গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩৬)

পর্বঃ৩৬[দ্বিতীয় প্রারম্ভ❤️]

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

 

[সবাই প্লিজ শেয়ার করে দেবেন পাঠক।🙂]

— কেঁদোনা বাবা৷ হয়েছে হয়েছে আর কাঁদেনা।

কাঁদতে কাঁদতে আরশানের চোখ মুখের দশা বেহাল। পুরো আদুরে শুভ্র মুখশ্রী ফুলে গিয়েছে কান্নার তোড়ে। ঐক্য বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। নরম হাতে বাচ্চাটার চোখের পানি মুছে মোলায়েম স্বরে বলে।
আরশান ঐক্যকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলে,

— পা…পা পাপাকে আল্লাহ কেন নিয়ে গিয়েছে আঙ্কেল? আমার পাপা নেই, পাপা…

ঐক্যের চোখজোড়া ছলছল করে উঠে৷ বাচ্চাটার করুণ কান্না ওর হৃদয়ে প্রবলভাবে আঘাত হানছে। ঐক্য শক্ত করে আরশানকে নিজের বুকে আগলে নেয়। কান্নার দমকে বাচ্চাটার ছোট্টো শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঐক্যের সহ্য হয়না বাচ্চাটার কান্না৷ ওকে বুক থেকে তুলে পরম মমতায় অশ্রুসিক্ত লালচে কোমল মুখটা নিজের খসখসে হাতের আজলায় নিয়ে কোমল গলায় বলে,

— একদিন আমরা সবাই আল্লাহর কাছে চলে যাব বাবা। কেউ আগে আর কেউ পরে৷

— আমি পাপা কাকে ডাকব আঙ্কেল?

বাচ্চাটা কান্নাসিক্ত সরল কন্ঠে শুধাল। ঐক্য এক মুহুর্তের থমকে গেল। বুকটা হু হু করে উঠলো আরশানের শিশুসুলভ সরল প্রশ্নটায়। হঠাৎ করে কোন কিছু না ভেবেই ঐক্য রূদ্ধ গলায় বলে উঠে,

— আমাকে!

আরশান নিমিষে কান্না থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল৷ নিষ্পাপ জলচাপা চোখে ঐক্যের পানে অবাক দৃষ্টি মেলে সরল গলায় জানতে চায়,

— তোমাকে কিভাবে পাপা ডাকব আঙ্কেল? তুমি তো আমার পাপা নও৷

ঐক্যের বুকটা কাঁপছে সমানতালে। ও কি বলে ফেলেছে জানেনা, জানতে চায়ওনা। ওর মন, মস্তিষ্কে কেবল কিলবিল করছে এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে ওর চাই,সম্পূর্ণ নিজের করে চাই৷ একটা শুষ্ক ঢোক গিলে ঐক্য আকু্ল স্বরে বলে,

— আমি যদি কোনভাবে তোমার পাপা হয়ে যাই, তুমি আমাকে পাপা বলে ডাকবে বাবা? বলো?

আরশানের কান্না থেমে গিয়েছে এতক্ষণে। চূড়ান্ত বিস্ময় লুটোপুটি খাচ্ছে ওর জল টলমল চোখদুটিতে। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা হয়তো জানেনা পিতার সংজ্ঞা কি? জানেনা সম্পর্কের কঠিন মারপ্যাচ। বাচ্চাটা কেবল অনুভব করতে পারে হৃদয়ের টান, স্বেহের বন্ধন। ঐক্যের কথাটায় ওর শিশুসুলভ কোমল মনে এক আশ্চর্য স্নেহের পরশ টের পাচ্ছিল। আর সেই অমোঘ টান থেকেই আরশান চোখ পিটপিট করে ঐক্যের ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আধো স্বরে আস্তে করে বললো,

