গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২০)

পর্বঃ২০

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[ এডাল্ট কনটেন্ট অ্যালার্ট।⛔]

বিছনায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে ইরা৷ থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর নগ্ন পিঠ৷ বুকে কম্পোটার আঁকড়ে ঢেকে রেখেছে ওর নিরাবরণ দেহখানি। দিনের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। জানালার সবগুলো পর্দা এখনো টেনে দেওয়া। যার দরুন রুমটা এখনো অন্ধকারচ্ছন্ন।

একটি নিষিদ্ধ অনৈতিক অভিসার পূরণ শেষে দুটি অপবিত্র দেহ শেষরাতে ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজেছিল একে অপরকে আষ্টে পিষ্ঠে জড়িয়ে। ভোরের আলো তাদের রাতের ভ্রম আর লিপ্সা মুহুর্তেই গায়েব করে দিয়ে বাস্তব দুনিয়ায় টেনে আনে।
মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে মূর্তির মতো বসে আছে ধ্রুব। উদাম ক্লান্ত পরিশ্রান্ত বদনে স্তব্ধ হয়ে বসে সে। বিধ্বস্ত চেহারায় কোন নড়চড় নেই।  বাকি দিন দুনিয়ার যেন ওর কোন হুশই নেই আপাতত। উদাম ফর্সা পিঠে নখর আঁচড়ে হিজিবিজি অবস্থা। এই চিহ্ন গুলো কাল রাতের তাদের নিষিদ্ধ কার্যালাপের সাক্ষী হয়ে ধ্রুবর পিঠে অঙ্কিত হয়ে আছে।অজানা আতঙ্কে ধ্রুব বুকটা হাঁপড়ের মতো উঠানামা করছে। এদিকে ইরার নিরন্তর কান্না যেন ওর বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। হতাশায় মাথার চুলগুলো খামচে ধরে হঠাৎ রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠে। ডান হাতটা মুঠো পাকিয়ে মেঝেতে কয়েকটা ঘুষি মারে,

— শিট শিট। এ আমি কি করে ফেললাম।

ইরা কান্না ভুলে হতবাক চোখে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে আছে। ধ্রুব মেঝে থেকে উঠে দাড়িয়ে ফোসফোস করছে। হাতের আঙ্গুলগুলো ছেঁচে রক্ত বের হয়ে গিয়েছে। অকস্মাৎ  সামনে থাকা কৃত্রিম ফ্লাওয়ার ভাসটায় কষে একটা লাঠি মারলো। ইরা আঁতকে উঠে বিছানার হেডরেস্টে সিঁটিয়ে যায়। ধ্রুবর এমন প্রতিক্রিয়া ওকে আশাহত করেছে এটা ওর ভীত চেহারা দেখলেই ঠাহর সম্ভব। প্রকম্পিত গলায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলে,

— ধ্রু..ব তু.. মি এমন করছো কেন?

ধ্রুব লাল চোখে পিছনে ফেরে। ওর হিংস্র চেহারা আর রাগান্বিত চোখ দেখে ইরা আঁতকে উঠে ফুঁপিয়ে উঠে। ধ্রুবর পিলে চমকে উঠে। ইরার ঘাড় গলায় অজস্র কামড়ের দাগ দেখে ধ্রুবর পা ভেঙ্গে আসে। কোনমতে পা দুটো টেনে এনে ইরার সামনে বসে। কাঁপা গলায় কোনমতে বললো,

— আ’ম স্যরি ইরা। আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দাও।

ইরা অশ্রুসিক্ত গলায় বললো,

— এবার কি হবে ধ্রুব? আমার কি হবে? আবৃতি যদি জানত…

— নাহ!

