেবিলে সাজালেন। এত খাবার একসাথে দেখে ইরার চক্ষু চড়কগাছ।
— সেকি মা। এতকিছু কেন এনেছো?
— তোমাদের জন্য এনেছি। যাও মুখ হাত ধুয়ে খেয়ে নাও। আর সাবধানে যাবে ওয়াশরুমে।
ইরা বিভ্রান্ত হয়ে ওয়াশরুমের দিকে গেল। উনি যে এখানে খাবার নিয়ে ওকে দেখতে আসেনি এটা ইরা নিশ্চিত। তাহলে এসেছেন কেন উনি?
দুপুরে ধ্রুব এসে পড়ে। দরজা খুলে দেন শায়েলা বেগমই। ধ্রুব মাকে এই সময় এখানে দেখে ভীষণ অবাক হয়। শায়েলা বেগম গম্ভীরমুখে বলেন,
— ভেতরে আয়।
ধ্রুব ভেতরে ঢুকে সোফায় মাথা নিচু করে বসে। ইরা একগ্লাস পানি নিয়ে এসে ধ্রুবর গাল, গলার ঘাম মুছে দেয়। শায়েলা বেগম দুজনকে পরখ করে নিয়ে হঠাৎ বলে উঠেন,
— দেখ ধ্রুব যা হওয়ার হয়েছে। ইরাকে এখন বাড়িতে নিয়ে আয়৷ এখন তো আর ওকে সমাজ থেকে লুকিয়ে
রাখার কোন মানে হয়না।
ইরা চমকে উঠে ধ্রুবর দিকে তাকায়। ধ্রুব এখনো মাথা নিচু করে আছে। আনমনে কি যেন ভেবে চলেছে। শায়েলা ওয়াহিদ তীক্ষ্ম চোখে ধ্রুবর মুখভঙ্গি পরখ করলেন। ধ্রুব যে ভীষণ রকম মানসিক টানাপোড়েনে আছে সেটা তিনি বেশ বুঝতে পারলেন। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। নাতীটার জন্য বুকটা পুড়ে যাচ্ছে তার। সব হয়েছে ওই লোকটার জেদের কারণে। মনে মনে মৃত স্বামীকে দোষারোপ করলেন তিনি।
ইরা অতকিছু খেয়াল করলোনা। ওর ভেতরে ভেতরে বাধভাঙ্গা খুশি উপচে পড়ছে। এখন আর ওকে এই ফ্ল্যাটে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবেনা। এখন আর ওকে ধ্রুবর দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে থাকতে হবেনা। এখন থেকে সে থাকবে ধ্রুবর প্রথম এবং একমাত্র স্ত্রী।
**
ধানমন্ডির ম্যাফল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে আহান বাইকে ব্রেক কষলো। আবৃতি বাইক থেকে নেমে চোখ ঘুরিয়ে আধুনিক প্রতিষ্ঠান টা দেখলো। এটা ঢাকার অন্যতম মানসম্মত আরেকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। আরশানের আগের স্কুলটা ছিল উত্তরায় ধ্রুবর বাসার থেকে কাছে। কিন্তু আবৃতি ধ্রুব আর ধ্রুব সম্পৃক্ত সব কিছু আজীবনের জন্য ছেড়ে এসেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবৃতি ভেতরে ঢুকলো।
অফিস কক্ষে যাবতীয় ফর্মালিটিস শেষে পিন্সিপল ম্যাম মিসেস কলি হেসে বললেন,
— বাচ্চার নামটা যেন কি?