— ডাকব।

ঐক্যের রক্ত ছলাৎ করে উঠে। তীব্র অনুভূতির জোয়ার আছড়ে পঠলো হৃদয়ে। নিম্ন অধর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে উপচে আসা আবেগ সামলাতে। তড়িৎ বাচ্চাটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয় স্বস্নেহে।
আশ্চর্যজনকভাবে ধ্রুবর মৃত্যুতে ওর কোন কষ্ট অনুভব হচ্ছেনা। ধ্রুব কখনোই আবৃতির স্বামী আর আরশানের পিতা হওয়ার যোগ্য ছিলনা। যে পুরুষ নিজ স্ত্রী-সন্তানের পরিপূর্ণ হক আদায় করতে পারেনা, সে পুরুষ নামেরই কলঙ্ক। প্রকৃত পুরুষ জীবনের সার্থকতা কেবল একজন বিশ্বস্ত স্বামী এবং দায়িত্ববান পিতা হওয়ার মধ্যেই নিহিত। যা ধ্রুব বেঁচে থাকতে নিজের জীবনে হতে পারেনি৷ কিন্তু ঐক্য অবশ্যই আরশানের একজন বেস্ট বাবা হয়ে দেখাবে, আবৃতি নামক এক ভালবাসার কাঙালিনীর ভরসা হবে, আগলে লাগবে ওদের সারাজীবন।

— ঐক্য সাহেব?

আবৃতি পিছু থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে ডেকে উঠে।

— মা?

জাহানারা রাতের রান্না চড়িয়েছেন সবে। এই সময় আবৃতির ডাকে তিনি না ফিরেই ব্যস্ত কন্ঠে প্রত্যিত্তোর করলেন,

— হ্যাঁ মা বল।

— আমি বিয়েতে রাজি।

জাহানারার ব্যস্ত হাত থেমে গেল সাথে সাথে। হতবাক নেত্রে তিনি নিজের মেয়ের পানে চাইলেন। আবৃতির ভাবভঙ্গি অটল, স্বাভাবিক। চোখের দৃষ্টিতে নেই কোন দ্বিধার প্রলেপ। জাহানারা অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। নিজের মনের অস্থিরতা আড়াল করে স্মিত হেসে শুধালেন,

— এটা তো খুব ভালো খবর মা৷ আমি এখনই বেয়াইনকে কল করছি। ইশ আপা খুব খুশি হবে। জানিস
আজ সকালেও কল করে জিজ্ঞেস করছিল তুই ইতিবাচক কিছু জানিয়েছিস কিনা? আমার ফোনটা কোথায় মা দেখতো। কাজের সময় আমি কিছুই খুঁজে পাইনা৷

ভদ্রমহিলা প্রবল অস্থিরতা নিয়ে চারদিকে নিজের ফোনটা খুঁজছেন। আবৃতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্ষীণ কন্ঠে ডেকে উঠে,

— মা?

জাহানারা অবোধ চোখে তাকালেন। আবৃতি বোজা গলায় কেমন করে যেন শুধালো,

— এবার আমি সংসার করতে পারবোতো মা?

অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটায় হতবাক জাহানারা নিজেকে বাকশূণ্য আবিষ্কার করলেন। প্রবাল বিস্ময়ে ঠাঁসা চক্ষুতে ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের ভঙ্গুর আননে চেয়ে রইলেন। আবৃতির করা অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের জবাবে মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারলেন না একটা শব্দ।

আবৃতি কাতর গলায় বললো,

— আমার না খুব বুক কাঁপছে মা। দ্বিতীয়বার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে মনে শঙ্কা কাজ করছে। ছ’ছয়টা বছর আমি খেটে গিয়েছি মা, কিন্তু বিনিময়ে পাইনি একটা সংসার যেটা আমার প্রাপ্ত, আমার অধিকার ছিল। ওই তাসের সংসারে নিজের সর্বোচ্চ খুইয়ে আমার মধ্যে আর বিন্দুমাত্র সাহস, শক্তি বেঁচে নেই। এবার যদি আমি ভেঙ্গে যাই তাহলে আমি মরে যাব মা, একদম মরে যাব।