ইরা কান্না থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়৷ ধ্রুব আবার দাড়িয়ে ঘরময় পায়চারী করতে থাকে। অপ্রকৃতস্থের মতো বিড়বিড় করে,

— না না আ..বৃতি আবৃতি কিছুতেই যাতে না জানতে পারে। ও আমাকে তাহলে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবেনা। আমি ওকে হারিয়ে ফেলব সারাজীবনের জন্য ।

ধ্রুব ফিসফিস করে কি বললো তা ইরার কানে গেলনা। ও সতর্ক চোখে চেয়ে আছে ধ্রুবর পানে। বুকটা ধড়ফড় করছে ধ্রুবর ক্ষীপ্ত আচরণে। ধ্রুব যে এভাবে রিয়েক্ট করে বসবে সেটা তো ইরা কল্পনাতেও ভাবেনি। তাহলে এবার কি হবে? ধ্রুব কি ওকে আগলে নেবে না? তাহলে কি লাভ হলো নিজের সতিত্বের বিসর্জনে?

– আই নিড টু গো।

ধ্রুব বিড়বিড়ায়। চারদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কিছু খোঁজে। কক্ষে থাকা কাউচের সামনে নিজের গতরাতের শার্টটা পড়ে থাকতে দেখে। ব্যস্ত হাতে শার্টটা পরে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে যেতে নেয়। ইরা হতভম্ব পায়ে কম্পোটার পেঁচিয়ে ধ্রুবকে পেছন থেকে জাপটে ধরে। বিহ্বল ধ্রুবর পা থমকে যায়। ইরা আহাজারি করে বললো,

— ধ্রুব তুমি এভাবে যেতে পারনা আমাকে একা ছেড়ে। সবসময় আমার সাথে এভাবে অন্যায় করে পার পেয়ে যেতে তুমি পারনা৷ এতদিন মুখ বুজে আমি সহ্য করে ছিলাম। কিন্তু কালকে রাতের পর থেকে আর সম্ভবপর নয় আমার পক্ষে। তোমাকে আমাকে এবার গ্রহণ করতেই হবে।

বলতে বলতে ইরার হেঁচকি উঠে যায় ধ্রুব বিস্ময়কর দৃষ্টিতে পেছনে ফিরে ইরাকে দেখে৷ একটা ঢোক গিলে গলারস্বর খাদে নামিয়ে বড্ড কসরত করে দুটো শব্দ বের করলো,

— মা…নে?

ইরা দুহাতে চোখের পানি মুছে৷ হঠাৎ করেই কান্না বিজড়িত মুখটা শক্ত হয়ে যায়। ব্যগ্র কন্ঠে দাঁত চেপে বললো,

— ইউ হ্যাভ টু এক্সেপ্ট মি ধ্রুব।

ধ্রুব পায়ের জোর হারিয়ে ফেলে। ধপ করে পাশে থাকা কাউচে বসে পড়ে। ইরা খেয়াল করে ধ্রুবর বাম লাল হয়ে থাকা চোখটা বেয়ে একফোঁটা গরম জল চিবুক গড়িয়ে বুকে মিলিয়ে গিয়েছে।

বর্তমান…….

কলিং বেলের কর্কশ আওয়াজে ইরা ধড়ফড়িয়ে উঠে।এই শীতেও ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মৃদু হাঁপাতে হাঁপাতে ঘড়িতে তাকায় ইরা। রাত তখন প্রায় তিনটা। বাসার সবাই গভীর ঘুমে থাকলেও রাত থেকে ইরা দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। হঠাৎ করেই যেন ওকে এক প্রবল অপরাধবোধ ঝেঁকে ধরেছে। নিজের ঘৃণ্য কৃতকর্মের কথা আজকাল হরহামেশাই মনে পড়ে যায়। ডাক্তার বলেছে ওর প্রেগন্যান্সিতে রিস্ক আছে৷ প্রেগন্যান্সি হাইপারটেনশনে ভোগার কারণে ওর গর্ভের বাচ্চার উপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
বিকেলে ইরাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ধ্রুব যে নিরুদ্দেশ হলো তার আর কোন খবর নেই। ইরা শতবার ফোনে ট্রাই করেছে। কিন্তু প্রতিবারেই একটা যান্ত্রিক কন্ঠে ফোন নট রিচেবল জানিয়েছে। ইরা ভারী পেট আঁকড়ে উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়াতেই পেটে খানিকটা খিচ মেরে উঠে। ব্যাথায় হালকা আর্তনাদ করে উঠে। তবুও অন্তরের তাড়নায় বাহিরের ব্যাথাকে ততটা প্রাধান্য দিলনা। বেড থেকে ওরনাটা গায়ে জড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে ছুটলো দরজা খুলতে। নিশ্চয়ই ধ্রুব ফিরেছে। ড্রয়িংরুমের আসতেই ইরার পা জোড়া থেমে যায়। সোনিয়া ততক্ষণে দরজা খুলে দিয়েছে। ধ্রুব ধীর পায়ে বাসায় ঢোকে। উষ্কখুষ্ক চুল, শার্টের উপরের বাটন কয়েকটা খোলা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা।
সর্বদা পরিপাটি, টিপটপ ভাবে চলা ধ্রুবর এই অগোছালো রূপ ইরার নিকট কেন জানি বড্ড পীড়াদায়ক ঠেকলো। ওর বুকে চিনচিনে ব্যথা জাগলো। সোনিয়া কিছু বললোনা। কেমন সহানুভূতির দৃষ্টিতে ধ্রুবর দিকে চেয়ে নরম সুরে বললো,

