লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
পর্ব — ১
নিশুতি রাত। হিংস্রাত্মক চাহনির একপাল অচেনা লোকেদের ভীড়ের মাঝে গুটিসুটি মেরে বসে আছে রিমঝিম।ওকে ঘিরে রাখা মহিলাদের আচরণ ভীষণই মারমুখী। কোনো এক অজানা কারণে এলাকার কতগুলো মহিলা একত্রিত হয়েছে অথচ এখন সম্ভবত মধ্যরাত। তাদের রোশানলে পড়ে ক্রমাগত টানাহ্যাঁচড়াতে রিমঝিমের গায়ে জড়ানো শাড়িটির অবস্থা করুণ! সেই সঙ্গে অদ্ভুত রকম কুৎসিত বাক্যবাণ ছুড়ে দিচ্ছেন ক্রমাগত। প্রতিটি শব্দরা বিগলিত সীসার ন্যায় শ্রবণগ্রন্থিতে আঘাত হানছে রিমঝিমের। কোনোরকমে আঁচল টেনে নিজেকে আরেকবার আবৃত করবার ব্যর্থ প্রয়াস চালায় রিমঝিম। হাত জোড়া কাঁপছে ঠকঠক করে। ভয়ে ওর শ্যামবর্ণা আনন সাদা কাগজের ন্যায় ধারণ করেছে।এইতো কিছু পল আগেও শীতের রাতে ভেজা শাড়িতে থাকার দরুণ কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়েছিল ওর। অথচ এখন পরিস্থিতির ভয়াবহতায় কাঁপা কাপির পরিমাণ বাড়ছে ক্রমেই। হিংস্র চাহনির, মারমুখী মানুষ গুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে অনুমান করার দুঃসাহস অব্দি করছেনা রিমঝিম। ভয়ে সিটিয়ে খামচে ধরলো ওকে বসিয়ে রাখা চেয়ারের হাতল। কয়েকবার নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলো সে। ওর কোনো কথায় যেন শুনতে ইচ্ছুক নন গ্রামের লোকজন। সিক্ত আঁখিযুগল নিয়ে তাঁকালো ওর বিপরীতে বসা দীর্ঘদেহী পুরুষের দিকে। তার সুদর্শন, আকর্ষনীয় মুখবিবরটাকে আজ বড়ই কদাকার মনে হলো রিমঝিমের নিকট। তবে তার নির্বিকার ভঙ্গিতে সে বলীয়ান।এমন পরিস্থিতিতে কেউ এতটা নির্জীব থাকতে পারে এমনটা কল্পনাও করতে পারেনি রিমঝিম। হতবিহ্বলতার শীর্ষে পৌছে কিছু বলতে চাইলেও শব্দরা যেন বিরোধিতা করে বসলো। কন্ঠ রোধ হলো ওর। মস্তিষ্ক যেন শারশুন্য। তির তির করে কাঁপতে থাকে নিটল ঠোঁট জোড়া। তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় রিমঝিম।
মুখ ফিরিয়ে নিয়েও আচমকাই ফেসে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পরিত্রান পাবার জন্যই হয়তো-বা কিছুক্ষণ পর ডাগর ডাগর, ছলছলে আঁখিযুগলে ফের চাইলো তার পাশে বসা শান্ত মুখশ্রীর যুবকের দিকে। সবকিছুর মূলে তো সে-ই। তবে কেন এত ভাবলেশহীনতা? কোথায় তার বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্ব যা নিয়ে গোটা পুরান ঢাকা দাপিয়ে বেড়ায়? কেন রিমঝিমকে উদ্ধার করছে না অনাগত কদর্যকর পরিস্থিতি হতে? নাকি তার প্রস্তাবে রাজী না হবার জন্য প্রতিশোধ নিতেই সে নিশ্চল বসা? ঘৃনায় মুখটা তেতো হল রিমঝিমের। ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে সে-ও বসে রইল ঠায়! যেন শরীরের সমস্ত শক্তি কেউ নিংড়ে নিয়েছে ওর।
