গল্প; দ্বিতীয় সূচনা (১৭)

   লেখনীতেঃআফসানা শোভা

পর্ব:১৭

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]

 

হাসপাতাল থেকে থমথমে মুখে বের হয় ধ্রুব। হাতে ইরার টেস্টের রিপোর্ট মিলিয়ে একগাদা ফাইল। ইরার মাথাটা ঘুরছে, পা জোড়া টলছে। আজ ডাক্তার যা বললো তা যদি সত্যি হয়? তাহলে? না না! তাহলে ইরা মরে যাবে, একদম মরে যাবে। ইরার মাথাটা ঘুরে উঠলে পাশে বেখেয়ালি ধ্রুবর শার্টের হাতা খামচে ধরে। ধ্রুব ভ্রু কুঁচকে তাকায়৷ ইরার চোখে জমা পানি আর বড় বড় শ্বাস টানতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ইরাকে আগলে ধরে। মুখে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— কি হয়েছে ইরা? আবার শরীর খারাপ করছে?

ইরা কাঁপা গলায় বললো,

— ধ্রুব তখন ডাক্তার কথাটা কেন বললো??

ধ্রুব সুদর্শন মুখটাতে নেমে আসে কালো মেঘের ঘনঘটা! সেই কথাটা শুনেতো ধ্রুবরও বুক কাঁপছে। ধ্রুব দ্রুত নিজেকে সামলায়। এখন যদি ও নিজেই ভেঙ্গে পড়ে তাহলে ইরা আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। ইরার বাহু আগলে ধরে নরম স্বরে বলে,

— ইরা চলো কোথায় তোমাকে নিয়ে বসি। তোমার রিল্যাক্স হওয়া প্রয়োজন।

কেবিন নংঃ২০৩

কেবিনের কোণার চেয়ারে বসে বাচ্চারা দুটো তখন হট চকলেট শেইক খাচ্ছিল। আবৃতি আর ঐশী তখনো গম্ভীর আলাপে মগ্ন। ঐক্যর অতীত বিস্তারিত শোনার পর আবৃতিরও ইচ্ছে হলো নিজের বিষাদ মাখা অতীতটা শেয়ার করে হালকা হতে।

— ধ্রুব তোমার অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল?

ঐশীর হতবাক প্রশ্ন৷ আবৃতি মলিন হেসে উপরনিচ মাথা নাড়ায়।

— কিন্তু তুমি অনুমতি দিলে কেন? মাদার তেরেসা হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল।

আবৃতি মাথা নাড়িয়ে বলে,

— উহু। নিতান্তই বাধ্য হয়ে। আমি অবলা নারী নই যে স্বামী এসে বলবে আর আমি রাজী হয়ে যাব।

ঐশী বিভ্রান্ত হয়ে বললো,

— তাহলে?

আবৃতি ফিকে হেসে বলে,

–বিয়ের পর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমার আরশান যদি গর্ভে না চলে আসতো,তবে হয়তো ধ্রুবকে আমি মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু আমি পারিনি। আমার আরশান বাবা বলতে অজ্ঞান ছিল। মিথ্যে বলবনা ধ্রুব নিজেও আরশান পৃথিবীতে আসার পর থেকে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায়। ইরার সাথে কখনো ওকে যোগাযোগ করতে দেখিনি। এমনকি ইরার সব স্মৃতি যেগুলো ও পরম যত্নে আলমারীতে লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোও পুড়িয়ে ফেলে।সব কিছু ভুলে একজন ভাল বাবা আর স্বামী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা আমি তার মধ্যে দেখতাম। ভালোই চলছিল সব। কিন্তু?

— কিন্তু?