জাহানারার মাতৃমন মুচড়ে উঠে আবৃতির করুণ আহাজারিতে। এই মেয়েটাকে তারা বড় যত্ন করে বড় করেছেন, সকল দুঃখ-কষ্ট থেকে দূরে রেখেছেন। কিন্তু মাত্র একটা ভুল সিদ্ধান্ত তার নাজুক মেয়েটার উপর চাপিয়ে দিয়ে মেয়েটার জীবনটা তারা নিজ হাতে নষ্ট করেছেন। তার হাসিখুশি মেয়েটা দীর্ঘ ছয়টা বছর ধরে হাসতে ভুলে গেল, প্রাণ খুলে বাঁচতে ভুলে গেল। অতীতের বিষাদের সমুদ্রের অতলে তার মেয়েটা এখনো হাবুডুবু খাচ্ছে। মা হয়ে তার কলিজার টুকরার এই বিষন্ন মুখটা যে ওনাকে কতটা পোড়ায় উনি কাকে বোঝাবেন। জোবায়দা চৌধুরী যখন নিজ ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিলেন তখন তার মাতৃমন কতটা প্রশান্তি অনুভব করেছিলেন বোঝাতে পারবেন না। শুকরিয়া আদায় করেছিলেন রবের প্রতি। কিন্তু তবুও অতীতের আতঙ্কে তিনি সাহস করেননি মেয়ের অনুমতি ছাড়া মত দিতে। জাহানারা চোখের জমে উঠা অশ্রুগুলো মুছে নিলেন। এগিয়ে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

— মা যে নিজেই জীবনে চরমভাবে ঠকে গিয়েছে, সে জানে ঠকানোর যন্ত্রণা কতটুকু। তার কাছে অন্তত তুই কোনদিন ঠকবিনা মা।

আবৃতির ভাঙ্গাচোরা চেহারায় খানিক আশার ক্ষীণ আলো দেখা যায়। কেঁপে ওঠে নাকের পাটা। জাহানার বুকে আঁচড়ে পড়ে ধরা গলায় বলে,

— আমি শুধু একটা সংসার চাই মা। আমার নিজের সংসার! যেই সংসারে থাকবে কেবল আমার একচ্ছত্র অধিকার! যেই সংসারের মানুষগুলো শুধু আমার থাকবে, শুধু আমার।

নতুন দিনের প্রারম্ভে আবৃতি জীবনে সাহস করে বাড়ানো দ্বিতীয় কদমটা যেন দিনটিকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। সকাল থেকেই আজ আবৃতিদের বাড়িতে মানুষজনের কোলাহল মুখর পরিবেশ বিরাজমান। আবৃতির চাচারা, দুই ফুফু সবাই সকাল সকালই আবৃতিদের বাসায় চলে এসেছে। জাহানারা কাল রাতেই কল করে সবাইকে আসতে বলে দিয়েছেন। এত ব্যস্ততার বিশেষ কারণ আছে বৈকি। গতকাল আবৃতির মত জানার পর জাহানারা কালবিলম্ব না করেই জোবায়দা চৌধুরীকে কল করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। জোবায়দা চৌধুরী খবরটা শুনেই আর দেরী করতে চাইলেন না। বললেন আজ ওনার গুটিকয়েক নিকটাত্মীয়দের নিয়ে আবৃতিকে আংটি পরিয়ে যাবেন। তারপর দুই পরিবার আজকের বৈঠকেই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করবেন।

