গল্প: অমৃত তোকে চাই(১৩)

লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা

পর্ব : ১৩

 

রিক্তার খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে সবাই হতভম্ব হয়ে রিক্তার দিকে তাকায়।
নাহিদা ভ্রু কুঁচকে বলে „“ কি রে কি হয়েছে? এভাবে হাসছিস কেন? ”
রিক্তা কোনো মতে হাসি আটকে বলে „“ কিছু না ”
শিখা চোখ ছোট ছোট করে বলে „“ কি রে রিক্তা কি হয়েছে? ”
রিক্তা স্বাভাবিক হয়ে বলে „“ নয়া প্রেমের ভাব…, ভালোবাসি বলাটার অভাব ”

রাহাদ হঠাৎ ব্রেক কষলো। জোরে ব্রেক করায় সবাই সামনে ঝুঁকে পড়ে। কেউ কিছু বলার আগে রাহাদ রিক্তার দিকে তাকিয়ে বলে „“ কি বললি বোনু? ”
” কিছু না তুমি গাড়ি ব্রেক করলে কেন? কি হয়েছে? ”
” তেমন কিছু না ”

এই বলে রাহাদ স্বাভাবিক হয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
গাড়ি চলছে ঢাকার ভিতর দিয়ে, চারপাশে মানুষজন, যানজট, চেঁচামেচি ইত্যাদি। কোলাহলের মাঝে হাসপাতালের সামনে এসে গাড়ি থামে।
গাড়ি থামিয়ে রাহাদ বলে „“ চলে এসেছি। ”

রিক্তা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, রাহাদের কথায় চোখ সরিয়ে গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আরশি, নাহিদা, শিখা নামে।
ওদের নামতে দেখে রাহাদও নেমে দাঁড়ায়।
রিক্তা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে বলে „“ ভাইয়া তুমি কি এখন চলে যাবে? ”
রাহাদ মুখে হাসি রেখে বলে „“ All the best sister আর ভয়ের কিছুই নেই আমি কথা বলে রেখেছি ”
রাহাদের মুখে হাসি দেখে রিক্তাও হেসে বলে „“ ওকে ভাইয়া ”
” তাহলে আমি যাই কোনো সমস্যা হলে ফোন করিস ”
” আচ্ছা সাবধানে যেও ”
” ওকে ”
এই বলে রাহাদ টাটা দিতেই রিক্তাও টাটা দেয়। রাহাদ গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যায়।

শিখা আগে আগে যাচ্ছে, রিক্তা,নাহিদা, আরশি পিছনে। রিক্তা এই প্রথম এখানে এসেছে।
রিক্তা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছে। হসপিটালের টা খুব বড়।
তারা হাসপাতালের করিডরে যেতেই একজন গার্ড এসে বলে „“ আপনারা কাকে খুঁজছেন? ”
শিখা বলল „“ ডক্টর আবরাহাম খান শুভ কে, তিনি কোথায়? ”
” স্যার তো তার কেবিনে। কিন্তু আপনারা কারা? ”
” আমি ওনার বোন ”
” আসসালামু আলাইকুম ম্যাম ”
এই বলে লোকটা শিখাকে স্যালুট করে।
শিখা মিষ্টি করে বলে „“ ওয়ালাইকুম সালাম ”
” ম্যাম আপনি আসুন, আমি স্যারের কেবিনে নিয়ে যাচ্ছি ”
শিখা মাথা নাড়িয়ে লোকটার পিছন পিছন যেতে থাকে। সাথে রিক্তা, আরশি,নাহিদা।

শুভর কেবিনের সামনে এসে লোকটা একটা বেল চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে বেল চাপার শব্দ শোনা যায়।
লোকটি দরজা খুলে বলে „“ আপনারা ভিতরে যান ”

শিখা ভিতরে ঢুকে, রিক্তা,নাহিদা,  আরশিও ঢুকে।
ভিতরে ঢুকে রিক্তা অবাক।
চারপাশে নীল রঙ দিয়ে সাজানো খুব পরিপাটি একটা চেম্বার। পুরো রুম চোখ ঘোরাতেই লুমিনাকে দেখে রিক্তা।

লুমিনা রিক্তাকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। শুভ গম্ভীর কণ্ঠে বলে „“ everyone sit down।”
সবাই চেয়ারে বসে যায়।

লুমিনা অবাক হয়ে বলে „“ তুমি রিক্তা? ”
লুমিনার কথায় রিক্তা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায় „“ জ্বি ”
” মাশাল্লাহ তুমি তো খুব সুন্দর, শুভর বর্ণনার থেকেও….”

