লেখনীতেঃআফসানা শোভা
পর্ব:১৬
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
রাজধানীর একটি অভিজাত রেস্ট্রুরেন্টের একটি গোল টেবিলে সবাই বসে আছে। রেস্টুরেন্টটি পার্কের নিকটে হওয়ায় ঐক্য সবাইকে এখানে নিয়ে এসেছে। বাহারী খাবার -দাবার পুরো টেবিল জুড়ে।
আবৃতি কাঁচুমাচু হয়ে কোণার একটি চেয়ারে বসে আছে। পাশে বসে ঐশী খেতে খেতে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। ওর চেহারায় এখন কিছু কালাতিক্রম পূর্বের অবসাদের রেশ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আবৃতির বরাবর সামনের চেয়ারে ঐক্য কপাল কুঁচকে বাম হাতে ফোনে খটাখট আঙুল চালিয়ে কি যেন করে চলেছে। আর মাঝে মাঝে ফোর্ক দিয়ে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছে। তার কুঁকড়ে যাওয়া কপাল আর গম্ভীর আনন দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ সিরিয়াসলি কিছু একটা করছে ফোনে। আবৃতি একপলক সেদিকে তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল। ওর কেমন জানি হাঁসফাঁস লাগছে। বুকটা হঠাৎ কেমন যেন ভার ভার লাগছে।
এই রেস্টুরেন্টটার সাথে ওর অতীতের কিছু স্মৃতি জমে আছে। এই রেস্টুরেন্টটায় প্রায়শই ধ্রুব ওদেরকে নিয়ে আসতো। আবৃতির প্রতি ভালবাসা না থাকলেও ধ্রুব সবসময় চেষ্টা করতো স্বামী আর পিতা নামক দায়িত্বটা অন্তত পালন করার। তাইতো উইকেন্ডে কোন পার্ক বা রেস্টুরেন্ট আবৃতির দর্শনের সৌভাগ্য হতো। কখনো কখনো আবার ছেলের বায়নায়ও নিয়ে আসতো এখানে। আবৃতিকে কি আর বাসায় ফেলে আসা যায়? তাই হয়তো চক্ষুলজ্জায়ও নিয়ে আসতো এখানে।
আবৃতি ওরনাটা টেনে নিজের কপালের ঘাম মুছলো। এই কনকনে ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও ও এত কেন ঘামছে বুঝতে পারছেনা। মনের মধ্যে কিছু একটা খচখচ করছে। যেন খারাপ কিছু একটা হতে চলেছে। নাকি সব ওর মনের ভ্রান্ত ধারণা? হয়তো ধ্রুব নামক নেগেটিভিটি ওর মনকে প্রভাবিত করেছে! তাই এমন অদ্ভুত অশান্তি হচ্ছে মনে।
আবৃতির চোখ ঐক্যর পাশের চেয়ারে পড়লো। দৃশ্যটা দেখে কিছুটা অবাক হলো সে। পরক্ষণেই ওর ঠোঁট জুড়ে মৃদু হাসি খেলে গেল। চেয়ারে বসে বসে ওয়াফা আর আরশান খাবার খাচ্ছিল। ওয়াফা চিকেনের পিসটা কাটতে পারছিল না দেখে আরশান নাইফটা নিয়ে সুন্দর মতো কেটে কেটে ওয়াফার প্লেটে দিচ্ছে। যদিও অপটু হাতে কাটতে তার বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে। তবুও এই ছোট্ট হাতেই দায়িত্ব নিয়ে ওয়াফাকে সাহায্য করার সর্বাত্মক চেষ্টায় সে।
আবৃতির চোখ জুড়িয়ে যায় ছেলের পরোপকারীতায়। এতক্ষণের খারাপ লাগার রেশ উড়ে মনটা একটুখানি হালকা হয়। ও প্রার্থনা করে তার ছেলেটা যেন এই সুন্দর সুন্দর গুণগুলো সাথে নিয়ে একজন আদর্শ মানুষ হতে পারে। আবৃতির জীবনে শত না পাওয়ার অভিযোগ যেন আরশান পূর্ণ করে। বাচ্চাটা যেন বড় হয়ে তার মায়ের দায়িত্ব একা হাতে নেয়। এইতো এইটুকুই, আবৃতির যে আর কিছুই চাওয়ার নেই এই জীবন থেকে। একসময় চেয়েছিল অনেককিছু। নিজের স্বপ্নপূরণ যখন করতে পারলনা। তখন চেয়েছিল থাক মন দিয়ে সংসার করবে। স্বামীর ভালবাসায় গোটা জীবন কাটিয়ে দেবে। কিন্তু কিছুই তো হলোনা! তাই এখন আবৃতি জীবন থেকে আর কিছুই চায়না। শুধু চায় তার বুকের ধনকে। যার মুখের দিকে তাকিয়ে আবৃতির সব দীর্ঘশ্বাসের সমাপ্তি হয়।