— ভাইয়া ডিনার করেছেন? খাবার দেব?

— না খিদে নেই।

যন্ত্রের মতো বললো ধ্রুব। তারপর টালমাতাল পায়ে রুমের দিকে হাঁটা দিল। সোনিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা আটকে পেছন ঘুরে অবাক হলো। ইরা দাড়িয়ে আছে লিভিং রুমের কোণায়। গর্ভবতী ইরাকে এত রাতে জাগ্রত দেখেও কিছু বললোনা ধ্রুব। ভারী পা ঠেলে রুমে ঢুকে গেল। ইরার চোখ ছলছল করে উঠলো। ও আজ সারা রাত না খেয়ে আছে। ধ্রুবর চিন্তায় ওর গলা দিয়ে খাবার নামতোনা। ভেবেছিল ধ্রুব ফিরলে ওর হাতে খাবার জন্য বায়না করবে। কিন্তু ধ্রুবর যেন কোন চিন্তাই নেই ইরাকে নিয়ে। মানসিক অশান্তি, প্রেগ্ন্যাসি হাইপারটেনশন,এক্লাম্পসিয়া সহ নানা জটিল শারীরিক ও মানসিক রোগে ভোগা ইরাকে আরো দূর্বল করে দিল ধ্রুবর এহেন নির্লিপ্ততা। ও টলটলে চোখে ধ্রুবর গমন পানে চেয়ে রইলো। কান্না গিলে নিজেও হাঁটা ধরতে নিলেও থেমে যেতে হলো সোনিয়ার প্রশ্নে,

— ভাবি খাবার খেয়েনিন।

ইরা চকিতে তাকায়৷ সোনিয়া অস্ফুটস্বরে বললো,

— সারারাত না খেয়ে থাকলে আপনার বাচ্চার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আজ যাই হোক গর্ভে থাকা ওই প্রাণটা তো নিষ্পাপ। তাহলে সে কেন শাস্তি পাবে বলুন?

ইরার আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। হঠাৎ করেই ওর সারা শরীর টা কাঁপতে লাগলো। সোনিয়া এগিয়ে এসে ইরাকে জোর করে টেনে নিয়ে চেয়ারে বসালো। ফ্রিজ থেকে ঢাকনা দেওয়া খাবার গুলো বের করে ওভেনে গরম করে থালায় বেড়ে নিল। সাথে নিল একটু লেবুর আচার। যাতে খেতে গেলে বমি না পায়। প্লেটটা নিয়ে ইরার সামনে চেয়ার টেনে বসে। ভাতে নলা পাকিয়ে লোকমা বাড়িয়ে ধরে ইরার মুখে,

— নিন হা করুন৷

ইরার টলটলে চোখের জোয়ার যেন ভাঙ্গলো। ও ফুঁপিয়ে উঠে সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরে। সোনিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইরার পিঠে হাত রেখে বললো,

— ধৈর্য ধরুন ভাবি। নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষনা চান। একটি নারীর অভিশাপ যে ভয়ংকর, খুব ভয়ংকর!

