লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
পর্বঃ০৭
তানিশা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে ফুটপাতে এসে দাড়াল। মেঘ এখনও ভেতরে।অফিসের কার সাথে জানি সাক্ষাৎ হয়েছে।তার সাথে কথা বলছে। তাই তানিশা সেখান থেকে সরে এসেছে।মেঘকে দেখে মাঝে মাঝে তানিশার মাথা ঘুরে।একটা মানুষ ঠাস করে কিভাবে মুড চেঞ্জ করতে পারে? তানিশার নিজের খুব খারাপ লেগেছিল মেঘের মন বিষন্ন হওয়ায়। কিন্তু একটু পরেই সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মনে মনে বলেছে এমন মানুষের মন খারাপ হয় না।এতো দুঃখ বিলাশ করতে হবে না।
একটু পরেই মেঘ হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে এলো। তানিশাকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো।সে তো ভেবে বসেছিল এই বুঝি মেয়েটা থাকে রেখেই চলে যায়। মনে মনে লোকটার গুষ্টি উদ্ধার করে এসেছে। অন্য একদিন দাড় করিয়ে কথা বলতি। মেঘ তো তাকে কোলে নিয়ে কথা বলতো। মেঘ তানিশার দিকে এগিয়ে গেল। তানিশা একদৃষ্টিতে ব্যস্ত রাস্তায় চেয়ে আছে।
-” এই তানিশা। “
তানিশা পিছন ফিরে তাকাল মেঘের পানে। -” জ্বী?”
-” বেশি দেরি করলাম? তুমি বোর হওনি তো আবার? “
-“না।গুনেগুনে চার মিনিট। এতে তেমন কিছুই হয়নি মেঘ ভাইয়া। আপনি এতো উতলা হবেন না। “
মেঘ সন্দিহান স্বরে শুধালো -” সত্যি তো।”
তানিশা সায় দিলো।
-“যাক।তা এখন কি করবে? “
-” আমার তো কিছুই করার নেই। কি আর করবো?আপনার না কাজ ছিলো?আপনি আপনার কাজ করতে পারেন। “
মেঘে কপাল কুঁচকে বললো-” এখানে আমার আবার কি কাজ ছিলো?”
তানিশা রাস্তার অপজিটের বিল্ডিংয়ে ইঙ্গিত করে বললো -” শপিং। “
তানিশার কথাশোনে মেঘের মনে হলো সে যে শপিংয়ে কথা বলেছিল তানিশাকে। ভুলে যাওয়ার জন্য নিজেকে মনে মনে বকলো।-“ওহহ করবো তো। পরে করবো। মাইশা বললো রাইশা আপু এলে তোমরা ফ্যামেলি শপিংয়ে আসবে। সেখানে অর্ক, রাফি, আদনান, ফাবিহাসহ সবকটাই আসবে। আমি যেনো তখন তাদের সাথে গিয়ে শপিং করি। তাই প্ল্যান চেঞ্জ করেছি।”
তানিশা ছোট্ট করে বললো -“ওহহ।ভালো।”
-” এখন আমি ফ্রী আছি।তুমি কি করবে এখন?ঘুরতে যাবে? বা লং ড্রাইভ? রাতের শহর দেখলে।দেশে আসার পরে তুমি হয়তো এই প্রথম বের হলে। এখন আমার এটা দ্বায়িত্বের মধ্যে পরে তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। “
-“আরে না না। আমি কোথাও ঘুরতে যাবো না।আমি তো ঘর থেকেই বের হতে চাইনি।মাইশা আপু জোর করে নিয়ে এলো বলে। আপনাকেও অনেক কষ্ট দিলাম। এখন আমি যাই। “
মেঘ মৃদু ক্রোধান্বিত স্বরে বলল -” যাই মানে? যাই মানে কি? “
তানিশা থতমত খেয়ে বলল -” য,যা যাবো।মানে বাড়ি যাবো বলছি। “
-“হ্যা তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেনওও?”
