— “আম্মু, কবুল বলো…”
নিজের বাবার কণ্ঠ শুনে কেঁপে উঠল সৌদামিনী। বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল তার। চারপাশে কাজি, আত্মীয়স্বজন আর অপরিচিত পুরুষদের ভিড় দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল ভয়ে।
হঠাৎই চোখ গিয়ে থামল এক মানুষের মুখে।
রতন।
তার মায়ের ফুফাতো ভাই। সম্পর্কে মামা।
রতনকে দেখামাত্র সৌদামিনীর মুখ সাদা হয়ে গেল। চোখে আতঙ্ক জমে উঠল মুহূর্তেই। পরের সেকেন্ডেই সে তীব্র চিৎকার দিয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
চারদিকে হইচই পড়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না।
প্রিমা নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে দাঁত চেপে রইল। কেন যে মেয়েটা এমন! ছয় বছর বয়সের পর থেকেই কোনো পুরুষ মানুষ দেখলেই ভয় পায়, চিৎকার করে, পালিয়ে যায়। কত ডাক্তার, কত কবিরাজ— কিছুতেই কিছু হয়নি। আজ নিজের বিয়ের দিনেও একই কাণ্ড!
এদিকে অনিরুদ্ধ এক মুহূর্তও দেরি করল না। বিয়ের আসর ছেড়ে দ্রুত ছুটল সৌদামিনীর পেছনে।
★★★
দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়েছিল সৌদামিনী। কিন্তু দরজা লাগানোরও শক্তি ছিল না তার। কাঁপতে কাঁপতে সে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল কাভার্ডের ভেতরে।
দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সৌদামীনি।
— “না… না… ও আসবে না… ও আসবে না…”
ভয়ে পুরো শরীর কাঁপছিল তার।
অনিরুদ্ধ রুমে ঢুকে চারপাশে তাকাল। পুরো ঘর খুঁজেও যখন পেল না, তখন হঠাৎ কাভার্ডের ভেতর থেকে চাপা কান্নার শব্দ কানে এলো।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কাভার্ড খুলতেই জমে গেল সে।
ভেতরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সৌদামিনী। চোখ-মুখ কান্নায় ভেজা। আতঙ্কে নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাঁপছে মেয়েটার।
অনিরুদ্ধকে দেখামাত্রই সৌদামিনী ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে উঠল।
— “না… না… কাছে আসবেন না…!”
চিৎকার করতে করতেই হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। চোখ দুটো উল্টে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।
অনিরুদ্ধ দ্রুত তাকে ধরে ফেলল। বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল তার।।
★★*
এই মেয়েটা শুধু ভয় পাচ্ছে না…ধীরে ধীরে চোখ খুলল সৌদামিনী। মাথাটা ভার লাগছে। চারপাশ ঝাপসা।
কিছুক্ষণ পর দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে দেখতে পেল সামনে কাজি সাহেব বসে আছেন। পাশে ইশিতা আর ইমতিহানও দাঁড়িয়ে। ঘরের পরিবেশটা অদ্ভুত নীরব।
কাজি গলা খাঁকারি দিয়ে নরম স্বরে বললেন—
— “সৌদামিনী হোসেন প্রিয়, আপনি কুমিল্লা নিবাসী ইশরাক ইমতিহানের একমাত্র ছেলে ইরফান ইমতিহান অনিরুদ্ধকে ১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১শ ১১ টাকা ১১ পয়সা দেনমোহর নির্ধারণ করিয়া এই বিবাহে সম্মতি থাকিলে বলুন— কবুল।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সৌদামিনী চুপচাপ বসে রইল। তার হাত কাঁপছে। চোখ নিচের দিকে। ঠোঁট নড়ছে না।
এক মিনিট…
দুই মিনিট…
সময় যেন থমকে গেল।
দশ মিনিট পার হয়ে গেলেও সৌদামিনীর মুখ থেকে একটা শব্দও বের হলো না।
ঘরের সবাই অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল।
ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়ানো অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখে কোনো রাগ নেই, বিরক্তি নেই। বরং অদ্ভুত কোমলতা।
সে সৌদামিনীর পাশে বসে আস্তে করে মাথায় হাত রাখল। আঙুল দিয়ে আলতো করে চুলে বিলি কাটতে কাটতে মৃদু হেসে বলল—
— “সই, কী হলো?”
সৌদামিনী ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
অনিরুদ্ধ আবার ফিসফিস করে বলল—
— “তুই না ছোটবেলায় বলতি, আমাকে নাকি তোর জামাই বানাবি?”
