লেখনীতে:আইরা নূর
পর্ব:০২
‼️কার্টেসি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ‼️
—দয়া করে আমার আম্মারে ছাইড়া দেন চাচী। আপনে আমারে মা’রে’ন কিন্তু আমার অসুস্থ আম্মারে দয়া কইরা আর মা’ই’রে’ন না চাচী। আমি আপনার পায়ে পড়ি চাচী। আমার আম্মারে ছাইড়া দেন।
—ছারমু না না তর আম্মারে ছারণ যাইবো না। তরে তো মা’র’মু’ই আর তর আম্মারে ও ফিডায়ে মা’ই’রা ফেলমু।
—না না চাচী আমার আম্মা কে ছেড়ে দিন। (কাঁদতে কাঁদতে)
—এই তুই আবার শুদ্ধ ভাষায় কথা কস। এই মাইয়া তরে না মানা করছি এইহানে থাকতে গেলে তরে আমগো মতন কইরা কথা কওন লাগবো। ঐ সব শুহুরে ভাষায় কথা কওন যাইবো না।
—ঠিক আছে চাচী আপনেরা যেইভাবে বলবেন আমি ঐ ভাবেই কথা কমু। কিন্তু আমার আম্মারে ছাইড়া দেন।
—ঠিক আছে ঠিক আছে পা ছাড় আমার। এতো কইরা যহন কইতাছিস তহন তর আম্মারে ছাইড়া দেবো কিন্তু তর আম্মার ভাগের শাস্তি গুলান তরে পাইতে হইবো।
—আপনে যা বলবেন আমি তাই করবো চাচী।
—ঠিক আছে যা কুয়া থেইক্কা পানি তুইলা আন জলদি। ১০ বলতি পানি আনবি। আর হ্যাঁ বড় বলতি খান নিবি। পানি আইনা জঙ্গল থেইক্কা কিছু খড়ি আনবি। পানি গরম করা লাগবো। আমার মাইয়ারা গোসল করবো। যা জলদি যা। কাজ গুলান যদি একটু ও অদিক ওদিক হয় না ত এর শাস্তি তর মায়ে পাইবো ঘিলু তে ঢুকাইয়া নে।
মেয়েটা আর কিছুই বলে না। মাকে তুলে তার ঘরে দিয়ে আসে। আর একটা বড় বলতি নিয়ে চলে যায় কুয়োর কাছে। কুয়ো টা তাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে।
মেয়েটা কুয়োর কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বালতি টা কুয়োর ভেতর ফেলে দেই। এরপর পানি ভর্তি হয়ে গেলে দড়ি টেনে বালতি টা নামাই।
মেয়েটার বয়স কতই বা হবে ১৭, ১৮। এতো ভারী বালতি টা টেনে নিয়ে যেতে তার এই জীর্ণ শীর্ণ শরীরের খুব ক’ষ্ট হচ্ছে কিন্তু তার যে আর কোনো উপায় নেই। এই কাজ টা ভালো মতো করতে না পারলে তার মায়ের ওপর যে তার চাচী আবারো অ’ত্যা’চা’র শুরু করবে।
মেয়েটা অনেক ক’ষ্টে ৫ বালতি পানি আনতে পারে। এরপর তার শরীর আর সাই দিচ্ছে না। সারাদিন কিছুই খেতে দেইনি তার চাচী। ক্ষুধার্থ পেটে কাজ করা দাই হয়ে গিয়েছে।
তাও মেয়েটা অনেক ক’ষ্টে ৬ নম্বর বালতি করে পানি আনে। পানির বালতিটা এনে অন্য বালতি তে ঢালার আগেই লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। না অজ্ঞান হারাই নি তবে শরীর আর চলেছে না তার।
তখনই বাড়ির ভেতর থেকে তার চাচাতো বোন বের হয়ে আসে। যার মুখে আছে এক শয়তানি হাসি। সে দৌঁড়ে বাড়ির ভেতর গিয়ে তার মাকে ডেকে আনে। মেয়েটির চাচী বাইরে এসে দেখে মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে আছে।
তিনি মেয়েটির কাছে গিয়ে তার চুলের মুঠি ধরে টেনে তোলে আর তাকে গা’লা’গা’লি করতে শুরু করে। এতো বাজে বাজে কথা তাকে বলছিল যে মেয়েটার গাঁ গুলিয়ে আসছিল।
—এই অপয়া তুই ম’র’তে পারস না। তর আর তর মায়ে জন্যে আমাগো গেরামে থাকা দাই হইয়া যাইতাছে। কবে যে এই আপদ দুইডা ম’র’বো আর আমি একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেবো।
বলেই মহিলাটি নিজের মেয়ে কে রান্না ঘর থেকে একটা চ্যালা কাঠ আনতে বলে। মেয়েটি দৌঁড়ে রান্না ঘর থেকে একটা চ্যালা কাঠ এনে মায়ের হাতে ধরিয়ে দেই।
এরপর মহিলা টি চ্যালা কাঠ দিয়ে ইচ্ছা মতো মাটিতে লুটিয়ে থাকা মেয়েটিকে মা’র”তে থাকে। মেয়েটি কোনো চিৎকার করছে না শুধু তার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়ছে। মেয়েটির গায়ের জায়গাই জায়গাই ছিঁলে র’ক্ত বের হচ্ছে।
কিন্তু মেয়েটি কোনো প্রতিবাদ করছে না। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে।
হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো ফায়াজের। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ছেলেটা। রুমে এসি চলছে। রুমের টেম্পারেচার ১৭ তে। তবুও ঘামছে সে। এটা কি স্বপ্ন দেখলো সে…!!!
আজ প্রায় ৭ দিন যাবত সে এই ধরনের স্বপ্ন দেখছে সে। কিন্তু কেনো দেখছে সে এমন স্বপ্ন..? সে তো ঐ মেয়েটা কে কোনোদিন দেখে ও নি। আর দেখবেই বা কিভাবে এতো দিন তো তার দৃষ্টি শক্তিই ছিল না।
যখন থেকে কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট করেছে তখন থেকেই এইসব ভিশন দেখছে সে। যখনই সে একটু চোখ বন্ধ করছে তখনই ঐ মেয়েটার মায়াবী মুখখানা তার চোখের সামনে ভাসছে। কেমন যেনো মায়া কাজ করছে সেই অজানা মেয়েটার ওপর ফায়াজের। কিন্তু কে এই মেয়ে..? কেনো সে বার বার তার স্বপ্নে আসছে..? কি বলতে চাইছে মেয়েটা তাকে..?
