পর্বঃ১৯
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
গৌধূলি লগ্ন আসন্ন। সন্ধ্যার আকাশে তখন ঈষৎ রক্তিম আভায় রাঙা! দীপ্তিশীল প্রভাকর তখন তার দায়িত্বের অব্যাহতি শেষে ধীরে ধীরে পশ্চিম কোণে গায়েব হচ্ছে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত পাখিরা উড়ে তাদের নীড়ে ফিরছে। হাইওয়ের প্রশস্ত রাস্তা ধরে শা শা করে এগোচ্ছে ঐক্যর অত্যাধুনিক চার চাকার বাহনটি৷ ঐক্য জানালার কাছে এক হাত ঠেকিয়ে আরেক হাতে চুপচাপ ড্রাইভ করছে। আপাতত সুদর্শন শ্যামবর্ণ পুরুষটির সম্পূর্ণ মনোযোগ ড্রাইভিংয়ে মনে হলেও আদতে তা না৷ পাশে জানালার বাইরে উদাসীন চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকা রমনীটির সম্পর্কে হঠাৎ অনেক কৌতুহল অনুভব করছে ঐক্য৷ আজ রেস্টুরেন্টের ঘটনা ওকে বেশ বিস্মিত করেছে। আবৃতির ডিভোর্স হয়েছে সেটা সম্পর্কে ঐক্য আগে থেকে অবগত। কিন্তু ওর এক্স হাসবেন্ড যে ধ্রুব হতে পারে সেটা ঐক্যর ধারণাতে ছিলনা। ধ্রুব গত পাঁচবছর ধরে ঐক্যর কোম্পানীতে আছে। বলতে গেলে ঐক্যর কোম্পানী সূচনালগ্ন থেকেই ধ্রুব চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিতে আছে। একাউন্ট অফিসার থেকে সহকারী ম্যানেজার পদে ধ্রুব চেষ্টা, পরিশ্রম আর ধৈর্যের পর ধাপে ধাপে এসেছে। সেই অমায়িক,ভদ্র, পরিশ্রমী ছেলেটার ব্যাক্তিজীবনে যে এতটা ভয়ানক হতে পারে সেটা ঐক্য এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছেনা৷ নাকি এর পিছনেও রহস্য আছে?
— মাম্মাম? পাপার সাথে ওই আন্টিটা কে ছিল?
আবৃতি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে যায় আরশানের প্রশ্নে। ঐক্য লুকিং মিররে তাকালো। আরশান উৎসুক চোখে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়। ঐক্য আঁড়চোখে আবৃতির ফ্যাকাশে মুখশ্রী পরখ করে নিরেট আওয়াজে বলে,
— আরশান তুমি গেইমস খেলতে চাও?
আরশান চোখ চকচক করে উঠে। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,
— খেলতে চাই আঙ্কেল।
ঐক্য নিজের ফোনটা আরশানের দিকে বাড়িয়ে ধরে,
— এই নাও। বাসা আসা অবধি তুমি আঙ্কেলের ফোনে গেইমস খেল বাবা।
পেছনের সিটে এলিয়ে আরশান নিশ্চিত মনে ফোনে গেইমস খেলতে লাগলো। বাচ্চা মনে স্বভাবতই কৌতুহল বেশি থাকবে স্বাভাবিক। ঐক্য জানে আরশান একের পর এক প্রশ্নের বানে আবৃতিকে জর্জরিত করে তুলবে। তার সামনে সেসস অযাচিত প্রশ্নের উত্তর দিতে আবৃতি ভীষণ বিব্রত অনুভব করবে। তাইতো নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরশানের দিকে। ওয়াফাকে ঐশীর সাথে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে ঐক্য একপ্রকার জোর করেই আরশান আর আবৃতিকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছে। শত একা যেতে পারুক। একজন নারীকে এমন একাকী ছেড়ে দেওয়ার মতো কাজ ঐক্যর পক্ষে সম্ভব না৷ আর তাছাড়া আবৃতির মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সেটা ঐক্য খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাকে এই অবস্থায় একা ছেড়ে দেওয়া সমীচিন না। ও তো এখনো ভাবতেই পারছেনা ধ্রুবর মতো ছেলে এমন জঘন্য কাজ করতে পারে। প্রথম স্ত্রী সন্তান থাকা স্বত্তেও দ্বিতীয় বিয়ে! কিভাবে করতে পেরেছে ছেলেটা এমনটা?
