গল্প:হৃদয় কপাটে দস্তক(০৩)

লেখিকা:তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

পর্ব:৩

 

 

নিশির মেসেজের মিনিট খানিকের মধ্যে রিপ্লাই এলো,

“নার্ভাস হওয়া স্বাভাবিক তবে আমি বলবো নার্ভাস কিংবা ভয় পাবেন না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আপনার থেকে সুপার ওমেন হওয়া আশা করছি না। আমি সাধারণ একটা সংসার চাই যেটা সাধারণ হলেও শান্তিতে পরিপূর্ণ থাকবে। দিনশেষে যেখানে গিয়ে প্রশান্তি মিলবে ভালো থাকবো।”

নিশি মেসেজটা পরে চুপ করে আছে। সেকেন্ডের মধ্যে আরও একটা মেসেজ এলো,

“আপনার আব্বু বলেছিল আপনি নাকি ছটফটে চঞ্চল। আমি এতদিন একা একাই থাকতাম তবে নিস্তব্দটা ভাঙার জন্য আপনার মতো চঞ্চল একজন সঙ্গীই দরকার। আপনার চঞ্চলতা সামলানোর দায়িত্বটা নাহয় আমার উপরই ছেড়ে দিন।
নিশি, পারফেক্ট হওয়া লাগবে না শুধু সকল পরিস্থিতিতে পাশে থাকা চাই এইটুকুই আমার চাওয়া। বাকিটা আমরা দুজন সামলে নিবো।”

নিশি কি বলবে বুঝতে পারছে না তবে এই কথাগুলো তার মনের কোটর ছুঁয়ে গেছে। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসির দেখা মিলেছে। বুকের ভেতর যে দলা পাকানো ভয়টা ছিলো সেটা কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।

“চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ”

মাঝে কেটে গিয়েছে আরও তিনদিন। এর মধ্যে সাজিদের সাথে কোনোরূপ কথা হয়নি দেখা হওয়া তো দূরের কথা। সাজিদকে সে দেখেছিল শুধু একবার যেদিন প্রথমবার নিশিকে দেখতে এসেছিল। সেদিন একবার শুধু এক পলক চোখ তুলে তাকিয়েছিল তারপর পর চোখ সরিয়ে ফেলেছিল। আগামী সপ্তাহ, সামনের শুক্রবার নিশি হয়ে যাবে এই ঘরের মেহমান, অন্য কারো বউ, অন্য পরিবারের অংশ।

বিকেলে নিশি শুয়ে শুয়ে ফোনে মুখ গুঁজে রেখেছে এর মধ্যে দরজা ঠেলে দৌঁড়ে ভেতরে আসে নিধি। নিধির প্রতিদিনকার স্বভাব এটা তাই সে পাত্তা না দিয়েই ফোন দেখতেই থাকলো। এদিকে নিধি এসে নিশির হাত টানতে থাকলো ফলে ফোনটা ধপ করে পড়লো নিশির নাকের উপর। সে নাক চেপে চিল্লিয়ে উঠলো,

– নিধি! কি করেছিস এটা? কত ব্যথা পেয়েছি জানিস!

নিধি পাত্তা না দিয়েই বললো,

– আরেহ আপু ওঠো! দেখো কে এসেছে!

নিশি বিরক্ত হয়ে বললো,

– কে এসেছে যে এমন করছিস? আমার হাল বেহাল করে কার আসার কথা জানাতে এসেছিস?

– তোমার জামাই থুক্কু হবু জামাই! আমার হবু দুলাভাই। মেজর সাজিদ মাহতাব।

শেষটা সাজিদের মতো গম্ভীর হয়ে কপি করে বললো সে। বলে নিজেই ফিক করে হেসে ফেললো। এদিকে নিশি থ হয়ে গেছে। সাজিদ এসেছে? হঠাৎ? সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। গলা নামিয়ে বললো,

– উনি এসেছেন তুই এটা এখন বলছিস? আমি চিল্লানোর পর? কি ভাববে উনি?

