Story: Cry Or Better Yet Beg (04)

(বাংলা অনুবাদ)

Author : Solche
পর্ব ৪

 

 

_______

গিলিস গার্লস স্কুলের সামনে লম্বা সুদর্শন একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে আর কেউ নই, সে হলো কাইল ইটম্যান। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন সে স্কুলের দেয়াল বা রাস্তার বাতির মতোই স্বাভাবিকভাবে সেই জায়গার অংশ।

“সে আবার এসেছে!” স্কুলের মেয়েরা হালকা আগ্রহ নিয়ে সুদর্শন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভাবল।

স্কুলের প্রধান ফটকের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে কাইল মুচকি হাসল। দূরে সে এক তরুণীকে দেখতে পেল, যে তার সাইকেল হাঁটিয়ে তার দিকেই আসছে। তার দৃঢ় অথচ মার্জিত হাঁটার ভঙ্গি দেখেই সে তাকে চিনে ফেলল। শুধু হাঁটার ভঙ্গি নয়, তার প্রাণবন্ত মুখভঙ্গি আর কোমল চলাফেরাও তাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, এ লায়লাই। লায়লার মতো আর কোনো মেয়ে নেই। সে এই সত্যটা জানত সেই গ্রীষ্মের দিন থেকেই, যেদিন সে প্রথম উইলো গাছের ছায়ায় বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটির কাছে গিয়েছিল।

“লায়লা!”

কারও ডাকে নিজের নাম শুনে লায়লা থেমে গেল। চোখ কুঁচকে তাকাল, তারপর আবার হাঁটা শুরু করল, আগের চেয়ে একটু দ্রুত। এই মুহূর্তগুলো কাইলের খুব প্রিয় ছিল, যখন তাকে দেখেই লায়লা দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে, মুখে হাসি নিয়ে। “তুমি এখানে এলে কেন?” সে জিজ্ঞেস করল। “কটেজে গিয়ে দেখা করলে কি সহজ হতো না?”

“হ্যা, কিন্তু স্কুল তো আমার বাড়ি ফেরার পথেই পড়ে।” কাইল উত্তর দিল। অবশ্য এটা মিথ্যা। সে টেনিস ক্লাবের বন্ধুদের ফেলে রেখে এসেছে শুধু লায়লাকে স্কুল থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যদিও ক্লাবের বড়রা পরের দিন র‌্যাকেট হাতে তাকে অপেক্ষা করাবে, যেন অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও সে এখন এসব নিয়ে ভাবছিল না। আগামীকালের সমস্যা আগামীকালই সামলানো যাবে। যা হওয়ার হবে।

তারা দু’জনে ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। রাস্তার ধারে স্টলের দোকান গুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা আইসক্রিম কিনল এবং হাঁটতে হাঁটতে খেতে লাগল। তারা এক বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারল, যেখানে পুরনো বইয়ের হালকা মিষ্টি গন্ধ ভাসছিল। লায়লা অনেক হাসছিল। বিল ছাড়া পৃথিবীতে একমাত্র কাইলই জানত, সে কতটা হাসে। কাইল এটা জানত, আর এতে সে খুশি হতো।

আরভিসের দিকে যাওয়ার রাস্তায় ঢোকার পর বাতাসটা অনেক ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কথা যখন পরীক্ষার দিকে গেল, লায়লার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। আর জ্যামিতির কথা উঠতেই সেই গাম্ভীর্যে হতাশার ছোঁয়া যোগ হলো।

কাইল তার মুখের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো খেয়াল করল। এখনই না, সে নিজেকে থামাল। তার মনে হচ্ছিল ভালোবাসার কথা বলে ফেলবে, কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করে তাদের সম্পর্ক অস্বস্তিকর করতে চায় না। সে ভাবল, আদৌ কি তাদের আলাদা করে প্রেম করা দরকার? সরাসরি বিয়েতেই চলে গেলে কেমন হয়? লায়লা ইটম্যান… নামটা বেশ ভালো শোনায়।

“তুমি হাসছ কেন?” লায়লা জিজ্ঞেস করল। সে তখন জ্যামিতির নম্বর না বাড়ার কথা বলে বিরক্ত হচ্ছিল, হঠাৎ খেয়াল করল কাইল কিছু একটা ভেবে হাসছে।

“ওহ… হ্যাঁ! শুনেছি ডিউক হেরহার্ড্ট ফিরে আসছেন?” কাইল দ্রুত বিষয় পাল্টানোর চেষ্টা করল। “অনেক দিন হয়ে গেছে। তিনি কবে আসবেন?”

“জানি না।”

“সবাই তার কথাই বলছে, ডিউক হেরহার্ড্ট এই, ডিউক হেরহার্ড্ট সেই। কিন্তু তোমাকে তো একদম আগ্রহী মনে হচ্ছে না।”

লায়লা তার সাইকেলের হ্যান্ডেল আরও শক্ত করে ধরল। ডিউকের সঙ্গে তার খুব বেশি যোগাযোগ ছিল না, মাঝে মাঝে জঙ্গলে দেখা হওয়া, কিংবা ক্লডিনের আমন্ত্রণে প্রাসাদে গিয়ে দেখা হওয়া ছাড়া। তাকে দেখলেই তার অস্বস্তি হতো, তাই সে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলত। দেখা হয়ে গেলে মাথা নিচু করে রাখত, যাতে তাকাতে না হয়। সে এমনই অনুভব করে আসছে সেই দিন থেকেই, যখন ছোটবেলায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে তার পায়ের কাছে সোনার মুদ্রাটা গড়িয়ে গিয়েছিল, আর তিনি সেটাকে থামাতে পা দিয়ে চেপে ধরেছিলেন। প্রাসাদে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একা ফেলে দিয়েছিল ক্লডিন, তারপর বিদায়স্বরূপ সেই মুদ্রাটা দিয়েছিল। কিন্তু সেই বিলাসবহুল অচেনা জগতের মাঝে তাকে ঠিক কতটা তুচ্ছ মনে হয়েছিল, তা তাকে বুঝিয়েছিল ডিউকই।

সেই অভিজ্ঞতা তার মনে অন্যরকম একটা দাগ কেটে গিয়েছিল। আগে যে অবজ্ঞা আর নিপীড়ন সে সহ্য করেছিল, তার চেয়েও ভিন্ন। সে এই ঘটনাটা ভুলে যেতে চায়, কিন্তু ডিউক হারহার্ডকে দেখলেই তা মনে পড়ে যায়। সে তাকে ঘৃণা করে। কারণ তিনি তাকে বারবার সেই দিন, সেই স্মৃতি, সেই ক্ষতের কথা মনে করিয়ে দেন।

সে যখন একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন একটি কালো গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। ডিউকের দাদী কখনো গাড়িতে চড়তেন না, তাই সম্ভবত এটা ডিউকের মা লেডি হেরহার্ড্ট, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরছেন।

“ডিউক ফিরছেন বলে আরভিস নিশ্চয়ই এখন খুব ব্যস্ত।” কাইল বলল।

“হ্যাঁ।”

“ও হ্যাঁ, লায়লা, আমি কি অফিসার হওয়ার চেষ্টা করব?” কাইল এবার হাঁটতে হাঁটতে উল্টো দিকে মুখ করে তার দিকে তাকাল। “ডিউক হেরহার্ড্টের মতো যদি অফিসার হতে পারি, তাহলে হয়তো একটা মেডেলও পাব। ক্যাপ্টেন ইটম্যান, একজন দারুণ স্নাইপার, যে এক গুলিতেই শত্রুর হৃদয় ভেদ করতে পারে!” সে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে স্নাইপার রাইফেল চালানোর ভঙ্গি করল।

“মাফ করবেন, মিস্টার ইটম্যান। আপনি তো একটা মুরগিও মারতে পারেন না।” লায়লা মুচকি হেসে বলল।

কাইলের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগল, কিন্তু সে তর্কও করতে পারল না। গত বছরের একটি ঘটনার কথা সে মনে করিয়ে দিয়েছিল। কাইল জোর করে বলেছিল, কটেজে খাওয়া খাবারের দাম সে কাজ করে শোধ করবে। তখন আঙ্কেল বিল তাকে রাতের খাবারের জন্য একটা মুরগি ধরতে বলেছিলেন। কাইল খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে মুরগির খাঁচায় গিয়েছিল, কিন্তু শেষে একটা পালকও ধরতে পারেনি। সেই দিন থেকেই বিল তাকে অপমানজনক ডাকনাম দিয়েছিল, “অলস।”

“তুমি আমার ভালো বন্ধু কাইল ইটটম্যান। তাই তোমাকে আমি পছন্দ করি।” লায়লা হেসে বলল, তার গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে। “আমি বরং চাই তুমি তোমার হাত দিয়ে মানুষ বাঁচাও, বন্দুক চালানোর বদলে।”

“আচ্ছা… অবশ্যই। আমি তো ডাক্তারই হব।” কাইল অপ্রস্তুতভাবে গালে হাত দিল। “তাহলে কি আমি মেডিক্যাল অফিসার হব? তাদেরও কি মেডেল দেয়?”

“অনেক মানুষ বাঁচালে নিশ্চয়ই দেয়, তাই না? অনেক মানুষ হত্যা করার চেয়ে এটা অনেক ভালো কাজ।”

“তুমি যদি তাই মনে করো, তাহলে ঠিক আছে।”

এভাবে গল্প করতে করতে তারা রাস্তার একটি মোড়ে এসে পৌঁছাল। বাঁদিকের রাস্তার শেষে ছিল ইউটম্যানদের বাড়ি।

“আহ! আমি তো সেই জ্যামিতির নোটগুলো আনতেই ভুলে গেছি, যেগুলো তোমাকে ধার দেওয়ার কথা ছিল।” কাইল হঠাৎ বলে উঠল।

“তাহলে তুমি এখন বাড়ি যাও, আর রাতের খাবারের সময় কটেজে চলে এসো। কিন্তু নোটগুলো আনতে ভুলবে না।”

“এই যে, তুমি কি আমাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করবে, নাকি নোটের জন্য?”

“নোটের জন্য।” সে নির্দ্বিধায় উত্তর দিল, তারপর দুষ্টুমি ভরা হাসিতে ফেটে পড়ল।

হেসে হেসেই কাইল নিজের বাড়ির দিকে দৌড় দিল। লায়লা তার পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, “এত তাড়া করার দরকার নেই! আমার এখনও রান্না করতে হবে!”

কাইল আরও জোরে চিৎকার করে উত্তর দিল, “চিন্তা করো না! ইচ্ছা হলেই চলে আসব!”