— আপনি ঠিক আছেন?
আবৃতি জানালা থেকে ফিরে তাকালো। সোজাসুজি ঐক্যর চোখে চোখ রেখে বললো,
— কেন আপনি কি মনে করেছিলেন আমি বসে বসে অশ্রু বিসর্জন দেব?
আবৃতির কাটকাট গলায় ঐক্য থতমত খেল। আমতা আমতা করে বললো,
— না না আমি সেটা বলতে চাইনি। আপনি ভুল বুঝছেন মিস…?
— আবৃতি খন্দকার।
ঐক্য আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসই পেলনা৷ এই মেয়ে কার রাগ কার উপর ঝাড়ছে? আশ্চর্য! আবৃতিকে নরম মনের মেয়ে ভেবে ভুল করার জন্য নিজেকে কষে একটা গালি দিল। এই মেয়ে মাল্টিপল পার্সোনালিটি বহন করে। ঐক্য আপনমনে ড্রাইভ করতে লাগলো। কৌতুহল হলেও আবৃতিকে আর কোন প্রকার প্রশ্ন করার সাহস পেলনা৷ ঐক্য হাঁসফাঁস করে উঠে। ওর হঠাৎ অদ্ভুত এক অদম্য কৌতুহল হচ্ছে পাশে থাকা স্বল্প পরিচিতা কঠোর ব্যাক্তিত্ব সম্পূর্ণা নারীটিকে জানবার। যে নারী নিজের প্রাক্তনের সামনেও নিজের ব্যাক্তিত্বে তিল পরিমাণ নড়চড় আনতে দেয়নি। ঐক্য যে কয়দিন আবৃতিকে লক্ষ্য করে এটা বুঝেছে আবৃতি একজন ফাইটার। যে নিজের সন্তানকে পরম মায়া মমতায় আগলে রাখে। ঐক্য অবাক হয় একজন সন্তানের জন্য তার মমতাময়ী মায়ের টান। আচ্ছা তার সন্তানটার জননী কেন তবে এত নিষ্ঠুর? কেন সে সামান্য ক্যারিয়ারের তরে নিজের মাতৃত্বকে পায়ে পিষে দিয়ে চলে গেল? কেন সে আবৃতির মতো মা হতে পারলোনা? কেন?
— আপনার মনে অনেক কিউরিসিটি হচ্ছে তাইনা মিষ্টার ঐক্য? হওয়াটাই স্বাভাবিক। শত ধ্রুব আপনার ম্যানেজার। ওকে আপনি আগে থেকেই চিনেন। বরঞ্চ কৌতুহল না আসাটাই অস্বাভাবিক।
— না না আসলে বিষয়টা তেমন না। আপনার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর কোন অধিকার আমি রাখিনা। কিন্তু আজ নিজের প্রাক্তনের সামনে আপনার অটল স্বাভাবিক রুপ আমাকে সত্যিই বিস্মিত করেছে৷
আবৃতি হাসলো। বললো,
— আপনি কি মনে করেছিলেন আমি ধ্রুবর সামনে ভেঙ্গে পড়ব ? কেঁদে ফেলব? আচ্ছা আপনারা একজন নারীকে কেন এত নরম ভাবেন বলুনতো?
— না মানে ….
— আমি স্বেচ্ছায় ধ্রুবকে ছেড়েছি। আমি স্বজ্ঞানে তাকে তার স্বাধীনতা উপহার দিয়েছি। আর আমি আবৃতি। যে নিজের অতীতকে অতীতেই রাখছে পছন্দ করে।বর্তমান নষ্ট করে অতীতের বিষাদে ডুবে থাকার মতো নরম মেয়ে অন্তত আমি না।
— আপনি ধ্রুবর প্রথম স্ত্রী?
— জি৷
*
— ভাইয়া?
গভীর ভাবনায় বিভোর ঐক্যকে খানিক ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে ঐশী৷ ঐক্য যেন বাস্তবে ছিটকে পড়ে। তেমনি ভাবে বললো,
–হুম। কিছু বলবি?
— তুমি এখনো ঘুমাওনি?