সূর্যের মৃদু আলোর ছটায় আজকের সকালটা যেন অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি চলোকিত চারদিকে সাজ সাজ, রব রব পরিবেশ। আরশান আগত অতিথিদের সাথে আসা বাচ্চাদের সাথে সারা ঘরময় ছোটাছুটি করছে। বাচ্চাটা জানেনা আজ তার মায়ের সাথে সাথে তারও জীবনের নতুন সূচনা হতে চলেছে।
আবৃতি নিজের রুমে চুপচাপ বসে ছিল। পাশে ওর কিছু কাজিন বোন আর ভাবি বসে হাসিঠাট্টা করছে। আবৃতির সেদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। সকাল থেকেই ওর মনটা একটা অবর্ণনীয় বিষন্নতায় মুড়ে আছে। কেমন চিনচিনে এক ব্যাথায় ভার হয়ে আছে বুক। কারণটা হয়তো জানা, আবার কিছুটা অজানা। আবৃতির অবস্থায় কেউ না পড়লে হয়তো এই অনুভুতি কেউ কোনদিন বুঝতে পারবেনা৷ এই যে একবার এই সব রীতিনীতি পার করে এসে আবার আরেকবার নতুন করে এসবে জড়াতে হচ্ছে এসব কি আবৃতিকে খুব সুখ দিচ্ছে? নাতো, বরং বুকের পুরনো ক্ষতকে খুঁচিয়ে আরো
ঘা করছে। আবৃতির ভাবনার মাঝেই জাহানারা হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলেন। ভদ্রমহিলার পা দুটো সকাল থেকে এক মুহুর্তের জন্যও একটু স্থির হয়নি। আহানকে সাত সকালে বাজারে পাঠিয়ে একগাদা বাজার করিয়ে আনিয়েছেন। মেহমানদের দুপুরে না খাইয়ে ছাড়বেন না। তার উপর তার ছেলের বৌ প্রথম এই বাড়িতে আসবে। মেয়েটাকে নিজের হাতে না খাইয়ে কিভাবে ছাড়বেন। তিনি রুমে ঢুকেই আবৃতির ছোট ফুফুর মেয়েটাকে ডেকে উঠলেন,

— আফিফা?

— জি বড় মামি, বলো।

— মেয়েটাকে একটু শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে দে না। দেখেছিস কিভাবে মুখ শুকনো করে বসে আছে৷ হ্যাঁ রে মা একটু হাত মুখটা ধুয়ে নে।

আবৃতির ফুফু পেছন পেছন রুমে এসেছিলেন। জাহানারার কথায় তিনি সায় মিলিয়ে বললেন,

— মুখে একটু কি যেন মাখে? আফিফা?

— ফেইস প্যাক?

–ওহ হ্যাঁ ফেইস প্যাক। ওটা একটু মেখে নে। এমনিতেই আমার ভাতিজি দেখতে মাশাল্লাহ৷ তবুও আজকে দেখতে আসবে তোকে। আজ চেহারাখানা এমন মলিন হলে চলে?

আবৃতি ম্লান হেসে বললো,

— তোমরা এমনভাবে বলছো যেন আমাকে নতুন দেখতে আসছে। এটা ফর্মাল একটা দেখাশোনা ফুফু। এত রংচঙের কিছুই নেই এখানে।

পুরো কক্ষে পিন পতন নীরবতা নেমে আসলো। উপস্থিত সবার মুখ থমথমে আকার ধারণ করল। আবৃতির কথাগুলো কি বিষাদ মাখা! আবৃতি সবার মুখ দেখে মলিন হাসল। ও জানে সবাই খুব স্বাভাবিক আচরণ করছে কারণ আহান সকালে সবাইকে পইপই করে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে আবৃতিকে যেন সবাই সাহস দেয়, ও যেন সবার উপস্থিতিতে কম্পোর্ট ফিল করে।

.

— পাপা আমাকে সুন্দর লাগছে তো?

অতি মনোযোগ সহকারে দক্ষ হাতে মেয়ের হেয়ারস্টাইল করতে থাকা ঐক্য আয়নায় চোখ তুলে তাকাল। ওয়াফা ডাগর ডাগর আঁখি মেলে পিটপিট করে আয়নায় উৎসুক চাহনিতে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়। ঐক্যের ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটে উঠে। মেয়ের আদুরে গালটা টেনে কোমল স্বরে বললো,

— মাশাল্লাহ! আমার আম্মাজানকে একদম পরীর মতো দেখতে লাগছে। কারো নজর না লাগুক।

ওয়াফা খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,

— পাপা আমাকে নামাও, আমি পিপ্পি আর দিদুনকে দেখিয়ে আসি।

ঐক্যের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলে ঐক্য ওকে চেয়ার থেকে নামিয়ে দেয়। ওয়াফা পরনের লেহেঙ্গার দুই কোণা ধরে ছুটে গেল।

— আম্মাজান বি কেয়ারফুল। ড্রেসে পা আটকে পড়বে তুমি৷

কিন্তু কে শোনে কার কথা। ওয়াফা ততক্ষণে রুম থেকে পগারপার। ঐক্য মৃদু হেসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে আংটির বক্সটা হাতে নিল। বক্সটা খুলতেই জ্বলজ্বল করে উঠে হিরের আংটিটা। ঐক্য মুচকি হেসে বুক ভরে শ্বাস টেনে বিরবির করে বললো,

— আমি আসছি আবৃতি। আপনাকে আমার করে নিতে আসছি। জীবনে দ্বিতীয় সূচনালগ্ন যে এতটা প্রশান্তিদায়ক হতে পারে তা আমার জানা ছিলনা!

দু’প্রান্তে দুজন ভাঙ্গাচোরা হৃদয়ের মানুষ জীবনে দ্বিতীয় সূচনা লগ্নের দ্বারপ্রান্তে। একজনের হৃদয়ে আশার ক্ষীণ আলো পুষছে, তো আরেকজনের হৃদয় অতীতের আতঙ্কে জর্জরিত!
.
.
.
— এই কি আবৃতি? তুই এখনো তৈরী হোস নি? ঐশী কল করেছে একটু আগে। ঐক্য ভাইয়ারা অন দ্য ওয়ে।

রুমে ঢুকতে ঢুকতে আহান কপাল কুঁচকে বললো। আবৃতি তাকিয়ে দেখে আহান ঘামে জুবুথুবু হয়ে আছে। খুব খাটছে ছেলেটা। জাহানারা ছেলেকে দেখে এগিয়ে এলেন। নিজের আঁচলের কাছা টেনে ছেলের ঘামে সিক্ত লাল মুখটা মুছিয়ে দিয়ে বললো,

— কত ঘেমে গিয়েছিস বাবা। ননির মিষ্টিটা পেয়েছিস?

আহান পরিশ্রান্ত গলায় বললো,

— হ্যাঁ পেয়েছি। কিচেনে রেখেছি। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন সে এখনো মটকা মেরে বসে আছে কেন আজিব?

— এই তো বলছিলাম শাড়ি পরে নিতে।

আহান বললো,

— আফিফা আবৃতিকে তৈরী করিয়ে দে। এভাবে সবাই বসে আছিস কেন সবাই?

— আমি পারব একা তৈরী হয়ে নিতে তোমরা যাও সবাই।

জাহানারা ছেলের দিকে অসহায় নেত্রে চাইলেন। আহান চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে সবাইকে বললো,

— তোমরা সবাই আসো। ও নিজেই তৈরী হয়ে নেবে।

ঘরের সবাই বের হয়ে গেলে আবৃতি দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দেয়। তারপর আলমারিটা খুলে ভাজ করে রাখা শাড়ি গুলোর দিকে তাকায়। এতগুলো শাড়ি, কিন্তু আবৃতি একটা শাড়িও নির্বাচন করতে পারেনা। ওর মনে অদ্ভুত দ্বিধা, মনে হচ্ছে আজকের উপলক্ষের সাথে ও সব রঙের শাড়ি পরতে পারবেনা। ওকে ভীষণ চুজ করে শাড়ির রঙ নির্বাচন করতে হবে। পাছে মানুষ মনে মনে ওকে নিন্দে করে,

