গল্প: মৃত কাঠগোলাপ (০৬)

লেখনীতে :আইরা নূর

পর্ব:০৬

 

🚫🚫 কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। গল্পটি শেয়ার করতে পারেন কিন্তু অবশ্যই হ্যাশট্যাগ গুলো লাগাবেন আর যদি কেউ গল্পটি নিজের টিকটক id তে দিতে চাই অবশ্যই আমার টিকটক id কে mention দেবেন🚫🚫

 

নীলাধ্র:- ওরা যা বলছে মেনে নে আরু। এমনিতেও আমি তোকে পড়াশোনা শেষ হলেই বিয়ে করতাম। তা এখন যখন বিয়ে করতে বলছেই তাহলে করেই নি, ক্ষ’তি কিসের।

নীলাধ্র র কথা শুনে আরুহি অবাক হয়ে যায়। সে কিছু বলতে যাবে কিন্তু নীলাধ্র তাকে আর বলতে না দিয়ে বলে,

নীলাধ্র:- ঠিক আছে আমরা রাজি।

এরপর ইয়ামিন নামের লোকটি বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করে। নীলাধ্র কেনো এই বিয়ে করতে রাজি হয়েছে সেটা তো সে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু আরুহি তো আর জানে না যে এই বিয়েই তার জীবনে কাল হয়ে আসবে।

ধর্মীয় ভাবে বিয়ে সম্পূর্ণ হলেই সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যায়। শেষে একটা লোক ছিল। তিনি ওদের উদ্দেশ্যে বলেন,

__:- নতুন স্বামী–স্ত্রী, তুরা এই ঘরেই থাকো। আজকে আমি অন্য জায়গায় থাকবার লাগবো।

নীলাধ্র:- দাঁড়ান, বলছি যে আমরা এখানে থাকবো না। আমাদেরকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে সাহায্য করুন, প্লিজ। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।

__:- এত রাতের বেলায়, তুরা তো এই জঙ্গল থেইকা বের হইতে পারবি না। তাই ভালো, কাল সকালে সূর্য উঠুক, তারপর তুরা দুজনে এখান থেইকা বের হবা। আজকের রাতটা না হয় এখানেই কাটাও।

বলেই লোকটি বের হয়ে যান। লোকটা বের হয়ে যেতেই নীলাধ্র ঘরের দরজা বন্ধ করে খাটে আরুহির পাশে এসে বসে পড়ে। তারপর আরুহির এক হাত ধরে বলে,

নীলাধ্র:- তাহলে বিয়েটা হয়েই গেল। আজকে থেকে আমরা স্বামী স্ত্রী। তুই খুশি না আরু!! (শ’য়’তা’নি হাসি দিয়ে)

আরুহি যেনো এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার আর নীলাধ্র র বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এক ঘণ্টার মধ্যেই তার জীবনটা কেমন পরিবর্তন হয়ে গেলো। তার কাছে এইসব কিছু এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

নীলাধ্র:- এই যে আজকে তোর হাতটা ধরলাম সারাজীবন এইভাবেই ধরে থাকবো। তোকে খুব ভালোবাসি রে আরু।

বলেই আরুহির হাতে ঠোঁ’ট ছোঁয়ায়। আরুহি এখনো বুঝতে পারছে না যে নীলাধ্র তার সাথে ঠিক কি করতে যাচ্ছে।

নীলাধ্র:- আরু তোর কাছে একটা জিনিস চাইবো, না করতে পারবি না কিন্তু।

আরুহি অবাক হয়ে বলে,

আরুহি:- কি~কি চাইবেন।

নীলাধ্র নে’শা’ক্ত নয়নে আরুহির দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে আরুহি কে কাছে পাওয়ার কামনা জেগে উঠেছে।

নীলাধ্র:- আজকে তোকে কাছে পেতে চাই। তোর সাথে মিশে যেতে চাই। বারণ করবি না আরু।

আরুহি কিছুই বলে না। সে লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়। আরুহি কে এইভাবে লজ্জা পেতে দেখে নীলাধ্র বলে,

নীলাধ্র:- উত্তর দিচ্ছিস না যে। চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ। তাহলে কি হ্যাঁ ধরে নেবো।

আরুহি চুপ করেই থাকে। নীলাধ্র উঠে গিয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে আরুহির কাছে যায় আর তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।
,,,,,,,,,