-“না মানে আপনাকে অনেক বিরক্ত করলাম। “
তানিশাকে এতো সৌজন্যতা দেখাতে দেখে মেঘ ভেতরে ভেতরে রুষ্ট হলো। কেমন দূর দূর লাগে। মেঘ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে ফুস নিশ্বাস ফেললো। তানিশার পানে তাকিয়ে শুধালো -“তার মানে ঘুরতে যেতে চাচ্ছো না। “
-“না মানে তেমনটাও না। আপনি কি মন খারাপ করলেন?” তানিশা সন্দিহান কন্ঠে শুধালো।মেঘকে সে কিঞ্চিৎ ভয়ও পায়। একে তো বদরাগী তার উপর মুড চেঞ্জ হয় মিনিটে মিনিটে। -” আচ্ছা চলেন। আশপাশ ঘুরাঘুরি করি। “
মেঘের মুখ উজ্জ্বল হলো। -” গাড়ি আনবো? না চলো রিকশা নেই। কেমন?”
তানিশা নাকচ করে দিলো -” না মেঘ ভাইয়া। রিকশা বা আপনার গাড়ি দিয়ে না। চলেন হেঁটে দেখি। “
মেঘ নিশ্চিন্তে মেনে নিলো। তানিশার দিকে তাকিয়ে হাতের মধ্যে থাকা স্যুটটা তানিশার দিকে এগিয়ে দিলো -” এটা ধরো তো। ইদানীং ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছি।কখন না কখন ফেলে দেই। “
”আচ্ছা ” বলে তানিশা মেঘের হাত থেকে স্যুটটা নিলো।বাম হাতে ভাজ করে রাখল। মেঘ মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখলো।তাদের কেমন কাপল কাপল দেখাচ্ছে। সুন্দরী ওয়াইফ হাসবেন্ড এর কোট হাতে নিয়ে ঘুরছে। পাশে তার সুদর্শন হাসবেন্ড। আহ!মেঘের এটা ভাবতেই সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে।
-” চলো, এখন ওই রাস্তার ওইপাশ যাই। “
-“ওইখানে কেন? “
-” অপর পাশের ভীড় কম মনে হচ্ছে। চলো। “
মেঘের কথায় রাস্তার অপর পাশের ফুটপাতের দিকে তাকাল তানিশা। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত ফুটপাত ধরে অনেক মানুষের যাতায়াত। তবে এই পাশের থেকে মনে হলো অপর পাশের হয়ত একটু মানুষ কম।তাই রাস্তা পার হতে নিয়েছিল তানিশা। মেঘে চেঁচিয়ে উঠলো -” এই তানিশাআআ।”
তানিশা আকস্মিক এমন চেচামেচিতে চমকে উঠলো। মেঘের পানে তাকিয়ে বললো -” কি হয়েছে মেঘ ভাইয়া?”
মেঘ ফুস করে শ্বাস ফেলে বলল -” তুমি এটা কি করতে যাচ্ছিলে? “
-” আমি আবার কি করলাম? “
-” একা একা রাস্তা পার হচ্ছো কেন?যদি কিছু হয়ে যেতো? এমনিতেই তুমি ছোট মানুষ। “
তানিশার বিস্ময় আকাশ ছুলো।-” আমি?এই আমি ছোট?আমাকে দেখতে ছোট লাগে? “
-” দেখা না দেখার কথা না। তুমি ছোট মানে ছোট।শাড়ী টারি পরলে কি মানুষ বড় হয়ে যায়?তোমাকে এখন একটা ফ্রক পরিয়ে দিলেই বাচ্চাদের মতো দেখতে লাগবে।”
-” আপনার মাথা লাগবে । “
মেঘ ডোন্ট কেয়ার ভাব ফুটিয়ে বলল -” আচ্ছা লাগোক। এখন হাত দাও তোমার। “ডান হাতটা তানিশার দিকে এগিয়ে দিলো মেঘ। তানিশা একবার হাতের দিকে তো একবার মেঘের মুখের দিকে তাকাল। মেঘ অতি উৎসাহ নিয়ে চেয়ে আছে তার পানে। তানিশা একটু ইতস্তত করে মেঘের হাতে বাম হাতটা রাখলো।বাম হাতের রূপুর ব্রেসলেটটা ঝলমলিয়ে উঠলো।
মেঘের হৃদস্পন্দন মিস করে গেল কয়েকটা। শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে এলো।চারপাশে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। মেঘের কাছে মনে হলো পুরো শহর থমকে গেছে ওদের রেখে। মেঘ শুকনো ঢোক গিললো। তার শক্ত পুরুষালি হাতে মধ্যে রাখা নরম তুলতুলে হাতটা মুঠোয় নিলো আবেশিত অনুভবে আলতো করে। তার বুকে মৃদু কম্পন সুর তুলছে।