সময়টা বিকেল তিনটার কাঁটা ছুঁলেও গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদের তেজে মনে হচ্ছে মধ্যদুপুর। আবৃতি শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে একটা রিকশা ডাকলো। রিকশায় চড়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিন অন করতেই ইরার মেসেজ ভেসে ওঠে।

— আমি অপেক্ষা করছি আবৃতি। তুমি কি আসবে?

আবৃতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কি-বোর্ডে আঙ্গুল চালিয়ে লিখে,

–আসছি

মেসেজটা পাঠিয়ে আবৃতি থম মেরে রইলো। কি বলতে চায় ইরা? যার জন্য আবৃতির সাথে দেখা করতে চাইছে। যদিও আবৃতি সম্পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই যাচ্ছে ইরার মোকাবেলা করার। কিন্তু তবুও মনের অবাঞ্চিত শঙ্কা কিছুতেই দূর করতে পারছেনা। মনের অস্থিরতা দূর করতে ফোনটা ওপেন করে। আনলক করতেই ওয়ালে ভেসে ওঠে একটু চক্ষু শীতল করা দৃশ্য৷ ধ্রুবর বুকের ওপর হুডির ভেতর পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে দুইবছরের ছোট্ট আরশান৷ ফোলা গালগুলো ধ্রুবের বুকে দাবিয়ে রেখেছে। বাবা ছেলে তখন ছিল গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। দেখতে মাত্রারিক্ত কিউট লাগায় আবৃতি ধ্রুবর অগোচরে ছবিটা নিয়েছিল৷ সেই থেকে ছবিটা আবৃতির ফোনের ওয়াল পেপারে স্থায়িত্ব অর্জন করেছে।
আবৃতি আনমনে হাসে। সকল দুঃশ্চিন্তা আর শঙ্কা যেন মুহুর্তেই উবে যায়৷ ছবিটিতে বৃদ্ধাঙ্গুলি বুলিয়ে আদর করে দেয়। হয়তো ধ্রুব ওকে মন থেকে ভালবাসে না। কিন্তু ধ্রুব ওকে ওর জীবনের শ্রেষ্ঠতম উপহারটি দিয়েছে। যাকে ছাড়া আবৃতি একটা নিঃশ্বাসও নিতে পারবেনা৷ এই ছোট্ট প্রাণটার মুখের দিকে তাকিয়ে ও মানিয়ে গিয়েছে ভালবাসাহীন একটা সম্পর্কে। থাক না নাইবা ভালবাসলো ধ্রুব ওকে।

এই শহরের অলি গলি খুঁজলে কত শত যুগল পাওয়া যাবে। যারা ভালবাসাহীন একটা দাম্পত্য জীবন বয়ে চলেছে বছরের পর বছর। আবৃতিও না হয় তাদের একজন হয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেবে তার কলিজার টুকরা আরশানের তরে!

–আপা আইয়া পড়ছি।

আবৃতি ভ্রম ভাঙ্গে। ঢোক গিলে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে রাস্তা পার হয়। ওপাশে সানরাইজ ক্যাফে। যেখানে অপেক্ষারত তার স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকা। উঁহু প্রাক্তন ভালবাসার প্রেমিকা!

ক্যাফেতে ঢুকে চারদিকে তাকায় আবৃতি। হঠাৎ চোখ পড়ে দূরের টেবিলে একটা মেয়ে ওকে হাত নেড়ে ইশারা করছে। আবৃতি ধীর পায়ে সেই টেবিলটার নিকট এগিয়ে যায়। হঠাৎ উপলব্ধি করে ওর পা জোড়া টেনে নেওয়ার জোর পাচ্ছেনা। টেবিলের কাছাকাছি আসলে ইরা উঠে দাড়ালো। আবৃতি আপাদমস্তক ইরাকে দেখলো। ছবিতে একবার দেখলেও এত বছরে কখনো সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি আবৃতির৷

একটা মেরুন রঙা লং ফ্রক আর গ্যাবার্ডিন পরনে। ঈষৎ কোঁকড়ানো চুলগুলো একটা ক্লাচারে আটকানো। শ্যামলা গাত্র হলেও চেহারায় একটা আলাদা মায়া বিরাজমান! বাহিরের জৌলুশও ইরার চোখের নিচে কালো দাগ আর মলিনতা ঢাকতে পারলোনা। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে কোন অসুখে ভুগছে৷ ইরাকে দেখার একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল আবৃতির মধ্যে । ভাগ্যের কল্যানে আজ দেখেও নিল।

— কেমন আছো আবৃতি?

