গল্প: ম‍্যাচ মেকার (০৫)

লেখিকা:জান্নাত রাহমান হৃদি

 

পর্ব:০৫

 

 

 

তুষার ভাইয়ের ব্যবসায় যে লাল বাত্তি ধরে গেছে তা আজকাল বেশ বুঝতে পারছি। সেদিন তাহিরা আপু এবং আমি কলেজের সব মেয়েগুলোকে ধরে ধরে খোঁজ নিয়েছিলাম। প্রায় অনেক আপুদের-ই প্রেম করিয়ে দিয়েছেন এই তুষার ভাই। তবে তুষার ভাই যে এটা টাকার বিনিময়ে করেন সে বিষয়ে তারাও অজ্ঞাত ছিল এতদিন। আমার থেকে শুনে তারা তাজ্জব হয়ে গেলো সবাই। তবে কয়েকজন আপু আবার এটাও বিবৃতি দিলেন যে, তুষার ভাই এসব কাজ টাকা খেয়ে করে কি করে না, সেসব দিয়ে দরকার কি আমাদের? কিন্তু তিনি কখনো আলতু ফালতু ছেলেদের প্রেম প্রস্তাব নিয়ে তাদের কাছে আসেন না। ছেলে গুলো ভদ্র এবং হ্যান্ডসাম টাইপের হয়। প্রায় অধিকাংশ আপুর প্রেম-ই নাকি বিয়ে নামক বন্ধনে টিকে গিয়েছে।”

তাদের বিবৃতি শুনে আমি বললাম, “ মানলাম তার নিয়ে আসা ছেলে গুলে ভালো হয়। ভালো হলে তিনি একেবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসুক। প্রেম প্রস্তাব কেনো? প্রেম ঘটক থেকে বিয়ের ঘটক হওয়া টা কি এর থেকে ভালো কাজ নয়? বিয়ের ঘটকালি করলে সওয়াব হয়। প্রেম ঘটকালি করলে নয়।” এভাবেই এক পক্ষর সঙ্গে তুমুল তর্ক বিতর্ক হলো। তবে কিছু মেয়েদের এটা বোঝাতে সক্ষম হলাম যে আমরা কোনো পন্য নই যে তিনি আমাদের কে দিয়ে ব্যবসা করবেন।”

তখন এক আপু তুষার ভাইয়ের পক্ষপাতীত্ব করে বললেন, “তোমাদের কে দিয়ে ব্যবসা করেন মানে কি? তিনি তোমাদের কাছ থেকে টাকা নেন? তিনি টাকাটা নেন, যিনি তার মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠিয়ে থাকেন তার কাছ থেকে। বলতে পারো এটা তার পারশ্রমিক হিসেবেই নেয়।”

“বুঝলাম তুষার ভাইয়ের এই চামচাকে বোঝানো সম্ভব নয়। যাই বলি; তিনি পক্ষ ঐ তুষার মানবের টাই নিবেন। তাই আমি এবং তাহিরা আপু লাষ্ট বক্তব্য দিলাম যে। “আমরা ব্যাপারটা জানতে পেরেছি বিধায়, তোমাদের ও সতর্ক করতে এলাম। এরপর বাদ বাকি তোমাদের যা মন চায় করবে। এ নিয়ে বলার রাইট নেই আমাদের। বক্তব্য শেষ করে স্থান পরিত্যাগ করলাম আমরা। তবে দু একদিনের মধ্যে টের পেলাম কলেজের মেয়েগুলো আজকাল তুষার ভাইকে দেখলে এড়িয়ে চলে। এখানে ওখানে বসে মেয়েরা তার ব্যবসা নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা উভয়-ই করে। যাই হোক আমি যে তার ব্যবসায় লাল বাতি ধরাতে পেরেছি এতেই আমার খুশি। তবে তার ব্যবসায় লাল বাতিটা পুরোপুরি ধরে নি এখনো। আমাদের কলেজের সামনে আজকাল তুষার ভাইকে দেখা না গেলেও, মহিলা কলেজের সামনে নাকি তাকে নিয়মিত দেখা যায়। এছাড়া হাই স্কুলের সামনেও তাকে দেখা যায়। তিনি বোধহয় আজকাল ঐ নাইন টেনে পড়ুয়া মেয়েদের মগজেও এই প্রেম নামক বস্তুু ঢুকাতে লেগে পড়েছেন।