মেঘ তানিশার হাত ধরে আগলে নিলো।তানিশার হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়ার পরেও যখন হাত ছাড়ছে না তখন তানিশা বললো-” মেঘ ভাইয়া হাত।”
মেঘ একবার হাতের পানে তাকিয়ে রাস্তায় চোখ রেখে বললো -” থাক। ছেড়ে দিলে ভীড়ে হারিয়ে যাবে। “
তানিশা খানিকক্ষণ মেঘের অতীব সুন্দর মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে থেকে মেঘের পায়ের সাথে পা মিলালো।হাত রয়ে গেল মেঘের হাতে মুঠোয়। মেঘ নিজের চওড়া দেহ দিয়ে তানিশাকে অপরিচিত মানুষের ছোঁয়া থেকে আগলে রাখছে। সেই পানে তাকিয়ে তানিশার ভালো লাগলো। তানিশা ব্যস্ত ফুটপাতের ব্যস্ত মানুষের পানে চেয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল -” মাঝে মাঝে মনে হয় হারিয়েই যাই। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দূরে কোথাও।”
মেঘ শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -” কেনো?”
-“এতো ভার সহ্য হয়না মেঘ ভাইয়া। ঘাড়ে অনেক বুজা।”
-“কিসের এতো বুজা তোমার ছোট জীবনে? “
তানিশা মাথা নত করে নিলো। সেভাবেই হাঁটল। এতো কোলাহলের মধ্যে ওদের মাঝে নিরবতা ছেয়ে গেল যেন।মেঘ তানিশাকে আর কোনো প্রশ্ন করলো না। সে এখন সময়টাকে উপভোগ করতে চায় ভীষণ ভাবে। একটা ক্ষুদ্র স্বপ্ন পূর্ণ হলো তার। এভাবে একদিন সব আশা পূর্ণ করবে মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে।
***********
আকাশের এক চিলতে চাঁদকে টুকরো টুকরো মেঘ এসে ডেকে দিচ্ছে। ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। গাড়ি মৃদু গতিতে আগাচ্ছে। তবুও বাতাসের তীব্র ঝাপটা এসে তানিশার চোখ বন্ধ করে দিচ্ছে।তানিশার বন্ধ চোখের পাতায় ভাসছে কারো সাথে কাটানো পুরোনো দিনের স্মৃতির দৃশ্যপট। মেঘ ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ড্রাইভ করছে। পাশাপাশি মুগ্ধ নয়নে তানিশার পানে আরচোখে তাকাচ্ছে। তানিশা জানালার পাশে একটা হাত রেখে সেথায় থুতনি ঠেকিয়ে আছে। তানিশার ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসের দাপটে আলুথালু হয়ে গেছে। মেঘ দৃষ্টি সংযত করে রাস্তায় দৃষ্টি রাখলো।খানিকক্ষণ পর মেঘ তানিশাকে ডাকলো-” তানিশা! “
তানিশা সেভাবেই থেকে উত্তর দিল-“জ্বি! “
-“সামনের রাস্তাটা দেখো তো চেনো কিনা? “
তানিশা চোখ খুলে রাস্তার পানে তাকিয়ে স্মিথ স্বরে বললো -” এটা তো আমাদের বাসায় যাওয়ার রাস্তা। চিনবো না কেন? “
মেঘ মনে মনে একটু আশাহত হলো। তবুও বললো -” জানো তানিশা, এই রাস্তায় আমার জীবনের বেস্ট একটা সময় কাটিয়েছি। সময়টা খুবই সংকুলান ছিলো তবুও আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম অনুভূতির সাথে এখানেই সাক্ষাৎ হয়েছিল। “
তানিশা মেঘের পানে তাকিয়ে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল -” তাই? কি সেটা? কেমন অনুভূতি? “
মেঘ নিশ্চুপ ভাবে ঠোঁট ছড়িয়ে রহস্যময় হাসলো।রহস্য করে বললো -” এখন না।আজ থাক, অন্য একদিন বলবো। “
তানিশা ক্ষীণ স্বরে সায় দিলো -” আচ্ছা। “
তানিশা আবার জানালার বাইরে তাকালো।মেঘও আরচোখে জানালার বাইরে তাকালো। গাড়িটা ফুস করে একটা জারুল গাছের পাশ কে*টে গেলো।যতবার এই রাস্তা পার হয়ে যায় ততদিন সেই দিনের কথা মনে হয় মেঘের।
ছয় বছর আগে…..