কিছু পল অতিবাহিত হতেই ফের দুচোখ ভর্তি আকুতি নিয়ে আরও একবার রিমঝিম চাইল ওর পাশে বসা যুবকের দিকে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে তখনও চেয়ে আছে কোনো এক অজানায়। কেন তার এত নির্লিপ্ততা? এতবড় অর্নথ হবার থেকে এযাত্রা রিমঝিমকে বাঁচিয়ে নেবে না সে? ভালোবাসাটা তবে নিছক সাময়িক ভালোলাগা ছিল? কেন রিমঝিমের চরিত্রের পাশে অমন বাজে তকমা সেটে দেয়া থেকে এবারের মতো তাকে বাঁচানোর কোনো তাগিদ নেই অপর প্রান্তে বসা মানুষটি? অথচ রিমঝিমের সমস্ত আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে নিরাশায় পরিনত করতেই যেন মানুষটির ভাবলেশহীনতা সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে তার কোনোকিছুতেই কোনো বিকার নেই। টলটলে আঁখিযুগলে দৃষ্টি অব্দি মেলালো না। সে যেন শুধুমাত্র দম দেয়া পুতুল। শুধুমাত্র আজকের রাতের নাটকের সংলাপ বলবে। বাকি দুনিয়া গোল্লায় গেলেও তার নির্বিকারত্বে আঁচ আসতে পারবে না। নিজ সিদ্ধান্তে এতটাই অনড় সেই যুবক!
নিজের অসহায়ত্বে ফের ফুঁপিয়ে উঠে রিমঝিম। কেন করলো এখানে আসার মতো ভুল। চোখের তারায় ফুটে উঠা অভিব্যক্তি জানান দেয় ওর ঘৃণার পরিমান। শাড়ির আঁচল টেনে চোখ মুছে অগ্নিদৃষ্টিতে চাইল পাশে বসা যুবক মুর্তির দিকে। নিস্প্রভকণ্ঠে বলল, — ‘আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না ওয়াহিদ শুদ্ধ চৌধুরী। আপনার একগুঁয়েমির মূল্য আমাকে কলঙ্কের মতো বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। আমার আত্মসম্মান ভেঙে আপনি জিতে গিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, এই অপমান আমি ভুলবো না। কোনোদিন নয়।’
এরপর আকাশের দিয়ে চেয়ে আকুতি করে বলল,— ‘হে আল্লাহ! এই অসম্মানের জীবনের চেয়ে মৃত্যু যদি শান্তি হয়, তবে সেটাই আমাকে দাও। তবুও আমার চরিত্রে কলংক লেপ্টে দিও না।’
রিমঝিমের কটু কথায়ও সেই যুবকের নির্বিকারত্বে কোনো পরিবর্তন এলোনা। বরং একবার নজর উঠিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনা সে।
হঠাৎই হইচই শুরু হলো আশেপাশে। একজন বৃদ্ধ লোক পাঞ্জাবি এবং লাল-সাদার মিশ্রনের রুমাল, মাথায় টুপি, এসে বসলেন ওদের সামনে থাকা একটি চেয়ারে। এবং তখনই কোথা থেকে একজন মহিলা এসে একটা লাল ওড়না দিয়ে মাথাটা ঢেকে দেয় রিমঝিমের। কড়াস্বরে বললেন,— ‘আব্বায় যা কইবো, চুপচাপ মাইনা নিবা মাইয়া! বেশি হম্বিতম্বি করলে মাথা ন্যাড়ায়ে কালি ঢাইলা দিমু। লাং লইয়া আমাগো গেরামে ব্যা শ্যাগিরি ছুটাইলামু…’
নিজ সম্পর্কে অমন বিশ্রী মন্তব্য শুনে ঘৃণায় রি রি করে উঠল রিমঝিমের তনুমন। বিষিয়ে উঠল অন্তর অব্দি। মহিলাকে কড়াস্বরে বলল,— ‘ মুখ সামলে কথা বলুন।’