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সৌদামিনী। কাঁপতে থাকা চোখে তাকিয়ে রইল অনিরুদ্ধের দিকে।
শৈশবের ঝাপসা কিছু স্মৃতি যেন মাথার ভেতর ভেসে উঠল।
অনিরুদ্ধের হাতটা এখনও তার মাথার উপর। নিরাপদ… শান্ত… আশ্বাসের মতো।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর অবশেষে কাঁপা ঠোঁটে খুব আস্তে বলল সে—
— “ক… কবুল…”
কাজি সাহেব আবার বললেন—
— “আলহামদুলিল্লাহ।”
আর সেই মুহূর্তে অনিরুদ্ধ নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করল। যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে তার মানুষটাকে নিজের করে পেল।
★★*
বিয়ের ভারী লেহেঙ্গাটা খুলে ফেলতেই যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সৌদামিনী। এতক্ষণ ধরে ভারী গয়না আর পোশাকে নিজেকে বন্দি লাগছিল তার।
অনিরুদ্ধ নিজেই তার জন্য লাল রঙের একটা জামদানি শাড়ি পাঠিয়েছিল। খুব বেশি জমকালো না, কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর।
শাড়িটা পরে আয়নার সামনে বসে ছিল সৌদামিনী। হালকা সাজ। চোখে পাতলা কাজল, ঠোঁটে হালকা লাল আভা। মাথার উপর নরম করে টানা দোপাট্টা। গলায় ছোট্ট সোনার নেকলেস, কানে ছোট দুল আর কপালে একফোঁটা টিকলি।
আজ তাকে খুব শান্ত লাগছে।
অদ্ভুতভাবে সুন্দরও।
কিন্তু বুকের ভেতরটা হালকা ব্যথা করছিল।
আর কিছুক্ষণ পরই তাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই ঘর… এই দেয়াল… এই জানালা… সবকিছু ফেলে।
“বাবার বাড়ি” শব্দটার মাঝেও যে এত মায়া লুকিয়ে থাকে, আজ বুঝতে পারছে সে।
চোখের কোণে হালকা পানি জমতেই দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল সৌদামিনী। কাঁদতে চায় না সে। আজ না।
ঠিক তখনই দরজাটা হালকা শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকল রতন।
তার পাশে রতনের বোনের মেয়ে নিপা।
রতনকে দেখামাত্র সৌদামিনীর পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। মুখের রং ফ্যাকাসে হয়ে এলো মুহূর্তেই। নিঃশ্বাস আটকে আসতে লাগল।
সে কিছু বলতে চাইল… কিন্তু পারল না।
মনে হলো শব্দ করতেও ভুলে গেছে সে।
রতনের চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে সৌদামিনীর উপর। সেই দৃষ্টিটা আজও আগের মতোই ভয়ংকর লাগছে তার কাছে।
নিপা কিছু একটা বলছিল, কিন্তু সৌদামিনীর কানে কিছুই ঢুকছিল না। চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না সে।
নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সৌদামিনী।
তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে ছিল। যেন নিজেকে ভেঙে পড়া থেকে আটকানোর শেষ চেষ্টা করছে।
_________
রাত ১১টা ৪৩।
পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। নিচতলায় এখনও কয়েকজন আত্মীয়ের চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু দোতলার এই রুমটা যেন অন্য এক জগত।
বাসর ঘরটা খুব বেশি সাজানো নয়, তবুও অপূর্ব লাগছে। খাটের চারপাশে সাদা আর লাল ফুলের মালা ঝুলছে। গোলাপ আর রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধে পুরো ঘর ভরে আছে। হালকা হলুদ আলোয় দেয়ালগুলো নরম দেখাচ্ছে। জানালার পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে।
খাটের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে সৌদামিনী। লাল জামদানির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। মাথা নিচু। চোখদুটো ফাঁকা।
তার বুকের ভেতরটা অকারণে কাঁপছে।
ঠিক তখনই দরজাটা ধীরে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
অনিরুদ্ধ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।
শব্দটা কানে যেতেই আচমকা কেঁপে উঠল সৌদামিনী। যেন কোনো ভয়ংকর স্মৃতি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গেছে।
সৌদামীনি আতঙ্কে খাটের কোণে সরে গিয়ে কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠল—
— “আসবে না… আসবে না…!”
তার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। চোখে ভয় জমে আছে।
— “মিনি যাবে না… তুমি পচা… ব্যাড টাচ করবে না… আসবে না…!”
কথাগুলো এলোমেলো হয়ে বেরোচ্ছে। যেন ছোট্ট কোনো ভয় পাওয়া বাচ্চা কথা বলছে।
অনিরুদ্ধের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
এটা শুধু ভয় না।
এটা গভীর কোনো ক্ষত।
এগারো বছর আগে নিশ্চয়ই কিছু ভয়ংকর ঘটেছিল সৌদামিনীর সাথে। না হলে একটা মানুষ এমনভাবে ভেঙে পড়ে না।
অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। খুব সাবধানে। যেন একটু ভুল করলেই মেয়েটা আরও ভেঙে যাবে।
সে কোনো জোর করল না। শুধু ধীরে সৌদামিনীর সামনে বসে নরম গলায় বলল—
— “সই…”
সৌদামিনী কাঁপতে কাঁপতে তাকাল।
অনিরুদ্ধ আস্তে করে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। শক্ত না, খুব আলতো করে। যেন নিরাপত্তা দিচ্ছে।
— “সই, আমি তোর ইফান…”
সৌদামিনী বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
চেনা লাগছে… কিন্তু ভয়টা এখনও যাচ্ছে না। বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
অনিরুদ্ধ তার মাথায় হাত বুলিয়ে আবার বলল—
— “আমি আছি। কেউ তোকে খারাপভাবে ছুঁবে না।”
কথাটা শুনেই হঠাৎ সৌদামিনীর চোখ ভিজে উঠল।
অনিরুদ্ধ তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিল।
সেই মুহূর্তে বাসর ঘরে কোনো লজ্জা ছিল না, কোনো দাবি ছিল না।
ছিল শুধু এক ভাঙা মেয়েকে আগলে রাখার নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি।
মেয়েটার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কোনো অতীত ।
চলবে…..