লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
পর্ব — ৩
বাংলায় একটা বাগধারা আছে যাকে বলে ভয়ে অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হবার যোগাড়।
বাংলা পড়ার সময় শুধু মুখস্ত করেছিল রিমঝিম। আজ অবশ্য বাগধারার তাৎপর্য বুঝল। মূলত মানুষ যখন অতিরিক্ত ভয় পায় তখন সে নিজের ছায়ার প্রতিসরণ দেখলেও কেঁপে উঠে। ঠিক এমনই অবস্থা রিমঝিমের। সে এতটুকু জানে, নতুন শহরে এসে নিজেকে শত্রুর সামনে প্রকাশ করে ফেলেছে ।
এলাকার গুন্ডাদের নজরে পড়ে গিয়েছে। হুট করে ভীষণ আফসোস শুরু হল ওর। হয়তো সামনে ওর জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। কে জানে ওই গুন্ডা গুলো ওর পিছু ছেড়ে দেবে নাকি ঢাকা শহরে টিকে থাকাটা মুশকিল করে দেবে? রিমঝিম মাহিনের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। দোকান থেকে আবার বিরিয়ানি কেনার মত মনোবল নেই ওর।
ওদিকে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে ততক্ষণে। ওদের নতুন বাসার গলিতে আসার আগে পেরোতে হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি৷ মাগরিবের আজান দিয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে। লোকজন প্রায় সকলেই ছুটেছেন মসজিদ অভিমুখে। ফলাফল রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। নিজেকে যতই শান্ত করার চেষ্টা করুক রিমঝিম কিন্তু কোনোভাবেই অস্থিরতা দমন করতে পারছেনা।
অজানা ভয়ে বুকের কাছটা কেমন যেন খামচে রেখেছে। শ্বাস আটকে, জোর কদমে এগিয়েও গেল গলির অভিমুখে। অল্প সময়ের মধ্যে পেরিয়ে এলো জায়গা। আর পেরিয়ে আসতেই এতক্ষণের আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়ল রিমঝিম। বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল ওর। ওই মাস্তান গুলো পিছু নেবার হলে নিশ্চয় এই গলিতে ওত পেতে থাকত। তাহলে হয়তো রিমঝিমের অপমানে কাজ হয়েছে লোকটার।
যাক আজকের মত সে বেঁচে গিয়েছে। মাহিনকে কড়া গলায় বলেছে চাচার কাছে যেন কোনোভাবে আজকের ঘটনা ফাঁস না করে। অবশ্য মাহিন ওর ছোটাপুকে ভালোবাসে। সে মুখে কুলুপ এঁটে রাখবে এব্যাপারটাই নিশ্চিত রিমঝিম।
বধুয়া নীড়ে রিমঝিমদের জন্য বরাদ্দ বাসাটা চর্তুথ ফ্লোরে। বাকি তিনটা ফ্লোর জুড়ে থাকেন বাড়িওয়ালা। যিনি নাজিম সাহেবের ছোটবেলার বন্ধু। শুধুমাত্র বন্ধুত্বের খাতিরে বাসাটা ভাড়া দিয়েছেন। বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল রিমঝিম। ওর জন্য বরাদ্দ রুমের বারান্দায় গ্রিল নেই। কাঁচের পার্টিশান করা বারান্দা দেখে খুশিতে ঝুম ঝুম করে উঠল সে। শীতের দিন হলেও মৃদু বাতাস বইছে। চুলের গোছাটা খুলে দেয় রিমঝিম। বাতাসে উড়তে থাকে ওর নিতম্ব ছড়ানো সুন্দর চুল গুলো।
চুলের যত্নে রিমঝিম কখনো কার্পণ্য করেনা। রিমঝিম ওর চাচাকে বলে বারান্দায় একটা দোলনা টাঙানোর ব্যবস্থা করবে। বৃষ্টির দিনে সহজেই ভিজতে পারবে। বারান্দার রেলিঙের কাছে এসে চমকে গেল রিমঝিম। তিন তালায় অর্থাৎ ওর বারান্দার ঠিক নিচে একটা গার্ডেন এরিয়া। যেখানে খুব সুন্দর করে বাহারী রকমের ফুল গাছ দিয়ে সাজানো, একটা স্টিলের দোলনাও আছে।
আরেকপাশে কাঁচের দরজা দিয়ে ঘেরা জায়গা। ওখানটাই অবশ্য পর্দা দিয়ে ঘেরা। যার কারণে ভেতরের সাজসজ্জা দেখতে পেলোনা রিমঝিম৷ একটু আশাহত হল বুঝি সে? ঠিক আছে। একদিন গিয়ে দেখে আসবে না-হয়। আশেপাশে দেখতে দেখতে আচমকা রিমঝিমের নজর পড়ল ওদের বিল্ডিংয়ের নিচে। আর তখনই ধ্বক করে উঠল রিমঝিমের ছোট্ট বুকটা।