তখনই ফায়াজের চোখ পড়ে ডেস্কের ওপর। যেখানে রয়েছে একটা ডাইরি। ডাইরি টা খুবই সাধারণ। হসপিটাল থেকে একজন নার্স তাকে এই ডাইরি টা দিয়েছেন আর বলেছেন যেই মেয়েটা তাকে কর্নিয়া ডোনেট করেছে এই ডাইরি টা সেই মেয়ের।
মেয়েটার নাকি শেষ ইচ্ছা ছিল তার মাধ্যমে যে এই পৃথিবীটা দেখবে ডাইরি টা যেনো তাকেই দেওয়া হয়। ফায়াজ বেড থেকে নেমে ডেস্কের দিকে যায়। ডাইরি টা হাতে নিয়ে এপিঠ ওপিঠ করে দেখতে থাকে। ডাইরি তে ছোপ ছোপ র’ক্তে”র ফোঁটা লেগে আছে। ডাইরি টা দেখেই ফায়াজের গাঁ ঘিনঘিন করছে তাই সে ডাইরি টা শব্দ করে ডেস্কের ওপর ই রেখে দেই।
ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পাই ভোর ৫ টা বাজে। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নামাজে দাঁড়ায়। নামাজ শেষে ফ্ল্যাট থেকে বের হয় জগিং এর জন্য।
৩, ৩ টা বছর সে এক অন্ধকার দুনিয়ায় ছিল। কি যে খারাপ একটা পরিস্থিতি তে ছিলো সেটা শুধু সেই জানে। জগিং শেষে আবারো ফ্ল্যাটে ফিরে ব্রেকফাস্ট রেডি করে বের হয়ে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে।
,,,,,,
নাঈম:- কি রে দোস্ত। কোথায় আছিস..?
ফায়াজ:- এই তো ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে বের হলাম। কেনো কি হয়েছে??
নাঈম:- কি হয়েছে মানে..!! এই আজকে না তোর আমাদের বাড়িতে আসার কথা ছিল।
ফায়াজ:- ওহ্ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা আমি ৩০ মিনিটের মধ্যেই আসছি।
নাঈম:- ওকে তাড়াতাড়ি আই।
বলেই নাঈম ফোন কে’টে দেই। নাঈম হলো ফায়াজের ছোট বেলার বন্ধু। তারা একসাথেই বড় হয়েছে। ৩ বছর আগে ফায়াজ একটা এক্সিডেন্টের দরুন নিজের বাবা, মা কে হারাই সাথে নিজের দৃষ্টি শক্তি ও। যার ফলে বাবা মা কে শেষ দেখা তার পক্ষে হয়ে উঠেনি। সেই এক্সিডেন্টে ফায়াজ বেশ গুরুতর আ’ঘা’ত পায়।
তখন এই নাঈম ই তার পাশে ছিল। ফায়াজ নিজের বাবার বিসনেস সামলাতো। ফায়াজের সাথে নাঈম ও বিসনেস সামলিয়েছে। কারণ তারা বিসনেস পার্টনার। ফায়াজের এমন অবস্থায় নাঈম ই বিসনেস সমলিয়েছে এতো গুলো দিন।
ফায়াজ ফ্ল্যাটে এসে রেডি হয়ে আবারো বের হয়ে পড়ে নাঈমের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষনের মধ্যে নাঈমের বাড়িতে পৌঁছিয়ে ও যায়।
ফায়াজ কিলিং বেল বাজাচ্ছে। দুইবার বেল বাজাতেই দরজা খুলে যায়। দরজা খুলতেই ফায়াজের সামনে প্রকট হয় নাঈমের ছোট বোন নুসরাত। নুসরাত কে দেখা মাত্রই ফায়াজের মুখ খানা ছোট হয়ে যায়।
ফায়াজ মেকি হেসে নুসরাতের পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। নাঈম সোফায় বসে বসে টিভি দেখছিল। ফায়াজ তাড়াতাড়ি গিয়ে নাঈমের পাশে বসে পড়ে। নাঈম চিপস খাচ্ছে আর টিভি দেখছে।
ফায়াজ নাঈম কে কিল মা’র’তে’ই বেচারার হাত থেকে চিপসের পকেট টা পড়ে যায়। নাঈম পাশে তাকাতেই দেখতে পাই ফায়াজ বসে আছে।
নাঈম:- কি রে বেটা এইভাবে কিল কেনো মা’র’লি..?? আমার সব চিপস নিচে পড়ে গেলো। এগুলো এখন কে পরিষ্কার করবে…????
ফায়াজ:- চিপস যেহেতু তুই খেয়েছিস তাই পরিষ্কার ও তুইই করবি।
নাঈম:- অসম্ভব আমি কেনো করব..??? শালা তুই আমাকে কিল মে’রে’ছি’স দেখেই তো চিপস গুলো পড়ে গিয়েছে। তাহলে তোকেই পরিষ্কার করতে হবে।
ফায়াজ:- আমি পারবো না।
নাঈম:- তোকে পারতে হবে। দোষ তোর তাই তুইই পরিষ্কার করবি।
ফায়াজ:- না আমি পারবো না। তুই কর। তোর বাড়ি, তুই চিপস খাচ্ছিলি তাই তুইই করবি।
নাঈম:- তুই …..