আরশান লাফিয়ে উঠে বলে,
— আরশান, আরশান ওয়াহিদ মিস।
তিনি হেসে বললেন,
— আরশান তোমার এডমিশন কমপ্লিট হয়েছে। তুমি এখন থেকে এই স্কুলের একজন স্টুডেন্ট। চাইলে আজ স্কুলটা ঘুরে দেখতে পার। কাল থেকে ক্লাস এটেন্ড করো।
আহান ওর হাত ধরে বললো,
— চলো মামুর সাথে । তোমার মাম্মার কথা বলে আসুক।
ওরা যেতেই প্রিন্সিপাল আবৃতির দিকে তাকিয়ে বললো,
–মিসেস আবৃতি ওয়াহিদ আপনা…
— আমার নাম আবৃতি খন্দকার ম্যাম। আরশানের ফাদারের সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।
আবৃতি ভীষণ শান্ত গলায় বললো। প্রিন্সিপাল মিসেস কলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আবৃতির দিকে। এত সুন্দরী মেয়েটার বিচ্ছেদ হয়ে গেল! এই পুরুষজাতি আসলে চায়টা কি? তিনি আমতাআমতা করে বললেন,
— দুঃখিত আবৃতি। আমি আসলে বুঝতে পারিনি।
— ইট’স ওকে ম্যাম। আপনি তো জানতেন না।
— কাল থেকে আরশানকে ক্লাস জয়েনিং। টাইমে স্কুলে নিয়ে এসো। চাইলে আমাদের স্কুল বাসও বুক করতে পারো। আজকে ছেলের স্কুলটা ঘুরে যাও।
আবৃতি সায় জানিয়ে উঠে দাড়ালো। তারপর ওনাকে বিদায় দিয়ে স্কুলের ভিতরে ঢুকলো।
এখন বোধহয় বাচ্চাদের টিফিন পিরিয়ড চলছে। প্লে গ্রাউন্ডে বাচ্চারা কেউ টিফিন করছে নাহয় কেউ খেলছে। বাচ্চাদের এত আমোদ দেখে আরশান খুশি হয়ে গেল।
— মাম্মাম দেখ এখানে কত্ত প্লে টয়েস।
আবৃতি মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। যাক ছেলেটা এত সহজেই মেনে যাবে ভাবেনি। হঠাৎ আবৃতির চোখ যায় একটা বাচ্চার দিকে। সব বাচ্চা হাসি খেলায় মেতে থাকলেও গ্রাউন্ডের একপাশে মন খারাপ করে বসে আছে একটা গুলুমুলু বাচ্চা৷ তার সামনে টিফিন ক্যারিয়ারটা অবহেলায় পড়ে আছে। আবৃতি বাচ্চাটার বয়স আন্দাজ করলো হয়তো আরশানের বয়সীই হবে। কিন্তু বাচ্চাটা এভাবে মন খারাপ করে বসে আছে কেন? আবৃতি কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল বাচ্চাটার দিকে।
সামনে কারো উপস্থিতি অনুভব করে ওয়াফা মাথা তুলে তাকালো। আবৃতি ওয়াফাকে দেখে মুগ্ধ হলো। ইশ কত্ত আদুরে এই বাচ্চাটা! ইচ্ছে করলে লাল ফুলকো গালদুটি টেনে দিতে৷ ও আদুরে সুরে বললো,
— তোমার নাম কি সোনা?
ওয়াফা চোখ পিটপিট করে বললে,
— মাহিয়া চৌধুরী ওয়াফা।
–অনেক সুন্দর নাম। কিন্তু কি হয়েছে বেইবি৷ তুমি এখানে এভাবে বসে আছ কেন? মন খারাপ?
ওয়াফা আবৃতির আদুরে সম্বোধনে গলে গেল। তার ছোট্ট জীবনে এমন ঘটনা নগন্য। সে উপরনিচ মাথা দোলাল। আবৃতি জট করে ওয়াফাকে কোলে তুলে নিল। আবৃতি মেয়ে বাচ্চাদের প্রতি অত্যন্ত দূর্বল। আর যদি হয় ওয়াফার মতো কিউট বাচ্চা তাহলে তো কথাই নেই। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ রাশভারী আওয়াজে ডেকে ওঠে,
— আম্মাজান?
আবৃতি ওয়াফাকে নিয়ে চমকে পিছনে ফিরলো। একটা বিশালদেহী উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ স্যুট বুট পরা ভদ্রলোক গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আবৃতির দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু আবৃতির কেন যেন লোকটাকে একদমই ভদ্র মনে হলোনা। কেন কে জানে?
চলমান……..
(যথার্থ রেসপন্স করবেন প্লিজ। অনেক সময় নিয়ে লিখেছি। 🥺)