আরশানের কষ্ট হচ্ছিল দেখে আবৃতি নিজে নাইফটা হাতে নেয়। দক্ষ হাতে চিকেনগুলো কেটে সসে ডুবিয়ে সেজুয়ান রাইসের সাথে নিজেই ওয়াফার মুখের সামনে ধরে৷ ওয়াফা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আবৃতি চোখের ইশারায় হা করতে বলে৷ ওয়াফা ভয়ে ভয়ে পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে আরশান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আজ আর চোখে মুখে কোন হিংসাত্মক তৎপরতা নেই। ওয়াফার ভীতি যেন দূর হলো। খুশি মনে মুহুর্তেই টুপ করে আবৃতির বাড়িয়ে রাখা নলা মুখে পুরে নেয়৷ আবৃতি আপনমনে হাসে। এদের দুটিতে এসব দুষ্ট-মিষ্টি খুনসুটি গুলো ও বেশ উপভোগ করে। এটাও জানে দুজন পূর্ব শত্রু থেকে সদ্য বন্ধুত্ব পেতেছে। তাইতো চোখে চোখে নীরব ভাষায় এক জন আরেকজনের মন রক্ষা করে চলছে।
ঐশী মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য অবলোকন করে। কিছু একটা ভেবে ওর ভেতরটা উচাটন করে। পরক্ষণেই নিজের আজন্মকাল গম্ভীর আর কপাল বেঁকে রাখা ভাইয়ের মুখখানা পরখ করে আকাশকুসুম চিন্তার ইতি টানে। এ জনমে হয়তো এই ছ্যাঁকাখোরকে বিয়ে করানো যাবেনা৷ কিন্তু একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কোথায়? হয়তো আল্লাহ চাইলে ও যা ভাবছে তা হলেও হতে পারে।
ফোনে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে ঐক্য পাশে তাকালো। তাকাতেই চমকে উঠলো। কুঁচকে রাখা কপালদ্বয়ের ভাজ নিমিষে মিলিয়ে গেল। নিজের মেয়েকে তার পরে এই প্রথমবার কাউকে এত যত্ন নিয়ে খাইয়ে দিতে দেখছে। ওয়াফার একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। ও ঐক্য ব্যতিত কারো হাতেই খেতে চায়না। এমনকি নিজের দিদুনের হাতেও না। সকালবেলা নিয়ম করে ঐক্য খাইয়ে দেয়। বাকি দুইবেলা প্রায়শই ওয়াফা অপটু নিজের হাতেই খাবার খায়। ঐক্য বিমোহিত দৃষ্টিতে মেয়ের তৃপ্তি সহকারে খাওয়া দেখছিল। দৃশ্যটা তার কাছে এমন লাগলো যেন একজন মা তার সন্তানকে ভালোবেসে খাইয়ে দিচ্ছে।
আবৃতির খুবই লজ্জা লাগছিল। ওরা দুই ভাইবোন ওকে এভাবে দেখছে কেন আজব? ঐক্য মনে হয় বুঝলো আবৃতির অস্বস্তি। তাইতো চোখ সরিয়ে আরেক পল পাশে চুপচাপ বসে পটু হাতে খাবার খাওয়া আরশানকে দেখলো। অবাক হলো বাচ্চাটার আজ হঠাৎ শান্ত আচরণে। ও যতটুকু আরশানকে চেনে তাতে বাচ্চাটা নিজ মায়ের এতটুকু ভাগও কাউকে দিতে রাজী না। কিন্তু আজ এমন শান্ত কি করে? ঐক্য গলা খাঁকারি দিল আরশানের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টায়।
— কি চ্যাম্প সিজলিং টা মজা?