লায়লা মাথা নেড়ে হাসল। সে জানত, তাকে বোঝানোর কোনো মানে নেই। এরপর সে সাইকেলে উঠল এবং প্লাটানাস রোডের দিকে রওনা দিল, যা আরভিস প্রাসাদের দিকে যায়।

___

ম্যাথিয়াস প্রাসাদের ড্রাইভওয়ের একেবারে শেষে, প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে গাড়ি থামাতে বললেন। চালক আর বাটলার দু’জনেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।

ডিউক হেরহার্ড্টের আগমন ছিল একেবারেই হঠাৎ। তিনি নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ আগেই আসবেন, এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই আরভিসের কর্মচারীরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত ছিল প্রস্তুতিতে। তাই তাকে আনতে মাত্র দু’জন লোক পাঠানো হয়েছিল। আর এখন ডিউক তাদের এমন চমক দিলেন। বাটলার হেসেন নার্ভাসভাবে ঢোক গিলল। “মাস্টার, এখনও—”

“আমি একটু হাঁটব।” ম্যাথিয়াস শান্তভাবে বললেন, তার কথা কেটে দিয়ে। চালক কিছুক্ষণ দ্বিধা করে তাড়াতাড়ি নেমে দরজা খুলতে গেল।

“না।” ম্যাথিয়াস মাথা নেড়ে হেসেনকে থামালেন, যিনি তার পেছনে নামতে যাচ্ছিলেন। “আমি প্রাসাদে গিয়ে দেখা করব।”

হেসেন কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে শেষমেশ তার নির্দেশ মেনে গাড়িতে ফিরে গেল। চালকও দ্রুত নিজের আসনে ফিরে এল। গাড়ি চলে যেতেই রাস্তাটা আবার শান্ত হয়ে গেল।

অফিসারের ক্যাপটা এক হাতে আলগাভাবে ধরে ম্যাথিয়াস গাছের ছায়ায় হাঁটতে লাগলেন। তার বুটের টকটক শব্দ হাওয়ায় দুলতে থাকা পাতার শব্দের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল।

ম্যাথিয়াস ভন হেরহার্ড্ট ছিলেন নিখুঁত শিশু, নিখুঁত ছাত্র, আর হয়ে উঠেছিলেন নিখুঁত সেনা কর্মকর্তা। এখন তিনি শিগগিরই নিখুঁত এক নারীকে বিয়ে করবেন। তারপর হবেন নিখুঁত স্বামী আর নিখুঁত পিতা। এই অবিরাম নিখুঁততার ধারাবাহিকতা এত সহজেই এসেছে যে, পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল।

তিনি হাঁটার গতি একটু কমালেন। পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো তার চোখে পড়ে, তার চোখের কোণের হালকা লালচে ভাবকে স্পষ্ট করে তুলল। আর একটু এগোতেই আলোটা তার সোনালি বেল্টের বাকল আর ধূসর ইউনিফর্মের বুকে থাকা ব্যাজগুলোর ওপর পড়ল।

“এই গ্রীষ্মেই তোমার বাগদান হওয়া উচিত।” ম্যাথিয়াস সহজেই তার মায়ের ইচ্ছা মেনে নিয়েছিলেন। সঠিক সময়ে বিয়ে করা এবং উত্তরাধিকার জন্ম দেওয়া তার দায়িত্ব।

“আমার মনে হয় ক্লডিনই পরবর্তী ডাচেস হওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী।” তার দাদীর মতামতও তিনি বিনা আপত্তিতে গ্রহণ করেছিলেন। ক্লডিন ভন ব্রান্ট ছিল চমৎকার বংশমর্যাদাসম্পন্ন এক উপযুক্ত পাত্রি।

ম্যাথিয়াস কখনো কিছু চাওয়ার সুযোগই পাননি। কিছু চাওয়ার আগেই সবকিছু তার কাছে এসে গেছে। তাই “ইচ্ছা” জিনিসটাই তার কাছে অপরিচিত। বিয়েও তেমনই। তিনি একটি নিখুঁত বিয়ের কথা ভাবতেন, যা তার জীবনে স্থিতি আনবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আবেগের ঝামেলা থাকবে না। ক্লডিন ভন ব্রান্ট সেই ধরনের সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছিল, আর সেটাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল। এর বাইরে তার প্রতি কোনো বিশেষ আগ্রহ ছিল না, প্রয়োজনও অনুভব করতেন না।

তিনি রাস্তার মাঝখানে থেমে আকাশের দিকে তাকালেন। ভাঙা রোদ তার চোখ ঝলসে দিল। ঠিক তখনই তিনি অনুভব করলেন, কাছাকাছি আর কেউ আছে। চোখ সরু করে চারপাশে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, এক তরুণী সাইকেল চালিয়ে তার দিকে আসছে। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার বাঁ পাশ দিয়ে চলে গেল। বাতাসে তার সোনালি চুল উড়ছিল।

লায়লা লিউয়েলিন? নামটা মনে আসতেই মেয়েটি মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। তাকে দেখেই তার সবুজ চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। তাকিয়ে তাকিয়েই সাইকেল চালাতে গিয়ে সে ভারসাম্য হারাল, আর সাইকেল উল্টে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার চিৎকার শোনা গেল। উল্টে থাকা সাইকেলের সামনের চাকা ঘুরতেই থাকল।

ম্যাথিয়াস এগিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটির কাছে দাঁড়ালেন। তার ছায়ার নিচে লায়লা মাথা তুলল। ভুল হওয়ার উপায় নেই। সে লায়লা লিউয়েলিন, সেই পাখিপ্রেমী ছোট্ট মেয়েটি।

“আমি দুঃখিত, ইয়োর গ্রেস।” সে দ্রুত মাথা নত করে বলল। মনে হচ্ছিল, সে অপেক্ষা করছে তিনি যেন চলে যান। ম্যাথিয়াস চলে যেতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ থেমে নিচে তাকালেন। লায়লার স্কুল ইউনিফর্ম মাটিতে মাখামাখি। তার মোজা ছেঁড়া, হাঁটুতে রক্ত। চারপাশে নীরবতা নেমে এল, আর সাইকেলের চাকা ধীরে ধীরে থেমে গেল।

লায়লা চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। তার চিরচেনা সাহসী অভিব্যক্তি ছিল, কিন্তু তাতে এক ধরনের কোমলতাও মিশে ছিল। মনে হচ্ছে মেয়েটাও বড় হয়ে গেছে, তিনি ভাবলেন। সময়ের সঙ্গে বড় হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তাকে দেখে তার অদ্ভুত লাগছিল। তার মনে সে সবসময় ছোট্ট মেয়েটিই ছিল, যে তাকে এড়িয়ে চলত আর তাকে বিরক্ত করত। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লায়লা সেই মেয়েটির সঙ্গে মোটেও মেলে না।

তার গ্রীষ্মকালীন ইউনিফর্মের নিচে শরীরের নরম বাঁক আর আগের মতো শুকনো গড়নের সঙ্গে মিল নেই। তার উজ্জ্বল ঠোঁট, গাল, আর বাতাসে ভেসে আসা তার শরীরের মৃদু গন্ধ, সবই আলাদা। এই উপলব্ধি ম্যাথিয়াসকে অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে ফেলল, যখন লায়লা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। সে পেছনে এক পা সরে জুতো ঠিক করল, তারপর ইউনিফর্মের ধুলো ঝাড়ল। সে এখন পুরোপুরি বড় হলেও, এখনও বেশ খাটো, সোজা দাঁড়ালেও তার চিবুক পর্যন্তই পৌঁছায়।

“লায়লা লিউয়েলিন…” ম্যাথিয়াস হঠাৎ বলে উঠলেন।

লায়লা চমকে কাঁধ গুটিয়ে ফেলল। মাথা তখনও নিচু। “আমি দুঃখিত, ইয়োর গ্রেস।” সে আবার বলল, তারপর বারবার ক্ষমা চাইতে চাইতে মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসগুলো তুলতে নিচু হলো।

ম্যাথিয়াস তার দৃষ্টি তার হাতের দিকে রাখলেন, মাটি আর রক্তে মাখা হাত, যতক্ষণ না তার আঙুল একটা কলমে ছোঁয়া লাগল। তিনি এক পা এগিয়ে এসে ধীরে কলমটার ওপর পা রাখলেন। এবার লায়লা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি।

“লায়লা লিউয়েলিন,” তিনি আবার বললেন। “আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি।” তার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক, যেমন স্বাভাবিকভাবে তিনি কলমটার ওপর পা রেখেছিলেন।

সে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল, আবার খুলল। “জি, ইয়োর গ্রেস?” মনে হচ্ছিল সুযোগ পেলেই সে কলমটা ছিনিয়ে নেবে, কিন্তু ম্যাথিয়াস নড়লেন না। “বলুন,” সে বলল। “আমি শুনছি।” তার শরীর কাঁপছিল, কিন্তু কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। তার সবুজ চোখ, গ্রীষ্মের বনভূমির মতো রাগ আর লজ্জায় ঝিলমিল করছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, বছর কয়েক আগে সেই সোনার মুদ্রার ঘটনা, যখন তিনি হাসতে হাসতে মুদ্রার ওপর পা রেখেছিলেন। আজও তার মুখে সেই একই অভিব্যক্তি।

অবশেষে ম্যাথিয়াস হালকা হেসে তার পাশ দিয়ে চলে গেলেন। ক্যাপটা মাথায় পরে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করলেন। লায়লা তার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার না থাকলে তিনি এমন আচরণ করলেন কেন? সে মনে মনে ভাবল, হাতে কলমটা শক্ত করে চেপে ধরে। আরভিসের মানুষ কি বিশ্বাস করবে, যাকে তারা নিখুঁত অভিজাত বলে সম্মান করে, সে এমন কিছু করতে পারে? আমি বাজি ধরে বলতে পারি, চশমা কেনার জন্য জমিয়ে রাখা আমার সব টাকা তাদের দিয়ে দিলেও তারা বিশ্বাস করবে না। বরং আমাকে পাগল বলবে!!

ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ করে সে দ্রুত সাইকেলটা সোজা করল, তারপর কলমটা ভালো করে মুছে ব্যাগে রাখল। সে সাইকেল হাঁটিয়ে সামনে এগোতে লাগল ডিউক হেরহার্ড্টের পেছনে, যিনি খুব ধীরে হাঁটছিলেন। তার পরে গিয়ে কেটে যাওয়া হাঁটু জ্বলছিল। সে জানত তিনি ফিরে তাকাবেন না, তবুও সে সোজা হয়ে হাঁটতে লাগল। খুঁড়িয়ে না হাঁটা খুব কষ্টকর ছিল এই মূহুর্তে, কিন্তু সে ব্যথা সহ্য করল।

ইশ, এই লম্বা পা দুটো একটু কাজে লাগিয়ে যদি তিনি একটু দ্রুত হাঁটতেন! সে বিরক্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ডিউক ঘুরে দাঁড়ালেন। হালকা বাতাসে পাতাগুলো দুলছিল, আর ভাঙা রোদ গ্রীষ্মের রাস্তায় দুলে দুলে পড়ছিল। চমকে গিয়ে লায়লা স্থির হয়ে গেল, এমনকি চোখ ফিরিয়ে নিতেও ভুলে গেল।