তেতে উঠলেন সেই বেটে মহিলা। মুখ বাঁকিয়ে বিশ্রীশব্দ করে বললেন, — ‘ উহুউউ আমারে চোপা দেখাইবা না মাইয়া। নডিদের মুখে উঁচু গলা মানায় না।’
— ‘আমার সম্বন্ধে আর একটা বাজে কথা বললে জ্বিহবা টেনে ছিড়ে ফেলব আমি।’ রিমঝিমও যেন তেতে উঠল। অনেক হয়েছে। আর এদের সহ্য করা যাবেনা। সে কোনো খারাপ উদেশ্যে নিয়ে এখানে আসেনি। আর নয়তো কোনো অনৈতিক কাজ করছিল তবে সে কেন নেবে অস্মমানের ভাগ? বরং এসব উদ্ধৃত আচারণ করা মানুষদের সে শক্তহাতে দমন করবে৷ ব্যস চেয়ারে ছেড়ে উঠে মহিলাটাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল রিমঝিম। তবে আচমকা টান পড়ল ওর চুলের গোছায়। সেই মহিলা যেন সর্বশক্তি দিয়ে টেনে ধরেছে ওর চুলের মুঠি৷ পুনরায় চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,— ‘ চুপ কইরা বও মাইয়া। আব্বায় যা কইবো মাইনা নিবা।’
মহিলার কথা শেষ হতে না হতেই এবারে বৃদ্ধ লোকটি ঠান্ডাগলায় বললেন, — ‘ দেখুন মেয়ে.. আমাদের গ্রামে ব্যাভিচারকারীকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলার রেওয়াজ আছে। হাতেনাতে ধরা হলে নারীদের পাথর মা রা হয়। যদিও আপনাদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়নি তাই কম শাস্তিস্বরূপ মাথা ন্যাড়া করে, কালি ঢেলে দেয়ার রেওয়াজও আছে। কিন্তু আপনারা যখন বলছেন আপনারা স্বামী-স্ত্রী। অন্ধকারে রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছেন। তাই আমরা বিশ্বাস করলাম। না চাইতেও আপনাদের কথায় মেনে নিলাম। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বন্ধন ফায়সালা আসমানে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের মনের শান্তির জন্য আপনাদের বিয়ে পড়িয়ে দিলে কোনো আপত্তি আছে? কোনো ব্যাভিচারীদের আমরা আশ্রয় দিয়ে আমাদের গ্রাম অপবিত্র করতে পারিনা।’
ফের টলটলে নেত্রে চাইলো ওপাশে নির্বিকার থাকা যুবকের দিকে রিমঝিম কিন্তু ওপাশের মানুষটা কোনো কথা না বলায় শুধু মাথাটা উপর-নীচ করলো রিমঝিম। আর কি-ই বা হবার আছে ওর? যদিও ওর ভেতরের আওয়াজ বলতে চাইলো,— ‘একটা মেয়েকে কদর্যপূর্ণ কথা বললে বুঝি তোদের গ্রাম অপবিত্র হয়না?’ তবে যদি সম্ভ্রমের দোহায় দিয়ে ওকে এমন শয় তান লোকের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় সেক্ষেত্রে রিমঝিম ম রে যাবে। তাইতো সেই লোকটিকে উদেশ্যে করে বলতে চাইল, — ‘ তবে আমায় পাথর নিক্ষেপ করে ফেলুন।’ কিন্তু তা আর বলা হলো কই? সে কোনো ব্যাভিচারিনী নয়। তবে জিহ্বার আগায় থাকা বাক্যটুকু গিলে নেয় রিমঝিম। অমানুষদের যাতাকলে আটকে আজকের রাতটুকুতে নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে নিজেকেই কুরবানি করে দেবে না-হয়!