নাঈম কিছু বলার আগেই নুসরাত ভেতরে এসে বলে,
নুসরাত:- আরে ভাইয়া আমি তো আছি নাকি। আমি থাকতে তোমাদের কে কেনো ক’ষ্ট করতে হবে। আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
নুসরাতের কথা শুনে নাঈম তো অবাক হয়ে যায়। কারণ যেই মেয়ে জল গড়িয়ে খাইনা সে নাকি তার হাতে ফেলা চিপস গুলো পরিষ্কার করবে। তাই নাঈম বলে,
নাঈম:- এই তুই কি ঠিক আছিস..?? না মানে তোর শরীর টরীর আবার খারাপ হলো না তো।
নুসরাত:- কেনো শরীর খারাপ কেনো হতে যাবে..?? সর আমি পরিষ্কার করে দেই।
নাঈম:- শরীর খারাপ না। তাহলে নিশ্চয়ই তোকে ভূতে ধরেছে হ্যাঁ।
নুসরাত:- কি আজব কথা বলছিস তুই..?? ভূতে কেনো ধরতে যাবে। (ভ্রু কুঁচকে)
নাঈম:- ভূতে ও ধরেনি শরীর ও খারাপ হয়নি তাহলে আজকে কি সূর্য পশ্চিম আকাশে উঠেছে নাকি রে। না মানে তুই নিজে যেচে আমার কাজ করতে আসছিস তো তাই বললাম।
নুসরাত:- বেশি কথা বললে না আম্মু কে বলে দেবো যে তুই আমাকে জ্বালাচ্ছিস তারপর আম্মু তোকে উত্তম মধ্যম দেবে।
নাঈম:- না না আম্মু কে বলিস না। আমি কিছুই করছি না। তুই তোর মতো কাজ কর।
বলেই নাঈম, ফায়াজের দিকে তাকাই। নুসরাত কে দেখে ফায়াজ কিছুটা বিরক্ত হচ্ছে যেটা নাঈম ও খেয়াল করে। নাঈম এবার বুঝতে পারছে যে কেনো নুসরাত কাজ করতে চাইছে।
নাঈম:- উফ্ এই নুসরাত কে নিয়ে আর পারি না। কতবার বলেছি যে ফায়াজের ব্যাপারে বেশি ভাববি না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। শেষে যখন ফায়াজ কে পাবে না তখন কেবলির মতো বসে বসে কাদবি ঐটাই তোর জন্য ঠিক। (মনে মনে)
ফায়াজ, নাঈমের কানের কাছে এসে বলে,
ফায়াজ:- বলছি যে তোর রুমে চল। কিছু কথা ছিল তোর সাথে।
ফায়াজের কথাই নাঈম বাস্তব জগতে ফেরে। সে ফায়াজ কে বলে,
নাঈম:- ঠিক আছে চল।
বলেই ফায়াজ নাঈমের সাথে তার রুমে চলে যায়। রুমে গিয়েই ফায়াজ রুমের দরজা আটকে বেডের ওপর গিয়ে বসে। নাঈম ও তার পাশে বসে। ফায়াজ কে দরজা আটকাতে দেখে নাঈম বলে,
নাঈম:- দরজা আটকালী যে..? কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে যে দরজা আটকালি..???
ফায়াজ:- ভাই তুই এ কার কর্নিয়া ট্রান্সপ্ল্যান্ট করিয়েছিস.?? যে দিন থেকে চোখের অপারেশন হয়েছে ঐদিন থেকেই খালি আজব আজব স্বপ্ন আসছে।
নাঈম:- কি ধরনের স্বপ্ন আসছে তোর..?? তুই ও আবার ভূতের স্বপ্ন টপ্ন দেখছিস নাকি..?? (ভ্রু কুঁচকে)
নাঈমের কথাই ফায়াজ বলে,
ফায়াজ:- না ভূতের স্বপ্ন কেনো দেখবো। আমি স্বপ্নে একটা প্রত্যন্ত গ্রাম দেখতে পাচ্ছি। আর একটা মেয়েকে যে বেশ অ’ত্যা’চা’রি’ত। কি মায়াবী চেহারা মেয়েটার। কিন্তু ওর জীবনে খুব ক’ষ্ট। মেয়েটা প্রতিদিনই আমার স্বপ্নে আসছে আর একেক দিন একেকটা ঘটনা দেখতে পাচ্ছি আমি। স্বপ্নের ঘটনা গুলো দেখে মনে হচ্ছে যে সব কিছু আমার সাথেই হচ্ছে। বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে আমার সাথে এইসব।
নাঈম, ফায়াজের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে জোরে জোরে হাসতে শুরু করে। অনেক ক’ষ্টে হাসি থামিয়ে নাঈম, ফায়াজ কে বলে উঠে,
নাঈম:- ভাই তুই আর স্বপ্ন পেলিনা। এইসব স্বপ্ন দেখছিস এখন।
বলেই আবারো হাসতে থাকে। ফায়াজ, নাঈম কে এক লা”থি মে’রে বেড থেকে ফেলে দিয়ে বলে,
ফায়াজ:- শালা হাসছিস কেন..?? আমি হাসির মতো কি বললাম যে তোর হাসি এখনো থামছে না..??
নাঈম এখনো সমান তালে হেসেই যাচ্ছে। নাঈম কে এইভাবে হাসতে দেখে ফায়াজ বলে,
ফায়াজ:- তুই শালা হাসতেই থাক আমি গেলাম। এইসব স্বপ্নের রহস্য আমি নিজেই বের করবো।
বলেই ফায়াজ রুমের দরজা খুলে বের হতে যায় কিন্তু তার আগেই তার সামনে নুসরাত হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। নুসরাত কে আচমকা সামনে দাঁড়াতে দেখে ফায়াজ একটু ভয় পেয়ে যায় কিন্তু সে নিজেকে সামলিয়ে নেয়।
নুসরাতের পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই নেবে তখনই নুসরাত বলে উঠে,
নুসরাত:- ভাইয়া আপনি কোথায় যাচ্ছেন..?? আপনাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এসেছি।
ফায়াজ মেকি হেসে বলে,
ফায়াজ:- ঐ নাস্তা তুমি তোমার ভাই কেই খাওয়াও। আমি গেলাম।
বলেই আর এক মুহুর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে এক রকম দৌড়িয়ে নিচে নেমে আসে ফায়াজ। ফায়াজ বের হতেই যাবে এমন সময় পিছন থেকে নাঈমের মা মিসেস রুবিনা ফায়াজ কে ডেকে ওঠে,
—ফায়াজ বাবা, এক্ষণই চলে যাচ্ছিস..?? দুপুরের খাবার টা খেয়েই নাহয় যা।
ফায়াজ পিছনে ঘুরে বলে,
ফায়াজ:- না আন্টি আজকে সময় হবে না অন্যদিন আসে খেয়ে যাবো।
ফায়াজ মিসেস রুবিনা কে আর কোনো কথা বলতে না দিয়ে বের হয়ে যায়। ফায়াজ নিজের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ড্রাইভ করতে শুরু করে। আর সেই স্বপ্ন গুলোর কথাই ভাবতে থাকে।