আবৃতি ফোনে ভিডিও গেইম খেলায় মগ্ন ছেলের আদুরে মুখটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে বলে,

— বছরখানেক ধরে প্রায়ই ধ্রুবর ফোনে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন কল, মেসেজেস আসতো। প্রথম প্রথম আমি বিষয়টা আমলে নেইনি। কিন্তু দিন যেতেই ধ্রুবর আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। ওর চোখে সেই প্রথম দিনগুলোর মতো আমার জন্য বিতৃষ্ণা দেখতে পাই। একদিন ও শাওয়ারে ছিল তখন ওর ফোনটা বেজে উঠলে আমি কৌতুহল বশত তুলি। ওপাশ থেকে ইরার কন্ঠ শুনে যেন আমার দুনিয়া দুলে উঠে। এর পর থেকে প্রায়ই গভীর রাতে ইরার বিভিন্ন টেক্সট আসতো ধ্রুবর ফোনে। তখন আমি বুঝতে পারি, আসলে ধ্রুব কখনো ইরাকে ভুলতেই পারেনি আর নাতো ইরা ভুলতে দিয়েছে৷

ঐশী বিহ্বলিত হয়ে আওড়ায়,

— তারমানে তোমাকে বিয়ে করার পরও ধ্রুব ইরার সাথে অ্যাফেয়ার চালিয়ে যাচ্ছিল?

— জানিনা! ধ্রুবর ভাষ্যমতে তারা নাকি শুধুই বন্ধু ছিল। সবকিছু জানার পর আমি যখন ধ্রুবর থেকে কৈফিয়ত চাই তখন ধ্রুব আমার চোখে চোখ রেখে বললো ও আর ইরা এখন শুধুই বন্ধু। সেই বন্ধুত্বের খাতিরেই নাকি ওরা পরস্পর যোগাযোগ রেখেছে। আচ্ছা এতরাতে প্রাক্তনকে টেক্সট কোন বন্ধু দেয় বলতে পার? এভাবে প্রায় তিনবছর চললো। আরশান বড় হলো। কিন্তু আমার আর ধ্রুবর সম্পর্কের কোন উন্নতি হলোনা। ধ্রুব, ইরার যোগাযোগ তখনো অব্যাহত৷ আমি জানতাম ইরার সাথে ধ্রুব কোন অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়নি। কিন্তু তবুও আমার স্বামী হয়েও ধ্রুব যেন আমার ছিলনা। কখনো কখনো আমার সাথে গল্প করতে বসলেও মুখ ফসকে ইরার বিষয়ে বলে ফেলতো। জান ঐশী ধ্রুব যখন ইরাকে নিয়ে কিছু বলতো তখন ওর চোখে আমি ইরার জন্য অপার মুগ্ধতা দেখতাম। তখন আমার না ভীষণ অপরাধ বোধ হতো দুজন ভালবাসার মানুষের মধ্যে আমি কেন তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে ডুকলাম।

— তারপর এরা গোপনে বিয়ে করে ফেলে নিজেদের নোংরা মানসিকতার পরিচয় দেয় তাইনা?

ঐশীর রোষপূর্ণ গলা।

— না?

— মানে?

আবৃতি রেস্ট্রুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের জানালা পেরিয়ে অদূরে তাকায়। আনমনে হারিয়ে যায় নিজের অসহায় অতীতের পাতায়…….

— মাম্মাম পাপা কখন আসবে?

ছেলের আধোআধো বুলি শুনে আবৃতি কক্ষের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় রাত এগারোটা বেজে বিশ। বাইরে তখন বৈশাখ মাসের আগমনী ঝড় বইছে। আবৃতির হঠাৎ কেমন অদ্ভুত অস্থিরতা শুরু হয়। কি ব্যাপার? ধ্রুবর ফিরতে আজ এত দেরী হচ্ছে কেন? আবৃতি বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের ফোনটা তুলে ধ্রুবর নাম্বারে ডায়াল করে৷ কিন্তু ফোনটা রিং বেজে কেটে যায়। আবৃতি ভ্রু কুঁচকে আবার ট্রাই করে। এভাবে দুইবার ফোনটা রিং বেজে কেটে যায়। তৃতীয়বারে ডায়াল করলে এবার বিপরীতে সুমিষ্ট নারীকন্ঠে ফোনটা সুইচড অফ শোনায়। আবৃতি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে দরদর করে ঘামতে থাকে। বাইরে ততক্ষণে উত্তাল কাল বৈশাখী শুরু হয়েছে। গোটা ফ্ল্যাটে তখন শুধুমাত্র আবৃতি আর আরশান ব্যতিত কোন জনপ্রাণী নেই। ওর শাশুড়ী ছোট ছেলের শশুর বাড়িতে আজ বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাই আজ আর ফেরেননি। আবৃতির চিন্তাযুক্ত চেহারা থেকে আরশান মায়ের কোলে চেপে বসে৷ অবুঝ কন্ঠে বলে,

— কি হয়েছে মাম্মাম? পাপা ফোন পিক করছেনা?