নীলাধ্র র ঘুম ভাঙ্গে দরজায় টোকা পড়ার আওয়াজে। নীলাধ্র, আরুহি কে ডেকে তোলে। আরুহি নিজেকে ঠিক করে নিয়ে উঠে বসে।

নীলাধ্র দরজা খুলতে কালকের লোক টি বলে,

__:- তুরা না যাইবা। তাইলে, তৈয়ার হইয়া যাও।

নীলাধ্র:- হ্যাঁ। বলছি যে আপনাদের কাছে কি পরার জন্য এক সেট জামা কাপড় হবে আর ওয়াশরুম টা কোনদিকে একটু দেখিয়ে দিলে ভালো হতো।

__:- দাঁড়াও, দেইখতাছি।

কিছুক্ষণ পর লোকটা নীলাধ্র আর আরুহির জন্য জামা নিয়ে আসেন আর ওয়াশরুম ও দেখিয়ে দেন। এক এক করে নীলাধ্র আর আরুহি রেডি হয়ে লোকটার সাথে বের হয়ে পড়ে এইখান থেকে বের হওয়ার জন্য।

এইদিকে সবাই নীলাধ্র আর আরুহি কে সেই রাত থেকে খুঁজেই যাচ্ছে। পুলিশ কেও ইনফর্ম করা হয়েছে। তখনই নীলাধ্র আর আরুহি হোটেলে প্রবেশ করে।

ওদের কে দেখে সবাই খুশী হয়ে যায়। কিন্তু ওদেরকে একসাথে আসতে দেখে অনেকেই কানা ঘুশো করতে শুরু করে। তাদের কে থামিয়ে দিয়ে ওদের এক টিচার আরুহি আর নীলাধ্র র উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন,

__:- তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?? জানো তোমাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা পা’গ’লই হয়ে যাচ্ছিলাম। কত টেনশনে ছিলাম আমরা। কোথায় ছিলে সারারাত তোমরা দুইজন?

তখন নীলাধ্র সবাইকে সবটাই বলে শুধু নিজেদের বিয়ের কথা বাদে। আরুহি ও আর কিছু বলে না, শুধু চুপ করে থাকে।

দেখতে দেখতে তাদের ট্যুর ও শেষ হয়ে যায়। আজকে তারা ঢাকায় ব্যাক করবে। যাওয়ার সময় ও আরুহি আর নীলাধ্র পাশাপাশি বসেছে। আরুহি মনে মনে খুব খুশি কারণ সে তার ভালোবাসার মানুষটাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পেয়েছে।

কিন্তু আসলেই কি সে তাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পেয়েছে!!!

ঢাকা থেকে ব্যাক করেই নীলাধ্র কেমন যেনো পরিবর্তন হতে শুরু করে। আর আগের মতো আরুহির পিছন পিছন ও ঘোরে না। যতটা সম্ভব আরুহি কে এড়িয়ে চলে।

আরুহি যতবারই তার সাথে কথা বলতে চেয়েছে ততবারই কিছু না কিছু কাজের অজুহাত দেখিয়ে নীলাধ্র, আরুহির থেকে দূরে সরে গিয়েছে। নীলাধ্র একরকম আরুহি কে ইগনোর করে চলছে।

যেটা আরুহি বুঝতে পারছে। কিন্তু কেনো যে নীলাধ্র তার সাথে এমন করছে সেটা সে বুঝতে পারছে না। আরুহির নীলাধ্র র এমন ইগনোর সহ্য হচ্ছে না।

তাই সে নীলাধ্র কল করে। কিন্তু নীলাধ্র তার কল রিসিভ করছে না। বেশ অনেক বার কল করার পর নীলাধ্র কল রিসিভ করে। এতে আরুহি অনেক খুশি হয়ে যায়।

সে কিছু বলতেই যাবে তখনই ফোনের ওপর পাশ থেকে নীলাধ্র র কর্কোশ গলা ভেসে আসে।

নীলাধ্র:- এই ছোট লোকের বাচ্চা দেখছিস না আমি ফোন রিসিভ করছি না তার মানে নিশ্চই আমি ব্যাস্ত আছি। তাও কেনো বার বার কল করছিস, হ্যাঁ। আর কোনোদিনও ফোন করবি না, ফোন রাখ।