তিনি যাই করুক! তার প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার সখটা আমার আপতত মিটে গিয়েছে। তার যতটুকু ক্ষতি করেছি— তাতেই আমার মনে শান্তি মিলেছে। আজকাল আর সেই দু হাজার টাকার জন্য কষ্ট পাইনা। তাই আমি চিন্তা করে নিয়েছি তার আর কোনো কাজে আমি হস্তক্ষেপ করবো না। তার যে ব্যবসা ইচ্ছে সেই ব্যবসা করে খাক। আমার আর দরকার কি? তবে ইদানিং টের পাচ্ছি তুষার ভাই আমার সঙ্গে আর আগের মতন কথা বলে না। আমি যে তার এত বড় একটা ক্ষতি করেছি; তাতেও সে আমাকে কিছু বলেন নি এসে। তিনি একদম শান্ত নদীর মতো চুপ হয়ে আছেন। যদিও তিনি কথা না বললেও আমার কিছু আসে যায় না। তার কি মনে হয়? আমি তার সাথে সেধে গিয়ে কথা বলবো? মোটেই না। তার মতো তুষারকে পাত্তা দেওয়ার সময় আমার হাতে নেই। আমি আমার প্রেমিক মহাশয় কে নিয়ে ভীষন বিজি এখন।

.
বিকেলের প্রাইভেট পড়ে সবে মাএ বাসায় ফিরেছি। বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখলাম তুষার ভাইদের বাসার সামনে ভীড় ভাট্টা লেগে আছে। কিছু একটা দেখছে সবাই গোল হয়ে। ওখানে গোল হয়ে দেখার মতো কি ঘটনা হয়েছে ব্যাপারটা জানার কৌতূহল হলো খুব। তাই বাসায় না ঢুকে তুষার ভাইদের গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। উঁকি দিয়ে দেখলাম কতগুলো মরা মুরগির বাচ্চা তুষার ভাই বস্তা ভর্তি করছেন। আর আশেপাশের কিছু মানুষ সেটাই দেখছে। এবং তুষার ভাইয়ের থেকে জানতে চাইছেন ঘটনা কি। এক সাথে এতগুলো বাচ্চা কিভাবে মরেছে। তুষার ভাই “জানি না” বলে বস্তা টা নিয়ে রওনা হলেন কোথাও। আমি তার পিছু নিলাম। কারণ ঘটনা টা জানার কৌতূহল আমার ও হচ্ছে। তাই যেতে যেতে জেনে নেওয়ার ধান্দায় আছি আমি।
তিনি তার পাশে আমার উপস্হিতি টের পেয়ে প্রশ্ন করলেন, “কি সমস্যা? আমার সাথে আসছিস কেন?”

“আপনার সাথে যাচ্ছি না তো। একা যাচ্ছি।”

“তো আমার পাশে হাঁটছিস কেন? আগে যা, না হয় পরে যা। তোকে বিরক্ত লাগছে আমার।”

আমি তার বলা অপমানের সহিত বলা কথাখানা গায়ে না লাগিয়ে প্রশ্ন করলাম। “আপনার মুরগি গুলো মরলো কিভাবে?”

“একটা বদ মেয়ের নজর লেগেছে তাই হয়তো।”

আমি তার কথায় মজা পেলাম খুব। খিল খিল করে হেসে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে। বললাম, “নজর নয়; বলতে পারেন অভিশাপ লেগেছে। আমার টাকা মেরে দেওয়ার ফল এটা।”

“বারবার তোর টাকা মেরেছি মেরেছি বলছিস কেন? ওটা আমার পারশ্রমিক।”

“পারশ্রমিক মানুষ নেয় কাজ সম্পন্ন করার পর। আপনি আগে নিলেন কেনো? এতো কনফিডেন্স নিয়ে নিলেন ভালো কথা। কাজটা সম্পন্ন তো করতে পারলেন না। পারেন নি যখন— তখন আপনার উচিত ছিলো না টাকাটা ফেরত দেওয়ার?”

“কানের সামনে মাছির মতো প্যানপ্যান করিস না তো মানসী। তোর ঐ টাকা দিয়ে বিয়েতে বেনারসী কিনে দিবো তোকে কথা দিলাম। এবার যাহ বাসায় যাহ!”