আবৃতি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বললো,

— তুমি ঘুমিয়ে যাও বাবা। তোমার পাপার আজ আসতে বোধহয় লেইট হবে।

যদিও ধ্রুব বাসায় ফেরা ব্যাতীত আরশানকে ঘুম পাড়ানো অসম্ভব কিন্তু কি বুঝে যেন বাচ্চাটা আজ আর বায়না করলোনা। লক্ষী বাচ্চার মতো মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আবৃতি চিন্তিত মনে আরশানের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। দশমিনিট পর আরশানের ভারী নিঃশ্বাস পড়তে দেখে আবৃতি ওকে ঠিকভাবে বালিশে শুইয়ে দেয়। তারপর পা টিপে টিপে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে আবৃতির কোমল মুখটা ভিজিয়ে দিল। কিন্তু আবৃতির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ও ফোনের কল লিস্ট ঘেঁটে ধ্রুবর কলিগ ইমনের নাম্বারটা খুঁজে বের করে ডায়াল করে। ওপাশে সাথে সাথে রিসিভ হতেই আবৃতি উৎকন্ঠিত সুরে বললো,

— ইমন ভাই আমি আবৃতি বলছি।

— আরে ভাবি আপনি?এত রাতে কল করেছেন? সব ঠিক আছে তো? ধ্রুব কোথায়?

আবৃতির পিলে চমকে উঠে। তার মানে ইমন ভাইও জানেনা ধ্রুব কোথায়? ওপাশ থেকে ইমন হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। আবৃতি বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করে,

— ভাইয়া অফিস কখন শেষ হয়েছে আপনাদের?

— সেতো এজ ইউজুয়াল আটটা ত্রিশ। কেন ধ্রুব এখনো বাসায় ফের….

আর কিছু শোনার অপেক্ষা করলোনা আবৃতি। খট করে লাইনটা কেটে দিল। আবৃতি স্তব্ধ হয়ে বারান্দায় আরশানের জন্য সেট করা দোলনায় বসলো। বৃষ্টির তোড়ে ও ভিজে যাচ্ছে। শীতলতার তোড়ে রক্তজবার মতো ওষ্ঠ জোড়া কেঁপে কেঁপে উঠছে। আচ্ছা ধ্রুব কোথায়? ও ঠিক আছে তো?

সকালের মৃদু আলো চোখে পড়তেই আবৃতি ঘুমন্ত কপালে গুটিকয়েক ভাঁজের সৃষ্টি হলো। নড়েচড়ে উঠে সামান্য আবার ঘুমাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সারারাত ঝড় বৃষ্টি পেরিয়ে সকালে সূযটা আজ বেশ কড়াভাবে তার রশ্মিতে ধরণীকে আলোকিত করে চলেছে। আবৃতি পিটপিট করে চোখ খুলে দেখে সে কাল রাতে বারান্দার দোলনাটায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। কতক্ষণ ঘুমঘুম চোখে শান্ত হয়ে বসে থাকে। হঠাৎ কাল রাতের সবকিছু মনে পড়তেই হতচকিত হয়ে দোলনা থেকে উঠে একছুটে নিজেদের বেডরুমে পৌঁছায়। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা দূর্বল মস্তিস্কে ক্ষীণ আশা ধ্রুবকে হয়তো প্রতিদিনের মতো আরশানকে জড়িয়ে ধরে পরম আবেশে ঘুমিয়ে থাকতে দেবে। কিন্তু বিধিবাম রুমে এসে দেখে আরশান বিছানায় একাকী ঘুমিয়ে আছে।