আবৃতি চোখ নামিয়ে হেসে বললো,

— ভালো। আপনি?

— আমিও ভাল আছি। দাড়িয়ে আছ কেন প্লিজ সিট৷

আবৃতি ইতস্তত ভঙ্গিতে চেয়ার টেনে বসলো। ওর ভীষণ অদ্ভুত লাগছে। নিজের স্বামীর প্রাক্তনের সামনে বসে তার সাথে কথা বলা এরকম অদ্ভুত ঘটনা বোধকরি আবৃতির সাথেই ঘটলো।

— কফি অর্ডার করব তোমার জন্য?

— না ধন্যবাদ। আসলে আরশানকে ওর দাদির কাছে রেখে এসেছি। আমার জলদি ফিরতে হবে। আপনি প্লিজ যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলুন।

— তুমি আগের থেকেও সুন্দর হয়ে গিয়েছ আবৃতি৷

আবৃতি অবাক চোখ জোড়া তুলে ইরাকে দেখলো। ইরা হাসিমুখে তাকিয়ে আছে৷ সিরিয়াস মুহুর্তে এমন অপ্রাসঙ্গিক কথায় অবাক হওয়াটাই নরমাল। আর তাছাড়া ইরার কথা শুনে মনে হচ্ছে ও আবৃতিকে আগেও দেখেছে। আবৃতি বিস্ময়কর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

— আপনি আমাকে আগে কখনো দেখেছেন?

ইরার ঠোঁট প্রসারিত হলো অমায়িক হাসিতে।

— হ্যাঁ তোমার আর ধ্রুবর বিয়েতে দেখেছিলাম সামনাসামনি।

আবৃতি যেন অবাক হতেই ভুলে গেল। এ কেমন নারী যে কিনা নিজের প্রাক্তনের বিয়েতেও উপস্থিত ছিল! কিভাবে পেরেছে এই নারী। ইরা মনে মনে মজা পেল আবৃতির অবাক মুখশ্রী পরখ করে। ও আড়চোখে আবৃতিকে দেখলো। একটা কলাপাতা রঙা তাঁতের শাড়ি পরনে। রঙা যেন ওর হলুদ ফর্সা গায়ের রঙে ফুটে আছে। লম্বা চুলে একটা বিনুনি করা। কৃত্রিম কোন সাজগোজের উপস্থিতি নেই লাবন্যময়ী মুখটাতে। যেন  কিচেন থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। কপালে আর ঠোঁটের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা৷ এই অকৃত্রিম সৌন্দর্য অজান্তেই ইরা মুগ্ধ হলো। মনে মনে ভাবলো এই জন্যই কি ধ্রুবর এই পতন?

– কি হলো আপনি কিছু বলবেন বলেছিলেন?

– ওহ হ্যাঁ। স্যরি আবৃতি আমি আসলে অসুস্থ তো। তাই মন মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।

– কি হয়েছে আপনার?

আবৃতি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো। ইরা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলো,