“আমার বেনারসী আমার স্বামী দিতে পারবে। আপনি আমার টা..” টকাটা ফেরত দিন কথাটা পুরো সম্পূর্ন করার আগেই আমি ধপ করে পড়লাম ড্রেনের মধ্যে। দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের মধ্যে পরে আমার চোখে পানি চলে এলো। নাক চেপে ধরে তুষার ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম আমাকে টেনে তোলার জন্য। তুষার ভাই আমাকে তোলার বদলে গা কাঁপিয়ে হাসছেন। তার হাসি দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠলো আমার। ধমকে উঠলাম আমি। “ গাঁধার মতো না হেসে টেনে তুলুন আমাকে।”

তুষার ভাই আগে আমার একটা ছবি তুললেন। এরপর টেনে উঠালেন আমায়। আমি জানি তিনি আমার ছবিখানা ফেসবুকে ছাড়ার মতলব করে তুলেছেন। সেটা তো হতে দেওয়া যাবে না। মান সম্মানের ব্যাপার। তাই হামলা দিলাম তুষার ভাইয়ের উপর। ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার মতো লিলিপুটের তো এই খাম্বার সঙ্গে পেরে উঠার কথা নয়। তুষার ভাই হাত উপরে তুলে ধরে বললেন, “নে এবার।”

“তুষার ভাই ভালো হচ্ছে না কিন্তু। পিকচার ডিলিট করুন এক্ষুনি। আপনার কি ম্যানার্স টেনার্স নেই নাকি? অনুমতি বিহীন কারো ছবি তুলতে হয় না। এটা জানেন আপনি?”

তুষার ভাই নির্বিকার হয়ে বললেন, “জানি কিন্তু মানি না।”

আমি ঠোঁট ফোলালাম। “হ্যা সেটাই তো! আপনার মতো একটা বদলোকের কাছ থেকে আমি আবার ম্যানার্সের এক্সপেক্ট করি। আজব ব্যাপার স্যাপার।”

“আমার ম্যানার্স নিয়ে ভাবার মতো অনেক সময় পাবি। তার আগে নিজে বাসায় গিয়ে সাবান মেখে গোসল দে যা। তোর গায়ের বাজে গন্ধে আমার পেট মুড়িয়ে উঠছে।”

“তাহলে আমি আজ আর গোসল করবো না। আপনার নাকের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকবো। আপনি গন্ধ নিবেন আর বমি করবেন। এটা আমাকে বিপদ থেকে সেইভ না করার শাস্তি।”

তুষার ভাই আচানক গম্ভীর স্বরে বললেন, “আমি চাইলে তোকে ড্রেনে পড়া থেকে বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে করেই বাঁচাই নি। আমি কেনোই বা বাঁচাতে যাবো তোকে। এটা তো আমার দায়িত্ব নয়। যার সাথে সারাদিন লুতুপুতু করে বেরাস; সে বাঁচাক এসে।”

“সে থাকলে তো আপনার মতো দাঁড়িয়ে থাকতো না। অবশ্যই বাঁচাতো।”

“তো! তার কাছে না থেকে, আমার কাছে আসতে গেলি কেনো? আমি আসতে বলেছিলাম নাকি? আমি এমনিও চাইনা তুই আমার সামনে আয়। তোর মুখটা দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে আজকাল। শোনা মানসী, তুই আর আমার সামনে আসবি না কখনো। তোকে দেখলেই আমরা রাগ লাগে, ভীষন রাগ। যেদিন তুই ঐ পঁচা পুকুর থেকে উঠে আসবি ; সেদিন তোর উপর থেকে এই রাগ কমবে আমার।” বলেই গটাগট পায়ে তুষার ভাই চলে গেলেন। আমি তার যাওয়ার পানে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। “পঁচা পুকুর” থেকে উঠে আসা বলতে তুষার ভাই আসলে কি বুঝাতে চেয়েছেন সেটাই মাথায় ঢুকলো না আমার। তাহলে কি এটা বোঝা অংকের থেকেও কঠিন? এত কঠিন কঠিন অংক আমি বুঝে ফেলি— অথচ তার এই কথাটার মানে বুঝতে পারছি না। আজকাল কি সত্যিই আমার ব্রেইন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? তাহলে তো সেটা মোটেই ভালো কাজ নয়। না; বেশি বেশি বাদাম খেতে হবে। ব্রেইন হারালে চলবে না।

 

 

চলবে………

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments