লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
পর্বঃ০৮
ড্রাইনিং রুমে সবাই ডিনার করতে বসেছেন।সবাই বলতে আবার সবাই নন।মাইশা, ফাদিন জোহান বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে।ফাইয়াজ বাড়ি ফিরেনি এখনও।বাকিরা খেতে বসেছেন।নাজমুল মর্তুজা আর নুরুল মর্তুজা নিজেদের মতো গল্প করছেন। মহিলারা নিজেদের মধ্যে।মাঝখান দিয়ে ফাহিম ফারহান নিশ্চুপ ভাবে খেয়ে যাচ্ছে।বাপ চাচাদের সঙ্গে ফাইয়াজের যেমন যায় তাদের তেমন একটা যায় না। আইরা আইয়াজকে তানিশার কোলে রেখে গেছে।তানিশা আইয়াজকে নিয়ে কয়েকবার করিডরে চক্কর লাগাল। তাতে আইয়াজ তানিশার কাঁধে মাথা ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। তানিশা আইয়াজকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে নিজের রুমে নিয়ে গেলো।সতর্কতার সহিতে শুইয়ে দিলো বিছানায়।আইয়াজ ঠোঁট উল্টে ঘুমাচ্ছে। তানিশা একটা আদর মেখে দিয়ে উঠে দাড়াল। অসচেতনতায় আইয়াজ একটু নড়েচড়ে শুলো।তানিশা আঁতকে আইয়াজের উপর হাত রাখলো। মৃদু চাপর দিয়ে ঘুম পারাতে পারাতে আনমনে টেবিলের নিচে ডাইরিটা দেখতে পেলো। দেখে মনে হলো এটাকে সে লুকিয়ে রাখতে ভুলে গিয়ে ছিলো। তানিশা আইয়াজের পাশ থেকে উঠে গিয়ে টেবিলের নিচে থেকে ডাইরিটা বের করলো।তুলে রেখে দিবে ভেবে ভেবে আনমনে চেয়ার টেনে বসেই পরলো।আশেপাশে কলম খুঁজল।না পেয়ে ডাইরির পাতা উল্টাতে লাগলো।ডাইরি প্রতি শব্দ তার মুখস্থ। এতো বার পড়েছে নিজের লেখাগুলো যে,ডাইরি না খুলেই পড়তে পারবে। পুরো ডাইরি উল্টেপাল্টে দেখে। ঘুরেফিরে প্রথম দিকের কয়েকটা পৃষ্ঠায় এসে থামলো। এই পার্টটা অসংখ্য বার পড়েছে। সব ঘটনার শিরোনাম না থাকলে এই ঘটনার একটা শিরোনাম দিয়েছিল সে। “রাজকুমারীর উৎপত্তি ” লেখাটার লাল নীল রঙের কালি ঝলমল করছে এখনও। তানিশা গালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বুজলো।সবকিছু যেনো চোখের পাতায় ভেসে আসলো।
তানিশার বয়স তখন মাত্র চার।
সন্ধ্যার পরেই বাড়ির সব ছেলেমেয়ে পড়তে বসে। তানিশা ছোট মানুষ ওদের বিরক্ত করে বলে পড়া সময় সে মা চাচি বা চাচাদের কাছে গচ্ছিত থাকে। আসফিয়া আর মানজুম আরা সেমাই করছেন।ফাইয়াজের হুট করে খেতে ইচ্ছে করছে। তাই সবার জন্যই করছেন। তানিশাকে কিচেনের একপাশের একটা টুলে বসিয়ে রেখে উনারা যার যার কাজ করছেন। মাঝে মাঝে এটা সেটা দিচ্ছেন হাতে। কিন্তু তানিশার এসব একদম ভালো লাগছে না। চাচিরা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হতেই তানিশা আস্তে করে টুল থেকে নেমে পরলো।খালি পায়ে পিল পিল করে হেটে ভাইবোনদের পড়ার রুমে গেলো।পর্দার আড়াল থেকে ড্যাবড্যাব করে আশপাশে চোখ বুলালো।সুলতানা হায়দারকে আশেপাশে না দেখে এগোলো। রাইশা তানিশাকে দেখেই হইহট্টগোল লাগিয়ে দিলো।তাতে ফাদিন ওর পা দিয়ে রাইশার পায়ে গুতো দিলো। তাতে ফাহিম আর মাইশার টেবিলের নিচের ঝগড়ার বিরতি হলো কিছুক্ষণের জন্য। ফাদিনের গুতোতে রাইশা জিব্হা কামড়ে ধরল। তানিশাকে হাত দিয়ে ইশারায় ডাকলো।তানিশা পিলপিল পায়ে ওদের একটু কাছে যেতেই রাইশার আগে ফাদিন তার লম্বা হাত দিয়ে তানিশাকে ছু মেরে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। রাইশা রেগেমেগে চিমটি দিয়ে ধরল ফাদিনের বাহু।ফাদিন পাল্টা চিমটি দিয়ে ফিসফিসয়ে বললো-” এখন মারামারি শুরু করলে কিন্তু ছোটমা এসে তানুকে নিয়ে যাবে। চুপচাপ পড়। ভালো ভাবে পড়তে থাকলে ওকে নিয়ে যাবেন না।চুম্মা দিতে হলে দে কিন্তু চিল্লাপাল্লা করবি না। “