সেই নিশুতিরাতের শেষ প্রহরে স্বল্প পরিচিত, পুরান ঢাকার দাপুটে নেতা ওয়াহিদ শুদ্ধ চৌধুরী এবং রিমঝিম মেহরিন আহমেদ নামক উনিশের তরুনী জড়িয়ে গেলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র বন্ধনে। ইহজীবন ছাড়িয়ে যেই সম্পর্কের বিস্তৃতি পরপার পর্যন্ত। বড়ই অনাড়ম্বর তাদের সম্পর্কের প্রথম ধাপ।’ কবুল ‘ শব্দটি উচ্চারণের পরপর যখন দুহাত তুলে মোনাজাত তোলা হল তখন ক্রোধে জর্জরিত রিমঝিম উদ্ভ্রান্তের মতো শুদ্ধকে উদেশ্য করে আওড়ালো,
— ‘আমি আপনাকে ঘৃণা করি ওয়াহিদ শুদ্ধ চৌধুরী…’
হুট করে চোখটা খুলে গেল রিমঝিমের।এবং নিজের অবস্থার প্রতি আরও একবার করুণআ হল ওর। ঠোঁট চেপে উথলে আসা কান্নাটা গিলে উঠার চেষ্টা করতেই থমকালো রিমঝিম। দু-গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানিটা যেন ওকেই তিরস্কার করল । অন্ধকারাচ্ছন্ন এক আলিশান কামরায় বিছানার মাঝামাঝি অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে রিমঝিম। মাথাটা প্রচন্ড ভারী লাগছে। জ্বরের প্রকোপে কেঁপে উঠল। জ্বরের কারণ অবশ্য অজানা নয়। প্রচন্ডভাবে শারিরীক নির্যাতনের শিকার সে। আর নির্যাতনকারী অন্য কেউ নয়। বরং স্বামী নামক প শু যে কি নিজের হিংস্রতা চালিয়েছে ওর শরীর জুড়ে। এই কামরায় যখন ওকে তুলে এনে আটকে রেখেছিল তখন সেই মানুষটিকে বাঁধা দেয়ায় বেশ কয়েকটি থাপ্পড়ও মেরেছিল। যার কারণে ঠোঁটের কোনা কেটেছে অনেকটা। ব্যথায় জর্জরিত শরীরটা টেনে-হিচড়ে উঠে বসতেই দেখল চিকন রক্তের ধারা বিছানার সাদা চাদরে আলপনার ন্যায় এঁকেবেঁকে রয়েছে।গায়ে জড়ানো শাড়িটা যেটা নিজের টিউশানির টাকায় কিনেছিল রিমঝিম সেই শখের শাড়ির অবস্থাটাও ঠিক ওর মতন। কয়েক টুকরোতে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে সেটাকে। শাড়ির সঙ্গে পরিহিত বাকি জিনিস গুলোও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে।সেগুলাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করা হয়েছে যেন কেউ নিজের ক্ষোভ পুরোটা পোশাক গুলোর মিটিয়ে নিয়েছে। নিভু নিভু চোখে তাঁকালো সেদিকে। ফের উথলে আসে কান্নার বেগ। প্রচন্ডরকম ব্যথায় জর্জরিত শরীরটা কোনো রকমে তুলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোলো ওয়াশরুমের দিকে।হাঁটার সময় টলকে পড়েই যাচ্ছিল ।দেয়াল ধরে সামলে নিলো নিজেকে। ওর সাথে কেউ এতটা হিংস্রাত্মক আচারণ করতে পারে ধারনাও করতে পারেনি কোনোদিন। তীব্র ঘৃণায়, ক্ষোভে,আক্রোশে অনবরত গাল বেয়ে অশ্রুর ধারা বইতে থাকে।