লেখনীতে:মাহজাবিনরাফা
পর্ব:০৫
ওরা চারজনে মিলে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে থাকার জন্য। আর্য মুগ্ধ আর প্রিয়ম ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। ঘরে ঢুকে যে যার রুমে চলে গেল। মাহতিম নিজের রুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল। তখনই শুনতে পায় প্রিয়ম কারো সাথে চিৎকার করে কথা বলছে। প্রিয়মের চিল্লানোর আওয়াজ মাহতিমের রুম পর্যন্ত চলে এসেছে। মাহতিম আর্য আর মুগ্ধ তিনজন নিজেদের রুম থেকে বেরিয়ে একসাথে প্রিয়মের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রিয়মের রুমের ডোর লক করা ছিল। ওরা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে কি হয়েছে
প্রিয়ম চিৎকার করে বলছে – সমস্যা কি তোর? তুই আমার কল রিসিভ করিস না কেন? দেমাগ বাড়ছে তোর? রিলেশনের শুরু থেকে শুধু আমি সবকিছু করছি। তোর পিছনে পাগলের মত ঘুরছি। অথচ তুই আমার কল রিসিভ করিস না। রেস্টুরেন্টে একটা ছেলের হাত ধরে বসেছিলি? কেমনে কেমনে পারস তুই এগুলা আমি তো কিছুই বুঝিনা আমার মাথা কাজ করতেছে না।
প্রিয়ম এক মিনিট পর আবার বলল – আমি সব কিছু বুঝে গিয়েছি তুই আমাকে ভালোবাসিস না। আমাকে জাস্ট ইউজ করেছিস। তোর কোন কিছু লাগলেই আমার কথা মনে পড়তো তা ছাড়া তো আমাকে চিনতেই পারিস না। আমি ডাক্তারি পড়ছি কার জন্য বল তোর জন্য আমি জমিদারের ছেলে আমাদের কি টাকা পয়সার অভাব যে আমাকে ডাক্তারি করে তারপর সংসার চালাতে হবে বা সেই টাকা দিয়ে খেতে হবে বা তোকে খাওয়াতে হবে। আমি কোন চাকরি না করলেও সমস্যা নেই আমার ছেলে মেয়েরাও আরামসে থাকতে পারবে। তবুও তোর বাবার শর্তে ডাক্তারি পড়ছি আর সেই তুই আমার সাথে এমন করতে পারলি? যা ইচ্ছা তাই কর যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে যা I don’t f****** care and listen break up don’t ever try to talk with me or calling me
ওরা তিনজন বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা সুরে মারার আওয়াজ পায়। কাঁচ ভাঙার শব্দ হয়। মাহতিম দরজার মধ্যে জোরে ধাক্কা লাগায়। তিনজন মিলে দরজার লক ভেঙে ফেলে। ভিতরে ঢুকে দেখে প্রিয় আমার চোখ দুটো লাল হয়েছে। চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করা। ডান হাত থেকে রক্ত ঝরছে। শার্ট টা মেঝেতে পড়ে আছে । ড্রেসিং টেবিলের উপরে জিনিসগুলো সব ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মোবাইলটা এখনো ফ্লোরে পড়ে আছে। আর অনবরত বেজেই যাচ্ছে।
প্রিয়ম তিনজনকে একসাথে তার ঘরে দেখতে পেয়ে বাজখাই কন্ঠে বলে – তোরা এখানে কি করছিস?
মাহতিম বলে ওঠে – তোর এই অবস্থা কেন
– বান্দির ঝী র সাথে ব্রেকআপ করে ফেলেছি
মাহতিন বলে ওঠে – কেন? যখন বলেছিলাম ওর সাথে ঘুরিস না ওর সাথে কথা বলিস না ও ভালো না। তখন তো proudly বলেছিলি না ও ভালো বেশি করলে তোদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ রাখবো না।
– তখন তো আর বুঝিনি যে ও একটা মা*গী
– ল্যাংগুয়েজ এর অবস্থা কি নাউজুবিল্লাহ
– আস্তাগফিরুল্লাহ বললেও তো পারতি
– তুই যা বলবি আমি তো তাই করার জন্য বসে আছি
প্রিয়ম তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে – গেট আউট অফ মাই রুম
মাহতিম প্রিয়মের কাঁধে হাত রেখে বলে – চল ব্রো বাহিরে ঘুরে আসি
প্রিয়ম মাহতিমের হাতটা ঝাড়া দিয়ে বলে – I need space just get out of my room leave me alone
মুগ্ধ বলে ওঠে – কেন মামা স্পেস দিয়ে কি করবি এলিয়েনরে ডাকবি । আর রুমে একা থাকতে চায় মানে আমাদেরকে ছাড়াই এলিয়েনের সাথে কথা বলবি। এখন আর তোর মানুষ পছন্দ না তাই না।
– breakup হইছে আমার। তোরা সবগুলা ফালতু। রুম থেকে বের হ
মাহতিম নির্বিকার স্বরে বলে ওঠে – কই ভাবছিলাম এখন তোদের কাছ থেকে মেয়েটার ব্যাপারে ইনফরমেশন নিব। আর এখন একজন দেবদাস হয়ে বসে থাকবে। আর সেই দেবদাস কে বাকি সবাই মিলে হ্যান্ডেল করতে হবে
প্রিয়ম বলে ওঠে – ওর সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না
মাহতিম মুখটা বাংলা পাচের মতো করে ফেলে।
মুগ্ধর ফোন বাজছে। মুগ্ধ কল টা রিসিভ করে আর বলে ওঠে – what are you serious
মুগ্ধ ওদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে – মিরা আর নিরা একটা বিয়েতে গিয়েছে। আর সেখানে ব্রাইড হলো আমাদের ফাংশনে আজকে যে মেয়েটা নাচ ছিল ওই মেয়েটা। বিয়ে হয়ে গেছে।
মাহতিম জ্ঞান হারায়। তিনজন এখন হসপিটাল এর করিডোরে হাঁটছে । একজন নার্স এসে প্রিয়মের হাত দেখে বলে – আপনার তো হাতের অবস্থা ভালো না। ফাস্ট এইড করে নেন ।
প্রিয়ম উত্তরে বলে – মাহতিমের কি অবস্থা সেটা বলুন
নার্স বলল – ডক্টর কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হবে।
একজন মধ্যবয়স্ক ডাক্তার বেরিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর বলে – পেশেন্টের অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। প্রেসেন্ট এর পরিবারকে তাড়াতাড়ি খবর দিন। পেসেন্টকে লন্ডন নিয়ে যেতে হবে।
প্রিয়ম বলল – মাহতিমের কি হয়েছে
– অতিরিক্ত শকের কারণে ব্রেন ডেড হতে হতে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু জ্ঞান ফিরছে না। যেকোনো সময় ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে।
– নরমাল একটা কারণে এত ক্রিটিকাল অবস্থা হয়ে গিয়েছে?
– কি হয়েছিল
– আচ্ছা আমি পরিবারের সবাইকে খবর দিচ্ছি
– যত তাড়াতাড়ি দিবেন তত ভালো হবে।
প্রিয়ম কাকে কল দিবে বুঝতে না পেরে মাহতিমের ফোন থেকে মাহতিমের ফুফাতো ভাই প্রণয় শিকদার কে কল করে। পাঁচবার রিং হওয়ার পর কলটা রিসিভ হয়।
প্রণয় বলে ওঠে – হ্যাঁ মাহাতিম বল
– আমি মাহতিম না। আমি মাহতিমের ফ্রেন্ড প্রিয়ম চৌধুরী।
– ওর ফোন তোমার কাছে কেন
– একচুয়ালি মাহতিম হসপিটালে ভর্তি।
– ওর কি হয়েছে
– আপনি একটু তাড়াতাড়ি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল এ চলে আসেন।
– আচ্ছা আমি আসছি
– আর আঙ্কেল আন্টি সবাইকে নিয়ে আসবে
– আঙ্কেল তো লন্ডনে।
– তুমি একটু তাড়াতাড়ি আসো আমি কিভাবে আঙ্কেলকে জানাবো বুঝতে পারছি না।
– আচ্ছা আসছি
প্রণয় ফুলস্পিডে বাইক চালিয়ে হসপিটালে পৌঁছালো। রিসিপশনে ওটির কথা জেনে ওটির দিকে পা বাড়ালো। ওটির সামনে যেতেই দেখতে পেল তিনজন যুবক এদিক সেদিক হাটাহাটি করছে। তিনজনের অবস্থাই বেগতিক। একজনের হাত থেকে রক্ত ঝরছে। আরেকজন কোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আরেকজন চেয়ারে বসে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুল টানছে।
প্রণয় মনে করে প্রিয়মের হাত থেকে যেহেতু রক্ত পড়ছে তাহলে হয়তো প্রিয়মই কিছু করেছে বা কোনো এক্সিডেন্ট হয়েছে। প্রণয়ের সেদিকে এগিয়ে যায়। প্রণয় কে দেখে প্রিয়ম চিনতে পারে মাহতিমের ফোনে প্রণয় ছবি দেখেছে প্রিয়ম। প্রিয়ম প্রণয়ের কাছে গিয়ে বলে – ইমিডিয়েটলি মাহতিমকে লন্ডনে নিয়ে যেতে হবে
প্রণয় জিজ্ঞেস করে – মাহতিমের কি হয়েছে?
– অতিরিক্ত শকের কারণে ব্রেন ডেথ হতে হতে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু জ্ঞান ফিরছে না। ডক্টর বলেছে যেকোনো সময় ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে।
– কিসের শক?
– মাহতিম আজকে সকালে একটা মেয়েকে পছন্দ করেছে। আমরা মেয়েটার ব্যাপারে খোঁজ করেছি কিন্তু মেয়েটাকে কোথাও পায়নি আর না মেয়েটার ব্যাপারে কেউ কিছু জানে আমাদের ফিমেল ফ্রেন্ড মিরা আর নিরা কিছুক্ষণ আগে কল করে জানিয়েছে ওরা একটা বিয়েতে গিয়েছে আর সেই বিয়েতে কনে হল সেই মেয়েটা আর বিয়ে নাকি হয়ে গেছে এটা শোনার পরেই মাহাতিম জ্ঞান হারায় আর আমরা ওকে হসপিটালে নিয়ে আসি। তারপর ডাক্তার বাকিটুকু আমাদেরকে জানিয়েছে। আমি কিভাবে আন্টিকে সব বলবো আমি এটা আমার মাথায় কাজ করছে না তাই আমি তোমাকে কল করেছি
প্রণয় শুনে কি বলবে প্রণয় সেটা বুঝতেই পারছে না। প্রণয় কাউকে একটা কল করে তারপর বলে – হ্যালো মামা। তুমি কোথায়? তুমি কি হসপিটালে? যদি হসপিটালে থাকো তাহলে নিউরো বিভাগে সবার সাথে ডিসকাস কর আমি তোমাকে মাহতিমের ফাইল পাঠাচ্ছি। মাহতিমের মেবি ব্রেনে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মাহাতিম এখন ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে ভর্তি।
প্রনয় কলটা কেটে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে মাহাতিমের ফাইলটা দিন
রিসেপশনেস্ট বলে ওঠে – আপনি ডঃ এজাদের সাথে কথা বলেন
– কোথায় উনি
– ওনার কেবিন নাম্বার ৩০৫
– ওকে থ্যাংকস
প্রণয় সামনে গিয়ে কেবিনের দরজায় টোকা দেয়।
– come in
প্রণয় ভিতরে ঢুকে বলে – আমি প্রণয় সিকদার। মাহতিমের কাজিন। মাহতিমের বাবা লন্ডনের গ্রেট অরমেন্ড স্ট্রিট হসপিটালের সার্জন। ওখানে মাহতিমের সবকিছু ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওর ফাইল টা দিন।
চলবে…………