মাইশা গাল ফুলিয়ে এগিয়ে এসে একটা চুমু দিলো তানিশার গালে। তানিশা মুছে নিতে চাইলে চোখ রাঙ্গালো।ফাদিন ঝুঁকে তানিশার কানে কানে বললো-” দুষ্টুমি করিস না তানু। নাহলে ছোটমা আবার তোকে আব্বুর কাছে দিয়ে আসবে। “
তানিশা তার দুই ঝুঁটি ওয়ালা মাথা নিয়ে ঘাড় কাত করে সায় দিলো। ফাদিন স্বস্তি হয়ে বাংলা বইটা পড়ে শুরু করল। “সুলতানা বললেন – মহারাজ আপনি ভুল করছেন। ‘
কিন্তু তাতেও সুলতান নিজের সিদ্ধান্তে অটুট। “
মায়ের নাম শুনে তানিশা মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো।ফাদিন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো -” কি? কি হয়েছে?”
তানিশা তার ছোট ছোট হাত দিয়ে ফাদিনের বইটা নিজের কাছে এগিয়ে নিয়ে গোল গোল চোখ দিয়ে মাকে খুঁজলো। খুজে না পেয়ে ফাদিনকে ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করলো -” আ,,আম্মু কুই? “
-” এখানে তোমার আম্মু নাই। ” তারপর বইয়ের পাতায় শাহী কাপড় পরা কপোত-কপোতীকে দেখিয়ে বললো -” ইনি হলেন রাজা।আর ইনি রানী। তোমার আম্মু না।”
তানিশা ঠোঁট উল্টে আবার জিজ্ঞেস করলো -” তু,তুমি আম্মুলে ডাকলে। ছুলতানা। “
-“আরে! সুলতানা মানে রানী।আমি তোমার আম্মুরে ডাকিনি।রানীরে ডাকছি। “
তানিশা কি বুঝলো তা ফাদিন জানতে পারলো না।কিন্তু এই বিষয়টা বলার পর তানিশা খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো। পা লম্বা করে মেজে ছুতে চাইলো।পিছলে যাচ্ছে দেখে ফাদিন শক্ত করে তানিশার ছোট শরীরটা বুকের সঙ্গ চেপে ধরল। তাতে তানিশার মোড়ামুড়ির বেগ আরোও বাড়লো। মাইশা তা লক্ষ্য করে ধমকের স্বরে বলল -“ওরে ছাড়ো না কেন? ছাড়ো। তানু নিচে নামবে। “
মাইশার দিকে শাসিয়ে তাকাল ফাদিন।তানিশার মুড়ামুড়ি দেখে গোমড়া মুখে ওকে ছেড়ে দিলো। তানিশা ওদের রেখে ড্রাইং রুমে এলো। ড্রাইং রুমে আসফিয়া সেমাইয়ের বাটি হাতে নিয়ে মাইশাকে ডেকে যাচ্ছেন।সেটা মাইশা যেনো ফাইয়াজকে উপরে দিয়ে আসে। তানিশা পিলপিল পায়ে গিয়ে আসফিয়ার কাছে গেলো। হাত বাড়িয়ে দিলো বাটিটা দেওয়ার জন্য। আসফিয়া জিজ্ঞেস করলেন -” কি? খাবে? “
তানিশা মাথা নাড়ালো ডানে বামে। মুখে বললো -” বলভাইয়াকে আমি দিবু। দাও। “
আসফিয়া খাতুন না করে দিলেন। কিন্তু তানিশা নাছোরবান্দা। সে দিবেই দিবে।আসফিয়া খাতুন হার মেনে ভালো করে তানিশার হাতে বাটিটা ধরিয়ে দিলেন। তানিশা বাটিটা দুহাতের আঁজলা নিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো। শেষ প্রান্তে আসতে আসতে ক্লান্ত হয়ে গেলো। দিনে সে একবারও সিড়ি চরে না।তাদের রুমটা নিচেই। যেতে হলে চাচা, ভাইয়েরা কোলে তুলে নিয়ে যায়। এখন নিজে নিজে উঠতে গিলে হাঁপিয়ে গেছে একদম। উপরে উঠে তানিশা ফাইয়াজের রুমে গেল।ফাইয়াজ এসাইনমেন্ট করছিল। দরজার দিকে দৃষ্টি পরতেই উঠে এসে একহাতে বাটি নিলো। অন্য হাতে তানিশাকে কোলে তুলে নিলো।আহ্লাদী স্বরে শুধালো -” আমার পাখিটা কেন আনতে গেলো?অন্যরা কই?মতো কষ্ট হয়েছে পাখি? “
তানিশা মাথা ঝাঁকাল ডানে বামে। না তার একটুও কষ্ট হয়নি।ফাইয়াজ তানিশাকে নিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে কাগজপত্র সরিয়ে সেখানে বসালো। নিজের জন্য চেয়ারটা বেছে নিলো। তানিশা ফুলো ফুলো গাল আরও ফুলিয়ে চেয়ে আছে। ফাইয়াজ সেমাই চামচে তুলে ফু দিয়ে তানিশার মুখের দিকে এগিয়ে দিলো।তানিশা মুখ ফিরিয়ে নিলো। ফাইয়াজ জিজ্ঞেস করল -” খাবে না? “
তানিশা আবার মাথা ঝাঁকাল শুধু। ফাইয়াজ তানিশা খাবে না দেখে নিজে খেতে শুরু করল। কিন্তু তানিশাকে নিজের দিকে হাপুস নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফাইয়াজ বুঝতে পারলো মেয়েটার মনে কিছু নিয়ে কৌতুহল জেগেছে। অপেক্ষা শুধু তার জিজ্ঞেস করার।তাই সে জিজ্ঞেস করল -” আমার পাখিটা কিছু চায় ভাইয়ার কাছে?”
তানিশা মুখ বন্ধ করেই রাখলো। ফাইয়াজ হতাশ হয়ে খাওয়া মন দিলো। ফাইয়াজ তার দিকে উৎসাহ দেখাচ্ছে না দেখে তানিশা ইতিউতি করে বললো -” বলভাইয়া।”
ফাইয়াজ মুখ তুলে আহ্লাদী হয়ে বলল -” জ্বি।”
-” মেজভাইয়া বলছে ছুলতানা হচ্ছে রানী।তাইলে তো আম্মু রানি। মেজমা বলেছে রানীর মেয়ে রাজকুমারী হয়। তাহলে আমি কি রাজকুমারী?বলভাইয়া। “
তানিশার কথা শুনে ফাইয়াজ হেসে ফেলল। তানিশা অভিমানী কন্ঠে বললো -” তুমি হাসলে কেনো?আমি রাজকুমারী না? “
ফাইয়াজ মাথা ঝাকিয়ে হাসলো। হাসি থামিয়ে তানিশার দিকে তাকিয়ে বললো -“হ্যা, আমার পাখিটা তো প্রিন্সেসই। “
তানিশার মুখ ঝলমলিয়ে উঠছে। ঝাপটে ধরল ফাইয়াজের গলা। -“সত্যি বলভাইয়া?আমি প্রিন্সেস? “
ফাইয়াজ তানিশার গালে চুমু এঁটে বললো-” হ্যা, তুমি তো আমাদের প্রিন্সস।”
-” তাহলে আজ থেকে তুমি আমাকে প্রিন্সেস ডেকো।আচ্ছা! “
ফাইয়াজ সায় দিয়ে বললো -” আচ্ছা ডাকবো। “
তানিশা খুশি হয়ে টেবিল থেকে নেমে গেলো। তার আবদারের ব্যাংকে বলা শেষ। এখন তার আর এখানে কাজ নেই।সে এখন নিজের অংশের সেমাই খাবে। ফাইয়াজ তানিশাকে যেতে দেখে পিছু ডাকলো। -” তানুপাখি মাকে বলো তো বলভাইয়াকে পানি দেয় যেনো । “
তানিশা থেমে গেল।কিন্তু পিছন ফিরে তাকালো না। ঝিম ধরে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ফাইয়াজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো। হঠাৎ একটু আগের ঘটনা মাথায় আসতেই কপাল চাপরালো। আবার ডাকলো।তানিশার মতো বড়ভাইয়ার বদলে বল ভাইয়া করে বলল -” প্রিন্সেস বড়মাকে গিয়ে বলো তো বলভাইয়াকে পানি দিতে। “
এবার তানিশা হাসি হাসি মুখ নিয়ে ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে -” আচ্ছা ‘বললো। আচ্ছা বলে খুশিতে দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। ফাইয়াজ কখনও তার আবদার ফেলে রাখে না।তাই তো সবাইকে রেখে ফাইয়াজের কাছে আবদার করে সে।
-“কি করছিস? “
সুলতানা হায়দারের স্বর শোনে তানিশা চোখ খুলে তাকালো। ডাইরিটা গুছিয়ে নিলো। সুলতানা হায়দার চেয়ার টেনে বসলেন তার পাশে। ডাইরিটা দেখে বললে -” সারাদিন এটা নিয়ে পরে থাকিস কেনো?”
-” তেমন কিছু না। তোমাদের সবার ডিনার শেষ?”
-” হ্যা।আজ তোর সাথে ঘুমাবে ভাবছি।”বলে সুলতানা হায়দার বিছানার পানে তাকালেন। আইয়াজকে ঘুমুতে দেখে বললেন -” আইয়াজকে ঘুম পারিয়ে দিয়েছিস?ভালো করেছিস।আইরা বোধহয় নিজের রুমে চলে গেছে। ওকে রেখে আসি।”
সুলতানা হায়দার উঠে যাচ্ছিলেন তানিশা সুলতানা হায়দারকে হাত ধরে আবার বসিয়ে দিলো -” তোমাকে যেতে হবে না।একটু পরে আমি নিয়ে দিয়ে আসবো। মাত্র ঘুমিয়েছে। ঘুম পাতলা।উঠে পরবে। “
-” আচ্ছা। কালকে রিদান রাশারা আসছে। তোর আসার খবর যখন থেকে কানে গেছে মায়ের শান্তি বিনষ্ট করে দিয়েছে একদম। “
-“হুমমম।বিয়ের আর মাত্র ছয়দিন বাকি। এখন আসবে না তো কখন আসবে। প্রায় আড়াইটা বছর চলে গেলো ওদের দেখিনা।মনটা পুড়ে। ” তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আইয়াজের দিকে তাকিয়ে বললো -” দেখো মা, আইয়াজ একদম বড়ভাইয়ার মতো ঠোঁট উল্টে ঘুমায়। “
সুলতানা হায়দার আইয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন -” বাপের সব পাবে মনে হয়। ফাদিন ফারহানদের ছেলেমেয়েদের আগলে রাখবে। “
তানিশা স্মিথ স্বরে বলল -” আচ্ছা আম্মু, ওই বাচ্চাটা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে কি ওদের আগলে রাখতো না। ওটা মেয়ে হতো আমার মন বলে। “
সুলতানা হায়দার হতাশার শ্বাস ফেলে মেয়ের পানে তাকালেন। তানিশার চোখ দুটোতে একটুও কষ্টের ছায়া নেই। অথচ মেয়ে পানে তাকিয়ে সুলতানা হায়দারের মন ভার হলো।-” তুই এখনও ওই ঘটনা ভুলতে পারিসনি। অথচ দেখ, আইয়াজ আসার পর থেকে আমরা দিব্যি আছি। তুই কেন ভুলতে পারিস না?”
তানিশা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো -” আমি হয়তো একটু বেশি আশা করেছিলাম। আমার আশা গুলো কি আর কখন পূণ হয়?”