খালাতো ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ছোট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন মেঘের খালা।রাতে সেখানে থেকে শেষ দুপুরে বাড়ি ফিরছিলো।তপ্ত দুপুরের খা খা রোদের মধ্যে বাইকটাতে গতি চাপিয়ে চলে যাচ্ছিল সে। হঠাৎ রাস্তার পাশে নাজমুল মর্তুজাকে গাড়ির পাশে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গতি কমিয়ে ছিলো সে। নাজমুল মর্তুজা মেঘকে দেখে যেনো মেঘ না চাইতে বৃষ্টি হাতে পেয়েছিলেন। মেঘকে ডেকে থামালেন। মেঘ নাজমুল মর্তুজার গাড়ির পাশে গিয়ে বাইকটা দাঁড় করালো।-” এই যে মেঘ বাবা।কি বিপদে পরলাম বলো তো?”
-” কি হয়েছে আংকেল? “
-” মাঝ রাস্তায় গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। আশেপাশে তো একটা মেকানিকের দোকানও নেই ।”
মেঘ সায় দিলো -” হ্যা তা তো নেই। তবে সমস্যা না আপনি আমার সাথে চলেন।আমি আমার পরিচিত একজন মেকানিককে কল করছি। সে এসে গাড়ি ঠিক করে দিয়ে, নিয়ে দিয়ে আসবে। “
-” না না আমাকে নিতে হবে না। তুমি মেকানিককে কল দাও আমি এখানে আছি। তবে ওকে নিয়ে একটু বাসা দিতে পারবে? “
নাজমুল মর্তুজা ইশারা করলেন গাড়ির ওপর পাশের দিকে। মেঘ সেই ইশারা লক্ষ্য করে ওই দিকে তাকালো। তাকিয়ে যেন সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেললো।এই অসময়ে কিঞ্চিৎ পরিচিত মুখটা তার বোধশক্তি কেড়ে নিলো। তার পৃথিবী থমকে গেল। অদ্ভুত অনুভূতির সাথে পরিচিত হলো যেন মেঘ। হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গিয়ে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো।মেঘের কানের পাশ দিয়ে ঘামের একটা রেখে বেয়ে গেল।তপ্ত দুপুরে জারুলতলায় দাড়িয়ে একজন ষোড়শী কন্যা নাক মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।শ্যামলা মুখশ্রীতে ফোটা ফোটা ঘাম জমেছে।ঝলমলে রোদ মেয়েটার সোনালী লেহেঙ্গার একপাশে পরেছে ত্যাছড়া ভাবে। সেই আলোর প্রতিফলন ঘটেছে মেয়েটার শ্যামলা মুখশ্রীতে।কুঁকড়ানো চুলগুলো উঁচু করে বেধে রাখা।তবে পাশের ছোট ছোট চুলগুলো কুঁকড়ে।স্প্রিং এর মতো হয়ে ঝুলে আছে।টানা টানা চোখ গুলোতে উপচে পরা বিরক্ত। এমন অপার্থিব সৌন্দর্যের বেষ্টিত কিশোরীর সাথে তার এই প্রথম সাক্ষাৎ। সেই সাক্ষাৎ যেন তার সর্বনাশ নিয়ে এলো।ঠিক রবীন্দ্রনাথের সেই লেখাটার মতো –
প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
*****************
মেঘ তানিশাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।তানিশা অনেক জোড়াজুড়ি করেও বাড়িতে নিয়ে আসতে পারলো না।কলিংবেল বাজাতেই হাফসা দরজা খুলে দিলেন।তানিশাকে দেখে গাল ভর্তি হাসলেন। তানিশাও বিনিময়ে মৃদু হাসলো। ড্রইং রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো মা চাচারা টিভি দেখছেন।সিঙ্গেল সোফা জুড়ে বসেছেন আসফিয়া। ডাবল সোফায় বসেছেন মানজুম আরা আর সুলতানা হায়দার। তানিশা গিয়ে বসলো তাদের মধ্যখানিতে। আসফিয়া খাতুন জিজ্ঞেস করলেন -” মাইশা এলো না যে। “
-“তোমার মেয়ে তোমার মেয়ে জামাইর সাথে চলে গেছে।জানো! আমাকে একা রেখেই।”
আসফিয়া বিস্ময় নিয়ে বললেন -” কি বলিস? এই ফাজিল এমন করেছে তোর সাথে? আজ আসুক বাড়িতে। রাগ করিস না। “