ম্যাথিয়াসের দৃষ্টি ধীরে ধীরে তার খোলা, লম্বা চুলের দিকে নেমে এলো।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এল তার বুকের ওপর দিয়ে, যা হালকা ওঠানামা করছিল, তারপর তার সাদা হাতের দিকে, যা সাইকেলের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে ছিল। এরপর তা থেমে গেল তার অবিশ্বাস্যরকম সরু গোঁড়ালি আর ছোট্ট পায়ের ওপর। তারপর আবার ফিরে এল তার চোখে। সেই স্বচ্ছ সবুজ চোখের দিকে সে দীর্ঘক্ষণ শান্তভাবে তাকিয়ে রইল। লায়লা লিউয়েলিন এখনও তার এস্টেটে বিনা খরচে থাকা এক অনাথ মেয়ে, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সবকিছু বদলে দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট মেয়েটি বড় হয়ে উঠেছে। এই সত্যটি তার মনে স্পষ্ট হতেই, সে অবশেষে লায়লাকে তার বর্তমান রূপে দেখতে পেল। সে আর কোনো ছোট্ট মেয়ে নয়। এখন সে এক তরুণী।

_____

বাহ্যিকভাবে ক্লডিন ভন ব্রান্টের আরভিসে আগমনকে গ্রীষ্মের শুরুতে আত্মীয়ের এস্টেটে এক সাধারণ সফর হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। তবে সবাই জানত, তার আসার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে।

দুই পরিবার বাগদানের ঘোষণা দেওয়ার আগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে একত্র হয়েছিল। এই উদ্দেশ্য সবার কাছেই পরিষ্কার ছিল, এবং কেউ তা লুকানোর চেষ্টা করেনি। সবচেয়ে কম করেছেন ক্লডিন নিজেই।

“হ্যালো, ডিউক হেরহার্ড্ট,” ক্লডিন নিখুঁত শিষ্টাচারে কার্টসি করে ম্যাথিয়াসকে অভিবাদন জানাল।

ম্যাথিয়াস বহু বছর আগের সেই অপরিণত কাজিনের কোনো চিহ্নই আর দেখতে পেলেন না। “স্বাগতম, লেডি ক্লডিন।” তিনি হালকা ঝুঁকে তার অভিবাদনের জবাব দিলেন। যেন তিনি এমন একজন ভদ্রমহিলাকে স্বাগত জানাচ্ছেন, যার সঙ্গে এই প্রথম দেখা হচ্ছে। তারা পরস্পরের দিকে মার্জিত হাসি বিনিময় করল।

আলোচনার জন্য বিশেষ নতুন বা বিস্ময়কর কিছু ছিল না। তারা কখনো খুব ঘনিষ্ঠ ছিল না, কিন্তু বছরের পর বছর বহুবার দেখা হওয়ায় একে অপরকে যথেষ্ট ভালোভাবেই চিনত। তারা জানত, ম্যাথিয়াস ভন হেরহার্ড্ট এবং ক্লডিন ভন ব্রান্ট, দু’জনেই প্রকৃত অর্থেই অভিজাত। এটাই ছিল তাদের একে অপরকে বেছে নেওয়ার সবচেয়ে সরল ও স্পষ্ট কারণ।

ম্যাথিয়াস দক্ষতার সঙ্গে ক্লডিনকে প্রাসাদের পেছনের দিকের গ্রীনহাউসে নিয়ে গেল। তার মা, এলিস ভন হেরহার্ড্ট, ক্লডিনের পছন্দের কথা জেনে সেখানেই বিকেলের চায়ের আয়োজন করতে বলেছিলেন।

এক চুমুক চা খেয়ে কাপটি নিঃশব্দে নামিয়ে রেখে ক্লডিন আনন্দের সঙ্গে বলল, “এই গ্রীনহাউসের সৌন্দর্য আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। মনে হয় যেন লেডি হেরহার্ড্ট স্বর্গের একটা অংশ এনে এখানে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।” সে একজন তরুণ অভিজাত নারীর মতোই প্রফুল্ল অথচ সংযত ভঙ্গিতে কথা বলছিল।

এলিস নরম কণ্ঠে বললেন, “এখানকার প্রতিটি জিনিস আমি যত্ন করে বেছে নিয়েছি এবং সাজিয়েছি। আমি অপেক্ষা করছি, কবে এমন একজন গৃহকর্ত্রীকে এটা তুলে দিতে পারব, যিনি এর প্রকৃত মূল্য বুঝবেন।”

এই কথা শুনে কাউন্টেস ব্রান্ট গর্বের সঙ্গে তার মেয়ের দিকে তাকালেন। ক্লডিন বিনয়ের সঙ্গে হালকা হাসল, কিন্তু কিছু বলল না।

“ম্যাথিয়াস, তোমার উচিত ক্লডিনকে আরভিসের এই স্বর্গটা ঘুরিয়ে দেখানো।” চা শেষের দিকে এলিস আস্তে করে ছেলেকে বললেন।

মনে হলো, এখন দুই পরিবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার সময় এসেছে। ম্যাথিয়াস হাত বাড়িয়ে দিলেন, আর ক্লডিন হালকাভাবে নিজের হাত তার হাতে রাখল। তার লেইসের সাদা গ্লাভসে ঢাকা হাতটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, ম্যাথিয়াসের মনে হঠাৎ ভেসে উঠল লায়লার ছোট হাত, মাটি আর রক্তে মাখা।

তারা হাঁটতে হাঁটতে ভদ্র আলোচনায় মগ্ন রইল। গ্রীনহাউসের মাঝখানে থাকা মার্বেলের ফোয়ারা থেকে মৃদু পানির কলকল শব্দ ভেসে আসছিল। দূরের পাখির মধুর ডাক অলস বিকেলের আবহকে আরও সজীব করে তুলছিল।