-” এভাবে কথা বলছিস কেন? “
তানিশা স্মিথ হাসে। -” জানি না। ওকে দিয়ে আসি। তুমি থাকো আমি আসি। “
তানিশা আইয়াজকে আইরার কাছে দিয়ে ফেরার পথে ফাদিনের রুমে উঁকি দিলো। ফাদিন কানে ইয়ারপোডস লাগিয়ে ল্যাপটপে কি যেনো দেখছে। তানিশার প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে গাল ভর্তি হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললো -” কিরে গাধার রাজকুমারী? উঁকি ঝুঁকি মারিস কেন? “
তানিশা সোজা হয়ে বললো-” কই? কিছু না। “
-” এই দিকে আয়। “
তানিশা এগিয়ে গেলো ফাদিনের পাশে। ফাদিন তানিশার হাত ধরে হাতটা মাথায় রাখলো নিয়ে -” মাথাটা টিপে দে তো। “
তানিশা ঝারন মে*রে হাত সরিয়ে দিয়ে বললো-” আমি কি এখন ছোট? আমি কেন মাথা টিপে দিবো? ঘরে বউ আনো। “
ফাদিন হাসে। -” আম্মু তোকে পড়িয়েছে তাই না?আচ্ছা আনবো, এখন তুই দে। দুইটাকা দিবো। এই দেখ তোর জন্য আনলাম। “
বলে ফাদিন ঝুঁকে গিয়ে বিছানার পাশের ডয়ার থেকে নিজের মানিব্যাগ বের করে আনলো।মানিব্যাগ মধ্যে কড়কড়ে দুইটাকার কয়েকটা নোট। তানিশা মৃদু হাসলো তা দেখে। ফাইয়াজের কাছে টাকা চাইলে আবদার অনুযায়ী পাওয়া গেলোও ফাদিনের কাছ থেকে দুইটাকার বেশি কেউ খসাতে পারেনি। তবে হ্যা, একদিনে দুইতিনবার টাকা খুঁজলে দিয়ে দিবে। কিন্তু দুইটাকার নোট ছাড়া আর কিছুই কপালে জুটবে না। তানিশা ফাদিনের কাছ থেকে অনেক টাকা পেতো।ওর কেনো ভাই থাকে দিয়ে কাজ করাতো না।কিন্তু পাঁজি ফাদিন ভাইটা সবসময় মাথা টিপে দিতে বলতো।তার বিনিময়ে দুইটাকা।তানিশা ফাদিনের টাকা গুলো আলাদা করে জমিয়ে রেখেছিলো। যেদিন পাঁচশ টাকা হলো তখন মাটির ব্যাংটা ভেঙে বাড়ির সবাইকে তানিশা আইসক্রিম কিনে খাইয়েছে। তানিশা ভাংতি গুলো নাজমুল মর্তুজাকে দিয়ে পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে সবাইকে বড় গলায় বলছে ফাদিন থাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে দিয়েছে। তা নিয়ে ফাদিন আর মাইশার সে কি ঝগড়া। তানিশা হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো। ফাদিন একটা নোট ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। -” অগ্রিম দিলাম।এখন দে। “
তানিশা নোটটা উল্টে পাল্টে দেখে বললো-” আমি কখন বললাম দিবো? এই টাকা দিয়ে আমাকে এখন আদিম যুগে যেতে হবে। কারণ এই যুগে দুইটাকা দিয়ে তো কিছুই হয় না। তাই আমিও দিবো না। বোনেরা মাথা টিপে দিবে তা আদিম যুগের কথা। এখন বউয়ের যুগ। “
ফাদিন চোখ রাঙিয়ে তাকাল। -” তুই আমার সঙ্গে বাটপারি করিস? “
-“হ।”বলে তানিশা নোটটা কড়কড় ডাকাতে ডাকাতে ফাদিনকে মুখ বাকালো। ফাদিনের চোয়াল শক্ত হলো। তানিশা রুম থেকে বের হয়ে যেতে দেখে পিছু থেকে চেচিয়ে বললো-” গাধার রাজকুমারী রে! কার সাথে বাটপারি করলি তুই এখন জানিস না।গুলি করে তোর খুলি উড়িয়ে দিবো।”
তানিশা দৌড়ে এসে আবার উঁকি দিলো ফাদিনের রুমে। ফাদিনকে ব্যাঙ্গিয়ে বললো-” হ্যা হ্যা তুমি আমার খুলি উড়িয়ে দিবে। যে কিনা বন্দুকটাও ঠিকঠাক ধরতে পারে না। “
ফাদিন আবার কিছু বলার আগেই চলে এলো তানিশা । ফাদিন পিছন থেকে হম্বিতম্বি করে চেচিয়ে যাচ্ছে।