হঠাৎ করেই ফায়াজ গাড়ির ব্রেক কষে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার চোখ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তার গাড়ির সামনে স্বপ্নে দেখা সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। যার পরনে রয়েছে র’ক্তে ভেজা সাদা সালোয়ার কামিজ।
চুল গুলো উস্কো পুস্কো হয়ে আছে। কপালের এক পাশে বেশ অনেকটা কে’টে গিয়েছে। কে’টে গিয়েছে বললে ভুল হবে মাথা ফেটে গলগল করে র”ক্ত পড়ছে। ফায়াজ তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হয়ে মেয়েটার কাছে যায়।
মেয়েটার কাছে যেতেই মেয়েটা ফায়াজের গায়ে ঢলে পড়ে। ফায়াজ ও মেয়েটিকে আগলে নেয়। মেয়েটি ঠিক মতো শ্বাস নিতে পারছে না। আশপাশ দিয়ে অনেক লোক যাচ্ছে। সবাই ফায়াজের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে।
ফায়াজ ও বেশ অবাক হয়ে গিয়েছে এতো গুলো লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউই এই মেয়েটিকে সাহায্য করছে না। ফায়াজ আর উপায় না পেয়ে নিজেই মেয়েটিকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসাই।
এরপর গাড়ি স্টার্ট দেই। তার গন্তব্য এখন হসপিটাল। মেয়েটার যা অবস্থা, দেখে মনে হয় না যে বাঁচবে। কিন্তু ফায়াজ একটা শেষ চেষ্টা করতে চাই। ফায়াজ হসপিটালের সামনে গাড়ি থামিয়ে মেয়েটিকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
ভেতরে প্রবেশ করতেই আরেক দৃশ্য দেখা যায়। ফায়াজের দিকে সবাই কেমন ভাবে যেনো তাকিয়ে আছে। ফায়াজ ও খেয়াল করেছে। কিন্তু সে সেইদিকে পাত্তা না দিয়েই ডাক্তার কে ডাকতে শুরু করে।
একটা ডাক্তার তার দিকে এগিয়ে এসে বলে,
—কি হয়েছে মিস্টার..?? আপনি এইভাবে ডাকাডাকি কেনো করছেন..??
ফায়াজ:- ডাক্তার এই মেয়েটির অবস্থা খুব খারাপ। আপনি ওর ট্রিটমেন্ট করুন। খুবই বাজে অবস্থা বেচারীর।
ডাক্তার অবাক হয়ে ফায়াজ কে জিজ্ঞেস করে,
—কোন মেয়ে। কার কথা বলেছেন আপনি..??
ফায়াজ তখন নিজের কোলে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। কারণ তার কোলে মেয়ে তো দূর কেউই ছিল না। কিন্তু ফায়াজ তো মেয়েটিকে কোলে করেই নিয়ে এলো। মেয়েটির অবস্থা খুব খারাপ ছিল।
ওর তো বাঁচার ই কথা নয়। তাহলে কোথায় গেলো মেয়েটা..?? এতো বড় মিস্টেক তো ফায়াজ করবে না। সে স্পষ্ট দেখেছে যে মেয়েটা তার গাড়ির সামনে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে মেয়েটাকে নিয়ে হসপিটালে ও এলো।
তাহলে মেয়েটা এক নিমেষে গেলো কোথায়..?? একদম কর্পূরের মতো উবে গেলো মেয়েটা…!! ডাক্তার ফায়াজের কাঁধে হাত রাখতেই ফায়াজ চমকে যাই।
—কি হয়েছে আপনার.??? এইরকম আজব ব্যবহার কেনো করছেন..?? কোথায় মেয়েটা.?? কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না।
ফায়াজ:- এখানেই তো ছিল মেয়েটা। বিশ্বাস করুন এখানেই ছিল। ওর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। মাথা বেশ অনেকটা ফেটে গিয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিলো যে মেয়েটা আর বাঁচবে না।
—আপনি নিজেই দেখুন না। এখানে তো কোনো মেয়েই নেই। আর আপনি তো খালি হাতেই হসপিটালে এসেছেন।
ফায়াজ ডাক্তারের কথা শুনে একহাত দিয়ে চুল টেনে ধরে আর ভাবতে লাগে সে দেখাই এতো বড় ভুল করবে..?? তখনই তার মনে পড়ে যে সে কেনো হসপিটালের দিকে আসেছিল। ফায়াজ রিসিপশনে গিয়ে রিসিপশনিষ্ট কে জিজ্ঞেস করে,
ফায়াজ:- বলছি যে ডক্টর মাহমুদ কি আজকে ডিউটিতে আছেন..?? তাহলে উনার সাথে দেখা করতাম।
—দাড়ান চেক করে জানাচ্ছি।
মেয়েটি চেক করে বলে,
—হ্যাঁ উনি আছেন। তবে এখন ব্রেক টাইম চলছে। উনি কারোর সাথেই দেখা করবেন না এখন।
ফায়াজ:- আমার সাথে দেখা করবেন উনি। আপনি উনাকে ফোন করে বলুন যে ফায়াজ এহসান উনার সাথে দেখা করতে চায়।
—কিন্তু উনি এখন ব্রেক টাইমে আছে। এখন ফোন করলে রা’গ করবেন।
ফায়াজ:- আমি বললাম না আমার নাম বলুন তাহলে উনি আর রা’গ করবেন না।
—আচ্ছা।
বলেই মেয়েটি ডাক্তার মাহমুদ এর এসিস্ট্যান্ট কে কল করে। ফায়াজের নাম বলা মাত্রই তাকে যাওয়ার পারমিশন দেই। ফায়াজ দ্রুত পায়ে ডক্টর মাহমুদের কেবিনের দিকে যায়।
তখনই পিছন থেকে এক মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে। যেটা ফায়াজের খুব পরিচিত। গত ৭ দিন যাবত সে এই কন্ঠ শুনছে। পিছনে মুড়তেই ফায়াজ দেখতে পাই সেই মেয়েটিকে যাকে নিয়ে হসপিটালে এসেছিল। আর হসপিটালে আশা মাত্রই মেয়েটি গায়েব হয়ে যায়।
মেয়েটি এখন পুরো পুরি ঠিক। কপালে ও কোনো আ’ঘা’তে’র চিহ্ন নেই। মেয়েটির শরীর থেকে একটি নরম আলো বের হচ্ছে যেটা দেখে ফায়াজ তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফায়াজ মেয়েটার কাছে আসতেই মেয়েটি মুচকি হেসে বলে,
—আপনি এখনো আমার দেওয়া ডাইরি টা পড়েন নি তাইনা। কেনো পড়েন নি..?? ঐ ডাইরি টা তো আমি আপনার জন্যই রেখেছি।
ফায়াজ:- এই মেয়ে কে তুমি..?? তুমি তো রাস্তায় অনেক খারাপ অবস্থায় ছিলে। আমি তোমাকে নিয়ে হসপিটালে আসতেই তুমি কোথায় গায়েব হয়ে গেলে হ্যাঁ..??