এটা সেই তখনকার মাস্তানদের লিডার ছেলেটা? যার গায়ে বোতল ছুঁড়ে দিয়েছিল! ছেলেটা এখানে কি করছে? একধ্যানে রিমঝিমের দিকেই চেয়ে আছে সে। ঠোঁটে জলন্ত সিগারেট। তখন যেই বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সেই বাইকে চড়ে বসে আছে।
আর দৃষ্টিটা অবশ্যই রিমঝিমের দিকে। সেই জ্বলজ্বলে তুখোড় দৃষ্টি৷ পরণে সাদা পাঞ্জাবি আর নীল জিন্স। তার উপর জড়িয়েছে চাদর। চোখে আবার কালো সানগ্লাস। মগার ঘরের মগা। এখন রোদ কোথায় যে ওইটা চোখে পরে আছে? দাড়ি-গোঁফ দেখে লাগে আধাপাগল।
কিন্তু ভাবসাব একদম রাজনীতিবিদদের মত ! হুহ্। মনে মনে একটা ভেংচি কাটল রিমঝিম। রাজনীতিবিদ না ছাই। এরা হচ্ছে পাতিনেতা। বড়বড় মন্ত্রীদের গাড়ির পেছনে হা করে দৌড়ায়। আর এলাকায় গুন্ডামি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস করে বেড়ায়। খুব চেনা আছে এসব উটকো চ্যালাপেলাদের। একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বারান্দা থেকে চলে এলো রিমঝিম। ঠাস করে বন্ধ করে দিল দরজাটা।বিড়বিড়িয়ে বলল,
— ' যতসব উজবুকের দল।'
--------
কয়েকদিন পর...
ধীরে ধীরে নিজেকে জাদুর ঢাকা শহরে মানিয়ে নিল রিমঝিম। সেদিনের পর আরও কয়েকবার বাইরে গেলেও ওই পাতিনেতাকে চোখে পড়েনি ওর। যাক উজবুকটা ওর পেছনে পড়ে যায়নি। এটা ওর জন্য খুবই সুখকর এবং সুসংবাদ। আজ সকালে নাজিম সাহেব অফিসের জন্য বেরিয়ে গিয়েছেন। মাহিনকে সঙ্গে নিয়েছেন তিনি। নতুন স্কুলে ছেলেকে পৌছে দিয়ে অফিস যাবেন। রিমঝিম চাচীর কাজে সাহায্য করছিল। সে-ও বেরোবে এক্ষুনি। শিরিন এলেন রান্নাঘর থেকে। তাড়া দিয়ে বললেন, — ' তুই এখনো এখানে বসে আছিস কেন? প্রথমদিনই দিনই দেরি করবি নাকি? যা জলদি বের হ। '
— ' এই তো চাচী। যাচ্ছি। ডাইনিং টেবিলটা একটু গুছিয়ে দিয়ে যাই। ' টেবিলে পড়ে থাকা পানিটা মুছতে মুছতে বলল রিমঝিম।
তবে শিরিন বেগম এগিয়ে এসে কেড়ে নিলেন কাপড়টা। বললেন, — ' এখন এসব ছাড় তো মা। যা দেরি করিস না। আমি করে নেব।' কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হাসিতে ঝলমল করে উঠল রিমঝিমের শ্যামবর্ণা মুখবিবর। কিছুপল অতিবাহিত হতেই সাদা গোল চুড়িদার এবং লাল ওড়নাটা স্কার্ফের মত গলায় পেঁচিয়ে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে। নিতম্ব ছড়ানো কেশরাজিতে বিনুনি গেঁথে তবেই সে বেরিয়েছে।খোলা চুলে কখনো বাইরে যায়না সে। তাছাড়া বরাবরই রিমঝিম সাজগোজ করেনা।
ভার্সিটিতে গেলেও সাদামাটা ভেবেই বেরিয়ে গেল। মুখের উপর এক পরদ মেকাপ করে বাইরে যাবার জামানায় রিমঝিম উজ্জ্বল শ্যামা রঙেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। চর্তুথ ফ্লোরে লিফটও আছে। বিগত কয়েকদিন লিফট দিয়েই যাতায়াত করেছে সে। আজ লিফটে তৃতীয় তালায় নামতে খুলে গেল দরজাটা। একটু কোনের দিকে সরে দাঁড়াল রিমঝিম। দরজাটা বন্ধ হতেই ঠিক ওর সামনে দাঁড়ানো অবয়ব দেখে পিলে চমকে উঠল রিমঝিমের। শ্বাস আটকে এলো। দুহাত জিন্সের পকেটে গুঁজে সেদিনকার জংলিটা সটান দাঁড়িয়ে আছে। এই লোক যে এক ধ্যানে রিমঝিমের দিকেই চেয়ে আছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
চারিদিকে সিগারেট আর পারফিউমের ঘ্রাণে একটা অদ্ভুত ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল রিমঝিমের গোটা শরীর জুড়ে। ঠিক তখনই বুঝল লিফট চলছে না! থেমে আছে তৃতীয় ফ্লোরে। অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তোতলানো কন্ঠে বলল,
— ' দেখুন? আমার রাস্তা ছাড়ুন।'
— ' যদি না ছাড়ি?'