বিছানা থেকে নেমে শাড়ির ছেঁড়া টুকরো গায়ে জড়িয়ে নিল রিমঝিম। ওয়াশরুমে এসে শাওয়ারের কল ছেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। করুণ কান্নার সেই স্বরে পাষাণের মন ও গলতে বাধ্য। অথচ সেই মানুষ টা! শত আকুতি মিনতি, বাঁধ ভাঙা কান্নারা তাকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। কিন্তু কেন করলো সে এমনটা? অনুভুতিরা তো জন্ম নিচ্ছিলো মানুষটার জন্য। তবুও কেন জানোয়ারের মত আচারণ করল? সারা শরীরের কামড়, আঁচড়, খামচি গুলোতে আরও একবার নজর বুলালো। ঠিক যেন ক্ষু ধার্ত কোনো জানো য়ার খুব লে খেয়েছে ওর শরীরটা।বারবার ঘষে ধুয়ে তুলে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে সেই দাগ গুলো। কিন্তু উঠার নাম নেই দাগ গুলোর। হুট করে কি হয়ে গেলো তার সঙ্গে? অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতই সকালে কলেজের উদেশ্য বেরিয়েছিল সে। তবে কে জানত? জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পাবে আজ। ভার্সিটির নবীন বরণ অনুষ্টানের জন্য সবাইকে লাল শাড়ি পড়তে বলেছিল কর্তৃপক্ষ। চাচীর থেকে বহু কষ্টে শাড়ি পরার অনুমতি পেয়েছিল সে। তবে? আর ভাবতে পারল না রিমঝিম। কোনোরকমে বাথরুমের ফ্লোর থেকে উঠে একটা টাওয়াল পেঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।আলো-আঁধারি খেলা করা রুমে তখনই চোখ গেলো দীর্ঘদেহী এক ছায়ার দিকে। ঘৃনায় গা গুলিয়ে উঠে রিমঝিমের। আলিশান কামরার এক কোনে রাখা বড় সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে সে।একহাতে সিগারেট ধরিয়ে তাতে সুখটানে ব্যস্ত সে।আদুর গা সেই যুবকের। তার নীল শার্ট,প্যান্ট সহ কোমরের ভারী লেদার বেল্ট, হাতের ঘড়ি সবই পড়ে আছে রিমঝিমের ছেঁড়া শাড়ির পাশে। যুবকের পরণে শুধুমাত্র একটা ট্রাউজার। খামচির দাগে লালচে হয়ে আছে তার পুরো শরীর। রিমঝিম কে দেখেই সুইচ টিপে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলো সে।জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে থাকল এক ধ্যানে রিমঝিমের কান্নাভেজা চোখের দিকে।ঠোঁটের কোনে ফুটে আছে বাঁকা হাসি। বাম হাতে ঘাড়টা ঘষল। এরপর সিগারেটে আরো একটা টান দিয়ে এস্ট্রেতে চেপে দিয়ে, এগিয়ে এলো রিমঝিমের কাছাকাছি। ধোঁয়াটা ছাড়লো রিমঝিমের মুখ বরাবর।সিগারেটের বিশ্রী দুর্গন্ধতে সয়লাভ গোটা রুম। শ্বাসকষ্ট শুরু হয় রিমঝিমের। কাশতে শুরু করল সে। তবে রিমঝিমের কষ্টে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা নেই তার। বরং থুতনিটা চেপে উঁচু করল রিমঝিমের মুখটা। হিসহিসিয়ে উঠল তার গাঢ়কণ্ঠে, — ‘ ওয়াহিদ শুদ্ধ চৌধুরির বিয়ের প্রস্তাব নাকোচ করে তুমি একদমই অনুচিত কাজ করেছো ওয়াইফি । সেই আবার আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছো। তোমার দুঃসাহসের তারিফ করলাম। পদ্ধতিটা ভালো না? তবে আমি তোমাকে ফোর্স করতে চাইনি।কিন্তু আমি যত ভালো হতে চাই, তুমি ততই খারাপ হবার জন্য উষ্কে দাও। জানো তো আমি আগুন। আর আগুন উস্কালে জ্বলেপুড়ে খাক হতেই হয়।’ আচমকা শুদ্ধর মুখে থুথু ছুড়ল রিমঝিম। ঝাঝালো কণ্ঠে আওড়ালো, — ‘ আপনি একটা জা নো য়ার। ‘