আর কিছু বলার আগেই শুভ বলে উঠে „“ হ্যাঁ পিচ্চি কি সমস্যা যেন তোমার? ”
লুমিনার কথা রিক্তা খুব মন দিয়ে শুনছিল, শুভর কথায় রিক্তা বলে „“ মাথা ব্যথা ”
” চশমা ব্যবহার করো? ”
” না ”
” কত দিন ধরে ব্যথা? ”
” এই তো অনেক দিন ধরে ”
” ওহ আচ্ছা ”

শুভ লুমিনাকে বলে „“ দেখ তো ইব্রাহীমকে ফোন করে, ও আছে কি না ”
লুমিনা মাথা নাড়িয়ে টেলিফোনে ইব্রাহীমকে ফোন করে „“ হ্যালো ”
” হুম বলো ”
” তুমি কি চেম্বারে আছো? ”
” হুম কেনো? ”
” আচ্ছা আমরা আসছি ”
” আচ্ছা ”

লুমিনা ফোন রেখে বলে „“ ইব্রাহীম আছে ”

শুভ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে „“ চল ”
শুভ কেবিন থেকে বের হয়, সঙ্গে সবাই বের হয়।

শুভর পরনে নীল শার্ট, শরীরে ডাক্তারি অ্যাপ্রন, গলায় স্টেথোস্কোপ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

রিক্তা পিছন থেকে শুভকে দেখছে আর মনে মনে ভাবছে „“ শুভ ভাই আমাকে নিয়ে ভাবে, আমার কথা তিনি অন্যের কাছে বললো কেন? ”

এই সব ভাবতে ভাবতে তারা একটা চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়ায়। শুভ দরজা নক করে ভিতরে ঢুকে, পিছনে রিক্তা, শিখা, লুমিনা, আরশি,নাহিদা।

শুভকে দেখে ইব্রাহীম উঠে দাঁড়ালো। বেচারা সকালের নাস্তা করছিল, সেই অবস্থায় মুখে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
শুভ হাতের ইশারায় বসতে বলে।

ইব্রাহীম মুখের খাবার গিলে বলে „“ হঠাৎ কি মনে করে? ”
শুভ চোখ পরীক্ষা করার মেশিনের সামনে বসতে বসতে বলে „“ তুই খা আমি দেখছি ”

ইব্রাহীম রিক্তাকে খেয়াল করে বলে „“ ওহ রিক্তা… ওয়েলকাম মিসেস…
বাকি টা বলার আগে শুভ হাতের কাছে থাকা একটা পেপার গোল করে ইব্রাহীমের দিকে মারে। ইব্রাহীম মুখে লাগাম টানে।

রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে „“ কি বললেন? ”
শুভ গম্ভীর কণ্ঠে বলে „“ আপনার এত কিছু না জানলেও হবে, আপনি এই চেয়ারে বসুন ”

রিক্তা মাথায় হাজারটা চিন্তা নিয়ে মেশিনের সামনে থাকা চেয়ারে বসে।

লুমিনা হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে রিক্তার দিকে তাকাচ্ছে। আরশি, নাহিদা, শিখা গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইব্রাহীম খেতে খেতে সামনে তাকাতেই বিস্ময় খায়। তার কাশি দেখে সবাই সেদিকে তাকায়।
ইব্রাহীম পানি খেয়ে শান্ত হয়ে বলে „“ তুমি এখানে? ”
সবাই ইব্রাহীমের দিকে তাকায়।
আরশি শিখার পিছন থেকে বের হয়ে বলে „“ আপনি এখানে কেনো? ”
” এটা আমার চেম্বার, কিন্তু তুমি এখানে কেনো? ”
” আমি রিক্তার সঙ্গে আসছি ”

লুমিনা তাদের কথাবার্তা শুনে বলে „“ তোমরা কি একে অপরকে চেনো? ”
আরশি মাথা নিচু করে বলে „“ হুম, উনি আমার বোনের দেবর ”
” ওহ আচ্ছা ”

শুভ চোখ থেকে চশমা খুলে মেশিনে ফোকাস করে রিক্তাকে বলে „“ সোজা মেশিনের দিকে তাকিয়ে থাক ”
রিক্তা হুম বলে মেশিনের দিকে তাকায়।

লুমিনা বিরক্ত হয়ে বিরবির করে „“ এই শুভ আসলেই বাদর, কখনো তুমি বলে আবার কখনো তুই! কেনো ভালোবেসে একটু আদর করে ডাকতে পারে না ”

শুভ বেশ কিছুক্ষণ রিক্তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ইব্রাহীম অনেক বার তাকে ডেকেছে কিন্তু আমাদের ডাক্তার সাহেব তার পিচ্চির চোখের মায়ায় ডুবে একাকার।ইব্রাহিম চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে শুভকে ঝাঁকিয়ে বলে „“ কিরে, কোথায় হারিয়ে গেলি? ”

শুভ নিজের ধ্যান ভেঙে বাস্তবে ফিরে। মেশিন থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। দুই হাতে নিজের চোখ কচলাতে থাকে।
রিক্তা চোখ সরিয়ে শিখাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