আবৃতি দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ঘড়িতে সকাল আটটার ঘর প্রায় আধঘন্টা আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। আবৃতির মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। মস্তিষ্ক বারবার সাবধান করছে ধ্রুবর কোন বিপদ হলোনাতো? ধ্রুবর প্রতি হয়তো আবৃতির কোনদিন ভালবাসা জন্মেনি,কিন্তু এই মানুষটা ওর সন্তানের বাবা। এ সত্যিটা যে কিছুতেই অস্বীকার করা যায়না। ও আর কিছু ভাবতে পারলোনা। মনে মনে ঠিক করলো ধ্রবকে নিজেই খুঁজতে বের হবে। মনে মনে ঠিক করে ওয়াশরুমের দিকে ছোটে। কোন মতে ঘুম কাটানোর জন্য মুখ চোখে সামান্য পানি ছিটিয়ে মুখটা না মুছেই বাথরুম থেকে বড় বড় পা ফেলে বের হয়। ফোন আর পার্সটা ব্যাগে ভরতেই ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে ওঠে। আবৃতি অবাক হলো। ভাবলো হয়তো তার শাশুড়ীরা চলে এসেছে। আবৃতি কপালে দুঃশ্চিতায় ঘাম জমলো। তার শাশুড়ী তাকে বিশেষ পছন্দ করেননা। আগে ওর শশুর বেঁচে থাকা কালীন আবৃতিকে কোন কথা না শোনালেও ওর শশুর মারা যেতে যেতে আবৃতিকে উঠতে বসতে কটু কথার বানে জর্জরিত করেন তিনি৷ । ইরার মতো গুণী মেয়েকে ছেলের বৌ করতে না পারার হাপিত্যেশে মরে যান।

ও দুরুদুরু বুক নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। কাঁপা হাতে দরজাটা খুলতেই ওর আপাদমস্তক একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠে। দরজার ওপাশে ধ্রুব উসকোখুসকো চুলে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। ধ্রুবকে দেখে আবৃতির জানে যেন পানি আসলো। ও হাত টেনে ধ্রুবকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজারা বন্ধ করে দিল। আবৃতি অনুভব করলো ওর ধরে রাখা হাতেও ধ্রুবর শরীরটা অস্বাভাবিক ভাবে কেঁপে উঠেছে। আবৃতি নিজেকে ধাতস্থ করে ধ্রুবর আপাদমস্তক দেখলো। শরীরে অফিসের কোর্ট টাই অনুপস্থিত। চোখদুটো অসম্ভব লাল! যেন সারারাত একফোঁটাও ঘুমায়নি। সাদা রঙা শার্টটার বুকের কাছের দুটো বোতাম ছেঁড়া। আবৃতি সেদিকে বেখেয়ালে নিজের হাতটা এগোলে এতক্ষণ জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুব আঁতকে উঠে চোখের পলকে দুপা পিছিয়ে যায়। আবৃতি অবাক গলায় বললো,

— কি হয়েছে ধ্রুব? আর তুমি সারারাত কোথায় ছিলে?

ধ্রুব একপলক আবৃতির চোখের দিকে তাকাল। কিন্তু সাথে সাথে চোখ নামিয়ে খানিকটা চুরি ধরার মতো করে মেঝেতে এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। ঈষৎ কম্পিত গলায় তুতলে বললো,

— এক…… কাজে বন্ধুর বাসায়… গিয়েছিলাম। ঝড়- বৃষ্টি দেখে ও আর বেরোতে দেয়নি। তাই রাতটুকু সেখানেই থেকে গিয়েছিলাম৷

পুরোটা কথা ধ্রুব সম্পূর্ণ মেঝের দিকে চেয়ে বলে। যেন কোন কারণে ও আবৃতির চোখে চোখ মেলানোর সাহস পাচ্ছেনা। আবৃতি কিছু বলতে মুখ হা করবে এমন সময় ধ্রুব হন্তদন্ত হয়ে বললো,

— আবৃতি আমার মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে। আমি ফ্রেস হয়ে একটু ঘুমোবো। প্লিজ এখন যাই৷