বলেই নীলাধ্র, আরুহির মুখের ওপর কল কেটে দেই। আরুহি তো নীলাধ্র র কথা শুনে একদম হতবাক হয়ে গিয়েছে। সে তো নিজের কান কেই বিশ্বাস করতে পারছে না।

আরুহি আবার কল করে নীলাধ্র কে। আর সে নিজের মনকে এই শান্তনা দেয় যে নীলাধ্র হয়তো অন্যকাউকে ভেবেই এই কথা গুলো বলেছে। কিন্তু নীলাধ্র নিজের ফোন বন্ধ করে রেখেছে।
,,,,,,,,,,,,,,

ফারাহ:- এই যে মহারানী এখানে বসে আছে। এই মেয়ে ওঠ তাড়াতাড়ি। যা গিয়ে রান্না টা চাপা। সারাদিন খালি বসে বসে গিলবে। কোনো কাজ তো করবে না। ভাই যে সারাদিন খেটে উপার্জন করবে আর ইনি শুধু বসে বসে গিলবে আর সেগুলো ধ্বংস করবে। স্বামী তো ত্যাগ করেছে আর আমাদের ঘা’ড়ে এসে পড়েছে। যত জ্বালা হয়েছে আমার।

ফারাহ র কথা শুনে আরুহির চোখ গুলো ভিজে উঠে। ৮ মাসের ভরা পে’ট নিয়ে চলতে খুব ক’ষ্ট হয় তার। একটু হাঁটা চলা করলেই শ্বাস নিতে ক’ষ্ট হয় খুব।

খাওয়া দাওয়া তো কিছুই করতে পারে না সে। খেলেই খালি বমি হয়ে সব বের হয়ে যায়। তাছাড়া নানান অসুখ তো লেগেই আছে।

আরুহি উঠানে একটা পিলারের সাথে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে ছিল আর নীলাধ্র র সাথে কাটানো সুন্দর মুহুর্ত গুলোর কথা ভাবছিল।

তখনই ফারাহ তাকে এইসব কথা বলে। দুইদিন ধরে ফারাহ তার সাথে এমনই ব্যবহার করছে। সে যেনো আরুহি কে দুচোখে সহ্য করতে পারছে না।

অথচ দুইদিন আগে অব্দি ফারাহ তার সেবা যত্ন করেছে। কিন্তু হঠাৎই দুইদিন আগে ফারাহ র কি যেনো হলো। তারপর থেকেই সে আরুহি কে সহ্যই করতে পারে না। আরুহি কে দেখলেই তাকে ইঙ্গিত করে অ’প’মা’ন জনক কথা বার্তা বলে।

কিন্তু আরুহি তাকে একটা কথা ও বলে না। কারণ সে জানে যে তার ভাবী মা কোনো একটা বিষয় নিয়ে তার ওপর খুব রে’গে আছে। তার ভাবী মা মন থেকে এইসব কথা বলছে না।

ফারাহ:- কি হলো এখনো বসে আছিস। যা তাড়াতাড়ি রান্নাটা চা’পি’য়ে দে। আর একটা কথা বললেই খালি ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবে। এই আমি কি তোকে মে’রে’ছি, যে তুই কাঁদছিস?

আরুহি চোখের পানি মুছে ফারাহ র কাছে গিয়ে বলে,

আরুহি:- ভাবীমা একটা কথা বলবে আমাকে?

ফারাহ:- কি কথা?

আরুহি:- তুমি তো আগে এমন ছিলে না। তাহলে এখন কেনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করো। আমি কি এমন করেছি যে আমার ওপর এতো রে’গে আছো?

ফারাহ:- তুই কি করিসনি সেটা জিজ্ঞেস কর। তোর জন্য আজকে আমার এই অবস্থা। আজকে তোর জন্যই আমি ১২ টা বছর নির্সন্তান। ১ টা সন্তানের মুখ দেখতে পাই না শুধুমাত্র তোর জন্য। (চি’ৎ’কা’র করে)

আরুহি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

আরুহি:- মানে!!

ফারাহ:- মানে। জানতে চাস তাই না। ঠিক আছে শোন তবে।

এরপর ফারাহ বলতে শুরু করে।

ফারাহ:- সেইদিন আমি তোর ভাইয়ের জন্য রুমে চা নিয়ে গিয়েছিলাম। তোর ভাই একজনের সাথে কথা বলছিল। জানিস তোর ভাই কি বলেছিল সেইদিন?