ঐক্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায়৷ রাত প্রায় তখন দুইটা৷ ঐশীর প্রায় রাত পড়াশোনা শেষ করে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দেড়টা দুইটা বেজে যায়৷ কিন্তু আজ কেন জানি ঘুমই আসছিলনা৷ তাইতো গুটি গুটি পায়ে ওয়াফাকে দেখতে এসেছিল৷ কিন্তু ওয়াফার রুমের বারান্দায় যে ঐক্যকে পেয়ে যাবে ভাবতে পারেনি৷
— কি? বললেনা তুমি এখনো জেগে আছ কেন?আর এখানে বসে বসে কি ভাবছো এত?
— না কিছু ভাবছি না৷ ওয়াফাকে ঘুম পাড়িয়ে এসে বসেছি। ঘুম আসছে না কেন জানি৷ তুই যা না ঘুমিয়ে পড়৷ এমনিতেই নিত্যদিনের ওয়ার্ড, ক্লাসে তুই হাঁপিয়ে যাস।
ঐশী ঐক্যর পাশের দোলনায় দপাস করে বসে যায়। ওর বসার সাথে সাথে দোলনাটা দুদিকে দোল খেয়ে উঠে৷ ঐশী ঐক্যর কাঁধে মাথা রেখে উদাস গলায় বলে,
–আমারও ঘুম আসছে না। চলো আজ দুজনে গল্প করি।
— এর রাতে গল্প?
–তুমি কেমন হয়ে গিয়েছ ভাইয়া। মনে আছে আগে এমন মাঝরাতে আম্মু-আব্বু,তুমি আমি কত আড্ডা দিতাম ছাদে? তুমি তো এখন আমাদের সময়ই দিতে চাওনা৷
ঐক্য মৌন রইল। আসলেই ঐশীর কথাটা ঠিক। আগের ঐক্যর সাথে এই ঐক্যর আসলেই এখন আর মিল খুঁজে পাওয়া যায়না৷ ঐক্য নিজেই যেন নিজেকে চিনতে পারেনা এখন। মনে হয় সে কোন উদ্দেশ্যহীন নাবিক। ঠিকানাহীনভাবে জীবন সাগরে ভেসে চলেছে গন্তব্যহীন। যার জীবনের কোন নির্দিষ্ট তীর নেই৷ অতীতের একটা ধাক্কা ওকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে যে এখনো উঠে দাঁড়াতেই পারছেনা। নাকি সে নিজেই চেষ্টা করছেনা উঠে দাড়ানোর? আচ্ছা আজ যখন নিজের প্রাক্তনের গর্ভবতী দ্বিতীয় স্ত্রীকে দেখেছিল তখন আবৃতির কেমন অনুভব হয়েছিল?
ঐক্যর হৃৎস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি পায়। ঐক্যর অস্থিরতা অনুভব করে ঐশী উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠে,
— ভাইয়া তোমাকে ডিস্টার্ব দেখাচ্ছে৷
— ঐশী আমার না কেমন যেন লাগছে। আচ্ছা তুই এটা বল আজ ধ্রুবকে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে দেখে আরশানের মায়ের কি খারাপ লাগেনি?
ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— একটা নিরন্তর সত্য কথা কি জানো ভাইয়া? নারীরা যেমন জীবন দিয়ে ভালবাসতে পারে, তেমনভাবে জীবন দিয়ে ঘৃণাও করতে পারে!
— মানে?
— মানে দাড়ায় এটাই। যে তোমার ভালবাসার যোগ্যই না তাকে মনে করে দুঃখ পাওয়া মানে নিজের ভালবাসার অবমূল্যায়ন করা। যেটা আবৃতি আপু করেনি।
ঐক্য নিশ্চুপ। ঐশী তার দিকে তাকায়। অস্ফুট সুরে বলে,
— কিন্তু ভাইয়া তুমি! তুমি নিজের জীবনটাকে এখনো তিনবছর পেছনে ফেলে এসেছ৷ অথচ আবৃতি আপুকে দেখ কিভাবে এই ভাঙ্গনেও নিজেকে পর্বতের মতো অটল রেখেছে। তার কাছ থেকেও তো কিছু শিখতে পার তুমি৷
ঐক্য থমকে গেল। মনে পড়লো ধ্রুবর সামনে আবৃতির স্নিগ্ধ স্বাভাবিক মুখশ্রী৷ আচ্ছা সে পারবে মাহিরাকে ফেইস করতে?পারবে সামনাসামনি কখনো দেখা হলে এরূপ স্বাভাবিক থাকতে? ঐক্যর দম বন্ধ লাগে। মাহিরার কথা মনে পড়লেই ওর অস্থিরতা শুরু হয়। যে মেয়েটাকে ও জীবনের চাইতেও বেশি ভালবাসলো সেই মেয়েটার প্রতারণা আজও ওকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হয়। ঐক্য ঢোক গিলে বিরবির করে বলে,
— তার মান…
— মানে হচ্ছে তুমি কখনো মাহিরাকে ভুলে নিজের জীবনে এগোতেই চাওনি।
ঐক্য চকিতে তাকালো। এলোমেলো স্বরে বললো,
— কি বলতে চাস তুই?
