লেখিকা:ফাতেমা তুজ নৌশি
পর্ব:০৮
রেহান উবু হয়ে শুয়ে বই পড়ছিল। ওমন সময় ঘরে প্রবেশ করল রুহি। তাকে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠল রেহান। রুহি ঠোঁট টিপে হাসল।
“তোমায় বলেছি না, এভাবে যখন তখন রুমে আসবে না।”
“আসলে কী হয়?”
“অনেক কিছু।”
“সেই অনেক কিছুটাই তো জানতে চাচ্ছি।”
“জানা লাগবে না।”
“তাহলে তো আমি আসবই।”
“বড়ো বেশি কথা বলো তুমি।”
“জানি।”
রেহানের গলা জড়িয়ে ধরল রুহি। রেহান চেচিয়ে উঠল।
“আরে, কি করছো!”
“কী করলাম?”
“দরজা খোলা না? কেউ দেখলে।”
“দেখলে দেখবে।”
রুহির কেমন গা ছাড়া ভাব। রেহান নিজেও লোভ সামলাতে পারছে না। মেয়েটির সাথে দীর্ঘ দিনের প্রণয় ওর। হয়ত রুহির জীবনের প্রথম পুরুষ রেহান ই।
“কী?”
“দেখছি।”
“কী দেখ?”
“তোমায়।”
অন্য মেয়েদের মতো লাজুক নয় রুহি। ও আরেকটু কাছে আসল।
“আরে, কী করছো?”
“কাছে আসছি।”
“না, না দূরে থাকো।”
“উহু।”
“পাগলি,কেউ এসে পড়বে।”
“আসুক না। আমি আমার পছন্দের মানুষের কাছে আসব না?”
“সে আসবে। তবে সময় আর সুযোগ টা মাথায় রাখবে না?”
রুহি উত্তর দিল না। বরং রেহানের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। মেয়েটির তপ্ত নিশ্বাস গলায় ছেয়ে যাচ্ছে। রেহান চোখ বন্ধ করে নিল। এই মেয়েটি কেন বুঝে না, সে যখন কাছে আসে তখন রেহান নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ভুল করার ইচ্ছে জাগে।
প্রায় চারটা মাস পেরিয়ে গেল। শিমাত এখন সকলের মাঝে মিশে গিয়েছে। তাকে রুহির কলেজে ভর্তি করানো হলো। রুহির সাথে ওর বন্ধুর মতো সম্পর্ক। এখন সবটা ভালো যাচ্ছে। সেদিন ইয়াজের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো। দু হাতে বিজনেস সামলায় সে। পারফেক্ট শব্দটি ওর সাথে বড়ো ভালো যায়। রুহি শরবত এনে দিল।
“চিনি দিয়েছিস?”
“উহু।”
শরবত তুলে নিল ইয়াজ। রুহি হলো বাড়ির সব চেয়ে আদরের। মেয়েটি সবার খোঁজ খবর রাখে। যেন এই সংসারের গিন্নি সে।
ইয়াজ খানিক রেস্ট করে শাওয়ার নিয়ে নিল। রাতের খাবারটা সকলের একসাথেই করা হয়। ডাইনিং এ উপস্থিত ইয়াজ,রেহান, রুহি, শিমাত, ইয়াজের বাবা ইলিয়াস মাহমুদ। হেঁশেল সামলাচ্ছেন বাড়ির দুই গৃহিনী। একটু লেট করে এলেন আনিসুল। সে এসে দুঃখ প্রকাশ করলেন। ইলিয়াস হেসে বললেন,”আরে বোস তো। লেট হয়েছে তাই কী হয়েছে।”
খাবার পরিবেশন করে দিলেন দুই গৃহিনী। শিমাত নিচু হয়ে খাচ্ছে। এদিকে রুহি আর রেহানের মাঝে খুনসুটি চলছে। যদিও সবটা সকলের আড়ালে। অনেকটা সময় বসে রইলেন আনিসুল। তারপর ভাবলেন কথাটা এখনই বলা দরকার। রেহানের সাথে শিমাতের সম্পর্কটা ভালোই এগিয়েছে। দুজন দুজনকে মানতে অসুবিধা থাকার কথা না।
“সকলকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
সবার মনোযোগ ভদ্রলোকের দিকে গেল। শিমাত ভাতের লোকমা মুখে দিয়েছে সবে। আনিসুল ভাগ্নীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বাড়ির দুই গৃহিনীও উপস্থিত হলেন। আনিসুল সাহেব বুক ফুলিয়ে বললেন,”আমি চাচ্ছি, শিমাতকে নিজের কাছেই রাখতে।”
এটা নিশ্চয়ই ভালো কথা। রেহান বলল,”হ্যাঁ। ওকে আর কোথাও পাঠাচ্ছি না। কী সুন্দরী, অন্য কোথাও যাবে না তো?”