আরুহি:- কি বলেছিল, ভাবী মা??

ফারাহ:- তোর ভাই তোর জন্য, শুধু মাত্র তোর জন্য আমাকে ঔষুধ খাইয়ে ব’ন্ধ্যা করে রেখেছে।

আরুহির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। কি বলছে ফারাহ এইসব তাকে। আরুহি নিজের কান কে যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না। আরুহি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,

আরুহি:- কি~কি সব বলছো ভাবী মা তুমি?

ফারাহ:- হ্যাঁ ঠিকই বলছি। আমার যদি সন্তান হয় তাহলে তো তোর ওপর থেকে আমার ভালোবাসাটা কমে যাবে। এটা ভেবেই তোর ভাই আমাকে সেই প্রথম দিন থেকে ঔষুধ দিয়ে গিয়েছে যেনো আমি আর কোনোদিন ও মা না হতে পারি। আর আমি ও বোকা তোর ভাইয়ের কথা শুনে সেই ঔষুধ গুলো দিনের পর দিন না দেখে খেয়ে গিয়েছি। এখন বুঝতে পারছিস যে কেনো আমি তোকে সহ্য করতে পারছি না। তোর জন্যই আমি আর কোনোদিনও মা হতে পারবো না। শুধুমাত্র তোর জন্য, আরু। (কাঁদতে কাঁদতে)

আরুহি:- তুমি কি বলছো ভাবী মা। ভাইয়া এমন কাজ করেছে!! (কাঁপা কাঁপা গলায়)

ফারাহ:- হ্যাঁ শুধু মাত্র তোর জন্য এমন কাজ করেছে তোর ভাই। (কাঁদতে কাঁদতে)

আরুহি দেওয়াল ঘেঁসে বসে পড়ে। তার জন্যই তার মায়ের মতো ভাবী, মা হতে পারেনা। শুধু মাত্র তার জন্য। তার জন্য তার ভাই এত বড় ত্যাগ করলো, কেনো করলো? শুধুমাত্র তার ভালোবাসায় ভাগ পড়বে বলে!

আরুহির চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। ফারাহ ও সমান তালে কাদঁছে। আরুহি আবার ফারাহ র কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

আরুহি:- আমাকে ক্ষমা করে দাও ভাবী মা। আমাকে ক্ষমা করে দাও, তুমি। আমার জন্য তুমি মা হতে পারো নি। আমি কেনো এখনো বেঁচে আছি!! আমার কেনো ম’র’ণ হয় না। আমি অনেক বড় পা’পী। আমার জন্য তোমাদেরকে সবার সামনে অ’প’মা’নি’ত হতে হলো। আমার জন্য তোমাদেরকে কে গ্রাম ছাড়া হতে হলো। আবার আমার জন্যই তুমি কোনো দিনও মা হতে পারবে না। (কাঁদতে কাঁদতে)

ফারাহ ও আরুহি কে একহাত দিয়ে জ’ড়ি’য়ে ধরে বলে,

ফারাহ:- এমন করে বলিস না ময়না, এমন করে বলিস না। রা’গে’র মাথায় তোর সাথে এমন ব্যবহার করে ফেলেছি আমি। তুই বলনা, আমার যদি একটা সন্তান থাকতো আমি যেমন তোকে ভালোবাসি তেমন তো তাকেও ভালবাসবো। তোর জন্য আমার ভালোবাসা কি কমে যেতো বল। তুই তো আমার প্রথম সন্তান। বিয়ে হয়ে এই সংসারে এসে তো প্রথমে তোর দায়িত্বই নিয়েছি। কক্ষনো তোকে পর ভাবি নি। ছোট বেলায় অ’না’থ আশ্রমে বড় হয়েছি। নিজের বাবা মাকে কখনোই চোখে দেখিনি। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকি। আমার যখন ১৭ বছর তখন কোথা থেকে এক বয়স্ক দম্পতি আসে আর আমাকে তাদের সাথে নিয়ে যায় তোদের গ্রামে। তাদের পরিচয় তারা আমার চাচা চাচী। যখন আমার ১৯ বছর তখন তোর ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়ে এই সংসারে পা রাখি। তখন তোর বয়স ছিল ৯ বছর। তোর ভাই তোকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে তুই আমার প্রথম সন্তান। তোর ওপর যেনো আমি কোনো অ’ন্যা’য় না করি। নিজের সন্তানকে ঠিক যেমন করে মানুষ করে, আগলে রাখে তোকেও যেনো আমি ঠিক সেইভাবেই মানুষ করি, আগলে রাখি। স্বপ্ন ছিল নিজের একটা সুন্দর সংসার হবে। স্বামী, সন্তান নিয়ে সংসার আমার পরিপূর্ণ হবে। কিন্তু আমার কপাল দেখ।