—আমি কে সেটা জানতে গেলে তো সেই ডাইরি টা পড়তে হবে।
ফায়াজ:- ঐ সব ডাইরি ফাইরি পড়ার টাইম আমার নেই। আমি যা জিজ্ঞেস করছি সেটার উত্তর দাও। কে তুমি..?? হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলে কিভাবে..?? আর তুমি তো একদম ঠিক আছো তাহলে রাস্তায় ঐ অবস্থায় পড়ে ছিলে যে..?? এই একমিনিট তুমি আবার চোর নও তো..?!!
মেয়েটি আবারো হেসে বলে,
—হুম আমি চোর। আপনার খুব দামি একটা জিনিস আমি চুরি করবো খুব শীগ্রই।
বলেই ফায়াজের চোখের সামনে থেকেই মেয়েটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। যেটা দেখে ফায়াজের তো হুস উড়ে যাওয়ার উপক্রম।
ফায়াজ:- আরে মেয়েটা কোথায় গেলো..?? এক নিমেষেই হাওয়ায় কীভাবে মিলিয়ে গেলো। না না নিশ্চই মেয়েটা ম্যাজিক জানে। আমাকে ম্যানিপুলেট করতে চাইছে ঐ মেয়ে।
বলেই আবারো ডক্টর মাহমুদের কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। ডক্টর মাহমুদ লান্স করে কিছু পেশেন্টের রিপোর্ট নিয়ে বসেছিলেন। কারণ এখনো ব্রেক টাইম শেষ হয়নি। ফায়াজ নক করে ডক্টর মাহমুদের কেবিনের প্রবেশ করে।
—কি ব্যাপার ফায়াজ.. কেমন আছো..?? তোমার তো আরো দুইদিন পর আশার কথা ছিল। তাহলে আজকে এলে যে…?? কোনো সমস্যা হচ্ছে নাকি…???
ফায়াজ:- সমস্যা মানে। বিশাল বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আংকেল।
ডক্টর মাহমুদ একটু নড়েচড়ে বসলেন আর ফায়াজ কে জিজ্ঞেস করলেন,
—চোখে কি কোনো প্রবলেম হচ্ছে…??? মানে দেখতে পাচ্ছ না ঠিক মতো..?
ফায়াজ:- দেখতে তো পাচ্ছি কিন্তু নরমাল জিনিসের সাথে অন্য কিছু ও।
—মানে..? একটু ক্লিয়ার করে বলবে।
তখন ফায়াজ সব কিছু খুলে বলে। সব কিছু শুনে ডক্টর মাহমুদ বলে উঠেন,
—অসম্ভব তুমি যে মেয়ের বর্ণনা আমাকে দিচ্ছ ঐ মেয়েটাকে তুমি কিভাবে নিজের সামনে দেখবে।
ফায়াজ:- কেনো দেখতে পাবো না..??
—না মানে তুমি যে বর্ণনা দিচ্ছ সেটা ঐ মেয়েটার সাথেই মিলে যাচ্ছে যে তোমাকে নিজের কর্নিয়া ডোনেট করেছে।
ফায়াজ ডক্টর মাহমুদের কথা শুনে বলে,
ফায়াজ:- ওহ্ আচ্ছা আংকেল ঐ মেয়েটার ডিটেলস আমাকে দিতে পারবেন প্লিজ। আমার খুব দরকার।
—সেটা কিভাবে হয় বাবা। এটা আমাদের প্রোটোকলের বিপরীতে হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোনো পেশেন্টের পার্সোনাল ডিটেলস কাউকেই দিতে পারি না।
ফায়াজ:- আংকেল আমি খুব বড় বিপদে পড়েছি। আমার সব কিছু জানতে হবে। সেই মেয়েটা আমার স্বপ্ন, আমার বাস্তব জগতে সব জায়গাই আসছে। প্লিজ আংকেল, প্লিজ একটু ব্যবস্থা করুন।
—কিন্তু এটা তো নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ফায়াজ:- প্লিজ আংকেল, আমার জন্য হলে ও প্লিজ,,,,,,,,
—আচ্ছা আমি দেখছি। তুমি এখন বাড়ি গিয়ে রেস্ট নাও। আমি মেয়েটার ডিটেলস কালেক্ট করে তোমাকে পাঠিয়ে দেবো।
ফায়াজ:- আচ্ছা ।।।
বলেই ফায়াজ কেবিন থেকে বের হয়ে যায়।
,,,,,,
চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে ফায়াজ। আর এখনো অব্দি তার সাথে যা যা হয়েছে সবটা ভাবছে। হঠাৎই তার মনে পড়ে যায় সেই ডাইরির কথা। চেয়ার ছেড়ে উঠে ডেস্কের কাছে এগিয়ে যায়।
ডেস্কের ওপর থেকে ডাইরি টা নিয়ে আবারো গিয়ে বসে চেয়ারে। ফায়াজ ডাইরির ওপর হাত বোলাচ্ছে। একদম সাধারণ একটা ডাইরি। যার ওপর ফোঁটা ফোঁটা র’ক্ত লেগে আছে।
ফায়াজ ডাইরি টা খোলে। প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করছে আইরিন নামটি। ফায়াজ বুঝল ডাইরি টা আইরিন নামের কোনো মেয়ের। হাতের লেখা গুলো খুবই সুন্দর। যেকারোর মন জয় করার মতো। তবে লেখাটা একটু ছড়িয়ে গিয়েছে হয়তো পানি পড়েছিল।
কিন্তু আসলেই কি পানি পড়েছিল নাকি এটা কারোর চোখের সেই অমূল্য অশ্রু..!!! তা জানে না ফায়াজ। বেশি কিছু না ভেবে পরের পৃষ্ঠা উল্টাই সে। গুটি গুটি অক্ষরে লেখা আছে।
“ আমি আইরিন। বাবা মায়ের অনেক আদরের মেয়ে। অভাব কি জিনিস আমার বাবাই আর আম্মু আমাকে কোনোদিনও বুঝতে দেইনি। সব সময় আমাকে আগলে রেখেছেন তারা। আমার বাবাই আর আম্মু আমাকে যেমন খুব ভালোবাসেন ঠিক তেমনি আমি আমার বাবাই আর আম্মুকে খুব ভালোবাসি।
আমাদের এই তিনজনের সংসারে কানাই কানাই ছিল সুখে পরিপূর্ণ। আমি ছিলাম আমার বাবাই আর আম্মুর চোখের মণি। আমার বাবাই য়ের চাঁদ। আমার বাবাই সবসময় আমাকে চাঁদ বলেই ডাকে।
একদিন বাবাই কে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম যে কেনো আমার বাবাই আমাকে চাঁদ বলে ডাকেন। তখন আমার বাবাই বললেন আমি যখন জন্ম নেয় তখন নাকি আকাশে বড় রুপার থাকার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল। তাই আমার বাবাই আমাকে চাঁদ বলে ডাকেন। ”
ফায়াজ বুঝল মেয়েটা তার বাব মায়ের খুব আদরের। তখন ফায়াজের নিজের বাবা মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। তার বাবা মা ও তো তাকে খুব ভালোবাসতেন। নিজের বাবা মায়ের কথা মনে পড়তেই ফায়াজের চোখ গুলো ঝাপসা হয়ে আসে।
একটা এক্সিডেন্ট তার জীবন থেকে কত কিছু কেড়ে নিল। তার বাবা মা, তার জীবনের অমূল্য সম্পদ এখন আর তার কাছে নেই। ফায়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরের পৃষ্ঠা উল্টাই।
“ আজকে আমার ১৬ তম জন্মদিন। আমার বাবাই আজকে আমার খুব বড় একটা ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
আমার ফটোগ্রাফি করার খুব শখ। ফটোগ্রাফি আমার নেশা। বাবাই আমাকে ছোট্ট একটা ক্যামেরা কিনে দিয়েছেন। সেটা দিয়েই এতদিন ফটোগ্রাফি করতাম। আমার অনেক দিনের শখ একটা 𝐂𝐚𝐧𝐨𝐧 𝐄𝐎𝐒 𝐑6 𝐌𝐚𝐫𝐤 𝐈𝐈 ক্যামেরা কেনার।
আর আজকে আমার বাবাই আমার জন্য 𝐂𝐚𝐧𝐨𝐧 𝐄𝐎𝐒 𝐑6 𝐌𝐚𝐫𝐤 𝐈𝐈 কিনে এনেছেন। আজকে যে আমার কি খুশি লাগছে। আজকে এই ক্যামেরা দিয়ে আমি আমার বাবাই আর আম্মুর সুন্দর একটা ছবি তুলেছি। ”
ডাইরি তে মেয়েটির কিছু ছোট ছোট খুশির মুহূর্তের কথা লেখা আছে। ফায়াজ খুব আগ্রহ নিয়ে পরের পৃষ্ঠা উল্টাই।
“ আজকে আমার বাবাই আর আম্মু ঢাকা যাবে। আমাকে নানু মনির কাছে রেখে। আমি কিভাবে থাকবো বাবাই আর আম্মু কে ছাড়া। আমি তো এক দিনও থাকতে পারবো না।
বাবাই কে কত করে বলছি যে বাবাই আমাকে নিয়ে চলো তোমাদের সাথে কিন্তু বাবাই শুনছেনই না। তাই আমি বাবাই য়ের সাথে রাগ করেছি। আর কোনো কথা বলব না।
কিন্তু বাবাই তো আমাকে তার ওপর রেগে থাকতেই দেননি। সেই তার চাঁদের রাগ ভাগিয়ে ফেললোই। আমার পছন্দের বই দিয়ে। বাবাই তো জানেন আমি বই পড়তে খুব পছন্দ করি।
অনেক দিন ধরেই ‘𝐉𝐨𝐮𝐫𝐧𝐞𝐲 𝐭𝐨 𝐭𝐡𝐞 𝐂𝐞𝐧𝐭𝐞𝐫 𝐨𝐟 𝐭𝐡𝐞 𝐄𝐚𝐫𝐭𝐡’ বইটা বাবাই য়ের কাছে চাইছিলাম কিন্তু বাবাই বলেছেন সময় হলে ঠিকই পেয়ে যাবে। আর আজকে সেই সময় হয়েছে। কতদিন এই বইটার জন্য অপেক্ষা করেছি।
ফাইনালি পেয়ে গিয়েছি। আজকে তো সারা দিন আমি এই বইটাই পড়বো। ”
ডাইরি পড়াতে ফায়াজ এতটাই মগ্ন ছিল যে তার ফোন বাজছে সেইদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। হঠাৎ করেই ফায়াজের হাত থেকে ডাইরি টা পড়ে যায়। আর তখনই ফোনের দিকে নজর পড়ে।
ফায়াজ ফোন কানে ধরতেই ওপর পাশ থেকে এক লোকের আওয়াজ ভেসে আসে।
—ডক্টর মাহমুদের এসিস্ট্যান্ট বলছিলাম।
ফায়াজ:- জি।।।।
—আপনি যেই মেয়েটার ইনফরমেশন চাইছিলেন সেই মেয়েটার সব ইনফরমেশন আমি আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছি।
ফায়াজ:- ও আচ্ছা আমি দেখছি।
বলেই ফায়াজ কল কে’টে দেই। ওয়াটসঅ্যাপ খুলতেই দেখতে পাই মেয়েটির ঠিকানা। ফায়াজ ইনফরমেশন টা একটু ভালো করে চেক করে। মেয়েটার বয়স ২০ বছর। মেয়েটার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম রতন পুরে।
ফায়াজ ফোন টা বন্ধ করে আবারো ডাইরি টা খোলে। ফায়াজ ডাইরি টা পড়তে শুরু করে। ডাইরির অর্ধেক পৃষ্ঠা সে ইতিমধ্যেই পড়ে ফেলেছে সে। ডাইরি টা পড়তে তার বেশ ভালোই লাগছে। কত খুশি নিয়ে মেয়েটা ডাইরি টা লিখেছে।
ডাইরি পড়তে পড়তে কখন যে সন্ধ্যে নেমে গিয়েছে সেইদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। মাগরিবের আজান কানে যেতেই ফায়াজ ডাইরি টা বন্ধ করে ওয়াশরুমে যায় আর ওযু করে বের হয়ে পড়ে মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে রওনা দেই নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে। মসজিদ থেকে তার ফ্ল্যাট বেশি দূরে নয়। তবে রাস্তা টা একটু নির্জন। ফায়াজ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই খেয়াল করলো যে কেউ তার পিছু করছে।