আনিসুল মনে মনে খুশি হলেন। এটাই মোক্ষম সুযোগ। শিমাত কিছু বুঝতে পারছে না। ইয়াজ স্বল্পভাষী। তবে বুদ্ধিমান। সে বুঝতে পারছে আনিসুলের কথা এখানেই শেষ নয়। আর তেমনটাই হলো।
“রেহানের সাথে শিমাতের বিয়ে দিতে চাচ্ছি। এখনই না। তবে বাগদানটা করে রাখব। শিমাতের এইচ এস সি শেষ হলে বিয়েটা হবে।”
প্রস্তাবটা সকলের পছন্দ হলো। তবে দুটি মানুষ থমকে গেল। রুহি আর রেহান দুজনের হৃদয়েই তান্ডব শুরু হলো। এদিকে শিমাত অনুভূতি হীন। সে বুঝতে পারছে না এমতাবস্থায় কেমন আচরণ করতে হবে।
ঘরে ফিরে একচোট কান্নাকাটি করল রুহি। তার স্বপ্ন,তার ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সে নিরুপায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ। রেহান কখনোই রুহির ঘরে আসে না। আজ এসেছে। মেয়েটির কান্না ভেজা চোখ তাকে দুঃখ দিচ্ছে।
“এই মেয়ে, কান্নাকাটি কোরো না প্লিজ। আমি কথা বলব। তুমি এতটা ভে ঙে কেন যাচ্ছ?”
“কিচ্ছু ঠিক হবার নয় রেহান। তুমি চলে যাও। আমরা একে অপরের ভাগ্যে নেই।”
“আরে পাগল।”
“প্লিজ।”
রেহান আর কিছু বলল না। নত হয়ে বেরিয়ে পড়ল। ওর দু চোখে নেমে এল যন্ত্রণা। বাবা মায়ের উচিত ছিল বিষয়টা আগে জানানো। এভাবে সকলের সামনে আগে বলা ঠিক হয় নি। একটা দীঘল শ্বাস বেরিয়ে এল হৃদয় থেকে।
রেহানের কালো মেঘে ডুবে থাকা মুখটি নজরে এসেছে ইয়াজের। সে বুদ্ধিমান। চট করেই বিষয়টা ধরে ফেলেছে। বোনের ঘরে এসে উপস্থিত হলো। মেয়েটি কান্নাকাটি করছে। তবে আগেই কিছু বলল না। ও দেখতে চাচ্ছে জল কোন দিকে গড়ায়।
কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও শিমাতের সাথে খুব একটা কথা হয় নি ইয়াজের। বলাবাহুল্য কথাই হয় নি। শিমাত শান্ত দৃষ্টি ফেলে সামনে তাকিয়ে। ইয়াজ ওর পাশে বসল। এতে মনোযোগ সরে এল। পাশ ঘুরে পুরুষটিকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুতবোধ করল।
“কফি খাবে?”
হু না কিছু বলার পূর্বেই কফি এগিয়ে দিল ইয়াজ। বিষয়টা শিমাত কে প্রভাবিত করল। তবে লজ্জায় কিছু বলল না।
“আচ্ছা শিমাত, রেহান কে তোমার কেমন লাগে?”