— দেখ দেখ দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে, কিন্তু মনে কত রঙঢঙ।

অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবৃতির নজর হঠাৎ একটা ভাজ করে রাখা সাদা শাড়ির দিকে গেল। শাড়িটা অনেক বছর পুরনো। সাদা রঙ সাধারণত এই ধরণের অনুষ্ঠানের সাথে মানানসই রঙ না।  কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো এই সাদা শাড়িটাই ওকে মানাবে। এই সাদা রঙটাই আশ্চর্যজনকভাবে ওর জীবনের সাথে মিলে গিয়েছে। শাড়িটা পরে নিয়ে আয়নায় নিজের অবয়বের পানে তাকাল আবৃতি। কি মনে করে হালকা একটু কাজল টানলো চোখে। নিজের হলদে ফর্সা ফ্যাকাশে মুখটায় চেয়ে ভাবে ও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এই নতুন সূচনাটাকে আঁকড়ে ধরে জীবনে এগিয়ে যেতে। কিন্তু অতীতের বিভীষিকা যে বড় ভয়ংকর! আবৃতি কাউকে ওর অন্তঃদহন দেখাতে পারছেনা৷ বোঝাতে পারছেনা ওর একটা অযৌক্তিক চাপা কষ্টে ওর মন আঙিন মুষড়ে আছে।। এই কষ্টের কোন যথাযথ ব্যাখ্যা আবৃতির কাছে নেই। ও পারবে তো আবার নতুন করে আরেকবার এই সংসার নামক সমরাঙ্গনে নিজেকে উজাড় করে দিতে? পারবে ঐক্য আর ওয়াফা নামক নতুন দায়িত্বের ভার সামলাতে?

— সুইটি আন্টি, সুইটি আন্টি দরজা খোল। দেখ আমি আর পাপা এসেছি। দরজাটা খোলনা। ও সুইটি আন্টি?

আবৃতি সচকিত হয়ে দরজার দিকে তাকায়। ওয়াফা ওর ছোট্ট হাতে ক্রমাগত দরজা চাপড়াচ্ছে। আবৃতি দ্রুত পায়ে দরজাটা খুলে দেয়। অবাক চোখে দেখে দরজার সামনে একটা ছোট্ট পরী দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। আবৃতি আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখে ছোট্টো পুতুলটার গায়ে একটা টকটকে লাল লেহেঙ্গা। যদিও লেহেঙ্গাটা ওয়াফার সাইজ অনুযায়ী একটু বড় হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘসময় বাদে আবৃতির ঠোঁট কোণে আলতো হাসির রেখা ফুটে উঠে। ওয়াফার সামনে পা মুড়িয়ে বসে বাচ্চাটার দু’গালে হাত রেখে আদুরে স্বরে বলে,

–মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। কত্ত মিষ্টি দেখাচ্ছে ওয়াফা সোনাকে।

ওয়াফার চোখ চকচক করে উঠে। আবৃতিকে আরো ভাল করে দেখাতে পরনের লেহেঙ্গা দু কোণা তুলে গোলগোল ঘুরিয়ে দেখায়। আবৃতি শব্দ করে হেসে দেয়। হঠাৎ করে অনুভব করে সকাল থেকে যে চাপা কষ্টে বুক ভার হয়ে ছিল, এখন তা হালকা লাগছে। জাহানারা হন্তদন্ত হয়ে রুমে আসলেন। এসেছিলেন আবৃতিকে ডাকতে। মেয়েকে আগাগোড়া দেখে ওনার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। মেয়েকে আগলে কোমল স্বরে বললেন,

— আয় মা। তোকে ডাকছেন ওনারা।

আবৃতি ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে। ওয়াফা আবৃতির ডান হাতটা আঁকড়ে ধরে মুচকি হেসে তাকায়। আরশান কোত্থেকে দৌঁড়ে এসে আবৃতির আরেকটা হাত আঁকড়ে বললো,