— 'মানে?'
— ' আপনার পথ না ছাড়লে আজ কি ছুঁড়বেন মিস রিমঝিম মেহরিন?'
বিস্মিত হল রিমঝিম। ও তো ভেবেছিল ওই ছেলেটার বোধহয় ওকে মনে নেই। কিন্তু এখানে তো পেটে পেটে জমিয়ে রেখেছে৷ এমনকি ওর নামও জেনে গিয়েছে। গলাটা একটু খাকারি দিয়ে বলল, — ' আপনার এত সাহস? আপনি আমার বাসা অব্দি চলে এসেছেন? দেখুন আমাকে যেতে দিন... নয়তো?'
— ' নয়তো কি করবেন? '
— ' আমি চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকব।'
— ' যদি কেউ না আসে? তাহলে কিছু ছুঁড়ে মারবেন? '
নাহ! আর ঝগড়া করার সাহস নেই ওর। একা লিফটে যদি উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলে! নাহ! আর ভাবতে পারল না রিমঝিম। যারকারণে একটু নরমস্বরে বলল, — ' প্লিজ আমায় যেতে দিন। '
— 'প্রথমে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আমার কিছু ছুঁড়ে মারবেন যদি আপনাকে যেতে না দিই?'
রিমঝিমের বলতে ইচ্ছে হল কাঁধের ব্যাগটা উঠিয়ে তোর উপর ছুঁড়ে দিতে মন চাইছে উজবুক কোথাকার। তবে কিছুই বললনা রিমঝিম। মাথাটা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
ওদিকে সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা কি বুঝল কে জানে? কাঁধ ঝাকিয়ে, অবজ্ঞার সূরে বলল,
— ' ওকে। '
পরপর লিফটের বাটন চাপতেই পুনরায় চালু হল লিফট এবং মিনিট খানিকের মধ্যে চলেও এলো গ্রাউন্ড ফ্লোরে। লোকটা গটগট করে হেঁটে গিয়ে চেপে বসল পার্কিং এরিয়ায় রাখা সেদিনের বাইকে। তাকে দেখে একটুও বোঝার উপায় নেই এই মাত্র একটা মেয়েকে লিফটে আটকে ভয় দেখিয়ে এসেছেন। বাইক নিয়ে লোকটা বেরিয়ে যাবার আগে শুনল ওদের দারোয়ান ছেলে হেসে হেসে বলছে, — ' শুদ্ধ ভাই আপনের গাড়ি আমি ধুইয়া দিছি। '
— 'ফিরে এসে তোমাকে বখশিস দিচ্ছি জামিল।' বলেই বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কথাটা ঠিকই শুনল কথাটা রিমঝিম। তারমানে এই জংলির নাম শুদ্ধ? কিন্তু নাম শুদ্ধ হলে হবেটা কি? কাজবাজ তো সব অশুদ্ধ জংলিদের মত। পেপার স্প্রেটা আজ না নিয়েই বেরিয়ে এসেছিল তাই বেঁচে গিয়েছে। নয়তো ওকে লিফটে আটকানোর সাধ মিটিয়ে দিত আজ রিমঝিম।
চলবে....