“হুম” বলে তানিশা ক্লান্ত শরীরে সুলতানা হায়দারের কাঁধে মাথাটা রাখলো। মানজুম আরা তা দেখে আক্ষেপ করে আসফিয়াকে বললেন-” দেখলে আপা। মা মাই হয়। পেলে পুষে বড় করার কোনো মান পেলাম না। “
সুলতানা হায়দার হাসলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তানিশা মানজুম আরা হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো -” তুমি খুব হিংসুটে মেজোমা। “তার পর মানজুম আরার কানে কানে গিয়ে ফিসফিসয়ে বললো -” কিন্তু জেনে রাখো আমি তোমাকেই বেশি ভালোবাসি। “
মানজুম আরা বিস্মতি হওয়ার ভান করে ইশারায় মাথা ঝাঁকিয়ে পরিষ্কার করে বুঝতে চাইলেন তানিশা সত্যি বলছে কিনা। তানিশা মাথা ঝাঁকাল উপর নিচ। আসফিয়া খাতুন পাশ থেকে বললেন -” হ্যা আর আমরা তো তোকে একটু আদর করিনি। পেলেপুষে বড় করিনি। “
তানিশা দুষ্টু হেসে আসফিয়াকে চোখ মারলো। যাতে বুঝালো আসলে উনাকেনই সে ভালোবাসে। মানজুম আরাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছিলো।তা খেয়াল করে মানজুম আরা মৃদু চাপর দিলেন তানিশার পিঠে। -” দেখো দেখো এই মেয়েকে। আমাদের ভোলাভালা পেয়ে বুঝ দিয়ে দিচ্ছে। “
সুলতানা হায়দার হাস্যরস স্বরে বললেন -” আপা আমার মেয়েকে কিছু বলো না। আমার মেয়ের এতো মা হয়েছে যে কাকে রেখে কাকে ভালোবাসবে ভেবে কুল পায় না।”
তানিশা সুলতানা হায়দারকে জড়িয়ে ধরে উনার কাঁধে মুখ গুঁজলো। মায়ের গায়ের ঘ্রাণ টেনে নিলো নিজের মধ্যে। তার কার্নিস বেয়ে একফোঁটা জল ঘড়িয়ে পরলো তার নিজের অজান্তেই। তানিশা মৃদু স্বরে বিরবিরয়ে বললো -” তোমাদের সবাইকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি মা। প্রচন্ড ভালোবাসি। “
ফারহান বাইরে থেকে এসে বোনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো। সোফার পিছন থেকে ওর কাঁধ হাত রেখে মৃদু ঝাঁকি দিয়ে ডাকলো। তানিশা ঝাপসা চোখে ভাইয়ের পানে দৃষ্টি দিলো। -” এখানে না থেকে উপরে যা। জোহানের কি হলো কি জানি? কি সব ঔষধ পত্র আনিয়েছে। “
আসফিয়া খাতুনও বললেন-” হ্যা, ছেলেটাকে ফাদিনের সাথে ফেরার পর থেকে কেমন জানি দেখাচ্ছে। ফর্সা মুখটা লাল টকটকে হয়ে গেছে। “
তানিশার তড়িৎ গতিতে উঠে বসলো। হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল -” কি হয়েছে ওর? কিসের ঔষধ আনিয়েছে। আচ্ছা বলতে হবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি। “
তানিশা পার্সটা হাতে নিয়ে দৌড়ে যেতে শুরু করল। আসফিয়া পিছন থেকে চিন্তিত স্বরে বললেন -” আরে! এই মেয়ে, পরে যাবি তো। আস্তে যা।”কিন্তু কথাগুলো গিয়ে তানিশার কর্ণকুহরে পৌছায়নি।একবার হুঁচট খেল তারপরও তড়িঘড়ি করে গিয়ে পৌঁছাল জোহানের রুমে। জোনাহ উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পা দুটো বিছানার বাইরে। তানিশা এগিয়ে গেল জোহানের দিকে। পিছন থেকে শুধু ওর কানের লতিত লাল হয়ে আছে এইটুকু লক্ষ্য করা গেল। তানিশা ওর পিঠে চাপর দিলো কয়েক বার ডাকলো। জোহান পিটপিট দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তানিশার পানে তাকাল। তানিশার মুখটা চোখে স্পষ্ট হতেই উঠে বসলো। তানিশা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুদর্শন যুবকটাকে দেখে গেলো। অসুস্থতার ফলে মুখটা লাল আভায় ছড়িয়ে গেছে। জোহান ঘুম ঘুম স্বরে বলল -” তুমি এসে গেছো?”