— এটাই যে তুমি গত তিনটা বছর ধরে নিজের অতীত আঁকড়ে বেঁচে আছ৷ কখনো মুভ অন করতেই চাওনি। কিন্তু আবৃতি আপু! জানো সে নিজে আমাকে জানিয়েছে জীবন যদি তাকে দ্বিতীয় সূচনার সুযোগ করে দেয়, তাহলে সে সেই সূচনাটাকে সানন্দে গ্রহণ করবে।
ঐক্য স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। আবৃতি নামক নারীটির প্রতি মুগ্ধতায় ওর মনটা ভরে উঠে। ঠিকই তো বলেছে ঐশী ওর আদতেই আবৃতিকে অনুসরণ করা উচিত। ঐক্য উঠে দাঁড়াল। ঘরে ফিরে বিছানায় এলোমেলো ভাবে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন নিজের মূল্যবান নিষ্পাপ অংশটির দিকে তাকায়৷ যে অংশটার পরিপূর্ণ লালন-পালনে সে বরাবরই ব্যর্থ৷ অবশ্য এটা কেউ তাকে বলেনি। এই সোসাইটি, আশপাশের মানুষ তাকে বাহবা দেয় এখন অবধি দ্বিতীয় বিয়ে না করে মেয়ের খেয়াল রাখার জন্য। কিন্তু আদতে কি সে নিজের মেয়ের পরিপূর্ণ খেয়াল রাখতে পারছে? ঐক্য জানে সে যতই ওয়াফার জন্য সবকিছু হাজির রাখুক। ওর মায়ের অভাব দুনিয়ার কোন বিকল্পে সে পূরণ করতে পারবেনা৷ যদি পারতোই তাহলে তার মেয়েটা ইনিয়ে বিনিয়ে কথায় কথায় আবৃতির প্রসঙ্গে বলতোনা৷ আচ্ছা সে কি ভুল করছে? জীবনের এই পর্যায়ে মুভ অন করা উচিত নয় কি? আর কত ওই জঘণ্য অতীতটা আঁকড়ে ধরে ও ধুঁকে ধুঁকে মরবে?
ঐশী নিজেও ভাইয়ের পিছনে পিছনে ঘরে ডুকলো। ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে নরম সুরে বললো,
— ভাইয়া ঠিক আছ তুমি?
— আমার ভীষণ অস্থির লাগছে।
— কিন্তু কেন?
–জানিনা কেন? কিন্তু জীবনটাকে আরেকবার সুযোগ দিতে বড্ড মন টানছে রে।
ঐশী চমকে উঠে । সে কি সঠিক শুনলো। তার ভাইটা অবশেষে নিজ থেকে জীবনে এগোতে চাইছে?
ঐশীর ঠোঁটজোড়া প্রশস্ত হাসিতে মেতে উঠে। ওর মনের পরিকল্পনাকে তার ভাই অবচেতন মনে সহজ করে দিয়েছে। এখন শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা। ঐশী আনমনে বিড়বিড়ায়,
— শীঘ্রই তোমার জীবনে দ্বিতীয় সূচনা হতে চলেছে ভাইয়া।
★
অন্ধকারচ্ছন্ন কক্ষটিতে শুনশান নিরবতা৷ মধ্যরাতে শেষভাগে ঘরের সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে। শুধু ঘুম নেই আবৃতির চোখে। নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির প্রিয় জিনিস তার আরামকেদারারায় চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দুলছে আবৃতি। আজ আর হাজার চেষ্টাতেও ঘুম নামবেনা দু’চোখে। তাইতো এখানে বসে আছে ঘন্টার পর ঘন্টা। হঠাৎ ওর বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা উত্তপ্ত জল গড়িয়ে ওড়লো মেঝেতে। অতীতের কিছু দগদগে ঘা আজ আবার নতুন করে তাজা হলো ইরা আর ধ্রুবকে দেখে। ওর মনে পড়লো সেই অভিশপ্ত দিন…..