আরুহি:- তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও ভাবী মা। আমার জন্যই আজকে তোমার এই অবস্থা। (কাঁদতে কাঁদতে)

ফারাহ আর আরুহি দুইজনই কাঁদছে। আসলে যখন ফারাহ জানতে পারে যে রিহান তাকে ঔষুধ দিয়ে এমন করে রেখেছে তখন তার কাছে মনে হতে লাগে যে আরুহির জন্যই তার এই অবস্থা।

কিন্তু বেশি দিন সে রা’গ করে থাকতে পারেনা আরুহির ওপর। কারণ ছোট থেকেই সে আরুহি কে বড় করেছে। তাই যতই চাক তার ওপর সে রে’গে থাকতে পারে না।
,,,,,,,,,,,

রিহান:- আরু তাড়াতাড়ি আই দেরি হয়ে যাবে পৌঁছাতে।

আরুহি:- এই তো ভাইয়া আসছি।

ফারাহ, আরুহি কে ধরে ধরে নিয়ে আসছে।

ফারাহ:- সাবধানে যাস। নিজের খেয়াল রাখিস। আর ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করিস। ঔষুধ গুলো ঠিক মতো খাবি। আমি কিন্তু ফোন করে সব খবর নেবো।

ফারাহ র কথা শুনে আরুহির চোখে অজান্তেই পানি চলে আসে। সে ফারাহ কে জ’ড়ি’য়ে ধরে কেঁদে দেই। ফারাহ আরুহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

ফারাহ:- কাঁদছিস কেনো আরু?

আরুহি:- জানি না ভাবী মা। আমার মনে হচ্ছে আর হয়তো কোনোদিনও তোমার সাথে দেখা হবে না। খুব ক’ষ্ট হচ্ছে তোমাদের কে ছেড়ে যেতে।

ফারাহ:- এইভাবে বলিস না আরু। কটা দিনেরই তো ব্যাপার। পরীক্ষা দিয়েই চলে আসবি। আর কোনোদিনও দেখা হবে না কেনো বলছিস, হ্যাঁ।

আরুহি:- জানি না। (ভাঙ্গা গলায়)

ফারাহ:- আচ্ছা এবার ছাড়। দেরি হয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে উঠ।

ফারাহ, আরুহি কে ধরে গাড়িতে তুলে দেই। ফারাহ র ও আরুহির জন্য মন কেমন করছে। তার বুকটা কেমন খালি খালি লাগছে।
,,,,,,,,,,

রিহান:- আরু সাবধানে থাকবি আর এক্সাম শেষ হলেই আমাকে জানিয়ে দিস। আমি এসে নিয়ে যাবো। এই অবস্থায় তোকে একা আসতে হবে না বুঝেছিস।

আরুহি:- ঠিক আছে, ভাইয়া। তুমি একদম টেনশন করো না।

রিহান, আরুহির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। কেনো জানি রিহানের আরুহি কে এখানে একা ছেড়ে যেতে মন সাই দিচ্ছে না। তবুও তাকে যেতে হবে। কারণ এখানে থাকার কোনো জায়গা নেই আর ফারাহ ও একা আছে বাড়িতে।

রিহান, আরুহি কে হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আরুহি ঘোলাটে চোখে তার ভাইয়ের যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার বুকটা খালি খালি লাগছে। মনে হচ্ছে ভাইকে হয়তো আর দেখতে পাবে না।

তখনই নিধি নিচে আসে। কারণ আরুহির এই উঁচু পেট নিয়ে একার পক্ষে ব্যাগ গুলো নিয়ে ওপরে ওঠা সম্ভব নয়। নিধি এসে তার ব্যাগ গুলো নিয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে আসে।