ক্লডিন আড়চোখে ম্যাথিয়াসকে লক্ষ্য করছিল। তার মুখে কোমল হাসি থাকলেও তার অন্তরের অনুভূতি বা দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা কঠিন। তার আচরণ নিখুঁত, কিন্তু ভেতরে সে এমন একজন মানুষ, যার মধ্যে কখনো কারও কাছে মাথা নত না করার অহংকার রয়েছে। ক্লডিন তার এই দিকটি পছন্দ করত।

“এখানকার পাখিগুলো খুব সুন্দর।” সে বলল, ডালে বসে থাকা রঙিন পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে।

ক্লডিন দেখানোর আগে ম্যাথিয়াস খেয়ালই করেননি যে গ্রীনহাউসে পাখিও আছে। তার মা, যিনি এখনও আরভিসের গৃহকর্ত্রী, গোলাপের মতোই পাখিকেও ভালোবাসতেন। যেমন গোলাপের যত্নের জন্য একজন গার্ডেনার রাখা হয়েছিল, তেমনি পাখিদের দেখভালের জন্য একজন পরিচর্যাকারীও ছিল। তার নিজের কাজ ছিল শুধু এগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করা। এটাই ছিল তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি, তার কাছে পৃথিবী এমন এক সুন্দর জায়গা, যেখানে অন্যরা সবকিছু প্রস্তুত করে রাখে তার আনন্দের জন্য।

“এই পাখিটা কত বাধ্য! সত্যিই অবাক করার মতো। এর রহস্যটা কী?” ক্লডিন হাত বাড়িয়ে দিলে একটি ছোট পাখি এসে বসতেই মুগ্ধ হয়ে বলল।

ম্যাথিয়াস চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, পাখিগুলো অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। জানালাগুলো খোলা, তবুও তারা উড়ে যাচ্ছে না। তারা এই শান্ত গ্রীনহাউসেই থেকে যেতে সন্তুষ্ট, আর সুমধুর সুরে গান গাইছে। তিনি দেখলেন একটি তোতা ডালে নড়ছে, আর ক্লডিনের হাতে বসে থাকা ফিঞ্চ গান গাইছে। তিনি পাশে অপেক্ষা করে থাকা পাখি পরিচর্যাকারীর দিকে ইশারা করলেন।

ধূসর চুলের লোকটি এগিয়ে এসে ক্লডিনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এদের ডানা ছেঁটে দিই, ম্যাডাম। এতে ওরা দূরে উড়তে পারে না, তাই পালিয়ে যায় না। এতে ওরা আরও অনুগত হয়ে ওঠে। যে পাখিরা স্বাধীনভাবে উড়তে পারে, তাদের বশ মানানো প্রায় অসম্ভব।”

“ডানা ছেঁটে দেন?” সে জিজ্ঞেস করল। “তাতে কি ওদের কষ্ট হয় না?”

“না, শুধু পালক কাটা হয়, তাই ব্যথা পায় না। বরং এটা তাদের জন্য ভালো, এতে তারা উড়ে গিয়ে হারিয়ে যায় না বা আঘাত পায় না। আপনি চাইলে আমি আপনাকে দেখাতে পারি কীভাবে করি।”

“ডিউক হেরহার্ড্ট, এটা কি ঠিক হবে?” ক্লডিন আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আপনার ইচ্ছা।” ম্যাথিয়াস সহজেই সম্মতি জানালেন।

পাখি পরিচর্যাকারী তাদের গ্রীনহাউসের এক কোণের বড় খাঁচার কাছে নিয়ে গেল। সেখানে এমন পাখি ছিল, যাদের এখনও ডানা কাটা হয়নি। সে ভেতর থেকে একটি উজ্জ্বল হলুদ পাখি বের করল, সবচেয়ে সুন্দরটি, এবং কাজের টেবিলে আনল।

“এটা কী পাখি?” ম্যাথিয়াস জিজ্ঞেস করলেন।

“এটা ক্যানারি, ইয়োর গ্রেস। খুব সুন্দর গান গায়।” লোকটি বলল। তারপর লোকটি পাখিটির মাথার ওপর একটি ছোট রুমাল চাপা দিল, তারপর এক হাতে ডানার পালকগুলো আলগা করে ছড়িয়ে দিল। অন্য হাতে ছোট কাঁচি নিয়ে দ্রুত কয়েকবার কেটে দিল। পালকগুলো টেবিলে ঝরে পড়ল। একইভাবে অন্য ডানাটাও কেটে সে পাখিটিকে নিচে রাখল। ক্যানারিটি মরিয়া হয়ে ডানা ঝাপটাতে লাগল, কিন্তু অল্প দূর উড়ে আবার মাটিতে পড়ে গেল। সে বুঝতেই পারছিল না যে আর উড়তে পারবে না, তাই কয়েকবার চেষ্টা করল, প্রতিবারই একই ফল।

ম্যাথিয়াস ঝুঁকে ফুলবাগানের ধারে পড়ে থাকা পাখিটিকে তুলে নিলেন। পাখিটি তার হাতে ছটফট করতে লাগল, আর তার ডাক গান নয়, চিৎকারের মতো শোনাচ্ছিল।

“ওরা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয় না, ইয়োর গ্রেস। ডানা কাটা অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে।” পাখি পরিচর্যাকারী বলল, যখন ম্যাথিয়াস পাখিটিকে তার হাতে ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি পাখিটিকে আলতো করে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল।

“আপনি কি নিজে চেষ্টা করতে চান, ম্যাডাম?” পাখি পরিচর্যাকারী ক্লডিনকে জিজ্ঞেস করল।

“না, শুধু দেখাটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমার কৌতূহল মেটানোর জন্য ধন্যবাদ।” এই বলে সে ঘুরে দাঁড়াল। “চলুন, আবার টি টেবিলে ফিরে যাই।” বলে সে ম্যাথিয়াসের দিকে হাত বাড়াল।

ম্যাথিয়াস আবার তার মসৃণ, সুন্দর হাতটির দিকে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য তার মনে ভেসে উঠল লায়লার ময়লা আর রক্তে মাখা হাতের ছবি।

পাখি পরিচর্যাকারীর কাছ থেকে চলে যাওয়ার আগে ম্যাথিয়াস হঠাৎ করে একটি নির্দেশ দিলেন। “ওটা আমার বেডরুমে নিয়ে এসো।”

“জি…?” পাখি পরিচর্যাকারী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“ওই পাখিটা,” ম্যাথিয়াস চোখ সরু করে পাখিটির দিকে তাকিয়ে বললেন। “আমার ক্যানারি।”

___

লায়লা তার পরিপাটি করে আঁচড়ানো স্বর্ণালি চুল পনিটেইলে বাঁধল।
তারপর সে এপ্রোন পরে বড় ঝুড়িটা তুলে নিল। “আজই এটা শেষ করা ভালো হবে।” সে গম্ভীর মুখে নিজেকেই বিড়বিড় করে বলল।

শুধু ডিউক হেরহার্ড্টই ফিরে আসেননি, কয়েকদিন আগে লেডি ক্লডিনও আরভিসে এসেছে। এতে লায়লার মনে সময়ের চাপ আরও বেড়ে গেছে। ডিউক জঙ্গলে ঘোরাঘুরি শুরু করার আগে, আর লেডি ক্লডিন তাকে ডাকার আগে, তাকে যথেষ্ট রাস্পবেরি সংগ্রহ করতে হবে। সৌভাগ্যবশত, এখনও পর্যন্ত সে তাদের কাউকেই খুব বেশি দেখেনি। সম্ভবত তারা তাদের বাগদানের পরিকল্পনা নিয়েই ব্যস্ত।

খড়ের টুপির চওড়া কিনারাটা নিচে নামিয়ে সে দ্রুত পায়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দিল। রাস্পবেরির ঝোপগুলো ফলভর্তি ছিল। আরভিসের বাসিন্দারা আর বনজন্তুরা যতই রাস্পবেরি খাক না কেন, সবসময় এত বেশি বাকি থাকে যে অসংখ্য ফল অতিরিক্ত পেকে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

একটি ঝোপ থেকে আরেকটি ঝোপে যত্ন করে এগোতে এগোতে দুপুর হওয়ার আগেই সে তার ঝুড়ি ভরে ফেলেছিল। ঝুড়িটা এত ভারী হয়ে উঠেছিল যে মনে হচ্ছিল যেই হাতে ধরে আছে সেটাই বুঝি খুলে পড়ে যাবে, তবুও আনন্দে তার মন ছিল একেবারে হালকা। সে ঝুড়িটা একটি গাছের ছায়ায় রেখে নদীর দিকে দৌড়ে গেল, সেখানে গিয়ে সে তার হাত ভালো করে ধুয়ে নিল। রাস্পবেরির রসের সব চিহ্ন মুছে ফেলল। সে মুখটাও ধুয়ে নিল।

শুল্টার নদী হেরহার্ড্ট এস্টেটের বন আর খাদকে ঘিরে বয়ে গেছে। শহরের কেন্দ্র থেকেও নদীটা কিছুটা দেখা যায়, কিন্তু সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায় আরভিস থেকেই। যেখানে হেরহার্ড্ট এস্টেট অবস্থিত। আরভিসের বন আর নদীর ঝলমলে পানির যে মিলন, তা অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর।

লায়লা তার এপ্রোনের পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে মুখ মুছে নিল।

নদীর পানি, যা গ্রীষ্মকালেও ঠাণ্ডা থাকে, ভীষণ সতেজ লাগছিল। সে একবার ভাবল পানিতে পা ডুবিয়ে দেবে, কিন্তু পরে মাথা নাড়ল। তার খালার বাড়িতে, যেখানে এতিম হিসেবে তাকে প্রথম পাঠানো হয়েছিল, তার চেয়ে বড় পাঁচজন কাজিন ছিল। তারা খুবই রুক্ষ আর দুষ্টু স্বভাবের ছিল। একদিন তারা ছোট্ট লায়লাকে ধরে নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছিল। তারা বলেছিল, সেখানে থাকতে হলে তাকে এই ‘দীক্ষা’ পার করতে হবে। যদি কোনো প্রতিবেশী তার চিৎকার শুনে তাকে বাঁচাতে না আসত, তাহলে হয়তো সে ডুবে গিয়ে জলের আত্মা হয়ে যেত।

যদিও স্পষ্টতই দোষটা তার কাজিনদের ছিল, কিন্তু সেই রাতে মাতাল খালার হাতে মার খেয়েছিল লায়লাই। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার খালা তাকে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, বলে যে সে নাকি এমন একটি শিশুকে সামলাতে পারবে না যে ঠিকমতো আচরণ করে না। এই ব্যাপারটা লায়লার কাছে অন্যায় মনে হয়েছিল, কিন্তু পরের বাড়িটা আগেরটার চেয়ে ভালো হওয়ায় সে সেটা তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এরপরের বাড়িগুলোর ক্ষেত্রেও সে একইভাবে ভেবেছিল, আর তার পরেরটাতেও। সবকিছু বিবেচনা করলে, শেষ পর্যন্ত সে যেহেতু বিলের কটেজে এসে পৌঁছেছিল, মনে হয় সে ঠিকই ভেবেছিল, পরিস্থিতি সত্যিই ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছিল।

মুখে উজ্জ্বল হাসি নিয়ে সে সেই গাছটার কাছে ফিরে গেল, যেখানে সে তার ঝুড়িটা রেখেছিল। সে ঝুড়ির ভেতরে গুঁজে রাখা পত্রিকাটা বের করে এপ্রোনের পকেটে ঢুকিয়ে নিল, তারপর দ্রুত গাছে ওঠা শুরু করল। শৈশবে যতটা দ্রুত বা চটপটে ছিল, এখন আর ততটা নয়,
তবে এখন সে আরও অনেক কৌশল জানে, যেগুলো বিল তাকে শিখিয়েছে। সে দক্ষতার সঙ্গে এমন এক ডালে গিয়ে বসল, যা আরামদায়ক চেয়ারের মতোই আরামদায়ক ও নিরাপদ ছিল।

শুল্টার নদীর দিকে তাকিয়ে সে নিশ্চিত ছিল, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী। অনেক শহর ঘোরা কাইলও তার সঙ্গে একমত হয়েছিল,
যা তার কাছে তার এই মতামতকে একেবারে নির্ভুল সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সে মনোযোগ দিয়ে দেখছিল পানির ওপর ছায়া আলোয় মাছ ধরতে ঝাঁপ দেওয়া জলচর পাখিগুলোকে, এবং নদীর দুই পাশে থাকা ঘন সবুজ গাছপালাকে। এই মনোরম দৃশ্য তাকে পুরো গ্রীষ্মকালটার জন্য অপেক্ষা করতে উৎসাহিত করল।

ডিউক হেরহার্ড্টের উপস্থিতির বিষয়টি যোগ হলেও, সে জানত, এই গ্রীষ্মও আগের মতোই সুন্দর হবে। তারপর সে এপ্রোনের পকেট থেকে পত্রিকাটা বের করে সেই পাতাটা খুলল, যেখানে রহস্য উপন্যাসের পরবর্তী কিস্তি ছাপা হয়েছিল। গোয়েন্দা তার অসাধারণ বুদ্ধি ব্যবহার করে অপরাধীকে ধরতে যাচ্ছিল। সে দারুণ আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করল।

ম্যাথিয়াস দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার পর মাথা তুলে শ্বাস নিলেন। শ্বাস নিতে নিতে তার স্পষ্ট অ্যাডামস অ্যাপল দ্রুত ওঠানামা করছিল। তার ভেজা, দৃঢ় দেহটা নদীর জলে প্রতিফলিত গাছগুলোর পাশে দারুণ মানিয়ে যাচ্ছিল। তিনি আসলে প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু পরে মত বদলে স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা শুরু করলেন। তিনি শুল্টার নদী আর আরভিসের বনকে ভালোবাসতেন।

ঘাটের পাশে থাকা বোটহাউসটাকে তিনি একসময় একটি কেবিনে রূপান্তর করেছিলেন, যেখান থেকে পুরো দৃশ্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। তার দাদি আর মা খুব কমই নদীর ধারে যেতেন, তাই জায়গাটা প্রায় সম্পূর্ণ তার একান্ত ব্যক্তিগত জগৎ হয়ে উঠেছিল। প্রাসাদে যখন কোনো অতিথি থাকত না, তখন তিনি প্রায়ই ওই কেবিনে আসতেন, জানালার বাইরে তাকিয়ে দৃশ্য দেখতেন, একটি বই পড়তেন, অথবা স্রেফ একটু ঘুমিয়ে নিতেন। সে যা-ই করুক না কেন, জায়গাটা সবসময়ই তার ভালো লাগত।

কিন্তু ওই জায়গাটার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল, এই মুহূর্তের মতো, নিজের শরীরটাকে পানির ভেতর ডুবিয়ে রাখার অনুভূতি। পিঠের ওপর ভেসে থেকে তিনি উপরের সবুজ ডালপালা আর ফাঁক দিয়ে দেখা নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বয়ে চলা পানির শব্দ, বাতাসে পাতার মর্মর, আর পাখির কিচিরমিচির, সব মিলিয়ে এক শান্ত সুর তৈরি করছিল।

গত কয়েকদিন প্রাসাদ ছিল বেশ কোলাহলপূর্ণ, তাই নদীর এই নিস্তব্ধ শান্তি তিনি আরও বেশি উপভোগ করছিলেন। হেরহার্ড্ট এবং ব্রান্ট পরিবারের মধ্যে বিয়ের আলোচনা মসৃণভাবেই এগোচ্ছিল। যদি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটে, তাহলে গ্রীষ্ম শেষ হওয়ার আগেই ক্লডিনের সঙ্গে তার বাগদান ঘোষণা করা হবে। ব্রান্ট পরিবার এক বছরের বাগদানকাল প্রস্তাব করেছিল, এবং ম্যাথিয়াস তাতে সম্মতি জানিয়েছিলেন।

যদি তিনি ডিউক হেরহার্ড্ট হিসেবে যথেষ্ট সম্মান অর্জন করতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিন সামরিক অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। আরও এক বা দুই বছর ইম্পেরিয়াল গার্ড হিসেবে কাজ করে, তারপর অবসর নিয়ে বিয়ে করা, এটাই তার কাছে একদম উপযুক্ত পরিকল্পনা মনে হয়েছিল। তারপর তিনি তার সমস্ত মনোযোগ তার পরিবারের দায়িত্বের দিকে নিবদ্ধ করবেন। তার নতুন পরিবার নিয়ে তার জীবন এই নদীর পানির মতোই শান্তভাবে বয়ে যাবে।

চলবে…..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x