তাই ফায়াজ পিছে মুড়তেই দেখতে পাই সেই মেয়েটা যাকে সকালে হসপিটালে দেখেছিল। ফায়াজ মেয়েটার কাছে যেতেই মেয়েটা বলে উঠে,
আইরিন:- আমার খোঁজ পেয়ে গিয়েছেন..!!! কিন্তু ঐখানে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। (মুচকি হেসে)
ফায়াজ:- এই মেয়ে তুমি এখানে কেনো..? এতো রাতে একটা ছেলের পিছু করছো। জানের ভয় নেই নাকি..!! জানো না রাস্তা ঘাট ভালো না।
আইরিন আবারো মুচকি হাসে আর বলে,
আইরিন:- এখন আর জানের ভয় হয়না। তবে আগে খুব হতো।
ফায়াজ:- নিজেকে খুব সাহসী মনে করো দেখছি।
আইরিন:- হুম।
ফায়াজ:- আচ্ছা একটা কথা বলতো, তুমি তো সকালে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলে আমি তোমাকে নিয়ে হসপিটালে ও গেলাম কিন্তু তুমি হঠাৎ করেই কোথায় উধাও হয়ে গেলে হুম।
আইরিন আবারো হেসে বলে,
আইরিন:- আমি কেনো বলবো। আপনার প্রশ্নের উত্তর আপনি নিজেই খুঁজে বের করুন।
ফায়াজ:- হুম বের তো করবই। কালকেই আমি তোমার গ্রামে যাবো। ঐখানে গেলে তোমার সব খবর আমি বের করব।
আইরিন:- বের করতে পারলে করুন। তবে আপনি কিছুই জানতে পারবেন না আমার সম্পর্কে।
ফায়াজ বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে ঘুরে দাড়াই। কিছু একটা ভেবে আবারো পিছনে তাকাতেই দেখতে পাই আইরিন সেখানে নেই।
ফায়াজ:- আইরিন, আইরিন কোথায় গেলো.?? একটু আগেই তো মেয়েটা এখানে ছিল। আবারো কর্পূরের মতো উবে গেলো।
ফায়াজ আর ভাবলো না। তাড়াতাড়ি নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে গেলো।
,,,,,,
ফায়াজ রেডি হচ্ছে রতন পুরে যাওয়ার জন্য। এই আইরিনের হাবভাব তার মোটেও ভালো ঠেকছে না ফায়াজের কাছে। মেয়েটা হঠাৎ করেই তার সামনে আসে আর হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা জার্নি করে সে রতনপুরে পৌঁছায়। আইরিনের ছবি তো তার কাছে নেই কিন্তু সে নাম যানে। তাই গ্রামে ঢুকেই সে আইরিনের নাম নিয়ে আশেপাশের লোক জনেদের জিজ্ঞেস করতে থাকে।
তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আইরিনের নাম শুনেই সবাই ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউই তার ব্যাপারে কিচ্ছু বলতে চাইছে না। ফায়াজ ব্যাপারটা কে এতটা আমলে নেয় না।
অনেক জন কে জিজ্ঞেস করার পর ও কেউ বলতে চাইছে না। তখনই ফায়াজের চোখ পড়ে একটা বাড়ির ওপর। গত ৭ দিন যাবত সে এই বাড়িটাই স্বপ্নে দেখে আসছে।
ফায়াজ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়িটা বেশ পুরোনো। ফায়াজ বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে আওয়াজ দিতে থাকে। অনেক বার ডাকার পর বাড়ির ভেতর থেকে এক মহিলা বের হয়ে আসে।
মহিলাটি ফায়াজ কে দেখে বলেন,
—এই ছেঁড়া কে গো তুমি। কহন থাইক্কা ডাকতাছো। কি কাম আছে তাড়াতাড়ি বইল্লা যাও এহান থেইক্কা।
ফায়াজ:- আমি আসলে আইরিনের খোঁজে এসেছিলাম। আর এটা আইরিনের বাড়ি তো..??
ফায়াজের কথা শুনে মহিলাটি রেগে গিয়ে উচ্চ বলেন,
—এই ছেঁড়া কি কইলা..?? এইডা ঐ অলক্ষীর বাড়ি..!! কে কইছে যে এইডা ঐ অলক্ষ্মীর বাড়ি। এইডা আমার বাড়ি হুনছ এইডা আমার বাড়ি।
ফায়াজ:- আচ্ছা আচ্ছা ভুল হয়ে গিয়েছে। আইরিন এই বাড়িতে থাকত নাকি??
—হেই মাইয়া রে আমি আরো ৩ বছর আগে আমার বাড়ি থেইক্কা বাইর কইরা দিছি।
ফায়াজ:- কি বের করে দিয়েছেন।
—হ।। ঐ অলক্ষীর জন্যে গেরামে টিকা দাই হইয়া যাইতাছিল।
ফায়াজ:- কেনো.?? কি করেছে আইরিন..??
—হেই মাইয়া কি কি সব দেখতে পাইতো।
ফায়াজ:- কি কি সব দেখতে পেতো মানে.?? (ভ্রু কুঁচকে)
—ওত কথা আমি কইতে পারমু না। এই ছেঁড়া তুমি ঐ অপয়ার না’গ’র নাকি.??
মহিলার মুখের ভাষা শুনে ফায়াজের কেমন কেমন লাগছে। তাই ফায়াজ আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে যায়। ফায়াজ স্বপ্নে এই মহিলাকে যেমন দেখেছিল তেমনি ব্যবহার কিন্তু ফায়াজ এতো কারেক্ট স্বপ্ন কিভাবে দেখলো…???