আরশান খাবার চিবুতে চিবুতে বলে,
— হ্যাঁ আঙ্কেল। চাওমিন টাও অন্নেক মজা। দেখ কতগুলো চিজ আর প্রন দিয়েছে।
ঐক্য বাচ্চাটার চুল এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বলে,
— পিজ্জা টাও মজা। টেস্ট করে দেখবে একটু?
আরশান চোখ বড় বড় করে বললো,
— এই না না আঙ্কেল। আমার টাম্মি একদম ফুল। আর খেতে পারবনা। দেখ কত্ত বড়৷
আরশান নিজের পেটটা আঙুল দিয়ে দেখাল।ঐক্য হাসিমুখে আরশানের গাল টেনে দিল। তারপর টিস্যু দিয়ে যত্ন করে ওর মুখটা মুছিয়ে দিয়ে বললো,
— গুড বয়! এখন এই শেইকটা খাও।
ঐক্য উঠে দাড়িয়ে ঐশীকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— তোরা বোস। আমি ব্যাংক পেমেন্ট করে করে আসছি।
ঐক্য যেতেই ঐশী একটু নড়েচড়ে বসলো। ততক্ষণে আবৃতি ওয়াফাকে খাইয়ে মুখ,হাত পেপার ন্যাপকিন দিয়ে ক্লিন করে দিচ্ছে।
— আপু?
— হু, বলো ঐশী।
— একটা কথা বলব? যদি কিছু না মনে করোতো।
আবৃতি চোখ তুলে তাকিয়ে জবাব দেয়,
— আরে দূর বলোতো। কি মনে করব? আমি অতকিছু মনে করিনা। তুমি দেদারসে বলে ফেলো।
ঐশী জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ইয়ে মানে এরপর কি করবে কিছু ভাবলে?
আবৃতি স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিত্তোর করে,
— আমিতো চাচ্ছি কোন একটা ছোটখাটো জবে ঢুকে যেতে৷ কিন্তু তোমার স্যার এই কথা শুনলেই রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যান। দুধের দাঁত পড়েছে দুইদিন হয়নি, তিনি নাকি বোন – ভাগ্নের সব দায়িত্ব পালন করবেন। আমি যেন কোন জব টবের কথা না ভাবি। সে আমার আবার বিয়ে দেবেন। হা হা হা৷
ঐশী মুচকি হাসে। আহানের এইসব ভাল গুণই ওকে দিওয়ানা করে ছেড়েছে। অত্যাধিক সুদর্শন হওয়ার দরুণ আহান ক্লাসের সব মেয়েদের ক্রাশ। কিন্তু ঐশী জানে ও আহানের বাহ্যিক রুপে ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। সেদিনের ওই ঘটনাটি যে ঐশী কখনো ভুলবেনা।
— কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি?
ঐশীর ধ্যান ভাঙ্গে। ও একটু সাহস করে একটা অতি ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করে বসলো,
— আপু তমি বিয়ে নিয়ে কিছু ভেবেছ?