– কি আর ভাববে! ভাববে যে তার বউ হিসেবে কাকে নিয়ে যাচ্ছে তার একটু ট্রেলার দেখলো আরকি। সামনে ট্রেনিং নিয়ে নিতে পারবে।

নিশি চোখ গরম করে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না। বিছানা থেকে নেমে ওড়না ভালো করে মাথায় পেঁচিয়ে পা টিপে টিপে ঘরের দরজার পর্দার আড়াল থেকে উকি দিয়ে দেখলো। তার বাবা আর সাজিদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

সাজিদের বিনীত স্বর ভেসে আসলো,

– আসলে আঙ্কেল, কয়েকদিন ধরে ইউনিটে খুব ব্যস্ততা ছিলো। একটা নতুন মেস ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বও পড়েছে তাই একদম সময় বের করতে পারিনি। আমি একদিনও থাকতে পারিনি কোনও আয়োজনে কিছু মনে করবেন না।

আসাদুজ্জামান হেসে বললো,

– আরেহ না কি বলো! তুমি দেশের স্বার্থে কাজ করো আর আমরা বুঝবো না? তবে তুমি এসেছো এটাতে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।

এরপর সাজিদ আর নিশি বাবার মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলছে। নিশির মা ও উপস্থিত ছিলেন। নিশি বিছানায় বসতেই নিধি ফিসফিসিয়ে বললো,

– কিরে আপু বসছো কেন? চলো

– না! বসে থাক।

– তোমাকেই তো দেখতে এসেছে চলোওওও

নিশি দুম করে কিল বসিয়ে বললো,

– নিধি! আমি তোর বড় বোন! লজ্জা করে না এসব বলতে?

নিধি ব্যথায় উহ করে উঠল তারপর ব্যথার জায়গা ঘষতে ঘষতে বলল,

– উফ আপু একদমই লজ্জা না! মাত্র তিনবছরের বড় হয়ে এতটাও বড় নও হু!

এটা বলে ভৌ দৌঁড় দিয়ে বাবার সামনে। সাজিদ ওকে দেখে হেসে বললো,

– কেমন আছো? উমম… নিধি না তোমার নাম?

নিধিও হেসে উত্তর দিলো,

– জ্বি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

সাজিদ পকেট থেকে একটা বড় চকলেট বের করে নিধিকে দিয়ে বললো,

– নাও এটা তোমার জন্যই এনেছিলাম।

নিধি হাতে নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললো,

– থ্যাংক ইউ মেজর দুলাভাই।

“মেজর দুলাভাই” এটা শুনে সাজিদ এবং নিশির বাবা গোল গোল চোখে তাকালো। বাবা এবং সাজিদের চেহারা দেখে বোকা হেসে দ্রুত প্রস্থান করলো নিধি।

এদিকে নিশি রুমে বসে ছিলো নিশির মা এসে বললেন,

– কিরে বসে আছিস কেন?

– তো কি করবো আম্মু?

– কি করবি মানে? সাজিদ এসেছে যা দেখা করে আয়। ওকে ছাদে যেতে বলেছে তোর বাবা তুইও যা তোদের কথা হয়নি এর মধ্যে।

– আম্মু…

– আরেহ তোর বাবা ও যাবে। ছাদের একপাশে থাকবে।

[কোনো পুরুষ যেন কোনো বেগানা নারীর সাথে নির্জনে মিলিত না হয়, যদি না সেখানে নারীর কোনো মাহরাম (পিতা, ভাই বা নিকটাত্মীয়) থাকে।
(সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)]

মায়ের জোরাজোরিতে ছাদে গিয়ে নিশি দেখলো সাজিদ আর তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে রেলিং ঘেঁষে নিশিকে দেখে পাশে সামান্য দুরুত্বে গিয়ে বসলো তার বাবা। নিশি ধীরে সুস্থে এগিয়ে সাজিদের পেছনে ছোট্ট করে বললো,

– আসসালামু আলাইকুম।

সাজিদ নিশির গলা পেয়ে পেছন ফিরে হেসে বললো,

– ওয়াআলাইকুমুস সালাম। কেমন আছেন?

– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?

– আলহামদুলিল্লাহ।

নিশি হাতে একটা ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাজিদকে যে কাপটা এগিয়ে দিবে সেই শক্তিটুকু পাচ্ছে না। নিশির হাতে চা এবং এমন হাঁসফাস করতে দেখে সাজিদ নিজেই এগিয়ে চা হাতে নিলো। তারপর নিশি গিয়ে তার বাবাকে দিলো আবার ফিরে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনই নিশ্চুপ আর এই নিশ্চুপতাই অস্বস্থির সৃষ্টি করছে। সাজিদ চায়ে চুমুক দিয়ে নীরবতা ভেঙ্গে বললো,

– চা টা দারুণ হয়েছে। আপনি বানিয়েছেন?

– জ্বি।

– আপনি এমন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? টাইলস গুনছেন নাকি?