ফায়াজ ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে ফ্রেশ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
,,,,,,
একটা মিষ্টি হাসির শব্দ ভেসে আসছে ফায়াজের কানে। ফায়াজ শব্দটার পিছু করতে করতে একটা বাগানে ঢুকে পড়ে। বাগানে খুব সুন্দর সুন্দর ফুল আছে।
হাসির শব্দ এখনো ফায়াজের কানে ভেসে আসছে। ফায়াজ শব্দটার পিছন করতে করতে বাগানের একদম মাঝখানে চলে আসে।
বাগানের একদম মাঝখানে একটা মেয়ে বসে বসে হাসছে। মেয়েটা অন্যদিকে মুখ করে বসে আছে তাই ফায়াজ মুখ দেখতে পাচ্ছে না। ফায়াজ মেয়েটার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে। কাঁধে হাত রাখতেই মেয়েটি তার দিকে তাকাই।
মেয়েটি তাকাতেই ফায়াজের মুখ থেকে অস্পষ্ট ভাবে বের হয়ে আসে আইরিনের নাম খানা। আইরিন এখনো হাসছে। ফায়াজ মুগ্ধ নয়নে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আইরিনের চেহারা দিয়ে যেনো নুর বের হচ্ছে। এতটা স্নিগ্ধ লাগছে আইরিন কে যে ফায়াজ চোখই ফেরাতে পারছে না। হঠাৎ করেই আইরিন হাসি থামিয়ে বলে উঠে,
আইরিন:- বলেছিলাম না যে ঐখানে গিয়ে কিছুই জানতে পারবেন না। তাও কষ্ট করে কেনো গেলেন..!!
ফায়াজ:- ঐখানে তোমার নাম শুনে সবাই কেমন একটা অদ্ভুত ব্যবহার করছিল। কি ব্যাপার বলত। তোমার নাম ও কেউ শুনতে পারছে না।
আইরিন:- ওরা এমনই। আমি তো ওদের ভালোর কথাই ভেবেছিলাম কিন্তু ওরা খুব বাজে। খুব বাজে ওরা।
ফায়াজ, আইরিনের পাশে এসে বসে।
ফায়াজ:- কি করছো এইসব.?
আইরিন:- এইতো মালা গাঁথছি।
ফায়াজ:- এই বাগান টা কার..?? এখানে বসে আছো যে..?
আইরিন:- এটা আমারই বাগান। ভালো লাগছে আপনার..??
ফায়াজ:- হুম।
আইরিন:- আপনি পুরো ডাইরি টা পড়েননি তাই না।
ফায়াজ:- হুম।
আইরিন:- আর পড়বেন না..??
ফায়াজ:- পড়বো।
তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। হঠাৎ করে আইরিন বলে উঠে,
আইরিন:- এবার আপনার যাওয়া উচিত। বেশিক্ষণ স্বপ্নে থাকা ভালো হবে না।
ফায়াজ:- কেনো.??
আইরিন:- এমনি। আপনি এখন যান।
তখনই ফায়াজের ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। ফায়াজ উঠেই চারপাশে তাকাতে দেখতে পাই সে নিজের রুমে আছে। তার মানে এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল।
ফায়াজ উঠেই আবারো আইরিনের ডাইরি টা নিয়ে বসে। এবার ডাইরির বেশ অনেকটা পাতা উল্টে পড়তে শুরু করে।
“ বাবাই তুমি কোথায় আছো..?? তোমাকে খুব মিস করছি। জানো বাবাই আম্মুর না ঔষুধ গুলো শেষ হয়ে গিয়েছে। চাচী কে অনেকবার বললাম আম্মুর ঔষুধ গুলো কেনার জন্য কিছু টাকা দিন তাও চাচী দিলেন না।
তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই সবাই আমাদের সাথে কেমন একটা ব্যবহার করে। নানু মনি ও তো আমাদের কে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তোমার যাওয়ার পর মামা মামীর কাছে আমি আর আম্মু যায়।
জানো বাবাই মামা মামী আমাকে আর আম্মু কত বাজে বাজে কথা বলেছেন। অনেক অপমান করেছেন। আমাকে মে’রে’ছে’ন ও। আমি তাদের কে কিছুই বলতে পারিনি। আম্মু বারণ করেছিল তাই।
জানো বাবাই আম্মুর শরীর না দিন দিন আরও বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছুই খেতে পারছে না আম্মু। প্লিজ বাবাই ফিরে এসো না ”
ফায়াজ বুঝতে পারে না যে আইরিন কেনো এমন কথা বলছে তাই সে কিছু পাতা আগে যায়। হঠাৎ করেই একটা পাতায় চোখ আটকে যায় তার।
সেই পৃষ্ঠার লেখা গুলো সব ছড়িয়ে আছে। ফায়াজ লেখা গুলো পড়তে লাগে।
“ বাবাই আমাদের কে ছেড়ে কেনো গেলে তুমি..?? আম্মু অনেক ভেঙ্গে পড়েছে। এখন আমাদের কে খেয়াল রাখবে। ফিরে এসো না বাবাই। কেনো তুমি রাস্তা ক্রস করতে গেলে বাবাই।
তোমার নিথর দেহটা রাস্তায় পড়ে ছিল কিন্তু আমি চেয়েও তোমার কাছে যেতে পারলাম না বাবাই। পুলিশ আসলো, তোমাকে শেষ দেখা দেখতে চাইলাম তাও তোমাকে দেখতে পারলাম না।
ঐ ট্রাক টা আমার চোখের সামনে দিয়ে পিষে চলে গেলো কিন্তু কেউ তোমাকে বাঁচাতে গেলো না। আমাকে ও কেউ যেতে দিলো না। ”
ফায়াজ বুঝতে পারলো যে আইরিনের বাবা মা’রা গিয়েছেন। ফায়াজ আবারো ডাইরির পাতায় উল্টা তে লাগলো।
“ বাবাই কার নজর পড়েছিল আমাদের এই সুখের সংসারে। তুমি ও চলে গেলে আর আমাদের দুঃখের দিন শুরু হলো।
বাবাই আজকে না চাচী আমাকে অনেক মে’রে’ছে’ন। পুরো শরীর আমার ব্য’থা’য় টনটন করছে। আমাকে না পুরো বাড়ি পরিষ্কার করতে বলেছিলেন।
এতো বড় বাড়ি আমি একা হাতে কি পরিষ্কার করতে পারি..!! আমি তো আগে কক্ষনোই এইসব কাজ করিনি তাই না। বাবাই আমাকে ও তোমার সাথে নিয়ে যাও। ”
চলবে…………..