অনেকক্ষণ ধরে সেন্টার টেবিলের উপর থাকা আবৃতির ফোনটা নিরলস বেজে চলেছে। তরকারীতে ব্যস্ত হাতে ঝোলের পানি দিয়ে আবৃতি ছুটলো ফোনটা তুলতে।
ফোনে সম্পূর্ণ অচেনা একটা নাম্বার দেখে আবৃতি ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করলো।
– হ্যালো কে বলছেন?
ওপাশে নিঃশব্দ বিরাজমান। আবৃতি তিতিবিরক্ত কন্ঠে বললো,
– আশ্চর্য ফোন করে কথা বলছেন না কেন?
ওপাশে একটি চিকন নারী কন্ঠ আওয়াজ ভেসে আসে৷
– আবৃতি আমি ইরা বলছি৷ চিনতে পেরেছ নিশ্চয়ই?
আবৃতির পিলে চমকে উঠে। ইরা নামক নারীটির অস্তিত্ব নিজের জীবনের বাঁকে বাঁকে অনুভব করলেও কখনো নারীটির কন্ঠ কিংবা তাকে স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়ে উঠেনি। চাইলে হয়তো সম্ভব হতো নারীটিকে একনজর চাক্ষুস অবলোকন করার। কিন্তু কেন যেন আবৃতির নারীটির প্রতি এক অদ্ভুত বিতৃষ্ণায় ইচ্ছেই জাগেনি তাকে সামনাসামনি দেখার। হয়তো নিজের স্বামীর প্রাক্তন বলে। আবৃতি স্বাভাবিক কন্ঠেই জিজ্ঞেস করে,
– হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। কোন প্রয়োজনে কল করা হয়েছে?
– প্রয়োজনেই বৈকি। নয়তো কেউ নিজের প্রাক্তন প্রেমিকের স্ত্রীকে কল করবেনা নিশ্চয়ই?
– সেটা আপনিই ভাল জানেন মিস ইরা। যেহেতু কলটা আপনার পক্ষ থেকেই।
– তোমার কথাগুলো খুবই স্পষ্ট আবৃতি। এজন্য হয়তো ধ্রুবর এত পরিবর্তন ।
– যা বলতে চাইছেন স্পষ্ট বললে খুশি হব।
– আমার তোমার সাথে কিছু প্রয়োজনীয় কথা আছে আবৃতি।
আবৃতি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
– কি কথা।
– খুবই প্রয়োজনীয়। যেটা ধ্রুবর স্ত্রী হিসেবে সবার আগে তোমার জানা উচিত।
আবৃতি কৌতুহল জাগলো। কি এমন কথা বলতে ফোন দিয়েছে ইরা? মনে মনে একটু ভীত হলেও আবৃতি বিপরীত পক্ষকে তা বুঝতে দিলনা। অস্ফুটস্বরে বললো,
– হ্যাঁ বলুন। কি বলতে চান।
– এখানে না। তুমি কাইন্ডলি আমার সাথে মিট করতে পারবে?
আবৃতি অবাক হলো। কি এমন কথা যে ইরা সরাসরি দেখা করার কথা বলছে।ওপাশ থেকে ইরার অনুরোধ,
– আবৃতি প্লিজ আমার তোমার সাথে মিট করা খুব প্রয়োজন।
– আচ্ছা ঠিক আছে৷ কখন দেখা করতে হবে?
– থ্যাংকস আ লট আবৃতি। আমি বিকেল তিনটায় তোমার এরিয়ায় সানরাইজ ক্যাফেতে অপেক্ষা করব৷ প্লিজ এসো।
এই বলে ইরা ফোন কেটে দেয়। কান থেকে ফোন নামিয়ে আবৃতি নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে থাকে। কি এমন কথা বলতে চায় তার স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকা? আবৃতির হাসফাস লাগা শুরু হয়। কপালের ঘাম মুছে কিচেনের দিকে এগোয়। পানি খাওয়ার জন্য গ্লাস টা নিতে গেলে হাত ফসকে গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে কয়েক টুকরো হয়ে যায়। আবৃতি একদৃষ্টিতে সেই ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর পানে চেয়ে থাকে।
চলবে…..