আবৃতির ব্যস্ত হাত থেমে যায়। কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থাকে। ঐশী আবৃতির ভাবলো আবৃতি হয়তো মাইন্ড করেছে।
— আপু আমি স্যরি। আসলে…
— দ্বিতীয় সূচনা হলে কেমন হয় ঐশী?
— মানে?
আবৃতি এবার শীতল চোখ তুলে তাকায় ঐশীর দিকে। বড্ড সাবলীল গলায় বলে,
— মানে আমার জীবনে দ্বিতীয় সূচনা হলে কেমন হয়? আমি ইন ফিউচার বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্কটাতে আবার জড়াতে চাই ঐশী। এই সম্পর্কে আমি ভালবাসা, সম্মান কিচ্ছু পাইনি। কিচ্ছু না। এই সম্পর্কটা আমাকে সবসময় অস্তিত্ব সংকটে ভুগিয়েছে। কিন্তু আমার তো কোন দোষ ছিলনা ঐশী৷ কেন আমি গুমরে গুমরে মরব? আমি বাঁচব, আমি হাসব। প্রাণ খুলে হাসবো। আমি আবার লাল শাড়ি গায়ে জড়াব, আবার স্বামীর জন্য সাজব। দেখব এই সমাজ কি করতে পারে। পুরুষ যদি একটা নারীকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে স্বাধীনভাবে এই সমাজে বাঁচতে পারে, তবে কেন একটা নারী নয়?
কথাগুলো বলতে বলতে আবৃতির গলা কেঁপে কেঁপে উঠে। মনোহরী চোখ দুটোতে জমে নোনা জল। ঐশী অবাক নয়নে দেখে এক আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারীকে। আরেকবার আবৃতির চমৎকার ব্যক্তিত্বে ওর দুচোখ থেকে মুগ্ধতা ছুঁইয়ে পড়ে৷ সম্মানে নুইয়ে পড়ে মন। ঠিকি তো একটা পুরুষ যদি বিচ্ছেদের সপ্তাহখানেকেই নতুন জীবন সূচনা করতে পারে। তাহলে একটা নারী কেন বছরের পর বছর একাকিত্ব নিয়ে সংগ্রাম করে যাবে? দ্বিতীয় সূচনা তো নারীর জীবনেও দরকার।
আবৃতি হঠাৎ ধরা গলায় বলে উঠে,
–জানো ঐশী, আমার না একটা সংসার করার বড্ড শখ!
বলতে বলতে আবৃতির চোখের নোনাজল গুলো বর্ষণ হয়ে ওর গাল বেয়ে নামে। ঐশী কতক্ষণ আনমনে কিছু ভাবে। সামনে একবার তাকায় ভিডিও গেইমে মগ্ন আরশান, ওয়াফাকে৷ আরেকপল অদূরের ঐক্যর দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা কঠিন ডিসিশন নেয়। বড় করে একটা শ্বাস টেনে আবৃতির একহাত নিজের মুঠিতে নেয়৷ অমায়িক হেসে বলে,
— খুব শীঘ্র তোমার একটা ভরা সংসার হবে আপু। দেখে নিও। তোমার জীবনে দ্বিতীয় সূচনা আসতে চলেছে!
চলমান….
[ ডানহাতের পিঠে একটা বিষফোঁড়া হয়েছে। ব্যাথা নিয়ে এত পরিমাণ কষ্টে এই পর্বটা লিখেছি। এমনিতেও আমি খেয়াল করেছি আমার লেখার হাত গতানুগতিক লেখকদের থেকে খুবই স্লো। তার উপর আমার ক্লাস, বিজনেসের কাজে লেখালেখিতে প্রপার টাইমই দিতে পারছিনা। কি যে করি? আপনারা সবাই মিলে প্লিজ এই পর্বে ২০০০ হাজার রিয়েক্ট আর ২০০+ কমেন্ট করে দেবেন প্লিজ। সত্য বলছি নিজের শরীরের উপর জুলুম করে আমার এই লেখালেখিটা করতে হয়।😞]