নিশি অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকালে দেখতে পেল সাজিদের দুষ্টমি মিশ্রিত মুখশ্রী। পরক্ষণেই এদিক ওদিক তাকিয়ে অস্থির দৃষ্টি ফেলছে। সাজিদ হেসে বললো,

– আপনি কি আমায় ভয় পাচ্ছেন বাই এনি চান্স? দেখেন আমি কিন্তু ভালো মানুষ! কিছুই করিনাই!

নিশি হেসে ফেলল এমন কথা শুনে। সাজিদও মৃদু হেসে বললো,

– যদি ভয় পান তাহলে বলব ভয় পাওয়ার কোনও দরকারই নেই। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন আমার প্রফেশনের দিক দিয়ে চিন্তা করে আমি হয়তো রাগী বা গম্ভীর কিন্তু আমি একদমই সেরকম নই বরং আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। আর চাই ও একটা সাদামাটা জীবন।

একটু থেমে শ্বাস নিয়ে আবার বললো,

– আপনি যেমন তেমনি থাকবেন। বিয়ে হচ্ছে মানে কেউ কাউকে পরিবর্তন করবে এমন না! বিয়ে মানে দুজন দুজনকে মানিয়ে নেওয়া। আমি আপনার স্বভাব, আচরণ সবটা, পুরো আপনিটাকে মানিয়ে নিবো আর আপনি আমাকে। পারবেন না?

নিশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সাজিদ আবার জিজ্ঞেস করলো,

– কি হলো বলেন? পারবেন না?

নিশি লাজুক হেসে হালকা মাথা নাড়লো। সাজিদও মুচকি হেসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

– আগামী পরশুদিন সাজিয়া বললো যে শপিংয়ে বেরোবে আমারও ছুটি আছে সেদিন তাই বলছিলাম আপনার কোনও সমস্যা নেই তো?

– উহু

– ঠিক আছে… আপনার আব্বুর পারমিশন লাগবে না? ওইটা আমি ম্যানেজ করছি আপনারা সকলেই যাবেন সাথে নিধিকেও!

নিশি মাথা নাড়লো।

– শুনেন আগামী শুক্রবার কিন্তু আসছি তখন কিন্তু চায়ে হবে না, গোটা ‘আপনি’ টাকেই পাকাপাকিভাবে নিয়ে যেতে আসবো। তবে তখন এমন ‘সাইলেন্ট মোড’ থাকলে হবে না।

নিশি হেসে ফেললো এই পর্যায়ে সাথে মাথা নড়ালো। সাজিদ পকেট থেকে আরেকটা চকলেট বের করে নিশির হাতে দিয়ে বললো,

– আপনার ভাগেরটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি নেন।

– না না। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি?

– চকলেট কি শুধু ছোট বাচ্চারা খায়?

– না তা না…

– নিন ধরুন তো!

জোর করে ধরিয়ে দিয়ে গলা উচিয়ে বললো,

– আঙ্কেল, আমি আসি আজকে। শীতও বাড়ছে আপনারাও ভেতরে চলে যান।

– রাতে খেয়ে যেতে বলেছিলাম বাবা।

– আরেকদিন খেয়ে যাবো আঙ্কেল আজ নয়।

– আচ্ছা আসো তাহলে। সাবধানে যেও।

নিশির দিকে তাকিয়ে সাজিদ নিচু গলায় বলল,

– আসছি।

নিশি মাথা নেড়ে বললো,

– হুম।

সাজিদ যাওয়ার সময় নিশি চোখ তুলে তাকিয়েছে মানুষটা উচ্চতায় অনেকটা বড়। শ্যামলা রঙের সুঠাম দেহের পুরুষের হাতের পেশিগুলো দৃশ্যমান। সবচেয়ে নজরকারা হলো সাজিদের চুলের কাটিং এবং ধারালো চোয়াল।
সাজিদ সামনে গিয়ে গেটের থেকে একবার পেছন ফিরে চাইলো আর তখনও নিশি তাকিয়ে ফলে দুজনের চোখাচোখি হলো। নিশি থতমত খেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। সাজিদ মৃদু হেসে পা চালালো।
এই মেয়েটা কি সারাজীবনই এমন লজ্জা পেয়ে যাবে?

 

চলবে…….

[কেমন লাগছে জানাবেন🫶🏻 যারা চুপি চুপি গল্প পড়েন তাদের বলব এমন গল্প পরে মজা আছে? যারা ফলো করেননি ফলো করে দিয়েন অনেকের কাছে পোস্ট যায় না তাই আপনারা সাহায্য করেন🙂]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x