শীতল দৃষ্টিতে রিমঝিমকে দেখে নিয়ে পাশের টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু উঠিয়ে মুখটা মুছল শুদ্ধ। দাঁতে দাঁত পিষল। দুহাত হল মুষ্টিবদ্ধ যেন নিজের রাগকে সংবরণ করতে চাইছে সে। তারপরেই হিসহিসিয়ে উঠল শুদ্ধ,
— ‘ আমি যেমনই হই আমার সঙ্গেই তোমাকে আজীবন থাকতে হবে। ‘
ব্যস ফের রাগে যেন ফেটে পড়ল রিমঝিম। কান্নাভেজা গলায় তেজ নিয়ে বলল,
— ‘ আপনার মত লোকের সঙ্গে আজীবন থাকার চেয়ে আমি আত্ন হত্যা করব।’
— ‘ হুশ! এসব বলে না। নিজের ক্ষতি করার চেষ্টাও যদি করো তবে তোমার চাচা নাজিমকে মে রে ফেলব আমি। আর তোমার সেই ভাইয়েরা? ওদের লা শ ও কেউ খুঁজে পাবেনা। ওসব দু নাম্বারি চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। ‘
বিস্ময় নিয়ে রিমঝিম চেয়েই থাকল সামনে দাঁড়ানো পুরুষের শক্ত চোয়াল এবং দুচোখে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে। মুখটা ফিরিয়ে নেয় রিমঝিম তীব্র ঘৃনায়। তবে রিমঝিমের ঘৃণাদের বুঝি সহ্য হলোনা সেই যুবকের। চেপে ধরল রিমঝিমকে নিজের সঙ্গে। শান্ত অথচ হুমকির স্বরে বলল, — ‘ ভদ্র মেয়ের মত বাসায় যান। বিয়ের জন্য রাজী হোন। আর কোনো গেম খেলার চেষ্টা করবেন না৷তাহলে ফলাফল ভালো হবেনা, বুঝেছেন ওয়াইফি?’
নিজেকে শুদ্ধর অত কাছে সহ্য হলনা রিমঝিমেরও। হাতটা উঠিয়ে ওর গালে থাপ্পড় দিতে উদ্যত হয় সে। তবে তার আগেই হাতটা ধরে ফেললো শুদ্ধ। এক হেচকা টানে রিমঝিমকে জড়িয়ে নিলো নিজের সঙ্গে।বলল, — ‘ইউ আর সো ওয়াইল্ড, ওয়াইফি। এন্ড আই লাভ ওয়াইল্ডনেস।’
— ‘কেন আমাকে কলংকিত করলেন আপনি?’ গভীর বিষাদ নিয়ে কথাটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল রিমঝিম। ছাড়িয়ে নিল নিজেকে শুদ্ধর কাছ থেকে। কিন্তু পৈশাচিক নির্যাতনের পর নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে টালমাটাল দেহটা নিয়ে বসে পড়ল মেঝেতে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলোর পাশে।
— ‘কলংকিত কোথায় করলাম ওয়াইফি? এটা তো ভালোবাসা ছিল।গোপন ভালোবাসা। তাছাড়া তুমি যতটা জংলি হবে, আমি ততটাই কঠোর হব। পোষ মানতে বাধ্য তুমি। আর আমার শরীরের আঁচড় গুলা? তোমার এই আঁচড় আমাকে প্রশান্তি দিয়েছে।’ বলেই শুদ্ধ ফের রিমঝিমের কাছে এগোতে গেলে গর্জে উঠলো রিমঝিম, — ‘একদম আমার কাছে এগোনোর চেষ্টা করবেননা। আপনাকে আমি খু ন করব।’
চলতে থাকা কদমটা থেমে গেল শুদ্ধর। বুকের সঙ্গে দুহাত বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে থাকল। সেই তুখোড়, জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে…..
চলবে…