— চলো চলো মাম্মাম। পাপা ওয়েট করে আছে।

ঐক্য সোফায় বসে ঘামছিল অস্থিরতায়। টাইয়ের নটটা হালকা ঢিলে করে দিয়ে নড়েচড়ে বসে। ঐশী আড়ষ্ট হয়ে পাশে বসে আছে। বিয়ের আগেই শশুরবাড়ির দর্শন পেয়ে বেচারী লজ্জায় লাল হয়ে বসে আছে। আবৃতির চাচী,ফুফু,কাজিনরা সবাই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে ওদের। একই বাড়িতে দুটো ছেলেমেয়ের বিয়ে এর আগে কস্মিনকালেও দেখেননি ওনারা। আবৃতির কাজিন ভাইয়ের বৌ তার জায়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

— আবৃতি আপুর ভাগ্য দেখেছ? আগের স্বামীটাও সব দিক থেকে পার্ফেক্ট ছিল আর এবারের স্বামীটাও।

— হুম। শুনেছি অঢেল টাকাপয়সার মালিক এই ছেলেটা। দেখতেও বেশ হ্যান্ডসাম। লাক ভাল মেয়েটার বলতে হবে।

বসার ঘরে গুটিগুটি তিন জোড়া পায়ের ছন্দপতনের শব্দে নতমস্তকে চুপচাপ বসে থাকা ঐক্য চোখ তুলে তাকাল। দেখলো সাদা শাড়ি পরনে মাথায় ঘোমটা চেপে আবৃতি ধীর কদমে ওয়াফা,আরশানের হাত ধরে এগিয়ে আসছে। ঢোক গিলে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল। আবৃতিকে দেখে জোবায়দা চৌধুরী ত্রস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। ওকে আগলে ধরে একদম ঐক্যের পাশে বসালেন। আহান এগিয়ে এসে ঐশীর পাশে বসলো। ঐশী সলজ্জে মুচকি হাসে। জোবায়দা চৌধুরী স্মিত হেসে বললেন,

— শোন যা বলার খোলামেলা ভাবেই দুজনকে বলছি। একটা সম্পর্কে মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। ভালবাসার বলে অনেকে সম্পর্কে জড়ালেও বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে হওয়ার কারণে সেই ভালবাসার সম্পর্ক একদিন ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়। তাই চেষ্টা করবে একজন আরেকজনের প্রতি বিশ্বাসটা অটুট রাখতে। মনে থাকবে?

ঐক্য আবৃতি ওনার কথা মাথা নাড়াল। জোবায়দা চৌধুরী ক্ষীণ হেসে বললেন,

— ঐক্য, আবৃতিকে মাকে আংটি পরিয়ে দাও।

ঐশী বক্স থেকে আংটিটা তুলে ঐক্যের হাতে দেয়। ঐক্য আংটিটা হাতে নিয়ে আবৃতির হাত চায়। এই প্রথম আবৃতি চোখ তুলে সরাসরি ঐক্যের চোখে তাকায়। ঐক্য মুচকি হাসে বিপরীতে। ইশারায় বোঝায় হাত দিতে। আবৃতি একটা শুষ্ক ঢোক গিলে ঐক্যের পাশে হাসিমুখে বসে থাকা আরশানের দিকে চায়। আরশান বড় বড় চোখে এদিকেই তাকিয়ে আছে। আবৃতি ছেলেকে দেখে নিয়ে নিজের কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে দেয় ঐক্যের দিকে। ঐক্য সামান্য হেসে আবৃতির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে অন্য হাতে আংটিটা পরিয়ে দেয়। আবৃতি নিজের সরু আঙুলে চকচকে পাথরের আংটিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ওর নেত্রযুগল ঝাপসা হয়ে উঠে।

চলমান…..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x