এ কথা বলে বড় বড় পা ফেলে চলে যায় বেডরুম ছেড়ে। যেন আবৃতির থেকে পালাতে চেয়েছে। ধ্রুব চলে যাওয়ার পর আবৃতি স্তব্ধ বদনে সেখানে স্টেচ্যুর মতো দাড়িয়ে থাকে। হঠাৎ বাসার কলিং বেল পুনরায় বেজে ওঠে। আবৃতি চমকে উঠে দরজার দিকে এগোয়। দরজা খুলতেই দেখে ওর শাশুড়ী, দীপ্ত আর ওর নতুন বৌ দাঁড়িয়ে আছে। আবৃতিকে সঙের মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে ওর শাশুড়ী একপ্রকার ঠেলে ভেতরে ঢোকে। চারদিকের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো,

— কি ব্যাপার সব এরকম শান্ত কেন? আর আমার দাদুভাই আর ধ্রুব কোথায়?

ধ্রুবর কালকে ঘরে না ফেরার কথাটা আবৃতি চেপে গেল। শুধু শুধু ঘরে অশান্তি করতে নারাজ ও।

— মা আরশানের পাপার মাথাটা ধরেছে তাই ঘুমুচ্ছে।

ধ্রুবর মা ক্লান্ত থাকায় আর কথা বাড়ালেন না। আবৃতিকে লেবু চা করতে নির্দেশ দিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোলেন।

— ভাবি আমি কি এক কাপ কড়া কফি পেতে পারি।

পাশ থেকে সোনিয়া দীপ্তর পেটে গুঁতো দিয়ে বললো,

— ভাবি কেন তোমার জন্য কষ্ট করে কফি বানাবে?

— ভাবি থাক। কফিটা আমার বৌ বানাবে। সোনিয়া দীপ্তর মাথায় চাটি মেরে বললো,

— ইশ শখ কতো? নিজের কফি নিজে বানাও গিয়ে।

— ভাবি দেখেছ?

আবৃতি ওদের দুজনের খুনসুটি মুগ্ধ নয়নে দেখে। এরকম দুষ্ট – মিষ্টি খুনসুটিগুলো কখনো ওর আর ধ্রুবর সম্পর্কে ছিলনা৷

দীপ্ত আর সোনিয়া দুজনের লাভ ম্যারেজ৷ বিনা বাঁধায় পরিবারের সম্মতিতে দুজনে বিয়ে করেছে। প্রেম -ভালবাসায় বাঁধা দেওয়া মানুষটাই যে আর বেঁচে নেই। আচ্ছা ধ্রুবও যদি ইরাকে বিয়ে করতে পারতো, তাহলে তারাও কি এমন মিষ্টি মিষ্টি ঝগড়া করতো?

অতীতের কথা এই পর্যন্ত বলে আবৃতি খানিকটা দম নেয়।

— আই কান্ট বিলিভ কি পরিমাণ হিপোক্রিট এই মহিলা। ধ্রুব বিবাহিত, বাচ্চা আছে জেনেও ধ্রুবর সাথে নোংরামো চালিয়ে গিয়েছে। আমিতো ভাবতেই পারছিনা একজন মেয়ে জেনে-বুঝে কি করে আরেকটা মেয়ের ঘর ভাঙ্গে।

ঐশী ছটফটিয়ে বলে। ওর পুরো শরীরে যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আবৃতি কাষ্ঠ হাসে। মেয়েটা এইটুকু শুনে এমন করেছে। আসল কাহিনী শুনলে কি করবে? ঐশী রাগে চিড়বিড় করে বলে,

— আম্মু ঠিকই বলে। একটা নারীই আরেকটা নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু!

আবৃতি হঠাৎ বলে উঠে,

— সব দোষ তো আর ইরার একার না ঐশী। ধ্রুব তো আর ধোঁয়া তুলসি পাতা না৷

— মানে? প্লিজ সব খুলে বলো আপু।

আবৃতি মুখ খুলে কিছু বলতে নেবে কিন্তু সামনের দৃশ্যপট দেখে ওর পায়ের তলার জমিন সরে যায়। শরীরটা প্রচন্ড কম্পনে ঝাঁকি দিয়ে উঠে!

.

কিছুক্ষণ আগে………

রেস্টুরেন্টে গ্লাস ডোরটি এক হাতে ওপেন করে অন্যহাতে ইরাকে ডুকতে সাহায্য করলো ধ্রুব। হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে রিচেপশনে নিজের অফিসের বসকে দেখে থমকে যায় ধ্রুব। আনমনে বিড়বিড়ায়,

— স্যার!

ইরা ধ্রুবর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকায়। দেখে কালো শার্ট আর মিন্ট ব্লু ডেনিম জিন্স পরিহিত এক শ্যামবর্ণা সুদর্শন যুবক বিল পে করছে। ইরা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

— কার কথা বলছো তুমি?

ধ্রুব চোখের ইশারায় দেখায়,

— ইনি আমার অফিসের বস।

ইরা চোখ বড় বড় করে বললো,

— এই ছেলেটা তোমার বস? দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার সেইম এইজের৷

ধ্রুব ফিচেল হেসে বললো,

— তুমি ঠিক ধরেছো বাট উনি আমার বয়সী না আমার একবছরের ছোট৷ একত্রিশ ওনার সম্ভবত।

— বাহ! এত অল্প বয়সে এত বড় মাফের বিজনেস ওনার৷ মানতে হবে দম আছে। তা বিয়ে করেছেন উনি?

— একটা পাঁচ বছরের পরীর বাবা ইনি! চলো দেখা যেহেতু হয়েছে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।

— স্যার?

ঐক্য ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকায়৷ নিজের অফিসের সহকারী ম্যানেজারকে এখানে স্ত্রী সমেত দেখে জিজ্ঞেস করে,

— ধ্রুব তুমি এখানে?

— এইতো স্যার ওয়াইফকে নিয়ে এসেছিলাম। ইরা এদিকে এসো। ইনি আমার বস মিষ্টার ঐক্য চৌধুরী।

ঐক্য গর্ভবতী ইরাকে পরিলক্ষিত করে সৌজন্য হেসে শুধায়,

— হ্যালো মিসেস। গুড আফটার নুন। নাইস টু মিট ইউ।

ইরা মিষ্টি হেসে প্রতিত্তোরে বলে,

— মি ঠু স্যার।

ধ্রুব আশপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— ওয়াফা মামনিকে নিয়ে এসেছেন স্যার?

ঐক্য মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়,

— ইয়েস। এই একটু হ্যাংআউটে এসেছিলাম। উ্যড ইউ গাইজ আর লাইক টু জয়েন আস?

ধ্রুব উত্তর দেওয়ার আগেই ইরা উৎসুক সুরে বলে,

–ইয়েস, ইয়েস। হোয়াই নট। আমার আপনার বেইবি ওয়াফাকে দেখার খুব ইচ্ছে৷ প্রায়সই ধ্রুব ওর কথা বলে।

ঐক্য মুচকি হাসে। ছোট থেকেই তার মেয়েটা সবার ভালবাসা পেয়ে আসছে৷ বলতে গেলে ঐক্যকে অপছন্দ করা মানুষ জনও ওয়াফার মিষ্টি আননে গলে যায়! ঐক্য ওদের নিয়েভিআইপি কেবিনের ২০৩ এর দিকে অগ্রসর হয়।

 

চলমান……..

(শব্দসংখ্যা প্রায় দুইহাজার। তারপরেও যারা বলবে পর্ব ছোট তাদের আর কিছু বলার নেই। সকাল থেকে গায়ে জ্বর। আর আমি লিখে গিয়েছি কাঁপতে কাঁপতে। যে পাঠকের কখনো গল্পে দুটো ভাল কমেন্ট করতে দেখিনা তারাই আসে বলতে আরে এত ছোট পর্ব! কিন্তু পেইজে আসা কত রিচওয়ালা গল্পের পার্ট ডকসে কপি করে ওয়ার্ড সংখ্যা দেখে আমি আসমান থেকে পড়ি। তারাও সর্বোচ্চ ১৫০০ প্লাস ওয়ার্ডের একটা পার্ট লিখে। তাও দুই দিন পর পর৷ গল্প লিখতে একজন লেখকের মেলা টাইম লাগে ভাই। আর আমাদের মতো যারা জীবিকার্জনে ছোটে, তাদের জন্য তো এক প্রকার অসম্ভব! আমার শখটুকুকে কিছু পাঠক আমার গলার দঁড়ি বানিয়ে ছেড়েছে।🥲)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x