শুভ চশমা পরে ইব্রাহীমকে বলে „“ পেপার দে ”
ইব্রাহীম পেপার দিয়ে বলে „“ সিরিয়াস কিছু? ”

শুভ পেপারে কিছু লিখতে লিখতে বলে „“ তেমন কিছু না, চোখের জন্য মাথা ব্যথা করে। চশমা পরলে ঠিক হয়ে যাবে, আর কিছু ঔষধ খেলে ”

পেপারে মেডিসিন লিখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।  ইব্রাহীমকে বলে „“ আমি নিচে যাচ্ছি ”

শুভ এই বলে কেবিন থেকে বের হয়, সাথে লুমিনা, রিক্তা, আরশি, শিখা,নাহিদা ।

শুভ নিচে চশমার দোকানে ঢুকে, সাথে সবাই।
শুভকে দেখে সব কর্মচারী দাঁড়িয়ে সালাম করে।
শুভ সালামের জবাব দিয়ে বলে „“ – 0.75 পাওয়ার আর নীল ফ্রেমের চশমা দেখাও ”

কয়েকজন মিলে অনেক ধরনের নীল চশমা এনে রাখে।
শুভ কিছুক্ষণ দেখে কাচের একটা নীল ফ্রেমের চশমা হাতে নিয়ে রিক্তাকে বলে „“ ট্রাই করো ”

রিক্তা ভাবনার জগতে ছিল, শুভর কথায় ভড়কে গিয়ে বলে „“ আমি..? ”
” না লুমিনা করবে ”
লুমিনা রিক্তাকে বলে „“ তোমাকেই বলেছে ”

রিক্তা এগিয়ে শুভর কাছে যায়। শুভ রিক্তার হাতে চশমা না দিয়ে, সে নিজেই রিক্তাকে পরিয়ে দেয়। শুভর স্পর্শে রিক্তা খানিকটা কেঁপে ওঠে।
শুভর কাণ্ডে সবাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে। আর শুভ লুকিয়ে মুচকি হাসলো।
চশমা পরিয়ে বলে „“ এবার দেখ ”

রিক্তা দোকানের মিররে তাকায়। সত্যি বলতে চশমাটা রিক্তাকে খুব মানিয়েছে।

শিখা বলল „“ বাহ খুব সুন্দর লাগছে ”
সাথে নাহিদাও বলে „“ হুম শুভ ভাইয়ার পছন্দ আছে বলতে হবে ”

শুভ তাদের কথায় উত্তর না করে দোকানের কর্মচারীকে বলে „“ এটা প্যাক করে দাও ”

দোকানের কর্মচারী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
পাঁচ মিনিটের ভিতরে ছেলেটা একটা প্যাকেট এনে বলে „“ এই যে স্যার ”
শুভ প্যাকেটটা নিয়ে রিক্তাকে দেয়।
শুভ ছেলেটাকে বলে „“ পেমেন্টটা চেম্বার থেকে নিও ”
” পেমেন্ট লাগবে না স্যার ”
” তোমাকে আমি তো জিজ্ঞেস করিনি ”
” সরি স্যার ”
” চেম্বারে এসো পরে ”
এই বলে শুভ দোকান থেকে বেড় হয়ে যায় সাথে সবাই বাইরে চলে আসে।

শুভ একটা পেপার রিক্তার হাতে দিয়ে বলে „“ এখানের ঔষধগুলো সময় মতো খাস ”
রিক্তা মাথা নাড়ায়।

হঠাৎ একজন নার্স দৌড়ে এসে বলে „“ স্যার, ইমারজেন্সি ২১২ নাম্বার কেবিনে চলুন, রোগী কেমন যেন করছে ”
” আচ্ছা, আমি আসছি, যাও তুমি ”
নার্সটা আচ্ছা বলে চলে যায়।
শুভ শিখাকে বলে „“ একটা ট্যাক্সি করে মামিদের বাড়ি চলে যা। বিকেলে রাহাদ বাড়ি দিয়ে আসবে তোকে… আর তোর ফ্রেন্ডদের তাদের বাড়ি ”
শিখা কিছু বলতেও পারলো না, এর আগেই লুমিনা, শুভ চলে যায়।

তারা এখানে থেকে কি করবে, তাই শিখা রিক্তাকে বলে „“ চল আমরা স্বপ্ন নীল নীড় মলে যাই, কোল্ড ড্রিংকস খেতে, তারপর বাড়ি যাবো ”

আরশি বলল „“ হ্যাঁ চল, আমাদের খুব গরম লাগছে ”
নাহিদাও বলল „“ হুম চল  আমারও খুব গরম লাগছে ”

চারজন মিলে হাসপাতালের পাশের স্বপ্ন নীল নীড় মলে চলে যায়।

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x