– ধ্রুব আর আমার সম্পর্কে সেই ইন্টার থেকে। ভাবতে পারছ কত বছর পুরনো এই সম্পর্ক। আমাদের দু’জনের রিলেশনের কথা ওর আমার পরিবার সহ পুরো ভার্সিটি জানতো। জানতোনা শুধুমাত্র ধ্রুবর বাবা। তিনি প্রেম ভালবাসায় ছিলেন চরম অনাগ্রহী। যার ফলে ধ্রুব ওনার থেকে লুকিয়ে গিয়েছিল আমাদের সম্পর্কের কথা। ধ্রুব ভেবে রেখেছিল একটা মোটামুটি জব হলে আন্টিকে দিয়ে অফিশিয়ালি প্রস্তাব পাঠাবেন। যাতে ধ্রুবর বাবা মনে করেন আমাকে আন্টি পারিবারিক ভাবেই পছন্দ করেছেন।
ইভেন সবাই তো নিশ্চিত ছিল ধ্রুবর বৌ আমিই হবো। জানো আমি কতবার আন্টির হাতের খাবার খেয়েছি ওর বাসায় গিয়ে৷ তুমি যেই রুমে এখন থাক ওই রুমটিতে কোথায় কি থাকবে এমন কতশত পরিকল্পনা করতাম আমি ও বাড়ি গেলে ।

আবৃতি হতবাক হয়ে বসে রইলো। ওর এখনো বুঝে আসছেনা ইরা ওকে হঠাৎ এসব কেন বলছে। ও তো জানেই ধ্রুব আর ইরা একে অপরকে পাগলের মতো ভালবাসতো। যার জন্য ধ্রুব এতো বছরেও তাকে আপন করতে পারেনি  ৷ কিন্তু এসব শুনে এখন আবৃতির কি লাভ?

ইরা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলা শুরু করলো,

– একদিন আমি খবর পেলাম আঙ্কেল নাকি ধ্রুবর বিয়ে ঠিক করেছেন হঠাৎ৷ তাও নিজের অতি প্রিয় বাল্যকালের বন্ধুর মেয়ের  সাথে। আমি আঁতকে উঠলাম। ধ্রুবও সব ভয়ডর ভুলে আঙ্কেলকে জানালো আমাদের কথা। বললো আমরা একে অপরের ছাড়া বাঁচবনা।আঙ্কেল কি করলেন তখন জানো বললেন তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নিজের মৃত বন্ধুর কাছে। কিছুতেই সেই প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙতে পারবেন না।

– তারপর আপনার মহা প্রেমিক বাবার কথায় আমাকে বিয়ে করে নিল তাইতো?

আবৃতির কাটকাট জবার। ইরা খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। আবৃতির ওই উজ্জ্বল চোখে কেন জানি চোখ মেলাতে পারলোনা। মেঝেতে এলোমেলো চোখের ক্ষীণ স্বরে পাতা ফেলে বললো,

– ওকে বাধ্য করা হয়েছিল।

আবৃতি আনমনে হাসলো। এই মেয়েটাকে ওর কেন জানি বড় বোকা মনে হলো। বয়সে ওর এত বড় হয়েও আবৃতির মনে হলো ইরার মিনিমাম বুঝ টুকুও নেই। হয়তো জীবনে এখনো রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন হয়নি তাই। ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

– এসব আপনার গুরুত্বপূর্ণ কথা?

ইরা  কি বলবে ভেবে পেলনা। ওকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে আবৃতি তিতিবিরক্ত হয়ে উঠে দড়াল। এখানে বসে বসে নিজের স্বামীর প্রেমকাহিনী শোনার কোন বিশেষ প্রয়োজন দেখছেনাও। নিজের ব্যাগটা নিয়ে হুট করে উঠে দাড়ায়৷

– স্যরি মিস ইরা। আমার ছেলেটা একা বাসায়। আমাকে ফিরতে হবে। আজ আসি৷ প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।

এই বলে আবৃতি ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা ধরে। কিন্তু পেছন থেকে ইরার কন্ঠে যেন বজ্রপাত ঘটে। যাতে বাধ্য হয়ে থেমে যেতে হয় আবৃতির চলন্ত পা যুগলকে।

– আমি ধ্রুবর সন্তানের মা হতে চলেছি আবৃতি।

চলমান…..

শব্দসংখ্যা ২০০০+
(চোখ দুটো আজ শেষ ইয়া আল্লাহ। একটানা ছয়ঘন্টা লিখেছি …..😵‍💫 অতীত শেষ এখানেই। সবাই প্লিজ রিয়েক্ট আর মন্তব্য করবেন । হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। 😘)
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x