-” হ্যা, মাত্রই এলাম। ” বলে তানিশা একটা চেয়ার টেনে এনে বসলো।-” এসে শুনি তোমার এই অবস্থা। কি হয়েছে তোমার? দেখি জ্বর হলো কিনা? “
তানিশা উঠে গিয়ে কপালে হাত দিবে তার আগেই জোহান তাকে থামিয়ে দিলো। মৃদু লজ্জিত স্বরে শুধালো -” জ্বর হয়নি। তবে অন্য কিছু। “
তানিশা ভ্রু উঁচিয়ে জোহানের লজ্জা পাওয়া মুখের পানে তাকালো।আস্তে আস্তে জোহানের হাতে দিকে দৃষ্টি গেলো।জোহান একহাত পেঠের উপর রেখেছে। তানিশা সন্দিহান কন্ঠে বলল -” আজেবাজে কিছু খেয়ছো তাই তো? ফাদিন ভাই তাহলে ভালোই ডোজ দিয়েছে তোমাকে। “
-” ফাদিনের কোনো দোষ নেই প্রিন্সেস।আমি নিজেই ইচ্ছাতেই খেয়েছি। ওর বন্ধুগুলোও অনেক ভালো। “
-” হয়েছে। আমাকে বুঝ দিতে হবে না। এখন বলো কি করবো তোমার জন্য। শরীর কেমন? স্যালাইন দিবো। “
-“না লাগবে না। আমি এখন ঠিক আছি।”
তানিশা সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -” সত্যি বলছো তো? “
-” হ্যা। আরেকটা কথা জানো প্রিন্সেস? “
-” কি? বলো। “
-” তোমার দেশ আমার ভালো লাগছে প্রিন্সেস। শুনে যতটা ভালো লাগতো তার চাইতে বেশি ভালো লাগছে। তোমার লাভলী ফ্যামেলি এন্ড লাভলী ইউ আমার অনেক পছন্দ হয়েছে । এখানে না এলে জানতামই না তুমি আমার প্রতি এতো কেয়ারিং। “
-” তোমার দেশে তুমি আমায় আগলে রেখেছিলে। তাই আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। তোমার কথা শুনে বুঝতে পারছি আমি একটু হলেও সফল। তোমাকে তোমার পাওনা ফিরিয়ে দিলাম। “
-” আমার পাওনা? আমি তোমার কাছে তো এমন কিছুই চাইনি। যা চাইলাম, দিলে না।”
তানিশা উঠে দাড়াল। কথা বললে কথা বাড়বে। যা সে চাচ্ছে না আপাতত।-” হয়েছে এতো বকবক করতে হবে না। তুমি ঠিক হয়ে শুয়ে পরো। পাশের রুমে তো আমি আছিই ডাকলেই পাবে। “
তানিশা চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই পিছন থেকে ম্লান সুর জোহান বললো-” আমার কথাটা আবার একবার ভাবো না প্রিন্সেস? “
তানিশা পিছন ফিরে তাকালো না। না শুনার ভান করে এসে দরজাটা ভীরি দিয়ে চলে এলো। জোনাহ তানিশার গমনের পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।মেয়েটাকে সে কিভাবে বুঝাবে? তার মাথায় কাজ করছে না। সবকিছু যে হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে।