গল্প:স্থির নিশীথ (০৩)

লেখিকা:নাজনীন নাহার

part:03

 

এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ। এই সময়টা খুব অদ্ভুত হয় এই বৃষ্টি আবার এই রোদ। ছুটির দিনে জ্যোতি একা একা ঘুরতে বের হয়েছে বিকেল সারে চারটা নাগাদ। ঘুরাটা আসল উদ্দেশ্য নয় আসল উদ্দেশ্য হলো তার প্রিয় প্রানীদের খাওয়াতে যাবে তাদের সাথে একটু সময় কাটাবে। জ্যোতির মন খারাপ থাকলে প্রানী বা প্রকৃতির সাথে সময় কাটায়।

অনেকটা সময় কাটানোর পরে জ্যোতি বাসায় যাওয়ার জন্য রিকশার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে জবা বলেছিল গাড়ি নিয়ে যেতে কিন্তু জ্যোতির নাকি রিকশায় চড়তে খুব ইচ্ছে করছে। অনেকক্ষণ দাড়িয়ে আছে রিকশা পাচ্ছে না। সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো জ্যোতি হঠাৎ দেখলো এক বৃদ্ধ মহিলা রাস্তার পাশে বসে আছে দেখে খুব অসুস্থ লাগছে জ্যোতি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল

– ‘আপনি ঠিক আছে?’

জবাব দেওয়ার আগেই বৃদ্ধা অজ্ঞান হয়ে পড়লো জ্যোতি তারাতাটি করে অগলে নিলো তাকে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে একটা রিকশা আসছে। হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকে রিকশাওয়ালাকে

– ‘মামা তারাতারি হসপিটালে চলুন। ‘

হসপিটালের সব ফর্ম পূরন করে ভর্তি করলো তাকে, ডক্টরা পেসেন্ট কে দেখে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পরে ডক্টর ইমার্জেন্সি থেকে বের হয়ে আসে।
-‘ এখন উনি বিপদ মুক্ত চিন্তা করার কিছু নেই বয়স হয়েছে তো তার উপড় ওনার হার্টে অনেক দুর্বল।’

বলে চলে যায় ডক্টর। সন্ধ্যা ঘনিয়ে  এসেছে এখনও তার জ্ঞান ফিরছে না। প্রায় এক ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরলো বৃদ্ধার। জ্যোতিকে ডাকলো নার্স ওনার সাথে কথা বলার জন্য। জ্যোতি কেভিনে গিয়ে তার পাশে দাড়ালো।

-‘ এখন শরীর কেমন লাগছে আপনার দাদি?’

-‘সুস্থ লাগছে অনেকটা। তুমি স্বয়ং সর্গীয় দূতের মতো এসে বাচালে আমায়। আমার গাড়ি পাশের গলিতেই ছিল আমি একা একটু হাঁটতে চেয়েছিলাম তাই ড্রাইভারকে পিছনে আসতে নিষেধ করেছিলাম আর গটে গেল অঘটন। ‘

জ্যোতির কাছে মহিলাকে খুব ভালো লাগলো কারন তারও মাঝে মাঝে একা থাকার,  একা হাঁটার ইচ্ছে জাগে। মানুষ যখন একা থাকে তখন সে নিজ সত্তাকে খুজে পায়।
জ্যোতি অনেকক্ষণ কথা বলল তার সাথে। জানতে পারলো তিনি আশরাফ মির্জার মা।আয়শা মির্জা। জ্যোতির সাথে খুব ভাব হলো তার।

– ‘আজকে থেকে আর একটা নাতনি পেলাম আমি।’

জ্যোতি হেসে বলল- ‘ হ্যাঁ, দাদি।’

.

রাত দশটার বেশি বাজে জবা চিন্তায় এদিক ওদিক পায়চারি করছে। জ্যোতিকে কল দিচ্ছে কিন্তু রিং হয়ে কেটে যায়।

-‘এই মেয়েটাও না কখনো কল ধরবে না। আমার কি চিন্তা হয় না নাকি। আজ আসুক বাসায় ওর একদিন আর আমার যে কদিন লাগে।’

.

কেবিনের সামনে বসে আছে জ্যোতি। ভিতরে ঘুমচ্ছে তার সদ্য পাতানো দাদি। রিসিপশনের দিক থেকে তার দিকে আসছে একজন জ্যোতি চোখ তুলে তাকালো লোকটার দিকে একে তো জ্যোতি চেনে। -‘ উনি তো ঋভান আরশ মির্জা ।’

ঋভান কেবিনে প্রবেশ করবে তখন জ্যোতি দাড়িয়ে বলল-‘এতো কেয়ারলেস কেনো আপনারা ওনি সেই বিকেলে অসুস্থ হয়েছেন,  কত আগে আপনাদের জানানো হয়েছে আর এতোক্ষণ বাদে আসছেন। এই জন্যই বলে বৃদ্ধ হলে মূল্য কমে যায়।’

-‘ সেটআপ। আমার দাদু আমি বুঝে নিব এখন আপনি আসতে পারেন।’

জ্যোতির দিকে না তাকিয়ে কথাটা বলে কেবিনে প্রবেশ করলো ঋভান।  জ্যোতির খুব ইগোতে লাগে বেপারটা। মনে মনে শুধালো ‘ এই মি.মির্জা তো খুব বাজে মানুষ। থাঙ্কস তো বললোই না উলতো কথা শুনিয়ে চলে গেলো’

ঋভান দেখে তার দাদু ঘুমচ্ছে। বেডের সামনের সোফায় বসলো। এর মধ্যে তার দাদু উঠে গেল।ঋভানকে দেখে আয়শা মির্জা খুব খুশি হয়ে বললো

-‘দাদুভাই তুমি এসেছো। তোমার বাবা কোথায় ও আসেনি?’