এ প্রশ্নটা সে নিজেও ভেবেছে। ভালো মন্দ কোনো উত্তর মিলে নি। তাই সে জবাবে ব্যর্থ হলো।
“হাসবেন্ড হিসেবে ওকে পছন্দ কর?”
মাথাটা নুয়ে ফেলল শিমাত। ওর জড়তা লক্ষ্য করে ইয়াজ কথা বাড়াল না। তবে মেয়েটিকে ভালো মতন দেখে নিল।
ঘরে এক চোট তান্ডব লেগেছে। আনিসুল ছেলের উপর চেচালেন। এটা কেমন কথা? তিনি সকলের সামনে বিয়ের কথাটা তুলেছেন। আর ছেলে কী না অবজ্ঞা করছে! অথচ রেহান বোঝাতে পারছে না শিমাতকে বোনের নজরে দেখে সে। আনিসুল রেগেমেগে বের হতে যাচ্ছিলেন ওমন সময় ঘরে উপস্থিত হলো ইয়াজ। পুরুষটিকে দেখে খানিকটা ভীত হলেন আনিসুল। কথাটা শুনে ফেলল কী?
“আরে,ইয়াজ যে।”
“আঙ্কেল আমি কিছু বলতে চাই।”
“হ্যাঁ। বল, আচ্ছা বসো আগে।”
সাধারণত বিজনেস নিয়ে ইয়াজের সাথে আলাপ হয় আনিসুলের। তাই তিনি সেসব ই ভেবে নিলেন। রেহান চলে গেল। ইয়াজ সে পথ থেকে নজর সরিয়ে বলল,”রেহান সম্ভবত বিয়েটা করতে চাচ্ছে না।”
প্রশ্নটা শুনে আনিসুলের মুখটা শুকিয়ে এল।
“ছেলে মানুষ। হয়ত লজ্জা পাচ্ছে।”
“বিষয়টা তেমন না।”
এবার আনিসুলের মুখটা কালো হতে শুরু করল। তিনি একটু কঠিন সুরেই বললেন,”ও বললেই তো হবে না। আমি সবার সামনে বলেছি। তাছাড়া শিমাতের মা, মানে আমার বোন আমাদের জন্য অনেক করেছে। সে প্রতিদান দিতে ভুল করব না আমি। ওকে বিয়ে করতেই হবে।”
ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলল ইয়াজ। তারপর অনেকটা সময় কথা হলো। সে যখন বের হলো তখন রেহানের সাথে দেখা। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।
“ব্রো,একটা কথা বলতে চাই।”
ইয়াজ বুঝতে পারল। ছেলেটার এই অবস্থায় মানসিক সাপোর্ট প্রয়োজন। সেই জন্যেই বের হলো ওরা।
রুহির ঘরের কাছে এসে থমকে গেল শিমাত। মেয়েটি কাঁদছে কেন? সে কী বলবে বুঝতে পারছে না।
“রুহি, তুমি কাঁদছ কেন?”
রুহি চট করেই চোখ মুছে নিল। হাসি রাঙিয়ে বলল,”কাঁদছি না তো।”
“আমি স্পষ্ট দেখলাম।”
“আচ্ছা বাদ দাও। বলো তোমার খবর। বিয়ের কন্যার মুখে হাসি নেই কেন?”
শিমাত উত্তর দিতে পারল না। সে আসলে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। রেহান স্বামী হিসেবে নিশ্চয়ই দারুণ হবে। তবে ওর মন কেন মানছে না?
“কী হলো?”
“হুম।”
“তুমি কী চিন্তা করছ? এই শিমাত তোমার বিয়েতে আমি কিন্তু খুব নাচব।”
শিমাত হাসার চেষ্টা করল। হুট করেই রুহি ওকে জড়িয়ে ধরল। শিমাত শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে না কি করা উচিত। এদিকে দু চোখে বর্ষণ নেমেছে রুহির। নিজের জীবনের এই অন্ধকার কেমন করে সইবে সে?
চলবে……