দেখতে দেখতে আরুহির এক্সাম ও শেষ হয়ে যায়। কালকেই আরুহি তার ভাই রিহানের সাথে চলে যাবে বরিশালে। গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার পর তারা কোথায় যাবে এটাই ভাবছিল।

তখন রিহানের মনে পড়ে তার বাবা তাদের জন্য বরিশালে একটা ছোট জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়েছিল। রিহান, আরুহি আর ফারাহ কে নিয়ে সেখানেই ওঠে।

আজকে আরুহি, নিধি কে নিয়ে একটু বাইরে বের হয়েছে কিছু কেনাকাটার জন্য। কালকেই তো বরিশালে চলে যাবে। আর নিধির সাথে দেখা হবে কি হবে না।
,,,,,,,,,,,,,

নিধি আর আরুহি একটা দোকানে ঢুকেছে। আরুহি কিছু ড্রেস দেখছিল তখনই তার নজর পড়ে বাইরে। বাইরে তাকাতেই তার হাত থেকে জামা টা পড়ে যায়।

বেশি কিছু না ভেবে সে দোকান থেকে বের হয়ে যায়। নিধি খেয়াল করে নি যে আরুহি সেখানে নেই। কারণ দোকানে অনেক ভিড় ছিল আর আরুহি একটু দূরে ফাঁকা জায়গাই দাঁড়িয়ে ড্রেস দেখছিল।

নীলাধ্র ফোনে কারো সাথে গম্ভীর গলায় কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে। পিছন থেকে এক পরিচিত কন্ঠে কেউ তাকে ডেকে উঠে।

নীলাধ্র পিছনে ফিরে তাকাই। তার সামনে আরুহি দাঁড়িয়ে আছে। বুকে হাত দিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। শ্বাস নিতে ও ক’ষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। আজ ৮ মাস পর আরুহি কে দেখছে নীলাধ্র।

শুকিয়ে গিয়েছে অনেক। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। মুখ টাও মলিন হয়ে আছে। ফর্সা মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আরুহি ধীর পায়ে নীলাধ্র র কাছে আসে।

আরুহি:- কেমন আছেন নীলাধ্র? খুব ভালোই আছেন তাই না??

নীলাধ্র:- হু~হুম খু~খুব ভালো আছি। (কাঁপা গলায়)

কিন্তু আদতেও কি সে ভালো আছে আরুহির সাথে এমন কাজ করে। একটু ও ক’ষ্ট হচ্ছে না তার। হয়তো হচ্ছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না। নাহলে ভালো আছে কথাটা বলতে গিয়েও কেনো তার গলা এইভাবে কাঁপছে। কেনো তার অক্ষিযুগলে জলরাশিরা ভিড় জমাতে চাইছে।

আরুহি সেইদিন চলে আসার পর থেকেই তো সে কেমন বদলে গিয়েছে। সারাদিন তার মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে থাকে। তবে কেনো এমন হয়, সেটা সে বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে না বললে ভুল হবে সেই বুঝতে চাইনা।

আরুহি:- ভালো থাকারই তো কথা। কিন্তু আমি না একদমই ভালো নেই জানেন। আচ্ছা আপনি কেনো আমার সাথে এমনটা করলেন নীলাধ্র? কেনো আমার সাথে ভালোবাসার নাটক টা করলেন? কেনো আমার অনুভূতি নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি খেললেন? কেনো আমাকে আর আমাদের সন্তান কে সবার সামনে স্বীকৃতি দিলেন না, নীলাধ্র? (ছল ছল নয়নে)

নীলাধ্র:- তুই এখানে কি করছিস? আর আবার সেই একি কথা তুলছিস!!

আরুহি:- কারো মনে ভালোবাসার জন্ম দিয়ে ছেড়ে দেওয়া তাকে মে’রে ফেলার সমান। আপনি কেনো মাঝ পথে আমার হাতটা ছেড়ে দিলেন। আপনি তো বলেছিলেন যে এই হাত সারাজীবন ধরে রাখবেন তাহলে কেনো করলেন এমনটা!!