************
ফারহান কাঁথা দিয়ে পুরো শরীর মুড়ে ঘুমাচ্ছে। তার রুমের বেজানো দরজাটা আলতো করে খুলে মাইশা প্রবেশ করলো। পিছনের তানিশাকে ইশারা দিয়ে ডাকলো। তানিশা রুমে ভালো করে চোখ বুলিয়ে পা টিপেটিপে রুমে প্রবেশ করলো। মাইশা গিয়ে ফারহানের কাঁথার এককোণ শক্ত করে ধরলো।তানিশাকে ইশারা দিয়ে পানি দিতে বললো। মাইশা “আআআআ” চিৎকার করতে করতে টান মেরে ফারহানের উপর থেকে কাঁথা সরালো। তানিশা তড়িৎ গতিতে গ্লাসের সব পানি ফারহানের মুকে ঢেলে দিলো। ফারহান হন্তদন্ত হয়ে গভীর ঘুম থেকে চোখ খুলতে কিছু সংখ্যক মেয়ে মানুষের চিৎকার শুনে সেও চেচিয়ে উঠলো -” লা হাওলা ওলা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ।”
তানিশা সেই সময় লাইট জ্বালিয়ে দিলো। মাইশা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। ফারহানের বুক এখন দরফর করছে। এমন রাক্ষসী হাসি তার বুকে ধাক্কা দিয়েছে ভীষণ ভাবে। মাইশাকে দেখে তার রাগের পারদ বেড়ে গেলো। -” ছোটআপুর বাচ্চাআআআ।”
মাইশা এগিয়ে গিয়ে ফারহানের চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললো -” ওলেএএ আমার ভাইটা ভয় পেয়েছে। “
ফারহান বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল -” জাস্ট টু মাচ ইয়ার আপু। “
-” আমরা টু মাচ করছি না তুই। ফজর থেকে ডাকা হচ্ছে। হুম হুম বলে আবার ঘুমিয়ে যাস। উঠ জলদি উঠ।তানিশা আমাকে ঘুম থেকে তুলে হাঁটতে নিয়ে যাবার জন্য মানাতে পারলে।তুই কোন ক্ষেতের মুলা।”
ফারহান কুঁচকে রাখা একটা চোখ খুলে বললো -” তানিশা বলছে?”
-“হ্যা।ও হাঁটতে যাবে। ফাদিন ভাইকে ডেকে তুলতে পারেনি। উফফ তোমরা ছেলেরাও না। “
-“আচ্ছা, তাহলে একটু অপেক্ষা করো।”
ফারহানকে ফ্রেশ হতে দিয়ে তানিশা মাইশাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাগানে গেলো।এখানে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করবে ওদের জন্য। এখনও ভালো করে আলো ফুটেনি। ফজরে নামাজ পরে হুট করেই হাঁটতে বের হতে ইচ্ছে করলো তানিশার।দেশে আসার পর থেকে মর্নিং ওয়াকে যায়নি। জোহানকে ডেকে তুলে মাইশাকেও ডেকে তুললো।ফারহানকে এর আগে থেকেও ডেকেও কোনো রেন্সপন্স পায়নি। ফাদিনের কথা তো বাধই। কিঞ্চিৎ পরে জোহানকে হন্তদন্ত হয়ে বের হতে দেখা গেলো।তানিশাকে গার্ডেনে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। ও ভেবেছিল সবাই তাকে রেখেই চলে গেছে। জোহানকে দেখেই মাইশার মেজাজ খারাপ হলো -” এই গর্দবটাকে কে খবর দিলো?”
তানিশা শান্ত কন্ঠে বললো -” ওকেই আশপাশ ঘুরে দেখাবো বলে যাচ্ছি। “
মাইশা বিস্মিত হয়ে বলল -” কি? এর জন্য আমার আরামের গুম হারাম করেছিস তুই?”
তানিশাকে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে না দেখে মাইশা আপনাআপনি থেমে গেলো। ফারহান চলে আসতেই। উপর থেকে ফাদিন চেচিয়ে বললো -” এই তোরা একটু দাঁড়া। ফাহিমকে নিয়ে আসছি আমি। “
বলেই উধাও হয়ে গেলো। ফারহাম কোমড়ের হাত রেখে বললো -” তাহলে আর বড়ভাই বাদ পরবে কেনো? ওকেও ডেকে নিয়ে আসি। “
তানিশা নাকচ করে বললো -” না। বড়ভাইয়াকে ডেকো না।ঘুম পূর্ণ করতে পারছে না এমনি। “
তানিশার কথায় মাইশাও সায় দেওয়ায় ফারহান থেমে গেলো। ফাদিন ফাহিমকে নিয়ে আসতেই ওরা রওয়ানা দিলো।বাড়ির ছোট গেইটা দিয়ে একজন একজন করে বের হচ্ছিল। তানিশা একদম শেষে বের হলো।বের হয়েই থমকে গেলো। গেইটের বাইরে একজন সুদর্শন পুরুষ, ঘুম ঘুম চোখ মেলে তাকাতেও পারছেন না। তবু এই অসময় তাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।