– ‘বাবা আজ বিকেলে নিউইয়র্ক গেছে দাদু। আমি একটু আগে জানতে পারলাম তুমি হসপিটালে। তোমায় এতো বলি একা একা বের হবে না তুমি শুনো না আমার কথা।’

ঋভান এসে জড়িয়ে ধরলো তার দাদুকে।

-‘মাঝে মাঝে একলা সময় কাটাতে ইচ্ছে করে দাদুভাই। আর দেখ মেয়েটা হঠাৎ এসে আমায় বাচিয়ে নিল। জ্যোতি কোথায়? দেখছি না অনেক্ক্ষণ হলো।’

-‘ কে জ্যোতি এখানে তো কেউ নেই।’

-‘তাহলে কি আমায় না বলেই চলে গেল মেয়েটা?’

ঋভান এখনও তার দাদুকে জড়িয়ে ধরে আছে।পরিবারের সব থেকে পছন্দের সদস্য তার দাদু। তার দাদুর চোখের মনি  হলো সে।  ছোট বেলা থেকে ঋভানকে চোখে হারায় তিনি। ঋভান যখন বিদেশে পড়াশোনার যায় তার দাদু তার সাথে কথা বলার জন্য অদির অপেক্ষায় থাকতো। ঋভান কে দেশে আসতে বললে ঋভান সব সময় না ই উওর দিত চার বছরে একটিবারও দেশে আসেনি তাই বাধ্য হয়ে তার দাদু তাকে দেখতে যেত বিদেশে। পরিবারের আর কোনো সদস্য ঋভানকে দেখতে বিদেশ যায়নি।

-‘ ডক্টর বলেছে আজ রাতটা এখানে থাকতে কাল সকালে বাসা যাবে আর আমি তোমার সাথে আছি দাদু। এখন একটু রেস্ট নাও।’

.

রাত এগারোটা কি তার বেশি বাজে জ্যোতি এখনও বাসায় এলো না জবা বার বার কল করছে আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে এই বুজি কলিং বেল বাজবে। কিছুক্ষণ পরই জবার অপেক্ষার অবসান ঘটে। কলিং বেল বাজা মাএই জবা দরজা খুলে জ্যোতির মুখ দেখার আগেই বলা শুরু করল – ‘আমার কি চিন্তা হয় বা তোর জন্য এতো রাত অব্দি কেউ বাইরে থাকে জ্যোতি?’

জ্যোতি কোনো উওর না দিয়ে রুমে প্রবেশ করলো।

কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে জবা খাবার বেরে বসে আছে খাবে।

-‘ বস এখানে।’

জ্যোতি বসলো খেতে।জবা খাবার বেরে দিল তাকে।  খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল – ‘ কই ছিলি এতক্ষণ? তুই তো সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকিস না, তাহলে আজ?’

– ‘ বিকেলে যখন বাসায় আসার জন্য রিকশা খুজছিলাম তখন দেখি একজন অসুস্থ হয়ে পরেছে তাকে নিয়ে হসপিটালে গিয়েছিলাম।  আর সে কে জানো?’

জবা উওর দিল-‘ না বললে কিভাবে জানবো।’

-‘আশরাফ মির্জার মা, আয়শা মির্জা।’

জবা একটু নড়ে চড়ে উঠলো, বলল- ‘ এখন কেমন আছেন উনি?’

-‘ভালোই,  ওনার নাতি এসেছে তারপর আমি বাসায় আসলাম বৃদ্ধ মানুষ একা কিভাবে ছেড়ে আসি বল? ‘

-‘ ভাগ্যিস মা নেই নাহলে হুলুস্থুল কান্ড বেদে যেত। ‘

জবা জ্যোতিকে বলল কাল যেন একবার দেখা করে আসে জ্যোতি। কিন্তু জ্যোতি কোনো উওর দিল না তা দেখে জবা বলল-‘ যাবি না তা বললেই হয় চুপ থাকার মানে কি?’

-‘বলেছি জাবোনা। তুই বেশি বুঝ ওই ঋভান আরশ মির্জার মতো।’

-‘তার সাথে তোর দেখা হয়েছে?’

-‘হ্যাঁ।’

জবা এই প্রসঙ্গ আর এগলো না অন্য কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করলো দু বোন।

-‘কালকে মা আসছে।’

-‘ওহ নো আবার ঝামেলা। ‘

জ্যোতির কথা শুনে জবা আর হাসি থামিয়ে রাখতে পারলো না।

চলবে….

Loading spinner

Leave a Comment