নীলাধ্র:- তুই জানতে চাস না কেনো আমি এমন করলাম। ঐ দিনের কথা মনে আছে তোর যেইদিন আমার খালামনি তোর সাথে আহানের বিয়ে দিতে চাইছিল। তোর জন্য আমার বোনের চোখের জল ঝরেছে। জাইরা, আহান কে ভালোবাসে সেই ছোট্ট থেকেই। তোর সাথে আহানের বিয়ে হবে শুনে জাইরা সেইদিন অনেক কান্না করেছিল। তাই আমি ও প্র’তি’শো’ধ নিয়েছি। সেইদিন জাইরার চোখ দিয়ে যে টুকু পানি ঝরেছিল আজ তোর চোখ দিয়ে তার দ্বিগুণ পানি ঝরছে। আর আমি তো এটাই চাই। তুই মৃ’ত্যু’র আগে পর্যন্ত “না পাওয়ার” যন্ত্রণা ভোগ কর।

আরুহি তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

আরুহি:- আচ্ছা আমার সাথে যে এতদিন ভালোবাসার নাটক করলেন তা আপনি কি একদিনের জন্য হলেও আমাকে ভালোবাসেন নি!! আমার জন্য কি আপনার মনের কোণে একটু ও ভালোবাসা জন্মায় নি। আমি কি এতটাই খা’রা’প!! (কাঁপা কাঁপা গলায়)

আরুহির কাঁপা কাঁপা গলা শুনে নীলাধ্র র বুক কেঁপে উঠে। অজান্তেই আবার ও তার চোখ গুলো ঝাপসা হয়ে আসে। নীলাধ্র নিজেকে সামলিয়ে চলে যেতে নেয় কিন্তু আরুহির কথাই সে থেমে যায়।

আরুহি:- যদি জানতাম ভালোবাসার পরিণাম এতটা ভ’য়ং’ক’র হবে, তাহলে আমি কখনোই আপনাকে ভালবাসতাম না। প্রত্যেকটা দিন মৃ’ত্যু’র সমান য’ন্ত্র’ণা সহ্য করতে হয় আমাকে। এর থেকে ভালো একেবারেই মে’রে ফেলতেন। অন্তত এই ভাবে ধুকে ধুকে তো ম’র’তে হতো না।

আরুহির কথা শুনে নীলাধ্র আরুহি দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আরুহি কথা বলতে বলতে খেয়াল করে যে কেউ নীলাধ্র কে বার বার কল করছে। আরুহি দেখতে পাই ফোনের ওপর নিরা নাম টা জ্বলজ্বল করছে। আরুহির বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। জলরাশি আবার ভিড় করে তার অক্ষিযুগলে।

নীলাধ্র:- তোর কথা বলা শেষ হলে এখন যেতে পারি!!

আরুহি:- নিরা আপু কল করেছে?? বিয়ে করেছেন না নিরা আপু কে?

নীলাধ্র:- না এখনো বিয়ে হয়নি। আগামী সপ্তাহে আমাদের বিয়ে। হয়েছে এবার আসি।

আরুহি:- এতো তাড়া যাওয়ার! আমার কথা গুলো একটু শুনেই যান। হয়তো আর কোনোদিনও আপনার সামনে দাঁড়াবো না। হয়তো এটাই আপনার আর আমার শেষ দেখা। শেষ বার একটু মন ভরে দেখতে দিন না। (করুন সুরে)

নীলাধ্র এবার আরুহির আরো কাছে এসে দাঁড়ায় আর তার দিকে একটু ঝুঁকে বলে,

নীলাধ্র:- নে দেখে নে ভালো করে। কারণ এরপর তো আমি অন্য কারোর হয়ে যাবো। (গম্ভীর কণ্ঠে)

আরুহি, নীলাধ্র র হাত তার পেটের ওপর রেখে ঘোলা চোখে মলিন হেসে বলে,

আরুহি:- নিজের সন্তান কে ফিল করতে পারছে? দেখুন আপনার ছেলে কত দু’ষ্টু সারাদিন এইভাবেই ক’ষ্ট দেই আমাকে। যেমন বাবা তার তেমন ছেলে। দুইজনই খালি আমাকে ক’ষ্ট দেই। দুইজনই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বোধহয়, কে কতটা ক’ষ্ট দিতে পারে আমাকে তাই না। কিন্তু এই প্রতিযোগিতাই কিন্তু আপনিই জিতেছেন। (কাঁপা কাঁপা কন্ঠে)

চলবে…….

 

ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আর মন্তব্য করতে ভুলবেন না।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x